📄 ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার নাটক : ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে নয়া ক্রুসেডের সূচনা
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী মুফাক্কিরে ইসলাম আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.) তাঁর বিভিন্ন লেখা ও আলোচনায় বার বার বলতেন, 'মার্কিন (খৃস্ট) শক্তি ও ইহুদী মস্তিষ্ক দুটো একযোগে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে নির্মূল করার জন্য পূর্ণ শক্তি নিয়ে ময়দানে আবির্ভূত হয়েছে।'
একদিকে সামরিক শক্তির মাধ্যমে মুসলমানদের গণহত্যা, অপরদিকে বিশ্বায়নের নামে তাদের আকীদা-বিশ্বাস ও সভ্যতা-সংস্কৃতি নির্মূল করার নিরন্তর প্রয়াস চলছে। আর অর্থনৈতিক যাঁতাকলে তো বহু পূর্ব থেকেই ইসলামী বিশ্বকে নিষ্পেষণ করা হচ্ছে।
২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনের ওপর হামলার যে নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে, তার পেছনে সম্পূর্ণ মার্কিন শক্তি ও ইহুদী মস্তিষ্ক কাজ করেছে। এটি ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে একটি সুগভীর ষড়যন্ত্র, নয়া ক্রুসেডের সূচনা। এই ষড়যন্ত্রের পেছনে বহু বছর ধরে পরিকল্পিতভাবে নভেল, নাটক ও ফিল্মের মাধ্যমে মস্তিষ্ক ধোলাই করা হয়েছে। ইহুদী চিন্তাবিদ, বুদ্ধিজীবী, কবি, সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতারা এই কাজ আজ থেকে বাইশ বছর পূর্ব থেকে শুরু করেছে। তারা রাশিয়ার পতনের পর ইসলামকে প্রধান টার্গেট বানিয়েছে। ইসলামকে দাঁড় করিয়েছে পুঁজিবাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। এর জন্য তারা চারদিকে জোরেশোরে এই প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে, আগামী শতাব্দী হবে ইসলামের শতাব্দী। আগামী শতাব্দীতে ইসলাম একটি শক্তিশালী মতবাদ ও চিত্তাকর্ষক সভ্যতার আকারে গোটা দুনিয়ার ওপর ছেয়ে যাবে। কারো সাথে যদি তার দ্বন্দ্ব সংঘাত হয় তাহলে তা হবে পশ্চিমা সভ্যতার সাথে। এসব প্রোপাগান্ডাকারী ইহুদী চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সর্বশীর্ষে রয়েছেন বার্নার্ড লুইস ও স্যামুয়েল হান্টিংটন, যারা 'Clash of Civilization (সভ্যতার দ্বন্দ্ব) তত্ত্ব বিশ্ববাসীর সামনে পেশ করেছে। বিশ্ব জায়নবাদী গোষ্ঠী এই তত্ত্বকে মিডিয়ার নিকট অর্পণ করেছে। মিডিয়া বিভিন্নভাবে সিনেমা, ফিল্ম, নভেল, নাটক, বক্তৃতা-বিবৃতি ও গবেষণামূলক প্রবন্ধ-নিবন্ধের মাধ্যমে পাশ্চাত্যের মন-মস্তিষ্কে একথা, মজবুতভাবে ঢুকিয়ে দেবার প্রাণান্তকর প্রয়াস চালিয়েছে যে, কমিউনিজমের পতনের পর পাশ্চাত্যের শত্রুতার গতিপথ এখন ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে রুখ করেছে।
১৯৯০ সালের বসন্তকালে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ইহুদী গুরু হেনরী কিসিঞ্জার বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এক বার্ষিক অধিবেশনে বক্তৃতা করতে গিয়ে বলেন, 'এখন পরিস্থিতি হচ্ছে, বর্তমানে পাশ্চাত্যের সামনে নতুন দুশমন হলো ইসলাম, যা ইসলামী বিশ্ব ও আরব বিশ্বের বিশাল এলাকা জুড়ে পরিব্যাপ্ত।'
২০০১ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বরে কিসিঞ্জার দ্বিতীয় বক্তৃতায় বলেন, 'ইসলামী সন্ত্রাস ও চরম পন্থার বিরুদ্ধে আগামীকালের পরিবর্তে আজই যুদ্ধ শুরু করা উচিত।' একই তারিখে বৃটিশ দৈনিক সানডে টেলিগ্রাফ একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। যার শিরোনাম ছিলো, 'ইসলাম কি আমাদের দাফন করে দেবে?' একই তারিখে লন্ডন থেকে প্রকাশিত সানডে টাইমস তার সম্পাদকীয়তে পাশ্চাত্যের মনোযোগ আকর্ষণ করে বলেছে, 'উত্তর আফ্রিকা থেকে মধ্য এশিয়ার চীন পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা জুড়ে ইসলামী ফান্ডামেন্টালিজম তথা ইসলামী মৌলবাদ ফণা তুলেছে। অতি দ্রুত এই বিষাক্ত সর্পের বিষদাঁত ভেঙ্গে দেয়া উচিত।'
১৯৯২ সালের এপ্রিলে ইকোনোমিস্ট পত্রিকা তার প্রথম পাতায় ইসলামকে টার্গেট বানিয়ে একটি কার্টুন ছেপেছে, যাতে এক আরব ব্যক্তি বন্দুক নিয়ে একটি মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। একই তারিখে সাপ্তাহিক টাইম একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। যাতে বলা হয়েছে, গোটা বিশ্বকে ইসলামের বিপদ থেকে সতর্ক থাকা উচিত। পত্রিকাটি তার কভার পৃষ্ঠায় মসজিদের মিনারার ছবি ছেপেছে, যার পাশে এক ব্যক্তি মেশিনগান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
১৯৯৩ সালের ডিসেম্বরে ফরাসী পত্রিকা মোন্ড ডিপ্লোমেট একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে, যাতে পত্রিকাটি লেখেছে, ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুধু সামরিক ময়দানেই হবে না; বরং সভ্যতা সংস্কৃতির ময়দানেও লড়াই হবে। আর এটাই হবে চূড়ান্ত লড়াই।'
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শরীক হওয়ার জন্য বিশ্ববাসীকে যে দাওয়াত দিয়েছেন, তাতে তিনি ইসলামকে শেকড় থেকে উপড়ে ফেলার দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেছেন। এই লড়াইয়ে তিনি ইসলামী বিশ্বের নেতৃবর্গকেও শরীক হওয়ার আহবান জানিয়েছেন।
আমরা আরেকটু অগ্রসর হয়ে যদি ইহুদী ষড়যন্ত্রের গভীরে যাই, তাহলে দেখতে পাবো, হলিউডের চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ইহুদীরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক এই যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। নিঃসন্দেহে হলিউড ইহুদীদের দুর্গ ও ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে হলিউড বিশ্বব্যাপী ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা ছড়ানোর কাজে লিপ্ত রয়েছে।
বিশ শতকের আশির দশকে হলিউড 'ডেল্টা ফোর্স, প্রতিশোধ (১৯৮৬), লাঞ্ছনার পূর্বে মৃত্যু (১৯৮৭), আকাশে চৌর্যবৃত্তি (১৯৮৮) ইত্যাদি যেসব ফিল্ম নির্মাণ করেছে তার মূল কথাই ছিল, আরব বেদুঈনরা ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের মালিক। তারা এসব অস্ত্রের মাধ্যমে নিরীহ-নিষ্পাপ মানবতাকে হত্যার হুমকি দেয়, কিন্তু পাশ্চাত্যই কেবল এসব নিরীহ-নিষ্পাপ মানুষকে হিংস্র আরবদের কবল থেকে রক্ষার জন্য হস্তক্ষেপ করছে। পাশ্চাত্য সম্প মানুষের মৌলিক অধিকারের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এখন পাশ্চাত্য দু'টি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একদিকে লাল কমিউনিজম অপরদিকে ইসলামী সবুজ পতাকা, যার পুরোটাই মানবতার জন্য অনিষ্ট ও অকল্যাণকর।
১৯৯২ সালে অভিজ্ঞতার জন্য ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে প্রথমবার হামলার নাটক মঞ্চস্থ করার পর হলিউড 'প্রকৃত মিথ্যা' নামে একটি সিনেমা নির্মাণ করে, যার মূল কথা ছিল, আমেরিকায় একটি গোপন আরব মিলিশিয়া সক্রিয় রয়েছে। যাদের শ্লোগান 'মুসলমানদের স্বাধীনতা'। এই মিলিশিয়া আমেরিকায় বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা করছে। সেই পরিকল্পনার আওতায় তারা আমেরিকার বিমান অপহরণ করে নিউইয়র্কে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রে আত্মঘাতী হামলার জন্য আকাশে উড্ডয়ন করেছে। ইতোমধ্যে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার এক অফিসার ও তার স্ত্রী তাদের আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত হয়ে যায়। তারা উভয়ে সন্ত্রাসীদের এই হামলা ব্যর্থ করে দেয়। এভাবে তারা নিউইয়র্ককে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে।
'মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিমান অপহরণ' নামে দ্বিতীয় আরেকটি ফিল্মে বলা হয়েছে, ইসলামী রাষ্ট্র দাগেস্তানের কিছু লোক দীর্ঘ দিন ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে। সেই ষড়যন্ত্রের আওতায় তারা বুশকে হত্যার জন্য তাঁর বিমান অপহরণ করেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের এ ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে গেছে।
ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী ঘৃণা, বিদ্বেষ, হিংসা ও শত্রুতা ছড়ানোর অংশ হিসেবে ১৯৯৮ সালে হলিউড আরেকটি ফিল্ম নির্মাণ করে। সেটি ছিল হলিউডের এ যাবতকালের সবচে' ব্যবসা-সফল ফিল্ম। তাতে দেখানো হয়েছে, শান্তি-নিরাপত্তার প্রবক্তা ও গোটা মানবতার কল্যাণকামী আদর্শ দেশ আমেরিকার সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য হিংসা-বিদ্বেষে ভরপুর মানবতার দুশমন মুসলমানরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রে সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে এ কাজের সূচনা করেছে। গোটা দুনিয়ার যদি ভয় ও বিপর্যয়ের আশংকা থাকে তাহলে সে আশংকা মধ্যপ্রাচ্যের আরবদের থেকে।
সুচতুর ইহুদীরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে নির্মূল করার জন্য নতুন কিছু টেকনিক গ্রহণ করেছে। সে টেকনিকগুলো হলো-
এক. মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার-প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিশ্ব-জনমত বিষিয়ে তোলা।
দুই. মুসলিম বিশ্বের যশ, খ্যাতি ও উচ্চাভিলাষী কিছু সংখ্যক নেতৃবর্গের পাশ্চাত্য বিরোধিতাকে মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার-প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে তাদের মুসলমানদের দৃষ্টিতে হিরো বানানো। এরপর তাদের দ্বারা স্থলভাবে ইসলাম বিরোধিতার কাজ নেয়া এবং তাদের ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহার করে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে নির্মূল করা।
কামাল থেকে জামাল এবং গাদ্দাফী থেকে সাদ্দাম পর্যন্ত নেতৃবর্গের কর্মকান্ড দ্বারা এ তিক্ত বাস্তবতাই ফুটে ওঠে। এ জন্যই মার্কিন পত্রিকা নিউজউইক লেখেছে, যদি সাদ্দাম না হতো তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকজন নতুন সাদ্দাম আবিষ্কার করার প্রয়োজন পড়ত।
পাশ্চাত্য অর্বাচীন মোস্তফা কামাল পাশা আতাতুর্ককে গাজী বানিয়ে ইসলামী খেলাফতের সিংহাসন উল্টে দিয়েছে। জামাল আবদুন নাসেরকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু আখ্যা দিয়ে তার হাতে হাজারো মিসরীকে হত্যা করিয়েছে। ইরাকের সাদ্দাম হুসাইনকে
আমেরিকা তার স্বার্থে ব্যবহার করেছে, কিন্তু যখন আমেরিকার স্বার্থ উদ্ধার হয়ে গেছে তখন তাকে ডাষ্টবিনে নিক্ষেপ করেছে। এই সাদ্দাম হুসাইন আমেরিকার প্ররোচনায় হাজারো ইরাকী ও কুয়েতী জনগণকে হত্যা করেছে। পরে তাকেই বলির পাঁঠা হতে হয়েছে। এদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ইসলামী বিশ্বের অন্যান্য নেতৃবর্গও তাদের আমলনামা কলংকিত করতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। যাদের মধ্যে সিরিয়ার বাশার আল আসাদ, পাকিস্তানের জেনারেল পারভেজ মোশাররফ, লিবিয়ার মোয়াম্মার আল গাদ্দাফী এবং আফগানিস্তানের হামিদ কারজাই উল্লেখযোগ্য।
তিন. নিজের নাক নিজের হাতেই কর্তন করে শত্রুকে নির্মূল করার বাহানা তৈরি করা।
চার. শত্রু সম্পর্কে পক্ষে বিপক্ষে উভয় ধরনের সংবাদ ধারাবাহিক ও পরিকল্পিতভাবে প্রচার করা, যাতে তৃতীয় কোন আওয়াজ না ওঠে।
সাম্প্রতিক পশ্চিমা মিডিয়া আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশে বসবাসরত মুসলমানদের সংখ্যা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাওয়া ও বিশ্বব্যাপী ধর্ম হিসেবে ইসলামের ব্যাপক জনপ্রিয়তার জুজুও দাঁড় করিয়েছে। ইহুদী মিডিয়া প্রচার করছে, ইউরোপ-আমেরিকার একদিকে যেমন পূর্ব ও পশ্চিম থেকে বিপদের আশংকা রয়েছে, তেমনিভাবে অভ্যন্তরীণ বিপদও কম নয়। চিন্তাবিদ, বুদ্ধিজীবী ও গবেষকরা ছাড়া পশ্চিমা এবং মার্কিন রাজনীতিকরাও এসব বিপদ চিহ্নিত করার প্রয়াস চালিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, ২০৫০ সাল পর্যন্ত পশ্চিমা জগত, বিশেষত আমেরিকার অবস্থা বর্তমান তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো হয়ে যাবে।
