📄 পীরদের আউট বুদ্ধি
বিদ্যান হোক আর মূর্খ হোক, আলিম হোক আর জাহিল হোক, সব শ্রেণীর পীর কিন্তু আউট বুদ্ধি খাটিয়ে থাকেন খুব বেশী। আউট বুদ্ধি, ট্যাক্টিস, চালাকী ও চতুরতা না খাটালে কোন পীরই তার পরীরগিরি কায়েম রাখতে পারেন না। এক জাঁদরেল পীর তাঁর কয়েকজন ভক্তকে নিয়ে এক মাহফিলে যাচ্ছিলেন। পথের ধারে এক ষাঁড় চরছিল। কাছাকাছি যেয়েই ষাঁড়টাকে লক্ষ্য করে খুব গাম্ভীর্যের সাথে বললেন, 'ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়ারহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ' ভক্তরা সব অবাক কি ব্যাপার! মাহফিলে যেয়ে অনেকের কানে তারা কথাটা দিল। সবাই ব্যাপারটা জানার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠল। মাহফিল শেষ হল। হুজুর বৈঠক ঘরে ঢুকে পড়লেন। লোকজন কিন্তু কেউ উঠল না।
ভেদ জানার জন্য সবাই থেকে গেল। প্রধান সাহাবীরা ভিতরে ঢুকে খুব আদবের সাথে বলল, হুজুর সব লোক বসে আছে একটা কথার জানার জন্য, যদি একটু মেহেরবানী করতেন তো ভাল হতো। হুজুর একটু মৃদু হেসে মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, বুঝেছি- ঐ সালামের ব্যাপারটা তো? ভক্তরা শুনেতো অবাক। কেউ কেউ বলল, হুজুর বুঝলেন কেমন করে যে আমরা সালামের কথাটাই জানতে চাই; কেউ কেউ বলল, হুঁ-হুঁ একি যার তার ব্যাপার; কামেল পীররা সবই জানতে পারেন, কারণ উনারা হলেন টেলিভিশন। আমাদের মনের খবর সবই উনাদের কাছে ধরা পড়ে।
এবার পীর সাহেব বললেন শুনো, আমি যখন আসছিলাম, আমাকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য দু'জন ফেরেশতা ঐ ষাঁড়ের শিং-এ দাঁড়িয়ে ছিল। কাছে যেতেই ওরা আমাকে সালাম দিল, তাই আমি ওদের সালামের জওয়াবে বললাম, 'ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়ারহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ'। একথা শুনে ভক্তরা সব খুশীর চোটে কেঁদে ফেলল, আর বলতে লাগল, সৌভাগ্য আমাদের যে, এহেন কামেল পীর আমরা পেয়েছি।
এক পীর উরুসের মেলা বসিয়েছেন। ভক্তরা সব খাসী, মোরগ, চাল, ডাল, তেল, আটা প্রভৃতি নিয়ে হাজির হয়েছে। এক ভক্ত খুব-সুরত এক দুম্বা নিয়ে হাজির হয়েছে। ভক্তের দিলের আকাঙ্ক্ষা, হুজুর যদি উঠে এসে দুম্বাটার গায়ে একটু হাত বুলিয়ে দিতেন তো ভাল হতো। এই বলে দুম্বাটাকে বাইরে বেঁধে রেখে সে ভিতরে ঢুকে পড়ল। পীর কেবলা তখন প্রধান ভক্তদের নিয়ে আসর জমিয়েছেন ভাল। এমন সময় দুম্বাওয়ালা তার মনের কথাটা পীরকে বলল। পীর সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে হাতের ইশারা করে বললেন, যাও হাত বুলিয়ে দিলাম। ভক্তের কিন্তু এতে মন উঠল না। বলল, হুজুর একটু কাছে যেয়ে গায়ে হাতটা যদি দিত পীরতো চটে লাল; বললেন বিশ্বাস হয় না তোমার। আমি এখানে বসে চোখ বন্ধ করে লন্ডনের আদালতে মামলার তদবীর করে আসি, আর এখানে বসে তোমার দুম্বার গায়ে হাত বুলাতে পারব না? যাও, হাত বুলিয়ে দিয়েছি- যাও ভক্ত হুজুরের পায়ে চুমা দিয়ে বেরিয়ে এল।
আর এক ঘটনা শুনুন। এক পীর সাহেবের নাম ছিল 'লাল বুজুক্কার'। একদিনের ঘটনা, এক গ্রামের রাস্তা দিয়ে গভীর রাতে একটা হাতী চলে গেছে। গ্রামের লোকেরা কিন্তু কেউ কোনদিন এ চিহ্ন দেখেনি। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, তাদের পীরও কোনদিন এরূপ চিহ্ন দেখেনি। ভোরবেলায় উঠে একজন লোক হাতীর পায়ের দাগ দেখে ডাক-হাঁক শুরু করে দিল। এক দুই করে গ্রামের ছোট-বড় মেয়ে-মরদ সবাই জুটে পড়ল। দাগ দেখে সবাই হয়রান, ব্যাপারটা কারো মাথায় আর আসে না। কেউ বলে কিয়ামত খুবই নজদিক, এটা তারই আলামত। কেউ বলে ভূমিকম্প হয়ে গ্রাম ধ্বংস হবে, এটা তারই আলামত। কেউ বলে গ্রামে কলেরা মহামারী আসবে, এটা তারই আলামত। মোটকথা, গ্রামের সকলেই আতঙ্কিত হয়ে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিল। কয়েকজন লোক ছুটল পালকী নিয়ে পীর সাহেবকে আনতে। পীর সাহেব এসেই বললেন চিন্তা নেই কেঁদ না। আমি থাকতে কোন মসিবত আসতে দিব না। এই বলে তিনি হাতীর পায়ের দাগ দেখে চিন্তা করতে লাগলেন এবং বৈঠক ঘরে ঢুকে পড়ে দরজা জানালা বন্ধ করে দিয়ে ধ্যানে বসে পড়লেন। আউট বুদ্ধি খাটিয়ে কিছুক্ষণ পর ঘর থেকে বের হয়ে বিকট এক চিৎকার করে বলতে লাগলেন-
لال بزککر نہ سکے تو اور سکیگا کو پاو میں چکی باندہکے شاید هرن كدا هے
লাল বুজুক্কার না সাকে তো আওর সাকেগা কো পাও মে চাক্কী বাঁধকে শায়েদ হরিণ কুদা হো।
লাল বুজুক্কার পীর না পারলে এ রহস্য আর কে বলতে পারবে? শুন, শুন, চার পায়ে চারটা চাক্কী (যাঁতা) বেঁধে একটা হরিণ এ রাস্তা দিয়ে লাফাতে লাফাতে চলে গেছে।
