📄 হজম শক্তির ওপর রোযার প্রভাব
আমরা জানি, হজম ব্যবস্থা দেহের অনেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এর প্রতিটি অঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ। যেমন- মুখ, জিহ্বা, মাঢ়ি, মুখের লালা, গলা এলিমেন্টারি ক্যানেল (গলা হতে পাকস্থলী পর্যন্ত খাদ্যবাহী নালী ইত্যাদি)। এ ছাড়া রয়েছে খাদ্য গ্রহণকারী অস্ত্র, লিভার, অস্ত্রের বিভিন্ন অংশ। এ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, একটি অন্যটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর একটি চালু হলে অন্যগুলো আপনা আপনি কম্পিউটারী ব্যবস্থার মতো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। যখন আমরা খেতে শুরু করি বা খাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করি, তখনই এ সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রতিটি অঙ্গ তার নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করতে থাকে। সমগ্র ব্যবস্থা চব্বিশ ঘণ্টা কর্মরত হতে দায়িত্ব পালন করে।
রোযা এক মাসের জন্যে হজম প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত অঙ্গ প্রত্যঙ্গসমূহের আরামের ব্যবস্থা করে। তবে হজমের ক্ষেত্রে লিভারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রোযায় লিভারের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে। কারণ লিভার খাদ্য হজম করা ছাড়াও আরও পনেরটি অতিরিক্ত কাজ সম্পন্ন করে। ফলে লিভার ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে পড়ে। রোযার মাধ্যমে এ হজম ব্যবস্থা চার হতে ছয় ঘণ্টা বিশ্রাম লাভ করে। এ বিশ্রাম রোযা ব্যতীত সম্পূর্ণ অসম্ভব। খুব সামান্য পরিমাণ খাদ্য এমনকি এক গ্রামের দশ ভাগের এক ভাগ পরিমাণ খাদ্যও যদি পাকস্থলীতে প্রবেশ করে, এতেই সমগ্র হজম ব্যবস্থা নিজের কাজ শুরু করে দেয়। লিভার সাথে সাথে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ হতে দাবী করা যায়, এ বিরতির মেয়াদ বছরে এক মাস হওয়া আবশ্যক।
বর্তমান যুগের মানুষ জীবনের অসাধারণ মূল্য নির্ধারণ করেছে। তারা চিকিৎসার নানা রকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিজেদের নিরাপদ ভাবতে শুরু করে, কিন্তু লিভার যদি কথা বলতে সক্ষম হতো তবে সে মানুষকে বলতো, তোমরা একমাত্র রোযার মাধ্যমে আমার ওপর বড়ো রকমের দয়া করতে পারো।
লিভারের ওপর রোযার বরকতসমূহের মধ্যে একটি রক্তের রাসায়নিক কার্যক্রমের প্রভাবের সাথে সংশ্লিষ্ট। লিভারের জটিল ও কঠিন কাজসমূহের মধ্যে একটি কাজ হচ্ছে হজম করা এবং হজম না হওয়া খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। লিভারকে হয়তো প্রতিটি লোকমা পাকস্থলীর স্টোরে পৌঁছে দিতে হয় অথবা খাদ্য হজম হয়ে রক্তের সাথে মিশে যাওয়ার কার্যক্রম তদারক করতে হয়। রোযা রাখার সময়ে লিভার শক্তি সঞ্চারক খাদ্যদ্রব্য পাকস্থলীতে পৌছে দেয়ার কাজ হতে বিরত থাকতে পারে। এ সময়ে লিভার রক্তে গ্লোবুলিন সৃষ্টির কাজে মনোযোগী হতে পারে। রোযার মাধ্যমে গলা এবং অত্যন্ত স্পর্শকাতর খাদ্যনালী বিশ্রাম পায়। আল্লাহর পক্ষ হতে বান্দাকে দেয়া এ তোহফার কোনো মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
রোযার মাধ্যমে মানুষের পাকস্থলী অত্যন্ত কল্যাণকর প্রভাব অর্জন করে। এ সময়ে পাকস্থলী হতে বের হওয়া লালা চমৎকারভাবে ভারসাম্য খুঁজে পায়। এ কারণে রোযার সময়ে এসিডিটি সঞ্চিত হয় না। অথচ রোযার সময় ব্যতীত অন্য সময়ের ক্ষুধায় এসিডিটি বেড়ে যায়। কিন্তু রোযার নিয়ত করার পর এসিডিটি তৈরি হওয়া বন্ধ থাকে। এ নিয়মে খাদ্যনালীতে লালা সৃষ্টিকারী কোষ রমযান মাসে বিশ্রামে চলে যায়। যারা সারাজীবনে কখনো রোযা রাখে না তাদের দাবীর বিপরীতে এটা প্রমাণিত হয়েছে, একটি স্বাস্থ্যবান পাকস্থলী সন্ধ্যায় ইফতার করার পর সফলতার সাথে হজমের কাজ সম্পন্ন করে।
