📄 বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের অভিমত
মূল বই-এর বাংলা সংস্করণ উপলক্ষ্যে দারুল উলূম নদওয়াতুল ওলামা, লাখনৌর শিক্ষক, বিখ্যাত ম্যাগাজিন পাক্ষিক তামীরে হায়াতের সহকারী সম্পাদক ও আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর নাতী মাওলানা মাহমুদ হাসান হাসানী নদভীর মূল্যবান ভূমিকা
মহান আল্লাহর নির্দেশ হলো, 'যথাসাধ্য তোমরা তাদের (অর্থাৎ শত্রুদের মোকাবেলার) উদ্দেশ্যে শক্তি সঞ্চয়ের মাধ্যমে প্রস্তুতি গ্রহণ করো।' (সূরা আনফাল-৬০)
আলোচ্য আয়াতের আলোকে মুসলমানদের সাধ্য অনুযায়ী ইসলাম ও মুসলমানদের উচ্ছেদকামী দুশমনদের বিরুদ্ধে এমন সব শক্তি সামর্থ্য ও যোগ্যতা অর্জন করা ফরয, যা শত্রুর ওপর ভীতিকর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে এমন পরিস্থিতিতে যখন ইসলাম ও মুসলিমবিরোধী শক্তি ইসলামকে নির্মূল করার জন্য সকল উপায়-উপকরণ প্রয়োগে তৎপর। ইসলামের শত্রুরা বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন উপায়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করেছে। বর্তমানে ইসলামকে নির্মূল করার জন্য সব ধরনের উপায়-উপকরণ ও পদ্ধতি অবলম্বনে ইসলামের সকল বৈরি শক্তি ঐক্যবদ্ধ। এ জন্য মিডিয়া হলো তাদের নিকট সবচে' শক্তিশালী ও কার্যকর হাতিয়ার। পশ্চিমা মিডিয়া ইহুদী ও মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রচার-প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রচার-প্রোপাগান্ডার জাল ছিন্ন করতে ইসলামী মিডিয়ার কোনো বিকল্প নেই।
আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, ইসলাম ও নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় যতদূর সম্ভব জিহাদের সময়োপযোগী উপায়-উপকরণ সংগ্রহ করা মুসলমানদের জন্য ফরয। বিভিন্ন যুগের উপায়-উপকরণের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে গিয়ে তিনি লেখেন, ভবিষ্যতে আরো যত সমরাস্ত্র ও যুদ্ধাস্ত্র তৈরি হবে সবই এই আয়াতের অন্তর্ভূক্ত। (তাফসীরে উসমানী)
আল্লামা উসমানীর এ ব্যাখ্যার পর আর অধিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না। কারণ, বাস্তবতা সম্পূর্ণ স্পষ্ট যে, ইউরোপ, আমেরিকা ও জায়নবাদী শক্তি ইসলামী বিশ্বে তাদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সবচে' বেশি সাহায্য নিয়েছে মিডিয়ার। আপন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তারা পত্র পত্রিকা, সংবাদ মাধ্যম ও ম্যাগাজিন-সাময়িকী ইত্যাদি ব্যাপকভাবে চালু করেছে। প্রিন্টিং মিডিয়ার পাশাপাশি ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া তথা রেডিও, টিভি, ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বিশ্ব জনমতকে নিজেদের পরিকল্পনার অনুকূলে ঢেলে সাজানোর কাজ জোরেশোরে চালিয়ে যাচ্ছে। এসব গণমাধ্যমে গোয়েবলসীয় কায়দায় মিথ্যা, ধোকা, প্রতারণা ও বাস্তবতা বিকৃতির কাজ এমনভাবে চলছে যে, মানুষ মিথ্যাকেই সত্য হিসেবে গ্রহণ করে নিচ্ছে।
মুসলিম বিশ্বের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও দারুল উলূম নদওয়াতুল ওলামার শিক্ষাসচিব মাওলানা ওয়াজেহ রশীদ হাসানী নদভী বাস্তবতার পর্দা উম্মোচিত করে লিখেছেন, 'আজ মুসলমানরা যে যুদ্ধের মুখোমুখি, তা জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা-সংস্কৃতি, সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ।' জনৈক ইউরোপিয়ান বুদ্ধিজীবী লেখেন, 'ইসলামের দুর্গ দখল করার সবচে' কার্যকর অস্ত্র হলো শিক্ষা।' এটি সামরিক লড়াই থেকেও অধিক কার্যকর। এর মাধ্যমে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদেরকে সহজেই আমাদের স্বার্থের সমর্থক ও রক্ষকে পরিণত করা সম্ভব।