যেমন মার্কিন রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মি. প্যাট্রিক বুকানন তাঁর 'পাশ্চাত্যের মৃত্য' নামক গ্রন্থে লেখেন, '২০৫০ সাল পর্যন্ত আমেরিকার অবস্থা বর্তমান তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো হয়ে যাবে। সে সময় আসল ইউরোপীয়দের সংখ্যা কেবল দশ শতাংশ হবে। তাদের মধ্যেও আবার এক তৃতীয়াংশ এমন হবে যাদের বয়স হবে ষাটের ঊর্ধ্বে। জাপানের অস্তিত্বও পশ্চিমাদের মতো নির্মূল হয়ে যাবে। কারণ জাপানে মানব জন্মের হার ইউরোপ-আমেরিকার মতোই ভয়াবহ আকারে হ্রাস পাচ্ছে।'১ মি. বুকানন তাঁর গ্রন্থে বর্তমান সামাজিক ও নৈতিক দৃষ্টিকোণের আলোকে একটি জরিপ পেশ করেছেন, তাতে তিনি বলেছেন, ২০৫০ সাল নাগাদ ইউরোপের জনসংখ্যা হ্রাস পেয়ে তা সর্বমোট ১৩৫ মিলিয়নে গিয়ে দাঁড়াবে। তার মধ্যে ২৩ মিলিয়ন জনসংখ্যা হ্রাস পাবে জার্মানীর। রাশিয়ার ৩০ মিলিয়ন এবং ইটালির ১৩ মিলিয়ন হ্রাস পাবে। রাশিয়ার জনসংখ্যা বিপুল পরিমাণে হ্রাস পাবে এবং সেখানে মুসলমানদের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাবে। মি. বুকাননের ভবিষ্যতদ্বাণী অনুযায়ী ইউরোপের জনসংখ্যা হ্রাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ লাভের জন্য তার সামনে মাত্র দু'টি রাস্তাই খোলা আছে। এক. বেকারত্ব ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য তারা যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন কমিয়ে
দিতে হবে। দুই. আরব বিশ্ব থেকে লাখে লাখে আরবদের নিয়ে এসে ইউরোপে পুনর্বাসন করতে হবে, যাতে তাদের অর্থনৈতিক সচ্ছল অবস্থা বহাল থাকে।
মি. বুকানন ইসরাঈল সম্পর্কেও ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছেন, ২০৫০ সাল নাগাদ ফিলিস্তিনীদের সংখ্যা ১৫ মিলিয়নে গিয়ে দাঁড়াবে। অর্থাৎ ইহুদীদের দ্বিগুণ হয়ে যাবে, যা তাদের কোমর ভাঙ্গার জন্য যথেষ্ট। বর্তমানের ইন্তেফাদা আন্দোলনের কারণে যেভাবে ইসরাঈলীরা তাদের বসতি ছেড়ে ফিলিস্তিন থেকে পলায়ন করছে তা আগামীতে আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
মি. বুকানন বলেন, সকল খৃস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল, কিন্তু বর্তমান অবস্থা হলো, মুসলমানদের সংখ্যা ক্যাথলিকদের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। দ্বিতীয় তিক্ত বাস্তবতা হলো, খৃস্ট জাতি দ্রুত পতনের পথে ধাবিত হচ্ছে। তাদের নিকট ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা হ্রাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কোনো পথ খোলা নেই। এটি পশ্চিমের জন্য সবচে' উদ্বেগের কারণ, যা তাদের নিজের হাতের তৈরি। এজন্য অনিবার্যভাবেই তাদের জনসংখ্যা হ্রাস পেয়ে সীমিত হয়ে যাবে। তাদের জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ার মূল কারণ হলো, অবাধ যৌন স্বাধীনতা, চারিত্রিক ও নৈতিক বিপথগামিতা এবং মানব সমাজের ওপর ধর্মের বাঁধন শিথিল হয়ে পড়া। * একে তারা নিজেরাও ধর্মীয় আকীদার অপমৃত্যু মনে করে। ২
মি. বুকানন বর্তমান অবস্থার বিশ্লেষণ দিতে গিয়ে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হবে, যে যুদ্ধে মেক্সিকো বিজয় লাভ করবে। কারণ মেক্সিকো জনসংখ্যা, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতার দিক দিয়ে সবার চেয়ে অগ্রগামী থাকবে। গ্রন্থের সমাপ্তিতে মি. বুকানন ধর্মীয় ও চারিত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, যখন ধর্মীয় আকীদা নির্মূল হয়ে যায় তখন অনিবার্যভাবে তার অনুসারীদের অস্তিত্বও নিরর্থক হয়ে পড়ে। সে হিসেবে ইউরোপ-আমেরিকায় খৃস্ট
ধর্মের আকীদা-বিশ্বাস নির্মূল হয়ে গেছে। সেখানে ধর্মহীনতার সয়লাব শুরু হয়েছে। খৃস্ট আকীদা-বিশ্বাস ও চারিত্রিক মূল্যবোধের জানাযা সম্পন্ন করে রাখা হয়েছে। খুব দ্রুত সেখানকার আদালতও খৃস্টান ধর্মকে আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতির গন্ডি থেকে বের করে দেবে।
এক সময় বিশেষজ্ঞগণ মার্কিন জনগণকে সালাদের এমন প্লেটের সথে তুলনা করত, যাতে সব উপাদান পরস্পরের সাথে সংমিশ্রিত হয়ে ছিল, তাদের মাঝে কোনো রকম স্বাতন্ত্র্য অবশিষ্ট ছিল না, কিন্তু এই অবস্থা বেশি দিন বাকী থাকেনি। এক পর্যায়ে এশিয়ান মুহাজিরদের পক্ষ থেকে শ্বেতাঙ্গদের প্রাধান্য বিরাট চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়, যখন এশিয়ান মুহাজিরদের জন্মের হার ১৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে লাগল। এখন স্প্যানিশদের জন্মের হার শতকরা ৫৩ শতাংশ, কৃষাঙ্গদের ১৩ শতাংশ এবং শ্বেতাঙ্গদের মাত্র ৬ শতাংশ। এই পরিস্থিতির আলোকে এ আশংকা আরো ত্বরান্বিত হয়েছে যে, আগামী বিশ-পঁচিশ বছরের মধ্যে সাদা মহাদেশের বর্ণই পাল্টে যাবে। সর্বসাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী যে বাস্তবতা ফুটে ওঠে তা হলো, সর্বমোট ২৬৭ মিলিয়ন জনসংখ্যার মধ্যে শ্বেতাঙ্গদের সংখ্যা ১৯৪ মিলিয়ন, কৃষাঙ্গদের ৩৩.৮ মিলিয়ন, স্প্যানিশদের সংখ্যা ২৯.৯ মিলিয়ন, এশিয়ানদের সংখ্যা ১০.৫ মিলিয়ন এবং রেড ইন্ডিয়ানদের সংখ্যা ২৭ লাখ।
জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ার ৩ পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও আমেরিকা দ্রুত পতনের কোলে ঢলে পড়ছে। এ পতন ক্রমশঃ ত্বরান্বিত হচ্ছে। প্রসিদ্ধ মার্কিন বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি বলেন, পরাশক্তির দাবীদার আমেরিকা সামরিক দিক দিয়ে শক্তিশালী ঠিক, কিন্তু সে এ ময়দানে সম্পূর্ণ একা। অথচ জাপান, জার্মানী ও আমেরিকা সম্মিলিতভাবে অর্থনৈতিক ত্রিশক্তির মর্যাদা রাখা সত্ত্বেও আমেরিকা জাপান ও জার্মানীকে সামরিক শক্তি থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। এ কারণেই জাপান ও জার্মানী ক্রমেই অর্থনৈতিক দিক দিয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠছে। কারণ আমেরিকা তার পরাশক্তি টিকিয়ে রাখার জন্য প্রতি বছর সামরিক বাজেটে দুইশ' কোটি ডলার ভর্তুকি দিতে বাধ্য হচ্ছে। এই বাজেটের ৬৫ শতাংশ অর্থ নতুন সমরাস্ত্র নির্মাণে ব্যয় করা হয়, এর বিপরীতে তারা মাত্র ২ শতাংশ অর্থ শিল্প গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য ব্যয় করে। এ কারণেই আমেরিকা শিল্প ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জাপান এবং জার্মানী থেকে পিছিয়ে পড়ছে। জাপান ও জার্মানীর সামরিক বাজেটে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। সামরিক বাজেটের অর্থ তারা শিল্পের উন্নয়ন ও গবেষণায় ব্যয় করছে। ফলে ক্রমেই জাপান ও জার্মানী অর্থনৈতিক দিক দিয়ে আমেরিকার তুলনায় শক্তিশালী হয়ে ওঠছে। পক্ষান্তরে সামরিক বাজেট পূরণ করতে গিয়ে আমেরিকার শিল্প উৎপাদন বিপুলহারে হ্রাস পাচ্ছে, বার্ষিক বাজেটের আকার ছোট হচ্ছে, বৈদেশিক ঋণ বাড়ছে এবং বাণিজ্যিক
ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ক্রমেই আমেরিকার অর্থনৈতিক অবস্থা শোচনীয় হচ্ছে। বহুজাতিক কোম্পানীগুলো চায়, আমরিকার অর্থনীতি যে অবস্থায় আছে সে অবস্থায়ই থাকুক। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে শ্বেতাঙ্গদের ওপর। বর্তমান অবস্থা হচ্ছে, আমেরিকার বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪.৩ কোটি ডলার। অর্থনীতি ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমেরিকার অর্থনৈতিক দুরবস্থা কোনো আইন প্রণয়নের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয়। ৪ হ্যাঁ, যদি জাতীয় কোনো দুর্ঘটনা পেশ হয় তাহলে সেটা ভিন্ন কথা। বাহ্যিক দৃষ্টিতে সেই জাতীয় দুর্ঘটনা হলো, নিজের হাতেই নিজের নাক কাটা। সেটা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার নাটকের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে। একে বুনিয়াদ বানিয়ে আমেরিকা দক্ষিণ ও মধ্য-এশিয়ার ওপর কবজা করার জন্য আফগানিস্তান ও ইরাককে বলির পাঁঠা বানানোর পর ইরানের ওপর স্বীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।
আমেরিকার ভয়ের আরেকটি বড় কারণ হলো, শুধু ইউরোপেই নয়; বরং গোটা আমেরিকায় ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইহুদী লবি মুসলমানদের বিরুদ্ধে এ জন্য ধারাবাহিক প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে যে, স্বয়ং ইহুদীদের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ে তাদের প্রতি মার্কিনীদের ঘৃণা ও দূরত্ব বাড়ছে। আমেরিকায় বসবাসরত মুসলমানদের সাথে মার্কিনীদের যোগাযোগ ও লেনদেনের কারণে খৃস্টানদের সামনে ইসলামের বাস্তবতা ও সৌন্দর্য সুস্পষ্ট হচ্ছে। ইহুদীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই মর্মে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে আসছে, হযরত ঈসা (আ.) পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার তখনই আগমন করবেন যখন সকল ইহুদী তাদের আসল মাতৃভূমি ফিলিস্তিনে প্রত্যাবর্তন করবে। আর হযরত ঈসা (আ.) প্রকৃতপক্ষে ইহুদী বংশেরই লোক। আল্লাহর রহমত ততদিন আমেরিকার ওপর বর্ষিত হতে থাকবে যতদিন পর্যন্ত আমেরিকা ইহুদীদের সাহায্য সমর্থন করতে থাকবে।
উপসাগরীয় যুদ্ধে যেসব মার্কিন সেনা অংশ নিয়েছিল, পরবর্তীতে তারা সৌদি আরবে কিংবা কুয়েতে অবস্থান করছে তাদের অধিকাংশই ইসলাম গ্রহণ করেছে। মার্কিন সমাজে এর অসাধারণ প্রভাব-প্রতিক্রিয়া পড়ছে। ইহুদীরা তাদের ঐতিহ্যগত হিংসা-বিদ্বেষ ও ইসলাম বিরোধিতার চেতনা কাজে লাগিয়ে প্রোপাগান্ডা আরো তীব্র করে দিয়েছে এবং মিডিয়ার মাধ্যমে সাধারণ মার্কিনীদের এই ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছে যে, প্রাচ্য থেকে আসন্ন বিপদ খুব কাছে। আজ-কালের মধ্যেই বড় ধরনের কোন হামলা হতে পারে। অতএব ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে পরিবেশ তৈরির জন্য ধারাবাহিক সংবাদ আসতে থাকে এবং সরকারী বেসরকারী স্থাপনায় হামলার আশংকা প্রকাশ করা হতে থাকে। প্রাণপন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ইহুদী লবি ওকলাহোমা ষড়যন্ত্রকে আরবদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়নি। এ ব্যর্থতা তাদের হিংসার আগুন আরো বেশি তেজ করে দিয়েছে। সিনেমা, টিভি, রেডিও ও সংবাদপত্রে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে অব্যাহত ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। পাশ্চাত্যে বসবাসরত মুসলানদের প্রতিনিয়ত আতংকগ্রস্ত করে তোলা হচ্ছে। এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ইহুদী লবি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে হামলার পরিকল্পনা তৈরি করে, যাতে এক তীরে দুই পাখি শিকার করা যায়। প্রথম শিকার মুসলিম উম্মাহ আর দ্বিতীয় শিকার আমেরিকা তথা ইহুদীদের পুরাতন শত্রু খৃস্টান জাতি। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে, তাদের দুই আজন্ম শত্রু মুসলমান ও খৃস্টানদের থেকে ভয়ানক প্রতিশোধ গ্রহণ করা।
ঠান্ডা লড়াইয়ের পরিসমাপ্তির পর পশ্চিমা মিডিয়া, গবেষক, চিন্তাবিদ ও নীতিনির্ধারক সংস্থাগুলোর মুখে মুখে সর্বদা একই আলোচনা শুরু হয়, কমিউনিজমের পর পশ্চিমাদের সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ পলিটিক্যাল ইসলাম (Political Islam)। 'সভ্যতার দ্বন্দ্ব' তত্ত্বটি মৌলিকভাবে বার্নার্ড লুইস (Bernerd Lewis)-এর আবিষ্কার, যা স্যামুলেয় হান্টিংটন-এর নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এই তত্ত্বটির ফলে পশ্চিমা গবেষক ও চিন্তাবিদদের মন-মস্তিষ্কে একথা ছেয়ে গেছে, ইসলাম ও পশ্চিমাদের মাঝে দ্বন্দ্ব-সংঘাত অনিবার্য। আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আক্রমণ, ধ্বং-সলীলা ও জবর দখলের ঘটনা একই প্রেক্ষাপটে হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম ও পাশ্চাত্যের সম্পর্ক বিষয়ক যেসব গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে দু'টি গ্রন্থ অতি গুরুত্বপূর্ণ। এক. আমেরিকা এন্ড পলিটিক্যাল ইসলাম (America and Political Islam), লেখক-গ্যারজেস। দুই, পলিটিক্যাল ইসলাম এন্ড দি ইউনাইটেড স্টেট (Political Islam and the United State), লেখক-পিন্টো।
