📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব > 📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ

📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ


আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ্ তায়ালা তার ওপর দশটি রহমত নাযিল করবেন'। [১]
সমস্ত নেককাজের প্রতিদান দশগুন বৃদ্ধি পায়। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ করা তো অন্যতম মহিমান্বিত নেক কাজ। তাই একবার দরূদ পাঠ করলে দশটি রহমত পাওয়া যায়। ইবনে আরাবি রহিমাহুল্লাহ বলেন-
'যদি কেউ প্রশ্ন করে যে, আল্লাহ্ তায়ালা তো নিম্নোক্ত আয়াতে বলেই দিয়েছেন যে, 'যে ব্যক্তি একটি ভালো কাজ করবে, সে তার মতো দশটির ফল পাবে'।[২] তাহলে এই হাদিসের ভিন্ন বৈশিষ্ট্য কোথায়?'
তাহলে তার উত্তরে আমি বলব, 'অনেক বড় একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কুরআনের দাবি হলো, যে একটি ভালো কাজ করবে, তাকে দশগুণ প্রতিদান দেওয়া হবে। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ করাও যেহেতু একটি ভালো কাজ, তাহলে কুরআনের দাবি অনুযায়ী তার প্রতিদান স্বরূপ জান্নাতে দশটি স্তর উন্নীত হবে। এটি তো সাধারণ বৈশিষ্ট্য। আরও উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলোঃ যে ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ্ তায়ালা তার ওপর দশটি রহমত নাযিল করবেন। আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর বান্দার কথা স্মরণ করছেন, এর চেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য আর কী হতে পারে! আল্লাহ্ তায়ালা যেমন নিজের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, বান্দা তাঁকে স্মরণ করলে তিনিও তাকে স্মরণ করবেন। তদ্রুপ তাঁর রাসুলের স্মরনের প্রতিদানও নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, তিনিও ওই বান্দার কথা স্মরণ করবেন এবং তাঁর ওপর রহমত নাযিল করবেন'।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর একবার দরূদ পাঠ করলে তার প্রতিদান স্বরূপ দশটি রহমত নাযিল হয়- বিষয়টি এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তার জন্য আরও অনেক ফজিলত রয়েছে। নিম্নে এমন কিছু হাদিস উল্লেখ করা হলো-
আনাস বিন মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যার কাছে আমার আলোচনা করা হবে, সে যেন আমার ওপর দরূদ পাঠ করে। যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ্ তায়ালা তার ওপর দশটি রহমত নাযিল করবেন, তার দশটি গুনাহ মাফ করে দেবেন এবং তাকে দশ স্তর উন্নত করবেন'। [৩]
'যার কাছে আমার আলোচনা করা হবে, সে যেন আমার ওপর দরূদ পাঠ করে'-এখান থেকে একটি কথা প্রতীয়মান হয় যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম শুনলে দরূদ পাঠ করা একটি আদেশ। অন্য একটি হাদিসেও এমন কথা আছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'কৃপণ ওই ব্যক্তি, যার কাছে আমার আলোচনা করা হলো, আর সে আমার ওপর দরূদ পাঠ করলো না'। [৪]
ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন—
'পৃথিবীতে বিচরণকারী আল্লাহ্ তায়ালার কিছু ফেরেশতা আছেন, তাঁরা আমার উম্মতের সালাম আমার কাছে পৌঁছে দেন'। [৫]
ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
'কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটে অবস্থান করবে ওই ব্যক্তি, যে আমার ওপর অধিক দরূদ পাঠ করে'। [৬]
জুমার দিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর প্রচুর পরিমাণ দরূদ পাঠ করা মুস্তাহাব। আউস বিন আউস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
'তোমাদের সবচেয়ে উত্তম দিন হলো জুমার দিন। এই দিনে আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে, এই দিনেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে, এই দিনেই শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে এবং এই দিনেই কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে। অতএব, এই দিনে তোমরা আমার ওপর বেশি বেশি দরূদ পাঠ করো; কেননা তোমাদের দরূদ আমার কাছে পেশ করা হবে'।
সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেনঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাদের দরূদ আপনার কাছে কীভাবে পেশ করা হবে, আপনি তো ইন্তিকাল করবেন? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—'আল্লাহ্ তায়ালা জমিনের জন্য নবীদের দেহ ভক্ষণ করা হারাম করে দিয়েছেন'। [৭]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ করার শব্দচয়ন কীভাবে হবে, তাও হাদিসে বিভিন্নভাবে বর্ণিত আছে। নিম্নে দুটি হাদিস উল্লেখ করছি-
আবু মাসউদ আনসারি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা একদিন সাদ বিন উবাদা'র মাজলিসে বসে ছিলাম। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মাঝে আগমন করলেন। বাশির বিন সাদ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ, আল্লাহ্ তায়ালা আমাদেরকে আপনার ওপর দরূদ পাঠ করার আদেশ দিয়েছেন। আমরা কীভাবে আপনার ওপর দরূদ পড়বো?
আবু মাসউদ বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুপ থাকলেন। এমনকি আমরা আফসোস করতে লাগলাম যে, সে যদি এই প্রশ্ন না করতো! এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
'তোমরা এভাবে বলবেঃ আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ, ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহিম, ওয়া আলা আ-লি ইবরাহিম। ওয়া বা-রিক আলা মুহাম্মাদ, ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা ইবরাহিমা ফিল আলামিন, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।' [৮]
আর সালাম কীভাবে দিতে হয় তা তো তোমরা ইতিমধ্যে জেনেছ'।
কাব বিন উজরা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আল্লাহ্ তায়ালা আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে আপনার ওপর সালাম পেশ করবো। কিন্তু আপনার ও আপনার পরিবারের ওপর দরূদ কীভাবে পাঠ করবো? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা বলবে—
আল্লাহুম্মা সল্লি আলা মুহাম্মাদ, ওয়ালা আলী মুহাম্মাদ, কামা সল্লাইতা আলা ইবরাহিম, ওয়ালা আ-লি ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদ, ওয়ালা আ-লি মুহাম্মাদ, কামা বারাকাতা আলা ইবরাহিম, ওয়ালা আ-লি ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ'। [৯]
এছাড়াও বিভিন্ন হাদিসে দরুদের অনেক ধরণ রয়েছে। আগ্রহী পাঠক হাদিস ভাণ্ডারে খুঁজলেই অনায়াসে পেয়ে যাবেন।

