📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব > 📄 অতিরিক্ত কথা

📄 অতিরিক্ত কথা


আনাস রদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন-
'কোনো ব্যক্তির ঈমান স্থির হবে না, যদি তার কলব স্থির না হয়। আর তার কলب স্থির হবে না, যদি না তার জিহ্বা স্থির হয়।' [৯]
উক্ত হাদিসে ঈমানের স্থিরতাকে অন্তরের স্থিরতার সহিত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। অতঃপর অন্তরের স্থিরতার জন্য জিহ্বার স্থিরতাকে শর্ত করা হয়েছে। সুতরাং জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ করা এবং অতিরিক্ত কথা বলা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
অন্য এক হাদিসে ইবনে উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-'আল্লাহর জিকির ব্যতীত তোমরা বেশি কথা বলো না; কেননা আল্লাহর জিকির ছাড়া অধিক কথা বললে অন্তর কঠোর হয়ে যায়। আর আল্লাহ্ তায়ালা থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে থাকে কঠোর হৃদয়ের লোকই।'[১০]
উমর বিন খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-'যে বেশি কথা বলবে তার স্খলন হবে বেশি। যার স্খলন বেশি হবে, তার গুনাহ হবে বেশি। আর যার গুনাহ হবে বেশি, তার জন্য জাহান্নামের আগুনই অধিক উপযুক্ত।' [১১]
মুয়াজ রদিয়াল্লাহু আনহুর একটি দীর্ঘ হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
'আমি কি তোমাকে সব কিছুর সার বলে দেবো না? মুয়াজ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি বললাম, অবশ্যই ইয়া রাসুলাল্লাহ। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জিহ্বা ধরে বললেন, 'এটি নিয়ন্ত্রিত রাখো'। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ, 'আমরা যে কথাবার্তা বলি, সেজন্যও কি আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে মুয়াজ, তোমার মা সন্তানহারা হোক! মানুষকে কেবল জিহ্বার উপার্জনের কারণেই অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।' [১২]
'জিহ্বার উপার্জন' দ্বারা উদ্যেশ্য হলো, হারাম কথাবার্তার প্রতিদান ও শাস্তি। কেননা মানুষ তার কথাবার্তা দ্বারা সওয়াব এবং গুনাহের বীজ রোপণ করে। কেয়ামতের দিন এর ফসল কাটবে। সুতরাং যে ভালো কথা বা কাজ রোপণ করবে, সে সম্মান লাভ করবে। আর যে মন্দ কথা বা কাজ রোপণ করবে, সে পাবে অনুতাপ ও লজ্জা।
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যে দুটি অঙ্গ মানুষকে বেশি পরিমাণ জাহান্নামে নিয়ে যাবে তা হলোঃ মুখওলজ্জাস্থান।' [১৩]
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- 'মানুষ এমন অনেক কথা বলে, যাকে সে কোনো অসুবিধা মনে করে না। অথচ এজন্য তাকে সত্তর বছর জাহান্নামে অবস্থান করতে হবে।' [১৪]
উকবা বিন আমীর রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, মুক্তি কোন পথে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—
'নিজের জিহবাকে নিয়ন্ত্রণ করো। নিজের বাড়িতেই অবস্থান করো। নিজের গুনাহের জন্য ক্রন্দন করো।' [১৫]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
'যে ব্যক্তি তার দুই ঠোঁটের মাঝখানের বস্তু (জিহবা) ও দুই পায়ের মাঝখানের বস্তুর (লজ্জাস্থানের) জামিন হবে (অপব্যবহার করবে না), আমি তার জন্য জান্নাতের জামিন হব।' [১৬]
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যে ব্যক্তি আল্লাহ্ এবং আখিরাতের দিনের ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে, অথবা চুপ থাকে।' [১৭]
উক্ত হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভালো কথা বলার আদেশ দিয়েছেন, অন্যথায় চুপ থাকতে বলেছেন। সুতরাং কথা হয়তো ভালো হবে, তাহলে বান্দা সে ব্যাপারে আদিষ্ট। আর যদি ভালো না হয়, তাহলে বান্দা সেক্ষেত্রে চুপ থাকতে আদিষ্ট।
উম্মে হাবিবা রদিয়াল্লাহু আনহা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন-
'মানুষের প্রতিটি কথা তার জন্য অপকারী, উপকারি নয়। তবে।' সৎকাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ এবং আল্লাহ্ তায়ালার জিকির তার জন্য লাভদায়ক। [১৮]
উমর বিন খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু একবার আবু বকর রদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গেলেন। দেখলেন, তিনি তাঁর হাত দিয়ে নিজ জিহ্বা টানছেন। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'থামুন, আল্লাহ্ আপনাকে ক্ষমা করুন'। আবু বকর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এর জন্যই যত বিপদ ঘটেছে'।[১৯]
আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'ওই আল্লাহর শপথ, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমার জিহ্বা ছাড়া অন্য কোনো জিনিষের এতো অধিক দীর্ঘ কয়েদখানার প্রয়োজন নেই'।
তিনি বলতেন—'হে জিহ্বা, ভালো কথা বল, তাহলে লাভবান হবে। মন্দ কথা থেকে চুপ থাকো, তাহলে অপমানের হাত থেকে বেঁচে যাবে'।
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু ইবনে আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, 'কিয়ামতের দিন মানুষের শরীরের কোনো অঙ্গ জিহ্বার চেয়ে অধিক ক্রুদ্ধ এবং রাগান্বিত হবে না। তবে যে তার দ্বারা ভালো কিছু বলেছে কিংবা কল্যাণকর কিছু লিখিয়েছে সে নিরাপদে থাকবে'।
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন—'যে নিজের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করে না, সে তার দ্বীনকেই অনুধাবন করতে পারে নি'।
জিহ্বার সবচেয়ে লঘু রোগ হলো অনর্থক কথা বলা। এই বিপদের ভয়াবহতা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে ব্যক্ত করেছেন যে— 'ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য হলো অনর্থক যাবতীয় বিষয় পরিহার করা।[২০]
আবু উবাইদা, হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করে বলেন, 'বান্দা থেকে আল্লাহ্ তায়ালার মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো, বান্দার আল্লাহ্ তায়ালা থেকে গাফেল হয়ে অনর্থক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়া'।
সাহল রহিমাহুল্লাহ বলেন-'যে অনর্থক কথা বলে, সে সত্য কথা বলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।'
এই যদি হয় জিহ্বার সবচেয়ে লঘু বিপদের ক্ষতির পরিমাণ, তাহলে গীবত, চোগলখুরি, অশ্লীল অন্যায় কথা, দুমুখো কথা, ঝগড়া, বিবাদ, বিতর্ক, গান গাওয়া, মিথ্যা বলা, অযথা তারিফ করা, ঠাট্টা বিদ্রূপ করা, অধিকাংশ কথায় ভুল করা ইত্যাদি প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড বিপদের ক্ষতি কী পরিমাণ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়! এসব বিপদ ব্যক্তির জিহবায় আপতিত হয়ে তার অন্তরকে নষ্ট করে দেয়। ফলে দুনিয়ার সুখ শান্তি বিনষ্ট হয় এবং আখিরাতের সফলতা ও নিষ্কৃতির হয়ে যায় বিনাশসাধন। আল্লাহ্ আমাদের সকলকে হেফাজত করুন। আমিন।

