📄 ইস্তিগফার
ইস্তিগফারের শাব্দিক অর্থ ক্ষমা প্রার্থনা করা। ক্ষমা প্রার্থনা করার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, গুনাহ গোপন করত তার অভিশাপ ও আজাব থেকে নিরাপত্তা এবং রক্ষা করার আবেদন করা। কুরআনে কারিমে ইস্তিগফারের আলোচনা এসেছে অনেক বার। কখনো আল্লাহ্ তায়ালা আদেশ দিয়ে বলেছেন-
'তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তায়ালা ক্ষমাশীল এবং দয়াবান।' [১]
আবার কখনো ইস্তিগফারকারীদের প্রশংসা করেছেন। যেমন আল্লাহ্ তায়ালা প্রশংসিত বান্দাদের ফিরিস্তি উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন-
'এবং শেষ রাতে ক্ষমা প্রার্থনাকারী।' [২]
যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
‘যে কোনো মন্দ কাজ করে কিংবা নিজের ওপর জুলুম করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহেক ক্ষমাশীল এবং দয়াবান পাবে’। [৩]
আবার অনেক স্থানে ইস্তিগফারকে তাওবার সাথে যুক্ত করে উল্লেখ করেছেন। তখন ইস্তিগফারের অর্থ হবে মুখে ক্ষমা প্রার্থনা করা। অন্তর যুগপৎ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্বারা গুনাহ পরিহার করা, এরই নাম তাওবা。
ইস্তিগফারের হুকুম এবং দোয়ার হুকুম অভিন্ন। অর্থাৎ আল্লাহ্ তায়ালা চাইলে তার আবেদন রক্ষা করে তাদের ক্ষমা করে দেবেন। বিশেষত যখন গুনাহের ভারে ন্যুজ কোনো হৃদয় থেকে সে আহ্বান প্রস্ফুটিত হয় কিংবা শেষ রাত, সালাত-পরবর্তী সময় ইত্যাদি গুনাহ কবুল হওয়ার সময়গুলোতে দোয়া করা হয়, তখন আল্লাহ্ তায়ালা অধিক হারে তা গ্রহণ করেন。
লুকমান আলাইহিস সালাম তাঁর ছেলেকে সম্বোধন করে বলেছেন—‘হে আমার ছেলে, ‘আল্লাহ্ আমাকে ক্ষমা করে দিন’ এই কথা দ্বারা তোমার জিহ্বাকে অভ্যস্ত করে নাও। কেননা আল্লাহ্ তায়ালার এমন কিছু সময় আছে, যখন তিনি কোনো ভিখারিকেই খালি হাতে ফেরান না’。
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন—‘তোমরা তোমাদের ঘরে, দস্তরখানে, পথেঘাটে, বাজারে, আসরে এবং যেখানেই থাকো বেশি বেশি ইস্তিগফার করো। কেননা কখন ক্ষমা নাযিল হয় তা তোমাদের জানা নেই।’
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
‘আল্লাহর শপথ, আমি দিনে সত্তর বারের চেয়েও অধিক আল্লাহ্ তায়ালার কাছে তাওবা ইস্তিগফার করি’। [৪]
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-
‘এক বান্দা গোনাহ করে। তারপর সে বলে, হে আমার রব, আমি একটি গুনাহ করেছি, আমাকে ক্ষমা করে দিন। তখন তার রব বলেন, আমার বান্দা কি এ কথা বিশ্বাস করে যে, তার একজন রব আছে, তিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং এর কারণে শাস্তিও দেন? আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম। অতঃপর ওই বান্দা কিছুকাল আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী গুনাহ থেকে বেঁচে থেকে আবারও একটি গুনাহ করে। এরপর সে বলে, হে আমার রব, আমি আবারও গুনাহ করেছি, আমাকে ক্ষমা করে দিন। তার রব তখন বলেন, আমার বান্দা কি এ কথা বিশ্বাস যে, তার একজন রব আছেন, তিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং এর কারণে শাস্তিও দেন? আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম। অতঃপর ওই বান্দা কিছুকাল আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী গুনাহ থেকে বেঁচে থেকে আবারও একটি গুনাহ করে। এরপর সে বলে, হে আমার রব, আমি আবারও গুনাহ করেছি, আমাকে ক্ষমা করে দিন। তার রব তখন বলেন, আমার বান্দা কি এ কথা বিশ্বাস যে, তার একজন রব আছেন, তিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং এর কারণে শাস্তিও দেন? এরপর তিনি তিনবার বলেন, আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম। সে যা ইচ্ছা করুক।' [৫]
