📄 বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সূচনা
১৯৬০ সালে যখব চুম্বে ঘোষণা দিল, কটেংগা প্রদেশ কংগো থেকে অবশ্যই স্বাধীন হবে। এ ঘোষণার কিছুদিন পরই চুম্বেকে হত্যা করা হয়। নিরাপত্তা পরিষদ সর্বপ্রথম জাতিসংঘ বাহিনী কংগোতে প্রেরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কংগোতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা বাহিনী হাজারো নিষ্পাপ মানুষকে হত্যা করে। তারা কটেংগার নিরীহ নিরপরাধ জনগণের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। সেখানের যোগাযোগ কেন্দ্রগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়া হয়, যাতে বহির্বিশ্বের সাথে কোনো যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে। হাসপাতাল এবং স্কুলগুলোও ধ্বংস করে দেয়া হয়। কোনো দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের সূচনা এখান থেকেই হয়, কিন্তু ব্যাপক আকারে হস্ত ক্ষেপ শুরু হয় উপসাগরীয় যুদ্ধের পর থেকে। নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৯১ সালের এপ্রিলে
একটি প্রস্তাব পাস করে ইরাকের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ প্রস্তাবের মাধ্যমে জাতিসংঘকে সম্পূর্ণ ছাড় দিয়ে দেয়া হয় যে, জাতিসংঘের কর্মকর্তারা কোনো অনুমতি ছাড়াই যে কোনো সময় ইরাকের অভ্যন্তরে অনুসন্ধান চালাতে পারবে এবং বিধ্বংসী কোনো অস্ত্র পাওয়া গেলে তা ধ্বংসও করতে পারবে। এমনিভাবে জাতিসংঘ ইরাকের খাদ্য-শস্য আমদানী-রফতানী এবং পেট্রোল বিক্রয়ের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মনগড়া আইন প্রণয়ন করে জাতিসংঘ নিজের ইচ্ছামত ইরাকের অর্থনীতি, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র নীতির ওপর পাহারা বসিয়ে দেয়। কোনো আপত্তি-অভিযোগ ছাড়াই ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তাব পাস করে। এভাবেই জাতিসংঘ বিশ্বের সকল দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার দরোজা খুলে দেয়। একই খেল বসনিয়া, হাইতি এবং সোমালিয়াতেও খেলা হয়। আংশিকভাবে লিবিয়া, কম্বোডিয়া, লাইবেরিয়া, নাইজেরিয়া, সুদান এবং রাঙ্গোলায়ও একই নাটক মঞ্চস্থ করা হয়।৫ অতঃপর ১৯৯২ সালের জুন মাসে জাতিসংঘের মহাসচিব বুট্রোস ঘালির রিপোর্ট 'শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত প্রস্তাব' জাতিসংঘের জেনারেল এ্যাসেম্বলীতে পেশ করেন। উক্ত রিপোর্টে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সকল দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিষয় আইনী মর্যাদা দেয়ার আহবান জানানো হয়। বৃহৎ শক্তিগুলো সবাই এ প্রস্তাবটি সাদরে গ্রহণ করে নেয়। মহাসচিব তার প্রস্তাবে জাতিসংঘের কার্যসীমা আরো ব্যাপক ও বিস্তৃত করার আবেদন জানান। তিনি বলেন, পারিবারিক একতা বিনষ্ট হওয়া থেকে রক্ষার জন্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, এইডস, ক্ষুধা, দারিদ্র ও দূর্ভিক্ষ নির্মূল করা, মানবাধিকার সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের ভূমিকা থাকা উচিত। কারণ, এ বিষয়গুলো এত সঙ্গীন এবং তার সীমা এত ব্যাপক বিস্তৃত যে, কোনো দেশের একার পক্ষে তার সীমিত উপকরণ দিয়ে এর মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।
টিকাঃ
৫. কসোভোতে মুসলমানদের বংশ নিধনের নতুন পদ্ধতি ন্যাটো বাহিনীর তত্ত্বাবধানে গ্রহণ করা হয়।
📄 বিশ্বের সরকারগুলোর মূল ক্ষমতা জাতিসংঘের নিকট হস্তান্তর করা
