📘 পর্নোগ্রাফি নিরব ঘাতক > 📄 পর্ব ৩: রিওয়ার্ড সার্কিট

📄 পর্ব ৩: রিওয়ার্ড সার্কিট


আমাদের মস্তিষ্কে লিম্বিক সিস্টেম এর বাইরে সেরেব্রাল কর্টেক্স অবস্থান করে যেটার আকার মানুষের ক্ষেত্রে বেশ বড় হলেও বানর, ইঁদুর এবং অন্যান্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে তা তুলনামূলকভাবে বেশ ছোট। সেরেব্রাল কর্টেক্স আমাদের ব্রেইনের যুক্তিনির্ভর কাজগুলো সম্পাদন করে। এতে আবেগের স্থান নেই বরং এর কাজ পরিকল্পনা করা, চিন্তা করা এবং এই অংশ থেকেই আমাদের মাথায় বিভিন্ন সুন্দর সুন্দর আইডিয়া আসে। কোন কাজের ফলাফল কি হবে তা সেরেব্রাল কর্টেক্স বুঝতে পারে, কিন্তু লিম্বিক সিস্টেমের সেই ক্ষমতা নেই।

গাড়ির ইঞ্জিনের যেমন সাধারণ ডিজাইন থাকে সেরকম লিম্বিক সিস্টেমেরও রয়েছে প্রাণীগতভাবে যত ভিন্নতাই থাকুক না কেন। বিড়াল, কুকুর, ইঁদুর অথবা মানুষ সবার লিম্বিক সিস্টেম প্রায় একইভাবে কাজ করে। ক্ষুধা, মাতৃত্ববোধ, মিলন অথবা যৌন চাহিদা এবং আসক্তি যাই হোক না কেন সব ক্ষেত্রে প্রত্যেকের ব্রেইনে একই ধরণের রাসায়নিক পদার্থ নির্গত হয় এবং এদের ফাংশনও সকল স্তন্যপায়ীতে প্রায় একই।

বিজ্ঞানীরা ইঁদুরকে নিয়ে এই জন্য গবেষণা করছেন না যে তা ইঁদুরের কোন কাজে লাগাবেন, বরং তারা গবেষণা করছেন যেন আমাদের আসক্তির প্রকৃতি বুঝতে পারেন এবং সে অনুযায়ী সাহায্য করতে পারেন। এছাড়া অন্যান্য কারণও রয়েছে। এই গবেষণা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ লিম্বিক সিস্টেম সব স্তন্যপায়ীতে প্রায় একই। মনে রাখা দরকার যে আমাদের লিম্বিক সিস্টেমে রাসায়নিক পদার্থের অনুপাতই নির্ধারণ করে আমরা দুনিয়াকে কিভাবে দেখছি বা আমাদের মুড কখন কেমন হবে। যদি আমাদের লিম্বিক সিস্টেমে রাসায়নিক পদার্থের অনুপাতের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়, আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও নষ্ট হয়ে যাবে। লিম্বিক সিস্টেম কে যদি এক বাক্যে সংজ্ঞায়িত করতে হয় তাহলে বলতে হবে, এর সব কাজই কষ্টকে এড়ানো এবং বারবার আনন্দময় কাজ করার পিছে জড়িত।

টিকে থাকা নির্ভর করে ব্যথা বা কষ্ট যাই বলুন না কেন তা এড়ানোর মধ্যে। এই কষ্ট শারীরিক এবং মানসিক উভয়ই হতে পারে। আমাদের ব্রেইনকে যদি কেটে আলাদা করে ফেলা হয়, তাহলে সেখানে অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটা অংশ দেখতে পাওয়া যাবে যার নাম 'রিওয়ার্ড সার্কিট', আপনি হয়ত 'রিওয়ার্ড সেন্টার' শব্দটিও শুনে থাকবেন। এই রিওয়ার্ড সার্কিট এর সংযোগ রয়েছে লিম্বিক সিস্টেম এবং সেরেব্রাল কর্টেক্স এর মধ্যে যার সম্পর্কে আগেই বলা হয়েছে যে এটি বিভিন্ন যুক্তিনির্ভর কাজ করে। এই ব্যাপারটি এতটাই গুরত্বপূর্ণ যে পরবর্তী আলোচনার অধিকাংশেই রিওয়ার্ড সার্কিট জুড়ে থাকবে।

