📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব > 📄 আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকা

📄 আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকা


অপছন্দনীয় অনাকাঙ্ক্ষিত আপতিত বিষয়ে বান্দার দুটি স্তর রয়েছে— সন্তুষ্টির স্তর এবং সবরের স্তর। সন্তুষ্টি হলো একটি বাঞ্ছিত বৈশিষ্ট্য। আর সবর মুমিনের ওপর আবশ্যকীয় কর্তব্য।
আল্লাহর ফয়সালা ও ভাগ্য-নির্ণয়ে যারা সন্তুষ্ট, এই শ্রেণীর লোকগণ কখনো বিপদদাতার প্রজ্ঞা, নিজ বান্দাকে বিপদের জন্য নির্বাচন করার দিকটি লক্ষ্য করে তাঁর সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নেন; তাঁর ব্যাপারে কোনো অভিযোগ উত্থাপন কিংবা অপবাদ আরোপ করেন না। আবার কখনো বিপদদাতার বড়ত্ব, মহত্ত্ব এবং পরিপূর্ণতার দিকে তাকিয়ে তাঁর প্রেম সাগরে ডুব দেন এবং এক পর্যায়ে কোনো কষ্ট কিংবা ব্যাথা আর অনুভব করেন না। এই স্তরে তারাই পৌঁছতে পারে, আল্লাহ্ তায়ালার ব্যাপারে যাদের রয়েছে পরিপূর্ণ জ্ঞান, যারা তাঁর প্রেমের স্রোতে অবগাহন করেছেন। তাই তো কখনো কখনো বিপদআপদ অসুখ বিসুখ নিয়েই তারা আনন্দিত হন; কেননা তাদের ভাবনায় থাকে যে, এসব তাদের বন্ধু ও প্রেমাস্পদের পক্ষ থেকেই এসেছে।
সন্তুষ্টি আর সবরের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। সবর, অন্তরকে অসন্তোষ ও ক্রোধ থেকে বিরত রাখা ও নিয়ন্ত্রণ করার নাম। সবরের মাঝে ব্যথার অনুভতি থাকে এবং অন্তরে তা দূর হয়ে যাওয়ার উদগ্র আকাঙ্ক্ষা থাকে। পাশাপাশি অস্থিরতা মোতাবেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আমল থেকে নিবৃত্ত রাখা হয়। পক্ষান্তরে সন্তুষ্টি হলো অন্তরের প্রশান্তি, আল্লাহ্ তায়ালার নির্ণয়ের ব্যাপারে হৃদয়ের সুস্থিরতা। এক্ষেত্রে ব্যাথার অনুভব থাকলেও তা দূর হয়ে যাওয়ার কামনা থাকে না। তবে অন্তরের মাঝে বিশ্বাস ও মারেফাতের যে সঞ্জীবনী অর্জিত হয়, তার দ্বারা এই ব্যাথার অনুভূতি লঘু হয়ে যায়। ক্ষেত্র বিশেষ যদি সন্তুষ্টির মাত্রা শক্তিশালী হয়, তাহলে পরিপূর্ণভাবেই ব্যাথার অনুভূতি দূর হয়ে যায়।
আনাস রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'আল্লাহ্ তায়ালা যখন কোনো জাতিকে পছন্দ করেন, তাদেরকে বিপদে পতিত করেন। অতএব যে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে, তিনিও তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। আর যে ক্রুব্ধ হয়ে যাবে, তিনিও তার ওপর ক্রুব্ধ হয়ে যাবেন'। [১]
ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-'আল্লাহ্ তায়ালা নিজ নির্ণয় ও জ্ঞান দ্বারা আনন্দ ও আত্মিক প্রশান্তি সঁপে দিয়েছেন ইয়াকিন-বিশ্বাস এবং সন্তুষ্টির ওপর। আর বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তা চাপিয়ে দিয়েছেন সংশয় ও অসন্তুষ্টির ওপর'।
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَ مَنْ يُؤْمِن بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَه
'যে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে, তিনি তার অন্তরকে সঠিক দিশা দান করেন'। [২]
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আলকামা রহিমাহুল্লাহ বলেন-'ব্যক্তির ওপর কোনো বিপদ এসে চাপে। সে তখন বিশ্বাস করে যে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে আগমন করেছে। ফলে তা মেনে নেয় এবং সন্তুষ্ট থাকে'।
অন্য আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيُوةً طَيِّبَةً
'আমি তাকে পবিত্র জীবন যাপন করাবো'।[৩]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আবু মুয়াবিয়া আসওয়ার বলেন—'পবিত্র জীবন দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সন্তুষ্টি ও অল্পেতুষ্টিময় জীবন'।
আলী রদিয়াল্লাহু আনহু দেখলেন আদি বিন হাতিম রদিয়াল্লাহু আনহু বিষণ্ণ হয়ে বসে আছেন। তিনি তাকে বললেন-'তোমাকে চিন্তিত ও বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন?' আদি রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন-'কেনই বা আমি বিষণ্ণ হবো না? আমার দুই ছেলে নিহত হয়েছে এবং আমার চোখ দুটোও উপড়ে ফেলা হয়েছে!' আলী রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন-'হে আদি, আল্লাহ্ তায়ালার নির্ণয় ও আদেশ বাস্তবায়ন হবেই। যে তাতে সন্তুষ্ট থাকবে, সে প্রতিদান পাবে। আর যে আল্লাহর নির্ণয়ে সন্তুষ্ট থাকবে না, তার ওপর নির্ণয় বাস্তবায়ন তো হবেই; উপরন্তু তার আমলনামাও নষ্ট হবে'।
এক লোক মৃত্যুশয্যায় পড়েছিল। আবু দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু গিয়ে দেখলেন সে আল্লাহর প্রশংসা করছে। এ অবস্থা দেখে তিনি বললেন, 'তুমি কাজের কাজ করছো। বস্তুত আল্লাহ্ তায়ালা যখন কোনো ফয়সালা করেন, তখন তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকাকেই পছন্দ করেন'।
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন-'যে ব্যক্তি তার জন্য নির্ধারিত ভাগ্যে সন্তুষ্ট থাকবে, তা তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে এবং তাতে সমৃদ্ধি আসবে, বরকত পাওয়া যাবে। আর যে তাতে সন্তুষ্ট থাকবে না, তা তার জন্য যথেষ্ট হবে না, সে তাতে বরকতও পাবে না'।
উমর বিন আব্দুল আজিজ রহিমাহুল্লাহ বলেন-'আল্লাহ্ তায়ালার ফয়সালা মেনে নেওয়া ব্যতীত আমার কোনো আনন্দের স্থান নেই'।
তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো—'আপনি কী কামনা করেন?' তিনি বললেন, 'আল্লাহ্ তায়ালা যা ফয়সালা করেন'।
আব্দুল ওয়াহিদ বিন জায়েদ রহিমাহুল্লাহ বলেন—'সন্তুষ্টি হলো আল্লাহ্ তায়ালার একটি বিরাট ফটক। দুনিয়ার জান্নাত এবং উপাসক ও তাপসদের প্রশান্তির স্থান'।
জনৈক সালাফ বলেছেন—'দুনিয়ায় সর্বাবস্থায় যারা আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট ছিল, আখিরাতে তাদের চেয়ে উন্নত মর্যাদার আর কাউকে দেখা যাবে না। কাজেই যাকে সন্তুষ্টির বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছে, সে চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছতে সক্ষম'।

