📘 পর্নোগ্রাফি নিরব ঘাতক > 📄 পর্ব ১: ভূমিকা

📄 পর্ব ১: ভূমিকা


এই আর্টিকেলটির মূল লক্ষ্য হচ্ছেন তারাই যারা পর্ণোগ্রাফিতে দারুণভাবে আসক্ত। কেবল আপনিই নির্ধারণ করতে পারবেন এধরণের বদভ্যাস আপনার আছে কিনা।

যাই হোক, আমার এবং আমার স্ত্রীর রিলেশনশিপের উপরে একটি ওয়েবসাইট ছিল। এটাতে পর্ণোগ্রাফি রিলেটেড কিছু ছিল না, অন্তত শুরুর দিকে নয়। তবে যৌনমিলনের স্নায়ুবিজ্ঞান, বিবর্তন এবং আসক্তি সম্পর্কিত বেশ কিছু আর্টিকেল ছিল। ৫ বছর আগে আমাদের ওয়েবসাইটে পর্ণ ইউজাররা আসতে থাকে যারা হয়ত গুগলের মাধ্যমে সাইটের খোঁজ পেয়েছে। তারা একের পর এক আসতে থাকে আর তাদের দুঃসহ জীবনের গল্প শেয়ার করে। তাদের গল্প থেকে আমরা অনেক কিছুই জানতে পেরেছি। সেই জানা থেকেই এখন কিছুটা আলোচনা করা হবে।

প্রথমত, ইন্টারনেট পর্ণ কোন প্লেবয় ম্যাগাজিন নয়। ম্যাগাজিনের আকর্ষণ খুব দ্রুতই হারিয়ে যায়। ইন্টারনেট পর্ণ স্থিরচিত্রের চেয়ে অনেক বেশি স্টিমুলেটিং। কারণ এতে প্রচুর নতুনত্ব রয়েছে আর একের পর এক ছবিতে খুব দ্রুতই স্লাইড করে পরিবর্তন করা যায়।

দ্বিতীয়ত, ইন্টারনেট পর্ণে আসক্ত হবার জন্য সেই ব্যক্তির আগে থেকেই কোন বিষয়ে আসক্তি থাকার মত ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন পড়ে না। তবে এর জন্য প্রবণতা থাকা প্রয়োজন, জিনগতভাবে কোন কিছুতে আসক্ত হবার প্রবণতা। এটা নিশ্চয়ই সত্য কিন্তু আমরা দেখেছি যেসব ছেলেরা আমাদের সাইটে এসেছিল তাদের এটা ব্যতীত অন্য কোন আসক্তি ছিল না। তারা সাধারণ কিছু ছেলে যারা এটা দেখা শুরু করে এবং আসক্ত হয়ে যায়। আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, যখনই তারা পর্ণ দেখা বন্ধ করে তখনই তারা 'পূর্বের স্বাভাবিক আমি'তে ফিরে যায়।

তৃতীয়ত, অতিমাত্রায় পর্ণাসক্তি ব্রেইনের উপর কিরূপ প্রভাব ফেলে তা বোঝাটা এর ব্যবহারকারীদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যখন আপনি বুঝবেন আপনার ব্রেইন কিভাবে কাজ করে, তখন পর্ণোগ্রাফির করাল থাবা থেকে মুক্তি পাওয়াও অনেকটা সহজ হবে।

পর্ণ ব্রেইনকে অত্যন্ত স্টিমুলেট করে যার ফলে এর গঠন পরিবর্তিত হয়ে যায়। অন্যান্য সকল আসক্তিতে ব্রেইনে যেমন প্রভাব পড়ে পর্ণোগ্রাফির ক্ষেত্রেও এর প্রভাব ঠিক সেরকম। ব্রেইনের এই পরিবর্তন আপনার চাহিদার পিছনে দায়ী। যদিও আপনি পর্ণ থেকে মুক্তি চান তারপরেও ব্রেইনের এই পরিবর্তন আপনাকে বারবার ফিরিয়ে আনে। এজন্য ইন্টারনেট পর্ণকে সুপার-স্টিমুলাস বলা হয়। এর অর্থ হচ্ছে, পর্ণের প্রভাব এতটাই বেশী যার সমতুল্য কিছুর মুখোমুখী আমরা আমাদের বিবর্তনকালে হইনি। বেশ আগে আমাদের ব্রেইন শিকারে অভ্যস্থ ছিল।

বলার প্রয়োজন নেই যে এটা এখনো কিছুটা থাকলেও আমাদের পরিবেশ কিন্তু পুরোপুরিই বদলে গেছে। কিন্তু গত কয়েক হাজার বছরে আমাদের ব্রেইনের গঠনের তেমন পরিবর্তন ঘটেনি। এর অর্থ, আমাদের ব্রেইন আধুনিক যুগের অনেক কিছুর সাথেই পরিপূর্ণভাবে মানিয়ে চলতে পারে না যেমন বাক্সের মত বাড়িতে বসবাস, চাকুরিতে যাওয়া, বসে বসে কাজ করা অথবা গ্লোবাল ওয়ার্মিনহ এবং অর্থনীতি নিয়ে চিন্তিত থাকা। আমাদের এখন ক্যাম্পফায়ারের আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসার কথা ছিল, কিন্তু আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকি কম্পিউটারে ইন্টারনেট পর্ণের সামনে।