মাওলানা ওয়াজেহ রশীদ হাসানী নদভী যে যুদ্ধের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, তা হলো মিডিয়ার যুদ্ধ। আর এটাই স্বাভাবিক যে, প্রতিপক্ষ যুদ্ধের যেই পদ্ধতি অনুসরণ করে, তার জবাবও সে পদ্ধতিতে দেয়াই যুক্তিযুক্ত। অন্যথায় বিপদ অনিবার্য। মাওলানা নজরুল হাফীজ নদভী তাঁর বিখ্যাত সাড়া জাগানো 'পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ' গ্রন্থটিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন। যার দ্বারা একদিকে যেমন মিডিয়া সন্ত্রাস এবং এর ধ্বংসলীলা ও অসাধারণ প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানা যায়, অপরদিকে মুসলমানদের মনে এই সচেতনতা জাগ্রত হয় যে, তারা এ ক্ষেত্রে যদি সামান্যতম অবহেলাও করে, তাহলে বর্তমানে তারা যে কঠিন পরিস্থিতির শিকার, তার চেয়েও বেশি কঠিন বিপজ্জনক পরিস্থিতির শিকার হবে তাদের আগামী প্রজন্ম। এই গ্রন্থের গুরুত্ব ও উপকারিতা জ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবী মহল ভালভাবেই অনুধাবন করেছেন। ইতোমধ্যে গ্রন্থটির আরবী, ইংরেজি ও হিন্দি অনুবাদ হয়ে গেছে। বাংলা ভাষায় এর অনুবাদের বিরাট কাজটি করেছেন মাওলানা শহীদুল ইসলাম ফারুকী। তিনি একজন উচ্চ সাহসী, প্রতিভাদীপ্ত, যোগ্যতাসম্পন্ন ও ইসলামের জন্য দরদী হৃদয়ের অধিকারী তরুণ আলেমেদীন। দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে লেখাপড়া শেষ করে মুফাক্কিরে ইসলাম আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর ভাগ্নে ও স্থলাভিষিক্ত খলীফা, মুসলিম বিশ্বের প্রখ্যাত আলেমেদীন ও দারুল উলুম নদওয়াতুল ওলামার রেক্টর হযরত মাওলানা সাইয়েদ মুহাম্মদ রাবে' হাসানী নদভী (দা.বা.)-এর কাছে বাইআত ও ইস্তে ফাদার সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং তাঁর সান্নিধ্যে এক মাসের বেশি সময় অতিবাহিত করেন। এছাড়া মাঝে মাঝে এখানে তার যাওয়া-আসা ও যোগাযোগ সব সময়ই আছে। তিনি হযরতের তাওয়াজ্জুহ, সুদৃষ্টি ও ভালবাসা লাভে বিশেষভাবে ধন্য হয়েছেন। আল্লাহ তাআলা হযরতের তাওয়াজ্জুহ ও বরকত দ্বারা তাঁকে আরো উপকৃত হওয়ার তাওফীক দান করুন এবং যুগ-চাহিদার প্রেক্ষিতে তাঁর দীনী খেদমত কবুল করুন। আমীন।
মাহমূদ হাসান হাসানী নদভী
দারুল উলূম নদওয়াতুল ওলামা
০৯ রবিউল আওয়াল-১৪৩০ হিজরী
ইসলামী শিক্ষার ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিষ্ঠান মাদরাসা দারুর রাশাদ, মিরপুর ঢাকার প্রিন্সিপাল, লন্ডনভিত্তিক ওয়ার্ল্ড ইসলামিক ফোরাম বাংলাদেশ ব্যুরোর সভাপতি ও আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী র. -এর বিশিষ্ট খলীফা হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ সালমান সাহেবের অভিমত
বিশ্বব্যাপী ইসলামের বিজয় ও অগ্রযাত্রার প্রয়াসকে গতিশীল করার লক্ষ্যে প্রয়োজন ইসলামী বিশ্ব সম্পর্কে পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গি, ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-দর্শন অনুধাবন করা, পাশ্চাত্যের নানামুখী চ্যালেঞ্জ ও তার ভয়াবহতা উপলব্ধি করা এবং পশ্চিমা মিডিয়ার মেযাজ ও তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে অবগতি লাভ করা। কারণ পশ্চিমা রাষ্ট্রশক্তি ও ইহুদী মস্তিষ্ক দুটো একযোগে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে নির্মূল করার জন্য পূর্ণ শক্তি নিয়ে ময়দানে আবির্ভূত হয়েছে। শত্রুর সামরিক কৌশল ও সমরাস্ত্র সম্পর্কে ভালভাবে অবগতি লাভ করা ছাড়াই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার পরিণাম লজ্জাজনক পরাজয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
