📘 পিতামাতার অবাধ্যতাঃ কারণ কিছু বাহ্যিক চিত্র ও প্রতিকারের উপায় > 📄 পিতামাতার সাথে আচার-আচরণের ২৬টি লক্ষণীয় দিক

📄 পিতামাতার সাথে আচার-আচরণের ২৬টি লক্ষণীয় দিক


এখানে কতগুলো আদব বা শিষ্টাচারের বিষয় রয়েছে, যেগুলো আমাদের জন্য মেনে চলা উচিত এবং পিতামাতার সাথে সে অনুযায়ী আচরণ করলে আমাদের জন্য তা যথাযথ হবে; আমরা আশা করতে পারি যে, আমরা তাদের কিছু ঋণ পরিশোধ করতে পারব এবং আল্লাহ তা'আলা আমাদের উপর তাদের ব্যাপারে যা ওয়াজিব (আবশ্যক) করে দিয়েছেন তার কিছু হলেও বাস্তবায়ন করতে পারব- যাতে আমরা আমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে খুশি করতে পারি, আমাদের হৃদয় উদার ও প্রশস্ত হয়, আমাদের জীবন পবিত্র হয়, আমাদের কর্মকাণ্ডসমূহ সহজ হয়ে যায় এবং আল্লাহ তা'আলা আমাদের হায়াতে (জীবনকালে) বরকত দান করেন।²⁰
সে আদব তথা শিষ্টাচার সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের মধ্য থেকে কিছু বিষয় নিম্নরূপ ²¹।
১. পিতামাতার আনুগত্য করা ও তাদের সাথে অবাধ্য আচরণ থেকে বিরত থাকা: মুসলিম ব্যক্তির উপর ওয়াজিব হল, তার পিতামাতার আনুগত্য করা এবং তাদের সাথে অবাধ্য আচরণ করা থেকে বিরত থাকা; আর তারা যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবাধ্য হওয়ার নির্দেশ না দিবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সকল মানুষের আনুগত্যের উপর তাদের আনুগত্য করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, তবে স্ত্রী কর্তৃক স্বামীর আনুগত্যের বিষয়টি ভিন্ন; কারণ, সে তার পিতামাতার আনুগত্যের উপর তার স্বামীর আনুগত্য করার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিবে।
২. তাদের সাথে উত্তম আচরণ করা: কথায়, কাজে ও সামগ্রিক বিষয়ে তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করা।
৩. বিনয় ও নম্রতার ডানা বিছিয়ে দেওয়া: আর এটা সম্ভব হবে তাদের প্রতি বিনয়, নম্রতা, কোমলতা প্রকাশ করার মাধ্যমে।
৪. তাদেরকে ধমক দেওয়া থেকে দূরে থাকা: আর এটা সম্ভব হবে নরম সুরে ডাকা ও কোমল ভাষায় কথা বলার মাধ্যমে; আর তাদেরকে ধমক দেওয়া ও তাদের সাথে উচ্চঃস্বরে কথা বলা থেকে সর্বোচ্চ সজাগ ও সতর্কতা অবলম্বন করা।
৫. তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করা: আর এটা সম্ভব হবে যখন তারা কথা বলবেন, তখন সামনাসামনি হয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনা এবং কথা বলার সময় তাদের সাথে কথা কাটাকাটি বা তর্ক- বিতর্ক পরিহার করা; আর তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা থেকে অথবা তাদের কথা প্রত্যাখ্যান করা থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা।
৬. তাদের নির্দেশে খুশি হওয়া এবং তাদের কারণে রাগ ও দুঃখ প্রকাশ পরিহার করা: যেমনটি আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍ وَلَا تَنْهَرْهُمَا ﴾ [الاسراء: ২৩]
"তাদেরকে 'উফ্' বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না।”²²
৭. তাদের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করা: আর এটা হবে হাসি-খুশি ও অভিবাদন জানানোর মাধ্যমে তাদের মুখোমুখি হওয়া এবং ভ্রূকুটিপূর্ণ কঠোর দৃষ্টি ও কপাল ভাঁজ করে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা থেকে দূরে থাকা।
৮. তাদের প্রতি ভালবাসা ও বন্ধুত্ব প্রকাশ করা: যেমন- তাদেরকে আগে আগে সালাম প্রদান করা, তাদের হাত ও মাথায় চুম্বন করা, মাজলিসে তাদের জন্য জায়গা প্রশস্ত করে দেওয়া, তাদের আগে খাবারের দিকে হাত বাড়িয়ে না দেওয়া, দিনের বেলায় তাদের পিছনে পিছনে হাঁটা এবং রাতের বেলায় তাদের সামনে হাঁটা— বিশেষ করে রাস্তা যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন বা ভয়ঙ্কর হয়; আর রাস্তা পরিষ্কার, উজ্জ্বল ও নিরাপদ হলে তাদের পিছনে হাঁটাতে কোনো দোষ নেই।
৯. তাদের সামনে আদব ও সম্মান রক্ষা করে বসা: আর এটা হবে সঠিকভাবে বসার মাধ্যমে এবং এমনভাবে বসা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে যা নিকট থেকে বা দূর থেকে তাদের প্রতি অপমান করা হয় বলে অনুভব হয়, যেমন— পা বাড়িয়ে দিয়ে বسا, অথবা তাদের উপস্থিতিতে অট্টহাসি হাসা, অথবা হেলান দিয়ে বসা, অথবা বিবস্ত্র হওয়া, অথবা তাদের সামনে অশ্লীল আচরণ করা, অথবা এগুলো ছাড়া অন্য এমন কোনো আচরণ করা যা তাদের সাথে পরিপূর্ণ শিষ্টাচার পরিপন্থী আচরণ বলে গণ্য।
১০. সেবা অথবা কোনো অবদানের ক্ষেত্রে খোঁটা পরিহার করা: কারণ, খোঁটা সকল অনুগ্রহ বা অবদানকে ধ্বংস করে দেয়; আর এটা মন্দ চরিত্রের অংশবিশেষ, আর এটা যখন হয় পিতামাতার অধিকারের ক্ষেত্রে, তখন তার খারাপি আরও বেড়ে যায়।
সুতরাং সন্তানের আবশ্যকীয় করণীয় হল সাধ্যানুসারে তার পিতামাতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং এ ক্ষেত্রে কোনো প্রকার কমতি বা ঘাটতি হলে তা স্বীকার করে নেওয়া; আর তার পিতামাতার অধিকার পূরণে সক্ষম না হলে অক্ষমতা প্রকাশ করে ক্ষমা চাওয়া।
১১. মায়ের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া: এ বিষয়টিও লক্ষ্য রাখা দরকার যে, পিতার আনুগত্য, তার প্রতি সহানুভূতি ও ইহসান করার উপর মাতার আনুগত্য, তার প্রতি সহানুভূতি ও ইহসান করার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে; আর এটা এই জন্য যে, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসের মধ্যে এসেছে, তিনি বলেন:
جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ : مَنْ أَحَقُّ النَّاسِ بِحُسْنِ صَحَابَتِي ؟ قَالَ : « أُمُّكَ » . قَالَ : ثُمَّ مَنْ ؟ قَالَ : « ثُمَّ أُمُّكَ » . قَالَ ثُمَّ مَنْ ؟ قَالَ : « ثُمَّ أُمُّكَ » . قَالَ ثُمَّ مَنْ ؟ قَالَ : « ثُمَّ أَبُوكَ » . ( رواه البخاري و مسلم ) .
"এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে জিজ্ঞাসা করল: হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে? তিনি বললেন: তোমার মা।
লোকটি জিজ্ঞাসা করল; তারপর কে? তিনি বললেন: তারপর তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল: তারপর কে? তিনি বললেন: তারপর তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল: তারপর কে? তিনি বললেন: তারপর তোমার পিতা।"²³
ইবনু বাত্তাল র. এই হাদিসের ব্যাখ্যা করার সময় বলেন: "তার দাবি হল, মাতার জন্য পিতার তিন গুণ পরিমাণ সদ্ব্যবহার পাওয়ার অধিকার থাকবে; তিনি বলেন: আর এটা গর্ভধারণের কষ্ট, অতঃপর প্রসব বেদনার কষ্ট এবং তারপর দুধ পান করানোর কষ্টের জন্য; কেননা, এই কষ্টগুলো এককভাবে মা করে থাকেন; অতঃপর পিতা লালনপালন ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মায়ের সাথে অংশগ্রহণ করেন। ²⁴
কখনও কখনও বলা হয়: মাতাকে সদ্ব্যবহার, ইহসান ও সহানুভূতির ক্ষেত্রে প্রাধান্য ও মর্যাদা দেওয়া হবে; আর আনুগত্যের ক্ষেত্রে পিতাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে; কারণ, পিতা হলেন ঘরের কর্তা ও নৌকার মাঝি।
১২. কাজের ক্ষেত্রে তাদেরকে সহযোগিতা করা: সুতরাং কোনো সন্তানের জন্য শোভনীয় নয় যে, তার পিতামাতা কাজ করবেন, আর সে তাদের সহযোগিতা না করে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবে।
১৩. তাদেরকে বিরক্ত করা থেকে দূরে থাকা: চাই তারা যখন ঘুমন্ত অবস্থায় থাকেন, তখন বিরক্ত করা হউক, অথবা হৈচৈ ও উচ্চকণ্ঠে আওয়াজ করে তাদেরকে বিরক্ত করা হউক, অথবা কোনো দুঃসংবাদ দেওয়ার মাধ্যমে, অথবা এগুলো ভিন্ন অন্য কোনো ধরনের বিরক্তিকর কিছু দ্বারা বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকা।
১৪. তাদের সামনে তর্ক-বিতর্ক করা ও ঝগড়া-বিবাদের উস্কানি দেওয়া থেকে বিরত থাকা: আর এটা সম্ভব হবে ভাই-বোন ও পরিবারের লোকজনের সাথে সাধারণভাবে তাদের (পিতামাতার) দৃষ্টির আড়ালে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সমাধান করার ব্যাপারে উৎসাহিত করা।
১৫. তাদের ডাকে দ্রুত সাড়া দেওয়া: মানুষ ব্যস্ত থাকুক অথবা অবসর থাকুক- সর্বাবস্থায় কর্তব্য হচ্ছে, পিতামাতার ডাকে দ্রুত সাড়া দেওয়া। কারণ, কোনো কোনো মানুষকে যখন তার পিতামাতার কোনো একজন ডাকে এবং সে তখন ব্যস্ত থাকে, তখন সে এমন ভাব প্রকাশ করে যে, সে কোনো আওয়াজই শুনেনি, আর যদি অবসর থাকে, তবে সে তাদের ডাকে সাড়া দেয়। কবির ভাষায়:
أصم عن الأمر الذي لا أريده * وأسمع خلق الله حين أريد
(যা আমি শুনতে চাই না তা শোনার ব্যাপারে আমি বধির, আর যখন আমি শুনতে চাই তখন আমি আল্লাহর সবচেয়ে অধিক শ্রোতা বান্দা।
সুতরাং সন্তানের জন্য শোভনীয় হল, পিতামাতার ডাক শোনা মাত্রই তাদের ডাকে সাড়া দেওয়া।
১৬. সন্তানদেরকে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে অভ্যস্থ করা: আর এটা সম্ভব হবে ব্যক্তিকে তাদের জন্য আদর্শ নমুনা হওয়ার মাধ্যমে; আর সে সাধ্যানুসারে চেষ্টা করবে তার সন্তানসমষ্টি ও তার পিতামাতার মাঝে সম্পর্ক মজবুত করার জন্য।
১৭. পিতামাতার মাঝে বিরোধ সৃষ্টি হলে তাদের মাঝে শান্তিপূর্ণ সমাধান করে দেওয়া: কেননা, অনেক সময় পিতামাতার মাঝে যখন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তখন তাদের মাঝে সম্পর্কের উন্নতি ও শান্তিপূর্ণ সমাধান করার জন্য সন্তানগণ ভালো ভূমিকা নিতে পারে এবং তারা যখন কোনো বিষয়ে মতবিরোধ করবে, তখন সন্তানগণ চাইবে তাদের মধ্যকার দৃষ্টিভঙ্গিকে কাছাকাছি নিয়ে আসতে।
১৮. তাদের নিকট প্রবেশ করার সময় অনুমতি প্রার্থনা করা: কারণ, তাঁরা উভয়ে অথবা তাঁদের কোনো একজন এমন অবস্থায় থাকেন, যে অবস্থায় তাঁকে কেউ দেখুক তিনি তা পছন্দ করেন না।
১৯. তাদেরকে সবসময় আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া: আর এটা হবে দীনের বিষয়ে তারা যা জানে না, তা তাদেরকে শিখিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে; আর তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশনা প্রদান করবে এবং অসৎকাজ থেকে বারণ করবে, যখন তাদের মাঝে কোনো প্রকার অন্যায় ও পাপকর্মের বাহ্যিক রূপ পরিলক্ষিত হবে, তবে এই ক্ষেত্রে অবশ্যই সর্বোচ্চ বিনয়-নম্রতা ও সহানুভূতি প্রদর্শনের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে; আর তাদের ব্যাপারে চরম ধৈর্যের পরিচয় দিবে, যখন তারা তা গ্রহণ না করবে।
২০. তাদের থেকে অনুমতি গ্রহণ করা এবং তাদের মতামত চাওয়া: চাই বন্ধুবান্ধবের সাথে কোথাও যাওয়ার ব্যাপারে হউক, অথবা দেশের বাইরে পড়ালেখা বা অনুরূপ কোনো উদ্দেশ্যে সফর করার ব্যাপারে হউক, অথবা জিহাদের জন্য যাওয়ার ব্যাপারে হউক, অথবা ঘর থেকে বের হওয়া ও ঘরের বাইরে বসবাস করার ব্যাপারে হউক; সুতরাং তারা যদি অনুমতি দেন, তাহলে সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিবে; আর অনুমতি না দিলে নিজের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় বর্জন করবে, বিশেষ করে যখন তাদের অভিমতের যুক্তিসংগত কারণ থাকে, অথবা তা জ্ঞান ও অভিজ্ঞতালব্ধ মতামত হয়ে থাকে।
২১. তাদের সুনাম রক্ষা করা: আর এটা সম্ভব হবে ভালদের সাথে মিশার মাধ্যমে এবং মন্দদের থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে; আর সন্দেহজনক স্থান থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার মাধ্যমে।
২২. তাদের নিন্দা করা ও মনে আঘাত দেওয়া থেকে দূরে থাকা: আর এটা হল যখন তাদের থেকে এমন কোনো কাজ হয়, যা সন্তান পছন্দ করে না, (তখন তাদেরকে তিরস্কার না করা এবং তাদের মনে আঘাত না দেওয়া) যেমন- লালনপালন ও শিক্ষার ব্যাপারে তাদেরকে খাট করা; অতীতে তাদের পক্ষ থেকে ঘটেছে এমন কাজের কথা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া, যা তারা শুনতে পছন্দ করেন না।
২৩. তারা নির্দেশ না দিলেও এমন কাজ করা, যা তাদেরকে আনন্দ দেয়: যেমন- ভাই-বোনের দেখাশুনা করা, অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে চলা, অথবা ঘর গোছানো বা কৃষি ক্ষেতের পরিচর্যা করা, অথবা উপহার দেওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা করা, অথবা এই জাতীয় কোনো কাজ করা, যা তাদেরকে আনন্দ দেয় এবং তাদের অন্তরে খুশির সঞ্চার করে।
২৪. তাদের স্বভাব ও মেজাজ বুঝা এবং সেই অনুযায়ী তাদের সাথে ব্যবহার করা: সুতরাং তারা যখন উভয়ে অথবা তাদের কোনো একজন খুব রাগী বা কঠোর স্বভাবের হয়, অথবা যে কোনো প্রকারের অপছন্দনীয় গুণের অধিকারী হয়, তখন সন্তানের জন্য যথাযথ কর্তব্য হল, তার পিতামাতার মধ্যকার ঐ স্বভাবকে ভালভাবে অনুধাবন করা এবং তাদের সাথে উচিত মত ব্যবহার করা।
২৫. তাদের জীবদ্দশায় তাদের জন্য বেশি বেশি দো'আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করা: আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا ﴾ [الاسراء: ٢٤]
"আর বলো: 'হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া কর, যেভাবে তারা শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।”²⁵
আল্লাহ তা'আলা বলেন, নূহ আলাইহিস সালাম বলেছিলেন:
رَّبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَن دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ ) [نوح: ۲۸]
"হে আমার রব! আপনি ক্ষমা করুন আমাকে, আমার পিতামাতাকে এবং যারা মুমিন হয়ে আমার ঘরে প্রবেশ করে তাদেরকে এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে।”²⁶
২৬. তাদের মৃত্যুর পর তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা: সুতরাং যেসব কারণে পিতামাতার মহান হক বা অধিকারের বিষয়টি প্রমাণিত, জগতসমূহের প্রতিপালকের দয়ার ব্যাপকতার কারণে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার বিষয়টি কখনও বন্ধ হয়ে যায় না, বরং মৃত্যুর পরেও অব্যাহত থাকে; কারণ, কোনো কোনো মানুষ তাদের পিতামাতার জীবদ্দশায় তাদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে কমতি করে থাকে; অতঃপর যখন তারা মৃত্যুবরণ করেন, তখন সে পিতামাতার অধিকার আদায়ে অবহেলা ও সময় নষ্ট করার কারণে লজ্জিত হয়ে তার হাত কামড়ায় এবং দাঁতে আঘাত করে; আর আফসোসের সুরে কামনা করে তারা যদি আবার দুনিয়ায় ফিরে আসত, তাহলে সে তাদের সাথে ভাল আচরণ করত!