আরেকটি উদাহরণ দেয়া যাক যা দিয়ে আমরা বুঝতে পারব যে কিভাবে আমাদের মস্তিষ্ক পরিবেশের সাথে নিজেকে বদলে নিতে পারেনি। আগেকার শিকারীদের মধ্যে কয়জনের ভুড়ি ছিল? আমি অন্তত এমন ছবি কখনোই দেখিনি। কিন্তু বর্তমানে ৭০ শতাংশ আমেরিকানই স্থূলতায় ভুগছে। কি ঘটছে তাহলে? আমাদের ব্রেইনকে ডিজাইন করা হয়েছে উচ্চ ক্যালোরির খাদ্যকে আনন্দের সাথে গ্রহণ করার জন্য কারণ এটি বেঁচে থাকার জন্যেও জরুরি। পূর্বেকার যুগে উচ্চ ক্যালোরি সমৃদ্ধ খাবার তেমন ছিলই না। ছিল বলতে কেবল চিনি, ফলের সুগার, বাদام এগুলিই। কিন্তু বর্তমানে আমাদের সামনে পরিশোধিত শর্করা এবং উচ্চ স্নেহজাতীয় খাবার অহরহ। এই ধরণের খাবারও আমাদের ব্রেইনের জন্য সুপার-স্টিমুলেটিং এবং এই স্টিমুলেশন আমাদের পূর্বেকার যেকোন কিছুর মাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে, ইন্টারনেট পর্ণের মত।

আপনার ব্রেইন বলছে আপনাকে বাঁচতে হবে অর্থাৎ যাও ক্যালোরিযুক্ত খাবার খাও। এজন্য আপনার অপরিপক্ক ব্রেইন এধরণের খাবার গ্রহণের সুযোগ পেলে কোনমতেই ছাড়তে চায় না। এরফলে অনেক সময় মানুষ প্রয়োজনের চাইতেও অতিরিক্ত খেয়ে ফেলে।

একই নিয়ম খাটে সেক্সুয়াল পার্টনারের ক্ষেত্রেও। ব্রেইন আমাদের বাচ্চা গ্রহণের ব্যাপারে উৎসাহ দেয়। মানুষ সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় নিজের বংশধর রেখে যাওয়ার ক্ষেত্রে। এখানে একটা প্রশ্ন, সেই প্রাচীন যুগের শিকারীরা সর্বোচ্চ কয়জন পার্টনারের সাথে জীবনে দেখা হত? কয়েক জন, এরচেয়ে খুব বেশি তো নয়। কয়জনের সাথে মিলিত হত? সে সংখ্যাটা অত্যন্ত ক্ষুদ্র হবে। কিন্তু পর্ণ ইউজাররা এক সেশনে যতজন নারী বা পুরুষকে দেখে ফেলে অশালীন অবস্থায়, আমাদের পূর্বপুরুষরা কয়েক প্রজন্মেও তা দেখতেন কিনা সন্দেহ। এজন্য পর্ণোগ্রাফিও সুপার স্টিমুলাস। আমাদের ব্রেইন কখনো এধরণের হেভি পর্ণ ইউসেজকে নিয়ন্ত্রণের জন্য বিবর্তিত হয়নি। এবং জাংক ফুডের মতই, একজন ব্যবহারকারী যতই পর্ণোগ্রাফি ব্রাউজ করুক না কেন সে সন্তুষ্ট হতে পারবেনা।

📘 পর্নোগ্রাফি নিরব ঘাতক > 📄 পর্ব ২: দ্য কুলিজ ইফেক্ট

📄 পর্ব ২: দ্য কুলিজ ইফেক্ট


আরেকটি কারণে ইন্টারনেট পর্ণোগ্রাফি অত্যন্ত স্টিমুলেটিং এবং আসক্তিপ্রবণ। পর্ণোগ্রাফিতে আসক্তিতে ডুবে থাকার কারণ আমাদের আদিম মস্তিষ্কে লুকিয়ে থাকা একটি পুরোনো প্রোগ্রাম যাকে সাবকনশিয়াস বা অবচেতন প্রোগ্রামও বলা হয়। একটি এক্সপেরিমেন্টের কথা বলা যাক যেটা অনেকবার করা হয়েছে। কি ঘটবে যদি খাঁচায় একটি পুরুষ ইঁদুরের সাথে প্রাপ্তবয়স্ক মাদী ইঁদুর রাখা হয়? শুরুতেই পুরুষ ইঁদুরটি মাদী ইঁদুরের সাথে মিলিত হয় এবং কিছুক্ষণ পরেই সে প্রথম মাদী-ইঁদুরের সাথে সঙ্গমের কারণে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। মাদী ইঁদুরটি এতে সন্তুষ্ট হয়নি বরং সে আরো প্রত্যাশা করছে। কিন্তু পুরুষ ইঁদুরের পক্ষে আর উত্তেজিত হওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তাহলে এখন কি করা যায়? এবার মূল মাদী ইঁদুরের বদলে আরেকটি ফ্রেশ মাদী ইঁদুর বদল করা হল। এতে পুরুষ ইঁদুরটি আবার প্রাণ ফিরে ফেল এবং পূর্বের মত আবার এই ইদুরটির সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হল যতক্ষণ পর্যন্ত না পূর্বের ঘটনার আবার পুনরাবৃত্তি ঘটে। এবারও পুরুষ ইঁদুরটি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে দ্বিতীয় মাদী ইঁদুরের প্রতি।