টিকাঃ
[১] সহিহ মুসলিম ৩৮৪
[২] সুরা আনআম ১৬০
[৩] জামে সগির, সুয়ুতি ৮৬৬১; সহিহ নাসাঈ ১২৯৬
[৪] জামে তিরমিজি ৩৫৪৬
[৫] সুনান, নাসাঈ ১২৮২; মিশকাতুল মাসাবিহ ৯২৪
[৬] জামে তিরমিজি ৪৮৪
[৭] সুনান, নাসাঈ ১৩৭৪; আবু দাউদ ১০৪৭
[৮] সুনান, নাসাঈ ১৩৭৪; আবু দাউদ ১০৪৭
[৯] সুনান, নাসাঈ ১৩৭৪; আবু দাউদ ১০৪৭

📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব > 📄 কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদের সালাত

📄 কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদের সালাত


আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় নবীর প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন—
إِنَّ رَبَّكَ يَعْلَمُ أَنَّكَ تَقُوْمُ أَدْنَى مِنْ ثُلُثَيِ الَّيْلِ وَنِصْفَهِ وَ ثُلُثَه
'আপনার রব জানেন যে, আপনি কখনো রাতের প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগ, কখনো অর্ধেক এবং কখনো তিন ভাগের এক ভাগ জেগে থাকেন' (ইবাদত করেন)। [১]
অন্যত্র আল্লাহ্ তায়ালা নিজ বান্দাদের কিছু গুণাবলী উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন-
وَ الَّذِينَ يَبِيْتُوْنَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَ قِيَامًا
'আর যারা তাদের প্রভুর উদ্যেশ্যে সিজদারত এবং দণ্ডায়মান অবস্থায় রাত কাটায়। [২]
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'ফরজ নামাযগুলোর পর সবচেয়ে উত্তম নামায হলো কিয়ামুল লাইল।
আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইশার নামায থেকে ফারেগ হয়ে ফজর নামাযের মধ্যবর্তী সময়ে এগারো রাকাত নামায আদায় করতেন। প্রতি দুই রাকাতে সালাম ফেরাতেন এবং সর্বশেষে এক রাকাত দিয়ে বেজোড় করে নিতেন'। [৩]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এক লোকের কথা আলোচনা করা হলো, যে সকাল হওয়া পর্যন্ত ঘুমাত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললে-
'এই লোকের কানে শয়তান পেশাব করে দিয়েছে'। [৪]
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'তোমাদের কেউ ঘুমিয়ে গেলে শয়তান তার ঘাড়ের পশ্চাদংশে তিনটি গিঠ দেয়। প্রতি গিঁটে সে এই বলে চাপড়ায় যে, তোমার সামনে দীর্ঘ রাত রয়েছে, সুতরাং তুমি শুয়ে থাকো। অতঃপর যদি সে জাগ্রত হয় এবং আল্লাহেক স্মরণ করে, তাহলে একটি গিঠ খুলে যায়। যদি অজু করে, আরও একটি গিঠ খুলে যায়। যদি নামায আদায় করে, তাহলে শেষ গিঁঠটিও খুলে যায়। ফলে সে উৎফুল্ল এবং নির্মল অন্তর নিয়ে সকালে পদার্পণ করে। অন্যথায় অলস এবং কপট হৃদয় নিয়ে সকালে পদার্পণ করে। [৫]
সকলে যখন ঘুমের কোলে নিশ্চিন্ত ঢলে পড়তো, ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু তখন নামাযে দাঁড়াতেন। ভোর পর্যন্ত তাঁর থেকে মৌমাছির মতো গুঞ্জন শোনা যেত।
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ তাহাজ্জুদ গুজরাণ সবার চেয়ে উজ্জ্বল চেহারার অধিকারী হয় কেন? তিনি বললেন, 'কারণ তাঁরা আল্লাহ্ তায়ালার সাথে নিভৃতে অবস্থান করে। আল্লাহ্ তায়ালা তাদেরকে নিজ নূর থেকে একটি নূর দিয়ে আলোকিত করে দিয়েছেন'।
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ আরও বলেছেন—'মানুষ গুনাহ করতে করতে এক পর্যায়ে কিয়ামুল লাইল থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়'।
এক লোক একজন আল্লাহওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলো—আমি তাহাজ্জুদ নামায আদায় করতে পারি না। আমাকে কোনো প্রতিষেধক দিন। তিনি বললেন, 'দিনের বেলা তাঁর অবাধ্যতা করো না, তাহলে তিনি রাতের বেলা তোমাকে তাঁর সামনে দণ্ডায়মান করবেন'।
সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, 'আমি একটি গুনাহের কারণে পাঁচ মাস তাহাজ্জুদ নামায থেকে বঞ্চিত ছিলাম'।
আবু সুলাইমান রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'ফুর্তিবাজ মানুষ নিজেদের প্রমোদে যে পরিমাণ মস্তিতে থাকে, রাতের ইবাদতকারীগণ নিশিতে তাদের চেয়ে অধিক মস্তিতে থাকে; যদি রাত না থাকতো, তাহলে আমি দুনিয়ায় অবশিষ্ট থাকাকে পছন্দ করতাম না'।
ইবনে মুনকাদির রহিমাহুল্লাহ বলেছেন—'দুনিয়ার মধ্যে তিনটি মাত্র আনন্দ অসমাপ্ত রয়েছেঃ কিয়ামুল লাইল, বন্ধুদের সাক্ষাৎ এবং জামাআতের নামায'।