উক্ত গ্রন্থদ্বয়ে ইসলাম সম্পর্কে মার্কিন শাসকদের দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব ব্যক্ত করা হয়েছে। এক শ্রেণীর ধারণা ইসলাম যুদ্ধংদেহী। অপর শ্রেণীর ধারণা ইসলাম সমঝোতাপ্রিয়।
যারা ইসলামকে যুদ্ধংদেহী মনে করেন তারা প্রকৃতিগতভাবেই ইসলামকে একনায়কতন্ত্রপ্রিয়, কট্টরপন্থী, গণতন্ত্রবিরোধী ও পাশ্চাত্য সভ্যতার পরিপন্থী পায়। ফলে অনিবার্যভাবেই ইসলাম পাশ্চাত্য ও ইসরাঈলের আজন্ম শত্রু। এই শ্রেণীর আমেরিকান নীতি নির্ধারকদের সিদ্ধান্ত হলো, প্রতিটি পর্যায়ে ইসলামকে প্রতিরোধ করা হবে এবং ইসলামী দেশগুলোর সেসব সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করা হবে, যারা পশ্চিমের রাজনৈতিক, ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বার্থ সংরক্ষণে সচেষ্ট। তারা যতই ডিক্টেটর ও একনায়কতন্ত্রী হোক না কেন, তাদের অবশ্যই টিকিয়ে রাখতে হবে। তাদের ধারণা, মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোতে যদি ইসলামী নেতৃত্ব রাষ্ট্র ক্ষমতায় চলে আসে তাহলে আল্লাহর নামে গণতন্ত্র দাফন হয়ে যাবে। অন্য ভাষায় ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে পাশ্চাত্যের স্বার্থ বিপন্ন হওয়ার আশংকা রয়েছে। অপরদিকে যারা ইসলামকে সমঝোতাপ্রিয় মনে করেন তারা ইসলামকে কোনো ধরনের বিপদ আখ্যা দিতে সংশয় পোষণ করেন। তাদের বিশ্বাস, রাজনৈতিক ইসলাম মূলতঃ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ঔপনিবেশিক যুগের রাজনৈতিক বঞ্চনার ফসল। প্রকৃতপক্ষে ইসলাম গণতন্ত্র বিরোধী নয়; বরং গণতন্ত্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই তারা মুসলিম দেশগুলোতে গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য পাশ্চাত্যের নাক গলানো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং মুসলিম দেশগুলো নিয়ে পাশ্চাত্যের দ্বি-মুখী নীতির কঠোর সমালোচনা করেন।
গ্রন্থদ্বয়ের লেখকের ধারণা, আমেরিকার বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গির উৎস বিভিন্ন। লেখকদ্বয় আমেরিকার প্রচলিত কালচারে প্রভাবিত। তাই তাদের মতে, ইসলাম একটি বিদ্বেষী ও শত্রুতামূলক কালচার এবং মুসলমানরা ধর্মীয় কট্টরপন্থী, কঠোর গণতন্ত্র বিরোধী, সন্ত্রাসী, অবিশ্বস্ত এবং ক্রুসেড যুদ্ধসমূহের পর থেকে ইউরোপ ও ইসলামের পারস্পরিক কর্মের উত্তরাধিকার।
প্রথম গ্রন্থের লেখক গ্যারজেস তার গ্রন্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম সম্পর্কে জনগণের মতামত জরিপকারী অনেক জাতীয় জরিপের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। সেসব জরিপ মতে, ৩৬ শতাংশ মার্কিনী ইসলাসকে আমেরিকার জন্য 'একটি কঠিন বিপদ' মনে করে। যেসব জরিপের তিনি উদ্ধৃাত দিয়েছেন, তার বেশিরভাগই ইসরাঈলী লবিগুলোর পরিচালিত। গ্যারজেস তার গ্রন্থে ইসরাঈল ও তার মিত্রদের সম্পর্কে যে বিশ্লেষণ করেছেন তা অতি সংক্ষিপ্ত ও সংশয়পূর্ণ। তার বিশ্লেষণ দ্বারা এ আশংকাও নাকচ করে দেয়া যায় না যে, তিনি ইসরাঈলী লবির প্রতিক্রিয়াকে আরো রঙ চড়িয়ে উপস্থাপন করেছেন।
পক্ষান্তরে অপর গ্রন্থের লেখক পিন্টোর বিশ্লেষণ বিস্তারিত ও খোলাখুলি। তিনি বিস্ত ারিতভাবে বলেছেন, কিভাবে ইসরাঈল ও তার লবিগুলো ইসলাম সম্পর্কে আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি পলিসি তৈরি করে। তারা আমেরিকার ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করে যাতে আমেরিকার উন্নতি ও কর্ম স্বাধীনতা প্রভাবিত হয়। লেখক বিশ্লেষণ করে দলীল-প্রমাণের আলোকে বলেছেন, ঠাণ্ডা লড়াইয়ের পর থেকে ইসরাঈল আমেরিকার জন্য ইসলামকে আগামীর বিপদ ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রয়াস চালিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণে সফলকাম হয়েছে।
মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন পাশ্চাত্যপন্থী সরকারও আমেরিকার ইসলাম বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাবকে শক্তিশালী করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। যেমন-আলজেরিয়া, মিসর, তিউনিসিয়া, তুরস্ক, জর্ডান ও পাকিস্তান। এসব দেশের সরকারগুলো সর্বদা মার্কিন নেতৃত্বকে পাশ্চাত্যের আসন্ন বিপদ ইসলামী মৌলবাদ সম্পর্কে অবহিত করতে ব্যতিব্যস্ত থাকে। পাশাপাশি এই কল্পিত বিপদ নির্মূল করার জন্য তারা আমেরিকার দক্ষিণ হস্তের ভূমিকা পালন করে।
গ্যারজেস তার গ্রন্থে বলেছেন, ক্লিন্টন প্রশাসন ইসলামের যুদ্ধংদেহী শ্রেণী ও সমঝোতাপ্রিয় শ্রেণীর মাঝে সমন্বয় সাধন এবং ভারসাম্য সৃষ্টির অতি দুর্বল প্রয়াস চালিয়েছিল। তারা ইসলামপন্থীদের সাথে কথাও বলেছে, কিন্তু আলজেরিয়া, মিসর, তুরস্ক, ইরান ও সুদান সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ ও নিজেদের একা হয়ে পড়ার ভয়ে আমেরিকা আর সামনে অগ্রসর হয়নি। অপরদিকে খোদ ইসরাঈলী লবি এই উদ্যোগকে নিজেদের জন্য বিপদ মনে করে বসে। তাও এমন ভয়ানক বিপদ যে, একে চিরতরে নির্মূল করার জন্য তারা পরিকল্পনা তৈরি করে ফেলে। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার নাটক সেই পরিকল্পনারই বাস্তবায়ন। কারণ, মার্কিন পলিসি মেকার ইহুদীদের বিশ্বাস ছিল এবং এখনো আছে, যদি মুসলিম দেশগুলোতে ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় এসে যায় তাহলে তারা ইসরাঈলকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে এবং পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে তেলের অস্ত্র প্রয়োগ করবে। তেলের পয়সা দিয়ে ভয়ানক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র তৈরি করবে, যাতে ইসরাঈল ভয়াবহ বিপদ ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। (দেখুন, মাসিক তরজুমানুল কুরআন, লাহোর, মার্চ-২০০০ সংখ্যা, নিবন্ধ-আমেরিকা এবং ইসলামী আন্দোলনসমূহ)
এই বিপদের ওপর বাঁধ নির্মাণ, বরং তার উৎস পুরোপুরি শুষ্ক করে দেয়ার জন্য ইহুদীরা যে পরিকল্পনা তৈরি করেছে, সেটা তারা মার্কিন শক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছে। ইহুদীদের একমাত্র ভয় ও বিপদ হলো ইসলামী ফান্ডামেন্টালিজম বা মৌলবাদ। এজন্য ইহুদীরা আমেরিকা ও তার মাধ্যমে গোটা দুনিয়ার মন-মস্তিষ্কে ও মগজে একথা ঢুকিয়ে দিয়েছে, শান্তি ও নিরাপত্তাপ্রিয় পৃথিবীর আসল বিপদ ও ভয়ের কারণ হলো ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ। যতদিন পর্যন্ত মুসলমানরা তাদের দীনী শিক্ষা অর্জন করতে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত তাদের থেকে মৌলবাদীই তৈরি হতে থাকবে, যারা মার্কিন কালচার তথা পাশ্চাত্য সভ্যতা-সংস্কৃতিকে ঘৃণা করবে। এই ঘৃণা বিদ্বেষের মূল উৎস
কুরআন। এই কুরআন পড়া দ্বারা তাদের সন্ত্রাসী মনোভাব এবং ইহুদী ও খৃস্টানদের সাথে শত্রুতার চেতনা সৃষ্টি হয়। ইহুদীদের এই ইসলাম রিদ্বেষী প্রচার-প্রোপাগান্ডা গোটা দুনিয়ায় এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসলামী দেশগুলোও আজ তা দ্বারা প্রভাবিত। ৫ সুতরাং ইহুদীদের ভয় হলো যতদিন পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ কুরআন পড়তে থাকবে ততদিন পর্যন্ত গোটা দুনিয়ার জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে ঘৃণা বিদ্বেষ অব্যাহত থাকবে। ঘৃণা, বিদ্বেষ ও শত্রুতার এই প্রাচীর স্থায়ীভাবে গুঁড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন। আর এটা তখনই সম্ভব যখন মুসলমানদের দীনী শিক্ষার প্রবাহিত ঝরনা শুষ্ক করে দেয়া হবে। তাদের দীনী শিক্ষার এই মৌলিক বাধাকে নির্মূল করে দিলেই ইসলামের সর্বশেষ দুর্গ দীন ইসলামকে নির্মূল করা সম্ভব হবে। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্য সর্বপ্রথম ইহুদীরা মিসর ও ইসরাঈলের মাঝে সমঝোতা করায়। অতঃপর উভয় দেশের মধ্যকার সম্পর্ক দৃঢ় ও সুসংহত করার লক্ষ্যে একতরফা মিসরের নিকট দাবী করল, মিসরের শিক্ষা সিলেবাস থেকে এমন সব মৌলিক দীনী আকীদা-বিশ্বাস ও নৈতিক শিক্ষা বাদ দিতে হবে, যা উভয় দেশের মধ্যকার সম্পর্ক মজবুত ও সুসংহত হওয়ার পথে অন্তরায়। সাবেক ইসরাঈলী প্রধানমন্ত্রী মানাহেম বেগান মিসর সফরকালে মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনওয়ার সাদাতকে বলেছিলেন, ইসরাঈল ও মিসরের মধ্যকার সুসম্পর্ক কিভাবে মজবুত ও সুসংহত হবে, অথচ মিসরী নাগরিক কুরআনের আয়াত পড়ছে যাতে ইসরাঈলের নিন্দা করা হয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে, 'বনী ইসরাঈলের মধ্যে যারা কাফির, তাদের দাউদ ও মারইয়ামতনয় ঈসার মুখে অভিসম্পাত করা হয়েছে। এটা এ কারণে, তারা অবাধ্যতা করত এবং সীমালংঘন করত। তারা পরস্পরকে মন্দ কাজে নিষেধ করত না, যা তারা করত। তারা যা করত তা অবশ্যই মন্দ ছিল।'
আনওয়ার সাদাত সাথে সাথে মিসরের শিক্ষামন্ত্রীকে নির্দেশ দিলেন, সিলেবাসের ওপর পুনর্দৃষ্টি দেয়া হোক এবং এ জন্য একটি কমিটিও গঠন করে দেন, আমেরিকা, ইসরাইল ও মিসরের শিক্ষাবিদদের যে কমিটির সদস্য করা হয়েছে। তাদের কাজ বর্তমান সিলেবাস পর্যালোচনা করে একটি সুপারিশ পেশ করবে, যার আলোকে এমন একটি নতুন সিলেবাস প্রণয়ন করা হবে যা হবে সেক্যুলার ধর্মহীন। মুসলিম বিশ্বের দীনী শিক্ষা নির্মূল করার জন্য আমেরিকা মুসলিম বিশ্বকে সাহায্য দিতে শর্তারোপ করল, যেসব মুসলিম ও আরব দেশ তাদের শিক্ষা সিলেবাস পরিবর্তন করে যুগের চাহিদার সাথে সমন্বয় করবে তাদেরই কেবল সাহায্য দেয়া হবে। সেমতে মিসর এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করলে তাকে ১৯৮১ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ১৮৫ মিলিয়ন ডলার সাহায্য কেবল শিক্ষার উন্নয়নের জন্যই দেয়া হয়েছে। এছাড়াও ১৮০ মিলিয়ন ডলার বিভিন্ন প্রশিক্ষণের জন্য, ৬০ মিলিয়ন ডলার নারী শিক্ষা উন্নয়নের জন্য এবং ৫২ লাখ ডলার
নারীদের কল্যাণ ও চিকিৎসা খাতে দেয়া হয়েছে। মিসর ছাড়া পাকিস্তান এবং ভারতকে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলার সাহায্য দেয়া হয়েছে। ইয়ামান ও জর্ডান স্বীকার করেছে, শিক্ষা খাতের উন্নয়নের নামে ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফান্ড-আই.এম.এফ থেকে তাদের বার্ষিক সাহায্য দেয়া হয়। মিসরের এক মন্ত্রী ড. আমর মূসাও সিলেবাস পরিবর্তন সমর্থন করে বলেন, এখন সময় এসেছে মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর, যাতেকরে আরব-ইসরাঈলের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কারণ নির্মূল হয়ে যায়।'
তেলআবিবে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। তাতে মিসরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা খলীল এবং জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব ড. বুট্রোস ঘালি অংশ গ্রহণ করেছিলেন। সেমিনারের বিষয় ছিল 'আরব-ইসরাঈল সম্পর্কের স্থায়িত্বে কুরআনের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া'। উক্ত সেমিনারে ইসরাঈলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মানাহেম বেগান পরিষ্কার দাবী করেন, 'ওই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করে দেয়া হোক যেখানে কুরআন পড়ানো হয়।'
শিক্ষার ক্ষেত্রে ইসরাঈল ও আমেরিকার বিধি-নিষেধ মিসর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় উভয় সিলেবাসে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সি.আই.এ-এর পরিচালক ও মার্কিন কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধি দল শায়খুল আযহারের সাথে সাক্ষাত শেষে যৌথ বিবৃতিতে বলেন, আল আযহারের সিলেবাসে সংস্কার এবং যুগ চাহিদার সাথে এর সমন্বয়ের কাজ চলছে। পাকিস্তানে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ নাস্তিক কামাল পাশা আতাতুর্কের ভূমিকা পালনের প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এ জন্যই তার প্রতি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পূর্ণ সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। পাকিস্তানের শিক্ষা সিলেবাসে পরিবর্তন আনার জন্য আগা খাঁ বোর্ড এবং সকল পরীক্ষা আগা খাঁ ইউনিভার্সিটির নিকট সোপর্দ করা হয়েছে। পাকিস্তানে খৃস্টান মিশনারী পরিচালিত এফ সি কলেজ ইউনিভার্সিটির সনদ পেয়ে গেছে, যেটা আমেরিকান ইউনিভার্সিটির সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে। (দৈনিক জং, মার্চ-২০০৪)