টিকাঃ
[৯] মুসনাদে আহমাদ ১৩০৪৮; তবরানি ১০৪০১
[১০] জামে' তিরমিজি ২৪১১
[১১] তাখরিজুল ইহইয়া, ইরাকী ৩/১৩৭; জামে সগির, সুয়ুতি ৮৯৭১
[১২] জামে তিরমিজি ২৬১৬; মুস্তাদরাক, হাকিম ২/৪১২
[১৩] জামে তিরমিজি ২০০৪
[১৪] জামে তিরমিজি ২৩১৪; ইবনে মাজা ৩৯৭০
[১৫] তিরমিজি ২৪০৬; রিয়াদুস সালিহিন ১৫২৮
[১৬] সহিহ বুখারি ৬৪৭৪
[১৭] সহিহ বুখারি ৬০১৮
[১৮] জামে তিরমিজি ২৪১২
[১৯] জামে সগির, সুযুতি ৫/৩৬৭; সহিহুত তারগিব, আলবানি ২৮৭৩
[২০] জামে তিরমিজি ২৩১৭; ইবনে মাজাহ ৩৯৭৬

📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব > 📄 অন্যায় দৃষ্টিপাত

📄 অন্যায় দৃষ্টিপাত


অন্যায় দৃষ্টিপাত দ্বারা কোনো জিনিষের সৌন্দর্য অন্তরে প্রবেশ করে। দর্শকের অন্তরে জায়গা করে নেয় দৃষ্ট জিনিষের একটি অবয়ব। ফলে উৎপাদন হওয়া শুরু হয় অন্তরে পচন সৃষ্টির অনেক উপাদান। নিম্নে তার মধ্য থেকে কিছু উল্লেখ করা হলো-
১- রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'দৃষ্টি শয়তানের একটি বিষাক্ত তির। সুতরাং যে আল্লাহর ভয়ে নিজের চোখকে সংযত রাখবে, আল্লাহ্ তায়ালা তার অন্তরে একটি (অপার্থিব) আনন্দ সৃষ্টি করে দেবেন। কেয়ামত দিবস পর্যন্ত সে তা উপভোগ করবে।' [২১]
২- দৃষ্টির চোরাপথ দিয়ে শয়তান প্রবেশ করে। উন্মুক্ত প্রান্তরে বাতাস যত দ্রুত প্রবেশ করে, শয়তান তার চেয়ে দ্রুত গতিতে দৃষ্টিপথে মানুষের অন্তরে প্রবেশ করে। দৃষ্টের আকৃতিকে রমণীয় করে উপস্থাপন করে এবং তাকে বানিয়ে দেয় একটি মূর্তি; কলব যার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ হয়ে যায়। অতঃপর তাকে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি, আশা ও ভরসা দেয়। এভাবে তার অন্তরে কামনার আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং উস্কে দেয় গুনাহের ইন্ধন; যদি দৃষ্টির মাধ্যমে ওই আকৃতি তার মনে প্রবেশ না করতো, তাহলে এসব কিছুই হতো না।
৩- দৃষ্টির অবাধ ব্যবহার অন্তরকে উদাসীন করে দেয়। সে তার কল্যাণকর বিষয়গুলো ভুলে যায়। মঙ্গল এবং কলবের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই অন্তর শিথিল হয়ে পড়ে এবং উদাসীনতা ও প্রবৃত্তির খাদে পড়ে যায়। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
'এমন লোকের আনুগত্য করো না যার অন্তরকে আমার স্মরণ থেকে উদাসীন করে দিয়েছি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কাজই হচ্ছে সীমা লঙ্ঘন করা।' [২২]
দৃষ্টির কারণে আয়াতে বর্ণিত তিনটি অনর্থ সৃষ্টি হয়।
