📄 কুরবানি
মহানবী মুহাম্মদ (সা) তাঁর উম্মতগণকে কুরবানি করার জন্য বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়ে গেছেন। এবং তিনি এই কুরবানির পক্ষে এভাবেও বলেছেন যে, যদি আমার উম্মতের মধ্যে কেউ কুরবানি করার সমর্থ থাকতেও কুরবানি না করে, তবে সে যেন আমার এই ঈদের নামায পড়তে না আসে। এতে প্রমাণ করে যে, প্রত্যেক সামর্থবান মুসলমানের জন্য কুরবানি করা অত্যাবশ্যক। নিম্নে কুরবানির ওপর মহানবী (সা)-এর দু'টি হাদীস পেশ করা হল -
وَقَالَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللهِ لا يَا رَسُولَ اللهِ مَا هَذِهِ الْأَضَاحِيُّ قَالَ سُنَّةُ آبِيْكُمْ إِبْرَاهِيمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ قَالُوا فَمَا لَنَا فِيهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ بِكُلِّ شَعْرَةٍ حَسَنَةً . قَالُوا فَالصُّوْفُ يَا رَسُولَ اللهِ - قَالَ بِكُلِّ شَعْرَةٍ مِنَ الصُّوْفِ حَسَنَةٌ.
অর্থ: মহানবী (সা)-এর সাহাবীগণ আরজ করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা)! এই কোরবানীর হাকীকত কি? উত্তরে মহানবী (সা) বললেন, এটি তোমাদের জাতির পিতা ইবরাহীম (আ)-এর সুন্নাত। সাহাবায়ে কিরাম আরজ করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা)! এতে আমাদের লাভ কি? তখন রাসূল (সা) বললেন, কুরবানির প্রতিটি লোমে লোমে নেকী রয়েছে। তখন সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন: ভেড়া দুম্বার পশমের বেলায় কি? তখন রাসূল (সা) বললেন: ইহারও প্রতিটি পשমে পשমে নেকী রয়েছে। (ইবনে মাজাহ- ৩১২৭) হাদীসটি যয়ীফ।
وَقَالَ عَلَيْهِ الصَّلوةُ وَالسَّلَامُ . وَجَدَ سَعَةَ لِأَنْ تُضَحِيَ فَلَمْ يُضَحِ فَلَا يَحْضُرُ مُصَلَّانَا.
এ ছাড়াও মহানবী (সা) আরও বলেছেন, আমার কোনো উম্মতের পক্ষে কুরবানির সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আমার যে উম্মত কুরবানি করে না সে যেন আমাদের এই ঈদগাহে না আসে। (সুনানুল কুবরা লি বাইহাকী- হা/১৯৪৮৫)
فَقَدْ قَالَ عَلَيْهِ الصَّلوةُ وَالسَّلامُ مَا عَمِلَ اِبْنُ أَدَمَ مِنْ عَمَلٍ يَوْمَ النَّحْرِ أَحَبَّ إِلَى اللهِ مِنْ اِهْرَاقِ الدَّمِ وَإِنَّهُ لَيَاتِي يَوْمَ الْقِيمَةِ بِقُرُونِهَا وَأَشْعَarِهَا وَأَظْلَا فِهَا وَإِنَّ الدَّمَ لَيَقَعُ مِنَ اللهِ بِمَكَانٍ قَبْلَ أَنْ يَقَعَ بِالْأَرْضِ فَطَيِّبُوا بِهَا.
