📄 পর্দা করলে আপন পর হয়ে যায়
অনেকে বলে, 'আমি পর্দা করলে অনেক আত্মীয় পর হয়ে যাবে। আর সেটা আমার জন্য ক্ষতিকর হবে।'
খালাতো ভাইকে পর্দা করলে, সে ভাই তো রাগ করেই, খালাও রাগ করে এবং সেই জেরে মাও রাগ করে! নন্দাইকে পর্দা করলে ননদ ও শ্বাশুরী রাগ করে! যাদেরকে পর্দা করি, তারা আমাদের বাড়ি আসাই বন্ধ ক'রে দেয়। আমরা বলি, আল্লাহর আনুগত্য করলে যে আত্মীয় পর হয়ে যায়, সে আত্মীয় তোমার আত্মীয় থাকাই ভাল নয়। ভাল কাজ করলে যে তোমাকে ভালবাসে এবং খারাপ কাজ করলে যে তোমাকে ঘৃণা করে, সেই হল পরম আত্মীয়; যদিও তার সাথে তোমার কোন রক্তের সম্পর্ক নেই।
ধৈর্য ধর বোনটি আমার! আর জেনে রেখো, যারা ভাল কাজ করে, তাদেরকে আল্লাহ ভালবাসেন। আর যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসেন, তারা অন্য কারো ভালবাসার মুখাপেক্ষী নয়। তবুও মহান আল্লাহ বলেছেন,
[إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمَنُ وُدًّا ] (মারয়্যামঃ ৯৬)
অর্থাৎ, যারা বিশ্বাস করেছে এবং সৎকর্ম করেছে, পরম দয়াময় তাদের জন্য (পারস্পরিক) সম্প্রীতি সৃষ্টি করবেন।
অর্থাৎ, পৃথিবীতে মানুষের অন্তরে সৎকর্ম ও পরহেযগারীর জন্য ভালবাসার সৃষ্টি করবেন। যেমন হাদীসে এসেছে, "যখন আল্লাহ কোন বান্দাকে নিজের প্রিয় করে নেন, তখন তিনি জিবরীল (আ)-কে বলেন যে, আমি অমুক বান্দাকে ভালবাসি, তুমিও তাকে ভালবাস। সুতরাং জিবরীলও তাকে ভালবাসতে শুরু করেন। অতঃপর তিনি সারা আকাশে ঘোষণা করে দেন যে, আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালবাসেন, তোমরাও তাকে ভালবাস। আকাশের সমস্ত ফিরিশতা তাকে ভালবাসতে শুরু করেন। তারপর পৃথিবীতে তার বরণ ও গ্রহণযোগ্যতা স্থাপন করা হয়। (বুখারী)
আস্থা রাখো, তুমি যদি সত্যিসত্যিই ভাল কাজ কর এবং শরয়ী পর্দা করার মতো জিহাদী ভাল কাজ কর, তাহলে তোমার আত্মীয়-পর সকলে তোমাকে ভালবাসবে। তবে একটি কথা মনে রেখে সান্ত্বনা নিয়ো, সবচেয়ে বেশি ভাল কাজ যিনি ক'রে গেছেন, সবচেয়ে বেশি আল্লাহর ভালবাসা যিনি লাভ করেছেন, তাঁরও শত্রু ছিল। আর তুমি কে?
ভাল লোকের হিংসুক থাকে। তুমি পর্দানশীন বলে তোমারও হিংসুক থাকতে পারে। হিংসুককে নিজের জ্বালায় পুড়ে মরতে দাও। সে যত জ্বলে, তত তার জ্বালায় আরো ঘি ঢালো।
যদি তুমি তাদের হিংসায় কষ্ট পাও, তাহলে ধৈর্য ধরো এবং পর্দা বর্জন করো না। মানুষের সাময়িক কষ্টদানকে আল্লাহর আযাবের মতো ভেবো না। কারণ সে আযাব আরো কঠিন। মহান আল্লাহ বলেন,
[وَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ آمَنَّا بِالله فَإِذَا أُوذِيَ فِي اللَّهُ جَعَلَ فِتْنَةَ النَّاسِ كَعَذَابِ اللَّهُ ]
অর্থাৎ, মানুষের মধ্যে কিছু লোক বলে, 'আমরা আল্লাহকে বিশ্বাস করি'; কিন্তু আল্লাহর পথে যখন ওদেরকে কষ্ট দেওয়া হয়, তখন ওরা মানুষের পীড়নকে আল্লাহর শাস্তির মত গণ্য করে। (আনকাবুতঃ ১০)
তুমি যদি তোমার আত্মীয়কে খোশ করতে গিয়ে পর্দার ফরয বর্জন কর, তাহলে শত ধিক্ তোমাকে। সর্বনাশ তোমার!
