📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব 📄 নফসে মুতমাইন্নাহ

📄 নফসে মুতমাইন্নাহ


যখন নফস আল্লাহ্ তায়ালার দিকে আকৃষ্ট হয়, তাঁর জিকিরে প্রশান্তি লাভ করে, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তাঁর সাক্ষাতের জন্য উদগ্রীব হয় এবং তাঁর নৈকট্য কামনা করে, তখন তা মুতমাইন্নায় পরিণত হয়। এই নফসকে মৃত্যুর সময় বলা হবেঃ 'হে প্রশান্ত আত্মা, সন্তুষ্ট এবং সন্তোষভাজন হয়ে তোমার রবের দিকে ফিরে এসো'। [২]

ইবনে আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'মুতমাইন্নাহ মানে হলো সত্যায়িত'।

কাতাদা রহিমাহুল্লাহ বলেন—'মুতমাইন্নাহ হলো ওই মুমিন যার অন্তর আল্লাহ্ তায়ালার প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থাশীল। ওই ব্যক্তি তার রবের নাম ও গুণাবলী এবং তিনি নিজের ব্যাপারে ও তাঁর রাসুলের ব্যাপারে যে সংবাদ দিয়েছেন সেগুলোর প্রতি প্রশান্ত বিশ্বাসী। মৃত্যু-পরবর্তী কবর জগতের জীবন সম্পর্কে এবং তারও পর কিয়ামতের অবস্থা সম্পর্কে তিনি যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন সেগুলোর ওপর সে স্থির বিশ্বাস স্থাপন করে, কেমন যেন সে স্বচক্ষে তা প্রত্যক্ষ্য করেছে। অতঃপর আল্লাহ্ তায়ালার নির্ধারণের ওপর অটল বিশ্বাস আরোপণ করে এবং তা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়। কখনও বিরাগভাজন হয় না, কোনো অভিযোগ করে না এবং তাঁর ঈমানেও কোনো চিড় ধরতে দেয় না। ফলে যা হাতছাড়া হয়ে যায় বা যা অপ্রাপ্য থেকে যায় তার জন্য নিরাশ হয় না এবং যা কিছু সে পেয়েছে তা নিয়ে অধিক উল্লসিত আনন্দিতও হয় না। কেননা সমস্ত মসিবত তার কাছে আসার আগে, তার সৃষ্টিরও পূর্বে, নির্ধারিত করে রাখা হয়েছে। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-

'তারা যেই মুসীবতের সম্মুখীন হোক না কেন, তা আল্লাহরই আদেশে। আর যে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবে, তিনি তার অন্তরকে সঠিক পথের দিশা দান করবেন' [৩]

উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় একাধিক সালাফ বলেন- 'এখানে ওই বান্দার কথা বলা হয়েছে, যার ওপর কোনো মসিবত আপতিত হয় এবং সে বিশ্বাস করে যে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। তাই সে তাতে সন্তুষ্ট থাকে এবং নিজের রবের কাছে আত্মসমর্পণ করে'。

সর্বোচ্চ পর্যায়ের ইতমিনান তথা প্রশান্তি হলো, বাধ্য অনুগত একনিষ্ঠ এবং সতর্কতার সহিত আল্লাহ্ তায়ালার আদেশ পালন করা। তাঁর আদেশের সামনে কোনো ইচ্ছা, প্রবৃত্তি, সংস্কৃতি কিংবা প্রথাকে প্রাধান্য না দেওয়া। তাঁর সংবাদবিরোধী কোনো সংশয় অন্তরে না রাখা। তাঁর আদেশবিরোধী কোনো কামনায় না জড়ানো। বরং কখনো যদি এসব বান্দার অন্তরে উদয় হয়, তাহলে সে এগুলোকে কুমন্ত্রণা আখ্যায়িত করবে, এগুলো গ্রহণ করার চেয়ে আকাশ থেকে জমিনে ভূপাতিত হওয়া তার কাছে অধিক প্রিয় হবে। অনুরূপ গুনাহের অস্থিরতা এবং বিরক্তি থেকে তাওবার প্রশান্তি এবং সুস্থিরতার দিকে ধেয়ে আসবে। কেউ এমন পর্যায়ে পৌঁছতে পারলে তার ক্ষেত্রে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই কথা প্রয়োগ হবে, 'এটাই স্পষ্ট ঈমান'。