এ কথা শুনে গ্রামের লোকদের মুখে হাসি ফুটে উঠল। যথাসম্ভব সম্মান করে পীর সাহেবকে তারা পৌঁছে দিল।
এ ধরনের চালাকীর কথা কত শুনবেন। আর এক ঘটনা শুনুন। এক এলাকার চল্লিশ পঞ্চাশটা গ্রামের লোক ছিল তাঁতী। তাঁতের কাপড় বুনাই ছিল। তাদের একমাত্র পেশা এবং তারা সবাই ছিল এক গদ্দীনশীল ভণ্ড পীরের অন্ধভক্ত। এক সময় এক মিসর ফেরতা বিখ্যাত আলিম তাবলীগের উদ্দেশ্যে ঐ এলাকার গ্রামে গ্রামে যেয়ে ওয়াজ নসিহত শুরু করে দিলেন। ওয়াজ নসিহত শুনে এলাকার লোক খুবই মুগ্ধ হতে লাগল। কেউ কেউ পীর সাহেবের কাছে যেয়ে ওয়াজের প্রশংসা করতে লাগল। প্রশংসা শুনে পীর রেগে আগুন হয়ে গেলেন। বললেন, তোমাদের মতো আহাম্মক তো দেখি না। যার তার কথায় একেবারে গলে যাও দেখছি। নিয়ে এসোতো বেটাকে ধরে, দেখি সে কত বড় আলিম হয়েছে। আমার একটা কথার জওয়াব যদি সে দিতে পারে তাহলে বুঝব, হ্যাঁ কিছু জানে; আর যদি উত্তর দিতে না পারে, গলা ধাক্কা দিয়ে বেটাকে এলাকা ছাড়া করব। তোমরা যাও, যেয়ে কাল বিকেলে শিমুলতলীর হাটখোলায় তাকে হাজির কর। আর আমার সব মুরীদানকে জানিয়ে দাও- সবাই যেন হাজির থাকে।
এবার ভক্তরা সব ছুটল মাওলানার কাছে। সব কথাই খুলে বললেন মাওলানাকে। মাওলানা একজন বিরাট আলিম। ইল্মে কুরআন, ইল্মে হাদীস, ইল্মে ফিকাহ, ইল্মে ওসুল, ইল্মে বালাগাত, ইল্মে মান্ত্রেক ও ইল্মে আদবে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। কাজেই ঘাবরাবার পাত্র তো তিনি নন। তাছাড়া তিনি বেড়াচ্ছেন তাবলীগে-দীনের উদ্দেশে, কোন দুরভিসন্ধি তো তাঁর নেই; অতএব মাওলানা পরের দিন বিকেলে শিমুলতলীর হাটখোলায় হাজির হলেন। যেয়ে দেখেন হৈ হৈ রৈ রৈ ব্যাপার। চল্লিশ পঞ্চাশটা গ্রামের সব লোক জমা হয়েছে। বাহাসের বিরাট প্রস্তুতি। পীর সাহেবের সাথে মাওলানার হবে বাহাস। মাওলানা তো অবাক! একি ব্যাপার? যাক তিনি তাঁর আসনে যেয়ে বসলেন। একটু পরেই খুব জাঁকজমকের সাথে পীর সাহেব এসে সামনাসামনি তাঁর আসনে বসে পড়লেন। লোকের কোলাহল এবার থেমে গেল। পীর সাহেব মাওলানাকে লক্ষ্য করে গাম্ভীর্যের সাথে বললেন, কি সাহেব শুনছি নাকি আমার এই এলাকায় এসে আজে বাজে কি সব কথা বলে বেড়াচ্ছেন। মাওলানা বললেন- আস্তাগফিরুল্লাহ, কে আপনাকে বলল যে আমি আজে বাজে কথা বলে বেড়াচ্ছি। আল্লাহর ফজলে আমি একজন আলিম। মিসর থেকে পাশ করে এসে কিছু তাবলীগের উদ্দেশে বের হয়েছি। কুরআন হাদীস প্রচার করে বেড়াচ্ছি।
পীর সাহেব পীরগিরির ভঙ্গিমায় মাথা হিলিয়ে হিলিয়ে বলতে লাগলেন, বুঝেছি সাহেব বুঝেছি, বড় আলিম বলে নিজেকে তো প্রচার করে বেড়াচ্ছেন, বলি কুরান জানেন তো? মাওলানা বললেন, জানব না কেন? আল্লাহর ফজলে কুরআনের বড় বড় তাফসীরের কিতাবগুলি সবই পড়েছি। পীর সাহেব বললেন-
আসালাংলাং ফাসালাংলাং আবে আয়ে আবে গ্যায়ে ফাবে থপ্ ফাবে থপ্নপ্।
বলুন তো সাহেব, এই আয়াতের মানে কি? আর এটা কাদের শানে নাযিল হয়েছে?
মাওলানা তো হতভম্ভ। বললেন, একথা ত্রিশপারা কুরআনের কোন জায়গায় যদি আপনি দেখাতে পারেন তো এক্ষুণি আপনাকে পাঁচশত টাকা পুরস্কর দিব। পীর সাহেব ভীষণ এক গর্জন করে বললেন, ত্রিশ পারা নিয়েই পড়ে থাকেন সাহেব- ত্রিশ পারা নিয়েই পড়ে থাকেন। আরও যে দশ পারা কলবের মধ্যে আছে সে খরবতো রাখেন না; হিয়া বড়া মাওলানা সেজে বসে আছেন। যান, আমার এলাকা ছেড়ে চলে যান। তারপর ভক্তদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, যতসব আহম্মকের দল; যে ব্যক্তি একটা কুরআনের আয়াতের খবর রাখে না, তার ওয়াজ শুনে সব পাগল হয়ে গেছে, দাও এ ভণ্ডকে এলাকা ছাড়া করে দাও। ভক্তরা হুকুম পাওয়া মাত্র মাওলানাকে এলাকা থেকেই তাড়িয়ে দিল।
এবার পীর সাহেবকে সবাই ধরল যে, হুজুর ঐ আয়াতটার মানে আমাদেরকে একটু ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিন। হুজুর বললেন, ওগো আমার প্রিয় শিষ্যরা শুন, এ আয়াত একমাত্র তোমাদের শানেই আমার কলবে নাযিল হয়েছে। তোমরা যখন তাঁতের কাপড় তৈরী কর, সেই সময়কার ঘটনাটাই এই আয়াতে সুন্দর করে বলা হয়েছে। অর্থাৎ ডান পায়ে করে যখন চেপে ধর, তখন বলা হচ্ছে 'আসালাংলাং' আর বাম পায়ে করে যখন চেপে ধর, তখন বলা হচ্ছে 'ফাসালাংলাং', ডান দিক থেকে সূতার গুটি যখন বামে যায়, সে অবস্থাটাকে বলা হয়েছে 'আবে আয়ে' আর বামে থেকে যখন ডানে যায়, তখন বলা হচ্ছে 'আবে গ্যায়ে' আর যখন চাপ দিয়ে সূতার গায়ে সূতা বসিয়ে দাও, তখনকার অবস্থাটা হচ্ছে 'ফাবে থপ্ ফাবে থস্থপ্।
