📄 ক্বলবের সুস্থতার আলামতসমূহ
দুনিয়াকে সর্বর্তভাবে ত্যাগ করে আখিরাতের বাহনে অবগাহন করা। পরকালে এমনভাবে নিবিষ্ট হওয়া কেমন যেন সে সেখানেরই বাসিন্দা, সেখানেই তার আবাসস্থল। তার অবস্থা এমন হয় যে, সে এই দুনিয়ায় এসেছে মুসাফির হিসেবে; প্রয়োজন পূরণ হলেই পুনরায় ফিরে যাবে আপন নীড়ে, নিজ দেশে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবদুল্লাহ বিন উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমাকে বলেছেন—
'দুনিয়াতে এমনভাবে অবস্থান করো, যেন তুমি মুসাফির কিংবা একজন পথিক মাত্র'। [৭]
পক্ষান্তরে কলব যখন অসুস্থ হয়, তখন সে ইহজীবনকে প্রাধান্য দেয়। এখানেই নিজের আবাসস্থল বানিয়ে নেয়। এখানকার অধিবাসী হয়ে থেকে যেতে চায় চিরস্থায়ী।
কলবের সুস্থতার আরও একটি আলামত হলোঃ সে তার অধিকারীর ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করতে থাকে, যতক্ষণ না সে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে এবং তাঁর দিকে সম্পূর্ণরূপে অভিনিবেশ গ্রহণ করে। আল্লাহ্ তায়ালার সাথে এমনভাবে মগ্ন হয়ে যায়, যেমনটা পাগল প্রেমিক তার প্রেমাস্পদের প্রতি হয়ে থাকে। আল্লাহর ভালোবাসা গ্রহণ করে সে অন্য সমস্ত ভালোবাসাকে ত্যাগ করে। তাবৎ দুনিয়ার স্মরণ ছেড়ে তাঁর স্মরণেই ধ্যাননিবিষ্ট থাকে। সব কিছুর সেবা ছেড়ে তাঁর সেবায় আত্মনিয়োগ করে। অন্তরের সুস্থতার একটি নিদর্শন হচ্ছেঃ যদি তার প্রাত্যহিক কোনো অজিফা কিংবা কোনো সওয়াবের কাজ হাতছাড়া হয়ে যায়, তখন সে তার জন্য এমনভাবে ব্যথিত হয় যে, লোভী কৃপণ লোক তার মূল্যবান সম্পদ হারালেও অতোটা ব্যথিত হয় না।
আরও একটি আলামত হলো-সে সেবা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে যায় তেমন, ক্ষুধার্ত ব্যক্তি পানাহারের প্রতি আকৃষ্ট হয় যেমন। ইয়াহিয়া বিন মুয়াজ রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহর খেদমত করতে পেরে যার অন্তর প্রশান্ত হয়, সমস্ত সৃষ্টি তার সেবায় খুশি হয়। যার চোখ আল্লাহেত শীতল হয়, তাকে দেখলে সকলেরই চোখ শীতল হয়'।
আরেকটি নিদর্শন হলোঃ তার যাবতীয় চিন্তা এক কথার ওপর আবর্তিত হবে। আর তা হলো, সর্বদা আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকা।
অনুরূপ অত্যন্ত কৃপণ লোক তার সম্পদের ওপর যতটুকু ব্যয়কুণ্ঠ হয়, সে তার চেয়েও নিজের সময়ের প্রতি যত্নশীল হবে- এটিও একটি আলামত। তদ্রূপ একটি লক্ষণ হচ্ছে-যখন সে নামাজে দাঁড়ায়, তখন দুনিয়ার সমস্ত চিন্তা ভাবনা তার থেকে দূরে ভেসে যায়। সে নামাযের মধ্যে শান্তি, প্রশান্তি, আরাম এবং আনন্দ খুঁজে পায়।
আরেকটি বড় আলামত হলো—সে অবিরাম তার রবের জিকির করতে করতে কখনো বিরক্ত হয় না। তাঁর সেবা করতে কখনো ত্যক্ত হয় না। তিনি ছাড়া অন্য কারও সাথে সখ্যতা গড়ে না; তবে যারা তাকে তাঁর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং তাঁর পথের দিশা দান করে, তাদের সাথেই একমাত্র বন্ধুত্ব গড়ে তোলে।
আমল করার চেয়ে আমল শুদ্ধ করার প্রতি তার অধিক মনযোগী হওয়া। ইবাদতে ইখলাস অর্জন করার আগ্রহ, দ্বীনের জন্য শুভাকাঙ্ক্ষী হওয়া, নিরবচ্ছিন্ন দ্বীনের ওপর অবিচলতা, দয়া ইত্যাদির প্রতি সচেষ্ট থাকা। যুগপৎ নিজের ওপর আল্লাহ্ তায়ালার অপার নিয়ামত এবং তাঁর প্রতি নিজের ত্রুটির কথা অকপটে স্বীকার করা ইত্যাদিও অন্তর সুস্থ হওয়ার অনবদ্য কিছু নিদর্শন।
টিকাঃ
[৭] সহিহ বুখারি ৬৪১৬
📄 অন্তরের রোগের কারণসমূহ
অন্তরের ওপর আপতিত বিপদ অনেক। তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হচ্ছে দুটি। ১- কামনা ও প্রবৃত্তি। ২-সংশয় ও সন্দেহ। প্রথমটি নিয়ত ও অভিলাষকে নষ্ট করে দেয়। আর দ্বিতীয়টি ইলম ও আকিদা-বিশ্বাসকে ধ্বংস করে দেয়।