ভারতে তো স্বাধীনতার পর থেকেই মুসলমানদের ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির ছাঁচে ঢালার জন্য নিরন্তর প্রয়াস চলছে। আমেরিকা ও ইসরাঈলের সহযোগিতায় সেখানে শারীরিক ও সাংস্কৃতিক বংশহত্যা চলছে। ভারতের মাদরাসাগুলোকে সন্ত্রাসের আড্ডাখানা প্রমাণ করার জন্য ভারতীয় মিডিয়া ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছে। ভারত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সেখানকার মিডিয়া উলঙ্গ হয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছে। বিশ্বকে সন্ত্রাসবাদের শিক্ষা না দেয়ার সবক প্রদানকারীদের অবস্থা হচ্ছে, খোদ আমেরিকা, ইসরাঈল ও ভারতের শিক্ষা কারিকুলাম সম্পূর্ণ ধর্মীয় গোঁড়ামিপনা ও মুসলিম দুশমনীর ওপর প্রণীত। উদাহরণস্বরূপ সন্ত্রাসীদের সবচে' বড় শয়তান ইসরাঈলের শিক্ষা কারিকুলাম পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণ করলে জানা যায়, তাদের সিলেবাসের ৪২ জায়গায় আরবদের চোর, ডাকাত ও বদমাইশ, বলা হয়েছে। ৭০ জায়গায় সন্ত্রাসী, ৩০ জায়গায় বিপর্যয় সৃষ্টিকারী, ৭০ জায়গায় হত্যাকারী, ২৭ জায়গায়
মানবতার শিকারী, ৩১ জায়গায় বিমান অপহরণকারী, ১৪১ জায়গায় লুণ্ঠনকারী ও খিয়ানতকারী, ৭০ জায়গায় গাছপালা ও ফসল বিনষ্টকারী এবং ১৮১ জায়গায় পাষাণ হৃদয়ের অধিকারী আখ্যা দেয়া হয়েছে। এক ইসরাঈলী প্রফেসর কৌহিন-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ানো হয় হিব্রু ভাষার এমন এক পুস্তক পর্যালোচনা করে বলেন, সাধারণত ৭৫% ইহুদী শিশুদের শৈশবকালেই এই বিশ্বাস জন্মে যে, আরবরা হত্যাকারী ও শিশু অপহরণকারী। ভারতের হিন্দু শিশুদেরও মুসলমানদের সম্পর্কে কমবেশি একই প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে। তারা প্রতিটি মুসলমান সম্পর্কে এই ধারণা পোষণ করে, মুসলমানরা নিজেদের কাছে ছুরি রাখে এবং হিন্দুদের হত্যা করে। আমেরিকা তার আসন্ন এ সকল বিপদ অংকুরেই নির্মূল করার জন্য নিজের নাক কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ৬
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি যদি ভালোভাবে বিশ্লষণ করা হয়, তাহলে একথা দ্বিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এর পেছনে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে যার ভিত্তিতে হামলাকারীরা তাদের শত্রুদের নির্মূলের জন্য খোদ নিজেদের হাতে নিজেদের নাক কেটেছিল। আমেরিকার সৃষ্টি ইসরাঈল তার পদাঙ্ক অনুসরণকারী দেশগুলোকে সর্বদা একই কৌশল বাতলে চলেছে। ভারতও কয়েকবার তার নিজের হাতে নিজের নাক সফলভাবে কেটেছে। এটা ভিন্ন কথা, এই বাণিজ্যে শুধু গুজরাত ট্রাজেডি ছাড়া তার আশানুরূপ মুনাফা অর্জিত হয়নি।
টিকাঃ
১. মি. বুকানন তিন বার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হয়ে তিন বারই বিফল হয়েছেন।
২. এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নিঃসন্দেহভাবে প্রমাণিত হয়েছে, সামাজিক উন্নতির জন্য স্থায়ী অটুট পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবন অবশ্যই প্রয়োজন। গবেষণা দলীল-প্রমাণের আলোকে বলেছে, প্রকৃতিগত পারিবারিক বন্ধন সন্তানদের সামগ্রিক কল্যাণের পথ দেখায়। তন্মধ্যে শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা, উত্তম চেতনা, শারীরিক সুস্থতা, শৈশবকালে বালিকাদের যৌন সম্পর্ক ও যৌন বিপথগামিতা থেকে দূরে থাকা ইত্যাদি। আমেরিকায় পঞ্চাশ শতাংশ শিশু পিতা-মাতার বাড়ীতে শুধু মায়ের নিকট অসহায় দারিদ্রের জীবন যাপন করছে, আর দশ শতাংশ শিশু পিতা-মাতার ঘরে অসহায়ের চেয়েও অসহায়ের জীবন যাপন করছে। জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা বলেন, এক বৈজ্ঞানিক জরিপে জানা গেছে, বৈধ যৌন সম্পর্কের তুলনায় অবৈধ যৌন সম্পর্ক শারীরিক ও যৌন উভয় দিক দিয়ে বেশি ক্ষতিকর। এমন যৌন সম্পর্কের ফলে যেসব সন্তান জন্ম গ্রহণ করে তাদের অবস্থা আরো ভয়াবহ। ইউরোপ-আমেরিকায় ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সের প্রায় অধিকাংশ ছেলে-মেয়ে বিবাহ ছাড়াই যৌন সম্পর্কে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে এবং এ ধরনের জীবনই তারা বেশি পছন্দ করে। পূর্ব ইউরোপে এমন লোকের হার ৪০ থেকে ৯০ শতাংশ। তাদের হাজারে মাত্র ৩৬ শতাংশ লোক বিবাহ করে। ১৯৯৬ সালের এক জরিপ থেকে জানা যায়, ৭৫ শতাংশ অবিবাহিত বালিকা গর্ভপাত করে। সরকার দুই লাখ আইনগত গর্ভপাতকারীদের জন্য ৫৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। ৭৫% বিবাহিত নারী গর্ভপাত ঘটায়। তন্মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ শ্বেতাঙ্গ নারী, যাদের দুই তৃতীয়াংশের বয়স ১৫ থেকে ২৪-এর মাঝামাঝি।
৩. জনসংখ্যা কমতির মৌলিক কারণসমূহের একটি হচ্ছে নেশাকর দ্রব্যের অভ্যাস। সর্বসাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমেরিকায় পঁয়ত্রিশ লাখ লোক এমন রয়েছে, যারা সন্তান প্রজননের ক্ষমতা বঞ্চিত।
৪. সাম্প্রতিককালে মার্কিন অর্থনীতির দুর্দিন আরো চরম আকার ধারণ করেছে। সে দেশের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশও শেষ পর্যন্ত এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার সহযোগী ধনী দেশগুলোর অর্থনীতিতে একের পর এক বিপর্যয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যর্থতাই স্পষ্ট করে তুলেছে। এসব দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট চরম আকার ধারণ করায় দেউলিয়া হয়ে পড়ছে একের পর এক বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ব্যাংক, বীমা, লিজিং, গৃহায়ন খাতসহ পুরো মার্কিন অর্থনীতিই এখন পতনের মুখে। আর সেই ঢেউ লেগেছে ইউরোপ, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়ার পুঁজিবাদী দেশগুলোতে। তথাকথিত অবাধ মুক্তবাজার ব্যবস্থা ও পুঁজিবাদ যে কোন দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীল সমাধান নয়-সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে তা ক্রমেই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের ভূমিকা সঙ্কুচিত করে ব্যক্তিখাতকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর ওপর দাঁড় করানোর পুঁজিবাদী ফর্মূলা যে কতোটা ভঙ্গুর- মার্কিন মুলুকে একের পর এক বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তাও এখন প্রমাণিত।
গত কয়েক বছর ধরেই বিশ্ব পুঁজিবাদের রক্ষক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে একের পর এক সঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে। ছোট-বড় অনেক সঙ্কট মিলিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অরাজক পরিস্থিতি। করপোরেট কেলেঙ্কারি, বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি এবং গৃহায়ন খাতে চরম বিপর্যয় মিলিয়ে 'মহামন্দা'র মুখে পড়েছে মার্কিন অর্থনীতি। আর মন্দার ধাক্কায় দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে একের পর এক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বিনিয়োগকারী ব্যাংক লিম্যান ব্রাদার্স দেউলিয়া হয়ে গেছে। গৃহঋণ বাজারে ধস নামার ফলে লিম্যান ব্রাদার্সের কোটি কোটি ডলার ক্ষতি হয়। এতে কোম্পানীটি নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে। দ্বিতীয় আরেকটি ব্যাংক মেরিল লিনচ দেউলিয়াত্ব থেকে বাঁচতে ব্যাংক অব আমেরিকার দ্বারস্থ হয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে তিনটি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। একই অবস্থার মুখে পড়েছে বিশ্বের বৃহত্তম বীমা কোম্পানী এধাইজি। সর্বশেষ ফটকাবাজির আর্থিক দানব গোল্ডম্যান স্যাক্স ও মর্গ্যান স্ট্যানলি বিনিয়োগ ব্যাংকের স্ট্যাটাস পরিবর্তন করে হোল্ডিং কোম্পানীতে পরিণত হয়েছে।
সারা দুনিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মন্দা ও প্রবৃদ্ধির নিম্নগতির প্রভাব পড়েছে সে দেশের খেটে খাওয়া মানুষের ওপর। কারণ মন্দার কারণে একের পর এক শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো অন্য দেশের বৃহৎ পুঁজিপতিরা কিনে নিচ্ছে। সব মিলিয়ে কাজ হারাচ্ছে হাজার হাজার আমেরিকান শ্রমিক। বাড়ছে বেকারত্ব। শুধু চলতি বছরের ৯ মাসেই প্রায় ৫ লাখ মার্কিন নাগরিক বেকার হয়ে গেছেন বলে পরিসংখ্যানে দেখা গেছে। ১৯২৯ সালের মহামন্দার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এতো বড় অর্থনৈতিক সঙ্কট আর কখনো দেখা যায়নি বলে মত দিয়েছেন বিশ্লষকরা। এসব কিছু বলে দিচ্ছে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংসের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। তার গমন পথের একেবারে শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে।- অনুবাদক
৫. কিছু আরব দেশের ইসলাম বিদ্বেষ এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে, অন্য দেশ থেকে আগত কোনো ব্যক্তির নিকট যদি কুরআন শরীফের কোনো কপি পাওয়া যায় তাহলে একথা বলে তা জব্দ করে নেয়া হয়, এ গ্রন্থ পড়লে সন্ত্রাসী মনোভাব সৃষ্টি হয়। এমনকি এখন তো দাড়ি রাখাও অপরাধ হয়ে গেছে। দাড়িওয়ালা কোনো ব্যক্তি সেসব দেশে প্রবেশ করলেই তাকে সন্ত্রাসী বলে গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
৬. আরবী ভাষায় একটি বিখ্যাত প্রবাদ আছে, যার সারমর্ম হচ্ছে, 'কাসির যে নিজের নাক নিজেই কেটেছে, নিশ্চয়ই এর কোনো একটা কারণ তো আছে।' এ প্রবাদের পটভূমি হচ্ছে, এক বাদশাহ আরেক বাদশাহর ওপর হামলা চালিয়ে তাকে পরাজিত করে। বিজয়ী বাদশাহ বিজিত বাদশাহ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশে তার উপদেষ্টাদের পরামর্শ চায়। উপদেষ্টারা সবাই প্রতিশোধ গ্রহণের চক্করে না পড়ার পরামর্শ দেয়, কিন্তু এক প্রাজ্ঞ বুদ্ধিমান উযীর একাকিত্বে পরামর্শ দিল, আমি আপনাকে দুশমনের ওপর হামলা না করার পরামর্শ দিয়েছি, এ অভিযোগে ভরা দরবারে আপনি আমাকে অপমান করবেন। অতঃপর আমার নাক কান কেটে এমন এক জায়গায় আমাকে ফেলে রাখবেন, যেখান দিয়ে দুশমনের কাফেলা পথ অতিক্রম করে। অতএব দুশমনের কাফেলা সেখান দিয়ে পথ অতিক্রমকালে দেখতে পেল, যে ব্যক্তি বাদশাহর দরবারে অতি প্রিয়জন ছিল, তার নাক কান কেটে ফেলা হয়েছে। নিজের হাতে নাক কান কাটা ব্যক্তির সাথে কী আচরণ করা যায়, বাদশাহ তার উপদেষ্টাদের কাছে পরামর্শ চাইলে সবাই পরামর্শ দিল, তার সাথে সহমর্মিতার আচরণ করা হোক। এক উযীর বিরোধীতা করে বলল, বাদশাহর এমন ব্যক্তি থেকে সতর্ক থাকা উচিত, যে নিজের নাক কান নিজেই কেটেছে, অবশ্যই এর কোনো একটা কারণ আছে। বাদশাহ তার বিরোধীতা সত্ত্বেও নাক কান কাটা ব্যক্তিকে নিজের প্রিয়জন বানিয়ে নিলেন। শেষ পর্যন্ত সে ধোকা দিয়ে গোপনে পালিয়ে গিয়ে তার বাদশাহর কাছে সকল রহস্য ফাঁস করে দিল। অতঃপর বাদশাহ অতর্কিত হামলা চালিয়ে দুশমনকে নির্মূল করে দিলেন।
📄 ১১ই সেপ্টেম্বরের নাটক
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যমান বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠন ও মিলিশিয়ার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞগণ ওয়াশিংটন ও পেন্টাগনের ওপর হামলার ধরন দেখে সাথে সাথে এ কথা প্রত্যাখ্যান করেছেন যে, 'এর পেছনে আল কায়দা ও ওসামা বিন লাদেনের হাত রয়েছে', কিন্তু ইহুদী নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব মিডিয়া এ ধরনের কোনো বক্তব্য বিবৃতি ও কোনো তদন্ত রিপোর্টই বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ হতে দেয়নি। অনেক মুসলিম চিন্তাবিদ, গবেষক ও সাংবাদিক বাস্তবতার আলোকে বার বার একথা বলেছেন, ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলার জন্য যে অসাধারণ দক্ষতা, উপকরণ ও মেধা প্রতিভা দরকার, ওসামা বিন লাদেন ও আল-কায়দার নিকট তা নেই, কিন্তু এ চিৎকার নিরব-নিভৃত মরু সাহারায় অসহায়ের রোদন ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রবাদ আছে, দরবেশের চিৎকার কে শোনে।