কমিউনিজমের পতনের পর বর্তমানে পাশ্চাত্যের প্রধান প্রতিপক্ষ ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে নির্মূল করার জন্য পাশ্চাত্য শুরু করেছে নতুন ক্রুসেড, যার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে কথিত সন্ত্রাসী হামলার নাটক মঞ্চস্থ করার মধ্য দিয়ে। এটিকে অজুহাত বানিয়ে তারা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে আফগানিস্তানকে। রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়া হয়েছে ইরাকে। না জানি কতদিন চলবে মুসলিম দেশ জবরদখলের এ ধারা। আর এ ক্রুসেডে তাদের অগ্রসেনানী হলো বিশ্ববিস্তৃত ইহুদী নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা মিডিয়া নেটওয়ার্ক। বর্তমান যুগকে আমরা মিডিয়ার যুগ বলতে পারি। এ যুগে সমরাস্ত্র ও সেনাবাহিনীর মাধ্যমে মানুষ হত্যার পরিবর্তে মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। এটাকে আমরা সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক লড়াই বলতে পারি। বলতে পারি স্নায়ুযুদ্ধ। এ যুগ মানুষকে শারীরিকভাবে গোলাম বানানোর পরিবর্তে মেধা-মনন ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে গোলাম বানানোর যুগ। আর মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব শারীরিক দাসত্বের তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ। মেধা-মনন ও চিন্তা-চেতনাকে বিষাক্ত করার সবচে শক্তিশালী কার্যকরি অস্ত্র হলো মিডিয়া। মিডিয়ার শক্তি আণবিক শক্তির চেয়েও বেশি ভয়াবহ। মিডিয়া কোটি কোটি মানুষের মেধা-মনন ও চিন্তা-চেতনা যখন যেদিকে ইচ্ছা সেদিকেই ঘোরাতে পারে। পাশ্চাত্য ভালকরেই জানে, যদি তাদের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক আধিপত্য ধরে রাখতে হয় এবং গোটা বিশ্বকে মার্কিনীকরণ করতে হয়, তাহলে মার্কিন জীবনব্যবস্থাকে আদর্শ ও অনুসরণীয় বানাতে হবে। ফাঁদ পেতে মানুষের বিবেক স্বীয় প্রভাববলয়ে নিয়ে আসতে হবে। মানুষের চিন্তাধারা ও ধ্যান-ধারণার ওপর অতর্কিত হামলা চালাতে হবে। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র হলো, মিডিয়া ও প্রচার মাধ্যম। এ রাস্তায় সহজেই মার্কিন সভ্যতা-সংস্কৃতি গোটা বিশ্বে গ্রহণীয় ও অনুসরণীয় বানানো সম্ভব। এজন্যই পাশ্চাত্য আজ মিডিয়ার সাহায্যে পশ্চিমা জীবনব্যবস্থার বিশ্বকরণ করছে।
ইসলামী বিশ্বের চিন্তাশীল ওলামায়ে কেরাম দীর্ঘদিন ধরে অনুভব করে আসছেন, ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ সম্পর্কে পশ্চিমা মিডিয়া ও ইসলাম বিরোধী বুদ্ধিবৃত্তিক লবির শত্রুতা ও বিদ্বেষমূলক প্রোপাগান্ডার সাইন্টিফিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন এবং এই লবি নিশ্চিহ্ন করার জন্য পরিকল্পিতভাবে কাজ শুরু করা দরকার। এর জন্য দীনী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ, ওলামায়ে কেরাম এবং ইসলামী চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সমকালীন বিভিন্ন বাদ-মতবাদ ও চিন্তা-দর্শনের জ্ঞান আহরণের অনুভূতি জাগ্রত করে বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকে সুসংগঠিত করা। এক কথায় মুসলিম উম্মাহকে জবাই করার জন্য পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ যেসব ষড়যন্ত্র নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে এবং ইহুদী নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা মিডিয়া যেগুলোর বাস্তবায়ন করছে, তারই সর্বশেষ বিশ্লেষণ নিয়ে একটি ব্যতিক্রমী গবেষণাধর্মী গ্রন্থ রচনা করেছেন ভারতের নদওয়াতুল ওলামার অধ্যাপক মাওলানা নজরুল হাফিজ নদভী। 'পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ' নামে যার বাংলা অনুবাদ করেছেন তরুণ আলেমেদ্বীন, বিশিষ্ট লেখক ও অনুবাদক স্নেহভাজন মাওলানা শহীদুল ইসলাম ফারুকী। দু'আ করি আল্লাহ তাআলা যেন এ গ্রন্থখানা প্রকাশনার সাথে জড়িত সকলকে কবুল করেন এবং মুসলিম জাহানের দিশেহারা মানুষের নৈতিক পুনর্জাগরণে গ্রন্থখানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, তার তাওফীক দান করেন। আমীন।
০৩-০২-০৯ ঈ.