হুজাইফা বিন ইয়ামান রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'চাটাই বুননের মতো এক এক করে ফিতনা মানুষের অন্তরে আপতিত হয়। যে অন্তরে তা গেঁথে যায়, সেখানে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। আর যে অন্তর তা প্রত্যাখ্যান করে, তার মধ্যে একটি সাদা দাগ পড়ে। তখন অন্তর দুই ধরণের হয়ে যায়। একটি হলো গাঢ় কালো উল্টানো সাদা মিশ্রিত কলসির ন্যায়; তার প্রবৃত্তির মধ্যে যা প্রবেশ করেছে তা ছাড়া ভালো-মন্দ কিছুই বুঝতে পারে না। আরেকটি অন্তর হলো শুভ্র অন্তর; যতদিন আসমান জমিন থাকবে, ততদিন সেখানে কোনো ফিতনা ক্ষতি করতে পারবে না।' [৮]
উক্ত হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কলবকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন। এক প্রকার হলো এমন কলব, যে কোনো ফিতনা তার ওপর আপতিত হলেই সে তা স্পঞ্জের ন্যায় চুষে নেয়। ফলে তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। এভাবে সে একের পর ক্রমাগত ফিতনা চুষে নিতে থাকে। এক পর্যায়ে তা গাঢ় কৃষ্ণ বর্ণ ধারণ করে এবং উল্টে যায়। যেমন কলসি ভূপাতিত হয়ে উল্টে যায়। যখন তা কালো হয় এবং উল্টে যায়, তখন তার মধ্যে দুটি গুরুতর ভয়ংকর রোগ আক্রমণ করে, যা তাকেও ধ্বংসের বিবরে নিক্ষেপ করে। একটি রোগ হলোঃ সত্য ও ন্যায় তার কাছে সংশয়পূর্ণ হয়ে যায়। ফলে সে ভালো মন্দের মাঝে কোনো পার্থক্য করতে পারে না। আবার কখনো এই রোগ তার মধ্যে এমনভাবে প্রোথিত হয় যে, সে সত্যকেই মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য বলে বিশ্বাস করতে থাকে। সুন্নতকে বিদআত, বিদআতকে সুন্নত; হককে বাতিল, বাতিলকে হক বলে নির্ধারণ করতে থাকে।
আর দ্বিতীয় রোগটি হলো, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনিত শরীয়তের ওপর নিজের কামনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেয়। তাঁর অনুসরণের চেয়ে প্রবৃত্তির অনুসরণকে প্রাধান্য দেয়।
কলবের দ্বিতীয় প্রকার হলোঃ শুভ্র সাদা একটি অন্তর। ঈমানের নূর সেখানে প্রজ্বলিত হয়। বিশ্বাসের বাতি তাকে করে দেয় আলোকিত। তাই কোনো ফিতনা তাকে আক্রমণ করতে চাইলে, কালবিলম্ব না করে সে তা প্রত্যাখ্যান করে এবং তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে তাঁর উজ্জ্বলতা এবং আলো ক্রমান্বয়ে আরও প্রখর ও আভাময় হতে থাকে।
টিকাঃ
[৮] সহিহ মুসলিম ২৬৪
📄 ক্বলবের চারটি বিষ
যাবতীয় গুনাহের কাজ কলবের জন্য বিষ স্বরূপ। তার অসুস্থতা এবং ধ্বংসের সোপান। গুনাহের কারণে অন্তরের রোগ প্রকট আকার ধারণ করে এবং আল্লাহ্ তায়ালার আদেশের বিপরীত কামনা বাসনায় ডুবে যায়। গুনাহ অসুস্থতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
ইবনে মুবারক রহিমাহুল্লাহ বলেন- 'আমি গুনাহকে দেখেছি অন্তরসমূহকে নিষ্প্রাণ করে দেয়। গুনাহাসক্তির কারণে কখনো লাঞ্ছিতও হতে হয়।'
'গুনাহ পরিত্যাগ করা অন্তরের জন্য সঞ্জীবনী স্বরূপ। গুনাহ না করাই তোমার নিজের জন্য কল্যাণকর।'
সুতরাং যে চায়, নিজের অন্তর, নিজের জীবন নিরাপদ থাকুক, তার জন্য অপরিহার্য হলো, নিজের অন্তরকে এই বিষের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা। পাশাপাশি নতুন কোনো বিষ যেন আক্রমণ না করতে পারে সেজন্য সদা সজাগ থাকা। আর যদি কদাচিৎ ভুলে একটু বিষ গলাধঃকরণ করেও নেয়, তখন তাওবা ইস্তিগফার এবং বিষ নষ্টকারী নেককাজ দ্বারা তার প্রভাব দূর করা আবশ্যক।
কলবের চারটি বিষ দ্বারা উদ্যেশ্য হলো—১- অতিরিক্ত কথা বলা। ২- অন্যায় দৃষ্টিক্ষেপ। ৩- অতিরিক্ত আহার এবং ৪- অতিরিক্ত মেলামেশা। এই চারটি বিষ অধিক প্রসিদ্ধ এবং কলবের জীবনে অধিক প্রভাব বিস্তার করে। নিম্নে প্রতিটি আলাদা আলাদা একটু বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
