📄 লেখকের কথা
إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ صَلَّى اللَّهُ وَسَلَّمَ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِينَ. أَمَّا بَعْدُ
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো তাজকিয়াতুন নুফুস তথা আত্মশুদ্ধি। আল্লাহ্ তায়ালা তাঁকে প্রেরণ করার উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّنَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيْتِهِ وَيُزَكِّيْهِمْ وَ يُعَلِّمُهُمُ الْكِتَبَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوْا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلْلٍ مُّبِيْنٍ
তিনি উম্মিদের মাঝে তাদের মধ্য থেকেই একজন রাসুল পাঠিয়েছেন, যে তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করবে, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত (প্রজ্ঞা) শিক্ষা দিবে। আগে তো তারা স্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যেই ছিল। [১]
সুতরাং যারা আল্লাহেক পেতে চায়, আখিরাতের সাফল্য কামনা করে, তাদের জন্য নিজের আত্মশুদ্ধির প্রতি মনযোগী হওয়া ছাড়া কোনো গত্যান্তর নেই। কুরআনের একটি সুরায় আল্লাহ্ তায়ালা একাধারে এগারটি কসম করে অতঃপর বান্দার সফলতাকে যুক্ত করে দিয়েছেন নিজের আত্মার পরিশুদ্ধির ওপর। পুরো কুরআনে অন্য কোথাও এভাবে একাধারে এতো দীর্ঘ ও বিচিত্র কসমের সারি পাওয়া যায় না। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَالشَّمْسِ وَضُحْبَهَا وَالْقَمَرِ إِذَا تَلْبَهَا وَالنَّهَارِ إِذَا جَلْبَهَا وَ الَّيْلِ إِذَا يَغْشَهَا وَ السَّمَاءِ وَ مَا بَنْهَا وَ الْأَرْضِ وَ مَا طحبها وَ نَفْسٍ وَ مَا سَوْنَهَا فَالْهَمَهَا فُجُوْرَهَا وَتَقْوْنَهَا . قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّهَا وَ قَدْ خَابَ مَنْ دَسْهَا
কসম সূর্যের ও তার আলোর, কসম চাঁদের যখন তা সূর্যের অনুগামী হয়, কসম দিনের যখন তা সূর্যকে প্রকাশ করে, কসম রাতের যখন তা একে ঢেকে রাখে, কসম আসমানের এবং যিনি তা বানিয়েছেন তার, কসম জমিনের এবং যিনি তা বিছিয়ে দিয়েছেন তার এবং কসম মানুষের অন্তরের ও সেই সত্ত্বার যিনি তাকে সুষম করেছেন এবং তাদেরকে তার পাপ ও পুন্যের জ্ঞান দিয়েছেন; নিঃসন্দেহে সে সফলকাম, যে মনকে পবিত্র করেছে। আর যে তাকে কলুষিত করেছে, সে বিফল। [২]
আমাদের পূর্বসূরি উলামায়ে কেরাম তাজকিয়া সম্পর্কে অনেক কিতাব বইপত্র রচনা করেছেন। কিন্তু তার মধ্যে কিছু আছে খুবই দীর্ঘ এবং বড়। তাই সমস্ত মুসলমান সেখান থেকে উপকৃত হতে পারে না। অনুরূপ কিছু বই আছে দুর্বল ও বানোয়াট বর্ণনা ও ঘটনাবলী দ্বারা ভরপুর। তাই তা পাঠ করা নিরাপদ নয়। তাই উম্মাহর উপকারের দিকে লক্ষ্য করে এই বিষয়ক সহিহ ও গ্রহণযোগ্য কিছু বর্ণনা উক্ত গ্রন্থে একত্রিত করার চেষ্টা করেছি। ইবনুল কাইয়িম, ইবনে রাজাব হাম্বলি এবং ইমাম গাজালির মতো প্রাজ্ঞ উলামায়ে কেরামের গ্রন্থ থেকে সেগুলো চয়ন করে এনেছি। আশা করি আল্লাহ্ তায়ালা এর দ্বারা লেখক, পাঠক ও প্রকাশককে উপকৃত করবেন। সম্মানিত করবেন ওই দিন 'যেদিন কোনো সম্পদ কিংবা সন্তানসন্ততি কাজে আসবে না; তবে যে আসবে নিরাপদ অন্তর নিয়ে'। প্রশংসা সব আল্লাহর। তিনি আমাদের মাওলা। তাঁর কাছেই আমরা ফিরে যাবো।
