📄 নেশা, স্বাস্থ্য, ইসলাম ও আধুনিক বিজ্ঞান
সকল ধর্মের মধ্যে একমাত্র ইসলামেরই এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে যে, ইসলাম মানুষের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করেছে। হালাল-হারাম, জায়েয-নাজায়েয বিষয় বিবেচনা করে ইসলাম মানুষের ওপর বড় রকমের অনুগ্রহ করেছে।
মূসা (আ)-এর শরীয়তে কিছু জিনিস হালাল এবং কিছু জিনিস হারাম করা হয়েছিলো বটে, কিন্তু হালাল হারাম নির্ধারণের কোনো কারণ ব্যাখা করা হয়নি। নেশাজাত জিনিসের ব্যাপারে তাওরাতে কোনো নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয় নি; বরং মদের বিষয়ে প্রশংসা বাক্য লিখিত রয়েছে। হিন্দু ধর্মে আফিম, ভাং, চস ইত্যাদি নেশাজাত জিনিস ব্যবহার করা ধর্মীয় বিধানের অন্তর্ভুক্ত। হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদে সোমরস বা ভাং পানের উপকার বর্ণনা করার প্রশংসা করা হয়েছে।
খ্রিষ্টান অধ্যুষিত দেশসমূহের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মদের ব্যবহার এতো বেশি যে, মনে হয় সেসব অনুষ্ঠানে যেন মদের ঝর্ণা প্রবাহিত হয়। বড় দিন উপলক্ষে মদে ভেজানো রুটি তাদের ইবাদাতগোজার নারী পুরুষ, শিশু, যুবক ও বৃদ্ধদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এ রুটি যীশুর গোশত এবং মদকে যীশুর রক্তের সাথে তুলনা করা হয়ে থাকে।
বর্তমান যুগে উন্নত বা উন্নয়নশীল অমুসলিম দেশসমূহেও মদ এবং অন্যান্য নেশাজাত দ্রব্যকে জীবনের প্রয়োজনীয় অংশ মনে করা হয়। যুদ্ধের সময় কর্তৃপক্ষ সৈন্যদের পর্যাপ্ত পরিমাণে মদ সরবরাহ করে থাকে। এ কারণে যুদ্ধের সরঞ্জামের মধ্যে বিপুল পরিমাণ মদও পরিবহন করা হয়।
সকল প্রকার নেশাজাত দ্রব্য সম্পর্কে সূরা বাকারার ২৭ তম রুকূ'তে বলা হয়েছে, লোকে যদি তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, বলো, উভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। তবে এতে মানুষের জন্যে উপকারও আছে, কিন্তু তার পাপ উপকার অপেক্ষা অধিক। (সূরা বাকারা) ইসলামে সকল প্রকার নেশাজাত দ্রব্য-আফিম, চরস, ভাং, মদ ইত্যাদি সম্পূর্ণ হারাম করা হয়েছে। পরিমাণ কম বেশি যা-ই হোক, সম্পূর্ন নিষিদ্ধ।
সূরা মায়েদার ১২তম রুকূ'তে বলা হয়েছে, হে মুমিনরা, মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক সব ঘৃণ্য বস্তুই শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন করো। যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায় এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণে ও সালাতে বাধা দিতে চায়। তবে কি তোমরা নিবৃত্ত হবে না?
রাসূল (সা) বলেছেন, যে জিনিস বেশি নেশা সৃষ্টি করে তা স্বল্প পরিমাণে ব্যবহার করাও হারাম।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, মানুষের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করেই ইসলামে হালাল হারাম নির্ধারণ করা হয়েছে। মদ এবং অন্যান্য নেশাজাত দ্রব্যাদির মন্দ প্রভাব মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর পড়ে। এ প্রভাব কিভাবে পড়ে সেটা বর্তমান যুগের ককটেল পার্টিতে গেলেই বুঝা যায়।
কেউ কেউ বর্তমানে মদের ব্যাপক প্রচলনের যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করে থাকে। তারা বলে, শীতকালে শীত হতে আত্মরক্ষার প্রয়োজনে সামান্য কিছু পরিমাণ মদ পান করা দূষণীয় নয়। অধিক মদ পান করা হলে মানুষের বিবেকবুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়, এ কারণে অধিক মদ পান নিষিদ্ধ, কিন্তু যারা এরকম যুক্তি দেখায় তারা বুঝতে পারে না যে, মদ হচ্ছে এক প্রকারের কাদা, যে কেউ যদি একবার এতে জড়িয়ে যায়, তবে সেই কাদা হতে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয় না। কাদায় ক্রমেই নীচের দিকে তলিয়ে যেতে থাকে। ক্ষতিকর কোনো জিনিসের অল্প পরিমাণ হতে যদি মানুষ বিরত না থাকে তবে অধিক ব্যবহারের ক্ষতি হতেও মানুষ নিজেকে রক্ষা করতে পারে না। ছোট পাপ করার ফলে বড়পাপের সাহস মনে তৈরী হয়ে যায়।
মহানবী (সা) হারাম জিনিসকে সরকারি চারণভূমির সাথে তুলনা করেছেন। সরকারি চারণভূমির ধারে কাছেও পশু চারণ বিপজ্জনক। কাজেই সেই চারণভূমির ধারে কাছেও যাওয়া যাবে না।
