📘 পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ > 📄 ১১ই সেপ্টেম্বরের উদ্দেশ্য

📄 ১১ই সেপ্টেম্বরের উদ্দেশ্য


ইতিহাসের সবচে' বড় মিথ্যা বা ১১ই সেপ্টেম্বর নাটকের মৌলিক উদ্দেশ্য হলো, ভূ-পৃষ্ঠকে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ থেকে মুক্ত করা। এ কারণেই পাশ্চাত্য এ যুদ্ধের নাম দিয়েছে ক্রুসেড যুদ্ধ। এ আগ্রাসনের মূল টার্গেট দীনী মাদরাসাগুলো, যা মুসলিম উম্মাহর সর্বশেষ দুর্গ; শক্তি ও অর্থের বলে এই দুর্গ গুঁড়িয়ে দেবার নিরন্তর প্রয়াস চলছে।

এই উদ্দেশ্যের দ্বিতীয় অংশ হচ্ছে, ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার আড়ালে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ প্রোপাগান্ডার পরিবেশ তৈরি করা, যার পুরো দায়িত্ব নিয়েছে ইহুদী মিডিয়া। যা পরিচালিত হচ্ছে সম্পূর্ণ পেন্টাগনের তত্ত্বাবধানে, কিন্তু মুসলিম উম্মাহর পক্ষে বিপক্ষে উভয় ধরনের সংবাদ পরিকল্পিতভাবে গোটা বিশ্বের সামনে প্রচার করা হচ্ছে। এই প্রচারণায় আল-কায়দা, তালেবান ও তাদের আধ্যাত্মিক নেতা ওসামা বিন লাদেনকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। মিডিয়াতে কখনো তাদের প্রশংসাও করা হচ্ছে, কিন্তুা 'কথা সত্য মতলব খারাপ' প্রবাদ অনুযায়ী তাদের প্রশংসার আড়ালে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষের আগুন প্রজ্বলিত করা

হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপ, আমেরিকা এবং তাদের কৌশলগত মিত্র ভারত ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে তাদের গোপন ঘৃণা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা কোন রাখঢাক ছাড়াই প্রকাশ্যে উন্মোচিত করে দিয়েছে। একথাই পবিত্র কুরআনের সূরা আলে ইমরানে অলংকারপূর্ণ ভাষায় ঘোষিত হয়েছে, 'শত্রুতাপ্রসূত বিদ্বেষ তাদের মুখ ফুটেই বের হয়ে যায়। আর যা কিছু তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে, তা আরো অনেকগুণ বেশি জঘন্য।'

১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার যে প্রতিক্রিয়া আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশে হয়েছে, তা সেসব বক্তৃতা-বিবৃতি দ্বারাই অনুমান করা যায়, যেসব বক্তৃতা-বিবৃতিতে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে কঠোর ঘৃণা-বিদ্বেষ, শত্রুতা, ক্রোধ ও প্রতিশোধ স্পৃহা প্রকাশ পেয়েছে।

০১. মানবতার শত্রু মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এই ঘটনাকে 'war on Civilaization-'সভ্যতার পক্ষে লড়াই' আখ্যা দিয়েছেন এবং কার্যত তিনি বিশ্বকে দুই ভাগে বিভক্ত করার জঘন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। এক. পাশ্চাত্য বিশ্ব, তথাকথিত সভ্য দুনিয়া। দুই. অন্যান্য বিশ্ব, ওদের ভাষায় যা অসভ্য ও বর্বর।

০২. সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনী ও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রামসফেল্ড কোন রাখঢাক ছাড়াই বলেছেন, আমাদের টার্গেট সেসব দেশকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া যারা সন্ত্রাসের বিকাশ ঘটাচ্ছে।

০৩. সাবেক সেক্রেটারী অফ স্টেট ডিপার্টমেন্ট লরেন্স এ্যাগেল বার্গ বলেন, এ ধরনের লোকদের সাথে লড়াইয়ের সূচনার এও একটা পদ্ধতি হতে পারে যে, প্রথমে তাদের কিছু লোককে নিঃশেষ করে দিতে হবে।

০৪. মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক পন্ডিত এবং ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, চিলি আর না জানি কত দেশের লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ নিষ্পাপ গণহত্যার নায়ক হেনরী কিসিঞ্জার বলেন, '১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার পেছনে বিন-লাদেনের হাত আছে যদিও এর কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই, কিন্তু তথাপি তার জড়িত থাকার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ সে আমেরিকার বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য আমাদের তার গোটা নেটওয়ার্কই নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। এমনকি মুসলিম বিশ্বের যেখানে যেখানে তার সমর্থক রয়েছে তাদেরও গুঁড়িয়ে দিতে হবে। আমি আশা করি, মার্কিন প্রশাসন এ বিষয়টি শেষ পর্যায়ে পৌঁছাবে। যেমন পার্ল হার্ভারের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত পৌছেছিল। এক কথায় ভূ-পৃষ্ঠ থেকে এই গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। এ লড়াইয়ে যদি বিশ্বের অন্যান্য দেশ আমেরিকাকে সমর্থন সহযোগিতা না করে তাহলে আমেরিকাকে একাই এ লড়াই চালিয়ে যেতে হবে এবং এর জন্য কোন পরামর্শ ও মতৈক্যের প্রয়োজন নেই।'