টিকাঃ
[১] সুরা মুজ্জাম্মিল ২০
[২] সুরা আল ফুরকানব ৬৪
[৩] সহিহ মুসলিম ১৬০৩
[৪] সহিহ বুখারি ১১৪৪
[৫] সহিহ বুখারি ১১৪২

📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব > 📄 দুনিয়াবিমুখতা ও তার তুচ্ছতার বর্ণনা

📄 দুনিয়াবিমুখতা ও তার তুচ্ছতার বর্ণনা


সাহল বিন সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাকে এমন একটি কাজের কথা বলুন, যা করলে আল্লাহও আমাকে ভালবাসবেন, মানুষের কাছেও আমি পছন্দের পাত্র হতে পারবো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—
'দুনিয়া থেকে বিমুখ হও, আল্লাহ্ তোমাকে ভালবাসবেন। মানুষের কাছে যা আছে, তা থেকে নিবৃত্ত হও, মানুষ তোমাকে ভালবাসবে'।[১]
আল্লাহ্ তায়ালা দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত মানুষদের পছন্দ করেন, উক্ত হাদিস থেকে এই কথাই প্রতীয়মান হয়।
সুফিয়ানে কেরাম বলেন-'আল্লাহর ভালোবাসা যেমন সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্তর, তেমনি দুনিয়াবিমুখতা সবচেয়ে উত্তম অবস্থা হিসেবে পরিগণিত'।
দুনিয়াবিমুখতার আরবি শব্দ হলো 'যুহদ'। অর্থ হলো—কোনো জিনিষ থেকে আকর্ষণ সরিয়ে তার চেয়ে উত্তম কোনো জিনিষের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া। তখন এমন একটি অবস্থা সৃষ্টি হয় যে, ত্যাগকৃত জিনিষ ত্যাগকারীর দৃষ্টিতে গৃহীত জিনিষের তুলনায় তুচ্ছ এবং নগণ্য হিসেবে দেখা দেয়। সুতরাং যে ব্যক্তি এই কথা অনুধাবন করতে পারবে যে, আল্লাহ্ তায়ালার কাছে যা আছে, তা চিরস্থায়ী; আখিরাত স্থিতিশীল এবং উত্তম, সে বিশ্বাস করবে যে, দুনিয়া হলো সূর্য কিরণে রাখা বরফের ন্যায়, অস্থায়ী এবং ক্রমনিঃসৃত। আর আখিরাত হলো মণি-জহরতের ন্যায়, স্থিতিশীল এবং স্থায়ী। এমন লোককেই বলা হয় 'যাহিদ' তথা দুনিয়াবিমুখ।
উপরোক্ত বিশ্বাস যার অন্তরে যত দৃঢ় হবে, দুনিয়া ও আখিরাতের পার্থক্য রেখা যার মনে যত বদ্ধমূল হবে, তার দুনিয়া বিক্রি করে, বর্জন করে আখিরাতে নিবিষ্ট হওয়া এবং তা অর্জন করার প্রতি ব্যগ্রতা হবে তেমনি প্রচন্ড অনড়। কুরআনে কারিম দুনিয়া বিমুখতা এবং আখিরাতের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার অনেক প্রশংসা করেছে। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
بَلْ تُؤْثِرُوْنَ الْحَيُوةَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى
'বরং তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দাও। অথচ আখিরাত হলো উত্তম এবং স্থায়ী'। [২]
অন্যত্র বলেন-
تُرِيدُوْنَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللَّهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ
'তোমরা দুনিয়ার সম্পদ কামনা করো; আর আল্লাহ্ তায়ালা (তোমাদের জন্য) চান আখিরাত'। [৩]
আরও বলেন-
وَ فَرِحُوا بِالْحَيُوةِ الدُّنْيَا وَ مَا الْحَيُوةُ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا مَتَاعٌ
'তারা দুনিয়ার জীবন নিয়ে আনন্দিত; অথচ দুনিয়ার জীবন আখিরাতের তুলনায় ক্ষণিকের ভোগ মাত্র'। [৪]
দুনিয়ার নিন্দা করে এবং আল্লাহ্ তায়ালার কাছে এর তুচ্ছতা বর্ণনা করে এমন হাদিসের সংখ্যা প্রচুর। নিম্নে কিছু তুলে ধরা হলো—
জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাজার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তার দুপাশে আরও অনেক লোক ছিল। এমন সময় তিনি ছোট কান বিশিষ্ট মৃত একটি ছাগল ছানার পাস দিয়ে অতিক্রম করলেন। তিনি তা নিজ হাতে উঠিয়ে নিলেন এবং তার কান ধরে বললেন, তোমাদের মধ্যে কে এটাকে এক দিরহামে নিতে ইচ্ছুক? লোকেরা বলল, কোনো জিনিষের বিনিময়ে আমরা এটা নিতে ইচ্ছুক না। তাছাড়া আমরা এটা দিয়ে করব কি? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা কি পছন্দ করো যে, এটা তোমাদের হোক? তারা বলল, আল্লাহর শপথ, সে যদি জীবিতও থাকতো, তবুও তার মাঝে ত্রুটি দেখা হতো যে, তার কান ছোট। এখন তো সে মৃত! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—
আল্লাহর শপথ, এই ছাগল ছানা তোমাদের নিকট যতটা তুচ্ছ, আল্লাহ্ তায়ালার নিকট তার চেয়েও তুচ্ছ হলো দুনিয়া। [৫]
মুসতাওরিদ বিন শাদ্দাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
'আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া এতোটুকু, যেমন তোমাদের কেউ সমুদ্রের পানিতে তার একটি আঙ্গুল ডুবিয়ে তুলে আনল। সে দেখুক তার আঙ্গুল কতটুকু পানি নিয়ে ফিরে এসেছে'। [৬]
সাহল বিন সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন—
'দুনিয়া যদি আল্লাহ্ তায়ালার কাছে মাছির একটি ডানা পরিমাণ সমমূল্যের হতো, তাহলে একজন কাফেরকেও সেখান থেকে এক ঢোঁক পানি পান করাতেন না'। [৭]