অর্থ: মহানবী (সা) বলেছেন, ঈদুল আযহার দিন একমাত্র রক্ত প্রবাহিতকরণ অর্থাৎ কোরবানী করা ব্যতীত বনী আদমের অন্য কোনো আমল বা কাজ আল্লাহর দরবারে অধিক প্রিয় নয়। কিয়ামত দিবসে ঐ জীব তার শিং, লোম ও খুরসহ উপস্থিত হবে এবং কুরবানির রক্ত মাটিতে পতিত হবার পূর্বেই আল্লাহ তায়ালার দরবারে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা কুবানির পশু কুরবানি করে সন্তুষ্ট থেকো। (তিরমিজী হা/১৫৭২)
ওপরে উল্লিখিত দু'টি হাদীসে কুরবানি ওপর এরূপ গুরুত্ব দেখে, পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মধ্য হতে কেউ বলেন যে, হাদীসে যেভাবে কুরবানি করার জন্য উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে, সেভাবে যদি মানুষ কুরবানি করে, তবে অদূর ভবিষ্যতে কুরবানি পশুগুলো পৃথিবী হতে বিলীন হয়ে যাবে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের একথাটি ঠিক নয়। কারণ মহানবী (সা) কুরবানি করার জন্য যে পশুগুলো নির্বাচন করে দিয়েছেন, সে পশুগুলো আজও আছে এবং কিয়ামত পর্যন্তও থাকবে। কারণ তিনি কুরবানি করার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। তাই সেগুলো মানুষ অধিক মূল্যে কুরবানির জন্য বিক্রয় করবে বলে বিপুল উৎসাহে অতি যত্নসহকারে লালন পালন করেন। এবং যারা আল্লাহ তায়ালাকে খুশী করার জন্য কুরবানি করবে তারা ইহা অধিক মূল্যে ক্রয় করেন। যদি মহানবী (সা) উক্ত পশুগুলোর দ্বারা কুরবানি প্রথা চালু না করতেন তবে পৃথিবীর মানুষ তাকে এতো যত্ন সহকারে আবাদ করতেন না। লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, এমন কিছু পশু আছে যেগুলো হালাল কিন্তু মহানবী (সা) সেগুলোকে কুরবানি করার জন্য নির্বাচন না করাতে সেগুলো আজ পৃথিবী হতে বিলুপ্তির পথে। যেমন- হরিণ, খরগোস ইত্যাদি।
এছাড়াও লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, মহানবী (সা) যেসব পশুগুলো কুরবানির জন্য নির্বাচন করে দিয়েছেন, যদি সেগুলোর গোশত ভক্ষণ হালাল না হতো অথবা কুরবানির জন্য নির্বাচন না করতেন তবে উক্ত প্রাণীগুলোর পক্ষে এই পৃথিবীর প্রতিকূল পরিবেশের সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে পারত না? কারণ তারা খুবই নিরীহ এবং কোনো মানুষও তাদের প্রতি কোনো রক্ষণাবেক্ষণ করতো না। ফলে তারা অতিদ্রুত পৃথিবী হতে বিলীন হয়ে যেতো।
অতএব, প্রতীয়মান হয় যে, কুরবানির পশুগুলো দ্বারা পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ করতে চাইলে কুরবানির গুরুত্ব অপরিসীম। এছাড়াও লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, বর্তমানে যে সকল পশু পৃথিবী হতে বিলুপ্তির পথে সেগুলোকে যদি মহনবী (সা) কুরবানি করার জন্য নির্বাচন করে যেতেন, তবে সেগুলো আর কখনও পৃথিবী হতে বিলুপ্ত হতো না। কারণ তখন মানুষ তার প্রতি যত্ন নিতেন এবং যত্নসহকারে লালন পালন করতেন এবং পৃথিবীতে তারা আজ গরু, ছাগল ও উট-দুম্বার মতো পর্যাপ্ত বিরাজ করতো।
📄 জলপাই তৈল
চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে, পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে পেয়েছেন যে, জলপাই তৈল খাদ্যের মধ্যে ব্যবহার করলে শরীরের কোলেস্টেরলের মাত্রা ঠিক রাখতে সাহায্য করে এবং এর ব্যবহারে এলডিএল অর্থাৎ লাইপো প্রোটিন কমায়।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা আরও অনেক গবেষণা করে জানতে পেরেছেন যে, জলপাই তৈলে কিছু পরিমাণে ক্যান্সার প্রতিরোধক উপাদানও আছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, জলপাই তৈলের ব্যবহারে মানব দেহের বিউমেটয়েড আর্থ্রাইটিসের কোপও অনেকাংশে কমায়।
গ্রীকরা মনে করেন যে, জলপাই গাছ হচ্ছে, তাদের দেবী এথিনার উপহার। (জনকণ্ঠ ২৩-০৫-০১)
মহানবী মুহাম্মদ (সা) উক্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের বহুপূর্বেই পবিত্র কুরআন ও হাদীসের আলোকে জলপাই সম্পর্কে বলে গেছেন। যেমন-
وَشَجَرَةً تَخْرُجُ مِنْ طُورِ سَيْنَاءَ تَنْبُتُ بِالدُّهْنِ وَصِبْغٍ لِلْآكِلِينَ.
