📘 পিতা মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য > 📄 পিতা-মাতার প্রতি খরচ করা

📄 পিতা-মাতার প্রতি খরচ করা


ভালো পথে সম্পদ ব্যয় করার ক্ষেত্রে পিতা-মাতাকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنْفِقُونَ قُلْ مَا أَنْفَقْتُمْ مِنْ خَيْرٍ فَلِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا تَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ
'লোকেরা তোমাকে জিজ্ঞেস করছে, কিভাবে খরচ করবে? তুমি বলে দাও যে, ধন-সম্পদ হ'তে তোমরা যা ব্যয় করবে, তা তোমাদের পিতা-মাতা, নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য ব্যয় কর। আর মনে রেখ, তোমরা যা কিছু সৎকর্ম করে থাক, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যকরূপে অবগত' (বাক্বারাহ ২/২১৫)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ابْدَأُ بِنَفْسِكَ فَتَصَدَّقْ عَلَيْهَا فَإِنْ فَضَلَ شَيْءٍ فَالأَهْلِكَ فَإِنْ فَضَلَ عَنْ أَهْلِكَ شَيْءٌ فَلِذِي قَرَابَتِكَ فَإِنْ فَضَلَ عَنْ ذِي قَرَابَتِكَ شَيْءٌ فَهَكَذَا وَهَكَذَا. يَقُولُ فَبَيْنَ يَدَيْكَ وَعَنْ يَمِينِكَ وَعَنْ شِمَالِكَ 'প্রথমে নিজের জন্য ব্যয় কর। এরপর অবশিষ্ট থাকলে পরিজনের জন্য ব্যয় কর। নিজ পরিজনের জন্য ব্যয় করার পরও যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে তবে নিকটাত্মীয়দের জন্য ব্যয় কর। আত্মীয়-স্বজনদেরকে দান করার পরও যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে তাহ'লে এদিক অর্থাৎ সম্মুখে-ডানে-বামে ব্যয় করবে'।
আর পিতা-মাতা পরিজনের অন্যতম সদস্য। হাদীছে এসেছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, بَيْنَمَا نَحْنُ جُلُوسٌ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذْ طَلَعَ عَلَيْنَا شَابٌ مِنَ الثَّنِيَّةِ فَلَمَّا رَأَيْنَاهُ بِأَبْصَارِنَا قُلْنَا : لَوْ أَنَّ هَذَا الشَّابَ جَعَلَ شَبَابَهُ وَنَشَاطَهُ وَقُوَّتَهُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ قَالَ فَسَمِعَ مَقَالَتَنَا رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم قَالَ : وَمَا سَبِيلُ اللَّهِ إِلَّا مَنْ قُتِلَ؟ مَنْ سَعَى عَلَى وَالِدَيْهِ فَفِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَمَنْ سَعَى عَلَى عِيَالِهِ فَفِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَمَنْ سَعَى عَلَى نَفْسِهِ لِيُعِفُّهَا فَفِي سَبِيلِ اللهِ، وَمَنْ سَعَى عَلَى التَّكَاثُرِ فَهُوَ فِي سَبِيلِ - الشَّيْطَانِ 'একদা আমরা রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে বসা ছিলাম। হঠাৎ করে একজন যুবক ছানিয়া নিম্ন ভূমি থেকে আগমন করল। তাকে গভীর দৃষ্টিতে অবলোকন করে বললাম, হায়! যদি এই যুবকটি তার যৌবন, উদ্যম ও শক্তি আল্লাহ্ পথে ব্যয় করত! বর্ণনাকারী বলেন, রাসূল (ছাঃ) আমাদের বক্তব্য শুনে বললেন, কেবল নিহত হ'লেই কি সে আল্লাহ্ পথে থাকবে? যে ব্যক্তি মাতা-পিতার খেদমতে সচেষ্টা থাকবে সে আল্লাহ্ পথে। যে পরিবার-পরিজনের কল্যাণের জন্য চেষ্টায় রত থাকবে সে আল্লাহ্ পথে। যে ব্যক্তি নিজেকে গোনাহ থেকে রক্ষার চেষ্টায় রত থাকবে সে আল্লাহর পথে। আর যে ব্যক্তি সম্পদের অধিকতর প্রাচুর্যের নেশায় মত্ত থাকবে সে শয়তানের পথে।
আরেকটি হাদীছে এসেছে,
عَنْ عَمْرُو بْن شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ رَجُلاً أَتَى النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُوْلُ اللَّهِ إِنَّ لِي مَالاً وَوَلَدًا وَإِنَّ وَالِدِي يَجْتَاحُ مَالِي. قَالَ أَنْتَ وَمَالُكَ لِوَالِدِكَ، إِنَّ أَوْلَادَكُمْ مِنْ أَطْيَبَ كَسْبِكُمْ، فَكُلُوا مِنْ كَسْبِ أَوْلَادِكُمْ
আমর ইবনু শু'আইব (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী (ছাঃ)-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমার সম্পদ ও সন্তান আছে। আমার পিতা আমার সম্পদের মুখাপেক্ষী। তিনি বলেন, তুমি ও তোমার সম্পদ উভয়ই তোমার পিতার। তোমাদের সন্তান তোমাদের জন্য সর্বোত্তম উপার্জন। সুতরাং তোমরা তোমাদের সন্ত ানদের উপার্জন থেকে খাবে'। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, إِنَّ أَطْيَبَ مَا أَكَلَ الرَّجُلُ مِنْ كَسْبِهِ وَإِنَّ وَلَدَهُ مِنْ كَسْبِهِ، পবিত্রতম হ'ল নিজের উপার্জন। আর সন্তান সন্ততি তার উপার্জনেরই অংশ'..।
عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْتَعْدِي عَلَى وَالِدِهِ قَالَ: إِنَّهُ أَخَذَ مِنْ مَالِي ، فَقَالَ لَهُ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَمَا عَلِمْتَ أَنَّكَ، وَمَالَكَ مِنْ كَسْبِ أَبيكَ -
ইবনু ওমর (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট এসে তার পিতার বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ির অভিযোগ করে বলল, তিনি আমার ধন-সম্পদ কেড়ে নিয়েছেন। তখন রাসূল (ছাঃ) তাকে বললেন, তুমি কি জান, তুমি এবং তোমার ধন-সম্পদ তোমার পিতারই উপার্জন?'।৩৭ অন্য বর্ণনায় রয়েছে وَإِنَّ أَمْوَالَ أَوْلَادِكُمْ مِنْ كَسْبِكُمْ فَكُلُوهُ - هَنِيئًا 'আর তোমাদের সন্তানদের সম্পদ তোমাদেরই উপার্জন। অতএব তোমরা তা স্বাচ্ছন্দ্যে খাও'।