টিকাঃ
[১] ইবনে মাজাহ ৪১০২; রিয়াদুস সালিহিন ৪৭৫
[২] সুরা আ'লা ১৬-১৭
[৩] সুরা আনফাল ৬৭
[৪] সুরা রাদ ২৬
[৫] সহিহ মুসলিম ২৯৫৭
[৬] জামে তিরমিজি ২৩২৩; ইবনে মাজাহ ৪১০৮
[৭] জামে তিরমিজি ২৩২০

📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব > 📄 নফসের প্রকারভেদ

📄 নফসের প্রকারভেদ


আল্লাহওয়ালা আধ্যাত্মিক বুজুর্গগণ এ ব্যাপারে একমত যে, কলব এবং আল্লাহর মাঝে মেলবন্ধন সৃষ্টি করার পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হলো নফস। নফসকে ধরাশায়ী করা, তার ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করা এবং তার বিরোধিতা করে তাকে পরিত্যজ্য করার পরই আল্লাহ্ পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব।
এক্ষেত্রে মানুষ দুই প্রকার। এক প্রকার মানুষ, তাদের নফস তাদের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করে নেয় এবং তাকে ধ্বংসের খাদে নিক্ষেপ করে। ফলে তারা নফসের হাতে অসহায় বন্দীতে পরিণত হয়। আরেক দল মানুষ, তারা নিজেদের নফসের ওপর কর্তৃত্ব লাভ করে এবং তাকে ভূপাতিত করে। ফলে নফস তার বাধ্য অনুগত দাসে পরিণত হয়।
জনৈক সালাফ বলেছেন, আত্মশুদ্ধির পথ অনুসারীদের সফর শেষ হয় নিজেদের নফসের ওপর বিজয় লাভ করার মাধ্যমে। যদি নফসের ওপর বিজয় লাভ করতে পারে, তাহলে সে সফল এবং কামিয়াব। আর যদি নফস তার ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করে নেয়, তাহলে সে ক্ষতিগ্রস্ত এবং ধ্বংস। আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন-
فَأَمَّا مَنْ طَغَى وَأَثَرَ الْحَيُوةَ الدُّنْيَا فَإِنَّ الْجَحِيمَ هِيَ الْمَأْوَى وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
'যে সীমালঙ্ঘন করেছে এবং পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। পক্ষান্তরে যে তার প্রভুর সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে এবং নফসের কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে, তার বাসস্থান হবে জান্নাত'। ১।
নফস, ব্যক্তিকে সীমালঙ্ঘন এবং দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। আর আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর বান্দাদের ডাকেন, তার ভয় এবং নফসকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখার দিকে। কলব উভয় আহ্বানকারীর মাঝখানে অবস্থান করে। একবার সে নফসের দিকে ঝুঁকে যায়, আরেকবার রবের দিকে আকৃষ্ট হয়। এই স্থানটিই হলো সবচেয়ে কঠিন এবং বিপর্যয়কর।
আল্লাহ্ তায়ালা কুরআনে নফসের তিনটি বিশেষণ উল্লেখ করেছেনঃ মুতমাইন্নাহ তথা প্রশান্ত। লাওয়ামা তথা নিন্দুক। আম্মারা বিস সু' তথা কুমন্ত্রণা দাতা।
নফসে মুতমাইল্লাহ
যখন নফস আল্লাহ্ তায়ালার দিকে আকৃষ্ট হয়, তাঁর জিকিরে প্রশান্তি লাভ করে, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তাঁর সাক্ষাতের জন্য উদগ্রীব হয় এবং তাঁর নৈকট্য কামনা করে, তখন তা মুতমাইন্নায় পরিণত হয়। এই নফসকে মৃত্যুর সময় বলা হবেঃ 'হে প্রশান্ত আত্মা, সন্তুষ্ট এবং সন্তোষভাজন হয়ে তোমার রবের দিকে ফিরে এসো'।।২।
ইবনে আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'মুতমাইন্নাহ মানে হলো সত্যায়িত'।