যখন কোনো বান্দা সংশয় থেকে বিশ্বাসে, মূর্খতা থেকে জ্ঞানে, উদাসীনতা থেকে আল্লাহর স্মরনে, বিশ্বাসঘাতকতা থেকে তাওবার দিকে, দেখানোপনা থেকে ইখলাস ও একনিষ্ঠতার দিকে, মিথ্যা থেকে সত্যের দিকে, অক্ষমতা থেকে বিচক্ষণতার দিকে, আত্মঅহমিকার দাপট থেকে বাধ্যতার বশ্যতায় এবং ঔদ্ধত্য থেকে বিনয়ের দিকে প্রত্যাবর্তন করবে, আশ্রয় নেবে এবং বাসস্থান গড়ে তুলবে, তখন তার নফস নফসে মুতমাইন্নাহ বলে পরিগণিত হবে。

আর এসব কিছুর মূল হলো, মনোযোগ এবং সতর্কতা। এদুইয়ের মাধ্যমে তার অন্তর থেকে উদাসীনতার তন্দ্রা দূর হয়ে যাবে এবং তার জন্য জান্নাতের অট্টালিকা উজ্জ্বল করে দেবে। তখন সে চিৎকার করে বলবেঃ হে আমার নফস, রাতের এই অমানিশায় তোমার প্রচেষ্টায় আমাকে একটু সহযোগিতা করো; তাহলে কিয়ামতের দিন ওই সমস্ত সুউচ্চ প্রাসাদে আরামের জীবন লাভ করতে পারবে。

সতর্কতার আলোয় সে দেখতে পাবে তার জন্য যা কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে সব। অনুধাবন করতে পারবে মৃত্যু থেকে চিরস্থির জান্নাতে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত তার সাথে কী ব্যবহার করা হবে। দুনিয়ার ত্বরিত ক্ষয়, অধিবাসীদের প্রতি তার অবিশ্বস্ততা এবং প্রেমিকদের জন্য তার ঘাতকমূর্তি অনুভব করতে পারবে। উক্ত আলোয় সে উপলব্ধি করবে ওই ব্যক্তির কথা যে বলবেঃ 'হায় আফসোস, আল্লাহর প্রতি কর্তব্য পালনে অবহেলা করেছি!' [৪]

তখন সে বাকি জীবন বিগত জীবনের প্রায়শ্চিত্ত করতে ব্যয় করবে, যে জীবন সে নিষ্প্রাণ কাটিয়ে দিয়েছে সেখানে ফিরিয়ে আনবে প্রাণের সতেজতা, যত ভুল সে করেছে তার জন্য হবে অনুতপ্ত, যে সময়টুকু অবশিষ্ট আছে তাকে যথার্থ কাজে লাগাবে; এই সময়টুকু যদি বেহাত হয়ে যায়, তাহলে সমস্ত কল্যাণ থেকে সে বঞ্চিত হবে, এই অনুভূতি তার অন্তরে জাগরিত হবে。

সতর্কর্তা ও মননিবেশের প্রদীপ থেকে এবং তার ওপর তার রবের নিয়ামতের আলোক থেকে সে প্রত্যক্ষ্য করবে যে, সে তার রবের নিয়ামতসমূহ গণনা করে শেষ করার সক্ষমতা রাখে না; সেগুলোর পরিপূর্ণ হক আদায় করতে অক্ষম। উক্ত আলোয় সে নিজের নফসের দোষ-ত্রুটি, আমলের ঘাটতি, কৃত গুনাহ ও অপরাধ, অনেক হক ও কর্তব্য আদায় করা থেকে অনীহা ইত্যাদি স্পষ্ট দেখতে পাবে। তখন তার অন্তর নত হবে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হবে নম্র। ফলে সে নিজের দোষ ত্রুটি গুনাহ অপরাধ হিসেব করত তার রবের নিয়ামতের বারিধারা দেখে তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করবে অবনত মস্তকে。