‘সে যা ইচ্ছা করুক’ অর্থাৎ যতদিন সে গুনাহ করে ইস্তিগফার করার এই অবস্থায় বহাল থাকবে, ততদিন আল্লাহ্ তায়ালা তার তাওবা কবুল করতে থাকবেন। তবে এখানে ইস্তিগফার দ্বারা এমন ইস্তিগফার উদ্দেশ্য, যার সাথে গুনাহ একেবারে পরিহার করা এবং পুনরায় না করার দৃঢ় সংকল্প থাকবে。
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন—'সুসংবাদ ওই ব্যক্তির জন্য, যে নিজ আমলনামায় প্রচুর ইস্তিগফার পাবে।'
অতএব এ কথা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, গুনাহের ঔষধ হলো ইস্তিগফার । কাতাদা রহিমাহুল্লাহ বলেন—‘এই কুরআন তোমাদেরকে তোমাদের রোগ এবং ঔষধ উভয়টি দেখিয়ে দিয়েছে। তোমাদের রোগ হলো গুনাহ। আর ঔষধ হলো ইস্তিগফার'。
আলী রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—'আল্লাহ্ তায়ালা যে বান্দাকে আজাব দিতে চান, তাকে ইস্তিগফারের তাওফিক দেন না'。
টিকাঃ
[১] সুরা বাকারা ১৯৯
[২] সুরা আলে ইমরান ১৭
[৩] সুরা নিসা ১১০
[৪] সহিহ বুখারি ৬৩০৭
[৫] সহিহ বুখারি ৭৫০৭
📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ্ তায়ালা তার ওপর দশটি রহমত নাযিল করবেন'। [১]
সমস্ত নেককাজের প্রতিদান দশগুন বৃদ্ধি পায়। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ করা তো অন্যতম মহিমান্বিত নেক কাজ। তাই একবার দরূদ পাঠ করলে দশটি রহমত পাওয়া যায়। ইবনে আরাবি রহিমাহুল্লাহ বলেন-
'যদি কেউ প্রশ্ন করে যে, আল্লাহ্ তায়ালা তো নিম্নোক্ত আয়াতে বলেই দিয়েছেন যে, 'যে ব্যক্তি একটি ভালো কাজ করবে, সে তার মতো দশটির ফল পাবে'।[২] তাহলে এই হাদিসের ভিন্ন বৈশিষ্ট্য কোথায়?'
তাহলে তার উত্তরে আমি বলব, 'অনেক বড় একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কুরআনের দাবি হলো, যে একটি ভালো কাজ করবে, তাকে দশগুণ প্রতিদান দেওয়া হবে। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ করাও যেহেতু একটি ভালো কাজ, তাহলে কুরআনের দাবি অনুযায়ী তার প্রতিদান স্বরূপ জান্নাতে দশটি স্তর উন্নীত হবে। এটি তো সাধারণ বৈশিষ্ট্য। আরও উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলোঃ যে ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ্ তায়ালা তার ওপর দশটি রহমত নাযিল করবেন। আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর বান্দার কথা স্মরণ করছেন, এর চেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য আর কী হতে পারে! আল্লাহ্ তায়ালা যেমন নিজের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, বান্দা তাঁকে স্মরণ করলে তিনিও তাকে স্মরণ করবেন। তদ্রুপ তাঁর রাসুলের স্মরনের প্রতিদানও নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, তিনিও ওই বান্দার কথা স্মরণ করবেন এবং তাঁর ওপর রহমত নাযিল করবেন'।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর একবার দরূদ পাঠ করলে তার প্রতিদান স্বরূপ দশটি রহমত নাযিল হয়- বিষয়টি এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তার জন্য আরও অনেক ফজিলত রয়েছে। নিম্নে এমন কিছু হাদিস উল্লেখ করা হলো-
আনাস বিন মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যার কাছে আমার আলোচনা করা হবে, সে যেন আমার ওপর দরূদ পাঠ করে। যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ্ তায়ালা তার ওপর দশটি রহমত নাযিল করবেন, তার দশটি গুনাহ মাফ করে দেবেন এবং তাকে দশ স্তর উন্নত করবেন'। [৩]