মহানবী ﷺ বলেন, “যে ব্যক্তি লোকেদেরকে অসন্তুষ্ট করেও আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে, সে ব্যক্তির জন্য লোকেদের কষ্টদানে আল্লাহই যথেষ্ট হন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট ক'রে লোকেদের সন্তুষ্টি খোঁজে, সে ব্যক্তিকে আল্লাহ লোকেদের প্রতিই সোপর্দ ক'রে দেন।” (তিরমিযী, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৩১১নং)
“যে ব্যক্তি লোকেদেরকে অসন্তুষ্ট করেও আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে, সে ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হন এবং লোকদেরকেও তার প্রতি সন্তুষ্ট করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট ক'রে লোকদের সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে, সে ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন এবং লোকদেরকেও তার প্রতি অসন্তুষ্ট ক'রে দেন।” (ইবনে হিব্বান প্রমুখ)
📄 পর্দা কেবল নবী-পত্নীদের জন্য
কিছু শিক্ষিত মহিলার ধারণা যে, পর্দার আয়াতগুলিতে কেবল নবী-পত্নীদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। আর তার মানে পর্দার বিধান কেবল তাঁদের জন্য ছিল। সাধারণ মহিলাদের জন্য তা নয় এবং তাদের জন্য তা বড় কঠিনও বটে! যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন, "হে নবী-পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কন্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর। (স্বাভাবিকভাবে কথা বল।) তোমরা স্বগৃহে অবস্থান কর এবং (প্রাক-ইসলামী) জাহেলী যুগের মত নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়িয়ো না। তোমরা নামায প্রতিষ্ঠা কর ও যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের অনুগতা হও; হে নবী-পরিবার! আল্লাহ তো কেবল তোমাদের মধ্য থেকে অপবিত্রতা দূর করতে চান এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে চান।” (আহমাবঃ ৩২-৩৩)
“তোমরা তার পত্নীদের নিকট হতে কিছু চাইলে পর্দার অন্তরাল হতে চাও। এ বিধান তোমাদের এবং তাদের হৃদয়ের জন্য অধিকতর পবিত্র। তোমাদের কারও পক্ষে আল্লাহর রসূলকে কষ্ট দেওয়া অথবা তার মৃত্যুর পর তার পত্নীদেরকে বিবাহ করা কখনও সঙ্গত নয়। নিশ্চয় আল্লাহর দৃষ্টিতে এ ঘোরতর অপরাধ।” (আহযাবঃ ৫৩)
কিন্তু মহিলার উক্ত ধারণা সঠিক নয়। তার কারণ প্রণিধানযোগ্য:-
(ক) নবী-পত্নীগণ সবচেয়ে বেশি ঈমানদার, সৎশীল ও পবিত্র মহিলা হওয়া সত্ত্বেও যদি ঐ হুকুম হয়, তাহলে সাধারণ মহিলাদের ক্ষেত্রে কী হুকুম হওয়া উচিত? পর্দার হুকুম কি সাধারণ মহিলাদের জন্য বেশি যথোপযুক্ত নয়?
(খ) পর্দার হুকুম সকল মহিলাদের জন্য। যেহেতু উক্ত আয়াতেই বলা হয়েছে, "তোমরা নামায প্রতিষ্ঠা কর ও যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের অনুগতা হও।” আর এ হুকুম কেবল নবী-পত্নীদের জন্য নয়।
(গ) পর্দার বিধান যে আমভাবে সকল মুসলিম নারীদের জন্য তার প্রমাণ অন্য আয়াতে রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
[يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاء الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللهُ غَفُورًا رَّحِيمًا ] (আহযাবঃ ৫৯)
অর্থাৎ, হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও মু'মিনদের রমণীগণকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের (মুখমন্ডলের) উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে; ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ মহা ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। (আহযাবঃ ৫৯)
(ঘ) পর্দার হুকুম নবী-পত্নীদের জন্য হলেও তাঁদের অনুসরণ করা সকল মুসলিম নারীর কর্তব্য। মহান আল্লাহ বলেন,
[لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لَّن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا ] (আহযাবঃ ২১)
অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর (চরিত্রের) মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। (আহযাবঃ ২১)