ধীরে ধীরে জাতিসংঘ ও তার অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর তরফ থেকে বিভিন্ন দেশের ওপর এমন আইন চাপিয়ে দিতে লাগল, সেসব দেশ তাদের নিজেদের বিষয়ে নিজেরা সিদ্ধান্ত নেবার পরিবর্তে সিদ্ধান্ত দেবে জাতিসংঘ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডি ও জনসন-এর শাসনামলে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের সহকারী মি. রিচার্ড গার্ডনার বলেছিলেন, যদি আমাদের নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইমারত নির্মাণ করতে হয়, তাহলে তার ভিত্তি ওঠাতে হবে একেবারে নীচ থেকে, ওপর থেকে নয়। আমাদের উচিত কোনো দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ও তার প্রভাব-প্রতিপত্তির পরওয়া না করা। এ ক্ষেত্রে যে দেশই হঠকারিতা প্রদর্শন করবে সে দেশকে দমন করতে মোটেও কুণ্ঠাবোধ না করা। এ ছাড়া আমরা শুধু তোষামদ, খোশামদ ও কারো অনুসরণ করে নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারব না। এ মন্তব্য প্রকাশ করেছেন, ফরেন এ্যাফেয়ার্সের এক প্রবন্ধকার, যা এপ্রিল ১৯৪৭ সালে ফরেন এ্যাফেয়ার্সের এক সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। এ প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার পর পরই খুব সাদাসিধাভাবে নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উত্থাপন করা হলে সাধারণ মূলনীতির মতো তা খুব সহজেই মেনে নেয়া হয়। প্রস্তাব পেশ করার সময় নামকা ওয়াস্তে একথারও উল্লেখ করে দেয়া হয়, এ প্রস্তাবের বাস্তবায়ন জরুরী নয়। অতঃপর একটি আন্তর্জাতিক দস্তাবেজ তৈরি করে জাতিসংঘের প্লাটফরম থেকে তা মঞ্জুর করিয়ে নেয়া হয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে জাতিসংঘ ও তার অধঃস্তন সংগঠনগুলোকে কোনো কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার দিয়ে দেয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ ১৯৮২ সালে আমেরিকা 'গণহত্যা বিষয়ক আইন'-এ স্বাক্ষর করেছিল। এই আইনের আওতায় হেগের আন্তর্জাতিক আদালতকে এই স্বাধীনতা ও ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল যে, যদি কোনো দেশকে গণহত্যা ও সাধারণ হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত পাওয়া যায় তাহলে তার বিরুদ্ধে মোকাদ্দমা চালানো হবে। হুবহু একই অবস্থা 'পরিবেশ সংরক্ষণ ও শিশু অধিকার' সংক্রান্ত আইনের। ১৯৮৯ ও ১৯৯৪ সালে এ আইনের খসড়ায় দস্তখত করে জাতিসংঘ থেকে পাস করানো হয়। 'গ্যাট' চুক্তির আকারে আন্ত র্জাতিক বাণিজ্য আইন সকল দেশের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। ৬ এভাবে ক্রমশঃ বিভিন্ন দেশের সরকার সর্বোচ্চ ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতা চলে যাচ্ছে জাতিসংঘের হাতে। এখন সেসব দেশ নিজের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ে আইন প্রণয়ন করতেও নির্জেকে অক্ষম মনে করছে। তারা তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য জাতিসংঘ ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলোর কাছে ধর্না দিতে হচ্ছে। জাতিসংঘের এক কমিটি মার্কিন প্রদেশ ওরিগান-এর একটি আইনকে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে রুজু করা ছাড়াই। প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছিল। এ আইনটি ছিল পরিবেশ সংক্রান্ত। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো আইন কেবল সুপ্রিম কোর্টই প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রাখে। শিশু সংক্রান্ত আইন সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ভার্জিনিয়া প্রদেশের এক পার্লামেন্ট সদস্য বলেন, জাতিসংঘ আইন তো পাস করল, কিন্তু মার্কিন সমাজে তা বাস্তবায়ন করার জন্য মার্কিন সিনেটকে এ আইনের সার্বিক দিক আলোচনা পর্যালোচনার সুযোগ দেয়নি। সমস্যা হবে তখন যখন মার্কিন আদালত জাতিসংঘ প্রণীত আইনের ফলাফলের সম্মুখীন হবে।
