📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 পূর্বাভাস

📄 পূর্বাভাস


দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের পরিসমাপ্তির পর পরই বিশ্বের সর্বত্র এমন একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আলোচনা-পর্যালোচনা শুরু হয়, যার থাকবে নিজস্ব কিছু নীতিমালা ও আইন-কানুন। থাকবে একটি নিজস্ব সীমারেখা। বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের জন্যই এসব নীতিমালা, আইন-কানুন ও সীমারেখা মেনে চলা আবশ্যকীয় হবে। চাই তা বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর ধর্ম, আকীদা-বিশ্বাস, সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং চরিত্র ও মূল্যবোধের সাথে সংঘর্ষপূর্ণই হোক না কেন। প্রয়োজনে এই নতুন বিশ্বব্যবস্থার নির্ধারিত নীতিমালা ও আইন-কানুনকে গোটা বিশ্বের ওপর চাপিয়ে দিতে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতেও কুণ্ঠা বোধ করা হবে না।

নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রেক্ষাপট ও তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ফিকির করলে যে বাস্তবতা ফুটে ওঠে সেটি হলো, এই নতুন বিশ্বব্যবস্থার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মৌলিক উদ্দেশ্য হলো, জায়নবাদী নীতিমালা, চিন্তাধারা, দৃষ্টিভঙ্গি ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্ত বায়ন করা এবং যে কোনো মূল্যে তার প্রাধান্য ও আধিপত্য বিস্তার করা। চাই নতুন বিশ্বব্যবস্থার স্বপ্নদ্রষ্টা চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা এ বাস্তবতা অনুভব করুন আর নাই করুন, কিন্তু বাস্তবতা এটাই। সাথে সাথে একথাও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, জায়নবাদী বুদ্ধিজীবীরাই সর্বপ্রথম তাদের দস্তাবেজেই নতুন বিশ্বব্যবস্থার মৌলিক নীতিমালা ও রূপরেখা পেশ করেছে, বরং তাতেই নতুন বিশ্বব্যবস্থার বীজ বপন করা হয়েছে। নতুন বিশ্বব্যবস্থা বর্তমান অত্যুন্নত অবস্থায় উন্নীত করতে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থায় রূপ দিতে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ওই সকল সংগঠন-সংস্থাই মৌলিক ও কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে, যেসব সংগঠন-সংস্থা ইউরোপ-আমেরিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

একথাও আর গোপন নেই যে, মানবাধিকার ও সংস্কৃতির নামে যেসব বেসরকারী সংগঠন, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান আজ গোটা বিশ্বে কাজ করে যাচ্ছে, তাদের সবারই নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে জায়নবাদীদের আন্তর্জাতিক সংগঠনের সাথে। এক কথায়, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এ সব সংগঠন, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে একটি জায়নবাদী কাঠামোয় ঢালার প্রাণান্তকর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তাদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে কাউন্সিল অফ ফরেন রিলেশন্স (CFR)-এর সাথে। এই কাউন্সিল অফ ফরেন রিলেশন্স-(সি.এফ.আর)-এর আওতায় আন্তর্জাতিক জায়নবাদী সংগঠন, মার্কিন গির্জা সংগঠন, আন্তর্জাতিক গির্জা সংগঠন এবং এগুলোর সাথে সম্পৃক্ত অন্যান্য অসংখ্য সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। এসব সংগঠন-সংস্থা ছাড়াও মানবাধিকারের নামে কাজ করে

যাচ্ছে আরো বহু সংগঠন, যারা জায়নবাদী লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও আদর্শে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের রাজনীতিবিদদের বিপুল সংখ্যক উল্লিখিত সংগঠন সংস্থাগুলোর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তারা যখনই ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করেন, তখনই তারা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ ও চিন্তা-চেতনা এমনভাবে বাস্ত বায়ন শুরু করেন, যাতে সামনে অগ্রসর হয়ে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায়, যে বিশ্বব্যবস্থায় জায়নবাদী গোষ্ঠী ও তাদের অনুসারীদের একক কর্তৃত্ব আধিপত্য থাকবে। এ নতুন বিশ্বব্যবস্থার পরিকল্পনা ও রূপরেখা তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় যখন সবেমাত্র সাদাসিধাভাবে লীগ অফ নেশন অস্তিত্ব লাভ করেছে। এরপর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা হয়। পরবর্তীতে এই জাতিসংঘকে মূলকেন্দ্র করেই জায়নবাদী চিন্তাবিদ ও রাজনীতিবিদরা আন্তর্জাতিক সরকারের স্বপ্ন দেখা শুরু করে। শুধু তাই নয়; বরং আন্ত র্জাতিক সরকারের রূপরেখা ও পরিকল্পনাকে বাস্তবতার লেবাস পরানোর জন্য সম্ভাব্য সকল শক্তি এবং প্রচেষ্টা কাজে লাগাতে শুরু করে। তাদের এ পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক অবকাঠামোর সাথে সংঘর্ষপূর্ণই হোক না কেন, এতে তাদের কিছুই আসে যায় না।