দুনিয়ার সকল মানুষের বিশেষ করে মুসলমানদের সেসব ফরাসী ও মার্কিন স্কলার গবেষকদের শুকরিয়া আদায় করা উচিত, যাঁরা সকল বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে এমন সুদৃঢ় দলীল-প্রমাণ একত্রিত করার প্রয়াস পেয়েছেন, যেগুলো দ্বারা আলোকিত দিবসের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, স্মরণকালের এই ভয়াবহ হামলার পেছনে আর কারো নয়, খোদ মার্কিনী এবং ইহুদীদেরই হাত রয়েছে। যেমন-২০০৬ সালের ৭ই সেপ্টেম্বরের টাইমস অফ ইন্ডিয়া লন্ডন থেকে প্রকাশিত দৈনিক অবজার্ভারের বরাত দিয়ে লেখেছে, ৭৫ জন মার্কিন গবেষক, চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীর বর্ণনার আলোকে একথা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়, এই নাটক হোয়াইট হাউসের তৈরি। আমেরিকার বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির ৭৫ জন প্রফেসর পাঁচ বছরব্যাপী অনুসন্ধানের পর যে রিপোর্ট দিয়েছেন তাতে বলা হয়েছে, এ দুর্ঘটনা এমন একটি ষড়যন্ত্র, যাতে মার্কিন গোঁড়া রাজনীতিক, শাসক ও প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন শামিল রয়েছে। এর উদ্দেশ্য প্রথমে আফগানিস্তান, অতঃপর ইরাক, সর্বশেষ ইরানের ওপর হামলার বৈধতা সরবরাহ করা যাতে ইসলামী বিশ্বকে সহজেই পদানত করা যায়।
এই বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে এক মার্কিন বিত্তশালী জিমি ওয়াল্টার দশ লাখ ডলারের পুরষ্কার ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, কেউ যদি এটা প্রমাণ করতে পারে, ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলায় বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার করা হয়নি, তাহলে তাকে দশ লাখ ডলার পুরস্কার দেয়া হবে। জিমি ওয়াল্টার দাবী করেন, বিল্ডিং ভাঙ্গার কারণ বিমানের আঘাত নয়; বরং বিল্ডিংয়ের ভেতরে শক্তিশালী বিস্ফোরক দ্রব্য রাখা ছিল। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার মাত্র ষাট সেকেন্ডে বিধ্বস্ত হয়েছে। কোনো সাংবাদিককে বিল্ডিংয়ের ধ্বংসাবশেষের কাছে যেতে দেয়া হয়নি। মাত্র তিন দিনে সকল ধ্বংসাবশেষ সেখান থেকে দূরে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এই হামলার পর পাশ্চাত্যের সকল মিডিয়া মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে এবং মার্কিন সরকার আমেরিকায় বসবাসকারী মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রোপাগান্ডা শুরু করে দেয়। যে ব্যক্তিই ইহুদী লবির এ ভয়ানক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস করেছে, সমগ্র পাশ্চাত্য মিডিয়া তার বিরুদ্ধেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে; বরং অসাধারণ দ্রুততার সাথে বুশ প্রশাসনের সকল মেশিনারী তার মত প্রকাশের স্বাধীনতা গলা টিপে হত্যা করেছে। এত শক্তিশালী দলীল-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমা মিডিয়া সেই একই পুরাতন রাগিনী অব্যাহত রেখেছে- নাইন-ইলেভেনের পেছনে আল-কায়দা ও তার নেতা ওসামা বিন লাদেনের হাত রয়েছে। ১১ই সেপ্টেম্বরের টুইন টাওয়ার ধ্বংস নাটক যে স্বয়ং আমেরিকার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, এ সম্পর্কে আমরা পাকিস্তানের করাচী থেকে প্রকাশিত দৈনিক জাসারত' পত্রিকার সমীক্ষা রিপোর্ট এখানে পেশ করছি।
📄 ১১ই সেপ্টেম্বরের নাটক খোদ আমেরিকার তৈরি
মার্কিন ইউনিভার্সিটির এক বিখ্যাত অধ্যাপক ড. স্টিভেন জোন্সকে বাধ্যতামূলক অবসর দিয়ে দেয়া হয়েছে। তাঁর 'ধপরাধ', তিনি প্রমাণ করেছেন, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ভবন শুধু বিমানের আঘাতে আগুন লাগায় ধ্বংস হতে পারে না; বরং এটা তখনই সম্ভব যখন ভেতর থেকে কোনো বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটানো হবে। প্রফেসর স্টিভেন দলীল-প্রমাণের আলোকে এ সত্য প্রমাণ করে দিয়েছেন, বাস্তবে এমনই হয়েছে, কিন্তু মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন প্রবক্তা তারই এক প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিজীবীর গবেষণা ও বিশ্লেষণ হজম করতে পারেনি। ফলে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি এ সংবাদও এসেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কমবেশি ৩০ শতাংশ লোক মনে করে, ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার পেছনে খোদ আমেরিকান সরকারের হাত রয়েছে। এসব প্রেক্ষিত ও ঘটনাবলী থেকে অনুমিত হয়, ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে পাশ্চাত্য মেধা মননের আরেকটি গভীর ষড়যন্ত্র এবং সভ্যতাসমূহের সে চূড়ান্ত সংঘাত, যা সূচিত হয়েছিল ক্রুসেড যুদ্ধ থেকে। এর মাঝের দীর্ঘ দুইশ' বছরের ঔপনিবেশিক যুগ তার বড় নিদর্শন। আবার ক্রুসেড যুদ্ধের নতুন শিরোনামে ইসলামী বিশ্বের পরিধিকে সংকীর্ণ করে তোলা হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিডিয়ার শক্তিশালী অপপ্রচার সত্ত্বেও যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ মনে করে, ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার পেছনে মার্কিন নির্বাহী বিভাগের হাত রয়েছে, তাহলে এটা সাধারণ কথা নয়। কারণ মার্কিন নাগরিকরা স্বচক্ষে ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। এত বড় ব্যর্থতা সত্ত্বেও দেশের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বে সংশ্লিষ্ট কোনো' ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি এবং এ ঘটনার জন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকেও তার পদ থেকে অপসারণ করা হয়নি। অথচ এত বড় ঘটনার পর তো শত শত ব্যক্তির অপসারিত হওয়ার কথা ছিল।
মার্কিনীরা আরো দেখেছে, কিভাবে বুশ প্রশাসন এই ঘটনার পর ভয়কে পলিসিতে রূপান্তর করে শুধু আমেরিকাতেই নয়; বরং সমগ্র পাশ্চাত্য জগতের মুসলমানদের কণ্ঠ রোধ করা হচ্ছে। বুশ প্রশাসনের দৃষ্টিতে মার্কিন প্রফেসরের গবেষণা ভুল, কিন্তু তার জবাবী গবেষণাও তো পেশ করা যেত, কিন্তু তা না করে উল্টো প্রফেসরের মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর পরিষ্কার অর্থ হলো, মার্কিন সরকার ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনাকে একটি 'পবিত্র আকীদা'র মর্যাদা দিয়েছে। যেমনিভাবে পাশ্চাত্যে হলোকাস্ট সম্পর্কে কোনো কথা বলা যায় না, তদ্রূপ ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার ব্যাপারেও কোনো প্রশ্ন তোলা যেতে পারে না। এ পরিস্থিতি মার্কিন সরকারের দুর্বল অবস্থানের দর্পণ। প্রাণহানির দিক থেকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ১১ই সেপ্টেম্বর একটি অতি সাধারণ ঘটনা ছিল। কারণ ১১ই সেপ্টেম্বরে যে পরিমাণ লোক হতাহত হয়েছে, সে পরিমাণ মুসলমান তো আমেরিকা ও তার জোট বাহিনী এক সপ্তাহেই হত্যা করে। আমেরিকা, বৃটেন ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশ ইরাকের ওপর যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, তার করণে শুধু এক বছরে দশ লাখ লোক খাদ্য ও ওষুধের অভাবে মারা গেছে। তার মধ্যে পাঁচ লাখ শিশুও অন্তর্ভুক্ত ছিল, কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়া এই দশ লাখ লোকের ধ্বংস হওয়ার
কথা কোনো দিনই উল্লেখ করেনি। অবশ্য তারা শুধু আড়াই কিংবা পৌনে তিন হাজার লোকের কথা গোটা দুনিয়ার মনস্তত্ত্বের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার আড়ালে আমেরিকা ও তার মিত্র জোট দিনরাত ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের দুর্ভাগ্য, এ ষড়যন্ত্রে মুসলিম বিশ্বের কোনো কোনো শাসকও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এখন তো সরাসরি মুসলমানদের দীন ও আকীদা এ ষড়যন্ত্রের কবলে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে গোটা ইসলামী বিশ্ব অস্থির চঞ্চল, কিন্তু এখন পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ এই আগ্রাসনের সামনে প্রতিরোধ প্রাচীর দাঁড় করাতে সক্ষম হয়নি। মুসলিম উম্মাহর এখন প্রয়োজন এই ষড়যন্ত্রকে তার প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি, ঐতিহাসিক ও সভ্যতা-সংস্কৃতির আলোকে বুঝা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ও কার্যত সর্বদিক দিয়ে তার মোকাবেলা করা। পাঁচ বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে এ বাস্তবতাও মুসলিম উম্মাহর সামনে উন্মোচিত হয়েছে যে, মুসলিম উম্মাহর আসল সমস্যা আমেরিকা ও পাশ্চাত্য নয়; বরং তাদের আসল সমস্যা পাশ্চাত্যের দোসর, দালাল, উচ্ছিষ্টভোগী, সুবিধাভোগী, তল্পীবাহক, ক্রীড়নক মুসলিম শাসকবর্গ, যাদের মাধ্যমে পাশ্চাত্য মুসলিম উম্মাহর আকীদা-বিশ্বাস ও মূল্যবোধ পদদলিত করছে। এই শয়তান শাসকবর্গ যদি না থাকত তাহলে পাশ্চাত্যের প্রতিটি চ্যালেঞ্জের জবাব দেয়ার ক্ষমতা মুসলিম উম্মাহর পূর্ণ মাত্রায়ই রয়েছে। মুসলিম উম্মাহর কোনো কিছুরই কমতি নেই। যে দিন মুসলিম উম্মাহ আমেরিকা ও পাশ্চাত্যের দেশীয় এজেন্টদের কবল থেকে মুক্তি পাবে, সেদিন হবে মুসলিম উম্মাহর প্রকৃত স্বাধীনতার দিন। খ্যাতিমান ফরাসী লেখক ও প্রসিদ্ধ গবেষক ড. ট্রি মিশন-এর 'ভয়ানক মিথ্যা, ভয়ানক ফ্রড' নামে একটি গ্রন্থ সম্প্রতি বাজারে এসেছে। বাজারে আসার মাত্র দুই ঘন্টার মাথায় তার প্রথম সংস্করণ নিঃশেষ হয়ে যায়। উক্ত গ্রন্থে লেখক যেসব দলীল-প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন তার আলোকে যে কেউ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হবে যে, ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার ব্যাপারে আমেরিকা ও পশ্চিমা মিডিয়া যে প্রোপাগান্ডা করেছে এবং করে যাচ্ছে, তার শতভাগই মিথ্যা।
📄 ১১ই সেপ্টেম্বরের উদ্দেশ্য
ইতিহাসের সবচে' বড় মিথ্যা বা ১১ই সেপ্টেম্বর নাটকের মৌলিক উদ্দেশ্য হলো, ভূ-পৃষ্ঠকে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ থেকে মুক্ত করা। এ কারণেই পাশ্চাত্য এ যুদ্ধের নাম দিয়েছে ক্রুসেড যুদ্ধ। এ আগ্রাসনের মূল টার্গেট দীনী মাদরাসাগুলো, যা মুসলিম উম্মাহর সর্বশেষ দুর্গ; শক্তি ও অর্থের বলে এই দুর্গ গুঁড়িয়ে দেবার নিরন্তর প্রয়াস চলছে।
এই উদ্দেশ্যের দ্বিতীয় অংশ হচ্ছে, ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার আড়ালে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ প্রোপাগান্ডার পরিবেশ তৈরি করা, যার পুরো দায়িত্ব নিয়েছে ইহুদী মিডিয়া। যা পরিচালিত হচ্ছে সম্পূর্ণ পেন্টাগনের তত্ত্বাবধানে, কিন্তু মুসলিম উম্মাহর পক্ষে বিপক্ষে উভয় ধরনের সংবাদ পরিকল্পিতভাবে গোটা বিশ্বের সামনে প্রচার করা হচ্ছে। এই প্রচারণায় আল-কায়দা, তালেবান ও তাদের আধ্যাত্মিক নেতা ওসামা বিন লাদেনকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। মিডিয়াতে কখনো তাদের প্রশংসাও করা হচ্ছে, কিন্তুা 'কথা সত্য মতলব খারাপ' প্রবাদ অনুযায়ী তাদের প্রশংসার আড়ালে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষের আগুন প্রজ্বলিত করা
হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপ, আমেরিকা এবং তাদের কৌশলগত মিত্র ভারত ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে তাদের গোপন ঘৃণা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা কোন রাখঢাক ছাড়াই প্রকাশ্যে উন্মোচিত করে দিয়েছে। একথাই পবিত্র কুরআনের সূরা আলে ইমরানে অলংকারপূর্ণ ভাষায় ঘোষিত হয়েছে, 'শত্রুতাপ্রসূত বিদ্বেষ তাদের মুখ ফুটেই বের হয়ে যায়। আর যা কিছু তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে, তা আরো অনেকগুণ বেশি জঘন্য।'
১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার যে প্রতিক্রিয়া আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশে হয়েছে, তা সেসব বক্তৃতা-বিবৃতি দ্বারাই অনুমান করা যায়, যেসব বক্তৃতা-বিবৃতিতে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে কঠোর ঘৃণা-বিদ্বেষ, শত্রুতা, ক্রোধ ও প্রতিশোধ স্পৃহা প্রকাশ পেয়েছে।
