📄 সবরের ফজিলেতে বর্ণিত হাদিস সমূহ
উম্মে সালামা রদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে-
'কোনো মুসলমান যদি বিপদে আক্রান্ত হয়ে বলে, 'আল্লাহ্ তায়ালা যা আদেশ করেছেন তাই হয়েছে। বস্তুত আমরা তো আল্লাহরই জন্য এবং তাঁর দিকেই আমাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে। হে আল্লাহ্, আমাকে আমার বিপদের প্রতিদান দিন এবং এর চেয়ে উত্তম বিনিময় দান করুন'- তাহলে আল্লাহ্ তাকে অবশ্যই এর চেয়ে উত্তম বিনিময় দান করবেন'。
উম্মে সালামা রদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, যখন (আমার স্বামী) আবু সালামা মারা গেলো আমি মনে মনে বললাম, আবু সালামার চেয়ে উত্তম ব্যক্তি আর কে হতে পারে? তিনিই সর্ব প্রথম ব্যক্তি যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট হিজরত করে পৌঁছে ছিলেন। তারপর আমি উপরোক্ত কথাগুলো বললাম। ফলে আল্লাহ্ তায়ালা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমায় বিনিময় হিসেবে দান করলেন। [১২]
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- 'আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-"আমি যখন আমার মুমিন বান্দার কোনো প্রিয় বস্তু দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেই আর সে প্রতিদানের আসায় ধৈর্য ধারণ করে, আমার কাছে তার জন্য জান্নাত ছাড়া অন্য কোনও প্রতিদান নেই"। [১৩]
আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'মুমিন ব্যক্তির যে কোনও বিপদআপদ আসুক, এর দ্বারা আল্লাহ্ তায়ালা তার পাপ মোচন করেন। এমনকি যে কাঁটা তার শরীরে বিদ্ধ হয় তার দ্বারাও!'
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন- 'মুমিন নরনারীর শরীরে, সম্পদে কিংবা সন্তানসন্ততিতে বিপদআপদ আসতেই থাকে এবং এভাবেই সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করে। তখন তার কোনও গুনাহই আর অবশিষ্ট থাকে না'। [১৪]
খাব্বাব বিন আরাত্ত রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অভিযোগ নিয়ে গেলাম। তিনি তখন কাবার ছায়ায় নিজ চাদরে মাথা রেখে বিশ্রাম করছিলেন। আমরা বললাম, আপনি কি আমাদের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করবেন না? আপনি কি আমাদের জন্য দোয়া করবেন না? তিনি বললেন-
'তোমাদের পূর্বের লোকদের অবস্থা ছিল এই যে, তাদের পাকড়াও করে তাদের জন্য মাটিতে গর্ত খুঁড়া হতো, তাদের সেখানে পুঁতে রেখে করাত দিয়ে তাদের মাথা দ্বিখণ্ডিত করা হতো, লোহার চিরুনি দিয়ে শরীরের হাড় ও মাংস ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ফেলা হতো- তবুও তাদেরকে দ্বীন থেকে এক পা নাড়ানো যেতো না। আল্লাহর শপথ, আল্লাহ্ তায়ালা এই দ্বীনকে অবশ্যই পূর্ণতা দান করবেন। তখন একা একজন আরোহী সানয়া থেকে হাযারামাউত পর্যন্ত সফর করবে, আল্লাহ্ ছাড়া এবং তার মেশপালের জন্য নেকড়ে ছাড়া কাউকে ভয় করবে না; কিন্তু তোমরা অনেক তাড়াহুড়ো করছো'। [১৫]
জনৈক সালাফ বলেন, 'যদি দুনিয়ার জীবনে বালা মুসীবত না থাকতো, তাহলে আমরা আখিরাতে পদার্পণ করতাম রিক্তহস্তে'。
আল্লাহ্ তায়ালার বাণী, 'আমি তাদের মধ্য থেকে নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা আমার নির্দেশ অনুযায়ী পথ প্রদর্শন করতো, যখন তারা ধৈর্যশীল হয়েছিল। তারা আমার নিদর্শনসমূহের প্রতিও দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করতো'।[১৬] এই আয়াতের প্রেক্ষিতে সুফিয়ান বিন উয়াইনাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যখন তারা আদেশ অনুযায়ী চলা শুরু করেছে, আমি তাদেরকে নেতা বানিয়ে দিয়েছি'。
আবার যখন লোকেরা উরওয়া বিন যুবাইর রদিয়াল্লাহু আনহুর পায়ে ব্যাধি দেখা দিলে লোকেরা তার পা কাটতে চাইলো, তখন তারা তাকে বলল, আপনি যেন ব্যাথা অনুভব না করেন এজন্য আপনাকে কিছু ঔষধ পান করিয়ে দিই? তখন তিনি বলেছিলেন, 'আমাকে আল্লাহ্ তায়ালা পরিক্ষা করছেন আমার সবর যাচাই করার জন্য। আমি কি তাঁর কাজে বাধা প্রধান করবো!'
উমর বিন আব্দুল আজিজ রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ্ তায়ালা কোনও বান্দাকে কোনও নিয়ামত দিয়ে তা ছিনিয়ে নিয়ে যদি তদস্থলে সবর দান করেন, তাহলে ছিনিয়ে নেওয়া জিনিষের চেয়ে বিনিময়টাই অধিক উত্তম'。
আবু বকর রদিয়াল্লাহু আনহু একবার অসুস্থ হলেন। লোকেরা তাঁর শুশ্রূষা করতে গিয়ে বলল, আপনার জন্য ডাক্তার ডাকবো? তিনি বললেন, 'ডাক্তার আমাকে দেখেছে'। তারা বলল, আপনার ব্যাপারে তাহলে সে কী বলেছে? তিনি বললেন, 'ডাক্তার বলেছেন, আমি যা ইচ্ছা তাই করি'。
বর্ণিত আছে যে, সাইদ বিন জুবাইর রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'বিপদে আক্রান্ত হয়ে আল্লাহ্ তায়ালার জন্য স্বীকৃতি দেওয়া, তার জন্য আল্লাহ্ তায়ালার প্রতিদান এবং সওয়াবের আশা রাখা, এটাই সবর। কখনো বান্দা অনেক অস্থির হয়ে পড়ে, তথাপি সে দৃঢ় অবিচল থাকে, তখন তার মাঝে শুধু সবরই পরিলক্ষিত হয়'。
বিপদে আক্রান্ত হয়ে আল্লাহ্ তায়ালার জন্য স্বীকৃতি দেওয়া এই কথা দ্বারা কেমন যেন 'ইন্না লিল্লাহ'এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ বান্দা স্বীকৃতি দেবে যে, সে আল্লাহ্ তায়ালার সম্পদ, মালিক সেখানে যা ইচ্ছা তসরুফ করতে পারেন। পক্ষান্তরে তার জন্য আল্লাহ্ তায়ালার প্রতিদান এবং সওয়াবের আশা রাখা এ কথা দ্বারা 'ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন'এর ব্যখ্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ আমরা তার কাছেই ফিরে যাবো এবং তাঁর কাছেই আশ্রয় গ্রহণ করবো, তিনি আমাদের সবরের প্রতিদান দান করবেন, ধৈর্যের ফল দেবেন; তিনি বিপদের প্রতিদান বিনষ্ট করবেন না。
টিকাঃ
[১২] সহিহ মুসলিম ২০১১
[১৩] সহিহ বুখারি ৬৪২৪
[১৪] সহিহ বুখারি ৫৬৪০
[১৫] সহিহ বুখারি ৩৬১২
[১৬] সুরা সাজদা ২৪