টিকাঃ
[১] সুরা জুমআ ২
[২] সুরা শামস ১-১১
📄 ইলম অর্জন এবং শিক্ষাদানের মর্যাদা
কুরআনে কারিম এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসে শরীয়তের ইলম তথা জ্ঞান অর্জন এবং শিক্ষাদানের অনেক ফজিলত বর্ণিত আছে। তন্মধ্যে কিছু নিম্নে উল্লেখ করা হলো—
আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন- তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে ইলম দান করা হয়েছে, আল্লাহ্ তায়ালা তাদের মর্যাদা সমুন্নত করে দেবেন। [১]
অন্যত্র বলেন- 'বলুন, যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি কখনো সমান হতে পারে?' [২]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— 'আল্লাহ্ তায়ালা যার ব্যাপারে কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তাকে দ্বীনের জ্ঞান দান করেন'। [৩]
অন্যত্র বলেছেন— 'যে ব্যক্তি ইলম অর্জনের জন্য পথ চলে, আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর জন্য জান্নাতের রাস্তা সুগম করে দেন'। [৪]
‘ইলম অর্জনের জন্য পথ চলা’—এর মূল মাধ্যম হলো পায়ে হেঁটে উলামায়ে কেরামের মজলিসে যাওয়া। তবে ইলম অর্জনের যাবতীয় মাধ্যম, পন্থা এবং পরোক্ষ উপকরণও এর অন্তর্ভুক্ত。
‘আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর জন্য জান্নাতের রাস্তা সুগম করে দেন'- এ কথা দ্বারা উদ্যেশ্য হলো, আল্লাহ্ তায়ালা তার জন্য কাঙ্ক্ষিত ইলম সহজলভ্য করে দেবেন। সে তা অর্জন করে সে অনুযায়ী আমল করবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে। এজন্যই ইলমকে জান্নাতে যাওয়ার একটি পথ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
আবার জান্নাতে যাওয়ার রাস্তা বলতে কিয়ামতের দিনের কথাও উদ্যেশ্য হতে পারে। সিরাত অতিক্রম এবং তার আগেপরের বিষয়াদিও এর ব্যাখ্যায় বলা যায়。
জনৈক সালাফ বলতেন, 'সাহায্য-সহযোগিতা লাগবে এমন কোনো তালিবুল ইলম তথা ইলম অন্বেষণকারী আছে!' অর্থাৎ তালিবুল ইলমকে সহযোগিতা করার মাধ্যমে তিনিও জান্নাতের পথে আরেক পা অগ্রসর হয়ে যেতে চাইছেন。
ইলম, আল্লাহ্ পর্যন্ত পৌঁছার নিকটতম একটি উপায়। যে ইলমের পথে চলবে, সে অত্যন্ত সহজভাবে আল্লাহ্ তায়ালা এবং জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। তদ্রুপ ইলম মূর্খতার অন্ধকার, সংশয় এবং দ্বিধা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একটি আলোকবর্তিকা। তাই তো আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর কিতাবের নাম রেখেছেন 'নূর' তথা আলোক。
