📄 ইখলাসের চিকিৎসা
ইখলাসের চিকিৎসা হলো, অন্তরের যাবতীয় কামনাকে পরাস্ত করা, পার্থিব সমস্ত লোভ লালসা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং আখিরাতের জন্য অভিনিবিষ্ট হওয়া; যেন অন্তরে আখিরাতেরই একচ্ছত্র ক্ষমতা পরিচালিত হয়। তাহলেই ইখলাসের পথ সুগম হয়ে যাবে। কতো মানুষ কতো শত আমল করে নিজেকে ক্লান্ত করে ফেলে আর ধারণা করতে থাকে যে, তা একমাত্র আল্লাহ্ তায়ালার জন্যই সম্পাদিত হচ্ছে। অথচ সে প্রবঞ্চিত; কেননা সে আসল রোগের চেহারাটাই উদঘাটন করতে পারে নি।
এক ব্যক্তি সর্বদা মসজিদের প্রথম কাতারে নামায আদায় করতো। একদিন প্রথম কাতার পায় নি বিধায় দ্বিতীয় কাতারে সালাত আদায় করে। লোকজন তাকে দ্বিতীয় কাতারে সালাত আদায় করতে দেখেছে, এই ভাবনায় তার অন্তরে লজ্জার উদ্রেক হলো। তখন সে অনুভব করলো যে, তার প্রথম কাতারে নামায পড়তে ভালো লাগতো এবং তা তার নিকট অতি প্রিয় ছিল এই কারণে যে, 'মানুষ তাকে দেখছে'।
বিষয়টি খুবই সুক্ষ্য এবং রহস্যময়। খুব কম আমলই মুক্ত থাকে এমন ভাবনা থেকে। এর প্রতি সজাগ সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে খুবই স্বল্প মানুষ; তবে আল্লাহ তায়ালা যাদের তাওফিক দান করেন, তারাই পারেন। যারা এ ব্যাপারে অচেতন অসতর্ক, কিয়ামতের দিন তারা নিজেদের যাবতীয় আমল গুনাহে রূপান্তরিত অবস্থায় দেখতে পাবে। তারাই আল্লাহ্ তায়ালার নিম্নোক্ত বাণীদ্বয়ের মূল উদ্দিষ্টঃ আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَ بَدَا لَهُمْ مِّنَ اللَّهِ مَا لَمْ يَكُوْنُوْا يَحْتَسِبُونَ وَ بَدَا لَهُمْ سَيِّاتُ مَا كَسَبُوا
'সেদিন তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন কিছু (শাস্তি) প্রত্যক্ষ করবে, যা তাদের ধারণাতেই ছিল না। তারা যা আমল করেছিল, তার মন্দ ফল তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে যাবে'। [৫]
অন্যত্র বলেন-
قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِيْنَ أَعْمَالًا الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الحيوةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُوْنَ صُنْعًا
'বলুন, আমি কি তোমাদেরকে এমন লোকদের কথা জানাবো, যাদের কর্মসমূহ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত? পার্থিব জীবনে যাদের প্রচেষ্টা বিফল হয়েছে, অথচ তারা মনে করে যে, তারা ভালো কাজ করছে!' [৬]
টিকাঃ
[৫] সুরা যুমার ৪৭
[৬] সুরা কাহাফ ১০৩-১০৪
📄 ইখলাস সম্পর্কে সালাফদের কিছু উক্তি
ইয়াকুব রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'মুখলিস (একনিষ্ঠ) ওই ব্যক্তি, যে নিজের গুনাহ ও মন্দকাজগুলো যেভাবে গোপন রাখে, সেভাবে নিজের নেক কাজগুলোও গোপন রাখে'।
সুসি রহিমাহুল্লাহ বলেন- 'ইখলাস হলো ইখলাসকে না দেখতে পারা; যে ব্যক্তি নিজের ইখলাসের মধ্যে ইখলাস প্রত্যক্ষ করে, তার ইখলাস ইখলাসের মুখাপেক্ষী'। উক্ত কথা দ্বারা উদ্যেশ্য হলো, নিজের আমলকে আত্মশ্লাঘা থেকে নির্মল রাখা। কেননা নিজের আমলকে ইখলাস-মণ্ডিত করা আবশ্যক। কিন্তু নিজেকে মুখলিস একনিষ্ঠ ভাবা এবং তার দিকে পরিতৃপ্তির দৃষ্টিতে তাকানো এটাও একটা বড় ব্যাধি। যার নাম হলো 'উজব' তথা শ্লাঘাবোধ। আর একনিষ্ঠ তো তাই হয়, যা সমস্ত আপদ ও ব্যাধি থেকে মুক্ত হয়। তাই এমন ব্যক্তির ইখলাসের মধ্যেও সমস্যা দেখা দেয়। ফলে তার ইখলাসও নতুন করে পরিশুদ্ধির মুখাপেক্ষী।
আইয়ুব রহিমাহুল্লাহ বলেন—'আমলকারিদের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো নিয়তকে স্বচ্ছ করা'।
কেউ বলেছেন, 'এক মুহূর্তের ইখলাসই চিরকালীন নাজাতের জন্য যথেষ্ট; কিন্তু ইখলাস বড়ই দুর্লভ'।
সুহাইল রহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'মানুষের নফসের জন্য কোন জিনিষ সবচেয়ে বেশি কষ্টকর?' তিনি বললেন, 'ইখলাস; কেননা অন্তরের ইখলাস খুবই বিরল জিনিষ'।
ফুজাইল বিন ইয়াজ রহিমাহুল্লাহ বলেন-'মানুষ দেখে এজন্য আমল ছেড়ে দেওয়া 'রিয়া' তথা আত্মপ্রদর্শনের অন্তর্ভুক্ত। আর মানুষকে দেখানোর জন্য আমল করা হলো শিরক। আল্লাহ্ তায়ালা তোমাকে উভয় থেকে নিরাপদ রাখেন, এটিই হলো ইখলাস'।