মুহাম্মদ সালমান
প্রিন্সিপাল মাদরাসা দারুর রাশাদ
মিরপুর, পল্লবী, ঢাকা
মুসলিমবিশ্বের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ আলেমেদীন, মক্কাভিত্তিক রাবেতা আলমে ইসলামীর স্থায়ী কমিটির সদস্য, খ্যাতিমান লেখক, গবেষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও মাসিক মদীনার সম্পাদক হযরত মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (দা. বা.)-এর সুচিন্তিত অভিমত
বর্তমান বিশ্বের সর্বত্র সর্বক্ষেত্রে মুসলমানগণ নানামুখী আগ্রাসনের শিকার। আর এই আগ্রাসনের প্রধান একটি অস্ত্র হচ্ছে মিডিয়া। পাশ্চাত্য দুনিয়া নানা ধরনের মারণাস্ত্র তৈরিতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে তার সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করে থাকে মিডিয়া আগ্রাসনের পিছনে। ফলে মুসলমানগণ সর্বত্রই উগ্র, মৌলবাদি এবং জঙ্গি নামে অভিহিত হচ্ছে। এই মিথ্যা অভিযোগ এতটাই প্রচারিত হয়েছে যে, দুনিয়ার সব দেশেই একটি শিশুও এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, মুসলিম জাতি সত্যিই শান্তিপূর্ণ বিশ্ব নির্মাণের পথে প্রধান অন্তরায়। আর এই বিশ্বাসের ফলশ্রুতিতে ফিলিস্তিন, ইরাক, আফগানিস্তান, কাশ্মীর ও পাকিস্তান প্রভৃতি মুসলিম দেশগুলোর উপর পাশ্চাত্য ভয়ানক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং নির্বিচারে গণহত্যার মাধ্যমে দেশগুলোকে ইতিমধ্যেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের মুসলিম পরিচিতি শেষ করে দেয়ার লক্ষ্যেও সেই ধরনের আয়োজন চলছে।
এইরূপ একটি নাজুক মুহূর্তে বিশ্বখ্যাত মিডিয়া ব্যক্তিত্ব নজরুল হাফীজ নদভী কর্তৃক উর্দু ভাষায় রচিত "পশ্চিমা মিডিয়ার স্বরূপ" বইটি মুসলিম জনগণকে জাগ্রত করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। বইটির বাংলা অনুবাদ কাঙ্ক্ষিত ছিল। তরুণ লেখক মাওলানা শহীদুল ইসলাম ফারুকী এই দুরূহ কাজটি সম্পাদন করেছেন। দোয়া করি, আল্লাহ পাক লেখককে আরও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
তাং ১৫.০২.০৯ ইং
মুহিউদ্দীন খান
সম্পাদক মাসিক মদীনা
ঢাকা।
এশিয়ার বিখ্যাত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের দারুল উলূম নদওয়াতুল ওলামার রেক্টর এবং বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী মুফাক্কিরে ইসলাম সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.)-এর ভাগ্নে ও স্থলাভিষিক্ত খলীফা আল্লামা সাইয়েদ মুহাম্মদ রাবে' হাসানী নদভীর ভূমিকা
প্রথম যুগের মুসলমানদের সামাজিক জীবনের ঘটনাসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি ঘটনা পবিত্র হাদীস শরীফে তাবুক যুদ্ধের ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে। ঘটনাটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। ঘটনাটি ছিলো, ঐতিহাসিক তাবুক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল গ্রীষ্ম মৌসুমে। সে সময় ছিল ফল-ফলারি পাকার মৌসুম। পাকা ফল-ফলারির দৃষ্টিনন্দন চিত্তহারী দৃশ্যে প্রভাবিত হয়ে কিছু লোক রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে যুদ্ধে গমন থেকে বিরত থাকেন। তন্মধ্যে কিছু তো ছিল যারা অন্তর দিয়েই ইসলাম গ্রহণ করেনি এবং দ্বি-মুখী নীতি পোষণ করত। তাদের ইসলাম গ্রহণের মিথ্যা দাবী সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) পূর্ণ ওয়াকিফহাল ছিলেন। যেহেতু তারা তাদের কর্মপদ্ধতি গোপন করত, এজন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের কিছু বলতেন না। এই শ্রেণী ছাড়াও তিন জন এমন ছিলেন, যারা ইসলামের সত্য দাবীদার এবং রাসূলের একনিষ্ঠ সাহাবী ছিলেন। মিথ্যা দাবীদাররা তো জেনে শুনেই তাবুকে অনুপস্থিত ছিলো, কিন্তু ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ এ তিন জন ঠুনকো বাধা ও কিছুটা অলসতার কারণে দূর-দূরান্তের পথ সফর করেননি। তাবুক যুদ্ধ থেকে ফেরার পর মিথ্যা দাবীদাররা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে মিথ্যা অজুহাত পেশ করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) সব কিছু জেনে শুনেও চুপ রইলেন। আর ইসলামের নিবেদিতপ্রাণ তিন জন তাঁদের ত্রুটি ও অলসতার কথা স্বীকার করে নিলেন। রাসূল (সা.) তাঁদের পাকড়াও করে বললেন, এখন আল্লাহ পাকই তোমাদের ফয়সালা করবেন। তাঁদের তিন জনকে বয়কট করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) সকল ঈমানদারের প্রতি কড়া নির্দেশ জারি করলেন, কিন্তু ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ এ তিন জন বিচলিত না হয়ে রাসূলের নির্দেশকে খোদায়ী ফয়সালা বলে মেনে নিয়ে অত্যন্ত ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন। একাধারে চল্লিশ দিন পর্যন্ত তাঁরা জনবিচ্ছিন্ন রইলেন। এ ঘটনাটি হযরত কাব (রা.) এভাবে বর্ণনা করেছেন, 'আমাকে রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তাবুক যুদ্ধে কেন যাওনি। আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সা.), আমি যদি ওজর বর্ণনা করি তাহলে এমন ওজর বর্ণনা করতে পারব, যা আপনি বিশ্বাস করে নেবেন। কারণ কোনো কথা দলীল-প্রমাণের আলোকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণনা করার মতো যোগ্যতা রয়েছে, কিন্ত এমনটি করলে মিথ্যার আশ্রয় নেয়া হবে। এর দ্বারা আমি আপনাকে ধোকা দিতে পারব, কিন্তু আল্লাহকে রাজি করতে পারব না। সত্য কথা হলো, আমার কোনো ওজরই ছিল না; বরং শুধু অলসতার কারণেই আমি যুদ্ধে শরীক হতে পারিনি।' রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত কাব (রা.)-এর কথা শুনে বললেন, সে সত্য বলেছে। তবে এখন আল্লাহর ফয়সালার অপেক্ষা কর।
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের তিন জনকে বয়কট করার জন্য সকলের প্রতি নির্দেশ জারি করেন। হযরত কাব (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে ঘটনার বিবরণ দেয়ার সময় যে বলেছিলেন, 'আমার কোনো কথা দলীল-প্রমাণের আলোকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার মতো যোগ্যতা রয়েছে।' হযরত কাবের সেই 'যোগ্যতা দক্ষতা'ই আজ মিডিয়া প্রদর্শন করছে। এই যোগ্যতা দক্ষতা যদি সৎ ও উপকারী উদ্দেশে প্রয়োগ করা হয় তাহলে তাকে সৎ মিডিয়া বলা হবে। আর যদি তা অসৎ ও ধ্বংসাত্মক উদ্দেশে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে তাকে অসৎ ধ্বংসাত্মক ও ক্ষতিকর মিডিয়া বলা হবে, কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ মিডিয়া এ ধ্বংসাত্মক পথ ধরেই এগুচ্ছে। ইসলামবিদ্বেষী শক্তি আজ মিডিয়ার ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আছে। তারা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে নির্মূল করার জন্য মিডিয়াকে ব্যবহার করছে।
