📄 রূপচর্চায় মধুর ব্যবহার
ইতিহাস প্রসিদ্ধ মিশরের রানী ক্লিওপেট্রা নিঃসন্দেহে বিশ্ববিখ্যাত সুন্দরী ছিলেন। কথিত আছে, তিনি ত্বকের জেল্লা বজায় রাখতে গাধার দুধ দিয়ে গোসল করতেন। আর ময়শ্চারাইজার হিসেবে মুখে নিয়মিত মধু মাখতেন। ময়শ্চারাইজিং ও এন্টিবায়োটিক গুণ মধুকে সৌন্দর্য চর্চার এক অপরিহার্য উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নিম্নে এ সম্পর্কিত কয়েকটি টিপস দেয়া গেল।
১. মুখমণ্ডল পরিষ্কার করে সামান্য মধু আঙ্গুলে লাগিয়ে সারা মুখে ও ঘাড়ে চক্রাকারে ম্যাসেজ করতে হবে। কিছুক্ষণ পরেই মুখ ও ত্বক মিশে রক্ত চলাচলের গতিকে বাড়িয়ে দেয়। এরপর সামান্য গরম পানি দিয়ে মুখমণ্ডল ও ঘাড় ধৌত করে ফেলতে হবে। এভাবে ২০-২৫ দিন মধু ব্যবহারে মুখমণ্ডল আগের চেয়ে সুশ্রী, সুন্দর ও লাবণ্যময়ী হয়ে উঠবে।
২. মুখে বয়সের ছাপ পড়লে দুধ ও মধু একত্রে মিশিয়ে পরিষ্কার মুখে ২০ মিনিট মালিশ করে রাখতে হবে। মিশ্রণটি তুলার সাহায্যে কপাল, গাল, ঠোঁটের উপরিস্থান, থুতনী ও গলায় আলতোভাবে লাগাতে হবে। এভাবে ১৫-২০ দিন নিয়মিত লাগালে মুখে বয়সের ভাঁজ অনেকাংশে দূর হয়ে যাবে।
৩. ফেসিয়ালের এক কার্যকর উৎস হলো মধু। ২/৩ চা চামচ মধু, পাঁচ চামচ ওটমিল ও এক চামচ জল একত্রে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করতে হবে। এরপর কাঁচা দুধে তুলো ভিজিয়ে মুখ ও ঘাড় মুছতে হবে। যাতে বাড়তি তেল-ময়লা না থাকে। এরপর উল্লিখিত পেস্টটি মুখ, গলা ও ঘাড়ে ভালোভাবে ম্যাসেজাকারে লাগিয়ে চল্লিশ মিনিট পর কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। ত্বকের ধরন তেল তেলে হলে ওটমিলের বদলে শশা ও লেবুর রস ব্যবহার করা যেতে পারে।
৪. হজম ঠিক মতো না হলে এর প্রভাব দেহের ত্বকে, চুলে, মুখে, মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে বিরূপ প্রভাব পড়ে। মধু, চুল ও ত্বককে স্বাভাবিক অবস্থা থেকে মুক্ত রাখতে সাহায্য করে। খাওয়ার পর হানি ওয়াটার থেরাপি অর্থাৎ মধুর সাথে পানি মিশ্রিত করে (পানির সাথে মধু মিশ্রিত নয়) অর্থাৎ খেলে বিপাক সমস্যাসহ ঝুঁকি কমে যাবে, চুল পড়া বন্ধ হবে এবং ত্বকে অক্সিজেন প্রবাহ বাড়বে।
৫. রোদে পোড়া মুখ, ঘাড়, গলা ও হাতের যত্নে মধু ও কমলালেবুর খোসা বাটা একত্রে মিশ্রিত করে আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার করে মাখলে অনেক উপকার পাওয়া যায়। নিয়মিত এ অভ্যাস ধরে রাখলে ত্বকের হারানো সৌন্দর্য ফিরে পাওয়া যায়।
৬. শীতকালে অত্যধিক শুষ্ক-আবহাওয়ার কারণে ঠোঁট, হাত, পা ফেটে যায়। আর এর সমাধানে মধু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার করে মধু মেখে কয়েক ঘণ্টা রেখে পরিষ্কার করলে উপকার পাওয়া যায়। দিনে দু'একবার, সপ্তাহে দু'তিনদিন এভাবে করলে উক্ত সমস্যা দূর হয়ে যাবে।
৭. শুষ্ক ত্বকের যত্নে অ্যামন্ড বাটা ও গোলাপ ফুলের পাঁপড়ি বাটার সাথে মধুসহ মিশ্রণ বানিয়ে মুখ ও ঘাড়ে ত্রিশ মিনিটি লাগিয়ে রাখলে উপকার পাওয়া যায়। এভাবে মিশ্রণটি সংরক্ষণ করে নিয়মিত ১৫-২০ দিন ব্যবহারে উক্ত সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।
