📄 মুখমণ্ডল ধোয়া
অজু করার সময় একবার চেহারা ধোয়া ফরয এবং তিনবার ধোয়া নবী করীম (সা)-এর মুবারক সুন্নাত। চেহারার সীমা মাথার চুলের গোড়া হতে নিয়ে চিবুকের নিচ পর্যন্ত এবং এক কানের লতি হতে অপর কানের লতি পর্যন্ত। হাদীস শরীফে চেহারা ধৌত করা রহমতের কারণ। এ সম্পর্কে নবী করীম (সা) ইরশাদ করেন-
فَإِذَا غَسَلَ وَجْهَهُ خَرَجَتِ الْخَطَايَا مِنْ وَجْهِهِ حَتَّى تَخْرُجَ مِنْ تَحْتِ أَشْفَارِ عَيْنَيْهِ.
অর্থ: অজুকারী যখন নিজ চেহারা ধৌত করে তখন তার চেহারার গুনাহগুলো ঝরে যায় এমনকি চোখের পালকের শিকড় হতেও বের হয়ে যায়।
এরপরে নবী করীম (সা) আরো বর্ণনা করেন : অজুকারী যখন মুখমণ্ডল ধোয় তখন সকল গুনাহ এবং অপরাধ এমনভাবে পবিত্র হয়ে যায়, যেন আজই তার মা তাকে জন্ম দিয়েছে।
(মুসনাদে আহমদ, হা/১৯০৯১ খ.-৫, আরবি পৃ. ২৬৬)
মুখমণ্ডল ধোয়ার অনেক বেশি চিকিৎসাগত, প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক উপকারিতা রয়েছে। নিচে সে সম্পর্কে কিছু বর্ণনা করা হলো :
চেহারা ধোয়ার বড় হিকমত নিহিত রয়েছে যে, এর দ্বারা অবয়বে নম্রতা ও সূক্ষ্মতার সৃষ্টি হয়। ময়লা ধুলার দ্বারা বন্ধ লোমকূপ খুলে যায়। চেহারা উজ্জ্বল, পূর্ণ আকর্ষণ ও ভীত হয়ে যায়। মুখ ধোয়ার সময় পানি যখন চোখের মধ্যে যায় তখন এর দ্বারা চক্ষুর অবয়বে শক্তি পৌঁছায়। গোলকের সাদা এবং মনির মধ্যে উজ্জ্বলতা বেড়ে যায়। অজুকারীর চোখ পূর্ণ আকর্ষণীয় সুশ্রী ও নিদ্রালু হয়ে যায়। চেহারার ওপর তিনবার হাত বুলানোতে সীনা ও মস্তিষ্কের ওপর প্রশান্তি আসে।
আজকাল যখন আমরা ঘর হতে বের হই এবং আমাদের চলাচল এমন স্থান দিয়ে হয় যেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে জীবাণু পাওয়া যায়। যেমন অনেক স্থানে ময়লা ধুলার বর্জ্য-স্তুপ পড়ে রয়েছে অথবা প্রাণী বা মানুষের বর্জ্য খোলা পড়ে রয়েছে, কোথাও বিভিন্ন প্রাণীর দেহাবশেষ যেমন নাড়ী-ভুড়ি, রক্ত ইত্যাদি নিক্ষেপ করা হয়েছে। এসব স্থান জীবাণুর স্বর্গরাজ্য এবং যখন এটা খোলা পড়ে থাকে তখন এর জীবাণু পরিবেশে ছড়িয়ে থাকে এবং যখন মানুষ এসব স্থান অতিক্রম করে তখন এসব জীবাণু মানুষের হাত, চেহারার ওপর আক্রমণ করে এবং আমরা যখন দৈনিক কমপক্ষে পাঁচবার আমাদের চেহারা মোবারক ধৌত করি তখন এসব জীবাণু হতে আমরা বেঁচে থাকতে পারি যা চেহারায় পৌঁছানোর পর নাক-মুখের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে বিভিন্ন ধরনের রোগের কারণ ঘটাতে পারে না।
আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় সমস্যা ময়লা আবর্জনা। শিল্পের উন্নতি আমাদেরকে এ কঠিন সমস্যার ব্যাপারে অধিক সজাগ করে। কারখানার চিমনি হতে বের হওয়া গ্যাস এবং গাড়ির সাইলেন্সার হতে বের হওয়া ধোয়া দ্বারা পরিবেশ দূষিত হয়ে যাচ্ছে। এ আবহাওয়ার মধ্যে কার্বন-ডাই অক্সাইড এবং কার্বন-মনো-অক্সাইড ব্যতীত সালফার-ডাই-অক্সাইড মিশে যাচ্ছে। যদি এসব গ্যাস হাওয়ার মধ্যে বেশি বেশি থাকে এবং একজন মানুষের ঘামের সাথে সংমিশ্রণ ঘটে তাহলে চেহারার ওপর থাকা