এখন প্রশ্ন, এই নতুন বিশ্বব্যবস্থা কি? কিইবা এর রূপরেখা? আর এই রূপরেখা বাস্তবায়নের জন্য এ পর্যন্ত কি ধরনের প্রয়াস চালানো হয়েছে। দুনিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্র ও জাতিগোষ্ঠীকে সহজেই এ পরিকল্পনা মানানোর জন্য এবং কোনো অবস্থাতেই যেন তারা এর বিরোধিতা না করে, এর জন্য কি প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে, সেই কর্মতৎপর শক্তিই বা কি, যার বলে বলীয়ান হয়ে এ উদ্দেশ্য অর্জনের পথে তারা ধাবমান? আর এ সব প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ যে নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা লাভ করবে তার ফায়দাই বা কারা ভোগ করবে? বক্ষমান গ্রন্থে আপনার এসব প্রশ্নের জবাব পাবেন।

পাশ্চাত্য মিডিয়া প্রকৃতপক্ষে এই আন্তর্জাতিক সরকার গঠন ও বিনির্মাণে মৌলিক উপাদানসমূহের মধ্যে একটি কার্যকরী শক্তিশালী উপাদান এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রীয় স্তম্ভগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় স্তম্ভ, যার মাধ্যমে নতুন বিশ্বব্যবস্থা কায়েম করা হচ্ছে।

এ নতুন বিশ্বব্যবস্থার নাম দেয়া হয়েছে 'গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়ন।'১ মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে গ্লোবালাইজেশনের অর্থ মার্কিনাইজেশন ছাড়া আর কিছুই নয়।

এ ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য বিভিন্নভাবে পুরো বিশ্বের সকল বিষয়ের ওপর পাশ্চাত্য পুঁজিবাদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা, যার প্রথম ভাগে থাকবে আমেরিকা।

এ ব্যবস্থার অধীনে বিশ্বের সকল অর্থনৈতিক সেক্টরে বহুজাতিক কোম্পানীর অবাধ বাণিজ্য করার অনুমতি থাকবে এবং এর সকল আইন-কানুন ও নীতিমালা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই প্রণয়ন করবে। মার্কিন সভ্যতা-সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ বিশ্বব্যাপী সুদৃঢ় করতে

মিডিয়া, সংবাদ মাধ্যম, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও যোগাযোগ মাধ্যমকে শক্তিশালী করা, ছবি ও চলচ্চিত্রের ব্যাপক প্রসার ঘটানো এবং কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইটের দ্রুত বিকাশ ঘটানোর সুদূরপ্রসারী কৌশল হাতে নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

সংক্ষেপে বিশ্বকে এমন একটি আন্তর্জাতিক সমাজে রূপান্তরিত করা হচ্ছে, যে সমাজে একই রকম নীতিমালা, নিয়ম-পদ্ধতি ও মূল্যবোধের কর্তৃত্ব চলবে। নিয়মনীতি ও মূল্যবোধের এই একতা এতই ব্যাপক হবে, যাতে নিজেদের জাতীয় পরিচয়, স্বাতন্ত্র্য, মূল্যবোধ, বৈশিষ্ট্য, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও তাহযীব-তামাদ্দুন বিসর্জন দিয়ে পৃথিবীর তাবৎ মানুষ ম্যাকডোনাল্ড খাওয়া, কোকাকোলা ও পেপসি পান করা, জিন্স পরিধান করা এবং মার্কেটিং রুচি অভ্যাসের ক্ষেত্রে এক অভিন্ন হয়ে যাবে।২ স্রোত যেভাবে চলছে তাতে মনে হচ্ছে, বিশ্বের তাবৎ মানুষ অতি দ্রুত একই অভিরুচি, অভ্যাস ও কালচার গ্রহণের পথে ধাবমান। তাদের দৃঢ় সংকল্প, অবিচল আস্থা ও ব্যাপক যুদ্ধ প্রস্তুতি দেখে মনে হচ্ছে আন্তর্জাতিক এই একতা ও অভিন্নতা অনিবার্যভাবেই সৃষ্টি হবে। যারা সহজেই এ ব্যবস্থা গ্রহণ করে নেবে তাদের সাথে ভাল আচরণ করা হবে আর যারা সহজে গ্রহণ করবে না; বরং এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করবে, তাদের ওপর শক্তি প্রয়োগ করে বাস্তবায়ন করা হবে। মার্কিন বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি বলেন, বিশ্বের ওপর মার্কিন ব্যবস্থা তথা ইহুদী ব্যবস্থার নেতৃত্ব কর্তৃত্ব অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া আমাদের নিকট অন্য কোনো জিনিস মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়, আর না আমরা কোনো চ্যালেঞ্জের সাথে আপোস করতে প্রস্তুত। বিশেষ করে অনৈক্য, অনিষ্ট ও ফিতনা-ফাসাদের আন্তর্জাতিক উৎস তথা জাতিপূজা, দেশপূজা, ইসলামী মৌলবাদ, সন্ত্রাস ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব কোনো মূল্যেই বরদাশত করা হবে না।

