📄 তাহাজ্জুদের সময়
অভিজ্ঞজনদের অনেক বিশ্লেষণ-এর দ্বারা তাহাজ্জুদ নামাযের মাধ্যমে নিম্নলিখিত উপকারিতা অর্জনের বিষয় প্রমাণিত:
১. তাহাজ্জুদের সময়ে নামায আদায় করা অস্বস্তি ও নিদ্রাহীনতার চিকিৎসা।
২. তাহাজ্জুদ নামায হার্টের রোগের বড় ধরনের ওষুধ।
৩. তাহাজ্জুদের সময় নামায আদায় করা স্নায়ুর সংকোচন ও বন্ধনের জন্য উপকারী।
৪. মস্তিষ্কের রোগ বিশেষ করে পাগল হওয়ার মতো মারাত্মক সমস্যার জন্য শেষ চিকিৎসা হলো তাহাজ্জুদ।
৫. তাহাজ্জুদের সময় নামায আদায় করা দৃষ্টির রোগগুলোর পরিপূর্ণ চিকিৎসা। তাহাজ্জুদের নামায বিশেষভাবে ঐসব লোকের জন্য নিরাময় যারা প্রত্যেক জিনিস দুটি দুটি দেখে।
৬. তাহাজ্জুদের নামায মানবদেহে বুদ্ধি, আনন্দ এবং আসাধরণ শক্তি সৃষ্টি করে যা নামাযীকে সারাদিন উৎফুল্ল রাখে।
এছাড়াও তাহাজ্জুদ নামাযের দ্বারা মানুষ আল্লাহ তায়ালার সাথে একান্ত নৈকট্য হাসিল করে। রাতের কিছু অংশ ঘুমানোর পরে এটা বুঝতে হবে যে, মধ্যরাতের পর হতে সুবহে সাদিকের আগে আগে তাহাজ্জুদের নামাযের সময়। নামাযী যখন তাহাজ্জুদ নামাযের জন্য ঘুম হতে জেগে উঠে তখন ঐ সময় তার মধ্যে এমন শক্তি সৃষ্টি হয় যে, তার অনুভূতি অদৃশ্য নড়াচড়া এবং অদৃশ্য রশ্মিগুলো সহজে গ্রহণ করে নেয়। এজন্য সুফিয়া কেরাম (র) বলেন, যে আল্লাহর ওলী যা কিছু অর্জন করেছেন তা তাহাজ্জুদের নামাযের মাধ্যমেই অর্জন করেছেন। তাহাজ্জুদ গোযারের সাথে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার খাস দীদার লাভের সৌভাগ্য অর্জিত হয়। এজন্য আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য হাসিল ও মারেফাত অর্জনের সর্বশেষ সিঁড়ি হলো তাহাজ্জুদের নামায।
📄 তাহাজ্জুদের উপকারিতা
মুলতানের নিশতার মেডিকেল কলেজের মেডিসিনের অধ্যাপক ডাক্তার নূর আহমদ তাহাজ্জুদ নামাযের উপকারিতা সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, হতাশ এবং অবসাদ বিষয়ে পাশ্চাত্যের মনস্তত্ত্ববিশারদ ডাক্তারদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে খাইবার মেডিকেল কলেজের মনস্তত্ত্ববিদরা আমাকে জানিয়েছেন। তাদের মতে, যেসব মুসলমান তাহাজ্জুদ নামাযের সময়ে জাগ্রত হয় তারা কখনো হতাশা এবং অবসাদে আক্রান্ত হন না। তাদের মতে হতাশা এবং অবসাদের চিকিৎসাই হচ্ছে তাহাজ্জুদের সময়ে জাগ্রত হওয়া।
মনস্তত্ত্ববিদরা হতাশার রোগীদের নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। গবেষণার পর তারা হতাশা এবং অবসাদের রোগীদের তাহাজ্জুদের সময়ে জাগাতে শুরু করেন। এসব রোগী ঘুম হতে জেগে কিছু পাঠ করতেন তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়তেন। কয়েক মাস এ নিয়ম পালন করার ফলে তারা অনেকটা সুস্থ হয়ে ওঠেন। ওষুধ ছাড়াই তাদের রোগ ভালো হয়ে যায়। ফলে পশ্চিমা ডাক্তাররা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, মধ্যরাতের পর জাগ্রত হওয়াটা হচ্ছে হতাশা এবং অবসাদগ্রস্ত রোগীদের একমাত্র প্রতিষেধক।
অভিজ্ঞতা এবং গবেষণায় একথা দিবালোকের মতো সত্য প্রমাণিত হয়েছে যে, রুগ্ন, অসুস্থ, অর্ধমৃত এবং অনিদ্রার রোগীদের নানা রকমের চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দুনিয়া ও আখেরাতের জন্যে কল্যাণকর একটি চিকিৎসাও রয়েছে। এ চিকিৎসা হচ্ছে নামায। যাদের দেহের ভেতর নানাবিধ আভ্যন্তরীণ রোগ রয়েছে তারা যদি রাতের শেষদিকে জেগে কাটায় তবে তাদের দেহ অবশ্যই এর সুফল লাভ করে। মনস্তত্ত্বের চিকিৎসক এবং মস্তিষ্ক বিশেষজ্ঞরা এ সম্পর্কে প্রমাণিত কিছু গবেষণার কথা উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন, রমযানে মুসলমানদের মধ্যে ডিপ্রেশন বা অবসাদ রোগ কম দেখা যায়। রমযান মাসে চিকিৎসকের কাছে অবসাদের রোগী খুব কম আসে। এর কারণ স্বরূপ তারা উল্লেখ করেন, রমযান মাসে মুসলমানরা রাত্রি শেষে সেহরী খায়, তাহাজ্জুদ নামায আদায় করে, ফলে তাদের মধ্যে ক্লান্তি এবং অবসাদ দেখা দেয় না। এ কারণেই চিকিৎসকরা এরকম সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, শেষ রাতে জেগে থাকা স্বাস্থ্যের জন্যে অত্যন্ত উপকারী।
১৯৮৫ ইং সনের জানুয়ারি হতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লাহোরের আল্লামা ইকবাল মেডিকেল কলেজের মনস্তত্ত্ব ও মস্তিষ্ক বিজ্ঞান বিভাগ অবসাদ সংক্রান্ত এক কর্মসূচি গ্রহণ করে। এ কর্মসূচিতে অবসাদ বা ডিপ্রেশনের রোগীদের একত্রে রাখা হয়। নারী পুরুষ নির্বিশেষে ৬৪ জন রোগী মনোনীত করা হয়। এদেরকে ৩২ জন করে দুই ভাগে ভাগ করে প্রথম দলের ২১ জনের জন্যে তাহাজ্জুদ নামায বাধ্যতামূলক করা হয়। দ্বিতীয় দলের ৩২ জনকে শেষ রাতে কিছু সময় জেগে থেকে যারা তাহাজ্জুদ আদায় করবে তাদের প্রতি দৃষ্টি রাখার কথা বলা হয়। এ সকল রোগী দীর্ঘদিন যাবৎ অবসাদে ভুগছিলেন এবং নানা রকমের চিকিৎসাও তারা গ্রহণ করেছেন। উল্লেখিত চিকিৎসার সময়ে অন্য সকল প্রকার ঔষধ তাদের জন্যে নিষিদ্ধ করা হয়।
উভয় দলের জন্যে রাত ২টা হতে রাত ৪টা পর্যন্ত জেগে থাকা বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়। প্রথম দলকে বলা হয়, তারা আল্লাহর যিকির, কুরআন তেলাওয়াত এবং তাহাজ্জুদ নামায আদায় করবে। এ সময়ে কুরআনের এ দুটি আয়াত কয়েকশ বার পাঠ করতে বলা হয়।
১. আলাবিযিকরিল্লাহি তাৎমাইননুল কুলুব। (সূরা রা'আদ: আয়াত-২৮)
২. ওয়া ইযা মারিদতু ফাহুয়া ইয়াশফিন। (সূরা আশশু'আরা: আয়াত-৮০)
রোগীদের বলা হয়, তারা যেন যিকিরের সময়ে মন নরম রাখে এবং নিজেদের মহান আল্লাহর নিকটবর্তী মনে করে। এ দলের নামকরণ করা হয় রিসার্চ গ্রুপ। দ্বিতীয় দলকে নাম দেয়া হয়েছিলো কন্ট্রোল গ্রুপ। তাদের বলা হয়। তারা যে দুই ঘণ্টা জেগে থাকবে সে দুই ঘণ্টা তারা ছোটখাটো কাজ কর্ম করবে অথবা বই পড়বে। সপ্তাহে দুবার এ রোগীদের পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হতো। চার সপ্তাহ পর রোগীদের হেমিলটন ডিপ্রেশন স্কেল দিয়ে নিরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায়, যারা ছোট খাটো কর্ম করেছে এবং বই পড়েছে, অর্থাৎ কন্ট্রোল গ্রুপ তাদের তুলনায় যারা নামায, কুরআন তেলাওয়াত এবং যিকির করেছে তাদের রোগ অনেক কমে গেছে।
তাহাজ্জুদ নামায রোগীদের সরল সঠিক পথ নির্দেশ করে। এ নামায যদি গভীর মনোযোগের সাথে আদায় করা যায়, এ নামাযে যদি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটানো যায় তবে সুফল অবধারিত। এর ফলে রোগের প্রকোপ কমে যাবে এবং জীবন সুন্দর সুখময় হয়ে ওঠবে। কারণ যারা তাহাজ্জুদ নামায আদায় করে তারা মানসিক প্রশান্তি লাভ করে।
তাহাজ্জুদ নামায হচ্ছে একটি মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা। এ নামায আদায়ের শিক্ষা কুরআন হতে সংগ্রহ করা হয়েছে। সফলতার দিক হতে পাশ্চাত্যের চিকিৎসা ব্যবস্থা এ চিকিৎসার ধারে কাছেও আসতে পারে না। একজন মুসলমান মনে প্রাণে একথা বিশ্বাস করে, সে আল্লাহ পাকের একজন ক্ষুদ্র দাস। একথাও বিশ্বাস করে যে, তার জীবন মৃত্যু আল্লাহর হাতে রয়েছে। জীবনের নানারকমের সমস্যা ও জটিলতায় আল্লাহ পাকই মুক্তি দিয়ে থাকেন, একথাও একজন মুসলমান পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করে।