টিকাঃ
[১] ইবনে মাজাহ ৪০৩১; মিশকাত ১৫৬৫
[২] সুরা তাগাবুন ১১
[৩] সূরা নাহল ৯৭

📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব > 📄 আশা

📄 আশা


কাঙ্ক্ষিত কোনো বস্তু পাওয়ার বাসনায় অন্তর প্রফুল্ল হওয়া, এটাই আশার পরিচয়।
উপায়, মাধ্যম বা উপকরণহীন আশা করলে সেক্ষেত্রে 'আশা'র চেয়ে প্রবঞ্চনা ও বোকামি শব্দই বেশি ফিট হয়। আর যদি কোনো কাজ আবশ্যকীয় হয়, যেমন সূর্য উদয় হওয়া, তখনও 'আশা' শব্দ ব্যবহার করা যায় না। তবে হাঁ, বৃষ্টি নামবে, এক্ষেত্রে আশা শব্দ ব্যবহার করা যায়; কেননা তা প্রাত্যহিক প্রাকৃতিক নিয়মানুযায়ী অবতরণ করে না।
মানব কলব বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কেরام বলেন, 'দুনিয়া হলো আখিরাতের শস্যক্ষেত্র। কলব তার জমি। ঈমান হলো শস্যবীজ। জমি চাষ, নিষ্কাসন, পানি সিঞ্চন এবং নদী খনন হলো ইত্যাদি হচ্ছে ইবাদত।
ঘোর দুনিয়াসক্ত কলব হলো জলাভূমির ন্যায়। সেখানে কোনো শস্য বিকশিত হয় না। কিয়ামতের দিন ফসল ঘরে নেওয়ার দিন। যে যা চাষ করেছে, সে তাই নিজের ঘরে উঠাবে। ঈমানের বীজ ছাড়া অন্য কোনো বীজ বৃদ্ধি লাভ করবে না। তদ্রূপ অপবিত্র অন্তর এবং কলুষিত চরিত্রের সাথেও ঈমান খুব কমই ফলদায়ক হবে।
জলাভূমিতে কোনো বীজ উৎপাদন হয় না। কাজেই যে বান্দা ক্ষমাপ্রাপ্তির আশা রাখে, তার হতে হবে একজন দক্ষ চাষির মতো। যে উর্বর জমি চাষ করে। ভালো উপযুক্ত বীজ বপন করে। অতঃপর প্রয়োজনীয় বিরতি দেয়। এরপর আগাছা, ঘাস ও বীজ উৎপাদনে ক্ষতিকর ও প্রতিবন্ধক সবকিছু পরিষ্কার করে। অতঃপর সমস্ত বিপদআপদ ও ঘূর্ণিঝড় থেকে নিরাপত্তার জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করে অপেক্ষা করতে থাকে ফসল পাকার এবং চূড়ান্ত সময়ের জন্য। তার এই যে অপেক্ষা, একেই বলে 'আশা'।
পক্ষান্তরে কোনো চাষি যদি কোনো জলাভূমি কিংবা পানি পৌঁছানো যায় না এতো উঁচু ভূমিতে বীজ বপন করে এবং জমির যথাযথ যত্নে মনোযোগ না দেয়। এরপর বসে থাকে ফসল কাটার মৌসুমের অপেক্ষায়। তার এই অপেক্ষাকে বলা হবে বোকামি, প্রবঞ্চনা; আশা নয়।
'আশা' ওই সময়ই প্রয়োগ করা যেতে পারে যখন বান্দা তার সামর্থ্যের সমস্ত উপকরণ ব্যবহার করার পর কাঙ্ক্ষিত বস্তুর অপেক্ষায় থাকে। তখন আর বান্দার সামর্থ্যের ভেতরের কিছু অবশিষ্ট থাকে না। যা থাকে তা হলো, বিনষ্টকারী ও ক্ষতিকর সমস্ত দুর্যোগ থেকে নিরাপদে রাখার জন্য আল্লাহর অনুগ্রহ। সুতরাং বান্দা যখন ঈমানের বীজ বপন করবে, তাকে সিক্ত করবে ইবাদতের পানি দ্বারা, নিজের অন্তরকে পবিত্র করবে নিকৃষ্ট মন্দ চরিত্রসমূহ থেকে, এরপর এই অবস্থার ওপর আমৃত্যু অবিচল থাকা ও ক্ষমাপ্রাপ্তির জন্য এবং জীবনের সুন্দর উপসংহারের জন্য আল্লাহ্ তায়ালার অনুগ্রহের অপেক্ষা করতে থাকবে- তখন তার এই অপেক্ষাকে বলা হবে বাস্তব এবং কার্যকরী আশা।
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
‎إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَجَهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَٰئِكَ
‎يَرْجُونَ رَحْمَتَ اللَّهِ ۚ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
'যারা ঈমান এনেছে, যারা হিজরত করেছে এবং যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর রহমতের আশা করে। বস্তুত আল্লাহ্ পরম ক্ষমাশীল এবং অসীম দয়ালু'। [১]
অর্থাৎ এরাই উপযুক্ত যে, আল্লাহর রহমতের আশা করবে। যার আশা তাকে ইবাদতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে, গুনাহ থেকে দূরে থাকতে অনুপ্রাণিত করে, তার আশাই কার্যকর আশা। আর যার আশা তাকে গুনাহ ও অবাধ্যতায় অবিচল ও নিমগ্ন থাকতে উৎসাহিত করে, সেটা আশা নয়; বরং প্রবঞ্চনা, মিথ্যে আশ্বাস।
যে আশা করবে, তার জন্য তিনটি উপাদান অপরিহার্য। এক, কাঙ্ক্ষিত বস্তুর প্রতি অনুরাগ থাকা। দুই, তা হারিয়ে যাওয়া কিংবা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয় থাকা। এবং তিন নম্বর হলো, তা অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা ব্যয় করা। কোনো প্রত্যাশীর মাঝে যদি উপরোক্ত কোনো একটি গুণ গরহাজির থাকে, তাহলে তা আশা হিসেবে ধর্তব্য হবে না; বরং তা হবে কামনা বাসনা। আশা এবং কামনা বাসনার মধ্যে বিস্তর ফরক রয়েছে।
আশাবাদী মাত্রই শঙ্কিত। পথিক যখন চলার পথে শঙ্কিত থাকে, তখন সে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে, কোনো কিছু হারিয়ে যাওয়ার আশংকায়। আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যে ভয় পায় সে ভোরেই রওনা করে। আর যে ভোরে রওনা করে সে গন্তব্যে স্থলে পৌঁছে যায়। মনে রেখো, আল্লাহ্ তায়ালার পণ্য খুবই মূল্যবান। শুনে রাখো, আল্লাহ্ তায়ালার পণ্য হচ্ছে জান্নাত'।[২]
কুরআন সুন্নাহয় আশা
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
قُلْ يُعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوْا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ الله يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
‘বলে দিন, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছো, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সব গুনাহ মাফ করে দেন। তিনি পরম ক্ষমাশীল অসীম দয়ালু'।।১৷
অন্যত্র বলেন-
وَإِنَّ رَبَّكَ لَدُوْ مَغْفِرَةٍ لِّلنَّاسِ عَلَى ظُلْمِهِمْ
'আর মানুষের অন্যায় সত্ত্বেও (অনুতপ্ত হলে) তোমার প্রভু তাদের প্রতি অবশ্যই ক্ষমাপরায়ণ'। [৪]
আবু মুসা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যখনই কোনো মুসলিম মারা যায়, তখন আল্লাহ্ তায়ালা তার স্থলে একজন ইয়াহুদি বা খৃষ্টান লোককে জাহান্নামে প্রবেশ করান'। [৫]
উমর বিন খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কিছু বন্দী আসলো। বন্দীদের মধ্যে একজন নারী হঠাৎ দৌড়ানো শুরু করলো। বন্দীদের মধ্যেই একটি শিশু পেয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে দুধ পান করাতে লাগলো। এই দৃশ্য দেখে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-'তোমরা কি বল, এই মহিলা কি তার সন্তানকে আগুনে নিক্ষেপ করবে?' আমরা বললাম, অবশ্যই না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
'এই মহিলা তার সন্তানের প্রতি যতটা না দয়ালু, আল্লাহ্ তায়ালা নিজ মুমিন বান্দার ওপর তার চেয়ে অধিক দয়াবান'। [৬]
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'আল্লাহ্ যখন সৃষ্টির কাজ শেষ করলেন, তখন তিনি তাঁর কিতাব লাওহে মাহফুজে লিখেন, 'নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার ক্রোধের ‘ওপর প্রবল’। এটি তাঁর নিকট আরশের ওপরে সংরক্ষিত আছে। ৷৷ ৷
আনাস রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে,
'আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, হে আদম সন্তান, যতক্ষণ তুমি আমাকে ডাকতে থাকবে এবং আমার কাছে (ক্ষমা পাওয়ার) আশা করতে থাকবে, তোমার গুনাহ যত অধিক হোক, তোমাকে আমি ক্ষমা করবো। এতে কোনো পরোয়া করবো না'।
'হে আদম সন্তান, তোমার গুনাহের পরিমাণ যদি আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, আর তুমি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো'।
'হে আদম সন্তান, তুমি যদি গোটা পৃথিবী পরিমাণ গুনাহ নিয়ে আমার কাছে আসো, আর আমার সাথে কাউকে শরিক না করে থাকো, তাহলে তোমার কাছে আমি পৃথিবী পরিমাণ ক্ষমা নিয়ে হাজির হবো'।
ইয়াহিয়া বিন মুয়াজ রহিমাহুল্লাহ বলেন- ‘গুনাহ অব্যহত রেখে অনুতপ্ত না হয়ে আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার আশায় থাকা, ইবাদত না করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের প্রত্যাশায় থাকা, জাহান্নামের বীজ বপন করে জান্নাতের প্রতিক্ষা করা, গুনাহ করে ইবাদতকারিদের আবাসে থাকার কামনা করা, আমল না করেই প্রতিদান পাওয়ার অপেক্ষা করা, সীমালঙ্ঘন অপ্রতিহত রেখে আল্লাহর তায়ালার ওপর ভরসা করা—আমার কাছে সবচেয়ে প্রবঞ্চনাকর ব্যাপার’।
'আপনি মুক্তি চাইবেন কিন্তু মুক্তির পথ মাড়াবেন না, জাহাজ তো আর শুকনোর ওপর চলে না!'