কাতাদা রহিমাহুল্লাহ বলেন—'মুতমাইন্নাহ হলো ওই মুমিন যার অন্তর আল্লাহ্ তায়ালার প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থাশীল। ওই ব্যক্তি তার রবের নাম ও গুণাবলী এবং তিনি নিজের ব্যাপারে ও তাঁর রাসুলের ব্যাপারে যে সংবাদ দিয়েছেন সেগুলোর প্রতি প্রশান্ত বিশ্বাসী। মৃত্যু-পরবর্তী কবর জগতের জীবন সম্পর্কে এবং তারও পর কিয়ামতের অবস্থা সম্পর্কে তিনি যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন সেগুলোর ওপর সে স্থির বিশ্বাস স্থাপন করে, কেমন যেন সে স্বচক্ষে তা প্রত্যক্ষ্য করেছে। অতঃপর আল্লাহ্ তায়ালার নির্ধারণের ওপর অটল বিশ্বাস আরোপণ করে এবং তা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়। কখনও বিরাগভাজন হয় না, কোনো অভিযোগ করে না এবং তাঁর ঈমানেও কোনো চিড় ধরতে দেয় না। ফলে যা হাতছাড়া হয়ে যায় বা যা অপ্রাপ্য থেকে যায় তার জন্য নিরাশ হয় না এবং যা কিছু সে পেয়েছে তা নিয়ে অধিক উল্লসিত আনন্দিতও হয় না। কেননা সমস্ত মসিবত তার কাছে আসার আগে, তার সৃষ্টিরও পূর্বে, নির্ধারিত করে রাখা হয়েছে। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَ مَنْ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَه
'তারা যেই মুসীবতের সম্মুখীন হোক না কেন, তা আল্লাহরই আদেশে। আর যে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবে, তিনি তার অন্তরকে সঠিক পথের দিশা দান করবেন'।।৩।
উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় একাধিক সালাফ বলেন- 'এখানে ওই বান্দার কথা বলা হয়েছে, যার ওপর কোনো মসিবত আপতিত হয় এবং সে বিশ্বাস করে যে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। তাই সে তাতে সন্তুষ্ট থাকে এবং নিজের রবের কাছে আত্মসমর্পণ করে'।
সর্বোচ্চ পর্যায়ের ইতমিনান তথা প্রশান্তি হলো, বাধ্য অনুগত একনিষ্ঠ এবং সতর্কতার সহিত আল্লাহ্ তায়ালার আদেশ পালন করা। তাঁর আদেশের সামনে কোনো ইচ্ছা, প্রবৃত্তি, সংস্কৃতি কিংবা প্রথাকে প্রাধান্য না দেওয়া। তাঁর সংবাদবিরোধী কোনো সংশয় অন্তরে না রাখা। তাঁর আদেশবিরোধী কোনো কামনায় না জড়ানো। বরং কখনো যদি এসব বান্দার অন্তরে উদয় হয়, তাহলে সে এগুলোকে কুমন্ত্রণা আখ্যায়িত করবে, এগুলো গ্রহণ করার চেয়ে আকাশ থেকে জমিনে ভূপাতিত হওয়া তার কাছে অধিক প্রিয় হবে। অনুরূপ গুনাহের অস্থিরতা এবং বিরক্তি থেকে তাওবার প্রশান্তি এবং সুস্থিরতার দিকে ধেয়ে আসবে। কেউ এমন পর্যায়ে পৌঁছতে পারলে তার ক্ষেত্রে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই কথা প্রয়োগ হবে, 'এটাই স্পষ্ট ঈমান'।
যখন কোনো বান্দা সংশয় থেকে বিশ্বাসে, মূর্খতা থেকে জ্ঞানে, উদাসীনতা থেকে আল্লাহর স্মরনে, বিশ্বাসঘাতকতা থেকে তাওবার দিকে, দেখানোপনা থেকে ইখলাস ও একনিষ্ঠতার দিকে, মিথ্যা থেকে সত্যের দিকে, অক্ষমতা থেকে বিচক্ষণতার দিকে, আত্মঅহমিকার দাপট থেকে বাধ্যতার বশ্যতায় এবং ঔদ্ধত্য থেকে বিনয়ের দিকে প্রত্যাবর্তন করবে, আশ্রয় নেবে এবং বাসস্থান গড়ে তুলবে, তখন তার নফস নফসে মুতমাইন্নাহ বলে পরিগণিত হবে।
আর এসব কিছুর মূল হলো, মনোযোগ এবং সতর্কতা। এদুইয়ের মাধ্যমে তার অন্তর থেকে উদাসীনতার তন্দ্রা দূর হয়ে যাবে এবং তার জন্য জান্নাতের অট্টালিকা উজ্জ্বল করে দেবে। তখন সে চিৎকার করে বলবেঃ হে আমার নফস, রাতের এই অমানিশায় তোমার প্রচেষ্টায় আমাকে একটু সহযোগিতা করো; তাহলে কিয়ামতের দিন ওই সমস্ত সুউচ্চ প্রাসাদে আরামের জীবন লাভ করতে পারবে।