০১. মানবতার শত্রু মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এই ঘটনাকে 'war on Civilaization-'সভ্যতার পক্ষে লড়াই' আখ্যা দিয়েছেন এবং কার্যত তিনি বিশ্বকে দুই ভাগে বিভক্ত করার জঘন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। এক. পাশ্চাত্য বিশ্ব, তথাকথিত সভ্য দুনিয়া। দুই. অন্যান্য বিশ্ব, ওদের ভাষায় যা অসভ্য ও বর্বর।
০২. সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনী ও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রামসফেল্ড কোন রাখঢাক ছাড়াই বলেছেন, আমাদের টার্গেট সেসব দেশকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া যারা সন্ত্রাসের বিকাশ ঘটাচ্ছে।
০৩. সাবেক সেক্রেটারী অফ স্টেট ডিপার্টমেন্ট লরেন্স এ্যাগেল বার্গ বলেন, এ ধরনের লোকদের সাথে লড়াইয়ের সূচনার এও একটা পদ্ধতি হতে পারে যে, প্রথমে তাদের কিছু লোককে নিঃশেষ করে দিতে হবে।
০৪. মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক পন্ডিত এবং ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, চিলি আর না জানি কত দেশের লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ নিষ্পাপ গণহত্যার নায়ক হেনরী কিসিঞ্জার বলেন, '১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার পেছনে বিন-লাদেনের হাত আছে যদিও এর কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই, কিন্তু তথাপি তার জড়িত থাকার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ সে আমেরিকার বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য আমাদের তার গোটা নেটওয়ার্কই নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। এমনকি মুসলিম বিশ্বের যেখানে যেখানে তার সমর্থক রয়েছে তাদেরও গুঁড়িয়ে দিতে হবে। আমি আশা করি, মার্কিন প্রশাসন এ বিষয়টি শেষ পর্যায়ে পৌঁছাবে। যেমন পার্ল হার্ভারের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত পৌছেছিল। এক কথায় ভূ-পৃষ্ঠ থেকে এই গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। এ লড়াইয়ে যদি বিশ্বের অন্যান্য দেশ আমেরিকাকে সমর্থন সহযোগিতা না করে তাহলে আমেরিকাকে একাই এ লড়াই চালিয়ে যেতে হবে এবং এর জন্য কোন পরামর্শ ও মতৈক্যের প্রয়োজন নেই।'
ওপরে যা কিছু উল্লিখিত হয়েছে তা তো আমেরিকার বড় দায়িত্বশীল এবং বুদ্ধিজীবীদের বক্তৃতা-বিবৃতির ধরন, সর্বসাধারণ পর্যায়ে যে পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে, নিম্নোক্ত উদাহরণসমূহ থেকে সেটা জানা যাবে।
০৫. ওয়াশিংটন পোস্টে জি রচ লোরি লেখেন, '১১ই সেপ্টেম্বরে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে তার জন্য আমরা যদি দামেশক, তেহরান বা অন্য কোন মুসলিম দেশের কিছুও
ধ্বংস করতে পারি তাহলে কিছুটা হলেও এর সমাধান হবে। কোনো দেরি ছাড়াই পাশ্চাত্যের উচিত, এই 'হারামীদের' হত্যা করা, চোখে গুলি মারা, টুকরো টুকরো করে দেয়া এবং বিষ দিয়ে হত্যা করা।'
০৬. নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ডেইলী নিউজে এক লেখিকার বক্তব্য, এখন এটা তদন্তের সময় নেই, এ ঘটনার সাথে ঠিক কোন্ কোন্ ব্যক্তি জড়িত; বরং দ্রুত তাদের নেতাদের হত্যা করা উচিত। আমরা হিটলার ও তার উচ্চ পদস্থ অফিসারদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে প্রচলিত বিধি-নিষেধের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করিনি; বরং আমরা জার্মানীর শহরসমূহের ওপর কার্পেট বোমা বর্ষণ এবং তাদের নাগরিকদের নির্বিচারে হত্যা করেছি। সেটাও যুদ্ধ ছিল, এটাও যুদ্ধ।
০৭. মার্কিন রাজনৈতিক পলিসির মুখপাত্র ন্যাশনাল রিভিউ'র এক সাংবাদিক রিচার ডেলোরী আরেকটু অগ্রসর হয়ে লেখেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন দেরি ছাড়া এখনই মক্কা মদীনার ওপর হামলা করা উচিত।
১১ই সেপ্টেম্বরের পর প্রোপাগান্ডা ও গুজবকে ভিত্তি বানিয়ে সুসংগঠিত ও সুপরিকল্পিতভাবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন স্বার্থে আঘাত আসার সন্দেহ সংশয় প্রকাশ করা হতে থাকে। ওসামা বিন লাদেনকে ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব আখ্যা দেয়ার জন্য নিত্যনতুন ধরন পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়। তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনা উপন্যাসের মতো বার বার ধরন পাল্টিয়ে প্রকাশ করা হয়। কখনো বলা হয়, আফগানিস্তানে বসে সে হাজার মাইল দূর থেকে মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানতে সক্ষম। কখনো বলা হয়, তার নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কখনো বলা হয়, তার সংগঠন আল-কায়দা এত শক্তিশালী ও সুসংগঠিত যে, ওরা মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপরও হামলা করতে সক্ষম। কখনো বলা হয়, মার্কিন পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হানার মতো সক্ষমতা তার সংগঠনের রয়েছে। কখনো বলা হয়, ওসামা বিন লাদেনের নিকট পারমাণবিক ও রাসায়নিক অস্ত্র রয়েছে। কখনো বলা হয়, ওসামাকে গ্রেফতার করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রামসফেল্ড তার অক্ষমতা প্রকাশ করে স্বীকার করেছেন, আমরা ওসামাকে কখনো গ্রেফতার করতে পারব না। এসব সংবাদ প্রচার প্রসারের মৌলিক উদ্দেশ্য হলো, যাতে একদিকে মার্কিন শত্রুরা আত্মতৃপ্তি ও আত্মপ্রশান্তিতে থাকে যে, আফগানিস্তানে কার্পেট বোমা বর্ষণ করলেও কোন সমস্যা নেই। আল-কায়দা ও তালেবান এর চেয়েও বেশি শক্তিশালী। অপরদিকে মার্কিন জনগণও যাতে বুঝে, আফগান শিশু, নারী ও অসুস্থরা আক্রান্ত হলেও শত্রু বিরাট শক্তিশালী।
আফগানিস্তানে হামলার আড়ালে ফিলিস্তিনে ইসরাঈলী গণহত্যা ধামাচাপা দেয়াও এর একটা উদ্দেশ্য ছিল। সে সময় এ্যানথ্রাকসের সংবাদ এমন নাটকীয়ভাবে প্রচার করা হয়, যাতে মার্কিন জনগণ ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার গভীরে না পৌঁছতে পারে এবং তদন্তের কোন দাবীও না ওঠে। ওসামা বিন লাদেনের পারমাণবিক শক্তি অর্জন করার ভিত্তিহীন সংবাদ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে একাধারে দুই মাস পর্যন্ত প্রচার করা হয়, যাতে
একে ভিত্তি বানিয়ে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের আণবিক শক্তি এবং তার ধ্বংসকারিতার ক্ষমতা সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। অপরদিকে সেসব ব্যক্তির দিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়, যারা পাকিস্তানের আণবিক শক্তি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। যাতে তাদের যে কোনো সুযোগে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেয়া যায়। ৭
১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনাকে পুঁজি করে ইউরোপ-আমেরিকায় বিশেষভাবে এবং গোটা বিশ্বে সাধারণভাবে কর্মতৎপর ও সক্রিয় মুসলিম দাঈ, দীন প্রচারক ও ইসলামী ব্যক্তিত্বদের গ্রেফতার, সক্রিয় ইসলামী সংগঠন-সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ, ইউরোপ, আমেরিকা ও অন্যান্য দেশে লেখাপড়ারত মুসলিম ছাত্রদের সেসব দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করা, কিংবা তাদের গ্রেফতার করে জেলে নিক্ষেপ করাও উদ্দেশ্য ছিল, যাতে তারা দ্বিতীয় বার সেসব দেশে যাওয়ার আর কল্পনাও না করে। এই ঘটনাকে বুনিয়াদ বানিয়ে মুসলমানদের অর্থনৈতিক শক্তি ধ্বংস করে দেয়া, অপরদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোকে এই পয়গام দেয়া, যদি তারা ওসামার মতো লোকদের পৃষ্ঠপোষকতা করে তাহলে তাদেরও পরিণাম হবে আফগানিস্তান এবং ইরাকের মতো।
১১ই সেপ্টেম্বরের নাটকের আরেকটি মৌলিক উদ্দেশ্য হলো, আফগানিস্তান ও ইরাক দখল করে মধ্য-এশিয়ার কাস্পিয়ান সাগর অঞ্চলও দখল করা। কারণ এসব অঞ্চল উপসাগরীয় দেশসমূহ থেকেও বেশি মূল্যবান প্রাকৃতিক গ্যাস, পেট্রোল, স্বর্ণ, রৌপ্য, ইস্পাত, মূল্যবান ধাতব পদার্থ ও খনিজ সম্পদে ভরপুর। এর মৌলিক ফায়দা এই হবে, উপসাগরীয় দেশগুলো পেট্রোলকে আর অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগ করতে পারবে না। দ্বিতীয় ফায়দা হবে, মধ্য-এশিয়ার মুসলমানদের দীনী চেতনা ও জাগরণের ওপর বাঁধ নির্মাণ করা। রাশিয়া ও চীন উভয় দেশ এ ক্ষেত্রে আমেরিকার সাথে রয়েছে। আফগানিস্তান দখল করার আরেকটি মৌলিক উদ্দেশ্য হলো, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার দীনী মাদরাসাগুলো চিরকালের জন্য নির্মূল করে দেয়া, যাতে তালেবানদের মতো আর কেউ আমেরিকার জন্য বিপদ হতে না পারে। আফগান মুজাহিদদের সাথে আমেরিকার সেনাবাহিনী যে জঘন্যতম অমানবিক আচরণ করছে, তা এই ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের একটি দিক, যার উদ্দেশ্য গোটা ইসলামী বিশ্বকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলা এবং অভ্যন্তরীণভাবে তাদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়া। ভারতের মুসলমানদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা সৃষ্টির জন্য গুজরাটে স্মরণকালের ভয়াবহ মুসলিম নিধন চালানো হয়েছে, যাতে ভারতের মুসলমানরা আর কখনো কোমর সোজা করে দাঁড়াতে না পারে। আমেরিকা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াই দীর্ঘ দিন জিইয়ে রাখতে চায়। এ জন্য মিডিয়ায় বার বার ওসামা বিন লাদেন ও তালেবানদের খবর
ফলাও করে প্রকাশ করা হচ্ছে, যাতে চলমান এই যুদ্ধের বৈধতা অব্যাহত থাকে। এক কথায় ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে নির্মূল করার জন্য আজ যত কিছু করা হচ্ছে এবং করা হবে, তার বৈধতার মূল পুঁজি ও বুনিয়াদ হলো ১১ই সেপ্টেম্বরের নাটক। এ জন্যই এ নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছিল। ১১ই সেপ্টেম্বরে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার নাটক ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে নয়া ক্রুসেডের সূচনা।
কিন্তু এত কিছু করা সত্ত্বেও তিক্ত বাস্তবতা হলো, আল্লাহ তাআলার সর্বশেষ দীন ইসলাম একটি চিরন্তন দীন। এ দীন আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। শত চেষ্টা করেও কেউ এ দীন নির্মূল করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা নিজে এর হেফাযতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমিই এই দীন নাযিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণ করব'। যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে এই দীন হেফাযতের প্রতিশ্রুতি না থাকত, তাহলে স্পেনেই এই দীন এবং তার অনুসারী মুসলমানরা দাফন হয়ে যেত কিংবা তাতারী আগ্রাসনের পর এই দীন আর জীবন্ত থাকত না। কারণ ইসলামের ইতিহাসে মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে তাতারী আগ্রাসনের চেয়ে বড় আর কোনো প্রচ ঝড় সৃষ্টি হয়নি। তাতারীদের মধ্যে পাহাড়কে স্বীয় জায়গা থেকে হটিয়ে দেয়ার শক্তি বিদ্যমান ছিল। শিক্ষিত সমাজ অবশ্যই জানেন, হিংস্র মঙ্গোলিয়ান তথা তাতারী সম্প্রদায় ইসলামী বিশ্বের ওপর হায়েনার ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এমন শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, যার প্রতিরোধ ছিল প্রায় অসম্ভব। যে সময় তারা ইসলামী বিশ্বের ওপর হামলা করে সে সময় পূর্ণ শক্তিতে বলীয়ান ছিল। তাদের নিকট হাজার বছরের লালিত শক্তি সংরক্ষিত ছিল, যা ব্যবহার করার সুযোগ তাদের ইতোপূর্বে সৃষ্টি হয়নি। সে শক্তির মোকাবেলা সহজ ছিল না। ইসলামী বিশ্বের ওপর হামলা চালিয়ে তারা রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল, ইসলামী শৌর্য-বীর্যের প্রদীপ নির্বাপিত করে দিয়েছিল। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে লাঞ্ছিত করেছিল। ইসলামী শক্তি তাতারীদের প্রলয়ংকরী প্লাবনের সামনে পিছু হটতে শুরু করে। ইসলামী রাষ্ট্রগুলো একের পর এক পরাজয়ের শিকার হতে থাকে। মুসলিম উম্মাহ স্বীকার করে নেয়, তাতারীদের প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ও শক্তি তাদের নেই। কোনো শক্তিই তাদের সামনে প্রতিরোধ প্রাচীর দাঁড় করাতে সক্ষম নয়। এমনকি সে সময় এ কথা প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়ে গিয়েছিল, কেউ যদি বলে, তাতারীরা অমুক যুদ্ধে পরাজয় বরণ করেছে তাহলে সে মিথ্যুক। তাতারিরা পরাজয় বরণ করেছে-এটা কল্পনাও করা যেত না। হিংস্র তাতারী জাতি পিছু হটবে-এটা অসম্ভব। বিবেক এটা গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। তাতারী ভীতি গোটা ইসলামী বিশ্বে ছেয়ে গিয়েছিল। এমন ভয়ানক ভীতি, যার অভিজ্ঞতা সাধারণত কোনো মানুষ অর্জন করেনি, কিন্তু এতদসত্ত্বেও শেষ ফল কি দাঁড়াল? যে ইসলাম বাহ্যিক দৃষ্টিতে তাদের কাছে পরাজয় বরণ করেছিল, যার অনুসারীরা তাদের প্রচন্ড হামলায় পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল, সে ইসলাম তার বিজয়ী জাতিকে জয় করে নিল, কিন্তু ইসলামের তার বিজয়ী জাতিকে জয় করা কিভাবে সম্ভব হলো। এ বিজয় তরবারির জোরে হয়নি। কারণ, মুসলমানদের তরবারি তো তাতারীদের তরবারির সামনে ভোতা হয়ে গিয়েছিল। নিরাশ হয়ে গিয়েছিল তারা জীবন সংগ্রাম থেকে। তাদের এ ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল,