টিকাঃ
[১] সুরা বাকারা ২১৮
[২] জামে তিরমিজি ২৪৫০
[৩] যুমার ৫৩
[৪] সূরা রাদ ৬
[৫] সহিহ মুসলিম ৬৯০৫
[৬] সহিহ মুসলিম ৬৮৭১
[৭] সহিহ বুখারি ৩১৯৪

📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব > 📄 ভয়

📄 ভয়


ভয়, আল্লাহ্ তায়ালার চাবুক। এর দ্বারা বান্দাদের ইলম ও আমলের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যান। যেন তারা তাঁর নৈকট্য অর্জন করতে পারে। ভবিষ্যতে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটার আশংকায় অন্তর অস্থির হওয়া এবং পোড়ানো, এটাই হলো ভয়। ভয়ই অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে গুনাহ ও অপরাধ থেকে নিবৃত্ত রাখে এবং জুড়ে দেয় ইবাদতের সাথে।
অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ ভয় অবচেতনতা ও গুনাহের প্রতি দুঃসাহস করার পথ খুলে দেয়। পক্ষান্তরে ভয়ের আধিক্যতা হতাশা ও নিরাশার গহ্বরে নিক্ষেপ করে।
আল্লাহ্ তায়ালার ভয় কীভাবে সৃষ্টি হয়? আল্লাহ্ তায়ালাকে জানা, তাঁর গুণাবলী সম্পর্কে অবহিত হওয়া, তিনি চাইলে গোটা বিশ্ব ধ্বংস করে দিতে পারেন বেপরোয়াভাবে, কেউ তাকে বাধা দেওয়ার নেই, এই বিশ্বাস অন্তরে বদ্ধমূল হওয়ার দ্বারা কখনো ভয় সৃষ্টি হয়। আবার কখনো সীমাতিরিক্ত গুনাহ করে তা পরিত্যাগ করার দ্বারা তৈরি হয়। অনুরূপ নিজের গুনাহ সম্পর্কে ভাবা, আল্লাহ্ তায়ালাকে চেনা, তাঁর অমুখাপেক্ষিতার কথা উপলব্ধি করার দ্বারাও ভয়ের উদ্রেক হয়। আল্লাহ্ তায়ালা যা ইচ্ছা করতে পারেন, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার কেউ নেই। কিন্তু মানুষ যা করবে সেজন্য জেরার সম্মুখীন হবে, এর মাধ্যমেও ভয়ের তীব্রতা জন্ম নেয়।
যারা নিজেদের রবকে চেনে এবং নিজেদের হাকিকত সম্পর্কে অবগত, তারাই আল্লাহ্ তায়ালাকে বেশি ভয় করে। এজন্যই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন-
'আল্লাহর শপথ, আমি সবার চেয়ে আল্লাহেক বেশি জানি এবং সবার চেয়ে অধিক ভয় করি'। [১]
একবার ইমাম শা'বি রহিমাহুল্লাহকে কেউ একজন সম্বোধন করে বলল, হে আলিম! তিনি বললেন, আলিম তো সে যে আল্লাহেক ভয় করে। কেননা আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে'। ২।
এজন্যই বলা হয়-'যে কেঁদে কেঁদে নিজের কপোলের অশ্রু মুছে, সে প্রকৃত ভীত নয়; বরং যে কাজ করলে শাস্তি হতে পারে, তা পরিহারকারীই মূলত ভীত'।
যুননুন মিশরি রহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলো, বান্দা কখন ভীত বলে গণ্য হয়? তিনি বললেন—'যখন সে নিজেকে ওই অসুস্থ ব্যক্তির স্থলে দাঁড় করায় যে অসুস্থতা দীর্ঘ হওয়ার ভয়ে আত্মরক্ষা করে'।
হাকিম আবুল কাসিম রহিমাহুল্লাহ বলেন-'কেউ কোনো জিনিসকে ভয় পেলে তার থেকে দূরে পালিয়ে বেড়ায়। কিন্তু যে আল্লাহকে ভয় পায়, সে তাঁর দিকে ধাবিত হয়'।
ফুজাইল বিন ইয়াজ রহিমাহুল্লাহ বলেন-'যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো?' তাহলে তুমি কোনো উত্তর দেবে না। কেননা তুমি যদি হাঁ বল, তাহলে তা হবে মিথ্যে। আর যদি না বলো, তাহলে তা হবে কুফরি'।
ভয়-হারাম কামনা ও প্রবৃত্তিগুলোকে জ্বালিয়ে দেয়। তখন কমনীয় গুনাহগুলো নিজের কাছে অপ্রিয় ও ঘৃণিত হয়ে ওঠে। যেমন মধু ঘৃণিত হয়ে যায় ওই ব্যক্তির কাছে, যে তাতে বিষ মেশানোর কথা জানে। সুতরাং ভয় দ্বারা প্রবৃত্তি দগ্ধ হয়। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পরিশীলিত হয়। অন্তরে সৃষ্টি হয় একনিষ্ঠতা, বিনয় ও খোদাপ্রীতি। বিদায় নেয় অহংকার হিংসা বিদ্বেষ। বরং তখন ভয়ের কারণে সদা বিভোর থাকে, নিজের পরিসমাপ্তি ও ফলাফলের ভয়াবহতার দিকে সজাগ দৃষ্টি দেয় এবং অন্যকে নিয়ে ভাবার সময় আর পায় না। প্রতিটি শ্বাস প্রশ্বাস মুহূর্ত লহমায় সে আত্মসমালোচনা, আত্মচিন্তা ও আল্লাহ্ তায়ালার ধ্যানমগ্ন হয়ে থাকে। প্রতিটি পদক্ষেপ, কথা ও সিদ্ধান্তের জন্য জিজ্ঞাসিত হতে হবে, এই চিন্তায় তন্ময় হয়ে যায়। তার অবস্থা হয়ে যায় ওই ব্যক্তির ন্যায়, যে নিক্ষিপ্ত হয়েছে কোনো হিংস্র জন্তুর ডেরায়। তার জানা নেই যে, প্রাণীটা তার থেকে বিমুখ হয়ে যাবে ফলে সে প্রাণে বেঁচে যাবে নাকি তার ওপর আক্রমণ করে তার ইহলিলা সাঙ্গ করবে? এমন অবস্থায় আপাদমস্তকে সে শুধু নিজেকে নিয়েই ভাববে; অন্যকে নিয়ে ভাবার ফুরসত তো তার হাতে নেই। যার ওপর আল্লাহর ভয় সওয়ার হয়, তার অবস্থাও এমনই হয়; সে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে; অন্যের দিকে তাকানোর অবকাশ পায় না।
ভয়ের তাৎপর্য ও মর্যাদা
ভীতদের জন্য আল্লাহ্ তায়ালা সঠিক পথের দিশা, দয়া, জ্ঞান ও সন্তুষ্টি সন্নিবেশিত করেছেন। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
هُدًى وَ رَحْمَةٌ لِّلَّذِينَ هُمْ لِرَبِّهِمْ يَرْهَبُوْنَ
'হেদায়েত ও রহমত তাদের জন্য, যারা নিজেদের প্রভুকে ভয় করে'। [৩]
অন্যত্র বলেন-
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهُ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمُوا
'আল্লাহ তায়ালার বান্দাদের মধ্যে শুধু জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে'। [৪]
আরও বলেছেন-
رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ذُلِكَ لِمَنْ خَشِيَ رَبَّه
'আল্লাহ্ তায়ালা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেছেন, তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। এটা তার জন্য, যে নিজের রবকে ভয় করে'। [৫]
আল্লাহ্ তায়ালা তাঁকে ভয়ের আদেশ দিয়েছেন। উপরন্তু তাকে ঈমানের শর্তের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَ خَافُوْنِ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ
'তোমরা আমাকে ভয় করো, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকো'। [৬]
অতএব, মুমিন কখনো একেবারে আল্লাহ্ তায়ালার ভয় থেকে মুক্ত হতে পারে না। হাঁ তার ভয় ক্ষেত্র বিশেষ দুর্বল হতে পারে। তবে তা তার ঈমান ও আল্লাহ-জ্ঞানের কমতি ও দুর্বলতার কারণেই হবে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
'যে আল্লাহ্ তায়ালার ভয়ে কান্না করে সে কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না, যে পর্যন্ত না দুধ পুনরায় ওলানে প্রবেশ করবে'। [৭]
ফুজাইল বিন ইয়াজ রহিমাহুল্লাহ বলেন-'যে আল্লাহেক ভয় করবে, এই ভয়ই তাকে তাবৎ কল্যাণের পথ দেখিয়ে দেবে'।
শিবলি রহিমাহুল্লাহ বলেন-'আমি যে দিনই আল্লাহকে ভয় করেছি, সে দিনই কোনো প্রজ্ঞা ও দৃষ্টান্ত দেখতে পেয়েছি'।
ইয়াহিয়া বিন মুয়াজ রহিমাহুল্লাহ বলেন-'যে কোনো মুমিন কোনো গুনাহ করলে তার জন্য দুটি নিয়ামত অপেক্ষায় থাকেঃ শাস্তির ভয় এবং ক্ষমার আশা'।
কুরআন সুন্নাহয় ভয়
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন—
وَالَّذِيْنَ هُمْ بِاٰيٰتِ رَبِّهِمْ يُؤْمِنُوْنَ ۙ ٥٨ وَالَّذِيْنَ هُمْ بِرَبِّهِمْ لَا يُشْرِكُوْنَ ٥٩ وَالَّذِيْنَ يُؤْتُوْنَ مَآ اٰتَوْا وَّ قُلُوْبُهُمْ وَجِلَةٌ اَنَّهُمْ اِلٰى رَبِّهِمْ رٰجِعُوْنَ ٦٠ اُولٰٓئِكَ يُسٰرِعُوْنَ فِى الْخَيْرٰتِ وَهُمْ لَهَا سٰبِقُوْنَ
‘যারা তাদের প্রভুর ভয়ে ভীত থাকে, যারা তাদের প্রভুর নিদর্শনসমূহ বিশ্বাস করে, যারা তাদের প্রভুর সাথে শরিক করে না এবং যারা যা দান করবার, তা ভীত-কম্পিত হৃদয়ে এ কারণে দান করে যে, তারা তাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন করবে। তারাই কল্যাণকর কাজে ধাবিত হয় এবং তারাই তাতে অগ্রগামী থাকে’। [৮]
আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, “তারা যা কিছুই দান করে তাদের অন্তর ভীত-প্রকম্পিত থাকে”। আমি বললাম, এরা কি তারা, যারা মদ পান করে, জিনা করে এবং চুরি করে? তিনি বললেন,
'হে সিদ্দিকের মেয়ে, না; বরং তারা হলো ওই সমস্ত লোক, যারা সিয়াম পালন করে, সালাত আদায় করে, সদকা করে, আবার এই ভয় করে যে, তাদের এসব কবুল করা হবে না। এরাই কল্যাণকর কাজের দিকে ধাবিত হয়”।[৯]
আবু যর রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'আমি (অदृश्य জগতের) যা দেখি তোমরা তা দেখ না, আর আমি যা শুনতে পাই তোমরা তা শুনতে পাও না। আসমান তো চড়চড় শব্দ করছে, আর সে এই শব্দ করার যোগ্য। তাতে এমন চার আঙ্গুল পরিমাণ জায়গাও নেই যেখানে কোনো একজন ফেরেস্তা আল্লাহ্ তায়ালার জন্য অবনত মস্তকে সাজদায় পড়ে না আছে।। আল্লাহ্ শপথ, আমি যা জানি, তোমরা যদি তা জানতে, তাহলে খুব কমই হাসতে, কাঁদতে প্রচুর, বিছানায় স্ত্রীদের ভোগ করতে না, পথে প্রান্তরে বেরিয়ে পড়তে এবং আল্লাহর সামনে কাকুতি মিনতি করতে। আল্লাহর শপথ, আমার মন চায় আমি যদি একটি বৃক্ষ হতাম আর তা কেটে ফেলা হতো!'। [১০]
হাদিসের মর্ম হচ্ছে, আমি আল্লাহ্ তায়ালার বড়ত্ব এবং অবাধ্যদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করা সম্পর্কে যে কথা জানি, তা যদি তোমরা জানতে, তাহলে তোমাদের কান্না, অস্থিরতা এবং আগত ফলাফলের জন্য ভয় দীর্ঘায়িত ত হতো। তোমরা হাসার কথা একেবারে ভুলে যেতে।
আম্মাজান আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, 'যখন আবহাওয়া পরিবর্তন হতো এবং বিক্ষুব্ধ বাতাস প্রবাহিত হতো, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কামরার মধ্যে পায়চারি করতে থাকতেন। একবার বের হতেন, আবার প্রবেশ করতেন। এসবই করতেন একমাত্র আল্লাহর আজাবের ভয়ে'। [১১]
আবদুল্লাহ বিন শিখখির রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নামায পড়তেন, তাঁর বুক থেকে চুলার হাঁড়ির (ফুটন্ত পানির) মতো কান্নার অস্ফুট আওয়াজ শোনা যেতো'। [১২]
সাহাবায়ে কেরام রদিয়াল্লাহু আনহুম এবং তৎপরবর্তী এই উম্মাহর সালাফদের অবস্থা নিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁরা যেমন আমলের দিকে শীর্ষে ছিলেন, তেমনি ছিলেন ভয়েরও চূড়ান্ত পর্যায়ে । আর আমরা তো এখন ত্রুটির সাগরে হাবুডুবু খাই; বরং গুনাহ করে আবার নিজেদের নিরাপদও ঠাওর করি!
আবু বকর সিদ্দিক রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-'আমি কামনা করি, আমি যদি একজন খাঁটি মুমিন বান্দার বাহুর একটি পশম হতাম!' তিনি যখন নামাজে দাঁড়াতেন, আল্লাহর ভয়ে কাষ্ঠখণ্ডের ন্যায় কাঁপতে থাকতেন।
উমর বিন খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু সুরা তুর পাঠ করছিলেন। যখন এই আয়াতে পৌঁছলেন “নিশ্চয়ই তোমার রবের আজাব পতিত হবে”, কান্না জুড়ে দিলেন। তাঁর কান্না এতো প্রকট আকার ধারণ করলো যে, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং লোকেরা তাঁর শুশ্রূষা করলো।
ইনতিকালের সময় তিনি নিজ ছেলেকে বলেন, 'তোমার জন্য আফসোস, আমার গালকে মাটিতে রেখে দাও; হতে পারে তিনি আমার ওপর রহম করবেন'। অতঃপর বললেন-'আমার ধ্বংস হোক, তিনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন'। এ কথা তিনবার বললেন। এর কিছুক্ষণ পরই তিনি ইন্তিকাল করেন।
তিনি রাতের বেলা উক্ত আয়াত পাঠ করে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ঘরের মধ্যেই কয়েকদিন আবদ্ধ থাকতেন। লোকেরা মনে করতো, তিনি অসুস্থ। অধিক কান্নার কারণে তাঁর চেহারায় দুটি কালো রেখা অংকিত হয়ে গিয়েছিল।
ইবনে আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে একবার বললেন, আল্লাহ্ তায়ালা আপনার দ্বারা কত জনপদ বিজিত করেছেন, আবাদ করেছেন কতো দেশ এবং আরও কতো খেদমত করিয়েছেন। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি শুধু চাই, আমি যেন নাজাত পাই; আমার কোনো প্রতিদানও থাকবে না, না থাকবে কোনো বোঝা'।
এদিকে উসমান বিন আফফান রদিয়াল্লাহু আনহু যখন কবরের পাশে দাঁড়াতেন, এতো পরিমাণ কান্না করতেন যে, তাঁর দাড়ি ভিজে যেতো। তিনি বলেন, 'আমাকে যদি জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, আর আমি না জানি যে, আমার ঠিকানা কোথায়, তাহলে ঠিকানা কোথায় তা জানার আগে আমি চাইবো ধূলিকণায় পরিণত হতে'।
আবু দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, 'মৃত্যুর পর তোমরা কীসের সম্মুখীন হবে তা যদি জানতে, তাহলে আরাম করে খানা খেতে না, কখনো তৃপ্তি সহকারে পান করতে না, বিশ্রাম নেওয়ার জন্য কোনো ঘরে প্রবেশ করতে না; বরং রাস্তা ঘাটে পথে প্রান্তরে বেরিয়ে পড়তে, নিজেদের বুক চাপড়াতে এবং নিজেদের পরিণতির জন্য বিলাপ করতে থাকতে। আমি কামনা করি, আমি যদি কোনো বৃক্ষ হতাম, আর আমাকে কেটে ভক্ষণ করে ফেলা হতো!'
ইবনে আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহু এ পরিমাণ কান্না করতেন যে, তাঁর উভয় চক্ষুর নিচে পুরান জুতার ফিতার মতো কালো দাগ পড়ে গিয়েছিল।
আলী রদিয়াল্লাহু আনহু ফজর নামায থেকে সালাম ফেরালেন। তাঁকে বিষণ্ণ দেখা যাচ্ছিল। তিনি নিজ হাত ওলট পালট করছিলেন। এমন সময় বললেন, 'আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের স্বচক্ষে দেখেছি। কিন্তু আজকের অবস্থার সাথে তাদের অবস্থার কোনো মিল নেই। তাদের অবস্থা থাকতো রিক্তহস্ত ধূলিমলিন ও আলুথালু কেশ। তাদের চোখে মেষের হাঁটুর ন্যায় দাগ পড়ে যেতো। নৈশ যাপন করতেন সাজদা, নামায ও আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে। তাদের কপাল ও পায়ের ওপর পালাক্রমে ভার ن্যস্ত করতেন। (অর্থাৎ কখনো দাঁড়িয়ে ইবাদত করতেন, কখনো সাজদা দিয়ে কাটিয়ে দিতেন।) সকাল হলে আল্লাহর জিকিরে নিমগ্ন হয়ে যেতেন। পবনের দিনে গাছ যেভাবে দোলে, তারাও সেভাবে দুলতেন। তাদের চোখ বেয়ে নেমে আসতো বারিধারা। এমনকি তাদের কাপড় ভিজে যেতো। আর আজ আল্লাহর শপথ, আমি এক জাতি দেখছি, যারা রাত কাটিয়ে দেয় উদাসীনতায়'। এরপর তিনি উঠে চলে গেলেন। পরবর্তীতে তাঁকে আর কখনো হর্ষোৎফুল্ল দেখা যায় নি।
মুসা বিন মাসউদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা যখন সুফিয়ান সাওরির মজলিসে বসতাম, তাঁর ভয় ও অস্থিরতা দেখে আমাদের মনে হতো, আমরা আগুনে পরিবেষ্টিত হয়ে আছি।
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ এর বর্ণনায় একজন বলেন, তিনি আসলে মনে হতো কোনো অন্তরঙ্গের দাফনকার্য শেষ করে আসলেন। বসলে মনে হতো তিনি একজন বন্দী, তাঁর গর্দান কেটে ফেলার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আর জাহান্নামের কথা স্মরণ করলে তাঁর অবস্থা হতো এমন যে, কেমন যেন জাহান্নাম একমাত্র তাঁর জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে'।
বর্ণিত আছে, যুরারা বিন আবু আওফা রহিমাহুল্লাহ ফজরের নামায পড়াচ্ছিলেন। তিলাওয়াত করছিলেন সুরা মুদ্দাসসির। যখন আল্লাহ্ তা'আলার এই বাণী পাঠ করলেন 'যে দিন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে, সে দিন হবে অত্যন্ত কঠিন দিন।[১৩] তখন তাঁর শ্বাস ভারী হয়ে গেলো এবং তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। [১৪]
আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করা হয় যে, তিনি বলেছেন, 'তোমরা কান্না করো। যদি কান্না না আসে তাহলে কান্নার ভান করো। ওই সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা যদি জানতে, তাহলে এতো পরিমাণ বিলাপ করতে যে, তোমাদের শ্বাস বন্ধ হয়ে যেতো। এতো পরিমাণ নামায পড়তে যে, তোমাদের মেরুদণ্ড ভেঙে যেতো'।[১৫]

টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি ৬১০১
[২] সুরা ফাতির ২৮
[৩] সুরা আ'রাফ ১৫৪
[৪] সুরা ফাতির ২৮
[৫] সুরা বাইয়িনাহ ৮
[৬] সুরা আলে ইমরান ১৭৫
[৭] সুনানে নাসাঈ ৩১০৮
[৮] সুরা মুমিনুন ৫৭-৬১
[৯] জামে তিরমিজি ৩১৭৫
[১০] জামে তিরমিজি ২৩১২
[১১] সহিহ বুখারি ৬/৩০০; সহিহ মুসলিম ৬/১৯৬
[১২] সুনানে নাসাঈ ১২১৪
[১৩] সুরা মুদ্দাসসির ৮-৯
[১৪] ইবার, যাহাবি ১/১০৯
[১৫] আল আহওয়াল, হাকিম ৪/৫৭৮

📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব > 📄 দুনিয়া

📄 দুনিয়া


কুরআন সুন্নাহয় দুনিয়া সম্পর্কে বর্ণিত নিন্দাবাদসমূহ, কিয়ামত পর্যন্ত পালাক্রমিক আগত দিবারাত্রির পরিবর্তন এবং কালকে উদ্যেশ্য করে করা হয় নি। কেননা আল্লাহ্ তায়ালা পরস্পরের অনুগামী করে দিন ও রাত সৃষ্টি করেছেন, যেন যারা উপদেশ গ্রহণের ইচ্ছা রাখে কিংবা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে চায়, তাদের উপকারে আসে, তারা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। তাই দুনিয়ার নিন্দা দ্বারা দিন রাত কিংবা কালকে উদ্যেশ্য নেওয়া যায় না। বর্ণিত আছে, 'দিন ও রাত হলো দুটি খাজানা, তাই এ দুটোকে কোন কাজে ব্যয় করছো তা ভেবে দেখো'।
মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'প্রতিটি দিন বলে, “হে আদম সন্তান, আমি আজ তোমার কাছে আগমন করেছি, পরবর্তীতে আর কোনো দিন তোমার কাছে ফিরে আসব না। তাই আমার মাঝে কি করছো ভেবে দেখো"। অতঃপর দিন শেষ হয়ে গেলে তাকে ভাজ করা হয় এবং তার ওপর সিল মেরে দেওয়া হয়। কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা খোলার আগে আর কখনো তা উন্মুক্ত হবে না'।
কেউ বলেছেন, 'দুনিয়া হলো জান্নাত ও জাহান্নামে যাওয়ার পথ। রাত মানুষের পণ্য আর দিন হলো বাজার'।
সুতরাং সময় হলো বান্দার মূল পুঁজি ও পাথেয়। জাবির রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যে লোক একবার বলে 'সুবহানাল্লাহিল আযিম ওয়াবিহামদিহী', তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছ লাগানো হয়'। [১]
অতএব যারা সময়কে অনর্থক কাজে ব্যয় করে, তারা ভেবে দেখুক, কত শত খেজুর গাছ হারিয়ে ফেলছে!
একজন আল্লাহওয়ালা এমন ছিলেন, যখন অনেক মানুষ তাঁর মজলিসে উপস্থিত হতো এবং দীর্ঘ সময় পেড়িয়ে যেতো, তখন তিনি বলতেন, 'তোমরা কি যাবে না? সূর্যের ফেরেশতা তাকে টেনে নিতে তো কোনো বিলম্ব করে না, ক্লান্ত হয় না!'
এক লোক একজন আলিমকে বলল, দাঁড়ান আপনার সাথে কথা বলবো। তিনি বললেন, 'প্রথমে সূর্যকে দাঁড় করাও'।
অনুরূপ কুরআন হাদিসে দুনিয়ার ব্যাপারে যে সমস্ত নিন্দা উচ্চারণ করা হয়েছে, সে সব দুনিয়ার স্থান তথা ভূমণ্ডলের জন্যও প্রযোজ্য নয়। জমিনে অবস্থিত পাহাড় পর্বত নদী নালা সমুদ্র ও খনিসমূহেরর সাথেও সংযুক্ত নয়। কেননা এ সব তো আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ থেক নিজ বান্দাদের জন্য নিয়ামত স্বরূপ দান করা হয়েছে। এতে তাদের জন্য যেমন উপকার রয়েছে, তেমনি রয়েছে শিক্ষাগ্রহণের উপাদান এবং স্রষ্টার একত্ব, বড়ত্ব, বিশালত্ব এবং শক্তি সামর্থ্যের নিদর্শন। কাজেই কুরআন সুন্নাহয় বর্ণিত নিন্দাগুলো দুনিয়ায় সংঘটিত 'মানব বংশের কর্মের দিকেই ফিরবে। কারণ তাদের অধিকাংশ কাজই শেষ ফলাফলের ভিত্তিতে প্রশংসা যোগ্য নয়। যেমন আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন-
اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيُوةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَ لَهُوُ وَ زِيْنَةٌ وَ تَفَاخُرُ بَيْنَكُمْ وَ تَكَاثُرُ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ
'তোমরা জেনে রাখো, দুনিয়ার জীবন তো কেবল খেলাধুলা, বাহ্যিক সাজসজ্জা, তোমাদের পারস্পরিক অহংকার এবং ধন সম্পদ ও সন্তান সন্ততিতে একে অন্যের ওপরে থাকার প্রতিযোগিতা মাত্র'। [২]
আদম সন্তান দুই ভাগে বিভক্তঃ এক ভাগ হলো তারা, দুনিয়া পরবর্তী ভালো-মন্দের হিসাব নিকাশ এবং শান্তি ও প্রতিদান দেওয়ার জন্য একটি স্থান আছে, যারা এ কথাকে অস্বীকার করে। অর্থাৎ যারা পরকাল বা আখিরাতে অবিশ্বাসী। এদের ব্যাপারে আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন-
إِنَّ الَّذِينَ لَا يَرْجُوْنَ لِقَاءَنَا وَ رَضُوا بِالْحَيُوةِ الدُّنْيَا وَ اطْمَانُوْا بِهَا وَ الَّذِينَ هُمْ عَنْ أَيْتِنَا غُفِلُوْنَ - أُولَيكَ مَأْوَتَهُمُ النَّارُ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
'যারা (আখিরাতে) আমার সাথে সাক্ষাৎ করার আশা রাখে না, পার্থিব জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট ও তাতেই পরিতৃপ্ত হয়ে গেছে এবং আমার নিদর্শনাবলী সম্পর্কে উদাসীন, তাদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম; তাদের কৃতকর্মের বদলায়'। [৩]
এ সমস্ত লোকদের একমাত্র অভিলাষ হলো দুনিয়া উপভোগ করা এবং মৃত্যুর পূর্বে যতটুকু পারা যায় দুনিয়ার স্বাদ আস্বাদন করে নেওয়া। যেমন আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَ الَّذِينَ كَفَرُوا يَتَمَتَّعُوْنَ وَيَأْكُلُوْنَ كَمَا تَأْكُلُ الْأَنْعَامُ وَالنَّارُ مَثْوًى لَّهُمْ
'যারা কাফের, তারা ভোগ বিলাসে মত্ত থাকে এবং আহার করে চতুষ্পদ জন্তু যেভাবে আহার করে। তাদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম'।
আর মানব বংশের দ্বিতীয় প্রকার হলো তারা, যারা মৃত্যুর পর শান্তি ও প্রতিদানের স্থানকে বিশ্বাস করে এবং নিজেদেরকে প্রেরিত পয়গম্বরদের সাথে সংশ্লিষ্ট রাখে। অর্থাৎ যারা আল্লাহ্ ও আখিরাতকে বিশ্বাস করে এবং নবী রাসুলের ওপর ঈমান রাখে। এরা আবার তিন ভাগে বিভক্তঃ নিজের প্রতি অত্যাচারী, মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী এবং কল্যাণের পথে অগ্রগামী।
নিজের প্রতি অত্যাচারীঃ এই শ্রেণীর মানুষের সংখ্যাই অধিক। এদের অধিকাংশাই দুনিয়ার চাকচিক্য ও সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। অন্যায়ভাবে দুনিয়া অর্জন করছে এবং অন্যায্য পথে ব্যবহার করছে। দুনিয়াই তাদের প্রধান চিন্তা। তাদের সন্তুষ্টি ক্ষোভ বন্ধুত্ব শত্রুতা ইত্যাদি দুনিয়াকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। দুনিয়ার জন্যই তাদের বন্ধুত্ব, শত্রুতাও এর জন্যই। এরা সবাই যদিও আখিরাতের ওপর মোটামুটি বিশ্বাসী, তথাপি দুনিয়ার ভোগ বিলাস ও আনন্দে মাতোয়ারা। দুনিয়ার উদ্যেশ্য সম্পর্কে তারা অসচেতন। দুনিয়া-পরবর্তী জীবনের জন্য পাথেয় অর্জন করার ক্ষেত্র স্বরূপ, এ কথা তারা বেমালুম ভুলে গেছে।