(ঙ) পর্দার হুকুম সকল মহিলার জন্য ব্যাপক বলেই উম্মে সালামাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হলে (মদীনার) আনসারদের মহিলারা যখন বের হল, তখন তাদের মাথায় (কালো) চাদর (বা মোটা ওড়না) দেখে মনে হচ্ছিল যেন ওদের মাথায় কালো কাকের ঝাঁক বসে আছে!' (আবু দাউদ ৪১০১ নং)
আল্লাহ তাআলার আদেশ, “মুমিন মেয়েরা যেন তাদের ঘাড় ও বুককে মাথার কাপড় দ্বারা ঢেকে নেয়---।” (নূর: ৩১)
আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'পূর্বের মুহাজির মহিলাদের প্রতি আল্লাহ রহম করেন। উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হলে তারা তাদের পরিধেয় কাপড়সমূহের মধ্যে সবচেয়ে মোটা কাপড়টিকে ফেড়ে মাথার ওড়না বানিয়ে মাথা (মুখ-ঘাড়-গলা-বুক) ঢেকেছিল।' (আবু দাউদ ৪১০২নং)
(চ) “হে নবী-পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও”---এর অর্থ এই নয় যে, তাঁদের প্রকৃতি ও চরিত্র অন্য মহিলাদের থেকে ভিন্নতর। উদ্দেশ্য হল, তোমরা আদর্শ মহিলা। তোমাদেরকে আল্লাহর আদেশ সবার আগে ও সবচেয়ে বেশি মানতে হবে। যেমন সাধারণতঃ প্রত্যেক নেতৃস্থানীয় ও ইমাম-আলেমগণের জন্য বলা হয়, আমলে তাঁরা জনসাধারণের আদর্শ হবেন। আর তার মানে এই নয় যে, তাঁরা যা করবেন, তা অন্যকে করতে হবে না।
দ্বিতীয় খলীফা উমার বিন খাত্ত্বাব নিজের পরিবার-পরিজনকে বলতেন, 'তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোন অপরাধে আমার কাছে আনীত হবে, আমি তাকে ডবল শাস্তি দেব। যেহেতু লোকেরা তোমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, যেমন চিল-শকুনি গোশতের দিকে তাকিয়ে থাকে। তোমরা অপরাধে পতিত হলে, তারাও পতিত হবে।'
অর্থাৎ, তোমরা আদর্শ হয়ে যদি পাপ কর, তাহলে তা দেখে সাধারণ মানুষ পাপে বেশি দুঃসাহসিকতা প্রদর্শন করবে।
(ছ) শরীয়তের যে হুকুম নবী বা তাঁর পত্নী অথবা কোন সাহাবীকে সম্বোধন ক'রে অবতীর্ণ হয়, তা আসলে তাঁদের জন্য খাস হয় না। তবে খাস হওয়ার যদি দলীল থাকে, তাহলে তা খাস মানতে হবে। আর পর্দার বিধান যে কেবল নবী-পত্নীদের জন্য খাস, তার কোন দলীল তো নেইই, বরং দলীল আছে তার বিপরীত।
(জ) মহান আল্লাহ পর্দার বিধানের যৌক্তিকতা ও উপকারিতা বর্ণনা করেছেন। আর তা হল এই যে, “এ বিধান তোমাদের এবং তাদের হৃদয়ের জন্য অধিকতর পবিত্র।” সুতরাং কেউ এ কথা বলতে পারে না যে, সাধারণ মুসলিম পুরুষ-মহিলাগণ সে পবিত্রতার মুখাপেক্ষী নয়। এ থেকেও স্পষ্ট হয় যে, এ বিধান সকলের জন্য।
📄 পাশ্চাত্যের মহিলাদের পর্দা
যৌন-স্বাধীনতার ইউরোপ-আমেরিকাতে পর্দার কথা হাস্যকর। যেখানে পর্দানশীন মহিলা হাসির পাত্রী। সেখানকার সমাজে বোরকা-ওয়ালী মহিলা এক আজীব মহিলা, এক বিরল মহিলা।
নারী-স্বাধীনতা তথা যৌন-স্বাধীনতার পরিবেশে পর্দা মেনে চলা মহিলার জন্য বড় কঠিন। যে পরিবেশে আইন ক'রে পর্দা নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়। যেখানে পর্দা দেখে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করা হয়। ভোগবাদী সে সমাজে পর্দাকে 'সেকেলে' মেয়েদের চিহ্ন মনে করা হয়।
এই শ্রেণীর দুনিয়াদার বেদ্বীন মানুষদের আচরণ ও পরিণাম সম্বন্ধে মহান আল্লাহ বলেছেন,
[إِنَّ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا وَرَضُوا بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاطْمَأَنُّوا بِهَا وَالَّذِينَ هُمْ عَنْ آيَاتِنَا غَافِلُونَ (৭) أُوْلَئِكَ مَأْوَاهُمُ النَّارُ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ] (ইউনুসঃ ৭-৮)
অর্থাৎ, যারা আমার সাথে সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না এবং পার্থিব জীবন নিয়েই পরিতৃপ্ত থাকে এবং এতেই যারা নিশ্চিন্ত থাকে এবং যারা আমার নিদর্শনাবলী সম্বন্ধে উদাসীন; এই লোকদের নিজেদের কৃতকর্মের ফলে ঠিকানা হবে জাহান্নাম। (ইউনুসঃ ৭-৮)
ইউরোপ তার ভুয়ো সভ্যতা নিয়ে গর্বিত। পার্থিব জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতায় মত্ত। যে দেশের পরিবেশে ১২-১৪ বছরে কেউ কুমারী থাকে না। যে পরিবেশের মহিলারা স্বামী ও বন্ধুর মাঝে কোন পার্থক্য বুঝে না। যে দেশের ঘরে ঘরে অবিবাহিত মেয়েরা তাদের বন্ধুদেরকে নিয়ে মা-বাপ-ভাইদের সাথে এক টেবিলে বসে পানাহার করে। বন্ধুর সাথে একান্তে সহাবস্থান ও সহবাস করে!
যে পরিবেশে 'নারী-স্বাধীনতা'র অর্থ হল, নারী মুক্ত দেহে রাস্তা-ঘাটে ও হাটে-বাজারে চলাফেরা করবে। ইচ্ছামতো পুরুষ বন্ধু গ্রহণ করবে। ইচ্ছামতো বাড়ির বাইরে থাকবে, তাতে কেউ বাধা দেবে না, কেউ কৈফিয়ত নেবে না। যেখানে নগ্নতাই হল নারী-স্বাধীনতা।
স্বাধীন নারী সেই, যে বিভিন্ন হোটেল ও বারে নাচ-গান ক'রে বেড়ায়। স্বাধীন নারী সেই, যে বিভিন্ন ফ্যাশন-শোয়ে মডেল হয়ে নিজেকে অর্ধ নগ্নাবস্থায় প্রদর্শন করে। আলোকপ্রাপ্ত মহিলা সেই, যার দেহের সিংহভাগ অংশে সূর্যের আলো লাগে!
এমন দেশে, এমন পরিবেশে কি পর্দার কথা ভাবাও যায়? মোটেই না। যে দেশে মুসলিম দেশের পর্দানশীনরা সফর করলে এয়ারপোর্টে বোরকা ব্যাগে ভরে নেয়। যে দেশে পৌছে গিয়ে মুসলিম মহিলা এই কামনা করে যে, তাকে যেন কোন ইউরোপিয়ান অন্য জাতির মহিলা বলে চিনতে না পারে! কিন্তু সত্যের একটা তেজস্ক্রিয়তা আছে। যে সত্যকে গোপন রাখা যায় না। সেই নগ্ন দেশের বহু মহিলা এখন সেই সত্য উপলব্ধি করেছে, যে সত্যের আলো থেকে অনেক পর্দানশীন বের হয়ে বাঁচতে চাচ্ছে, সেই সত্যের আলোর পিপাসায় ইউরোপের অনেক মহিলা জিহাদ ক'রে যাচ্ছে।
এক সউদী মহিলা স্বামীর সাথে তওহীদ ও পর্দার দেশ থেকে যৌন-স্বাধীনতার এক দেশ প্যারিস সফর করল। স্বামীর ইচ্ছানুসারে প্লেনেই তার বোরকা খুলে ফেলে দিল। প্লেন ফিরে গেল সউদিয়ায়। সেই সাথে বোরকাও ফিরে গেল পর্দার দেশে। ফিরে গেল ঈমানের পরিবেশে। ফিরে গেল সেই হেরেমে, যেখানে মহিলার যথার্থ কদর করা হয়।
মহিলা স্বামী-সন্তানের সাথে ইউরোপে বসবাস করতে লাগল। প্রয়োজনে ইটালি, হলান্ড, বেলজিয়াম, জার্মানি, স্পেন প্রভৃতি জায়গায় সফর করতে থাকল। সে সব দেশের চিড়িয়া-ঘর, জাদু-ঘর, পার্ক, সমুদ্র-সৈকত, থিয়েটার, বার, হোটেল, মার্কেট প্রভৃতি বেড়াবার জায়গাগুলি দেখতে লাগল। বিনা পর্দায় পুরুষদের সাথে মিশতে লাগল। ইউরোপের অভিজাত পোশাক পরে, নানা প্রসাধনের সাথে বাজারে ফিরতে লাগল। ভুলে গেল নিজের দেশের কথা, ভুলে গেল পর্দার কথা।
ধীরে ধীরে নামাযও ছুটতে লাগল। বিউটি-পার্লারে গিয়ে আধুনিকা সেজে আসতে দেখে তার স্বামীও বড় খোশ ছিল। জীবনের পরম আনন্দ ও চরম সুখ তারা উপভোগ করতে লাগল। সতীত্ব বাঁচিয়ে চললেও নিজ দেহের রূপ-লাবণ্য দ্বারা দর্শন-তৃপ্তি উপভোগ করেছে বহু পুরুষে। মনে পড়ে নিজের দেশের কথা, যেখানে পুরুষেরা সেই তৃপ্তি উপভোগ করতে পারে না। যেখানে মহিলাকে পুরুষের কামদৃষ্টি থেকে বড় হিফাযতে রাখা হয়।
ধীরে ধীরে শয়তানী জীবন শুরু হতে লাগল। পাশ্চাত্যের স্বাধীন জীবনে পূর্ণ ছায়া তাদের উপর পড়তে লাগল। নারী-দেহ নিয়ে ব্যবসা, প্রতিযোগিতা ও সুখ-ভোগের সকল আড্ডা ও পদ্ধতি স্বচক্ষে পরিদর্শন করতে লাগল।
একদিন সে দেশে বেড়াতে আসার প্রস্তুতি স্বরূপ স্বামীর সঙ্গে 'গিফট' ক্রয় করতে লন্ডনের এক বাজারে বের হল। ঘুরতে ঘুরতে লক্ষ্য করল একটি দোকানে ভিন্ন প্রকৃতির একটি মহিলা কিছু কেনাকাটা করছে। তার দেহ আপাদমস্তক ঢাকা। এমনকি হাতে হাত-মোজা, পায়েও পা-মোজা পরে আছে সে। মহিলাকে দেখে মনে হল ঈমানী মেঘ যেন তাকে ছায়া ক'রে আছে। তার চলনে-বলনে নম্রতা ও ভদ্রতা রয়েছে। এমন বিরল মহিলার আচরণে যেন হিদায়াতের আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে।
সউদী মহিলাটির যেন হুঁশ হারিয়ে গেল। তার মনের ভিতরে আজীব কম্পন শুরু হল। ভাবল, হয়তো সে কোন আরবী মহিলা। অথবা অনারবী মুসলিম মহিলা। হৃদয়ে তার পরিচয় জানার আগ্রহ সৃষ্টি হল। বিদ্যুত-বেগে তার নিকটবর্তী হয়ে হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। সেও তার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে রইল। কোন অজানা এক সম্পর্ক যেন উভয়কে কাছাকাছি ক'রে দিল।
সউদী মহিলাটি কথার সূত্রপাত ক'রে বলল, 'আস্-সালামু আলাইকুম অরাহমাতুল্লাহি অবারাকাতুহ।' বোরকা-ওয়ালী মহিলাটি সুন্দরতর ভাষায় সালামের জবাব দিল। বলল, 'আপনি কি কোন আরবী মহিলা?'