তারপর পীর সাহেব বললেন, বাবারা শুন! তোমাদের কাজটাকে আল্লাহ খুব পছন্দ করেছেন বলেই আল্লাহর খাস্ রহমত স্বরূপ এ আয়াত আমার কলবে নাজিল হয়েছে, অতএব তোমরা বেশক জান্নাতী। এ কথা শুনে মুরীদের দল পীরের পায়ে চুমা দিয়ে পীর কেবলা জিন্দাবাদ ধ্বনি দিতে দিতে প্রস্থান করল। এই ঘটনা উল্লেখ এজন্য করলাম যে, অনেক পীর নিজের প্রভাব, পীরত্ব ও ভাত রুটি চলে যাওয়ার ভয়ে, কোন যোগ্য ও জবরদস্ত হক্কানী আলেমকে নিজের এলাকায় ঢুকতে দিতে চান না।
এ ধরনের কত কথা শুনবেন। জনৈক জাঁদরেল পীর এক এলাকা থেকে আর এক এলাকা যাবেন। সকাল সাতটার ট্রেন তাঁকে ধরতেই হবে। পীর আগেই তাঁর দু'জন খাস ভক্তকে চুপে চুপে স্টেশনে পাঠিয়ে দিলেন আর কানে কানে বলে দিলেন যে, আমার স্টেশন যাওয়ার আগেই যদি ট্রেন ছেড়ে দেয়, তাহলে তোমরা শিকল টেনে ট্রেন থামিয়ে দিও। এদিকে পীর সাহেবের নাস্তাটাস্তা হয়ে গেল- পালকী হাজির। পীর সাহেব কিন্তু ইচ্ছা করেই দেরী করছেন। সবাই বলল হুজুর, তাড়াতাড়ি উঠুন, তা না হলে ট্রেন পাবেন না, দু'মাইল রাস্তা যেতে হবে। হুজুর বললেন, এত বড় শক্তি যে ট্রেন আমাকে ফেলে চলে যাবে? জেনে রেখো ট্রেন আমার সাথে কখনই বেয়াদবী করবে না। এই বলে পীর সাহেব কয়েক মিনিট দেরী করেই পালকীতে উঠলেন। পালকী স্টেশন হতে কোয়াটার মাইল দূরে থাকতেই ট্রেন ছেড়ে দিল। হুজুর ট্রেন ছেড়ে দিল, হুজুর ট্রেন ছেড়ে দিল- বলে ভক্তরা চেঁচাতে শুরু করে দিল। হুজুর বললেন চেঁচাও কেন? জেনে রেখ, ট্রেন আমার সাথে কখনই বেআদবী করবে না। সত্যিই ট্রেনটা আউট সিগনালের কাছে যেয়ে থেমে গেল। আর পালকীর কাছ থেকে ট্রেনের দূরত্বটা অনেকটা কমে গেল। হুজুর যেয়ে ট্রেনে উঠলেন, আর সেই সঙ্গে পীর সাহেবের মস্তবড় কারামতি জাহের হয়ে গেল।
আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে, পীর সাহেবের ইন্তেকালের পর তাঁর কতকগুলো ভক্তকে বুজুরগীটা এভাবে বর্ণনা করতে দেখা গেছে। একদিন হুজুর কেবলা পালকীতে চড়ে ট্রেন ধরার জন্য রওয়ানা হলেন। হাফ মাইল দূরে থাকতেই ট্রেন ছেড়ে দিল। সবাই তখন বলল, হুজুর, ট্রেন তো ছেড়ে দিল। আমাদের হুজুর পাক তখন বললেন, বাবারা চিন্তা করো না, আমাকে না নিয়ে ট্রেন যাবে না। সত্যিই দেখা গেল, ট্রেন প্লাটফরমের বাইরে যেয়ে থেমে গেল। ট্রেন আর কোন মতে চলে না। ড্রাইভারের শত চেষ্টা ব্যর্থ হল। এমন সময় হুজুর পাক যেয়ে পালকী থেকে নামলেন। এবার ব্যাপারটা বুঝতে আর কারো বাকী থাকলো না। ড্রাইভার ও গার্ড ছুটে এসে হুজুরের পা দু'টো জড়িয়ে ধরল। হুজুর তখন ইঞ্জিনের দিকে মুখ করে একটা ফুঁক মেরে দিয়ে বললেন, যাও- এবার চালাও। ড্রাইভার ইঞ্জিনে উঠেই দেখে, কলকব্জা সব ঠিক হয়ে গেছে। ট্রেন এবার চলতে আরম্ভ করল। ভাইসব, আমাদের হুজুর এমন হুজুর ছিলেন যে, রেলগাড়ী তাঁর কথা শুনতো। এ ধরনের বহু কথা আছে। ঘটনা ঘটে এক- আর নিজেদের কারামতি জাহের করার জন্য রূপ দেয় আর এক।
আর একটা ঘটনা শুনুন। এক পীরের আড্ডায় পীর ও তার ভক্তদেরকে বিকট চিৎকার করে হেলে-দুলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চালনা করে যিক্র করতে দেখে এক হাজী সাহেব বলেছিলেন, তোমরা যিক্র করো তো এত নাচো কেন? সঙ্গে সঙ্গে পীর বাবাজী উত্তর দিল, বাবা, কেবল হাজী হলেই হয় না, কুরআনের খবর টবর রাখতে হয়। এই বলে পড়তে শুরু করে দিল:
কূল আউযো বেরব্বিন নাছে, মালেকিন নাছে, ইলাহিন নাছে, মিন শাররিল ওয়াছ ওয়াছিল খান্নাছে, আল্লাযী ইয়ো-ওয়াছ বিছু ফী সুদুরীন নাছে, মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাছে। অর্থাৎ- রব নাচে, মালেক নাচে, ইলাহি নাচে, জিন-ইনসান সবাই নাচে, নাচে না কেবল খান্নাস।
আর এক আউট বুদ্ধির কথা বলবো। এক পীর ভক্তের গ্রামের একটি ছেলে আমার কাছে পড়তো। ছেলেটি বাড়ী গেলেই পীর সাহেব তাকে প্রশ্ন করতো, আচ্ছা বলতো বাবা, আউযোবিল্লার বাপ কে? 'আলিফ' কেন খাড়া হযে আছে আর 'বে' কেন পড়ে আছে? জিমের পেটে কেন নুক্তা? ছেলেটি বলতো, এগুলো সব বাজে প্রশ্ন। শরীয়তের আদেশ নিষেধের কথা কিছু জিজ্ঞেস করুন। পীর তখন বলতো, বাবা- ভেদ আছে, ভেদ আছে। মৌলবীদের কাছে এসব পাবে না। এসব হচ্ছে মারফতী তত্ত্ব।
এক পীরের কাছে কোন লোক গেলেই তাকে এক গ্লাস পানি আনা করাতো। তারপর ঐ পানিতে লাঠির মাথাটা একটু ডুবিয়ে দিলে বলতো- লে বেটা খেয়ে লে। ভক্ত পানি খেয়ে দেখে একেবারে মিছরীর সরবত। কিন্তু পীর যে আগেই কাম সেরে রেখেছে তা আর কয়জন বোঝে। মানে লাঠির মাথায় 'সেকারিন' দিয়ে রেখেছে।