আবদুল্লাহ বিন উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন- 'আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর বান্দাদের অন্তর থেকে একবারে ইলম ছিনিয়ে নেবেন না; বরং আলেমদের উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ইলম উঠিয়ে নেবেন। অবশেষে যখন একজন আলেমও অবশিষ্ট থাকবে না, তখন মানুষ জাহেল মূর্খদের অনুসৃত বানিয়ে নেবে। তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হলে তারা ইলমহীন ফতোয়া দেবে। ফলে তারা নিজেরা ভ্রষ্ট হবে এবং অন্যদেরও ভ্রষ্ট করবে।' [৫]
উক্ত হাদিস সম্পর্কে উবাদা বিন সামিত রদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, 'তুমি যদি চাও, তাহলে আমি বলতে পারি, মানুষ থেকে কোন ইলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। তা হলো, খুশু তথা একাগ্রতা'。
উবাদা বিন সামিত রদিয়াল্লাহু আনহুর এ কথা বলার কারণ হলো, ইলম দুই ধরণের হয়ে থাকে। তন্মধ্যে একটি হলো ওই ইলম যা মানুষের অন্তরে প্রভাব বিস্তার করে এবং তাকে পরিশুদ্ধ করে। আর তা হলো- আল্লাহ্ তায়ালার সত্ত্বা, তাঁর নামসমূহ এবং তাঁর গুণাবলী সম্পর্কে জানা এবং তাঁর ভয়, গাম্ভীর্য, সম্মান, ভালোবাসা, আশা, এবং নির্ভরতা-সংশ্লিষ্ট যাবতীয় জ্ঞান অর্জন করা। এই জ্ঞানই হলো উপকারি জ্ঞান। একাগ্রতা ও খুশুর সম্পর্ক অন্তরের সাথেই। সুতরাং উবাদা রদিয়াল্লাহু আনহু কেমন যেন অন্তরের জন্য উপকারী ইলম উঠিয়ে নেওয়ার আশংকা প্রকাশ করছেন。
ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'কিছু মানুষ কুরআন পাঠ করে। কিন্তু কুরআন তাদের কণ্ঠাস্থি অতিক্রম করে না। তবে যদি তা অন্তরে প্রবেশ করে এবং প্রোথিত হয়ে যায়, তখন তা উপাদেয় হয়ে যায়'。
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন- 'ইলম দুই প্রকারঃ এক প্রকার ইলম মানুষের জিহ্বার সাথে সম্পৃক্ত। এই ইলম মানুষের বিপক্ষ-দলিল হিসেবে গণ্য (অর্থাৎ মানুষের জন্য ক্ষতিকর)। যেমন হাদিসে আছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'কুরআন, হয়তো তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে'। [৬]
'আরেক প্রকার ইলম মানুষের কলব-সংশ্লিষ্ট। এটিই হলো উপাদেয় ইলম। তবে সর্বপ্রথম উঠিয়ে নেওয়া হবে এই উপাদেয় ইলম। যা কলবের সাথে মিশে যায় এবং তাকে পরিশুদ্ধ করে। পরিশেষে বাকি থাকবে জিহ্বা-সংক্রান্ত ইলম। মানুষ তা তাচ্ছিল্যের সাথে গ্রহণ করবে। সে অনুযায়ী আমল করবে না: ইলম বহনকারীরাও না, অন্যরাও না। অতঃপর এই ইলমও বিলীন হয়ে যাবে, তার বহনকারীদের নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার দ্বারা। তখন সর্বনিকৃষ্ট মানব সভ্যতার ওপর কিয়ামত সংঘটিত হবে'。
টিকাঃ
[১] সূরা মুজাদালা ১১
[২] সুরা যুমার ৯
[৩] সহিহ বুখারি ১/১৯৭; সহিহ মুসলিম ৭/১২৮
[৪] সহিহ মুসলিম ১৭/২১, ৬৭৪৬
[৫] সহিহ বুখারি ১০০
[৬] সহিহ মুসলিম ২২৩
📄 আল্লাহর জিকির ও কুরআন তিলাওয়াত
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ কলবের জন্য জিকিরের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ক আলোচনা করতে গিয়ে লিখেন—‘অন্তরের জন্য জিকির তেমন, মাছের জন্য পানি যেমন। মাছকে যদি পানি থেকে বের করে ফেলা হয় তাহলে তার কী অবস্থা হবে!’