মধ্যপন্থা অবলম্বন কারিঃ এরা দুনিয়াকে গ্রহণ করে শরীয়ত অনুমোদিত পন্থায়। দুনিয়া সংক্রান্ত যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে। নিজের কর্তব্য পালন করার পর অবশিষ্ট অংশটুকু রেখে দেয় দুনিয়ার হালাল ও শরীয়তবৈধ কামনা বাসনা ও অভিলাষগুলো পূরণ করার জন্য। এজন্য অবশ্য তাদের কোনো শাস্তি হবে না; তবে তাদের স্তর ও মান কিছুটা কমে যাবে।
কল্যাণের পথে অগ্রগামীঃ যারা দুনিয়ার উদ্যেশ্য ও হাকিকত অনুধাবন করে এবং সে অনুযায়ী আমল করে। তারা জানে যে, আল্লাহ্ তায়ালা বান্দাদের দুনিয়ায় বসবাস করাচ্ছেন, ভূমিতে প্রেরণ করেছেন তাদের মধ্যে কে উত্তম ইবাদত করে তা যাচাই ও পরিক্ষা করার জন্য। যেমন আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন-
إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَّهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
'পৃথিবীতে যা কিছু আছে আমি সেগুলোকে তার শোভা করেছি, মানুষকে এই পরীক্ষা করার জন্য যে, এদের মধ্যে কর্মে ও আমলে কে শ্রেষ্ঠ'। [৪]
উক্ত আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা বান্দাদের দুনিয়ার প্রতি অনুৎসাহিত করে আখিরাতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। এরপর আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَإِنَّا لَجَعِلُوْنَ مَا عَلَيْهَا صَعِيدًا جُرُزًا
‘নিশ্চয়ই ভূপৃষ্ঠে যা কিছু আছে, আমি একদিন তা সমতল প্রান্তরে পরিণত করবো’।[৫]
এই প্রকারের মানুষজন দুনিয়া থেকে ততটুকুই গ্রহণ করে, অর্জন করে যা একজন মুসাফিরের পাথেয় হিসেবে যথেষ্ট। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
‘দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক! আমি তো ওই আরোহীর ন্যায়, যে কোনো এক গাছের নিচে বিশ্রাম গ্রহণ করে। পুনরায় চলা শুরু করে আর গাছটিকে ছেড়ে চলে যায়’।[৬]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনে উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমাকে অসিয়ত করেছেন—
‘তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো, যেন তুমি একজন পথিক কিংবা প্রবাসী’।[৭]
এই প্রকারের লোকজন যদি তাদের বৈধ চাহিদা পূরণে আল্লাহ্ তাআলার ইবাদতের জন্য শক্তি অর্জনের নিয়ত করে, তাহলে তাদের কামনাপূরণও ইবাদতে পরিণত হবে এবং এ জন্য তাদের প্রতিদানও দেওয়া হবে। মুয়াজ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমি আমার নামায থেকে যেমন সওয়াবের আশা করি, আমার নিদ্রা থেকেও তেমন সওয়াবের আশা করি’।
সাইদ বিন জুবাইর রহিমাহুল্লাহ বলেন—‘তোমাকে আখিরাত-অন্বেষণ থেকে উদাসীন ও গাফেল করে দেয় যা কিছু, তাই প্রবঞ্চনার পণ্য। আর যা তোমাকে আখিরাতের স্মরণ থেকে গাফেল করে না, তা প্রবঞ্চনার পণ্য না; বরং তার চেয়ে কল্যাণকর বস্তুর দিকে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম’।
ইয়াহিয়া বিন মুয়াজ রহিমাহুল্লাহ বলেন—‘আমি দুনিয়াকে কেন পছন্দ করবো না? অথচ এখানে আমার জীবন যাপনের জন্য খাদ্য সরঞ্জাম আছে, যার মাধ্যমে আমি ইবাদত করার শক্তি অর্জন করি; যা আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে’।
আবু সাফওয়ান রায়িনি রহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'আল্লাহ তায়ালা কুরআনে যে দুনিয়ার নিন্দা করেছেন এবং বুদ্ধিমান মাত্রই যে দুনিয়া পরিহার করা উচিত, সেটা কোন দুনিয়া? তিনি জবাবে বললেন, 'দুনিয়ার যে উপাদান দিয়ে তুমি দুনিয়া কামনা করবে, তাই নিন্দিত ও তিরস্কৃত। আর যে উপাদান দিয়ে আখিরাত কামনা করবে, তা নিন্দিত নয়; বরং প্রশংসিত'।
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন-'মুমিনের জন্য দুনিয়া কতই না উত্তম বাসস্থান; সে অল্প কিছু আমল করে এবং জান্নাতের জন্য পাথেয় অর্জন করে নিয়ে যায়। পক্ষান্তরে কাফের ও মুনাফিকের জন্য দুনিয়া কতই না নিকৃষ্ট আবাস; সে দুনিয়ার রাতগুলো নষ্ট করে এবং জাহান্নামের জন্য পাথেয় অর্জন করে নিয়ে যায়'।
আবু মুসা আশআরি রদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন-'যে দুনিয়াকে ভালবাসবে তার আখিরাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর যে আখিরাতকে অগ্রাধিকার দেবে, তার দুনিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতএব তোমরা যা অবশিষ্ট থাকবে তাকে প্রাধান্য দাও যা ফুরিয়ে যাবে তার ওপর।[৮]
আউন বিন আবদুল্লাহ বলেন-'অন্তরের মধ্যে দুনিয়া ও আখিরাত হলো বাটখারার দুই পাল্লায় ন্যায়; একদিক ওপরে উঠলে অন্যদিক স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিচে নেমে যায়'।
ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, দুনিয়া ও আখিরাতের দৃষ্টান্ত হলো-'এক ব্যক্তির দুইজন স্ত্রী আছে। সে একজনকে সন্তুষ্ট করলে অন্যজন বিক্ষুব্ধ হয়ে যায়'।
আবু দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-'তোমরা যদি কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে হলফ করে বলতে পারো যে, সে তোমাদের মাঝে সবচেয়ে বেশি দুনিয়াবিমুখ, তাহলে আমিও হলফ করে বলতে পারবো, সে তোমাদের মাঝে সবচেয়ে ভালো ব্যক্তি'।
আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু তাবিয়িদের লক্ষ্য করে বললেন,
'তোমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের চেয়ে বেশি সালাত আদায় করো, অধিক সিয়াম পালন করো এবং অনেক বেশি মেহনত করো, কিন্তু তাঁরা তোমাদের চেয়ে উত্তম লোক ছিলেন'। লোকেরা বলল, হে আব্দুর রহমানের পিতা, কেন এমনটা হলো? তিনি বললেন, 'তারা তোমাদের চেয়ে বেশি দুনিয়াবিমুখ এবং আখিরাতে অনুরক্ত ছিলেন'।
দুনিয়াপ্রীতির অপকারিতা
সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ঈসা বিন মারিয়াম আলাইহিস সালাম বলতেন, 'দুনিয়াপ্রীতি সমস্ত অনিষ্টের মূল। সম্পদে রয়েছে অনেক অসুখ'। জিজ্ঞেস করা হলো, সম্পদের অসুখ কি? তিনি বললেন, 'সম্পদশালী সাধারণত অহমিকা ও গৌরব থেকে নিরাপদ থাকে না'। তারা বলল, যদি নিরাপদ থাকতে পারে? তিনি বললেন, 'তাহলে তার ব্যস্ততা তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয়'। [৯]
দুনিয়ার ভালোবাসা দ্বারা জাহান্নাম আবাদ হয়। আর দুনিয়াবিমুখতা দ্বারা জান্নাত আবাদ হয়। মদের নেশার চেয়েও দুনিয়াসক্তির নেশা অনেক প্রবল। মদখোর তো কিছুক্ষণ পরেই সম্বিত ফিরে পায়; কিন্তু দুনিয়াসক্ত লোক গোরের অন্ধকারে না গিয়ে এই নেশা থেকে উঠে আসতে পারে না। ইয়াহিয়া বিন মুয়াজ রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'দুনিয়া হলো শয়তানের মাদক। যে তাতে আসক্ত হয়ে যায়, সে মৃত্যুর সৈন্যদের দেখে, নিজেকে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে আবিষ্কার করে, অনুতপ্ত হওয়ার পূর্বে এই নেশা থেকে মুক্ত হতে পারে না।
