📄 আল্লাহ্ তায়ালার ভালোবাসা
আল্লাহ্ তায়ালার ভালোবাসা, সবচেয়ে উন্নত মর্যাদা এবং চূড়ান্ত স্তর। ভালোবাসা অর্জন হয়ে গেলে এর চেয়ে উন্নত কোনো অবস্থান নেই। আগ্রহ, ঘনিষ্ঠতা, সন্তুষ্টি ইত্যাদি যা কিছু আছে সবই ভালোবাসারই কোনো ফল এবং অনুগত বিষয়। তদ্রূপ ভালোবাসার আগেও কোনো স্থান নেই। তাওবা সবর যুহদ ইত্যাদি এসব তো এর ভূমিকা ও প্রেক্ষাপট মাত্র।
সবচেয়ে উপকারী, উন্নত, সমুজ্জ্বল ও কার্যকর ভালোবাসা হলো ওই ব্যক্তির ভালোবাসা, যার অন্তর আল্লাহর ভালোবাসায় টইটম্বুর এবং তার প্রকৃতি আল্লাহ্ তায়ালাকে স্রষ্টা ও ইলাহ হিসেবে মেনে নিয়েছে। কেননা স্রষ্টা ও প্রভু তো তিনিই, যাকে অন্তরসমূহ ভালোবাসা, সম্মান, মর্যাদা, বিনয়, আনুগত্য ও দাসত্ব দ্বারা প্রভু বানিয়ে নিয়েছে এবং স্রষ্টা হিসেবে গ্রহণ করেছে। ইবাদত ও দাসত্ব আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারও জন্য হতে পারে না। আর এই দাসত্বই বিনয় ও আনুগত্যের পূর্ণতার পাশাপাশি ভালোবাসারও পূর্ণতা দান করে।
আল্লাহ্ তায়ালার সত্ত্বা সর্বদিক থেকে প্রেমময়। অন্য সব কিছু তার প্রেমের অনুগামী হয়ে প্রেম লাভ করে। আল্লাহ্ তায়ালার নাযিলকৃত সমস্ত কিতাবেই তাঁর ভালোবাসার কথা অকাট্যভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাবৎ নবী রাসুলগণ এর দাওয়াত দিয়েছেন নিজ নিজ উম্মতকে। আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় বান্দাদের এই প্রকৃতি দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। তাদেরকে বিবেক দান করেছেন, অজস্র নেয়ামত দান করেছেন, নিজ ভালোবাসার প্রতি উদ্বুদ্ধ করার জন্যই। কেননা সাধারণ অনুগ্রহকারী এবং করুণাময়ের জন্য ভালোবাসা ও প্রেম লালন করা অন্তরসমূহের একটি বিবর্তনময় প্রকৃতি। তাহলে যিনি সর্ব দিক থেকে অনুগ্রহশীল, যিনি সমস্ত নিয়ামতের অদ্বিতীয় স্রষ্টা এবং একচ্ছত্র দাতা, তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও অনুরাগ কী পরিমাণ হতে পারে তা কল্পনাতীত। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَمَا بِكُمْ مِّنْ نِّعْمَةٍ فَمِنَ اللَّهِ ثُمَّ إِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فَإِلَيْهِ تَجْهرُونَ
'তোমাদের কাছে যে নেয়ামত রয়েছে তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই। আবার যখন তোমরা কোনো কষ্টে পড় তখন তাঁর কাছেই ফরিয়াদ করো'।[১]
আল্লাহ্ তায়ালার আসমায়ে হুসনা থেকে, মহিমাময় গুণাবলী থেকে এবং তাঁর সৃষ্টির নিদর্শনাবলী থেকে তাঁর যে পরিপূর্ণতা, বড়ত্ব, মর্যাদা ও সম্মান বান্দার সামনে স্পষ্ট হয়, এর দ্বারা প্রেম আরও গাঢ় হয়। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَ الَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لله
'কিছু মানুষ আছে যারা আল্লাহেক ছাড়া (তাঁর) কতিপয় সমকক্ষেও মান্য করে, যাদেরকে তারা আল্লাহকে ভালোবাসার মতই ভালোবাসে। পক্ষান্তরে যারা ঈমানদার, আল্লাহর প্রতি তাদের ভালোবাসা আরও দৃঢ়তর। [২]
অন্যত্র বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَه أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَفِرِينَ يُجَاهِدُوْنَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُوْنَ لَوْمَةَ لَا بِم
'হে ঈমানদারগণ, তোমাদের মধ্যে যারা স্বীয় ধর্ম ত্যাগ করবে, তাদের স্থলে আল্লাহ্ এমন একদল লোক নিয়ে আসবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং তারাও তাঁকে ভালবাসবে; তারা মুমিনদের প্রতি নরম আর কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে এবং তারা আল্লাহর পথে জেহাদ করবে ও কোনো নিন্দুকের নিন্দায় ভীত হবে না'। [৩]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত দৃঢ়তার সহিত কসম করে বলেছেন-
কোনো ব্যক্তি মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তিনি তার কাছে অধিকতর প্রিয় হন নিজ সন্তান, পিতা ও তাবৎ মানুষ থেকে। [৪]
অন্য হাদিসে উমর বিন খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহুকে লক্ষ্য করে বলেছেন-
তোমার কাছে আমি তোমার প্রাণের চেয়ে বেশি প্রিয় না হলে তুমি সত্যিকারে মুমিন হতে পারবে না। (অর্থাৎ তোমার ভালোবাসা ওই পর্যায়ে না পৌঁছলে তোমার ঈমান কার্যকরী হবে না।) [৫]
এখন ভাবার বিষয় হলো, যদি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের কাছে নিজ আত্মার চেয়ে বেশি প্রিয় হন, নিজের যাবতীয় অনুষঙ্গ থেকে অধিক ভালোবাসার পাত্র হন, তাহলে কি মহামহিয়ান প্রভু তাঁর চেয়ে আমাদের ভালোবাসা ও ইবাদতের বেশি হকদার হবেন না!
বান্দার প্রতি আল্লাহ্ তায়ালার যাবতীয় দান তাকে আল্লাহর ভালোবাসার প্রতি আহ্বান করে; চাই তা বান্দার পছন্দনীয় হোক বা অপছন্দনিয়। আল্লাহ্ তায়ালার দান ও নিষেধাজ্ঞা, নিরাপত্তা ও বিপদ, বিস্তৃতি ও সঙ্কীর্ণতা, ন্যায় ও অনুগ্রহ, মৃত্যুদান ও জীবিতকরণ, দয়া ও দানশীলতা, করুণা ও গুনাহ ঢেকে রাখা, ক্ষমা ও সহিষ্ণুতা, বান্দার ওপর সংযম, তার প্রার্থনার সাড়া দেওয়া, তার বিপদ দূর করা, তৃষ্ণা নিবারণ করা, সংকট নিরসন করা- বান্দার প্রয়োজনে হোক বা সর্ব দিক থেকে অমুখাপেক্ষিতার কালে হোক, এসব কিছু অন্তরসমূহকে আল্লাহর দাসত্ব ও ভালোবাসার দিকে আহ্বান ও উদ্বুদ্ধ করে। কোনো সৃষ্টি অপর সৃষ্টির প্রতি কোনো করুণা ও অনুগ্রহ করলে সে তাকে ভালো না বেসে পারে না। তাহলে যে সত্ত্বা বান্দাকে ধারাবাহিক অবাধ্যতা সত্ত্বেও নিরবচ্ছিন্ন অনুগ্রহ দিয়ে ভাসিয়ে রেখেছেন, তাঁকে বান্দা কীভাবে ভালবাসবে না!
