📄 হাত ধোয়া
যখন অজু করা হয় তখন সর্বপ্রথম দুহাত তিনবার ধোয়া হয়, এরূপ করা নবী করীম (সা)-এর সুন্নাত। হাদীস শরীফে এরূপ কাজকে গুনাহ হতে পাক করে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেহেতু রাসূল (সা) ইরশাদ করেছেন-
فَإِذَا غَسَلَ يَدَيْهِ خَرَجَتِ الْخَطَايَا مِنْ يَدَيْهِ حَتَّى تَخْرُجَ مِنْ تَحْتِ أَظْفَارِ يَدَيْهِ.
অর্থ: যখন হাত ধৌত করে তখন হাতের গুনাহ পড়ে যেতে থাকে, এমনকি নখের নিচ দিয়েও পড়তে থাকে। (সুনানে নাসায়ী: হা/১০৩ মাথাসহ দুইকান মাসেহ অধ্যায়: ১০৩ নম্বর)
যেহেতু হাত ধোয়ার দ্বারা মানবদেহে প্রচুর পরিমাণে উপকার সাধিত হয়, এর কয়েকটি আলোচনা করা হলো:
আমরা বিভিন্ন জিনিস হাত দ্বারা ধরে থাকি, যেহেতু হাত খোলা থাকে এতে হাতের ওপর বিভিন্ন রোগের জীবাণু বা বিভিন্ন কেমিক্যাল (Chemicals) বিদ্যমান থাকে যা আমাদের হাতকে কলুষিত করে। যদি হাত না ধুয়ে কুলি করা হয় বা নাকে পানি দেয়া হয় তাহলে এসব জীবাণু সহজেই আমাদের মুখ বা নাকের মাধ্যমে দেহের মধ্যে প্রবেশ করে এবং দেহকে নানা প্রকারের রোগে আক্রান্ত করে। এজন্য হাত ধোয়ার উপর এতোই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে যাতে বিভিন্ন ধরনের রোগ আমাদের দেহের মধ্যে প্রবেশ করতে না পারে। এর ধারাবাহিকতায় আমেরিকার অধ্যাপক ডাক্তার সাহেদ আতহার এম. ডি লিখেছেন-
Hand washing is being emphasized more and more in Hospitals now in order to prevent spread of germs. However Non-Maslim did not know that hand washing is so importan has been ordered in the Quran 1400 years ago. (Health Guidelines from Quran and Sunnah P.60)
বর্তমানে হাত ধোয়ার ওপরে যথেষ্ট জোর দেয়া হচ্ছে, হাসপাতালগুলোতে যাতে জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে না পারে। অমুসলিমগণ জানেন না যে, হাত ধোয়ার ওপরে যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
খাজা শামসুদ্দিন আজিমী লিখেছেন, যখন অজু করি তখন আঙ্গুলের ফাঁকগুলো হতে বের হওয়া রশ্মিগুলো এমন বৃত্ত তৈরি করে যে, যার ফলে আমাদের অভ্যন্তরীণ অন্ধকার দূরীকরণের, বৈদ্যুতিক শৃংখলার শক্তি বেড়ে যায় এবং বৈদ্যুতিক প্রবাহ এক সীমা পর্যন্ত হাতের মধ্যে ঝলক দেয়, এ কাজের দ্বারা হাতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়, সঠিক পদ্ধতিতে অজু করার দ্বারা আঙ্গুলের মধ্যে এমন লাবণ্য তৈরি হয়, তার দ্বারা মানুষের মধ্যে চারিত্রিক সংশোধনের কাগজ বা সিটের ওপর পরিবর্তন করার সুপ্ত প্রতিভা প্রকাশিত হয়ে যায়।
📄 কুলি করা
অজুর সময় তিনবার কুলি করা সুন্নাত। এর দ্বারা গুনাহ ঝরে যায়। যেমন রাসূল (সা) ইরশাদ করেন-
إِذَا تَوَضَّأَ الْعَبْدُ الْمُؤْمِنُ فَتَمَضْمَضَ خَرَجَتِ الْخَطَايَا مِنْ فَمِهِ.
