📄 বোরকা জাতির মহিলাদের মাঝে বর্ণ-বৈষম্য সৃষ্টি করে
অনেক ধর্মনিরপেক্ষবাদী মানুষ বলে থাকে, 'বোরকা জাতির মহিলাদের মাঝে বর্ণ-বৈষম্য সৃষ্টি করে।'
অতএব সর্বশ্রেণীর মহিলাদের জমায়েত-ক্ষেত্রে, স্কুল-কলেজে তা চলবে না। এমনকি মাথার ওড়নাটাও ব্যবহার করতে পারবে না! কেন তা পারবে না? কেন পারবে না 'তৃণারণিমণি'র ন্যায় দেশের কাজ করতে? 'নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান' থাকলে কেন পারবে না? কেন শিখ পাগড়ী ও দাড়ির মাধ্যমে নিজের স্বতন্ত্রতা বজায় রাখতে পারবে না? কেন মুসলিম দাড়ি ও পর্দার মাধ্যমে নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখতে পারবে না? কেন বিবাহিত হিন্দু মহিলা মাথায় সিঁদুর পরে নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারবে না?
নাকি যত দোষ, নন্দঘোষ? 'সবাই কৃণের নাম করে, আমি বললেই ধরে মারে। সব শালাকে ছেড়ে দিয়ে বেঁড়ে শালাকেই ধর?'
মনের মাঝে শত শ্রেণীর বিশ্বাসের পার্থক্য রেখে যদি 'মহান মিলন' বজায় থাকে, উঁচু-নিচু জাতিভেদ সত্ত্বেও যদি 'মহান মিলন' বজায় থাকে, নানান ধরনের লেবাসের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও যদি 'মহান মিলন' বজায় থাকে, ইউরোপীয় পোশাক পরেও যদি জাতির 'মহান মিলন' বজায় থাকে, ছেলেরা মেয়েদের মতো এবং মেয়েরা ছেলেদের মতো পোশাক পরেও যদি জাতির 'মহান মিলন' বজায় থাকে, তাহলে মুসলিম মহিলাদের বোরকা পরার ফলে সে 'মহান মিলন'-এ ফাটল ধরবে কেন? কেবল মুসলিম মহিলাদের সভ্য লেবাসেই বর্ণ-বৈষম্য সূচিত হবে কেন? মুসলিমদের পার্সোনাল ল' নিয়ে প্রচার-মাধ্যমগুলোতে এত হৈচৈ হয় কেন? যেহেতু সভ্যতার ভোট কম তাই না? ইসলাম 'শ্রেষ্ঠ ধর্ম' তাই না? ভালর হিংসা কে না করে? তাই তারাও করে। তারা তো আসলে চায়, মুসলিমরা সব কিছুতে তাদের মতো হোক।
[وَوَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ كَمَا كَفَرُوا فَتَكُونُونَ سَوَاء] (নিসাঃ ৮৯)
অর্থাৎ, তারা চায় যে, তারা যেরূপ অবিশ্বাস করেছে, তোমরাও সেরূপ অবিশ্বাস কর; ফলে তারা ও তোমরা একাকার হয়ে যাও। (নিসাঃ ৮৯)
[أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَن نَّজْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءٌ تَحْيَاهুম وَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ ] (জাষিয়াহঃ ২১)
অর্থাৎ, পাপাচারীরা কি মনে করে যে, আমি জীবন ও মৃত্যুর দিক দিয়ে ওদেরকে তাদের সমান গণ্য করব, যারা ঈমান রাখে এবং সৎকাজ করে? ওদের ফায়সালা কত নিকৃষ্ট। (জাষিয়াহঃ ২১)
কিন্তু বড় দুঃখের বিষয় যে, মুসলিম দেশেও বহু ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ আছে, যাদের দ্বারা পর্দা উচ্ছেদের দাবী উঠছে! মুসলিমরাই ইসলামের আদর্শকে অপছন্দ করছে। যেহেতু তারা নামধারী মুসলমান। কেউ আবার নাস্তিক মুসলমান!
📄 পর্দা মহিলার ব্যক্তি-স্বাধীনতা হরণ করে
অনেক মহিলা ধারণা করে যে, পর্দা মহিলার ব্যক্তি-স্বাধীনতা হরণ করে এবং তাকে তার ইচ্ছামতো বেশভূষা গ্রহণে বাধা প্রদান করে।
ব্যক্তি-স্বাধীনতা কথাটি প্রয়োগ করা হলেও তার যথার্থ আমল ব্যক্তি-জীবনে দেখা যায় না। যেহেতু কোন মানুষ নিজ ইচ্ছামতো খেতে পারে না, ইচ্ছামতো পরতে পারে না, ইচ্ছামতো আচরণ করতে পারে না, ইচ্ছামতো ঘুমাতে পারে না। নচেৎ আমরা হত্যা, চুরি-ডাকাতি, ধর্ষণ, দুর্নীতি, অরাজকতা, মাতলামি প্রভৃতি অপরাধকে ব্যক্তির 'ব্যক্তি-স্বাধীনতা' মনে করে উপেক্ষা করতাম। ডাক্তারী উপদেশ না মেনে পছন্দমতো পানাহার ক'রে অকাল মৃত্যু ডেকে আনতাম।
কিন্তু তা করা হয় না। সুতরাং একচ্ছত্র ব্যক্তি-স্বাধীনতা কারো নেই। তবে নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খলিত ব্যক্তি-স্বাধীনতা অবশ্যই আছে। আর মানুষের আচরণে নিয়ন্ত্রণ ও সুশৃঙ্খলা সম্বন্ধে একমাত্র মানুষের সৃষ্টিকর্তাই বেশি জানেন। তিনিই ভাল বুঝেন মানুষের প্রকৃতি ও প্রবণতা। সুতরাং তিনিই তার নিয়ন্ত্রণের অধিকার রাখেন এবং সেটাই হয় সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ।
[أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ ] (মুল্কঃ ১৪)
অর্থাৎ, যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবগত। (মুল্কঃ ১৪)
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মুসলিম হয়, সে আত্মসমর্পণকারী হয়। মুসলিম মানেই আত্মসমর্পণকারী। আর অপরের নিকট আত্মসমর্পণকারীর নিশ্চয় কোন ব্যক্তি-স্বাধীনতা থাকতে পারে না। কারণ সে জানে যে, যাঁর নিকট সে আত্মসমর্পণ করেছে, তিনি তার মঙ্গলামঙ্গলের ব্যাপারে বেশি বুঝেন। নিশ্চয় তিনি মানুষের জন্য যা কল্যাণকর, তাই বিধিবদ্ধ করেন। আর তখন তা মেনে নেওয়া ব্যতীত আত্মসমর্পণকারীর নিকট অন্য কোন পথ খোলা থাকে না।
[إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَن يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (৫১) وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَخْشَ اللَّهَ وَيَتَّقْهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ ] (নূরঃ ৫১-৫২)
অর্থাৎ, যখন মু'মিনদেরকে তাদের মধ্যে মীমাংসা ক'রে দেওয়ার জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের দিকে আহবান করা হয়, তখন তারা তো কেবল এ কথাই বলে, 'আমরা শ্রবণ করলাম ও মান্য করলাম।' আর ওরাই হল সফলকাম। যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর শাস্তি হতে সাবধান থাকে, তারাই হল কৃতকার্য। (নূরঃ ৫১-৫২)
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَরَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا ] (আহযাবঃ ৩৬)
অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোন বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোন বিশ্বাসী পুরুষ কিংবা বিশ্বাসী নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না। কেউ আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের অবাধ্য হলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে। (আহযাবঃ ৩৬)
وَرَبُّكَ يَخْلُقُ مَا يَشَاء وَيَخْتَارُ مَا كَانَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ سُبْحَانَ اللَّهِ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ]
অর্থাৎ, তোমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন, এতে ওদের কোন এখতিয়ার নেই। আল্লাহ পবিত্র, মহান এবং ওরা যাকে অংশী করে, তা হতে তিনি ঊর্ধ্বে। (ক্বাস্বাসঃ ৬৮)
মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন কোন ভাল ডাক্তারের কাছে যায় চিকিৎসার জন্য। ডাক্তার তাকে ওষুধ দেন, সে ওষুধ তেঁতো এবং রুচি-বিরুদ্ধ হলেও খেতে হয়। কিছু অতিরিক্ত পথ্য দেন এবং নির্দিষ্ট এমন জিনিস খেতে বলেন, যা তার পছন্দের বাইরে। কিছু এমন জিনিস খেতে নিষেধ করেন, যা তার একান্ত পছন্দের। তখন মানুষ সুস্থতা লাভের জন্য ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলতে বাধ্য হয়। তখন তার কোন ব্যক্তি-স্বাধীনতা থাকে না। আর তা থাকলে বা রাখলে সুস্থতার নাগাল পায় না।
অনুরূপ সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ আমাদের জন্য শৃঙ্খলিত জীবন দান করেছেন, সেই জীবনের বাস্তবতা মেনে নিতেই হবে, যদিও তা আমাদের ব্যক্তি-স্বাধীনতা-বিরোধী। আমাদের শরীরে যতটুকু লবণ লাগে, যতটুকু চিনি লাগে, যতটুকু লোহা লাগে, তার কমবেশি নিজের ইচ্ছামতো গ্রহণ করতে পারি না। করলে জীবন বাঁচাতে পারব না। তিনি লেবাস-পোশাক দিয়েছেন মানুষের ইজ্জত-সম্ভ্রম বাঁচানোর জন্য। আমরা তা ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারি না, করলে নিজেদের ইজ্জত-সম্মান রক্ষা করতে পারব না।
সভ্য মানুষের জীবনে কোন অবাধ ব্যক্তি-স্বাধীনতা নেই। যদি কারো থাকে, তবে একমাত্র পাগলের আছে। আর পাগলের জীবন আমরা কেউই চাই না।
📄 দুনিয়ার অধিকাংশ মহিলারা-ই পর্দা করে না
অনেক মহিলা বলে, 'কে আর মানছে ভাইয়া! অধিকাংশ মেয়েরাই তো পর্দা মানে না।'
তার মানে, তুমিও মানবে না। তুমিও গড্ডলিকা-প্রবাহে গা ভাসাতে চাও, তুমিও গতানুগতিক চরিত্রের মহিলা হতে চাও। তুমি মনে কর, সংখ্যাগরিষ্ঠ মহিলা যেটা করে, সেটা নিশ্চয় উত্তম। তোমার এ যুক্তি এক প্রকার গণতান্ত্রিক। অথচ তুমি এ কথা জানো যে, সংসারের অধিকাংশ মানুষ ভাল নয়। অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে যাবে। সুতরাং সংখ্যায় কম হলেও তোমাকে ভাল মানুষদের আদর্শ গ্রহণ করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,
قُل لا يَسْتَوِي الْخَبِيثُ وَالطَّيِّبُ وَلَوْ أَعْجَبَكَ كَثْرَةُ الْخَبِيثِ فَاتَّقُوا اللَّهَ يَا أُولِي الأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ] (মাইদাহঃ ১০০)
অর্থাৎ, বল, 'অপবিত্র ও পবিত্র সমান নয়; যদিও অপবিত্রের আধিক্য তোমাকে চমৎকৃত করে। সুতরাং হে বুদ্ধিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।' (মাইদাহঃ ১০০)
ইবনে মাসউদ বলেছেন, 'তোমরা পরানুগামী (ইয়েস-ম্যান) হয়ো না।' লোকেরা বলল, 'পরানুগামিতা কী?' তিনি বললেন, 'এই বলা যে, আমরা লোকেদের অনুগামী। তারা সৎপথে থাকলে আমরা আছি এবং তারা পথভ্রষ্ট হলে আমরাও পথভ্রষ্ট। বরং প্রত্যেকের মনকে প্রস্তুত রাখা উচিত যে, লোকে কাফের হলে, সে হবে না।' (ত্বাবারানী)
📄 পুরুষের উপর পর্দা ফরজ নয় কেন?
পর্দার আসল উদ্দেশ্য যদি ইজ্জত-রক্ষা হয়, তাহলে পুরুষকে পর্দা করতে বলা হয় না কেন?
যেহেতু প্রকৃতিগতভাবে পুরুষের বাহ্যিক দেহ মহিলার চোখে ততটা বা মোটেই আকর্ষণীয় ও বাঞ্ছনীয় নয়, যতটা মহিলার বাহ্যিক দেহ পুরুষের চোখে আকর্ষণীয় ও বাঞ্ছনীয়। মহিলার বাহ্যিক দেহ দেখে পুরুষের মনে যে কামনা ও বাসনার সৃষ্টি হয়, পুরুষের বাহ্যিক দেহ দেখে মহিলার মনে সে কামনা ও বাসনার সৃষ্টি হয় না। তাই যা লোভনীয়, তাকেই গোপন থাকতে বলা হয়েছে। তাছাড়া পুরুষকে তার চক্ষু সংযত করতে বলা হয়েছে। যেমন সে কথা অন্য স্থানে আলোচিত হয়েছে।
নারী হল ফুল স্বরূপ। আর পুরুষ হল ভ্রমর। দুনিয়ার সবারই ফুলের প্রতি আকর্ষণ থাকে, ভ্রমরের প্রতি আকর্ষণ থাকে না। সুতরাং ভ্রমরকে পর্দা করতে বলার কোন যৌক্তিকতাই নেই।
তাছাড়া পুরুষ উপার্জন ও পরিশ্রমশীল। সৃষ্টিকর্তা তার দেহকে সেইভাবে সুঠাম ক'রে সৃষ্টি করেছেন। নারী তা নয়, তার দেহকে তিনি বড় কোমল ও কমনীয় ক'রে সৃষ্টি করেছেন। নারী অল্প পরিশ্রমে কাতর হয়ে পড়ে। তার ভূমিকা পরিশ্রম করা নয়। পরম্ভ পরিশ্রমীকে যদি পর্দার হুকুম দেওয়া হয়, তাহলে মানুষের পেট চলবে কীভাবে?