'যার কাছে আমার আলোচনা করা হবে, সে যেন আমার ওপর দরূদ পাঠ করে'-এখান থেকে একটি কথা প্রতীয়মান হয় যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম শুনলে দরূদ পাঠ করা একটি আদেশ। অন্য একটি হাদিসেও এমন কথা আছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'কৃপণ ওই ব্যক্তি, যার কাছে আমার আলোচনা করা হলো, আর সে আমার ওপর দরূদ পাঠ করলো না'। [৪]
ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন—
'পৃথিবীতে বিচরণকারী আল্লাহ্ তায়ালার কিছু ফেরেশতা আছেন, তাঁরা আমার উম্মতের সালাম আমার কাছে পৌঁছে দেন'। [৫]
ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
'কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটে অবস্থান করবে ওই ব্যক্তি, যে আমার ওপর অধিক দরূদ পাঠ করে'। [৬]
জুমার দিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর প্রচুর পরিমাণ দরূদ পাঠ করা মুস্তাহাব। আউস বিন আউস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
'তোমাদের সবচেয়ে উত্তম দিন হলো জুমার দিন। এই দিনে আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে, এই দিনেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে, এই দিনেই শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে এবং এই দিনেই কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে। অতএব, এই দিনে তোমরা আমার ওপর বেশি বেশি দরূদ পাঠ করো; কেননা তোমাদের দরূদ আমার কাছে পেশ করা হবে'।
সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেনঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাদের দরূদ আপনার কাছে কীভাবে পেশ করা হবে, আপনি তো ইন্তিকাল করবেন? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—'আল্লাহ্ তায়ালা জমিনের জন্য নবীদের দেহ ভক্ষণ করা হারাম করে দিয়েছেন'। [৭]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ করার শব্দচয়ন কীভাবে হবে, তাও হাদিসে বিভিন্নভাবে বর্ণিত আছে। নিম্নে দুটি হাদিস উল্লেখ করছি-
আবু মাসউদ আনসারি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা একদিন সাদ বিন উবাদা'র মাজলিসে বসে ছিলাম। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মাঝে আগমন করলেন। বাশির বিন সাদ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ, আল্লাহ্ তায়ালা আমাদেরকে আপনার ওপর দরূদ পাঠ করার আদেশ দিয়েছেন। আমরা কীভাবে আপনার ওপর দরূদ পড়বো?
আবু মাসউদ বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুপ থাকলেন। এমনকি আমরা আফসোস করতে লাগলাম যে, সে যদি এই প্রশ্ন না করতো! এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
'তোমরা এভাবে বলবেঃ আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ, ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহিম, ওয়া আলা আ-লি ইবরাহিম। ওয়া বা-রিক আলা মুহাম্মাদ, ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা ইবরাহিমা ফিল আলামিন, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।' [৮]
আর সালাম কীভাবে দিতে হয় তা তো তোমরা ইতিমধ্যে জেনেছ'।
কাব বিন উজরা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আল্লাহ্ তায়ালা আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে আপনার ওপর সালাম পেশ করবো। কিন্তু আপনার ও আপনার পরিবারের ওপর দরূদ কীভাবে পাঠ করবো? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা বলবে—