হৃদ-বিশেষজ্ঞরা বলেন, চোখ এবং অন্তরের মাঝে একটি পথ এবং জানালা আছে। তাই যখন চোখ নষ্ট এবং বিকৃত হয়ে যায়, অন্তরও নষ্ট এবং বিকৃত হয়ে যায়। তখন তা পরিণত হয় একটি ডাস্টবিনে; যেখানে সমস্ত নাপাকি, ময়লা এবং আবর্জনা নিক্ষিপ্ত হয়। ফলে সেখানে আর আল্লাহ্ তা'আলার মারেফাত, ভালোবাসা, ঘনিষ্ঠতা, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন এবং তাঁর নৈকট্যে আনন্দিত হওয়া ইত্যাদি অবস্থান করার যোগ্য থাকে না। তখন অন্তর পরিণত হয় এসবের বিপরীত জিনিসের বাসস্থানে।
৪- দৃষ্টিক্ষেপের কারণে আল্লাহর অবাধ্যতা হয়। আল্লাহ্ তায়ালা আদেশ দিয়েছেন-
'মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের গুপ্তাঙ্গের হেফাজত করে। এটি তাদের পবিত্র থাকার জন্য অধিক সহায়ক। তারা যা কিছু করে আল্লাহ্ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত।' ।২৩৷
দুনিয়ায় আল্লাহ্ তায়ালার আদেশ মান্য না করে কেউ সুখী হতে পারে না। অনুরূপ আখিরাতেও বান্দার মুক্তির কোনো উপায় নেই আল্লাহ্ তায়ালার আদেশ মানা ব্যতীত।
৫- দৃষ্টির মাধ্যমে অন্তরে অন্ধকারের আবরণ পড়ে যায়। অনুরূপ দৃষ্টিকে আল্লাহ্ তায়ালার জন্য হেফাজত করলে, আল্লাহ্ তায়ালা তাতে নূরের আভা ছড়িয়ে দেন। আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর পূর্বোক্ত আদেশ, দৃষ্টি অবনত রাখার আদেশ (সূরা নূর ৩০), এর পরেই উল্লেখ করেছেন নূরের আয়াত। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
'আল্লাহ্ আসমান জমিনের নূর। তাঁর নূরের উপমা হলো যেন একটি দীপাধার, যাতে রয়েছে একটি প্রদীপ। '।২৪।
আর যখন অন্তর আলোকিত হয়ে যায়, তখন চতুর্দিক থেকে কল্যাণের দূতেরা তার দিকে আকৃষ্ট হতে থাকে। তদ্রূপ যখন তা অন্ধকারে পরিণত হয়, তখন সর্বস্থান থেকে বিপদ ও অনিষ্টের মন্দ ছায়া তার দিকে লালায়িত হতে থাকে।
৬- দৃষ্টিক্ষেপের কারণে অন্তর তার সত্য-মিথ্যা, সুন্নাহ-বিদআতের মাঝে পার্থক্য করার নির্ণয়ী শক্তি হারিয়ে ফেলে। কেমন যেন সে অন্ধ হয়ে যায়। আর যদি তা আল্লাহর জন্য অবনত রাখা হয় এবং হেফাজত করা হয়, তাহলে সেখানে সত্যের একটি আলোক তৈরি হয়, যার দ্বারা হক-বাতিল ন্যায়-অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য নিরূপণ করা সহজ হয়ে যায়।
আল্লাহর একজন নেককার বান্দা বলেছিলেন-'যে নিজের বাহ্যকে সুন্নাহর অনুসরণ দিয়ে এবং অভ্যন্তরকে অবিরত ধ্যানমগ্নতা দিয়ে গড়ে তুলবে, নিজের চোখকে হেফাজত করবে হারাম থেকে, অন্তরকে নিবৃত্ত রাখবে সংশয় থেকে এবং হালাল খাবার ভক্ষণ করবে, সে অবশ্যই ফিরাসাহ তথা খোদাপ্রদত্ত অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করবে।'
যে ব্যক্তি নিজের চোখকে আল্লাহ্ তায়ালার নিষিদ্ধ বস্তু থেকে হেফাজত করবে, আল্লাহ্ তায়ালা তার অন্তরে অন্তর্দৃষ্টি ঢেলে দেবেন।