আর সেখান থেকেই মুসলিম ব্যক্তি যে সুযোগ হারিয়েছে সে তা পেতে সক্ষম হবে- সে তার পিতামাতার মৃত্যুপরবর্তী সময়ে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে; আর এটা কয়েকটি কাজের মাধ্যমে হতে পারে, যেমন-
ক. সন্তান স্বয়ং নিজেই ভাল হয়ে যাবে।
খ. তাদের জন্য বেশি বেশি দো'আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।
গ. তাদের সাথে সম্পর্কযুক্ত আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা।
ঘ. তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা।
ঙ. তাদের পক্ষ থেকে দান-সাদকা করা।
এ হল কতিপয় বিষয়, যেগুলোর দ্বারা আমরা যথাযথভাবে সুন্দর পদ্ধতিতে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে পারি।

টিকাঃ
²⁰ দেখুন: 'কাদাউদ্‌ দাইন' (قضاء الدين), পৃ. ১৩ - ২১; 'ওয়া বিল-ওয়ালিদাইনে ইহসানা' (وبالوالدين إحسانا), পৃ. ৬৩ - ৬৬
²¹ দেখুন: মুহাম্মদ সা'ঈদ মুবীদ, 'আদাবুল মুসলিম ফীল 'আদাতে ওয়াল 'ইবাদাতে ওয়াল মু'আমিলাত' (أدب المسلم في العادات والعبادات والمعاملات), পৃ. ১৫৮- ১৬০; নিজাম ইয়া'কুবী, 'কুরাতুল 'আইনাইন ফী ফাদায়েলি বিরিল ওয়ালিদাইন' ( قرة العينين في فضائل بر الوالدين ), পৃ. ৪৬ - ৫২; আবদুল্লাহ 'উলওয়ান, 'তারবিয়্যাতুল আওলাদ ফিল ইসলাম' (تربية الأولاد في الإسلام), ১/২৮৫-২৮৬; আল-হাযেমী, 'আল-ই'লাম ফী মা ওয়ারাদা ফী বিরিল ওয়ালিদাইনে ওয়া সিলাতিল আরহাম' ( الإعلام في ما ورد في بر الوالدين وصلة الأرحام ), পৃ. ২৬; আহমাদ 'ঈসা 'আশুর, 'বিরুল ওয়ালিদাইনে ওয়া হুকুকুল আবায়ে ওয়াল আবনায়ে ওয়াল আরহাম' ( حال بر الوالدين وحقوق الآباء والأبناء والأرحام ), পৃ. ১৬ - ২০; ড. মুহাম্মাদ আস-সালেহ, 'আত-তাকাফুলুল ইজতিমা'য়ী ফিশ শারী'য়াতিল ইসলামিয়া' ( التكافل الاجتماعي في الشريعة الإسلامية ), পৃ. ৯৮ - ১০৫; আলী মুহাম্মাদ জাম্মায, 'ওয়াসিয়্যাতু লুক্মান লি-ইবনেহি' ( وصية لقمان لابنه), পৃ. ২৩ - ৩৩
²² সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৩
²³ বুখারী, হাদিস নং- ৫৬২৬; মুসলিম, হাদিস নং- ৬৬৬৪
²⁴ ফাতহুল বারী: ১০/৪১৬
²⁵ সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৩ - ২৪
²⁶ সূরা নূহ, আয়াত: ২৮

এখানে কতগুলো আদব বা শিষ্টাচারের বিষয় রয়েছে, যেগুলো আমাদের জন্য মেনে চলা উচিত এবং পিতামাতার সাথে সে অনুযায়ী আচরণ করলে আমাদের জন্য তা যথাযথ হবে; আমরা আশা করতে পারি যে, আমরা তাদের কিছু ঋণ পরিশোধ করতে পারব এবং আল্লাহ তা'আলা আমাদের উপর তাদের ব্যাপারে যা ওয়াজিব (আবশ্যক) করে দিয়েছেন তার কিছু হলেও বাস্তবায়ন করতে পারব- যাতে আমরা আমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে খুশি করতে পারি, আমাদের হৃদয় উদার ও প্রশস্ত হয়, আমাদের জীবন পবিত্র হয়, আমাদের কর্মকাণ্ডসমূহ সহজ হয়ে যায় এবং আল্লাহ তা'আলা আমাদের হায়াতে (জীবনকালে) বরকত দান করেন।²⁰
সে আদব তথা শিষ্টাচার সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের মধ্য থেকে কিছু বিষয় নিম্নরূপ ²¹।
১. পিতামাতার আনুগত্য করা ও তাদের সাথে অবাধ্য আচরণ থেকে বিরত থাকা: মুসলিম ব্যক্তির উপর ওয়াজিব হল, তার পিতামাতার আনুগত্য করা এবং তাদের সাথে অবাধ্য আচরণ করা থেকে বিরত থাকা; আর তারা যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবাধ্য হওয়ার নির্দেশ না দিবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সকল মানুষের আনুগত্যের উপর তাদের আনুগত্য করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, তবে স্ত্রী কর্তৃক স্বামীর আনুগত্যের বিষয়টি ভিন্ন; কারণ, সে তার পিতামাতার আনুগত্যের উপর তার স্বামীর আনুগত্য করার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিবে।
২. তাদের সাথে উত্তম আচরণ করা: কথায়, কাজে ও সামগ্রিক বিষয়ে তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করা।
৩. বিনয় ও নম্রতার ডানা বিছিয়ে দেওয়া: আর এটা সম্ভব হবে তাদের প্রতি বিনয়, নম্রতা, কোমলতা প্রকাশ করার মাধ্যমে।
৪. তাদেরকে ধমক দেওয়া থেকে দূরে থাকা: আর এটা সম্ভব হবে নরম সুরে ডাকা ও কোমল ভাষায় কথা বলার মাধ্যমে; আর তাদেরকে ধমক দেওয়া ও তাদের সাথে উচ্চঃস্বরে কথা বলা থেকে সর্বোচ্চ সজাগ ও সতর্কতা অবলম্বন করা।
৫. তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করা: আর এটা সম্ভব হবে যখন তারা কথা বলবেন, তখন সামনাসামনি হয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনা এবং কথা বলার সময় তাদের সাথে কথা কাটাকাটি বা তর্ক- বিতর্ক পরিহার করা; আর তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা থেকে অথবা তাদের কথা প্রত্যাখ্যান করা থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা।
৬. তাদের নির্দেশে খুশি হওয়া এবং তাদের কারণে রাগ ও দুঃখ প্রকাশ পরিহার করা: যেমনটি আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍ وَلَا تَنْهَرْهُمَا ﴾ [الاسراء: ২৩]
"তাদেরকে 'উফ্' বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না।”²²
৭. তাদের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করা: আর এটা হবে হাসি-খুশি ও অভিবাদন জানানোর মাধ্যমে তাদের মুখোমুখি হওয়া এবং ভ্রূকুটিপূর্ণ কঠোর দৃষ্টি ও কপাল ভাঁজ করে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা থেকে দূরে থাকা।