বান্দার জন্য কল্যাণকর যা কিছু আছে তিনি অবতরণ করেন, অনিষ্টকর সবকিছু নিজের দিকে উঠিয়ে নেন। তিনি বান্দা থেকে চির অমুখাপেক্ষী হয়েও স্বীয় নিয়ামত দিয়ে তার কাছে প্রিয় হতে চান। কিন্তু বান্দা প্রতি লহমায় তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী হয়েও গুনাহ ও অবাধ্যতার মাধ্যমে তাঁর থেকে দূরে সরে যেতে চায়, তাঁর কাছে ঘৃণিত হতে চায়। তাঁর দান, অনুগ্রহ, কৃপা ও নিয়ামত তাকে অবাধ্যতা থেকে নিবৃত্ত করতে পারে না; কিন্তু তার অবাধ্যতার কারণে পরম দয়ালু প্রভু তাঁর দান অনুদান বন্ধ করে দেন না। তাহলে তাঁকে বান্দা কেন ভালবাসবে না!
দুনিয়ার যাকে বা যা কিছু আপনি ভালোবাসেন এবং যারা আপনাকে ভালোবাসে, এই ভালোবাসা মূলত নিজের জন্য, নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য। পক্ষান্তরে আল্লাহ্ তায়ালা আপনাকে ভালোবাসেন আপনার কল্যাণের জন্যই।
দুনিয়ার বাজারে যার সাথেই লেনদেন করবেন, যদি সে আপনার থেকে লাভ করতে না পারে, তাহলে আপনার সাথে লেনদেন করবে না; যে কোনো প্রকারের লাভ তার চাইই চাই। কিন্তু রাব্বল আলামিন আপনার সাথে লেনদেন করেন আপনাকে লাভবান করার জন্য, চির উন্নত এবং বৃহৎ মুনাফা আপনাকে দান করার জন্য। সুতরাং আপনি এক দিরহাম দান করলে তা দশ গুণ থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি হয়ে যাবে। কিন্তু আপনি একটি গুনাহ করলে, তা একটি হিসেবেই পরিগণিত হবে; আবার গুনাহই এমন বস্তু যা সবচেয়ে দ্রুত মুছে ফেলা হয়। তাহলে এতো উদার রবকে বান্দা কেন ভালবাসবে না!
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আপনাকে সৃষ্টি করেছেন নিজের জন্য। আর দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় জিনিষ সৃষ্টি করেছেন আপনার জন্য। তাহলে তাঁর চেয়ে উত্তম কে আছে আপনার হৃদয়ের মণিকোঠায় জায়গা পাওয়ার মতো, সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য প্রচেষ্টা করার মতো!
আপনার এবং তাবৎ সৃষ্টিকুলের সমস্ত চাহিদা আকাঙ্ক্ষা ও মতলব একমাত্র তাঁর কাছেই বিদ্যমান। তিনি সবচেয়ে উদার। বড় দানশীল। বান্দা না চাইতেই তাকে আশাতীত অনেক দান করেন। অল্প আমল করলেও তা মূল্যায়ন করেন এবং তার প্রতিদান বৃদ্ধি করে দেন। অনেক গুনাহ ভুল ত্রুটি ক্ষমা করেন এবং মিটিয়ে দেন। আসমান জমিনে যা কিছু আছে, সবাই তাঁর কাছে প্রার্থনা করে। প্রতিদিনই তাঁর নতুন নতুন কর্মসূচি থাকে। এক জনের প্রার্থনা শুনতে গিয়ে তিনি অন্য জনের প্রার্থনা থেকে উদাসীন হয়ে যান না। প্রার্থনার আধিক্য তাকে ভুলে পতিত করতে পারে না। অনুনয়কারীদের অব্যহত তাগিদে তিনি বিচলিত কিংবা বিরক্ত হন না; বরং নাছোড় প্রার্থনাকারীদের পছন্দ করেন। তাঁর কাছে চাইলে তিনি খুশি হন। না চাইলে হন রুষ্ট। তিনি বান্দা থেকে লজ্জাবোধ করেন কিন্তু বান্দা তাঁর থেকে লজ্জাবোধ করে না। তিনি বান্দার দোষত্রুটি গোপন রাখেন কিন্তু বান্দা নিজের দোষত্রুটি তাঁর থেকে গোপন রাখতে পারে না। তিনি বান্দার ওপর দয়া করেন কিন্তু বান্দা নিজের ওপর দয়া করে না। নিজের নিয়ামত অনুগ্রহ ও সমর্থন দ্বারা বান্দাকে ডেকেছেন তাঁর সন্তুষ্টির পথে, কিন্তু বান্দা অস্বীকার করে। সে মিশন পূরণ করার জন্য তাদের কাছে প্রেরণ করেছেন নবী রাসুল। তাদের সাথে পাঠিয়ে দিয়েছেন নিজের পত্র এবং অঙ্গীকারসমূহ। আবার বান্দার চাহিদা কামনা প্রার্থনা পূরণ করার জন্য তিনি নিজেই অবতরণ করেন প্রতিনিয়ত। মমতাভরে ডেকে ডেকে বলতে থাকেন, 'কে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দেবো। আছে কি কেউ আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করবো'। [৬]
যিনি সমস্ত কল্যাণের আঁধার, যিনি সবার ডাকে সাড়া দেন, যিনি ত্রুটি বিচ্যুটি সমীহ করেন, যিনি গুনাহগুলো ক্ষমা করেন, যিনি অন্যায়গুলো গোপন রাখেন, যিনি বিপদআপদ দূর করেন, যিনি সমস্ত আক্ষেপ মোচন করেন, সর্বোপরি যার কাছেই সমস্ত চাওয়া পাওয়া আকাঙ্ক্ষা অভিলাষের ভাণ্ডার, অন্তর সমূহ তাঁকে ভালো না বেসে কি করে থাকতে পারে?