মূলত ব্রেইনের এই অংশতেই আমরা সকল কামনা এবং আনন্দ অনুভব করে থাকি যেমনঃ যৌন মিলন অথবা অর্গাজম। এখানেই নিয়ন্ত্রিত হয় আমরা কি পছন্দ করব অথবা করবনা। এজন্যই রিওয়ার্ড সার্কিট অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ, এটি আকারে ছোট হলেও প্রতিটা কাজের নির্দেশনা দানের পিছনেই ভূমিকা রাখছে। আপনি যদি আসক্ত হন কিছুতে তাহলে এর পিছেও রিওয়ার্ড সার্কিট দায়ী। রিওয়ার্ড সার্কিট তখনই সক্রিয় হয়ে যায় যখন আমরা এমন কোন কাজে লিপ্ত হই যার সাথে আমাদের টিকে থাকার প্রশ্ন রয়েছে অথবা আরো সূক্ষ্মভাবে বললে আমাদের জিন এবং বংশধরের টিকে থাকার প্রশ্ন।

আমাদের বিভিন্ন কাজে মোটিভেশনের পিছনে পুরষ্কারের ভূমিকা রয়েছে। ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই। মনে করুন দুটি প্রতিযোগিতা চলছে। এর মধ্যে একটিতে অংশগ্রহণের জন্য পুরষ্কার রয়েছে, অপরটিতে নেই। আমাদের রিওয়ার্ড সার্কিট যেই প্রতিযোগিতায় পুরষ্কার রয়েছে সেটিতে অংশগ্রহণের ব্যাপারে তাগিদ দেবে। এই সার্কিট আমাদের ভেতরে সুখানুভূতি তৈরী করে এবং একই সাথে সুখকে খোঁজার জন্য মোটিভেশন দেয়। এটা আপনার ভেতর ফাস্ট ফুড খাবারের চাহিদা তৈরী করবে, যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হবার জন্য আগ্রহী করবে, ঝুঁকি নিতে সাহায্য করবে।

এই সার্কিটের কারণেই আপনি আপনার সঙ্গিনীকে ভালোবাসেন, ভালোবাসেন আপনার সন্তান, পিতা-মাতাকে। আপনার টিম যখন কোন খেলায় জিতে, আপনি যখন উঁচু ভবন থেক বাঞ্জি জাম্পিং করেন অথবা উত্তাল সমুদ্রে ডাইভিং করেন তখনও এই সার্কিট সক্রিয় হয়ে যায়। কোন কাজে যত বেশী উত্তেজনা বোধ করবেন, রিওয়ার্ড সার্কিটও তত বেশী সক্রিয় হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, স্বাভাবিক কিছু আনন্দ যেমন অপরূপ সূর্যাস্ত দেখা, পার্কের ভেতর দিয়ে হাঁটা, স্ত্রীর কাছ থেকে নির্মল হাসি উপহার পাওয়া এসবও রিওয়ার্ড সার্কিটকে সক্রিয় করে। বিভিন্ন কারণে ব্রেইনের নির্দিষ্ট অংশে রাসায়নিক পদার্থ নির্গত হওয়া শুরু বা বন্ধ হতে থাকে। রিওয়ার্ড সার্কিটের ক্ষেত্রে সেই পদার্থটি হচ্ছে ডোপামিন। ডোপামিন নিউরোট্রান্সমিটার গ্রুপের মূল রাসায়নিক পদার্থ যা রিওয়ার্ড সার্কিটকে সচল করে। রিওয়ার্ড সার্কিট যদি ইঞ্জিন হয় তাহলে ডোপামিন হচ্ছে গ্যাস। আপনি যদি উচ্চ ক্যালোরি সমৃদ্ধ বিভিন্ন খাবার যেমনঃ বার্গার, পিজ্জা এসব পছন্দ করেন তাহলে এর পিছনে কারণ হতে পারে এসব খেলে আপনার ব্রেইনে প্রচুর ডোপামিন নির্গত হয়।