টিকাঃ
৬. বাহ্যিকভাবে আমেরিকার নামে ইহুদী গোষ্ঠীই এই চুক্তির সকল সুযোগ-সুবিধা ও ফায়দা ভোগ করবে। কারণ মার্কিন ব্যাবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে ইহুদী গোষ্ঠীরই একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। এই চুক্তির আওতায় বিশ্বের সকল দেশ কৃষি উৎপাদনে জাতিসংঘের আইন-কানুন ও নিয়ম-নীতি মেনে চলতে বাধ্য হবে। জাতিসংঘ যদি দাবী করে, অমুক অমুক কৃষি উৎপাদনের পরিমাণ ও মানদন্ড এমন হবে, তাহলে সে দেশ এই দাবী বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হবে। এতে তার বস্তুগত যতই লোকসান গুনতে হোক না কেন। উদাহরণস্বরূপ ইসরাঈল ও মিসরের কৃষি ও বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ইসরাঈল তুলা ও তরকারির বীজ সরবরাহ করে, যা ছিল অতি নিম্নমানের। এর ফলে মিসরের কৃষকদের বিপুল পরিমাণ আর্থিক লোকসান গুনতে হয়েছে; বরং তাদের কৃষি ভূমিও বরবাদ হয়ে গেছে। বাণিজ্য ক্ষেত্রে ঠিক একই চুক্তি ভারত ও অন্যান্য দেশের মাঝে করানোর জোর প্রয়াস চলছে। অপরদিকে বৈদেশিক ঋণ থেকে মুক্তি দেয়ার মুখরোচক কথা বলে ভারতের বড় বড় কারখানা ও কোম্পানীগুলো ক্রয় করে নেয়া হচ্ছে।
📄 জাতিসংঘকে আন্তর্জাতিক সরকারের মর্যাদা দান
জাতিসংঘের মহাসচিব ড. বুট্রোস ঘালি তার 'শান্তি প্রস্তাব' রিপোর্টে যথারীতি দাবী করেছেন, জাতিসংঘকে বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের কাছ থেকে ট্যাক্স আদায় করার ক্ষমতা প্রদান করা হোক। সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক লেনদেন, পেট্রোল উৎপাদন ও অস্ত্রের রেজিস্ট্রেশন ফি ইত্যাদি বাবদ অর্থ উসুল করা হবে, যাতে জাতিসংঘের এত বড় সচিবালয় ও তার ক্রমবর্ধমান খরচের জন্য পর্যাপ্ত অর্থের যোগান দেয়া যায়। কারণ বিভিন্ন সদস্য দেশের কাছ থেকে চাঁদা উসুল করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এখন আমরা এসব চাঁদার ওপর ভরসা করতে পারি না। ধীরে ধীরে ৭ নং ধারার আওতায় জাতিসংঘের স্থায়ী শান্তিবাহিনী গঠন করার প্রয়াস চালানো হোক।
১৯৬১ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর 'যুদ্ধ বিগ্রহ থেকে মুক্তি' শীর্ষক বিশ্লেষণধর্মী এক রিপোর্ট তৈরি করে মার্কিন সরকারের সামনে পেশ করে। উক্ত রিপোর্টকে ভিত্তি করে মার্কিন কংগ্রেস 'আইন ৮৭-২৯৭' সরকারীভাবে পাস করে। যার শিরোনাম ছিল 'অস্ত্র সংকোচন আইন'। এ আইন অনুযায়ী আমেরিকা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, শান্তিপূর্ণ বিশ্বে মানববিধ্বংসী অস্ত্রগুলো ধীরে ধীরে সুপরিকল্পিতভাবে তিন স্তরে নির্মূল করা হবে।
০১. প্রথম স্তরে অস্ত্রের বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলা হবে এবং এ বিষয়ে আন্ত র্জাতিক চুক্তির পরিবেশ তৈরি করা হবে।
০২. দ্বিতীয় স্তরে আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে শান্তি বাহিনী গঠন করা হবে।
০৩. তৃতীয় স্তরে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত উপায়ে খুব দ্রুত সকল দেশকে বিধ্বংসী অস্ত্র থেকে মুক্ত করা হবে, যাতে কোন দেশ সামরিক দিক দিয়ে জাতিসংঘের সশস্ত্র বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করতে না পারে।