৮. ব্রণ একটি সমস্যা, যাতে চুলকানীসহ ত্বকে বিশ্রী কালো দাগও পড়ে। এ সমস্যায় চন্দন বাটার সাথে মধু পরিমাণ মতো মিশ্রিত করে ব্যবহার করতে হবে। সেই সাথে মল ত্যাগে কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা যেন না থাকে। তাহলে কিছু দিন ব্যবহারেই ব্রণসহ কালো দাগ দূর হয়ে যাবে।
৯. চুলে খুশকির সমস্যায় লেবুর রসে মধু মিশ্রিত করে চুলের গোড়ায় ম্যাসাজ করতে হবে। এভাবে ২০-৩০ মিনিট পর ভালো কোনো শ্যাম্পু দিয়ে চুল পরিষ্কার করতে হবে। ৫-৭ দিন নিয়মিত ব্যবহারে খুশকির সমস্যা সমাধান হবে।
১০. ত্বকের র্যাশ মরা কোষ বিদায় করতে হলে চিনাবাদামের চূর্ণের সাথে মধু সামান্য পরিমাণ মিশ্রিত করে পেস্ট তৈরি করতে হবে। পরে আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার করলে চকচকে ভাব এসে যাবে। সেই সাথে ত্বকের আর্দ্রতাও ফিরে আসবে।
📄 মধুর প্রকারভেদ
মধু আট প্রকার: ১. মাক্ষিক, ২. ভ্রামর, ৩. ক্ষৌদ্র, ৪. পৌত্তিক, ৫. ছাত্র, ৬. অর্ঘ্য, ৭. উদ্দালক ও ৮. দাল। এদের কিছু গুণ ও লক্ষণ নিচে দেয়া হলো-
১. মাক্ষিক মধু: মধুমক্ষিকরা বা মৌমাছিরা যে তৈলবর্ণ মধু তৈরি করে, তাকে বলা হয় মাক্ষিক মধু। সমস্ত মধুর মধ্যে এটিই শ্রেষ্ঠ। এ মধু চক্ষুরোগ বিনাশ করে, অর্শরোগ নাশ করে, শ্বাসকষ্ট দূর করে, ক্ষয়রোগ নিরাময় করে, ক্ষত নিবারণ করে এবং কাস রোগের আরোগ্য করে। এটি লঘুপাক, তাই খেতে কোনো অসুবিধে নেই।
২. ভ্রামণ মধু: সাধারণভাবে যে ভ্রমর আমরা দেখি, এদের চেয়ে আকারে সামান্য ছোট ভ্রমর সংগৃহীত স্ফটিকতুল্য পরিষ্কার মধুকে ভ্রামর মধু বলা হয়। ভ্রামর মধু মূত্ররোধক, শীতল ও পিচ্ছিল। রক্তজনিত পিত্তনিবারক এবং অভিষ্যন্দকারক।
৩. ক্ষৌদ্র মধু: কপিলবর্ণের যে অতি সূক্ষ্ণ মক্ষিকা, তাদেরই ক্ষুদ্র নামে অভিহিত করা হয়। এই মক্ষিকা দ্বারা তৈরি মধুই ক্ষৌদ্র মধু নামে অভিহিত হয়। এই মধু মাক্ষিক মধুর মতোই গুণান্বিত। এটি ব্যবহারের প্রমেহ নিবারিত হয়ে থাকে।
৪. পৌত্তিক মধু: এক রকমের মৌমাছি দেখা যায় যা আকারে ছোট এবং এর কামড় অতীব পীড়াদায়ক। এদের গায়ের রং কালো এবং এরা বড় পুত্তিকা। পুত্তিকা মৌমাছি কর্তৃক তৈরি মধুর নাম পৌত্তিক মধু। এই মধুর রং অনেকটা ঘৃতের মতো।
প্রমেহ নিবারণের কাজে, মূত্রকৃচ্ছ উপশমের কাজে, রক্ত দুটি নিবারণের কাজে এবং অস্থিক্ষত নিরাময়ের কাজে এই মধুকে ব্যবহার করা হয়।
৫. ছাত্র মধু: হিমালয়ের বনে এক ধরনের পীত ও কপিলবর্ণের মৌমাছি দেখা যায়। এরা ছত্রাকার মৌচাক তৈরি করে, তাই এর থেকে তৈরি মধুকে ছাত্র মধু বলা হয়ে থাকে। এই মধু দেখতে পীত ও কপিলবর্ণ হয়।
ক্রিমি প্রশমনের কাজে, মোহ নাশের কাজে, তৃপ্তি আনয়নে, শ্বেতীরোগ নিরাময় করতে, বিষদোষের উপশমে এবং তৃষ্ণা নিবারণের জন্য এর ব্যবহার হয়।
৬. অর্ঘ্য মধু: তীক্ষ্ণ তুন্ডুযুক্ত এক ধরনের মক্ষিকা দেখা যায়, সেগুলিকে বলা হয় অর্ঘ্য। এদের বর্ণ পীত এবং দুটি পা আছে।
এদের দ্বারা তৈরি মধুর নামই হলো অর্ঘ্য মধু।