সতর্কতার আলোয় সে দেখতে পাবে তার জন্য যা কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে সব। অনুধাবন করতে পারবে মৃত্যু থেকে চিরস্থির জান্নাতে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত তার সাথে কী ব্যবহার করা হবে। দুনিয়ার ত্বরিত ক্ষয়, অধিবাসীদের প্রতি তার অবিশ্বস্ততা এবং প্রেমিকদের জন্য তার ঘাতকমূর্তি অনুভব করতে পারবে। উক্ত আলোয় সে উপলব্ধি করবে ওই ব্যক্তির কথা যে বলবেঃ 'হায় আফসোস, আল্লাহর প্রতি কর্তব্য পালনে অবহেলা করেছি!' [৪]
তখন সে বাকি জীবন বিগত জীবনের প্রায়শ্চিত্ত করতে ব্যয় করবে, যে জীবন সে নিষ্প্রাণ কাটিয়ে দিয়েছে সেখানে ফিরিয়ে আনবে প্রাণের সতেজতা, যত ভুল সে করেছে তার জন্য হবে অনুতপ্ত, যে সময়টুকু অবশিষ্ট আছে তাকে যথার্থ কাজে লাগাবে; এই সময়টুকু যদি বেহাত হয়ে যায়, তাহলে সমস্ত কল্যাণ থেকে সে বঞ্চিত হবে, এই অনুভূতি তার অন্তরে জাগরিত হবে।
সতর্কর্তা ও মননিবেশের প্রদীপ থেকে এবং তার ওপর তার রবের নিয়ামতের আলোক থেকে সে প্রত্যক্ষ্য করবে যে, সে তার রবের নিয়ামতসমূহ গণনা করে শেষ করার সক্ষমতা রাখে না; সেগুলোর পরিপূর্ণ হক আদায় করতে অক্ষম। উক্ত আলোয় সে নিজের নফসের দোষ-ত্রুটি, আমলের ঘাটতি, কৃত গুনাহ ও অপরাধ, অনেক হক ও কর্তব্য আদায় করা থেকে অনীহা ইত্যাদি স্পষ্ট দেখতে পাবে। তখন তার অন্তর নত হবে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হবে নম্র। ফলে সে নিজের দোষ ত্রুটি গুনাহ অপরাধ হিসেব করত তার রবের নিয়ামতের বারিধারা দেখে তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করবে অবনত মস্তকে।
উক্ত প্রদীপশিখায় সে দেখতে পাবে, তার সময় খুবই মূল্যবান এবং ভয়ানক। এটাই তার সৌভাগ্যের একমাত্র মূলধন। তখন থেকেই সে আল্লাহর অবাধ্যতায় তা ব্যয় করতে কুণ্ঠাবোধ করবে; কেননা তার এই সুমতি অর্জন হয়ে গিয়েছে যে, যদি সময় বিনষ্ট হয়, তাহলে সে ক্ষতি এবং পরিতাপের সম্মুখীন হবে। আর যদি সে তা কাজে লাগায়, তাহলে সে পাবে শান্তি ও সৌভাগ্যের পায়রার দেখা।
এসবই হলো সতর্কতা, মনোযোগ এবং অভিনিবেশের ফল ও প্রভাব। এটাই হলো নফসে মুতমাইন্নাহ'র প্রথম স্তর; এখান থেকেই আল্লাহ্ এবং পরকালের পথের যাত্রা শুরু হয়।
নফসে লাওয়ামা
একদল উলামায়ে কেরাম বলেন, 'নফসে লাওয়ামা হলো ওই নফস যা কখনো এক অবস্থার ওপর স্থির থাকে না। তার রয়েছে বিচিত্র রং ও ঢং। কখনো সে মনযোগী হয়, আবার কখনো হয়ে যায় উদাসীন। উপেক্ষা করে আবার আত্মনিয়োগ করে। ভালোবাসে আবার ঘৃণা করে। খুশি হয় আবার দুঃখিত হয়। সন্তুষ্ট হয় আবার ক্রোধান্বিত হয় এবং অনুসরণ করে আবার বিরত থাকে ইত্যাদি এসব তার গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য'।
আরেকদল উলামায়ে কেরাম বলেন, 'এটা মুমিনের অন্তর'। হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'তুমি মুমিন ব্যক্তিকে দেখবে সর্বদা নিজের নফসকে তিরস্কার করছে। সে বলে, আমি এমনটা চাই নি, আমি কেন এমনটা করলাম, এটা তো ওটার চেয়ে ভালো ছিল ইত্যাদি'।
আরও একদল বলেন, 'লাওম হলো কিয়ামত দিবস। কেননা ওই দিন যারা অন্যায় করেছে কিংবা কর্তব্য পালনে ত্রুটি করেছে তারা সকলেই নিজেকে তিরস্কার করবে'।
উলামায়ে কেরামের উপরোক্ত বিভিন্ন বক্তব্য উল্লেখ করত আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'উক্ত সমস্ত মতই সঠিক। নফসে লাওয়ামা দুই প্রকারঃ নিন্দিত লাওয়ামা এবং অনিন্দিত লাওয়ামা'।