অর্থ : এবং ঐ বৃক্ষ সৃষ্টি করেছি, যা-সিনাই পর্বতে জন্মায় এবং আহারকারীদের জন্যে তৈল ও নানা রং ও গুণাগুণ উৎপন্ন করে। (সূরা মুমিনূন: আয়াত-২০)
الْحُسَيْنُ بْنُ مَهْدِى حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ عَنْ مَعْمَرٍ عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ عَنْ أَبِيهِ عَنْ عُمَرَ بْنَ الْخَطَابِ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ مَا ابْتَدِمُوا بِالزَّيْتِ وَادَّهِنُوا بِهِ فَإِنَّهُ مِنْ شَجَرَةٍ مُبَارَكَةٍ.
অর্থ : ওমর বিন খাত্তাব (রা) হতে বর্ণিত। মহানবী (সা) বলেছেন, তোমরা জলপাই তৈল দ্বারা তরকারী পাকাও এবং তা দ্বারা মালিশ কর নিশ্চয় উহা বরকতপূর্ণ গাছ। (তিরমিজি হা/১৮৫১, ২য় খণ্ড-৭ম পৃষ্ঠা আবুবয়াবুল আতআমা ও ইবনে মাজা হা/৩৩১৯, ২য় খণ্ড ২৩৮ পৃষ্ঠা আবুবয়াবুল আতআমা)
সুতরাং দেখা যায় যে, জলপাই-এর তৈল যে একটি উপকারী তৈল তা মহানবী (সা) আজ হতে প্রায় দেড় হাজার বৎসর পূর্বেই এই পৃথিবীর মানুষদেরকে বলে গেছেন এবং এর ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান যুগের স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা জলপাই তৈলের উক্ত গুণাগুণ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন।
📄 তেল
ক্যানাডার বিখ্যাত ফিজিও থেরাপিষ্টের বিজ্ঞানী স্যার জেমস সাগম বলেন, আমি মাথায় তেল লাগানোকে একদিকে সময়ের অপচয় ও ধূলাবালি আটকে থাকার কারণ মনে করতাম। অনেক গবেষণার পর আমি যে তথ্য সংগ্রহ করলাম তা হলো:
মাথায় তেল ব্যবহারের ফলে মস্তিষ্কের চাপ রোধ হয়। মাথাব্যাথার পুরাতন রোগী ভালো হয়। ঘাড়ে রগের ব্যথা ভালো হয়। কাঁধের ব্যথা ও খিঁচুনি ভালো হয়। দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতা দূর হয় এবং চেহারার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ফলদায়ক। আর মাথায় চুল আঁচড়ানোর দ্বারা এক প্রকার উষ্ণতা সৃষ্টি হয় যা পשম বা চুলের মাধ্যমে শরীরের শিরা-উপশিরার ব্যবস্থাকে প্রাণবন্ত ও শক্তিশালী করে।
অথচ মহানবী মুহাম্মদ (সা) উক্ত বিজ্ঞানীদের বহু পূহে তিনি নিজে মাথায় তেল ব্যবহার করেছেন এবং তার সকল উম্মতগণকে তা ব্যবহার করতে উৎসাহ দিয়ে গেছেন। যেমন-
আনাস (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, প্রিয় নবী (সা) তাঁর পবিত্র মাথা মোবারকে বেশি বেশি তেল লাগাতেন এবং স্বীয় দাড়ি মোবারক আঁচড়াতেন। অর্থাৎ মহানবী (সা) যা-যা করেছেন, তা তিনি পৃথিবীর সকল মানুষদেরকে করতে বলেছেন এবং আল্লাহ তায়ালা নিজেই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে 'মহানবী (সা)-কে' অনুসরণ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন-