ওপরে যা কিছু উল্লিখিত হয়েছে তা তো আমেরিকার বড় দায়িত্বশীল এবং বুদ্ধিজীবীদের বক্তৃতা-বিবৃতির ধরন, সর্বসাধারণ পর্যায়ে যে পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে, নিম্নোক্ত উদাহরণসমূহ থেকে সেটা জানা যাবে।

০৫. ওয়াশিংটন পোস্টে জি রচ লোরি লেখেন, '১১ই সেপ্টেম্বরে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে তার জন্য আমরা যদি দামেশক, তেহরান বা অন্য কোন মুসলিম দেশের কিছুও

ধ্বংস করতে পারি তাহলে কিছুটা হলেও এর সমাধান হবে। কোনো দেরি ছাড়াই পাশ্চাত্যের উচিত, এই 'হারামীদের' হত্যা করা, চোখে গুলি মারা, টুকরো টুকরো করে দেয়া এবং বিষ দিয়ে হত্যা করা।'

০৬. নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ডেইলী নিউজে এক লেখিকার বক্তব্য, এখন এটা তদন্তের সময় নেই, এ ঘটনার সাথে ঠিক কোন্ কোন্ ব্যক্তি জড়িত; বরং দ্রুত তাদের নেতাদের হত্যা করা উচিত। আমরা হিটলার ও তার উচ্চ পদস্থ অফিসারদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে প্রচলিত বিধি-নিষেধের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করিনি; বরং আমরা জার্মানীর শহরসমূহের ওপর কার্পেট বোমা বর্ষণ এবং তাদের নাগরিকদের নির্বিচারে হত্যা করেছি। সেটাও যুদ্ধ ছিল, এটাও যুদ্ধ।

০৭. মার্কিন রাজনৈতিক পলিসির মুখপাত্র ন্যাশনাল রিভিউ'র এক সাংবাদিক রিচার ডেলোরী আরেকটু অগ্রসর হয়ে লেখেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন দেরি ছাড়া এখনই মক্কা মদীনার ওপর হামলা করা উচিত।

১১ই সেপ্টেম্বরের পর প্রোপাগান্ডা ও গুজবকে ভিত্তি বানিয়ে সুসংগঠিত ও সুপরিকল্পিতভাবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন স্বার্থে আঘাত আসার সন্দেহ সংশয় প্রকাশ করা হতে থাকে। ওসামা বিন লাদেনকে ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব আখ্যা দেয়ার জন্য নিত্যনতুন ধরন পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়। তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনা উপন্যাসের মতো বার বার ধরন পাল্টিয়ে প্রকাশ করা হয়। কখনো বলা হয়, আফগানিস্তানে বসে সে হাজার মাইল দূর থেকে মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানতে সক্ষম। কখনো বলা হয়, তার নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কখনো বলা হয়, তার সংগঠন আল-কায়দা এত শক্তিশালী ও সুসংগঠিত যে, ওরা মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপরও হামলা করতে সক্ষম। কখনো বলা হয়, মার্কিন পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হানার মতো সক্ষমতা তার সংগঠনের রয়েছে। কখনো বলা হয়, ওসামা বিন লাদেনের নিকট পারমাণবিক ও রাসায়নিক অস্ত্র রয়েছে। কখনো বলা হয়, ওসামাকে গ্রেফতার করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রামসফেল্ড তার অক্ষমতা প্রকাশ করে স্বীকার করেছেন, আমরা ওসামাকে কখনো গ্রেফতার করতে পারব না। এসব সংবাদ প্রচার প্রসারের মৌলিক উদ্দেশ্য হলো, যাতে একদিকে মার্কিন শত্রুরা আত্মতৃপ্তি ও আত্মপ্রশান্তিতে থাকে যে, আফগানিস্তানে কার্পেট বোমা বর্ষণ করলেও কোন সমস্যা নেই। আল-কায়দা ও তালেবান এর চেয়েও বেশি শক্তিশালী। অপরদিকে মার্কিন জনগণও যাতে বুঝে, আফগান শিশু, নারী ও অসুস্থরা আক্রান্ত হলেও শত্রু বিরাট শক্তিশালী।

আফগানিস্তানে হামলার আড়ালে ফিলিস্তিনে ইসরাঈলী গণহত্যা ধামাচাপা দেয়াও এর একটা উদ্দেশ্য ছিল। সে সময় এ্যানথ্রাকসের সংবাদ এমন নাটকীয়ভাবে প্রচার করা হয়, যাতে মার্কিন জনগণ ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার গভীরে না পৌঁছতে পারে এবং তদন্তের কোন দাবীও না ওঠে। ওসামা বিন লাদেনের পারমাণবিক শক্তি অর্জন করার ভিত্তিহীন সংবাদ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে একাধারে দুই মাস পর্যন্ত প্রচার করা হয়, যাতে

একে ভিত্তি বানিয়ে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের আণবিক শক্তি এবং তার ধ্বংসকারিতার ক্ষমতা সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। অপরদিকে সেসব ব্যক্তির দিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়, যারা পাকিস্তানের আণবিক শক্তি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। যাতে তাদের যে কোনো সুযোগে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেয়া যায়। ৭