---না।
---আপনি কি ব্রিটেনের মহিলা?
---হ্যাঁ। আলহামদু লিল্লাহ। আমি ও আমার স্বামী ছেলেমেয়ে নিয়ে দু'বছর আগে ইসলাম গ্রহণ করেছি। আমার নাম খাদীজা। পূর্ব নাম ক্যাটরীনা। আমরা ব্রাইটন শহরের বাসিন্দা। বর্তমানে আমরা লন্ডনের বাৎসরিক সেমিনারে যোগ দিতে এসেছি। আপনি কি আরবী মুসলিম মহিলা?
---হ্যাঁ। আমার বাড়ি সউদিয়ায়।
---ওহো! আমাদের রসূলের দেশ। সে দেশ তো পর্দার দেশ। আপনার পর্দা কোথায়?
---আপনি ব্রিটেনে থেকে এইভাবে পর্দার পোশাক কীভাবে ব্যবহার করছেন?
---যেভাবে আল্লাহ আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। আশ্চর্য যে, আপনি আসল মুসলিম হয়েও নকল দেশে এসে নিজের আসলত্ব হারিয়ে ফেলেছেন? আপনি মক্কা-মদীনার দেশের মহিলা। ছোটবেলা থেকে ইসলামী পরিবেশে মানুষ হয়ে পাশ্চাত্যের চকচকে সভ্যতায় ধোঁকা খেয়েছেন? আমরা জানি, সে পরিবেশের মূল্য। আল্লাহর শত প্রশংসা ও শোকর যে, তিনি আমাদেরকে ইসলামের প্রতি পথ-প্রদর্শন করেছেন এবং যার ফলে পূর্বের অসভ্য ও কদর্য জীবন থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছি। সেই জীবন থেকে মুক্তিলাভ করেছি, যে জীবনে নারীর কোন মূল্য নেই। যে জীবনে নারী খুবই সস্তা ভোগপণ্য। ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পর আমি নারীত্বের মর্যাদা পেয়েছি, মানবতার অধিকার পেয়েছি। খুব ভালভাবেই অনুভব করেছি, নারীকে মর্যাদা দিয়েছে ইসলাম। জীবনের পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা শিখিয়েছে ইসলাম। মহিলার আসল কর্ম ও অবস্থান-ক্ষেত্র শিখিয়েছে ইসলাম। স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র বন্ধনের মর্যাদা শিখিয়েছে ইসলাম। ফিরে যান বোনটি নিজ পর্দার দিকে। ফিরে যান নিজ ইসলামী পরিবেশের দিকে। ফিরে যান এ অন্ধকার ভুবন থেকে আলোকময় পৃথিবীতে। ফিরে যান নিজ মর্যাদার দিকে। ফিরে যান নিজ ঈমানী সংসারের দিকে।
এ দীর্ঘ উপদেশের সাথে কুরআনের আয়াত ও হাদীসও শুনাতে লাগল। সে বোরকা-ওয়ালী যেন মায়ের কাছে মামার বাড়ির গল্প বলছিল। কিন্তু সে মায়ের কাছে যে নিজ মায়ের বাড়ি বিস্মৃত হয়েছিল! পরিশেষে সে বিদায় নিল। যাবার সময় সালাম দেওয়ার আগে বলে গেল, 'আল্লাহর কাছে আপনার জন্য তওফীক কামনা করি, আপনি যেন আপনার পর্দায় ফিরে আসতে পারেন।'