শামসুদ্দিন ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ তাঁর কিতাব ‘আল ওয়াবিলুস সাইয়িব’-এ এই বিষয়ে প্রায় আশিটি ফায়েদা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ্ চাহে তো আমরা এখানে তার মধ্য থেকে কয়েকটি উল্লেখ করব। যেহেতু তা মূল্যবান এবং উপকারী, তাই আমরা হুবহু ওই কিতাব থেকেই তা উদ্ধৃত করছি।
‘জিকির হলো কলব এবং রূহের খোরাক। মানুষের শরীরের খোরাক বন্ধ করে দিলে তার যে অবস্থা হয়, জিকির না করলে অন্তরের অবস্থাও তেমন বিপন্ন হয়’।
‘জিকির শয়তানকে বিতাড়িত করে, দমন করে এবং বশীভূত করে। আল্লাহ্ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করে। অন্তর থেকে দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি দূর করে এবং খুশি আনন্দ ও প্রশান্তির যোগান দেয়। অন্তর এবং চেহারাকে আলোকিত করে। জিকিরকারীর মাঝে গাম্ভীর্য, সজিবতা ও মিষ্টতা তৈরি হয়। অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা, ভয় এবং তাঁর প্রতি বিনয় জন্ম নেয় । অনুরুপ বান্দা আল্লাহ্ তায়ালার জিকির করলে আল্লাহ্ তায়ালাও বান্দাকে স্মরণ করেন। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন—
তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করব। [১]
জিকিরের মাঝে যদি অন্য কোনো উপকারিতা কিংবা পাওনা না থাকতো, তাহলে আল্লাহ্ তায়ালা বান্দাকে স্মরণ করেন এই একটি বিষয়ই তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা অনুধাবনের জন্য যথেষ্ট।
জিকির কলবকে উদাসীনতা থেকে পুনরজাগরিত করে এবং গুনাহগুলো মিটিয়ে দেয়।
জিকির যদিও খুবই সহজ একটি ইবাদত, তথাপি তার জন্য যে পরিমাণ প্রতিদান ও মর্যাদা বরাদ্ধ করা হয়েছে, অন্য কোনো আমলের জন্য তা বরাদ্ধ করা হয় নি। আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদ, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদির' দিনে একশ বার পাঠ করবে, সে দশটি গোলাম আযাদ করার সমান সওয়াব পাবে। তাঁর জন্য একশটি সওয়াব লেখা হবে। তার একশটি গুনাহ মিটিয়ে দেওয়া হবে। ওইদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত সে শয়তান থেকে নিরাপদ থাকবে। কোনো ব্যক্তি তার চেয়ে উত্তম কোনো আমল করতে পারবে না, তবে যে তার চেয়ে অধিক পাঠ করবে সে পারবে।' [২]
জাবির রদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন-
'যে ব্যক্তি বলবে সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি-তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছ রোপণ করা হবে।' [৩]
ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন—'আমার কাছে আল্লাহর জন্য সহস্র তাসবিহ পাঠ করা, আল্লাহর রাস্তায় সে পরিমাণ দীনার ব্যয় করা থেকে অধিক প্রিয়।
জিকির অন্তরের রুঢ়তার ঔষধ। এক ব্যক্তি হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহকে বলল, হে আবু সাইদ, আমার অন্তর অনেক রুঢ়। আপনি কিছু একটা ব্যবস্থা করুন। তিনি বললেন, 'তাকে জিকির দ্বারা সিক্ত করো। মাকহুল রহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহ্ তায়ালার জিকির একটি প্রতিষেধক আর মানুষের জিকির একটি ব্যাধি।
এক ব্যক্তি সালমান রহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করল—'কোন আমলটি সবচেয়ে বেশি উত্তম। তিন বললেন-'তুমি কি কোরআন পাঠ করো না! 'আল্লাহর জিকিরই সবচেয়ে উত্তম'।