অর্থ: যখন মুমিন বান্দা অজু করার সময় কুলি করে, তখন তার মুখের সকল গুনাহ ঝরে যায়। (মুসনাদে আহমদ, খ-৫, আরবি পৃ. ২৬৩) (সুনানে নাসায়ী, হা/১০৩ মাথাসহ দু-কান মাসেহ করা অধ্যায়, ১০৩ নং)
কুলির দ্বারা দাঁতের মধ্যকার খানা ঢুকে থাকা কণা মুখ হতে বের হয়ে যায়। যদি দাঁতের অভ্যন্তর হতে এসব কণা বের না করা যায় তাহলে এগুলো দাঁত, মস্তিষ্ক এবং গলার বিভিন্ন রোগের কারণ হয়ে যায়।
কুলি করার দ্বারা যা মুখকে পরিষ্কার করে, তা দাঁতের রোগ হতে মুক্ত করে, চোয়াল মজবুত হয় এবং দাঁতের মধ্যে উজ্জ্বলতা সৃষ্টি হয়, রুজি বেড়ে যায় এবং মানুষ টনসিলের রোগ হতে সুরক্ষিত থাকে।
📄 নাকে পানি দেয়া
নাকে পানি দেয়াও নবী করীম (সা)-এর সুন্নাত। ডান হাত দ্বারা নাকে তিনবার পানি দিবে এবং বাম হাত দ্বারা পাক পরিষ্কার করবে। এভাবে হাদীস শরীফে নাক পরিষ্কার করারও যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। রাসূল (সা) ইরশাদ করেন: মুমিন যখন অজু করার সময় নাকে পানি দিয়ে নাক পরিষ্কার করে, তখন নাকের গুনাহ পানির প্রথম ফোঁটার সাথে ঝরে যায়। (এসব গুনাহ বলতে ছগীরা গুনাহের কথা বলা হয়েছে। কবীরা গুনাহ বিশেষভাবে তাওবা ও ফিরে আসার সিদ্ধান্তে মাফ হয়ে থাকে। (ক. মুসনাদে আহমদ, খ-৫, আরবি পৃ. ২৬৩)
সুনানে নাসায়ী এবং মুসলিম শরীফের হাদীসে রয়েছে যে, রাসূল (সা) ইরশাদ করেন-
فَإِذَا اسْتَنْشَرَ خَرَجَتِ الْخَطَايَا مِنْ أَنْفِهِ.
অর্থ: মুমিন বান্দা অজু করার সময় যখন নাক ধোয়, তখন নাকের সকল গুনাহ ঝরে যায়। (সুনানে নাসায়ী, হা/১০৩ মাথাসহ দু'কান মাসেহ করা অধ্যায়, ১০৩ নং)
নাক ধোয়া এবং পরিষ্কার করার মধ্যে যেখানে পবিত্রতা অর্জিত হয়, সেখানে চিকিৎসাগত উপকারিতাও অর্জিত হয়। কুলি করার পর নাকে পানি দেয়া হয়, নাক মানব দেহের খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং মনোযোগ দেয়ার যোগ্য অঙ্গ। নাকের উত্তম যোগ্যতা এই যে, আওয়াজকে অন্তরঙ্গ করে এবং সহ্য ক্ষমতা সৃষ্টি করে। আঙ্গুল দ্বারা নাকের ছিদ্রের নাসারন্ধ্রকে দাবিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলে আপনার নিকট পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে যাবে।
নাকের মধ্যকার পর্দাগুলো আওয়াজকে সুন্দর করার ক্ষেত্রে এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে। মস্তকের জ্যোতি একত্র করে। বিশেষ অংশগুলো পরিষ্কার রাখার ক্ষেত্রে নাকের বড় ভূমিকা রয়েছে। নাক ফুসফুসের জন্য বায়ুকে পরিষ্কার, গরম এবং উপযুক্ত করে তোলে।
প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে প্রত্যহ প্রায় শত ঘনফুট বায়ু নাকের মধ্যদিয়ে প্রবেশ করে। বায়ুর এত বড় পরিমাণে একটি বড় কক্ষ ভরে যাবে। বরফের মওসুমে জমা এবং শুষ্ক দিনে আপনি বরফের ময়দানে (Skating) স্কেটিং শুষ্ক করে দিন, কিন্তু আপনার ফুসফুস শুষ্ক হাওয়ার দ্বারা সমস্যায় পড়ে না। সে এর এক অযুতাংশও গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত ছিল না, যদিও এমতাবস্থায় তার এত বায়ুর প্রয়োজন হয় যা গরম ও আর্দ্র হাওয়ায় পাওয়া যায়। অর্থাৎ যে ৮০% আর্দ্র এবং ৯০° ফারেনহাইট উষ্ণ বায়ু চায়।