উচ্চ শিক্ষিত মহিলা। তার কথার ঝড়ে হৃদয়-বনে হুল্লোড় সৃষ্টি ক'রে গেল। কিন্তু সে খর্জুর বৃক্ষের ন্যায় হতবাক দাঁড়িয়ে থাকল। তৎক্ষণাৎ তার দুই চক্ষু বেয়ে অশ্রুর স্রোতধারা বইতে লাগল। পর্দার দেশের এক মেয়েকে নসীহত ক'রে গেল বেপর্দা দেশের এক মেয়ে! বড় আত্মসম্মানেরও ব্যাপার ছিল। সেই মেয়ে, যে তার জীবন যৌন-স্বাধীনতার পচা পুকুরে কচুরিপানার ফুলের মতো কাটিয়েছে, যে প্রতিপালিত হয়েছে ভুয়ো সভ্যতা ও নকল সংস্কৃতির পানি ও বাতাসে, সে তাকে শিক্ষা দিল, যে ইসলামী সভ্যতার ছায়াতলে সুদর্শন গোলাপরূপে প্রতিপালিত হয়েছে। যে সেই দেশে মানুষ হয়েছে, যে দেশে ইসলামী আলো আছে, সভ্যতার পর্দা আছে, ইসলামী জীবন-ধারা আছে, সৎ কাজে আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা দেওয়ার মতো বিশেষ অফিস ও কর্মচারী আছে। প্রত্যেক স্কুল-কলেজে ইসলামী শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। যেখানে ছেলে ও মেয়েদের পৃথক পৃথক স্কুল-কলেজ আছে। যেখানে বেনামাযী ও বেদ্বীন মহিলারাও পর্দা করে।
মহিলা বড় লজ্জিতা ও অনুতপ্তা হল। অশ্রু-সজল নয়নে বাসায় ফিরে এসে স্বামীকে বলল, 'ঐ ইংরেজ মহিলাটা আমার চোখ খুলে দিয়েছে। আমার হারিয়ে যাওয়া চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছে। আমি দেশে ফিরে যেতে চাই। আমি বোরকা পরতে চাই।'
স্বামী তার এ কথা শুনে 'হো-হো' ক'রে হাসতে লাগল। হাসি থামিয়ে বলল, 'ও তো একটা সেকেলে মেয়ে। ওর কথায় তুমি গলে গেলে?'
স্ত্রী বলল, 'আমি গলে যায়নি। আমি এখন শক্ত হয়েছি। গলে তো তোমার কথাতেই গিয়েছিলাম। তুমি এমন স্বামী যার মধ্যে কোন আত্মমর্যাদাবোধ ও ঈর্ষা নেই। পর-পুরুষকেও স্ত্রীর রূপের অংশী কর। তুমি অযোগ্য স্বামী। তুমি হয় আমাকে দেশে পাঠাও, নচেৎ তালাক দাও!!!'
পরিশেষে মহিলা স্বামীর কাছে বিজয়িনী হল। ফিরে এল নিজ দেশে, হারামাইনের দেশে। ফিরে এল অন্ধকার থেকে আলোর পৃথিবীতে। ফিরে এল পর্দা-পুশিদার জীবনে। ফিরে এল পবিত্রতা ও সতীত্বের জীবনে। ফিরে এল আয়েশা, হাফসা, যয়নাব, ফাতেমা প্রমুখদের পর্দার পরিবেশে। ফিরে এল নিজ মর্যাদায়, নারীত্বের গর্ব ও গৌরবে। (আইনা হিজাবী দ্রঃ)
(মিসরী মহিলা) সূযী মাযহার বলেন, 'বিবাহের পর আমরা স্বামী-স্ত্রী মিলে হানিমুনে প্যারিস গেলাম। এক (জুমআয়) শহরের মসজিদে নামায আদায়ের পর মসজিদ থেকে বের হওয়ার আগে মাথার ওড়না খুলে ব্যাগে ভরলাম। তা দেখে এক ফরাসী যুবতী বড় আদবের সাথে আমাকে বলল, 'মাথার কাপড় খুলে ফেললেন কেন?'
আমি বললাম, 'যেহেতু নামায শেষ ক'রে ফেলেছি তাই।'
সে বলল, 'আপনি কি জানেন না, পর্দা সর্বাবস্থায় আল্লাহর হুকুম?'
সেই সময় তার সাথে আমার কথা বলার মোটেই ইচ্ছা ছিল না। যেহেতু তখন আমি হানিমুনে ছিলাম। আর আমার নিকট যথেষ্ট দ্বীনী জ্ঞানও ছিল না। কিন্তু সে আমাকে ছাড়ল না। বড় আদবের সাথে মসজিদে একটু বসতে বলল। সত্যিই সে দাওয়াতের কাজে সুদক্ষ মহিলা ছিল। বসার পর সে আমাকে বলল, 'আপনি কি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর সাক্ষ্য দেন এবং হৃদয়ে তার মানে বুঝেন?'