আবু মুসা আশআরি রদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন-
'যে স্বীয় রবের জিকির করে আর যে করে না, তাদের উদাহরণ হলো জীবিত এবং মৃত।' [৪]
আবদুল্লাহ বিন বুসর রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার জন্য ইসলামের শরীয়তের বিষয়াদি অধিক হয়ে গেছে। সুতরাং আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলুন যা আমি শক্ত করে ধরে রাখতে পারি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—
'তোমার জিহ্বা যেন সর্বদা আল্লাহ্ তায়ালার জিকির দ্বারা সিক্ত থাকে।' [৫]
সর্বদা জিকির করার দ্বারা কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সাক্ষী বৃদ্ধি পায়। গীবত চোগলখুরি ইত্যাদি অন্যায় কথা থেকে বান্দা নিজের জিহ্বাকে হেফাজত করতে পারে। বান্দার জিহ্বা হয়তো জিকিরকারি হবে, অন্যথায় অনর্থক হবে। সুতরাং যার জন্য জিকিরের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যাবে, সে আল্লাহ্ তায়ালার কাছে যাওয়ার দরজা খোলা পাবে। সে যেন পবিত্র হয়ে তার রবের দরবারে প্রবেশ করে; তাহলে তাঁর কাছে কাঙ্ক্ষিত সবকিছুই পাবে। যদি বান্দা নিজের রবকে পেয়ে যায়, তাহলে সবকিছু পেয়ে যাবে। আর যদি স্বীয় রবকে হারিয়ে বসে, তাহলে সে সবকিছু থেকে বঞ্চিত থাকবে'。
জিকিরের বিভিন্ন ধরণ রয়েছে। যেমন আল্লাহ্ তায়ালার নাম, গুণাবলী, প্রশংসা এবং তার স্তুতি গেয়ে জিকির করা। যেমন সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ্, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ইত্যাদি।
আল্লাহ্ তায়ালার নাম ও গুণাবলীর হুকুম আহকাম বর্ণনা করাও জিকিরের একটি ধরণ। যেমন, এই কথা বলা যে, আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর বান্দাদের আওয়াজ শুনেন এবং তাদের যাবতীয় কার্যাবলী দেখেন।
জিকিরের আরেকটি ধরণ হলো, আল্লাহ্ তায়ালার আদেশ নিষেধের কথা স্মরণ করা ও আলোচনা করা। যেমন বলবে, আল্লাহ্ তায়ালা অমুক কাজের আদেশ দিয়েছেন, এই কাজে আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা আছে-
আল্লাহ্ তায়ালার দয়া ও নিয়ামতসমূহের আলোচনা করাও জিকিরের একটি ধরণ। সর্বোত্তম জিকির হলো কুরআন তিলাওয়াত করা। কেননা সেখানে অন্তরের সমস্ত রোগ এবং তা প্রতিকারের পন্থা উল্লেখ আছে। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
'হে মানুষ, তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এসেছে উপদেশবাণী এবং অন্তরের ব্যাধিসমূহের চিকিৎসা।' [৬]
অন্যত্র বলেন-
‘আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি, যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য এবং অনুগ্রহ। [৭]
কামনা বাসনা এবং সংশয় সন্দেহও কলবের রোগের অন্তর্ভুক্ত। কুরআন এই প্রকার রোগেরও চিকিৎসা করে। কুরআনে এমন স্পষ্ট দলিল প্রমাণ ও অকাট্য যুক্তি উল্লেখ করা হয়েছে, যা সত্য থেকে মিথ্যাকে পৃথক করে দেয়। ফলে বিশ্বাস, কল্পনা এবং অনুভূতি-বিনষ্টকারী সংশয়গুলো দূর হয়ে যায়। তখন সে কুরআনের দৃষ্টিতে সব জিনিষ প্রত্যক্ষ্য করে।
অতএব যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করবে এবং অন্তর দিয়ে অবগাহন করবে তার সরোবরে, সে সত্য ও মিথ্যা অনুধাবন করতে পারবে। দিন ও রাতের মাঝে যেমন পার্থক্য করতে পারে, হক বাতিলের মাঝেও তেমন পার্থক্য নিরূপণ করতে পারবে।