দুনিয়াপ্রীতির সবচেয়ে প্রধান অপকার হলো, তা আল্লাহর ভালোবাসা, স্মরণ ও জিকির থেকে গাফেল করে দেয়। সম্পদের কারণে যে আখিরাত থেকে উদাসীন হয়ে যায় সে ক্ষতিগ্রস্ত। অন্তর যখন আল্লাহর স্মরণ থেকে উজাড় হয়ে যায়, তখন শয়তান সেখানে ঘাঁটি স্থাপন করে নেয় এবং যাচ্ছেতাই তাকে পরিচালনা করে। দ্বীনি ক্ষতির ক্ষেত্রে তার এমন একটি মনোভাব তৈরি হয় যে, সে অল্পকিছু ভালো কজ করে সন্তুষ্ট ও তৃপ্তির ঢেকুর তোলে এবং ভাবে যে, আমি অনেক ভালো কাজ করে ফেলেছি।
ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'দুনিয়ায় আগত সকলেই মেহমান এবং তার সম্পদ সমস্ত ধারের বস্তু; কর্জ। সুতরাং মেহমান কিছুদিন পরেই চলে যাবে আর কর্জের সম্পদ ফিরিয়ে দিতে হবে'।
দুনিয়াপ্রীতি সমস্ত অনিষ্টের মূল এবং দ্বীনের জন্য হানিকারক, এ কথার বিশ্লেষণে আল্লাহওয়ালা উলামায়ে কেরাম কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন,
এক, দুনিয়ার ভালোবাসা দুনিয়াকে অন্তরের মাঝে সম্মানযোগ্য করে তোলে। অথচ আল্লাহ্ তায়ালার নিকট দুনিয়া বড়ই তুচ্ছ। আর আল্লাহ্ তায়ালার নিকট তুচ্ছ কোনো জিনিসকে সম্মান করা একটি বড় কবিরা গুনাহ।
দুই, দুনিয়ায় জীবন যাপন করতে যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু বাদে আল্লাহ্ তায়ালা দুনিয়াকে অভিসম্পাত করেছেন, নিন্দা করেছেন এবং এর প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। আর আল্লাহ্ তায়ালার অভিশপ্ত নিন্দিত ও ঘৃণিত বিষয়কে যে ভালোবাসে সে আল্লাহ্ তায়ালার ঘৃণা, ক্রোধ এবং আজাবের সম্মুখীন হয়।
তিন, যখন কেউ দুনিয়াকে ভালবেসে ফেলে, তখন সে দুনিয়াকেই নিজের চূড়ান্ত গন্তব্য স্থির করে নেয়। ফলে আল্লাহ্ তায়ালা যে সমস্ত কাজকে তাঁর এবং আখিরাত পর্যন্ত পৌঁছার মাধ্যম বানিয়েছেন, সে এগুলোকে দুনিয়া অর্জনের পেছনে ব্যয় করে। কাজেই বিষয়টি হয়ে যায় একদম বিপরীত, পরিবর্তন হয়ে যায় পুরো দর্শন।
সাকুল্যে এখানে দুটি সমস্যা সৃষ্টি হয়েছেঃ এক, মাধ্যম বা উপায়কে চূড়ান্ত লক্ষ্য বানিয়ে ফেলা। দুই, আখিরাতের কাজ দিয়ে দুনিয়া তালাশ করা। এই উভয়টিই সবদিক থেকে বিরাট নিকৃষ্ট এবং কুৎসিত ব্যাপার। দা কুমড়োর সম্পর্ককে তারা পরিবর্তন করে ফেলে। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَيَوةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُوْنَ أُولَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبُطِلٌ مَّا كَانُوا يَعْمَلُوْنَ
'যারা কেবল পার্থিব জীবন ও তার ঠাটবাট চায়, আমি তাদেরকে তাদের কর্মের পূর্ণ ফল এ দুনিয়াতেই ভোগ করতে দেবো এবং এতে তাদের কোনো কম দেওয়া হবে না। এরাই তারা যাদের জন্য আখেরাতে জাহান্নাম ছাড়া কিছুই নেই। যা কিছু কাজকর্ম তারা করেছে তা পরকালে নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তারা যা আমল করেছে তা বাতিল বলে গণ্য হবে'। [১০]
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তায়ালা বান্দাদের মাঝে ফয়সালার জন্য অবতরণ করবেন। সকল উম্মত সেদিন নতজানু থাকবে। সর্বপ্রথম যাদের ডাকা হবে তারা হলো কুরআনের হাফিজ, আল্লাহর পথের শহীদ এবং প্রচুর ধনসম্পদের অধিকারী একব্যক্তি। আল্লাহ্ তায়ালা কুরআনের হাফেজকে বলবেন, "আমি আমার রাসুলের ওপর যা নাযিল করেছিলাম, তোমাকে কি সেই বিষয়ের জ্ঞান দেই নি?”
সে বলবে, 'হাঁ, অবশ্যই দিয়েছিলেন, হে আমার রব'। আল্লাহ্ তায়ালা বলবেন, “যে জ্ঞান তুমি লাভ করেছিলে, তদনুসারে কী আমল করেছিলে?” সে বলবে, 'আমি দিন রাত তা তিলাওয়াত করেছি'। আল্লাহ্ তায়ালা বলবেন, 'তুমি মিথ্যা বলেছ'। ফেরেশতাগণও বলবেন, 'তুমি মিথ্যা বলেছ'। আল্লাহ্ তায়ালা তাকে বলবেন, "তুমি বরং পাঠ করেছো এ জন্য যে, মানুষ বলবে, অমুকে ক্বারি”। আর তা বলা হয়েছে।
অতঃপর নিয়ে আসা হবে ধনী ব্যক্তিকে। আল্লাহ্ তায়ালা তাকে বলবেন, “তোমাকে কি প্রচুর বিত্ত দেই নি? তোমাকে তো অন্যের প্রতি মুখাপেক্ষী হতে হতো না?” সে বলবে, 'হাঁ অবশ্যই হে আমার রব'। আল্লাহ্ বলবেন,
"তোমাকে আমি যা দিয়ছিলাম তা দিয়ে কী আমল করেছো?" সে বলবে, 'তা দিয়ে আমি আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রেখেছি এবং দান সাদকা করেছি'। আল্লাহ্ বলবেন, 'তুমি মিথ্যা বলছো'। ফেরেশতাগণও বলবেন, 'তুমি মিথ্যা বলছো'।
এরপর আল্লাহ্ বলবেন, “তোমার নিয়ত ছিল তোমাকে যেন বলা হয় অমুক ব্যক্তি খুব দানশীল”। আর তা বলে হয়েছে।
তারপর আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়া ব্যক্তিকে আনা হবে। আল্লাহ্ তায়ালা তাকে বলবেন, “কীজন্য তুমি নিহত হয়েছিলে?” সে বলবে, 'আমাকে আপনার রাস্তায় জিহাদের আদেশ দিয়েছেন। আমি জিহাদ করতে করতে শহীদ হয়ে গেছি'। আল্লাহ্ বলবেন, 'তুমি মিথ্যা বলছো'। ফেরেশতাগণও বলবেন, 'তুমি মিথ্যা বলছো'। এরপর আল্লাহ্ বলবেন, “তুমি বরং যুদ্ধ করেছো এ জন্য যে, লোকে বলবে অমুক অনেক সাহসী”। আর তা বলা হয়েছে।
তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার হাঁটুতে হাত চাপড়ে বললেন, 'আবু হুরাইরা, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তায়ালার এই তিনজন সৃষ্টি দ্বারাই সর্ব প্রথম জাহান্নামের আগুন প্রজ্বলিত করা হবে'। [১১]
উক্ত হাদিসে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই। দুনিয়ার ভালোবাসা তাদেরকে উত্তম প্রতিদান থেকে বঞ্চিত করে দিয়েছে। বরবাদ হয়ে গেছে তাদের যাবতীয় আমল। উপরন্তু তারা পরিণত হয়েছে জাহান্নামের উদ্বোধনপাত্রে।
চার, দুনিয়ার ভালোবাসা বান্দা এবং তার আখিরাতের জন্য উপকারী কাজের মাঝে প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড়ায়। মানুষ তখন দুনিয়া ও তার প্রেমাস্পদ নিয়েই ব্যতিব্যস্ত থাকে। তবে এক্ষেত্রে মানুষের রয়েছে বিভিন্ন স্তরঃ দুনিয়ার ভালোবাসা কাউকে সরাসরি ঈমান এবং শরীয়ত থেকেই গাফেল করে দেয়। আবার অনেককে ওয়াজিব কোনো কর্তব্য পালন করতে বাধা দেয়, যদি তা দুনিয়ার স্বার্থের বিপরীত হয়; তবে কিছু ওয়াজিব কর্তব্য সে পালন করেও বটে। অনেকে আবার সময়মত ওয়াজিব পালন করতে পারে না। যেভাবে আদায় করা দরকার ছিল, সেভাবে পারে না; বরং সময় ও ন্যায্যতায় গড়িমসি করে। কেউ কেউ আবার ওয়াজিব আদায় করার সময় নিজের অন্তরকে আল্লাহ্ তায়ালার সামনে সোপর্দ করতে পারে না, বশে আনতে পারে না নিজের কলবকে। ফলে দেখা যায় অন্তসারশুন্য প্রকাশ্য কর্তব্য আদায় হচ্ছে। দুনিয়ার প্রেমিক ও অনুরাগীদের অবস্থা এতোটাই অশুভ যে, তারা আল্লাহর দাসত্বের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত থাকে; আল্লাহ্ তায়ালার জন্য নিজের অন্তরকে একাগ্র একনিষ্ঠ করতে পারে না; তাঁর জিকিরে নিজের জিহ্বাকে সিক্ত করতে পারে না; না পারে অন্তর ও কলবকে এক সুতোয় গাঁথতে। সুতরাং দুনিয়ার মহব্বত ও ভালোবাসা অপরিহার্যভাবে আখিরাতের জন্য ক্ষতিকর; ঠিক যেভাবে আখিরাতের ভালোবাসা দুনিয়ার জন্য ক্ষতিকর।