আমি বললাম, 'অবশ্যই। আমি একজন মুসলিম আরবী মহিলা।'
তখন সে কুরআনের এই আয়াত পাঠ করল,
[قُلْ إِنِّي أَخَافُ إِنْ عَصَيْتُ رَبِّي عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيم ] (আনআম: ১৫)
আমি চুপ থাকলাম। সে আবার বলল, 'অবাধ্যাচরণ নেয়ামত ধ্বংস হওয়ার কারণ হতে পারে। আশা করি আমার কথাটা ভেবে দেখবেন।' তারপর সে আমার হাতে হাত মিলিয়ে মুসাফাহা করল। আমি তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলাম। অতঃপর জীবনের প্রথমবারের মতো বড় ভাবনায় পড়লাম আমি।
আমি বড় অবাক হলাম। ফরাসী মহিলা এমন যৌন-স্বাধীনতার পাপময় পরিবেশে থেকেও ইসলামের খবর রাখে, পর্দা মেনে চলে। অথচ আমি ইসলামী পরিবেশে থেকে তা পারি না! অতঃপর রাত্রে হোটেলের নগ্ন পরিবেশে আমার স্বামী তার সঙ্গ দিতে বলল। কিন্তু অর্ধনগ্ন যুবক-যুবতীদের অবাধ মেলামিশার নোংরা পরিবেশ আমাকে অতিষ্ঠ ক'রে তুলল। আমি তার সামনে কেঁদে ফেললাম। সে কারণ জিজ্ঞাসা করলে আমি সব কথা খুলে বললাম। সে আর আমাকে জোর করল না।
বারবার ঐ ফরাসী যুবতীর উক্তিটি আমার কর্ণকুহরে পুনরাবৃত্ত হতে লাগল, 'অবাধ্যাচরণ নেয়ামত ধ্বংস হওয়ার কারণ হতে পারে।' আমার সবচেয়ে বড় নেয়ামত আমার সুস্বাস্থ্য ও রূপ-লাবণ্য। তা যদি চলে যায়? আমার দাদীজান প্যারালাইসিসের রোগী ছিলেন। যদি আমিও তাই হই?
সুতরাং ইসলামী বই-পুস্তক পড়াশোনা করতে শুরু করলাম। এক সময় মহান আল্লাহ আমাদের উভয়কে পবিত্রতার পথ প্রদর্শন করলেন।
📄 পর-পুরুষের সাথে নির্জনবাস
পর্দায় গোপনে থাকলেও যেখানে আর কেউ নেই, সেখানে মহিলার কোন পুরুষের সাথে একান্তে অবস্থান করা বৈধ নয়। কোন পথে বা পার্কে, কোন রুমে বা গাড়িতে, কোন সাব-ওয়ে, সিঁড়ি বা লিফটে, আরো যে কোন স্থানে গায়র মাহরাম নারী-পুরুষের নির্জনবাস অতি সামান্য ক্ষণের জন্য হলেও বড় বিপজ্জনক।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “মাহরামের উপস্থিতি ছাড়া কোন পুরুষ যেন কোন মহিলার সাথে নির্জনবাস না করে।” (বুখারী ও মুসলিম) তিনি আরো বলেন, "তোমরা এমন মহিলাদের নিকট গমন করো না, যাদের স্বামী বর্তমানে উপস্থিত নেই। কারণ শয়তান তোমাদের প্রত্যেকের রক্ত-শিরায় প্রবাহিত হয়।” (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ১৭৭৯, সহীহ তিরমিযী ৯৩৫নং) তিনি আরো বলেন, “যখনই কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনতা অবলম্বন করে, তখনই শয়তান তাদের তৃতীয় সাথী (কোটনা) হয়।” (তিরমিযী, সহীহ তিরমিযী ৯৩৪নং)
সাহাবী বলেন, “আল্লাহর নবী আমাদেরকে নিষেধ করেছেন যে, আমরা যেন মহিলাদের নিকট তাদের স্বামীদের বিনা অনুমতিতে গমন না করি।” (সহীহ তিরমিযী ২২৩০নং) একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “তোমরা (বেগানা) নারীদের নিকট (একাকী) যাওয়া থেকে বিরত থাক।” (এ কথা শুনে) জনৈক আনসারী নিবেদন করল, 'স্বামীর আত্মীয় সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?' তিনি বললেন, “স্বামীর আত্মীয় তো মৃত্যুসম (বিপজ্জনক)।” (বুখারী ৫২৩২, মুসলিম ২১৭২, তিরমিযী ১১৭১ নং)
স্বামীর বাড়িতে স্বামীর আত্মীয় বলতে সেই সকল পুরুষ, যাদের সাথে কোনও কালে মহিলার বিবাহ বৈধ। (যেমন স্বামীর ভাই, ভাইপো, চাচা প্রভৃতি।) আর তাদের মধ্যে সবচেয়ে কাছের হল স্বামীর ছোট ভাই। স্বামীর বড় ভাইকে পরিবেশে 'ভাসুর' বলে শ্রদ্ধা করলেও তার সাথে নির্জনতা অবলম্বন বৈধ নয়, সে আল্লাহর অলী হলেও নয়।