উল্লেখ্য, মার্কিন সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রাধান্য ও আধিপত্যের ফলে অন্যান্য জাতির স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য নির্মূল হয়ে যাবে। এ ঘোষণা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও দেয়া হচ্ছে। আর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এর বাস্তবায়ন ঘটানো হচ্ছে গ্যাট চুক্তির মাধ্যমে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাণিজ্যবাজার দখল করে নেয়ার জন্য বড় বড় কোম্পানীকে খোলাখুলি ছাড় দেয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদ টনি ক্লার্ক-এর বিশ্লেষণ মতে, গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নের ফায়দা কেবল বড় বড় কোম্পানীগুলোর মালিকদেরই হবে। তাই দেখা যায়, বিশ্ব অর্থনীতির ৭৪ শতাংশ আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৭৫ শতাংশ ৫০০ বড় বড় কোম্পানীর দখলে রয়েছে। তন্মধ্যে আমেরিকার রয়েছে ১৫৩টি কোম্পানী, ইউরোপের রয়েছে ১৫৫টি আর জাপানের রয়েছে ১৪১টি। আর বিশ্বের অন্যান্য দেশের কেবল এক শতাংশ কোম্পানী পুরো বিশ্বের বিদেশী বিনিয়োগের ৫০ শতাংশের মালিক।

বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদদের ধারণা, এসব কোম্পানীর ব্যাপকতা ও বিস্তৃতির অনুমান না পুঁজি দ্বারা সম্ভব আর না উৎপাদনের পরিমাণ দ্বারা সম্ভব; বরং তার অনুমান আমদানী দ্বারা করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, জেনারেল মোটর্স কোম্পানী, যার আমদানী ১৬৮ মিলিয়ন ডলারের ঊর্ধ্বে আই.ব.বি. কোম্পানী, যা ৬০টি বড় বড় কোম্পানী পরস্পরে একীভূত হয়ে অস্তিত্ব লাভ করেছে। এ কোম্পানী তৃতীয় বিশ্বের ১৩০টি এবং ইউরোপের ৪০টি কোম্পানীর ওপর আধিপত্য বিস্তার করে আছে। শুধু মিসর একাই এ কোম্পানীতে একশ' মিলিয়ন ডলারের পুঁজি বিনিয়োগ করেছে, কিন্তু এর ফায়দা পুরোটাই হচ্ছে আই.বি.বি কোম্পানীর। এভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলো অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ক্রমেই আমেরিকার গোলামে পরিণত হচ্ছে।

বড় বড় কোম্পানীর মুখপাত্র মিডিয়া ও প্রচার মাধ্যমগুলো বিভিন্ন দেশ জাতির সমস্যাগুলোকে অত্যন্ত সুন্দর ও হৃদয়গ্রাহী করে জাতির সামনে উপস্থাপন করে আবার এসব সমস্যা সৃষ্টিকারীদেরকেই তার মুক্তিদাতা হিসেবে তুলে ধরে। মিডিয়া বলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোকে রক্ষা করেছে, অথচ বাস্তবতা হলো, সে ওয়াল স্ট্রীটের সেসব মার্কিনীদের রক্ষা করেছে যারা মেক্সিকোতে তাদের কাজ-কারবার ও ব্যবসা- বাণিজ্য পরিচালনা করত।

মিডিয়া ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে খাদ্য ঘাটতির মায়াকান্না কাঁদে, কিন্তু একবারও সে একথা বলে না, কারকিল কোম্পানী আন্তর্জাতিক খাদ্য দ্রব্যের ওপর সর্প হয়ে বসে আছে এবং হাজার হাজার মাইল দূর থেকে বসে সে এসব খাদ্য-দ্রব্য রফতানী করে, যাতে এসব খাদ্য-দ্রব্য আবার তাদের 'সংশেই পড়ে যারা পূর্ব থেকে বদহজমের শিকার। অথচ স্বয়ং এসব খাদ্য-দ্রব্য উৎপাদনকারী দেশের জনগণ ক্ষুধায় মরছে। যে টেকনোলজির কথা মিডিয়া বলে, তার ফায়দা কার হচ্ছে? এর ফায়দা হচ্ছে নিউইয়র্ক, জেনেভা ও লন্ডনের সেসব ব্যবসায়ীর, যারা বিশ্বের সকল উপকরণের ওপর কবজা করে বসে আছে। আর এদিকে সাধারণ নাগরিকদের অবস্থা ক্রমেই খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে। প্রকাশ থাকে যে, ৬৫ শতাংশ আন্তর্জাতিক মিডিয়ার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দখলদারিত্ব রয়েছে, কিন্তু মিডিয়া একথা কখনোই বলেনি, বিশ্বব্যাংক ও বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানী এশিয়ান টাইগার্সখ্যাত মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের অর্থনীতি ধ্বংসে কি ভূমিকা পালন করেছে? যাতে তাদেরও গোলাম বানানো যায় এবং তাদের অবস্থা এমন করুণ ও শোচনীয় বানিয়ে দেয়া যায়, যাতে তারা সেসব দেশের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে যাবে যারা পাশ্চাত্যের প্রভুদের সাথে টক্কর দেয়ার সামান্যও চিন্তা করে।