মিডিয়া আজ রাতকে দিন এবং দিনকে রাত বানাচ্ছে। বাস্তবকে অবাস্তব এবং অবাস্তবকে বাস্তবতার রূপ দিচ্ছে। মিডিয়া আজ একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্রে পরিণত হয়েছে। মিডিয়া মিথ্যা, মোনাফেকী, অধিকার হরণ এবং বাস্তবতাবিরোধী কথা বলতে সামান্যও পরওয়া করে না, ইসলাম এটা পছন্দ করে না। ইসলাম বলে, সত্য কথা বল, অন্যথায় বিরত থাক, ধোকা দেয়ার চেষ্টা করো না, কিন্তু ইউরোপ অত্যন্ত চালাকি ও সতর্কতার সাথে কথা বলা এবং ঘটনাকে নিজের মন মতো করে উপস্থাপনকে একটি শাস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাই তো দেখা যায়, তাদের উদ্দেশ্য অনুযায়ীই আজ তাদের মিডিয়া পশ্চিমা মূল্যবোধ ও জাহেলী কর্মকান্ড ও কথাবার্তা প্রসার করছে। পশ্চিমা মিডিয়া শুধু চারিত্রিক ও নৈতিক মূল্যবোধই নয়; বরং মানবিক মূল্যবোধও পদদলিত করছে। এর মোকাবেলায় বিশ্বে এমনও কিছু মিডিয়া রয়েছে, যারা আল্লাহকে ভয় করে এবং মিথ্যা ও ধোকাবাজি থেকে বেঁচে থাকে। এগুলোকেই ইসলামী মিডিয়া বলে। পশ্চিমা মিডিয়া এমন সুন্দর ও চিত্তাকর্ষকভাবে সংবাদ উপস্থাপন করে, যাতে ভালো ভালো লোকও তাতে ধোকা খেয়ে যায়। পশ্চিমা মিডিয়ার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হলো ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ।
দারুল উলূম নদওয়াতুল ওলামার উস্তাদ মাওলানা নজরুল হাফীজ নদভী অত্র গ্রন্থে পশ্চিমা মিডিয়ার ওপর ইহুদী আধিপত্যের সূচনালগ্ন থেকে এ যাবতকালের লোমহর্ষক দাস্তান ও তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার কথা অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে আলোচনার প্রয়াস পেয়েছেন। কিতাবের শেষে ইসলামের সত্যপ্রিয়তা, সত্য পছন্দের পন্থা পদ্ধতি অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করেছেন। কিতাবটি পাঠকের সামনে নতুন নতুন জ্ঞান তুলে ধরেছে। এতে দাওয়াতের সঠিক পথ পদ্ধতিও চিহ্নিত করা হয়েছে। গ্রন্থটি পাঠ করলে পাঠকের সামনে এক নতুন বাস্তবতা ফুটে ওঠবে। আল্লাহ তাআলা গ্রন্থটিকে সত্য ও ন্যায়ের জন্য কবুল করে নিন।
সাইয়েদ মুহাম্মদ রাবে' হাসানী নদভী
দারুল উলূম নদওয়াতুল ওলামা, লাখনৌ।
ঈমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতার প্রসার সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.)
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন, 'যারা পছন্দ করে, ঈমানদারদের মধ্যে ব্যভিচার প্রসার লাভ করুক, তাদের জন্যে ইহকাল ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে, আল্লাহ জানেন তোমরা জান না।' (সূরা নূর-১৯)
আলোচ্য আয়াতটি একটি মু'জিযা ছাড়া আর কিছুই নয়। আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয় তখন মদীনার সীমিত সমাজে একটি বিশেষ ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি লোকেরা স্ব স্ব মজলিস ও বৈঠকে আলোচনা করতে লাগল। মজলিসগুলো কত বড় ছিল, ঘটনটি কত বড় ছিল এবং কোন্ কোন্ ব্যক্তি এর সাথে জড়িত ছিল, এসব কিছু থেকে কুরআনের এ আয়াতটি আরো বেশি ব্যাপক ও বিস্তৃত ছিল। কুরআনের আয়াতটি যুগ-যুগান্তর পেরিয়ে এবং সকল ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক দূরত্ব ভেদ করে আরো কিছু দাবী করছিল। আজ আমরা সেই আয়াতের তাফসীর ও ব্যাখ্যা বাস্তবে স্বচোখে অবলোকন করছি। যারা চায় ঈমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতা, নির্লজ্জতা ও ব্যভিচার প্রসার লাভ করুক, সেসবের প্রতিচ্ছবি হলো, আজকের যুগের মিডিয়া, সংবাদ মাধ্যম, রেডিও, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, কম্পিউটার, স্যাটেলাইট, সিনেমা, ফিল্ম, নভেল, নাটক, উপন্যাস, ম্যাগাজিন, পিকচার ও লিটারেচার ইত্যাদি। বিভিন্ন দর্শন ও মতবাদের এই যুগে উল্লিখিত আয়াতটির এর চেয়ে উত্তম আর কোন তাফসীর ও ব্যাখ্যা হতে পারে না। এ আয়াতের তাফসীর আজ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে। পূর্বের যুগে এর তাফসীর অনেক কঠিন ছিল। মদীনার সীমিত পরিসরে এর তাফসীর সম্ভব ছিল না। মদীনার সেই পরিবেশে লোকেরা শুধু অন্তর দিয়েই তা বিশ্বাস করেছিল, হয়তো কোনো একটি বিশেষ ঘটনার ওপর সেটি ফিট করেছিল, কিন্তু আজকের বিশ্বের সকল শক্তি যেভাবে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লেগে গেছে, তার অনুমান তখনকার যুগে কিভাবে সম্ভব ছিল।
আমাদের সমাজে ধ্বংসাত্মক শক্তিবর্গ যেভাবে অনৈতিকতা ও বিদ্রোহ প্রসার করছে, তাদের নিকট এমন উপকরণ রয়েছে যা দিয়ে তারা দিনকে রাত এবং রাতকে দিন বানাতে পারে, আলোকে অন্ধকার এবং অন্ধকারকে আলোতে পরিণত করতে পারে।
দুনিয়ার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সকল সংগঠন-সংস্থার একই অবস্থা। একই পথে তারা ধাবমান। ইউরোপ, আমেরিকা ও রাশিয়াকে দেখুন, পাশাপাশি প্রাচ্যের সরকারগুলোকেও দেখুন, যাদের সকলের চিন্তা-চেতনা ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য শুধুই ধ্বংসাত্মক, যাদের জীবন পাপাচারে ভরা, যাদের আখলাক-চরিত্র অধঃপতনের চূড়ান্ত সীমায় পৌছে গেছে। যাদের চিন্তা-চেতনা ও ধ্যান-ধারণা কেবলই ধ্বংসাত্মক। তারা সকলে মিলে একটি যৌথ ও সম্মিলিত সমাজব্যবস্থা বানিয়ে নিয়েছে। আর সেই সমাজব্যবস্থাই বিশ্বের জাতি-গোষ্ঠীর ভাগ্যের ফয়সালা করছে। বর্তমান পরিস্থিতি হচ্ছে, বিশ্বের সর্বত্র আজ সেই গোষ্ঠীর যাদু চলছে, যাদের হাতে রয়েছে মিডিয়া ও গণমাধ্যম। আর কুরআন পাক তাদের কথাই এ আয়াতে বলেছে, 'যারা পছন্দ করে, ঈমানদারদের মধ্যে ব্যভিচার প্রসার লাভ করুক, তাদের জন্যে ইহকাল ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে, আল্লাহ জানেন তোমরা জান না।'১
টিকাঃ
১. অত্যন্ত আফসোসের বিষয়, ক্রিকেট, ফুটবল ইত্যাদি খেলাগুলো সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে ক্রমশঃ জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। এর পেছনে সেসব দেশের সরকারগুলো কোটি কোটি ডলার ব্যয় করছে। এসব খেলার ম্যাচ ও টুর্নামেন্টে দর্শকদের সরগরম উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। এর পেছনে সময় ও সম্পদের অনর্থক অপচয় অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। না জানি কত মানুষ এর পেছনে পড়ে নামায বরবাদ করছে। এসব দেশের ওলামায়ে কিরাম ও দায়িত্বশীলদের বিষয় টা নিয়ে চিন্তা করা ও এর প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেয়া সময়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন।
আধুনিক খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদন সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.)
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন, 'একশ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশে অবান্তর কথাবার্তা সংগ্রহ করে অন্ধভাবে এবং তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।' (সূরা লোকমান-৬)
খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদনের উপায়-উপকরণ দুই প্রকার। প্রথম প্রকার হল, যেগুলোর সম্পর্ক খেলাধুলা, প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শন ইত্যাদি থেকে অগ্রসর হয়ে চিত্তরঞ্জন ও নিমগ্নতার সাথে। আর দ্বিতীয় প্রকার হল, আনন্দ উল্লাস এবং মানসিক স্বাদ ও লাভজনক কথাবার্তা ইত্যাদি, যাতে পড়ে লোকজন আল্লাহর ফরয, ওয়াজিব ও যিকির-আযকার থেকে উদাসীন হয়ে যায়। যেমন অশ্লীল গল্প-গুজব, কিস্সা-কাহিনী ও ঘটনাবলী ইত্যাদি। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদনের উভয় প্রকার একত্র করে দিয়েছেন। কুরআনের ভাষায় তা হলো 'লাহওয়াল হাদীস'।