আল্লাহুম্মা সল্লি আলা মুহাম্মাদ, ওয়ালা আলী মুহাম্মাদ, কামা সল্লাইতা আলা ইবরাহিম, ওয়ালা আ-লি ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদ, ওয়ালা আ-লি মুহাম্মাদ, কামা বারাকাতা আলা ইবরাহিম, ওয়ালা আ-লি ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ'। [৯]
এছাড়াও বিভিন্ন হাদিসে দরুদের অনেক ধরণ রয়েছে। আগ্রহী পাঠক হাদিস ভাণ্ডারে খুঁজলেই অনায়াসে পেয়ে যাবেন।
টিকাঃ
[১] সহিহ মুসলিম ৩৮৪
[২] সুরা আনআম ১৬০
[৩] জামে সগির, সুয়ুতি ৮৬৬১; সহিহ নাসাঈ ১২৯৬
[৪] জামে তিরমিজি ৩৫৪৬
[৫] সুনান, নাসাঈ ১২৮২; মিশকাতুল মাসাবিহ ৯২৪
[৬] জামে তিরমিজি ৪৮৪
[৭] সুনান, নাসাঈ ১৩৭৪; আবু দাউদ ১০৪৭
[৮] সুনান, নাসাঈ ১৩৭৪; আবু দাউদ ১০৪৭
[৯] সুনান, নাসাঈ ১৩৭৪; আবু দাউদ ১০৪৭
📄 কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদের সালাত
আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় নবীর প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন—
إِنَّ رَبَّكَ يَعْلَمُ أَنَّكَ تَقُوْمُ أَدْنَى مِنْ ثُلُثَيِ الَّيْلِ وَنِصْفَهِ وَ ثُلُثَه
'আপনার রব জানেন যে, আপনি কখনো রাতের প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগ, কখনো অর্ধেক এবং কখনো তিন ভাগের এক ভাগ জেগে থাকেন' (ইবাদত করেন)। [১]
অন্যত্র আল্লাহ্ তায়ালা নিজ বান্দাদের কিছু গুণাবলী উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন-
وَ الَّذِينَ يَبِيْتُوْنَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَ قِيَامًا
'আর যারা তাদের প্রভুর উদ্যেশ্যে সিজদারত এবং দণ্ডায়মান অবস্থায় রাত কাটায়। [২]
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'ফরজ নামাযগুলোর পর সবচেয়ে উত্তম নামায হলো কিয়ামুল লাইল।
আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইশার নামায থেকে ফারেগ হয়ে ফজর নামাযের মধ্যবর্তী সময়ে এগারো রাকাত নামায আদায় করতেন। প্রতি দুই রাকাতে সালাম ফেরাতেন এবং সর্বশেষে এক রাকাত দিয়ে বেজোড় করে নিতেন'। [৩]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এক লোকের কথা আলোচনা করা হলো, যে সকাল হওয়া পর্যন্ত ঘুমাত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললে-
'এই লোকের কানে শয়তান পেশাব করে দিয়েছে'। [৪]
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'তোমাদের কেউ ঘুমিয়ে গেলে শয়তান তার ঘাড়ের পশ্চাদংশে তিনটি গিঠ দেয়। প্রতি গিঁটে সে এই বলে চাপড়ায় যে, তোমার সামনে দীর্ঘ রাত রয়েছে, সুতরাং তুমি শুয়ে থাকো। অতঃপর যদি সে জাগ্রত হয় এবং আল্লাহেক স্মরণ করে, তাহলে একটি গিঠ খুলে যায়। যদি অজু করে, আরও একটি গিঠ খুলে যায়। যদি নামায আদায় করে, তাহলে শেষ গিঁঠটিও খুলে যায়। ফলে সে উৎফুল্ল এবং নির্মল অন্তর নিয়ে সকালে পদার্পণ করে। অন্যথায় অলস এবং কপট হৃদয় নিয়ে সকালে পদার্পণ করে। [৫]
সকলে যখন ঘুমের কোলে নিশ্চিন্ত ঢলে পড়তো, ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু তখন নামাযে দাঁড়াতেন। ভোর পর্যন্ত তাঁর থেকে মৌমাছির মতো গুঞ্জন শোনা যেত।
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ তাহাজ্জুদ গুজরাণ সবার চেয়ে উজ্জ্বল চেহারার অধিকারী হয় কেন? তিনি বললেন, 'কারণ তাঁরা আল্লাহ্ তায়ালার সাথে নিভৃতে অবস্থান করে। আল্লাহ্ তায়ালা তাদেরকে নিজ নূর থেকে একটি নূর দিয়ে আলোকিত করে দিয়েছেন'।
