📄 খাঁটি তাওবা
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন- 'হে মুমিনগণ, আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করো। অসম্ভব নয় যে, তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মিটিয়ে দেবেন এবং তোমাদের প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত' । [৬]
খাঁটি ও বিশুদ্ধ তাওবা মানে হলো, তাওবাকে যাবতীয় ত্রুটি, অসম্পূর্ণতা ও ধোঁয়াশা থেকে পরিষ্কার রাখা। হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'খাঁটি তাওবা হলো, ব্যক্তি অতীতের কৃতকর্মের ওপর লজ্জিত হওয়া এবং পুনরায় তা না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া'。
কালবি বলেন—'জিহ্বা দ্বারা ইসতিগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করা, অন্তরে অনুতপ্ত হওয়া এবং শরীর দিয়ে সংযত থাকা- এই তিনের সম্মেলনেই খাঁটি তাওবা হয়。
সাইদ বিন মুসাইয়াব রহিমাহুল্লাহ বলেন-'খাঁটি তাওবা হলো, তাওবার মাধ্যমে নিজেকে সংশোধন করে নেওয়া'。
ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তাওবা বিশুদ্ধ হতে হলে তিনটি উপাদানের উপস্থিতি আবশ্যক-
এক, তাওবার সময় সমস্ত গুনাহকে ব্যাপকভাবে শামিল করা, যেন এমন কোনো গুনাহ নেই যা তার দ্বারা সংঘটিত হয় নি。
দুই, এবার সমস্ত গুনাহ পরিত্যাগ করার ওপর সংকল্প বদ্ধ হওয়া, যেন কোনো গুনাহের ব্যাপারে কোনো ধরণের সংশয়, দোটানা ও ধীরতা না থাকে; বরং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া যে, সব ধরণের গুনাহই পরিত্যাগ করবে。
তিন, আল্লাহ্ তায়ালার ভীতি, তার আজাবের ভয় এবং তাঁর প্রতিদানের আকাঙ্ক্ষা রেখে তাওবাকে সমস্ত কলুষতা ও বিশুদ্ধতায় ছেদ তৈরি করে এমন যাবতীয় বিষয় থেকে নির্মল রাখা。
নিজের প্রয়োজন, সম্মান, পদ ও পদবী অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য বা সম্পদ ও জনবল নিরাপদের রাখার জন্য অথবা মানুষের প্রশংসা অর্জন ও তাদের নিন্দা থেকে বেঁচে থাকা এবং মূর্খদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য কিংবা পার্থিব কোনো কামনা পূরণ করা এবং দারিদ্রতা থেকে মুক্তির জন্য তাওবা না করা; এসব কিছুই তাওবার বিশুদ্ধতা এবং তা আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক'。
বান্দা তখনই তাওবা করতে পারবে, যখন আল্লাহ্ তায়ালা তাকে তাওফিক দান করবেন এবং তা কার্যকর হবে তখন, যখন আল্লাহ্ তায়ালা তার তাওবা কবুল করবেন। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন— 'এবং সেই তিনজনের প্রতিও (আল্লাহ্ সদয় হলেন), যাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত মূলতবী রাখা হয়েছিল। যখন প্রশস্ত পৃথিবী তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল আর তাদের নিজেদের জীবন তাদের কাছে দুর্বিষহ হয়ে গিয়েছিল এবং তাঁরা উপলব্ধি করেছিল যে, আল্লাহর শাস্তি থেকে (পালানোর জন্য) তাঁর কাছে ছাড়া কোনো আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহশীল হলেন, যাতে তারা তাওবা করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ অনুগ্রহশীল, করুণাময় । [৭]