অন্যদিকে যে ব্যক্তি কুরআনে বর্ণিত প্রজ্ঞাবাণী এবং উৎকৃষ্ট উপদেশগুলো পাঠ করবে, দুনিয়াবিমুখী এবং আখিরাতমুখী আয়াতগুলো আত্মস্থ করবে, তার অন্তরের প্রবৃত্তি ও কামনা বাসনার ব্যাধিও সুস্থ হয়ে যাবে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- ‘যে চায় আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসুল তাকে ভালবাসুক, যে যেন কুরআন পাঠ করে। [৮]
কুরআন দ্বারাই বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটে পৌঁছতে পারে। খাব্বাব বিন আরাত্ত রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-'যতো পারো আল্লাহ্ তায়ালার নৈকট্য লাভ করো। আর জেনে রাখো, তাঁর কালামের চেয়ে প্রিয় কোনো মাধ্যমে তুমি তাঁর নৈকট্য অর্জন করতে পারবে না'।
ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-'যে কুরআনকে ভালোবাসে, সে আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসুলকে ভালোবাসে।'
উসমান বিন আফফান রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-'তোমাদের অন্তর যদি পবিত্র হয়ে যায়, তবুও তোমাদের রবের কালাম থেকে তা পরিতৃপ্ত হবে না’。
পরিশেষে আমরা বলব, বান্দার জন্য সবচেয়ে উপকারী উপাদান হলো আল্লাহ্ তায়ালার জিকির করা এবং কুরআন তিলাওয়াত হলো আল্লাহ্ তায়ালার সবচেয়ে উন্নত জিকির। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
শুনে রাখো, আল্লাহর জিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে। [৯]
টিকাঃ
[১] সুরা বাকারা ১৫২
[২] সহিহ বুখারি ৩২৯৩
[৩] জামে তিরমিজি ৩৪৬৫
[৪] সহিহ বুখারি ৬৪০৭
[৫] জামে তিরমিজি ৩৩৭৫
[৬] সুরা ইউনুস ৫৭
[৭] সুরা ইউনুস ৫৭
[৮] শুয়াবুল ঈমান, বাইহাকি ২২১৯; সিলসিলাহ সহিহা ২৩৪২
[৯] সূরা রাদ ২৮
📄 ইস্তিগফার
ইস্তিগফারের শাব্দিক অর্থ ক্ষমা প্রার্থনা করা। ক্ষমা প্রার্থনা করার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, গুনাহ গোপন করত তার অভিশাপ ও আজাব থেকে নিরাপত্তা এবং রক্ষা করার আবেদন করা। কুরআনে কারিমে ইস্তিগফারের আলোচনা এসেছে অনেক বার। কখনো আল্লাহ্ তায়ালা আদেশ দিয়ে বলেছেন-
'তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তায়ালা ক্ষমাশীল এবং দয়াবান।' [১]
আবার কখনো ইস্তিগফারকারীদের প্রশংসা করেছেন। যেমন আল্লাহ্ তায়ালা প্রশংসিত বান্দাদের ফিরিস্তি উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন-
'এবং শেষ রাতে ক্ষমা প্রার্থনাকারী।' [২]
যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
‘যে কোনো মন্দ কাজ করে কিংবা নিজের ওপর জুলুম করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহেক ক্ষমাশীল এবং দয়াবান পাবে’। [৩]
আবার অনেক স্থানে ইস্তিগফারকে তাওবার সাথে যুক্ত করে উল্লেখ করেছেন। তখন ইস্তিগফারের অর্থ হবে মুখে ক্ষমা প্রার্থনা করা। অন্তর যুগপৎ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্বারা গুনাহ পরিহার করা, এরই নাম তাওবা。
ইস্তিগফারের হুকুম এবং দোয়ার হুকুম অভিন্ন। অর্থাৎ আল্লাহ্ তায়ালা চাইলে তার আবেদন রক্ষা করে তাদের ক্ষমা করে দেবেন। বিশেষত যখন গুনাহের ভারে ন্যুজ কোনো হৃদয় থেকে সে আহ্বান প্রস্ফুটিত হয় কিংবা শেষ রাত, সালাত-পরবর্তী সময় ইত্যাদি গুনাহ কবুল হওয়ার সময়গুলোতে দোয়া করা হয়, তখন আল্লাহ্ তায়ালা অধিক হারে তা গ্রহণ করেন。
