📄 পিতা-মাতার সেবায় জান্নাত লাভ
পিতা-মাতার আদেশ-নিষেধ পালন করলে এবং তাদের আদেশ-নিষেধকে যথাযথভাবে হেফাযত করলে জান্নাত লাভ করা যায়। কারণ তারা সন্তানের জন্য জান্নাতে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। যেমন হাদীছে এসেছে-
عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ أَنَّ رَجُلاً أَتَاهُ فَقَالَ : إِنَّ لِي امْرَأَةً وَإِنَّ أُمِّي تَأْمُرُنِي بِطَلَاقِهَا. قَالَ أَبُو الدَّرْدَاءِ سَمِعْتُ رَسُوْلَ الله صلى الله عليه وسلم يَقُوْلُ : الْوَالِدُ أَوْسَطُ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ فَإِنْ شِئْتَ فَأَضِعْ ذَلِكَ الْبَابَ أَوِ احْفَظْهُ আবুদ্দারদা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি তার নিকটে এসে বলল, আমার স্ত্রী আছে। আর আমার মা আমার স্ত্রীকে তালাক দানের নির্দেশ দিচ্ছেন। এমতাবস্থায় আমি কি করব? জবাবে আবুদ্দারদা বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেছেন, 'পিতা হ'লেন জান্নাতের সর্বোত্তম দরজা। এক্ষণে তুমি তা হেফাযত করতে পার অথবা বিনষ্ট করতে পার'। ৬২ অত্র হাদীছে পিতা দ্বারা জিনস তথা পিতা-মাতা উভয়কে বুঝানো হয়েছে।
টিকাঃ
৬২. আহমাদ হা/২৭৫৫১; তিরমিযী হা/১৯০০; ইবনু মাজাহ হা/২০৮৯; মিশকাত হা/৪৯২৮; ছহীহাহ হা/৯১৪।
৬৩. মিরকাত ৭/৩০৮৯, হা/৪৯২৮-এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।
📄 পিতা-মাতার সেবায় বয়স ও রিযিক বৃদ্ধি পায়
পিতা-মাতার খিদমত করলে আল্লাহ বেশী বেশী সৎ আমল করার সুযোগ দেন এবং আয়-রোযগারে বরকত দান করেন। যেমন হাদীছে এসেছে,
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ الله صلى الله عليه وسلم مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُمَدَّ لَهُ فِي عُمْرِهِ وَأَنْ يُزَادَ لَهُ فِي رِزْقِهِ فَلْيَبَرَّ وَالِدَيْهِ وَلْيَصِلْ رَحِمَهُ -
আনাস ইবনু মালেক (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি পসন্দ করে যে, তার আয়ু বৃদ্ধি করা হোক এবং তার জীবিকায় প্রশস্ততা আসুক সে যেন তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করে ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে'। ৬৪ সালমান ফারেসী (রাঃ)-এর বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, لَا يَرُدُّ الْقَضَاءَ إِلَّا الدُّعَاءُ وَلَا يَزِيدُ فِي الْعُمُرِ إِلَّا البر 'তাক্বদীর পরিবর্তন হয় না দো'আ ব্যতীত এবং বয়স বৃদ্ধি হয় না সৎকর্ম ব্যতীত'। ৬৫ অর্থাৎ যেসব বিষয় আল্লাহ দো'আ ব্যতীত পরিবর্তন করেন না, সেগুলি দো'আর ফলে পরিবর্তিত হয়। আর 'সৎকর্মে বয়স বৃদ্ধি পায়' অর্থাৎ ঐ ব্যক্তির আয়ুতে বরকত লাভ হয়। যাতে নির্ধারিত আয়ু সীমার মধ্যে সে বেশী বেশী সৎকাজ করার তাওফীক লাভ করে এবং তা তার আখেরাতে সুফল বয়ে আনে (মিরক্কাত, মির'আত)। কেননা মানুষের রূযী ও আয়ু আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। যাতে কোন কমবেশী হয় না'। ৬৬ অন্য একটি হাদীছে এসেছে, إِنَّ الدُّعَاءَ يَنْفَعُ مِمَّا نَزَلَ وَمِمَّا لَمْ يَنْزِلْ فَعَلَيْكُمْ عِبَادَ الله بالدُّعَاء 'যে বিপদ আপতিত হয়েছে এবং যা এখনও আপতিত হয়নি সবক্ষেত্রেই দো'আ উপকার বয়ে নিয়ে আসে। সুতরাং হে আল্লাহ্ বান্দাগণ! তোমাদের জন্য আবশ্যক হ'ল দো'আ করা'।