তিনিই স্মরণের বরণের মূল্যায়নের কৃতজ্ঞতার দাসত্বের আনুগত্যের ও প্রশংসার সবচেয়ে বেশি হকদার। তিনিই বাঞ্ছিত সাহায্যকারী, সদয় প্রতাপশালী, উদার বদান্য, প্রশস্ত দানশীল। দয়া প্রার্থনা করলে তিনি দয়া করেন। তাঁর পথে যাত্রা করলে সম্মানিত করেন। তাঁর কাছে আশ্রয় নিলে মর্যাদাশীল করেন। তাঁর ওপর ভরসা করলে যথেষ্ট হয়ে যান। জন্মদাতা মা নিজ সন্তানের ওঁরপর যতটুকু দয়াবান, তিনি নিজ বান্দার ওপর তার চেয়েও অধিক দয়াবان। ধূসর মরুভূমিতে রসদপত্রসহ একমাত্র সম্বল উট হারিয়ে অস্থির এবং মৃত্যুমুখে পতিত ব্যক্তি হারানো উট ফিরে পেয়ে যে পরিমাণ আনন্দিত ও খুশি হয়, কোনো বান্দা তাওবা করে তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করলে তিনি এর চেয়েও অধিক আনন্দিত হন। তিনিই সবকিছুর মালিক।
তাঁর কোনো শরিক নেই। তিনি একক। তাঁর কোনো সমকক্ষ নেই।
সব জিনিষই ধ্বংসশীল, একমাত্র তিনি ছাড়া। তাঁর আদেশেই বান্দা ইবাদত করতে পারে। গুনাহ করলেও তাঁর জ্ঞান অনুযায়ীই করে। তাঁর ইবাদত করলে তিনি তা মূল্যায়ন করেন। তাঁর তাওফিক ও নিয়ামতের দ্বারাই বান্দা তাঁর ইবাদত করতে পারে। বান্দা যদি তাঁর অবাধ্যতা করে, তাঁর হক নষ্ট করে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন। তিনি নিকট থেকে সব কিছুই দেখেন। সবকিছুই সংরক্ষণ করেন। নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন। তিনি ন্যায়পরায়ণ। নফসগুলোর সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ান, নিয়ন্ত্রণ করেন। পরিণাম লিখে রেখেছেন। সব কিছুর সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। অন্তরসমূহ তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করে। সমস্ত গোপনই তাঁর কাছে প্রকাশ্য। সমস্ত অদৃশ্য তাঁর সামনে দৃশ্য। দুঃখ ভারাক্রান্ত সমস্ত হৃদয় তাঁর কাছেই সমর্পিত। তাঁর নূরের জ্যোতিতে ত্রিভুবন মাতোয়ারা। সমস্ত বিবেক বুদ্ধি তাঁর প্রকৃতি উদ্ধার করতে অক্ষম। সমস্ত দলিল ও আবিষ্কার তাঁর অনুরূপ কিংবা সমকক্ষ খুঁজতে ব্যর্থ। তাঁর আলোয় সমস্ত অন্ধকার আলোকিত। আসমান জমিন তাঁর কান্তিতে উজ্জ্বল। সমস্ত সৃষ্টি তাঁর দিকেই মুখাপেক্ষী। তিনি নিদ্রা যান না, নিদ্রার তাঁর কোনো প্রয়োজন নেই। নিজ ইচ্ছানুসারে দাঁড়িপাল্লা নামান ও উত্তোলন করেন।
রাত আগমনের পূর্বে দিনের, দিন উদিত হওয়ার পূর্বে রাতের সমস্ত আমল তাঁর কাছে উত্থাপন করা হয়। তাঁর পর্দা হলো নূর। যদি তিনি তা সরিয়ে দেন, তাহলে যাবতীয় সৃষ্টি পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাবে। সৃষ্টির কোনো চোখ তাঁর পর্যন্ত পৌঁছতে, তাকে অবলোকন করতে সক্ষম নয়।
আল্লাহ্ তায়ালার ভালোবাসা অন্তরের জন্য সঞ্জীবনী। রূহের জন্য হিতকর পথ্য। কলবের কোনো শান্তি, সুখ, স্বাদ, সফলতা ও জীবন নেই, যদি তাঁর ভালোবাসা তাতে না থাকে। চোখ জ্যোতি হারিয়ে ফেললে যতটুকু কষ্ট হয়, কান শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেললে যতটুকু দুঃখ হয়, অন্তর থেকে আল্লাহর ভালোবাসা হারিয়ে গেলে তার চেয়ে বেশি কষ্ট হয়। শরীর যেমন আত্মশুন্য হয়ে গেলে পচে গলে বিনষ্ট হয়ে যায়, অন্তরও যখন নিজ সৃষ্টিকর্তা, আবিষ্কর্তা ও সত্য প্রভুর ভালোবাসাশূন্য হয়, তখন তা পচে যায়, হয়ে যায় দুর্গন্ধী। এটা তারাই অনুভব করতে পারে, তারাই সত্যায়ন করে, যাদের অন্তর সজীব ও সজাগ। মৃতকে যতই আঘাত করা হোক সে অসাড়, অনুভূতিহীন।
ফাতাহ মুসেলি রহিমাহুল্লাহ বলেন-'প্রকৃত আল্লাহেপ্রমী দুনিয়া নিয়ে কখনো শান্তি পায় না। এক নিমেষ সে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল হতে পারে না'।
জনৈক সালাফ বলেছেন-'প্রেমিকের অন্তর পাখির ন্যায় উড়ন্ত। অধিক জিকিরকারী। স্বউদ্যোগে অনুরাগে ভর করে সম্ভাব্য ও সামর্থ্যের সমস্ত উপায় ও মাধ্যমে সে আল্লাহ্র সন্তুষ্টির পথে অবগাহন করে'।
কেউ বলেছেন-'তোমার রবের প্রেমিক হয়ে যাও, বনে যাও তাঁর সেবক; বস্তুত প্রেমিকের দল প্রেমাস্পদের সেবক হওয়াকেই নিজেদের জন্য গর্ব মনে করে'।
এক মহিলা নিজ সন্তানদের অসিয়ত করেন- 'তোমরা আল্লাহর ভালোবাসা ও ইবাদতে অভ্যস্ত হয়ে যাও। কেননা মুত্তাকীগণ ইবাদতের মধ্যেই নিজেদের শূরা খুঁজে পেয়েছেন। তাই আল্লাহর দাসত্ব ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে তাঁরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছেন। অভিশপ্ত ইবলিস যদি কখনো তাদের সামনে কোনো গুনাহ পেশ করে, স্বয়ং গুনাহই লজ্জায় তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়; কেননা মুত্তাকীগণ তা অপছন্দ করেন'।
ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ বলেন, তুমি আল্লাহর অবাধ্যতা করো আবার তাকে ভালোবাসার দাবীও করো। আমার জীবনের শপথ, ইনসাফের নিক্তিতে এটা বড়ই কদর্য দাবি। যদি তোমার ভালোবাসা সত্য হতো, তাহলে তুমি তাঁর অনুসরণ করতে; কেননা প্রেমিক সব সময় প্রেমাস্পদের অনুসারীই হয়ে থাকে।
টিকাঃ
[১] সূরা নাহল ৫৩
[২] সুরা বাকারা ১৬৫
[৩] সুরা মাইদা ৫৪
[৪] সহিহ মুসলিম ৭৩
[৫] সহিহ বুখারি ৬৬৩২
[৬] আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মহামহিম আল্লাহ্ তায়ালা প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন, কে আছে এমন যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেবো। কে আছ এমন যে আমার নিকট চাইবে। আমি তাকে তা দেবো। কে আছে এমন যে আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করবো। (সহিহ বুখারি ১১৪৫)
📄 আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকা
অপছন্দনীয় অনাকাঙ্ক্ষিত আপতিত বিষয়ে বান্দার দুটি স্তর রয়েছে— সন্তুষ্টির স্তর এবং সবরের স্তর। সন্তুষ্টি হলো একটি বাঞ্ছিত বৈশিষ্ট্য। আর সবর মুমিনের ওপর আবশ্যকীয় কর্তব্য।
আল্লাহর ফয়সালা ও ভাগ্য-নির্ণয়ে যারা সন্তুষ্ট, এই শ্রেণীর লোকগণ কখনো বিপদদাতার প্রজ্ঞা, নিজ বান্দাকে বিপদের জন্য নির্বাচন করার দিকটি লক্ষ্য করে তাঁর সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নেন; তাঁর ব্যাপারে কোনো অভিযোগ উত্থাপন কিংবা অপবাদ আরোপ করেন না। আবার কখনো বিপদদাতার বড়ত্ব, মহত্ত্ব এবং পরিপূর্ণতার দিকে তাকিয়ে তাঁর প্রেম সাগরে ডুব দেন এবং এক পর্যায়ে কোনো কষ্ট কিংবা ব্যাথা আর অনুভব করেন না। এই স্তরে তারাই পৌঁছতে পারে, আল্লাহ্ তায়ালার ব্যাপারে যাদের রয়েছে পরিপূর্ণ জ্ঞান, যারা তাঁর প্রেমের স্রোতে অবগাহন করেছেন। তাই তো কখনো কখনো বিপদআপদ অসুখ বিসুখ নিয়েই তারা আনন্দিত হন; কেননা তাদের ভাবনায় থাকে যে, এসব তাদের বন্ধু ও প্রেমাস্পদের পক্ষ থেকেই এসেছে।