ইরাক ও যুগোশ্লাভিয়া প্রজাতন্ত্রকে যেভাবে সামরিক অস্ত্রশস্ত্র থেকে বঞ্চিত করে হত্যা করা হয়েছে তা এই আইনের বাস্তব পদক্ষেপ। এই আইন অনুযায়ী সকল দেশকে কেবল সেসব অস্ত্রশস্ত্রই রাখার অনুমতি থাকবে যা অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃংখলা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন। পুলিশ বাহিনীকে অভ্যন্তরীণ বিশৃংখলা ও নৈরাজ্য দমন করার জন্য ভারী অস্ত্রে সজ্জিত করা হবে।
৯০-এর দশকের পর থেকে জাতিসংঘ শান্তিবাহিনীতে সৈন্য সংখ্যা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ১ লাখে উন্নীত হয়েছে। ২০শে মার্চ ১৯৬২ সালে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে প্রতিরক্ষা পর্যালোচনা বিভাগ রিপোর্ট নং ৭ প্রস্তুত করে। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় উক্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রশ্ন করেছিল, এমন পরিবেশ কিভাবে সৃষ্টি করা যায় যেখানে জাতিসংঘ তার যোগ্যতা ও শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারবে। এ প্রশ্নের উত্তর প্রতিরক্ষা বিভাগ প্রস্তুত করেছিল। তাতে সরাসরি বলা হয়, যে সকল দেশের ওপর জাতিসংঘ তার আধিপত্য ও দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এবং তার অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো সেসব দেশের সকল সেক্টরে পূর্ণ জেঁকে বসতে চায়, সেসব দেশকে জাতিসংঘের সকল প্রতিষ্ঠানের সদস্য হওয়া অত্যাবশ্যক করতে হবে এবং জাতিসংঘের সকল প্রতিষ্ঠানের কাছে পূর্ণাঙ্গ সামরিক শক্তি থাকতে হবে। এ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য আমাদের জাতিসংঘের চার্টারে সামান্য পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গোটা বিশ্বে স্বাধীনভাবে তার সকল দায়িত্ব সুচারুরূপে আঞ্জাম দিতে পারে।
জাতিসংঘে যেসব দেশ শক্তিশালী ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে, তারাই অস্ত্র সংকোচনের তত্ত্বাবধান, শান্তি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা, পারস্পরিক অনৈক্য-দ্বন্দ দূরীকরণ ও ট্যাক্স উসুল করার জন্য যথেষ্ট। এসবের জন্য জাতিসংঘের প্রয়োজন নেই। আমরা এমন জাতিসংঘের কথা বলছি, যার নিকট পাঁচ লাখ সৈন্যের এমন বাহিনী থাকবে, যারা অত্যাধুনিক আণবিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত হবে। পঞ্চাশ থেকে একশ' পর্যন্ত রাসায়নিক ও আণবিক সমরাস্ত্র থাকবে এবং সকল সরকারের তিনটি কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা তার নিকট থাকবে। আন্তর্জাতিক আদালতের ফয়সালা সে-ই বাস্তবায়ন করবে। নিঃসন্দেহে আমরা সাধারণ রাষ্ট্র সরকারের কথা বলছি। এ প্রস্তাবকে বুনিয়াদ বানিয়ে বৃহৎ শক্তিগুলোর অস্ত্রত্যাগ সংক্রান্ত অসংখ্য চুক্তি হয়েছে। আণবিক অস্ত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে আলোচনা পর্যালোচনা হয়েছে। রাশিয়ার সাথে অস্ত্র পরিত্যাগের সবচে' বড় চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। যে চুক্তির আওতায় রাশিয়াকে অন্ততঃ পক্ষে আণবিক অস্ত্র থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘের অফিসাররা সামরিক প্রশিক্ষণ দেখাশোনা করে।