১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনাকে পুঁজি করে ইউরোপ-আমেরিকায় বিশেষভাবে এবং গোটা বিশ্বে সাধারণভাবে কর্মতৎপর ও সক্রিয় মুসলিম দাঈ, দীন প্রচারক ও ইসলামী ব্যক্তিত্বদের গ্রেফতার, সক্রিয় ইসলামী সংগঠন-সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ, ইউরোপ, আমেরিকা ও অন্যান্য দেশে লেখাপড়ারত মুসলিম ছাত্রদের সেসব দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করা, কিংবা তাদের গ্রেফতার করে জেলে নিক্ষেপ করাও উদ্দেশ্য ছিল, যাতে তারা দ্বিতীয় বার সেসব দেশে যাওয়ার আর কল্পনাও না করে। এই ঘটনাকে বুনিয়াদ বানিয়ে মুসলমানদের অর্থনৈতিক শক্তি ধ্বংস করে দেয়া, অপরদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোকে এই পয়গام দেয়া, যদি তারা ওসামার মতো লোকদের পৃষ্ঠপোষকতা করে তাহলে তাদেরও পরিণাম হবে আফগানিস্তান এবং ইরাকের মতো।

১১ই সেপ্টেম্বরের নাটকের আরেকটি মৌলিক উদ্দেশ্য হলো, আফগানিস্তান ও ইরাক দখল করে মধ্য-এশিয়ার কাস্পিয়ান সাগর অঞ্চলও দখল করা। কারণ এসব অঞ্চল উপসাগরীয় দেশসমূহ থেকেও বেশি মূল্যবান প্রাকৃতিক গ্যাস, পেট্রোল, স্বর্ণ, রৌপ্য, ইস্পাত, মূল্যবান ধাতব পদার্থ ও খনিজ সম্পদে ভরপুর। এর মৌলিক ফায়দা এই হবে, উপসাগরীয় দেশগুলো পেট্রোলকে আর অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগ করতে পারবে না। দ্বিতীয় ফায়দা হবে, মধ্য-এশিয়ার মুসলমানদের দীনী চেতনা ও জাগরণের ওপর বাঁধ নির্মাণ করা। রাশিয়া ও চীন উভয় দেশ এ ক্ষেত্রে আমেরিকার সাথে রয়েছে। আফগানিস্তান দখল করার আরেকটি মৌলিক উদ্দেশ্য হলো, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার দীনী মাদরাসাগুলো চিরকালের জন্য নির্মূল করে দেয়া, যাতে তালেবানদের মতো আর কেউ আমেরিকার জন্য বিপদ হতে না পারে। আফগান মুজাহিদদের সাথে আমেরিকার সেনাবাহিনী যে জঘন্যতম অমানবিক আচরণ করছে, তা এই ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের একটি দিক, যার উদ্দেশ্য গোটা ইসলামী বিশ্বকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলা এবং অভ্যন্তরীণভাবে তাদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়া। ভারতের মুসলমানদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা সৃষ্টির জন্য গুজরাটে স্মরণকালের ভয়াবহ মুসলিম নিধন চালানো হয়েছে, যাতে ভারতের মুসলমানরা আর কখনো কোমর সোজা করে দাঁড়াতে না পারে। আমেরিকা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াই দীর্ঘ দিন জিইয়ে রাখতে চায়। এ জন্য মিডিয়ায় বার বার ওসামা বিন লাদেন ও তালেবানদের খবর

ফলাও করে প্রকাশ করা হচ্ছে, যাতে চলমান এই যুদ্ধের বৈধতা অব্যাহত থাকে। এক কথায় ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে নির্মূল করার জন্য আজ যত কিছু করা হচ্ছে এবং করা হবে, তার বৈধতার মূল পুঁজি ও বুনিয়াদ হলো ১১ই সেপ্টেম্বরের নাটক। এ জন্যই এ নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছিল। ১১ই সেপ্টেম্বরে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার নাটক ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে নয়া ক্রুসেডের সূচনা।