ফুসফুস জীবাণু হতে পবিত্র ধোঁয়া অর্থাৎ ধুলা ও ময়লা মুক্ত বায়ু চায়। এরূপ পরিমাণ বায়ু জমাকৃত একটি এয়ার কন্ডিশন ছোট ট্রাংকের সমান হবে অথচ নাকের মধ্যে কুদরতের নিয়ম একে এমন সংক্ষিপ্ত এবং সমন্বিত (Integrated) করে দিয়েছেন যে, সে মাত্র কয়েক ইঞ্চি লম্বা।
নাক বায়ুকে আর্দ্র করার জন্য Error! গ্যালন (এক-চতুর্থাংশ গ্যালন) আর্দ্রতা প্রতিদিন তৈরি করে থাকে। পরিষ্কার এবং অন্যান্য শক্ত কাজ নাসারন্ধ্রের চুলগুলো করে থাকে। নাকের মধ্যে এক খাদক ঝাড়ু আছে। এ ঝাড়ুর মধ্যে অদৃশ্য শলাকা রয়েছে যা হাওয়ার মাধ্যমে পাকস্থলীতে পৌঁছানো ক্ষতিকর জীবাণুকে ধ্বংস করে দেয়। জীবাণুগুলো মেশিনের মতো ধরা ছাড়াও অদৃশ্য শলাগুলোতে এক প্রতিরোধী মাধ্যম রয়েছে যাকে ইংরেজিতে Lysonimon বলা হয়। এই প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে নাক চোখগুলোকে Infection হতে রক্ষা করে। যখন কোনো নামাযি ব্যক্তি অজু করার সময় নাকের ভেতর পানি দেয়, তখন পানির মধ্যে কার্যকরী বৈদ্যুতিক রশ্মি অদৃশ্য লোম-এর কার্যকরী শক্তি বাড়ায়। যার ফলে মানুষ অসংখ্য অদৃশ্য রোগ হতে সুরক্ষিত থাকে।
📄 মুখমণ্ডল ধোয়া
অজু করার সময় একবার চেহারা ধোয়া ফরয এবং তিনবার ধোয়া নবী করীম (সা)-এর মুবারক সুন্নাত। চেহারার সীমা মাথার চুলের গোড়া হতে নিয়ে চিবুকের নিচ পর্যন্ত এবং এক কানের লতি হতে অপর কানের লতি পর্যন্ত। হাদীস শরীফে চেহারা ধৌত করা রহমতের কারণ। এ সম্পর্কে নবী করীম (সা) ইরশাদ করেন-
فَإِذَا غَسَلَ وَجْهَهُ خَرَجَتِ الْخَطَايَا مِنْ وَجْهِهِ حَتَّى تَخْرُجَ مِنْ تَحْتِ أَشْفَارِ عَيْنَيْهِ.
অর্থ: অজুকারী যখন নিজ চেহারা ধৌত করে তখন তার চেহারার গুনাহগুলো ঝরে যায় এমনকি চোখের পালকের শিকড় হতেও বের হয়ে যায়।
এরপরে নবী করীম (সা) আরো বর্ণনা করেন : অজুকারী যখন মুখমণ্ডল ধোয় তখন সকল গুনাহ এবং অপরাধ এমনভাবে পবিত্র হয়ে যায়, যেন আজই তার মা তাকে জন্ম দিয়েছে।
(মুসনাদে আহমদ, হা/১৯০৯১ খ.-৫, আরবি পৃ. ২৬৬)
মুখমণ্ডল ধোয়ার অনেক বেশি চিকিৎসাগত, প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক উপকারিতা রয়েছে। নিচে সে সম্পর্কে কিছু বর্ণনা করা হলো :
চেহারা ধোয়ার বড় হিকমত নিহিত রয়েছে যে, এর দ্বারা অবয়বে নম্রতা ও সূক্ষ্মতার সৃষ্টি হয়। ময়লা ধুলার দ্বারা বন্ধ লোমকূপ খুলে যায়। চেহারা উজ্জ্বল, পূর্ণ আকর্ষণ ও ভীত হয়ে যায়। মুখ ধোয়ার সময় পানি যখন চোখের মধ্যে যায় তখন এর দ্বারা চক্ষুর অবয়বে শক্তি পৌঁছায়। গোলকের সাদা এবং মনির মধ্যে উজ্জ্বলতা বেড়ে যায়। অজুকারীর চোখ পূর্ণ আকর্ষণীয় সুশ্রী ও নিদ্রালু হয়ে যায়। চেহারার ওপর তিনবার হাত বুলানোতে সীনা ও মস্তিষ্কের ওপর প্রশান্তি আসে।
