📄 ক্যান্সার ও হৃদরোগে মধু
পূর্বের আলোচনা হতে পরিষ্কার বুঝা যায়, মধুতে ব্যাকটেরিয়া নির্মূলের ক্ষমতা বিদ্যমান। গ্যাস্ট্রিক ও ডিওডেনাল আলসার-এর জন্য দায়ী "হেলিকোব্যাকটর পাইলরী" নামক ব্যাকটেরিয়াকেও নির্মূল করতে পারে। সেই সাথে মধু ক্যান্সার ও হৃদরোগ প্রতিহত করতে পারে। ক্যান্সার এবং হৃদরোগের অন্যতম কারণ হলো, মুক্তমূলক বা ফ্রি-রেডিক্যাল। এন্টি-অক্সিডেন্ট, মুক্তমূলক বা ফ্রি রেডিক্যালের বিরুদ্ধে কাজ করে, ক্যান্সার, হৃদরোগসহ অনেক রোগ প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে। মধুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে এন্টি-অক্সিডেন্ট। মধু যত ঘন বা গাঢ় হবে, এন্টি-অক্সিডেন্ট-এর পরিমাণ তত বেশি থাকবে। ফলে নিয়মিত মধু সেবনে ক্যান্সার ও হৃদরোগসহ বহুবিধ রোগ প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে। মধুর সাথে কালিজিরা সেবনে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে বিস্ময়কর ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
📄 বিভিন্ন রোগ ব্যাধিতে মধু ব্যবহারের পদ্ধতি
পেটের রোগ-ব্যাধি, শরীরের পানি শূন্যতায়, হাইপার হাইড্রোসিস, হার্ট প্রম্বিং, শারীরিক দুর্বলতা, স্নায়ুবিক দুর্বলতা, কোষ্ঠকাঠিন্যতায় নিম্নোক্তভাবে মধু ব্যবহার করতে হবে। একে "হানী ওয়াটার থেরাপী" বলা হয়। তৈরির পদ্ধতি: প্রথমে পরিষ্কার একটি কাঁচের গ্লাসে ১ (এক) থেকে ৩ (তিন) চামচ মধু নিতে হবে। এরপর এক গ্লাস অথবা পরিমাণ মতো বিশুদ্ধ পানি গ্লাসে ঢালতে হবে এবং উক্ত মধু মিশ্রিত পানি পান করতে হবে। প্রত্যহ ১ (এক) থেকে ৩ (তিন) চা চামচ মধু চেটে চেটে খেতে হবে। সেই সাথে প্রয়োজনানুসারে ১/২ চা চামচ কালিজিরার তেল চেটে চেটে খেতে হবে। অথবা প্রথম সকালে ও রাত্রে শয়নকালে এক চিমটি কালিজিরা চিবিয়ে চিবিয়ে খেতে হবে।
📄 মৌমাছির বিষের মাধ্যমে রোগ মুক্তি
বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, মৌমাছির হুলের বিষে কিছু কঠিন রোগ নিরাময়ের প্রতিষেধক রয়েছ। মৌমাছির বিষ গেঁটেবাত ও রক্ত Multiple Selerosis বা গেঁটেবাত নিরাময়ে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। বিজ্ঞানীরা মৌমাছির বিষে বেশ কিছু ধরনের প্রোটিন খুঁজে পেয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এ সব প্রোটিনের মধ্যকার "ফসফলিপাজ-এ” নামক এক প্রকার এনজাইম থাকে; যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
সাধারণত মধু সংগ্রহের জন্য মধু চাষ করা হলেও বিজ্ঞানীরা মৌমাছির বিষ সংগ্রহ করেছেন। বিশেষ ধরনের কাগজে লাগামাত্রই বিদ্যুতের প্রভাবে মৌমাছি বিষ উগড়ে বা ঢেলে দেয়। সম্প্রতি মৌমাছির বিষ নিয়ে বিজ্ঞানীরা এক দীর্ঘ মেয়াদী গবেষণার কাজ শুরু করেছেন। ওয়াশিংটনের জর্জ টাউন ইউনিভার্সিটির মেডিক্যাল সেন্টারে বছরব্যাপী এই গবেষণা শুরু হয়েছে। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও মাইক্রোবায়োলজির প্রফেসর জোসেফ বেলান্তি এ গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, মৌমাছির বিষের সাহায্যে রোগ নিরাময় ক্ষমতার ধারণা নতুন নয়; বরং ইতিহাস থেকে জানা যায়, গ্রিক ও রোমানিরা মৌমাছির বিষের সাহায্যে রোগ নিরাময় সম্পর্কিত বিদ্যা সম্পর্কে জানত। আর এ সূত্র ধরেই সমকালীন বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে গবেষণায় আকৃষ্ট হন। এরূপ আরেকটি ঘটনাতে দেখা যায়, গেঁটেবাত বা Multiple Selerosis রয়েছে, এমন ব্যক্তি মৌমাছি দ্বারা আক্রান্ত হওয়া রোগের দুর্ভোগ থেকে বিস্ময়করভাবে মুক্ত হয়ে গেছে।
📄 রূপচর্চায় মধুর ব্যবহার
