📄 মদ মানবতার নিকৃষ্ট শত্রু
আল্লাহ্ তায়ালা কুরআনে বলেন, "তোমাকে তারা মদ এবং জুয়ার বিধান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, এ দু’টি জিনিসের মধ্যে জঘন্যতম অকল্যাণ রয়েছে, যদিও কিছু কল্যাণও রয়েছে, কিন্তু অকল্যাণের পরিমাণ কল্যাণের চেয়ে অধিক।"
📄 অধ্যাপক হার্শ-এর লিখিত গ্রন্থের পর্যালোচনা
স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কিত বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হার্শ এ বিষয়ের ওপর একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তথাকথিত সভ্যতার দাবীদার আমেরিকা মদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে পরের বছরও তা বহাল রাখতে পারেনি। অথচ ইসলাম চৌদ্দ'শ বছর আগেই মদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং মানবতাকে অনেক ক্ষতি হতে রক্ষা করেছে।
কুরআনের তিনটি সূরায় মদ সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সূরা বাকারায় এ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে সেটা পরে উল্লেখ করবো। দ্বিতীয়ত সূরা নিসার ৪৩ নং আয়াতে মদ নিষিদ্ধকরণ সম্পর্কিত বিধান দেয়া হয়েছে। তৃতীয়ত সূরা মায়েদার ৯০ ও ৯১ নং আয়াতে এ সম্পর্কিত বিবরণ দেয়া হয়েছে। কয়েকজন মুফাস্সিরের মতে, মদ সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞার আয়াত পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হয়েছে। অন্যান্য আলেমদের মতে, মদ সম্পর্কিত বিধানে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। একটি আদেশ অন্য আদেশের পরিপূরক। আপাতদৃষ্টিতে বর্ণনায় পার্থক্য দেখা গেলেও মৌলিক বিষয়ে কোনো পার্থক্য নেই।
মদ পান করা কিংবা মজুদ রাখার অনুমতি উল্লিখিত তিনটি সূরার একটিতেও দেয়া হয়নি। তিনটি সূরার বর্ণনাতেই মদ হতে সৃষ্ট সমস্যাসমূহ আলাদাভাবে বর্ণনা করার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। উপরোক্ত আয়াতে মদের অপকারিতা বস্তুগত দৃষ্টিকোণ হতে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে যেহেতু আমরা কুরআনের আয়াতকে বিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ করছি, কাজেই উপরোক্ত আয়াতও বিজ্ঞানের আলোকেই ব্যাখ্যা করা হবে ইনশাআল্লাহ।
মদ মানুষের দেহে কি রকম বিষাক্ত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে সে সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমে মদের রাসায়নিক অংশ সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে হবে।
রসায়ন বিজ্ঞানের আলোকে আমরা একথা জানি, মদের মধ্যে বিশেষ শক্তিসম্পন্ন এ্যলকোহলসহ আরও বিভিন্ন উপাদান রয়েছে। খাদ্য পানীয় হজম করার ক্ষেত্রে মদের কোনো ভূমিকা নেই; বরং হজমের ক্ষেত্রে ব্যাক্টেরিয়া সৃষ্টি করে নতুন সমস্যার জন্ম দেয়। এ কারণেই মানবদেহের জন্যে মদ একটি ক্ষতিকর কেমিক্যাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। মদের বিষাক্ত উপাদান মানুষের হৃৎপিণ্ডে সরাসরি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। খাদ্যদ্রব্য হিসেবে মদের কোনোই গুরুত্ব নেই। যারা মদ পান করে তারা যদিও এটাকে এক প্রকার খাদ্য হিসেবে দাবী করে। মদ পেটের ভেতর পৌঁছার পর অন্যান্য খাদ্যের বিপরীতে নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত অবস্থার সৃষ্টি করে।
📄 হজম শক্তির ওপর মদের প্রভাব