উক্ত প্রদীপশিখায় সে দেখতে পাবে, তার সময় খুবই মূল্যবান এবং ভয়ানক। এটাই তার সৌভাগ্যের একমাত্র মূলধন। তখন থেকেই সে আল্লাহর অবাধ্যতায় তা ব্যয় করতে কুণ্ঠাবোধ করবে; কেননা তার এই সুমতি অর্জন হয়ে গিয়েছে যে, যদি সময় বিনষ্ট হয়, তাহলে সে ক্ষতি এবং পরিতাপের সম্মুখীন হবে। আর যদি সে তা কাজে লাগায়, তাহলে সে পাবে শান্তি ও সৌভাগ্যের পায়রার দেখা。

এসবই হলো সতর্কতা, মনোযোগ এবং অভিনিবেশের ফল ও প্রভাব। এটাই হলো নফসে মুতমাইন্নাহ'র প্রথম স্তর; এখান থেকেই আল্লাহ্ এবং পরকালের পথের যাত্রা শুরু হয়।

টিকাঃ
[২] সুরা ফাজর ২৭-২৮
[৩] সুরা তাগাবুন ১১
[৪] সূরা যুমার ৫৬

📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব 📄 নফসে লাওয়ামা

📄 নফসে লাওয়ামা


একদল উলামায়ে কেরাম বলেন, 'নফসে লাওয়ামা হলো ওই নফস যা কখনো এক অবস্থার ওপর স্থির থাকে না। তার রয়েছে বিচিত্র রং ও ঢং। কখনো সে মনযোগী হয়, আবার কখনো হয়ে যায় উদাসীন। উপেক্ষা করে আবার আত্মনিয়োগ করে। ভালোবাসে আবার ঘৃণা করে। খুশি হয় আবার দুঃখিত হয়। সন্তুষ্ট হয় আবার ক্রোধান্বিত হয় এবং অনুসরণ করে আবার বিরত থাকে ইত্যাদি এসব তার গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য'。

আরেকদল উলামায়ে কেরাম বলেন, 'এটা মুমিনের অন্তর'। হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'তুমি মুমিন ব্যক্তিকে দেখবে সর্বদা নিজের নফসকে তিরস্কার করছে। সে বলে, আমি এমনটা চাই নি, আমি কেন এমনটা করলাম, এটা তো ওটার চেয়ে ভালো ছিল ইত্যাদি'。

আরও একদল বলেন, 'লাওম হলো কিয়ামত দিবস। কেননা ওই দিন যারা অন্যায় করেছে কিংবা কর্তব্য পালনে ত্রুটি করেছে তারা সকলেই নিজেকে তিরস্কার করবে'。

উলামায়ে কেরামের উপরোক্ত বিভিন্ন বক্তব্য উল্লেখ করত আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'উক্ত সমস্ত মতই সঠিক। নফসে লাওয়ামা দুই প্রকারঃ নিন্দিত লাওয়ামা এবং অনিন্দিত লাওয়ামা'。

📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব 📄 নিন্দিত লাওয়ামা

📄 নিন্দিত লাওয়ামা


'নিন্দিত নফসে লাওয়ামা হলো ওই নফস, যা মূর্খ এবং জালেম। আল্লাহ্ এবং ফেরেশতাগণ এই নফসের নিন্দা করেছেন'。

📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব 📄 অনিন্দিত লাওয়ামা

📄 অনিন্দিত লাওয়ামা


'এটা হলো ওই নফস, যা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর ইবাদতে ত্রুটি করার কারণে অবিচ্ছিন্নভাবে তার ধারককে তিরস্কার করতে থাকে। এই নফস নিন্দিত না। বরং যার নফস তাকে আল্লাহ্ তায়ালার ইবাদত না করার জন্য তিরস্কার করে, তাঁর সন্তুষ্টির পথে অন্যের নিন্দা সহ্য করে এবং আল্লাহ্ তায়ালার জন্য কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া না করে, তার নফসই তো হলো সর্বশ্রেষ্ঠ নফস এবং এই নফস আল্লাহ্ তায়ালার তিরস্কার ও নিন্দা থেকে নিরাপদ। পক্ষান্তরে যে নফস তার ধারকের কার্যক্রম নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে, তাকে তিরস্কার না করে এবং আল্লাহর জন্য কোনো নিন্দা সহ্য না করে, এই নফস আল্লাহ্ তায়ালার নিন্দা ও তিরস্কারের পাত্র।

ফন্ট সাইজ
15px
17px