আপনি নিম্ন ক্যালোরির খাবার পছন্দ করেন না কারণ সেই পরিমাণ ডোপামিন এধরণের খাবার খেলে আপনার ব্রেইনে নির্গত হয় না। আপনি সেই খাবার খেতে ইচ্ছাপোষণ করেন কারণ ব্রেইন আপনাকে এর জন্য বেশী পুরষ্কার/আনন্দ দিচ্ছে। এজন্যই আপনার কাছে চকোলেট কেক বেশী ভালো লাগে ব্রকোলির চেয়ে কারণ চকোলেট কেক বানানো হয়েছে আপনাকে উচ্চ ক্যালোরি সরবরাহ করার জন্য আর আপনার ব্রেইন এ সম্পর্কে অবগত। একইভাবে মিষ্টি খাবার আপনার রিওয়ার্ড সার্কিটকে সচল করে। আপনার রক্তে সুগারের প্রয়োজন এজন্য আপনি মিষ্টি খাবার খান না বরং আপনার ব্রেইন সুগার খাবার পুরষ্কার পেতে চায় বলেই আপনি মিষ্টি খাবার গ্রহণ করেন।

মেথ অথবা কোকেইন এর মত ড্রাগ গুলোকে যদি বাদ দেয়া হয় তালিকা থেকে, তাহলে প্রচুর পরিমাণে ডোপামিন নিঃসরণের তালিকায় সবচেয়ে উপরে থাকবে অর্গাজম। যেকোন কাজ করার মোটিভেশনের পিছনে ডোপামিনের অবদান রয়েছে। ব্যাপারটা এমন না যে আপনি আসলেই আইস-ক্রিম খেতে চাচ্ছেন অথবা সুন্দরী কোন তারকার সাথে ডেটে যেতে চাচ্ছেন, বরং এসব কাজের মাধ্যমে আপনি আপনার রিওয়ার্ড সার্কিটের দ্বারা অধিক ডোপামিনের নিঃসরণ আকাঙ্খা করছেন। আপনি লটারি জিততে চান এই জন্য নয় যে আপনি টাকা পাবেন, বরং আপনি টাকা পেলে আপনার রিওয়ার্ড সার্কিট অ্যাক্টিভ হয়ে আপনার মস্তিষ্কে সুখানুভূতি তৈরী করবে, আর আপনি সেটাই চাচ্ছেন। কোন কাজের পিছনে ডোপামিনের নিঃসরণ যত বেশী হবে আপনি সেটা তত বেশী করতে চাইবেন। প্রশ্ন আসতে পারে, কেন বিলিওনেয়াররা এত এত টাকা থাকার পরেও রিটায়ার করেনা? তাদের তো আর টাকার প্রয়োজন নেই।

উত্তর এখানেই রয়েছে, তাদের টাকার প্রয়োজন না থাকলেও ডোপামিনের প্রয়োজন রয়েছে। তারা স্টক মার্কেটে শেয়ার জিতার মাধ্যমে ডোপামিন চায়, তারা বিভিন্ন আনন্দ-ফুর্তির মাধ্যমে ডোপামিন খোঁজে।