টিকাঃ
৬৪. আহমাদ হা/১৩৪২৫; ছহীহ আত-তারগীব হা/২৪৮৮।
৬৫. তিরমিযী হা/২১৩৯; মিশকাত হা/২২৩৩; ছহীহাহ হা/১৫৪।
৬৬. ক্বামার ৫৪/৫২-৫৩; আ'রাফ ৭/৩৪; বুখারী হা/৬৫৯৪; মুসলিম হা/২৬৪৩; মিশকাত হা/৮২ 'তাক্বদীরে বিশ্বাস' অনুচ্ছেদ।
৬৭. তিরমিযী হা/৩৫৪৮; আহমাদ হা/২২০৯৭; ছহীহুল জামে' হা/৩৪০৯; ছহীহ আত-তারগীব হা/১৬৩৪।
📄 পিতা-মাতার সেবা আল্লাহর পথে জিহাদে লিপ্ত থাকার সমতুল্য
মানুষ জীবনে সফল হওয়ার জন্য নানাবিধ চেষ্টা-প্রচেষ্টা করে থাকে। কেউ দুনিয়াতে সফল হয়। আবার কেউ হয় ব্যর্থ। কিন্তু পিতা-মাতার খিদমতে সময় ব্যয় করলে দুনিয়া এবং পরকালে নিশ্চিত সফলতা রয়েছে। তাছাড়া এটি আল্লাহ্ পথে জিহাদের সমতুল্য বলে হাদীছে বিধৃত হয়েছে。
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ : بَيْنَمَا نَحْنُ جُلُوسٌ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذْ طَلَعَ عَلَيْنَا شَابٌ مِنَ الثَّنِيَّةِ فَلَمَّا رَأَيْنَاهُ بِأَبْصَارِنَا قُلْنَا : لَوْ أَنَّ هَذَا الشَّابَ جَعَلَ شَبَابَهُ وَنَشَاطَهُ وَقُوَّتَهُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ قَالَ فَسَمِعَ مَقَالَتَنَا رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم قَالَ : وَمَا سَبيلُ اللَّهِ إِلَّا مَنْ قُتِلَ؟ مَنْ سَعَى عَلَى وَالِدَيْهِ فَفِي سَبيل الله، وَمَنْ سَعَى عَلَى عِيَالِهِ فَفِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَمَنْ سَعَى عَلَى نَفْسِهِ لِيُعِفُّهَا فَفِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَمَنْ سَعَى عَلَى التَّكَاثُرِ فَهُوَ فِي سَبِيْلِ الشَّيْطَانِ -
আবু হুরায়রা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা আমরা রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে বসা ছিলাম। হঠাৎ করে একজন যুবক ছানিয়া (নিম্ন ভূমি) থেকে আগমন করল। তাকে গভীর দৃষ্টিতে অবলোকন করে আমরা বললাম, যদি এই যুবকটি তার যৌবন, উদ্যম ও শক্তি আল্লাহর পথে ব্যয় করত! বর্ণনাকারী বলেন, রাসূল (ছাঃ) আমাদের বক্তব্য শুনে বললেন, কেবল নিহত হ'লেই কি আল্লাহ্ পথ? যে ব্যক্তি পিতা-মাতার খেদমতের চেষ্টা করবে সে আল্লাহ্ পথে রয়েছে। যে পরিবার-পরিজনের জন্য চেষ্টায়রত সে আল্লাহর পথে। যে ব্যক্তি নিজেকে গুনাহ থেকে রক্ষার চেষ্টারত সে আল্লাহ্র পথে। আর যে ব্যক্তি সম্পদের প্রাচুর্যতার জন্য চেষ্টারত সে শয়তানের পথে'।
টিকাঃ
৬৮. মু'জামুল আওসাত্ব হা/৪২১৪; শু'আবুল ঈমান হা/৯৮৯২; ছহীহাহ হা/৩২৪৮।
📄 পিতা-মাতার সাথে নম্র ভাষায় কথায় বলায় জান্নাত লাভ
পিতা-মাতার সাথে এমনভাবে কথা বলতে হবে যাতে তারা কোনভাবেই কষ্ট না পান। আল্লাহ্ নেক বান্দাদের বৈশিষ্ট্য হ'ল তারা বিনয়ের সাথে চলে এবং নম্র ও ভদ্র ভাষায় কথা বলে। বিশেষতঃ পিতা-মাতার সাথে বিনয়ের সাথে কথা বললে জান্নাত লাভ করা যায়। যেমন হাদীছে এসেছে-
عَنْ طَيْسَلَةَ بْنِ مَيَّاسِ قَالَ : كُنْتُ مَعَ النَّجَدَاتِ فَأَصَبْتُ ذُنُوبًا لَا أَرَاهَا إِلَّا مِنَ الْكَبَائِرِ، فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لِابْن عُمَرَ قَالَ: مَا هِيَ؟ قُلْتُ : كَذَا وَكَذَا، قَالَ: لَيْسَتْ هَذِهِ مِنَ الْكَبَائِر ، هُنَّ تِسْعَ : الْإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَقَتْلُ نَسَمَةٍ، وَالْفِرَارُ مِنَ الرَّحْفِ، وَقَذْفُ الْمُحْصَنَةِ، وَأَكْلُ الرِّبَا، وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ، وَالْحَادٌ فِي الْمَسْجِدِ، وَالَّذِي يَسْتَسْخِرُ وَبُكَاءُ الْوَالِدَيْنِ مِنَ الْعُقُوقِ ثُمَّ قَالَ لِي ابْنُ عُمَرَ: أَتَفْرَقُ النَّارَ وَتُحِبُّ أَنْ تَدْخُلَ الْجَنَّةَ؟ قُلْتُ: إِي وَاللَّهُ، قَالَ: أَحَيُّ وَالِدُكَ؟ قُلْتُ: عِنْدِي أُمِّي، قَالَ: فَوَاللَّهِ لَوْ أَلَنْتَ لَهَا الْكَلَامَ، وَأَطْعَمْتَهَا الطَّعَامَ، لَتَدْخُلَنَّ الْجَنَّةَ مَا اجْتَنَبْتَ الْكَبَائِرَ -
তায়সালা ইবনু মাইয়াস (রহঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত ছিলাম। আমি কিছু পাপকাজ করে বসি যা আমার মতে কবীরা গুনাহর শামিল। আমি সেগুলি ইবনু ওমর (রাঃ)-এর কাছে উল্লেখ করলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, তা কি? আমি বললাম, এই এই ব্যাপার। তিনি বলেন, এগুলো কবীরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত নয়। কবীরা গুনাহ নয়টি। (১) আল্লাহ্ সাথে শরীক করা (২) মানুষ হত্যা (৩) জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন (৪) সতী-সাধ্বী নারীর বিরুদ্ধে যেনার মিথ্যা অপবাদ রটানো (৫) সূদ খাওয়া (৬) ইয়াতীমের মাল আত্মসাৎ করা (৭) মসজিদে ধর্মদ্রোহী কাজ করা (৮) ধর্ম নিয়ে উপহাস করা এবং (৯) সন্তানের অসদাচরণ যা পিতা-মাতার কান্নার কারণ হয়। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) আমাকে বলেন, তুমি কি জাহান্নাম থেকে দূরে থাকতে এবং জান্নাতে প্রবেশ করতে চাও? আমি বললাম, আল্লাহর শপথ! আমি তাই চাই। তিনি বলেন, তোমার পিতা-মাতা কি জীবিত আছেন? আমি বললাম, আমার মা জীবিত আছেন। তিনি বলেন, আল্লাহ্র কসম! তুমি তার সাথে নম্র ভাষায় কথা বললে এবং তার ভরণপোষণ করলে তুমি অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে, যদি কবীরা গুনাহসমূহ থেকে বিরত থাক'।
টিকাঃ
৬৯. আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৮, সনদ ছহীহ।