📄 মধুর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও এর পুষ্টিমান
হাজার-হাজার সংগৃহীত ফুলের নির্যাস এবং খাদ্য দ্রব্যের সাথে মৌমাছির মুখ থেকে নিঃসৃত লালা উপাদানসমূহের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় লালারূপ ঘন আঠালো পদার্থ তৈরি হয়, তাকে মধু বলে।
১০০ গ্রাম মধুকে বিশ্লেষণ করলে নিম্নোক্ত উপাদনগুলো পাওয়া যায়।
১. গ্লুকোজ - ৩৫%; ইহা ক্লান্তি দূরীকরণের বিশেষ ভূমিকা রাখে।
২. লেভিউলোজ - ৪০%
৩. শর্করা ৩-৪%; এর উপস্থিতির কারণে জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয় না এবং নষ্টও হয় না।
৪. পানি - ১৮%; শরীরের পানির ভারসাম্য রক্ষা করে।
৫. খনিজ উপাদান ০.২% গ্রাম। (যা শারীরিক, মানসিক, স্নায়ুবিক ও স্মৃতি শক্তি বাড়ায়)
৬. ক্যালসিয়াম ৫ মি. গ্রাম (যা দ্বারা হাড়, দাঁত, রক্ত ও অন্যান্য টিসু তৈরি হয়)
৭. লৌহ - ৯ মি. গ্রাম (যা রক্ত তৈরিতে সরাসরি অংশগ্রহণ করে।)
৮. আমিষ-০.৩ গ্রাম। = ভিটামিন বি-২০.০৪ মি. গ্রাম। = ভিটামিন-সি - ৪ মি. গ্রাম।
৯. অন্যান্য ৩% গ্রাম।
এছাড়া মধুতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের এন্টি-অক্সিডেন্ট, এন্টিসেপটিক এজেন্ট, এন্টিবায়োটিক এজেন্ট, হজম শক্তি বৃদ্ধিকারী এনজাইমিক এজেন্ট ইত্যাদি। এতে ২% এনজাইম রয়েছে। এ এনজাইমগুলো হলো- ডায়াস্টেজ, ইনভার্টেজ, সোকরোজ, ক্যাটালেক্স, পার-অক্সিডেস, লাইপেজ। এই এনজাইমগুলো বিভিন্ন খনিজ উপাদান যেমন-ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন, ক্লোরিন, সালফার, ফসফরাস, আয়োডিন লবণের সাথে যুক্ত থাকে। কিছু উপকরণের রেডিয়ামের ন্যায় ধাতব উপাদানও থাকে।
রাসায়নিক গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে জানা গেছে, এতে এ্যালুমিনিয়াম, বোরন, ক্রোমিয়াম, কপার, লেড, টিন, জিংক ও জৈব এসিড যেমন-ম্যালিক এসিড, সাইট্রিক এসিড, টারটারিক এসিড এবং অক্সালিক এসিড, ভিটামিন, হরমোনস, এসিটাইল কোলিন, এন্টিবায়োটিকস, ফাইটোনসাইডস, সাইটোস্ট্যাটিকস এবং পানি (১৭.৭%) ছাড়াও অন্যান্য পুষ্টিকর উপাদান আছে। ভিটামিন যেমন-ভিটামিন বি-১, বি-২, বি-৩, বি-৫, বি-৬, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ই, ভিটামিন-কে এবং ক্যারোটিন ইত্যাদি মধুতে বিদ্যমান। এক কেজি মধুতে ৩২৫০ ক্যালরি শক্তি থাকে। ইহা সুগারের ন্যায় যা রূপান্তর ব্যতীত সরাসরি অস্ত্র থেকে রক্তে সংযোজিত হয়।
📄 রোগ নিরাময়ে মধু ব্যবহারের ইতিহাস
গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটাস বিভিন্ন ধরনের রোগ নিরাময়ে মধু ব্যবহার করতেন। তিনি মধুকে অতিরিক্ত খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশিষ্ট চিকিৎসা বিজ্ঞানী গ্যালেন মধুর ঔষধি গুণাগুণ বর্ণনা করেছেন এবং এর বিষবিরোধী ধর্মও উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে মধু আন্দ্রিক রোগে উপকারী। বিশেষ করে দুর্বল শিশুদের মুখের অভ্যন্তরীণ পঁচনশীল ঘা নিরাময়ে এটি খুবই উপকারী। বিভিন্ন ধরনের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। এটি ক্ষুধা ও স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধি করে এবং শোষক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মধু পাকস্থলীর বিভিন্ন প্রকার রোগে বিশেষ উপকারি।
আল-সমরকান্দী এবং ইবনে আল-নাসিফ বিভিন্ন প্রকার মূত্র রোগে মধু ব্যবহার করতেন। আল-রাজী মূত্র পাথরীতে কালিজিরার সাথে মধু ব্যবহার করতেন। ইউনানী মধ্য যুগের চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ বিভিন্ন রোগে মধু ব্যবহার করতেন, (যেমন-পাকস্থলী ও অস্ত্রের রোগ, কোষ্ঠকাঠিন্য, অম্লাধিক্য, মুখের প্রদাহ, চোখের রোগ, চোখের পাতায় প্রদাহ, কর্ণিয়ার ক্ষত, কর্নিয়ার অস্বচ্ছতা, স্নায়ুরোগ, পক্ষাঘাত, রক্ত প্রবাহের অবরুদ্ধতাজনিত হৃদরোগ এবং উচ্চ রক্তচাপ, ত্বকের রোগ, সংক্রমণজনিত ক্ষত, সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া ইত্যাদি।)
📄 মধু সম্পর্কিত জার্মানি হৃদ-রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ ই-কচ-এর উক্তি
ডা: ই-কচ-এর মতে, উপযুক্ত ঘাস খেয়ে ঘোড়া যেমন তেজী হয় তেমনি প্রত্যহ সকালে এক চা-চামচ করে খাঁটি মধু খেলে হৃদপিণ্ড শক্তিশালী হয়।
📄 মধু ব্যাকটেরিয়া নির্মূল করে
গ্যাস্টিক, আলসার অথবা ডিওডেনাল আলসারের জন্য "হেলিকো ব্যাকটরপাইলরী" নামক ব্যাকটেরিয়াকে দায়ী করা হয়। এই ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে ক্যান্সার ও হৃদরোগ হয়। লন্ডনে সেন্ট জর্জ হাসপাতালে পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিতে হৃদরোগের সম্ভাবনা দ্বিগুণ বৃদ্ধি করে। শিশুদের দৈহিক বৃদ্ধি প্রভাবিত করে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যে সব উঠতি বয়সের মেয়েদের দেহে এ ব্যাকটেরিয়া নেই, তাদের তুলনায় যাদের এ ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, তাদের দৈহিক বৃদ্ধি অপেক্ষাকৃত কম। ৫৫৪ জন মেয়ের ওপর গবেষণা চালিয়ে এই ফল পাওয়া গেছে। এই ব্যাকটেরিয়া নির্মূলের জন্য এন্টি-বায়োটিক ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে এর আক্রমণে গ্যাস্টিক এবং ডিওডেনাল আলসারের জন্য ট্রিপল থেরাপী (Triple therapy) ব্যবহৃত হয়।
অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, মধু সেবনে হেলিকো-ব্যাক্টর পাইলরী নামক ব্যাকটেরিয়া নির্মূল হয়। মধু সেবনে একদিকে যেমন ব্যাকটেয়িরার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায় তেমনি এন্টি-বায়োটিকের ক্ষতিকর প্রভাব হতেও পরিত্রাণ পাওয়া যায়।