তাতারীদের মোকাবেলায় আর কিছু করা সম্ভব নয়। তবে কী ছিল সে শক্তি? যে শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তারা বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। সে শক্তি ছিল অলৌকিক দীন ইসলাম। যা ছিল চিরন্তন, চিরস্থায়ী, সার্বজনীন, সুন্দর, মনোরম, হৃদয়গ্রাহী ও চিত্তাকর্ষক এক জীবনব্যবস্থা, এক জীবনপদ্ধতি। এই দীনের অলৌকিক যাদুতে আচ্ছন্ন হয়েই তারা শেষ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর কাছে পরাজয় বরণ করে। কারণ, তাতারীরা ছিল অসভ্য, বর্বর। সভ্যতার কোন স্পর্শই ছিল না তাদের জীবনে। তারা ছিল মানব আকৃতিতে হিংস্র হায়েনা। পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট। সেই জাতি ইসলামের যাদুতে আচ্ছন্ন হয়ে দুনিয়ার সংকীর্ণ সরুপথ থেকে পৃথিবীর প্রশস্ত ও বিস্তৃত মহাসড়কে প্রবেশ করল। ঠিক একই অবস্থা হবে বর্তমান পাশ্চাত্য শক্তিরও। সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন তারাও ইসলামের যাদুতে আচ্ছন্ন হবে। পাশ্চাত্য আজ জীবন সংগ্রাম থেকে নিরাশ হয়ে পড়েছে। হতাশ হয়ে পড়েছে তাদের সভ্যতা থেকে। এখন তাদের একটি নতুন সভ্যতার প্রয়োজন, যে সভ্যতা তাদের মনে প্রশান্তি দান করবে। নিয়ে যাবে দুনিয়ার সংকীর্ণ সরু পথ থেকে প্রশস্ত ও বিস্তৃত মহাসড়কে। আমেরিকা ও পাশ্চাত্য শক্তি আজ যে উত্তাল তরঙ্গের মতো ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে, এর কি প্রভাব-প্রতিক্রিয়া পড়েছে, মার্কিন বিভিন্ন পত্র পত্রিকার সৌজন্যে এখানে আমরা তার কিছু চিত্র তুলে ধরছি।
১১ই সেপ্টেম্বরের তুফানের পর এর নায়করাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আজ মার্কিন অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামরিক শক্তি ক্রমশঃ দুর্বল হতে চলেছে। ১১ই সেপ্টেম্বরের পর আমেরিকা মুদ্রাস্ফীতি থেকে বাঁচতে তিন বার নিজের সংরক্ষিত মুদ্রা ভান্ডারের অবমূল্যায়ন করেছে। অর্থনৈতিক এই দুরবস্থা আমেরিকা থেকে সুদূর জাপান, তাইওয়ান, মেক্সিকো ও ব্রাজিল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। আমেরিকার সাধারণ আভ্যন্তরীণ উৎপাদনে যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে, একে তারা কৌশলগত অস্থিরতা বলে অভিহিত করে চলেছে। ২০০১ সালের ২৯ আগস্ট পর্যন্ত আমেরিকা তার উৎপাদনের হার শতকরা ৭ শতাংশ বলেছিল। যখন এ হার প্রকৃতপক্ষে শূন্যের কোঠায় এসে গিয়েছিল। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এ হার নেতিবাচক পর্যায়ে চলে গেছে। এই অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে সেসব অঞ্চলে বেকারত্বের হার দ্রুত বাড়ছে। ১১ই সেপ্টেম্বরের পর আমেরিকায় দশ লাখের বেশি লোককে চাকুরী থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে। বড় বড় কোম্পানী আরো কর্মচারী ছাটাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমেরিকার ইলেকট্রনিক শিল্পে বহির্বিশ্বের অর্ডার ৩.২ হ্রাস পেয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য শিল্প দ্রব্য উৎপাদনেও বিরাট ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কৃত্রিমভাবে বহাল রাখা হচ্ছে। ২০০০ সালের অক্টোবর থেকে ২০০১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ের বেকারত্বের হার সম্পর্কে অর্থনীতিবিদ গোল্ডমিন স্যাক্স ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ২০০২ জানুয়ারী পর্যন্ত বেকারত্বের হার আরো প্রবৃদ্ধি ঘটবে। আরেক অর্থনীতিবিদ মর্গান স্ট্যানলের ভবিষ্যদ্বাণী মোতাবেক আমেরিকার বার্ষিক বাণিজ্য ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সমগ্র দুনিয়ার স্টক মার্কেটগুলো বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। ১৪শ' বছর পূর্বের কুরআনের ভবিষ্যদ্বাণী আজ একুশ শতকে এসে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে এভাবে, ইহুদী এবং তার মিত্র শক্তি নিজেই
নিজের ঘর ধ্বংস ও বরবাদ করছে। আমেরিকার রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি যেভাবে দাফন হয়ে যাচ্ছে, তা আল্লাহ পাকের ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়।
পক্ষান্তরে ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাসরত মুসলমানদের যে উপকার হয়েছে, তা সুদূরপ্রসারী। তাদের সবচে' বড় যে ফায়দা হয়েছে সেটি হলো, তাদের মধ্যে নতুনভাবে ইসলামের অনুভূতি জেগেছে। ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনা মুসলমানদের মাঝে তাদের ধর্মের দিকে ফিরে আসার নতুন চেতনা সৃষ্টি করেছে। আগে যারা নিজেদের মুসলমান পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করত, এখন তারা মুসলমান পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে। যারা নামায ও ইসলামের পরিচায়ক বিষয়াবলী থেকে উদাসীন ছিল এখন তারা দাড়ি রাখছে, ইসলামী লেবাস পরছে এবং মসজিদে যাওয়া শুরু করেছে। প্রতিটি মসজিদে নামাযীর সংখ্যা বাড়ছে। এমনকি মাঠ সংকীর্ণ হওয়ার কারণে ঈদের নামায কয়েক জামাআতে আদায় করতে হয়েছে।
একদিকে মুসলমানদের মধ্যে কুরআন ও দীনী কিতাব পড়ার আগ্রহ বাড়ছে, অপরদিকে মার্কিনী এবং ইউরোপিয়ানরাও টিভিতে ইসলামের আলোচনা শুনে কুরআন, ইসলামী ইতিহাস ও দীনী কিতাব ক্রয় করতে শুরু করে দিয়েছে। শুধু আমেরিকাতেই ইসলাম সম্পর্কিত বই পুস্তক ক্রয়ের হার ত্রিশ শতাংশ বেড়েছে। তন্মধ্যে কুরআনের ইংরেজী অনুবাদ এত ব্যাপকভাবে ক্রয় করা হয়েছে, যাতে লাইব্রেরীগুলোর স্টকই খতম হয়ে গেছে। এক পত্রিকা লেখেছে, এক মাসের মধ্যে ৫০ হাজার কুরআন শরীফ বিক্রি হয়েছে। মার্কিন নিউজ এজেন্সীগুলো সংবাদ দিয়েছে, ১১ই সেপ্টেম্বরের পর থেকে কুরআন শরীফ সবচে বেশি বিক্রীত গ্রন্থে পরিণত হয়েছে। এর পাশাপাশি মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারগুলোতে অমুসলিমদের আসা-যাওয়া এবং ইসলাম সম্পর্কে জানার প্রবণতা এ পরিমাণ বেড়েছে, যা বিগত ত্রিশ বছরেও হয়নি। কিছু কিছু ইসলামিক সেন্টারের দায়িত্বশীলরা বলেছেন, প্রতিদিন ইসলাম সম্পর্কে টিভি ও সংবাদপত্রকে আমাদের কমপক্ষে আট দশটা সাক্ষাতকার দিতে হয়েছে। এ ধারাবাহিকতা ক্রমেই বাড়ছে। মুসলমানরাও প্রচার মাধ্যমগুলোর সাথে তাদের সম্পর্ক বৃদ্ধি করে চলেছে। মসজিদে ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ১১ই সেপ্টেম্বরের পর থেকে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ৩০ হাজার মার্কিনী ইসলাম গ্রহণ করেছে। ২০০৪ সালের ১লা সেপ্টেম্বরের সংবাদ অনুযায়ী আমেরিকায় ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা পঞ্চাশ হাজারে পৌছে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুসলমানরা কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও ইসলামের এমন পরিচিতি সৃষ্টি করতে পারত না, যেমন ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর ইসলাম যতটুকু পরিচিতি লাভ করেছে।
সেখানকার মুসলমানদের অমুসলিম প্রতিবেশীরা ইতোপূর্বে তাদের সাথে পরিচিত হওয়া বা তাদের খোঁজ-খবর রাখার চিন্তাও করত না, কিন্তু এই ঘটনার পর অমুসলিম প্রতিবেশীরা মুসলমানদের খোঁজ-খবর নেয়া ও তাদের সাথে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করছে। তারা মুসলমানদের সভ্যতা-সংস্কৃতি ও ইসলামী ইতিহাস সম্পর্কে তাদের কাছে জিজ্ঞেস করছে। গির্জা ঘরে মুসলমানদের দাওয়াত দিচ্ছে, ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস
করছে এবং কুরআনের অনুবাদ কপি তালাশ করছে। এসবের পর যখন তাদের নিকট ইসলামের সত্যতা ফুটে ওঠছে, তখন সাথে সাথে তারা ইসলাম গ্রহণ করে নিচ্ছে।
১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনায় মার্কিন মুসলমানদের এক ফায়দা এও হয়েছে, মিডিয়া তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। নতুবা এর পূর্বে তাদের কেউ পাত্তা দিত না। রাজনৈতিক দলগুলোও এখন মুসলমানদের গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। মার্কিন কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃবর্গ মুসলমানদের সমর্থনে বিবৃতি দিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত তাদের তোয়াজ করছে। বুশ স্বীকার করেছেন, ১১ই সেপ্টেম্বরের পর ইহুদী সংগঠনগুলো মুসলমানদের বিরুদ্ধে আমার নিকট এত ফ্যাক্সবার্তা পাঠিয়েছে যে, আমি এসব দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি। বিশেষ করে মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী (ইহুদী) এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঘৃণ্য ভূমিকা পালন করেছে।
১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার আরেকটি বড় ফায়দা হলো, মুসলমানদের মধ্যে একতা ও ভ্রাতৃত্বের প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। তারা নিরাশার পরিবর্তে দৃঢ়তার পথ গ্রহণ করেছে। তাদের দীনী ও দাওয়াতী সংগঠনগুলোকে আরো সক্রিয় করে তুলেছে। দীনী কাজের জন্য বিরাট ফান্ড সরবরাহ করছে। ইসলাম সম্পর্কে বিভিন্ন কিতাব মানুষের মাঝে বিতরণ করছে। আমেরিকার প্রসিদ্ধ পত্রিকা ইউ.এস.এ টুডে লিখেছে, ৯/১১-এর ঘটনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম সম্পর্কে অসাধারণ আগ্রহ বেড়েছে। সাধারণ ও বিশেষ শ্রেণী সবাই আমেরিকায় বসবাসরত মুসলমানদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। ইসলাম সম্পর্কিত গ্রন্থাবলী ক্রয় করে স্টাডি শুরু করেছে। এই পত্রিকা ১৭ই সেপ্টেম্বর সংখ্যায় লেখেছে, এক সপ্তাহের মধ্যে বিভিন্ন মার্কিন লাইব্রেরীতে ইসলাম সম্পর্কিত গ্রন্থাবলীর স্টক শেষ হয়ে গেছে। কুরআন শরীফ বিক্রয়ে সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে। এমনিভবে ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা হাজার পর্যন্ত পৌছে গেছে। নিউইয়র্ক টাইমস ২৩ই অক্টোবর সংখ্যায় লেখেছে, সমুদ্রের ধারাবাহিক উত্তাল তরঙ্গের মতো হাজারো মার্কিনী আমেরিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইসলামিক সেন্টার ও মসজিদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ইউ.এস.এ টুডে ১৭ই সেপ্টেম্বর সংখ্যায় লেখেছে, এতদিন পর্যন্ত মার্কিনীরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মুসলমানদের থেকে আলাদা হয়ে জীবন যাপন করত, কিন্তু ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনা তাদের ইসলাম, মুসলিম উম্মাহ ও মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে বাধ্য করেছে। এর মৌলিক কারণ হলো, ১১ই সেপ্টেম্বরের প্রলংকরী ঘটনায় মার্কিনীদের মস্তিষ্কে এই প্রশ্ন সৃষ্টি করে দিয়েছে, ইহুদী। মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা যদি সঠিক হয় তাহলে এক ব্যক্তির মধ্যে এত বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করার শক্তি কিভাবে এলো। তার পেছনে কোন্ শক্তি আছে। তার ধর্ম কি তাকে এত বড় ত্যাগ স্বীকারের মতো যোগ্যতা সৃষ্টিতে এখনো সক্ষম?