এক মুনসেফ সাহেবের একটা ছেলে হারিয়ে গিয়েছিল। বিচলিত হয়ে মুনসেফ সাহেব জনৈক পীরের কাছে গেলেন। দূরে থেকে মুনসেফ সাহেবকে দেখে পীরের জনৈক ভক্ত পীরের কানে কানে বলে দিল যে, হুজুর আজ তিন দিন হল মুনসেফ সাহেবের ছেলে হারিয়েছে, তাই আপনার কাছে আসছেন। সামনে যেতেই কোন কথা না শুনেই চোখ বন্ধ করে ঘাড় হিলিয়ে হিলিয়ে পীর বলতে লাগল, মুনসেফের বেটা! মাত্র তিনদিন হল, ধৈর্য ধরো, ধৈর্য ধরো, ফল পাবে- ফল পাবে। মুনসেফ তো শুনেই অবাক, একি! কেমন করে ইনি জানলেন যে, আমি ছেলের জন্য এসেছি এবং আমার ছেলে তিনদিন হলো হারিয়েছে। যাক, তিনি আবেদন নিবেদন জানিয়ে চলে এলেন। আল্লাহর মর্জি, ছেলেটি কয়েকদিন পর ফিরে এলো। পীরের ভক্ত এ রিপোর্টটাও পীরের কানে দিয়ে দিল। ছেলে ফিরে আসায় মুনসেফ সাহেব খুসী হয়ে কিছু উপঢৌকন নিয়ে পীরের কাছে যেতেই, সেই আগের ভঙ্গিমায় বলতে লাগল, মুনসেফের বেটা বলি নাই যে ধৈর্য্য ধরো, ধৈর্য ধরো, ফল পাবে, ফল পাবে। কি হলো- ছেলে এসেছে তো? বাবা, ভেদ আছে ভেদ আছে।
মোটকথা আউট বুদ্ধি খাটিয়ে পীররা তাদের ব্যবসাকে ঠিক রেখেছেন। আর জনমত তাদের অন্ধভক্ত হয়ে পা চাঁটতে শুরু করে দিয়েছে। অন্ধভক্তরা তদন্ত করে দেখল না যে, আউট সিগ্লালের কাছে ট্রেনটা কেন থামল? যে পীর বাংলার মাটিতে বসে চোখ বন্ধ করে লন্ডনের আদালতে মামলার তদবীরে যায়, যে পীর একই সঙ্গে একাধিক সুরত ধরতে পারে, যে পীর নিজেকে টেলিভিশন বলে দাবী করে সকলের মনের খবর বলে দেওয়ার স্পর্ধা দেখায়, যে পীর ঘরে বসে চোখ বুজে বাইরে বাঁধা দুম্বার গায়ে হাত বুলাতে পারে; সেই পীরের ভক্ত যখন তারই সামনে মটর গাড়ির তলায় পড়ে মারা যায়, কেন সে পীর তখন হাত ইশারায় গাড়ীটা রুকে দিয়ে দুর্ঘটানর হাত থেকে, তার ভক্তকে বাঁচাতে পারে না? এ সব সাধারণ কথা যদি ভক্তদের মাথায় না ঢুকে, তাহলে তাদের অন্ধত্ব ঘুচাবে কে?
বিদ্যান হোক আর মূর্খ হোক, আলিম হোক আর জাহিল হোক, সব শ্রেণীর পীর কিন্তু আউট বুদ্ধি খাটিয়ে থাকেন খুব বেশী। আউট বুদ্ধি, ট্যাক্টিস, চালাকী ও চতুরতা না খাটালে কোন পীরই তার পরীরগিরি কায়েম রাখতে পারেন না। এক জাঁদরেল পীর তাঁর কয়েকজন ভক্তকে নিয়ে এক মাহফিলে যাচ্ছিলেন। পথের ধারে এক ষাঁড় চরছিল। কাছাকাছি যেয়েই ষাঁড়টাকে লক্ষ্য করে খুব গাম্ভীর্যের সাথে বললেন, 'ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়ারহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ' ভক্তরা সব অবাক কি ব্যাপার! মাহফিলে যেয়ে অনেকের কানে তারা কথাটা দিল। সবাই ব্যাপারটা জানার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠল। মাহফিল শেষ হল। হুজুর বৈঠক ঘরে ঢুকে পড়লেন। লোকজন কিন্তু কেউ উঠল না।
ভেদ জানার জন্য সবাই থেকে গেল। প্রধান সাহাবীরা ভিতরে ঢুকে খুব আদবের সাথে বলল, হুজুর সব লোক বসে আছে একটা কথার জানার জন্য, যদি একটু মেহেরবানী করতেন তো ভাল হতো। হুজুর একটু মৃদু হেসে মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, বুঝেছি- ঐ সালামের ব্যাপারটা তো? ভক্তরা শুনেতো অবাক। কেউ কেউ বলল, হুজুর বুঝলেন কেমন করে যে আমরা সালামের কথাটাই জানতে চাই; কেউ কেউ বলল, হুঁ-হুঁ একি যার তার ব্যাপার; কামেল পীররা সবই জানতে পারেন, কারণ উনারা হলেন টেলিভিশন। আমাদের মনের খবর সবই উনাদের কাছে ধরা পড়ে।
এবার পীর সাহেব বললেন শুনো, আমি যখন আসছিলাম, আমাকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য দু'জন ফেরেশতা ঐ ষাঁড়ের শিং-এ দাঁড়িয়ে ছিল। কাছে যেতেই ওরা আমাকে সালাম দিল, তাই আমি ওদের সালামের জওয়াবে বললাম, 'ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়ারহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ'। একথা শুনে ভক্তরা সব খুশীর চোটে কেঁদে ফেলল, আর বলতে লাগল, সৌভাগ্য আমাদের যে, এহেন কামেল পীর আমরা পেয়েছি।
এক পীর উরুসের মেলা বসিয়েছেন। ভক্তরা সব খাসী, মোরগ, চাল, ডাল, তেল, আটা প্রভৃতি নিয়ে হাজির হয়েছে। এক ভক্ত খুব-সুরত এক দুম্বা নিয়ে হাজির হয়েছে। ভক্তের দিলের আকাঙ্ক্ষা, হুজুর যদি উঠে এসে দুম্বাটার গায়ে একটু হাত বুলিয়ে দিতেন তো ভাল হতো। এই বলে দুম্বাটাকে বাইরে বেঁধে রেখে সে ভিতরে ঢুকে পড়ল। পীর কেবলা তখন প্রধান ভক্তদের নিয়ে আসর জমিয়েছেন ভাল। এমন সময় দুম্বাওয়ালা তার মনের কথাটা পীরকে বলল। পীর সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে হাতের ইশারা করে বললেন, যাও হাত বুলিয়ে দিলাম। ভক্তের কিন্তু এতে মন উঠল না। বলল, হুজুর একটু কাছে যেয়ে গায়ে হাতটা যদি দিত পীরতো চটে লাল; বললেন বিশ্বাস হয় না তোমার। আমি এখানে বসে চোখ বন্ধ করে লন্ডনের আদালতে মামলার তদবীর করে আসি, আর এখানে বসে তোমার দুম্বার গায়ে হাত বুলাতে পারব না? যাও, হাত বুলিয়ে দিয়েছি- যাও ভক্ত হুজুরের পায়ে চুমা দিয়ে বেরিয়ে এল।
