📘 পিতা মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য > 📄 অমুসলিম পিতা-মাতার সেবা করা

📄 অমুসলিম পিতা-মাতার সেবা করা


পিতা-মাতা অমুসলিম হ'লেও তারা জন্মদাতা। তাদের স্নেহ-ভালোবাসায় সন্তান বড় হয়ে উঠে। সেজন্য তাদের সাথে সর্বাবস্থায় সদাচরণ করতে হবে। তারা আল্লাহ্ ও রাসূল বিরোধী কোন আদেশ না করলে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بَعْضٍ فِي كِتَابِ اللهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ إِلَّا أَنْ تَفْعَلُوْا إِلَى أَوْلِيَائِكُمْ مَعْرُوفًا كَانَ ذَلِكَ فِي الْكِتَابِ مَسْطُوْرًا - 'নবী (মুহাম্মাদ) মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠ এবং তাঁর স্ত্রীগণ তাদের (মুমিনদের) মা। আর আল্লাহ্ কিতাবে রক্ত সম্পর্কীয়গণ পরস্পরের অধিক নিকটবর্তী অন্যান্য মুমিন ও মুহাজিরগণের চাইতে। তবে তোমরা যদি তোমাদের বন্ধুদের প্রতি সদাচরণ কর তাতে বাধা নেই। আর এটাই মূল কিতাবে (অর্থাৎ লওহে মাহফুযে) লিপিবদ্ধ আছে (যার কোন নড়চড় হয় না) (আহযাব ৩৩/৬)।
উক্ত আয়াতে রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে বলা হয়েছে, যদিও তারা অমুসলিম হয়। আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেন,
وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْhُمَا وَصَاحِبْhُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَتَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
'আর যদি পিতা-মাতা তোমাকে চাপ দেয় আমার সাথে কাউকে শরীক করার জন্য, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহ'লে তুমি তাদের কথা মানবে না। তবে পার্থিব জীবনে তাদের সাথে সদ্ভাব রেখে বসবাস করবে। আর যে ব্যক্তি আমার অভিমুখী হয়েছে, তুমি তার রাস্তা অবলম্বন কর। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকটে। অতঃপর আমি তোমাদেরকে তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করব' (লোকমান ৩১/১৫)।
হাদীছে এসেছে, সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাছ (রাঃ) বলেন, نَزَلَتْ فِي أَرْبَعُ آيَاتٍ مِنْ كِتَابِ الله تَعَالَى : كَانَتْ أُمِّي حَلَفَتْ أَنْ لَا تَأْكُلَ وَلَا تَشْرَبَ حَتَّى أُفَارِقَ مُحَمَّدًا صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَأَنْزَلَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ: وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْhُمَا وَصَاحِبْhُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا -
'আমার সম্পর্কে আল্লাহ্ কিতাবের চারটি আয়াত নাযিল হয়। (১) আমার মা শপথ করেন যে, আমি যতক্ষণ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে ত্যাগ না করব ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি পানাহার করবেন না। এই প্রসঙ্গে মহামহিম আল্লাহ নাযিল করেন, 'পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করতে চাপ দেয় যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তবে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস করবে' (লোকমান ৩১/১৫)।
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে,
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبي بَكْر قَالَتْ قَدِمَتْ عَلَى أُمِّي وَهِيَ مُشْرِكَةٌ فِي عَهْدِ قُرَيْشٍ إِذْ عَاهَدَهُمْ فَاسْتَفْتَيْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهُ قَدِمَتْ عَلَى أُمِّى وَهْيَ رَاغِبَةٌ أَفَأَصِلُ أُمِّي قَالَ: نَعَمْ صِلِى أُمَّكِ -
আসমা বিনতে আবুবকর (রাঃ) বলেন, আমার মুশরিকা মা কুরাইশদের আয়ত্তে থাকাকালীন আমার নিকট এসেছিল। তখন আমি রাসূল (ছাঃ)-কে ফৎওয়া জিজ্ঞেস করে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মুশরিকা মা আমার কাছে এসেছে। আর তিনি ইসলাম গ্রহণে অনাগ্রহী। আমি কি তার সাথে সদ্ব্যবহার করব? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তোমার মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার কর'।
হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, ঘটনাটি ছিল হোদায়বিয়ার সন্ধি থেকে মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত সময়কার। যখন তিনি তার মুশরিক স্বামী হারেছ বিন মুদরিক আল-মাখযুমীর সাথে ছিলেন (ফাহুল বারী)। আসমা (রাঃ)-এর মা আবুবকর (রাঃ)-এর স্ত্রী মুশরিকা অবস্থায় মক্কা থেকে মদীনায় গিয়ে স্বীয় কন্যা আসমার গৃহে আশ্রয় নেন। তার আগমনের এ সময়টি ছিল কুরাইশদের সাথে রাসূল (ছাঃ)-এর যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ এবং একে অপরের নিরাপত্তার সন্ধি চুক্তির মেয়াদকালে। এ সময়ও সে ইসলামের প্রতি বিমুখ ও বীতশ্রদ্ধ ছিল। কিন্তু স্বামী ও সন্তানাদির বিরহ-বিদ্রোহের লাঞ্ছনাময় জীবনের দুর্বিষহ যন্ত্রণায় ছিল কাতর। আসমা (রাঃ) বলেন, এজন্য সে আমার কাছ থেকে কিছু পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী ছিল। সে কমপক্ষে এতটুক আশা করে এসেছিল যাতে আমি তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করি। মুশরিকা মায়ের এ অবস্থা দেখে আসমা বিনতু আবুবকর (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ্ রাসূল! আমি কি আমার এই মায়ের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখব এবং তার সাথে সদাচরণ করব? তখন নবী (ছাঃ) বললেন, হ্যাঁ! তুমি তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখ। অর্থাৎ সে যা পেলে খুশী হয়, তুমি তাকে তা দাও। হাফেয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, এ হাদীছ দ্বারা মুশরিক নিকটতম আত্মীয়ের সাথেও সদাচরণ করার বৈধতা প্রমাণিত হয়'।
অন্য হাদীছে এসেছে, عَنْ أَسْمَاءَ ابْنَةِ أَبِي بَكْرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَتْ: أَتَتْنِي أُمِّي رَاغِبَةً فِي عَهْدِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَسَأَلْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم أَصِلُهَا قَالَ: نَعَمْ. قَالَ ابْنُ عُيَيْنَةَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى فِيهَا (لَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّين)
আবুবকর কন্যা আসমা হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ)-এর যুগে আমার অমুসলিম মা আমার কাছে এলেন। আমি নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট জিজ্ঞেস করলাম, তার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করব কি-না? তিনি বললেন, হ্যাঁ। ইবনু উয়াইনাহ (রহঃ) বলেন, এ ঘটনা প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেন, 'দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি, আর তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ী থেকে বের করে দেয়নি তাদের সঙ্গে সদয় ব্যবহার করতে আর ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ করতে আল্লাহ নিষেধ করেননি (মুমতাহিনাহ ৬০/০৮)' ।

টিকাঃ
৪৫. বুখারী হা/২৬২০, ৩১৮৩; মুসলিম হা/১০০৩; মিশকাত হা/৪৯১৩।
৪৬. ফাতহুল বারী ৫/২৩৪; মিরকাতুল মাফাতীহ হা/৪৯১৩-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য।
৪৭. বুখারী হা/৫৯৭৮; আল-আদাবুল মুফরাদ হা/২৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00