মদের প্রভাব প্রথমে পড়ে মুখের ওপর। সাধারণত মুখের ভেতর বিশেষ রকমের ফ্লোরা থাকে। এটা এক ধরনের লালা। মদের ঝাঁঝের কারণে এ লালার শক্তি কমে যায়। ফলে দাঁতের মাঢ়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যারা নিয়মিত মদ পান করে তাদের দাঁত খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়, কালচে রং ধারণ করে। মুখের পরে মদের প্রভাব পড়ে গলা এবং খাদ্যনালীর ওপর। এ দু’টি অঙ্গ পরস্পর সংযুক্ত। এই খাদ্যনালী মানবদেহের জন্যে প্রয়োজনীয় এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ সম্পন্ন করে। খাদ্যনালীতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি পর্দা রয়েছে। ইংরেজিতে একে বলা হয় মুকাস মেমব্রেনস। এ স্পর্শকাতর পর্দার ওপর মদের প্রভাব পড়ে তীব্রভাবে। এতে ঐ পর্দায় এক প্রকার জ্বালা যন্ত্রণা হয়। ফলে ঐ খাদ্যনালীতে দুর্বলতা দেখা দেয়। গলা ও খাদ্য নালীতে ক্যান্সার মদের কারণেই হয়ে থাকে। যেসব প্রতিষ্ঠান ঘাতকব্যাধি ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সোচ্চার তারা ১৯৮০ সালের পর হতে মদের বিরুদ্ধে সুদূরপ্রসারী দৃঢ় কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
একথা তো সবাই জানে, মদের কারণে পাকস্থলীতে গ্যাস্ট্রিক তৈরী হয়। গ্যাস্ট্রিক হওয়ার কারণ হচ্ছে, পাকস্থলীতে লিপিড নামের একটি চর্বি রয়েছে যা মদের দ্বারা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লিপিড পাকস্থলী রক্ষকের ভূমিকা পালন করে। লিপিড থাকার কারণে পাকস্থলীতে হাইড্রোক্লোরিক এসিড কোনো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না। মদের কারণে গলায় এবং খাদ্যনালীতে ক্যান্সার হয় এটা নিশ্চিত প্রমাণিত, কিন্তু পাকস্থলীর ক্যান্সার মদের কারণে হয় কিনা এটা এখনো প্রমাণিত হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই ইতোমধ্যে এ রকম সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, পাকস্থলীর ক্যান্সারও মদের কারণেই হয়ে থাকে।
মদপানের সবচেয়ে বেশি প্রভাব অত্যন্ত নাজুক ১২টি অস্ত্রের ওপর পড়ে।:. এটা হচ্ছে প্রচণ্ড রাসায়নিক প্রভাব। মদ সেখানে রাসায়নিক প্রভাব বিস্তার করে যেখানে হজমের জন্যে লালা বের হয়। যারা নিয়মিত মদপান করে তাদের অস্ত্র এবং পিণ্ডের ঝিল্লি সব সময় রোগাক্রান্ত থাকে। অথবা এদের কাজ স্বাভাবিক থাকে না। এ অবস্থা গ্যাস এবং বদহজমের মাধ্যমে মদপানকারীকে সমস্যায় ফেলে। পাকস্থলীর এ সমস্যা অস্ত্রের ওপরেও প্রভাব বিস্তার করে। ফলে হজমের কম্পিউটার সাদৃশ ব্যবস্থা তছনছ হয়ে যায়। যদিও একজন সুস্থ সবল মানুষের যাবতীয় খাদ্যই হজম হয়ে যায়, কিন্তু এটা হজম ব্যবস্থাকে বিশেষ নির্দেশ প্রদানের মাধ্যমেই কার্যকর হয়। মদ্যপায়ীদের এ ব্যবস্থার ওপর কোনো প্রকার নিয়ন্ত্রণ থাকে না। হজম ব্যবস্থায় গোঁজামিল সৃষ্টি হয়। ফলে মানুষ মোটা হয়ে যায়। দেহকোষে চর্বির পরিমাণ বেড়ে যায়। চর্বি অধিক পরিমাণে মায়োকর্ষিক টিস্যুর ওপর প্রভাব বিস্তার করে। পরিণামে গুরুতর হৃদরোগ সৃষ্টি হয়।
মদের সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়ে লিভারের ওপর। মানুষের লিভার হচ্ছে একটি স্পর্শকাতর ল্যাবরেটরির মতো। এ লিভারে মদের প্রতি ফোঁটা বিষের মতো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। লিভারের ওপর মদের প্রভাব দু'ভাবে হয়ে থাকে।
প্রথমত, মদপান লিভারের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত করে। দ্বিতীয়ত, লিভারের রাসায়নিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত স্পর্শকাতর। মদের বাধাহীন প্রভাবে লিভারকে একই কাজ বার বার সম্পন্ন করতে হয়। পর্যায়ক্রমিক পরিশ্রমের কারণে লিভার দুর্বল হয়ে যায়, পরিণামে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। এক পর্যায়ে লিভার অকেজো এবং নষ্ট হয়ে যায়। অতিরিক্ত মদপানের কারণে একে একে লিভারের সকল কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়ে পড়ে। লিভার রক্ত তৈরীর কাজ করে, কিন্তু মদ্যপায়ীর লিভার পরিমিত রক্ত উৎপাদনে সহায়তা করতে পারে না। এ কারণেই দেখা যায়, যারা নিয়মিত মদ পান করে তারা ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে যায়। যদিও বাইরে হতে দেখলে তাদেরকে স্বাস্থ্যবান এবং সবল মনে হয়। কারণ তাদের শরীরের রক্ত তৈরীর কার্যক্রম অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। বিশেষত লিভারের যে শক্তির সাহায্যে দেহের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য রক্ষা পায় এবং হিমোগ্লোবিন তৈরী হয়, সেটা মদ্যপায়ীদের বিশেষভাবে কমে যায়। এর ফলে তাদের দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে না বললেই চলে।