সন্তুষ্টি আর সবরের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। সবর, অন্তরকে অসন্তোষ ও ক্রোধ থেকে বিরত রাখা ও নিয়ন্ত্রণ করার নাম। সবরের মাঝে ব্যথার অনুভতি থাকে এবং অন্তরে তা দূর হয়ে যাওয়ার উদগ্র আকাঙ্ক্ষা থাকে। পাশাপাশি অস্থিরতা মোতাবেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আমল থেকে নিবৃত্ত রাখা হয়। পক্ষান্তরে সন্তুষ্টি হলো অন্তরের প্রশান্তি, আল্লাহ্ তায়ালার নির্ণয়ের ব্যাপারে হৃদয়ের সুস্থিরতা। এক্ষেত্রে ব্যাথার অনুভব থাকলেও তা দূর হয়ে যাওয়ার কামনা থাকে না। তবে অন্তরের মাঝে বিশ্বাস ও মারেফাতের যে সঞ্জীবনী অর্জিত হয়, তার দ্বারা এই ব্যাথার অনুভূতি লঘু হয়ে যায়। ক্ষেত্র বিশেষ যদি সন্তুষ্টির মাত্রা শক্তিশালী হয়, তাহলে পরিপূর্ণভাবেই ব্যাথার অনুভূতি দূর হয়ে যায়।
আনাস রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'আল্লাহ্ তায়ালা যখন কোনো জাতিকে পছন্দ করেন, তাদেরকে বিপদে পতিত করেন। অতএব যে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে, তিনিও তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। আর যে ক্রুব্ধ হয়ে যাবে, তিনিও তার ওপর ক্রুব্ধ হয়ে যাবেন'। [১]
ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-'আল্লাহ্ তায়ালা নিজ নির্ণয় ও জ্ঞান দ্বারা আনন্দ ও আত্মিক প্রশান্তি সঁপে দিয়েছেন ইয়াকিন-বিশ্বাস এবং সন্তুষ্টির ওপর। আর বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তা চাপিয়ে দিয়েছেন সংশয় ও অসন্তুষ্টির ওপর'।
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَ مَنْ يُؤْمِن بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَه
'যে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে, তিনি তার অন্তরকে সঠিক দিশা দান করেন'। [২]
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আলকামা রহিমাহুল্লাহ বলেন-'ব্যক্তির ওপর কোনো বিপদ এসে চাপে। সে তখন বিশ্বাস করে যে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে আগমন করেছে। ফলে তা মেনে নেয় এবং সন্তুষ্ট থাকে'।
অন্য আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيُوةً طَيِّبَةً
'আমি তাকে পবিত্র জীবন যাপন করাবো'।[৩]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আবু মুয়াবিয়া আসওয়ার বলেন—'পবিত্র জীবন দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সন্তুষ্টি ও অল্পেতুষ্টিময় জীবন'।
আলী রদিয়াল্লাহু আনহু দেখলেন আদি বিন হাতিম রদিয়াল্লাহু আনহু বিষণ্ণ হয়ে বসে আছেন। তিনি তাকে বললেন-'তোমাকে চিন্তিত ও বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন?' আদি রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন-'কেনই বা আমি বিষণ্ণ হবো না? আমার দুই ছেলে নিহত হয়েছে এবং আমার চোখ দুটোও উপড়ে ফেলা হয়েছে!' আলী রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন-'হে আদি, আল্লাহ্ তায়ালার নির্ণয় ও আদেশ বাস্তবায়ন হবেই। যে তাতে সন্তুষ্ট থাকবে, সে প্রতিদান পাবে। আর যে আল্লাহর নির্ণয়ে সন্তুষ্ট থাকবে না, তার ওপর নির্ণয় বাস্তবায়ন তো হবেই; উপরন্তু তার আমলনামাও নষ্ট হবে'।
এক লোক মৃত্যুশয্যায় পড়েছিল। আবু দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু গিয়ে দেখলেন সে আল্লাহর প্রশংসা করছে। এ অবস্থা দেখে তিনি বললেন, 'তুমি কাজের কাজ করছো। বস্তুত আল্লাহ্ তায়ালা যখন কোনো ফয়সালা করেন, তখন তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকাকেই পছন্দ করেন'।
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন-'যে ব্যক্তি তার জন্য নির্ধারিত ভাগ্যে সন্তুষ্ট থাকবে, তা তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে এবং তাতে সমৃদ্ধি আসবে, বরকত পাওয়া যাবে। আর যে তাতে সন্তুষ্ট থাকবে না, তা তার জন্য যথেষ্ট হবে না, সে তাতে বরকতও পাবে না'।
উমর বিন আব্দুল আজিজ রহিমাহুল্লাহ বলেন-'আল্লাহ্ তায়ালার ফয়সালা মেনে নেওয়া ব্যতীত আমার কোনো আনন্দের স্থান নেই'।
তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো—'আপনি কী কামনা করেন?' তিনি বললেন, 'আল্লাহ্ তায়ালা যা ফয়সালা করেন'।
আব্দুল ওয়াহিদ বিন জায়েদ রহিমাহুল্লাহ বলেন—'সন্তুষ্টি হলো আল্লাহ্ তায়ালার একটি বিরাট ফটক। দুনিয়ার জান্নাত এবং উপাসক ও তাপসদের প্রশান্তির স্থান'।
জনৈক সালাফ বলেছেন—'দুনিয়ায় সর্বাবস্থায় যারা আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট ছিল, আখিরাতে তাদের চেয়ে উন্নত মর্যাদার আর কাউকে দেখা যাবে না। কাজেই যাকে সন্তুষ্টির বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছে, সে চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছতে সক্ষম'।
টিকাঃ
[১] ইবনে মাজাহ ৪০৩১; মিশকাত ১৫৬৫
[২] সুরা তাগাবুন ১১
[৩] সূরা নাহল ৯৭
📄 আশা
কাঙ্ক্ষিত কোনো বস্তু পাওয়ার বাসনায় অন্তর প্রফুল্ল হওয়া, এটাই আশার পরিচয়।
উপায়, মাধ্যম বা উপকরণহীন আশা করলে সেক্ষেত্রে 'আশা'র চেয়ে প্রবঞ্চনা ও বোকামি শব্দই বেশি ফিট হয়। আর যদি কোনো কাজ আবশ্যকীয় হয়, যেমন সূর্য উদয় হওয়া, তখনও 'আশা' শব্দ ব্যবহার করা যায় না। তবে হাঁ, বৃষ্টি নামবে, এক্ষেত্রে আশা শব্দ ব্যবহার করা যায়; কেননা তা প্রাত্যহিক প্রাকৃতিক নিয়মানুযায়ী অবতরণ করে না।
মানব কলব বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কেরام বলেন, 'দুনিয়া হলো আখিরাতের শস্যক্ষেত্র। কলব তার জমি। ঈমান হলো শস্যবীজ। জমি চাষ, নিষ্কাসন, পানি সিঞ্চন এবং নদী খনন হলো ইত্যাদি হচ্ছে ইবাদত।
ঘোর দুনিয়াসক্ত কলব হলো জলাভূমির ন্যায়। সেখানে কোনো শস্য বিকশিত হয় না। কিয়ামতের দিন ফসল ঘরে নেওয়ার দিন। যে যা চাষ করেছে, সে তাই নিজের ঘরে উঠাবে। ঈমানের বীজ ছাড়া অন্য কোনো বীজ বৃদ্ধি লাভ করবে না। তদ্রূপ অপবিত্র অন্তর এবং কলুষিত চরিত্রের সাথেও ঈমান খুব কমই ফলদায়ক হবে।
জলাভূমিতে কোনো বীজ উৎপাদন হয় না। কাজেই যে বান্দা ক্ষমাপ্রাপ্তির আশা রাখে, তার হতে হবে একজন দক্ষ চাষির মতো। যে উর্বর জমি চাষ করে। ভালো উপযুক্ত বীজ বপন করে। অতঃপর প্রয়োজনীয় বিরতি দেয়। এরপর আগাছা, ঘাস ও বীজ উৎপাদনে ক্ষতিকর ও প্রতিবন্ধক সবকিছু পরিষ্কার করে। অতঃপর সমস্ত বিপদআপদ ও ঘূর্ণিঝড় থেকে নিরাপত্তার জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করে অপেক্ষা করতে থাকে ফসল পাকার এবং চূড়ান্ত সময়ের জন্য। তার এই যে অপেক্ষা, একেই বলে 'আশা'।
