📄 পিতা-মাতার সেবা করার কতিপয় উদাহরণ
হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর উদাহরণ:
পিতা মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও ঘৃণা বা অবজ্ঞা না করে বরং অত্যন্ত ভদ্র ভাষায় পিতার সাথে কথা বলায় আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রশংসা করেছেন এবং কুরআনে পিতার সাথে সদ্ব্যবহারের উদাহরণ উপস্থাপন করেছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ يَا أَبَتِ لِمَ تَعْبُدُ مَا لَا يَسْمَعُ وَلَا يُبْصِرُ وَلَا يُغْنِي عَنْكَ شَيْئًا يَا أَبَتِ إِنِّي قَدْ جَاءَنِي مِنَ الْعِلْمِ مَا لَمْ يَأْتِكَ فَاتَّبِعْنِي أَهْدِكَ صِرَاطًا سَوِيًّا - يَا أَبَتِ لَا تَعْبُدِ الشَّيْطَانَ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلرَّحْمَنِ عَصِيًّا يَا أَبَتِ إِنِّي أَخَافُ أَنْ يَمَسَّكَ عَذَابٌ مِنَ الرَّحْمَنِ فَتَكُونَ لِلشَّيْطَانِ وَلِيًّا
'যখন তিনি তার পিতাকে বললেন, হে পিতা! কেন তুমি ঐ বস্তুর পূজা কর যে শোনে না, দেখে না বা তোমার কোন কাজে আসে না? হে আমার পিতা! আমার নিকটে এমন জ্ঞান এসেছে, যা তোমার কাছে আসেনি। অতএব তুমি আমার অনুসরণ কর। আমি তোমাকে সরল পথ দেখাব। হে আমার পিতা! শয়তানের পূজা করো না। নিশ্চয়ই শয়তান হ'ল দয়াময়ের অবাধ্য। হে আমার পিতা! আমার ভয় হয় যে, (এই অবস্থায় যদি তুমি মৃত্যুবরণ কর) দয়াময়ের পক্ষ হ'তে শাস্তি তোমাকে স্পর্শ করবে। আর তখন তুমি শয়তানের সাথী হয়ে পড়বে' (মারিয়াম ১৯/৪২-৪৫)।
হযরত ইয়াহইয়া বিন যাকারিয়া (আঃ)-এর উদাহরণ:
ইয়াহইয়া (আঃ) পিতা-মাতার সাথে সুন্দর আচরণ করতেন। প্রত্যেক নবী-রাসূলই পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করেছেন। তাদের মধ্যে যারা এই সৎ কাজের জন্য বিখ্যাত আল্লাহ কেবল তাদেরই নাম উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা ইয়াহয়া (আঃ)-এর প্রশংসা করে বলেন, وَبَرًّا بِوَالِدَيْهِ وَلَمْ يَكُنْ جَبَّارًا عَصِيًّا 'আর তিনি (ইয়াহ্ইয়া) ছিলেন তার পিতামাতার প্রতি সদাচরণকারী এবং তিনি উদ্ধত ও অবাধ্য ছিলেন না' (মারিয়াম ১৯/১৪)।
অর্থাৎ তিনি পিতা-মাতার অবাধ্যতা করতেন না এবং কাউকে হত্যার মাধ্যমে তাঁর রবেরও অবাধ্যতা করেননি (তাফসীরে দুর্বল মানছুর ৫/৪৮৭)। পবিত্রতা অবলম্বন, তাক্বওয়ার নীতি অবলম্বন ও পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের কারণে আল্লাহ তা'আলা তিন সময়ে তাঁর প্রতি শান্তি বর্ষণ করেন। তার জন্মের সময়, মৃত্যুর সময় ও পুনরুত্থানের সময়। ৭১
হযরত ঈসা (আঃ)-এর উদাহরণ:
ঈসা (আঃ) মায়ের সেবা করতেন। তিনি শিশুকালেই সবার সামনে বলেছিলেন, আল্লাহ আমাকে মায়ের সাথে সদাচরণ করার উপদেশ দিয়েছেন। তিনি এর পরেই বলছেন, আল্লাহ আমাকে অহংকারী ও হতভাগ্য করেননি। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, যার মধ্যে অহংকার রয়েছে, সে পিতা-মাতার সেবা করতে পারবে না। এজন্য আল্লাহ তা'আলা পিতা-মাতার খেদমতকারী হিসাবে ঈসা (আঃ)-এর নাম উল্লেখ করার পর তার অহংকারী না হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ঈসা (আঃ) وَأَوْصَانِي بالصَّلاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا، وَبَرّاً بِوَالِدَتِي وَلَمْ يَجْعَلْنِي جَبَّاراً شَقِيًّا - “তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন ছালাতের ও যাকাতের যতদিন আমি বেঁচে থাকি। (এবং নির্দেশ দিয়েছেন) আমার মায়ের প্রতি অনুগত থাকতে। আর তিনি আমাকে উদ্ধত ও হতভাগ্য করেননি' (মারিয়াম ১৯/৩২)। 'আমার মায়ের প্রতি অনুগত থাকতে' কথার মধ্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, ঈসা বিনা বাপে সৃষ্ট হয়েছিলেন। কুরআনে সর্বত্র 'ঈসা ইবনে মারিয়াম' বলা হয়েছে তার মায়ের দিকে সম্বন্ধ করে। যা অন্য কোন নবীর শানে বলা হয়নি।
হযরত ওছমান বিন আফফান (রাঃ)-এর উদাহরণ:
রাসূল (ছাঃ)-এর জামাতা ও ইসলামের তৃতীয় খলীফা ওছমান (রাঃ) ছিলেন মায়ের প্রতি সীমাহীন সেবাপরায়ণ। যেমন হাদীছে এসেছে, عَنْ عَائِشَةَ رضي الله عنها تَقُولُ : رَجُلانِ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَا أَبَرَّ مَنْ كَانَ فِي هَذِهِ الْأُمَّةِ بِأُمِّهِمَا، فَيُقَالُ لَهَا : مَنْ هُمَا؟ فَتَقُوْلُ : عُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ، وَحَارِثَةُ بْنُ النُّعْمَانِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، فَأَمَّا عُثْمَانُ فَإِنَّهُ قَالَ : مَا قَدَرْتُ أَنْ أَتَأَمَّلَ أُمِّي مُنْذُ أَسْلَمْتُ، وَأَمَّا حَارِثَهُ فَإِنَّهُ كَانَ يُفَلِّي رَأْسَ أُمِّهِ وَيُطْعِمُهَا بَيَدِهِ، وَلَمْ يَسْتَفْهِمْهَا كَلاَمًا قَطُّ تَأْمُرُ بِهِ حَتَّى يَسْأَلَ مَنْ عِنْدِهَا بَعْدَ أَنْ تَخْرُجَ : مَا قَالَتْ أُمِّي؟
আয়েশা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ)-এর দু'জন ছাহাবী ছিলেন যারা এই উম্মতের মধ্যে সর্বাধিক মাতার প্রতি সদাচারী ছিলেন। তাকে বলা হ'ল, তারা কারা? তিনি বললেন, ওছমান বিন আফ্ফান ও হারেছাহ বিন নু'মান (রাঃ)। ওছমান যিনি বলেছেন, আমি ইসলাম গ্রহণের পর আমার মাকে কখনো চিন্তিত করিনি। আর হারেছা, তিনি মায়ের চুল আঁচড়িয়ে দিতেন, নিজ হাতে তাকে খাওয়াতেন এবং তাকে আদেশকৃত কোন কথা বুঝতে না পারলে জিজ্ঞেস করতেন না। বরং তার মা তার নিকট থেকে বের হ'লে মায়ের সাথে থাকা লোকদেরকে জিজ্ঞেস করতেন, আমার মা কি বললেন? ৭২
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর উদাহরণ:
ছাহাবী আবু হুরায়রা (রাঃ) ছিলেন মায়ের সেবাপরায়ণ। তিনি প্রায়ই মায়ের কাছে গিয়ে দেখা করতেন এবং তার জন্য দো'আ করতেন। যেমন হাদীছে এসেছে-
عَنْ أَبِي مُرَّةَ مَوْلَى أُمِّ هَانِي ابْنَةِ أَبِي طَالِب قَالَ: كُنْتُ أَرْكَبُ مَعَ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه إِلَى أَرْضِهِ بِالْعَقِيقِ فَإِذَا دَخَلَ أَرْضَهُ صَاحَ بِأَعْلَى صَوْتِهِ: عَلَيْكِ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ الله وَبَرَكَاتُهُ يَا أُمَّتَاهُ ، تَقُولُ: وَعَلَيْكَ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ، يَقُولُ : رَحِمَكِ اللهُ، رَبَّيْتِنِي صَغِيرًا، فَتَقُولُ: يَا بُنَيَّ، وَأَنْتَ فَجَزَاكَ اللَّهُ خَيْرًا وَرَضِيَ عَنْكَ كَمَا بَرَرْتَنِي كَبِيرًا -
আবু তালিব কন্যা উম্মে হানী (রাঃ)-এর মুক্তদাস আবু মুররা (রহঃ) বলেন, আমি আক্বীকু নামক স্থানে অবস্থিত আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর খামার বাড়ীতে তার সাথে একই বাহনে আরোহণ করে গমন করেছিলাম। তিনি তার বাড়ীতে পৌছে উচ্চস্বরে বলেন, يَا أُمَّاءُ عَلَيْكِ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ 'ওহে জননী! তোমার প্রতি শান্তি, আল্লাহর রহমত ও তার বরকত নাযিল হৌক। তার মা বলেন, তোমার প্রতিও শান্তি, আল্লাহর রহমত ও তার বরকত নাযিল হৌক। আবার আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, ছোটকালে তুমি আমাকে যেভাবে রহমতের সাথে লালন-পালন করেছিলে, আল্লাহ তোমাকে সেভাবে লালন-পালন করুক। তার মা বললেন, হে বৎস! আল্লাহ তোমাকেও উত্তম প্রতিদান দান করুন এবং তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হৌন। যেভাবে তুমি বৃদ্ধকালে আমার সাথে সদাচরণ করছ'।
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) প্রতিদিন তার মাতার কাছে প্রবেশের সময় উক্ত দো'আ পাঠ করতেন এবং তার মাও জওয়াবে দো'আ করে দিতেন'।
অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ يَقُولُ قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ قَالَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم لِلْعَبْدِ الْمَمْلُوكِ الْمُصْلِحِ أَجْرَانِ، وَالَّذِي نَفْسُ أَبِي هُرَيْرَةَ بِيَدِهِ لَوْلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْحَجُّ وَبِرُّ أَمِّى لأَحْبَبْتُ أَنْ أَمُوْتَ وَأَنَا مَمْلُوكَ. قَالَ وَبَلَغَنَا أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ لَمْ يَكُنْ يَحُجُّ حَتَّى مَاتَتْ أُمُّهُ لِصُحْبَتِهَا -
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েব হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ক্রীতদাস সৎ গোলামের জন্যে দু'টি পুরস্কার রয়েছে। সেই মহান আল্লাহর শপথ, যার হাতে আবু হুরায়রার জীবন! যদি আল্লাহর পথে জিহাদ করা, হজ্জ করা এবং আমার মায়ের সেবা করার দায়িত্ব আমার উপরে না থাকত, তাহলে গোলাম অবস্থায় মৃত্যু বরণকেই আমি অধিক পসন্দ করতাম। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা জানতে পেরেছি যে, أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ لَمْ يَكُنْ يَحُجُّ حَتَّى مَاتَتْ أُمُّهُ لِصُحْبَتِهَا
আবু হুরায়রা (রাঃ) হজ্জে গমন করেননি তাঁর মায়ের মৃত্যুর আগে। কেননা তিনি সর্বদা তাঁর সাহচর্যে থেকে সেবা করতেন' (মুসলিম হা/১৬৬৫; শু'আবুল ঈমান হা/৮৬০২)। উল্লেখ্য যে, আবু হুরায়রা (রাঃ) মায়ের সেবা করার কারণে যে হজ্জ থেকে বিরত ছিলেন তা ছিল নফল হজ্জ। কারণ নফল হজ্জ করা অপেক্ষা মায়ের খেদমত করা বেশী গুরুত্বপূর্ণ ও ফরয। তিনি রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে বিদায় হজ্জে অংশগ্রহণ করেছিলেন'। ৭৫
ওসামা বিন যায়েদের উদাহরণ:
তাঁর মায়ের নাম উম্মে আয়মান। তিনি বারাকাহ নামে পরিচিত ছিলেন। রাসূল (ছাঃ) ওসামাকে খুবই ভালবাসতেন। রাসূল (ছাঃ) যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন তার বয়স ছিল বিশ বছর。
كَانَتِ النَّحْلَةُ تَبْلُغُ بِالْمَدِينَةِ أَلْفًا، فَعَمَدَ أَسَامَةُ بْنُ زَيْدٍ إِلَى نَحْلَةٍ فَقَطَعَهَا مِنْ أَجْلِ حُمَّارِهَا ، فَقِيلَ لَهُ فِي ذَلِكَ فَقَالَ: إِنَّ أُمِّي اشْتَهَتْهُ عَلَيَّ، وَلَيْسَ شَيْءٌ مِنَ الدُّنْيَا تَطْلُبُهُ أُمِّي أَقْدِرُ عَلَيْهِ إِلَّا فَعَلْتُهُ،
খেজুর বৃক্ষের মূল্য হাযার দিরহামে পৌঁছে যায়। ওসামা বিন যায়েদ একটি খেজুর গাছ কর্তনের ইচ্ছা করলেন এবং তার ডগায় মাথি থাকার কারণে গাছটি কেটে ফেললেন। তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হ'লে তিনি বলেন, আমার মা তা খাওয়ার কামনা করেছিলেন। আর পৃথিবীতে এমন কিছু নেই যা আমার মা কামনা করার পর আমার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা করব না'। ৭৬
ছাহাবী হারেছা বিন নু'মানের উদাহরণ:
তিনি মায়ের সেবায় নিয়োজিত থাকায় রাসূল (ছাঃ) তাকে জান্নাতে কুরআন তিলাওয়াত করতে শুনেছেন। তিনি তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। যেমন হাদীছে এসেছে,
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ قَالَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم: نمْتُ فَرَأَيْتُنِي فِي الْجَنَّةِ فَسَمِعْتُ صَوْتَ قَارِئ يَقْرَأُ ، فَقُلْتُ : مَنْ هَذَا؟ قَالُوا : هَذَا حَارِثَةُ بْنُ النُّعْمَانِ. فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم: كَذَاكَ الْبِرُّ كَذَاكَ الْبِرُّ، وَكَانَ أَبَرَّ النَّاسِ بِأُمِّهِ -