📄 অতিরিক্ত কথা
আনাস রদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন-
'কোনো ব্যক্তির ঈমান স্থির হবে না, যদি তার কলব স্থির না হয়। আর তার কলب স্থির হবে না, যদি না তার জিহ্বা স্থির হয়।' [৯]
উক্ত হাদিসে ঈমানের স্থিরতাকে অন্তরের স্থিরতার সহিত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। অতঃপর অন্তরের স্থিরতার জন্য জিহ্বার স্থিরতাকে শর্ত করা হয়েছে। সুতরাং জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ করা এবং অতিরিক্ত কথা বলা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
অন্য এক হাদিসে ইবনে উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-'আল্লাহর জিকির ব্যতীত তোমরা বেশি কথা বলো না; কেননা আল্লাহর জিকির ছাড়া অধিক কথা বললে অন্তর কঠোর হয়ে যায়। আর আল্লাহ্ তায়ালা থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে থাকে কঠোর হৃদয়ের লোকই।'[১০]
উমর বিন খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-'যে বেশি কথা বলবে তার স্খলন হবে বেশি। যার স্খলন বেশি হবে, তার গুনাহ হবে বেশি। আর যার গুনাহ হবে বেশি, তার জন্য জাহান্নামের আগুনই অধিক উপযুক্ত।' [১১]
মুয়াজ রদিয়াল্লাহু আনহুর একটি দীর্ঘ হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
'আমি কি তোমাকে সব কিছুর সার বলে দেবো না? মুয়াজ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি বললাম, অবশ্যই ইয়া রাসুলাল্লাহ। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জিহ্বা ধরে বললেন, 'এটি নিয়ন্ত্রিত রাখো'। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ, 'আমরা যে কথাবার্তা বলি, সেজন্যও কি আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে মুয়াজ, তোমার মা সন্তানহারা হোক! মানুষকে কেবল জিহ্বার উপার্জনের কারণেই অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।' [১২]
'জিহ্বার উপার্জন' দ্বারা উদ্যেশ্য হলো, হারাম কথাবার্তার প্রতিদান ও শাস্তি। কেননা মানুষ তার কথাবার্তা দ্বারা সওয়াব এবং গুনাহের বীজ রোপণ করে। কেয়ামতের দিন এর ফসল কাটবে। সুতরাং যে ভালো কথা বা কাজ রোপণ করবে, সে সম্মান লাভ করবে। আর যে মন্দ কথা বা কাজ রোপণ করবে, সে পাবে অনুতাপ ও লজ্জা।
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যে দুটি অঙ্গ মানুষকে বেশি পরিমাণ জাহান্নামে নিয়ে যাবে তা হলোঃ মুখওলজ্জাস্থান।' [১৩]
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- 'মানুষ এমন অনেক কথা বলে, যাকে সে কোনো অসুবিধা মনে করে না। অথচ এজন্য তাকে সত্তর বছর জাহান্নামে অবস্থান করতে হবে।' [১৪]
উকবা বিন আমীর রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, মুক্তি কোন পথে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—
'নিজের জিহবাকে নিয়ন্ত্রণ করো। নিজের বাড়িতেই অবস্থান করো। নিজের গুনাহের জন্য ক্রন্দন করো।' [১৫]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
'যে ব্যক্তি তার দুই ঠোঁটের মাঝখানের বস্তু (জিহবা) ও দুই পায়ের মাঝখানের বস্তুর (লজ্জাস্থানের) জামিন হবে (অপব্যবহার করবে না), আমি তার জন্য জান্নাতের জামিন হব।' [১৬]
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যে ব্যক্তি আল্লাহ্ এবং আখিরাতের দিনের ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে, অথবা চুপ থাকে।' [১৭]
উক্ত হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভালো কথা বলার আদেশ দিয়েছেন, অন্যথায় চুপ থাকতে বলেছেন। সুতরাং কথা হয়তো ভালো হবে, তাহলে বান্দা সে ব্যাপারে আদিষ্ট। আর যদি ভালো না হয়, তাহলে বান্দা সেক্ষেত্রে চুপ থাকতে আদিষ্ট।