কিন্তু এত কিছু করা সত্ত্বেও তিক্ত বাস্তবতা হলো, আল্লাহ তাআলার সর্বশেষ দীন ইসলাম একটি চিরন্তন দীন। এ দীন আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। শত চেষ্টা করেও কেউ এ দীন নির্মূল করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা নিজে এর হেফাযতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমিই এই দীন নাযিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণ করব'। যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে এই দীন হেফাযতের প্রতিশ্রুতি না থাকত, তাহলে স্পেনেই এই দীন এবং তার অনুসারী মুসলমানরা দাফন হয়ে যেত কিংবা তাতারী আগ্রাসনের পর এই দীন আর জীবন্ত থাকত না। কারণ ইসলামের ইতিহাসে মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে তাতারী আগ্রাসনের চেয়ে বড় আর কোনো প্রচ ঝড় সৃষ্টি হয়নি। তাতারীদের মধ্যে পাহাড়কে স্বীয় জায়গা থেকে হটিয়ে দেয়ার শক্তি বিদ্যমান ছিল। শিক্ষিত সমাজ অবশ্যই জানেন, হিংস্র মঙ্গোলিয়ান তথা তাতারী সম্প্রদায় ইসলামী বিশ্বের ওপর হায়েনার ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এমন শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, যার প্রতিরোধ ছিল প্রায় অসম্ভব। যে সময় তারা ইসলামী বিশ্বের ওপর হামলা করে সে সময় পূর্ণ শক্তিতে বলীয়ান ছিল। তাদের নিকট হাজার বছরের লালিত শক্তি সংরক্ষিত ছিল, যা ব্যবহার করার সুযোগ তাদের ইতোপূর্বে সৃষ্টি হয়নি। সে শক্তির মোকাবেলা সহজ ছিল না। ইসলামী বিশ্বের ওপর হামলা চালিয়ে তারা রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল, ইসলামী শৌর্য-বীর্যের প্রদীপ নির্বাপিত করে দিয়েছিল। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে লাঞ্ছিত করেছিল। ইসলামী শক্তি তাতারীদের প্রলয়ংকরী প্লাবনের সামনে পিছু হটতে শুরু করে। ইসলামী রাষ্ট্রগুলো একের পর এক পরাজয়ের শিকার হতে থাকে। মুসলিম উম্মাহ স্বীকার করে নেয়, তাতারীদের প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ও শক্তি তাদের নেই। কোনো শক্তিই তাদের সামনে প্রতিরোধ প্রাচীর দাঁড় করাতে সক্ষম নয়। এমনকি সে সময় এ কথা প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়ে গিয়েছিল, কেউ যদি বলে, তাতারীরা অমুক যুদ্ধে পরাজয় বরণ করেছে তাহলে সে মিথ্যুক। তাতারিরা পরাজয় বরণ করেছে-এটা কল্পনাও করা যেত না। হিংস্র তাতারী জাতি পিছু হটবে-এটা অসম্ভব। বিবেক এটা গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। তাতারী ভীতি গোটা ইসলামী বিশ্বে ছেয়ে গিয়েছিল। এমন ভয়ানক ভীতি, যার অভিজ্ঞতা সাধারণত কোনো মানুষ অর্জন করেনি, কিন্তু এতদসত্ত্বেও শেষ ফল কি দাঁড়াল? যে ইসলাম বাহ্যিক দৃষ্টিতে তাদের কাছে পরাজয় বরণ করেছিল, যার অনুসারীরা তাদের প্রচন্ড হামলায় পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল, সে ইসলাম তার বিজয়ী জাতিকে জয় করে নিল, কিন্তু ইসলামের তার বিজয়ী জাতিকে জয় করা কিভাবে সম্ভব হলো। এ বিজয় তরবারির জোরে হয়নি। কারণ, মুসলমানদের তরবারি তো তাতারীদের তরবারির সামনে ভোতা হয়ে গিয়েছিল। নিরাশ হয়ে গিয়েছিল তারা জীবন সংগ্রাম থেকে। তাদের এ ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল,

তাতারীদের মোকাবেলায় আর কিছু করা সম্ভব নয়। তবে কী ছিল সে শক্তি? যে শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তারা বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। সে শক্তি ছিল অলৌকিক দীন ইসলাম। যা ছিল চিরন্তন, চিরস্থায়ী, সার্বজনীন, সুন্দর, মনোরম, হৃদয়গ্রাহী ও চিত্তাকর্ষক এক জীবনব্যবস্থা, এক জীবনপদ্ধতি। এই দীনের অলৌকিক যাদুতে আচ্ছন্ন হয়েই তারা শেষ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর কাছে পরাজয় বরণ করে। কারণ, তাতারীরা ছিল অসভ্য, বর্বর। সভ্যতার কোন স্পর্শই ছিল না তাদের জীবনে। তারা ছিল মানব আকৃতিতে হিংস্র হায়েনা। পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট। সেই জাতি ইসলামের যাদুতে আচ্ছন্ন হয়ে দুনিয়ার সংকীর্ণ সরুপথ থেকে পৃথিবীর প্রশস্ত ও বিস্তৃত মহাসড়কে প্রবেশ করল। ঠিক একই অবস্থা হবে বর্তমান পাশ্চাত্য শক্তিরও। সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন তারাও ইসলামের যাদুতে আচ্ছন্ন হবে। পাশ্চাত্য আজ জীবন সংগ্রাম থেকে নিরাশ হয়ে পড়েছে। হতাশ হয়ে পড়েছে তাদের সভ্যতা থেকে। এখন তাদের একটি নতুন সভ্যতার প্রয়োজন, যে সভ্যতা তাদের মনে প্রশান্তি দান করবে। নিয়ে যাবে দুনিয়ার সংকীর্ণ সরু পথ থেকে প্রশস্ত ও বিস্তৃত মহাসড়কে। আমেরিকা ও পাশ্চাত্য শক্তি আজ যে উত্তাল তরঙ্গের মতো ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে, এর কি প্রভাব-প্রতিক্রিয়া পড়েছে, মার্কিন বিভিন্ন পত্র পত্রিকার সৌজন্যে এখানে আমরা তার কিছু চিত্র তুলে ধরছি।