দ্বিতীয় মৌলিক কারণ হলো, ৭০ শতাংশ মার্কিনীর মতে, মার্কিন মিডিয়ার সংবাদে ভারসাম্যহীনতা ও পক্ষপাতিত্ব পাওয়া যায়। ৫৫ শতাংশ মার্কিনী মার্কিন মিডিয়ার সংবাদকে মনগড়া ও বানোয়াট মনে করে। যেমন পেন্টাগনের অদৃশ্য নির্দেশে উপসাগরীয় যুদ্ধের একতরফা সংবাদ পরিবেশন করে সি.এন.এন গোটা বিশ্বে মার্কিন মিডিয়ার ভাবমূর্তি বিনষ্ট করেছে এবং মার্কিন মিডিয়াকে কলঙ্কিত করেছে। খোদ
আমরিকার সংবাদপত্রের সম্পাদকগণ আমেরিকার এই নতুন পলিসির প্রতিবাদ জানিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়া বিষয়ক এই পলিসির কারণে মার্কিনীরা ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনায় ওসামা ও তার ধর্মপন্থী মুসলমানদের বিরোধী প্রোপাগান্ডায় কোনো বিরূপ প্রভাব গ্রহণ করেনি। তবে সাময়িকভাবে তারা বিভ্রান্ত হয়েছে। এরপর যখন মার্কিন সরকার প্রত্যাশা অনুযায়ী মিডিয়ায় মনগড়া, বানোয়াট ও জাল দলীল-দস্তাবেজ জারি করা শুরু করে, তখন সর্বপ্রথম খোদ মার্কিন সাংবাদিকরাই এসব দলীল-দস্তাবেজ মিথ্যা, ধোকা, প্রতারণা ও বানোয়াট আখ্যায়িত করে। আইন বিশেষজ্ঞ ও বুদ্ধিজীবীরা তো এর প্রতি ভ্রুক্ষেপই করেননি, কিন্তু ইহুদীরা তাদের হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা ও শত্রুতার ঝাল মেটাতে এটাকেই মোক্ষম সময় মনে করে। ফলে তারা মুসলমানদের ইবাদতকেন্দ্রগুলোকে টার্গেট বানায়। মুসলিম নারীদের চলাফেরা পর্যন্ত সংকীর্ণ করে তোলে। মিথ্যা ভিত্তিহীন সংবাদের ভিত্তিতে মুসলমানদের গ্রেফতার করায়। অথচ স্বয়ং দু ইহুদীকে এক মসজিদ ধ্বংস করার অপরাধে বোমাসহ গ্রেফতার করা হয়েছে। মার্কিনীদের সামনে যখনই প্রকৃত বিষয়টা সুস্পষ্ট এবং ইহুদী ষড়যন্ত্রের পর্দা উন্মোচিত হলো, তখন তারা মুসলমানদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। মসজিদসমূহের সামনে গিয়ে নামাযী মুসলমানদের ফুলের মালা দিয়েছে এবং নিজেদের ভুল ধারণা ও ভুল বোঝাবুঝির জন্য ক্ষমা চেয়েছে। গির্জার দায়িত্বশীলরা ইসলামের পরিচয় বর্ণনার জন্য মুসলমানদের আহবান করেছে। ইসলাম ও ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস জানার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অতঃপর তাদের সামনে যখন ইসলাম ও ইসলামী শিক্ষামালা সুস্পষ্ট হয়ে গেল তখন তারা সত্য কথা গ্রহণ করতে মোটেও দেরি করেনি; বরং তারা বিভিন্ন লাইব্রেরীতে গিয়ে ইসলাম সম্পর্কে কিতাবাদি সংগ্রহ শুরু করে দেয়।
সেমতে মাত্র চার দিনের ভেতর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সকল লাইব্রেরীর ইসলাম বিষয়ক গ্রন্থাবলীর স্টক খতম হয়ে যায়। বিপুলভাবে কুরআনের ইংরেজি অনুবাদ বিক্রি হতে লাগল। প্রকাশকরা ছেপেই কূল পায় না। অপরদিকে ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়াও ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ সম্পর্কে বিভিন্ন প্রবন্ধ-নিবন্ধ এবং সাক্ষাতকার প্রকাশ শুরু করে। ফলে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা চিন্তায় পড়ে গেল, এফ.বি.আই তার বু-ি নয়াদী উদ্দেশে ব্যর্থ হয়ে গেছে! এখন আমেরিকান সরকার স্বয়ং তাদের নাগরিকদের স্বাধীনতার ওপরই বহু বিধি নিষেধ আরোপ করছে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। হোক না তারা আমেরিকায় অভিবাসী মুসলমান।
এ পরিস্থিতি ইহুদী প্রোপাগান্ডার মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছে। ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে; বরং যেসব মার্কিনী পূর্ব থেকেই ইহুদীদের সাথে শত্রুতা রাখত, তাদের শত্রুতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ তারাও এখন বলছে, ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার পেছনে জালেম ইহুদীদের হাত রয়েছে, কিন্তু যেহেতু মার্কিন মিডিয়ার ওপর তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে, এজন্য মার্কিনীদের ইহুদী বিদ্বেষের সংবাদ ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়, কিন্তু কতদিন সত্য চাপা দিয়ে রাখা যাবে। একদিন না একদিন তার বিস্ফোরণ হবেই। সেদিন অবশ্যই সত্য তার স্বমহিমায় আত্মপ্রকাশ করবে। নিজেদের দুষ্কর্মের হিসাব দিতে হবে এবং নিজেদের খোঁড়া গর্তে পড়তেই হবে।
এখন পাশ্চাত্যে বসবাসরত মুসলমানদের উচিত সেখানে ইসলামের দাওয়াতকে আরো সক্রিয় ও গতিশীল করা। আর এই দাওয়াত তখনই ফলপ্রসূ হবে যখন স্বয়ং মুসলমানরা তাদের জীবনকে অমুসলিমদের সামনে ইসলামের বাস্তব নমুনা হিসেবে উপস্থাপন করবে। মুসলমানদের বাস্তব ইসলামী জীবন দেখেই দলে দলে লোক ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেবে। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভূ-খ ইসলামের প্রহরীদের ভূ-খ হয়ে যাবে। ইসলামী ইতিহাস বলে, দেবালয় থেকেই কাবার প্রহরী বের হয়ে আসে। আগামীতেও বের হয়ে আসবে ইনশাআল্লাহ। ঈমানদাররা এ পৃথিবীতে সূর্যের মতো জীবন যাপন করবে। কারণ আল্লাহ তাআলাই বলেছেন, আমিই এই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই একে সংরক্ষণ করব। সুতরাং মুসলিম উম্মাহর নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। শত নিরাশার মাঝেও আশার সূর্য উকি মারে। অল্প কয়েক বছর আগের কথা, রাশিয়ার মতো পরাশক্তি আফগানিস্তানে এসে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। আমেরিকার পূর্বাভাসেও দেখা যাচ্ছে, ইরাক এবং আফগানিস্তানে আমেরিকার কবর রচিত হবে।
আলোচ্য কথাগুলো ২০০৫ সালে লেখা হয়েছিল। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি হচ্ছে, আমেরিকা ইরাক ও আফগানিস্তানের চোরাবালি থেকে বের হবার নিরন্তর প্রয়াস চালাচ্ছে। পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার পিছু হটা, আফগানিস্তানে তালেবানদের নতুনভাবে উত্থান এবং আরব বিশ্বে আমেরিকার দোসর, দালাল, তল্পীবাহক ও তার স্বার্থ সংরক্ষণকারী সরকারগুলোর বিদায় ঘন্টা বেজে ওঠা অনিবার্য। কারণ সত্য সমাগত মিথ্যা দূরীভূত-এটা আল্লাহ পাকের চিরন্তন ফয়সালা। এ পর্যন্ত যাকিছু ঘটে গেছে তা আমাদের বদ আমলের ফল, যার কারণে ক্রুসেডাররা এতদিন সময় পেয়েছে। একদিকে দুনিয়ার উন্নত জাতি-গোষ্ঠী, যারা তাদের সকল বস্তুগত উপকরণ ও শক্তি নিয়ে জুলুম, নির্যাতন ও পাশবিকতার সকল রেকর্ড ভাঙতে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, অপরদিকে অসহায়, নিরীহ, দুর্বল ও নিরস্ত্র লোক, যারা কোনো সরকার কিংবা দল ও সংগঠনের সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়াই পরাশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, পেশ করেছে জান-মালের নযরানা। দুর্বল ঈমানের লোকদের যখন আল্লাহ তাআলা এমন অসাধারণ সাহায্য করেছেন, তাহলে ঈমান শক্তিশালী হলে কি পরিমাণ গায়েবী সাহায্য আসতো। আল্লাহ তাআলা তাঁর দীনের রশ্মি প্রজ্বলিত করেই ছাড়বেন, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।
টিকাঃ
৭. ১৯৫০ সাল থেকে এ পর্যন্ত আমেরিকা, ফ্রান্স, জার্মানী, হল্যান্ড, মিসর, ইরাক, ইরান, লিবিয়া, পাকিস্তান ও ভারতের আধুনিক সমরাস্ত্র নির্মাণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহে দক্ষতার সাথে কাজ করেছেন, এমন মুসলিম বিজ্ঞানীকে ইসরাঈলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ নানা কৌশলে হত্যা করেছে। এসব মুসলিম বিজ্ঞানী পারমাণবিক বোমা, মিজাইল বিধ্বংসী রাডার, রণতরী নির্মাণ ইত্যাদি প্রকল্পে অত্যন্ত দক্ষতা ও সফলতার সাথে কাজ করেছেন। (দেখুন, আল বা'সুল ইসলামী, লাখনৌ, রবিউল আউয়াল ও রবিউস সানী সংখ্যা, ১৮২৩ হিজরী)