ইতিহাস প্রসিদ্ধ মিশরের রানী ক্লিওপেট্রা নিঃসন্দেহে বিশ্ববিখ্যাত সুন্দরী ছিলেন। কথিত আছে, তিনি ত্বকের জেল্লা বজায় রাখতে গাধার দুধ দিয়ে গোসল করতেন। আর ময়শ্চারাইজার হিসেবে মুখে নিয়মিত মধু মাখতেন। ময়শ্চারাইজিং ও এন্টিবায়োটিক গুণ মধুকে সৌন্দর্য চর্চার এক অপরিহার্য উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নিম্নে এ সম্পর্কিত কয়েকটি টিপস দেয়া গেল।
১. মুখমণ্ডল পরিষ্কার করে সামান্য মধু আঙ্গুলে লাগিয়ে সারা মুখে ও ঘাড়ে চক্রাকারে ম্যাসেজ করতে হবে। কিছুক্ষণ পরেই মুখ ও ত্বক মিশে রক্ত চলাচলের গতিকে বাড়িয়ে দেয়। এরপর সামান্য গরম পানি দিয়ে মুখমণ্ডল ও ঘাড় ধৌত করে ফেলতে হবে। এভাবে ২০-২৫ দিন মধু ব্যবহারে মুখমণ্ডল আগের চেয়ে সুশ্রী, সুন্দর ও লাবণ্যময়ী হয়ে উঠবে।
২. মুখে বয়সের ছাপ পড়লে দুধ ও মধু একত্রে মিশিয়ে পরিষ্কার মুখে ২০ মিনিট মালিশ করে রাখতে হবে। মিশ্রণটি তুলার সাহায্যে কপাল, গাল, ঠোঁটের উপরিস্থান, থুতনী ও গলায় আলতোভাবে লাগাতে হবে। এভাবে ১৫-২০ দিন নিয়মিত লাগালে মুখে বয়সের ভাঁজ অনেকাংশে দূর হয়ে যাবে।
৩. ফেসিয়ালের এক কার্যকর উৎস হলো মধু। ২/৩ চা চামচ মধু, পাঁচ চামচ ওটমিল ও এক চামচ জল একত্রে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করতে হবে। এরপর কাঁচা দুধে তুলো ভিজিয়ে মুখ ও ঘাড় মুছতে হবে। যাতে বাড়তি তেল-ময়লা না থাকে। এরপর উল্লিখিত পেস্টটি মুখ, গলা ও ঘাড়ে ভালোভাবে ম্যাসেজাকারে লাগিয়ে চল্লিশ মিনিট পর কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। ত্বকের ধরন তেল তেলে হলে ওটমিলের বদলে শশা ও লেবুর রস ব্যবহার করা যেতে পারে।
৪. হজম ঠিক মতো না হলে এর প্রভাব দেহের ত্বকে, চুলে, মুখে, মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে বিরূপ প্রভাব পড়ে। মধু, চুল ও ত্বককে স্বাভাবিক অবস্থা থেকে মুক্ত রাখতে সাহায্য করে। খাওয়ার পর হানি ওয়াটার থেরাপি অর্থাৎ মধুর সাথে পানি মিশ্রিত করে (পানির সাথে মধু মিশ্রিত নয়) অর্থাৎ খেলে বিপাক সমস্যাসহ ঝুঁকি কমে যাবে, চুল পড়া বন্ধ হবে এবং ত্বকে অক্সিজেন প্রবাহ বাড়বে।
৫. রোদে পোড়া মুখ, ঘাড়, গলা ও হাতের যত্নে মধু ও কমলালেবুর খোসা বাটা একত্রে মিশ্রিত করে আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার করে মাখলে অনেক উপকার পাওয়া যায়। নিয়মিত এ অভ্যাস ধরে রাখলে ত্বকের হারানো সৌন্দর্য ফিরে পাওয়া যায়।
৬. শীতকালে অত্যধিক শুষ্ক-আবহাওয়ার কারণে ঠোঁট, হাত, পা ফেটে যায়। আর এর সমাধানে মধু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার করে মধু মেখে কয়েক ঘণ্টা রেখে পরিষ্কার করলে উপকার পাওয়া যায়। দিনে দু'একবার, সপ্তাহে দু'তিনদিন এভাবে করলে উক্ত সমস্যা দূর হয়ে যাবে।
৭. শুষ্ক ত্বকের যত্নে অ্যামন্ড বাটা ও গোলাপ ফুলের পাঁপড়ি বাটার সাথে মধুসহ মিশ্রণ বানিয়ে মুখ ও ঘাড়ে ত্রিশ মিনিটি লাগিয়ে রাখলে উপকার পাওয়া যায়। এভাবে মিশ্রণটি সংরক্ষণ করে নিয়মিত ১৫-২০ দিন ব্যবহারে উক্ত সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।
৮. ব্রণ একটি সমস্যা, যাতে চুলকানীসহ ত্বকে বিশ্রী কালো দাগও পড়ে। এ সমস্যায় চন্দন বাটার সাথে মধু পরিমাণ মতো মিশ্রিত করে ব্যবহার করতে হবে। সেই সাথে মল ত্যাগে কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা যেন না থাকে। তাহলে কিছু দিন ব্যবহারেই ব্রণসহ কালো দাগ দূর হয়ে যাবে।
৯. চুলে খুশকির সমস্যায় লেবুর রসে মধু মিশ্রিত করে চুলের গোড়ায় ম্যাসাজ করতে হবে। এভাবে ২০-৩০ মিনিট পর ভালো কোনো শ্যাম্পু দিয়ে চুল পরিষ্কার করতে হবে। ৫-৭ দিন নিয়মিত ব্যবহারে খুশকির সমস্যা সমাধান হবে।
১০. ত্বকের র্যাশ মরা কোষ বিদায় করতে হলে চিনাবাদামের চূর্ণের সাথে মধু সামান্য পরিমাণ মিশ্রিত করে পেস্ট তৈরি করতে হবে। পরে আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার করলে চকচকে ভাব এসে যাবে। সেই সাথে ত্বকের আর্দ্রতাও ফিরে আসবে।