টিকাঃ
৩৩. মুসলিম হা/৯৯৭; মিশকাত হা/৩৩৯২।
৩৪. মু'জামুল আওসাত্ব হা/৪২১৪; শু'আবুল ঈমান হা/৯৮৯২; ছহীহাহ হা/২২৩২, ৩২৪৮।
৩৫. আবুদাউদ হা/৩৫৩০; ইবনু মাজাহ হা/২২৯২; মিশকাত হা/৩৩৫৪; ছহীহুল জামে' হা/১৪৮৭।
৩৬. ইবনু মাজাহ হা/২১৩৭; মিশকাত হা/২৭৭০; ইরওয়া হা/২১৬২।
৩৭. তাবারানী, মু'জামুল কাবীর হা/১৩৩৪৫; ছহীহাহ হা/১৫৪৮; ছহীহুল জামে' হা/১৩৩১; মাজমা'উয যাওয়ায়েদ হা/৬৭৬৩।
৩৮. আহমাদ হা/৬৬৭৮; বায়হাকী, সুনানুল কুবরা হা/১৫৫২৬।

📘 পিতা মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য > 📄 পিতা-মাতার প্রতি খরচের ক্ষেত্রে মা‘কে অগ্রাধিকার দেওয়া

📄 পিতা-মাতার প্রতি খরচের ক্ষেত্রে মা‘কে অগ্রাধিকার দেওয়া


পিতা-মাতার উভয়ের প্রতি খরচ করা সন্তানের জন্য আবশ্যক। তবে মায়ের অধিক অবদান থাকার কারণে মাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যেমন হাদীছে এসেছে,
عَنْ طَارِقِ الْمُحَارِبِيِّ قَالَ قَدِمْنَا الْمَدِينَةَ فَإِذَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَائِمٌ عَلَى الْمِنْبَرِ يَخْطُبُ النَّاسَ وَهُوَ يَقُولُ : يَدُ الْمُعْطِي الْعُلْيَا وَابْدَأُ بِمَنْ تَعُولُ أُمَّكَ وَأَبَاكَ وَأُخْتَكَ وَأَخَاكَ ثُمَّ أَدْنَاكَ فَأَدْنَاكَ -
তারিকু মুহারিবী (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমরা মাদীনায় আগমন করলাম, আর তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন, তিনি তাতে বলছিলেন, দাতার হাত উঁচু (মর্যাদাসম্পন্ন)। তোমার পোষ্যদের মধ্যে দানের কাজ আরম্ভ কর। (যেমন) তোমার মা, তোমার বাবা, তোমার বোন, ভাই; এভাবে যে যত তোমার নিকটাত্মীয় (তাকে পর্যায়ক্রমে দানের ব্যাপারে অগ্রাধিকার দাও)।

টিকাঃ
৩৯. নাসাঈ হা/২৫৩২; আহমাদ হা/১৭৫৩০; ছহীহুত তারগীব হা/১৯৫৬।

📘 পিতা মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য > 📄 শেষ বয়সে পিতা-মাতাকে সঙ্গ দেওয়া

📄 শেষ বয়সে পিতা-মাতাকে সঙ্গ দেওয়া


যৌবনের উদ্যমতা ও কর্মচঞ্চল বয়সসীমার চৌহদ্দি মাড়িয়ে এক সময় পিতা-মাতাও বার্ধক্যে উপনীত হন। এসময় তারা শিশুমনা হয়ে যান। ফলে তারা শিশুদের মত সঙ্গ চায়। শিশুরা যেমন পিতা-মাতা বা আত্মীয়-স্বজনের সাথে খেলতে, ঘুরতে বা বেড়াতে চায়, তেমনি বৃদ্ধ বয়সে পিতা-মাতাও সঙ্গ চায়, ঘুরতে চায়, আত্মীয়-স্বজনের বা সন্তানের সাক্ষাৎ চায়। এসময় সন্তানের জন্য আবশ্যক হ'ল তাদের সাথে অবস্থান করা বা তাদেরকে নিজের কাছে রাখা। এসময় তাদের সঙ্গ দিলে বরকত লাভ করা যায়। বৃদ্ধ মানুষ পৃথিবীতে আছে বিধায় এ ধরা কল্যাণ ও বরকতময়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ،الْبَرَكَةُ مَعَ أَكَابِرِكُم প্রবীণদের সাথেই তোমাদের কল্যাণ, বরকত রয়েছে'।
ইসলামে বৃদ্ধ পিতা-মাতার খিদমত ও সেবা করার ফযীলত ও গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন হাদীছে এসেছে,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَن النَّبيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ : رَغِمَ أَنْفُ ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُ ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُ. قِيلَ مَنْ يَا رَسُولَ اللهِ قَالَ : مَنْ أَدْرَكَ أَبَوَيْهِ عِنْدَ الْكِبَرِ أَحَدَهُمَا أَوْ كِلَيْهِمَا فَلَمْ يَدْخُلِ الْجَنَّةَ -
আবু হুরায়রা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেন, তার নাক ধূলায় ধূসরিত হৌক (৩ বার)। বলা হ'ল, তিনি কে হে আল্লাহ্ রাসূল! তিনি বললেন, যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতা উভয়কে কিংবা একজনকে বৃদ্ধাবস্থায় পেল, অথচ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না'। ৪১ অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, ابْغُوْنِي الضَّعِيفَ فَإِنَّكُمْ إِنَّمَا تُرْزَقُوْنَ وَتُنْصَرُوْنَ بِضُعَفَائِكُمْ 'তোমরা আমাকে দুর্বলদের মাঝে খোঁজ কর। কেননা তোমাদের মধ্যে যারা দুর্বল তাদের অসীলায় তোমরা রিযিক ও সাহায্য প্রাপ্ত হয়ে থাক'।
إِنَّمَا يَنْصُرُ اللَّهُ هَذِهِ الْأُمَّةَ بِضَعِيْفِهَا بِدَعْوَتِهِمْ وَصَلَاتِهِمْ وَإِخْلَاصِهِمْ 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা এই উম্মতকে তাদের দুর্বল লোকদের দো'আ, ছালাত ও ইখলাছের মাধ্যমে সাহায্য করে থাকেন'। ৪৩ অন্য হাদীছে এসেছে, রাসূল (ছাঃ) বলেন, إِنَّ مِنْ إِجْلَالِ اللَّهِ إِكْرَامَ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِم 'নিশ্চয়ই বৃদ্ধ চুল বিশিষ্ট মুসলিমকে সম্মান করাই আল্লাহকে সম্মান করার শামিল'।
কারণ বৃদ্ধদের ইবাদতে ও দো'আয় একনিষ্ঠতা থাকে, থাকে দুনিয়ার মোহ থেকে অন্তরের পরিচ্ছন্নতা। তাদের আগ্রহ ও মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে পরকাল।