বহুকাল ধরে মার্কিন মিডিয়ায় এ ধরনের প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখে মানসিকতা প্রস্তুত করা হচ্ছে যে, আমেরিকা বর্তমানে বিশ্বের সবচে' বৃহৎ দেশ। কেন্দ্রেীয় সরকারের মাধ্যমে এই দেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালন কঠিন হয়ে পড়েছে। এজন্য আমেরিকার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আলোচনা-পর্যালোচনা হওয়া দরকার। এখন কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা সীমিত করে দেয়ার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে মার্কিন সংবিধানে স্বাধীন মত প্রকাশ ও ব্যক্তিগত অস্ত্র রাখার অধিকার দেয়া হয়েছে। এখন সেসব অধিকার নির্মূল করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে।
আমেরিকার বিভিন্ন স্টেটে মার্কিন সংবিধানে সংশোধনী আনার প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে, কিন্তু এখনো পর্যন্ত দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জিত হয়নি। যদি দুই তৃতীয়াংশ স্টেট এ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে পুরাতন সংবিধানের পরিবর্তে নতুন সংবিধান রচনার সেই পুরাতন দাবী আবার যিন্দা করা সম্ভব। তখন ইউনাইটেড স্টেট অফ আমেরিকার পরিবর্তে নিউ স্টেট অফ আমেরিকা নাম দেয়া হবে। স্টেটের সংখ্যা হ্রাস করে তাকে অর্ধ স্বায়ত্তশাসন দেয়া হবে। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা হ্রাস করার পরিবর্তে তার বাস্তবায়ন ক্ষমতা আরো বৃদ্ধি ও বর্তমান সাংবিধানিক অধিকার বিলুপ্ত করা হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা মোতাবেক ইহুদী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে ধারাবাহিক এ ধরনের গ্রন্থ লেখা এবং বক্তৃতা ও বিবৃতি প্রদান করা হচ্ছে। যাতে বলা হচ্ছে, আমেরিকা একটি যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে অনৈক্য ও দ্বন্দ্বের শিকার হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির উপদেষ্টা আর্থার সেলেংগার রচিত গ্রন্থ 'আমেরিকার অনৈক্যে' একথা বলা হয়েছে। এমনিভাবে জন ক্যানন-যিনি অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ছিলেন, তিনি স্বীয় গ্রন্থে প্রস্তাব পেশ করেছেন, আমেরিকার ভবিষ্যত সম্পর্কে আলোচনা পর্যালোচনার জন্য একটি স্বতন্ত্র কমিটি গঠন করা উচিত।
📄 নতুন গ্রুপ
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রুশ ও যুগোশ্লাভিয়া ঐক্যবদ্ধ দেশরূপে আবির্ভূত হয় পরবর্তীতে ইউরোপীয় দেশগুলোর মাঝে একতা, সহযোগিতা ও ঐক্যের নতুন রূপ সামনে আসে। এই ঐক্য সর্বপ্রথম ইউরোপীয় যৌথ বাজারের রূপ ধারন করে অতঃপর পর্যায়ক্রমে এ ঐক্যই ইউরোপীয় পার্লামেন্টের রূপ ধারণ করে। এরপর কাস্টম ও সীমান্ত আইন বিলুপ্ত হয়। এখন ইউরোপীয় দেশসমূহের মাঝে একব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও একক মুদ্রা চালু হয়েছে। একই অবস্থা উত্তর ও দক্ষিণ আমেরি মহাদেশের মাঝে সৃষ্টি হচ্ছে। যে কমিটি উভয় মহাদেশের মাঝে অনুষ্ঠিত চুক্তি বাস্তবায়নের তত্ত্বাবধান করবে, সে কমিটিই পরবর্তীতে পার্লামেন্টের রূপ ধারণ কববে। পর্যায়ক্রমে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের পদাঙ্ক অনুসরণে ঐক্যবদ্ধ মার্কিন পার্লামেন্ট অস্তিত্ব লাভ হবে।
সম্ভবত একই অবস্থা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্য সাগরীয় দেশসমূহে অবলম্বন করা হচ্ছে। জর্ডান ও ইসরাঈলের মাঝে ঢিলেঢালা ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই ঐক্যের উদ্দেশ্য উভয় দেশের মাঝে কাস্টম ও পাসপোর্ট ব্যবস্থা নির্মূল করা ছাড়া আর কিছুই নয়। রাবাত, ওমান ও কায়রোতে 'অর্থনীতি' শিরোনামে যে ষষ্ঠ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে তার মৌলিক উদ্দেশ্য, ইসরাঈলী পণ্যের জন্য সকল আরব দেশের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়া।