আজকাল যখন আমরা ঘর হতে বের হই এবং আমাদের চলাচল এমন স্থান দিয়ে হয় যেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে জীবাণু পাওয়া যায়। যেমন অনেক স্থানে ময়লা ধুলার বর্জ্য-স্তুপ পড়ে রয়েছে অথবা প্রাণী বা মানুষের বর্জ্য খোলা পড়ে রয়েছে, কোথাও বিভিন্ন প্রাণীর দেহাবশেষ যেমন নাড়ী-ভুড়ি, রক্ত ইত্যাদি নিক্ষেপ করা হয়েছে। এসব স্থান জীবাণুর স্বর্গরাজ্য এবং যখন এটা খোলা পড়ে থাকে তখন এর জীবাণু পরিবেশে ছড়িয়ে থাকে এবং যখন মানুষ এসব স্থান অতিক্রম করে তখন এসব জীবাণু মানুষের হাত, চেহারার ওপর আক্রমণ করে এবং আমরা যখন দৈনিক কমপক্ষে পাঁচবার আমাদের চেহারা মোবারক ধৌত করি তখন এসব জীবাণু হতে আমরা বেঁচে থাকতে পারি যা চেহারায় পৌঁছানোর পর নাক-মুখের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে বিভিন্ন ধরনের রোগের কারণ ঘটাতে পারে না।
আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় সমস্যা ময়লা আবর্জনা। শিল্পের উন্নতি আমাদেরকে এ কঠিন সমস্যার ব্যাপারে অধিক সজাগ করে। কারখানার চিমনি হতে বের হওয়া গ্যাস এবং গাড়ির সাইলেন্সার হতে বের হওয়া ধোয়া দ্বারা পরিবেশ দূষিত হয়ে যাচ্ছে। এ আবহাওয়ার মধ্যে কার্বন-ডাই অক্সাইড এবং কার্বন-মনো-অক্সাইড ব্যতীত সালফার-ডাই-অক্সাইড মিশে যাচ্ছে। যদি এসব গ্যাস হাওয়ার মধ্যে বেশি বেশি থাকে এবং একজন মানুষের ঘামের সাথে সংমিশ্রণ ঘটে তাহলে চেহারার ওপর থাকা ঘামের ফোঁটা এই গ্যাসের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে বিভিন্ন ধরনের গ্যাস (কার্বন এসিড, সালফিউরিক এসিড) এ পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং এই ঘাম দ্বারা সৃষ্ট এসিড মানব চর্মকে খারাপ করে দেয়। এজন্য চেহারা ধোয়ার দ্বারা ঘাম এবং বিষাক্ত ক্যামিক্যাল ইত্যাদি ধুয়ে চলে যায় এবং মানুষ চর্মরোগ এবং চেহারার অ্যালার্জী হতে মুক্ত ও নিরাপদ থাকে।
অজুর মাধ্যমে চেহারা ধোয়ার দ্বারা মানুষ বিভিন্ন রোগ হতে বাঁচতে পারে। চোখের অসুখের সময় ডাক্তারগণ বার বার চোখ ধোয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
হাকীম মুহাম্মদ তারিক মাহমুদ চাগতাঈ-এর মতে অজু করার পর যে অঙ্গগুলো ভিজে যায়, মেডিকেল সাইন্স অনুযায়ী যদি এ অঙ্গগুলো আর্দ্র থাকে তাহলে চোখের রোগ হতে মানুষ বেঁচে যায় এবং যে সব চোখে কাঁচে আর্দ্রতা কমে, তা শেষ হয়ে যায় এবং রোগী ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে।
দিনের মধ্যে বারবার অজুর জন্য চেহারা ধৌত করার কারণে এর সৌন্দর্য বেড়ে যায়। আমেরিকার কাউন্সিল ফর বিউটি-এর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য লেডিবিচার এক আশ্চর্য ও চমৎকার তথ্য আবিষ্কার করেছেন। তার বক্তব্য হলো যে, মুসলমানদের কোনো প্রকারের মেডিক্যাল জাতীয় (Madicated) লোশনের প্রয়োজন নেই। তারা ইসলামী অজুর মাধ্যমে চেহারা ধুতে থাকে এবং মুসলমানগণ কয়েকটি রোগ হতে বেঁচে থাকে।