📘 পর্নোগ্রাফি নিরব ঘাতক > 📄 পর্ব ৪: ডোপামিনঃ মলিকিউল অফ অ্যাডিকশন

📄 পর্ব ৪: ডোপামিনঃ মলিকিউল অফ অ্যাডিকশন


ডোপামিন নিঃসরণের একটা প্যাটার্ন রয়েছে, অনেকটা রোলার কোস্টারের মত। বায়োলজিতে একটা নিয়ম রয়েছে, যা বেড়ে যাবে তাকে একসময় কমতেও হবে। এটা খাদ্য, যৌন মিলন অথবা তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পানিও হতে পারে। ধরুণ আপনি অনেক ক্ষুধার্ত, এসময়ে ডোপামিনের পরিমাণ আপনার ব্রেইনে বাড়তে থাকবে। এরপরে যখন বার্গারের কথা চিন্তা করবেন তখন ডোপামিন আরো বাড়বে, আর যখন বার্গারটা আপনার সামনে পরিবেশন করা হবে চিজ ও হট সস মাখিয়ে, তখন ডোপামিন একদম চূড়ায় পৌঁছে যাবে। এরপরে যখন কামড় দেবেন বেশ আনন্দ লাগবে, কিন্তু প্রতি কামড়ে এই আনন্দ কমে আসবে। এবং শেষ কামড়ের সাথে সাথে ডোপামিন এর চাহিদা আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

এই একই উঠানামার প্রয়োগ রয়েছে মাস্টারবেশন অথবা যৌনমিলনে। অর্গাজমের ঠিক আগ মূহুর্তে আনন্দ একদম চূড়ায় পৌঁছে যাবে (তবে মনে রাখা দরকার, অর্গাজমের পিছনে অন্য কিছু নিউরোকেমিক্যাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে যেমন ওপিয়েট, ডোপামিন নয়)। ডোপামিন আপনাকে অর্গাজম ঘটানোর জন্য কেবল মোটিভেশন দেবে, কিন্তু অর্গাজমের অনুভূতি আসে অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণের ফলে।

নতুন কারো সাথে সাক্ষাৎ করা, নতুন গাড়ি-বাড়ি কেনা, নতুন স্মার্টফোন কেনা এসবও ডোপামিনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় কারণ আমাদের ব্রেইন নূতনত্ব পছন্দ করে।

আপনি বিয়ের দাওয়াত খাচ্ছেন, এসময় আপনার টেবিলে ডেজার্ট পরিবেশন করা হল। যদিও আপনি আপনার খাবার শেষ করেননি এরপরেও নতুন খাবার দেখে আপনার ব্রেইনে ডোপামিনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। আপনার পেট যদি ভর্তিও থাকে রিওয়ার্ড সার্কিট সেটা দেখবেনা, বরং সে তার প্রভাব বিস্তার করবে সে অবস্থাতেই। সে আপনাকে নতুন খাবার খাইয়ে ডোপামিন রিলিজ করাবে। আপনার সেরেব্রাল কর্টেক্স আপনাকে বলছে আর খাওয়া যাবেনা, মুটিয়ে যাবেন অন্যদিকে রিওয়ার্ড সার্কিটের যেহেতু ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা নেই তাই সে এধরণের কোন সিগন্যাল দেবেনা। পর্ণোগ্রাফির ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার, যেরকম নতুন জিনিসে আগ্রহ ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় পর্ণোগ্রাফির ক্ষেত্রেও একই জিনিস বারবার দেখলে প্রথমবারের মত ডোপামিন নিঃসৃত হয় না, ফলে ইউজার পর্ণের ধরণ পরিবর্তন করেন।

কুলিজ ইফেক্টে আবার ফিরে আসা যাক। মূলত ডোপামিনই কুলিজ ইফেক্টের পিছনে দায়ী। ধরুন, আমাদের কাছে দুটো মাদী-ইঁদুর রয়েছে। মাদী-ইঁদুর #১ এবং মাদী-ইঁদুর #২। মাদী-ইঁদুর #১ এর সাথে পুরুষ ইঁদুরের প্রতিবার সঙ্গমে ডোপামিনের পরিমাণ হ্রাস পেতে থাকবে এবং একপর্যায়ে সে সঙ্গমে পুরোপুরি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে কারণ তার রিওয়ার্ড সার্কিট আর ডোপামিন সরবরাহ করছেনা। এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে যৌনশক্তির পেছনে ডোপামিনের গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

এরপরে যদি আমরা মাদী-ইঁদুর #২ কে পুরুষ ইঁদুরের সামনে উপস্থাপন করি তাহলে আবার তার ব্রেইনে ডোপামিনের বন্যা বয়ে যায় যা তার যৌনশক্তিকে আবার জাগিয়ে তোলে এবং সে আবার পূর্ণ উদ্যমে ইঁদুরের সাথে মিলিত হত। কুলিজ ইফেক্ট এর কারণ এটাই।

ঠিক এ কারণেই মানুষ একটি পর্ণ ভিডিও দেখতে দেখতে নতুন আরো দুটি ভিডিওর ট্যাব ওপেন করে যেন তার ব্রেইন তাকে নতুন করে ডোপামিন সরবরাহ করে কারণ আগেই বলেছি, নতুনত্ব ডোপামিন নিঃসরণে প্রভাব ফেলে।

এই পর্যায়ে এসে ডোপামিনের একটি ডাকনাম দেয়া যায় 'দ্য মলিউকিউল অফ অ্যাডিকশন।' এর কারণ ব্রেইনে যেসব পরিবর্তনের কারণে আমরা কোন কিছুতে আসক্ত হই তা মূলত ব্রেইনে ডোপামিনের মাত্রার পরিবর্তনের উপরেই নির্ভরশীল। কোকেইন, অ্যালকোহল, নিকোটিন এগুলোর সবগুলিই ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির হলেও এর সবগুলোই ডোপামিনের বন্যা বইয়ে দিতে সক্ষম। সকল আসক্তিকর রাসায়নিক পদার্থ এবং কাজ ডোপামিনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এজন্যই আমরা আসক্ত হই। অবশ্যই যে জিনিসের প্রতি আসক্তি আমাদের রয়েছে তার নিয়মিত সরবরাহ প্রয়োজন হবে আসক্তি টিকিয়ে রাখার জন্য যেন তা ব্রেইনে গঠনগত পরিবর্তন আনতে পারে।

আরেকটি অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, ডোপামিন নিঃসৃত হয় আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী, প্রকৃত যে আনন্দ পাওয়া যাবে তার উপর নির্ভর করে নয়। ডোপামিন মূলত আমাদের আকাঙ্ক্ষার দিকে পরিচালিত করে, মোটিভেশন দেয়। তবে প্রকৃত আনন্দ আসে 'ওপিওয়েড' থেকে যা মরফিনের মতই রাসায়নিক পদার্থ যা ব্রেইনে নির্গত হয়। অর্থাৎ ডোপামিন হচ্ছে কোনকিছুর আনন্দ প্রত্যাশা করা আর সেই প্রত্যাশার পূর্ণতা দেয় 'ওপিওয়েড'।

আসক্তি বলতে মূলত ডোপামিনের পিছনে ছোটা বোঝায়। প্রকৃতপক্ষে যা ঘটে, আসক্তির কারণে আমরা কোন কিছুকে অনেক বেশী প্রত্যাশা করি কিন্তু তুলনামূলক কম পছন্দ করি। চাহিদা এবং এতে রিওয়ার্ড সার্কিট এর ভুমিকা নিয়ে এক্সপেরিমেন্টও রয়েছে।

একটি ইঁদুরকে খাচায় রাখা হয় এবং সেই খাচার এক প্রান্তে একটি বাটন রয়েছে। ইঁদুরের মাথায় একটি তার সংযুক্ত করা ছিল এবং সেই তারের প্রান্তে ইলেকট্রোড ছিল যা আবার সংযুক্ত ছিল ইঁদুরের রিওয়ার্ড সার্কিটের সাথে। যখনই ইঁদুরটি সেই বাটনে চাপ দেয়, তারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত মাত্রার বিদ্যুৎ তার রিওয়ার্ড সার্কিটে পৌঁছে সেটিকে উদ্দিপ্ত করে। ইঁদুরটি বাটনে ক্লিক করতেই থাকে করতেই থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না এটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সে ঘুমানোর জন্য, খাবার জন্য অথবা এমনকি যৌন মিলনের জন্যেও বাটনটি প্রেস করা থেকে বিরত থাকবেনা। সে সবকিছুর বিনিময়ে বাটনটি প্রেস করতে চাইবে। মারাত্মকভাবে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যেও আমরা এরূপ আচরণ দেখি।

এইবার আরেকটি এক্সপেরিমেন্ট চালানো হয়। পূর্বের ইঁদুরটিকে সরিয়ে ফেলা হয় এবং সেখানে নতুন ইঁদুর রাখা হয়। খাঁচার অপর প্রান্তে রাখা হয় বাটনটি। ইঁদুর এবং খাঁচার মধ্যবর্তী রাস্তায় ইলেকট্রিক গ্রিড রাখা হয়। অর্থাৎ লিভার পর্যন্ত পৌঁছাতে হলে তাকে ইলেক্ট্রিক শক খেতে হবে যা যথেষ্ট পীড়াদায়ক। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, ইঁদুরটি এই ইলেক্ট্রিক শক সহ্য করে হলেও সে ইলেক্ট্রিক গ্রীড অতিক্রম করবে এবং বাটনটি প্রেস করবে। কিন্তু এবার যদি খাঁচার অপর পাশে খাবার রাখা হয় এবং খাবার পর্যন্ত পৌছানোর রাস্তায় ইলেকট্রিক গ্রীড রাখা হয় ইঁদুরটি স্রেফ তার জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, সে না খেয়ে মরে গেলেও ইলেকট্রিক শক সহ্য করে খাবারের কাছে যাবেনা।

এবার আরেকটি এক্সপেরিমেন্ট যেখানে ডোপামিনের ক্ষমতা এবং তার সাথে রিওয়ার্ড সার্কিট এর সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হবে। যদি তাদের মস্তিষ্কে ডোপামিনের নিঃসরণ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে তারা সকল মোটিভেশন হারিয়ে ফেলে। তাদের সামনে খাবার ফেলে রাখলেও তারা সেখানে না হেঁটে গিয়ে না খেয়ে মারা যায়।

ব্যাপারটি এমন নয় যে তারা খাবারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে, বরং তারা খাবার পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য যে মোটিভেশন দরকার সেটা পাচ্ছেনা, এরূপ অবস্থায় তারা যৌনক্রিয়াতেও লিপ্ত হবেনা কারণ তার সকল যৌনশক্তি উধাও হয়ে গেছে ডোপামিন না থাকার ফলে। তারা তখনও খাবার পছন্দ করে, যদি তাদের মুখে খাবার তুলে দেয়া হয় তারা সেটি গ্রহণ করবে।

মূল কথা হচ্ছে, আমাদের কাজ করার জন্য একদম সঠিক পরিমাণের ডোপামিন প্রয়োজন। এর অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে, যেমন এটা আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়, আপনার ভেতরে পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করে, আপনাকে আনন্দিত রাখে। কিন্তু ডোপামিনের ভারসাম্য না থাকলে বিভিন্ন মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হবে।

📘 পর্নোগ্রাফি নিরব ঘাতক > 📄 পর্ব ৫: অ্যাডিকশন টেস্ট

📄 পর্ব ৫: অ্যাডিকশন টেস্ট


এবার আসক্তির উপর পরীক্ষা নেয়া হবে। আপনি যদি নিম্নোক্ত প্রশ্নের তিনটি বা এর অধিক প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ উত্তর দেন তাহলে আপনার আসক্তি রয়েছে অন্তত আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন অনুযায়ী। তবে যদি দুই এর কম হয় তাহলে আপনার তেমন চিন্তিত হবার কারণ নেই। তবে এটা মূল টেস্ট নয় বরং শর্ট ভার্শন বলা যেতে পারে। কিছু কিছু বিষয় বাদ দেয়া হয়েছে এবং এই টেস্ট শুধুমাত্র পর্ণোগ্রাফি নয় বরং যেকোন আসক্তির ক্ষেত্রেই বলা যেতে পারে।

প্রথম প্রশ্নঃ আপনি কি পূর্বের চেয়েও অধিক সময় আসক্তির পিছনে ব্যয় করছেন? আপনি কি আরো 'কড়া' বা বিকৃত ধাঁচের পর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন?

দ্বিতীয় প্রশ্নঃ আপনি কি সেখান থেকে ফিরে আসার চেষ্টা করেছেন?