আর এক ঘটনা শুনুন। এক পীর সাহেবের নাম ছিল 'লাল বুজুক্কার'। একদিনের ঘটনা, এক গ্রামের রাস্তা দিয়ে গভীর রাতে একটা হাতী চলে গেছে।
গ্রামের লোকেরা কিন্তু কেউ কোনদিন এ চিহ্ন দেখেনি। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, তাদের পীরও কোনদিন এরূপ চিহ্ন দেখেনি। ভোরবেলায় উঠে একজন লোক হাতীর পায়ের দাগ দেখে ডাক-হাঁক শুরু করে দিল। এক দুই করে গ্রামের ছোট-বড় মেয়ে-মরদ সবাই জুটে পড়ল। দাগ দেখে সবাই হয়রান, ব্যাপারটা কারো মাথায় আর আসে না। কেউ বলে কিয়ামত খুবই নজদিক, এটা তারই আলামত। কেউ বলে ভূমিকম্প হয়ে গ্রাম ধ্বংস হবে, এটা তারই আলামত। কেউ বলে গ্রামে কলেরা মহামারী আসবে, এটা তারই আলামত। মোটকথা, গ্রামের সকলেই আতঙ্কিত হয়ে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিল। কয়েকজন লোক ছুটল পালকী নিয়ে পীর সাহেবকে আনতে। পীর সাহেব এসেই বললেন চিন্তা নেই কেঁদ না। আমি থাকতে কোন মসিবত আসতে দিব না। এই বলে তিনি হাতীর পায়ের দাগ দেখে চিন্তা করতে লাগলেন এবং বৈঠক ঘরে ঢুকে পড়ে দরজা জানালা বন্ধ করে দিয়ে ধ্যানে বসে পড়লেন। আউট বুদ্ধি খাটিয়ে কিছুক্ষণ পর ঘর থেকে বের হয়ে বিকট এক চিৎকার করে বলতে লাগলেন-
لال بزککر نہ سکے تو اور سکیگا کو پاو میں چکی باندہکے شاید هرن كدا هے
লাল বুজুক্কার না সাকে তো আওর সাকেগা কো
পাও মে চাক্কী বাঁধকে শায়েদ হরিণ কুদা হো।
লাল বুজুক্কার পীর না পারলে এ রহস্য আর কে বলতে পারবে? শুন, শুন, চার পায়ে চারটা চাক্কী (যাঁতা) বেঁধে একটা হরিণ এ রাস্তা দিয়ে লাফাতে লাফাতে চলে গেছে।
এ কথা শুনে গ্রামের লোকদের মুখে হাসি ফুটে উঠল। যথাসম্ভব সম্মান করে পীর সাহেবকে তারা পৌঁছে দিল।
এ ধরনের চালাকীর কথা কত শুনবেন। আর এক ঘটনা শুনুন। এক এলাকার চল্লিশ পঞ্চাশটা গ্রামের লোক ছিল তাঁতী। তাঁতের কাপড় বুনাই ছিল।
তাদের একমাত্র পেশা এবং তারা সবাই ছিল এক গদ্দীনশীল ভণ্ড পীরের অন্ধভক্ত। এক সময় এক মিসর ফেরতা বিখ্যাত আলিম তাবলীগের উদ্দেশ্যে ঐ এলাকার গ্রামে গ্রামে যেয়ে ওয়াজ নসিহত শুরু করে দিলেন। ওয়াজ নসিহত শুনে এলাকার লোক খুবই মুগ্ধ হতে লাগল। কেউ কেউ পীর সাহেবের কাছে যেয়ে ওয়াজের প্রশংসা করতে লাগল। প্রশংসা শুনে পীর রেগে আগুন হয়ে গেলেন। বললেন, তোমাদের মতো আহাম্মক তো দেখি না। যার তার কথায় একেবারে গলে যাও দেখছি। নিয়ে এসোতো বেটাকে ধরে, দেখি সে কত বড় আলিম হয়েছে। আমার একটা কথার জওয়াব যদি সে দিতে পারে তাহলে বুঝব, হ্যাঁ কিছু জানে; আর যদি উত্তর দিতে না পারে, গলা ধাক্কা দিয়ে বেটাকে এলাকা ছাড়া করব। তোমরা যাও, যেয়ে কাল বিকেলে শিমুলতলীর হাটখোলায় তাকে হাজির কর। আর আমার সব মুরীদানকে জানিয়ে দাও- সবাই যেন হাজির থাকে।
এবার ভক্তরা সব ছুটল মাওলানার কাছে। সব কথাই খুলে বললেন মাওলানাকে। মাওলানা একজন বিরাট আলিম। ইল্মে কুরআন, ইল্মে হাদীস, ইল্মে ফিকাহ, ইল্মে ওসুল, ইল্মে বালাগাত, ইল্মে মান্ত্রেক ও ইল্মে আদবে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। কাজেই ঘাবরাবার পাত্র তো তিনি নন। তাছাড়া তিনি বেড়াচ্ছেন তাবলীগে-দীনের উদ্দেশে, কোন দুরভিসন্ধি তো তাঁর নেই; অতএব মাওলানা পরের দিন বিকেলে শিমুলতলীর হাটখোলায় হাজির হলেন। যেয়ে দেখেন হৈ হৈ রৈ রৈ ব্যাপার। চল্লিশ পঞ্চাশটা গ্রামের সব লোক জমা হয়েছে। বাহাসের বিরাট প্রস্তুতি। পীর সাহেবের সাথে মাওলানার হবে বাহাস। মাওলানা তো অবাক! একি ব্যাপার? যাক তিনি তাঁর আসনে যেয়ে বসলেন। একটু পরেই খুব জাঁকজমকের সাথে পীর সাহেব এসে সামনাসামনি তাঁর আসনে বসে পড়লেন। লোকের কোলাহল এবার থেমে গেল। পীর সাহেব মাওলানাকে লক্ষ্য করে গাম্ভীর্যের সাথে বললেন, কি সাহেব শুনছি নাকি আমার এই এলাকায় এসে আজে বাজে কি সব কথা বলে বেড়াচ্ছেন। মাওলানা বললেন- আস্তাগফিরুল্লাহ, কে আপনাকে বলল যে আমি আজে বাজে কথা বলে বেড়াচ্ছি। আল্লাহর ফজলে আমি একজন আলিম। মিসর থেকে পাশ করে এসে কিছু তাবলীগের উদ্দেশে বের হয়েছি। কুরআন হাদীস প্রচার করে বেড়াচ্ছি।
পীর সাহেব পীরগিরির ভঙ্গিমায় মাথা হিলিয়ে হিলিয়ে বলতে লাগলেন, বুঝেছি সাহেব বুঝেছি, বড় আলিম বলে নিজেকে তো প্রচার করে বেড়াচ্ছেন, বলি কুরান জানেন তো? মাওলানা বললেন, জানব না কেন? আল্লাহর ফজলে কুরআনের বড় বড় তাফসীরের কিতাবগুলি সবই পড়েছি। পীর সাহেব বললেন-
আসালাংলাং ফাসালাংলাং আবে আয়ে আবে গ্যায়ে ফাবে থপ্ ফাবে থপ্নপ্।
বলুন তো সাহেব, এই আয়াতের মানে কি? আর এটা কাদের শানে নাযিল হয়েছে?
