📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব 📄 আত্মনিয়ন্ত্রণ দুই প্রকার

📄 আত্মনিয়ন্ত্রণ দুই প্রকার


এক প্রকার কোনো কাজ করার আগে করতে হয়। আরেক প্রকার করতে হয় কোনো কাজ করার পরে。

প্রথম প্রকার হলো, কাজ করার ইচ্ছা কিংবা কল্পনা করার সময় একটু থেমে অপেক্ষা করা। কাজটি করার যোগ্য এবং প্রত্যাখ্যানঅযোগ্য, এ কথা স্পষ্ট হওয়ার আগে কাজটি না করা。

হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন-'আল্লাহ্ তায়ালা ওই ব্যক্তিকে রহম করুন, যে কোনো কাজ করার ইচ্ছা করলে একটু থেমে যায়। যদি তা আল্লাহর জন্য হয়, তাহলে সম্পাদন করে অন্যথায় ত্যাগ করে'。

তাঁর এই কথার ব্যাখ্যা অনেকে এভাবে করেছেন- যখন নফসে কোনো কাজের কথা উদয় হবে এবং ব্যক্তি তা করার ইচ্ছা করবে, তখন সে একটু অপেক্ষা করে দেখবে যে, সে কি এই কাজ করার সামর্থ্য রাখে কি না? যদি সামর্থ্যের বাহিরে হয়, তাহলে তার দিকে অগ্রসর হবে না। আর যদি সামর্থ্যের ভেতরে হয়, তাহলে আরও একবার থেমে যাবে এবং ভেবে দেখবে যে, এই কাজটি করার চেয়ে পরিত্যাগ করা উত্তম নাকি পরিত্যাগ করার চেয়ে সম্পাদন করাই উত্তম? যদি প্রথমটি হয়, তাহলে তা পরিহার করবে। অন্যথায় তৃতীয়বারের মতো একটু দাঁড়াবে এবং আবারও দৃষ্টি দেবে যে, এই কাজের আগ্রহ কি আল্লাহ্ তায়ালার সন্তুষ্টি ও প্রতিদান লাভের উদ্যেশ্যে নাকি সৃষ্টি থেকে ধন সম্পদ প্রশংসা ও সুনাম অর্জনের লক্ষ্যে? যদি দ্বিতীয়টা হয়, তাহলে তা থেকে বিরত থাকবে, যদিও এর দ্বারা উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে যায়; যেন নফস শিরক এবং গাইরুল্লাহর জন্য আমল করতে অভ্যস্ত না হয়ে যায় এবং এগুলোকে হালকা মনে না করে। কেননা তার কাছে এগুলো যত হালকা মনে হবে, ততই আল্লাহর জন্য আমল করা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। আর যদি প্রথমটি হয়, তাহলে আরও একবার ভেবে দেখবে যে, যদি প্রয়োজন হয় তাহলে এই কাজে কি তাকে সহযোগিতা করা হবে? তার কি অনেক সহযোগী এবং সাথী আছে? যদি তার কোনো সহযোগী ও সাথী না থাকে, তাহলে এই কাজ করবে না। যেমন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় থেকে জিহাদ করেন নি, নিজের শক্তি ও সহযোগী গড়ে তোলার জন্য। আর যদি তার সহযোগী থাকে, তখন গিয়ে সে এই কাজ করতে অগ্রসর হবে; কেননা সে আল্লাহর আদেশে বিজয়ী ও সফল। এই চারটি বিষয়ের একটি বিষয় যদি অনুপস্থিত থাকে, তাহলে সফলতা আসবে না। আর যদি সবগুলোর সমাগম ঘটে, তাহলে সফলতা তার পদচুম্বন করবে। এই চারটি স্থানে বান্দা কাজের পূর্বে নিজেকে হিসাব নিতে মুখাপেক্ষী。

দ্বিতীয় প্রকার হলো, কাজের পর নিজের হিসাব নেওয়া। এটা আবার তিন প্রকার-

এক-আল্লাহ্ তায়ালার কোনো ইবাদতে ত্রুটি করলে এবং যেভাবে করা দরকার ছিল সেভাবে করতে না পারলে নফসের হিসাব নেওয়া। কোনো ইবাদতে আল্লাহ্ তায়ালার হক ছয়টি। আর তা হলোঃ কাজের মধ্যে ইখলাস তথা একনিষ্ঠতা থাকা, সেখানে আল্লাহ্ তায়ালার বশ্যতা থাকা, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ থাকা, আল্লাহ্ তায়ালার অনুগ্রহের কথা সাক্ষ্য দেওয়া, নিজের ওপর আল্লাহ্ তায়ালার নিয়ামতের সাক্ষ্য দেওয়া এবং এতো কিছুর পর সেখানে নিজের ত্রুটির কথা স্বীকার করা। এভাবে সে ভেবে দেখবে যে, সে কি এসমস্ত হক আদায় করতে পেরেছে? কাঙ্ক্ষিত পদ্ধতিতে কি তা সম্পাদন করতে পেরেছে?