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ আরও বলেছেন—'মানুষ গুনাহ করতে করতে এক পর্যায়ে কিয়ামুল লাইল থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়'।
এক লোক একজন আল্লাহওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলো—আমি তাহাজ্জুদ নামায আদায় করতে পারি না। আমাকে কোনো প্রতিষেধক দিন। তিনি বললেন, 'দিনের বেলা তাঁর অবাধ্যতা করো না, তাহলে তিনি রাতের বেলা তোমাকে তাঁর সামনে দণ্ডায়মান করবেন'।
সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, 'আমি একটি গুনাহের কারণে পাঁচ মাস তাহাজ্জুদ নামায থেকে বঞ্চিত ছিলাম'।
আবু সুলাইমান রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'ফুর্তিবাজ মানুষ নিজেদের প্রমোদে যে পরিমাণ মস্তিতে থাকে, রাতের ইবাদতকারীগণ নিশিতে তাদের চেয়ে অধিক মস্তিতে থাকে; যদি রাত না থাকতো, তাহলে আমি দুনিয়ায় অবশিষ্ট থাকাকে পছন্দ করতাম না'।
ইবনে মুনকাদির রহিমাহুল্লাহ বলেছেন—'দুনিয়ার মধ্যে তিনটি মাত্র আনন্দ অসমাপ্ত রয়েছেঃ কিয়ামুল লাইল, বন্ধুদের সাক্ষাৎ এবং জামাআতের নামায'।
টিকাঃ
[১] সুরা মুজ্জাম্মিল ২০
[২] সুরা আল ফুরকানব ৬৪
[৩] সহিহ মুসলিম ১৬০৩
[৪] সহিহ বুখারি ১১৪৪
[৫] সহিহ বুখারি ১১৪২
📄 শোকর বা কৃতজ্ঞতা
শোকর বলা হয়, দানকৃত কল্যাণের জন্য নেয়ামত দাতার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা।
বান্দার শোকর আদায়ের জন্য তিনটি উপাদান প্রয়োজন। এক সঙ্গে তিনটির সম্মেলন ব্যতীত শুকরিয়া আদায় করা সম্ভব নয়। এক, আন্তরিকভাবে নিয়ামতের স্বীকৃতি দেওয়া। দুই, প্রকাশ্যে তা নিয়ে আলোচনা করা এবং তৃতীয় হলো এই নিয়ামতকে আল্লাহ্ তায়ালার বাধ্যতার কাজে ব্যয় করা বা তার সহযোগিতা নেওয়া।
সুতরাং শোকরের সম্পর্ক একাদিক্রমে অন্তর, জিহ্বা এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাথে। অন্তর হলো ভালোবাসা স্বীকৃতি এবং পরিচয়ের জন্য। জিহ্বা দ্বারা প্রশংসা ও স্তুতি গাওয়া হয়। আর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে নিয়ামতকে ভালো কাজে ব্যয় করতে হয় এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে হয়। এই তিনের সম্মেলনেই শোকরের ষোল কলা পূর্ণ হয়।
আল্লাহ্ তায়ালা শোকরকে ঈমানের সাথে সংযুক্ত করে দিয়েছেন। জানিয়ে দিয়েছেন যে, বান্দা যদি তাঁর ওপর ঈমান স্থাপন করে এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে, তাহলে তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার কোনও প্রয়োজন তাঁর নেই। কুরআনে কারিমে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
مَا يَفْعَلُ اللهُ بِعَذَابِكُمْ إِنْ شَكَرْتُمْ وَأَمَنْتُمْ
'তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো ও ঈমানদার হও, তাহলে আল্লাহ্ তোমাদেরকে শাস্তি দেবেন কেন?' [১]
যারা কৃতজ্ঞ বান্দা, শোকর গোজার, তারা আল্লাহ্ তায়ালার নিয়ামত ও অনুগ্রহের জন্য বিশিষ্ট হিসেবে পরিগণিত। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন-
وَ كَذَلِكَ فَتَنَّا بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَيَقُوْلُوْا أَمْ ؤُلَاءِ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِّن بَيْنِنَا أَلَيْسَ اللَّهُ بِأَعْلَمَ بِالشَّكِرِينَ
'এভাবেই আমি কিছু লোককে কিছু লোক দ্বারা পরীক্ষায় নিপতিত করি। তারা যেন বলে যে, এরাই কি ওই সব লোক, আমাদের মধ্য থেকে যাদের প্রতি আল্লাহ্ অনুগ্রহ করেছেন? আল্লাহ্ কি কৃতজ্ঞদের সম্পর্কে সুপরিজ্ঞাত নন?' [২]