নিন্দিত লাওয়ামা
'নিন্দিত নফসে লাওয়ামা হলো ওই নফস, যা মূর্খ এবং জালেম। আল্লাহ্ এবং ফেরেশতাগণ এই নফসের নিন্দা করেছেন'।
অনিন্দিত লাওয়ামা
'এটা হলো ওই নফস, যা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর ইবাদতে ত্রুটি করার কারণে অবিচ্ছিন্নভাবে তার ধারককে তিরস্কার করতে থাকে। এই নফস নিন্দিত না। বরং যার নফস তাকে আল্লাহ্ তায়ালার ইবাদত না করার জন্য তিরস্কার করে, তাঁর সন্তুষ্টির পথে অন্যের নিন্দা সহ্য করে এবং আল্লাহ্ তায়ালার জন্য কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া না করে, তার নফসই তো হলো সর্বশ্রেষ্ঠ নফস এবং এই নফস আল্লাহ্ তায়ালার তিরস্কার ও নিন্দা থেকে নিরাপদ। পক্ষান্তরে যে নফস তার ধারকের কার্যক্রম নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে, তাকে তিরস্কার না করে এবং আল্লাহর জন্য কোনো নিন্দা সহ্য না করে, এই নফস আল্লাহ্ তায়ালার নিন্দা ও তিরস্কারের পাত্র।
নফসে আম্মারা বিম মু'
এই নফস সমস্ত অন্যায় ও অশুভ কাজের মন্ত্রণা দেয়। এটাই তার তবিয়ত। আল্লাহ্ তায়ালার তাওফিক ব্যতীত কেউ তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকতে পারে না। এই নফসই হলো চূড়ান্ত পর্যায়ের নিন্দিত এবং কলঙ্কিত। ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনায় আজিজের স্ত্রীর আলোচনা করতে গিয়ে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন—
وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةُ بِالسُّوْءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ
'আমি আমার নফসকে দোষমুক্ত বলি না। নফস তো কুমন্ত্রণা দিয়েই থাকে। তবে আমার প্রভু অনুগ্রহ করলে তা ভিন্ন কথা। নিশ্চয়ই আমার প্রভু ক্ষমাশীল, দয়ালু। [৫]
অন্যত্র বলেন—
'তোমাদের ওপর যদি আল্লাহ্ তায়ালার দয়া ও অনুগ্রহ না থাকতো, তাহলে তোমাদের কেউ কখনো পবিত্র থাকতে পারতো না'। [৬]
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে প্রয়োজন পূরণের খোতবা শিক্ষা দিতে গিয়ে এভাবে বলেছেন—
'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্ তায়ালার। আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি, তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর কাছেই আমাদের নফসের অনিষ্ট এবং মন্দ কাজের অনিষ্ট থেকে পানাহ চাই'। [৭]
মন্দ ও অনিষ্ট নফসের অভ্যন্তরে প্রোথিত। তার কারনেই মন্দ ও খারাপ কাজ সম্পাদিত হয়। আল্লাহ্ তায়ালা যদি বান্দাকে তার নফসের হাতে ছেড়ে দেন, সে তার অনিষ্ট এবং মন্দ কাজের কারণে হালাক হয়ে যাবে। আর যদি আল্লাহ্ তায়ালা তাকে সক্ষমতা দান করেন এবং সহযোগিতা করেন, তাহলে সে সব ধরণের অনিষ্ট থেকে মুক্ত থাকতে পারবে। আমরা আল্লাহ্ তায়ালার কাছে আমাদের নফস এবং মন্দ ও গুনাহের কাজের অনিষ্ট থেকে পানাহ ভিক্ষা চাই।
তো চূড়ান্ত কথা হলোঃ মানুষের শরীরে নফস একটাই। কখনো তা আম্মারা হয়, লাওয়ামা হয় কখনো, আবার কখনো মুতমাইন্না হয়।
নফসে মুতমাইন্নাহ'র সহচর থাকেন একজন ফেরেশতা। তিনি তাকে সঠিক দিশা দেখান। তার মাঝে হকের আলো নিক্ষেপ করেন। তাকে সত্যের দিকে উৎসাহিত করেন। তাকে সত্যের সুন্দর সমুজ্জ্বল চেহারা প্রদর্শন করান। বাতিল থেকে তাকে বিরত রাখেন। অন্যায় থেকে নিবৃত্ত রাখেন এবং গুনাহের কুৎসিত রূপ প্রত্যক্ষ্য করান। মোটকথা, আল্লাহ্ তায়ালার জন্য এবং আল্লাহ্ তায়ালার সাথে সম্পৃক্ত যাবতীয় জিনিষ নফসে মুতমাইন্নাহ থেকে উৎপাদিত হয়।