আমরা এখানে একটা প্যাটার্ন লক্ষ করি। এই প্রক্রিয়াটা বারবার করা যাবে নতুন ফ্রেশ ইঁদুরের সাহায্যে যদিও বলা যাচ্ছেনা কতবার। ইতিমধ্যেই ইঁদুরটি ক্লান্তির কারণে আধমরা হয়ে যাবে। এই পুরো ব্যাপারটি আমাদের ব্রেইনে থাকা জেনেটিক প্রোগ্রাম এর সাথে সম্পর্কিত। এসবের সাথে আমাদের প্রজনন অঙ্গের কোন যোগাযোগ নেই। সবকিছুই ঘটছে আমাদের ব্রেইনে এবং এর কারণ নতুন প্রজন্ম সৃষ্টি করা এবং আরো স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, নতুন প্রজন্মে অধিক বৈচিত্র্য আনা।

এবার আমরা একটি গ্রাফে চলে যাব। গ্রাফের এক্স-অক্ষে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন স্ত্রী প্রাণীর সংখ্যা এবং ওয়াই-অক্ষে এজ্যাকুলেশন বা বীর্যপাতের সময় মিনিট এককে। একটি পরীক্ষায় পুরুষের বিপরীতে কেবল একটি মাদী প্রাণী রাখা হয় এবং অপর আরেকটি পরীক্ষায় একটি পুরুষের বিপরীতে কয়েকটি মাদী-প্রাণী রাখা হয়। এরফলে বীর্যপাতের সময়ের কিরকম পরিবর্তন হচ্ছে?

একই মাদী-প্রাণীর সাথে প্রতিবার সঙ্গমে তার বীর্যপাতের জন্য অধিক সময় প্রয়োজন হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিবারেই সময় বেড়েছে এবং যখন এক্সপেরিমেন্টটি বন্ধ করে দেয়া হয় তখন এটি দাঁড়ায় ১৮ মিনিটে।

এখন, একটা ভেড়া বাঁচে গড়ে ১২ বছর, সে হিসেবে তার ১৮ মিনিট মানুষের ২ ঘন্টার সমতুল্য, সময়টা নেহাৎ কম নয়।

এবার ভিন্ন ভিন্ন মাদী-প্রাণীর সাথে সঙ্গমে খুব দ্রুতই পুরুষ-প্রাণীটি বীর্যপাত করে। এর কারণ সে অত্যন্ত উত্তেজিত ছিল ভিন্ন ভিন্ন মাদী- প্রাণী ব্যবহারে যেটা একক প্রাণীর ক্ষেত্রে ঘটেনি। এবারের সময়টা নেমে এসেছে মাত্র ৩-৪ মিনিটে।

হেভি পর্ণ ইউজারদের ক্ষেত্রেও উত্তেজিত হবার জন্য এমনটাই প্রয়োজন হয়। একই জিনিসে তারা আর পূর্বের মত উত্তেজিত বোধ করে না। এখানে প্রাণীদের ক্ষেত্রে যে ব্যাপারটি ঘটেছে তাকে বলা হয় 'দ্য কুলিজ ইফেক্ট'। এটার শুরু হয় বর্তমান যৌনসঙ্গিনীর প্রতি অনীহার মাধ্যমে যা প্রাণ ফিরে পায় নতুন যৌনসঙ্গিনীর মাধ্যমে। এই ইফেক্টটি সকল স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে বিদ্যমান যা শুধু পুরুষ নয় নারীদের মধ্যেও কিছুটা দেখা যায়।

পর্ণ ইউজাররা ল্যাবরেটরির ইঁদুরের মত। তার আদিম মস্তিষ্ক স্ক্রিণে থাকা দ্বিমাত্রিক নারী-দেহের সাথে প্রজনন-কর্মে লিপ্ত হতে চায়। এখন, সেই আসক্ত ব্যক্তি যখন বিবাহ বন্ধনে লিপ্ত হয় তখন সে প্রতিজ্ঞা করে যে, 'না, আমি কখনোই তার সাথে প্রতারণা করব না।' কিন্তু কুলিজ ইফেক্ট ব্রেইনে তখনও কাজ করছে। কোন নারীকে দেখলে আপনার ব্রেইনের যে অংশ যুক্তিনির্ভর সেটা আপনাকে বলছে, 'না, তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে প্রতারণা করবেনা' কিন্তু আপনার মস্তিষ্কের আদি অংশ বলছে, 'ওর দিকে তাকাও।' এরপর সেই মেয়েটিকে নিয়ে বিভিন্ন কুরুচিপূর্ণ ফ্যান্টাসাইজ করা হয়। এভাবে আমাদের মস্তিষ্কের গভীরে প্রোথিত হয়ে গিয়েছে এই কুলিজ ইফেক্ট।