আল্লাহ্ তায়ালা বান্দাদের দুই ভাগে ভাগ করেছেন। কৃতজ্ঞ ও অকৃতজ্ঞ। অকৃতজ্ঞতা এবং অকৃতজ্ঞ লোকেরাই তাঁর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত। আর সবচেয়ে পছন্দের হলো কৃতজ্ঞতা এবং কৃতজ্ঞ বান্দাগণ। আল্লাহ্ তায়ালা মানুষ সম্পর্কে বলেন—
إِنَّا هَدَيْنَهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُوْرًا
'আমি তাকে রাস্তা দেখিয়েছি। সে হয়তো কৃতজ্ঞ হবে কিংবা অকৃতজ্ঞ'। ৩
অন্যত্র বলেন-
وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَا زِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
'স্মরণ করো, যখন তোমাদের প্রভু ঘোষণা করেছিলেন, যদি তোমরা কৃতজ্ঞ থাকো তাহলে তোমাদেরকে বাড়িয়ে দেবো। কিন্তু যদি অকৃতজ্ঞ হও তাহলে (মনে রেখো) অবশ্যই আমার শাস্তি বড় কঠোর। [৪]
অতএব আল্লাহ্ তায়ালা নিয়ামত বৃদ্ধির ভার রেখেছেন শোকরের ওপর। শোকরের যেমন কোনও সমাপ্তি নেই তেমনি তাঁর নিয়ামতের প্রবৃদ্ধিরও কোনও সীমানা নেই। আল্লাহ্ তায়ালা অনেক দান প্রতিদানকে নিজের চাহিদা ও ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেন-
فَسَوْفَ يُغْنِيْكُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ إِنْ شَاءَ
'আল্লাহ্ চাইলে নিজ অনুগ্রহে তোমাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন'। [৫]
অনুরূপ ক্ষমার ক্ষেত্রে বলেন,
وَيَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ
'তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেবেন'। [৬]
তদ্রুপ তাওবার ক্ষেত্রে বলেন-
وَ يَتُوْبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ 1
'আল্লাহ্ যার ইচ্ছা তাওবা কবুল করেন'। [৭]
শোকরের প্রতিদান কী হবে, আল্লাহ্ তায়ালা তা নিদিষ্ট করে দেন নি; বরং রেখেছেন সাধারণ অনির্দিষ্ট, যা অমোঘ কিছু হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। যেমন আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তায়ালা বলেন-
وَ سَنَجْزِي الشَّكِرِينَ
‘আমি অবশ্যই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবো'। ।৮।
আল্লাহ্ তায়ালার শত্রু ইবলিস। সে শোকরের সমুন্নত মর্যাদা এবং কৃতজ্ঞদের সম্মানিত অবস্থানের কথা উপলব্ধি করতে পেরেছিল বিধায় তার চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিয়েছে, মানুষকে শোকর থেকে দূরে রাখা। সে বলেছে—
ثُمَّ لَا تِيَنَّهُمْ مِّن بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَ مِنْ خَلْفِهِمْ وَ عَنْ أَيْمَانِهِمْ وَ عَنْ شَمَا بِلِهِمْ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شُكِرِينَ
'অতঃপর আমি তাদের ওপর আক্রমণ করবো তাদের সামনের দিকে থেকে, তাদের পেছন দিক থেকে, তাদের ডান দিক থেকে, তাদের বাম দিক থেকে। এবং আপনি তাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ পাবেন না। [৯]
কৃতজ্ঞ বান্দাদের ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন—
وَقَلِيلٌ مِّنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ
'আমার খুব স্বল্প সংখ্যক বান্দাই কৃতজ্ঞ'।[১০]
আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতের বেলা এতো পরিমাণ ইবাদত করতেন যে, তাঁর পা মোবারক ফেটে যেতো। একবার তাকে বলা হলো, আপনি এতো ইবাদত করেন, অথচ আল্লাহ্ তায়ালা আপনার পূর্বাপরের যাবতীয় ভুল ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন? তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন—
'আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না'! [১১৷
