📄 কুরআন সুন্নাহয় ভয়
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন— ‘যারা তাদের প্রভুর ভয়ে ভীত থাকে, যারা তাদের প্রভুর নিদর্শনসমূহ বিশ্বাস করে, যারা তাদের প্রভুর সাথে শরিক করে না এবং যারা যা দান করবার, তা ভীত-কম্পিত হৃদয়ে এ কারণে দান করে যে, তারা তাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন করবে। তারাই কল্যাণকর কাজে ধাবিত হয় এবং তারাই তাতে অগ্রগামী থাকে’ । [৮]
আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, “তারা যা কিছুই দান করে তাদের অন্তর ভীত-প্রকম্পিত থাকে”। আমি বললাম, এরা কি তারা, যারা মদ পান করে, জিনা করে এবং চুরি করে? তিনি বললেন, 'হে সিদ্দিকের মেয়ে, না; বরং তারা হলো ওই সমস্ত লোক, যারা সিয়াম পালন করে, সালাত আদায় করে, সদকা করে, আবার এই ভয় করে যে, তাদের এসব কবুল করা হবে না। এরাই কল্যাণকর কাজের দিকে ধাবিত হয়” । [৯]
আবু যর রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- 'আমি (অদৃশ্য জগতের) যা দেখি তোমরা তা দেখ না, আর আমি যা শুনতে পাই তোমরা তা শুনতে পাও না। আসমান তো চড়চড় শব্দ করছে, আর সে এই শব্দ করার যোগ্য। তাতে এমন চার আঙ্গুল পরিমাণ জায়গাও নেই যেখানে কোনো একজন ফেরেস্তা আল্লাহ্ তায়ালার জন্য অবনত মস্তকে সাজদায় পড়ে না আছে। আল্লাহর শপথ, আমি যা জানি, তোমরা যদি তা জানতে, তাহলে খুব কমই হাসতে, কাঁদতে প্রচুর, বিছানায় স্ত্রীদের ভোগ করতে না, পথে প্রান্তরে বেরিয়ে পড়তে এবং আল্লাহর সামনে কাকুতি মিনতি করতে। আল্লাহর শপথ, আমার মন চায় আমি যদি একটি বৃক্ষ হতাম আর তা কেটে ফেলা হতো!' । [১০]
হাদিসের মর্ম হচ্ছে, আমি আল্লাহ্ তায়ালার বড়ত্ব এবং অবাধ্যদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করা সম্পর্কে যে কথা জানি, তা যদি তোমরা জানতে, তাহলে তোমাদের কান্না, অস্থিরতা এবং আগত ফলাফলের জন্য ভয় দীর্ঘায়িত ত হতো। তোমরা হাসার কথা একেবারে ভুলে যেতে।
আম্মাজান আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, 'যখন আবহাওয়া পরিবর্তন হতো এবং বিক্ষুব্ধ বাতাস প্রবাহিত হতো, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কামরার মধ্যে পায়চারি করতে থাকতেন। একবার বের হতেন, আবার প্রবেশ করতেন। এসবই করতেন একমাত্র আল্লাহর আজাবের ভয়ে' । [১১]
আবদুল্লাহ বিন শিখখির রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নামায পড়তেন, তাঁর বুক থেকে চুলার হাঁড়ির (ফুটন্ত পানির) মতো কান্নার অস্ফুট আওয়াজ শোনা যেতো' । [১২]
সাহাবায়ে কেরাম রদিয়াল্লাহু আনহুম এবং তৎপরবর্তী এই উম্মাহর সালাফদের অবস্থা নিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁরা যেমন আমলের দিকে শীর্ষে ছিলেন, তেমনি ছিলেন ভয়েরও চূড়ান্ত পর্যায়ে । আর আমরা তো এখন ত্রুটির সাগরে হাবুডুবু খাই; বরং গুনাহ করে আবার নিজেদের নিরাপদও ঠাওর করি!
আবু বকর সিদ্দিক রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-'আমি কামনা করি, আমি যদি একজন খাঁটি মুমিন বান্দার বাহুর একটি পশম হতাম!' তিনি যখন নামাজে দাঁড়াতেন, আল্লাহর ভয়ে কাষ্ঠখণ্ডের ন্যায় কাঁপতে থাকতেন。
উমর বিন খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু সুরা তুর পাঠ করছিলেন। যখন এই আয়াতে পৌঁছলেন “নিশ্চয়ই তোমার রবের আজাব পতিত হবে”, কান্না জুড়ে দিলেন। তাঁর কান্না এতো প্রকট আকার ধারণ করলো যে, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং লোকেরা তাঁর শুশ্রূষা করলো।
ইনতিকালের সময় তিনি নিজ ছেলেকে বলেন, 'তোমার জন্য আফসোস, আমার গালকে মাটিতে রেখে দাও; হতে পারে তিনি আমার ওপর রহম করবেন'। অতঃপর বললেন-'আমার ধ্বংস হোক, তিনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন'। এ কথা তিনবার বললেন। এর কিছুক্ষণ পরই তিনি ইন্তিকাল করেন。
তিনি রাতের বেলা উক্ত আয়াত পাঠ করে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ঘরের মধ্যেই কয়েকদিন আবদ্ধ থাকতেন। লোকেরা মনে করতো, তিনি অসুস্থ। অধিক কান্নার কারণে তাঁর চেহারায় দুটি কালো রেখা অংকিত হয়ে গিয়েছিল।
ইবনে আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে একবার বললেন, আল্লাহ্ তায়ালা আপনার দ্বারা কত জনপদ বিজিত করেছেন, আবাদ করেছেন কতো দেশ এবং আরও কতো খেদমত করিয়েছেন। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি শুধু চাই, আমি যেন নাজাত পাই; আমার কোনো প্রতিদানও থাকবে না, না থাকবে কোনো বোঝা'。
এদিকে উসমান বিন আফফান রদিয়াল্লাহু আনহু যখন কবরের পাশে দাঁড়াতেন, এতো পরিমাণ কান্না করতেন যে, তাঁর দাড়ি ভিজে যেতো। তিনি বলেন, 'আমাকে যদি জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, আর আমি না জানি যে, আমার ঠিকানা কোথায়, তাহলে ঠিকানা কোথায় তা জানার আগে আমি চাইবো ধূলিকণায় পরিণত হতে'。
আবু দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, 'মৃত্যুর পর তোমরা কীসের সম্মুখীন হবে তা যদি জানতে, তাহলে আরাম করে খানা খেতে না, কখনো তৃপ্তি সহকারে পান করতে না, বিশ্রাম নেওয়ার জন্য কোনো ঘরে প্রবেশ করতে না; বরং রাস্তা ঘাটে পথে প্রান্তরে বেরিয়ে পড়তে, নিজেদের বুক চাপড়াতে এবং নিজেদের পরিণতির জন্য বিলাপ করতে থাকতে। আমি কামনা করি, আমি যদি কোনো বৃক্ষ হতাম, আর আমাকে কেটে ভক্ষণ করে ফেলা হতো!'