পক্ষান্তরে কোনো চাষি যদি কোনো জলাভূমি কিংবা পানি পৌঁছানো যায় না এতো উঁচু ভূমিতে বীজ বপন করে এবং জমির যথাযথ যত্নে মনোযোগ না দেয়। এরপর বসে থাকে ফসল কাটার মৌসুমের অপেক্ষায়। তার এই অপেক্ষাকে বলা হবে বোকামি, প্রবঞ্চনা; আশা নয়।
'আশা' ওই সময়ই প্রয়োগ করা যেতে পারে যখন বান্দা তার সামর্থ্যের সমস্ত উপকরণ ব্যবহার করার পর কাঙ্ক্ষিত বস্তুর অপেক্ষায় থাকে। তখন আর বান্দার সামর্থ্যের ভেতরের কিছু অবশিষ্ট থাকে না। যা থাকে তা হলো, বিনষ্টকারী ও ক্ষতিকর সমস্ত দুর্যোগ থেকে নিরাপদে রাখার জন্য আল্লাহর অনুগ্রহ। সুতরাং বান্দা যখন ঈমানের বীজ বপন করবে, তাকে সিক্ত করবে ইবাদতের পানি দ্বারা, নিজের অন্তরকে পবিত্র করবে নিকৃষ্ট মন্দ চরিত্রসমূহ থেকে, এরপর এই অবস্থার ওপর আমৃত্যু অবিচল থাকা ও ক্ষমাপ্রাপ্তির জন্য এবং জীবনের সুন্দর উপসংহারের জন্য আল্লাহ্ তায়ালার অনুগ্রহের অপেক্ষা করতে থাকবে- তখন তার এই অপেক্ষাকে বলা হবে বাস্তব এবং কার্যকরী আশা।
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَجَهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَٰئِكَ
يَرْجُونَ رَحْمَتَ اللَّهِ ۚ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
'যারা ঈমান এনেছে, যারা হিজরত করেছে এবং যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর রহমতের আশা করে। বস্তুত আল্লাহ্ পরম ক্ষমাশীল এবং অসীম দয়ালু'। [১]
অর্থাৎ এরাই উপযুক্ত যে, আল্লাহর রহমতের আশা করবে। যার আশা তাকে ইবাদতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে, গুনাহ থেকে দূরে থাকতে অনুপ্রাণিত করে, তার আশাই কার্যকর আশা। আর যার আশা তাকে গুনাহ ও অবাধ্যতায় অবিচল ও নিমগ্ন থাকতে উৎসাহিত করে, সেটা আশা নয়; বরং প্রবঞ্চনা, মিথ্যে আশ্বাস।
যে আশা করবে, তার জন্য তিনটি উপাদান অপরিহার্য। এক, কাঙ্ক্ষিত বস্তুর প্রতি অনুরাগ থাকা। দুই, তা হারিয়ে যাওয়া কিংবা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয় থাকা। এবং তিন নম্বর হলো, তা অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা ব্যয় করা। কোনো প্রত্যাশীর মাঝে যদি উপরোক্ত কোনো একটি গুণ গরহাজির থাকে, তাহলে তা আশা হিসেবে ধর্তব্য হবে না; বরং তা হবে কামনা বাসনা। আশা এবং কামনা বাসনার মধ্যে বিস্তর ফরক রয়েছে।
আশাবাদী মাত্রই শঙ্কিত। পথিক যখন চলার পথে শঙ্কিত থাকে, তখন সে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে, কোনো কিছু হারিয়ে যাওয়ার আশংকায়। আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যে ভয় পায় সে ভোরেই রওনা করে। আর যে ভোরে রওনা করে সে গন্তব্যে স্থলে পৌঁছে যায়। মনে রেখো, আল্লাহ্ তায়ালার পণ্য খুবই মূল্যবান। শুনে রাখো, আল্লাহ্ তায়ালার পণ্য হচ্ছে জান্নাত'।[২]
কুরআন সুন্নাহয় আশা
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
قُلْ يُعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوْا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ الله يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
‘বলে দিন, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছো, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সব গুনাহ মাফ করে দেন। তিনি পরম ক্ষমাশীল অসীম দয়ালু'।।১৷
অন্যত্র বলেন-
وَإِنَّ رَبَّكَ لَدُوْ مَغْفِرَةٍ لِّلنَّاسِ عَلَى ظُلْمِهِمْ
'আর মানুষের অন্যায় সত্ত্বেও (অনুতপ্ত হলে) তোমার প্রভু তাদের প্রতি অবশ্যই ক্ষমাপরায়ণ'। [৪]
আবু মুসা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যখনই কোনো মুসলিম মারা যায়, তখন আল্লাহ্ তায়ালা তার স্থলে একজন ইয়াহুদি বা খৃষ্টান লোককে জাহান্নামে প্রবেশ করান'। [৫]
উমর বিন খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কিছু বন্দী আসলো। বন্দীদের মধ্যে একজন নারী হঠাৎ দৌড়ানো শুরু করলো। বন্দীদের মধ্যেই একটি শিশু পেয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে দুধ পান করাতে লাগলো। এই দৃশ্য দেখে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-'তোমরা কি বল, এই মহিলা কি তার সন্তানকে আগুনে নিক্ষেপ করবে?' আমরা বললাম, অবশ্যই না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
'এই মহিলা তার সন্তানের প্রতি যতটা না দয়ালু, আল্লাহ্ তায়ালা নিজ মুমিন বান্দার ওপর তার চেয়ে অধিক দয়াবান'। [৬]
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'আল্লাহ্ যখন সৃষ্টির কাজ শেষ করলেন, তখন তিনি তাঁর কিতাব লাওহে মাহফুজে লিখেন, 'নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার ক্রোধের ‘ওপর প্রবল’। এটি তাঁর নিকট আরশের ওপরে সংরক্ষিত আছে। ৷৷ ৷
আনাস রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে,
'আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, হে আদম সন্তান, যতক্ষণ তুমি আমাকে ডাকতে থাকবে এবং আমার কাছে (ক্ষমা পাওয়ার) আশা করতে থাকবে, তোমার গুনাহ যত অধিক হোক, তোমাকে আমি ক্ষমা করবো। এতে কোনো পরোয়া করবো না'।
'হে আদম সন্তান, তোমার গুনাহের পরিমাণ যদি আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, আর তুমি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো'।
'হে আদম সন্তান, তুমি যদি গোটা পৃথিবী পরিমাণ গুনাহ নিয়ে আমার কাছে আসো, আর আমার সাথে কাউকে শরিক না করে থাকো, তাহলে তোমার কাছে আমি পৃথিবী পরিমাণ ক্ষমা নিয়ে হাজির হবো'।
ইয়াহিয়া বিন মুয়াজ রহিমাহুল্লাহ বলেন- ‘গুনাহ অব্যহত রেখে অনুতপ্ত না হয়ে আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার আশায় থাকা, ইবাদত না করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের প্রত্যাশায় থাকা, জাহান্নামের বীজ বপন করে জান্নাতের প্রতিক্ষা করা, গুনাহ করে ইবাদতকারিদের আবাসে থাকার কামনা করা, আমল না করেই প্রতিদান পাওয়ার অপেক্ষা করা, সীমালঙ্ঘন অপ্রতিহত রেখে আল্লাহর তায়ালার ওপর ভরসা করা—আমার কাছে সবচেয়ে প্রবঞ্চনাকর ব্যাপার’।
'আপনি মুক্তি চাইবেন কিন্তু মুক্তির পথ মাড়াবেন না, জাহাজ তো আর শুকনোর ওপর চলে না!'