পক্ষান্তরে নফসে আম্মারার দোসর হয় শয়তান। সে তার সঙ্গ দেয়। তাকে প্রতিশ্রুতি দেয়। আশা ভরসা দেয়। তার মাঝে বাতিল ও মিথ্যা ঢেলে দেয়। তাকে অন্যায় ও মন্দ কাজের আদেশ ও মন্ত্রণা দেয়। মন্দকে তার সামনে সুশোভিত করে তুলে ধরে। তাকে দীর্ঘ আশা দেয়। তার সামনে বাতিলকে এতো সুন্দর রূপে প্রস্ফুটিত করে যে, সে তা গ্রহণ করে এবং সুন্দর মনে করতে থাকে।
নফসে মুতমাইন্না এবং তার সহচর ফেরেশতা ব্যক্তি থেকে নিম্নোক্ত সমস্ত জিনিষের দাবি জানায়ঃ আল্লাহ্ তায়ালার একত্ব, দাসত্ব, সততা, খোদাভীতি, আল্লাহ-নির্ভরতা, তাওবা, প্রত্যাবর্তন, আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করা, দুনিয়ার বুকে আশা স্বল্প রাখা, মৃত্যু এবং তার পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুতি।
অন্যদিকে শয়তান এবং তার কাফের মুনাফিক সাঙ্গপাঙ্গরা নফসে আম্মারার কাছে এর বিপরীত জিনিষগুলো দাবি করে।
নফসে মুতমাইন্নার জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো নিজের আমলকে শয়তান থেকে মুক্ত করা এবং নফসে আম্মারা থেকে দূর রাখা। যদি উভয়কে ভেদ করে কোনো একটি আমল আল্লাহ্ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, তাহলে তা বান্দার মুক্তির জন্য যথেষ্ট। কিন্তু নফসে আম্মারা এবং শয়তান দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে নিয়েছে, আল্লাহ্ পর্যন্ত একটি খালেস আমল পৌঁছতে দেবে না। এজন্যই জনৈক আল্লাহওয়ালা বলতেন, 'আমি যদি জানতে পারতাম যে, আমার একটি ইবাদত আল্লাহ্ তায়ালা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, তাহলে মুসাফির তার পরিবারে ফিরে আসলে যে পরিমাণ আনন্দ লাভ হয়, তার চেয়ে বেশি আনন্দিত হতাম মৃত্যুর জন্য।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি যদি জানতাম যে, আল্লাহ্ তায়ালা আমার একটি সাজদা কবুল করেছেন, তাহলে মৃত্যু আমার কাছে অধিক প্রিয় হতো, প্রবাসীর নীড়ে ফিরে আসা থেকে'।
কখনো নফসে আম্মারা সরাসরি নফসে মুতমাইন্নার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। ফলে নফসে মুতমাইন্না কোনো কল্যাণকর বিষয় উত্থাপন করলেই আম্মারা এসে তার প্রতিপক্ষ হয় এবং তার ভালো কাজের বিকৃত ব্যাখ্যা পেশ করে। যেমন জিহাদের আলোচনা আনলে আম্মারা বলবে, এটা তো প্রকারান্তরে নিজেকে হত্যার মুখে ঠেলে দেওয়া, স্ত্রীকে বিধবা করা, সন্তানদের এতিম করা এবং ধন সম্পদ নষ্ট করার নাম। তদ্রূপ যাকাত ও দানসদকার বাস্তবতা তুলে ধরবে সম্পদ অকাজে ব্যয় হয়ে হ্রাস হয়ে যাওয়া, নিজের সম্পদ ফুরিয়ে গেলে মানুষের কাছে হাত পাতা এবং ফকির মিসকিন অসহায়দের কাতারে নাম লিখাতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি অবান্তর যুক্তি দিয়ে। কাজেই আমার নফস কোন প্রকারের অন্তর্ভুক্ত, আমি তার গোলাম না সে আমার গোলাম, আমাকে সে কোন পথে পরিচালিত করছে এসব বিষয়ের প্রতি সদা সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

টিকাঃ
১১। সুরা নাজিয়াত ৩৭-৪০
১২। সুরা ফাজর ২৭-২৮
[৩] সুরা তাগাবুন ১১
[৪] সূরা যুমার ৫৬
[৫] সুরা ইউসুফ ৫৩
[৬] সুরা নূর ২১
[৭] সুনান ইবনে মাজাহ ১৮৯২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00