অর্ঘ্য মধু কফ নিবারক, পুষ্টিবর্ধনকারী, পিত্তনিরাময়কারী। এটি স্বাদে কষায় এবং বিপাকে কটু। এটি ভক্ষণে শক্তি বৃদ্ধি হয়।
৭. উদ্দালক মধু: চলতি কথায় এর নাম হলো উই মধু। উইয়ের ঢিবির মধ্যে এই ধরনের মৌমাছিরা বাস করে এবং অল্প পরিমাণে মধু তৈরি করে-এরাই উদ্দালক নামে পরিচিতি।
উদ্দালক মৌমাছি আকারে ছোট এবং কপিল বর্ণাকৃতি। এদের মধুও দেখতে কপিলবর্ণ।
৮. দাল মধু: চলতি ভাষায় এর নাম কুটুরে মধু। ফুল থেকে যে মধু স্থলিত হয়ে পুত্রের ওপরে সংগৃহীত হয়, তার নাম দال মধু।
এই মধু ওজনে ভারি। এই মধুতে রসের পরিমাণ বেশি।
বমি রুদ্ধ করতে, পুষ্টির বিকাশ ঘটাতে, রুচি আনতে, কফ নিবারণে, প্রমেহ উপশমে এই মধুর কার্যকারিতা অনস্বীকার্য।
📄 নতুন ও পুরাতন মধুর গুণ
নতুন মধু পুষ্টিকারক, কিন্তু তেমন কফবিনাশকারী নয়। পুরানো মধু ধারক গুণসম্পন্ন, রুক্ষ, মেদনাশক এবং অত্যন্ত কৃশতাকারক। এক বছর অতিক্রান্ত হলেই সেই মধুকে বলা হয় পুরানো মধু। ভ্রমররা সবিষ প্রাণী। বিষাক্ত ফুল থেকেও এরা রস আহরণ করে মধু তৈরি করে থাকে, তাই শীতল মধুই সবচেয়ে বেশি গুণকারক। কিন্তু বিষসম্বন্ধ থাকায় উষ্ণ মধু সেবন বা উষ্ণ দ্রব্যের সঙ্গে মধু সেবন সঙ্গত নয়। তবে মধুকে উত্তপ্ত করলে সরাসরি-সূর্যালোকে মধুর গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, যে সকল মৌমাছি খারাপ মধু আনে। তা প্রমাণ হলে রানী মৌমাছির আদেশক্রমে তাদের ঘাড় আলাদা করে মেরে ফেলে।
📄 যুগ যুগ ধরে প্রমাণিত মধুর গুণ
মধু একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর খাদ্য। সব শাস্ত্রে মধুকে মহৌষধ বলা হয়ে থাকে। সম্প্রতি এক গবেষণায় জানা যায়, এক কেজি মধু ৬.৫০ লিটার দুধ অথবা ৭.৫০ কেজি পনির অথবা ১.৬৫ কেজি গোশত অথবা ৪০টি প্রমাণ সাইজের কমলা অথবা ৫০টি ডিমের পুষ্টিমানের সমান। এক কেজি মধু ৩২৫০ ক্যালরি শক্তি সরবরাহ করে। এক চামচ মধুর খাদ্যমান একটি ডিমের সমান। এক পাউন্ড গোশতে যে পরিমাণ খাদ্য উপাদান থাকে তার চেয়ে তিনগুণ খাদ্য উপাদান থাকে মধুতে। মধু মধুর মতোই পুষ্টিকর। বৃদ্ধদের জন্য মধু অমৃত তুল্য। বাচ্চাদের জন্য খাদ্য হিসেবে দুধের পরই মধুর স্থান। প্রত্যহ চা-চামচের ২/১ চামচ মধু বাচ্চাকে খাওয়ালে তার শরীরের রক্ত কণিকা বৃদ্ধি পায়, ফলে বাচ্চার ওজন বেড়ে যায়। তাছাড়া মধু বল বৃদ্ধিকারক। হেকিমী ও কবিরাজী শাস্ত্রে মধু দ্বারা নানা প্রকার রোগ নাশক ঔষধ প্রস্তুত করা হয়। প্রাচীনকালে মিশরে স্বামীরা প্রতি বছর বিবাহ বার্ষিকীতে স্ত্রীকে এক ভান্ড করে মধু উপহার দিত। হিন্দু সমাজে বাসর রাতে নববধূর গালে ও ঠোঁটে মধু মাখিয়ে দেয়া হতো। অনেক সবজাত শিশুকে জন্মের প্রথমে দুধ খাওয়ার আগে দুই এক ফোঁটা মধু মুখে দেয়া হয়। উদ্দেশ্য হচ্ছে সারা জীবন যেন মধুর মতো মধুময় হয়ে উঠে তাদের জীবন। গ্রীক সুন্দরীরা মধু পান করত যৌবন ধরে রাখার জন্য। মিশরের মায়েরা বাচ্চাদের মধু মিশ্রিত পানি পান করাতেন যাতে তাদের স্বাস্থ্য ভালো থাকে ও তারা যেন সুন্দর হয়। কিংবদন্তি সুন্দরী ক্লিওপেট্রা মুখে মধু মাখতেন।