১১ই সেপ্টেম্বরের তুফানের পর এর নায়করাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আজ মার্কিন অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামরিক শক্তি ক্রমশঃ দুর্বল হতে চলেছে। ১১ই সেপ্টেম্বরের পর আমেরিকা মুদ্রাস্ফীতি থেকে বাঁচতে তিন বার নিজের সংরক্ষিত মুদ্রা ভান্ডারের অবমূল্যায়ন করেছে। অর্থনৈতিক এই দুরবস্থা আমেরিকা থেকে সুদূর জাপান, তাইওয়ান, মেক্সিকো ও ব্রাজিল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। আমেরিকার সাধারণ আভ্যন্তরীণ উৎপাদনে যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে, একে তারা কৌশলগত অস্থিরতা বলে অভিহিত করে চলেছে। ২০০১ সালের ২৯ আগস্ট পর্যন্ত আমেরিকা তার উৎপাদনের হার শতকরা ৭ শতাংশ বলেছিল। যখন এ হার প্রকৃতপক্ষে শূন্যের কোঠায় এসে গিয়েছিল। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এ হার নেতিবাচক পর্যায়ে চলে গেছে। এই অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে সেসব অঞ্চলে বেকারত্বের হার দ্রুত বাড়ছে। ১১ই সেপ্টেম্বরের পর আমেরিকায় দশ লাখের বেশি লোককে চাকুরী থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে। বড় বড় কোম্পানী আরো কর্মচারী ছাটাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমেরিকার ইলেকট্রনিক শিল্পে বহির্বিশ্বের অর্ডার ৩.২ হ্রাস পেয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য শিল্প দ্রব্য উৎপাদনেও বিরাট ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কৃত্রিমভাবে বহাল রাখা হচ্ছে। ২০০০ সালের অক্টোবর থেকে ২০০১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ের বেকারত্বের হার সম্পর্কে অর্থনীতিবিদ গোল্ডমিন স্যাক্স ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ২০০২ জানুয়ারী পর্যন্ত বেকারত্বের হার আরো প্রবৃদ্ধি ঘটবে। আরেক অর্থনীতিবিদ মর্গান স্ট্যানলের ভবিষ্যদ্বাণী মোতাবেক আমেরিকার বার্ষিক বাণিজ্য ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সমগ্র দুনিয়ার স্টক মার্কেটগুলো বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। ১৪শ' বছর পূর্বের কুরআনের ভবিষ্যদ্বাণী আজ একুশ শতকে এসে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে এভাবে, ইহুদী এবং তার মিত্র শক্তি নিজেই

নিজের ঘর ধ্বংস ও বরবাদ করছে। আমেরিকার রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি যেভাবে দাফন হয়ে যাচ্ছে, তা আল্লাহ পাকের ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়।

পক্ষান্তরে ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাসরত মুসলমানদের যে উপকার হয়েছে, তা সুদূরপ্রসারী। তাদের সবচে' বড় যে ফায়দা হয়েছে সেটি হলো, তাদের মধ্যে নতুনভাবে ইসলামের অনুভূতি জেগেছে। ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনা মুসলমানদের মাঝে তাদের ধর্মের দিকে ফিরে আসার নতুন চেতনা সৃষ্টি করেছে। আগে যারা নিজেদের মুসলমান পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করত, এখন তারা মুসলমান পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে। যারা নামায ও ইসলামের পরিচায়ক বিষয়াবলী থেকে উদাসীন ছিল এখন তারা দাড়ি রাখছে, ইসলামী লেবাস পরছে এবং মসজিদে যাওয়া শুরু করেছে। প্রতিটি মসজিদে নামাযীর সংখ্যা বাড়ছে। এমনকি মাঠ সংকীর্ণ হওয়ার কারণে ঈদের নামায কয়েক জামাআতে আদায় করতে হয়েছে।

একদিকে মুসলমানদের মধ্যে কুরআন ও দীনী কিতাব পড়ার আগ্রহ বাড়ছে, অপরদিকে মার্কিনী এবং ইউরোপিয়ানরাও টিভিতে ইসলামের আলোচনা শুনে কুরআন, ইসলামী ইতিহাস ও দীনী কিতাব ক্রয় করতে শুরু করে দিয়েছে। শুধু আমেরিকাতেই ইসলাম সম্পর্কিত বই পুস্তক ক্রয়ের হার ত্রিশ শতাংশ বেড়েছে। তন্মধ্যে কুরআনের ইংরেজী অনুবাদ এত ব্যাপকভাবে ক্রয় করা হয়েছে, যাতে লাইব্রেরীগুলোর স্টকই খতম হয়ে গেছে। এক পত্রিকা লেখেছে, এক মাসের মধ্যে ৫০ হাজার কুরআন শরীফ বিক্রি হয়েছে। মার্কিন নিউজ এজেন্সীগুলো সংবাদ দিয়েছে, ১১ই সেপ্টেম্বরের পর থেকে কুরআন শরীফ সবচে বেশি বিক্রীত গ্রন্থে পরিণত হয়েছে। এর পাশাপাশি মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারগুলোতে অমুসলিমদের আসা-যাওয়া এবং ইসলাম সম্পর্কে জানার প্রবণতা এ পরিমাণ বেড়েছে, যা বিগত ত্রিশ বছরেও হয়নি। কিছু কিছু ইসলামিক সেন্টারের দায়িত্বশীলরা বলেছেন, প্রতিদিন ইসলাম সম্পর্কে টিভি ও সংবাদপত্রকে আমাদের কমপক্ষে আট দশটা সাক্ষাতকার দিতে হয়েছে। এ ধারাবাহিকতা ক্রমেই বাড়ছে। মুসলমানরাও প্রচার মাধ্যমগুলোর সাথে তাদের সম্পর্ক বৃদ্ধি করে চলেছে। মসজিদে ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ১১ই সেপ্টেম্বরের পর থেকে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ৩০ হাজার মার্কিনী ইসলাম গ্রহণ করেছে। ২০০৪ সালের ১লা সেপ্টেম্বরের সংবাদ অনুযায়ী আমেরিকায় ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা পঞ্চাশ হাজারে পৌছে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুসলমানরা কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও ইসলামের এমন পরিচিতি সৃষ্টি করতে পারত না, যেমন ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর ইসলাম যতটুকু পরিচিতি লাভ করেছে।

সেখানকার মুসলমানদের অমুসলিম প্রতিবেশীরা ইতোপূর্বে তাদের সাথে পরিচিত হওয়া বা তাদের খোঁজ-খবর রাখার চিন্তাও করত না, কিন্তু এই ঘটনার পর অমুসলিম প্রতিবেশীরা মুসলমানদের খোঁজ-খবর নেয়া ও তাদের সাথে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করছে। তারা মুসলমানদের সভ্যতা-সংস্কৃতি ও ইসলামী ইতিহাস সম্পর্কে তাদের কাছে জিজ্ঞেস করছে। গির্জা ঘরে মুসলমানদের দাওয়াত দিচ্ছে, ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস

করছে এবং কুরআনের অনুবাদ কপি তালাশ করছে। এসবের পর যখন তাদের নিকট ইসলামের সত্যতা ফুটে ওঠছে, তখন সাথে সাথে তারা ইসলাম গ্রহণ করে নিচ্ছে।

১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনায় মার্কিন মুসলমানদের এক ফায়দা এও হয়েছে, মিডিয়া তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। নতুবা এর পূর্বে তাদের কেউ পাত্তা দিত না। রাজনৈতিক দলগুলোও এখন মুসলমানদের গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। মার্কিন কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃবর্গ মুসলমানদের সমর্থনে বিবৃতি দিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত তাদের তোয়াজ করছে। বুশ স্বীকার করেছেন, ১১ই সেপ্টেম্বরের পর ইহুদী সংগঠনগুলো মুসলমানদের বিরুদ্ধে আমার নিকট এত ফ্যাক্সবার্তা পাঠিয়েছে যে, আমি এসব দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি। বিশেষ করে মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী (ইহুদী) এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঘৃণ্য ভূমিকা পালন করেছে।

১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার আরেকটি বড় ফায়দা হলো, মুসলমানদের মধ্যে একতা ও ভ্রাতৃত্বের প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। তারা নিরাশার পরিবর্তে দৃঢ়তার পথ গ্রহণ করেছে। তাদের দীনী ও দাওয়াতী সংগঠনগুলোকে আরো সক্রিয় করে তুলেছে। দীনী কাজের জন্য বিরাট ফান্ড সরবরাহ করছে। ইসলাম সম্পর্কে বিভিন্ন কিতাব মানুষের মাঝে বিতরণ করছে। আমেরিকার প্রসিদ্ধ পত্রিকা ইউ.এস.এ টুডে লিখেছে, ৯/১১-এর ঘটনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম সম্পর্কে অসাধারণ আগ্রহ বেড়েছে। সাধারণ ও বিশেষ শ্রেণী সবাই আমেরিকায় বসবাসরত মুসলমানদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। ইসলাম সম্পর্কিত গ্রন্থাবলী ক্রয় করে স্টাডি শুরু করেছে। এই পত্রিকা ১৭ই সেপ্টেম্বর সংখ্যায় লেখেছে, এক সপ্তাহের মধ্যে বিভিন্ন মার্কিন লাইব্রেরীতে ইসলাম সম্পর্কিত গ্রন্থাবলীর স্টক শেষ হয়ে গেছে। কুরআন শরীফ বিক্রয়ে সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে। এমনিভবে ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা হাজার পর্যন্ত পৌছে গেছে। নিউইয়র্ক টাইমস ২৩ই অক্টোবর সংখ্যায় লেখেছে, সমুদ্রের ধারাবাহিক উত্তাল তরঙ্গের মতো হাজারো মার্কিনী আমেরিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইসলামিক সেন্টার ও মসজিদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ইউ.এস.এ টুডে ১৭ই সেপ্টেম্বর সংখ্যায় লেখেছে, এতদিন পর্যন্ত মার্কিনীরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মুসলমানদের থেকে আলাদা হয়ে জীবন যাপন করত, কিন্তু ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনা তাদের ইসলাম, মুসলিম উম্মাহ ও মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে বাধ্য করেছে। এর মৌলিক কারণ হলো, ১১ই সেপ্টেম্বরের প্রলংকরী ঘটনায় মার্কিনীদের মস্তিষ্কে এই প্রশ্ন সৃষ্টি করে দিয়েছে, ইহুদী। মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা যদি সঠিক হয় তাহলে এক ব্যক্তির মধ্যে এত বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করার শক্তি কিভাবে এলো। তার পেছনে কোন্ শক্তি আছে। তার ধর্ম কি তাকে এত বড় ত্যাগ স্বীকারের মতো যোগ্যতা সৃষ্টিতে এখনো সক্ষম?