টিকাঃ
[২১] মুসতাদরাক, হাকিম ৪/৩১৪; মুসনাদ, আহমদ ৫/২৬৪
[২২] সূরা কাহফ ২৮
[২৩] সূরা নূর ৩০
[২৪] সূরা নূর ৩৫

📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব > 📄 অতিরিক্ত ভক্ষণ

📄 অতিরিক্ত ভক্ষণ


স্বল্প খাবার খেলে অন্তর দয়ার্দ্র হয়, মেধাশক্তি প্রখর হয়, ক্রোধ এবং প্রবৃত্তি দুর্বল হয়। পক্ষান্তরে অধিক খাবার খেলে এর বিপরীত ফলাফল প্রকাশ পায়।
মিকদাম বিন মা'দিকারাব রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি—
'মানুষ তার উদরের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো ভাণ্ড ভরে না। আদম সন্তানের জন্য এমন কিছু লোকমাই যথেষ্ট যা তার মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারে। আর যদি এর চেয়ে অধিক খেতেই হয়, তাহলে এক তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, এক তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য।' [২৫]
অতিরিক্ত ভক্ষণ অনেকগুলো অনিষ্টের জন্য দায়ী। তা অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে গোনাহের জন্য প্রলুব্ধ করে, ইবাদত এবং শারীরিক সওয়াবের কাজ থেকে ভারী করে দেয়; খারাবি বর্ণনা করার জন্য এই দুটিই যথেষ্ট। কতো গুনাহ এমন রয়েছে, যার মূল কারণ উদরপূর্তি এবং অতিরিক্ত ভক্ষণ! আবার এদুইয়ের কারণেই কতো শত ইবাদত বাঁধাগ্রস্ত হয়ে যায়। বস্তুত যে নিজের উদরের অনিষ্ট থেকে নিরাপদ, সে তো বিশাল এক ক্ষতি থেকে নিরাপদ। আর শয়তান মানুষকে খুব সহজেই ঘায়েল করতে পারে তখন, যখন তার পেট খাবার দ্বারা পূর্ণ থাকে। এজন্যই জনৈק বিজ্ঞ লোক বলেছিলেন, 'তোমরা রোজা রেখে শয়তানের গতিপথ সংকীর্ণ করে দাও'।
জনৈক সালাফ বলেছেন, 'বনী ইসরাইলের কিছু যুবক একত্রে উপাসনা করতো। যখন তাদের খাবারের সময় হতো, তখন একজন তাদের মাঝে দাঁড়িয়ে বলত, “তোমরা বেশি আহার করো না; তাহলে বেশি পান করতে হবে। ফলে অধিক নিদ্রা আগমন করবে আর তোমরা প্রচুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবে'।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরাম অধিকাংশ সময় ক্ষুধার্ত থাকতেন। এটি যদিও খাবারের অনুপস্থিতির কারণে ছিল, কিন্তু আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর রাসুলের জন্য সর্বোত্তম এবং পরিপূর্ণ একটি জীবন ব্যবস্থাই নির্বাচন করেছিলেন। আর এ জন্যই ইবনে উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা খাবারের সক্ষমতা থাকতেও এই সুন্নাহর অনুসরণ করতেন। তাঁর পূর্বে তাঁর পিতা উমর রদিয়াল্লাহু আনহুও একই পথ মাড়িয়ে গেছেন। আম্মাজান আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
'মদিনায় আগমনের পর থেকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবার এক নাগাড়ে তিন রাত গমের রুটি পেট পুরে খাননি। [২৬]
ইবরাহিম বিন আদহাম রহিমাহুল্লাহ বলেন-'যে নিজের পেটকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, সে নিজের দ্বীনকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। যে নিজের ক্ষুধাকে সংবরণ করতে পারবে, যে সমস্ত উত্তম চরিত্র অধিকার করতে পারবে। বস্তুত আল্লাহ্ তায়ালার অবাধ্যতা ক্ষুধার্ত থেকে যোজন যোজন দূরে, পরিতৃপ্তের অনেক নিকটে।'