প্রশ্ন হলো, বিশ্বায়ন কি পৃথিবীর পুনর্গঠনে সফলকাম হবে? বিশ্ব কি আমেরিকার নেতৃত্ব মেনে নেবে? বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও জাতিগোষ্ঠী কি তাদের নিজস্ব সভ্যতা- সংস্কৃতি ও স্বাতন্ত্র্যবোধ পরিত্যাগ করতে প্রস্তুত হবে? আর যদি এমনটি জোরপূর্বক করা হয় তাহলে সেটা কতদিন চলবে? এ ধরনের আরো অসংখ্য প্রশ্ন রয়েছে যার উত্তর অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

টিকাঃ
১. ১৯৯১ সালে মার্কিন সরকার সর্বপ্রথম 'নিউ ওয়ার্ল্ড ওয়ার্ডার' নামে এর পরিকল্পনা পেশ করে, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর 'গ্লোবালাইজেশন' পরিভাষা সর্বত্র প্রসার লাভ করে। যার একমাত্র উদ্দেশ্য তৃতীয় বিশ্বকে মার্কিনী রঙে রঙিন করা।
২. বর্তমানে প্রাচ্যের দেশসমূহ চারিত্রিক ও নৈতিক অধঃপতনের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছে। পাশ্চাত্যের দেশসমূহে যে হারে এবং যে ধরনের চারিত্রিক ও নৈতিক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, সে ধরনের অপরাধই কিছু কম হারে প্রাচ্যের দেশসমূহে সংঘটিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রাচ্যের দেশসমূহ ইচ্ছা-অনিচ্ছায় মার্কিন গ্লোবালাইজেশন তথা বিশ্বায়ন ব্যবস্থার মধ্যেই ঢুকে পড়ছে। এছাড়াও বিশ্বায়ন ব্যবস্থা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সভ্যতা-সংস্কৃতিসহ সর্বক্ষেত্রেই তার দুর্দান্ত থাবা বিস্তার করে চলেছে।

📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 নতুন বিশ্বব্যবস্থা

📄 নতুন বিশ্বব্যবস্থা


জায়নবাদী চিন্তাবিদরা প্রায় এক শতাব্দী পূর্বে তাদের দস্তাবেজে আন্তর্জাতিক সরকারের রূপরেখা পেশ করে,৩ কিন্তু এই আন্তর্জাতিক সরকারের রূপরেখা বাস্তবে রূপদান এবং এর জন্য পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত প্রয়াস প্রথম বিশ্বযুদ্ধকাল থেকে শুরু হয় যখন অতি গোপনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলসন-এর রাজনৈতিক উপদেষ্টা কর্নেল মান্ডিল হাউস তার বন্ধু-বান্ধবদের সহযোগিতায় লীগ অফ নেশনের অবকাঠামো তৈরি করেন। মান্ডিল হাউস তার পরিকল্পনা ও রূপরেখা সর্বপ্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্টের সামনে পেশ করেন, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো প্রস্তাব গ্রহণ কিংবা প্রত্যাখ্যান করার অধিকার সাংবিধানিকভাবে কেবল মার্কিন সিনেটেরই রয়েছে। সেমতে মার্কিন সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য একথা বলে লীগ অফ নেশনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দেন যে, মার্কিনীরা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অন্য কোনো সংগঠনের অধীন থাকতে পারে না। এভাবে লীগ অফ নেশনের পরিকল্পনা বাস্তব রূপ লাভের পূর্বেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং ইহুদীবাদী মস্তিষ্ক প্রথমেই হোঁচট খায়। যদিও সে সময় মার্কিন সিনেটে লীগ অফ নেশনের প্রস্তাব পাশ হয়নি, কিন্তু নামে মাত্র হলেও তার একটি অস্তিত্ব অবশ্যই প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সেদিন পরিকল্পনাকারীদের ভালভাবেই অনুমান হয়ে গিয়েছিল, যে পরিকল্পনা সরাসরি কোনো দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে, সে পরিকল্পনায় সফলকাম হওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো এ ধরনের সংগঠনের অধীনে কোনোভাবেই আসবে না। এর মৌলিক কারণ হলো, মার্কিন সংবিধান আইন প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন মার্কিন সিনেট ও অধঃস্তন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর অর্পণ করে রেখেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মিডিয়ার যে স্বাধীনতা রয়েছে এবং মার্কিন সিনেটের সদস্যরা যে স্বাধীনতার সাথে বিভিন্ন বিলের ওপর আলোচনা-পর্যালোচনা করেন, সে ভিত্তিতে মার্কিন সিনেট লীগ অফ নেশন প্রস্তাবের ওপর বিস্তারিত আলোচনা-পর্যালোচনা ছাড়াই তা পাস করে দেবে-সেটা অসম্ভব ছিল। অপরদিকে মার্কিন সংবিধান সে দেশের নাগরিকদের আত্মরক্ষার জন্য নিজেদের কাছে অস্ত্র রাখার অনুমতি ও স্বাধীনতা প্রদান করেছে। এ অবস্থায় মার্কিন উচ্চ ক্ষমতাকে অন্য কোনো সংগঠনের অধীন করে দেয়ায় বড় ধরনের বিপদ লুকায়িত থাকতে পারে। এ পরিস্থিতি উপলদ্ধি করে পরিকল্পনাকারীরা তাদের উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য 'ধীরে চলা'র নীতি গ্রহণ করে। পরবর্তী ধাপে তারা নিম্নবর্ণিত উপকরণ ও কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করে।