দুই-যে সমস্ত কাজ করার চেয়ে পরিহার করা শ্রেয় ছিল, এরূপ প্রতিটি কাজে নিজের জবাবদিহিতা করা。

তিন-কোনো একটি বৈধ কাজ করার পর তা নিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করবে, কেন করেছে কাজটি? আল্লাহ্ তায়ালার সন্তুষ্টি এবং আখিরাতের জন্য করেছে কি? তাহলে তো সে এতে লাভবান হবে। নাকি দুনিয়া পাওয়ার ইচ্ছা করেছে? তাহলে তো তার লোকসান হয়ে যাবে এবং এই কাজ দিয়ে অর্জনযোগ্য সফলতা তার হাতছাড়া হয়ে যাবে。

উদাসীনতা, আত্মনিয়ন্ত্রন না করা, লাগামহীনতা এবং এসবকে তুচ্ছ ও নগণ্য মনে করা- এগুলোর কারণে ব্যক্তি হালাকের বিবরে গিয়ে পতিত হয়। প্রবঞ্চিতদের অবস্থাও এমনই। তারা শাস্তি থেকে নিজেদের চোখকে অন্ধ করে নেয় এবং ক্ষমা পাওয়ার আশায় থাকে। ফলে নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করে না এবং শেষ ফলাফল নিয়েও ভেবে দেখে না। আর যখন তার এই মনোভাব ধারাবাহিকতা লাভ করে, তখন তার জন্য গুনাহের কাজ করা সহজ হয়ে যায়। সে অপরাধের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে যায়; তার জন্য গুনাহ ও অপরাধ ত্যাগ করা তখন হয়ে যায় প্রচণ্ড কষ্টসাধ্য。

এসব থেকে উত্তরণের পথ হলো, সর্ব প্রথম নিজেকে ফরজ কাজগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা। যদি কোনো ত্রুটি দৃষ্টিগোচর হয়, তাহলে তার ক্ষতিপুরন করবে, ক্বাযা কিংবা সংশোধনের দ্বারা। অতঃপর গুনাহের কাজগুলো নিয়ে ভেবে দেখবে। যদি কোনো গুনাহের কথা স্মরণ হয়, তাহলে তওবা ইস্তিগফার এবং নেক কাজের দ্বারা তার খেসারত দেবে。

এরপর নিজেকে জিজ্ঞেস করবে উদাসীনতা সম্পর্কে। যে কাজের জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, যদি সেখানে কোনো ঘাটতি দেখা যায়, তাহলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে এবং তাঁর জিকির করে তার ক্ষতিপূরণ করবে। পরিশেষে নিজের মুখ দিয়ে যে সমস্ত কথা বলেছে, পা দিয়ে যেখানে যেখানে গিয়েছে, হাত দিয়ে যে সমস্ত কাজ সম্পাদন করেছে এবং কান দিয়ে যা শ্রবণ করেছে সেগুলোর হিসাব নেবে; এসবের পেছনে উদ্যেশ্য কী ছিল, কেন করেছে, কার জন্য করেছে, কোন পদ্ধতিতে করেছে?- এভাবে নিজেকে জবাবদিহিতার অভ্যস্ত করে নেবে。

মুমিন ব্যক্তি সব সময় একটি কথা নিজের করোটিতে খেয়াল করবে যে, প্রতিটি কথা ও পদক্ষেপের জন্য দুটি প্রশ্নের সম্মুখীন তাকে হতে হবেঃ কার জন্য করেছো? কোন পদ্ধতিতে করেছো? প্রথম প্রশ্ন একনিষ্ঠতার জন্য। আর দ্বিতীয় প্রশ্ন আনুগত্যের জন্য। [৩]

টিকাঃ
[৩] সূরা আলে ইমরান ৩০

📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব 📄 আত্মনিয়ন্ত্রণের উপকারিতা

📄 আত্মনিয়ন্ত্রণের উপকারিতা


১- নিজের ত্রুটি ও দোষগুলো জানা যায়। যে ব্যক্তি নিজের দোষ সম্পর্কে অবগত নয়, সে তা পরিশুদ্ধও করতে পারে না। ইউনুস বিন উবাইদ রহিমাহুল্লাহ বলেন-'আমি এমন একশটি ভালো গুণের কথা জানি, আমার নফসের মধ্যে যার একটিও উপস্থিত নেই'। মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি' রহিমাহুল্লাহ বলেন- 'যদি গুনাহের কোনো দুর্গন্ধ থাকত, তাহলে কেউ আমার পাশে বসতে পারতো না'。

২- নিজের ওপর আল্লাহ্ তায়ালার হকসমূহ জানতে পারা। এর মাধ্যমে ব্যক্তির মাঝে নিজের নফসের প্রতি ঘৃণা তৈরি হয়। তখন সে তাকে তাচ্ছিল্য করে এবং আত্মম্ভরিতা ও দেখানোপনা থেকে মুক্ত করে। ফলে তার জন্য নিজ রবের সামনে বিনয়, অবনত এবং ঝুঁকে যাওয়ার দ্বার উন্মুক্ত হয়। নিজের নফসের ওপর সৃষ্টি হয় নিরাশা। আল্লাহ্ তায়ালার ক্ষমা, মার্জনা এবং রহমত ছাড়া মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়, এ কথা তার অন্তরে দৃঢ় বদ্ধমূল হয়ে যায়। কেননা আল্লাহ্ তায়ালার হক হলো তাঁর বাধ্য হওয়া, অবাধ্য না হওয়া, তাঁকে স্মরণ করা ভুলে না যাওয়া এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করা, অকৃতজ্ঞ না হওয়া。

অতএব নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা, জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা নিজেকে পরিশুদ্ধ এবং অনুগত করার জন্য অতীব জরুরী।

ফন্ট সাইজ
15px
17px