আর ছোট ভাইকে তো বিজাতির পরিবেশ গুণে 'দেওর' বা 'দেবর' বলাই হয়। যার অর্থ হল দ্বিতীয় বর। তার মানে স্বামী হল প্রথম বর এবং তার ছোট ভাই হল দ্বিতীয় বর অথবা নায়েব বর! আর সে জন্যই ভাবী-দেওরে যে আচরণ চলে, তা সত্যই স্বামীর সাথে আচরণের কাছাকাছি। নাউযু বিল্লাহি মিন যালিক। অথচ মুসলিম মহিলার 'বর' একটাই। তার কেউ 'দেবর' হতে পারে না।
এরই বিপরীত হল মহিলার নিজের বাড়িতে তার দোলাভাই বা বুনাই। শালীও স্ত্রীর বিকল্প অথবা দ্বিতীয় স্ত্রী বা 'দেবউ'। তার এক নাম 'কেলিকুঞ্চিকা'। কেলি মানে প্রেমখেলা। আর কুঞ্চিকা মানে চাবি। পরিবেশে শালী হল প্রেমকেলির চাবি। বউ তো আছেই, শালী 'ফাউ' আর কী? এ জন্যই এমন পরিবেশে প্রবাদ প্রচলিত আছে, 'বাগানে কখনো ফোটে না ফুল যদি না থাকে মালী, বিয়ের আসরে বলো না কবুল যদি না থাকে শালী।' প্রবাদটিকে এভাবেও বলা যায়, 'বাগানে কখনো ফোটে না ফুল যদি না থাকে মালী, বিয়ের বাসরে জমে না মজা যদি না থাকে শালী।'
এ জন্যই শালীর সাথে ভাব জমে ভাল। এ জন্যই অনেকের 'বাপের বেটি মুড়কি পায় না মোন্ডা শালীর পাতে, সহোদরের মুখ দেখে না সখ্য শালার সাথে!' অনেক সময় স্বামী জেনেশুনে স্ত্রীকে নিজের ভাইয়ের সাথে হৃদ্যতার সুযোগ দেয় এবং স্ত্রীও জেনেশুনে স্বামীকে নিজের বোনের সাথে হৃদ্যতার সুযোগ দেয়। ফলে নিজের মাথায় হাঁড়ি ভাঙ্গে উভয়ে। বেপর্দা পরিবেশে 'দেওর ও শালী' ঘটিত বহু দুর্ঘটনা সমাজে চাপা থাকে। অনেক সময় শাক দিয়ে মাছ ঢেকে রাখতে পারা যায় না। কিন্তু তা দেখেশুনেও মুসলিমরা উপদেশ গ্রহণ করে না। হাদীসে কেন বলা হল, “স্বামীর আত্মীয় তো মৃত্যুসম"? যেহেতু সে মৃত্যুর মতো বিপজ্জনক। অতিরিক্ত ভোল্টেজের কারেন্ট হলে তার খুঁটিতে মৃত্যুচিহ্ন অঙ্কিত থাকে। তার মানে সাবধান! এর কাছে যাবে না অথবা একে স্পর্শ করবে না, নচেৎ তোমার মৃত্যু অনিবার্য! নতুবা তার অর্থ এই যে, মানুষ যেমন অন্যান্য বিপদের তুলনায় মৃত্যুকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে, তেমনি স্বামীর ভাইকে অন্যান্য পুরুষদের তুলনায় বেশি ভয় করা উচিত। নতুবা তার অর্থ এই যে, মৃত্যুর হাত থেকে যেমন বাঁচার উপায় নেই, তেমনি ভাবী-দেওরের ফিতনা থেকে বাঁচার কোন উপায় নেই। ভাবী-দেওরের এক বাড়িতে নির্জনতা অবলম্বন করলেই বিপদ দুর্দম মৃত্যুর মতো এসে উপস্থিত হবে। নতুবা তার অর্থ এই যে, মহিলার মৃত্যুবরন করা ভাল, তবুও স্বামীর বেগানা কোন আত্মীয়র সাথে নির্জনতা অবলম্বন করা ভাল নয়।
প্রকাশ থাকে যে, বাগদত্ত বা ভাবী স্বামীর সাথেও প্রেমালাপ, নির্জনবাস বা একান্তে ভ্রমণ বৈধ নয়, কুরআন শিক্ষা দিতে অথবা উমরাহ আদায় করতেও নয়। আর মাহরাম যদি নাবালক হয়, তাহলে তাতে উভয়ের নির্জনতা কাটে না। কারণ তার থাকা-না থাকায় দুর্ঘটনায় কোন প্রভাব পড়ে না। বড় দুঃখের বিষয় যে, পাশ্চাত্য-ঘেষা বহু পরিবারে তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে বন্ধুত্বের সুযোগ দেওয়া হয়। সুতরাং ছেলে ইচ্ছা ও পছন্দমতো 'যুবতী' বন্ধু এবং মেয়ে ইচ্ছা ও পছন্দমতো 'যুবক' বন্ধু গ্রহণ করে এবং আপোসে নির্জন বাস ও ভ্রমণ করে। প্রাইভেট মাস্টারের সাথে নির্জনতা অবলম্বনের সুযোগ দেওয়া হয়। মনে-ধরা ছেলের সাথে মেয়েকে পরিকল্পিত ভ্রমণে পাঠানো হয়। অনেকে রোমান্টিক স্থান পার্ক ও নদী বা সমুদ্র-সৈকতে নির্জনে ভ্রমণে বা বনভোজনে যায়, অনেক প্রেমিক-প্রেমিকা একান্তে ভ্রমণে সেখানে যায়, যেখানে গেলে তারা ধারণা করে যে, প্রেম পাকা ও অনির্বাণ হয়। অভিভাবক চোখ-কান বন্ধ করে থাকে অথবা জেনেশুনেও কিছু বলে না। এ হল 'ঘটে তো ঘটে যাক, পটে তো পটে যাক'-এর নীতি, নাকি প্রগতির সভ্য নীতি! অথচ এমন আচরণ প্রগতি নয়, বরং নেহাতই দুর্গতি।