মাওলানা তো হতভম্ভ। বললেন, একথা ত্রিশপারা কুরআনের কোন জায়গায় যদি আপনি দেখাতে পারেন তো এক্ষুণি আপনাকে পাঁচশত টাকা পুরস্কর দিব। পীর সাহেব ভীষণ এক গর্জন করে বললেন, ত্রিশ পারা নিয়েই পড়ে থাকেন সাহেব- ত্রিশ পারা নিয়েই পড়ে থাকেন। আরও যে দশ পারা কলবের মধ্যে আছে সে খরবতো রাখেন না; হিয়া বড়া মাওলানা সেজে বসে আছেন। যান, আমার এলাকা ছেড়ে চলে যান। তারপর ভক্তদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, যতসব আহম্মকের দল; যে ব্যক্তি একটা কুরআনের আয়াতের খবর রাখে না, তার ওয়াজ শুনে সব পাগল হয়ে গেছে, দাও এ ভণ্ডকে এলাকা ছাড়া করে দাও। ভক্তরা হুকুম পাওয়া মাত্র মাওলানাকে এলাকা থেকেই তাড়িয়ে দিল।
এবার পীর সাহেবকে সবাই ধরল যে, হুজুর ঐ আয়াতটার মানে আমাদেরকে একটু ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিন। হুজুর বললেন, ওগো আমার প্রিয় শিষ্যরা শুন, এ আয়াত একমাত্র তোমাদের শানেই আমার কলবে নাযিল হয়েছে। তোমরা যখন তাঁতের কাপড় তৈরী কর, সেই সময়কার ঘটনাটাই এই আয়াতে সুন্দর করে বলা হয়েছে। অর্থাৎ ডান পায়ে করে যখন চেপে ধর, তখন বলা হচ্ছে 'আসালাংলাং' আর বাম পায়ে করে যখন চেপে ধর, তখন বলা হচ্ছে 'ফাসালাংলাং', ডান দিক থেকে সূতার গুটি যখন বামে যায়, সে অবস্থাটাকে বলা হয়েছে 'আবে আয়ে' আর বামে থেকে যখন ডানে যায়, তখন বলা হচ্ছে 'আবে গ্যায়ে' আর যখন চাপ দিয়ে সূতার গায়ে সূতা বসিয়ে দাও, তখনকার অবস্থাটা হচ্ছে 'ফাবে থপ্ ফাবে থস্থপ্।
তারপর পীর সাহেব বললেন, বাবারা শুন! তোমাদের কাজটাকে আল্লাহ খুব পছন্দ করেছেন বলেই আল্লাহর খাস্ রহমত স্বরূপ এ আয়াত আমার কলবে নাজিল হয়েছে, অতএব তোমরা বেশক জান্নাতী। এ কথা শুনে মুরীদের দল পীরের পায়ে চুমা দিয়ে পীর কেবলা জিন্দাবাদ ধ্বনি দিতে দিতে প্রস্থান করল। এই ঘটনা উল্লেখ এজন্য করলাম যে, অনেক পীর নিজের প্রভাব, পীরত্ব ও ভাত রুটি চলে যাওয়ার ভয়ে, কোন যোগ্য ও জবরদস্ত হক্কানী আলেমকে নিজের এলাকায় ঢুকতে দিতে চান না।
এ ধরনের কত কথা শুনবেন। জনৈক জাঁদরেল পীর এক এলাকা থেকে আর এক এলাকা যাবেন। সকাল সাতটার ট্রেন তাঁকে ধরতেই হবে। পীর আগেই তাঁর দু'জন খাস ভক্তকে চুপে চুপে স্টেশনে পাঠিয়ে দিলেন আর কানে কানে বলে দিলেন যে, আমার স্টেশন যাওয়ার আগেই যদি ট্রেন ছেড়ে দেয়, তাহলে তোমরা শিকল টেনে ট্রেন থামিয়ে দিও। এদিকে পীর সাহেবের নাস্তাটাস্তা হয়ে গেল- পালকী হাজির। পীর সাহেব কিন্তু ইচ্ছা করেই দেরী করছেন। সবাই বলল হুজুর, তাড়াতাড়ি উঠুন, তা না হলে ট্রেন পাবেন না, দু'মাইল রাস্তা যেতে হবে। হুজুর বললেন, এত বড় শক্তি যে ট্রেন আমাকে ফেলে চলে যাবে? জেনে রেখো ট্রেন আমার সাথে কখনই বেয়াদবী করবে না। এই বলে পীর সাহেব কয়েক মিনিট দেরী করেই পালকীতে উঠলেন। পালকী স্টেশন হতে কোয়াটার মাইল দূরে থাকতেই ট্রেন ছেড়ে দিল। হুজুর ট্রেন ছেড়ে দিল, হুজুর ট্রেন ছেড়ে দিল- বলে ভক্তরা চেঁচাতে শুরু করে দিল। হুজুর বললেন চেঁচাও কেন? জেনে রেখ, ট্রেন আমার সাথে কখনই বেআদবী করবে না। সত্যিই ট্রেনটা আউট সিগনালের কাছে যেয়ে থেমে গেল। আর পালকীর কাছ থেকে ট্রেনের দূরত্বটা অনেকটা কমে গেল। হুজুর যেয়ে ট্রেনে উঠলেন, আর সেই সঙ্গে পীর সাহেবের মস্তবড় কারামতি জাহের হয়ে গেল।
আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে, পীর সাহেবের ইন্তেকালের পর তাঁর কতকগুলো ভক্তকে বুজুরগীটা এভাবে বর্ণনা করতে দেখা গেছে। একদিন হুজুর কেবলা পালকীতে চড়ে ট্রেন ধরার জন্য রওয়ানা হলেন। হাফ মাইল দূরে থাকতেই ট্রেন ছেড়ে দিল। সবাই তখন বলল, হুজুর, ট্রেন তো ছেড়ে দিল। আমাদের হুজুর পাক তখন বললেন, বাবারা চিন্তা করো না, আমাকে না নিয়ে ট্রেন যাবে না। সত্যিই দেখা গেল, ট্রেন প্লাটফরমের বাইরে যেয়ে থেমে গেল। ট্রেন আর কোন মতে চলে না। ড্রাইভারের শত চেষ্টা ব্যর্থ হল। এমন সময় হুজুর পাক যেয়ে পালকী থেকে নামলেন। এবার ব্যাপারটা বুঝতে আর কারো বাকী থাকলো না। ড্রাইভার ও গার্ড ছুটে এসে হুজুরের পা দু'টো জড়িয়ে ধরল। হুজুর তখন ইঞ্জিনের দিকে মুখ করে একটা ফুঁক মেরে দিয়ে বললেন, যাও- এবার চালাও। ড্রাইভার ইঞ্জিনে উঠেই দেখে, কলকব্জা সব ঠিক হয়ে গেছে। ট্রেন এবার চলতে আরম্ভ করল। ভাইসব, আমাদের হুজুর এমন হুজুর ছিলেন যে, রেলগাড়ী তাঁর কথা শুনতো। এ ধরনের বহু কথা আছে। ঘটনা ঘটে এক- আর নিজেদের কারামতি জাহের করার জন্য রূপ দেয় আর এক।