উম্মে হাবিবা রদিয়াল্লাহু আনহা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন-
'মানুষের প্রতিটি কথা তার জন্য অপকারী, উপকারি নয়। তবে।' সৎকাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ এবং আল্লাহ্ তায়ালার জিকির তার জন্য লাভদায়ক। [১৮]
উমর বিন খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু একবার আবু বকর রদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গেলেন। দেখলেন, তিনি তাঁর হাত দিয়ে নিজ জিহ্বা টানছেন। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'থামুন, আল্লাহ্ আপনাকে ক্ষমা করুন'। আবু বকর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এর জন্যই যত বিপদ ঘটেছে'।[১৯]
আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'ওই আল্লাহর শপথ, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমার জিহ্বা ছাড়া অন্য কোনো জিনিষের এতো অধিক দীর্ঘ কয়েদখানার প্রয়োজন নেই'।
তিনি বলতেন—'হে জিহ্বা, ভালো কথা বল, তাহলে লাভবান হবে। মন্দ কথা থেকে চুপ থাকো, তাহলে অপমানের হাত থেকে বেঁচে যাবে'।
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু ইবনে আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, 'কিয়ামতের দিন মানুষের শরীরের কোনো অঙ্গ জিহ্বার চেয়ে অধিক ক্রুদ্ধ এবং রাগান্বিত হবে না। তবে যে তার দ্বারা ভালো কিছু বলেছে কিংবা কল্যাণকর কিছু লিখিয়েছে সে নিরাপদে থাকবে'।
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন—'যে নিজের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করে না, সে তার দ্বীনকেই অনুধাবন করতে পারে নি'।
জিহ্বার সবচেয়ে লঘু রোগ হলো অনর্থক কথা বলা। এই বিপদের ভয়াবহতা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে ব্যক্ত করেছেন যে— 'ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য হলো অনর্থক যাবতীয় বিষয় পরিহার করা।[২০]
আবু উবাইদা, হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করে বলেন, 'বান্দা থেকে আল্লাহ্ তায়ালার মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো, বান্দার আল্লাহ্ তায়ালা থেকে গাফেল হয়ে অনর্থক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়া'।
সাহল রহিমাহুল্লাহ বলেন-'যে অনর্থক কথা বলে, সে সত্য কথা বলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।'
এই যদি হয় জিহ্বার সবচেয়ে লঘু বিপদের ক্ষতির পরিমাণ, তাহলে গীবত, চোগলখুরি, অশ্লীল অন্যায় কথা, দুমুখো কথা, ঝগড়া, বিবাদ, বিতর্ক, গান গাওয়া, মিথ্যা বলা, অযথা তারিফ করা, ঠাট্টা বিদ্রূপ করা, অধিকাংশ কথায় ভুল করা ইত্যাদি প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড বিপদের ক্ষতি কী পরিমাণ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়! এসব বিপদ ব্যক্তির জিহবায় আপতিত হয়ে তার অন্তরকে নষ্ট করে দেয়। ফলে দুনিয়ার সুখ শান্তি বিনষ্ট হয় এবং আখিরাতের সফলতা ও নিষ্কৃতির হয়ে যায় বিনাশসাধন। আল্লাহ্ আমাদের সকলকে হেফাজত করুন। আমিন।
টিকাঃ
[৯] মুসনাদে আহমাদ ১৩০৪৮; তবরানি ১০৪০১
[১০] জামে' তিরমিজি ২৪১১
[১১] তাখরিজুল ইহইয়া, ইরাকী ৩/১৩৭; জামে সগির, সুয়ুতি ৮৯৭১
[১২] জামে তিরমিজি ২৬১৬; মুস্তাদরাক, হাকিম ২/৪১২
[১৩] জামে তিরমিজি ২০০৪
[১৪] জামে তিরমিজি ২৩১৪; ইবনে মাজা ৩৯৭০
[১৫] তিরমিজি ২৪০৬; রিয়াদুস সালিহিন ১৫২৮
[১৬] সহিহ বুখারি ৬৪৭৪
[১৭] সহিহ বুখারি ৬০১৮
[১৮] জামে তিরমিজি ২৪১২
[১৯] জামে সগির, সুযুতি ৫/৩৬৭; সহিহুত তারগিব, আলবানি ২৮৭৩
[২০] জামে তিরমিজি ২৩১৭; ইবনে মাজাহ ৩৯৭৬