টিকাঃ
[১] সুরা বাকারা ২১৮
[২] জামে তিরমিজি ২৪৫০
[৩] যুমার ৫৩
[৪] সূরা রাদ ৬
[৫] সহিহ মুসলিম ৬৯০৫
[৬] সহিহ মুসলিম ৬৮৭১
[৭] সহিহ বুখারি ৩১৯৪
📄 ভয়
ভয়, আল্লাহ্ তায়ালার চাবুক। এর দ্বারা বান্দাদের ইলম ও আমলের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যান। যেন তারা তাঁর নৈকট্য অর্জন করতে পারে। ভবিষ্যতে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটার আশংকায় অন্তর অস্থির হওয়া এবং পোড়ানো, এটাই হলো ভয়। ভয়ই অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে গুনাহ ও অপরাধ থেকে নিবৃত্ত রাখে এবং জুড়ে দেয় ইবাদতের সাথে।
অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ ভয় অবচেতনতা ও গুনাহের প্রতি দুঃসাহস করার পথ খুলে দেয়। পক্ষান্তরে ভয়ের আধিক্যতা হতাশা ও নিরাশার গহ্বরে নিক্ষেপ করে।
আল্লাহ্ তায়ালার ভয় কীভাবে সৃষ্টি হয়? আল্লাহ্ তায়ালাকে জানা, তাঁর গুণাবলী সম্পর্কে অবহিত হওয়া, তিনি চাইলে গোটা বিশ্ব ধ্বংস করে দিতে পারেন বেপরোয়াভাবে, কেউ তাকে বাধা দেওয়ার নেই, এই বিশ্বাস অন্তরে বদ্ধমূল হওয়ার দ্বারা কখনো ভয় সৃষ্টি হয়। আবার কখনো সীমাতিরিক্ত গুনাহ করে তা পরিত্যাগ করার দ্বারা তৈরি হয়। অনুরূপ নিজের গুনাহ সম্পর্কে ভাবা, আল্লাহ্ তায়ালাকে চেনা, তাঁর অমুখাপেক্ষিতার কথা উপলব্ধি করার দ্বারাও ভয়ের উদ্রেক হয়। আল্লাহ্ তায়ালা যা ইচ্ছা করতে পারেন, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার কেউ নেই। কিন্তু মানুষ যা করবে সেজন্য জেরার সম্মুখীন হবে, এর মাধ্যমেও ভয়ের তীব্রতা জন্ম নেয়।
যারা নিজেদের রবকে চেনে এবং নিজেদের হাকিকত সম্পর্কে অবগত, তারাই আল্লাহ্ তায়ালাকে বেশি ভয় করে। এজন্যই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন-
'আল্লাহর শপথ, আমি সবার চেয়ে আল্লাহেক বেশি জানি এবং সবার চেয়ে অধিক ভয় করি'। [১]
একবার ইমাম শা'বি রহিমাহুল্লাহকে কেউ একজন সম্বোধন করে বলল, হে আলিম! তিনি বললেন, আলিম তো সে যে আল্লাহেক ভয় করে। কেননা আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে'। ২।
এজন্যই বলা হয়-'যে কেঁদে কেঁদে নিজের কপোলের অশ্রু মুছে, সে প্রকৃত ভীত নয়; বরং যে কাজ করলে শাস্তি হতে পারে, তা পরিহারকারীই মূলত ভীত'।
যুননুন মিশরি রহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলো, বান্দা কখন ভীত বলে গণ্য হয়? তিনি বললেন—'যখন সে নিজেকে ওই অসুস্থ ব্যক্তির স্থলে দাঁড় করায় যে অসুস্থতা দীর্ঘ হওয়ার ভয়ে আত্মরক্ষা করে'।
হাকিম আবুল কাসিম রহিমাহুল্লাহ বলেন-'কেউ কোনো জিনিসকে ভয় পেলে তার থেকে দূরে পালিয়ে বেড়ায়। কিন্তু যে আল্লাহকে ভয় পায়, সে তাঁর দিকে ধাবিত হয়'।
ফুজাইল বিন ইয়াজ রহিমাহুল্লাহ বলেন-'যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো?' তাহলে তুমি কোনো উত্তর দেবে না। কেননা তুমি যদি হাঁ বল, তাহলে তা হবে মিথ্যে। আর যদি না বলো, তাহলে তা হবে কুফরি'।
ভয়-হারাম কামনা ও প্রবৃত্তিগুলোকে জ্বালিয়ে দেয়। তখন কমনীয় গুনাহগুলো নিজের কাছে অপ্রিয় ও ঘৃণিত হয়ে ওঠে। যেমন মধু ঘৃণিত হয়ে যায় ওই ব্যক্তির কাছে, যে তাতে বিষ মেশানোর কথা জানে। সুতরাং ভয় দ্বারা প্রবৃত্তি দগ্ধ হয়। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পরিশীলিত হয়। অন্তরে সৃষ্টি হয় একনিষ্ঠতা, বিনয় ও খোদাপ্রীতি। বিদায় নেয় অহংকার হিংসা বিদ্বেষ। বরং তখন ভয়ের কারণে সদা বিভোর থাকে, নিজের পরিসমাপ্তি ও ফলাফলের ভয়াবহতার দিকে সজাগ দৃষ্টি দেয় এবং অন্যকে নিয়ে ভাবার সময় আর পায় না। প্রতিটি শ্বাস প্রশ্বাস মুহূর্ত লহমায় সে আত্মসমালোচনা, আত্মচিন্তা ও আল্লাহ্ তায়ালার ধ্যানমগ্ন হয়ে থাকে। প্রতিটি পদক্ষেপ, কথা ও সিদ্ধান্তের জন্য জিজ্ঞাসিত হতে হবে, এই চিন্তায় তন্ময় হয়ে যায়। তার অবস্থা হয়ে যায় ওই ব্যক্তির ন্যায়, যে নিক্ষিপ্ত হয়েছে কোনো হিংস্র জন্তুর ডেরায়। তার জানা নেই যে, প্রাণীটা তার থেকে বিমুখ হয়ে যাবে ফলে সে প্রাণে বেঁচে যাবে নাকি তার ওপর আক্রমণ করে তার ইহলিলা সাঙ্গ করবে? এমন অবস্থায় আপাদমস্তকে সে শুধু নিজেকে নিয়েই ভাববে; অন্যকে নিয়ে ভাবার ফুরসত তো তার হাতে নেই। যার ওপর আল্লাহর ভয় সওয়ার হয়, তার অবস্থাও এমনই হয়; সে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে; অন্যের দিকে তাকানোর অবকাশ পায় না।
ভয়ের তাৎপর্য ও মর্যাদা
ভীতদের জন্য আল্লাহ্ তায়ালা সঠিক পথের দিশা, দয়া, জ্ঞান ও সন্তুষ্টি সন্নিবেশিত করেছেন। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
هُدًى وَ رَحْمَةٌ لِّلَّذِينَ هُمْ لِرَبِّهِمْ يَرْهَبُوْنَ
'হেদায়েত ও রহমত তাদের জন্য, যারা নিজেদের প্রভুকে ভয় করে'। [৩]
অন্যত্র বলেন-
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهُ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمُوا
'আল্লাহ তায়ালার বান্দাদের মধ্যে শুধু জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে'। [৪]
আরও বলেছেন-
رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ذُلِكَ لِمَنْ خَشِيَ رَبَّه
'আল্লাহ্ তায়ালা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেছেন, তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। এটা তার জন্য, যে নিজের রবকে ভয় করে'। [৫]
আল্লাহ্ তায়ালা তাঁকে ভয়ের আদেশ দিয়েছেন। উপরন্তু তাকে ঈমানের শর্তের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَ خَافُوْنِ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ
'তোমরা আমাকে ভয় করো, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকো'। [৬]
অতএব, মুমিন কখনো একেবারে আল্লাহ্ তায়ালার ভয় থেকে মুক্ত হতে পারে না। হাঁ তার ভয় ক্ষেত্র বিশেষ দুর্বল হতে পারে। তবে তা তার ঈমান ও আল্লাহ-জ্ঞানের কমতি ও দুর্বলতার কারণেই হবে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
'যে আল্লাহ্ তায়ালার ভয়ে কান্না করে সে কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না, যে পর্যন্ত না দুধ পুনরায় ওলানে প্রবেশ করবে'। [৭]
ফুজাইল বিন ইয়াজ রহিমাহুল্লাহ বলেন-'যে আল্লাহেক ভয় করবে, এই ভয়ই তাকে তাবৎ কল্যাণের পথ দেখিয়ে দেবে'।
শিবলি রহিমাহুল্লাহ বলেন-'আমি যে দিনই আল্লাহকে ভয় করেছি, সে দিনই কোনো প্রজ্ঞা ও দৃষ্টান্ত দেখতে পেয়েছি'।
ইয়াহিয়া বিন মুয়াজ রহিমাহুল্লাহ বলেন-'যে কোনো মুমিন কোনো গুনাহ করলে তার জন্য দুটি নিয়ামত অপেক্ষায় থাকেঃ শাস্তির ভয় এবং ক্ষমার আশা'।
কুরআন সুন্নাহয় ভয়
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন—
وَالَّذِيْنَ هُمْ بِاٰيٰتِ رَبِّهِمْ يُؤْمِنُوْنَ ۙ ٥٨ وَالَّذِيْنَ هُمْ بِرَبِّهِمْ لَا يُشْرِكُوْنَ ٥٩ وَالَّذِيْنَ يُؤْتُوْنَ مَآ اٰتَوْا وَّ قُلُوْبُهُمْ وَجِلَةٌ اَنَّهُمْ اِلٰى رَبِّهِمْ رٰجِعُوْنَ ٦٠ اُولٰٓئِكَ يُسٰرِعُوْنَ فِى الْخَيْرٰتِ وَهُمْ لَهَا سٰبِقُوْنَ
‘যারা তাদের প্রভুর ভয়ে ভীত থাকে, যারা তাদের প্রভুর নিদর্শনসমূহ বিশ্বাস করে, যারা তাদের প্রভুর সাথে শরিক করে না এবং যারা যা দান করবার, তা ভীত-কম্পিত হৃদয়ে এ কারণে দান করে যে, তারা তাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন করবে। তারাই কল্যাণকর কাজে ধাবিত হয় এবং তারাই তাতে অগ্রগামী থাকে’। [৮]
আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, “তারা যা কিছুই দান করে তাদের অন্তর ভীত-প্রকম্পিত থাকে”। আমি বললাম, এরা কি তারা, যারা মদ পান করে, জিনা করে এবং চুরি করে? তিনি বললেন,
'হে সিদ্দিকের মেয়ে, না; বরং তারা হলো ওই সমস্ত লোক, যারা সিয়াম পালন করে, সালাত আদায় করে, সদকা করে, আবার এই ভয় করে যে, তাদের এসব কবুল করা হবে না। এরাই কল্যাণকর কাজের দিকে ধাবিত হয়”।[৯]
আবু যর রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'আমি (অदृश्य জগতের) যা দেখি তোমরা তা দেখ না, আর আমি যা শুনতে পাই তোমরা তা শুনতে পাও না। আসমান তো চড়চড় শব্দ করছে, আর সে এই শব্দ করার যোগ্য। তাতে এমন চার আঙ্গুল পরিমাণ জায়গাও নেই যেখানে কোনো একজন ফেরেস্তা আল্লাহ্ তায়ালার জন্য অবনত মস্তকে সাজদায় পড়ে না আছে।। আল্লাহ্ শপথ, আমি যা জানি, তোমরা যদি তা জানতে, তাহলে খুব কমই হাসতে, কাঁদতে প্রচুর, বিছানায় স্ত্রীদের ভোগ করতে না, পথে প্রান্তরে বেরিয়ে পড়তে এবং আল্লাহর সামনে কাকুতি মিনতি করতে। আল্লাহর শপথ, আমার মন চায় আমি যদি একটি বৃক্ষ হতাম আর তা কেটে ফেলা হতো!'। [১০]
হাদিসের মর্ম হচ্ছে, আমি আল্লাহ্ তায়ালার বড়ত্ব এবং অবাধ্যদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করা সম্পর্কে যে কথা জানি, তা যদি তোমরা জানতে, তাহলে তোমাদের কান্না, অস্থিরতা এবং আগত ফলাফলের জন্য ভয় দীর্ঘায়িত ত হতো। তোমরা হাসার কথা একেবারে ভুলে যেতে।
আম্মাজান আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, 'যখন আবহাওয়া পরিবর্তন হতো এবং বিক্ষুব্ধ বাতাস প্রবাহিত হতো, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কামরার মধ্যে পায়চারি করতে থাকতেন। একবার বের হতেন, আবার প্রবেশ করতেন। এসবই করতেন একমাত্র আল্লাহর আজাবের ভয়ে'। [১১]
আবদুল্লাহ বিন শিখখির রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নামায পড়তেন, তাঁর বুক থেকে চুলার হাঁড়ির (ফুটন্ত পানির) মতো কান্নার অস্ফুট আওয়াজ শোনা যেতো'। [১২]
সাহাবায়ে কেরام রদিয়াল্লাহু আনহুম এবং তৎপরবর্তী এই উম্মাহর সালাফদের অবস্থা নিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁরা যেমন আমলের দিকে শীর্ষে ছিলেন, তেমনি ছিলেন ভয়েরও চূড়ান্ত পর্যায়ে । আর আমরা তো এখন ত্রুটির সাগরে হাবুডুবু খাই; বরং গুনাহ করে আবার নিজেদের নিরাপদও ঠাওর করি!