পাঁচ, দুনিয়ার ভালবাসা দুনিয়াকে ব্যক্তির একমাত্র অভিলাষ ও মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। আনাস বিন মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যে ব্যক্তির একমাত্র চিন্তার বিষয় হবে আখিরাত, আল্লাহ্ তায়ালা সেই ব্যক্তির অন্তরকে অভাবমুক্ত করে দিবেন এবং তার যাবতীয় বিচ্ছিন্ন কাজ একত্রিত করে সুসংহত করে দিবেন, তখন তার নিকট দুনিয়া আগমন করবে বাধ্য হয়ে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তির একমাত্র চিন্তার বিষয় হবে দুনিয়া, আল্লাহ্ তায়ালা সেই ব্যক্তির দুচোখে অভাব অনটন লাগিয়ে দেবেন, তার যাবতীয় কাজ এলোমেলো করে দেবেন, আর তার জন্য দুনিয়ার যতটুকু নির্দিষ্ট সে তার চেয়ে বেশি কিছু ভোগ করতে পারবে না'। [১২]
ছয়, দুনিয়াপ্রেমী দুনিয়া নিয়েই কঠোর আজাবের সম্মুখীন হয়। দুনিয়া অর্জন করতে গিয়ে, সে জন্য প্রচেষ্টা ব্যয় করতে গিয়ে এবং দুনিয়াবাসির সাথে লেনদের করতে গিয়ে তাকে প্রচুর পরিমাণে আজাবের সম্মুখীন হতে হয়। তাছাড়া মৃত্যুর সাথে সাথে সবকিছু রেখে চলে যাওয়া, এটাও একটি আজাব। কবরজগতেও দুনিয়া হারানোর আক্ষেপ, তার বিপরীতে কোনো কিছু না পাওয়া এবং আখিরাতের জন্য কোনো কিছু সঞ্চয় না করার কারণে নির্মম আজাবের স্বীকার হতে হবে। পোকা মাকড় ও কীট পতঙ্গ তার শরীরে যে লীলাখেলা চালাবে, তার রুহ তা অনুভব করে দুশ্চিন্তা, বিষণ্ণতা ও আফসোসে টইটম্বুর হয়ে যাবে।
মোট কথা, দুনিয়া প্রেমিক দুনিয়াতেও আজাবের মধ্যে থাকবে, কবর জগতেও কঠিন আজাবের সম্মুখীন হবে এবং নিজ রবের সাথে সাক্ষাৎ কালেও আজাবের স্বীকার হতে হবে। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
فَلَا تُعْجِبْكَ أَمْوَالُهُمْ وَلَا أَوْلَادُهُمْ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ بِهَا فِي الحيوةِ الدُّنْيَا وَ تَزْهَقَ أَنْفُسُهُمْ وَهُمْ كَفِرُوْنَ
'তাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি যেন আপনাকে বিমুগ্ধ না করে। আল্লাহ্ তো চান দুনিয়ার জীবনে তাদেরকে এসব জিনিষ দ্বারাই শাস্তি দিতে। আর যাতে কাফের অবস্থাতেই তাদের প্রাণ বের হয়'।
জনৈক সালাফ বলেন-'আল্লাহ্ তায়ালা তাদেরকে শাস্তি দিবেন ধন সম্পদ জমা করার দ্বারা, এসবের মায়া নিয়েই তাদের রুহ ত্যাগ করবে এবং এসবের ওপর আল্লাহ্ তায়ালার হক আদায় না করার ক্ষেত্রে তারা কুফরি ও অকৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করবে'।
মাত, দুনিয়াপ্রীতি ও আখিরাতের চেয়ে দুনিয়ার প্রতি অধিক অনুরাগীর চেয়ে নির্বোধ ও বোকা এই পৃথিবীতে দ্বিতীয় কেউ নেই। সে কল্পনাকে প্রাধান্য দেয় বাস্তবতার ওপর। স্বপ্নকে প্রাধান্য দেয় সত্যের ওপর। অস্থায়ী ছায়ামূর্তিকে অগ্রাধিকার দেয় চিরস্থায়ী শান্তির ওপর। নশ্বর পৃথিবীকে অবিনশ্বর জান্নাতের ওপর। আখিরাতের জীবনের স্নিগ্ধতা ও প্রশান্তিকে বিক্রি করে দেয় এমন এক জীবন দ্বারা যা অলীক স্বপ্ন কিংবা বৃক্ষছায়ার ন্যায় অস্থায়ী। বুদ্ধিমান ব্যক্তি কখনো এতো সরল ধোঁকা খেতে পারে না।
জনৈক সালাফ বলেন- 'দুনিয়ার ভোগে যারা ডুবে আছো, শুনে রাখো, দুনিয়ার কোনো স্থায়িত্ব নেই; অস্থায়ী ছায়া নিয়ে ধোঁকা খাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়'।
সূর্যের আলো কখনো কখনো ছায়ায় ঢেকে যায়। এই ছায়া হয় অস্থায়ী এবং ক্রমসংকুচিত। আপনি যদি তাকে ধরার লোভে তার পিছু নেন তাহলে মাঠে মারা যাবেন। এই ছায়াই হলো দুনিয়ার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
মরুভূমিতে তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি দূর থেকে রেতচমক দেখে মনে করে পানি। দৌড়ে যায় সে দিকে। কিন্তু গিয়ে সেখানে কিছুই পায় না। শুধু বালু আর বালুই দেখতে পায়। এভাবে এক সময় তার জীবনটাই শেষ হয়ে যায়। এটা দুনিয়ার উত্তম দৃষ্টান্ত।
একজন বৃদ্ধা। তার চেহারা বড় বীভৎস। তার ওপর রয়েছে অনেক অপবাদ। তার স্বামীও তার ধোঁকা থেকে রেহাই পায় নি। সে বিয়ের প্রস্তুতি নিয়েছে। সাজসজ্জা গ্রহণ করেছে নতুন বৌয়ের। ঢেকে দিয়েছে তার চেহারার মলিনতা। প্রস্তাব দেওয়ার জন্য যারা এসেছে, তাদের অনেকেই তার বাহ্যিক চেহারা দেখে পছন্দ করে ফেলেছে; তাদের দৃষ্টি বাহ্যকে অতিক্রম করতে পারে নি। তারা প্রস্তাব দিয়ে দিলো। বৃদ্ধা বলল, মোহর হলো আখিরাত ত্যাগ করতে হবে। আমি ও আখিরাত দুই সতীন। এক সঙ্গে থাকা কোনো ক্রমেই সম্ভব নয়। পাণিপ্রার্থী তাকেই প্রাধান্য দিলো। মেনে নিলো তার শর্ত। সে বলল, প্রেয়সীকে পাচ্ছি, আখিরাত হারালেও কোনো সমস্যা নেই। বাসর রাতে যখন ঘোমটা ওঠাল, সমস্ত অলংকার খুলে ফেলল, তখন তার সামনে বাস্তবতা জাহির হলো। তারা দেখল, এর চেয়ে ধোঁকা আর কিছু হতে পারে না। এমতাবস্থায় সে হয়তো তালাক দিয়ে পালিয়ে যাবে কিংবা অন্ধের মতো থেকে যাওয়াকেই প্রাধান্য দেবে; তার বাসর রাত অতিবাহিত হবে ফাঁপা কান্না, আর্ত চিৎকার ও বিলাপে।
আল্লাহর শপথ, দুনিয়া তার প্রেমিকদের আহ্বান করে আকর্ষক ভঙ্গিতে। অনুরাগী ও পাগলেরা দলে দলে ছুটে যায় তার দিকে। দিন রাত একাকার করে তা অর্জন করার চেষ্টা করে। কেউ এক নিমেষের জন্য ক্ষান্ত দেয় না। এক পর্যায়ে দুনিয়া তার জাল বিছিয়ে দেয়। তারা সকলেই দুনিয়ার পাতা জালে ও ফাঁদে আটকা পড়ে। তখন তাদেরকে জবাই দেওয়া হয় অসহায় পশুর ন্যায়।
আহ! দুনিয়াপ্রেমীর দল কতই না অভাগা!

টিকাঃ
[১] জামে তিরমিজি ৩৪৬৪
[২] সুরা হাদিদ ২০
[৩] সুরা ইউসুন ৭
[৪] সুরা কাহাফ ৭
[৫] সুরা কাহাফ ৮
[৬] জামে তিরমিজি ২৩৭৭
[৭] সহিহ বুখারি ৬৪১৬
[৮] মুসনাদ ৪/৪১২; ইবনে হিব্বان ৬১২
[৯] ফাতাওয়া মিসরিয়া, ইবনে তাইমিয়া ৪৮৩; তাখরিজুল ইহইয়া, ইরাকি ৯/১৭০৪; শরহুল আলফিয়া ১/১৩৩
[১০] সুরা হুদ ১৫-১৬
[১১] জামে তিরমিজি ২৩৮২
[১২] জামে তিরমিজি ২৪৬৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00