আসক্তি থেকে থাকলেও ফিরে আসার চেষ্টা বা লক্ষণ যে থাকবেই ব্যাপারটা এমন নয়। অনলাইন ফোরামে অনেক ব্যবহারকারীই পর্ণোগ্রাফি থেকে ফেরার পর কিছু লক্ষণ এর কথা বলেছেন। এই লক্ষণগুলি বিভিন্ন হতে পারেঃ ক্লান্তি, রাগ, দুশ্চিন্তা, খিটখিটে মেজাজ, ডিপ্রেশন ইত্যাদি। এগুলো কমন কিছু লক্ষণ। তবে অনেকে শারিরীক পরিবর্তনের কথাও বলেছেন যেমন ঠান্ডা লাগা, ফ্লু, মাথা ব্যথা, নির্ঘুম রাত কাটানো ইত্যাদি।

তৃতীয় প্রশ্নঃ আপনি কি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছেন না এবং সেই কাজে লিপ্ত হচ্ছেন?

আপনি যেরকম সময় ব্যবহারের চিন্তা করেন তার চাইতেও দীর্ঘ সময় ধরে কি সেই কাজে লিপ্ত থাকছেন? আমার মনে এটি ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন নেই।

চতুর্থ প্রশ্নঃ আপনি কি সেই আসক্তির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে অবগত যা আপনার শরীর, মননে, যৌন ক্ষমতা হ্রাস ইত্যাদি ক্ষেত্রে পড়ছে?

পঞ্চম প্রশ্নঃ সেই কাজের কারণে কি আপনি অন্য কোন প্রয়োজনীয় কাজ থেকে বিরত থাকছেন বা পরবর্তী সময়ের জন্য ফেলে রাখছেন?

এর অর্থ আপনি জীবনের বিভিন্ন গুরত্বপূর্ণ কাজ ফেলে পর্ণোগ্রাফিতে সময় দিচ্ছেন।

ষষ্ঠ প্রশ্নঃ এ থেকে মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছা কি আপনার রয়েছে?

অনেক আসক্ত ব্যক্তিই বলে তারা চাইলেই যেকোন মূহুর্তে মুক্তি পেতে পারবে। কিন্তু তারা এটা থেকে মুক্ত হয়না। আপনি যদি অনেকবার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালান তাহলে এই প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ হবে।

শেষ সপ্তম প্রশ্নঃ আপনি কি আপনার গুরত্বপূর্ণ সময় এবং এনার্জি এর পিছনে দিছেন?

এখন আচরণগত আসক্তির কারণের ব্যাখ্যা দেয়া যাক। এটা সাধারণ জ্ঞানের বিষয় যে ডোপামিন বৃদ্ধিকারণ বস্তু যেমন অ্যালকোহল, কোকেইন, মেথ ইত্যাদি ব্রেইনে বিভিন্ন পরিবর্তন আনে যা আসক্তির দিকে কাউকে ঠেলে দেয়। কিন্তু শপিং, ফুড, জুয়া, যৌনমিলন এগুলোও কি ব্রেইনে পরিবর্তন আনে যা আসক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়?

উত্তরটি হবে, নিশ্চয়ই। তারা পরিবর্তন আনে বলেই তো তাদের আসক্তি বলা হয়। সম্প্রতি জুয়া এবং খাবারের উপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে এসব আসক্তির ফলে ব্রেইনের পরিবর্তন মাদকাসক্তির মত। ইন্টারনেট পর্ণের ব্যাপারে সাধারণত কেউই জানতে চায়না আর যেহেতু এটা খুবই নতুন এক ঘটনা (ইন্টারনেট পর্ণোগ্রাফির সমস্যাটি মূলত কয়েকবছর আগে সৃষ্টি হয়েছে) তাই এ ব্যাপারে তেমন গবেষণাও নেই। এখন বলুন, কোনটা বেশী উত্তেজনা সৃষ্টি করে চিজকেক খাওয়া নাকি পর্ণোগ্রাফি দেখা বা মাস্টারবেশন করা? অর্গাজমের কারণে ডোপামিনের পরিমাণ খাবারের চাইতে অনেক বেশি বেড়ে যায়। কোন কাজের পিছনে পর্ণাসক্তরা বেশী সময় ব্যয় করে খাবার না পর্ণোগ্রাফিতে?