আয়েশা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেন, আমি ঘুমালাম। তারপর স্বপ্নে আমাকে জান্নাত দেখানো হ'ল। এরপর একজন ক্বারীর তিলাওয়াত শুনতে পেলাম। আমি বললাম, এটা কে? তারা বললেন, ইনি হারেছাহ বিন নু'মান। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, এটিই সদাচরণের পুরস্কার, এটিই সদাচরণের পুরস্কার। আর তিনি মাতার সাথে সর্বাধিক সদাচরণকারী ছিলেন'। ৭৭
ওয়ায়েস কারনী (রহঃ)-এর উদাহরণ:
তিনি মায়ের সেবায় নিয়োজিত থাকার কারণে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারেননি। এজন্য রাসূল (ছাঃ) তার প্রশংসা করেছেন এবং তার সাথে সাক্ষাৎ হ'লে তার নিকট দো'আ চাইতে বলেছেন। হাদীছে এসেছে,
উসায়ের ইবনু জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ওমর ইবনু খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর অভ্যাস ছিল, যখন ইয়েমেনের কোন সাহায্যকারী দল তার কাছে আসত তখন তিনি তাঁদের জিজ্ঞেস করতেন, তোমাদের মধ্যে কি ওয়ায়েস ইবনু আমির আছে? অবশেষে তিনি ওয়ায়েসকে পান। তখন তিনি বললেন, তুমি কি ওয়ায়েস ইবনু আমির? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, মুরাদ গোত্রের কারান বংশের? তিনি বললেন, হ্যাঁ। জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি শ্বেত রোগ ছিল এবং তা নিরাময় হয়েছে, কেবলমাত্র এক দিরহাম স্থান ব্যতীত? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মা কি জীবিত আছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন ওমর (রাঃ) বললেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, 'তোমাদের কাছে মুরাদ গোত্রের কারান বংশের ওয়ায়েস ইবনু আমির ইয়েমেনের সাহায্যকারী দলের সঙ্গে আসবে। তার ছিল শ্বেত রোগ। পরে তা নিরাময় হয়ে গিয়েছে। কেবলমাত্র এক দিরহাম ব্যতীত। তার মা রয়েছেন। সে তাঁর প্রতি অতি সেবাপরায়ণ। এমন ব্যক্তি আল্লাহর নামে কসম করলে আল্লাহ তা পূর্ণ করে দেন। কাজেই যদি তুমি তোমার জন্য তার কাছে মাগফিরাতের দো'আ কামনার সুযোগ পাও তাহ'লে তা করবে। সুতরাং আপনি আমার জন্য মাগফিরাতের দো'আ করুন। তখন ওয়ায়েস (রহঃ) তার মাগফিরাতের জন্য দো'আ করলেন। এরপর ওমর (রাঃ) তাকে বললেন, তুমি কোথায় যেতে চাও? তিনি বললেন, কুফা এলাকায়। ওমর (রাঃ) বললেন, আমি কি তোমার জন্য কুফার গভর্ণরের কাছে চিঠি লিখে দেব? তিনি বললেন, আমি অখ্যাত গরীব লোকদের মধ্যে থাকাই পসন্দ করি। বর্ণনাকারী বলেন, পরবর্তী বছরে তাদের অভিজাত লোকদের মধ্যে এক ব্যক্তি হজ্জ করতে এলে ওমর (রাঃ)-এর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হ'ল।
তখন তিনি তাকে ওয়ায়েস কারনী (রহঃ)-এর অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, আমি তাঁকে জীর্ণ ঘরে সম্পদহীন অবস্থায় রেখে এসেছি। তিনি বললেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন, তোমাদের কাছে কারান বংশের মুরাদ গোত্রের ওয়ায়েস ইবনু আমির (রহঃ) ইয়েমেনের সাহায্যকারীর সেনাদলের সঙ্গে আসবে। তার শ্বেত রোগ ছিল। সে তা থেকে আরোগ্য লাভ করে, এক দিরহাম পরিমাণ স্থান ব্যতীত। তার মা রয়েছেন, সে তার অতি সেবাপরায়ণ। যদি সে আল্লাহ্র নামে কসম খায় তবে আল্লাহ তা'আলা তা পূর্ণ করে দেন। তোমরা নিজের জন্য তাঁর কাছে মাগফিরাতের দো'আ চাওয়ার সুযোগ পেলে তা করবে। পরে অভিজাত সে ব্যক্তি ওয়ায়েস (রহঃ)-এর কাছে এল এবং বলল, আমার জন্য মাগফিরাতের দো'আ করুন। তিনি বললেন, আপনি তো নেক সফর (হজ্জের সফর) থেকে সদ্য আগত। সুতরাং আপনি আমার জন্য মাগফিরাতের দো'আ করুন। সে ব্যক্তি বলল, আপনি আমার জন্য মাগফিরাতের দো'আ করুন। ওয়ায়েস (রহঃ) বললেন, আপনি সদ্য নেক সফর থেকে এসেছেন। আপনি আমার জন্য মাগফিরাতের দো'আ করুন। এরপর তিনি বললেন। আপনি কি ওমর (রাঃ)-এর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন? সে বলল, হ্যাঁ। তখন তিনি তার জন্য মাগফিরাতের দো'আ করলেন। তখন লোকেরা তার (মর্যাদা) সম্পর্কে অবহিত হ'ল। এরপর তিনি যেদিকে মুখ যায় সেদিকে চলে গেলেন (অর্থাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন)। বর্ণনাকারী আসীর বিন জাবের (রহঃ) বলেন, আমি তাকে একখানি ডোরাদার চাদর দিয়েছিলাম। এরপর যখন কোন মানুষ তাকে দেখত তখন বলত, ওয়ায়েসের এই চাদরখানি কোথায় গেল? ৭৮
মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন (রহঃ)-এর উদাহরণ: ৭৯
كَانَ مُحَمَّدُ بْنُ سِيرِينَ إِذَا كَانَ عِنْدَ أُمِّهِ، خَفَضَ مِنْ صَوْتِهِ، وَتَكَلَّمَ رُوَيْدًا 'মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন (৩৩-১১০ হি.) যখন মায়ের নিকট থাকতেন তখন কণ্ঠস্বর নীচু করতেন এবং ধীরে ধীরে কথা বলতেন'। ৮০ অন্য বর্ণনায় রয়েছে, হিশাম বিন হাসান বলেন, مَا رَأَيْتُ مُحَمَّدَ بْنَ سِيرِينَ يُكَلِّمُ أُمَّهُ قَطُّ إِلَّا وَهُوَ يَتَضَرَّعُ - 'আমি কখনো মুহাম্মাদ ইবনু সীরীনকে তার মায়ের সাথে নম্র ভাষায় কথা বলতে দেখিনি'। ৮১
ইবনুল হানাফিয়্যার উদাহরণ: ৮২
সুফিয়ান ছাওরী বলেন, كَانَ ابْنُ الْحَنِيفَةَ يَغْسِلُ رَأْسَ أُمِّهِ بِالْخِطْمِي وَيَمْشُطُهَا، وَيُقَبِّلُهَا، 'ইবনুল হানাফিয়্যা খিতমী ঘাস দ্বারা মায়ের মাথা ধুয়ে দিতেন, চিরুনি করে দিতেন এবং তাকে চুমু দিতেন’। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, মাথায় খিযাব লাগিয়ে দিতেন’।৮৩
যাবইয়ান বিন আলীর উদাহরণ:
যাবইয়ান ইবনু আলী আছ-ছাওরী ছিলেন মায়ের পরম বাধ্যগত। তার ব্যাপারে ইতিহাসে বলা হয়েছে,
وَكَانَ مِنْ أَبَرِّ النَّاسِ بِأُمِّهِ، وَكَانَ يُسَافِرُ بِهَا إِلَى مَكَّةَ، فَإِذَا كَانَ يَوْمٌ حَارٌ حَفَرَ بِفْرًا، ثُمَّ جَاءَ بِنِطَعٍ فَصَبَّ فِيْهِ الْمَاءَ، ثُمَّ يَقُوْلُ لَهَا ادْخُلِي تَبَرَّدِي فِي هَذَا الْمَاءِ
'তিনি মায়ের প্রতি সর্বাধিক সদাচারী ছিলেন। একবার তিনি মাকে নিয়ে মক্কায় গমন করেন। একদা প্রচণ্ড গরম পড়লে তিনি গর্ত খনন করে এক বালতি পানি নিয়ে আসলেন। অতঃপর তাতে পানি ঢাললেন এবং তার মাকে বললেন, এখানে প্রবেশ করে এই পানিতে নিজেকে ঠাণ্ডা করুন'। ৮৪
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর উদাহরণ:
আবু হানীফা (রহঃ) তাঁর মাতার সাথে সদাচরণ করতেন। তিনি তাঁর যাবতীয় অধিকারের প্রতি খেয়াল রাখতেন। তার নিকট উজ্জ্বল চেহারায় প্রবেশ করতেন। তার কথার বিরোধিতা করতেন না। আব্দুল জাব্বার হাযরামী বলেন, যুর'আ নামে একজন বক্তা আমাদের মসজিদে থাকতেন। আবু হানীফার মা একটি ফৎওয়া জানতে চাইলেন। আবু হানীফা (রহঃ) ফৎওয়া দিলে তিনি গ্রহণ না করে বললেন, যুর'আ যে ফৎওয়া দিবেন তাই আমি গ্রহণ করব। আবু হানীফা তাকে নিয়ে যুর'আর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলেন,
هذه أمي تستفتيك في كذا وكذا، فَقَالَ : أنت أعلم مني وأفقه، call فأفتها أنت فقال أبو حنيفة قد أفتيتها بكذا وكذا فقال زُرْعَة القول كما .قَالَ أبو حنيفة، فرضيت وانصرفت 'ইনি আমার মা। এই এই বিষয়ে আপনার নিকট ফৎওয়া জানতে চান। তিনি বললেন, আপনিতো আমার থেকে বড় জ্ঞানী ও ফক্বীহ। আপনিই ফৎওয়া দিন। আবু হানীফা (রহঃ) বললেন, আমি এই এই ফৎওয়া দিয়েছি। তখন যুর'আ সেই ফৎওয়াই দিলেন যা ইমাম আবু হানীফা দিয়েছেন। এতে তার মা খুশি হয়ে ফিরে গেলেন'। ৮৫
আলী বিন হুসাইনের উদাহরণ :
আলী বিন হুসাইন ছিলেন ইসলামের চতুর্থ খলীফা আলী (রাঃ) নাতি। তিনি অধিক ইবাদতগুযার ছিলেন বলে তাকে 'যায়নুল আবেদীন' বা ইবাদতকারীদের শোভা বলা হয়ে থাকে। তিনি ভ্রান্ত শী'আদের রাফেযী নাম দেন。
كَانَ عَلِيُّ بْنُ الْحُسَيْنِ لَا يَأْكُلُ مَعَ أُمِّهِ، وَكَانَ أَبَرَّ النَّاسِ بِهَا، فَقِيلَ لَهُ فِي ذَلِكَ، فَقَالَ: أَخَافُ أَنْ أَكُلَ مَعَهَا فَتَسْبِقُ عَيْنُهَا إِلَى شَيْءٍ مِنَ الطَّعَامِ، وَأَنَا لَا أَعْلَمُ بِهِ فَأَكُلَهُ، فَأَكُونُ قَدْ عَقَقْتُهَا
হুসাইন বিন আলী তাঁর মায়ের সাথে খেতেন না। অথচ তিনি লোকদের মধ্যে মাতা-পিতার প্রতি সর্বাধিক সদাচারী ছিলেন। তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হ'লে তিনি বলেন, আমি তার সাথে খাব আর তার দৃষ্টি খাদ্যের কোন কিছুর দিকে যাবে। আর আমি না জেনেই তা খেয়ে নিব। হতে পারে এতে আমি তার অবাধ্য হয়ে যাব'। ৮৬
হায়াত বিন শুরাইহ্-এর উদাহরণ:
হায়াত বিন শুরাইহ একজন বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী ছিলেন। তিনি তার কর্মের জন্য বিশেষ করে মাতৃসেবার জন্য বিখ্যাত। তিনি মিসরের অধিবাসী ছিলেন। ২২৪ হিজরীতে তাঁর মৃত্যু হয়'। ৮৭ হায়াত বিন শুরাইহ একদিন মজলিসে তার ছাত্রদের পাঠদান করছিলেন। আর তার নিকট বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জ্ঞান অর্জনের জন্য লোকেরা ভিড় করত। তার মা এসে বললেন, قُم يا حيوة فاعلف الدجاج، فيقوم ويترك التعليم 'হে হায়াত! দাঁড়াও এবং মুরগীকে খাবার দাও। তিনি পাঠদান ছেড়ে মায়ের আদেশ পালন করলেন'। ৮৮
ত্বালক বিন হাবীবের উদাহরণ:
তিনি ইরাকের বছরার অধিবাসী ছিলেন। বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী তাবেঈ ও মাতা- পিতার সাথে সদাচরণে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি পরহেযগার ছিলেন। তার কণ্ঠস্বর ছিল সুমধুর'। ৮৯
তিনি ইবাদতগুযার ও আলেমদের অন্যতম ছিলেন। তিনি তার মায়ের মাথায় চুমু দিতেন। তিনি এমন বাড়ির ছাদের উপর দিয়ে হাঁটতেন না যার নীচে তার মা অবস্থান করতেন। এটি তার মায়ের সম্মানের জন্য করতেন'। ৯০
ইয়াস বিন মু'আবিয়ার উদাহরণ:
ইয়াস বিন মু'আবিয়া বছরার কাযী ছিলেন। তিন একাধারে মুহাদ্দিছ, ফক্বীহ ও উপমাবিদ ছিলেন। এই তাবেঈ মায়ের খেদমত করার ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। ১২২ হিজরীতে তিনি মারা যান'। ৯১
لَمَّا مَاتَتْ أُمُّهُ بَكَى عليها فَقِيلَ لَهُ فِي ذَلِكَ فَقَالَ: كَانَ لِي بَابَانِ مَفْتُوحَانِ إِلَى الْجَنَّةِ فَغُلِقَ أَحَدُهُمَا 'ইয়াস বিন মু'আবিয়ার মা মারা গেলে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এ বিষয়ে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি বললেন, 'আমার জন্য জান্নাতের দু'টি দরজা উন্মুক্ত ছিল, যার একটি বন্ধ হয়ে গেল'। ৯২
টিকাঃ
৭১. তাফসীর ইবনু কাছীর ৫/২১৭, সূরা মারিয়াম ১৪-১৫ আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।
৭২. মাকারিমুল আখলাক ১/৭৫, হা/২২৩; ইবনুল জাওযী, আল-বিরু ওয়াছ ছিলাহ হা/৮৬, ১/৮৫।
৭৩. আল-আদাবুল মুফরাদ হা/১৪; মাকারিমুল আখলাক হা/২২৮; মারওয়াযী, আল বির্ষু ওয়াছ ছিলাহ হা/৫০, সনদ হাসান।
৭৪. আল-জামে' ফিল হাদীছ হা/১৫২।
৭৫. নববী, শারহু মুসলিম, অত্র হাদীছের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।
৭৬. ইবনু আবিদ্দুনিয়া, মাকারিমুল আখলাক হা/২২৫, ১/৭৬; ইবনুল জাওযী, আল-মুনতাযাম ফী তারীখিল মুলুক ওয়াল উমাম হা/১২৫, ৫/৩০৭; আল-বিরু ওয়াছ ছিলাহ হা/৮৭; কান্ধালুভী, হায়াতুছ ছাহাবা ৩/২২৪-২২৫; ইবনু সা'দ, আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা ৪/৫২; ইবনু আসাকির, তারীখে দিমাশক ৮/৮২।
৭৭. আহমাদ হা/২৫২২৩; ইবনু হিব্বান হা/৭০১৫; ছহীহাহ হা/৯১৩; মিশকাত হা/৪৯২৬।
৭৮. মুসলিম হা/২৫৪২; হাকেম হা/৫৭১৯।