এবার আরেকটি এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে কথা বলা যাক। এর শিরোনাম হচ্ছে, 'বানরেরা পয়সার বিনিময়ে স্ত্রী-বানরের নিতম্ব দেখছে।' বানরের তো পয়সা নেই। তাহলে তাদের পয়সাটা কি? বানরেরা আসলে ফলের জুস খুবই পছন্দ করে। এই গবেষণায়, বানরদেরকে ফলের জুস দেয়া হয়েছিল। যদি তারা স্ত্রী-বানরের নিতম্ব দেখতে চায় তাহলে তাদেরকে ফলের জুস দেয়া হবে না। ব্যাপারটা অনেকটা পর্ণোগ্রাফির মতই-মাংকি পর্ণোগ্রাফি।

যেই আদি প্রোগ্রামের কথা বলা হয়েছিল কিছুক্ষণ আগে, সেটা মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেম অংশে অবস্থিত। এই অংশটি প্রতিটি স্তন্যপায়ী প্রাণীর রয়েছে যার মধ্যে বানরও রয়েছে এবং সেটার ফাংশনকেই এক্সপেরিমেন্টে সত্য হতে দেখলাম। এটা সত্য যে আমাদের ব্রেইন মাত্র একটিই কিন্তু ব্রেইনের প্রতিটি অংশের নির্দিষ্ট কাজ রয়েছে। আর এই অংশ অর্থাৎ লিম্বিক সিস্টেম অত্যন্ত প্রাচীন আর এর কাজ কেবল বেঁচে থাকায় সহায়তা করা, টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া। এর ফাংশন সম্পর্কে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলা যাবে কিন্তু যে বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ তা হল, এই অংশটিই রাগ, ক্ষোভ, খুশি, ভয় ইত্যাদিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

আমাদের বিভিন্ন কামনা-বাসনাকে চালনা করার পিছে এই অংশটিই দায়ী। এর মধ্যে রয়েছে সঙ্গিনী নির্বাচন এবং আমাদের যৌনচাহিদা। তাই দেখাই যাচ্ছে, আমাদের যৌন চাহিদার জন্য আমাদের যৌনাঙ্গ দায়ী নয় বরং এর সবকিছুর পিছনে কলকাঠি নাড়ছে আমাদের আদিম মস্তিষ্ক। লিম্বিক সিস্টেমই সকল আসক্তির পিছনে দায়ী যার মধ্যে পর্ণ আসক্তিও রয়েছে।

📘 পর্নোগ্রাফি নিরব ঘাতক > 📄 পর্ব ৩: রিওয়ার্ড সার্কিট

📄 পর্ব ৩: রিওয়ার্ড সার্কিট


আমাদের মস্তিষ্কে লিম্বিক সিস্টেম এর বাইরে সেরেব্রাল কর্টেক্স অবস্থান করে যেটার আকার মানুষের ক্ষেত্রে বেশ বড় হলেও বানর, ইঁদুর এবং অন্যান্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে তা তুলনামূলকভাবে বেশ ছোট। সেরেব্রাল কর্টেক্স আমাদের ব্রেইনের যুক্তিনির্ভর কাজগুলো সম্পাদন করে। এতে আবেগের স্থান নেই বরং এর কাজ পরিকল্পনা করা, চিন্তা করা এবং এই অংশ থেকেই আমাদের মাথায় বিভিন্ন সুন্দর সুন্দর আইডিয়া আসে। কোন কাজের ফলাফল কি হবে তা সেরেব্রাল কর্টেক্স বুঝতে পারে, কিন্তু লিম্বিক সিস্টেমের সেই ক্ষমতা নেই।

গাড়ির ইঞ্জিনের যেমন সাধারণ ডিজাইন থাকে সেরকম লিম্বিক সিস্টেমেরও রয়েছে প্রাণীগতভাবে যত ভিন্নতাই থাকুক না কেন। বিড়াল, কুকুর, ইঁদুর অথবা মানুষ সবার লিম্বিক সিস্টেম প্রায় একইভাবে কাজ করে। ক্ষুধা, মাতৃত্ববোধ, মিলন অথবা যৌন চাহিদা এবং আসক্তি যাই হোক না কেন সব ক্ষেত্রে প্রত্যেকের ব্রেইনে একই ধরণের রাসায়নিক পদার্থ নির্গত হয় এবং এদের ফাংশনও সকল স্তন্যপায়ীতে প্রায় একই।

বিজ্ঞানীরা ইঁদুরকে নিয়ে এই জন্য গবেষণা করছেন না যে তা ইঁদুরের কোন কাজে লাগাবেন, বরং তারা গবেষণা করছেন যেন আমাদের আসক্তির প্রকৃতি বুঝতে পারেন এবং সে অনুযায়ী সাহায্য করতে পারেন। এছাড়া অন্যান্য কারণও রয়েছে। এই গবেষণা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ লিম্বিক সিস্টেম সব স্তন্যপায়ীতে প্রায় একই। মনে রাখা দরকার যে আমাদের লিম্বিক সিস্টেমে রাসায়নিক পদার্থের অনুপাতই নির্ধারণ করে আমরা দুনিয়াকে কিভাবে দেখছি বা আমাদের মুড কখন কেমন হবে। যদি আমাদের লিম্বিক সিস্টেমে রাসায়নিক পদার্থের অনুপাতের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়, আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও নষ্ট হয়ে যাবে। লিম্বিক সিস্টেম কে যদি এক বাক্যে সংজ্ঞায়িত করতে হয় তাহলে বলতে হবে, এর সব কাজই কষ্টকে এড়ানো এবং বারবার আনন্দময় কাজ করার পিছে জড়িত।

টিকে থাকা নির্ভর করে ব্যথা বা কষ্ট যাই বলুন না কেন তা এড়ানোর মধ্যে। এই কষ্ট শারীরিক এবং মানসিক উভয়ই হতে পারে। আমাদের ব্রেইনকে যদি কেটে আলাদা করে ফেলা হয়, তাহলে সেখানে অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটা অংশ দেখতে পাওয়া যাবে যার নাম 'রিওয়ার্ড সার্কিট', আপনি হয়ত 'রিওয়ার্ড সেন্টার' শব্দটিও শুনে থাকবেন। এই রিওয়ার্ড সার্কিট এর সংযোগ রয়েছে লিম্বিক সিস্টেম এবং সেরেব্রাল কর্টেক্স এর মধ্যে যার সম্পর্কে আগেই বলা হয়েছে যে এটি বিভিন্ন যুক্তিনির্ভর কাজ করে। এই ব্যাপারটি এতটাই গুরত্বপূর্ণ যে পরবর্তী আলোচনার অধিকাংশেই রিওয়ার্ড সার্কিট জুড়ে থাকবে।

মূলত ব্রেইনের এই অংশতেই আমরা সকল কামনা এবং আনন্দ অনুভব করে থাকি যেমনঃ যৌন মিলন অথবা অর্গাজম। এখানেই নিয়ন্ত্রিত হয় আমরা কি পছন্দ করব অথবা করবনা। এজন্যই রিওয়ার্ড সার্কিট অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ, এটি আকারে ছোট হলেও প্রতিটা কাজের নির্দেশনা দানের পিছনেই ভূমিকা রাখছে। আপনি যদি আসক্ত হন কিছুতে তাহলে এর পিছেও রিওয়ার্ড সার্কিট দায়ী। রিওয়ার্ড সার্কিট তখনই সক্রিয় হয়ে যায় যখন আমরা এমন কোন কাজে লিপ্ত হই যার সাথে আমাদের টিকে থাকার প্রশ্ন রয়েছে অথবা আরো সূক্ষ্মভাবে বললে আমাদের জিন এবং বংশধরের টিকে থাকার প্রশ্ন।

আমাদের বিভিন্ন কাজে মোটিভেশনের পিছনে পুরষ্কারের ভূমিকা রয়েছে। ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই। মনে করুন দুটি প্রতিযোগিতা চলছে। এর মধ্যে একটিতে অংশগ্রহণের জন্য পুরষ্কার রয়েছে, অপরটিতে নেই। আমাদের রিওয়ার্ড সার্কিট যেই প্রতিযোগিতায় পুরষ্কার রয়েছে সেটিতে অংশগ্রহণের ব্যাপারে তাগিদ দেবে। এই সার্কিট আমাদের ভেতরে সুখানুভূতি তৈরী করে এবং একই সাথে সুখকে খোঁজার জন্য মোটিভেশন দেয়। এটা আপনার ভেতর ফাস্ট ফুড খাবারের চাহিদা তৈরী করবে, যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হবার জন্য আগ্রহী করবে, ঝুঁকি নিতে সাহায্য করবে।

এই সার্কিটের কারণেই আপনি আপনার সঙ্গিনীকে ভালোবাসেন, ভালোবাসেন আপনার সন্তান, পিতা-মাতাকে। আপনার টিম যখন কোন খেলায় জিতে, আপনি যখন উঁচু ভবন থেক বাঞ্জি জাম্পিং করেন অথবা উত্তাল সমুদ্রে ডাইভিং করেন তখনও এই সার্কিট সক্রিয় হয়ে যায়। কোন কাজে যত বেশী উত্তেজনা বোধ করবেন, রিওয়ার্ড সার্কিটও তত বেশী সক্রিয় হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, স্বাভাবিক কিছু আনন্দ যেমন অপরূপ সূর্যাস্ত দেখা, পার্কের ভেতর দিয়ে হাঁটা, স্ত্রীর কাছ থেকে নির্মল হাসি উপহার পাওয়া এসবও রিওয়ার্ড সার্কিটকে সক্রিয় করে। বিভিন্ন কারণে ব্রেইনের নির্দিষ্ট অংশে রাসায়নিক পদার্থ নির্গত হওয়া শুরু বা বন্ধ হতে থাকে। রিওয়ার্ড সার্কিটের ক্ষেত্রে সেই পদার্থটি হচ্ছে ডোপামিন। ডোপামিন নিউরোট্রান্সমিটার গ্রুপের মূল রাসায়নিক পদার্থ যা রিওয়ার্ড সার্কিটকে সচল করে। রিওয়ার্ড সার্কিট যদি ইঞ্জিন হয় তাহলে ডোপামিন হচ্ছে গ্যাস। আপনি যদি উচ্চ ক্যালোরি সমৃদ্ধ বিভিন্ন খাবার যেমনঃ বার্গার, পিজ্জা এসব পছন্দ করেন তাহলে এর পিছনে কারণ হতে পারে এসব খেলে আপনার ব্রেইনে প্রচুর ডোপামিন নির্গত হয়।