দ্বিতীয় মৌলিক কারণ হলো, ৭০ শতাংশ মার্কিনীর মতে, মার্কিন মিডিয়ার সংবাদে ভারসাম্যহীনতা ও পক্ষপাতিত্ব পাওয়া যায়। ৫৫ শতাংশ মার্কিনী মার্কিন মিডিয়ার সংবাদকে মনগড়া ও বানোয়াট মনে করে। যেমন পেন্টাগনের অদৃশ্য নির্দেশে উপসাগরীয় যুদ্ধের একতরফা সংবাদ পরিবেশন করে সি.এন.এন গোটা বিশ্বে মার্কিন মিডিয়ার ভাবমূর্তি বিনষ্ট করেছে এবং মার্কিন মিডিয়াকে কলঙ্কিত করেছে। খোদ

আমরিকার সংবাদপত্রের সম্পাদকগণ আমেরিকার এই নতুন পলিসির প্রতিবাদ জানিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়া বিষয়ক এই পলিসির কারণে মার্কিনীরা ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনায় ওসামা ও তার ধর্মপন্থী মুসলমানদের বিরোধী প্রোপাগান্ডায় কোনো বিরূপ প্রভাব গ্রহণ করেনি। তবে সাময়িকভাবে তারা বিভ্রান্ত হয়েছে। এরপর যখন মার্কিন সরকার প্রত্যাশা অনুযায়ী মিডিয়ায় মনগড়া, বানোয়াট ও জাল দলীল-দস্তাবেজ জারি করা শুরু করে, তখন সর্বপ্রথম খোদ মার্কিন সাংবাদিকরাই এসব দলীল-দস্তাবেজ মিথ্যা, ধোকা, প্রতারণা ও বানোয়াট আখ্যায়িত করে। আইন বিশেষজ্ঞ ও বুদ্ধিজীবীরা তো এর প্রতি ভ্রুক্ষেপই করেননি, কিন্তু ইহুদীরা তাদের হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা ও শত্রুতার ঝাল মেটাতে এটাকেই মোক্ষম সময় মনে করে। ফলে তারা মুসলমানদের ইবাদতকেন্দ্রগুলোকে টার্গেট বানায়। মুসলিম নারীদের চলাফেরা পর্যন্ত সংকীর্ণ করে তোলে। মিথ্যা ভিত্তিহীন সংবাদের ভিত্তিতে মুসলমানদের গ্রেফতার করায়। অথচ স্বয়ং দু ইহুদীকে এক মসজিদ ধ্বংস করার অপরাধে বোমাসহ গ্রেফতার করা হয়েছে। মার্কিনীদের সামনে যখনই প্রকৃত বিষয়টা সুস্পষ্ট এবং ইহুদী ষড়যন্ত্রের পর্দা উন্মোচিত হলো, তখন তারা মুসলমানদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। মসজিদসমূহের সামনে গিয়ে নামাযী মুসলমানদের ফুলের মালা দিয়েছে এবং নিজেদের ভুল ধারণা ও ভুল বোঝাবুঝির জন্য ক্ষমা চেয়েছে। গির্জার দায়িত্বশীলরা ইসলামের পরিচয় বর্ণনার জন্য মুসলমানদের আহবান করেছে। ইসলাম ও ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস জানার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অতঃপর তাদের সামনে যখন ইসলাম ও ইসলামী শিক্ষামালা সুস্পষ্ট হয়ে গেল তখন তারা সত্য কথা গ্রহণ করতে মোটেও দেরি করেনি; বরং তারা বিভিন্ন লাইব্রেরীতে গিয়ে ইসলাম সম্পর্কে কিতাবাদি সংগ্রহ শুরু করে দেয়।

সেমতে মাত্র চার দিনের ভেতর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সকল লাইব্রেরীর ইসলাম বিষয়ক গ্রন্থাবলীর স্টক খতম হয়ে যায়। বিপুলভাবে কুরআনের ইংরেজি অনুবাদ বিক্রি হতে লাগল। প্রকাশকরা ছেপেই কূল পায় না। অপরদিকে ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়াও ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ সম্পর্কে বিভিন্ন প্রবন্ধ-নিবন্ধ এবং সাক্ষাতকার প্রকাশ শুরু করে। ফলে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা চিন্তায় পড়ে গেল, এফ.বি.আই তার বু-ি নয়াদী উদ্দেশে ব্যর্থ হয়ে গেছে! এখন আমেরিকান সরকার স্বয়ং তাদের নাগরিকদের স্বাধীনতার ওপরই বহু বিধি নিষেধ আরোপ করছে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। হোক না তারা আমেরিকায় অভিবাসী মুসলমান।