টিকাঃ
৪০. ইবনু হিববান হা/৫৫৯; হাকেম হা/২১০, সনদ ছহীহ।
৪১. মুসলিম হা/২৫৫১; মিশকাত হা/৪৯১২।
৪২. নাসাঈ হা/৩১৭৯; আবুদাউদ হা/২৫৯৪; আহমাদ হা/২১৯৩১, সনদ ছহীহ।
৪৩. নাসাঈ হা/৩১৭৮; ছহীহুত তারগীব হা/০৬; ছহীহুল জামে' হা/২৩৮৮, সনদ ছহীহ।
৪৪. আবুদাউদ হা/৪৮৪৩; আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৩৫৭; মিশকাত হা/৪৯৭২; ছহীহুত তারগীব হা/৯৮; ছহীহুল জামে' হা/২১৯৯।

📘 পিতা মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য > 📄 অমুসলিম পিতা-মাতার সেবা করা

📄 অমুসলিম পিতা-মাতার সেবা করা


পিতা-মাতা অমুসলিম হ'লেও তারা জন্মদাতা। তাদের স্নেহ-ভালোবাসায় সন্তান বড় হয়ে উঠে। সেজন্য তাদের সাথে সর্বাবস্থায় সদাচরণ করতে হবে। তারা আল্লাহ্ ও রাসূল বিরোধী কোন আদেশ না করলে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بَعْضٍ فِي كِتَابِ اللهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ إِلَّا أَنْ تَفْعَلُوْا إِلَى أَوْلِيَائِكُمْ مَعْرُوفًا كَانَ ذَلِكَ فِي الْكِتَابِ مَسْطُوْرًا - 'নবী (মুহাম্মাদ) মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠ এবং তাঁর স্ত্রীগণ তাদের (মুমিনদের) মা। আর আল্লাহ্ কিতাবে রক্ত সম্পর্কীয়গণ পরস্পরের অধিক নিকটবর্তী অন্যান্য মুমিন ও মুহাজিরগণের চাইতে। তবে তোমরা যদি তোমাদের বন্ধুদের প্রতি সদাচরণ কর তাতে বাধা নেই। আর এটাই মূল কিতাবে (অর্থাৎ লওহে মাহফুযে) লিপিবদ্ধ আছে (যার কোন নড়চড় হয় না) (আহযাব ৩৩/৬)।
উক্ত আয়াতে রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে বলা হয়েছে, যদিও তারা অমুসলিম হয়। আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেন,
وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْhُمَا وَصَاحِبْhُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَتَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
'আর যদি পিতা-মাতা তোমাকে চাপ দেয় আমার সাথে কাউকে শরীক করার জন্য, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহ'লে তুমি তাদের কথা মানবে না। তবে পার্থিব জীবনে তাদের সাথে সদ্ভাব রেখে বসবাস করবে। আর যে ব্যক্তি আমার অভিমুখী হয়েছে, তুমি তার রাস্তা অবলম্বন কর। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকটে। অতঃপর আমি তোমাদেরকে তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করব' (লোকমান ৩১/১৫)।
হাদীছে এসেছে, সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাছ (রাঃ) বলেন, نَزَلَتْ فِي أَرْبَعُ آيَاتٍ مِنْ كِتَابِ الله تَعَالَى : كَانَتْ أُمِّي حَلَفَتْ أَنْ لَا تَأْكُلَ وَلَا تَشْرَبَ حَتَّى أُفَارِقَ مُحَمَّدًا صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَأَنْزَلَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ: وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْhُمَا وَصَاحِبْhُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا -
'আমার সম্পর্কে আল্লাহ্ কিতাবের চারটি আয়াত নাযিল হয়। (১) আমার মা শপথ করেন যে, আমি যতক্ষণ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে ত্যাগ না করব ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি পানাহার করবেন না। এই প্রসঙ্গে মহামহিম আল্লাহ নাযিল করেন, 'পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করতে চাপ দেয় যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তবে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস করবে' (লোকমান ৩১/১৫)।
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে,
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبي بَكْر قَالَتْ قَدِمَتْ عَلَى أُمِّي وَهِيَ مُشْرِكَةٌ فِي عَهْدِ قُرَيْشٍ إِذْ عَاهَدَهُمْ فَاسْتَفْتَيْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهُ قَدِمَتْ عَلَى أُمِّى وَهْيَ رَاغِبَةٌ أَفَأَصِلُ أُمِّي قَالَ: نَعَمْ صِلِى أُمَّكِ -