আপনি নিম্ন ক্যালোরির খাবার পছন্দ করেন না কারণ সেই পরিমাণ ডোপামিন এধরণের খাবার খেলে আপনার ব্রেইনে নির্গত হয় না। আপনি সেই খাবার খেতে ইচ্ছাপোষণ করেন কারণ ব্রেইন আপনাকে এর জন্য বেশী পুরষ্কার/আনন্দ দিচ্ছে। এজন্যই আপনার কাছে চকোলেট কেক বেশী ভালো লাগে ব্রকোলির চেয়ে কারণ চকোলেট কেক বানানো হয়েছে আপনাকে উচ্চ ক্যালোরি সরবরাহ করার জন্য আর আপনার ব্রেইন এ সম্পর্কে অবগত। একইভাবে মিষ্টি খাবার আপনার রিওয়ার্ড সার্কিটকে সচল করে। আপনার রক্তে সুগারের প্রয়োজন এজন্য আপনি মিষ্টি খাবার খান না বরং আপনার ব্রেইন সুগার খাবার পুরষ্কার পেতে চায় বলেই আপনি মিষ্টি খাবার গ্রহণ করেন।

মেথ অথবা কোকেইন এর মত ড্রাগ গুলোকে যদি বাদ দেয়া হয় তালিকা থেকে, তাহলে প্রচুর পরিমাণে ডোপামিন নিঃসরণের তালিকায় সবচেয়ে উপরে থাকবে অর্গাজম। যেকোন কাজ করার মোটিভেশনের পিছনে ডোপামিনের অবদান রয়েছে। ব্যাপারটা এমন না যে আপনি আসলেই আইস-ক্রিম খেতে চাচ্ছেন অথবা সুন্দরী কোন তারকার সাথে ডেটে যেতে চাচ্ছেন, বরং এসব কাজের মাধ্যমে আপনি আপনার রিওয়ার্ড সার্কিটের দ্বারা অধিক ডোপামিনের নিঃসরণ আকাঙ্খা করছেন। আপনি লটারি জিততে চান এই জন্য নয় যে আপনি টাকা পাবেন, বরং আপনি টাকা পেলে আপনার রিওয়ার্ড সার্কিট অ্যাক্টিভ হয়ে আপনার মস্তিষ্কে সুখানুভূতি তৈরী করবে, আর আপনি সেটাই চাচ্ছেন। কোন কাজের পিছনে ডোপামিনের নিঃসরণ যত বেশী হবে আপনি সেটা তত বেশী করতে চাইবেন। প্রশ্ন আসতে পারে, কেন বিলিওনেয়াররা এত এত টাকা থাকার পরেও রিটায়ার করেনা? তাদের তো আর টাকার প্রয়োজন নেই।

উত্তর এখানেই রয়েছে, তাদের টাকার প্রয়োজন না থাকলেও ডোপামিনের প্রয়োজন রয়েছে। তারা স্টক মার্কেটে শেয়ার জিতার মাধ্যমে ডোপামিন চায়, তারা বিভিন্ন আনন্দ-ফুর্তির মাধ্যমে ডোপামিন খোঁজে।

📘 পর্নোগ্রাফি নিরব ঘাতক > 📄 পর্ব ৪: ডোপামিনঃ মলিকিউল অফ অ্যাডিকশন

📄 পর্ব ৪: ডোপামিনঃ মলিকিউল অফ অ্যাডিকশন


ডোপামিন নিঃসরণের একটা প্যাটার্ন রয়েছে, অনেকটা রোলার কোস্টারের মত। বায়োলজিতে একটা নিয়ম রয়েছে, যা বেড়ে যাবে তাকে একসময় কমতেও হবে। এটা খাদ্য, যৌন মিলন অথবা তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পানিও হতে পারে। ধরুণ আপনি অনেক ক্ষুধার্ত, এসময়ে ডোপামিনের পরিমাণ আপনার ব্রেইনে বাড়তে থাকবে। এরপরে যখন বার্গারের কথা চিন্তা করবেন তখন ডোপামিন আরো বাড়বে, আর যখন বার্গারটা আপনার সামনে পরিবেশন করা হবে চিজ ও হট সস মাখিয়ে, তখন ডোপামিন একদম চূড়ায় পৌঁছে যাবে। এরপরে যখন কামড় দেবেন বেশ আনন্দ লাগবে, কিন্তু প্রতি কামড়ে এই আনন্দ কমে আসবে। এবং শেষ কামড়ের সাথে সাথে ডোপামিন এর চাহিদা আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

এই একই উঠানামার প্রয়োগ রয়েছে মাস্টারবেশন অথবা যৌনমিলনে। অর্গাজমের ঠিক আগ মূহুর্তে আনন্দ একদম চূড়ায় পৌঁছে যাবে (তবে মনে রাখা দরকার, অর্গাজমের পিছনে অন্য কিছু নিউরোকেমিক্যাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে যেমন ওপিয়েট, ডোপামিন নয়)। ডোপামিন আপনাকে অর্গাজম ঘটানোর জন্য কেবল মোটিভেশন দেবে, কিন্তু অর্গাজমের অনুভূতি আসে অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণের ফলে।

নতুন কারো সাথে সাক্ষাৎ করা, নতুন গাড়ি-বাড়ি কেনা, নতুন স্মার্টফোন কেনা এসবও ডোপামিনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় কারণ আমাদের ব্রেইন নূতনত্ব পছন্দ করে।

আপনি বিয়ের দাওয়াত খাচ্ছেন, এসময় আপনার টেবিলে ডেজার্ট পরিবেশন করা হল। যদিও আপনি আপনার খাবার শেষ করেননি এরপরেও নতুন খাবার দেখে আপনার ব্রেইনে ডোপামিনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। আপনার পেট যদি ভর্তিও থাকে রিওয়ার্ড সার্কিট সেটা দেখবেনা, বরং সে তার প্রভাব বিস্তার করবে সে অবস্থাতেই। সে আপনাকে নতুন খাবার খাইয়ে ডোপামিন রিলিজ করাবে। আপনার সেরেব্রাল কর্টেক্স আপনাকে বলছে আর খাওয়া যাবেনা, মুটিয়ে যাবেন অন্যদিকে রিওয়ার্ড সার্কিটের যেহেতু ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা নেই তাই সে এধরণের কোন সিগন্যাল দেবেনা। পর্ণোগ্রাফির ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার, যেরকম নতুন জিনিসে আগ্রহ ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় পর্ণোগ্রাফির ক্ষেত্রেও একই জিনিস বারবার দেখলে প্রথমবারের মত ডোপামিন নিঃসৃত হয় না, ফলে ইউজার পর্ণের ধরণ পরিবর্তন করেন।

কুলিজ ইফেক্টে আবার ফিরে আসা যাক। মূলত ডোপামিনই কুলিজ ইফেক্টের পিছনে দায়ী। ধরুন, আমাদের কাছে দুটো মাদী-ইঁদুর রয়েছে। মাদী-ইঁদুর #১ এবং মাদী-ইঁদুর #২। মাদী-ইঁদুর #১ এর সাথে পুরুষ ইঁদুরের প্রতিবার সঙ্গমে ডোপামিনের পরিমাণ হ্রাস পেতে থাকবে এবং একপর্যায়ে সে সঙ্গমে পুরোপুরি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে কারণ তার রিওয়ার্ড সার্কিট আর ডোপামিন সরবরাহ করছেনা। এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে যৌনশক্তির পেছনে ডোপামিনের গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

এরপরে যদি আমরা মাদী-ইঁদুর #২ কে পুরুষ ইঁদুরের সামনে উপস্থাপন করি তাহলে আবার তার ব্রেইনে ডোপামিনের বন্যা বয়ে যায় যা তার যৌনশক্তিকে আবার জাগিয়ে তোলে এবং সে আবার পূর্ণ উদ্যমে ইঁদুরের সাথে মিলিত হত। কুলিজ ইফেক্ট এর কারণ এটাই।

ঠিক এ কারণেই মানুষ একটি পর্ণ ভিডিও দেখতে দেখতে নতুন আরো দুটি ভিডিওর ট্যাব ওপেন করে যেন তার ব্রেইন তাকে নতুন করে ডোপামিন সরবরাহ করে কারণ আগেই বলেছি, নতুনত্ব ডোপামিন নিঃসরণে প্রভাব ফেলে।

এই পর্যায়ে এসে ডোপামিনের একটি ডাকনাম দেয়া যায় 'দ্য মলিউকিউল অফ অ্যাডিকশন।' এর কারণ ব্রেইনে যেসব পরিবর্তনের কারণে আমরা কোন কিছুতে আসক্ত হই তা মূলত ব্রেইনে ডোপামিনের মাত্রার পরিবর্তনের উপরেই নির্ভরশীল। কোকেইন, অ্যালকোহল, নিকোটিন এগুলোর সবগুলিই ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির হলেও এর সবগুলোই ডোপামিনের বন্যা বইয়ে দিতে সক্ষম। সকল আসক্তিকর রাসায়নিক পদার্থ এবং কাজ ডোপামিনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এজন্যই আমরা আসক্ত হই। অবশ্যই যে জিনিসের প্রতি আসক্তি আমাদের রয়েছে তার নিয়মিত সরবরাহ প্রয়োজন হবে আসক্তি টিকিয়ে রাখার জন্য যেন তা ব্রেইনে গঠনগত পরিবর্তন আনতে পারে।