টিকাঃ
৩. ১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের প্রসিদ্ধ শহর 'ব্রাসেলসে ইহুদী পন্ডিত ও চিন্তাবিদদের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনে ১৯টি অধ্যায় সম্বলিত এক দস্তাবেজ প্রণয়ন করা হয়, যা ইতোমধ্যেই জনসম্মুখে চলে এসেছে। সেই দস্তাবেজের ১১তম ও ১৯তম অধ্যায়ে আন্তর্জাতিক সরকারের পরিকল্পনা এবং রূপরেখা পেশ করা হয়েছে। ১২তম অধ্যায়ে মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যম দখল করার পরিকল্পনা পেশ করা হয়েছে এবং ১৬তম অধ্যায়ে শিক্ষার মাধ্যমে মগজ ধোলাইয়ের পরিকল্পনা পেশ করা হয়েছে, কিন্তু এখন সেটা অস্বীকার করা হচ্ছে।

📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 মার্কিন সরকারের সকল সেক্টরে অনুপ্রবেশের পরিকল্পনা

📄 মার্কিন সরকারের সকল সেক্টরে অনুপ্রবেশের পরিকল্পনা


মার্কিন সিনেটে লীগ অফ নেশন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পাস করাতে ব্যর্থ হওয়ার পর ষড়যন্ত্রকারী ইহুদী মস্তিষ্ক এ পর্যায়ে মার্কিন সরকারের সকল সেক্টরে অনুপ্রবেশের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করে, যাতে তারা মার্কিন সিনেটের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে পারে এবং ভবিষ্যতে যে কোনো ধরনের প্রস্তাব পাস করাতে যেন হোঁচট খেতে না হয়। এ পরিকল্পনার আওতায় তারা সরকারের মৌলিক তিনটি স্তম্ভ এবং কেন্দ্র ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়া, সংবাদ মাধ্যম, বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির কেন্দ্রগুলোকেও টার্গেট করে। এ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য কর্নেল মান্ডিল হাউস অতি গোপনে তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে আমেরিকার পরিবর্তে লন্ডনে গিয়ে সলা পরামর্শ করেন। সেই পরামর্শ সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে 'আন্তর্জাতিক বিষয়ক মার্কিন সংস্থা' নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে। সেমতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক উপদেষ্টা কর্নেল মান্ডিল হাউস মার্কিন প্রেসিডেন্টের সহায়তায় এ ধরনের একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে ১৯২১ সালে এই সংস্থার নাম পরিবর্তন করে 'Council of Foreign Relation-C.F.R' (পররাষ্ট্র সম্পর্ক কাউন্সিল) রাখা হয়। এই সংস্থার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য তার অধীনে আরো অসংখ্য প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয় এবং প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে সেগুলোকে 'কাউন্সিল অফ ফরেন রিলেশন' সংস্থার অধীনে রাখা হয়। সেসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে 'বিজনেস কাউন্সিল, এশিয়ান ইনস্টিটিউট, আটলান্টিক কমিটি, ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড ফেডারেলিস্ট ও ট্রি টেরিয়াল কমিশন ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সি.এফ.আর অস্তিত্ব লাভের পর পরই তার মুখপত্র 'ফরেন এ্যাফেয়ার্স (Foreign Affairs)'-এর প্রকাশনা শুরু হয়। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার আওতায় সি.এফ.আর-এর শক্তিধর সদস্যরা, যাদের সকলেই ছিল নিরেট ইহুদী-তারা মার্কিন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বড় বড় পদ, ট্যাক্সমুক্ত সংগঠন, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, মার্কিন মিডিয়া, ব্যাংক, বীমা, ইন্স্যুরেন্স, কোম্পানী, ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকান পার্টি এবং প্রভাব-প্রতিপত্তির মালিক অন্যান্য কেন্দ্রের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। তারা ডেল কার্নেগী, ফোর্ড ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশন, নিউইয়র্ক টাইমস, নিউজউইক এবং মার্কিন সকল টিভি স্টেশনের ওপর দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করে। কালক্রমে অবস্থা এ পর্যায়ে এসে দাঁড়াল যে, যে জাতি মুহাজির হয়ে ১৮৪৮ সালে সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় আমেরিকায় এসেছিল এবং যাদের জনসংখ্যার হার শতকরা ২.৯ শতাংশ, সে জাতি আজ বিশাল আমেরিকার ৯৭ শতাংশ জনগণের ওপর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব করছে।


মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট থেকে শুরু করে রোনাল্ড রিগান পর্যন্ত নয় জন মার্কিন প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা জন মেকলে বলেন, আমাদের যখনই মার্কিন প্রশাসনের জন্য কোন লোকের প্রয়োজন পড়ে, তখনই আমরা নিউইয়র্কে অবস্থিত সি.এফ.আর-এর কেন্দ্রীয় দফতরের সাথে যোগাযোগ করি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সি.এফ.আর-এর অসাধারণ ও সীমাহীন প্রভাব-প্রতিপত্তি রয়েছে। তার অনুমান এভাবে করা যেতে পারে, ১৯৫২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকান দু'টি দল থেকেই 'প্রেসিডেন্ট পদে' যত লোককেই মনোনয়ন দেয়া হয়েছে, তাদের সবারই সি.এফ.আর-এর সাথে নিবিড় সম্পর্ক ছিল। সি.এফ.আর-এর সাথে সুগভীর ও সুনিবিড় সম্পর্ক ছাড়া কেউ-ই এ পদে মনোনয়ন লাভ করতে সক্ষম হন না। শুধু প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান এর ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি সি.এফ.আর-এর সদস্য ছিলেন না, কিন্তু তাকে বাধ্য করা হয় জর্জ বুশকে তার ভাইস প্রেসিডেন্ট মনোনয়ন দিতে। যিনি সি.এফ.আর-এর একজন সক্রিয় ও প্রসিদ্ধ সদস্য ছিলেন। মি. রোনাল্ড রিগান প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার প্রথম মাসেই তার ওপর আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়, যাতে তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশকে ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করা হয়। রিগান সরকারের সদস্য সংখ্যা ছিল তিনশ' তের জন। তাদের সকলেই ছিল সি.এফ.আর-এর সক্রিয় সদস্য। মি. বিল ক্লিন্টন যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তখন তিনি সি.এফ.আর-এর প্রেসিডেন্ট মি. ওয়ার্ন ক্রিস্টোফারকে তার সরকার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তিবর্গ নির্বাচন করার পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করেন। সে হিসেবে তার সরকারের সকল লোকবলই ছিল সি.এফ.আর-এর সক্রিয় ও চৌকস সদস্য। সি.এফ.আর-এর মুখপাত্র ফরেন এ্যাফেয়ার্সেরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অসাধারণ জনপ্রিয়তা এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি রয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর কমান্ডার এ্যাডমিরাল ওয়ার্ড-এর বক্তব্য ও সাক্ষ্যই তার প্রভাব-প্রতিপত্তি অনুমানের জন্য যথেষ্ট। তিনি বলেন, ফরেন এ্যাফেয়ার্সের নিবন্ধগুলো পড়লে ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির কর্মকৌশল কি হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। ফরেন এ্যাফেয়ার্স যদি কোনো প্রস্তাব দ্বিতীয়বার প্রকাশ করে তাহলে সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো সেটা এমনভাবে বাস্তবায়ন করে, যেন তা এক 'সর্বজন স্বীকৃত বাস্তবতা'।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পূর্বে ১৯৩৯ সালে সি.এফ.আর একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব পেশ করে। প্রস্তাবটি ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সৃষ্ট সমস্যা সংকটগুলো নিয়ে চিন্তা-ফিকির করার জন্য এখন থেকেই একটি কমিটি গঠন করা হোক। সি.এফ.আর-এর এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটির কাজে সাহায্য করার জন্য মার্কিন সরকার সি.এফ.আর-এর নিকট বিশেষজ্ঞদের সরবরাহের জন্য আবেদন করে! সেমতে মাত্র একজন সদস্য ছাড়া কমিটির সকল সদস্যই ছিল সি.এফ.আর-এর সক্রিয়, মেধাবী বিশেষজ্ঞ ও চৌকস সদস্য। অতঃপর ইহুদী ষড়যন্ত্র অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন এই কমিটির কার্যসীমা আরো ব্যাপক করে দেয়া হয়। এক কথায়, এই কমিটি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে 'উপদেষ্টা পরিষদ' হিসেবে কাজ করতে থাকে।