মদপানের ফলে লিভারের স্বাভাবিক তৎপরতা হঠাৎ করে কমে যাওয়ার কারণে বেহুশ হয়ে যায় এবং অজ্ঞান অবস্থায় তার মৃত্যুও হয়। একে বলা হয় লিভারের ব্যাংকরাপথেসি। মদপানে লিভারের ক্ষতি হয়নি এরকম একজন লোকও পাওয়া যাবে না। বিষয়টি এর চেয়ে বিস্তারিতভাবে এবং গুরুত্বের সাথে ব্যাখ্যা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
📄 রক্ত চলাচল ব্যবস্থার ওপর মদের প্রভাব
রক্ত চলাচল ব্যবস্থার ওপর মদের প্রভাব দু'ভাবে পড়ে। প্রথমত লিভারের সরাসরি প্রভাবে। দ্বিতীয়তঃ প্রভাব পড়ে মিকার্ডো টিস্যুর ওপর। এ প্রভাব পড়ার কারণে লিভার পরোক্ষভাবে রক্তের মধ্যে চর্বি জাতীয় খাদ্য মিশিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এর মধ্যে দুর্বলতা তৈরী হয়। পরিণামে প্রবাহিত রক্তে আর্টেরিওস ক্লোরোসিস ছড়িয়ে পড়ে। এতে করে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন তৈরী হয়। অন্যদিকে মদের দ্রুত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির কারণে রক্ত প্রবাহের বিশেষ পদ্ধতিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়ে পরিণামে মানসিক ক্লান্তি সৃষ্টি হয়। উপরন্তু মদের কারণে হৃদপিণ্ডে চর্বির অংশ জমা হয়। ফলে দেহের অঙ্গসমূহে শিথিল ভাব তৈরি হয়। এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, মদ্যপায়ী লিভারের সমস্যায় আক্রান্ত হবার ফলে হয় তো হার্টফেল করে অথবা তার লিভার নষ্ট হয়ে যায়। যারা হৃদরোগে আক্রান্ত হয় তাদের জন্যে এক ফোঁটা মদও মারাত্মক ক্ষতি করে। এ রকম ব্যক্তি মদ স্পর্শ করলে বুঝতে হবে, সে জীবনের প্রতি কোনো ভালোবাসা রাখে না, অথবা নিজের দেহের কোনো অংশের ক্ষতির সে পরোয়া করে না।
এক শ্রেণীর রসবোধসম্পন্ন মানুষ মনে করে, সামান্য পরিমাণ মদ পান করা হলে মন প্রফুল্ল হয় এবং ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। এ কারণে এটাকে মদপানের উপকারিতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়, কিন্তু বাস্তবতা ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এরকম চিন্তার কোনো অবকাশ নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানে মদের উপকারিতা সম্পর্কে এরকম কোনো কথা নেই, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে কিছু লোক চিকিৎসাবিজ্ঞানের নামে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক তথ্য উপস্থাপন করে থাকে।
মদ কিডনির ওপর গুরুতর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিডনি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কিডনি মানবদেহে চালুনির কাজ সম্পন্ন করে থাকে। যে মদে এলকোহলের পরিমাণ কম থাকে সে মদও কিডনির জন্যে ক্ষতিকর। এ কারণেই দেখা যায়, যারা নিয়মিত বিয়ার পান করে তাদের অধিকাংশেরই কিডনি নষ্ট হয়ে যায়।
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে উল্লেখ করেছেন, তিনি তাঁর রহমত দিয়ে মানব জীবনকে নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করেছেন। যদি আমরা মহান আল্লাহর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে অবস্থান না করতাম তাহলে পান করার সাথে সাথেই বুঝতে পারতাম, মানবদেহের জন্যে মদ কতোটা ক্ষতিকর। কিছু লোক গালভরা দাবী করে, মদপানে তাদের নেশা হয় না, কিন্তু এ দাবী শিশুদের মতো অবুঝ লোকেরাই করতে পারে যা আত্মপ্রতারণার শামিল।