উক্ত আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা জানিয়ে দিয়েছেন যে, ওই তিনজন তাওবা করার পূর্বে তিনি তাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন। তাঁর অনুগ্রহের কারণেই তারা তাওবা করতে পেরেছেন। তাঁর অনুগ্রহই তাদের তাওবার মূল সোপান। আল্লাহ্ তায়ালার দুটি নাম 'আওয়াল এবং আখির' শুরু এবং শেষ- এর রহস্যই এটা যে, তিনিই সৃষ্টিকর্তা তিনিই সাহায্যকারী। তিনিই উপায় তৈরি করে দেন তিনিই উপায় গ্রহণ করেন। সুতরাং বান্দাও তাওবা করে, আল্লাহ্ তায়ালাও তাওবা করেন; বান্দার তাওবা হলো, বখে যাওয়ার পর পুনরায় নিজের মালিকের কাছে প্রত্যাবর্তন করা। আর আল্লাহর তাওবা হলো, অনুমতি, সক্ষমতা, সহযোগিতা দান ও কবুল করা。
টিকাঃ
[৬] সুরা তাহরিম ৮
[৭] সুরা তাওবা ১১৮
📄 তাওবার রহস্য ও তাৎপর্য
বুঝমান ধীসম্পন্ন বান্দা থেকে যখন কোনো গুনাহ সংঘটিত হয়, তখন তার কয়েকটি বিষয়ের প্রতি মনযোগী হওয়া আবশ্যক—
এক- উক্ত কাজের ব্যাপারে আল্লাহ্ তায়ালার আদেশ ও নিষেধ পর্যালোচনা করা। তাহলে এই কাজটা যে ভুল তা নিশ্চিত হতে পারবে এবং নিজের গুনাহকেও স্বীকার করতে পারবে。
দুই- আল্লাহ্ তায়ালার প্রতিশ্রুতি ও ধমকিগুলোর দিকে মনোনিবেশ করা। তাহলে তার অন্তরে অস্থিরতা ও ভয় তৈরি হবে, যা তাকে তাওবা করতে উদ্বুদ্ধ করবে。
তিন- তার ওপর আল্লাহ্ তায়ালার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, তাঁর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ও তাঁর ভাগ্য নির্ধারণের অপরিহার্যতা নিয়ে চিন্তা করবে। তিনি চাইলে তাকে গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারতেন, এ কথা ভেবে দেখবে। তাহলে বান্দার অন্তরে আল্লাহ্ তায়ালার সত্ত্বা, নামসমূহ, গুণাবলী, প্রজ্ঞা, রহমত, সহিষ্ণুতা ও উদারতার জ্ঞান লাভ হবে। ফলে আল্লাহ্ তায়ালার দাসত্বের প্রতি আগ্রহ উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে। আল্লাহ্ তায়ালার নাম ও গুণাবলীসংশ্লিষ্ট প্রতিশ্রুতি, সুসংবাদ ও ধমকি সম্পর্কে জানতে পারবে। পৃথিবীতে আল্লাহ্ তায়ালার কর্ম ও কর্মপন্থা সম্পর্কে সম্মক ধারণা লাভ হবে। এভাবে তার অন্তরে আল্লাহ্ তায়ালার মারেফত জন্ম লাভ করবে, ঈমান মজবুত হবে এবং আল্লাহ্ তায়ালার নির্ণয় ও ফয়সালা নত মস্তকে মেনে নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন হবে。