৭৯. মুহাম্মাদ ইবনু সীরিন আবুবকর আনছারী বাছরী। তিনি ওছমান (রাঃ)-এর খেলাফতের শেষের দিকে বছরায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন রাসূল (ছাঃ)-এর খাদেম আনাস বিন মালেকের মুক্তদাস। তিনি আবু হুরায়রা, ইবনু ওমর, ইবনু আব্বাস, আনাস, ইমরান বিন হুসায়েনসহ অসংখ্য ছাহাবী থেকে হাদীছ বর্ণনা করেন এবং তার থেকে অসংখ্য তাবেঈ হাদীছ বর্ণনা করেন। তিনি ১১০ হিজরীতে হাসান বছরীর মৃত্যুর একশ দিন পর ৭৮ বছর বয়সে বছরায় মৃত্যু বরণ করেন (ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ৯/২৭৪; যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা ৪/৬০৬)।
৮০. ইবনু আবিদ-দুনিয়া, মাকারিমুল আখলাক ১/৭৭, হা/২২৯; ড. সাইয়েদ বিন হুসাইন আল-আফানী, ছালাহুল উম্মাহ ফী উলুবিবল হিম্মাহ ৫/৬৫২।
৮১. হিলইয়াতুল আওলিয়া ২/২৭৩; ড. সাইয়েদ বিন হুসাইন আল-আফানী, ছালাহুল উম্মাহ ফী উলুবিবল হিম্মাহ ৫/৬৫২।
৮২. মুহাম্মদ ইবন আলী (রহঃ)। তিনি আলী বিন আবী তালিব (রাঃ)-এর অন্যতম সন্তান ছিলেন। তিনি আবুল কাসেম এবং আবু আব্দুল্লাহ উভয় উপনামে পরিচিত। ইবনুল হানাফিয়্যাহ নামে তিনি ততোধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি ওমর (রাঃ)-এর খেলাফতকালে জন্মগ্রহণ করেন। তার মাতা খাওলা বিনতু জা'ফর ছিলেন বানু হানীফ গোত্রের একজন মহিলা। পরিণত বয়সে তিনি আমীর মু'আবিয়া এবং আব্দুল মালেক ইবনু মারওয়ানের দরবারে গিয়েছিলেন। উষ্ট্রের যুদ্ধের দিন তিনি মারওয়ানকে মাটিতে ফেলে দিয়েছিলেন এবং তার বুকের উপর চড়ে বলেছিলেন। তিনি তাকে হত্যা করতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু মারওয়ান কাকুতি-মিনতি এবং আল্লাহর দোহাই দিয়ে প্রাণ ভিক্ষা চায়। পরে তিনি তাকে ছেড়ে দেন। খলীফা আবদুল মালিকের রাজত্বকালে তীর সাথে সাক্ষাত করতে গেলে আব্দুল মালেক এই ঘটনার উল্লেখ করেন। মুহাম্মদ ইবনু আলী ঘটনার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন (ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ৯/৩৮; যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা ৪/১১০)।
৮৩. মাকারিমুল আখলাক, ইবনুল জাওযী, আল-বিরু ওয়াছ ছিলাহ হা/৮৯, ১/৮৫; ইবনু সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা ৫/২৪৬।
৮৪. ইবনুল জাওযী, আল-বিরু ওয়াছ ছিলাহ হা/৯৬, ১/৮৮; ইবনু আবিদ দুনিয়া, মাকারিমুল আখলাক হা/২২১।
৮৫. তারীখু বাগদাদ ১৩/৩৬৩; গাযী তাকীউদ্দীন বিন আব্দুল কাদের তামীমী,, আত-ত্বাবাকাতুস সুন্নিয়া ১/৩৬।
৮৬. ইবনুল জাওযী, আল-বিরু ওয়াছ ছিলাহ হা/৯০, ১/৮৬; ছালাহুল উম্মাহ ফী উলুব্বিল হিম্মাহ ৫/৬৫৩।
৮৭. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা ৯/৬৩।
৮৮. তারতুসী, বিরুল ওয়ালিদায়ন ৭৯ পৃঃ; ছালাহুল উম্মাহ ৫/৬৫৩।
৮৯. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা ৪/৬০১।
৯০. তারতুসী, বিরুল ওয়ালিদায়ন পৃঃ ৭৯; ছালাহুল উম্মাহ ৫/৬৫৩; মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম, উকুকুল ওয়ালিদায়ন ১/৬২; ত্বাবাকাতুল কুবরা ৭/২২৮।
৯১. আল-বিদায়াহ ওয়াল নিহায়াহ ৩/৩৩৪; ইবনু হিব্বান, আছ-ছিক্কাত ৪/৩৫।
৯২. আল-বিরু হা/৬০; আল-বিদায়াহ ৯/৩৩৮; ইবনু আসাকির ১০/৩৩; তাহযীবুল কামাল ৩/৪৩৬।
📄 পিতা-মাতার অর্থনৈতিক অধিকার
সন্তানের নিকট পিতা-মাতার যেমন সদাচরণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে, তেমনি তাদের অর্থনৈতিক অধিকারও রয়েছে। এক সময় পিতা-মাতা বৃদ্ধ হয়ে যান। তারা কর্ম করে খেতে পারেন না। তাদের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যায়। এমন করুণ পরিস্থিতিতে পিতা-মাতার দায়ভার নিতে হবে সন্তানকে। যেই পিতা-মাতা অক্লান্ত পরিশ্রম করে সন্তান লালন-পালন করে বড় করে তুলেছে তাদের এ বয়সে ভালো থাকার অধিকার রয়েছে। সন্তান তার সামর্থ্য অনুপাতে পিতা-মাতার জন্য খরচ করবে। সন্তান মানুষের সবচেয়ে বড় উপার্জন। সন্তানেরা একটি বৃক্ষের ন্যায়, যাদেরকে পিতা-মাতা সেবা-যত্ন করে বড় করে তুলে। সন্তান এক সময় উপার্জন করতে শেখে। বৃক্ষের ফলদানের সময় চলে আসে। এই ফল ভোগের সর্বাধিক অধিকার রাখেন পিতা-মাতা। তাই স্ত্রী ও সন্তানের পাশাপাশি পিতা-মাতার প্রয়োজনে খরচ করতে হবে।
পিতা-মাতা সন্তানের সম্পদ থেকে কি পরিমাণ ও কখন নিতে পারবেন:
পিতা-মাতা তাদের নিজেদের প্রয়োজন অনুপাতে সন্তানের সম্পদ নিতে পারবেন। বিনা প্রয়োজনে বা পিতা-মাতা সম্পদশালী হ'লে সন্তানের সম্পদ থেকে দাবী করে বা বল প্রয়োগ করে কিছুই নিতে পারবেন না। হাদীছে এসেছে, কায়েস ইবনু আবী হাযেম হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, حَضَرْتُ أبا بكر الصديق، أتاه رجل ، فقال : يا خليفة رسول الله إن هذا يريد أن يأخذ مالي كله فيجتاحه ، فقال له أبو بكر : ما تقول؟ قال: نعم، فقال أبو بكر : إنما لك من ماله ما يكفيك، فقال: يا خليفة رسول الله، أما قال رسول الله صلى الله عليه وسلم، أنت ومالك لأبيك؟ فقال أبو بكر: ارض بما رضي আল্লাহ عز وجل 'আমি একদিন আবুবকর (রাঃ) নিকট উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় একজন লোক এসে বলল, হে রাসূলের খলীফা! ইনি আমার সমুদয় সম্পদ ছিনিয়ে নিতে চান। আবুবকর তখন তার পিতাকে বললেন, তুমি কি বল? সে বলল, হ্যাঁ। আবুবকর (রাঃ) তাকে বললেন, তোমার জন্য যতটুকু প্রয়োজন কেবল ততটুক তার সম্পদ থেকে গ্রহণ করার অধিকার রয়েছে। সে বলল, হে আল্লাহ্র রাসূলের খলীফা! রাসূল (ছাঃ) কি বলেননি যে, 'তুমি ও তোমার সমুদয় সম্পদ তোমার পিতার'? আবুবকর (রাঃ) বললেন, ‘আল্লাহ যতটুকুতে খুশি হয়েছেন তুমি ততটুকুতে খুশি হও’। ১৪অত্র হাদীছের সনদে মুনযির বিন যিয়াদ নামক দুর্বল বর্ণনাকারী থাকায় সনদ যঈফ হ’লেও হাদীছের মর্ম সঠিক। কারণ পিতা-মাতা-সন্তানের সমুদয় সম্পদ নিতে পারবে না। তাছাড়া এর স্বপক্ষে মারফু ছহীহ হাদীছ রয়েছে। যেমন- আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, إِنَّ أَوْلَادَكُمْ هِبَةُ الله لَكُمْ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ، فَهُمْ وَأَمْوَالُهُمْ لَكُمْ إِذَا احْتَحِتُمْ إِلَيْهَا- ‘নিশ্চয় তোমাদের সন্তানেরা তোমাদের জন্য আল্লাহ্র পক্ষ থেকে দান। তিনি যাকে খুশি তাকে কন্যা সন্তান দান করেন, যাকে খুশি তাকে ছেলে সন্তান দান করেন। তারা ও তাদের সম্পদ তোমাদেরই যখন তোমরা সেগুলোর প্রয়োজন বোধ করবে’। ১৫রাসূল (ছাঃ) আরো বলেন, كُلّ أَحَقُّ بِمَالِهِ مِنْ وَلَدِهِ وَوَالِدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِيْنَ ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তার সম্পদে অধিক হকদার তার সন্তান, পিতা ও সকল মানুষ হ’তে’। ১৬তিনি আরো বলেন, ، لا يَحِلُّ مَالُ امْرِئٍ مُسْلِم إِلَّا بِطِيْب نَفْسِهِ ‘কোন মুসলমানের সন্তুষ্টি ছাড়া তার সম্পদ গ্রহণ করা হালাল নয়’।
শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়া (রহঃ) বলেন, عَلَى الْوَلَدِ الْمُوسِرِ أَنْ يُنْفِقَ عَلَى أَبِيهِ وَزَوْجَةِ أَبِيهِ وَعَلَى إِخْوَتِهِ الصَّغَارِ وَإِنْ لَمْ يَفْعَلْ ذَلِكَ كَانَ عَاقًا لِأَبِيهِ قاطعًا لِرَحِمِهِ مُسْتَحِقًا لِعُقُوبَةِ اللهِ تَعَالَى فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ – ‘সচ্ছল সন্তানের উপর আবশ্যক হ’ল তার পিতার জন্য খরচ করা, তার পিতার স্ত্রীর জন্য খরচ করা ও ছোট ভাইদের জন্য খরচ করা। সে যদি এমনটি না করে তাহ'লে সে পিতার অবাধ্য, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী এবং দুনিয়া ও পরকালে আল্লাহ্ শাস্তির জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হবে'।
ওলামায়ে কেরام পিতা-মাতা কর্তৃক সন্তানের সম্পদ গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু শর্তারোপ করেছেন। যেমন- ১. পিতা-মাতাকে দরিদ্র হ'তে হবে, যাদের কোন সম্পদ নেই এবং কোন উপার্জনও নেই। ২. পিতা-মাতার প্রতি খরচ করার জন্য সন্তানের সামর্থ্য থাকতে হবে। ইবনু কুদামা (রহঃ) দু'টি শর্ত أَحَدُهُما أَلا يُجْحِفَ بالابن، ولا يضر به ولا يَأْخُذَ ,উল্লেখ করে বলেন, شيئًا تَعلَّقت به حَاجَتُه الثَّانِي: ألا يَأْخُذَ مِن مَالِ وَلَدِهِ فَيُعْطِيَهُ الْآخَرَ،
'প্রথমত, সম্পদ নেওয়ার কারণে সন্তানের প্রতি যাতে যুলুম না হয়, এর কারণে সে যেন ক্ষতিগ্রস্থ না হয় এবং পিতা এমন কিছু নিবেন না যা সন্ত ানের প্রয়োজনের সাথে সংশ্লিষ্ট। দ্বিতীয়ত, পিতা এক সন্তানের সম্পদ নিয়ে আরেক সন্তানকে দিবেন না'।
কোন কোন বিদ্বান পিতা কর্তৃক সন্তানের সম্পদ গ্রহণের জন্য ছয়টি শর্ত আরোপ করেছেন। ১. পিতা এমন সম্পদ গ্রহণ করবেন যাতে সন্তান ক্ষতিগ্রস্থ না হয় বা যে সম্পদের সন্তানের প্রয়োজন নেই। ২. অন্য সন্ত ানকে না দেওয়া। ৩. তাদের যে কেউ মৃত্যু রোগে আক্রান্ত না হওয়া। ৪. সন্তান মুসলিম ও পিতা কাফির না হওয়া। ৫. সম্পদ মওজুদ থাকা। ৬. মালিকানার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা'।
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, وَلِأَبِيهِ أَنْ يَأْخُذَ مِنْ مَالِهِ مَا يَحْتَاجُهُ بِغَيْرِ إِذْنِ الِابْنِ وَلَيْسَ لِلِابْنِ مَنْعُهُ সম্পদে প্রয়োজনবোধ করলে তার অনুমতি ব্যতীত গ্রহণ করবে। এতে সন্ত ানের বাধা দেওয়ার অধিকার নেই'।
সন্তানের পরিত্যক্ত সম্পদে পিতা-মাতার অধিকার :
পিতা-মাতার পূর্বে সন্তান মারা গেলে সন্তানের পরিত্যক্ত সম্পদে পিতা- মাতা ভাগ পাবেন। পিতা তিন অবস্থায় সন্তানের সম্পত্তিতে অংশীদার হবেন। ১. সন্তানের ছেলে বা ছেলের ছেলে থাকলে পিতা সম্পদের এক- ষষ্ঠাংশ পাবেন। ২. সন্তানের স্ত্রী-সন্তান না থাকলে পিতা ওয়ারিছ ও আছাবা হিসাবে সন্তানের সমুদয় সম্পদ পাবেন। ৩. সন্তানের কেবল কন্যা সন্তান থাকলে পিতা ওয়ারিছ হিসাবে এক-ষষ্ঠাংশ ও আছাবা হিসাবে বাকী সম্পত্তি পাবেন। অপর দিকে মাতাও তিনটি ক্ষেত্রে সন্তানের সম্পত্তিতে অংশীদার হবেন। ১. সন্তানের সন্তান থাকলে মাতা সম্পদের এক-ষষ্ঠাংশ পাবেন, ২. সন্তানের কোন সন্তান ও ভাই-বোন না থাকলে মাতা সম্পদের এক- তৃতীয়াংশ পাবেন ৩. সন্তানের একাধিক ভাই-বোন থাকলে মাতা সম্পদের এক-ষষ্ঠাংশ পাবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلِأَبَوَيْهِ لِكُلِّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا السُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِنْ كَانَ لَهُ وَلَدٌ فَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ وَلَدٌ وَوَرِثَهُ أَبَوَاهُ فَلِأُمِّهِ الثُّلُثُ فَإِنْ كَانَ لَهُ إِخْوَةٌ فَلِأُمِّهِ السُّدُسُ مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنِ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ لَا تَدْرُونَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ لَكُمْ نَفْعًا فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا -
'মৃতের পিতা-মাতার প্রত্যেকে পরিত্যক্ত সম্পত্তির ছয় ভাগের এক ভাগ করে পাবে, যদি মৃতের কোন পুত্র সন্তান থাকে। আর যদি না থাকে এবং কেবল পিতা-মাতাই ওয়ারিছ হয়, তাহ'লে মা পাবে তিন ভাগের এক ভাগ। কিন্তু যদি মৃতের ভাইয়েরা থাকে, তাহ'লে মা পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ মৃতের অছিয়ত পূরণ করার পর এবং তার ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতা ও পুত্রদের মধ্যে কে তোমাদের জন্য অধিক উপকারী, তা তোমরা জানো না। এটা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত অংশ। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়' (নিসা ৪/১১)।
টিকাঃ
১৩. মু’জামুল আওসাত্ব হা/৮০৬; মাজমা’উয যাওয়ায়েদ হা/৬৭৭১; ইরওয়া ৩/৩২৮।
১৪. মু’জামুল আওসাত্ব হা/৮০৬; বায়হাকী, সুনানুল কুবরা হা/১৫৫৩২; মাজমা’উয যাওয়ায়েদ হা/৬৭৭১; ইরওয়া ৩/৩২৮।
১৫. হাকেম হা/৩১২৩; বায়হাকী, সুনানুল কুবরা হা/১৫৫২৩; ছহীহাহ হা/২৫৬৪।
১৬. সুনানু সাঈদ ইবনু মানছুর হা/২২৯৩; বায়হাকী, সুনানুল কুবরা হা/১৫৫৩১; ছুগরা হা/২৩১৩; বর্ণনাটি মুরসাল।
১৭. আহমাদ হা/২০৭১৪; দারাকুনী হা/৯১-৯২; মিশকাত হা/২৯৪৬; ছহীহুল জামে‘ হা/৭৬৬২।
৯৮. মাজমূ'উল ফাতাওয়া ৩৪/১০১।
৯৯. আল-মুগনী ৬/৬২।
১০০. মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম আলে শায়খ, ফাতাওয়া ওয়া রাসায়েল ৯/২২১।
১০১. মাজমুউল ফাতাওয়া ৩৪/১০২।
📄 অসদাচরণকারী সন্তানদের প্রতি সতর্কবাণী
পিতা-মাতার সাথে অসদাচরণের ভয়াবহ পরিণতির কিছু নমুনা:
পিতা-মাতার সাথে অসদাচরণ করা ঘৃণিত কাজ। কোন অবস্থাতেই তাদের সাথে খারাপ আচরণ করা যাবে না। কেউ যদি এরূপ জঘণ্য কাজ করে তাহ'লে তার প্রতিদান অনুরূপ অথবা তার চেয়ে খারাপ হয়ে থাকে। পৃথিবীর ইতিহাস প্রমাণ করে যে, পিতা-মাতার সাথে অসদাচরণকারীরা ধ্বংস হয়ে গেছে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, وَالَّذِي قَالَ لِوَالِدَيْهِ أَفٌ لَكُمَا أَتَعِدَانَنِي أَنْ أَخْرُجَ وَقَدْ خَلَتِ الْقُرُونُ مِنْ قَبْلِي وَهُمَا يَسْتَغِيثَانِ اللَّهُ وَيْلَكَ آمِنْ إِنَّ وَعْدَ اللهُ حَقٌّ فَيَقُولُ مَا هَذَا إِلَّا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِيْنَ ‘পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পিতা- মাতাকে বলে ঠিক তোমাদের জন্য। তোমরা কি আমাকে এ ভয় দেখাতে চাও যে, আমি পুনরুত্থিত হব? অথচ আমার পূর্বে বহু জাতি গত হয়ে গেছে। একথা শুনে তার পিতামাতা দু'জনে আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করে বলে, তোমার ধ্বংস হৌক! তুমি ঈমান আনো। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ওয়াদা সত্য। জবাবে সে বলে, এটাতো পুরাকালের উপকথা মাত্র' (আহক্বাফ ৪৬/১৭)।
নিম্নে এ সম্পর্ক কয়েকটি উদাহরণ পেশ করা হ'ল-
ছাবেত আল-বুনানী (রহঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, বর্ণিত আছে যে, জনৈক ব্যক্তি তার পিতাকে এক স্থানে প্রহার করছিল। তখন তাকে বলা হ'ল এটি তুমি কি করছ? তখন পিতা বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। কারণ এই স্থানেই আমি আমার বাবাকে মেরে ছিলাম। ফলে আমার ছেলের দ্বারা আমি এই স্থানে এরূপ পরিস্থিতির শিকার হয়েছি। এটি তারই বিনিময়। তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই'।
আবু হাফছ ইয়াসকান্দী বলেন, তার নিকট জনৈক লোক এসে বলল, আমার ছেলে আমাকে মেরে ব্যথিত করেছে। তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ! ছেলে তার পিতাকে মেরেছে? সে বলল, হ্যাঁ, আমাকে মেরে ব্যথিত করেছে। তিনি বললেন, তুমি কি তাকে জ্ঞান ও শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছ? সে বলল, না। তিনি বললেন, তুমি তাকে কুরআন শিক্ষা দিয়েছ? সে বলল, না। তিনি বললেন, তাহ'লে সে কোন কাজ করে? সে বলল, কৃষি কাজ। আচ্ছা তুমি কি জান যে, সে কেন তোমাকে মেরেছিল? সে বলল, না। তাহ'লে হ'তে পারে যে, সে যখন সকালে গাধার উপর আরোহন করে কৃষিকাজে যাচ্ছিল আর তার সামনে ছিল বলদ, পিছনে ছিল কুকুর এবং সে কুরআন তেলাওয়াত করতে জানত না। ফলে সে গান গাইছিল আর এ অবস্থায় তুমি তার মুখোমুখি হয়েছিলে। তখন সে তোমাকে গরু মনে করেছিল (এবং তোমাকে মেরে ছিল)। তুমি বরং আল্লাহ্ প্রশংসা কর যে, সে তোমার ঘাড় মটকিয়ে দেয়নি'।
মাদায়েনী বলেন, কবি জারীর পিতার সবচেয়ে বড় অবাধ্য ব্যক্তি ছিলেন। আর তার ছেলে বেলালও তার অবাধ্য ছিল। সে একদিন পিতার সাথে গালাগালিতে লিপ্ত হয় এবং এতে কষ্টদায়ক ভাষা ব্যবহার করে। শুনে তার মা তাকে বলল, হে আল্লাহ্ শত্রু! তুমি বাবাকে এসব কথা বলছ? তখন জারীর বললেন, তাকে বলতে দাও। হয়ত সে এসব কথা আমাকে বলতে শুনেছে, যখন আমি আমার পিতাকে বলেছিলাম'।
আছমাঈ বলেন, 'জনৈক আরব আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, আমি পিতামাতার সর্বাধিক অবাধ্য ও সর্বাধিক সুন্দর আচরণকারীকে খোঁজার জন্য মহল্লা থেকে বের হ'লাম। বিভিন্ন পাড়ায় পরিভ্রমণ করে এক বৃদ্ধকে পেলাম। যার গলায় রশি বাধা ছিল। আর তা দ্বারা সে পানির বালতি বহন করছে। প্রচণ্ড রৌদ্রের কারণে উটও যা করতে পারে না। কঠিন গরম পড়ছিল। তার পিছনে ছিল একজন যুবক। আর তার হাতে একটি চাবুক ছিল, যা দিয়ে সে তাকে পিটাচ্ছিল। এতে তার পিঠ ফেটে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিল। আমি বললাম, তুমি কি এই দুর্বল বৃদ্ধের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করবে না? তার জন্য কি গলায় রশি নিয়ে পানি বহন করাই যথেষ্ট ছিল না? আবার তুমি তাকে পিটাচ্ছ? সে বলল, আরে সেতো একই সাথে আমার পিতাও। আমি বললাম, আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান থেকে বঞ্চিত করুন! সে বলল, চুপ করুন! সেও এরূপ আচরণ করত তার পিতার সাথে। আর তার পিতা তার দাদার সাথে। আমি বললাম, এই লোকই পিতার সর্বাধিক অবাধ্য। এরপর কিছুদূর না যেতেই জনৈক যুবকের নিকট পৌঁছলাম। তার কাঁধে একটি ঝুড়ি রয়েছে। তাতে রয়েছে এক বৃদ্ধ। যেন একটি পাখির বাচ্চা। প্রতি এক ঘণ্টা চলার পর সে ঝুড়ি তার সামনে রেখে তাকে খাবার দিচ্ছে যেমন পাখিরা করে থাকে। আমি বললাম, ইনি কে? সে বলল, আমার পিতা। তিনি অচল হয়ে পড়েছেন। আর আমি তাকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছি। তখন আমি বললাম, এই লোকই পিতার প্রতি সবচেয়ে বড় সদাচরণকারী আরব।
পিতা-মাতার প্রতি অসদাচরণকারীদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, أُولَئِكَ الَّذِينَ حَقَّ عَلَيْهِمُ الْقَوْلُ فِي أُمَمٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِمْ مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ إِنَّهُمْ كَانُوا خاسِرين 'এরাই তো তারা যাদের উপর শাস্তি অবধারিত হয়েছিল জিন ও ইনসানের মধ্যে যেসব জাতি তাদের পূর্বে গত হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই তারা ছিল ক্ষতিগ্রস্ত' (আহক্বাফ ৪৬/১৮)।
পিতা-মাতাকে গালি দেওয়া :
পিতা-মাতাকে গালি দেওয়া কবীরা গুনাহ এবং এটি তাদের অবাধ্যতার চরম বহিঃপ্রকাশ। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, إِنَّ مِنْ أَكْبَرِ الْكَبَائِرِ أَنْ يَلْعَنَ الرَّجُلُ وَالِدَيْهِ 'কবীরা গুনাহসমূহের একটি হ’ল নিজ পিতা-মাতাকে গালি দেয়া'। ছাহাবীগণ বলেন, কেউ কি নিজ পিতা-মাতাকে গালি দিতে পারে? তিনি বলেন, সে অন্যের পিতা- মাতাকে গালি দিবে, ফলে ঐ ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে গালি দিবে'।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ يَقُولُ: مِنَ الْكَبَائِرِ عِنْدَ اللَّهِ تَعَالَى أَنْ يَسْتَسِبَّ الرَّجُلُ لِوَالِدِهِ - (রহঃ) বলেন, পিতা-মাতাকে গালি শুনানো আল্লাহ্র নিকট একটি কবীরা গুনাহ'।
শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, إِذَا شَتَمَ الرَّجُلُ أَبَاهُ وَاعْتَدَى عَلَيْهِ فَإِنَّهُ يَجِبُ أَنْ يُعَاقَبَ عُقُوبَةً بَلِيْغَةً - 'যখন কোন ব্যক্তি তার পিতাকে গালি দেবে এবং এক্ষেত্রে সীমালংঘন করবে, তাকে কঠিন শাস্তি প্রদান করা আবশ্যক হয়ে যাবে'।
অন্য হাদীছে এসেছে, عَنْ أَبي الطَّفَيْلِ قَالَ: سُئِلَ عَلِيٌّ : هَلْ خَصَّكُمُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّm بشَيْءٍ لَمْ يَخُصُّ بِهِ النَّاسَ كَافَّةً؟ قَالَ : مَا حَصَّنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّm بِشَيْءٍ لَمْ يَخُصُّ بِهِ النَّاسَ، إِلَّا مَا فِي قِرَابِ سَيْفِي، ثُمَّ أَخْرَجَ صَحِيفَةً، فَإِذَا فِيهَا مَكْتُوبٌ : لَعَنَ اللهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللَّهِ، لَعَنَ اللَّهُ مَنْ سَرَقَ مَنَارَ الْأَرْضِ، لَعَنَ اللَّهُ مَنْ لَعَنَ وَالِدَيْهِ، لَعَنَ اللَّهُ مَنْ آوَى مُحْدِثًا -
আবু তোফায়েল (রাঃ) বলেন, আলী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হ'ল, নবী করীম (ছাঃ) কি কোন বিশেষ ব্যাপারে আপনাকে বলেছেন, যা সর্বসাধারণকে বলেননি? তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) অন্য কাউকে বলেননি এমন কোন বিশেষ কথা একান্তভাবে আমাকে বলেননি। অবশ্য আমার তরবারির খাপের মধ্যে যা আছে ততটুকুই। অতঃপর তিনি একখানি ছফীহা বের করলেন। তাতে লেখা ছিল- 'যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে পশু যবাই করে তার প্রতি আল্লাহ্ অভিশাপ। যে ব্যক্তি জমির সীমানা চিহ্ন চুরি করে তার প্রতি আল্লাহ্ অভিশাপ। যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে অভিসম্পাত করে তার প্রতি আল্লাহর অভিশাপ। যে ব্যক্তি বিদ'আতীকে আশ্রয় দেয় তার প্রতি আল্লাহ্ অভিশাপ'।
পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া:
পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এমন গুনাহ যা খালেছ অন্তরে তওবা ছাড়া ক্ষমা হয় না। সেজন্য সর্বাস্থায় পিতা-মাতার অনুগত থাকতে হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ أَلَّا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا 'তুমি বল, এস আমি তোমাদেরকে ঐ বিষয়গুলো পাঠ করে শুনাই যা তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের উপর হারাম করেছেন। আর তা হ'ল এই যে, তোমরা তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না। পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে' (আন'আম ৬/১৫১)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَائِيلَ لَا تَعْبُدُوْنَ إِلَّا اللَّهَ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا 'আর যখন আমরা বনু ইস্রাঈলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম ও অভাবগ্রস্তদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে' (বাক্বারাহ ২/৮৩)।
عَنِ الْمُغِيرَةِ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ إِنَّ الله حَرَّمَ عَلَيْكُمْ عُقُوْقَ الْأُمَّهَاتِ، وَمَنْعَ وَهَاتِ، وَوَأْدَ الْبَنَاتِ، وَكَرِهَ لَكُمْ قِيْلَ وَقَالَ، وَكَثْرَةَ السُّؤَالِ، وَإِضَاعَةَ الْمَالِ মুগীরাহ ইবনু শু'বাহ (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) ইরশাদ করেছেন, 'আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর হারাম করেছেন মায়েদের অবাধ্যতা, কারো প্রাপ্য না দেয়া ও অন্যায়ভাবে কিছু নেয়া এবং কন্যা সন্তানকে জীবন্ত প্রোথিত করা। আর অপসন্দ করেছেন অনর্থক বাক্য ব্যয়, অতিরিক্ত প্রশ্ন করা এবং মাল বিনষ্ট করা'।