আসমা বিনতে আবুবকর (রাঃ) বলেন, আমার মুশরিকা মা কুরাইশদের আয়ত্তে থাকাকালীন আমার নিকট এসেছিল। তখন আমি রাসূল (ছাঃ)-কে ফৎওয়া জিজ্ঞেস করে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মুশরিকা মা আমার কাছে এসেছে। আর তিনি ইসলাম গ্রহণে অনাগ্রহী। আমি কি তার সাথে সদ্ব্যবহার করব? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তোমার মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার কর'।
হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, ঘটনাটি ছিল হোদায়বিয়ার সন্ধি থেকে মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত সময়কার। যখন তিনি তার মুশরিক স্বামী হারেছ বিন মুদরিক আল-মাখযুমীর সাথে ছিলেন (ফাহুল বারী)। আসমা (রাঃ)-এর মা আবুবকর (রাঃ)-এর স্ত্রী মুশরিকা অবস্থায় মক্কা থেকে মদীনায় গিয়ে স্বীয় কন্যা আসমার গৃহে আশ্রয় নেন। তার আগমনের এ সময়টি ছিল কুরাইশদের সাথে রাসূল (ছাঃ)-এর যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ এবং একে অপরের নিরাপত্তার সন্ধি চুক্তির মেয়াদকালে। এ সময়ও সে ইসলামের প্রতি বিমুখ ও বীতশ্রদ্ধ ছিল। কিন্তু স্বামী ও সন্তানাদির বিরহ-বিদ্রোহের লাঞ্ছনাময় জীবনের দুর্বিষহ যন্ত্রণায় ছিল কাতর। আসমা (রাঃ) বলেন, এজন্য সে আমার কাছ থেকে কিছু পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী ছিল। সে কমপক্ষে এতটুক আশা করে এসেছিল যাতে আমি তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করি। মুশরিকা মায়ের এ অবস্থা দেখে আসমা বিনতু আবুবকর (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ্ রাসূল! আমি কি আমার এই মায়ের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখব এবং তার সাথে সদাচরণ করব? তখন নবী (ছাঃ) বললেন, হ্যাঁ! তুমি তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখ। অর্থাৎ সে যা পেলে খুশী হয়, তুমি তাকে তা দাও। হাফেয ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন, এ হাদীছ দ্বারা মুশরিক নিকটতম আত্মীয়ের সাথেও সদাচরণ করার বৈধতা প্রমাণিত হয়'।
অন্য হাদীছে এসেছে, عَنْ أَسْمَاءَ ابْنَةِ أَبِي بَكْرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَتْ: أَتَتْنِي أُمِّي رَاغِبَةً فِي عَهْدِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَسَأَلْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم أَصِلُهَا قَالَ: نَعَمْ. قَالَ ابْنُ عُيَيْنَةَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى فِيهَا (لَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّين)
আবুবকর কন্যা আসমা হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ)-এর যুগে আমার অমুসলিম মা আমার কাছে এলেন। আমি নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট জিজ্ঞেস করলাম, তার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করব কি-না? তিনি বললেন, হ্যাঁ। ইবনু উয়াইনাহ (রহঃ) বলেন, এ ঘটনা প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেন, 'দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি, আর তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ী থেকে বের করে দেয়নি তাদের সঙ্গে সদয় ব্যবহার করতে আর ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ করতে আল্লাহ নিষেধ করেননি (মুমতাহিনাহ ৬০/০৮)' ।

টিকাঃ
৪৫. বুখারী হা/২৬২০, ৩১৮৩; মুসলিম হা/১০০৩; মিশকাত হা/৪৯১৩।
৪৬. ফাতহুল বারী ৫/২৩৪; মিরকাতুল মাফাতীহ হা/৪৯১৩-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য।
৪৭. বুখারী হা/৫৯৭৮; আল-আদাবুল মুফরাদ হা/২৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00