চার- ভাগ্যের ক্ষেত্রে বান্দা আল্লাহ্ তায়ালার মহত্ত্ব অনুধাবন করার চেষ্টা করবে। পরাক্রমশালী চির পবিত্র আল্লাহ্ তায়ালা যা ইচ্ছা ফয়সালা করেন। তিনি নিজ উন্নত ক্ষমতার বলে বান্দার কলবকে নিজ ইচ্ছানুযায়ী পরিবর্তন করেন, বান্দার কামনা বাসনার সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়ে যান。
ভাগ্য-নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তায়ালার বড়ত্ব উপলব্ধি করার আরেকটি মাধ্যম হলো এটা অনুভব করা যে, বান্দা আল্লাহ্ তায়ালার ইচ্ছানুযায়ী পরিচালিত, তাঁর চাহিদার সামনে অসহায় দুর্বল, তার বাগডোর আল্লাহরই হাতে। তিনি রক্ষা না করলে রক্ষা করার কেউ নেই। তিনি সাহায্য না করলে সক্ষমতা দান করার কেউ নেই। সে প্রশংসিত পরাক্রমশালী সত্ত্বার কবজায় তুচ্ছ ও নিঃস্ব。
আল্লাহর বড়ত্ব অন্তরে স্থাপন করার জন্য বান্দা এই সাক্ষ্য দেবে যে, পরিপূর্ণতা, প্রশংসা এবং সমস্ত বড়ত্ব একমাত্র আল্লাহ তায়ালার। ত্রুটি, দোষ, জুলুম, গুনাহ ও প্রয়োজনের কারণে বান্দা নিজেই নিন্দা ও তিরস্কারের হকদার। এভাবে সে যত বেশি আল্লাহ্ তায়ালার বড়ত্ব এবং নিজের ক্ষুদ্রতা, মুখাপেক্ষিতা ও ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার সাক্ষ্য দিতে থাকবে, ততই আল্লাহর বড়ত্ব, পরিপূর্ণতা, ক্ষমতা ও সমৃদ্ধির বিশ্বাস তার অন্তরে বদ্ধমূল হবে。
পাঁচ- বান্দা যখন গুনাহ করে আল্লাহ্ তায়ালা তা দেখেন। তিনি চাইলেই তা প্রকাশ করে দিয়ে তাকে লাঞ্ছিত অপদস্থ করতে পারেন। কিন্তু তিনি তো সাত্তার, গুনাহ গোপন কারী। তিনি অনুগ্রহ করে বান্দার গুনাহগুলো লুকিয়ে রাখেন। তদ্রূপ চাইলেই নগদে তাকে শাস্তি দিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু আল্লাহ্ তায়ালা মায়া করে তাকে সময় সুযোগ দেন- এসব কথা চিন্তা করলে আল্লাহ্ তায়ালার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা অনেকাংশে বেড়ে যাবে。
ছয়- আল্লাহ্ তায়ালার ক্ষমা ও অনুগ্রহ নিয়ে ধ্যান করা। ক্ষমা আল্লাহ্ তায়ালার একটি অপার অনুগ্রহ। তিনি যদি বান্দাকে যথাযথভাবে পাকড়াও করেন, তাহলে তিনি ন্যায়পরায়ণ এবং প্রশংসিতই থাকবেন। কিন্তু তিনি নিজ অনুগ্রহে শাস্তির যোগ্য বান্দাকে ক্ষমা করে দেন- এসব নিয়ে ভাবলে আল্লাহ্ তায়ালার প্রতি ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা, বিনয় এবং তাঁর পরিচিতি বহুত বৃদ্ধি পাবে。
সাত- বান্দার তুচ্ছতা, মুখাপেক্ষিতা, অভাবগ্রস্ততা এবং দাসত্বের চারটি ধাপ আছে-
১- প্রয়োজন ও অভাবের তুচ্ছতা। এক্ষেত্রে তাবৎ সৃষ্টি একই সমান্তরালে।
২- দাসত্ব ও আনুগত্যের তুচ্ছতা। এটা শুধু অনুগত বান্দাদের জন্য খাস।
৩- ভালোবাসার বিনয়। ভালোবাসার পরিমাণ অনুযায়ী প্রেমিক প্রেমাস্পদের কাছে বিনয়ী হয়।
৪- গুনাহ ও অপরাধের তুচ্ছতা।
চারটি তুচ্ছতা যখন বান্দা নিজের মধ্যে দেখতে পাবে, তখন পরিপূর্ণ ও যথাযথভাবে আল্লাহর সামনে নত হতে পারবে。