টিকাঃ
[২৫] জামে তিরমিজি ২৩৮০; ইবনে মাজাহ ৩৩৪৯
[২৬] সহিহ বুখারি ৫৪১৬; সহিহ মুসলিম ২৯৭০

📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব > 📄 অতিরিক্ত সংযোগ রক্ষা

📄 অতিরিক্ত সংযোগ রক্ষা


এটি একটি দুরারোগ্য ব্যাধি। সমস্ত অনিষ্টের আকর্ষক শক্তি। মানুষের সাথে অধিক মেলামেশা ও সংযোগের কারণে কত নিয়ামত হাতছাড়া হয়ে যায়, রোপিত হয় কত শত্রুতার চাড়া এবং অন্তরে স্থাপিত হয় এমন স্থির বিদ্বেষ, পাহাড় তার আপন স্থান থেকে সরে গেলেও তা অন্তরে নিজ স্থানে অটল থাকে। বস্তুত অতিরিক্ত মেলামেশা এবং সংযোগে দুনিয়ারও ক্ষতি নিহিত, আখিরাতেরও ক্ষতি নিহিত।
ব্যক্তির উচিত মানুষের সাথে ওই পর্যন্ত মেলামেশা করা, যতক্ষণ তা উপকারি থাকে। এজন্য মানুষকে চার ভাগে ভাগ করা হয়। যখন এক ভাগ অন্য ভাগের সাথে মিশ্রিত হয় এবং সেখানে কোনো পার্থক্য রেখা থাকে না, তখনই সেখানে অনিষ্ট সৃষ্টি হয়।
১-কিছু মানুষের সঙ্গ হচ্ছে খাবারের ন্যায়; দিবারাত্রি যে কোনো সময় প্রয়োজন হতে পারে। যখন প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে, তখন তাদের সঙ্গ ত্যাগ করবে। আবার যখন সাহচর্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হবে, তখন আবার তাদের সংস্পর্শে আসবে- খাবারের ক্ষেত্রে বিষয়টি প্রযোজ্য হলেও এই শ্রেণীর মানুষের ক্ষেত্রে তা একদমই প্রযোজ্য নয়; বরং তাদের সঙ্গ অবিচ্ছিন্ন ধারায় চলতে থাকবে। তারা হলেন ওই সমস্ত মানুষ, যারা আল্লাহেক চেনেন, তাঁর আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে জানেন, তাঁর শত্রুদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবগত আছেন, অন্তরের রোগ ও তার প্রতিকার সম্পর্কে জ্ঞাত এবং আল্লাহ্, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসুল ও তাঁর সৃষ্টির জন্য শুভার্থী। এই প্রকারের মানুষের সঙ্গ নিয়ে আসে লাভের ওপর লাভ।
২-কিছু মানুষের সঙ্গ ঔষধের ন্যায়; রোগ হলে তাদের প্রয়োজন হয়। অতএব আপনি যখন সুস্থ থাকবেন, তখন তাদের সংস্পর্শের কোনো প্রয়োজন নেই। তারা হলেন ওই সমস্ত লোক, জীবন ধারনের জন্য, ব্যবসা বানিজ্য পরামর্শ ইত্যাদি করার জন্য যাদের সাথে সংযোগ রাখা অপরিহার্য। সুতরাং যখন তাদের থেকে প্রয়োজন পূরণ হয়ে যাবে, তখন অবশ্যই তাদের সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে।
৩-অনেক মানুষ আছে যাদের সঙ্গ, তাদের প্রকার স্তর শক্তিমত্তা ও দুর্বলতার তারতম্যে, রোগের ন্যায়। তাদের মধ্যে কিছু আছে, যাদের সঙ্গ দুরারোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের ন্যায়। তারা হলো ওই সমস্ত লোক, যাদের থেকে দুনিয়া যুগপৎ আখিরাতের কোনো লাভ অর্জন হয় না। এরকম মানুষের সঙ্গ যদি আপনাকে পেয়ে বসে এবং তা অব্যহত থাকে, তাহলে তা আপনার জন্য মরণ ব্যাধিতে পরিণত হবে।
অন্যদিকে কিছু লোক আছে, যারা ভালো করে কথা বলতে পারে না যে আপনি তার থেকে উপকৃত হবেন; চুপও থাকতে পারে না যে আপনার থেকে তারা উপকৃত হবে; সে নিজের স্তর জানে না যে সেখানে নিজেকে স্থাপিত করবে। বরং সে যখন কথা বলে, তখন তার বাক্যবাণ হয় বিদ্রোহীর মতো, শ্রোতাদের অন্তরে যা বিস্ময় ও আনন্দের উদ্রেক ঘটায়। সে যখনই সুযোগ পায়, তখনই এমন ওজস্বী কথা বলে আর ধারণা করতে থাকে যে, সে মজলিসকে অমোঘ এক সুরভী দ্বারা সুরভিত করে ফেলেছে। কিন্তু যখন সে কথা বলা থামিয়ে দেয়, চুপ হয়ে যায়, তখন প্রস্ফুটিত হয় যে, সে ছিল জাঁতার বিরাট এক কলের ন্যায়; যাকে বহন করাও সম্ভব নয় আবার জমিনে রেখে টেনে নেওয়াও সম্ভব নয়; তার বাক্যবাণ পুরোটাই নিষ্ফল।
এমন অপোগণ্ড লোকের সংস্পর্শ দুধরণের হতে পারে। আবশ্যিক এবং আকস্মিক। আকস্মিক হলে তো তা এড়িয়ে যেতে সময় লাগে না। কিন্তু যদি ভাগ্যের পরিহাসে কেউ এমন কারও পাল্লায় পড়ে যায়, তার সাথে মেলামেশা করা ছাড়াও কোনো গতি না থাকে, তাহলে সে যেন উত্তমভাবে তার সাথে মেলামেশা করে; বাহ্য দিয়ে তাকে সন্তুষ্ট রাখে কিন্তু অভ্যন্তরকে তার থেকে নিরাপদে রাখে, যতদিন না আল্লাহ্ তায়ালা তার জন্য মুক্তির কোনো পথ বা পন্থা বের করে দেন।
৪- কিছু মানুষ আছে যাদের সংশ্রব ধ্বংসের নামান্তর। কেমন যেন নিজ হাতে বিষ পান করা। অতঃপর যদি বরাত সুপ্রসন্ন হয়, তাহলে প্রতিষেধক পাওয়া যায়। অন্যথায় তার জন্য বিলাপ করা ছাড়া কোনো গতি নেই। এ প্রকারের মানুষের সংখ্যাই অধিক। আল্লাহ্ তায়ালা তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি না করুন। তারা হলো বিদআত এবং ভ্রষ্টতা চর্চাকারী, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ উপেক্ষাকারী, অনিসলামের দিকে আহ্বানকারী, সুন্নতকে বিদআত আর বিদআতকে সুন্নত সাব্যস্তকারী। কোনো বুদ্ধিমান ধীসম্পন্ন ব্যক্তি এমন লোকদের সংস্পর্শে যেতে পারে না, তাদের সাথে মেলামেশা করতে পারে না। খোদা না করুন, যদি করেই ফেলে, তাহলে তার অন্তরের জন্য মৃত্যু কিংবা অসুস্থতা অপরিহার্য।
আমরা আল্লাহ্ তায়ালার কাছে নিজেদের এবং তাদের জন্য রহমত ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00