এটি কুরআনের একটি মু'জিযা যে, চৌদ্দশ' বছর পূর্বের আয়াত আজকের আধুনিক খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদনের সাজ-সরঞ্জামাদির ওপরও প্রযোজ্য হচ্ছে। বিশেষ করে রেডিও-টিভির ওপর তো পূর্ণাঙ্গভাবেই প্রযোজ্য হয়। কারণ এগুলো একই সাথে খেলাধুলা এবং চিত্তবিনোদন উভয়ই। আয়াতের পরবর্তী অংশ দ্বারা তা আরো পূর্ণাঙ্গ হয়-'একশ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশে অবান্তর কথাবর্তা সংগ্রহ করে অন্ধভাবে'।
এখন দেখুন, আধুনিক এই খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদন অর্জনের জন্য পয়সা খরচ করে বাজার থেকে ক্রয় করা ছাড়া আর কোনোই উপায় নেই। আয়াতের বর্ণনাভঙ্গি দ্বারা বুঝা যায়, কেবলমাত্র রেডিও-টিভির নাম নেয়াটাই বাকী রয়ে গেছে। তাছাড়া বাকী সব উদ্দেশ্য পূর্ণাঙ্গভাবেই বর্ণনা করে দেয়া হয়েছে। কুরআন তো আরবী ভাষায়। এখানে ইংরেজি শব্দ কিভাবে আসবে। এটা বিবেকও গ্রহণ করবে না, কিন্তু কুরআনের মু'জিযা দেখুন, আজ থেকে চৌদ্দশ' বছর পূর্বে যে কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে, যদি আমি মসজিদে বসে বলি, এ আয়াতে রেডিও-টিভির কথা রয়েছে তাহলে ভুল হবে না। কারণ কুরআনে বলা হয়েছে, 'একশ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশে অবান্তর কথাবার্তা ক্রয় করে।' যারা আরবী ভাষার অলংকার সম্পর্কে জানেন এবং আরবদের মতো আরবী ভাষায় ভালো দক্ষতা রাখেন, তারাই উল্লিখিত আয়াতগুলোর যথার্থ মর্ম অনুধাবনে সক্ষম হবেন। আলহামদু লিল্লাহ! আল্লাহর শোকর, আমাদের আরবীর উস্তাদ ছিলেন সরাসরি আরব। আমরা আরবী ভাষার সকল কিতাব তাঁর নিকটেই পড়েছি। ফলে আমরা আরবী ভাষার নাড়ি-নক্ষত্র সম্পর্কে জানি এবং এর ভাষালংকার বিষয়ে আমাদের পূর্ণ ব্যুৎপত্তি রয়েছে। সেই আলোকে আমি কুরআনের শব্দ 'লাহওয়াল হাদীস'-এর খুব মজা অনুভব করছি এবং আমার আরবী রুচিবোধ 'লাহওয়াল হাদীস'-এর পরিধি ও সীমারেখা স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছে। আমি এ শব্দের তরজমা করতে পারছি না। অথচ আমি লাখনৌর বাসিন্দা। আমি স্বীকার করছি, আমি এই শব্দের তরজমার হক আদায় করতে পারব না। এ শব্দের সরল অর্থ হলো, কথার খেলা। এখন বলুন, রেডিও টিভিতে কিসের খেলা চলে। যদি এমনটি হতো, অনেক লোক যারা একটা খেলা পছন্দ করে, তা হলে সেখানে রেডিও-টিভির কথা আসত না, কিন্তু এখানে কথার খেলা বলা হয়েছে। সুতরাং এ 'লাহওয়াল হাদীস' শব্দের মর্ম রেডিও-টিভির ওপরই পূর্ণাঙ্গভাবে প্রযোজ্য হয়। এটি কুরআনের এক অলৌকিকতা।
আমি দাবী করে বলতে পারি, হিজরী প্রথম শতাব্দী, দ্বিতীয় শতাব্দী, তৃতীয় শতাব্দী, চতুর্থ শতাব্দী, পঞ্চম শতাব্দী, ষষ্ঠ শতাব্দী, এমনকি আমি বলব, শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (র.)-এর মস্তিষ্কেও 'লাহওয়াল হাদীস' দ্বারা রেডিও-টিভির কথা আসেনি। এটি কুরআনের এক মু'জিযা। রেডিও'র প্রোগ্রাম, টিভির স্ক্রিনে যিন্দা মানুষের ছবি এবং রেডিও ও টেপ রেকর্ডার ইত্যাদি সবই 'লাহওয়াল হাদীস'।
আজ থেকে চৌদ্দশ' বছর পূর্বে এসব জিনিস আবিষ্কার হওয়া তো দূরে থাক, কারো স্বপ্নেও তা আসেনি, কারো কল্পনায়ও ছিল না, কিন্তু আল্লাহর কিতাব সে সময়েই বলে দিয়েছে-'একশ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশে 'লাহওয়াল হাদীস' তথা অবান্তর কথাবার্তা খরিদ করে।'