ইবনে আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহু এ পরিমাণ কান্না করতেন যে, তাঁর উভয় চক্ষুর নিচে পুরান জুতার ফিতার মতো কালো দাগ পড়ে গিয়েছিল。
আলী রদিয়াল্লাহু আনহু ফজর নামায থেকে সালাম ফেরালেন। তাঁকে বিষণ্ণ দেখা যাচ্ছিল। তিনি নিজ হাত ওলট পালট করছিলেন। এমন সময় বললেন, 'আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের স্বচক্ষে দেখেছি। কিন্তু আজকের অবস্থার সাথে তাদের অবস্থার কোনো মিল নেই। তাদের অবস্থা থাকতো রিক্তহস্ত ধূলিমলিন ও আলুথালু কেশ। তাদের চোখে মেষের হাঁটুর ন্যায় দাগ পড়ে যেতো। নৈশ যাপন করতেন সাজদা, নামায ও আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে। তাদের কপাল ও পায়ের ওপর পালাক্রমে ভার ন্যস্ত করতেন। (অর্থাৎ কখনো দাঁড়িয়ে ইবাদত করতেন, কখনো সাজদা দিয়ে কাটিয়ে দিতেন।) সকাল হলে আল্লাহর জিকিরে নিমগ্ন হয়ে যেতেন। পবনের দিনে গাছ যেভাবে দোলে, তারাও সেভাবে দুলতেন। তাদের চোখ বেয়ে নেমে আসতো বারিধারা। এমনকি তাদের কাপড় ভিজে যেতো। আর আজ আল্লাহর শপথ, আমি এক জাতি দেখছি, যারা রাত কাটিয়ে দেয় উদাসীনতায়'। এরপর তিনি উঠে চলে গেলেন। পরবর্তীতে তাঁকে আর কখনো হর্ষোৎফুল্ল দেখা যায় নি。
মুসা বিন মাসউদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা যখন সুফিয়ান সাওরির মজলিসে বসতাম, তাঁর ভয় ও অস্থিরতা দেখে আমাদের মনে হতো, আমরা আগুনে পরিবেষ্টিত হয়ে আছি。
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ এর বর্ণনায় একজন বলেন, তিনি আসলে মনে হতো কোনো অন্তরঙ্গের দাফনকার্য শেষ করে আসলেন। বসলে মনে হতো তিনি একজন বন্দী, তাঁর গর্দান কেটে ফেলার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আর জাহান্নামের কথা স্মরণ করলে তাঁর অবস্থা হতো এমন যে, কেমন যেন জাহান্নাম একমাত্র তাঁর জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে'。
বর্ণিত আছে, যুরারা বিন আবু আওফা রহিমাহুল্লাহ ফজরের নামায পড়াচ্ছিলেন। তিলাওয়াত করছিলেন সুরা মুদ্দাসসির। যখন আল্লাহ্ তা'আলার এই বাণী পাঠ করলেন 'যে দিন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে, সে দিন হবে অত্যন্ত কঠিন দিন। [১৩] তখন তাঁর শ্বাস ভারী হয়ে গেলো এবং তিনি মৃত্যুবরণ করলেন । [১৪]
আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করা হয় যে, তিনি বলেছেন, 'তোমরা কান্না করো। যদি কান্না না আসে তাহলে কান্নার ভান করো। ওই সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা যদি জানতে, তাহলে এতো পরিমাণ বিলাপ করতে যে, তোমাদের শ্বাস বন্ধ হয়ে যেতো। এতো পরিমাণ নামায পড়তে যে, তোমাদের মেরুদণ্ড ভেঙে যেতো' । [১৫]
টিকাঃ
[৮] সুরা মুমিনুন ৫৭-৬১
[৯] জামে তিরমিজি ৩১৭৫
[১০] জামে তিরমিজি ২৩১২
[১১] সহিহ বুখারি ৬/৩০০; সহিহ মুসলিম ৬/১৯৬
[১২] সুনানে নাসাঈ ১২১৪
[১৩] সুরা মুদ্দাসসির ৮-৯
[১৪] ইবার, যাহাবি ১/১০৯
[১৫] আল আহওয়াল, হাকিম ৪/৫৭৮