১৯৪১ সালের ১৪ই আগস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ও বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। সেই চুক্তিতে একটি 'নতুন বিশ্বব্যবস্থা ও স্থায়ী শান্তি-নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা'র আহবান জানানো হয়।

১৯৪২ সালের ১লা জানুয়ারী ২৬টি মিত্র দেশ মিলে জাতিসংঘ চার্টারে স্বাক্ষর করে। সেসব দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের দস্তখতে জারি হওয়া চুক্তির সত্যায়ন করে। সে সময় থেকেই 'জাতিসংঘ' পরিভাষার ব্যবহার শুরু হয়, কিন্তু আমেরিকাই একমাত্র দেশ, যে এই সংস্থাকে 'জাতিসংঘে'র পরিবর্তে 'মিত্র সংঘ' আখ্যা দিয়েছে।

১৯৪৩ সালের জানুয়ারীতে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী 'কার্ডিল হিলে'র সভাপতিত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়, যার সকল সদস্যই ছিল সি.এফ.আর-এর সক্রিয় সদস্য। এই কমিটিই জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা প্রস্তাবের একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সামনে পেশ করে, যা ১৯৪৪ সালের ১৫ জানুয়ারীতে মার্কিন জনগণের সামনে 'জাতিসংঘ' প্রতিষ্ঠার নিয়মতান্ত্রিক ঘোষণা করে। বিশ্ব মানচিত্রে অস্তিত্ব লাভ করে বিশ্বকে শাসন করার ইহুদীবাদী মস্তিষ্কের দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন 'জাতিসংঘ'।

১৯৫৪ সালে সানফ্রান্সিসকোতে জাতিসংঘ চার্টারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়। এই চার্টারে ৫০টি দেশ স্বাক্ষর করে। উক্ত চার্টারে সদস্য দেশগুলোর আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল, কিন্তু এর সপ্তম ধারায় আবার উল্লেখ করা হয়েছে, প্রয়োজন পড়লে নিরাপত্তা পরিষদের তত্ত্বাবধানে সামরিক কাউন্সিল গঠন করা যেতে পারে। এই সামরিক কাউন্সিল তখনই তার ভূমিকা পালন করবে যখন জাতিসংঘ কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। ধারা ৩৩-এর অধীনে জাতিসংঘের স্বতন্ত্র নিরাপত্তা বাহিনী গঠন করার কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতিসংঘের এই চার্টার প্রণয়ন কমিটিতে যেহেতু সি.এফ.আর-এর সদস্য সংখ্যাই বেশী ছিল, সেহেতু এর ধারাগুলো সব খুব সহজে মঞ্জুর হয়ে যায়। এতে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়নি। এভাবেই ইহুদী মস্তিষ্কের পরিকল্পিত 'আন্তর্জাতিক সরকার' গঠনের প্রথম প্রতিষ্ঠান কিংবা মাধ্যম তাদের দখলে চলে আসে।

টিকাঃ
৪. ১৯৯৭ সালের একটি জরিপ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদীদের কল্পনাহীন প্রভাব-প্রতিপত্তি সহজেই অনুমান করা যায়। এ জরিপ রিপোর্ট থেকে জানা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোটিপতি ইহুদীদের হার শতকরা ২৫ শতাংশ, জুতা শিল্পে শতকরা ৩৪ শতাংশ, পানীয় শিল্পে শতকারা ৫০ শতাংশ, পোশাক ও ফ্যাশন শিল্পে শতকরা ১০০ শতাংশ, পেট্রোলিয়াম শিল্পে শতকরা ৯৮ শতাংশ, শিক্ষার ক্ষেত্রে শতকরা ২০ শতাংশ, মার্কিন ইউনিভার্সিটিগুলোতে ইহুদী শিক্ষকের হার শতকরা ৫০ শতাংশ, হার্ভার্ডের মত বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে ইহুদী শিক্ষকের হার শতকরা ৭৫ শতাংশ, মেডিসিন শিল্পে শতকরা ২৫ শতাংশ, ল' কলেজে শিক্ষকের হার শতকরা ৩৮ শতাংশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডাক্তার ও আইনজীবীদের হার শতকরা ৩৮ শতাংশ। আর মিডিয়া তো তাদের একচ্ছত্র দখলেই রয়েছে। শুধু 'নিউ হাউস ফ্যামিলী' নামে একটি ইহুদী পরিবারের করায়ত্তেই ৪৮টি দৈনিক, ২০টি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন, ১৮২টি রেডিও স্টেশন, ১৪০টি টিভি ক্যাবল এবং ১৭৩৫টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন দৈনিক পত্রিকা বিক্রি হয় ৬০ মিলিয়ন কপি। এসবই ইহুদী মালিকানা পত্রিকা। অপরদিকে মার্কিন নির্বাচনে ইহুদী ভোটারদের ভোটের হার শতকরা ৯২ শতাংশ, অথচ সামগ্রিকভাবে গোটা জাতির ভোটের হার শতকরা ৫৪ শতাংশ। আর আমেরিকায় বসবাসরত মুসলমানদের ভোটের হার কেবল শতকরা ২৮ শতাংশ। এগুলোও আবার ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও আরব বিশ্ব থেকে আগত মুসলমানদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।

📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সূচনা

📄 বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সূচনা


১৯৬০ সালে যখব চুম্বে ঘোষণা দিল, কটেংগা প্রদেশ কংগো থেকে অবশ্যই স্বাধীন হবে। এ ঘোষণার কিছুদিন পরই চুম্বেকে হত্যা করা হয়। নিরাপত্তা পরিষদ সর্বপ্রথম জাতিসংঘ বাহিনী কংগোতে প্রেরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কংগোতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা বাহিনী হাজারো নিষ্পাপ মানুষকে হত্যা করে। তারা কটেংগার নিরীহ নিরপরাধ জনগণের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। সেখানের যোগাযোগ কেন্দ্রগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়া হয়, যাতে বহির্বিশ্বের সাথে কোনো যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে। হাসপাতাল এবং স্কুলগুলোও ধ্বংস করে দেয়া হয়। কোনো দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের সূচনা এখান থেকেই হয়, কিন্তু ব্যাপক আকারে হস্ত ক্ষেপ শুরু হয় উপসাগরীয় যুদ্ধের পর থেকে। নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৯১ সালের এপ্রিলে

একটি প্রস্তাব পাস করে ইরাকের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ প্রস্তাবের মাধ্যমে জাতিসংঘকে সম্পূর্ণ ছাড় দিয়ে দেয়া হয় যে, জাতিসংঘের কর্মকর্তারা কোনো অনুমতি ছাড়াই যে কোনো সময় ইরাকের অভ্যন্তরে অনুসন্ধান চালাতে পারবে এবং বিধ্বংসী কোনো অস্ত্র পাওয়া গেলে তা ধ্বংসও করতে পারবে। এমনিভাবে জাতিসংঘ ইরাকের খাদ্য-শস্য আমদানী-রফতানী এবং পেট্রোল বিক্রয়ের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মনগড়া আইন প্রণয়ন করে জাতিসংঘ নিজের ইচ্ছামত ইরাকের অর্থনীতি, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র নীতির ওপর পাহারা বসিয়ে দেয়। কোনো আপত্তি-অভিযোগ ছাড়াই ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তাব পাস করে। এভাবেই জাতিসংঘ বিশ্বের সকল দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার দরোজা খুলে দেয়। একই খেল বসনিয়া, হাইতি এবং সোমালিয়াতেও খেলা হয়। আংশিকভাবে লিবিয়া, কম্বোডিয়া, লাইবেরিয়া, নাইজেরিয়া, সুদান এবং রাঙ্গোলায়ও একই নাটক মঞ্চস্থ করা হয়।৫ অতঃপর ১৯৯২ সালের জুন মাসে জাতিসংঘের মহাসচিব বুট্রোস ঘালির রিপোর্ট 'শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত প্রস্তাব' জাতিসংঘের জেনারেল এ্যাসেম্বলীতে পেশ করেন। উক্ত রিপোর্টে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সকল দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিষয় আইনী মর্যাদা দেয়ার আহবান জানানো হয়। বৃহৎ শক্তিগুলো সবাই এ প্রস্তাবটি সাদরে গ্রহণ করে নেয়। মহাসচিব তার প্রস্তাবে জাতিসংঘের কার্যসীমা আরো ব্যাপক ও বিস্তৃত করার আবেদন জানান। তিনি বলেন, পারিবারিক একতা বিনষ্ট হওয়া থেকে রক্ষার জন্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, এইডস, ক্ষুধা, দারিদ্র ও দূর্ভিক্ষ নির্মূল করা, মানবাধিকার সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের ভূমিকা থাকা উচিত। কারণ, এ বিষয়গুলো এত সঙ্গীন এবং তার সীমা এত ব্যাপক বিস্তৃত যে, কোনো দেশের একার পক্ষে তার সীমিত উপকরণ দিয়ে এর মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।

টিকাঃ
৫. কসোভোতে মুসলমানদের বংশ নিধনের নতুন পদ্ধতি ন্যাটো বাহিনীর তত্ত্বাবধানে গ্রহণ করা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00