আর একটা ঘটনা শুনুন। এক পীরের আড্ডায় পীর ও তার ভক্তদেরকে বিকট চিৎকার করে হেলে-দুলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চালনা করে যিক্র করতে দেখে এক হাজী সাহেব বলেছিলেন, তোমরা যিক্র করো তো এত নাচো কেন? সঙ্গে সঙ্গে পীর বাবাজী উত্তর দিল, বাবা, কেবল হাজী হলেই হয় না, কুরআনের খবর টবর রাখতে হয়। এই বলে পড়তে শুরু করে দিল:
কূল আউযো বেরব্বিন নাছে, মালেকিন নাছে, ইলাহিন নাছে, মিন শাররিল ওয়াছ ওয়াছিল খান্নাছে, আল্লাযী ইয়ো-ওয়াছ বিছু ফী সুদুরীন নাছে, মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাছে। অর্থাৎ- রব নাচে, মালেক নাচে, ইলাহি নাচে, জিন-ইনসান সবাই নাচে, নাচে না কেবল খান্নাস।
আর এক আউট বুদ্ধির কথা বলবো। এক পীর ভক্তের গ্রামের একটি ছেলে আমার কাছে পড়তো। ছেলেটি বাড়ী গেলেই পীর সাহেব তাকে প্রশ্ন করতো, আচ্ছা বলতো বাবা, আউযোবিল্লার বাপ কে? 'আলিফ' কেন খাড়া হযে আছে আর 'বে' কেন পড়ে আছে? জিমের পেটে কেন নুক্তা? ছেলেটি বলতো, এগুলো সব বাজে প্রশ্ন। শরীয়তের আদেশ নিষেধের কথা কিছু জিজ্ঞেস করুন। পীর তখন বলতো, বাবা- ভেদ আছে, ভেদ আছে। মৌলবীদের কাছে এসব পাবে না। এসব হচ্ছে মারফতী তত্ত্ব।
এক পীরের কাছে কোন লোক গেলেই তাকে এক গ্লাস পানি আনা করাতো। তারপর ঐ পানিতে লাঠির মাথাটা একটু ডুবিয়ে দিলে বলতো- লে বেটা খেয়ে লে। ভক্ত পানি খেয়ে দেখে একেবারে মিছরীর সরবত। কিন্তু পীর যে আগেই কাম সেরে রেখেছে তা আর কয়জন বোঝে। মানে লাঠির মাথায় 'সেকারিন' দিয়ে রেখেছে।
এক মুনসেফ সাহেবের একটা ছেলে হারিয়ে গিয়েছিল। বিচলিত হয়ে মুনসেফ সাহেব জনৈক পীরের কাছে গেলেন। দূরে থেকে মুনসেফ সাহেবকে দেখে পীরের জনৈক ভক্ত পীরের কানে কানে বলে দিল যে, হুজুর আজ তিন দিন হল মুনসেফ সাহেবের ছেলে হারিয়েছে, তাই আপনার কাছে আসছেন। সামনে যেতেই কোন কথা না শুনেই চোখ বন্ধ করে ঘাড় হিলিয়ে হিলিয়ে পীর বলতে লাগল, মুনসেফের বেটা! মাত্র তিনদিন হল, ধৈর্য ধরো, ধৈর্য ধরো, ফল পাবে- ফল পাবে। মুনসেফ তো শুনেই অবাক, একি! কেমন করে ইনি জানলেন যে, আমি ছেলের জন্য এসেছি এবং আমার ছেলে তিনদিন হলো হারিয়েছে। যাক, তিনি আবেদন নিবেদন জানিয়ে চলে এলেন। আল্লাহর মর্জি, ছেলেটি কয়েকদিন পর ফিরে এলো। পীরের ভক্ত এ রিপোর্টটাও পীরের কানে দিয়ে দিল। ছেলে ফিরে আসায় মুনসেফ সাহেব খুসী হয়ে কিছু উপঢৌকন নিয়ে পীরের কাছে যেতেই, সেই আগের ভঙ্গিমায় বলতে লাগল, মুনসেফের বেটা বলি নাই যে ধৈর্য্য ধরো, ধৈর্য ধরো, ফল পাবে, ফল পাবে। কি হলো- ছেলে এসেছে তো? বাবা, ভেদ আছে ভেদ আছে।
মোটকথা আউট বুদ্ধি খাটিয়ে পীররা তাদের ব্যবসাকে ঠিক রেখেছেন। আর জনমত তাদের অন্ধভক্ত হয়ে পা চাঁটতে শুরু করে দিয়েছে। অন্ধভক্তরা তদন্ত করে দেখল না যে, আউট সিগ্লালের কাছে ট্রেনটা কেন থামল? যে পীর বাংলার মাটিতে বসে চোখ বন্ধ করে লন্ডনের আদালতে মামলার তদবীরে যায়, যে পীর একই সঙ্গে একাধিক সুরত ধরতে পারে, যে পীর নিজেকে টেলিভিশন বলে দাবী করে সকলের মনের খবর বলে দেওয়ার স্পর্ধা দেখায়, যে পীর ঘরে বসে চোখ বুজে বাইরে বাঁধা দুম্বার গায়ে হাত বুলাতে পারে; সেই পীরের ভক্ত যখন তারই সামনে মটর গাড়ির তলায় পড়ে মারা যায়, কেন সে পীর তখন হাত ইশারায় গাড়ীটা রুকে দিয়ে দুর্ঘটানর হাত থেকে, তার ভক্তকে বাঁচাতে পারে না? এ সব সাধারণ কথা যদি ভক্তদের মাথায় না ঢুকে, তাহলে তাদের অন্ধত্ব ঘুচাবে কে?