প্রাকৃতিক কারণ সম্পর্কে কথা বলা যাক। প্রাকৃতিক কারণ একটি নতুন শব্দ যা দিয়ে বোঝানো হয় এমন কোন কাজকে যার সাথে মাদকের সম্পৃক্ততা না থাকলেও তা ডোপামিন নিঃসরণ করে যার মধ্যে রয়েছে খাবার, যৌনমিলন, জুয়া, ভিডিও গেইম ইত্য্যাদি। আপনি যদি উপাত্তের দিকে তাকান তাহলে দেখবেন মাত্র ১৫ শতাংশই তীব্রভাবে কোনকিছুতে আসক্ত হয় যার পেছনে জিনের প্রভাব রয়েছে। তবে প্রাকৃতিক কারণের দিকে যদি আকানো যায় যার মধ্যে খাবারও রয়েছে, তাহলে এবার আমাদের হাতে প্রচুর সংখ্যক মানুষ রয়েছে যারা আসক্ত হতে পারে।

যদিও এধরণের আসক্তিতে প্রচুর সময় লাগে মাদকের চেয়ে। চিন্তা করে দেখুন, কয়জন মানুষ মোটা হতে চায়? অথচ বাস্তবে অধিকাংশ মানুষই স্থূলতায় ভুগছে, অন্তত পাশ্চাত্য সমাজে।

অন্যদিকে ইঁদুরের যায় আসে না সে মোটা হলে। যখন তারা উচ্চ ক্যালোরি যুক্ত খাবার খায় তখন তাদের সবাই প্রয়োজনের চাইতে অতিরিক্ত গ্রহণ করে আর শুধু মোটাই হয় না, স্থূল হয়ে যায়। এখান থেকে দুটো জিনিস অনুমান করা যায়। যখন প্রাকৃতিক কারণের ব্যাপারটি আসে তখন আমাদের রিওয়ার্ড সার্কিট সেক্ষেত্রে নিজের বিবর্তন ঘটিয়ে নিয়েছে। এটি আমাদের খাবার এবং যৌন মিলনের প্রতি আগ্রহী করেছে কিন্তু মাদকের প্রতি করেনি। এজন্যই প্রচুর মানুষ খাবারে এবং ইন্টারনেট পর্ণে আসক্ত হয়ে যায়।

এই খাবার এবং যৌন মিলনের অধিক আকর্ষণীয় অথবা উত্তেজনাকর কোন ভার্শন আমাদেরকে আরো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরতে পারে যদিও আমরা তার প্রতি জিনগতভাবে ধারণে সমর্থ নয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কখন প্রাকৃতিক কারণগুলি আসক্তিতে পরিণত হয়?

প্রথমত, যখন এগুলি আমাদের পূর্বপুরুষদের অভিজ্ঞতার চাইতেও অধিক উত্তেজ্নাকর হবে।

দ্বিতীয়ত, যখন এগুলির অধিক সরবরাহ থাকবে।

তৃতীয়ত, যখন এগুলোতে প্রচুর বৈচিত্র্য থাকবে যেটাকে নতুনত্ব হিসেবে বিবেচনা করেছি আগে।

চতুর্থত, যখন আমরা এগুলোতে আসক্ত হই এটা না জেনে যে এটি আমাদের ব্রেইনে পরিবর্তন আনতে পারে।

বর্তমানের উচ্চ ক্যালোরিসমৃদ্ধ খাবার এবং ইন্টারনেট পর্ণ এই চারটি কারণকেই পূরণ করে।

দুটোই আমাদের ব্রেইনের স্বাভাবিক কার্যপদ্ধতিকে বদলে দেয় এবং যতক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ করা সম্ভব ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের ব্রেইন গ্রহণের নির্দেশ দেয়। এর কারণ ক্যালোরি এবং প্রজনন দুটোই জিনগতভাবে মানুষ সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00