লুকমান আলাইহিস সালাম তাঁর ছেলেকে সম্বোধন করে বলেছেন—‘হে আমার ছেলে, ‘আল্লাহ্ আমাকে ক্ষমা করে দিন’ এই কথা দ্বারা তোমার জিহ্বাকে অভ্যস্ত করে নাও। কেননা আল্লাহ্ তায়ালার এমন কিছু সময় আছে, যখন তিনি কোনো ভিখারিকেই খালি হাতে ফেরান না’。
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন—‘তোমরা তোমাদের ঘরে, দস্তরখানে, পথেঘাটে, বাজারে, আসরে এবং যেখানেই থাকো বেশি বেশি ইস্তিগফার করো। কেননা কখন ক্ষমা নাযিল হয় তা তোমাদের জানা নেই।’
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
‘আল্লাহর শপথ, আমি দিনে সত্তর বারের চেয়েও অধিক আল্লাহ্ তায়ালার কাছে তাওবা ইস্তিগফার করি’। [৪]
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-
‘এক বান্দা গোনাহ করে। তারপর সে বলে, হে আমার রব, আমি একটি গুনাহ করেছি, আমাকে ক্ষমা করে দিন। তখন তার রব বলেন, আমার বান্দা কি এ কথা বিশ্বাস করে যে, তার একজন রব আছে, তিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং এর কারণে শাস্তিও দেন? আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম। অতঃপর ওই বান্দা কিছুকাল আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী গুনাহ থেকে বেঁচে থেকে আবারও একটি গুনাহ করে। এরপর সে বলে, হে আমার রব, আমি আবারও গুনাহ করেছি, আমাকে ক্ষমা করে দিন। তার রব তখন বলেন, আমার বান্দা কি এ কথা বিশ্বাস যে, তার একজন রব আছেন, তিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং এর কারণে শাস্তিও দেন? আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম। অতঃপর ওই বান্দা কিছুকাল আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী গুনাহ থেকে বেঁচে থেকে আবারও একটি গুনাহ করে। এরপর সে বলে, হে আমার রব, আমি আবারও গুনাহ করেছি, আমাকে ক্ষমা করে দিন। তার রব তখন বলেন, আমার বান্দা কি এ কথা বিশ্বাস যে, তার একজন রব আছেন, তিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং এর কারণে শাস্তিও দেন? এরপর তিনি তিনবার বলেন, আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম। সে যা ইচ্ছা করুক।' [৫]
‘সে যা ইচ্ছা করুক’ অর্থাৎ যতদিন সে গুনাহ করে ইস্তিগফার করার এই অবস্থায় বহাল থাকবে, ততদিন আল্লাহ্ তায়ালা তার তাওবা কবুল করতে থাকবেন। তবে এখানে ইস্তিগফার দ্বারা এমন ইস্তিগফার উদ্দেশ্য, যার সাথে গুনাহ একেবারে পরিহার করা এবং পুনরায় না করার দৃঢ় সংকল্প থাকবে。
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন—'সুসংবাদ ওই ব্যক্তির জন্য, যে নিজ আমলনামায় প্রচুর ইস্তিগফার পাবে।'
অতএব এ কথা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, গুনাহের ঔষধ হলো ইস্তিগফার । কাতাদা রহিমাহুল্লাহ বলেন—‘এই কুরআন তোমাদেরকে তোমাদের রোগ এবং ঔষধ উভয়টি দেখিয়ে দিয়েছে। তোমাদের রোগ হলো গুনাহ। আর ঔষধ হলো ইস্তিগফার'。
আলী রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—'আল্লাহ্ তায়ালা যে বান্দাকে আজাব দিতে চান, তাকে ইস্তিগফারের তাওফিক দেন না'。
টিকাঃ
[১] সুরা বাকারা ১৯৯
[২] সুরা আলে ইমরান ১৭
[৩] সুরা নিসা ১১০
[৪] সহিহ বুখারি ৬৩০৭
[৫] সহিহ বুখারি ৭৫০৭