অন্য হাদীছে এসেছে, عَنْ أَبِي بَكْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم : أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ ثَلَاثًا. قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ الله . قَالَ : الإِشْرَاكُ بِالله، وَعُقُوْقُ الْوَالِدَيْنِ. وَجَلَسَ وَكَانَ مُتَّكِثًا فَقَالَ: أَلَا وَقَوْلُ الزُّورِ. قَالَ: فَمَا زَالَ يُكَرِّرُهَا حَتَّى قُلْنَا لَيْتَهُ سَكَتَ
আবু বাকরা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেন, 'আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় কবীরা গোনাহ সম্পর্কে খবর দিব না (৩ বার)? তারা বলল, বলুন হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, আল্লাহ্ সাথে শিরক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। এ সময় তিনি ঠেস দিয়ে ছিলেন। অতঃপর উঠে বসে বললেন, সাবধান! মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া। কথাটি তিনি বলতেই থাকলেন। এমনকি আমরা বললাম, যদি তিনি চুপ করতেন'। ১৭৫ অত্র হাদীছে বুঝা যায় যে, শিরকের পরেই মহাপাপ হ'ল পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। এরপরে মহাপাপ হ'ল মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।
অন্য হাদীছে এসেছে,
عَنْ عَبْدِ اللهِ بنِ عَمْرٍو رضى الله عنهما قَالَ جَاءَ أَعْرَابِي إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ مَا الْكَبَائِرُ ؟ قَالَ : الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ . قَالَ ثُمَّ مَاذَا؟ قَالَ : ثُمَّ عُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ. قَالَ ثُمَّ مَاذَا؟ قَالَ : الْيَمِينُ الْغَمُوسُ. قُلْتُ وَمَا الْيَمِينُ الْغَمُوسُ؟ قَالَ : الَّذِي يَقْتَطِعُ مَالَ امْرِئٍ مُسْلِمٍ هُوَ فِيْهَا كَاذِبٌ
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, এক বেদুঈন নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল! কবীরা গুনাহসমূহ কি? তিনি বললেন, আল্লাহ্র সাথে শরীক করা। সে বলল, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, তারপর পিতা-মাতার অবাধ্যতা। সে বলল, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, মিথ্যা কসম করা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, মিথ্যা শপথ কি? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা (শপথের সাহায্যে) মুসলিমের ধন-সম্পদ হরণ করে নেয়।
হাদীছে আরো এসেছে,
عَنْ عُبَيْدِ بْنِ عُمَيْر عَنْ أَبِيهِ أَنَّهُ حَدَّثَهُ وَكَانَتْ لَهُ صُحْبَةٌ أَنَّ رَجُلًا سَأَلَهُ فَقَالَ يَا رَسُولَ الله مَا الْكَبَائِرُ؟ فَقَالَ : هُنَّ تِسْعٌ، فَذَكَرَ مَعْنَاهُ زَادَ وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ الْمُسْلِمَيْنِ وَاسْتِحْلَالُ الْبَيْتِ الْحَرَامِ قِبْلَتِكُمْ أَحْيَاء وَأَمْوَاتًا
উবায়েদ ইবন উমায়ের (রহঃ) তাঁর পিতা হ'তে বর্ণনা করেছেন, তার সাথে বর্ণনাকারীর সখ্যতা ছিল। তিনি বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করে হে আল্লাহ্র রাসূল! কবীরা গুনাহ কোনগুলো? তিনি বলেন, তা নয়টি। তখন তিনি উপরোক্ত হাদীছে বর্ণিত গুনাহগুলোর উল্লেখ করেন এবং অতিরিক্ত এও বলেন, মুসলমান পিতা ও মাতার অবাধ্য হওয়া এবং আল্লাহর ঘরকে (কা'বা) সম্মান না করা, যা তোমাদের জীবনে ও মরণে কিবলা'।
পিতা-মাতাকে অস্বীকার করা:
পৃথিবীতে মানুষের আসার একমাত্র মাধ্যম পিতা-মাতা। অনেকে ভাল চাকুরী করার সুবাদে বা অন্য কোন কারণে বাবা-মায়ের পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করে। কেউবা বাবা-মাকে অস্বীকার করে বসে। এগুলো ইসলামী শরী'আতে হারাম ও কবীরা গুনাহ। বরং কেউ বাবা-মাকে অস্বীকার করলে তার স্থান হবে জাহান্নামে। যেমন হাদীছে এসেছে,
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم : إِنَّ أَعْظَمَ النَّاسِ فِرْيَةً لَرَجُلٌ هَاجَى رَجُلاً فَهَجَا الْقَبِيلَةَ بِأَسْرِهَا وَرَجُلٌ انْتَفَى مِنْ أَبِيْهِ وَزَنَّى أُمَّهُ -
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 'মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি সে যে কোন ব্যক্তির নিন্দা করল। অতঃপর সে (জওয়াবে) পুরো বংশের নিন্দা জ্ঞাপন করল এবং ঐ ব্যক্তি যে তার পিতৃ পরিচয় অস্বীকার করল। (অর্থাৎ পিতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল) এবং তার মাকে ব্যভিচারের অপবাদ দিল'। ১৭৮ অন্য হাদীছে এসেছে,
عَنْ سَعْدٍ رضي الله عنه قَالَ سَمِعْتُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ : مَنِ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيْهِ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ غَيْرُ أَبِيهِ، فَالْجَنَّةُ عَلَيْهِ حَرَامٌ -
সা'দ (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, 'যে ব্যক্তি অন্যকে নিজের পিতা বলে দাবী করে অথচ সে জানে যে সে তার পিতা নয়, জান্নাত তার জন্য হারাম'। ১৭৯ অন্যত্র এসেছে,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ : لَا تَرْغَبُوا عَنْ آبَائِكُمْ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ أَبِيهِ فَهُوَ كُفْرٌ -
আবু হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নবী করীম (ছাঃ) হ'তে বর্ণিত, তিনি (ছাঃ) বলেন, 'তোমরা তোমাদের পিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না (অর্থাৎ তাকে অস্বীকার করো না)। কারণ যে লোক নিজের পিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় (অর্থাৎ পিতাকে অস্বীকার করা) তা কুফরী'।
হাদীছে আরো আছে,
عَنْ أَبِي ذَرِّ رضى الله عنه أَنَّهُ سَمِعَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ : لَيْسَ مِنْ رَجُلِ ادَّعَى لِغَيْرِ أَبِيْهِ وَهُوَ يَعْلَمُهُ إِلَّا كَفَرَ، وَمَنِ ادَّعَى قَوْمًا لَيْسَ لَهُ فِيهِمْ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ -
আবু যার (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি নবী করীম (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছেন, 'কোন লোক যদি নিজ পিতা সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও অন্য কাউকে তার পিতা বলে দাবী করে তবে সে আল্লাহকে অস্বীকার করল। আর যে ব্যক্তি নিজেকে এমন বংশের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দাবী করল যে বংশের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নিল'।
অন্য বর্ণনায় রয়েছে রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি নিজের পিতাকে বাদ দিয়ে অন্য ব্যক্তিকে পিতা বলে পরিচয় দেয়, সে জান্নাতের সুবাসটুকুও পাবে না। অথচ সত্তর বছরের দূরত্ব থেকে জান্নাতের সুবাস পাওয়া যাবে'।১৮২ এসকল হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, পিতা-মাতাকে অস্বীকার করা কবীরা গুনাহ, যার কারণে জান্নাত হারাম হয়ে যাবে। এজন্য পিতা-মাতা যে মর্যাদার অধিকারী হন, যে কর্ম বা যে পেশার হোন তাদেরকে যথাযোগ্য সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করতে হবে এবং তাদের পরিচয় প্রদানে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হওয়া যাবে না।
টিকাঃ
১৬৫. বক্তব্যটি সে যুগের কোন মুমিন পিতা-মাতা ও কাফের পুত্রের কথোপকথনের উদ্ধৃতি বটে। কিন্তু এটি সকল যুগেই সম্ভব।
১৬৬. আবুল লায়ছ সামারকান্দী, তামবীহুল গাফেলীন হা/১৫২, ১/১৩১; মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ সাফারেনী, গেযাউল আলবাব ১/৩৭৩।
১৬৭. তামবীহুল গাফেলীন হা/১৫২, ১/১৩০-১৩১।
১৬৮. আহমাদ মুছতফা দারবীশ, ই'রাবুল কুরআন ৫/৪২১; আব্দুল কাদের বাগদাদী, খিযানাতুল আদাব ১/৭৬।
১৬৯. বায়হাক্বী, আল-মাহাসিন ওয়াল মাসাঈ ১/২৩৫, ১/৬১৪; নাযরাতুন নাঈম ১০/৫০১৬; মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম, উকুকুল ওয়ালিদায়েন ১/৬২।
১৭০. বুখারী হা/৫৯৭৩; মুসলিম হা/৯০; মিশকাত হা/৪৯১৬।
১৭১. আল-আদাবুল মুফরাদ হা/২৮।
১৭২. মাজমু' উল ফাতাওয়া ১১/৪৯২।
১৭৩. আদাবুল মুফরাদ হা/১৭; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩৪৬২; ছহীহুল জামে' হা/৫১১২।
১৭৪. বুখারী হা/২৪০৮; মুসলিম হা/৫৯৩; মিশকাত হা/৪৯১৫।
১৭৫. বুখারী হা/৫৯৭৬; মুসলিম হা/৮৭; ছহীহ আত-তারগীব হা/২৫০৮।
১৭৬. বুখারী হা/৬৯২০; ছহীহ আত-তারগীব হা/১৮৩১; বুলুগুল মারাম হা/১৩৬৬।
১৭৭. আবুদাউদ হা/২৮৭৫; হাকেম হা/৭৬৬৬; ছহীহুল জামে' হা/৪৬০৫।
১৭৮. ইবনু মাজাহ হা/৩৭৬১; ইবনু হিব্বান হা/৫৭৮৫; আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৮৭৪; ছহীহাহ হা/১৪৮৭।
১৭৯. বুখারী হা/৬৭৬৬; মুসলিম হা/৬৩; মিশকাত হা/৩৩১৪।
১৮০. বুখারী হা/৬৭৬৮; মুসলিম হা/৬২; মিশকাত হা/৩৩১৫।
১৮১. বুখারী হা/৩৫০৮; মুসলিম হা/৬১; আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৪৩৩।
১৮২. আহমাদ হা/৬৫৯২; ছহীহুল জামে' হা/৫৯৮৮; ছহীহ আত-তারগীব হা/১৯৮৮।
📄 কতিপয় যরূরী জ্ঞাতব্য
পিতা-মাতার প্রতিদান :
পিতা-মাতা যে কষ্ট করে সন্তান লালন-পালন করেন, তার প্রতিদান কেউ দিতে পারে না। এমনকি মায়ের এক ফোটা দুধের ঋণ পরিশোধ করাও অসম্ভব। গর্ভকালীন একটি দীর্ঘ শ্বাসের বিনিময়ও কোন সন্তান দিতে পারবে না। কিন্তু ভালোর প্রতিদান ভালো কাজ দিয়ে হওয়া উচিৎ। আল্লাহ বলেন, هَلْ جَزَاءُ الْإِحْسَانِ إِلَّا الْإِحْسَانُ 'উত্তম কাজের প্রতিদান উত্তম ছাড়া আর কি হ'তে পারে? (আর-রহমান ৫৫/৬০)।
দাসত্ব বরণকারী পিতাকে মুক্ত করলেও পিতা-মাতার অধিকার আদায় হবে না। যেমন হাদীছে এসেছে,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم: لَا يَجْزِى وَلَدٌ وَالِدَهُ إِلَّا أَنْ يَجِدَهُ مَمْلُوْكًا فَيَشْتَرِيَهُ فَيُعْتِقَهُ -
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, 'সন্তানের পক্ষে তার পিতাকে প্রতিদান দেয়া সম্ভব নয়। তবে সে তাকে দাসরূপে পেয়ে ক্রয় করে দাসত্বমুক্ত করে দিলে তার প্রতিদান হ'তে পারে'।
অন্য হাদীছে এসেছে,
وَعَنْ أَبِي بُرْدَة قَالَ : شَهِدْتُ ابْنَ عُمَرَ رضي الله عنهما وَرَجُلٌ يَمَانِي يَطُوفُ بِالْبَيْتِ قَدْ حَمَلَ أُمَّهُ وَرَاءَ ظَهْرِهِ، يَقُوْلُ : إِنِّي لَهَا بَعِيرُهَا الْمُذَلَّل ... إِنْ أُدْعِرَتْ رِكَابُهَا لَمْ أَذْعَرْ ثُمَّ قَالَ : يَا ابْنَ عُمَرَ أَتَرَانِي جَزَيْتُهَا؟ قَالَ: لَا، وَلَا بِزَفْرَةٍ وَاحِدَةٍ-
আবু বুরদা (রহঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি ইবনে ওমর (রাঃ)-এর সাথে ছিলাম। ইয়েমেনের এক ব্যক্তি তার মাকে তার পিঠে বহন করে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করছিল আর বলছিল, 'আমি তার জন্য তার অনুগত। উটতুল্য। আমি তার পাদানিতে আঘাতপ্রাপ্ত হ'লেও নিরুদ্বেগে তা সহ্য করি'। অতঃপর সে ইবনে ওমর (রাঃ)-কে বলল, আমি কি আমার মাতার প্রতিদান দিতে পেরেছি বলে আপনি মনে করেন? তিনি বলেন, না, তার একটি দীর্ঘশ্বাসের প্রতিদানও হয়নি'।
অন্য বর্ণনায় এসেছে, عَنِ الْحَسَنِ قَالَ: إِنَّ ابْنَ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا رَأَى رَجُلًا يَطُوفُ بِالْبَيْتِ حَامِلًا أُمَّهُ، وَهُوَ يَقُولُ: أَتَرَيْنِي جَزَيْتُكِ يَا أُمَّهُ؟ فَقَالَ ابْنُ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا : أَيْ لُكَعُ وَلَا طَلْقَةً وَاحِدَةً
হাসান হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা ইবনু ওমর (রাঃ) দেখলেন, জনৈক ব্যক্তি তার মাকে কাঁধে নিয়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফকালীন সময়ে বলছে, হে মা! তুমি কি মনে কর আমি তোমার প্রতিদান দিতে পেরেছি? ইবনু ওমর (রাঃ) একথা শুনে বললেন, হে নগণ্য! জন্মের সময়কার একটি কষ্টেরও নয়'।
আরেকটি হাদীছে এসেছে, عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ قَالَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم مَنِ اسْتَعَاذَ باللَّهِ فَأَعِيذُوهُ وَمَنْ سَأَلَ بِاللَّهِ فَأَعْطُوهُ وَمَنْ دَعَاكُمْ فَأَجِيبُوهُ وَمَنْ صَنَعَ إِلَيْكُمْ مَعْرُوفًا فَكَافِئُوهُ فَإِنْ لَمْ تَجِدُوا مَا تُكَافِئُونَهُ فَادْعُوا لَهُ حَتَّى تَرَوْا أَنَّكُمْ قَدْ كَافَأْتُمُوهُ-
আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহর নামে নিরাপত্তা চায়, তাকে নিরাপত্তা দাও। যে ব্যক্তি আল্লাহ্ নামে ভিক্ষা চায়, তাকে দাও। যে ব্যক্তি তোমাদেরকে দাওয়াত করে তার ডাকে সাড়া দাও। যে ব্যক্তি তোমাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে তোমরা তার উত্তম প্রতিদান দাও। প্রতিদান দেয়ার মতো কিছু না পেলে তার জন্য দু'আ করতে থাকো, যতক্ষণ না তোমরা অনুধাবন করতে পারো যে, তোমরা তার প্রতিদান দিতে পেরেছো।
পিতা-মাতার মাঝে দ্বন্দ্ব লাগলে সন্তানের করণীয়:
পিতা-মাতা সন্তানের নিকট সমমর্যাদার অধিকারী। যদিও সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে মা অগ্রাধিকারযোগ্য। বর্তমান অনৈসলামিক সমাজ ব্যবস্থায় দেখা যায় পিতা ও মাতার মধ্যে মনোমালিন্য লেগেই থাকে। এমনকি তারা সন্তানের সামনে উচ্চ ভাষায় পরস্পরকে গালিগালাজ করে এবং হাতাহাতিও করে। আর এর কারণ হ'ল শয়তান স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারলে খুব খুশী হয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, إِنَّ إِبْلِيسَ يَضَعُ عَرْشَهُ عَلَى الْمَاءِ ثُمَّ يَبْعَثُ سَرَايَاهُ فَأَدْنَاهُمْ مِنْهُ مَنْزِلَةً أَعْظَمُهُمْ فِتْنَةٌ يَجِيءُ أَحَدُهُمْ فَيَقُولُ فَعَلْتُ كَذَا وَكَذَا فَيَقُولُ مَا صَنَعْتَ شَيْئًا قَالَ ثُمَّ يَجِيءُ أَحَدُهُمْ فَيَقُولُ مَا تَرَكْتُهُ حَتَّى فَرَّقْتُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ امْرَأَتِهِ قَالَ: فَيُدْنِيهِ مِنْهُ وَيَقُولُ نِعْمَ أَنْتَ
শয়তান সমুদ্রের পানির উপর তার সিংহাসন স্থাপন করে। অতঃপর মানুষের মধ্যে ফিৎনা-ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্য সেখান থেকে তার বাহিনী চারদিকে প্রেরণ করে। এদের মধ্যে সে শয়তনই তার নিকট সর্বাধিক সম্মানিত যে শয়তান মানুষকে সবচেয়ে বেশী ফিৎনায় নিপতিত করতে পারে। তাদের মধ্যে একজন ফিরে এসে বলে, আমি এরূপ এরূপ ফিৎনা মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করেছি। তখন সে (ইবলীস) প্রত্যুত্তরে বলে, তুমি কিছুই করনি। তিনি বলেন, অতঃপর এদের অপর একজন এসে বলে, আমি মানব সন্তানকে ছেড়ে দেইনি, এমনকি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ করে দিয়েছি। তিনি বলেন, শয়তান এ কথা শুনে তাকে নিকটে বসায় আর বলে, তুমিই উত্তম কাজ করেছ। বর্ণনাকারী আ'মাশ বলেন, আমার মনে হয় জাবের (রাঃ) এটাও বলেছেন যে, অতঃপর ইবলীস তার সাথে আলিঙ্গন করে'।
এক্ষেত্রে সন্তানের দায়িত্ব হ'ল নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিষয়গুলো অবলোকন করে উভয়কে নিজেদের ভুলের ব্যাপারে সচেতন করা এবং বুঝিয়ে তাদের মাঝে মীমাংসা করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আর যখন তোমরা কথা বলবে তখন ন্যায় কথা বলবে, তা নিকট জনের বিরুদ্ধে হলেও' (আন'আম ৬/১৫২)। তিনি আরো বলেন, 'হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক আল্লাহ্ জন্য সাক্ষ্যদাতা হিসাবে, যদিও সেটি তোমাদের নিজেদের কিংবা তোমাদের পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে যায়' (নিসা ৪/১৩৫)। এক্ষণে তাদের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়া সদাচরণের অংশ। আল্লাহ তা'আলা বলেন, إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ মুমিনগণ পরস্পরে ভাই ব্যতীত নয়। অতএব তোমাদের দু'ভাইযের মধ্যে সন্ধি করে দাও। আর আল্লাহকে ভয় কর। তাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে' (হুজুরাত ৪৯/১০)। আর মীমাংসা করে দেওয়ার কাজটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি না করলে পিতা-মাতার মাঝে বিচ্ছেদ ঘটতে পারে, যা সন্তানের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক হবে। রাসূল (ছাঃ) মীমাংসা করার গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে বলেন, أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَفْضَلَ مِنْ دَرَجَةِ الصِّيَامِ وَالصَّلَاةِ وَالصَّدَقَةِ، قَالُوا : بَلَى، قَالَ: صَلَاحُ ذَاتِ البَيْنِ، فَإِنَّ فَسَادَ ذَاتِ البَيْنِ هِيَ الْحَالِقَةُ 'আমি তোমাদেরকে (নফল) ছিয়াম, ছালাত ও ছাদাক্বা অপেক্ষাও উত্তম আমলের কথা বলব না? ছাহবীগণ বললেন, অবশ্যই বলুন। তিনি বললেন, বিবদমান দু'ব্যক্তির মাঝে সুসম্পর্ক স্থাপন করা। কেননা পরস্পর সম্পর্ক বিনষ্ট করা হ'ল দ্বীন ধ্বংসকারী বিষয়'। ১৮৮ এছাড়াও সন্তান নিম্নের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে পারে-
১. সন্তান পিতা-মাতার মীমাংসার জন্য দো'আ করবে। আর দো'আ করার জন্য দো'আ কবুলের সময়গুলো বেছে নিবে; সেটি হতে পারে সিজদায়, শেষ রাতে বা ফরয ছালাত শেষে।
২. পিতা ও মাতা উভয় বংশের মধ্য হতে দু'জন বিচারক নিয়োগ করা। যাতে তারা তাদের মাঝের মতপার্থক্য দূর করে সমঝোতায় উপনীত হতে পারে। আর আশা রাখবে আল্লাহ যাতে এদের মাধ্যমে মীমাংসা করে দেন। আল্লাহ বলেন, وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا إِنْ يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّق اللهُ بَيْنَهُمَا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا
'আর যদি তোমরা (স্বামী-স্ত্রী) উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশংকা কর, তাহ'লে স্বামীর পরিবার থেকে একজন ও স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন শালিস নিযুক্ত কর। যদি তারা উভয়ে মীমাংসা চায়, তাহ'লে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে (সম্প্রীতির) তাওফীক দান করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও ভিতর-বাহির সবকিছু অবহিত' (নিসা ৪/৩৫)।
৩. পিতা-মাতা উভয়কে ক্ষমা করার গুরুত্ব ও ফযীলত সম্পর্কে অবহিত করা। যাতে তারা পরস্পরকে ক্ষমা করে পরস্পরের প্রতি সহনশীল ও وَأَنْ تَعْفُوا أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَلَا تَنْسَوُا الْفَضْلَ 1 Raa | R
بَيْنَكُمْ إِنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ অধিক নিকটবর্তী। তোমরা পরস্পরের প্রতি সদাচরণকে ভুলে যেয়ো না (বাক্বারাহ ২/২৩৭)। আল্লাহ আরো বলেন, তারা যেন তাদের মার্জনা করে ও দোষ-ত্রুটি এড়িয়ে যায়। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করেন? বস্তুতঃ আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াবান (নূর ২৪/২২)।
৪. পিতা-মাতাকে সম্পর্ক ছিন্ন করার ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত করবে। অবহিত করবে পরস্পরকে পরিত্যাগ করার ভয়াবহতা সম্পর্কে।
৫. পিতা-মাতাকে পারস্পরিক ভালো ধারণা সম্পর্কে অবহিত করবে। পিতার নিকট মায়ের অনুশোচনা সম্পর্কে অবহিত করবে এবং মায়ের নিকট পিতার অকৃত্রিম ভালো থাকার কথা অবহিত করবে যদিও তা মিথ্যা হয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, لَيْسَ الْكَذَّابُ الَّذِي يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ وَيَقُولُ خَيْرًا وَيَنْمِي خَيْرًا 'সে ব্যক্তি মিথ্যাবাদী নয়, যে মানুষের মধ্যে মীমাংসা করার জন্য (নিজের থেকে) ভালো কথা পৌঁছে দেয় কিংবা ভালো কথা বলে'।
শ্বশুর ও শাশুড়ীর সেবা করার বিধান:
শশুর-শাশুড়ীর খেদমত করা আবশ্যক নয়। তবে স্বামীকে খুশি রাখার জন্য বা স্বামীর সন্তুষ্টির জন্য বৈধ খেদমত করা উত্তম কাজ। অনুরূপ শ্বশুর-শাশুড়ীর কাপড়-চোপড় পরিষ্কার করলে ও তাদের সেবা-যত্ন করলে তাতে অশেষ নেকী অর্জিত হবে। এর ফলে স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি অধিক সন্তুষ্ট থাকবেন। ১৯০ রাসূল (ছাঃ) জনৈক মহিলাকে বলেন, তুমি লক্ষ্য রেখ যে, তুমি তোমার স্বামীর হৃদয়ের কোথায় অবস্থান করছ? কেননা সে তোমার জান্নাত এবং জাহান্নাম'।
পিতা মাতার আদেশে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার বিধান:
আবুদ্দারদা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি শামে (সিরিয়া) তার নিকটে এসে বলল, আমার মা, অন্য বর্ণনায় আমার পিতা বা মাতা (রাবীর সন্দেহ) আমাকে বারবার তাগিদ দিয়ে বিয়ে করালেন। এখন তিনি আমাকে আমার স্ত্রীকে তালাক দানের নির্দেশ দিচ্ছেন। এমতাবস্থায় আমি কি করব? জবাবে আবুদ্দারদা বলেন, আমি তোমাকে স্ত্রী ছাড়তেও বলব না, রাখতেও বলব না। আমি কেবল এতটুকু বলব, যতটুকু আমি রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট থেকে শুনেছি। তিনি বলেছেন, الْوَالِدُ أَوْسَطُ أَبِوْابِ الْجَنَّةِ، فَحَافِظُ إِنْ شِئْتَ أَوْ ضيع 'পিতা হ'লেন জান্নাতের মধ্যম দরজা। এক্ষণে তুমি তা রেখে দিতে পার অথবা বিনষ্ট করতে পার'।
আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, আমার স্ত্রীকে আমি ভালবাসতাম। কিন্তু আমার পিতা তাকে অপসন্দ করতেন। তিনি তাকে তালাক দিতে বলেন। আমি তাতে অস্বীকার করি। তখন বিষয়টি রাসূল (ছাঃ)-কে বলা হ'লে তিনি বলেন, أطعْ أَبَاكَ وَطَلَّقْهَا، فَطَلَّقْتُهَا 'তুমি তোমার পিতার আনুগত্য কর এবং তাকে তালাক দাও। অতঃপর আমি তাকে তালাক দিলাম'।
ঈমানদার ও দূরদর্শী পিতার আদেশ মান্য করা ঈমানদার সন্তানের জন্য অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু পুত্র ও তার স্ত্রী উভয়ে ধার্মিক ও আনুগত্যশীল হ'লে ফাসেক পিতা-মাতার নির্দেশ এক্ষেত্রে মানা যাবে না। একইভাবে সন্তান ছহীহ হাদীছপন্থী হ'লে বিদ'আতী পিতা-মাতার নির্দেশও মানা চলবে না। কারণ সকল ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের বিধান অগ্রাধিকার পাবে।
উপরোক্ত হাদীছদ্বয়ের ভিত্তিতে কেউ কেউ বলে থাকেন যে, পিতা-মাতার কথায় স্ত্রীকে তালাক দিতে হবে। যা শরী'আতসম্মত নয়। কারণ সবাই আল্লাহ্র রাসূল বা ওমর ফারুক নন। সবার নিকট অহি আসে না বা ইলহামও হয় না। ইবনু আব্বাস ও আবুদ্দারদা (রাঃ)-কে পিতা-মাতার আদেশে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হ'লে তারা বলেন,
أَنَا بِالَّذِي آمُرُكَ أَنْ تُطَلَّقَ امْرَأَتَكَ، وَلَا أَنْ تَعُقَّ وَالِدَيْكَ، قَالَ: فَمَا أَصْنَعُ بِهَذِهِ الْمَرْأَةِ؟ قَالَ: ابْرِرْ وَالِدَيْكَ
‘আমি তোমাকে তোমার স্ত্রী তালাক দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারছি না আবার পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়ারও আদেশ করছিনা। প্রশ্নকারী বললেন, তাহ'লে আমি এই নারীর ব্যাপারে কী করব? ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, (স্ত্রীকে রেখেই) পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ কর’।
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ)-কে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল,
إِنَّ أَبِي يَأْمُرُنِي أَنْ أَطَلَّقَ امْرَأَتِي قَالَ: لَا تُطَلِّقْهَا قَالَ: أَلَيْسَ عُمَرُ أَمَرَ ابْنَهُ عَبْدَ اللهِ أَنْ يُطَلِّقَ امْرَأَتَهُ قَالَ حَتَّى يَكُوْنَ أَبُوْكَ مِثْلَ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ -
'আমার পিতা আমার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার জন্য আমাকে আদেশ দিচ্ছেন। (আমি কি করব?) তিনি বললেন, তুমি তালাক দিও না। বর্ণনাকারী বলল, ওমর (রাঃ) কি তার ছেলে আব্দুল্লাহকে স্বীয় স্ত্রীকে তালাক দিতে বলেননি। তিনি বললেন, তোমার পিতা কি ওমরের মত হয়েছেন'? ১৯৫ অর্থাৎ সব পিতা-মাতার আদেশে স্ত্রীকে তালাক দেওয়া যাবে না।
একদিন প্রখ্যাত তাবেঈ আতা (রহঃ)-কে একজন লোক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হ'ল, যার স্ত্রী ও মা রয়েছেন। আর তার মা তার স্ত্রীর প্রতি অসন্তুষ্ট। তিনি বললেন, ،لِيَتَّقِ اللهَ فِي أُمَّهِ وَلِيَصِلْهَا 'সে যেন তার মায়ের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে এবং মায়ের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে'। তাকে বলা হ'ল, সে কি স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিবে? তিনি বললেন, না। তাকে বলা হ'ল, মা যে স্ত্রীকে তালাক দেওয়া ব্যতীত খুশি নন। তিনি বললেন, أَرْضَاهَا اللهُ، امْرَأَتُهُ بِيَدِهِ إِنْ طَلَّقَهَا فَلَا حَرَجَ وَإِنْ حَبَسَهَا فَلَا حَرَجَ، তাকে সন্তুষ্ট না করুন। স্ত্রী তার হাতে রয়েছে, সে যদি তালাক দেয় তাতেও কোন দোষ নেই। আবার না দিলেও কোন দোষ নেই'।
শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ)-কে মায়ের কথায় স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হ'লে তিনি বলেন, لَا يَحِلُّ لَهُ أَنْ يُطَلَّقَهَا، بَلْ يَجِبُ عَلَيْهِ أَنْ يَبَرَّهَا وَلَيْسَ تَطْلِيقُ امْرَأَتِهِ مِنْ بِرِّهَا، দেওয়া হালাল হবে না। বরং তার জন্য আবশ্যক হ'ল মায়ের সাথে সদাচরণ করা। আর স্ত্রীকে তালাক দেওয়া সদাচরণের অন্তর্ভুক্ত নয়'।
প্রখ্যাত তাবেঈ হাসান বছরীকে জিজ্ঞেস করা হ'ল, জনৈক মা তার সন্ত ানকে স্ত্রী তালাক দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন সে কি করবে? তিনি বললেন, لَيْسَ الطَّلَاقُ مِنْ بِرِّهَا فِي شَيْءٍ، অংশ নয়'। ১৯৮ মুছতফা বিন সা'দ রুহায়বানী বলেন, وَلَا تَجِبُ عَلَى ابْنِ طَاعَةُ أَبَوَيْهِ وَلَوْ كَانَا عَدْلَيْنِ فِي طَلَاقِ زَوْجَتِهِ؛ لِأَنَّهُ لَيْسَ مِنْ الْبَرِّ، তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে পিতা-মাতার আনুগত্য করা সন্তানের জন্য আবশ্যক নয়। যদিও তারা ন্যায়পরায়ণ কারণ এটি সদাচরণের অংশ নয়'।
তবে পিতা-মাতা শরী'আতসম্মত কোন কারণে স্ত্রীকে তালাক দিতে বললে তালাক দিতে হবে। যেমন ওমর (রাঃ) তার ছেলে আব্দুল্লাহকে স্ত্রী তালাক দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যেখানে শারঈ কারণ ছিল। ২০০ ইবরাহীম (আঃ) তাঁর ছেলে ইসমাঈল (আঃ)-কে স্ত্রী তালাক দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফলে তিনি তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়েছিলেন। সেখানেও শারঈ কারণ ছিল। ২০১ অতএব স্পষ্ট শারঈ কারণ ছাড়া পিতা-মাতার আদেশে স্ত্রীকে তালাক দেওয়া যাবে না।
অমুসলিম পিতা-মাতাকে দান :
অমুসলিম পিতা-মাতার জন্য মুসলিম সন্তান খরচ করবে। তাদের প্রয়োজনে নগদ অর্থ প্রদান করবে। তবে তাদের যাকাতের মাল থেকে দেওয়া যাবে না। কারণ তারা মুশরিক। আর মুশরিক যাকাতের মালের হকদার নয়। অমুসলিমকে সাধারণ দান-খয়রাত করা যাবে। আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট জনৈক ইহুদী মহিলা ভিক্ষা চাইলে তিনি তাকে ভিক্ষا দেন।
পিতা-মাতা হিসাবেও তাদের যাকাতের মাল দেওয়া যাবে না। যেমনটি মুসলিম পিতা-মাতাকে যাকাতের মাল থেকে দেওয়া যাবে না। কারণ সন্ত ানের জন্য আবশ্যক হ'ল পিতা-মাতার যাবতীয় খরচ বহন করা। ইমাম আবুদাউদ 'অমুসলিমদের উপর ছাদাক্বাহ করার বিধান' অনুচ্ছেদ রচনা করে আসমা বর্ণিত হাদীছটি বর্ণনা করেন। ২০০ আসমা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত,
قَدِمَتْ عَلَى أُمِّى رَاغِبَةً فِي عَهْدِ قُرَيْشٍ وَهِيَ رَاغِمَةٌ مُشْرِكَةٌ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أُمِّى قَدِمَتْ عَلَى وَهِيَ رَاغِمَةٌ مُشْرِكَةٌ أَفَأَصِلُهَا قَالَ : نَعَمْ فَصِلِي أُمَّكِ 'আমার মাতা, যিনি ইসলামের প্রতি বৈরী ও কুরাইশদের ধর্মের অনুরাগী ছিলেন (কুরাইশদের সাথে হোদায়বিয়ার সন্ধির সময়) আমার নিকট আগমন করেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমার মাতা আমার নিকট এসেছেন, কিন্তু তিনি ইসলাম বৈরী মুশরিক। এখন (আত্মীয়তার বন্ধন হেতু) আমি কি তাকে কিছু দান করার মাধ্যমে সম্পর্ক রক্ষা করব? তিনি বলেন, হ্যাঁ, তুমি তোমার মাতার সাথে সুম্পর্ক বজায় রাখ'।
অমুসলিম পিতা-মাতার হেদায়াতের জন্য দো'আ :
সাধারণভাবে অমুসলিমদের হেদায়াতের জন্য দো'আ করা কর্তব্য। রাসূল (ছাঃ) আবু জাহল বা ওমরের হেদায়াতের জন্য, আবু হুরায়রার মায়ের হেদায়াতের জন্য, দাউস সম্প্রদায়ের হেদায়াতের জন্য, ছাক্বীফ গোত্রের হেদায়াতের জন্য এবং ইহুদী খৃষ্টানদের হেদায়াতের জন্য দো'আ করেছিলেন'। ২০৫ কারণ কারো দাওয়াতের মাধ্যমে বা দো'আর মাধ্যমে কেউ হেদায়াত হ'লে সেটি লাল উট কুরবানী করা অপেক্ষা উত্তম'। ২০৬ আর পিতা-মাতা সবচেয়ে কাছের মানুষ। কাজেই পিতা-মাতা অমুসলিম থেকে জাহান্নামে যাবে এটি কোন সন্তানের কাম্য নয়। সেজন্য অমুসলিম পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের পাশাপাশি তাদের হেদায়াতের জন্য আল্লাহ্র নিকট খালেছ অন্তরে দো'আ করতে হবে।
আবু কাছীর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, আমি আমার মাকে ইসলামের প্রতি আহবান জানাতাম, তখন তিনি মুশরিক ছিলেন। একদিন আমি তাকে ইসলাম কবুলের জন্য আহবান জানালাম। তখন তিনি রাসূল (ছাঃ) সম্পর্কে আমাকে এমন এক কথা শোনালেন যা আমার কাছে খুবই অপ্রিয় ছিল। আমি কাঁদতে কাঁদতে রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে এলাম। আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি আমার মাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে আসছিলাম। আর তিনি অস্বীকার করে আসছিলেন। এরপর আমি তাকে আজ দাওয়াত দেওয়াতে তিনি আমাকে আপনার সম্পর্কে এমন কথা শোনালেন, যা আমি পসন্দ করি না। সুতরাং আপনি আল্লাহ্র কাছে দো'আ করুন যেন তিনি আবু হুরায়রার মাকে হেদায়াত দান করেন। তখন আল্লাহ্র রাসূল বললেন, اللَّهُمَّ اهْدِ أُمَّ أَبِي هُرَيْرَةَ 'হে আল্লাহ্! আবু হুরায়রার মাকে হেদায়াত দান কর'। নবী করীম (ছাঃ)-এর দো'আর কারণে আমি খুশি মনে বেরিয়ে এলাম। যখন আমি (ঘরের) দরজায় পৌঁছলাম তখন তা বন্ধ দেখতে পেলাম। আমার মা আমার পায়ের আওয়াজ শুনতে পেলেন। তিনি বললেন, আবু হুরায়রা! একটু দাঁড়াও (থাম)। তখন আমি পানির কলকল শব্দ শুনছিলাম। তিনি বলেন, এরপর তিনি (আমার মা) গোসল করলেন এবং গায়ে চাদর পরলেন। আর তড়িঘড়ি করে দোপাট্টা ও ওড়না জড়িয়ে নিলেন, এরপর ঘরের দরজা খুলে দিলেন। এরপর বললেন, 'হে আবু হুরায়রা! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই, আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল'। তিনি বলেন, তখন আমি রাসূল (ছাঃ)-এর খিদমতে রওনা হ'লাম। এরপর তাঁর কাছে গেলাম এবং আমি তখন আনন্দে কাঁদছিলাম। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! সুসংবাদ গ্রহন করুন। আল্লাহ্ আপনার দো'আ কবুল করেছেন এবং আবু হুরায়রার মাকে হিদায়াত দান করেছেন। তখন তিনি আল্লাহ্ শুকরিয়া আদায় করলেন ও তাঁর প্রশংসা করলেন এবং ভাল ভাল (কথা) বললেন। তিনি বলেন, এরপর আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি আল্লাহ্ কাছে দো'আ করুন, তিনি যেন আমাকে এবং আমার মাকে মুমিন বান্দাদের কাছে প্রিয় করেন এবং তাদের ভালোবাসা আমাদের অন্তরে বদ্ধমূল করে দেন। তিনি (বর্ণনাকারী) বলেন, এরপর রাসূল (ছাঃ) বললেন, اللَّهُمَّ حَتَّبْ عُبَيْدَكَ هَذَا، يَعْني أَبَا هُرَيْرَةَ وَأُمَّهُ إِلَى عِبَادِكَ الْمُؤْمِنِينَ وَحَبِّبْ إِلَيْهِمُ الْمُؤْمِنِينَ 'হে আল্লাহ্! তোমার এই বান্দা (আবু হুরায়রা)-কে এবং তাঁর মাকে মুমিন বান্দাদের কাছে প্রিয়ভাজন করে দাও এবং তাদের কাছেও মুমিন বান্দাদের প্রিয় করে দাও'। এরপর এমন কোন মুমিন বান্দা সৃষ্টি হয়নি, যে আমার কথা শুনেছে অথবা আমাকে দেখেছে অথচ আমাকে ভালবাসেনি'।
অমুসলিম পিতা-মাতার কবর যিয়ারত :
অমুসলিম পিতা-মাতার কবর যিয়ারত করা জায়েয। কারণ তারা অমুসলিম হ'লেও জন্মদাতা পিতা ও মাতা। সেজন্য ইসলামী শরী'আত মুশরিক পিতা-মাতার কবর যিয়ারতের অনুমতি দিয়েছে। এতে তাদের উপকার হবে না। কিন্তু যিয়ারতকারীর উপকার হ'তে পারে। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, زَارَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم قَبْرَ أُمِّهِ فَبَكَى وَأَبْكَى مَنْ حَوْلَهُ فَقَالَ : اسْتَأْذَنْتُ رَبِّي فِي أَنْ أَسْتَغْفِرَ لَهَا فَلَمْ يُؤْذَنْ لِي وَاسْتَأْذَنْتُهُ فِي أَنْ أزُورَ قَبْرَهَا فَأُذِنَ لِى فَزُورُوا الْقُبُورَ فَإِنَّهَا تُذَكِّرُ الْمَوْتَ (218)
নবী (ছাঃ) তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করতে গেলেন। তিনি কাঁদলেন এবং আশেপাশের সবাইকে কাঁদালেন। তিনি বললেন, আমি আমার প্রভুর নিকট মায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি চাইলাম। কিন্তু আমাকে অনুমতি দেয়া হ'ল না। তখন আমি তার কবর যিয়ারত করার জন্য অনুমতি চাইলে আমাকে অনুমতি দেয়া হ'ল। অতএব তোমরা কবর যিয়ারত কর। কারণ কবর যিয়ারাত মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়'।
অমুসলিম পিতা-মাতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা:
অমুসলিম পিতা-মাতা মৃত্যু বরণ করার পর তাদের ক্ষমার জন্য দো'আ করা যাবে না। কারণ তারা নিশ্চিত জাহান্নামী। আর বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরে তাদের জন্য দো'আ করে কোন লাভ হবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَوْ مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ কَانُوا أُولِي قُرْبَى مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ
নবী ও মুমিনদের উচিত নয় মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা যদিও তারা নিকটাত্মীয় হয়, একথা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর যে তারা জাহান্নামের অধিবাসী (তাওবাহ ৯/১১৩)। ২০৯ আলী (রাঃ) বলেন, سَمِعْتُ رَجُلًا يَسْتَغْفِرُ لِأَبَوَيْهِ وَهُمَا مُشْرِكَانِ فَقُلْتُ لَهُ أَتَسْتَغْفِرُ لِأَبَوَيْكَ وَهُمَا مُشْرِكَانِ. فَقَالَ أَوْلَيْسَ اسْتَغْفَرَ إِبْرَاهِيمُ لأَبَيْهِ وَهُوَ مُشْرِكٌ فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَتَزَلَتْ مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ
এক ব্যক্তিকে তার (মৃত) মুশরিক পিতা-মাতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে শুনলাম। আমি তাকে বললাম, তোমার মৃত পিতা-মাতার জন্য কি তুমি ক্ষমা প্রার্থনা করছ, অথচ তারা ছিল মুশরিক? সে বলল, ইবরাহীম (আঃ) কি তাঁর পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেননি, অথচ তার পিতা ছিল মুশরিক? আমি বিষয়টি নবী (ছাঃ)-এর নিকট উল্লেখ করলাম। তখন নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় 'নবী ও ঈমানদার লোকদের পক্ষে শোভনীয় নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে, তারা তাদের আত্মীয়-স্বজনই হৌক না কেন'।
উল্লেখ্য যে, ইবরাহীম (আঃ) ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন তার ওয়াদা পূরণের জন্য। তিনি পিতার নিকট বলেছিলেন যে, আমি তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। তাছাড়া তার দো'আ কবুল হয়নি। কারণ তার পিতা ছিল মুশরিক। وَمَا كَانَ اسْتِغْفَارُ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ إِلَّا عَنْ مَوْعِدَةٍ وَعَدَهَا إِيَّاهُ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ أَنَّهُ عَدُوٌّ لِلَّهِ تَبَرَّاً مِنْهُ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَأَوَّاهُ حَلِيمٌ আর পিতার জন্য ইবরাহীমের ক্ষমা প্রার্থনা ছিল কেবল সেই ওয়াদার কারণে যা সে তার পিতার সাথে করেছিল। অতঃপর যখন তার নিকট পরিষ্কার হয়ে গেল সে আল্লাহর শত্রু, তখন সে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল। নিশ্চয়ই ইবরাহীম ছিল বড়ই কোমল হৃদয় ও সহনশীল' (তাওবাহ ৯/১১৪)।
يَلْقَى إِبْرَاهِيمُ أَبَاهُ آزَرَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَعَلَى وَجْهِ آزَرَ قَتَرَةٌ وَغَبَرَةٌ، فَيَقُولُ لَهُ إِبْرَاهِيمُ أَلَمْ أَقُلْ لَكَ لا تَعْصِنِي فَيَقُولُ أَبُوهُ فَالْيَوْمَ لَا أَعْصِيكَ. فَيَقُولُ إِبْرَاهِيمُ يَا رَبِّ، إِنَّكَ وَعَدْتَنى أَنْ لَا تُخْزِيَنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ فَأَيُّ خِزْيِ أَخْرَى مِنْ أَبِي الأَبْعَدِ فَيَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى إِنِّي حَرَّمْتُ الْجَنَّةَ عَلَى الْكَافِرِينَ، ثُمَّ يُقَالُ يَا إِبْرَاهِيمُ مَا تَحْتَ رِجْلَيْكَ فَيَنْظُرُ فَإِذَا هُوَ بِدِيجٍ مُلْتَطِحْ، فَيُؤْخَذُ بِقَوَائِمِهِ فَيُلْقَى فِي النَّارِ
'কিয়ামতের দিন ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতা আযরের সাক্ষাৎ লাভ করবেন। আযরের মুখমণ্ডল মলীন ধুলা থাকবে। তখন ইবরাহীম (আঃ) তাকে বলবেন, আমি কি পৃথিবীতে আপনাকে বলিনি যে, আমার অবাধ্যতা করবেন না? তখন তাঁর পিতা বলবে, আজ আর তোমার অবাধ্যতা করব না। এরপর ইব্রাহীম (আঃ) (আল্লাহ্র কাছে) আবেদন করবেন, হে আমার রব! আপনি আমার সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, হাশরের দিন আপনি আমাকে লজ্জিত করবেন না। আমার পিতা রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার চেয়ে অধিক অপমান আমার জন্য আর কি হ'তে পারে? তখন আল্লাহ বলবেন, আমি কাফিরদের জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছি। পুনরায় বলা হবে, হে ইব্রাহীম! তোমার পদতলে কি? তখন তিনি নিচের দিকে তাকাবেন। হঠাৎ দেখতে পাবেন তাঁর পিতার স্থানে সর্বশরীরে রক্তমাখা একটি জানোয়ার পড়ে রয়েছে। এর চার পা বেঁধে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে'।
উপরোল্লেখিত ঘটনার অন্তরালে বেশ কিছু তাৎপর্য রয়েছে। তার মধ্যে একটি হল, আল্লাহ তা'আলার ভয় এবং তাঁর হুকুম-আহকামের প্রতি যাদের নিষ্ঠা থাকে না, তাদের দ্বারা দুনিয়ায় অন্য অধিকার রক্ষা ও নিষ্ঠা আশা করা যায় না। ইহজগতে মানবগোষ্ঠী সমাজের রীতি-নীতি কিংবা রাষ্ট্রের আইন-কানূন থেকে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে বহু পন্থা আবিষ্কার করে। কিন্তু মহান আল্লাহ্ আইন-কানুনের কাছে সেগুলো ধরা পড়ে যায়। তাই পিতা-পুত্রের মত নিবিড় সম্পর্কযুক্ত আপনজনের ক্ষেত্রেও কোন আপোষ-মীমাংসা করা সম্ভব হয়নি এবং কাফের পুত্রের সঙ্গে পবিত্র পিতার মিলিত হওয়া, মহান আল্লাহ তা'আলা অনুমোদন করেননি। বরং পিতাকে এমন ভাষায় সতর্ক করে দেন, যা ভবিষ্যত মুসলিম জাতির জন্য এক মহাস্মারক। আনাস (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, : أَنَّ رَجُلاً قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيْنَ أَبِي قَالَ فِي النَّارِ. فَلَمَّا قَفَّى دَعَاهُ فَقَالَ: إِنَّ أَبِي وَأَبَاكَ فِي النَّارِ
জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, হে আল্লাহ্র রসূল! আমার (মৃত) পিতা কোথায় (জান্নাতে না জাহান্নামে)? তিনি বললেন, জাহান্নামে। অতঃপর সে যখন (মন খারাপ করে) ফিরে যেতে উদ্যত হল, তখন তিনি তাকে ডেকে বললেন, 'আমার পিতা এবং তোমার পিতা উভয়ে জাহান্নামে'। ২১২ অন্য হাদীছে এসেছে, আবু রাযীন (রাঃ) বলেন, قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيْنَ أُمِّى قَالَ : أُمُّكَ فِي النَّارِ. قَالَ قُلْتُ: فَأَيْنَ مَنْ مَضَى مِنْ أَهْلِكَ، قَالَ : أَمَا تَرْضَى أَنْ تَكُوْنَ أُمُّكَ مَعَ أُمِّي 'আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমার (মৃত) মাতা কোথায় (জান্নাতে না জাহান্নামে)? তিনি বললেন, তোমার মা জাহান্নামে। আমি বললাম, আপনার পরিবারের যারা পূর্বে মারা গেছে তারা কোথায়? তখন তিনি তাকে বললেন, 'তুমি কি এতে খুশি নও যে, তোমার মা আমার মায়ের সাথে থাকবে'।
আবু তালেব মারা গেলে রাসূল (ছাঃ) বলেন, আমাকে নিষেধ না করা পর্যন্ত আমি আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। তখন আল্লাহ তা'আলা নাযিল করলেন, مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ، إِنَّكَ لَا تَهْدِي .مَنْ أَحْبَبْتَ 'নবী ও মুমিনদের উচিত নয় মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা' (তওবা ৯/১১৩) ও 'নিশ্চয়ই তুমি হেদায়াত করতে পারো না যাকে তুমি ভালবাস' (ক্বাছাছ ২৮/৫৬)
অমুসলিম পিতা-মাতাকে দাফন:
অমুসলিম পিতা-মাতা মারা গেলে তাদের দাফনের ব্যবস্থা করা সন্তানের অন্যতম দায়িত্ব। তবে মুসলিম সন্তান তার অমুসলিম পিতা-মাতাকে গোসল দিবে না, কাফনের কাপড় পরাবে না, তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে না ও জানাযার ছালাতের ব্যবস্থা করবে না। ২১৫ আলী (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন,
لَمَّا تُوُفِّيَ أَبُو طَالِب أَتَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَقُلْتُ إِنَّ عَمَّكَ الشَّيْخَ قَدْ مَاتَ . قَالَ : اذْهَبْ فَوَارِهِ ثُمَّ لاَ تُحْدِثُ شَيْئًا حَتَّى تَأْتِيَنِي. قَالَ فَوَارَيْتُهُ ثُمَّ أَتَيْتُهُ قَالَ : اذْهَبْ فَاغْتَسِلْ ثُمَّ لَا تُحْدِثُ شَيْئاً حَتَّى تَأْتِيَنِي. قَالَ فَاغْتَسَلْتُ ثُمَّ أَتَيْتُهُ قَالَ فَدَعَا لِي بِدَعَوَاتِ مَا يَسُرُّنِي أَنَّ لِي بِهَا حُمْرَ النَّعَمِ - وَسُودَهَا 'আবু তালিব মারা গেলে আমি নবী (ছাঃ)-এর নিকট গিয়ে বললাম, আপনার বৃদ্ধ চাচা মারা গেছেন। তিনি বললেন, তুমি গিয়ে তাকে দাফন করে এসো। আর এর মধ্যে কাউকে কিছু বলবে না বা কিছু ঘটাবে না। তিনি বলেন, আমি তাকে দাফন করে তাঁর নিকট আসলে তিনি বললেন, গোসল করে এসো। আর এর মধ্যে কাউকে কিছু বলবে না বা কিছু ঘটাবে না। অতঃপর গোসল করে তাঁর নিকট আসলে তিনি এমন কিছু দো'আ করে দিলেন যা লাল ও কালো উট অপেক্ষা উত্তম ছিল'।
টিকাঃ
১৮৩. মুসলিম হা/১৫১০; আল-আদাবুল মুফরাদ হা/১০; মিশকাত হা/৩৩৯১।
১৮৪. আল-আদাবুল মুফরাদ হা/১১; আল-আছারুছ ছহীহাহ হা/১৯৯।
১৮৫. ফাকেহী, আখবারে মাক্কাহ হা/৬১৫; মারওয়াযী, আল বিরু ওয়াছ ছিলাহ হা/৩৮, সনদ ছহীহ।
১৮৬. আবুদাউদ হা/১৬৭২; আহমাদ হা/৫৭৪৩; ছহীহুত তারগীব হা/৮৫২।
১৮৭. মুসলিম হা/২৮১৩; মিশকাত হা/৭১।
১৮৮. তিরমিযী হা/২৫০৯; মিশকাত হা/৫০৩৮; ছহীহুত তারগীব হা/২৮১৪।
১৮৯. বুখারী হা/২৬৯২; মুসলিম হা/২৬০৫; মিশকাত হা/৪৮২৫।
১৯০. ফাতাওয়া লাজনা দায়েমাহ ১৯/২৬৪-২৬৫।
১৯১. আহমাদ হা/১৯০২৫; ছহীহাহ হা/২৬১২।
১৯২. শারহুস সুন্নাহ হা/৩৪২১; আহমাদ হা/২৭৫৫১; তিরমিযী হা/১৯০০; ইবনু মাজাহ হা/২০৮৯; মিশকাত হা/৪৯২৮; ছহীহাহ হা/৯১৪।
১৯৩. হাকেম হা/২৭৯৮; ছহীহ ইবনু হিব্বান হা/৪২৬; ছহীহাহ হা/৯১৯।
১৯৪. ইবনু আবী শায়বাহ হা/১৯০৫৯, ১৯০৬০; হাকেম হা/২৭৯৯; ছহীহুত তারগীব হা/২৪৮৬, ইবনু আব্বাস বর্ণিত হাদীছটি হাসান ও আবুদ্দারদা বর্ণিত হাদীছটি ছহীহ।
১৯৫. মুহাম্মাদ ইবনু মুফলেহ, আল-আদাবুশ শারঈয়া ১/৪৪৭।
১৯৬. মারওয়াযী, আল-বিরু ওয়াছ ছিলাহ হা/৫৮, সনদ হাসান।
১৯৭. মাজমূ'উল ফাতাওয়া ৩৩/১১২।
১৯৮. মারওয়াযী, আল-বিরু ওয়াছ ছিলাহ ৫৬ পৃঃ।
১৯৯. মাতালিবু উলিল নুহা ফী শারহি গায়াতিল মুনতাহা ৫/৩২০।
২০০. হাকেম হা/২৭৯৮; ছহীহ ইবনু হিব্বان হা/৪২৬; ছহীহাহ হা/৯১৯।
২০১. বুখারী হা/৩৩৬৪।
২০২. বুখারী হা/১০৪৯; মুসলিম হা/৯০০; মিশকাত হা/১২৮।
২০৩. দলীলুল ফালেহীন লি তুরুকে রিয়াযুছ ছালেহীন ৩/১৬২।
২০৪. আবুদাউদ হা/১৬৬৮; ছহীহ তারগীব হা/২৫০০; মিরকাত হা/৪৯১৩-এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।
২০৫. বুখারী হা/২৯৩৭; মুসলিম হা/২৪৯১; আহমাদ হা/১৪৭৪৩; আবুদাউদ হা/৫৩৮; তিরমিযী হা/৩৯৪২; মিশকাত হা/৪৭৪০, ৫৯৮৬।
২০৬. বুখারী হা/২৯৪২; আবুদাউদ হা/৩৬৬১।
২০৭. মুসলিম হা/২৪৯১; মিশকাত হা/৫৮৯৫।
২০৮. মুসলিম হা/৯৭৬; হাকেম হা/১৩৯০; মিশকাত হা/১৭৬৩।
২০৯. অত্র আয়াতে মুশরিকদের ক্ষমা প্রার্থনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যাদের শিরক ও কুফরী স্পষ্ট হয়ে গেছে। জীবিত মুশরিকদের জন্য হেদায়াতের দো'আ করা যেতে পারে। এতে কোন দোষ নেই। কিন্তু মৃত কাফির-মুশরিকের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা বা তাদের নামের আগে শ্রদ্ধাবশতঃ মরহুম-মাগফুর, জান্নাতবাসী বা জান্নাতবাসিনী ইত্যাদি দো'আ সূচক শব্দ ব্যবহার করা যাবে না।
২১০. তওবা ৯/১১৩; হাকেম হা/৩২৮৯; তিরমিযী হা/৩১০১; আহমাদ হা/১০৮৫, সনদ ছহীহ।
২১১. বুখারী হা/৩৩৫০; মিশকাত হা/৫৫৩৮।
২১২. মুসলিম হা/২০৩; আবুদাউদ হা/৪৭১৮।
২১৩. আহমাদ হা/১৬২৩৪; যিলালুল জান্নাহ হা/৬৩৮; মাজমা'উয যাওয়ায়েদ হা/৪৫৬, হায়ছামী বলেন, বর্ণনাকারীরা বিশ্বস্ত। আলবানী বলেন, শাহেদ থাকায় বর্ণনাটি ছহীহ।
২১৪. বুখারী হা/১৩০৭; মুসলিম হা/২৪; আহমাদ হা/২৩২৪।
২১৫. ছহীহাহ হা/১৬১-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য।
২১৬. আহমাদ হা/৮০৭; নাসাঈ হা/১৯০; ছহীহাহ হা/১৬১।