📄 আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকা
অপছন্দনীয় অনাকাঙ্ক্ষিত আপতিত বিষয়ে বান্দার দুটি স্তর রয়েছে— সন্তুষ্টির স্তর এবং সবরের স্তর। সন্তুষ্টি হলো একটি বাঞ্ছিত বৈশিষ্ট্য। আর সবর মুমিনের ওপর আবশ্যকীয় কর্তব্য।
আল্লাহর ফয়সালা ও ভাগ্য-নির্ণয়ে যারা সন্তুষ্ট, এই শ্রেণীর লোকগণ কখনো বিপদদাতার প্রজ্ঞা, নিজ বান্দাকে বিপদের জন্য নির্বাচন করার দিকটি লক্ষ্য করে তাঁর সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নেন; তাঁর ব্যাপারে কোনো অভিযোগ উত্থাপন কিংবা অপবাদ আরোপ করেন না। আবার কখনো বিপদদাতার বড়ত্ব, মহত্ত্ব এবং পরিপূর্ণতার দিকে তাকিয়ে তাঁর প্রেম সাগরে ডুব দেন এবং এক পর্যায়ে কোনো কষ্ট কিংবা ব্যাথা আর অনুভব করেন না। এই স্তরে তারাই পৌঁছতে পারে, আল্লাহ্ তায়ালার ব্যাপারে যাদের রয়েছে পরিপূর্ণ জ্ঞান, যারা তাঁর প্রেমের স্রোতে অবগাহন করেছেন। তাই তো কখনো কখনো বিপদআপদ অসুখ বিসুখ নিয়েই তারা আনন্দিত হন; কেননা তাদের ভাবনায় থাকে যে, এসব তাদের বন্ধু ও প্রেমাস্পদের পক্ষ থেকেই এসেছে।
সন্তুষ্টি আর সবরের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। সবর, অন্তরকে অসন্তোষ ও ক্রোধ থেকে বিরত রাখা ও নিয়ন্ত্রণ করার নাম। সবরের মাঝে ব্যথার অনুভতি থাকে এবং অন্তরে তা দূর হয়ে যাওয়ার উদগ্র আকাঙ্ক্ষা থাকে। পাশাপাশি অস্থিরতা মোতাবেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আমল থেকে নিবৃত্ত রাখা হয়। পক্ষান্তরে সন্তুষ্টি হলো অন্তরের প্রশান্তি, আল্লাহ্ তায়ালার নির্ণয়ের ব্যাপারে হৃদয়ের সুস্থিরতা। এক্ষেত্রে ব্যাথার অনুভব থাকলেও তা দূর হয়ে যাওয়ার কামনা থাকে না। তবে অন্তরের মাঝে বিশ্বাস ও মারেফাতের যে সঞ্জীবনী অর্জিত হয়, তার দ্বারা এই ব্যাথার অনুভূতি লঘু হয়ে যায়। ক্ষেত্র বিশেষ যদি সন্তুষ্টির মাত্রা শক্তিশালী হয়, তাহলে পরিপূর্ণভাবেই ব্যাথার অনুভূতি দূর হয়ে যায়।
আনাস রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'আল্লাহ্ তায়ালা যখন কোনো জাতিকে পছন্দ করেন, তাদেরকে বিপদে পতিত করেন। অতএব যে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে, তিনিও তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। আর যে ক্রুব্ধ হয়ে যাবে, তিনিও তার ওপর ক্রুব্ধ হয়ে যাবেন'। [১]
ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-'আল্লাহ্ তায়ালা নিজ নির্ণয় ও জ্ঞান দ্বারা আনন্দ ও আত্মিক প্রশান্তি সঁপে দিয়েছেন ইয়াকিন-বিশ্বাস এবং সন্তুষ্টির ওপর। আর বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তা চাপিয়ে দিয়েছেন সংশয় ও অসন্তুষ্টির ওপর'।
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَ مَنْ يُؤْمِن بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَه
'যে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে, তিনি তার অন্তরকে সঠিক দিশা দান করেন'। [২]
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আলকামা রহিমাহুল্লাহ বলেন-'ব্যক্তির ওপর কোনো বিপদ এসে চাপে। সে তখন বিশ্বাস করে যে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে আগমন করেছে। ফলে তা মেনে নেয় এবং সন্তুষ্ট থাকে'।
অন্য আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيُوةً طَيِّبَةً
'আমি তাকে পবিত্র জীবন যাপন করাবো'।[৩]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আবু মুয়াবিয়া আসওয়ার বলেন—'পবিত্র জীবন দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সন্তুষ্টি ও অল্পেতুষ্টিময় জীবন'।
আলী রদিয়াল্লাহু আনহু দেখলেন আদি বিন হাতিম রদিয়াল্লাহু আনহু বিষণ্ণ হয়ে বসে আছেন। তিনি তাকে বললেন-'তোমাকে চিন্তিত ও বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন?' আদি রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন-'কেনই বা আমি বিষণ্ণ হবো না? আমার দুই ছেলে নিহত হয়েছে এবং আমার চোখ দুটোও উপড়ে ফেলা হয়েছে!' আলী রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন-'হে আদি, আল্লাহ্ তায়ালার নির্ণয় ও আদেশ বাস্তবায়ন হবেই। যে তাতে সন্তুষ্ট থাকবে, সে প্রতিদান পাবে। আর যে আল্লাহর নির্ণয়ে সন্তুষ্ট থাকবে না, তার ওপর নির্ণয় বাস্তবায়ন তো হবেই; উপরন্তু তার আমলনামাও নষ্ট হবে'।
এক লোক মৃত্যুশয্যায় পড়েছিল। আবু দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু গিয়ে দেখলেন সে আল্লাহর প্রশংসা করছে। এ অবস্থা দেখে তিনি বললেন, 'তুমি কাজের কাজ করছো। বস্তুত আল্লাহ্ তায়ালা যখন কোনো ফয়সালা করেন, তখন তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকাকেই পছন্দ করেন'।
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন-'যে ব্যক্তি তার জন্য নির্ধারিত ভাগ্যে সন্তুষ্ট থাকবে, তা তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে এবং তাতে সমৃদ্ধি আসবে, বরকত পাওয়া যাবে। আর যে তাতে সন্তুষ্ট থাকবে না, তা তার জন্য যথেষ্ট হবে না, সে তাতে বরকতও পাবে না'।
উমর বিন আব্দুল আজিজ রহিমাহুল্লাহ বলেন-'আল্লাহ্ তায়ালার ফয়সালা মেনে নেওয়া ব্যতীত আমার কোনো আনন্দের স্থান নেই'।
তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো—'আপনি কী কামনা করেন?' তিনি বললেন, 'আল্লাহ্ তায়ালা যা ফয়সালা করেন'।
আব্দুল ওয়াহিদ বিন জায়েদ রহিমাহুল্লাহ বলেন—'সন্তুষ্টি হলো আল্লাহ্ তায়ালার একটি বিরাট ফটক। দুনিয়ার জান্নাত এবং উপাসক ও তাপসদের প্রশান্তির স্থান'।
জনৈক সালাফ বলেছেন—'দুনিয়ায় সর্বাবস্থায় যারা আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট ছিল, আখিরাতে তাদের চেয়ে উন্নত মর্যাদার আর কাউকে দেখা যাবে না। কাজেই যাকে সন্তুষ্টির বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছে, সে চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছতে সক্ষম'।
টিকাঃ
[১] ইবনে মাজাহ ৪০৩১; মিশকাত ১৫৬৫
[২] সুরা তাগাবুন ১১
[৩] সূরা নাহল ৯৭