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ
অর্থ: বলুন! যদি তোমরা আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাস, তবে তোমরা আমাকে অনুসরণ কর। তাহলে আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তিনি তোমাদের ভুল ত্রুটিগুলো ক্ষমা করে দিবেন। (সূরা-আল ইমরান: আয়াত-৩১)
📄 লাউ
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞানীরা বলেন যে, লাউ বা লাউ জাতীয় কোনো সবজি বেশি বেশি খেলে পেট ও মাথা ঠান্ডা থাকে। তারা আরও বলেন যে, লাউ পেটের জন্য খুব উপকারী সবজি এবং যে কোনো পেটের পীড়ায় লাউ খেলে পেটের জন্য অবশ্যই উপকার হবে। বিজ্ঞানীরা আরও বলেন যে, নিয়মিত লাউ খেলে তার পেটে কোনো রোগ থাকবে না এবং লাউ ডায়েরিয়া রোগীর এক বিশেষ ঔষধ।
অথচ মহানবী মুহাম্মদ (সা) উক্ত খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞানীদের বহুপূর্বেই, পৃথিবীর মানুষদেরকে লাউ-এর প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য তিনি বেশি বেশি লাউ খেতে উৎসাহ দিয়ে গেছেন। এবং আল্লাহ তায়ালাও তাকে অনুসরণ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন-
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ.
অর্থ : বলুন! যদি তোমরা আল্লাহ তায়ালাকে ভালবাস তবে তোমরা আমাকে অনুসরণ কর। তাহলে আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ কাজগুলোকে ক্ষমা করে দিবেন। (সূরা আলে-ইমরান : আয়াত-৩১)
حَدَّثَنَا وَكِيعٌ عَنْ اسْمَعِيلَ بْنَ أَبِي خَالِدٍ عَنْ حَكِيمِ بْنِ جَابِرٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ دَخَلْتُ عَلَى النَّبِيِّ ﷺ فِي بَيْتِهِ وَعِنْدَهُ هُذِهِ الدُّبَّاءُ فَقُلْتُ أَيُّ شَيْءٍ هَذَا قَالَ هَذَا الْقُرْعُ هُوَ الدُّبَّاءُ نُكْثِرُ بِهِ طَعَامُنَا.
অর্থ : জাবির (রা) তার পিতা হতে হাদীস বর্ণনা করে বলেন, আমি মহানবী (সা)-এর বাড়িতে গেলাম এবং তাঁর নিকট লাউ দেখতে পেলাম। অতঃপর আমি বললাম, এটা কি? তখন মহানবী (সা) বললেন, এটা লাউ যা আমরা বেশি বেশি পরিমাণে খাদ্য হিসেবে খেয়ে থাকি। (সুনানে ইবনে মাজা হা/৩৩০৪, ২য় খণ্ড ২৩৭ পৃ. আবুওয়াবু আতআমা)
সুতরাং প্রতীয়মান হয় যে, লাউ-এর উপকারিতা সম্পর্কে মহানবী (সা) জানতেন, তাই তিনি ইহা বেশি বেশি ভক্ষণ করেছেন এবং পৃথিবীর মানুষদেরকে খাওয়ার জন্য উৎসাহ দিয়ে গেছেন। যা বর্তমান যুগের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন।