📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব 📄 নফসে আম্মারা বিস সু'

📄 নফসে আম্মারা বিস সু'


এই নফস সমস্ত অন্যায় ও অশুভ কাজের মন্ত্রণা দেয়। এটাই তার তবিয়ত। আল্লাহ্ তায়ালার তাওফিক ব্যতীত কেউ তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকতে পারে না। এই নফসই হলো চূড়ান্ত পর্যায়ের নিন্দিত এবং কলঙ্কিত। ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনায় আজিজের স্ত্রীর আলোচনা করতে গিয়ে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন—

'আমি আমার নফসকে দোষমুক্ত বলি না। নফস তো কুমন্ত্রণা দিয়েই থাকে। তবে আমার প্রভু অনুগ্রহ করলে তা ভিন্ন কথা। নিশ্চয়ই আমার প্রভু ক্ষমাশীল, দয়ালু। [৫]

অন্যত্র বলেন—

'তোমাদের ওপর যদি আল্লাহ্ তায়ালার দয়া ও অনুগ্রহ না থাকতো, তাহলে তোমাদের কেউ কখনো পবিত্র থাকতে পারতো না' । [৬]

আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে প্রয়োজন পূরণের খোতবা শিক্ষা দিতে গিয়ে এভাবে বলেছেন—

'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্ তায়ালার। আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি, তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর কাছেই আমাদের নফসের অনিষ্ট এবং মন্দ কাজের অনিষ্ট থেকে পানাহ চাই' । [৭]

মন্দ ও অনিষ্ট নফসের অভ্যন্তরে প্রোথিত। তার কারনেই মন্দ ও খারাপ কাজ সম্পাদিত হয়। আল্লাহ্ তায়ালা যদি বান্দাকে তার নফসের হাতে ছেড়ে দেন, সে তার অনিষ্ট এবং মন্দ কাজের কারণে হালাক হয়ে যাবে। আর যদি আল্লাহ্ তায়ালা তাকে সক্ষমতা দান করেন এবং সহযোগিতা করেন, তাহলে সে সব ধরণের অনিষ্ট থেকে মুক্ত থাকতে পারবে। আমরা আল্লাহ্ তায়ালার কাছে আমাদের নফস এবং মন্দ ও গুনাহের কাজের অনিষ্ট থেকে পানাহ ভিক্ষা চাই。

তো চূড়ান্ত কথা হলোঃ মানুষের শরীরে নফস একটাই। কখনো তা আম্মারা হয়, লাওয়ামা হয় কখনো, আবার কখনো মুতমাইন্না হয়。

নফসে মুতমাইন্নাহ'র সহচর থাকেন একজন ফেরেশতা। তিনি তাকে সঠিক দিশা দেখান। তার মাঝে হকের আলো নিক্ষেপ করেন। তাকে সত্যের দিকে উৎসাহিত করেন। তাকে সত্যের সুন্দর সমুজ্জ্বল চেহারা প্রদর্শন করান। বাতিল থেকে তাকে বিরত রাখেন। অন্যায় থেকে নিবৃত্ত রাখেন এবং গুনাহের কুৎসিত রূপ প্রত্যক্ষ্য করান। মোটকথা, আল্লাহ্ তায়ালার জন্য এবং আল্লাহ্ তায়ালার সাথে সম্পৃক্ত যাবতীয় জিনিষ নফসে মুতমাইন্নাহ থেকে উৎপাদিত হয়。

পক্ষান্তরে নফসে আম্মারার দোসর হয় শয়তান। সে তার সঙ্গ দেয়। তাকে প্রতিশ্রুতি দেয়। আশা ভরসা দেয়। তার মাঝে বাতিল ও মিথ্যা ঢেলে দেয়। তাকে অন্যায় ও মন্দ কাজের আদেশ ও মন্ত্রণা দেয়। মন্দকে তার সামনে সুশোভিত করে তুলে ধরে। তাকে দীর্ঘ আশা দেয়। তার সামনে বাতিলকে এতো সুন্দর রূপে প্রস্ফুটিত করে যে, সে তা গ্রহণ করে এবং সুন্দর মনে করতে থাকে。

নফসে মুতমাইন্না এবং তার সহচর ফেরেশতা ব্যক্তি থেকে নিম্নোক্ত সমস্ত জিনিষের দাবি জানায়ঃ আল্লাহ্ তায়ালার একত্ব, দাসত্ব, সততা, খোদাভীতি, আল্লাহ-নির্ভরতা, তাওবা, প্রত্যাবর্তন, আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করা, দুনিয়ার বুকে আশা স্বল্প রাখা, মৃত্যু এবং তার পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুতি。

অন্যদিকে শয়তান এবং তার কাফের মুনাফিক সাঙ্গপাঙ্গরা নফসে আম্মারার কাছে এর বিপরীত জিনিষগুলো দাবি করে。

নফসে মুতমাইন্নার জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো নিজের আমলকে শয়তান থেকে মুক্ত করা এবং নফসে আম্মারা থেকে দূর রাখা। যদি উভয়কে ভেদ করে কোনো একটি আমল আল্লাহ্ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, তাহলে তা বান্দার মুক্তির জন্য যথেষ্ট। কিন্তু নফসে আম্মারা এবং শয়তান দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে নিয়েছে, আল্লাহ্ পর্যন্ত একটি খালেস আমল পৌঁছতে দেবে না। এজন্যই জনৈক আল্লাহওয়ালা বলতেন, 'আমি যদি জানতে পারতাম যে, আমার একটি ইবাদত আল্লাহ্ তায়ালা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, তাহলে মুসাফির তার পরিবারে ফিরে আসলে যে পরিমাণ আনন্দ লাভ হয়, তার চেয়ে বেশি আনন্দিত হতাম মৃত্যুর জন্য।

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি যদি জানতাম যে, আল্লাহ্ তায়ালা আমার একটি সাজদা কবুল করেছেন, তাহলে মৃত্যু আমার কাছে অধিক প্রিয় হতো, প্রবাসীর নীড়ে ফিরে আসা থেকে'。

কখনো নফসে আম্মারা সরাসরি নফসে মুতমাইন্নার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। ফলে নফসে মুতমাইন্না কোনো কল্যাণকর বিষয় উত্থাপন করলেই আম্মারা এসে তার প্রতিপক্ষ হয় এবং তার ভালো কাজের বিকৃত ব্যাখ্যা পেশ করে। যেমন জিহাদের আলোচনা আনলে আম্মারা বলবে, এটা তো প্রকারান্তরে নিজেকে হত্যার মুখে ঠেলে দেওয়া, স্ত্রীকে বিধবা করা, সন্তানদের এতিম করা এবং ধন সম্পদ নষ্ট করার নাম। তদ্রূপ যাকাত ও দানসদকার বাস্তবতা তুলে ধরবে সম্পদ অকাজে ব্যয় হয়ে হ্রাস হয়ে যাওয়া, নিজের সম্পদ ফুরিয়ে গেলে মানুষের কাছে হাত পাতা এবং ফকির মিসকিন অসহায়দের কাতারে নাম লিখাতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি অবান্তর যুক্তি দিয়ে। কাজেই আমার নফস কোন প্রকারের অন্তর্ভুক্ত, আমি তার গোলাম না সে আমার গোলাম, আমাকে সে কোন পথে পরিচালিত করছে এসব বিষয়ের প্রতি সদা সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

টিকাঃ
[৫] সুরা ইউসুফ ৫৩
[৬] সুরা নূর ২১
[৭] সুনান ইবনে মাজাহ ১৮৯২

ফন্ট সাইজ
15px
17px