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুয়াজ রদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন,
'হে মুয়াজ, আল্লাহর শপথ, আমি তোমাকে ভালবাসি। প্রতি সালাতের পর তুমি এই দোয়া করতে ভুলো না—'আল্লাহুম্মা আয়িন্নি আলা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ইবাদাতিকা' (হে আল্লাহ্, আপনার যিকির, শোকর এবং যথার্থ ইবাদত করতে আমাকে সাহায্য করুন)। [১২]
শোকর হলো নেয়ামতের জন্য কয়েদ কিংবা তালা স্বরূপ এবং এর দ্বারাই তার প্রবৃদ্ধি ঘটে। উমর বিন আব্দুল আজিজ রহিমাহুল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহর নিয়ামতগুলো আবদ্ধ করে ফেল তাঁর কৃতজ্ঞতা দ্বারা।
আলী রদিয়াল্লাহু আনহু হামযানের এক লোককে বলেছেন, 'নিয়ামত পৌঁছে শোকরের দ্বারা। শোকর বৃদ্ধি করে দেয় নিয়ামতকে। শোকর এবং প্রবৃদ্ধি এক সুতোয় গাঁথা। তাই যতদিন বান্দা থেকে শোকর বিচ্ছিন্ন না হয় আল্লাহ্ তায়ালা থেকেও প্রবৃদ্ধি বন্ধ হয় না'।
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তোমরা বেশি বেশি আল্লাহ্ তায়ালার নিয়ামতগুলোর কথা আলোচনা করো; কেননা সেগুলোর আলোচনাও শোকরেরই অংশ। আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় নবীকে তাঁর রবের নিয়ামতের কথা ব্যক্ত করতে বলেছেন। 'আর আপনার রবের অনুগ্রহের কথা প্রকাশ্যে বলুন'।[১৩]
আমর বিন শুয়াইব রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছন-
'আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর নিয়ামতের চিহ্ন বান্দার ওপর দেখতে পছন্দ করেন'। [১৪]
অর্থাৎ যাকে যে রকম নিয়ামত প্রদান করা হয়েছে, সে সে অনুযায়ী জীবন যাপন করবে, এটাই আল্লাহ্ তায়ালার পছন্দনীয়।
আবুল মুগিরা রহিমাহুল্লাহকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করতো যে, হে আবু মুহাম্মাদ, কেমন কাটছে আপনার দিন? তিনি বলতেন, 'দিন কাটছে আল্লাহ্ তায়ালার নিয়ামতে ডুবে, শোকর আদায়ে ব্যর্থ অবস্থায়। আমাদের রব আমাদের থেকে অমুখাপেক্ষী, তবুও তিনি আমাদের কাছে প্রিয় হতে চান। আর আমরা তাঁর কাছে অপ্রিয় হয়ে যাই, যদিও আমরা তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী'।
শুরাইহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, কোনও বান্দার ওপর বিপদ আপতিত হলে তার মধ্যে আল্লাহ্ তায়ালার তিনটি অনুগ্রহ থাকে। এক, বিপদটা তার দ্বীনের ওপর না আসা। দুই, এর চেয়ে বড় কোনও বিপদ আসে নি। তিন, এটা হওয়া অপরিহার্য ছিল, তাই এখনি হয়ে গেলো।
ইউনুস বিন উবাইদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, এক লোক আবু গুনাইমাকে বলল, আপনার সকাল কেমন হলো? তিনি বললেন, 'আমার সকাল হলো দুটি নিয়ামতের মাঝে, আমি জানি না কোনটা উত্তম। এক, আমার অনেক গুনাহ রয়েছে, কিন্তু আল্লাহ্ তায়ালা তা গোপন করে রেখেছেন। ফলে কেউ সে ব্যাপারে আমাকে নিন্দা কিংবা তিরস্কার করতে পারে না। দুই, আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় বান্দাদের অন্তরে আমার ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছেন, আমার আমল যে স্তরে পৌঁছার জন্য যথেষ্ট নয়'।
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন
وَالَّذِينَ كَذَّبُوا بِايْتِنَا سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِّنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُوْنَ
'আর যারা আমার নিদর্শনসমূহ অবিশ্বাস করে তাদেরকে আমি ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করবো যে, তারা জানতেও পারবে না'। [১৫]