ঘামের ফোঁটা এই গ্যাসের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে বিভিন্ন ধরনের গ্যাস (কার্বন এসিড, সালফিউরিক এসিড) এ পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং এই ঘাম দ্বারা সৃষ্ট এসিড মানব চর্মকে খারাপ করে দেয়। এজন্য চেহারা ধোয়ার দ্বারা ঘাম এবং বিষাক্ত ক্যামিক্যাল ইত্যাদি ধুয়ে চলে যায় এবং মানুষ চর্মরোগ এবং চেহারার অ্যালার্জী হতে মুক্ত ও নিরাপদ থাকে।
অজুর মাধ্যমে চেহারা ধোয়ার দ্বারা মানুষ বিভিন্ন রোগ হতে বাঁচতে পারে। চোখের অসুখের সময় ডাক্তারগণ বার বার চোখ ধোয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
হাকীম মুহাম্মদ তারিক মাহমুদ চাগতাঈ-এর মতে অজু করার পর যে অঙ্গগুলো ভিজে যায়, মেডিকেল সাইন্স অনুযায়ী যদি এ অঙ্গগুলো আর্দ্র থাকে তাহলে চোখের রোগ হতে মানুষ বেঁচে যায় এবং যে সব চোখে কাঁচে আর্দ্রতা কমে, তা শেষ হয়ে যায় এবং রোগী ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে।
দিনের মধ্যে বারবার অজুর জন্য চেহারা ধৌত করার কারণে এর সৌন্দর্য বেড়ে যায়। আমেরিকার কাউন্সিল ফর বিউটি-এর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য লেডিবিচার এক আশ্চর্য ও চমৎকার তথ্য আবিষ্কার করেছেন। তার বক্তব্য হলো যে, মুসলমানদের কোনো প্রকারের মেডিক্যাল জাতীয় (Madicated) লোশনের প্রয়োজন নেই। তারা ইসলামী অজুর মাধ্যমে চেহারা ধুতে থাকে এবং মুসলমানগণ কয়েকটি রোগ হতে বেঁচে থাকে।
📄 দাড়ি খিলাল করা
অজু করার সময় হালকা দাড়ি ধোয়া যায় এবং ঘন দাড়ি আঙ্গুল দ্বারা খিলাল করে চুলগুলোকে ভিজানো হয়, এটা নবী করীম (সা)-এর সুন্নাত। দাড়ি ধোয়া অথবা খিলাল করার দ্বারা চুলের গোড়া ভিজে যায় এবং সেগুলো মজবুত ও পরিষ্কার হয়ে যায়। দাড়ি খিলাল করার দ্বারা সব প্রকারের জীবাণু (Common Germs) এবং (Contaglious Germs) ইত্যাদি দূর হয়ে যায়। দাড়ির চুলে জমে থাকা পানি গলায় শক্তি যোগায়। এভাবে থাইরয়েড গ্লান্ড এবং গলার সকল রোগ হতে বাঁচায়।
নবী করীম (সা)-এর সব কথায় হিকমত ও কল্যাণ রয়েছে। অজু ও নামায-এর বিধানাবলি যা একাধারে প্রভুর সন্তুষ্টি ও আত্মিক উন্নতি এবং কল্যাণ সাধিত হয়। ঐভাবে মানবদেহ এবং দুনিয়ার জীবন-এর কয়েকটি সমস্যা হতে বেঁচে যায়।
আজ মানুষের দুনিয়া-আখেরাতের জীবনের কল্যাণ ও সফলতার নিশ্চয়তা একমাত্র ইসলামের বিধানের ওপর আমল করা, অপর কোনো ধর্ম এরূপ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী নয়। ঐ কারণে সব ধর্ম বাতিল হয়ে গিয়েছে এবং আল্লাহ তা'আলা ইসলামকে কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী রাখবেন।
📄 কনুই পর্যন্ত হাত ধোয়া
অজু করার সময় কনুইসহ হাত একবার ধোয়া ফরয এবং তিনবার ধোয়া সুন্নাত। মুমিন বান্দার এ ধরনের আমলকে রহমতের কারণও বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে নবী করীম (সা) ইরশাদ করেন:
فَإِذَا غَسَلَ يَدَيْهِ خَرَجَتِ الْخَطَايَا مِنْ يَدَيْهِ حَتَّى تَخْرُجَ مِنْ تَحْتِ أَظْفَارِ يَدَيْهِ.