১৯৮৫ সালে বার্তা সংস্থা স্টার পরিবেশিত এক খবরে বলা হয়েছে, ইন্ডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডাক্তার রোলোহারজার লিখেছেন, মদের প্রভাব অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মস্তিস্কের ওপর পড়ে। মদ পান করার সাথে সাথে তা রক্তের সাথে মিশে গিয়ে কয়েক সেকেন্ড মস্তিস্কে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সামান্য পরিমাণ মদও প্রতিক্রিয়াবিহীন থাকে না।
মদের মন্দ প্রভাবের কারণে মুসলমানরা মদকে উম্মুল খাবায়েছ, অর্থাৎ সকল দুষ্কর্মের উৎসমূল আখ্যায়িত করেছে। শুধু মদ নয়, সকল নেশাজাত দ্রব্যই দুষ্কর্মের মূল। কারণ প্রতিটি নেশাজাত জিনিসই মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। আফিম, ভাং, চরস ইত্যাদি নেশাজাত দ্রব্য মানুষের রক্তে একপ্রকার জোশ সৃষ্টি করে। মদ পান করার পর সে ব্যক্তি হুশ জ্ঞান হারিয়ে কখনো গালাগাল করতে থাকে, কখনো নিজের জীবন বিসর্জন দিতে যায়, কখনো কাউকে প্রহার করতে যায়, কখনো কাঁদে, কখনো ভয় পেয়ে কাঁপতে থাকে। নেশায় আচ্ছন্ন ব্যক্তি এমন বিস্ময়কর আচরণ শুরু করে যে, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কোনো মানুষ সে ব্যক্তিকে দেখাও পছন্দ করে না।
মদপানে অভ্যস্ত ব্যক্তিদের এ হতে বিরত রাখার জন্যে জাপানী পুলিশ একবার একটি ব্যতিক্রমধর্মী কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলো। নেশায় আচ্ছন্ন ব্যক্তির কর্মতৎপরতা ভিডিও করে রাখা হয়। সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ কর্মকর্তা এ ব্যবস্থা করেন। নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির জ্ঞান ফিরে আসার পর তার নেশাগ্রস্ত অবস্থার কর্মতৎপরতা তাকে দেখানো হলে সে তখন লজ্জায় ম্রিয়মাণ হয়ে যায়। মাথা নীচু করে থাকে।
বোম্বাইতে আমি নিজে একটি বিস্ময়কর দৃশ্য দেখেছি। মিল কারখানার নারী এবং পুরুষ শ্রমিকরা বেতন পাওয়ার সাথে সাথে নিজের সন্তানসহ মদ-তাড়ির দোকানে চলে যায়। সেখানে নিজে মদ পান করে এবং ছোট শিশুদের মেরে মেরে মদ তাড়ি পান করায়। এ কারণেই ইসলাম মদপানের মজলিসের কাছে যেতেও নিষেধ করেছে।
ইউরোপ আমেরিকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কার্যক্রম দেখে অবাক না হয়ে পারা যায় না। তারা কোকেন, ভাং, চরস, আফিম, ঘুমের ওষুধ বিভিন্ন দেশে আমদানী রফতানি সম্পর্কে কঠোর ভূমিকা পালন করে। মদের সাথে সংশ্লিষ্ট অপরাধ দমনেও তারা পালন করে বিশেষ ভূমিকা। এসব অপরাধীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, অর্থ জরিমানাসহ নানারকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা করে, কিন্তু তাদের দেশে মদের ব্যাপক ব্যবহারের ভয়ানক ক্ষতি সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ নির্বিকার। তারা মনে করে মদ তাদের সভ্যতা সংস্কৃতির অঙ্গ।
ফ্রান্সের হোটেলসমূহে খুব কম দামে মদ পাওয়া যায়। অথচ সাদা পানি পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৫৬ সালের এক রিপোর্টে জানা যায়, মদপানের কারণে সৃষ্ট মারাত্মক রোগে প্রতিবছর ফ্রান্সে পনের হাজার লোক মৃত্যুবরণ করে। এর কয়েকগুণ বেশি লোক মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে। প্রতি পঁয়ত্রিশ মিনিটে একজন লোক মদপানজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট একবার সৌদি বাদশাহ শাহ সউদকে সৌদি আরবে মদ নিষিদ্ধ করায় প্রশংসা করে বলেন, আমেরিকায় প্রতিবছর ৬৮ হাজার মানুষ মদপানের কারণে মৃত্যুবরণ করে।
উপরোল্লিখিত পরিসংখ্যান সামনে নিয়ে চিন্তা করলে বুঝা যাবে, সমগ্র বিশ্বে মদপানের কারণে প্রতিবছর কতো সংখ্যক মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হয়।
রাসূল (সা) মদ পান করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, মদ পান করবে না কারণ মদ হচ্ছে সকল মন্দের উৎস। সাধারণত মদপানের কাজে ব্যবহার হয় এ রকম পাত্র ব্যবহার করতেও রাসূল (সা) নিষেধ করেছেন।
মদ ছাড়া অন্যান্য মাদকদ্রব্যের ব্যবহারও মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনে। এসব হচ্ছে সিগারেট, চা, আইসক্রিম এবং অন্যান্য মাদকদ্রব্য। উল্লিখিত পাঁচটি জিনিস ধূমপান, চা, আইসক্রিম, মদ এবং অন্যান্য মাদকদ্রব্যকে অনেকেই নেশাজাত জিনিস মনে করে না। বিশেষত ধূমপান, চা, আইসক্রিম তো নেশাজাত জিনিস হিসেবে অনেকেই মানতে চায় না। এ কারণে শিশু, যুবক, বৃদ্ধ নারী পুরুষ সবাই এসব জিনিসের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এসব জিনিসকে মনে করা হয় জীবনের অংশ। কিন্তু দ্বিধাহীনভাবে দাবী করা যায়, উল্লিখিত পাঁচটি জিনিসই স্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকর।