📄 পিতা-মাতার সেবা করার ফযীলত
পিতা-মাতার সেবা করা জিহাদ অপেক্ষা উত্তম:
দ্বীন রক্ষার জন্য অনেক সময় জিহাদে যেতে হয়। আর আল্লাহর পথে জিহাদের ফযীলত কত বেশী তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ এই ফযীলতপূর্ণ আমলের উপর পিতা-মাতার সেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। যেমন হাদীছে এসেছে-
عَنْ عَبْدِ الله بن عمرو رضى الله عنهما يَقُولُ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَاسْتَأْذَنَهُ فِي الْجِهَادِ، فَقَالَ : أَحَى وَالِدَاكَ؟ قَالَ : نَعَمْ. قَالَ: فَفِيهِمَا فَجَاهِدٌ
আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট এসে জিহাদে যাবার অনুমতি প্রার্থনা করল। তখন তিনি বললেন, তোমার পিতা-মাতা কি জীবিত আছেন? সে বলল, হ্যাঁ। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তাহলে তাঁদের খিদমতের চেষ্টা কর'। ৪৮ হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, এর অর্থ হ'ল, 'তোমার পিতা-মাতা জীবিত থাকলে তাদের সেবা ও খিদমতে সর্বোচ্চ চেষ্টা কর। কারণ এটি জিহাদের স্থলাভিষিক্ত হবে' (ফাহুল বারী ১০/৪০৩)।
অন্য হাদীছে এসেছে,
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ قَالَ أَقْبَلَ رَجُلٌ إِلَى نَبِيِّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ : أُبَايِعُكَ عَلَى الْهَجْرَةِ وَالْجِهَادِ أَبْتَغِي الأَجْرَ مِنَ اللَّهُ. قَالَ : فَهَلْ مِنْ وَالِدَيْكَ أَحَدٌ حَيٍّ؟ قَالَ نَعَمْ، بَلْ كِلاَهُمَا، قَالَ : فَتَبْتَغِي الْأَجْرَ مِنَ اللَّهُ. قَالَ : نَعَمْ. قَالَ : فَارْجِعْ إِلَى وَالِدَيْكَ فَأَحْسِنْ صُحْبَتَهُمَا -
আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আছ (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট এসে বলল, আমি আপনার হাতে হিজরত ও জিহাদের জন্য বায়'আত গ্রহণ করব। এতে আমি আল্লাহর কাছে পুরস্কার ও বিনিময় আশা করি। তিনি বললেন, তোমার পিতা-মাতার মধ্যে কেউ জীবিত আছেন কি? সে বলল, হ্যাঁ, বরং উভয়ে জীবিত আছেন। তিনি বললেন, তাহ'লে তুমি আল্লাহ্র কাছে বিনিময় প্রত্যাশা করছ? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহ'লে তুমি তোমার পিতামাতার কাছে ফিরে যাও এবং তাদের দু'জনের সঙ্গে সদাচরণপূর্ণ জীবন যাপন কর'। ৪৯
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আমি তাদের উভয়কে ক্রন্দনরত অবস্থায় ছেড়ে এসেছি। রাসূল (ছাঃ) বললেন, এরপরেও তুমি আল্লাহ্র নিকট পুরস্কার আশা কর? লোকটি বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, 'তুমি তোমার পিতা-মাতার নিকট ফিরে যাও ও সর্বোত্তম সাহচর্য দান কর এবং তাদের কাছেই (খিদমতে) জিহাদ কর'। ৫০ তিনি আরও বলেন, فَارْجِعْ إِلَيْهِمَا فَأَضْحِكُهُمَا ،كَمَا أَبْكَيْتَهُمَا، وَأَبِي أَنْ يُبَايِعَهُ 'তুমি তাদের কাছে ফিরে যাও। অতঃপর তাদেরকে হাসাও, যেমনভাবে তাদেরকে কাঁদিয়েছ। অতঃপর তিনি তার বায়'আত নিতে অস্বীকার করলেন'। ৫১
অন্য হাদীছে এসেছে, عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ : أَنَّ رَجُلاً هَاجَرَ إِلَى رَسُولِ الله صلى الله عليه وسلم مِنَ الْيَمَنِ فَقَالَ : هَلْ لَكَ أَحَدٌ بِالْيَمَنِ؟ قَالَ : أَبْوَايَ. قَالَ : أَذِنَا لَكَ؟ قَالَ : لا . قَالَ : ارْجِعْ إِلَيْهِمَا فَاسْتَأْذِنْهُمَا فَإِنْ أَذِنَا لَكَ فَجَاهِدْ وَإِلَّا فَبِرَّهُمَا আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি ইয়েমেন থেকে হিজরত করে রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট চলে আসলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়েমেনে কি তোমার কেউ আছে? সে বলল, আমার পিতা- মাতা আছেন। তিনি বললেন, তারা তোমাকে অনুমতি দিয়েছেন? সে বলল, না। তিনি বললেন, তুমি তাদের নিকট ফিরে গিয়ে তাদের কাছে অনুমতি প্রার্থনা কর। যদি তারা অনুমতি দেন তাহলে জিহাদে যাও। অন্যথা তাদের সাথে সদাচরণ করো'। ৫২
অন্য একটি আছারে বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ زُرَارَةَ بْنِ أَوْفَى قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى ابْنِ عَبَّاسٍ فَقَالَ: إِنِّي أَرَدْتُ أَنْ أَغْزُوَ الرُّوْمَ، وَإِنَّ أَبَوَيَّ يَمْنَعَانِي قَالَ : أَطِعْ أَبَوَيْكَ، وَاجْلِسْ فَإِنَّ الرُّوْمَ سَتَجِدُ مَنْ يَغْزُوهَا غَيْرَكَ -
যুরারাহ বিন আওফা হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট এসে বলল, আমি রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে চাই। অথচ আমার পিতা-মাতা আমাকে বাধা দেন। তিনি বললেন, পিতা-মাতার অনুগত্য কর এবং অপেক্ষা কর। কেননা খুব শীঘ্রই রোমকরা তুমি ছাড়া এমন ব্যক্তির সাক্ষাৎ লাভ করবে, যে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে'। ৫৩
এর দ্বারা বুঝা যায় যে, পিতা-মাতার সেবা কখনো কখনো জিহাদের চেয়ে উত্তম হয়ে থাকে। জমহুর বিদ্বানের নিকটে সন্তানের উপর জিহাদে যাওয়া হারাম হবে, যদি তাদের মুসলিম পিতা-মাতা উভয়ে কিংবা কোন একজন জিহাদে যেতে নিষেধ করেন। কেননা তাদের সেবা করা সন্তানের জন্য 'ফরযে আইন'। পক্ষান্তরে জিহাদ করা তার জন্য 'ফরযে কিফায়াহ'। যা সে না করলেও অন্য কেউ করবে ইসলামী রাষ্ট্রের আমীরের হুকুমে। ৫৪
পিতা-মাতার সেবা করা অন্যতম নেক আমল:
হাদীছে বিভিন্ন আমলকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। কতগুলো ইবাদত রয়েছে যা আল্লাহর সাথে সংশ্লিষ্ট। আবার কতগুলো ইবাদত রয়েছে যা বান্দার সাথে সংশ্লিষ্ট। বান্দার সাথে সংশ্লিষ্ট ইবাদতগুলোর মধ্যে পিতা-মাতার সাথে সুন্দর আচরণ করা সর্বশ্রেষ্ঠ আমল। যেমন হাদীছে এসেছে-
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ سَأَلْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم أَيُّ الْعَمَل أَحَبُّ إِلَى اللهِ ؟ قَالَ : الصَّلَاةُ عَلَى وَقْتِهَا . قَالَ : ثُمَّ أَيُّ قَالَ : ثُمَّ بِرُّ الْوَالِدَيْنِ. قَالَ : ثُمَّ أَيُّ قَالَ : الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ . قَالَ حَدَّثَنِي بِهِنَّ وَلَوِ اسْتَرَدْتُهُ لَزَادَنِي -
আব্দুল্লাহ্ (ইবনু মাসউদ) (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি আল্লাহ্ রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! কোন আমল সর্বোত্তম? তিনি বললেন, সময়মত ছালাত আদায় করা। আমি বললাম, অতঃপর কোনটি? তিনি বলেন, অতঃপর পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করা। আমি বললাম, অতঃপর কোনটি? তিনি বলেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা। অতঃপর আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-কে আর কিছু জিজ্ঞেস না করে আমি চুপ রইলাম। আমি যদি আরো বলতাম, তবে তিনি আরও অধিক বলতেন'। ৫৫
উল্লেখ্য যে, আল্লাহ্র নিকট প্রিয় কাজের স্থানে কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, এমন আমল যা জান্নাতের নিকটবর্তী করে বা শ্রেষ্ঠ আমলের কথা বলা হয়েছে। ৫৬ অন্য বর্ণনায় এসেছে, আউয়াল ওয়াক্তে ছালাত আদায় করা, এরপর পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করা, এরপর জিহাদে গমন করা'। ৫৭ এর দ্বারা বুঝা যায় যে, পিতা-মাতার সেবা করার স্থান ছালাতের পরে এবং জিহাদে গমন করার উপরে।
পিতা-মাতার সেবায় আল্লাহর সন্তুষ্টি:
সন্তানের নিকট মায়ের যেমন বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, তেমনি পিতারও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। পিতা যদি কোন বৈধ কারণে সন্তানের উপর অসন্তুষ্ট থাকেন, তাহ'লে আল্লাহ তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যান। কারণ একজন সন্ত নিকে আদর্শবান হিসাবে গড়ে তুলতে পিতার আর্থিক ও মানসিক অবদান রয়েছে। যেমন হাদীছে এসেছে,
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ : رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدِ وَسَخَطُ الرَّبِّ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি নবী করীম (ছাঃ) হ'তে বর্ণনা করেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, 'পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি এবং পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহ তা'আলার অসন্তুষ্টি রয়েছে'। ৫৮ অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (ছাঃ) বলেন, طَاعَةُ اللَّهِ طَاعَةُ الْوَالِدِ وَمَعْصِيَةُ اللَّهِ مَعْصِيَةُ الْوَالِدِ 'পিতার আনুগত্যে আল্লাহ্ আনুগত্য রয়েছে এবং পিতার অবাধ্যতায় আল্লাহ্ অবাধ্যতা রয়েছে'। ৫৯ এই হাদীছের ব্যাখ্যায় মোল্লা আলী কারী হানাফী বলেন, মাতাও এর মধ্যে শামিল। বরং মায়ের বিষয়টি আরো গুরুত্ববহ। যেমন অন্য বর্ণনায় এসেছে, رِضَا اللَّهُ فِي رِضَا الْوَالِدَيْنِ وَسَخَطُ اللَّهِ فِي سَخَطِ الْوَالِدَيْنِ 'পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি এবং পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহ্ তা'আলার অসন্তুষ্টি রয়েছে'। ৬০ ব্যাখ্যাকার আল্লামা মানাভী বলেন, আল্লাহ সন্তানকে পিতার আনুগত্য ও তাকে সম্মান করতে আদেশ করেছেন। অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহ্র নির্দেশ বাস্তবায়ন করল সে কার্যতঃ আল্লাহ্র সাথে সুন্দর আচরণ করল এবং তাঁকে সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করল। এতে আল্লাহ্ তার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার আদেশকে অমান্য করবে তিনি তার প্রতি রাগান্বিত হবেন'। ৬১
পিতা-মাতার সেবায় জান্নাত লাভ:
পিতা-মাতার আদেশ-নিষেধ পালন করলে এবং তাদের আদেশ-নিষেধকে যথাযথভাবে হেফাযত করলে জান্নাত লাভ করা যায়। কারণ তারা সন্তানের জন্য জান্নাতে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। যেমন হাদীছে এসেছে-
عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ أَنَّ رَجُلاً أَتَاهُ فَقَالَ : إِنَّ لِي امْرَأَةً وَإِنَّ أُمِّي تَأْمُرُنِي بِطَلَاقِهَا. قَالَ أَبُو الدَّرْدَاءِ سَمِعْتُ رَسُوْلَ الله صلى الله عليه وسلم يَقُوْلُ : الْوَالِدُ أَوْسَطُ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ فَإِنْ شِئْتَ فَأَضِعْ ذَلِكَ الْبَابَ أَوِ احْفَظْهُ
আবুদ্দারদা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি তার নিকটে এসে বলল, আমার স্ত্রী আছে। আর আমার মা আমার স্ত্রীকে তালাক দানের নির্দেশ দিচ্ছেন। এমতাবস্থায় আমি কি করব? জবাবে আবুদ্দারদা বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেছেন, 'পিতা হ'লেন জান্নাতের সর্বোত্তম দরজা। এক্ষণে তুমি তা হেফাযত করতে পার অথবা বিনষ্ট করতে পার'। ৬২ অত্র হাদীছে পিতা দ্বারা জিনস তথা পিতা-মাতা উভয়কে বুঝানো হয়েছে। ৬৩
পিতা-মাতার সেবায় বয়স ও রিযিক বৃদ্ধি পায়:
পিতা-মাতার খিদমত করলে আল্লাহ বেশী বেশী সৎ আমল করার সুযোগ দেন এবং আয়-রোযগারে বরকত দান করেন। যেমন হাদীছে এসেছে,
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ الله صلى الله عليه وسلم مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُمَدَّ لَهُ فِي عُمْرِهِ وَأَنْ يُزَadَ لَهُ فِي رِزْقِهِ فَلْيَبَرَّ وَالِدَيْهِ وَلْيَصِلْ رَحِمَهُ -
আনাস ইবনু মালেক (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি পসন্দ করে যে, তার আয়ু বৃদ্ধি করা হোক এবং তার জীবিকায় প্রশস্ততা আসুক সে যেন তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করে ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে'। ৬৪ সালমান ফারেসী (রাঃ)-এর বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, لَا يَرُدُّ الْقَضَاءَ إِلَّا الدُّعَاءُ وَلَا يَزِيدُ فِي الْعُمُرِ إِلَّا البر 'তাক্বদীর পরিবর্তন হয় না দো'আ ব্যতীত এবং বয়স বৃদ্ধি হয় না সৎকর্ম ব্যতীত'। ৬৫ অর্থাৎ যেসব বিষয় আল্লাহ দো'আ ব্যতীত পরিবর্তন করেন না, সেগুলি দো'আর ফলে পরিবর্তিত হয়। আর 'সৎকর্মে বয়স বৃদ্ধি পায়' অর্থাৎ ঐ ব্যক্তির আয়ুতে বরকত লাভ হয়। যাতে নির্ধারিত আয়ু সীমার মধ্যে সে বেশী বেশী সৎকাজ করার তাওফীক লাভ করে এবং তা তার আখেরাতে সুফল বয়ে আনে (মিরক্কাত, মির'আত)। কেননা মানুষের রূযী ও আয়ু আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। যাতে কোন কমবেশী হয় না'। ৬৬ অন্য একটি হাদীছে এসেছে, إِنَّ الدُّعَاءَ يَنْفَعُ مِمَّا نَزَلَ وَمِمَّا لَمْ يَنْزِلْ فَعَلَيْكُمْ عِبَادَ الله بالدُّعَاء 'যে বিপদ আপতিত হয়েছে এবং যা এখনও আপতিত হয়নি সবক্ষেত্রেই দো'আ উপকার বয়ে নিয়ে আসে। সুতরাং হে আল্লাহ্ বান্দাগণ! তোমাদের জন্য আবশ্যক হ'ল দো'আ করা'। ৬৭
পিতা-মাতার সেবা আল্লাহ্ পথে জিহাদে লিপ্ত থাকার সমতুল্য:
মানুষ জীবনে সফল হওয়ার জন্য নানাবিধ চেষ্টা-প্রচেষ্টা করে থাকে। কেউ দুনিয়াতে সফল হয়। আবার কেউ হয় ব্যর্থ। কিন্তু পিতা-মাতার খিদমতে সময় ব্যয় করলে দুনিয়া এবং পরকালে নিশ্চিত সফলতা রয়েছে। তাছাড়া এটি আল্লাহ্ পথে জিহাদের সমতুল্য বলে হাদীছে বিধৃত হয়েছে。
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ : بَيْنَمَا نَحْنُ جُلُوسٌ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذْ طَلَعَ عَلَيْنَا شَابٌ مِنَ الثَّنِيَّةِ فَلَمَّا رَأَيْنَاهُ بِأَبْصَارِنَا قُلْنَا : لَوْ أَنَّ هَذَا الشَّابَ جَعَلَ شَبَابَهُ وَنَشَاطَهُ وَقُوَّتَهُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ قَالَ فَسَمِعَ مَقَالَتَنَا رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم قَالَ : وَمَا سَبيلُ اللَّهِ إِلَّا مَنْ قُتِلَ؟ مَنْ سَعَى عَلَى وَالِدَيْهِ فَفِي سَبيل الله، وَمَنْ سَعَى عَلَى عِيَالِهِ فَفِي سَبِيلِ اللَّهُ، وَمَنْ سَعَى عَلَى نَفْسِهِ لِيُعِفُّهَا فَفِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَمَنْ سَعَى عَلَى التَّكَاثُرِ فَهُوَ فِي سَبِيْلِ الشَّيْطَانِ -
আবু হুরায়রা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা আমরা রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে বসা ছিলাম। হঠাৎ করে একজন যুবক ছানিয়া (নিম্ন ভূমি) থেকে আগমন করল। তাকে গভীর দৃষ্টিতে অবলোকন করে আমরা বললাম, যদি এই যুবকটি তার যৌবন, উদ্যম ও শক্তি আল্লাহর পথে ব্যয় করত! বর্ণনাকারী বলেন, রাসূল (ছাঃ) আমাদের বক্তব্য শুনে বললেন, কেবল নিহত হ'লেই কি আল্লাহ্ পথ? যে ব্যক্তি পিতা-মাতার খেদমতের চেষ্টা করবে সে আল্লাহ্ পথে রয়েছে। যে পরিবার-পরিজনের জন্য চেষ্টায়রত সে আল্লাহর পথে। যে ব্যক্তি নিজেকে গুনাহ থেকে রক্ষার চেষ্টারত সে আল্লাহ্র পথে। আর যে ব্যক্তি সম্পদের প্রাচুর্যতার জন্য চেষ্টারত সে শয়তানের পথে'। ৬৮
পিতা-মাতার সাথে নম্র ভাষায় কথা বলায় জান্নাত লাভ:
পিতা-মাতার সাথে এমনভাবে কথা বলতে হবে যাতে তারা কোনভাবেই কষ্ট না পান। আল্লাহ্ নেক বান্দাদের বৈশিষ্ট্য হ'ল তারা বিনয়ের সাথে চলে এবং নম্র ও ভদ্র ভাষায় কথা বলে। বিশেষতঃ পিতা-মাতার সাথে বিনয়ের সাথে কথা বললে জান্নাত লাভ করা যায়। যেমন হাদীছে এসেছে-
عَنْ طَيْسَلَةَ بْنِ مَيَّاسِ قَالَ : كُنْتُ مَعَ النَّجَدَاتِ فَأَصَبْتُ ذُنُوبًا لَا أَرَاهَا إِلَّا مِنَ الْكَبَائِرِ، فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لِابْن عُمَرَ قَالَ: مَا هِيَ؟ قُلْتُ : كَذَا وَكَذَا، قَالَ: لَيْسَتْ هَذِهِ مِنَ الْكَبَائِر ، هُنَّ تِسْعَ : الْإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَقَتْلُ نَسَمَةٍ، وَالْفِرَارُ مِنَ الرَّحْفِ، وَقَذْفُ الْمُحْصَنَةِ، وَأَكْلُ الرِّبَا، وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ، وَالْحَادٌ فِي الْمَسْجِدِ، وَالَّذِي يَسْتَسْخِرُ وَبُكَاءُ الْوَالِدَيْنِ مِنَ الْعُقُوقِ ثُمَّ قَالَ لِي ابْنُ عُمَرَ: أَتَفْرَقُ النَّارَ وَتُحِبُّ أَنْ تَدْخُلَ الْجَنَّةَ؟ قُلْتُ: إِي وَاللَّهُ، قَالَ: أَحَيُّ وَالِدُكَ؟ قُلْتُ: عِنْدِي أُمِّي، قَالَ: فَوَاللَّهِ لَوْ أَلَنْتَ لَهَا الْكَلَامَ، وَأَطْعَمْتَهَا الطَّعَامَ، لَتَدْخُلَنَّ الْجَنَّةَ مَا اجْتَنَبْتَ الْكَبَائِرَ -
তায়সালা ইবনু মাইয়াস (রহঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত ছিলাম। আমি কিছু পাপকাজ করে বসি যা আমার মতে কবীরা গুনাহর শামিল। আমি সেগুলি ইবনু ওমর (রাঃ)-এর কাছে উল্লেখ করলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, তা কি? আমি বললাম, এই এই ব্যাপার। তিনি বলেন, এগুলো কবীরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত নয়। কবীরা গুনাহ নয়টি। (১) আল্লাহ্ সাথে শরীক করা (২) মানুষ হত্যা (৩) জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন (৪) সতী-সাধ্বী নারীর বিরুদ্ধে যেনার মিথ্যা অপবাদ রটানো (৫) সূদ খাওয়া (৬) ইয়াতীমের মাল আত্মসাৎ করা (৭) মসজিদে ধর্মদ্রোহী কাজ করা (৮) ধর্ম নিয়ে উপহাস করা এবং (৯) সন্তানের অসদাচরণ যা পিতা-মাতার কান্নার কারণ হয়। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) আমাকে বলেন, তুমি কি জাহান্নام থেকে দূরে থাকতে এবং জান্নাতে প্রবেশ করতে চাও? আমি বললাম, আল্লাহর শপথ! আমি তাই চাই। তিনি বলেন, তোমার পিতা-মাতা কি জীবিত আছেন? আমি বললাম, আমার মা জীবিত আছেন। তিনি বলেন, আল্লাহ্র কসম! তুমি তার সাথে নম্র ভাষায় কথা বললে এবং তার ভরণপোষণ করলে তুমি অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে, যদি কবীরা গুনাহসমূহ থেকে বিরত থাক'। ৬৯
পিতা-মাতার সেবায় দুনিয়ায় বিপদমুক্তি:
পিতা-মাতার সেবা করলে বিপদের সময় আল্লাহ সন্তানকে সাহায্য করেন, দো'আ করলে কবুল করেন এবং বিপদে রক্ষা করেন। যেমন বনী ইস্রাঈলের জনৈক ব্যক্তি পিতা-মাতার সেবা করার কারণে বিপদে সাহায্য প্রাপ্ত হয়েছিল।
আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, পূর্বকালে তিন ব্যক্তি সফরে বের হয়। পথিমধ্যে তারা মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে পতিত হয়। তখন তিনজন একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেয়। হঠাৎ গুহা মুখে একটি বড় পাথর ধ্বসে পড়ে। তাতে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। তিন জন সাধ্যমত চেষ্টা করেও তা সরাতে ব্যর্থ হয়। তখন তারা পরস্পরে বলতে থাকে যে, এই বিপদ থেকে রক্ষার কেউ নেই আল্লাহ ব্যতীত। অতএব তোমরা আল্লাহকে খুশী করার উদ্দেশ্যে জীবনে কোন সৎকর্ম করে থাকলে সেটি সঠিকভাবে বল এবং তার দোহাই দিয়ে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা কর। সম্ভবতঃ তিনি আমাদেরকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করবেন।
তখন একজন বলল, আমার দু'জন বৃদ্ধ পিতা-মাতা ছিলেন এবং আমার ছোট ছোট কয়েকটি শিশু সন্তান ছিল। যাদেরকে আমি প্রতিপালন করতাম। আমি মেষপাল চরিয়ে যখন ফিরে আসতাম, তখন সন্তানদের পূর্বে পিতা- মাতাকে দুধ পান করাতাম। একদিন আমার ফিরতে রাত হয়ে যায়। অতঃপর আমি দুগ্ধ দোহন করি। ইতিমধ্যে পিতা-মাতা ঘুমিয়ে যান। তখন আমি তাদের মাথার নিকট দুধের পাত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, যতক্ষণ না তারা জেগে ওঠেন। এ সময় ক্ষুধায় আমার বাচ্চারা আমার পায়ের নিকট কেঁদে গড়াগড়ি যায়। কিন্তু আমি পিতা-মাতার পূর্বে তাদেরকে পান করাতে চাইনি। এভাবে ফজর হয়ে যায়। অতঃপর তারা ঘুম থেকে উঠেন ও পান করেন। তারপরে বাচ্চাদের পান করাই। اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتُ فَعَلْتُ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ وَجْهَكَ فَفَرِّجْ عَنَّا مَا نَحْنُ فِيْهِ مِنْ هَذِهِ الصَّخْرَةِ 'হে আল্লাহ্! যদি আমি এটা তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি, তাহ'লে তুমি আমাদের থেকে এই পাথর সরিয়ে নাও'! তখন পাথর কিছুটা সরে গেল এবং তারা আকাশ দেখতে পেল।
অতঃপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যক্তি তাদের নিজ নিজ সৎকর্মের কথা উল্লেখ করে বলল, হে আল্লাহ! যদি আমরা এগুলি তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি, তাহ'লে তুমি আমাদের থেকে এই পাথর সরিয়ে নাও'! তখন পাথরের বাকীটুকু সরে গেল এবং আল্লাহ তাদেরকে মুক্তি দান করলেন। ৭০
টিকাঃ
৪৮. বুখারী হা/৩০০৪; মুসলিম হা/২৫৪৯; মিশকাত হা/৩৮১৭।
৪৯. মুসলিম হা/২৫৪৯; ছহীহ আত-তারগীব হা/২৪৮০।
৫০. মুসলিম হা/২৫৪৯; মিশকাত হা/৩৮১৭ (৫-৬)।
৫১. আবুদাউদ হা/২৫২৮; ছহীহ আত-তারগীব হা/২৪৮১।
৫২. আবুদাউদ হা/২৫৩০; আহমাদ হা/১১৭৩৯; ছহীহ আত-তারগীব হা/২৪৮২।
৫৩. ইবনু আবী শায়বাহ হা/৩৩৪৫৯; মারওয়াযী, আল-বিরু ওয়াছ ছিলাহ হা/৭১, সনদ ছহীহ।
৫৪. ত্বাহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার ৫/৫৬৩; খাতাবী, মা'আলিমুস সুনান ৩/৩৭৮।
৫৫. বুখারী হা/২৭৮২; মুসলিম হা/৮৫; মিশকাত হা/৫৬৮।
৫৬. মুসলিম হা/৮৫।
৫৭. তিরমিযী হা/১৭০; আহমাদ হা/২৭১৪৮; মিশকাত হা/৬০৭; ছহীহ আত-তারগীব হা/৩৯৯।
৫৮. তিরমিযী হা/১৮৯৯; মিশকাত হা/৪৯২৭; ছহীহাহ হা/৫১৬।
৫৯. তাবারাণী, মু'জামুল আওসাত্ব হা/২২৫৫; মাজমা'উয যাওয়ায়েদ হা/১৩৩৯১; ছহীহ আত-তারগীব হা/২৫০২।
৬০. শু'আবুল ঈমান হা/৭৮৩০; ছহীহুল জামে' হা/৩৫০৭; ছহীহ আত-তারগীব হা/২৫০৩।
৬১. ফায়যুল বারী হা/৪৪৫৬-এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।
৬২. আহমাদ হা/২৭৫৫১; তিরমিযী হা/১৯০০; ইবনু মাজাহ হা/২০৮৯; মিশকাত হা/৪৯২৮; ছহীহাহ হা/৯১৪।
৬৩. মিরকাত ৭/৩০৮৯, হা/৪৯২৮-এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।
৬৪. আহমাদ হা/১৩৪২৫; ছহীহ আত-তারগীব হা/২৪৮৮।
৬৫. তিরমিযী হা/২১৩৯; মিশকাত হা/২২৩৩; ছহীহাহ হা/১৫৪।
৬৬. ক্বামার ৫৪/৫২-৫৩; আ'রাফ ৭/৩৪; বুখারী হা/৬৫৯৪; মুসলিম হা/২৬৪৩; মিশকাত হা/৮২ 'তাক্বদীরে বিশ্বাস' অনুচ্ছেদ।
৬৭. তিরমিযী হা/৩৫৪৮; আহমাদ হা/২২০৯৭; ছহীহুল জামে' হা/৩৪০৯; ছহীহ আত-তারগীব হা/১৬৩৪।
৬৮. মু'জামুল আওসাত্ব হা/৪২১৪; শু'আবুল ঈমান হা/৯৮৯২; ছহীহাহ হা/৩২৪৮।
৬৯. আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৮, সনদ ছহীহ।
৭০. বুখারী হা/৫৯৭৪, ২৯৭২; মুসলিম হা/২৭৪৩; মিশকাত হা/৪৯৩৮ 'শিষ্টাচার সমূহ' অধ্যায় 'সৎকর্ম ও সদ্ব্যবহার' অনুচ্ছেদ।
📄 পিতা-মাতার সেবা করার কতিপয় উদাহরণ
হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর উদাহরণ:
পিতা মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও ঘৃণা বা অবজ্ঞা না করে বরং অত্যন্ত ভদ্র ভাষায় পিতার সাথে কথা বলায় আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রশংসা করেছেন এবং কুরআনে পিতার সাথে সদ্ব্যবহারের উদাহরণ উপস্থাপন করেছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ يَا أَبَتِ لِمَ تَعْبُدُ مَا لَا يَسْمَعُ وَلَا يُبْصِرُ وَلَا يُغْنِي عَنْكَ شَيْئًا يَا أَبَتِ إِنِّي قَدْ جَاءَنِي مِنَ الْعِلْمِ مَا لَمْ يَأْتِكَ فَاتَّبِعْنِي أَهْدِكَ صِرَاطًا سَوِيًّا - يَا أَبَتِ لَا تَعْبُدِ الشَّيْطَانَ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلرَّحْمَنِ عَصِيًّا يَا أَبَتِ إِنِّي أَخَافُ أَنْ يَمَسَّكَ عَذَابٌ مِنَ الرَّحْمَنِ فَتَكُونَ لِلشَّيْطَانِ وَلِيًّا
'যখন তিনি তার পিতাকে বললেন, হে পিতা! কেন তুমি ঐ বস্তুর পূজা কর যে শোনে না, দেখে না বা তোমার কোন কাজে আসে না? হে আমার পিতা! আমার নিকটে এমন জ্ঞান এসেছে, যা তোমার কাছে আসেনি। অতএব তুমি আমার অনুসরণ কর। আমি তোমাকে সরল পথ দেখাব। হে আমার পিতা! শয়তানের পূজা করো না। নিশ্চয়ই শয়তান হ'ল দয়াময়ের অবাধ্য। হে আমার পিতা! আমার ভয় হয় যে, (এই অবস্থায় যদি তুমি মৃত্যুবরণ কর) দয়াময়ের পক্ষ হ'তে শাস্তি তোমাকে স্পর্শ করবে। আর তখন তুমি শয়তানের সাথী হয়ে পড়বে' (মারিয়াম ১৯/৪২-৪৫)।
হযরত ইয়াহইয়া বিন যাকারিয়া (আঃ)-এর উদাহরণ:
ইয়াহইয়া (আঃ) পিতা-মাতার সাথে সুন্দর আচরণ করতেন। প্রত্যেক নবী-রাসূলই পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করেছেন। তাদের মধ্যে যারা এই সৎ কাজের জন্য বিখ্যাত আল্লাহ কেবল তাদেরই নাম উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা ইয়াহয়া (আঃ)-এর প্রশংসা করে বলেন, وَبَرًّا بِوَالِدَيْهِ وَلَمْ يَكُنْ جَبَّارًا عَصِيًّا 'আর তিনি (ইয়াহ্ইয়া) ছিলেন তার পিতামাতার প্রতি সদাচরণকারী এবং তিনি উদ্ধত ও অবাধ্য ছিলেন না' (মারিয়াম ১৯/১৪)।
অর্থাৎ তিনি পিতা-মাতার অবাধ্যতা করতেন না এবং কাউকে হত্যার মাধ্যমে তাঁর রবেরও অবাধ্যতা করেননি (তাফসীরে দুর্বল মানছুর ৫/৪৮৭)। পবিত্রতা অবলম্বন, তাক্বওয়ার নীতি অবলম্বন ও পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের কারণে আল্লাহ তা'আলা তিন সময়ে তাঁর প্রতি শান্তি বর্ষণ করেন। তার জন্মের সময়, মৃত্যুর সময় ও পুনরুত্থানের সময়। ৭১
হযরত ঈসা (আঃ)-এর উদাহরণ:
ঈসা (আঃ) মায়ের সেবা করতেন। তিনি শিশুকালেই সবার সামনে বলেছিলেন, আল্লাহ আমাকে মায়ের সাথে সদাচরণ করার উপদেশ দিয়েছেন। তিনি এর পরেই বলছেন, আল্লাহ আমাকে অহংকারী ও হতভাগ্য করেননি। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, যার মধ্যে অহংকার রয়েছে, সে পিতা-মাতার সেবা করতে পারবে না। এজন্য আল্লাহ তা'আলা পিতা-মাতার খেদমতকারী হিসাবে ঈসা (আঃ)-এর নাম উল্লেখ করার পর তার অহংকারী না হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ঈসা (আঃ) وَأَوْصَانِي بالصَّلاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا، وَبَرّاً بِوَالِدَتِي وَلَمْ يَجْعَلْنِي جَبَّاراً شَقِيًّا - “তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন ছালাতের ও যাকাতের যতদিন আমি বেঁচে থাকি। (এবং নির্দেশ দিয়েছেন) আমার মায়ের প্রতি অনুগত থাকতে। আর তিনি আমাকে উদ্ধত ও হতভাগ্য করেননি' (মারিয়াম ১৯/৩২)। 'আমার মায়ের প্রতি অনুগত থাকতে' কথার মধ্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, ঈসা বিনা বাপে সৃষ্ট হয়েছিলেন। কুরআনে সর্বত্র 'ঈসা ইবনে মারিয়াম' বলা হয়েছে তার মায়ের দিকে সম্বন্ধ করে। যা অন্য কোন নবীর শানে বলা হয়নি।
হযরত ওছমান বিন আফফান (রাঃ)-এর উদাহরণ:
রাসূল (ছাঃ)-এর জামাতা ও ইসলামের তৃতীয় খলীফা ওছমান (রাঃ) ছিলেন মায়ের প্রতি সীমাহীন সেবাপরায়ণ। যেমন হাদীছে এসেছে, عَنْ عَائِشَةَ رضي الله عنها تَقُولُ : رَجُلانِ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَا أَبَرَّ مَنْ كَانَ فِي هَذِهِ الْأُمَّةِ بِأُمِّهِمَا، فَيُقَالُ لَهَا : مَنْ هُمَا؟ فَتَقُوْلُ : عُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ، وَحَارِثَةُ بْنُ النُّعْمَانِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، فَأَمَّا عُثْمَانُ فَإِنَّهُ قَالَ : مَا قَدَرْتُ أَنْ أَتَأَمَّلَ أُمِّي مُنْذُ أَسْلَمْتُ، وَأَمَّا حَارِثَهُ فَإِنَّهُ كَانَ يُفَلِّي رَأْسَ أُمِّهِ وَيُطْعِمُهَا بَيَدِهِ، وَلَمْ يَسْتَفْهِمْهَا كَلاَمًا قَطُّ تَأْمُرُ بِهِ حَتَّى يَسْأَلَ مَنْ عِنْدِهَا بَعْدَ أَنْ تَخْرُجَ : مَا قَالَتْ أُمِّي؟
আয়েশা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ)-এর দু'জন ছাহাবী ছিলেন যারা এই উম্মতের মধ্যে সর্বাধিক মাতার প্রতি সদাচারী ছিলেন। তাকে বলা হ'ল, তারা কারা? তিনি বললেন, ওছমান বিন আফ্ফান ও হারেছাহ বিন নু'মান (রাঃ)। ওছমান যিনি বলেছেন, আমি ইসলাম গ্রহণের পর আমার মাকে কখনো চিন্তিত করিনি। আর হারেছা, তিনি মায়ের চুল আঁচড়িয়ে দিতেন, নিজ হাতে তাকে খাওয়াতেন এবং তাকে আদেশকৃত কোন কথা বুঝতে না পারলে জিজ্ঞেস করতেন না। বরং তার মা তার নিকট থেকে বের হ'লে মায়ের সাথে থাকা লোকদেরকে জিজ্ঞেস করতেন, আমার মা কি বললেন? ৭২
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর উদাহরণ:
ছাহাবী আবু হুরায়রা (রাঃ) ছিলেন মায়ের সেবাপরায়ণ। তিনি প্রায়ই মায়ের কাছে গিয়ে দেখা করতেন এবং তার জন্য দো'আ করতেন। যেমন হাদীছে এসেছে-
عَنْ أَبِي مُرَّةَ مَوْلَى أُمِّ هَانِي ابْنَةِ أَبِي طَالِب قَالَ: كُنْتُ أَرْكَبُ مَعَ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه إِلَى أَرْضِهِ بِالْعَقِيقِ فَإِذَا دَخَلَ أَرْضَهُ صَاحَ بِأَعْلَى صَوْتِهِ: عَلَيْكِ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ الله وَبَرَكَاتُهُ يَا أُمَّتَاهُ ، تَقُولُ: وَعَلَيْكَ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ، يَقُولُ : رَحِمَكِ اللهُ، رَبَّيْتِنِي صَغِيرًا، فَتَقُولُ: يَا بُنَيَّ، وَأَنْتَ فَجَزَاكَ اللَّهُ خَيْرًا وَرَضِيَ عَنْكَ كَمَا بَرَرْتَنِي كَبِيرًا -
আবু তালিব কন্যা উম্মে হানী (রাঃ)-এর মুক্তদাস আবু মুররা (রহঃ) বলেন, আমি আক্বীকু নামক স্থানে অবস্থিত আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর খামার বাড়ীতে তার সাথে একই বাহনে আরোহণ করে গমন করেছিলাম। তিনি তার বাড়ীতে পৌছে উচ্চস্বরে বলেন, يَا أُمَّاءُ عَلَيْكِ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ 'ওহে জননী! তোমার প্রতি শান্তি, আল্লাহর রহমত ও তার বরকত নাযিল হৌক। তার মা বলেন, তোমার প্রতিও শান্তি, আল্লাহর রহমত ও তার বরকত নাযিল হৌক। আবার আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, ছোটকালে তুমি আমাকে যেভাবে রহমতের সাথে লালন-পালন করেছিলে, আল্লাহ তোমাকে সেভাবে লালন-পালন করুক। তার মা বললেন, হে বৎস! আল্লাহ তোমাকেও উত্তম প্রতিদান দান করুন এবং তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হৌন। যেভাবে তুমি বৃদ্ধকালে আমার সাথে সদাচরণ করছ'।
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) প্রতিদিন তার মাতার কাছে প্রবেশের সময় উক্ত দো'আ পাঠ করতেন এবং তার মাও জওয়াবে দো'আ করে দিতেন'।
অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ يَقُولُ قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ قَالَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم لِلْعَبْدِ الْمَمْلُوكِ الْمُصْلِحِ أَجْرَانِ، وَالَّذِي نَفْسُ أَبِي هُرَيْرَةَ بِيَدِهِ لَوْلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْحَجُّ وَبِرُّ أَمِّى لأَحْبَبْتُ أَنْ أَمُوْتَ وَأَنَا مَمْلُوكَ. قَالَ وَبَلَغَنَا أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ لَمْ يَكُنْ يَحُجُّ حَتَّى مَاتَتْ أُمُّهُ لِصُحْبَتِهَا -
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েব হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ক্রীতদাস সৎ গোলামের জন্যে দু'টি পুরস্কার রয়েছে। সেই মহান আল্লাহর শপথ, যার হাতে আবু হুরায়রার জীবন! যদি আল্লাহর পথে জিহাদ করা, হজ্জ করা এবং আমার মায়ের সেবা করার দায়িত্ব আমার উপরে না থাকত, তাহলে গোলাম অবস্থায় মৃত্যু বরণকেই আমি অধিক পসন্দ করতাম। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা জানতে পেরেছি যে, أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ لَمْ يَكُنْ يَحُجُّ حَتَّى مَاتَتْ أُمُّهُ لِصُحْبَتِهَا
আবু হুরায়রা (রাঃ) হজ্জে গমন করেননি তাঁর মায়ের মৃত্যুর আগে। কেননা তিনি সর্বদা তাঁর সাহচর্যে থেকে সেবা করতেন' (মুসলিম হা/১৬৬৫; শু'আবুল ঈমান হা/৮৬০২)। উল্লেখ্য যে, আবু হুরায়রা (রাঃ) মায়ের সেবা করার কারণে যে হজ্জ থেকে বিরত ছিলেন তা ছিল নফল হজ্জ। কারণ নফল হজ্জ করা অপেক্ষা মায়ের খেদমত করা বেশী গুরুত্বপূর্ণ ও ফরয। তিনি রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে বিদায় হজ্জে অংশগ্রহণ করেছিলেন'। ৭৫
ওসামা বিন যায়েদের উদাহরণ:
তাঁর মায়ের নাম উম্মে আয়মান। তিনি বারাকাহ নামে পরিচিত ছিলেন। রাসূল (ছাঃ) ওসামাকে খুবই ভালবাসতেন। রাসূল (ছাঃ) যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন তার বয়স ছিল বিশ বছর。
كَانَتِ النَّحْلَةُ تَبْلُغُ بِالْمَدِينَةِ أَلْفًا، فَعَمَدَ أَسَامَةُ بْنُ زَيْدٍ إِلَى نَحْلَةٍ فَقَطَعَهَا مِنْ أَجْلِ حُمَّارِهَا ، فَقِيلَ لَهُ فِي ذَلِكَ فَقَالَ: إِنَّ أُمِّي اشْتَهَتْهُ عَلَيَّ، وَلَيْسَ شَيْءٌ مِنَ الدُّنْيَا تَطْلُبُهُ أُمِّي أَقْدِرُ عَلَيْهِ إِلَّا فَعَلْتُهُ،
খেজুর বৃক্ষের মূল্য হাযার দিরহামে পৌঁছে যায়। ওসামা বিন যায়েদ একটি খেজুর গাছ কর্তনের ইচ্ছা করলেন এবং তার ডগায় মাথি থাকার কারণে গাছটি কেটে ফেললেন। তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হ'লে তিনি বলেন, আমার মা তা খাওয়ার কামনা করেছিলেন। আর পৃথিবীতে এমন কিছু নেই যা আমার মা কামনা করার পর আমার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা করব না'। ৭৬
ছাহাবী হারেছা বিন নু'মানের উদাহরণ:
তিনি মায়ের সেবায় নিয়োজিত থাকায় রাসূল (ছাঃ) তাকে জান্নাতে কুরআন তিলাওয়াত করতে শুনেছেন। তিনি তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। যেমন হাদীছে এসেছে,
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ قَالَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم: نمْتُ فَرَأَيْتُنِي فِي الْجَنَّةِ فَسَمِعْتُ صَوْتَ قَارِئ يَقْرَأُ ، فَقُلْتُ : مَنْ هَذَا؟ قَالُوا : هَذَا حَارِثَةُ بْنُ النُّعْمَانِ. فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم: كَذَاكَ الْبِرُّ كَذَاكَ الْبِرُّ، وَكَانَ أَبَرَّ النَّاسِ بِأُمِّهِ -
আয়েশা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেন, আমি ঘুমালাম। তারপর স্বপ্নে আমাকে জান্নাত দেখানো হ'ল। এরপর একজন ক্বারীর তিলাওয়াত শুনতে পেলাম। আমি বললাম, এটা কে? তারা বললেন, ইনি হারেছাহ বিন নু'মান। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, এটিই সদাচরণের পুরস্কার, এটিই সদাচরণের পুরস্কার। আর তিনি মাতার সাথে সর্বাধিক সদাচরণকারী ছিলেন'। ৭৭
ওয়ায়েস কারনী (রহঃ)-এর উদাহরণ:
তিনি মায়ের সেবায় নিয়োজিত থাকার কারণে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারেননি। এজন্য রাসূল (ছাঃ) তার প্রশংসা করেছেন এবং তার সাথে সাক্ষাৎ হ'লে তার নিকট দো'আ চাইতে বলেছেন। হাদীছে এসেছে,
উসায়ের ইবনু জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ওমর ইবনু খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর অভ্যাস ছিল, যখন ইয়েমেনের কোন সাহায্যকারী দল তার কাছে আসত তখন তিনি তাঁদের জিজ্ঞেস করতেন, তোমাদের মধ্যে কি ওয়ায়েস ইবনু আমির আছে? অবশেষে তিনি ওয়ায়েসকে পান। তখন তিনি বললেন, তুমি কি ওয়ায়েস ইবনু আমির? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, মুরাদ গোত্রের কারান বংশের? তিনি বললেন, হ্যাঁ। জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি শ্বেত রোগ ছিল এবং তা নিরাময় হয়েছে, কেবলমাত্র এক দিরহাম স্থান ব্যতীত? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মা কি জীবিত আছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন ওমর (রাঃ) বললেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, 'তোমাদের কাছে মুরাদ গোত্রের কারান বংশের ওয়ায়েস ইবনু আমির ইয়েমেনের সাহায্যকারী দলের সঙ্গে আসবে। তার ছিল শ্বেত রোগ। পরে তা নিরাময় হয়ে গিয়েছে। কেবলমাত্র এক দিরহাম ব্যতীত। তার মা রয়েছেন। সে তাঁর প্রতি অতি সেবাপরায়ণ। এমন ব্যক্তি আল্লাহর নামে কসম করলে আল্লাহ তা পূর্ণ করে দেন। কাজেই যদি তুমি তোমার জন্য তার কাছে মাগফিরাতের দো'আ কামনার সুযোগ পাও তাহ'লে তা করবে। সুতরাং আপনি আমার জন্য মাগফিরাতের দো'আ করুন। তখন ওয়ায়েস (রহঃ) তার মাগফিরাতের জন্য দো'আ করলেন। এরপর ওমর (রাঃ) তাকে বললেন, তুমি কোথায় যেতে চাও? তিনি বললেন, কুফা এলাকায়। ওমর (রাঃ) বললেন, আমি কি তোমার জন্য কুফার গভর্ণরের কাছে চিঠি লিখে দেব? তিনি বললেন, আমি অখ্যাত গরীব লোকদের মধ্যে থাকাই পসন্দ করি। বর্ণনাকারী বলেন, পরবর্তী বছরে তাদের অভিজাত লোকদের মধ্যে এক ব্যক্তি হজ্জ করতে এলে ওমর (রাঃ)-এর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হ'ল।
তখন তিনি তাকে ওয়ায়েস কারনী (রহঃ)-এর অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, আমি তাঁকে জীর্ণ ঘরে সম্পদহীন অবস্থায় রেখে এসেছি। তিনি বললেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন, তোমাদের কাছে কারান বংশের মুরাদ গোত্রের ওয়ায়েস ইবনু আমির (রহঃ) ইয়েমেনের সাহায্যকারীর সেনাদলের সঙ্গে আসবে। তার শ্বেত রোগ ছিল। সে তা থেকে আরোগ্য লাভ করে, এক দিরহাম পরিমাণ স্থান ব্যতীত। তার মা রয়েছেন, সে তার অতি সেবাপরায়ণ। যদি সে আল্লাহ্র নামে কসম খায় তবে আল্লাহ তা'আলা তা পূর্ণ করে দেন। তোমরা নিজের জন্য তাঁর কাছে মাগফিরাতের দো'আ চাওয়ার সুযোগ পেলে তা করবে। পরে অভিজাত সে ব্যক্তি ওয়ায়েস (রহঃ)-এর কাছে এল এবং বলল, আমার জন্য মাগফিরাতের দো'আ করুন। তিনি বললেন, আপনি তো নেক সফর (হজ্জের সফর) থেকে সদ্য আগত। সুতরাং আপনি আমার জন্য মাগফিরাতের দো'আ করুন। সে ব্যক্তি বলল, আপনি আমার জন্য মাগফিরাতের দো'আ করুন। ওয়ায়েস (রহঃ) বললেন, আপনি সদ্য নেক সফর থেকে এসেছেন। আপনি আমার জন্য মাগফিরাতের দো'আ করুন। এরপর তিনি বললেন। আপনি কি ওমর (রাঃ)-এর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন? সে বলল, হ্যাঁ। তখন তিনি তার জন্য মাগফিরাতের দো'আ করলেন। তখন লোকেরা তার (মর্যাদা) সম্পর্কে অবহিত হ'ল। এরপর তিনি যেদিকে মুখ যায় সেদিকে চলে গেলেন (অর্থাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন)। বর্ণনাকারী আসীর বিন জাবের (রহঃ) বলেন, আমি তাকে একখানি ডোরাদার চাদর দিয়েছিলাম। এরপর যখন কোন মানুষ তাকে দেখত তখন বলত, ওয়ায়েসের এই চাদরখানি কোথায় গেল? ৭৮
মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন (রহঃ)-এর উদাহরণ: ৭৯
كَانَ مُحَمَّدُ بْنُ سِيرِينَ إِذَا كَانَ عِنْدَ أُمِّهِ، خَفَضَ مِنْ صَوْتِهِ، وَتَكَلَّمَ رُوَيْدًا 'মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন (৩৩-১১০ হি.) যখন মায়ের নিকট থাকতেন তখন কণ্ঠস্বর নীচু করতেন এবং ধীরে ধীরে কথা বলতেন'। ৮০ অন্য বর্ণনায় রয়েছে, হিশাম বিন হাসান বলেন, مَا رَأَيْتُ مُحَمَّدَ بْنَ سِيرِينَ يُكَلِّمُ أُمَّهُ قَطُّ إِلَّا وَهُوَ يَتَضَرَّعُ - 'আমি কখনো মুহাম্মাদ ইবনু সীরীনকে তার মায়ের সাথে নম্র ভাষায় কথা বলতে দেখিনি'। ৮১
ইবনুল হানাফিয়্যার উদাহরণ: ৮২
সুফিয়ান ছাওরী বলেন, كَانَ ابْنُ الْحَنِيفَةَ يَغْسِلُ رَأْسَ أُمِّهِ بِالْخِطْمِي وَيَمْشُطُهَا، وَيُقَبِّلُهَا، 'ইবনুল হানাফিয়্যা খিতমী ঘাস দ্বারা মায়ের মাথা ধুয়ে দিতেন, চিরুনি করে দিতেন এবং তাকে চুমু দিতেন’। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, মাথায় খিযাব লাগিয়ে দিতেন’।৮৩
যাবইয়ান বিন আলীর উদাহরণ:
যাবইয়ান ইবনু আলী আছ-ছাওরী ছিলেন মায়ের পরম বাধ্যগত। তার ব্যাপারে ইতিহাসে বলা হয়েছে,
وَكَانَ مِنْ أَبَرِّ النَّاسِ بِأُمِّهِ، وَكَانَ يُسَافِرُ بِهَا إِلَى مَكَّةَ، فَإِذَا كَانَ يَوْمٌ حَارٌ حَفَرَ بِفْرًا، ثُمَّ جَاءَ بِنِطَعٍ فَصَبَّ فِيْهِ الْمَاءَ، ثُمَّ يَقُوْلُ لَهَا ادْخُلِي تَبَرَّدِي فِي هَذَا الْمَاءِ
'তিনি মায়ের প্রতি সর্বাধিক সদাচারী ছিলেন। একবার তিনি মাকে নিয়ে মক্কায় গমন করেন। একদা প্রচণ্ড গরম পড়লে তিনি গর্ত খনন করে এক বালতি পানি নিয়ে আসলেন। অতঃপর তাতে পানি ঢাললেন এবং তার মাকে বললেন, এখানে প্রবেশ করে এই পানিতে নিজেকে ঠাণ্ডা করুন'। ৮৪
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর উদাহরণ:
আবু হানীফা (রহঃ) তাঁর মাতার সাথে সদাচরণ করতেন। তিনি তাঁর যাবতীয় অধিকারের প্রতি খেয়াল রাখতেন। তার নিকট উজ্জ্বল চেহারায় প্রবেশ করতেন। তার কথার বিরোধিতা করতেন না। আব্দুল জাব্বার হাযরামী বলেন, যুর'আ নামে একজন বক্তা আমাদের মসজিদে থাকতেন। আবু হানীফার মা একটি ফৎওয়া জানতে চাইলেন। আবু হানীফা (রহঃ) ফৎওয়া দিলে তিনি গ্রহণ না করে বললেন, যুর'আ যে ফৎওয়া দিবেন তাই আমি গ্রহণ করব। আবু হানীফা তাকে নিয়ে যুর'আর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলেন,
هذه أمي تستفتيك في كذا وكذا، فَقَالَ : أنت أعلم مني وأفقه، call فأفتها أنت فقال أبو حنيفة قد أفتيتها بكذا وكذا فقال زُرْعَة القول كما .قَالَ أبو حنيفة، فرضيت وانصرفت 'ইনি আমার মা। এই এই বিষয়ে আপনার নিকট ফৎওয়া জানতে চান। তিনি বললেন, আপনিতো আমার থেকে বড় জ্ঞানী ও ফক্বীহ। আপনিই ফৎওয়া দিন। আবু হানীফা (রহঃ) বললেন, আমি এই এই ফৎওয়া দিয়েছি। তখন যুর'আ সেই ফৎওয়াই দিলেন যা ইমাম আবু হানীফা দিয়েছেন। এতে তার মা খুশি হয়ে ফিরে গেলেন'। ৮৫
আলী বিন হুসাইনের উদাহরণ :
আলী বিন হুসাইন ছিলেন ইসলামের চতুর্থ খলীফা আলী (রাঃ) নাতি। তিনি অধিক ইবাদতগুযার ছিলেন বলে তাকে 'যায়নুল আবেদীন' বা ইবাদতকারীদের শোভা বলা হয়ে থাকে। তিনি ভ্রান্ত শী'আদের রাফেযী নাম দেন。
كَانَ عَلِيُّ بْنُ الْحُسَيْنِ لَا يَأْكُلُ مَعَ أُمِّهِ، وَكَانَ أَبَرَّ النَّاسِ بِهَا، فَقِيلَ لَهُ فِي ذَلِكَ، فَقَالَ: أَخَافُ أَنْ أَكُلَ مَعَهَا فَتَسْبِقُ عَيْنُهَا إِلَى شَيْءٍ مِنَ الطَّعَامِ، وَأَنَا لَا أَعْلَمُ بِهِ فَأَكُلَهُ، فَأَكُونُ قَدْ عَقَقْتُهَا
হুসাইন বিন আলী তাঁর মায়ের সাথে খেতেন না। অথচ তিনি লোকদের মধ্যে মাতা-পিতার প্রতি সর্বাধিক সদাচারী ছিলেন। তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হ'লে তিনি বলেন, আমি তার সাথে খাব আর তার দৃষ্টি খাদ্যের কোন কিছুর দিকে যাবে। আর আমি না জেনেই তা খেয়ে নিব। হতে পারে এতে আমি তার অবাধ্য হয়ে যাব'। ৮৬
হায়াত বিন শুরাইহ্-এর উদাহরণ:
হায়াত বিন শুরাইহ একজন বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী ছিলেন। তিনি তার কর্মের জন্য বিশেষ করে মাতৃসেবার জন্য বিখ্যাত। তিনি মিসরের অধিবাসী ছিলেন। ২২৪ হিজরীতে তাঁর মৃত্যু হয়'। ৮৭ হায়াত বিন শুরাইহ একদিন মজলিসে তার ছাত্রদের পাঠদান করছিলেন। আর তার নিকট বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জ্ঞান অর্জনের জন্য লোকেরা ভিড় করত। তার মা এসে বললেন, قُم يا حيوة فاعلف الدجاج، فيقوم ويترك التعليم 'হে হায়াত! দাঁড়াও এবং মুরগীকে খাবার দাও। তিনি পাঠদান ছেড়ে মায়ের আদেশ পালন করলেন'। ৮৮
ত্বালক বিন হাবীবের উদাহরণ:
তিনি ইরাকের বছরার অধিবাসী ছিলেন। বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী তাবেঈ ও মাতা- পিতার সাথে সদাচরণে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি পরহেযগার ছিলেন। তার কণ্ঠস্বর ছিল সুমধুর'। ৮৯
তিনি ইবাদতগুযার ও আলেমদের অন্যতম ছিলেন। তিনি তার মায়ের মাথায় চুমু দিতেন। তিনি এমন বাড়ির ছাদের উপর দিয়ে হাঁটতেন না যার নীচে তার মা অবস্থান করতেন। এটি তার মায়ের সম্মানের জন্য করতেন'। ৯০
ইয়াস বিন মু'আবিয়ার উদাহরণ:
ইয়াস বিন মু'আবিয়া বছরার কাযী ছিলেন। তিন একাধারে মুহাদ্দিছ, ফক্বীহ ও উপমাবিদ ছিলেন। এই তাবেঈ মায়ের খেদমত করার ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। ১২২ হিজরীতে তিনি মারা যান'। ৯১
لَمَّا مَاتَتْ أُمُّهُ بَكَى عليها فَقِيلَ لَهُ فِي ذَلِكَ فَقَالَ: كَانَ لِي بَابَانِ مَفْتُوحَانِ إِلَى الْجَنَّةِ فَغُلِقَ أَحَدُهُمَا 'ইয়াস বিন মু'আবিয়ার মা মারা গেলে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এ বিষয়ে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি বললেন, 'আমার জন্য জান্নাতের দু'টি দরজা উন্মুক্ত ছিল, যার একটি বন্ধ হয়ে গেল'। ৯২
টিকাঃ
৭১. তাফসীর ইবনু কাছীর ৫/২১৭, সূরা মারিয়াম ১৪-১৫ আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।
৭২. মাকারিমুল আখলাক ১/৭৫, হা/২২৩; ইবনুল জাওযী, আল-বিরু ওয়াছ ছিলাহ হা/৮৬, ১/৮৫।
৭৩. আল-আদাবুল মুফরাদ হা/১৪; মাকারিমুল আখলাক হা/২২৮; মারওয়াযী, আল বির্ষু ওয়াছ ছিলাহ হা/৫০, সনদ হাসান।
৭৪. আল-জামে' ফিল হাদীছ হা/১৫২।
৭৫. নববী, শারহু মুসলিম, অত্র হাদীছের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।
৭৬. ইবনু আবিদ্দুনিয়া, মাকারিমুল আখলাক হা/২২৫, ১/৭৬; ইবনুল জাওযী, আল-মুনতাযাম ফী তারীখিল মুলুক ওয়াল উমাম হা/১২৫, ৫/৩০৭; আল-বিরু ওয়াছ ছিলাহ হা/৮৭; কান্ধালুভী, হায়াতুছ ছাহাবা ৩/২২৪-২২৫; ইবনু সা'দ, আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা ৪/৫২; ইবনু আসাকির, তারীখে দিমাশক ৮/৮২।
৭৭. আহমাদ হা/২৫২২৩; ইবনু হিব্বান হা/৭০১৫; ছহীহাহ হা/৯১৩; মিশকাত হা/৪৯২৬।
৭৮. মুসলিম হা/২৫৪২; হাকেম হা/৫৭১৯।
৭৯. মুহাম্মাদ ইবনু সীরিন আবুবকর আনছারী বাছরী। তিনি ওছমান (রাঃ)-এর খেলাফতের শেষের দিকে বছরায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন রাসূল (ছাঃ)-এর খাদেম আনাস বিন মালেকের মুক্তদাস। তিনি আবু হুরায়রা, ইবনু ওমর, ইবনু আব্বাস, আনাস, ইমরান বিন হুসায়েনসহ অসংখ্য ছাহাবী থেকে হাদীছ বর্ণনা করেন এবং তার থেকে অসংখ্য তাবেঈ হাদীছ বর্ণনা করেন। তিনি ১১০ হিজরীতে হাসান বছরীর মৃত্যুর একশ দিন পর ৭৮ বছর বয়সে বছরায় মৃত্যু বরণ করেন (ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ৯/২৭৪; যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা ৪/৬০৬)।
৮০. ইবনু আবিদ-দুনিয়া, মাকারিমুল আখলাক ১/৭৭, হা/২২৯; ড. সাইয়েদ বিন হুসাইন আল-আফানী, ছালাহুল উম্মাহ ফী উলুবিবল হিম্মাহ ৫/৬৫২।
৮১. হিলইয়াতুল আওলিয়া ২/২৭৩; ড. সাইয়েদ বিন হুসাইন আল-আফানী, ছালাহুল উম্মাহ ফী উলুবিবল হিম্মাহ ৫/৬৫২।
৮২. মুহাম্মদ ইবন আলী (রহঃ)। তিনি আলী বিন আবী তালিব (রাঃ)-এর অন্যতম সন্তান ছিলেন। তিনি আবুল কাসেম এবং আবু আব্দুল্লাহ উভয় উপনামে পরিচিত। ইবনুল হানাফিয়্যাহ নামে তিনি ততোধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি ওমর (রাঃ)-এর খেলাফতকালে জন্মগ্রহণ করেন। তার মাতা খাওলা বিনতু জা'ফর ছিলেন বানু হানীফ গোত্রের একজন মহিলা। পরিণত বয়সে তিনি আমীর মু'আবিয়া এবং আব্দুল মালেক ইবনু মারওয়ানের দরবারে গিয়েছিলেন। উষ্ট্রের যুদ্ধের দিন তিনি মারওয়ানকে মাটিতে ফেলে দিয়েছিলেন এবং তার বুকের উপর চড়ে বলেছিলেন। তিনি তাকে হত্যা করতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু মারওয়ান কাকুতি-মিনতি এবং আল্লাহর দোহাই দিয়ে প্রাণ ভিক্ষা চায়। পরে তিনি তাকে ছেড়ে দেন। খলীফা আবদুল মালিকের রাজত্বকালে তীর সাথে সাক্ষাত করতে গেলে আব্দুল মালেক এই ঘটনার উল্লেখ করেন। মুহাম্মদ ইবনু আলী ঘটনার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন (ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ৯/৩৮; যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা ৪/১১০)।
৮৩. মাকারিমুল আখলাক, ইবনুল জাওযী, আল-বিরু ওয়াছ ছিলাহ হা/৮৯, ১/৮৫; ইবনু সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা ৫/২৪৬।
৮৪. ইবনুল জাওযী, আল-বিরু ওয়াছ ছিলাহ হা/৯৬, ১/৮৮; ইবনু আবিদ দুনিয়া, মাকারিমুল আখলাক হা/২২১।
৮৫. তারীখু বাগদাদ ১৩/৩৬৩; গাযী তাকীউদ্দীন বিন আব্দুল কাদের তামীমী,, আত-ত্বাবাকাতুস সুন্নিয়া ১/৩৬।
৮৬. ইবনুল জাওযী, আল-বিরু ওয়াছ ছিলাহ হা/৯০, ১/৮৬; ছালাহুল উম্মাহ ফী উলুব্বিল হিম্মাহ ৫/৬৫৩।
৮৭. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা ৯/৬৩।
৮৮. তারতুসী, বিরুল ওয়ালিদায়ন ৭৯ পৃঃ; ছালাহুল উম্মাহ ৫/৬৫৩।
৮৯. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা ৪/৬০১।
৯০. তারতুসী, বিরুল ওয়ালিদায়ন পৃঃ ৭৯; ছালাহুল উম্মাহ ৫/৬৫৩; মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম, উকুকুল ওয়ালিদায়ন ১/৬২; ত্বাবাকাতুল কুবরা ৭/২২৮।
৯১. আল-বিদায়াহ ওয়াল নিহায়াহ ৩/৩৩৪; ইবনু হিব্বান, আছ-ছিক্কাত ৪/৩৫।
৯২. আল-বিরু হা/৬০; আল-বিদায়াহ ৯/৩৩৮; ইবনু আসাকির ১০/৩৩; তাহযীবুল কামাল ৩/৪৩৬।
📄 পিতা-মাতার অর্থনৈতিক অধিকার
সন্তানের নিকট পিতা-মাতার যেমন সদাচরণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে, তেমনি তাদের অর্থনৈতিক অধিকারও রয়েছে। এক সময় পিতা-মাতা বৃদ্ধ হয়ে যান। তারা কর্ম করে খেতে পারেন না। তাদের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যায়। এমন করুণ পরিস্থিতিতে পিতা-মাতার দায়ভার নিতে হবে সন্তানকে। যেই পিতা-মাতা অক্লান্ত পরিশ্রম করে সন্তান লালন-পালন করে বড় করে তুলেছে তাদের এ বয়সে ভালো থাকার অধিকার রয়েছে। সন্তান তার সামর্থ্য অনুপাতে পিতা-মাতার জন্য খরচ করবে। সন্তান মানুষের সবচেয়ে বড় উপার্জন। সন্তানেরা একটি বৃক্ষের ন্যায়, যাদেরকে পিতা-মাতা সেবা-যত্ন করে বড় করে তুলে। সন্তান এক সময় উপার্জন করতে শেখে। বৃক্ষের ফলদানের সময় চলে আসে। এই ফল ভোগের সর্বাধিক অধিকার রাখেন পিতা-মাতা। তাই স্ত্রী ও সন্তানের পাশাপাশি পিতা-মাতার প্রয়োজনে খরচ করতে হবে।
পিতা-মাতা সন্তানের সম্পদ থেকে কি পরিমাণ ও কখন নিতে পারবেন:
পিতা-মাতা তাদের নিজেদের প্রয়োজন অনুপাতে সন্তানের সম্পদ নিতে পারবেন। বিনা প্রয়োজনে বা পিতা-মাতা সম্পদশালী হ'লে সন্তানের সম্পদ থেকে দাবী করে বা বল প্রয়োগ করে কিছুই নিতে পারবেন না। হাদীছে এসেছে, কায়েস ইবনু আবী হাযেম হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, حَضَرْتُ أبا بكر الصديق، أتاه رجل ، فقال : يا خليفة رسول الله إن هذا يريد أن يأخذ مالي كله فيجتاحه ، فقال له أبو بكر : ما تقول؟ قال: نعم، فقال أبو بكر : إنما لك من ماله ما يكفيك، فقال: يا خليفة رسول الله، أما قال رسول الله صلى الله عليه وسلم، أنت ومالك لأبيك؟ فقال أبو بكر: ارض بما رضي আল্লাহ عز وجل 'আমি একদিন আবুবকর (রাঃ) নিকট উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় একজন লোক এসে বলল, হে রাসূলের খলীফা! ইনি আমার সমুদয় সম্পদ ছিনিয়ে নিতে চান। আবুবকর তখন তার পিতাকে বললেন, তুমি কি বল? সে বলল, হ্যাঁ। আবুবকর (রাঃ) তাকে বললেন, তোমার জন্য যতটুকু প্রয়োজন কেবল ততটুক তার সম্পদ থেকে গ্রহণ করার অধিকার রয়েছে। সে বলল, হে আল্লাহ্র রাসূলের খলীফা! রাসূল (ছাঃ) কি বলেননি যে, 'তুমি ও তোমার সমুদয় সম্পদ তোমার পিতার'? আবুবকর (রাঃ) বললেন, ‘আল্লাহ যতটুকুতে খুশি হয়েছেন তুমি ততটুকুতে খুশি হও’। ১৪অত্র হাদীছের সনদে মুনযির বিন যিয়াদ নামক দুর্বল বর্ণনাকারী থাকায় সনদ যঈফ হ’লেও হাদীছের মর্ম সঠিক। কারণ পিতা-মাতা-সন্তানের সমুদয় সম্পদ নিতে পারবে না। তাছাড়া এর স্বপক্ষে মারফু ছহীহ হাদীছ রয়েছে। যেমন- আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, إِنَّ أَوْلَادَكُمْ هِبَةُ الله لَكُمْ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ، فَهُمْ وَأَمْوَالُهُمْ لَكُمْ إِذَا احْتَحِتُمْ إِلَيْهَا- ‘নিশ্চয় তোমাদের সন্তানেরা তোমাদের জন্য আল্লাহ্র পক্ষ থেকে দান। তিনি যাকে খুশি তাকে কন্যা সন্তান দান করেন, যাকে খুশি তাকে ছেলে সন্তান দান করেন। তারা ও তাদের সম্পদ তোমাদেরই যখন তোমরা সেগুলোর প্রয়োজন বোধ করবে’। ১৫রাসূল (ছাঃ) আরো বলেন, كُلّ أَحَقُّ بِمَالِهِ مِنْ وَلَدِهِ وَوَالِدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِيْنَ ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তার সম্পদে অধিক হকদার তার সন্তান, পিতা ও সকল মানুষ হ’তে’। ১৬তিনি আরো বলেন, ، لا يَحِلُّ مَالُ امْرِئٍ مُسْلِم إِلَّا بِطِيْب نَفْسِهِ ‘কোন মুসলমানের সন্তুষ্টি ছাড়া তার সম্পদ গ্রহণ করা হালাল নয়’।
শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়া (রহঃ) বলেন, عَلَى الْوَلَدِ الْمُوسِرِ أَنْ يُنْفِقَ عَلَى أَبِيهِ وَزَوْجَةِ أَبِيهِ وَعَلَى إِخْوَتِهِ الصَّغَارِ وَإِنْ لَمْ يَفْعَلْ ذَلِكَ كَانَ عَاقًا لِأَبِيهِ قاطعًا لِرَحِمِهِ مُسْتَحِقًا لِعُقُوبَةِ اللهِ تَعَالَى فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ – ‘সচ্ছল সন্তানের উপর আবশ্যক হ’ল তার পিতার জন্য খরচ করা, তার পিতার স্ত্রীর জন্য খরচ করা ও ছোট ভাইদের জন্য খরচ করা। সে যদি এমনটি না করে তাহ'লে সে পিতার অবাধ্য, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী এবং দুনিয়া ও পরকালে আল্লাহ্ শাস্তির জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হবে'।
ওলামায়ে কেরام পিতা-মাতা কর্তৃক সন্তানের সম্পদ গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু শর্তারোপ করেছেন। যেমন- ১. পিতা-মাতাকে দরিদ্র হ'তে হবে, যাদের কোন সম্পদ নেই এবং কোন উপার্জনও নেই। ২. পিতা-মাতার প্রতি খরচ করার জন্য সন্তানের সামর্থ্য থাকতে হবে। ইবনু কুদামা (রহঃ) দু'টি শর্ত أَحَدُهُما أَلا يُجْحِفَ بالابن، ولا يضر به ولا يَأْخُذَ ,উল্লেখ করে বলেন, شيئًا تَعلَّقت به حَاجَتُه الثَّانِي: ألا يَأْخُذَ مِن مَالِ وَلَدِهِ فَيُعْطِيَهُ الْآخَرَ،
'প্রথমত, সম্পদ নেওয়ার কারণে সন্তানের প্রতি যাতে যুলুম না হয়, এর কারণে সে যেন ক্ষতিগ্রস্থ না হয় এবং পিতা এমন কিছু নিবেন না যা সন্ত ানের প্রয়োজনের সাথে সংশ্লিষ্ট। দ্বিতীয়ত, পিতা এক সন্তানের সম্পদ নিয়ে আরেক সন্তানকে দিবেন না'।
কোন কোন বিদ্বান পিতা কর্তৃক সন্তানের সম্পদ গ্রহণের জন্য ছয়টি শর্ত আরোপ করেছেন। ১. পিতা এমন সম্পদ গ্রহণ করবেন যাতে সন্তান ক্ষতিগ্রস্থ না হয় বা যে সম্পদের সন্তানের প্রয়োজন নেই। ২. অন্য সন্ত ানকে না দেওয়া। ৩. তাদের যে কেউ মৃত্যু রোগে আক্রান্ত না হওয়া। ৪. সন্তান মুসলিম ও পিতা কাফির না হওয়া। ৫. সম্পদ মওজুদ থাকা। ৬. মালিকানার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা'।
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, وَلِأَبِيهِ أَنْ يَأْخُذَ مِنْ مَالِهِ مَا يَحْتَاجُهُ بِغَيْرِ إِذْنِ الِابْنِ وَلَيْسَ لِلِابْنِ مَنْعُهُ সম্পদে প্রয়োজনবোধ করলে তার অনুমতি ব্যতীত গ্রহণ করবে। এতে সন্ত ানের বাধা দেওয়ার অধিকার নেই'।
সন্তানের পরিত্যক্ত সম্পদে পিতা-মাতার অধিকার :
পিতা-মাতার পূর্বে সন্তান মারা গেলে সন্তানের পরিত্যক্ত সম্পদে পিতা- মাতা ভাগ পাবেন। পিতা তিন অবস্থায় সন্তানের সম্পত্তিতে অংশীদার হবেন। ১. সন্তানের ছেলে বা ছেলের ছেলে থাকলে পিতা সম্পদের এক- ষষ্ঠাংশ পাবেন। ২. সন্তানের স্ত্রী-সন্তান না থাকলে পিতা ওয়ারিছ ও আছাবা হিসাবে সন্তানের সমুদয় সম্পদ পাবেন। ৩. সন্তানের কেবল কন্যা সন্তান থাকলে পিতা ওয়ারিছ হিসাবে এক-ষষ্ঠাংশ ও আছাবা হিসাবে বাকী সম্পত্তি পাবেন। অপর দিকে মাতাও তিনটি ক্ষেত্রে সন্তানের সম্পত্তিতে অংশীদার হবেন। ১. সন্তানের সন্তান থাকলে মাতা সম্পদের এক-ষষ্ঠাংশ পাবেন, ২. সন্তানের কোন সন্তান ও ভাই-বোন না থাকলে মাতা সম্পদের এক- তৃতীয়াংশ পাবেন ৩. সন্তানের একাধিক ভাই-বোন থাকলে মাতা সম্পদের এক-ষষ্ঠাংশ পাবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلِأَبَوَيْهِ لِكُلِّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا السُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِنْ كَانَ لَهُ وَلَدٌ فَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ وَلَدٌ وَوَرِثَهُ أَبَوَاهُ فَلِأُمِّهِ الثُّلُثُ فَإِنْ كَانَ لَهُ إِخْوَةٌ فَلِأُمِّهِ السُّدُسُ مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنِ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ لَا تَدْرُونَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ لَكُمْ نَفْعًا فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا -
'মৃতের পিতা-মাতার প্রত্যেকে পরিত্যক্ত সম্পত্তির ছয় ভাগের এক ভাগ করে পাবে, যদি মৃতের কোন পুত্র সন্তান থাকে। আর যদি না থাকে এবং কেবল পিতা-মাতাই ওয়ারিছ হয়, তাহ'লে মা পাবে তিন ভাগের এক ভাগ। কিন্তু যদি মৃতের ভাইয়েরা থাকে, তাহ'লে মা পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ মৃতের অছিয়ত পূরণ করার পর এবং তার ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতা ও পুত্রদের মধ্যে কে তোমাদের জন্য অধিক উপকারী, তা তোমরা জানো না। এটা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত অংশ। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়' (নিসা ৪/১১)।
টিকাঃ
১৩. মু’জামুল আওসাত্ব হা/৮০৬; মাজমা’উয যাওয়ায়েদ হা/৬৭৭১; ইরওয়া ৩/৩২৮।
১৪. মু’জামুল আওসাত্ব হা/৮০৬; বায়হাকী, সুনানুল কুবরা হা/১৫৫৩২; মাজমা’উয যাওয়ায়েদ হা/৬৭৭১; ইরওয়া ৩/৩২৮।
১৫. হাকেম হা/৩১২৩; বায়হাকী, সুনানুল কুবরা হা/১৫৫২৩; ছহীহাহ হা/২৫৬৪।
১৬. সুনানু সাঈদ ইবনু মানছুর হা/২২৯৩; বায়হাকী, সুনানুল কুবরা হা/১৫৫৩১; ছুগরা হা/২৩১৩; বর্ণনাটি মুরসাল।
১৭. আহমাদ হা/২০৭১৪; দারাকুনী হা/৯১-৯২; মিশকাত হা/২৯৪৬; ছহীহুল জামে‘ হা/৭৬৬২।
৯৮. মাজমূ'উল ফাতাওয়া ৩৪/১০১।
৯৯. আল-মুগনী ৬/৬২।
১০০. মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম আলে শায়খ, ফাতাওয়া ওয়া রাসায়েল ৯/২২১।
১০১. মাজমুউল ফাতাওয়া ৩৪/১০২।
📄 অসদাচরণকারী সন্তানদের প্রতি সতর্কবাণী
পিতা-মাতার সাথে অসদাচরণের ভয়াবহ পরিণতির কিছু নমুনা:
পিতা-মাতার সাথে অসদাচরণ করা ঘৃণিত কাজ। কোন অবস্থাতেই তাদের সাথে খারাপ আচরণ করা যাবে না। কেউ যদি এরূপ জঘণ্য কাজ করে তাহ'লে তার প্রতিদান অনুরূপ অথবা তার চেয়ে খারাপ হয়ে থাকে। পৃথিবীর ইতিহাস প্রমাণ করে যে, পিতা-মাতার সাথে অসদাচরণকারীরা ধ্বংস হয়ে গেছে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, وَالَّذِي قَالَ لِوَالِدَيْهِ أَفٌ لَكُمَا أَتَعِدَانَنِي أَنْ أَخْرُجَ وَقَدْ خَلَتِ الْقُرُونُ مِنْ قَبْلِي وَهُمَا يَسْتَغِيثَانِ اللَّهُ وَيْلَكَ آمِنْ إِنَّ وَعْدَ اللهُ حَقٌّ فَيَقُولُ مَا هَذَا إِلَّا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِيْنَ ‘পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পিতা- মাতাকে বলে ঠিক তোমাদের জন্য। তোমরা কি আমাকে এ ভয় দেখাতে চাও যে, আমি পুনরুত্থিত হব? অথচ আমার পূর্বে বহু জাতি গত হয়ে গেছে। একথা শুনে তার পিতামাতা দু'জনে আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করে বলে, তোমার ধ্বংস হৌক! তুমি ঈমান আনো। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ওয়াদা সত্য। জবাবে সে বলে, এটাতো পুরাকালের উপকথা মাত্র' (আহক্বাফ ৪৬/১৭)।
নিম্নে এ সম্পর্ক কয়েকটি উদাহরণ পেশ করা হ'ল-
ছাবেত আল-বুনানী (রহঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, বর্ণিত আছে যে, জনৈক ব্যক্তি তার পিতাকে এক স্থানে প্রহার করছিল। তখন তাকে বলা হ'ল এটি তুমি কি করছ? তখন পিতা বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। কারণ এই স্থানেই আমি আমার বাবাকে মেরে ছিলাম। ফলে আমার ছেলের দ্বারা আমি এই স্থানে এরূপ পরিস্থিতির শিকার হয়েছি। এটি তারই বিনিময়। তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই'।
আবু হাফছ ইয়াসকান্দী বলেন, তার নিকট জনৈক লোক এসে বলল, আমার ছেলে আমাকে মেরে ব্যথিত করেছে। তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ! ছেলে তার পিতাকে মেরেছে? সে বলল, হ্যাঁ, আমাকে মেরে ব্যথিত করেছে। তিনি বললেন, তুমি কি তাকে জ্ঞান ও শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছ? সে বলল, না। তিনি বললেন, তুমি তাকে কুরআন শিক্ষা দিয়েছ? সে বলল, না। তিনি বললেন, তাহ'লে সে কোন কাজ করে? সে বলল, কৃষি কাজ। আচ্ছা তুমি কি জান যে, সে কেন তোমাকে মেরেছিল? সে বলল, না। তাহ'লে হ'তে পারে যে, সে যখন সকালে গাধার উপর আরোহন করে কৃষিকাজে যাচ্ছিল আর তার সামনে ছিল বলদ, পিছনে ছিল কুকুর এবং সে কুরআন তেলাওয়াত করতে জানত না। ফলে সে গান গাইছিল আর এ অবস্থায় তুমি তার মুখোমুখি হয়েছিলে। তখন সে তোমাকে গরু মনে করেছিল (এবং তোমাকে মেরে ছিল)। তুমি বরং আল্লাহ্ প্রশংসা কর যে, সে তোমার ঘাড় মটকিয়ে দেয়নি'।
মাদায়েনী বলেন, কবি জারীর পিতার সবচেয়ে বড় অবাধ্য ব্যক্তি ছিলেন। আর তার ছেলে বেলালও তার অবাধ্য ছিল। সে একদিন পিতার সাথে গালাগালিতে লিপ্ত হয় এবং এতে কষ্টদায়ক ভাষা ব্যবহার করে। শুনে তার মা তাকে বলল, হে আল্লাহ্ শত্রু! তুমি বাবাকে এসব কথা বলছ? তখন জারীর বললেন, তাকে বলতে দাও। হয়ত সে এসব কথা আমাকে বলতে শুনেছে, যখন আমি আমার পিতাকে বলেছিলাম'।
আছমাঈ বলেন, 'জনৈক আরব আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, আমি পিতামাতার সর্বাধিক অবাধ্য ও সর্বাধিক সুন্দর আচরণকারীকে খোঁজার জন্য মহল্লা থেকে বের হ'লাম। বিভিন্ন পাড়ায় পরিভ্রমণ করে এক বৃদ্ধকে পেলাম। যার গলায় রশি বাধা ছিল। আর তা দ্বারা সে পানির বালতি বহন করছে। প্রচণ্ড রৌদ্রের কারণে উটও যা করতে পারে না। কঠিন গরম পড়ছিল। তার পিছনে ছিল একজন যুবক। আর তার হাতে একটি চাবুক ছিল, যা দিয়ে সে তাকে পিটাচ্ছিল। এতে তার পিঠ ফেটে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিল। আমি বললাম, তুমি কি এই দুর্বল বৃদ্ধের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করবে না? তার জন্য কি গলায় রশি নিয়ে পানি বহন করাই যথেষ্ট ছিল না? আবার তুমি তাকে পিটাচ্ছ? সে বলল, আরে সেতো একই সাথে আমার পিতাও। আমি বললাম, আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান থেকে বঞ্চিত করুন! সে বলল, চুপ করুন! সেও এরূপ আচরণ করত তার পিতার সাথে। আর তার পিতা তার দাদার সাথে। আমি বললাম, এই লোকই পিতার সর্বাধিক অবাধ্য। এরপর কিছুদূর না যেতেই জনৈক যুবকের নিকট পৌঁছলাম। তার কাঁধে একটি ঝুড়ি রয়েছে। তাতে রয়েছে এক বৃদ্ধ। যেন একটি পাখির বাচ্চা। প্রতি এক ঘণ্টা চলার পর সে ঝুড়ি তার সামনে রেখে তাকে খাবার দিচ্ছে যেমন পাখিরা করে থাকে। আমি বললাম, ইনি কে? সে বলল, আমার পিতা। তিনি অচল হয়ে পড়েছেন। আর আমি তাকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছি। তখন আমি বললাম, এই লোকই পিতার প্রতি সবচেয়ে বড় সদাচরণকারী আরব।
পিতা-মাতার প্রতি অসদাচরণকারীদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, أُولَئِكَ الَّذِينَ حَقَّ عَلَيْهِمُ الْقَوْلُ فِي أُمَمٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِمْ مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ إِنَّهُمْ كَانُوا خاسِرين 'এরাই তো তারা যাদের উপর শাস্তি অবধারিত হয়েছিল জিন ও ইনসানের মধ্যে যেসব জাতি তাদের পূর্বে গত হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই তারা ছিল ক্ষতিগ্রস্ত' (আহক্বাফ ৪৬/১৮)।
পিতা-মাতাকে গালি দেওয়া :
পিতা-মাতাকে গালি দেওয়া কবীরা গুনাহ এবং এটি তাদের অবাধ্যতার চরম বহিঃপ্রকাশ। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, إِنَّ مِنْ أَكْبَرِ الْكَبَائِرِ أَنْ يَلْعَنَ الرَّجُلُ وَالِدَيْهِ 'কবীরা গুনাহসমূহের একটি হ’ল নিজ পিতা-মাতাকে গালি দেয়া'। ছাহাবীগণ বলেন, কেউ কি নিজ পিতা-মাতাকে গালি দিতে পারে? তিনি বলেন, সে অন্যের পিতা- মাতাকে গালি দিবে, ফলে ঐ ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে গালি দিবে'।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ يَقُولُ: مِنَ الْكَبَائِرِ عِنْدَ اللَّهِ تَعَالَى أَنْ يَسْتَسِبَّ الرَّجُلُ لِوَالِدِهِ - (রহঃ) বলেন, পিতা-মাতাকে গালি শুনানো আল্লাহ্র নিকট একটি কবীরা গুনাহ'।
শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, إِذَا شَتَمَ الرَّجُلُ أَبَاهُ وَاعْتَدَى عَلَيْهِ فَإِنَّهُ يَجِبُ أَنْ يُعَاقَبَ عُقُوبَةً بَلِيْغَةً - 'যখন কোন ব্যক্তি তার পিতাকে গালি দেবে এবং এক্ষেত্রে সীমালংঘন করবে, তাকে কঠিন শাস্তি প্রদান করা আবশ্যক হয়ে যাবে'।
অন্য হাদীছে এসেছে, عَنْ أَبي الطَّفَيْلِ قَالَ: سُئِلَ عَلِيٌّ : هَلْ خَصَّكُمُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّm بشَيْءٍ لَمْ يَخُصُّ بِهِ النَّاسَ كَافَّةً؟ قَالَ : مَا حَصَّنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّm بِشَيْءٍ لَمْ يَخُصُّ بِهِ النَّاسَ، إِلَّا مَا فِي قِرَابِ سَيْفِي، ثُمَّ أَخْرَجَ صَحِيفَةً، فَإِذَا فِيهَا مَكْتُوبٌ : لَعَنَ اللهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللَّهِ، لَعَنَ اللَّهُ مَنْ سَرَقَ مَنَارَ الْأَرْضِ، لَعَنَ اللَّهُ مَنْ لَعَنَ وَالِدَيْهِ، لَعَنَ اللَّهُ مَنْ آوَى مُحْدِثًا -
আবু তোফায়েল (রাঃ) বলেন, আলী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হ'ল, নবী করীম (ছাঃ) কি কোন বিশেষ ব্যাপারে আপনাকে বলেছেন, যা সর্বসাধারণকে বলেননি? তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) অন্য কাউকে বলেননি এমন কোন বিশেষ কথা একান্তভাবে আমাকে বলেননি। অবশ্য আমার তরবারির খাপের মধ্যে যা আছে ততটুকুই। অতঃপর তিনি একখানি ছফীহা বের করলেন। তাতে লেখা ছিল- 'যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে পশু যবাই করে তার প্রতি আল্লাহ্ অভিশাপ। যে ব্যক্তি জমির সীমানা চিহ্ন চুরি করে তার প্রতি আল্লাহ্ অভিশাপ। যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে অভিসম্পাত করে তার প্রতি আল্লাহর অভিশাপ। যে ব্যক্তি বিদ'আতীকে আশ্রয় দেয় তার প্রতি আল্লাহ্ অভিশাপ'।
পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া:
পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এমন গুনাহ যা খালেছ অন্তরে তওবা ছাড়া ক্ষমা হয় না। সেজন্য সর্বাস্থায় পিতা-মাতার অনুগত থাকতে হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ أَلَّا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا 'তুমি বল, এস আমি তোমাদেরকে ঐ বিষয়গুলো পাঠ করে শুনাই যা তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের উপর হারাম করেছেন। আর তা হ'ল এই যে, তোমরা তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না। পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে' (আন'আম ৬/১৫১)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَائِيلَ لَا تَعْبُدُوْنَ إِلَّا اللَّهَ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا 'আর যখন আমরা বনু ইস্রাঈলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম ও অভাবগ্রস্তদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে' (বাক্বারাহ ২/৮৩)।
عَنِ الْمُغِيرَةِ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ إِنَّ الله حَرَّمَ عَلَيْكُمْ عُقُوْقَ الْأُمَّهَاتِ، وَمَنْعَ وَهَاتِ، وَوَأْدَ الْبَنَاتِ، وَكَرِهَ لَكُمْ قِيْلَ وَقَالَ، وَكَثْرَةَ السُّؤَالِ، وَإِضَاعَةَ الْمَالِ মুগীরাহ ইবনু শু'বাহ (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) ইরশাদ করেছেন, 'আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর হারাম করেছেন মায়েদের অবাধ্যতা, কারো প্রাপ্য না দেয়া ও অন্যায়ভাবে কিছু নেয়া এবং কন্যা সন্তানকে জীবন্ত প্রোথিত করা। আর অপসন্দ করেছেন অনর্থক বাক্য ব্যয়, অতিরিক্ত প্রশ্ন করা এবং মাল বিনষ্ট করা'।
অন্য হাদীছে এসেছে, عَنْ أَبِي بَكْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم : أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ ثَلَاثًا. قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ الله . قَالَ : الإِشْرَاكُ بِالله، وَعُقُوْقُ الْوَالِدَيْنِ. وَجَلَسَ وَكَانَ مُتَّكِثًا فَقَالَ: أَلَا وَقَوْلُ الزُّورِ. قَالَ: فَمَا زَالَ يُكَرِّرُهَا حَتَّى قُلْنَا لَيْتَهُ سَكَتَ
আবু বাকরা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেন, 'আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় কবীরা গোনাহ সম্পর্কে খবর দিব না (৩ বার)? তারা বলল, বলুন হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, আল্লাহ্ সাথে শিরক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। এ সময় তিনি ঠেস দিয়ে ছিলেন। অতঃপর উঠে বসে বললেন, সাবধান! মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া। কথাটি তিনি বলতেই থাকলেন। এমনকি আমরা বললাম, যদি তিনি চুপ করতেন'। ১৭৫ অত্র হাদীছে বুঝা যায় যে, শিরকের পরেই মহাপাপ হ'ল পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। এরপরে মহাপাপ হ'ল মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।
অন্য হাদীছে এসেছে,
عَنْ عَبْدِ اللهِ بنِ عَمْرٍو رضى الله عنهما قَالَ جَاءَ أَعْرَابِي إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ مَا الْكَبَائِرُ ؟ قَالَ : الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ . قَالَ ثُمَّ مَاذَا؟ قَالَ : ثُمَّ عُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ. قَالَ ثُمَّ مَاذَا؟ قَالَ : الْيَمِينُ الْغَمُوسُ. قُلْتُ وَمَا الْيَمِينُ الْغَمُوسُ؟ قَالَ : الَّذِي يَقْتَطِعُ مَالَ امْرِئٍ مُسْلِمٍ هُوَ فِيْهَا كَاذِبٌ
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, এক বেদুঈন নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল! কবীরা গুনাহসমূহ কি? তিনি বললেন, আল্লাহ্র সাথে শরীক করা। সে বলল, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, তারপর পিতা-মাতার অবাধ্যতা। সে বলল, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, মিথ্যা কসম করা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, মিথ্যা শপথ কি? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা (শপথের সাহায্যে) মুসলিমের ধন-সম্পদ হরণ করে নেয়।
হাদীছে আরো এসেছে,
عَنْ عُبَيْدِ بْنِ عُمَيْر عَنْ أَبِيهِ أَنَّهُ حَدَّثَهُ وَكَانَتْ لَهُ صُحْبَةٌ أَنَّ رَجُلًا سَأَلَهُ فَقَالَ يَا رَسُولَ الله مَا الْكَبَائِرُ؟ فَقَالَ : هُنَّ تِسْعٌ، فَذَكَرَ مَعْنَاهُ زَادَ وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ الْمُسْلِمَيْنِ وَاسْتِحْلَالُ الْبَيْتِ الْحَرَامِ قِبْلَتِكُمْ أَحْيَاء وَأَمْوَاتًا
উবায়েদ ইবন উমায়ের (রহঃ) তাঁর পিতা হ'তে বর্ণনা করেছেন, তার সাথে বর্ণনাকারীর সখ্যতা ছিল। তিনি বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করে হে আল্লাহ্র রাসূল! কবীরা গুনাহ কোনগুলো? তিনি বলেন, তা নয়টি। তখন তিনি উপরোক্ত হাদীছে বর্ণিত গুনাহগুলোর উল্লেখ করেন এবং অতিরিক্ত এও বলেন, মুসলমান পিতা ও মাতার অবাধ্য হওয়া এবং আল্লাহর ঘরকে (কা'বা) সম্মান না করা, যা তোমাদের জীবনে ও মরণে কিবলা'।
পিতা-মাতাকে অস্বীকার করা:
পৃথিবীতে মানুষের আসার একমাত্র মাধ্যম পিতা-মাতা। অনেকে ভাল চাকুরী করার সুবাদে বা অন্য কোন কারণে বাবা-মায়ের পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করে। কেউবা বাবা-মাকে অস্বীকার করে বসে। এগুলো ইসলামী শরী'আতে হারাম ও কবীরা গুনাহ। বরং কেউ বাবা-মাকে অস্বীকার করলে তার স্থান হবে জাহান্নামে। যেমন হাদীছে এসেছে,
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم : إِنَّ أَعْظَمَ النَّاسِ فِرْيَةً لَرَجُلٌ هَاجَى رَجُلاً فَهَجَا الْقَبِيلَةَ بِأَسْرِهَا وَرَجُلٌ انْتَفَى مِنْ أَبِيْهِ وَزَنَّى أُمَّهُ -
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 'মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি সে যে কোন ব্যক্তির নিন্দা করল। অতঃপর সে (জওয়াবে) পুরো বংশের নিন্দা জ্ঞাপন করল এবং ঐ ব্যক্তি যে তার পিতৃ পরিচয় অস্বীকার করল। (অর্থাৎ পিতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল) এবং তার মাকে ব্যভিচারের অপবাদ দিল'। ১৭৮ অন্য হাদীছে এসেছে,
عَنْ سَعْدٍ رضي الله عنه قَالَ سَمِعْتُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ : مَنِ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيْهِ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ غَيْرُ أَبِيهِ، فَالْجَنَّةُ عَلَيْهِ حَرَامٌ -
সা'দ (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, 'যে ব্যক্তি অন্যকে নিজের পিতা বলে দাবী করে অথচ সে জানে যে সে তার পিতা নয়, জান্নাত তার জন্য হারাম'। ১৭৯ অন্যত্র এসেছে,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ : لَا تَرْغَبُوا عَنْ آبَائِكُمْ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ أَبِيهِ فَهُوَ كُفْرٌ -
আবু হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নবী করীম (ছাঃ) হ'তে বর্ণিত, তিনি (ছাঃ) বলেন, 'তোমরা তোমাদের পিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না (অর্থাৎ তাকে অস্বীকার করো না)। কারণ যে লোক নিজের পিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় (অর্থাৎ পিতাকে অস্বীকার করা) তা কুফরী'।
হাদীছে আরো আছে,
عَنْ أَبِي ذَرِّ رضى الله عنه أَنَّهُ سَمِعَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ : لَيْسَ مِنْ رَجُلِ ادَّعَى لِغَيْرِ أَبِيْهِ وَهُوَ يَعْلَمُهُ إِلَّا كَفَرَ، وَمَنِ ادَّعَى قَوْمًا لَيْسَ لَهُ فِيهِمْ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ -
আবু যার (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি নবী করীম (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছেন, 'কোন লোক যদি নিজ পিতা সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও অন্য কাউকে তার পিতা বলে দাবী করে তবে সে আল্লাহকে অস্বীকার করল। আর যে ব্যক্তি নিজেকে এমন বংশের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দাবী করল যে বংশের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নিল'।
অন্য বর্ণনায় রয়েছে রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি নিজের পিতাকে বাদ দিয়ে অন্য ব্যক্তিকে পিতা বলে পরিচয় দেয়, সে জান্নাতের সুবাসটুকুও পাবে না। অথচ সত্তর বছরের দূরত্ব থেকে জান্নাতের সুবাস পাওয়া যাবে'।১৮২ এসকল হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, পিতা-মাতাকে অস্বীকার করা কবীরা গুনাহ, যার কারণে জান্নাত হারাম হয়ে যাবে। এজন্য পিতা-মাতা যে মর্যাদার অধিকারী হন, যে কর্ম বা যে পেশার হোন তাদেরকে যথাযোগ্য সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করতে হবে এবং তাদের পরিচয় প্রদানে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হওয়া যাবে না।
টিকাঃ
১৬৫. বক্তব্যটি সে যুগের কোন মুমিন পিতা-মাতা ও কাফের পুত্রের কথোপকথনের উদ্ধৃতি বটে। কিন্তু এটি সকল যুগেই সম্ভব।
১৬৬. আবুল লায়ছ সামারকান্দী, তামবীহুল গাফেলীন হা/১৫২, ১/১৩১; মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ সাফারেনী, গেযাউল আলবাব ১/৩৭৩।
১৬৭. তামবীহুল গাফেলীন হা/১৫২, ১/১৩০-১৩১।
১৬৮. আহমাদ মুছতফা দারবীশ, ই'রাবুল কুরআন ৫/৪২১; আব্দুল কাদের বাগদাদী, খিযানাতুল আদাব ১/৭৬।
১৬৯. বায়হাক্বী, আল-মাহাসিন ওয়াল মাসাঈ ১/২৩৫, ১/৬১৪; নাযরাতুন নাঈম ১০/৫০১৬; মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম, উকুকুল ওয়ালিদায়েন ১/৬২।
১৭০. বুখারী হা/৫৯৭৩; মুসলিম হা/৯০; মিশকাত হা/৪৯১৬।
১৭১. আল-আদাবুল মুফরাদ হা/২৮।
১৭২. মাজমু' উল ফাতাওয়া ১১/৪৯২।
১৭৩. আদাবুল মুফরাদ হা/১৭; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩৪৬২; ছহীহুল জামে' হা/৫১১২।
১৭৪. বুখারী হা/২৪০৮; মুসলিম হা/৫৯৩; মিশকাত হা/৪৯১৫।
১৭৫. বুখারী হা/৫৯৭৬; মুসলিম হা/৮৭; ছহীহ আত-তারগীব হা/২৫০৮।
১৭৬. বুখারী হা/৬৯২০; ছহীহ আত-তারগীব হা/১৮৩১; বুলুগুল মারাম হা/১৩৬৬।
১৭৭. আবুদাউদ হা/২৮৭৫; হাকেম হা/৭৬৬৬; ছহীহুল জামে' হা/৪৬০৫।
১৭৮. ইবনু মাজাহ হা/৩৭৬১; ইবনু হিব্বান হা/৫৭৮৫; আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৮৭৪; ছহীহাহ হা/১৪৮৭।
১৭৯. বুখারী হা/৬৭৬৬; মুসলিম হা/৬৩; মিশকাত হা/৩৩১৪।
১৮০. বুখারী হা/৬৭৬৮; মুসলিম হা/৬২; মিশকাত হা/৩৩১৫।
১৮১. বুখারী হা/৩৫০৮; মুসলিম হা/৬১; আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৪৩৩।
১৮২. আহমাদ হা/৬৫৯২; ছহীহুল জামে' হা/৫৯৮৮; ছহীহ আত-তারগীব হা/১৯৮৮।