অর্থ: যখন হাত ধৌত করে তখন হাতের গুনাহ ঝরে যেতে থাকে এমনকি নখের নিচ দিয়েও করতে থাকে।
(সুনানে নাসায়ী: হা/১০৩ মাথাসহ দুই কান মাসেহ অধ্যায়- ১০৩ নম্বর)
📄 মাথা মাসেহ করা
এক-চতুর্থাংশ মাথা মাসেহ করা ফরয এবং একবার পূর্ণ মাথা মাসেহ করা সুন্নাত। মুসলমানদের এক আমলকেও খারাপ কাজের কাফফারা নির্ধারণ করে দিয়েছেন? এ ব্যাপারে নবী করীম (সা) ইরশাদ করেন-
فَإِذَا مَسَحَ بِرَأْسِهِ خَرَجَتِ الْخَطَايَا مِنْ رَأْسِهِ حَتَّى تَخْرُجَ مِنْ تَحْتِ أُذُنَيْهِ.
অর্থ: অজুকারী যখন মাথা মাসেহ করে, তখন তার মাথা হতে গুনাহসমূহ ঝরতে থাকে এমনকি তার দুই কানের নিচ হতেও। (সুনানে নাসায়ী, হা/১০৩ মাথাসহ কান মাসেহ করা অধ্যায়- ১০৩ নম্বর)
মাথা মাসেহ করার মধ্যেও অনেক বৈজ্ঞানিক হিকমত পাওয়া যায়। যেহেতু জ্ঞানবান বলতে জানেন যে, মাথার ওপরের চুল মানুষের এন্টেনার (Antenna) কাজ করে থাকে। এ কথা সব অনুভূতিসম্পন্ন লোকই জানে যে, মানুষ তথ্যের ভান্ডারের নাম। যতক্ষণ পর্যন্ত যেকোনো কাজের ব্যাপারে খবর না পায় ততক্ষণ পর্যন্ত সে কোনো কাজ করতে পারে না।
যেমন খাদ্য আমরা খাই যখন ক্ষুধা লাগে, পানি তখন পান করি যখন ভেতর হতে পানি পানের চাহিদা সৃষ্টি হয়। শোবার জন্য বিছানার ওপর ঐ সময়ে শুয়ে পড়ি যখন আমাদের এ খবর মিলে যে, আমাদের শিরাগুলোর আরামের প্রয়োজন। খুশির জবা বা অনুভূতি আমাদের ওপর ঐ সময় প্রকাশিত হয় যখন আমাদের খুশির বিষয়ে কোনো খবর জমা হয়। এরূপে অসন্তুষ্টি, রাগ ইত্যাদিও খবরের ওপর নির্ভর করে হয়।
অজু করার নিয়ত মূলত আমাদের এ কথার দিকে মনোযোগ সৃষ্টি করে যে, আমরা এ কাজ আল্লাহ তাআলার জন্য করছি। অজুর বিধান পূর্ণ করার পর যখন আমরা মাথা মাসেহ পর্যন্ত পৌঁছি তখন আমাদের মেধা আল্লাহ ব্যতীত অন্য শক্তি হতে ঘুরিয়ে আল্লাহ তায়ালার সত্তার দিকে কেন্দ্রিভূত হয়। মাসেহ করার সময় যখন আমরা মাথার ওপর হাত বুলাই মাথার চুলগুলো (Antenna) এ কথাকে গ্রহণ করে যা সকল প্রকারের কুসংস্কার, বঞ্চনা এবং আল্লাহ তা'আলার গণ্ডির বিপরীত, অর্থাৎ বান্দার মেধা এ সংবাদকে গ্রহণ করে যা সকল সংবাদের মূল উৎস (আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা) এর রাস্তাই আমাদের রাস্তা।