রোযা পাকস্থলীর অস্ত্রসমূহকেও বিশ্রাম দেয় এবং এতে সেগুলো সজীবতা লাভ করে। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর লালা এবং পাকস্থলীর কার্যক্রম জোরদার হয়। রোযার মাধ্যমে অস্ত্রের জাল যেমন নতুন সজীবতা লাভ করে, ঠিক তেমনি হজম নালীর ওপর হওয়া সকল রোগের আক্রমণ হতেও নিরাপদ থাকে।
📄 রোযার মাধ্যমে রক্তের ওপর কল্যাণকর প্রভাব
দিনের বেলায় রোযা রাখার কারণে রক্তের পরিমাণ কমে যায়। এ রক্ত স্বল্পতা হৃৎপিণ্ডকে খুবই কল্যাণকর বিশ্রাম দেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে, ইন্টারসেলুলার বা কোষের আন্তঃসংযোগ কমে যাওয়ার কারণে টিস্যুর ওপর চাপ কমে যায়। টিস্যুর ওপর চাপ অথবা ডায়াসটোলিকের চাপ হৃৎপিণ্ডের জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোযার মাধ্যমে ডায়াসটোলিকের ওপর প্রেসার সব সময়েই কম থাকে। সে সময় হৃৎপিণ্ড থাকে বিশ্রামে। বর্তমানে বস্তুবাদী আদর্শে জীবনযাপনের কারণে মানুষ হাইপার টেনশনে ভুগতে থাকে। রমযানের এক মাসের রোযা ডায়াসটোলিকের ওপর প্রেসার কমিয়ে দেয়ার কারণে মানুষ অবর্ণনীয় উপকার লাভে সক্ষম হয়। রোযার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়ে রক্ত চলাচল ব্যবস্থার ওপর। রক্ত চলাচল কোষের দুর্বলতার কারণে রক্তের মধ্যে অবশিষ্ট রেমন্যান্টিস মিশ্রিত হতে পারে না। অথচ ইফতারের সময় এ রক্ত চলাচল স্বাভাবিকতা অর্জন করে। ফলে রক্ত চলাচলকারী কোষের দেয়ালের মধ্যে চর্বিসহ অন্য উপাদান সঞ্চিত হতে পারে। এ কারণে বর্তমান যুগের অনেক ধরনের বিপজ্জনক রোগ হওয়ার আশংকা দূর হয়ে যায়। রোযার সময়ে কিডনীও বিশ্রাম লাভ করে। মোটকথা, মানব দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ রোযার বরকতের কারণে সম্পূর্ণ সুস্থ এবং কর্মক্ষম হয়ে ওঠে।
📄 সেল বা কোষের ওপর রোযার প্রভাব
রোযার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়ে সেলসমূহের ভারাসাম্য সৃষ্টির উপর। রোযার মাধ্যমে দেহের সেল বা কোষ বিশ্রাম লাভ করে। লালাযুক্ত ঝিল্লিকে বলা হয় ইপিথেলিয়াল সেল। এ সেল বা কোষ দেহের বর্জ্য নিষ্কাশনের দায়িত্ব পালন করে। রোযার মাধ্যমে এসব কোষ বিশ্রাম পাওয়ার কারণে তাদের পুষ্টি নিশ্চিত হয়। দেহের এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সারা বছর রমযান মাসের প্রতীক্ষায় থাকে। কারণ রোযার মাধ্যমে তাদের বিশ্রামের সুযোগ ঘটে। অধিকতর সক্রিয় হওয়ার জন্যে নিজের মধ্যে তারা সজীবতা লাভে সক্ষম হয়।
📄 নার্ভ সিস্টেমের ওপর রোযার প্রভাব
একটা কথা মনে রাখতে হবে, রোযা রাখার সময় কিছু লোকের মধ্যে যে রুক্ষ্মতা উগ্রতা লক্ষ্য করা যায়, এর সাথে নার্ভ সিস্টেমের কোনো সম্পর্ক নেই। এ রকম অবস্থার জন্যে মানুষের ব্যক্তিগত রুক্ষ্ম স্বভাব এবং উগ্র মেজাজ দায়ী। রোযা রাখার সময়ে নার্ভ সিস্টেম সম্পূর্ণ শান্ত থাকে। ইবাদতের মাধ্যমে অর্জিত প্রশান্তি আমাদের মনের সকল কলুষ, কালিমা, ক্রোধ দূর করে দেয়। অধিকতর খুশুখুযু বা বিনয় ও নম্রতা প্রকাশের কারণে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার আশায় সকল প্রকার উদ্বেগ উৎকণ্ঠা দূর হয়ে যায়। বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতা মানুষের ওপর যে মানসিক চাপ সৃষ্টি করে রোযার কারণে তা প্রায় সম্পূর্ণই লোপ পেয়ে যায়। রোযা রাখার ফলে আমাদের যৌন আকাঙ্ক্ষা সুপ্ত থাকে, তাই আমাদের মনস্তত্ত্বের ওপর বিরূপ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় না।
রোযা এবং অজুর সম্মিলিত প্রভাবে যে রকম দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় জন্ম নেয়, এর ফলে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলে ভারসাম্য সৃষ্টি হয়। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যের নার্ভ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এক অপার্থিব প্রশান্তিতে মন পরিপূর্ণ হয়ে যায়। মানুষের জন্যে রোযা যে আল্লাহর অনুগ্রহ, এটা বোঝার আরেকটি উপায় হলো, রোযার সময় সকল প্রকার উদ্বেগ হতে মুক্ত ও পরিচ্ছন্ন থাকা যায়।