📄 অবতরণিকা
ইসলাম আগমনের পূর্বে নারীর কোন মান-মর্যাদা ও কদর ছিল না। যেটুকু ছিল, সেটুকু শুধু যৌন-সুখের আশায় 'ওয়াইফ ইজ লাইফ' আকারে। কন্যা হিসাবে নারীর মান ছিল না। এই জন্য কোন দম্পতিই কন্যা-সন্তান পছন্দ করত না। কারো কন্যা-সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে শুনলেই তার চেহারা কালো হয়ে যেত। মহান আল্লাহ সেই জাহেলী যুগের মানুষদের অবস্থা বর্ণনা ক'রে বলেন,
(وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِمَا ضَرَبَ لِلرَّحْمَنِ مَثَلًا ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًا وَهُوَ كَظِيمٌ) (যুখরুফ: ১৭)
অর্থাৎ, ওরা পরম দয়াময় আল্লাহর প্রতি যে কন্যা-সন্তান আরোপ করে, ওদের কাউকেও সে কন্যা সন্তানের সংবাদ দেওয়া হলে তার মুখমন্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়।
[وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالأُنثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًا وَهُوَ كَظِيمٌ (৫৮) يَتَوَارَى مِنَ الْقَوْمِ مِن سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ أَيُمْسِكُهُ عَلَى هُونٍ أَمْ يَدُسُّهُ فِي التُّرَابِ أَلَا سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ] (নাহলঃ ৫৮-৫৯)
অর্থাৎ, তাদের কাউকে যখন কন্যা-সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখমন্ডল কাল হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সংবাদ দেওয়া হয়, তার গ্লানি হেতু সে নিজ সম্প্রদায় হতে আত্মগোপন করে; সে চিন্তা করে যে, হীনতা সত্ত্বেও সে তাকে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে। সাবধান! তারা যা সিদ্ধান্ত করে, তা কতই না নিকৃষ্ট। বরং তারা মাটিতে জীবন্ত দাফন ক'রে দিত! মহান আল্লাহ সে কথাও বলেছেন এবং তাদের সে নির্মম পাপের জন্য জবাবদিহি করতে হবে, তাও জানিয়ে দিয়েছেন।
وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَت * بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ ﴾ (তাকবীরঃ ৮-৯)
অর্থাৎ, যখন জীবন্ত-প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন্ অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল? যেমন বর্তমানেও যন্ত্রের মাধ্যমে কন্যা-ভ্রূণ চিহ্নিত ক'রে গর্ভেই তা হত্যা করা হচ্ছে।
সে যুগে কন্যা-সন্তানকে ন্যায্য অধিকার ও মীরাসের অংশ থেকে বঞ্চিত করা হত। বর্তমান জাহেলী যুগেও কন্যাকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। পণ ও যৌতুক প্রথার কারণে পিতা-মাতার কাছে কন্যা-সন্তান আদৌ বাঞ্ছিত নয়। বড় হয়ে অনেক কন্যা পিতা-মাতার মান-সম্মান রাখে না বলেও কন্যা-সন্তানের প্রতি অনীহা আসে। পুত্র-সন্তানে মানহানিকর কিছু ঘটালে সমাজে ক্ষতিকর নয় বলেই সবাই পুত্র-সন্তান চায়। সমাজে সেই ছেলেকে পছন্দ করা হয়, যার ভবিষ্যৎ আছে। আর সেই মেয়েকে পছন্দ করা হয়, যার অতীত আছে। অতীত-হারানো মেয়ে পতিতার মতো বলেই তার কদর বিলুপ্ত হয়।
