📄 আল্লাহর অবাধ্যতায় পিতা-মাতার আনুগত্য নেই
পিতা-মাতা তার সন্তানকে শরী'আত বিরোধী কোন কাজের আদেশ করলে, সন্তান তা প্রত্যাখ্যান করলেও কোন দোষ হবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কালামে বলেছেন,
وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْhُمَا وَصَاحِبْhُمَا في الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَتَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُوْنَ.
'আর যদি পিতা-মাতা তোমাকে চাপ দেয় আমার সাথে কাউকে শরীক করার জন্য, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহ'লে তুমি তাদের কথা মানবে না। তবে পার্থিব জীবনে তাদের সাথে সদ্ভাব রেখে বসবাস করবে। আর যে ব্যক্তি আমার অভিমুখী হয়েছে, তুমি তার রাস্তা অবলম্বন কর। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকটে। অতঃপর আমি তোমাদেরকে তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করব' (লোকমান ৩১/১৫)।
এখানে শিরক বলতে আল্লাহর সত্তা বা তাঁর গুণাবলী ও তাঁর ইবাদতে শরীক করা বুঝায়। একইভাবে আল্লাহ্ বিধানের সাথে অন্যের বিধানকে শরীক করা বুঝায়। ধর্মের নামে ও রাষ্ট্রের নামে মানুষের মনগড়া সকল বিধান এর মধ্যে শামিল। অতএব পিতা-মাতা যদি সন্তানকে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের বাইরে অন্য কিছু করতে চাপ প্রয়োগ করেন, তবে সেটি মানতে সন্তান বাধ্য নয়। কিন্তু অন্য সকল বিষয়ে সদাচরণ করবে (কুরতুবী, লোকুমান ৩১/১৫ আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য)।
মুছ'আব বিন সা'দ তার পিতা সা'দ বিন খাওলা হ'তে বর্ণনা করেন যে, আমার মা একদিন আমাকে কসম দিয়ে বলেন, আল্লাহ কি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেননি? فَوَ الله لا أَطْعَمُ طَعَاماً وَلَا أَشْرَبُ شَرَاباً حَتَّى أَمُوْتَ أَوْ تَكْفُرَ بِمُحَمَّدٍ، কসম! আমি কিছুই খাব না ও পান করব না, যতক্ষণ না মৃত্যুবরণ করব অথবা তুমি মুহাম্মাদকে অস্বীকার করবে'। ২৬ ফলে যখন তারা তাকে খাওয়াতেন, তখন গালের মধ্যে লাঠি ভরে দিয়ে ফাঁক করতেন ও তরল খাদ্য দিতেন। এভাবে তিন দিন যাওয়ার পর যখন মায়ের মৃত্যু ঘনিয়ে আসল, তখন সূরা আনকাবূত এর ৮ নং আয়াত নাযিল হ'ল, وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْنًا وَإِنْ جَاهَدَاكَ لِتُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْhُمَا إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ নির্দেশ দিয়েছি যেন তারা পিতা-মাতার সাথে (কথায় ও কাজে) উত্তম ব্যবহার করে। তবে যদি তারা তোমাকে আমার সাথে এমন কিছুকে শরীক করার জন্য চাপ দেয়, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে তুমি তাদের কথা মান্য করো না। আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল। অতঃপর আমি তোমাদের জানিয়ে দেব যেসব কাজ তোমরা করতে'।
অন্য বর্ণনায় এসেছে, মা বললেন, তুমি অবশ্যই তোমার দ্বীন ছাড়বে। নইলে আমি খাব না ও পান করব না, এভাবেই মরে যাব। তখন তোমাকে লোকেরা তিরস্কার করে বলবে, يَا قَاتِلَ أُمَّهِ 'হে মায়ের হত্যাকারী'! আমি বললাম, يَا أَمَّاهُ! لَوْ كَانَتْ لَكِ مِائَةُ نَفْسٍ، فَخَرَجَتْ نَفْسًا نَفْسًا مَا تَرَكْتُ دِينِي هَذَا فَإِنْ شِئْتِ فَكُلِي، وَإِنْ شِئْتِ فَلَا تَأْكُلِي ، একশটি জীবন হয়, আর এক একটি করে এভাবে বের হয়, তবুও আমি আমার এই দ্বীন পরিত্যাগ করব না। কাজেই তুমি খেলে খাও, না খেলে না খাও! অতঃপর আমার এই দৃঢ় অবস্থান দেখে তিনি খেলেন। তখন অত্র আয়াত নাযিল হ'ল'। বস্তুতঃ এমন ঘটনা সকল যুগে ঘটতে পারে। তখন মুমিনকে অবশ্যই দুনিয়ার বদলে