আট- আল্লাহ্ তায়ালা রিজিকদাতা, তাহলে রিজিকপ্রাপ্তের উপস্থিতি আবশ্যক। আল্লাহ্ তায়ালা সবকিছু দেখেন ও শুনেন, তাহলে দেখা ও শোনার মতো কেউ থাকা অপরিহার্য। তদ্রুপ আল্লাহ্ তায়ালা ক্ষমাশীল, তাওবা কবুলকারী, তাহলে যাকে ক্ষমা করবেন, যার তাওবা কবুল করবেন তাঁরও অস্তিত্ব অপরিহার্য। অন্যথায় আল্লাহ্ তায়ালার এসব নাম ও গুণাবলী অকেজো হয়ে যাবে, যা অসম্ভব。
আল্লাহ্ তায়ালা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জ্ঞানী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাই বলেন- 'যদি তোমরা গুনাহ না করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের উঠিয়ে নিয়ে এমন এক জাতি প্রেরণ করবেন, যারা গুনাহ করে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে; তিনি তাদের ক্ষমা করবেন' । [১০]
আনাস বিন মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- 'মুমিন বান্দা যখন আল্লাহর কাছে তাওবা করে আল্লাহ্ তায়ালা ভীষণ আনন্দিত হন। ওই ব্যক্তির চেয়ে অধিক আনন্দিত হন, যে ব্যক্তি ছায়া পানিহীন আশংকাপূর্ণ বিজন মরুভূমিতে ঘুমিয়ে পড়ে এবং তার সাথে থাকে খাদ্য পানীয় সহ একটি সওয়ারি। ঘুম থেকে উঠে দেখে সওয়ারি হাতছাড়া হয়ে গেছে। সে নিরাশ হয়ে একটি গাছের ছায়ায় এসে আশ্রয় নেয়। সে তার সওয়ারির ব্যাপারে একদম হতাশ। এমন সময় দেখে যে, তার সওয়ারি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার লাগাম ধরে আনন্দের আতিশয্যে বলে উঠে, 'হে আল্লাহ্, আপনি আমার বান্দার আমি আপনার রব; আনন্দের তীব্রতায় সে ভুল করে বসে । [১১]
প্রিয় পাঠক, একবার ভেবে দেখুন তো, একটি জন্তুকে আপনি ছোট থেকে লালন পালন করে বড় করেছেন। তার ভালোবাসা আপনার অন্তরে প্রোথিত। তাকে আপনি অনেক ভালোবাসেন। আপনার শত্রু তাকে বন্দী করে ফেলেছে। আপনি এখন তার নাগাল পাচ্ছেন না। আপনি জানেন যে, শত্রু তাকে ভীষণ শাস্তি দেবে। তাকে অন্যায়ভাবে ধ্বংস করে দেবে। আপনি এখন তার ব্যাপারে হতাশ। কিন্তু অভূতপূর্বভাবে সে শত্রুর হাত থেকে পালিয়ে আপনার দরজায় এসে আপনাকে চমকে দিলো। আপনার গোবরাটের মাটিতে গাল ঘষে ঘষে আপনাকে সন্তুষ্ট করতে লাগলো। এমন সময় আপনার আনন্দের পরিমাণটা কেমন হবে! আপনি যাকে লালন পালন করেছেন, নিজের মায়া মমতা দিয়ে যাকে গড়ে তুলেছেন, সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে যাকে ভালবেসেছেন, তার জন্য যদি আপনার এ পরিমাণ মায়া ও ভালোবাসা হয়, তাহলে যে আল্লাহ তাঁর বান্দাকে সৃষ্টি করেছেন, অস্তিত্ব দান করেছেন এবং তার ওপর ঢেলে দিয়েছেন নিজ অপার অনুগ্রহের ফল্গুধারা, সে বান্দার প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও মমতা কী পরিমাণ হতে পারে! পাঠক একটু ভেবে দেখবেন!
টিকাঃ
[১০] সহিহ মুসলিম ৬৮৫৮
[১১] সহিহ মুসলিম ৬৮৪৮