বর্তমান যুগের কন্যার অবস্থা সম্বন্ধে এক কবি বলেছেন, 'কন্যা ঘরের আবর্জনা, পয়সা দিয়ে ফেলতে হয়, রক্ষণীয়া পালনীয়া শিক্ষণীয়া আদৌ নয়।' জাহেলী যুগে তার অবস্থা এর চাইতেও ঢের শোচনীয় ছিল।
কিন্তু ইসলাম এসে নারীকে মর্যাদা দিল। মুহাম্মাদ ﷺ যখন নবী হয়ে প্রেরিত হলেন, তখন তিনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখালেন। অজ্ঞতার সিন্ধু থেকে তুলে জ্ঞানের সৈকত দেখালেন। ভ্রষ্টতার কদর্যতা থেকে উদ্ধার ক'রে সৎপথের সুন্দর পরিবেশে প্রতিষ্ঠিত করলেন। নারীকে তার যথার্থ মর্যাদা দিলেন। তার প্রাপ্য অধিকার তাকে প্রদান করলেন। মা, স্ত্রী, কন্যা ও বোনরূপে যথাযথ সম্মান দান করলেন। তিনি বললেন, “হে আল্লাহ! আমি দুই দুর্বল; এতীম ও নারীর অধিকার লংঘনে পাপের কথা ঘোষণা করছি।” (আহমাদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, হাকেম, সিলসিলাহ সহীহাহ ১০১৫নং)
“যে ব্যক্তি একাধিক কন্যা নিয়ে সঙ্কটাপন্ন হবে, অতঃপর সে তাদের প্রতি যথার্থ সদ্ব্যবহার করবে, সেই ব্যক্তির জন্য ঐ কন্যারা জাহান্নাম থেকে অন্তরাল (পর্দা) স্বরূপ হবে।” (বুখারী ১৪১৮ নং, মুসলিম ২৬২৯ নং)
বর্তমান জাহেলী যুগেও বহু মানুষের কাছে নারীর মর্যাদা নেই। তাদের সমাজে নারী বিকিকিনি হয়। যৌন-বিলাসের জন্য ভোগ্য-পণ্যের মতো নারীর সস্তা বাজার রমরমা। বৃদ্ধা হয়ে গেলে নারীর স্থান হয় বৃদ্ধ-খোঁয়াড়ে। এ হল পাশ্চাত্যের অবস্থা এবং তার পা-চাঁটা গোলামদের সমাজ-ব্যবস্থা। 'নারী-স্বাধীনতা'র নামে তারা 'যৌন-স্বাধীনতা' দিয়ে নারীকে নিজেদের যৌন-খোঁয়াড়ে বন্দী করেছে। তবুও তাদের গর্ব কত, তারা দিয়েছে, নারীর মর্যাদা! সেই গর্বে শরীক হয়েছে মুসলিম নামধারী বহু মুনাফিক মানুষ। যারা পাশ্চাত্যের সেই যৌন-স্বাধীনতা নিজেদের সমাজ ও পরিবেশে দেখতে চায়। সুতরাং তারা প্রচার-মাধ্যমে তা প্রচার করে, পত্র-পত্রিকায় লেখালিখি করে, অনেকে আবার এ ব্যাপারে পৃথক বই-পুস্তকও লেখে। অনেকে পাশ্চাত্যের নুন খেয়ে তাদের ভালমতো গুণ গায়। ফলে সেই যৌন-স্বাধীনতার চিন্তাধারা মুসলিম উম্মাহর মাঝে দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে, যেমন শুষ্ক কাশ-ফুলে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
এই আগুনের লেলিহান শিখার মুখে পড়েও অনেক মুসলিমের অবস্থা 'পিপু-ফিশু'র মতোঃ পিঠ পুড়ে গেল। ফিরে শোও। কত রবি জ্বলে? কেবা আঁখি মেলে?
আর অনেকের অবস্থা সেই বরাঙ্গীর মতো, যাকে বলা হল, 'বরাঙ্গী লো বরাঙ্গী! তোর ঘর পুড়ছে যে!' সে বলল, 'পুড়ুর্গে, আমার বরাং তো পুড়েনি!'
অনেকে বলে, 'অত কি মানা যায়?'
অনেকে অগ্নিতে ঘৃতাহুতি করে!
অনেকের চিরাগ তলে অন্ধকার!
অনেকে মাথার টুপি ঠিক রেখে চলে, কিন্তু বউয়ের মাথায় কাপড়ের কথা খেয়াল করে না!
বিদেশী আগ্রাসনের পর থেকে পাশ্চাত্যের পরশ পর্দার পরিবেশকে 'কদর্য' পরিগণিত করেছে। পুরুষ-মহলে চাকরির লোভ মহিলাদেরকে পর্দা অবজ্ঞা করতে বাধ্য করছে। যৌথ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উদ্ভিন্ন-যৌবনারা পর্দার পর্দাকে মন থেকে ছিন্ন ক'রে ফেলছে। নারীবাদী লেখক-লেখিকারা নারী-স্বাধীনতার নামে জরায়ু-স্বাধীনতার প্রচার ও প্রসারে পর্দার নিন্দা ক'রে চলেছেন। কবি-সাহিত্যিকরাও পাশ্চাত্যের তথাকথিত সভ্যতায় প্রভাবান্বিত হয়ে সেই একই বিষ উদ্দ্গার ক'রে চলেছেন। নারীকে সমানাধিকার প্রদান করতে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, চাকরি-স্থল ও হাটে-বাজারে উপস্থিত করছেন দেশের নেতা-নেত্রীরা।
মুসলিম দেশগুলিতে পর্দা অবমানিত শুরু হয়। ১৯২০ সালে মুসলিম নামধারী নাস্তিক আতাতুর্ক কামাল পাশা তুর্কিস্তানে পর্দা নিষিদ্ধ ক'রে আইন প্রণয়ন করে। ১৯২৬ সালে রাফেযী রিযা পাহলবী ইরানে পর্দা নিষিদ্ধ হওয়ার আইন পাশ করে। আফগানিস্তানে মুহাম্মাদ আমান পর্দা উচ্ছেদ করার কানুন চালু করে। আলবানিয়ায় আহমাদ যোগোয়া পর্দার রেওয়াজ তুলে দেয়। তিউনিসিয়ায় ১৪২১ হিজরী সনে কুখ্যাত নেতা বুরুক্বাইবা আইন ক'রে পর্দা নিষিদ্ধ করে।
আজও বহু দেশে পর্দা নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। উপমহাদেশে তারই অনুকরণ করার চেষ্টা চলছে। কোথাও পর্দার বিরুদ্ধে পুরুষেরা সোচ্চার হচ্ছে!
'মাছ মরেছে বিড়াল কাঁদে শান্ত করল বকে, ব্যাঙের শোকে সাঁতার পানি দেখি সাপের চোখে!'
কোথাও পর্দার বিরুদ্ধে মিটিং-মিছিল হচ্ছে। কোথাও বোরকা জ্বালানো হচ্ছে। যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে না, তাদের কথাই আলাদা। তাদের সাথে যুক্তি-তর্কে পেরে ওঠা যাবে না। যেহেতু তাদের মধ্যে আসল শর্ত (ঈমান বিল্লাহ)টাই নেই। এ পুস্তিকা তাদের জন্য নয়, কুরআনও তাদের জন্য হিদায়াত নয়। মহান আল্লাহ সেই শিক্ষা-গর্বিত অহংকারীদেরকে পথ দেখাবেন না। তিনি বলেছেন,
[سَأَصْرِفُ عَنْ آيَاتِيَ الَّذِينَ يَتَكَبَّرُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَإِن يَرَوْا كُلَّ آيَةٍ لَا يُؤْمِنُوا بِهَا وَإِن يَرَوْا سَبِيلَ الرُّشْدِ لَا يَتَّخِذُوهُ سَبِيلاً وَإِن يَرَوْا سَبِيلَ الْغَيِّ يَتَّخِذُوهُ سَبِيلاً ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَكَانُوا عَنْهَا غَافِلِينَ] (আ'রাফঃ ১৪৬)
অর্থাৎ, পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে গর্ব করে বেড়ায় তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী হতে ফিরিয়ে দেব; তারা আমার প্রত্যেকটি নিদর্শন দেখলেও ওতে বিশ্বাস করবে না। তারা সৎপথ দেখলেও ওকে পথ বলে গ্রহণ করবে না, কিন্তু তারা ভ্রান্ত পথ দেখলে তাকেই পথ হিসাবে গ্রহণ করবে। এটি এ কারণে যে, তারা আমার আয়াত (নিদর্শন) সমূহকে মিথ্যা মনে করেছে এবং সে সম্বন্ধে তারা উদাসীন ছিল। (আ'রাফঃ ১৪৬)
পক্ষান্তরে যাদের বুকে এখনও ঈমানের পিদিম জ্বলছে, তাদের সতর্কতার জন্য হিজাবের বহু বই মন্থন ক'রে আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। মহান আল্লাহ বলেন,
[ وَذَكِّরْ فَإِنَّ الذِّكْرَى تَنফَعُ الْمُؤْمِنِينَ ] (যারিয়াতঃ ৫৫)
অর্থাৎ, তুমি উপদেশ দিতে থাক, কারণ উপদেশ বিশ্বাসীদের উপকারে আসবে। (যারিয়াতঃ ৫৫)
তাঁর কাছেই আমার আশা, তিনি যেন পাঠক-পাঠিকার মন থেকে মুনাফিক্বী, সন্দেহ, গাফিলতি, উন্নাসিকতা ও অবহেলার পর্দা সরিয়ে দিয়ে তাঁদের পরিবারে পর্দার বিধান প্রতিষ্ঠা ক'রে দেন। আমীন।
বিনীত---- আব্দুল হামীদ মাদানী আল-মাজমাআহ সউদী আরব তাং ৩০/৫/১১
📄 বোরকার ভিতরে অপরাধীর আত্মগোপন
বোরকার বিরুদ্ধে সমালোচনা ক'রে অনেকে বলে থাকে, 'বোরকার আড়ালে অপরাধীরা আত্মগোপন করে। সুতরাং দেশে বোরকা নিষিদ্ধ হওয়া উচিত।' 'দেখতে লারি চলন বাঁকা।' বোরকা তো তাদের চোখের বালি। সুতরাং এই অজুহাতে বোরকার অবসান ঘটাতে চায় তারা! কিন্তু কেউ যদি ভাল জিনিসের অপব্যবহার করে, তাহলে ভালটা খারাপ হবে কেন? সিনেমা ও টিভির মাধ্যমে কত নোংরামি প্রচার হচ্ছে, অপরাধের ট্রেনিং হচ্ছে, তা তো কৈ নিষিদ্ধ হয় না। নোংরা পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে কত নোংরামি প্রচার হচ্ছে, তা তো কৈ নিষিদ্ধ হয় না। তা হবে না। কারণ, তা হল প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতা। অবৈধ প্রেম-ভালবাসা-ঘটিত কত শত ব্যভিচার, খুন, আত্মহত্যা ও ভ্রূণ হত্যা হচ্ছে, কৈ তা তো নিষিদ্ধ করা হয় না। বেশ্যাবৃত্তির মুক্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তা নিষিদ্ধ হয় না। কারণ এ সব ব্যক্তি-স্বাধীনতা। তাতে হস্তক্ষেপ করা আইনতঃ বৈধ নয়। আর কোন মুসলিম সচ্চরিত্র মহিলা পর্দার জন্য বোরকা পরলে, সেটা তার ব্যক্তি-স্বাধীনতা নয়। সে স্বাধীনতায় বাধা দেওয়া যাবে! আসলে ঐ যে বলে না? 'আমি যেমন ঢেমন, দুনিয়াকে দেখি তেমন।' তাই তাদের দেশে নৈতিকতার নামে যা করা হবে, সেটাই হবে নিষিদ্ধ আচরণ। আর নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটিয়ে যে সব উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করা হবে, তা হবে ব্যক্তি-স্বাধীনতা! বোরকা নিষিদ্ধ হোক, কারণ, বোরকার ভিতরে সন্ত্রাসী আত্মগোপন ক'রে আত্মঘাতী হামলা চালায়। তাহলে ফুলের মালাও নিষিদ্ধ হোক, কারণ তার মাঝেও বোম বেঁধে আত্মঘাতী হামলা করা হয়। ব্যাগ ব্যবহার করা নিষিদ্ধ হোক, কারণ তার মাঝে বোম রেখে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। কোন মহিলা যদি পেটের ভিতর বোম বেঁধে ধরা পড়ে, তাহলে কি সমস্ত মহিলার পেটকে খুলে রাখার আইন জারী হবে? কোন মহিলা যদি ব্লাউজের ভিতরে হিরোইন পাচার করে, তাহলে কি সকল মহিলার বুক খুলে রাখা জরুরী হবে?
কদর্য বোরকা পরার রীতি নয় যুক্তিবাদী সাহেব! কদর্য হল তোমার কর্দমময় মস্তিষ্ক। কদর্য হল তোমার কর্দমময় পরিবেশ। তোমার ভিতরে ঈমানী সভ্যতা না থাকলে তোমাকে কি বুঝানো যাবে সভ্যতার সংজ্ঞা?
📄 বোরকা জাতির মহিলাদের মাঝে বর্ণ-বৈষম্য সৃষ্টি করে
অনেক ধর্মনিরপেক্ষবাদী মানুষ বলে থাকে, 'বোরকা জাতির মহিলাদের মাঝে বর্ণ-বৈষম্য সৃষ্টি করে।'
অতএব সর্বশ্রেণীর মহিলাদের জমায়েত-ক্ষেত্রে, স্কুল-কলেজে তা চলবে না। এমনকি মাথার ওড়নাটাও ব্যবহার করতে পারবে না! কেন তা পারবে না? কেন পারবে না 'তৃণারণিমণি'র ন্যায় দেশের কাজ করতে? 'নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান' থাকলে কেন পারবে না? কেন শিখ পাগড়ী ও দাড়ির মাধ্যমে নিজের স্বতন্ত্রতা বজায় রাখতে পারবে না? কেন মুসলিম দাড়ি ও পর্দার মাধ্যমে নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখতে পারবে না? কেন বিবাহিত হিন্দু মহিলা মাথায় সিঁদুর পরে নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারবে না?
নাকি যত দোষ, নন্দঘোষ? 'সবাই কৃণের নাম করে, আমি বললেই ধরে মারে। সব শালাকে ছেড়ে দিয়ে বেঁড়ে শালাকেই ধর?'
মনের মাঝে শত শ্রেণীর বিশ্বাসের পার্থক্য রেখে যদি 'মহান মিলন' বজায় থাকে, উঁচু-নিচু জাতিভেদ সত্ত্বেও যদি 'মহান মিলন' বজায় থাকে, নানান ধরনের লেবাসের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও যদি 'মহান মিলন' বজায় থাকে, ইউরোপীয় পোশাক পরেও যদি জাতির 'মহান মিলন' বজায় থাকে, ছেলেরা মেয়েদের মতো এবং মেয়েরা ছেলেদের মতো পোশাক পরেও যদি জাতির 'মহান মিলন' বজায় থাকে, তাহলে মুসলিম মহিলাদের বোরকা পরার ফলে সে 'মহান মিলন'-এ ফাটল ধরবে কেন? কেবল মুসলিম মহিলাদের সভ্য লেবাসেই বর্ণ-বৈষম্য সূচিত হবে কেন? মুসলিমদের পার্সোনাল ল' নিয়ে প্রচার-মাধ্যমগুলোতে এত হৈচৈ হয় কেন? যেহেতু সভ্যতার ভোট কম তাই না? ইসলাম 'শ্রেষ্ঠ ধর্ম' তাই না? ভালর হিংসা কে না করে? তাই তারাও করে। তারা তো আসলে চায়, মুসলিমরা সব কিছুতে তাদের মতো হোক।
[وَوَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ كَمَا كَفَرُوا فَتَكُونُونَ سَوَاء] (নিসাঃ ৮৯)
অর্থাৎ, তারা চায় যে, তারা যেরূপ অবিশ্বাস করেছে, তোমরাও সেরূপ অবিশ্বাস কর; ফলে তারা ও তোমরা একাকার হয়ে যাও। (নিসাঃ ৮৯)
[أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَن نَّজْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءٌ تَحْيَاهুম وَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ ] (জাষিয়াহঃ ২১)
অর্থাৎ, পাপাচারীরা কি মনে করে যে, আমি জীবন ও মৃত্যুর দিক দিয়ে ওদেরকে তাদের সমান গণ্য করব, যারা ঈমান রাখে এবং সৎকাজ করে? ওদের ফায়সালা কত নিকৃষ্ট। (জাষিয়াহঃ ২১)
কিন্তু বড় দুঃখের বিষয় যে, মুসলিম দেশেও বহু ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ আছে, যাদের দ্বারা পর্দা উচ্ছেদের দাবী উঠছে! মুসলিমরাই ইসলামের আদর্শকে অপছন্দ করছে। যেহেতু তারা নামধারী মুসলমান। কেউ আবার নাস্তিক মুসলমান!
📄 পর্দা মহিলার ব্যক্তি-স্বাধীনতা হরণ করে
অনেক মহিলা ধারণা করে যে, পর্দা মহিলার ব্যক্তি-স্বাধীনতা হরণ করে এবং তাকে তার ইচ্ছামতো বেশভূষা গ্রহণে বাধা প্রদান করে।
ব্যক্তি-স্বাধীনতা কথাটি প্রয়োগ করা হলেও তার যথার্থ আমল ব্যক্তি-জীবনে দেখা যায় না। যেহেতু কোন মানুষ নিজ ইচ্ছামতো খেতে পারে না, ইচ্ছামতো পরতে পারে না, ইচ্ছামতো আচরণ করতে পারে না, ইচ্ছামতো ঘুমাতে পারে না। নচেৎ আমরা হত্যা, চুরি-ডাকাতি, ধর্ষণ, দুর্নীতি, অরাজকতা, মাতলামি প্রভৃতি অপরাধকে ব্যক্তির 'ব্যক্তি-স্বাধীনতা' মনে করে উপেক্ষা করতাম। ডাক্তারী উপদেশ না মেনে পছন্দমতো পানাহার ক'রে অকাল মৃত্যু ডেকে আনতাম।
কিন্তু তা করা হয় না। সুতরাং একচ্ছত্র ব্যক্তি-স্বাধীনতা কারো নেই। তবে নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খলিত ব্যক্তি-স্বাধীনতা অবশ্যই আছে। আর মানুষের আচরণে নিয়ন্ত্রণ ও সুশৃঙ্খলা সম্বন্ধে একমাত্র মানুষের সৃষ্টিকর্তাই বেশি জানেন। তিনিই ভাল বুঝেন মানুষের প্রকৃতি ও প্রবণতা। সুতরাং তিনিই তার নিয়ন্ত্রণের অধিকার রাখেন এবং সেটাই হয় সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ।
[أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ ] (মুল্কঃ ১৪)
অর্থাৎ, যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবগত। (মুল্কঃ ১৪)
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মুসলিম হয়, সে আত্মসমর্পণকারী হয়। মুসলিম মানেই আত্মসমর্পণকারী। আর অপরের নিকট আত্মসমর্পণকারীর নিশ্চয় কোন ব্যক্তি-স্বাধীনতা থাকতে পারে না। কারণ সে জানে যে, যাঁর নিকট সে আত্মসমর্পণ করেছে, তিনি তার মঙ্গলামঙ্গলের ব্যাপারে বেশি বুঝেন। নিশ্চয় তিনি মানুষের জন্য যা কল্যাণকর, তাই বিধিবদ্ধ করেন। আর তখন তা মেনে নেওয়া ব্যতীত আত্মসমর্পণকারীর নিকট অন্য কোন পথ খোলা থাকে না।
[إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَن يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (৫১) وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَخْشَ اللَّهَ وَيَتَّقْهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ ] (নূরঃ ৫১-৫২)
অর্থাৎ, যখন মু'মিনদেরকে তাদের মধ্যে মীমাংসা ক'রে দেওয়ার জন্য আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের দিকে আহবান করা হয়, তখন তারা তো কেবল এ কথাই বলে, 'আমরা শ্রবণ করলাম ও মান্য করলাম।' আর ওরাই হল সফলকাম। যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর শাস্তি হতে সাবধান থাকে, তারাই হল কৃতকার্য। (নূরঃ ৫১-৫২)
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَরَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا ] (আহযাবঃ ৩৬)
অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোন বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোন বিশ্বাসী পুরুষ কিংবা বিশ্বাসী নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না। কেউ আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের অবাধ্য হলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে। (আহযাবঃ ৩৬)
وَرَبُّكَ يَخْلُقُ مَا يَشَاء وَيَخْتَارُ مَا كَانَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ سُبْحَانَ اللَّهِ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ]
অর্থাৎ, তোমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন, এতে ওদের কোন এখতিয়ার নেই। আল্লাহ পবিত্র, মহান এবং ওরা যাকে অংশী করে, তা হতে তিনি ঊর্ধ্বে। (ক্বাস্বাসঃ ৬৮)
মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন কোন ভাল ডাক্তারের কাছে যায় চিকিৎসার জন্য। ডাক্তার তাকে ওষুধ দেন, সে ওষুধ তেঁতো এবং রুচি-বিরুদ্ধ হলেও খেতে হয়। কিছু অতিরিক্ত পথ্য দেন এবং নির্দিষ্ট এমন জিনিস খেতে বলেন, যা তার পছন্দের বাইরে। কিছু এমন জিনিস খেতে নিষেধ করেন, যা তার একান্ত পছন্দের। তখন মানুষ সুস্থতা লাভের জন্য ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলতে বাধ্য হয়। তখন তার কোন ব্যক্তি-স্বাধীনতা থাকে না। আর তা থাকলে বা রাখলে সুস্থতার নাগাল পায় না।
অনুরূপ সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ আমাদের জন্য শৃঙ্খলিত জীবন দান করেছেন, সেই জীবনের বাস্তবতা মেনে নিতেই হবে, যদিও তা আমাদের ব্যক্তি-স্বাধীনতা-বিরোধী। আমাদের শরীরে যতটুকু লবণ লাগে, যতটুকু চিনি লাগে, যতটুকু লোহা লাগে, তার কমবেশি নিজের ইচ্ছামতো গ্রহণ করতে পারি না। করলে জীবন বাঁচাতে পারব না। তিনি লেবাস-পোশাক দিয়েছেন মানুষের ইজ্জত-সম্ভ্রম বাঁচানোর জন্য। আমরা তা ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারি না, করলে নিজেদের ইজ্জত-সম্মান রক্ষা করতে পারব না।
সভ্য মানুষের জীবনে কোন অবাধ ব্যক্তি-স্বাধীনতা নেই। যদি কারো থাকে, তবে একমাত্র পাগলের আছে। আর পাগলের জীবন আমরা কেউই চাই না।