এ পরিস্থিতি ইহুদী প্রোপাগান্ডার মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছে। ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে; বরং যেসব মার্কিনী পূর্ব থেকেই ইহুদীদের সাথে শত্রুতা রাখত, তাদের শত্রুতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ তারাও এখন বলছে, ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার পেছনে জালেম ইহুদীদের হাত রয়েছে, কিন্তু যেহেতু মার্কিন মিডিয়ার ওপর তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে, এজন্য মার্কিনীদের ইহুদী বিদ্বেষের সংবাদ ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়, কিন্তু কতদিন সত্য চাপা দিয়ে রাখা যাবে। একদিন না একদিন তার বিস্ফোরণ হবেই। সেদিন অবশ্যই সত্য তার স্বমহিমায় আত্মপ্রকাশ করবে। নিজেদের দুষ্কর্মের হিসাব দিতে হবে এবং নিজেদের খোঁড়া গর্তে পড়তেই হবে।

এখন পাশ্চাত্যে বসবাসরত মুসলমানদের উচিত সেখানে ইসলামের দাওয়াতকে আরো সক্রিয় ও গতিশীল করা। আর এই দাওয়াত তখনই ফলপ্রসূ হবে যখন স্বয়ং মুসলমানরা তাদের জীবনকে অমুসলিমদের সামনে ইসলামের বাস্তব নমুনা হিসেবে উপস্থাপন করবে। মুসলমানদের বাস্তব ইসলামী জীবন দেখেই দলে দলে লোক ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেবে। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভূ-খ ইসলামের প্রহরীদের ভূ-খ হয়ে যাবে। ইসলামী ইতিহাস বলে, দেবালয় থেকেই কাবার প্রহরী বের হয়ে আসে। আগামীতেও বের হয়ে আসবে ইনশাআল্লাহ। ঈমানদাররা এ পৃথিবীতে সূর্যের মতো জীবন যাপন করবে। কারণ আল্লাহ তাআলাই বলেছেন, আমিই এই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই একে সংরক্ষণ করব। সুতরাং মুসলিম উম্মাহর নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। শত নিরাশার মাঝেও আশার সূর্য উকি মারে। অল্প কয়েক বছর আগের কথা, রাশিয়ার মতো পরাশক্তি আফগানিস্তানে এসে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। আমেরিকার পূর্বাভাসেও দেখা যাচ্ছে, ইরাক এবং আফগানিস্তানে আমেরিকার কবর রচিত হবে।

আলোচ্য কথাগুলো ২০০৫ সালে লেখা হয়েছিল। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি হচ্ছে, আমেরিকা ইরাক ও আফগানিস্তানের চোরাবালি থেকে বের হবার নিরন্তর প্রয়াস চালাচ্ছে। পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার পিছু হটা, আফগানিস্তানে তালেবানদের নতুনভাবে উত্থান এবং আরব বিশ্বে আমেরিকার দোসর, দালাল, তল্পীবাহক ও তার স্বার্থ সংরক্ষণকারী সরকারগুলোর বিদায় ঘন্টা বেজে ওঠা অনিবার্য। কারণ সত্য সমাগত মিথ্যা দূরীভূত-এটা আল্লাহ পাকের চিরন্তন ফয়সালা। এ পর্যন্ত যাকিছু ঘটে গেছে তা আমাদের বদ আমলের ফল, যার কারণে ক্রুসেডাররা এতদিন সময় পেয়েছে। একদিকে দুনিয়ার উন্নত জাতি-গোষ্ঠী, যারা তাদের সকল বস্তুগত উপকরণ ও শক্তি নিয়ে জুলুম, নির্যাতন ও পাশবিকতার সকল রেকর্ড ভাঙতে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, অপরদিকে অসহায়, নিরীহ, দুর্বল ও নিরস্ত্র লোক, যারা কোনো সরকার কিংবা দল ও সংগঠনের সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়াই পরাশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, পেশ করেছে জান-মালের নযরানা। দুর্বল ঈমানের লোকদের যখন আল্লাহ তাআলা এমন অসাধারণ সাহায্য করেছেন, তাহলে ঈমান শক্তিশালী হলে কি পরিমাণ গায়েবী সাহায্য আসতো। আল্লাহ তাআলা তাঁর দীনের রশ্মি প্রজ্বলিত করেই ছাড়বেন, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।

টিকাঃ
৭. ১৯৫০ সাল থেকে এ পর্যন্ত আমেরিকা, ফ্রান্স, জার্মানী, হল্যান্ড, মিসর, ইরাক, ইরান, লিবিয়া, পাকিস্তান ও ভারতের আধুনিক সমরাস্ত্র নির্মাণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহে দক্ষতার সাথে কাজ করেছেন, এমন মুসলিম বিজ্ঞানীকে ইসরাঈলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ নানা কৌশলে হত্যা করেছে। এসব মুসলিম বিজ্ঞানী পারমাণবিক বোমা, মিজাইল বিধ্বংসী রাডার, রণতরী নির্মাণ ইত্যাদি প্রকল্পে অত্যন্ত দক্ষতা ও সফলতার সাথে কাজ করেছেন। (দেখুন, আল বা'সুল ইসলামী, লাখনৌ, রবিউল আউয়াল ও রবিউস সানী সংখ্যা, ১৮২৩ হিজরী)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00