দ্বীনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মানব জাতিকে এক আল্লাহ্ ইবাদত ও আনুগত্য করার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। অতঃপর শ্রেষ্ঠত্বের এই মর্যাদা রক্ষায় তাকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান-বুদ্ধি দান করা হয়েছে। কিন্তু মানবজাতির শত্রু ইবলীস ইবাদতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ফলে সন্তানকে সতর্ক করা হয়েছে, যাতে শয়তানের অনুগত কোন মুশরিক পিতা-মাতা পিতৃত্বের দাবী নিয়ে নিজ সন্তানদের শিরক করায় বাধ্য করতে না পারে। কারণ শিরক হ'ল অমার্জনীয় পাপ। এখানে মহান আল্লাহ্ পক্ষ হ'তে অধিকার প্রাপ্ত পিতা-মাতা ও সন্তান উভয়কেই শিরকমুক্ত থেকে ইসলামের প্রতি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণের কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
পবিত্র কুরআনে বিধৃত ইবরাহীম (আঃ)-এর কাহিনী অবলম্বনে পিতা কর্তৃক পুত্রকে শিরকের পথে আহবান এবং পুত্র কর্তৃক পিতাকে সত্যের পথে আহবানের দলীল পাওয়া যায়। ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতা মূর্তিপূজক তথা মুশরিক ছিলেন। অথচ ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন সুপথপ্রাপ্ত। মহান আল্লাহ বলেন, وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لِأَبِيهِ آزَرَ أَتَتَّخِذُ أَصْنَاماً آلِهَةً إِنِّي أَرَاكَ وَقَوْمَكَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ . 'স্মরণ করুন, যখন ইবরাহীম পিতা আযরকে বললেন, তুমি কি প্রতিমাসমূহকে উপাস্য মনে কর? আমি দেখতে পাচ্ছি যে, তুমি ও তোমার সম্প্রদায় প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় রয়েছ' (আন'আম ৬/৭৪)। অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন,
وَلَقَدْ آتَيْنَا إِبْرَاهِيمَ رُشْدَهُ مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا بِهِ عَالِمِينَ، إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ وَقَوْمِهِ مَا هَذِهِ التَّمَاثِيلُ الَّتِي أَنْتُمْ لَهَا عَاكِفُوْنَ، قَالُوْا وَجَدْنَا آبَاءَنَا لَهَا عَابِدِيْنَ، قَالَ لَقَدْ كُنتُمْ أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ فِي ضَلَالٍ مُّبِيْنٍ.
'ইতিপূর্বে আমরা ইবরাহীমকে সৎপথের জ্ঞান দান করেছিলাম। আর আমরা তার সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলাম। যখন তিনি তার পিতা ও সম্প্রদায়কে বললেন, এই মূর্তিগুলি কী, যাদের পূজায় তোমরা রত আছ? তারা বলল, আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে এদের পূজারী হিসাবে পেয়েছি। তিনি বললেন, তোমরা ও তোমাদের বাপ-দাদারা স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছ' (আম্বিয়া ২১/৫১-৫৪)। ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতার শিরকের আহবানে সাড়া দেননি। কারণ তাঁর পিতা আল্লাহ্র বিরুদ্ধে আহবান করেছিল। আর রাসূল (ছাঃ) সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقَ فِي مَعْصِيةِ الْخَالِقِ 'স্রষ্টার অবাধ্যতায় সৃষ্টির প্রতি কোন আনুগত্য নেই'।
টিকাঃ
২৫. আয়াতটি খ্যাতনামা ছাহাবী সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাছ (রাঃ)-এর সম্পর্কে নাযিল হয় (কুরতুবী)।
২৬. আহমাদ হা/১৬১৪; তিরমিযী হা/৩১৮৯, সনদ ছহীহ।
২৭. আনকাবুত ২৯/৮; ইবনু হিব্বান হা/৬৯৯২; শু'আবুল ঈমান হা/৭৯৩২; তাফসীরে ইবনু কাছীর ৬/২৬৫, সনদ ছহীহ।
২৮. কুরতুবী হা/৪৮৪৯, ৪৮৫০; তিরমিযী হা/৩১৮৯, হাদীছ ছহীহ; ইবনু কাছীর ৬/৩৩৭।
২৯. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৬৪ ও ৩৬৯৬।