৮. তাদের প্রতি ভালবাসা ও বন্ধুত্ব প্রকাশ করা: যেমন- তাদেরকে আগে আগে সালাম প্রদান করা, তাদের হাত ও মাথায় চুম্বন করা, মাজলিসে তাদের জন্য জায়গা প্রশস্ত করে দেওয়া, তাদের আগে খাবারের দিকে হাত বাড়িয়ে না দেওয়া, দিনের বেলায় তাদের পিছনে পিছনে হাঁটা এবং রাতের বেলায় তাদের সামনে হাঁটা— বিশেষ করে রাস্তা যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন বা ভয়ঙ্কর হয়; আর রাস্তা পরিষ্কার, উজ্জ্বল ও নিরাপদ হলে তাদের পিছনে হাঁটাতে কোনো দোষ নেই।
৯. তাদের সামনে আদব ও সম্মান রক্ষা করে বসা: আর এটা হবে সঠিকভাবে বসার মাধ্যমে এবং এমনভাবে বসা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে যা নিকট থেকে বা দূর থেকে তাদের প্রতি অপমান করা হয় বলে অনুভব হয়, যেমন— পা বাড়িয়ে দিয়ে বসা, অথবা তাদের উপস্থিতিতে অট্টহাসি হাসা, অথবা হেলান দিয়ে বসা, অথবা বিবস্ত্র হওয়া, অথবা তাদের সামনে অশ্লীল আচরণ করা, অথবা এগুলো ছাড়া অন্য এমন কোনো আচরণ করা যা তাদের সাথে পরিপূর্ণ শিষ্টাচার পরিপন্থী আচরণ বলে গণ্য।
১০. সেবা অথবা কোনো অবদানের ক্ষেত্রে খোঁটা পরিহার করা: কারণ, খোঁটা সকল অনুগ্রহ বা অবদানকে ধ্বংস করে দেয়; আর এটা মন্দ চরিত্রের অংশবিশেষ, আর এটা যখন হয় পিতামাতার অধিকারের ক্ষেত্রে, তখন তার খারাপি আরও বেড়ে যায়।
সুতরাং সন্তানের আবশ্যকীয় করণীয় হল সাধ্যানুসারে তার পিতামাতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং এ ক্ষেত্রে কোনো প্রকার কমতি বা ঘাটতি হলে তা স্বীকার করে নেওয়া; আর তার পিতামাতার অধিকার পূরণে সক্ষম না হলে অক্ষমতা প্রকাশ করে ক্ষমা চাওয়া।
১১. মায়ের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া: এ বিষয়টিও লক্ষ্য রাখা দরকার যে, পিতার আনুগত্য, তার প্রতি সহানুভূতি ও ইহসান করার উপর মাতার আনুগত্য, তার প্রতি সহানুভূতি ও ইহসান করার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে; আর এটা এই জন্য যে, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসের মধ্যে এসেছে, তিনি বলেন:
جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ : مَنْ أَحَقُّ النَّاسِ بِحُسْنِ صَحَابَتِي ؟ قَالَ : « أُمُّكَ » . قَالَ : ثُمَّ مَنْ ؟ قَالَ : « ثُمَّ أُمُّكَ » . قَالَ ثُمَّ مَنْ ؟ قَالَ : « ثُمَّ أُمُّكَ » . قَالَ ثُمَّ مَنْ ؟ قَالَ : « ثُمَّ أَبُوكَ » . ( رواه البخاري و مسلم ) .
"এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে জিজ্ঞাসা করল: হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে? তিনি বললেন: তোমার মা। লোকটি জিজ্ঞাসা করল; তারপর কে? তিনি বললেন: তারপর তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল: তারপর কে? তিনি বললেন: তারপর তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল: তারপর কে? তিনি বললেন: তারপর তোমার পিতা।"²³
ইবনু বাত্তাল র. এই হাদিসের ব্যাখ্যা করার সময় বলেন: "তার দাবি হল, মাতার জন্য পিতার তিন গুণ পরিমাণ সদ্ব্যবহার পাওয়ার অধিকার থাকবে; তিনি বলেন: আর এটা গর্ভধারণের কষ্ট, অতঃপর প্রসব বেদনার কষ্ট এবং তারপর দুধ পান করানোর কষ্টের জন্য; কেননা, এই কষ্টগুলো এককভাবে মা করে থাকেন; অতঃপর পিতা লালনপালন ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মায়ের সাথে অংশগ্রহণ করেন।²⁴
কখনও কখনও বলা হয়: মাতাকে সদ্ব্যবহার, ইহসান ও সহানুভূতির ক্ষেত্রে প্রাধান্য ও মর্যাদা দেওয়া হবে; আর আনুগত্যের ক্ষেত্রে পিতাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে; কারণ, পিতা হলেন ঘরের কর্তা ও নৌকার মাঝি।
১২. কাজের ক্ষেত্রে তাদেরকে সহযোগিতা করা: সুতরাং কোনো সন্তানের জন্য শোভনীয় নয় যে, তার পিতামাতা কাজ করবেন, আর সে তাদের সহযোগিতা না করে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবে।
১৩. তাদেরকে বিরক্ত করা থেকে দূরে থাকা: চাই তারা যখন ঘুমন্ত অবস্থায় থাকেন, তখন বিরক্ত করা হউক, অথবা হৈচৈ ও উচ্চকণ্ঠে আওয়াজ করে তাদেরকে বিরক্ত করা হউক, অথবা কোনো দুঃসংবাদ দেওয়ার মাধ্যমে, অথবা এগুলো ভিন্ন অন্য কোনো ধরনের বিরক্তিকর কিছু দ্বারা বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকা।
১৪. তাদের সামনে তর্ক-বিতর্ক করা ও ঝগড়া-বিবাদের উস্কানি দেওয়া থেকে বিরত থাকা: আর এটা সম্ভব হবে ভাই-বোন ও পরিবারের লোকজনের সাথে সাধারণভাবে তাদের (পিতামাতার) দৃষ্টির আড়ালে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সমাধান করার ব্যাপারে উৎসাহিত করা।
১৫. তাদের ডাকে দ্রুত সাড়া দেওয়া: মানুষ ব্যস্ত থাকুক অথবা অবসর থাকুক- সর্বাবস্থায় কর্তব্য হচ্ছে, পিতামাতার ডাকে দ্রুত সাড়া দেওয়া। কারণ, কোনো কোনো মানুষকে যখন তার পিতামাতার কোনো একজন ডাকে এবং সে তখন ব্যস্ত থাকে, তখন সে এমন ভাব প্রকাশ করে যে, সে কোনো আওয়াজই শুনেনি, আর যদি অবসর থাকে, তবে সে তাদের ডাকে সাড়া দেয়। কবির ভাষায়:
أصم عن الأمر الذي لا أريده * وأسمع خلق الله حين أريد
(যা আমি শুনতে চাই না তা শোনার ব্যাপারে আমি বধির, আর যখন আমি শুনতে চাই তখন আমি আল্লাহর সবচেয়ে অধিক শ্রোতা বান্দা।
সুতরাং সন্তানের জন্য শোভনীয় হল, পিতামাতার ডাক শোনা মাত্রই তাদের ডাকে সাড়া দেওয়া।
১৬. সন্তানদেরকে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে অভ্যস্থ করা: আর এটা সম্ভব হবে ব্যক্তিকে তাদের জন্য আদর্শ নমুনা হওয়ার মাধ্যমে; আর সে সাধ্যানুসারে চেষ্টা করবে তার সন্তানসমষ্টি ও তার পিতামাতার মাঝে সম্পর্ক মজবুত করার জন্য।
১৭. পিতামাতার মাঝে বিরোধ সৃষ্টি হলে তাদের মাঝে শান্তিপূর্ণ সমাধান করে দেওয়া: কেননা, অনেক সময় পিতামাতার মাঝে যখন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তখন তাদের মাঝে সম্পর্কের উন্নতি ও শান্তিপূর্ণ সমাধান করার জন্য সন্তানগণ ভালো ভূমিকা নিতে পারে এবং তারা যখন কোনো বিষয়ে মতবিরোধ করবে, তখন সন্তানগণ চাইবে তাদের মধ্যকার দৃষ্টিভঙ্গিকে কাছাকাছি নিয়ে আসতে।
১৮. তাদের নিকট প্রবেশ করার সময় অনুমতি প্রার্থনা করা: কারণ, তাঁরা উভয়ে অথবা তাঁদের কোনো একজন এমন অবস্থায় থাকেন, যে অবস্থায় তাঁকে কেউ দেখুক তিনি তা পছন্দ করেন না।
১৯. তাদেরকে সবসময় আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া: আর এটা হবে দীনের বিষয়ে তারা যা জানে না, তা তাদেরকে শিখিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে; আর তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশনা প্রদান করবে এবং অসৎকাজ থেকে বারণ করবে, যখন তাদের মাঝে কোনো প্রকার অন্যায় ও পাপকর্মের বাহ্যিক রূপ পরিলক্ষিত হবে, তবে এই ক্ষেত্রে অবশ্যই সর্বোচ্চ বিনয়-নম্রতা ও সহানুভূতি প্রদর্শনের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে; আর তাদের ব্যাপারে চরম ধৈর্যের পরিচয় দিবে, যখন তারা তা গ্রহণ না করবে।
২০. তাদের থেকে অনুমতি গ্রহণ করা এবং তাদের মতামত চাওয়া: চাই বন্ধুবান্ধবের সাথে কোথাও যাওয়ার ব্যাপারে হউক, অথবা দেশের বাইরে পড়ালেখা বা অনুরূপ কোনো উদ্দেশ্যে সফর করার ব্যাপারে হউক, অথবা জিহাদের জন্য যাওয়ার ব্যাপারে হউক, অথবা ঘর থেকে বের হওয়া ও ঘরের বাইরে বসবাস করার ব্যাপারে হউক; সুতরাং তারা যদি অনুমতি দেন, তাহলে সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিবে; আর অনুমতি না দিলে নিজের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় বর্জন করবে, বিশেষ করে যখন তাদের অভিমতের যুক্তিসংগত কারণ থাকে, অথবা তা জ্ঞান ও অভিজ্ঞতালব্ধ মতামত হয়ে থাকে।
২১. তাদের সুনাম রক্ষা করা: আর এটা সম্ভব হবে ভালদের সাথে মিশার মাধ্যমে এবং মন্দদের থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে; আর সন্দেহজনক স্থান থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার মাধ্যমে।
২২. তাদের নিন্দা করা ও মনে আঘাত দেওয়া থেকে দূরে থাকা: আর এটা হল যখন তাদের থেকে এমন কোনো কাজ হয়, যা সন্তান পছন্দ করে না, (তখন তাদেরকে তিরস্কার না করা এবং তাদের মনে আঘাত না দেওয়া) যেমন- লালনপালন ও শিক্ষার ব্যাপারে তাদেরকে খাট করা; অতীতে তাদের পক্ষ থেকে ঘটেছে এমন কাজের কথা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া, যা তারা শুনতে পছন্দ করেন না।
২৩. তারা নির্দেশ না দিলেও এমন কাজ করা, যা তাদেরকে আনন্দ দেয়: যেমন- ভাই-বোনের দেখাশুনা করা, অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে চলা, অথবা ঘর গোছানো বা কৃষি ক্ষেতের পরিচর্যা করা, অথবা উপহার দেওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা করা, অথবা এই জাতীয় কোনো কাজ করা, যা তাদেরকে আনন্দ দেয় এবং তাদের অন্তরে খুশির সঞ্চার করে।
২৪. তাদের স্বভাব ও মেজাজ বুঝা এবং সেই অনুযায়ী তাদের সাথে ব্যবহার করা: সুতরাং তারা যখন উভয়ে অথবা তাদের কোনো একজন খুব রাগী বা কঠোর স্বভাবের হয়, অথবা যে কোনো প্রকারের অপছন্দনীয় গুণের অধিকারী হয়, তখন সন্তানের জন্য যথাযথ কর্তব্য হল, তার পিতামাতার মধ্যকার ঐ স্বভাবকে ভালভাবে অনুধাবন করা এবং তাদের সাথে উচিত মত ব্যবহার করা।
২৫. তাদের জীবদ্দশায় তাদের জন্য বেশি বেশি দো'আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করা: আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا ﴾ [الاسراء: ٢٤]
"আর বলো: 'হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া কর, যেভাবে তারা শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।”²⁵
আল্লাহ তা'আলা বলেন, নূহ আলাইহিস সালাম বলেছিলেন:
رَّبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَن دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ ) [نوح: ۲۸]
"হে আমার রব! আপনি ক্ষমা করুন আমাকে, আমার পিতামাতাকে এবং যারা মুমিন হয়ে আমার ঘরে প্রবেশ করে তাদেরকে এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে।”²⁶
২৬. তাদের মৃত্যুর পর তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা: সুতরাং যেসব কারণে পিতামাতার মহান হক বা অধিকারের বিষয়টি প্রমাণিত, জগতসমূহের প্রতিপালকের দয়ার ব্যাপকতার কারণে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার বিষয়টি কখনও বন্ধ হয়ে যায় না, বরং মৃত্যুর পরেও অব্যাহত থাকে; কারণ, কোনো কোনো মানুষ তাদের পিতামাতার জীবদ্দশায় তাদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে কমতি করে থাকে; অতঃপর যখন তারা মৃত্যুবরণ করেন, তখন সে পিতামাতার অধিকার আদায়ে অবহেলা ও সময় নষ্ট করার কারণে লজ্জিত হয়ে তার হাত কামড়ায় এবং দাঁতে আঘাত করে; আর আফসোসের সুরে কামনা করে তারা যদি আবার দুনিয়ায় ফিরে আসত, তাহলে সে তাদের সাথে ভাল আচরণ করত!
আর সেখান থেকেই মুসলিম ব্যক্তি যে সুযোগ হারিয়েছে সে তা পেতে সক্ষম হবে- সে তার পিতামাতার মৃত্যুপরবর্তী সময়ে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে; আর এটা কয়েকটি কাজের মাধ্যমে হতে পারে, যেমন-
ক. সন্তান স্বয়ং নিজেই ভাল হয়ে যাবে।
খ. তাদের জন্য বেশি বেশি দো'আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।
গ. তাদের সাথে সম্পর্কযুক্ত আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা।
ঘ. তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা।
এ হল কতিপয় বিষয়, যেগুলোর দ্বারা আমরা যথাযথভাবে সুন্দর পদ্ধতিতে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে পারি।

টিকাঃ
²⁰ দেখুন: 'কাদাউদ্‌ দাইন' (قضاء الدين), পৃ. ১৩ - ২১; 'ওয়া বিল-ওয়ালিদাইনে ইহসানা' (وبالوالدين إحسانا), পৃ. ৬৩ - ৬৬
²¹ দেখুন: মুহাম্মদ সা'ঈদ মুবীদ, 'আদাবুল মুসলিম ফীল 'আদাতে ওয়াল 'ইবাদাতে ওয়াল মু'আমিলাত' (أدب المسلم في العادات والعبادات والمعاملات), পৃ. ১৫৮- ১৬০; নিজাম ইয়া'কুবী, 'কুরাতুল 'আইনাইন ফী ফাদায়েলি বিরিল ওয়ালিদাইন' ( قرة العينين في فضائل بر الوالدين ), পৃ. ৪৬ - ৫২; আবদুল্লাহ 'উলওয়ান, 'তারবিয়্যাতুল আওলাদ ফিল ইসলাম' (تربية الأولاد في الإسلام), ১/২৮৫-২৮৬; আল-হাযেমী, 'আল-ই'লাম ফী মা ওয়ারাদা ফী বিরিল ওয়ালিদাইনে ওয়া সিলাতিল আরহাম' ( الإعلام في ما ورد في بر الوالدين وصلة الأرحام ), পৃ. ২৬; আহমাদ 'ঈসা 'আশুর, 'বিরুল ওয়ালিদাইনে ওয়া হুকুকুল আবায়ে ওয়াল আবনায়ে ওয়াল আরহাম' ( حال بر الوالدين وحقوق الآباء والأبناء والأرحام ), পৃ. ১৬ - ২০; ড. মুহাম্মাদ আস-সালেহ, 'আত-তাকাফুলুল ইজতিমা'য়ী ফিশ শারী'য়াতিল ইসলামিয়া' ( التكافل الاجتماعي في الشريعة الإسلامية ), পৃ. ৯৮ - ১০৫; আলী মুহাম্মাদ জাম্মায, 'ওয়াসিয়্যাতু লুক্মান লি-ইবনেহি' ( وصية لقمان لابنه), পৃ. ২৩ - ৩৩
²² সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৩
²³ বুখারী, হাদিস নং- ৫৬২৬; মুসলিম, হাদিস নং- ৬৬৬৪
²⁴ ফাতহুল বারী: ১০/৪১৬
²⁵ সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৩ - ২৪
²⁶ সূরা নূহ, আয়াত: ২৮

📘 পিতামাতার অবাধ্যতাঃ কারণ কিছু বাহ্যিক চিত্র ও প্রতিকারের উপায় > 📄 সদ্ব্যবহারে সহায়ক ১২টি বিষয় বা কর্মকাণ্ড

📄 সদ্ব্যবহারে সহায়ক ১২টি বিষয় বা কর্মকাণ্ড


পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করাটা আল্লাহ তা'আলার অন্যতম নি'আমত, তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা করেন তাকে এই নি'আমত দ্বারা ধন্য করেন। এখানে এমন কতগুলো কর্মকাণ্ড বা বিষয় রয়েছে, যেগুলো কোনো মানুষ গ্রহণ করে চেষ্টা-সাধনা করলে সেগুলো তাকে তার পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে সহযোগিতা করবে; এসব কর্মকাণ্ড ও বিষয়াদির কতিপয় দিক নিম্নরূপ:²⁷
১. আল্লাহ তা'আলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা: আর এটা সম্ভব হবে শরী'আত সম্মত পন্থা অবলম্বন করে 'ইবাদত ও দো'আর মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সর্বোত্তম সম্পর্ক স্থাপন করার মাধ্যমে, আশা করা যায় যে, তিনি আপনাকে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জন্য তাওফীক দিবেন এবং সার্বিকভাবে সহযোগিতা করবেন।
২. সদ্ব্যবহারের সুফল ও অবাধ্যতার কুফল সামনে রাখা: কেননা, (পিতামাতার আনুগত্যের) কাজটি যথাযথভাবে সম্পাদন করা ও তা বাস্তবায়নের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করার অন্যতম বড় উপায় হল সদ্ব্যবহার করার ফলাফল সম্পর্কে জানা এবং তার উত্তম পরিণতি সামনে রাখা।
অনুরূপভাবে অবাধ্যতার কুফল এবং তার কারণে যে উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, পরিতাপ ও অপমানের আমদানি হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি দেওয়া; আর এসবই পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে সাহায্য করবে এবং তাদের অবাধ্য হওয়া থেকে বিরত রাখবে।
৩. অন্যসব মানুষের উপর পিতামাতার মর্যাদার বিষয়টি সামনে রাখা: কেননা, তারা হলেন এই দুনিয়ায় তার অস্তিত্বের উপলক্ষ; আর তারা তার জন্য কষ্ট করেছেন, তাকে অকৃত্রিম স্নেহ ও ভালোবাসা দিয়েছেন এবং বড় হওয়া পর্যন্ত লালনপালন করেছেন; সুতরাং সন্তান তাদের জন্য যত কিছুই করুক না কেন, সে কখনও তাদের হক (অধিকার) আদায় করতে সক্ষম হবে না; অতএব, এই বিষয়টি মনে রাখলে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার মত কাজটি সহজ হবে।
৪. পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহারে আত্মনিয়োগ করা: ব্যক্তির জন্য আবশ্যক হলো তার পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা এবং এর সকল দায়-দায়িত্ব বহন করা; আর এ কাজে নিজেকে এমনভাবে বিলিয়ে দেওয়া, যাতে তা তার স্বভাব ও অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়।
৫. তালাকের অবস্থায় আল্লাহকে ভয় করা: পিতামাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য হল তারা যদি তাদের মধ্যকার দাম্পত্য জীবন বহাল রাখতে অপারগ হয় এবং তাদের মাঝে তালাকের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে, তাহলে তাদের প্রত্যেকেই যেন সন্তানদেরকে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জন্য উপদেশ দেয় এবং তাদের প্রত্যেকে যেন সন্তানদেরকে পিতামাতার সাথে দুর্ব্যবহার করতে প্ররোচিত না করে; কারণ, সন্তানরা যখন পিতামাতার অবাধ্য বলে পরিচিত হবে, তখন এর জন্য পিতামাতাই দায়ী হবেন; ফলে তারা নিজেরা হতভাগ্য হবে এবং সন্তানদেরকেও হতভাগ্য করবে।
৬. পিতামাতার সততা: ছেলে-সন্তানদের সততা ও তাদের কর্তৃক তাদের পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জন্য অন্যতম উপায় ও উপলক্ষ হল পিতামাতার সততা।
৭. পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের উপদেশ দেওয়া: আর এটা হবে সদ্ব্যবহারকারীদেরকে উৎসাহ দান এবং তাদেরকে সদ্ব্যবহার করার ফযীলত বর্ণনা করে উপদেশ দেওয়ার মাধ্যমে; আর অবাধ্যদেরকে উপদেশ দান এবং অবাধ্যতার খারাপ পরিণতি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে।
৮. সদ্ব্যবহার করার জন্য সন্তানদেরকে সহযোগিতা করা: আর এটা হল সদ্ব্যবহার করার জন্য পিতামাতা কর্তৃক সন্তানদের সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া; আর এটা সম্ভব হয়ে উঠবে তাদেরকে উৎসাহ ও ধন্যবাদ দেওয়ার মাধ্যমে এবং তাদের জন্য দো'আ করার মাধ্যমে।
আমি কোনো কোনো পিতামাতার ব্যাপারে জানি, যাকে ছেড়ে তার সন্তান-সন্তুতি ও নাতি-নাতনীগণ এক মুহূর্তও থাকতে পারে না, অথচ তার বয়স একশ বছর পার হয়ে গেছে। কারণ, তারা তার সাথে অনেক বেশি উত্তম আচরণ করে এবং তার সেবায় পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে যায়; বরং তারা এর দ্বারা মজা ও আনন্দ পায়।
আর আল্লাহ তা'আলা তাওফীক দান করার পর তাদেরকে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জন্য যে কারণটি সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ করে তা হল- এই পিতা তার সাথে উত্তম ব্যবহার করার ব্যাপারে তাদের (সন্তানদের) উত্তম সাহায্যকারী, যেমন- তিনি তার সন্তানদেরকে ভালবাসেন, তাদের জন্য বেশি বেশি দো'আ করেন, আগ্রহের সাথে তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, তাদের প্রশংসা ও গুণ-গান করেন, তাদের মনে আনন্দ দেন এবং তাদেরকে তাদের সবচেয়ে প্রিয় নামে ডাকেন।
৯. সন্তান কর্তৃক তার নিজকে মাতাপিতার অবস্থানে রেখে চিন্তা করা: হে ছেলে! আগামীতে যখন তুমি বার্ধক্যে উপনীত হবে, তোমার অস্থিমজ্জা দুর্বল হয়ে যাবে, চুল সাদা হয়ে যাবে এবং তুমি চলাফেরা করতে অক্ষম হয়ে যাবে, তখন যদি তোমার সন্তানদের কাছ থেকে তুমি দুর্ব্যবহার পাও, নিষ্ঠুর অবহেলার শিকার হও এবং স্পষ্ট অবজ্ঞার পাত্র হয়ে যাও, তাহলে কি তা তোমাকে আনন্দ দিবে?!
১০. সদ্ব্যবহারকারী ও অবাধ্য সন্তানদের জীবনবৃত্তান্ত পাঠ করা: কেননা, সদ্ব্যবহারকারীদের জীবনী আগ্রহ-উদ্দীপনাকে সতেজ ও তীক্ষ্ণ করবে, সংকল্প ও সিদ্ধান্তকে পবিত্র করবে এবং সদ্ব্যবহার করতে অনুপ্রাণিত করবে।
আর অবাধ্য সন্তানদের জীবনী পাঠ এবং তাদের অর্জিত খারাপ পরিণতি অবাধ্য হওয়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে, তাতে ঘৃণার জন্ম দিবে, সদ্ব্যবহারের দিকে আহ্বান করবে এবং তার ব্যাপারে আগ্রহ ও উৎসাহের জন্ম দিবে।
১১. সদ্ব্যবহার দ্বারা পিতামাতার খুশি ও অবাধ্যতার কারণে তাদের কষ্ট পাওয়ার বিষয়টি অনুধাবন করা: মানুষ যদি এই বিষয়টি বুঝতে পারে, তাহলে সে আগ্রহ সহকারে সদ্ব্যবহারের দিকে অগ্রসর হবে এবং তাদের অবাধ্য হওয়া থেকে বিরত থাকবে। কবি সত্যই বলেছেন:
لَوْ كَانَ يَدْرِي الْاِبْنُ أَيَّةَ غُصَّةٍ * قَدْ جَرَّعَتْ أَبَوَيْهِ بَعْدَ فِرَاقِه
(যদি ছেলে জানতে পারত কোন্ যন্ত্রণা তার পিতামাতাকে গিলতে হয় তার বিচ্ছেদের পর)।
أم تهيم بوجده حيرانة * وأب يسح الدمع من آماقه
(মা তাকে পাওয়ার জন্য দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়ায়, আর পিতা তাকে হারিয়ে অবিরত চোখের জলে বুক ভাসায়)।
يتجرعان لبينه غصص الردى * ويبوح ما كتماه من أشواقه
(তারা তার বিচ্ছেদের কারণে ধ্বংসের ঢোক গিলতে বাধ্য হন, তার প্রতি প্রবল আগ্রহের আতিশয্যে যা কিছু তারা গোপন করেছিল তা প্রকাশে করে দিতে বাধ্য হয়)।
لرثا لأم سُلَّ من أحشائها * ويبكي لشيخ هام في آفاقه
(অবশ্যই শোক প্রকাশ করতে হবে সে মায়ের জন্য যার পেটের নাড়ি-ভুড়ি থেকে তাকে আলাদা করা হয়েছে,
আর এমন বৃদ্ধ পিতার জন্য ক্রন্দন করতে হবে যিনি তাকে পাগলের মত ভালোবাসত)।
وَلْيَبْدَلِ الْخُلْقُ الْأَبِيُّ بِعَطْفِهِ * وَجَزَاهُمَا بِالْعَذْبِ مِنْ أَخْلَاقِهِ
(আর অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে তার দাম্ভিক আচরণকে মায়া-দয়া দ্বারা, আর তাদেরকে তার মধুর চরিত্র দ্বারা পুরস্কার দিতে হবে)।²⁸

টিকাঃ
²⁷ দেখুন: মুহাম্মাদ ইবন লুতফী আস-সাব্বাগ, 'ওসায়া লিয-যাওজাইন' ( وصايا للزوجين ) [ স্বামী-স্ত্রী'র জন্য অসীয়ত], পৃ. ৫৬ - ৬৪
²⁸ হাফেয তারতুশী, 'বিরুল ওয়ালিদাইন' (بر الوالدين), পৃ. ১৮৮

পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করাটা আল্লাহ তা'আলার অন্যতম নি'আমত, তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা করেন তাকে এই নি'আমত দ্বারা ধন্য করেন। এখানে এমন কতগুলো কর্মকাণ্ড বা বিষয় রয়েছে, যেগুলো কোনো মানুষ গ্রহণ করে চেষ্টা-সাধনা করলে সেগুলো তাকে তার পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে সহযোগিতা করবে; এসব কর্মকাণ্ড ও বিষয়াদির কতিপয় দিক নিম্নরূপ:²⁷
১. আল্লাহ তা'আলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা: আর এটা সম্ভব হবে শরী'আত সম্মত পন্থা অবলম্বন করে 'ইবাদত ও দো'আর মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সর্বোত্তম সম্পর্ক স্থাপন করার মাধ্যমে, আশা করা যায় যে, তিনি আপনাকে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জন্য তাওফীক দিবেন এবং সার্বিকভাবে সহযোগিতা করবেন।
২. সদ্ব্যবহারের সুফল ও অবাধ্যতার কুফল সামনে রাখা: কেননা, (পিতামাতার আনুগত্যের) কাজটি যথাযথভাবে সম্পাদন করা ও তা বাস্তবায়নের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করার অন্যতম বড় উপায় হল সদ্ব্যবহার করার ফলাফল সম্পর্কে জানা এবং তার উত্তম পরিণতি সামনে রাখা।
অনুরূপভাবে অবাধ্যতার কুফল এবং তার কারণে যে উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, পরিতাপ ও অপমানের আমদানি হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি দেওয়া; আর এসবই পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে সাহায্য করবে এবং তাদের অবাধ্য হওয়া থেকে বিরত রাখবে।
৩. অন্যসব মানুষের উপর পিতামাতার মর্যাদার বিষয়টি সামনে রাখা: কেননা, তারা হলেন এই দুনিয়ায় তার অস্তিত্বের উপলক্ষ; আর তারা তার জন্য কষ্ট করেছেন, তাকে অকৃত্রিম স্নেহ ও ভালোবাসা দিয়েছেন এবং বড় হওয়া পর্যন্ত লালনপালন করেছেন; সুতরাং সন্তান তাদের জন্য যত কিছুই করুক না কেন, সে কখনও তাদের হক (অধিকার) আদায় করতে সক্ষম হবে না; অতএব, এই বিষয়টি মনে রাখলে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার মত কাজটি সহজ হবে।
৪. পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহারে আত্মনিয়োগ করা: ব্যক্তির জন্য আবশ্যক হলো তার পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা এবং এর সকল দায়-দায়িত্ব বহন করা; আর এ কাজে নিজেকে এমনভাবে বিলিয়ে দেওয়া, যাতে তা তার স্বভাব ও অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়।
৫. তালাকের অবস্থায় আল্লাহকে ভয় করা: পিতামাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য হল তারা যদি তাদের মধ্যকার দাম্পত্য জীবন বহাল রাখতে অপারগ হয় এবং তাদের মাঝে তালাকের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে, তাহলে তাদের প্রত্যেকেই যেন সন্তানদেরকে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জন্য উপদেশ দেয় এবং তাদের প্রত্যেকে যেন সন্তানদেরকে পিতামাতার সাথে দুর্ব্যবহার করতে প্ররোচিত না করে; কারণ, সন্তানরা যখন পিতামাতার অবাধ্য বলে পরিচিত হবে, তখন এর জন্য পিতামাতাই দায়ী হবেন; ফলে তারা নিজেরা হতভাগ্য হবে এবং সন্তানদেরকেও হতভাগ্য করবে।
৬. পিতামাতার সততা: ছেলে-সন্তানদের সততা ও তাদের কর্তৃক তাদের পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জন্য অন্যতম উপায় ও উপলক্ষ হল পিতামাতার সততা।
৭. পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের উপদেশ দেওয়া: আর এটা হবে সদ্ব্যবহারকারীদেরকে উৎসাহ দান এবং তাদেরকে সদ্ব্যবহার করার ফযীলত বর্ণনা করে উপদেশ দেওয়ার মাধ্যমে; আর অবাধ্যদেরকে উপদেশ দান এবং অবাধ্যতার খারাপ পরিণতি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে।
৮. সদ্ব্যবহার করার জন্য সন্তানদেরকে সহযোগিতা করা: আর এটা হল সদ্ব্যবহার করার জন্য পিতামাতা কর্তৃক সন্তানদের সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া; আর এটা সম্ভব হয়ে উঠবে তাদেরকে উৎসাহ ও ধন্যবাদ দেওয়ার মাধ্যমে এবং তাদের জন্য দো'আ করার মাধ্যমে।
আমি কোনো কোনো পিতামাতার ব্যাপারে জানি, যাকে ছেড়ে তার সন্তান-সন্তুতি ও নাতি-নাতনীগণ এক মুহূর্তও থাকতে পারে না, অথচ তার বয়স একশ বছর পার হয়ে গেছে। কারণ, তারা তার সাথে অনেক বেশি উত্তম আচরণ করে এবং তার সেবায় পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে যায়; বরং তারা এর দ্বারা মজা ও আনন্দ পায়।
আর আল্লাহ তা'আলা তাওফীক দান করার পর তাদেরকে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জন্য যে কারণটি সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ করে তা হল- এই পিতা তার সাথে উত্তম ব্যবহার করার ব্যাপারে তাদের (সন্তানদের) উত্তম সাহায্যকারী, যেমন- তিনি তার সন্তানদেরকে ভালবাসেন, তাদের জন্য বেশি বেশি দো'আ করেন, আগ্রহের সাথে তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, তাদের প্রশংসা ও গুণ-গান করেন, তাদের মনে আনন্দ দেন এবং তাদেরকে তাদের সবচেয়ে প্রিয় নামে ডাকেন।
৯. সন্তান কর্তৃক তার নিজকে মাতাপিতার অবস্থানে রেখে চিন্তা করা: হে ছেলে! আগামীতে যখন তুমি বার্ধক্যে উপনীত হবে, তোমার অস্থিমজ্জা দুর্বল হয়ে যাবে, চুল সাদা হয়ে যাবে এবং তুমি চলাফেরা করতে অক্ষম হয়ে যাবে, তখন যদি তোমার সন্তানদের কাছ থেকে তুমি দুর্ব্যবহার পাও, নিষ্ঠুর অবহেলার শিকার হও এবং স্পষ্ট অবজ্ঞার পাত্র হয়ে যাও, তাহলে কি তা তোমাকে আনন্দ দিবে?!
১০. সদ্ব্যবহারকারী ও অবাধ্য সন্তানদের জীবনবৃত্তান্ত পাঠ করা: কেননা, সদ্ব্যবহারকারীদের জীবনী আগ্রহ-উদ্দীপনাকে সতেজ ও তীক্ষ্ণ করবে, সংকল্প ও সিদ্ধান্তকে পবিত্র করবে এবং সদ্ব্যবহার করতে অনুপ্রাণিত করবে।
আর অবাধ্য সন্তানদের জীবনী পাঠ এবং তাদের অর্জিত খারাপ পরিণতি অবাধ্য হওয়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে, তাতে ঘৃণার জন্ম দিবে, সদ্ব্যবহারের দিকে আহ্বান করবে এবং তার ব্যাপারে আগ্রহ ও উৎসাহের জন্ম দিবে।
১১. সদ্ব্যবহার দ্বারা পিতামাতার খুশি ও অবাধ্যতার কারণে তাদের কষ্ট পাওয়ার বিষয়টি অনুধাবন করা: মানুষ যদি এই বিষয়টি বুঝতে পারে, তাহলে সে আগ্রহ সহকারে সদ্ব্যবহারের দিকে অগ্রসর হবে এবং তাদের অবাধ্য হওয়া থেকে বিরত থাকবে। কবি সত্যই বলেছেন:
لَوْ كَانَ يَدْرِي الْاِبْنُ أَيَّةَ غُصَّةٍ * قَدْ جَرَّعَتْ أَبَوَيْهِ بَعْدَ فِرَاقِه
(যদি ছেলে জানতে পারত কোন্ যন্ত্রণা তার পিতামাতাকে গিলতে হয় তার বিচ্ছেদের পর)।
أم تهيم بوجده حيرانة * وأب يسح الدمع من آماقه
(মা তাকে পাওয়ার জন্য দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়ায়, আর পিতা তাকে হারিয়ে অবিরত চোখের জলে বুক ভাসায়)।
يتجرعان لبينه غصص الردى * ويبوح ما كتماه من أشواقه
(তারা তার বিচ্ছেদের কারণে ধ্বংসের ঢোক গিলতে বাধ্য হন, তার প্রতি প্রবল আগ্রহের আতিশয্যে যা কিছু তারা গোপন করেছিল তা প্রকাশে করে দিতে বাধ্য হয়)।
لرثا لأم سُلَّ من أحشائها * ويبكي لشيخ هام في آفاقه
(অবশ্যই শোক প্রকাশ করতে হবে সে মায়ের জন্য যার পেটের নাড়ি-ভুড়ি থেকে তাকে আলাদা করা হয়েছে,
আর এমন বৃদ্ধ পিতার জন্য ক্রন্দন করতে হবে যিনি তাকে পাগলের মত ভালোবাসত)।
وَلْيَبْدَلِ الْخُلْقُ الْأَبِيُّ بِعَطْفِهِ * وَجَزَاهُمَا بِالْعَذْبِ مِنْ أَخْلَاقِهِ
(আর অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে তার দাম্ভিক আচরণকে মায়া-দয়া দ্বারা, আর তাদেরকে তার মধুর চরিত্র দ্বারা পুরস্কার দিতে হবে)।²⁸

টিকাঃ
²⁷ দেখুন: মুহাম্মাদ ইবন লুতফী আস-সাব্বাগ, 'ওসায়া লিয-যাওজাইন' ( وصايا للزوجين ) [ স্বামী-স্ত্রী'র জন্য অসীয়ত], পৃ. ৫৬ - ৬৪
²⁸ হাফেয তারতুশী, 'বিরুল ওয়ালিদাইন' (بر الوالدين), পৃ. ১৮৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00