উক্ত আয়াতের তাফসিরে সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ্ তায়ালা তাদের ওপর প্রচুর নিয়ামত দান করবেন অতঃপর তাদেরকে শুকরিয়া আদায় করা এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা থেকে বঞ্চিত করে দেবেন। এভাবেই তারা আজাবের দিকে এগিয়ে যাবে'।
অনেকে এভাবেও ব্যাখ্যা করেছেন যে, 'তারা যখনই কোনও গুনাহ করবে, আল্লাহ্ তায়ালা তাদের জন্য একটি নিয়ামত বৃদ্ধি করে দেবেন। নিয়ামতের শোকর আদায় না করে তারা গুনাহ করতেই থাকবে এবং এক পর্যায়ে আজাবে পতিত হয়ে যাবে।
এক ব্যক্তি আবু হাজিম রহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলো, আবু হাজিম, চক্ষুদ্বয়ের শোকর কি? তিনি বললেন, ভালো কিছু দেখলে তা প্রকাশ করবে আর মন্দ কিছু দেখলে তা গোপন রাখবে। সে আবার জিজ্ঞেস করলো, তাহলে কর্ণদ্বয়ের শোকর কি? তিন বললেন, ভালো কিছু শ্রবণ করলে তা মুখস্থ করবে আর যদি মন্দ কিছু শ্রবণ করো তাহেল তা ঝেড়ে ফেলে দেবে। সে পুনরায় জিজ্ঞেস করলো, তাহলে হস্তদ্বয়ের শোকর কি? তিনি বললেন, তার মালিকানাধীন নয় এমন কিছু তা ধারা স্পর্শ করবে না আবার তার হক থেকে তাকে বঞ্চিতও করবে না। এবার সে জিজ্ঞেস করলো, তাহলে উদরের শোকর কি? তিনি বললেন, তার নিম্নাংশ হবে খানা এবং ঊর্ধ্বাংশ হবে ইলম ও জ্ঞানের স্থান। সে বলল, লজ্জাস্থানের শোকর কি? তিনি বললেন, এর উত্তর তো আল্লাহ্ তায়ালাই দিয়েছেন-
وَ الَّذِينَ هُمْ لِفُرُوْجِهِمْ حَفِظُوْنَ إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُوْمِينَ فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُولَيكَ هُمُ الْعُدُوْنَ
'আর যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। তবে তাদের স্ত্রী ও মালিকানাধীন দাসিদের ক্ষেত্রে সংযত না রাখলে তারা তিরস্ক্রিত হবে না। কিন্তু এর বাইরে (অন্যদের) কামনা করলে তারা সীমালঙ্ঘনকারী হবে'। [১৬]
তাহলে পায়ের শোকর কি?, সে জিজ্ঞেস করলো। তিনি উত্তর দিলেন, যদি তোমার জ্ঞাতসারে কোনও এমন মৃত ব্যক্তি থাকে, যাকে তুমি ঈর্ষা করো, তাহলে তোমার পা দুটোকে তার মতো কাজে ব্যয় করো। (অর্থাৎমৃত আল্লাহ ওয়ালারা যেমন কাজ করে গেছেন, তুমিও তাদের মতো আমল করো, নিজের পা দুটোকে ইবাদতের দিকে গমন করাও।) আর যদি কাউকে ঘৃণা করো, তাহলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে তার মতো কাজ করা থেকে বিরত থাকো। বস্তুত যে লোক জবানে আল্লাহ তায়ালার শোকর আদায় করে কিন্তু তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্বারা করে না, তার উদাহরণ হলো ওই ব্যক্তির ন্যায় যার একটি কাপড় আছে, সে তার এক দিক হাতে নিয়েছে কিন্তু পরিধান করে নি; এই কাপড় তাপে ঠান্ডায় বৃষ্টিতে কুয়াশায় তার কোনো কাজে আসবে না। ঠিক তেমনি শুধু মুখের শোকর তার জন্য উপাদেয় হবে না।
জনৈক আলিম তার ভাইয়ের কাছে নিম্নোক্ত পত্র লিখে প্রেরণ করেছেন, 'পর কথা, আমরা অধিক হারে আল্লাহ্ তায়ালার নাফরমানী করি, তথাপি তার অগণিত নিয়ামতে ডুবে আছি। আমার জানা নেই কীসের জন্য তাঁর শুকরিয়া আদায় করবো; যে সমস্ত ভালো কাজের তিনি তাওফিক দিয়েছেন তার জন্য নাকি ঘৃণিত যে কাজগুলো তিনি গোপনে রেখেছেন তার জন্য?!'
টিকাঃ
[১] সুরা নিসা ১৪৭
[২] সুরা আনআম ৫৩
[৩] সুরা ইনসান ৩
[৪] সুরা ইবরাহিম ৭
[৫] সুরা তাওবা ২৮
[৬] সুরা মাইদা ৪০
[৭] সুরা তাওবা ১৫
[৮] সূরা আলে ইমরান ১৪৫
[৯] সুরা আ'রাফ ১৭
[১০] সুরা সাবা ১৩
[১১] সহিহ বুখারি ৪৮৩৭
[১২] সুনানে আবু দাউদ ১৫২২
[১৩] সুরা দুহা ১১
[১৪] জামে তিরমিজি ২৮১৯
[১৫] সুরা আ'রাফ ১৮২
[১৬] সুরা মুমিনুন ৫-৭