আবু বকর সিদ্দিক রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-'আমি কামনা করি, আমি যদি একজন খাঁটি মুমিন বান্দার বাহুর একটি পশম হতাম!' তিনি যখন নামাজে দাঁড়াতেন, আল্লাহর ভয়ে কাষ্ঠখণ্ডের ন্যায় কাঁপতে থাকতেন।
উমর বিন খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু সুরা তুর পাঠ করছিলেন। যখন এই আয়াতে পৌঁছলেন “নিশ্চয়ই তোমার রবের আজাব পতিত হবে”, কান্না জুড়ে দিলেন। তাঁর কান্না এতো প্রকট আকার ধারণ করলো যে, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং লোকেরা তাঁর শুশ্রূষা করলো।
ইনতিকালের সময় তিনি নিজ ছেলেকে বলেন, 'তোমার জন্য আফসোস, আমার গালকে মাটিতে রেখে দাও; হতে পারে তিনি আমার ওপর রহম করবেন'। অতঃপর বললেন-'আমার ধ্বংস হোক, তিনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন'। এ কথা তিনবার বললেন। এর কিছুক্ষণ পরই তিনি ইন্তিকাল করেন।
তিনি রাতের বেলা উক্ত আয়াত পাঠ করে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ঘরের মধ্যেই কয়েকদিন আবদ্ধ থাকতেন। লোকেরা মনে করতো, তিনি অসুস্থ। অধিক কান্নার কারণে তাঁর চেহারায় দুটি কালো রেখা অংকিত হয়ে গিয়েছিল।
ইবনে আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে একবার বললেন, আল্লাহ্ তায়ালা আপনার দ্বারা কত জনপদ বিজিত করেছেন, আবাদ করেছেন কতো দেশ এবং আরও কতো খেদমত করিয়েছেন। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি শুধু চাই, আমি যেন নাজাত পাই; আমার কোনো প্রতিদানও থাকবে না, না থাকবে কোনো বোঝা'।
এদিকে উসমান বিন আফফান রদিয়াল্লাহু আনহু যখন কবরের পাশে দাঁড়াতেন, এতো পরিমাণ কান্না করতেন যে, তাঁর দাড়ি ভিজে যেতো। তিনি বলেন, 'আমাকে যদি জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, আর আমি না জানি যে, আমার ঠিকানা কোথায়, তাহলে ঠিকানা কোথায় তা জানার আগে আমি চাইবো ধূলিকণায় পরিণত হতে'।
আবু দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, 'মৃত্যুর পর তোমরা কীসের সম্মুখীন হবে তা যদি জানতে, তাহলে আরাম করে খানা খেতে না, কখনো তৃপ্তি সহকারে পান করতে না, বিশ্রাম নেওয়ার জন্য কোনো ঘরে প্রবেশ করতে না; বরং রাস্তা ঘাটে পথে প্রান্তরে বেরিয়ে পড়তে, নিজেদের বুক চাপড়াতে এবং নিজেদের পরিণতির জন্য বিলাপ করতে থাকতে। আমি কামনা করি, আমি যদি কোনো বৃক্ষ হতাম, আর আমাকে কেটে ভক্ষণ করে ফেলা হতো!'
ইবনে আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহু এ পরিমাণ কান্না করতেন যে, তাঁর উভয় চক্ষুর নিচে পুরান জুতার ফিতার মতো কালো দাগ পড়ে গিয়েছিল।
আলী রদিয়াল্লাহু আনহু ফজর নামায থেকে সালাম ফেরালেন। তাঁকে বিষণ্ণ দেখা যাচ্ছিল। তিনি নিজ হাত ওলট পালট করছিলেন। এমন সময় বললেন, 'আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের স্বচক্ষে দেখেছি। কিন্তু আজকের অবস্থার সাথে তাদের অবস্থার কোনো মিল নেই। তাদের অবস্থা থাকতো রিক্তহস্ত ধূলিমলিন ও আলুথালু কেশ। তাদের চোখে মেষের হাঁটুর ন্যায় দাগ পড়ে যেতো। নৈশ যাপন করতেন সাজদা, নামায ও আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে। তাদের কপাল ও পায়ের ওপর পালাক্রমে ভার ن্যস্ত করতেন। (অর্থাৎ কখনো দাঁড়িয়ে ইবাদত করতেন, কখনো সাজদা দিয়ে কাটিয়ে দিতেন।) সকাল হলে আল্লাহর জিকিরে নিমগ্ন হয়ে যেতেন। পবনের দিনে গাছ যেভাবে দোলে, তারাও সেভাবে দুলতেন। তাদের চোখ বেয়ে নেমে আসতো বারিধারা। এমনকি তাদের কাপড় ভিজে যেতো। আর আজ আল্লাহর শপথ, আমি এক জাতি দেখছি, যারা রাত কাটিয়ে দেয় উদাসীনতায়'। এরপর তিনি উঠে চলে গেলেন। পরবর্তীতে তাঁকে আর কখনো হর্ষোৎফুল্ল দেখা যায় নি।
মুসা বিন মাসউদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা যখন সুফিয়ান সাওরির মজলিসে বসতাম, তাঁর ভয় ও অস্থিরতা দেখে আমাদের মনে হতো, আমরা আগুনে পরিবেষ্টিত হয়ে আছি।
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ এর বর্ণনায় একজন বলেন, তিনি আসলে মনে হতো কোনো অন্তরঙ্গের দাফনকার্য শেষ করে আসলেন। বসলে মনে হতো তিনি একজন বন্দী, তাঁর গর্দান কেটে ফেলার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আর জাহান্নামের কথা স্মরণ করলে তাঁর অবস্থা হতো এমন যে, কেমন যেন জাহান্নাম একমাত্র তাঁর জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে'।
বর্ণিত আছে, যুরারা বিন আবু আওফা রহিমাহুল্লাহ ফজরের নামায পড়াচ্ছিলেন। তিলাওয়াত করছিলেন সুরা মুদ্দাসসির। যখন আল্লাহ্ তা'আলার এই বাণী পাঠ করলেন 'যে দিন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে, সে দিন হবে অত্যন্ত কঠিন দিন।[১৩] তখন তাঁর শ্বাস ভারী হয়ে গেলো এবং তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। [১৪]
আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করা হয় যে, তিনি বলেছেন, 'তোমরা কান্না করো। যদি কান্না না আসে তাহলে কান্নার ভান করো। ওই সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা যদি জানতে, তাহলে এতো পরিমাণ বিলাপ করতে যে, তোমাদের শ্বাস বন্ধ হয়ে যেতো। এতো পরিমাণ নামায পড়তে যে, তোমাদের মেরুদণ্ড ভেঙে যেতো'।[১৫]
টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি ৬১০১
[২] সুরা ফাতির ২৮
[৩] সুরা আ'রাফ ১৫৪
[৪] সুরা ফাতির ২৮
[৫] সুরা বাইয়িনাহ ৮
[৬] সুরা আলে ইমরান ১৭৫
[৭] সুনানে নাসাঈ ৩১০৮
[৮] সুরা মুমিনুন ৫৭-৬১
[৯] জামে তিরমিজি ৩১৭৫
[১০] জামে তিরমিজি ২৩১২
[১১] সহিহ বুখারি ৬/৩০০; সহিহ মুসলিম ৬/১৯৬
[১২] সুনানে নাসাঈ ১২১৪
[১৩] সুরা মুদ্দাসসির ৮-৯
[১৪] ইবার, যাহাবি ১/১০৯
[১৫] আল আহওয়াল, হাকিম ৪/৫৭৮