আরেকটি অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, ডোপামিন নিঃসৃত হয় আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী, প্রকৃত যে আনন্দ পাওয়া যাবে তার উপর নির্ভর করে নয়। ডোপামিন মূলত আমাদের আকাঙ্ক্ষার দিকে পরিচালিত করে, মোটিভেশন দেয়। তবে প্রকৃত আনন্দ আসে 'ওপিওয়েড' থেকে যা মরফিনের মতই রাসায়নিক পদার্থ যা ব্রেইনে নির্গত হয়। অর্থাৎ ডোপামিন হচ্ছে কোনকিছুর আনন্দ প্রত্যাশা করা আর সেই প্রত্যাশার পূর্ণতা দেয় 'ওপিওয়েড'।

আসক্তি বলতে মূলত ডোপামিনের পিছনে ছোটা বোঝায়। প্রকৃতপক্ষে যা ঘটে, আসক্তির কারণে আমরা কোন কিছুকে অনেক বেশী প্রত্যাশা করি কিন্তু তুলনামূলক কম পছন্দ করি। চাহিদা এবং এতে রিওয়ার্ড সার্কিট এর ভুমিকা নিয়ে এক্সপেরিমেন্টও রয়েছে।

একটি ইঁদুরকে খাচায় রাখা হয় এবং সেই খাচার এক প্রান্তে একটি বাটন রয়েছে। ইঁদুরের মাথায় একটি তার সংযুক্ত করা ছিল এবং সেই তারের প্রান্তে ইলেকট্রোড ছিল যা আবার সংযুক্ত ছিল ইঁদুরের রিওয়ার্ড সার্কিটের সাথে। যখনই ইঁদুরটি সেই বাটনে চাপ দেয়, তারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত মাত্রার বিদ্যুৎ তার রিওয়ার্ড সার্কিটে পৌঁছে সেটিকে উদ্দিপ্ত করে। ইঁদুরটি বাটনে ক্লিক করতেই থাকে করতেই থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না এটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সে ঘুমানোর জন্য, খাবার জন্য অথবা এমনকি যৌন মিলনের জন্যেও বাটনটি প্রেস করা থেকে বিরত থাকবেনা। সে সবকিছুর বিনিময়ে বাটনটি প্রেস করতে চাইবে। মারাত্মকভাবে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যেও আমরা এরূপ আচরণ দেখি।

এইবার আরেকটি এক্সপেরিমেন্ট চালানো হয়। পূর্বের ইঁদুরটিকে সরিয়ে ফেলা হয় এবং সেখানে নতুন ইঁদুর রাখা হয়। খাঁচার অপর প্রান্তে রাখা হয় বাটনটি। ইঁদুর এবং খাঁচার মধ্যবর্তী রাস্তায় ইলেকট্রিক গ্রিড রাখা হয়। অর্থাৎ লিভার পর্যন্ত পৌঁছাতে হলে তাকে ইলেক্ট্রিক শক খেতে হবে যা যথেষ্ট পীড়াদায়ক। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, ইঁদুরটি এই ইলেক্ট্রিক শক সহ্য করে হলেও সে ইলেক্ট্রিক গ্রীড অতিক্রম করবে এবং বাটনটি প্রেস করবে। কিন্তু এবার যদি খাঁচার অপর পাশে খাবার রাখা হয় এবং খাবার পর্যন্ত পৌছানোর রাস্তায় ইলেকট্রিক গ্রীড রাখা হয় ইঁদুরটি স্রেফ তার জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, সে না খেয়ে মরে গেলেও ইলেকট্রিক শক সহ্য করে খাবারের কাছে যাবেনা।

এবার আরেকটি এক্সপেরিমেন্ট যেখানে ডোপামিনের ক্ষমতা এবং তার সাথে রিওয়ার্ড সার্কিট এর সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হবে। যদি তাদের মস্তিষ্কে ডোপামিনের নিঃসরণ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে তারা সকল মোটিভেশন হারিয়ে ফেলে। তাদের সামনে খাবার ফেলে রাখলেও তারা সেখানে না হেঁটে গিয়ে না খেয়ে মারা যায়।

ব্যাপারটি এমন নয় যে তারা খাবারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে, বরং তারা খাবার পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য যে মোটিভেশন দরকার সেটা পাচ্ছেনা, এরূপ অবস্থায় তারা যৌনক্রিয়াতেও লিপ্ত হবেনা কারণ তার সকল যৌনশক্তি উধাও হয়ে গেছে ডোপামিন না থাকার ফলে। তারা তখনও খাবার পছন্দ করে, যদি তাদের মুখে খাবার তুলে দেয়া হয় তারা সেটি গ্রহণ করবে।

মূল কথা হচ্ছে, আমাদের কাজ করার জন্য একদম সঠিক পরিমাণের ডোপামিন প্রয়োজন। এর অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে, যেমন এটা আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়, আপনার ভেতরে পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করে, আপনাকে আনন্দিত রাখে। কিন্তু ডোপামিনের ভারসাম্য না থাকলে বিভিন্ন মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00