📄 পীরদের সিজদার দাবী
অনেক পীর বলে থাকেন যে, তাজিমের সিজদা হালাল। সেজন্য তাঁরা মুরীদদের কাছ থেকে সিজদা নিয়ে থাকেন। তাঁরা বলেন ফেরেশতারা যখন আদমকে সিজদা করেছিলেন, তখন মুরীদরা কেন পীরকে সিজদা করবে না? তারা আরও বলেন, ইবলিশ যেমন আদমকে সিজদা না করে শয়তান হয়ে গেছে, ঠিক তেমনি কোন মুরীদ যদি তার পীরকে সিজদা না করে, সেও শয়তান হয়ে যাবে। এই ফতোয়ার পর কোন অন্ধভক্ত আর স্থির থাকতে পারে কি? তাই দেখা যায়, দলে দলে সব ভক্তরা এসে পীরের পায়ে সিজদা করে থাকে। পীর সাহেবও 'এডিশনাল গড' সেজে দাঁতের গোঁড়ায় গোঁড়ায় হাসতে হাসতে সিজদা গ্রহণ করেন। পীর মরে গেলেও ছাড়াছাড়ি নেই। ভক্তরা কবরে যেয়ে মাথা ঠুকতে থাকে।
কিন্তু এই ভ্রান্ত দল এতটুকু বুঝতে সমর্থ হল না যে, ফেরেশতারা আর মানুষ কখনো এক জীব নয়। ফেরেশতারা যা করে মানুষের জন্য তা করণীয় নয়; আর মানুষ যা করে, ফেরেশতাদের জন্য তা করণীয় নয়। তাছাড়া আল্লাহ ফেরেস্তাদের হুকুম করেছিলেন যে, আদমকে সিজদা কর, তাই তারা সিজদা করেছিল। কিন্তু এই পীর নামধারী জীবগুলোকে কে হুকুম করল যে, মানুষ হয়ে মানুষকে সিজদা করতে হবে? পীররা কি মুহাম্মদ -এর উম্মত নয়? যদি উম্মত না হয় তাহলে তারা কাফের। আর যদি উম্মত হয়, তাহলে শেষ নবী যে শরীয়ত রেখে গেছেন তাই তাদেরকে মানতে হবে। তাঁর আগের কোন বিধি বিধান মানা যেতে পারে না। রসূল মুহাম্মদের আগে ইতিহাসের কোন কোন পর্যায়ে দেখি, আপন ভাই-বোনে বিয়ে হালাল ছিল, মদ খাওয়া প্রভৃতি বৈধ ছিল। তাই বলে কি এই পীর সাহেবরা আপন বোনকে বিয়ে করবেন? শত সহস্র স্ত্রী গ্রহণ করবেন? মদ খাওয়া চালু করবেন? আর এক কথা হচ্ছে, আল্লাহ যে ফেরেশতাদেরকে বলেছিলেন, 'উজ্জুদু লি আদামা'-এর অর্থ এ নয় যে, আদমকে সিজদা কর। এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, আদমের কারণে আল্লাহকে সিজদা কর। একথা তাফসীরের কিতাব ও আরবী অভিধান থেকে প্রমাণিত হয়েছে।
পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে, সিজদা শুধু আল্লাহকেই করতে হবে। আল্লাহ ছাড়া কোন সৃষ্টিকে সিজদা করা হারাম।
দারেমী কিতাবে জাবের থেকে বর্ণিত আছে, আর তাবারানীতে ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, আল্লাহর রসূল বলেছেন: لا ينبغي لبشر أن يسجد لبشر অর্থাৎ কোন মানুষের পক্ষে অন্য কোন মানুষকে সিজদা করা হালাল নয়।
আবু দাউদ, নাসায়ী ইবনু মাজা প্রভৃতি হাদীসের কিতাবে লেখা আছে, একদিন মুআয বিন জাবাল (রহ.) ইয়ামান থেকে ফিরে এসে আল্লাহর রসূল -কে সিজদা করলেন। আল্লাহর রাসুল বললেন একি? মুআয বললেন, আমি ইয়াহুদী ও খৃস্টানদেরকে দেখেছি, তারা তাদের বড় বড় পাদ্রীদেরকে সিজদা করে থাকে। আমিও তাদেরকে বলেছিলাম একি ব্যাপার? তারা বলেছিল, এ হচ্ছে নবীদের সালামের পদ্ধতি। একথা শুনে আল্লাহর রসূল বললেন: ইহুদী ও খৃস্টানরা তাদের নবীদের নামে মিথ্যা অভিযোগ আবিষ্কার করেছে। তুমি কখনো এমন করো না। আর এক বর্ণনায় আছে, আল্লাহর রসূল মুআযকে বললেন, আচ্ছা মুআয বল দেখি, তুমি আমার কবর জিয়ারত করতে গেলে কি কবরে সিজদা করবে? মুআয বললেন, না। তখন আল্লাহর রসূল বললেন, خبردار তোমরা এমন কাজ কখনো করো না। (মেশকাত)
তাফসীর ইবনু কাসীরে আছে, সাহাবী সালমান ফার্সী তখন সবেমাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছেন। একদিন মদিনার কোন রাস্তায় আল্লাহর রসূলের সাথে তাঁর দেখা হয়ে গেল। তিনি আল্লাহর রসুল -কে সিজদা করলেন। আল্লাহর রসূল তাঁকে বললেন, দেখ সালমান, আমাকে সিজদা করো না। যিনি চিরঞ্জীবি ও মৃত্যুঞ্জয়ী তুমি কেবল মাত্র তাঁকেই সিজদা করবে।
আল্লাহ ছাড়া অপরকে সিজদা করা যে হারাম, বে সব পীর তাদের ভক্তদের কাছ থেকে সিজদা নিয়ে থাকে আর যে সব অন্ধভক্ত পীরকে সিজদা করে থাকে, তারা যে ধর্মভ্রষ্ট ও মিথ্যুক এতে কোনই সন্দেহ নেই।
অনেক পীর বলে থাকেন যে, তাজিমের সিজদা হালাল। সেজন্য তাঁরা মুরীদদের কাছ থেকে সিজদা নিয়ে থাকেন। তাঁরা বলেন ফেরেশতারা যখন আদমকে সিজদা করেছিলেন, তখন মুরীদরা কেন পীরকে সিজদা করবে না? তারা আরও বলেন, ইবলিশ যেমন আদমকে সিজদা না করে শয়তান হয়ে গেছে, ঠিক তেমনি কোন মুরীদ যদি তার পীরকে সিজদা না করে, সেও শয়তান হয়ে যাবে। এই ফতোয়ার পর কোন অন্ধভক্ত আর স্থির থাকতে পারে কি? তাই দেখা যায়, দলে দলে সব ভক্তরা এসে পীরের পায়ে সিجدا করে থাকে। পীর সাহেবও 'এডিশনাল গড' সেজে দাঁতের গোঁড়ায় গোঁড়ায় হাসতে হাসতে সিجدا গ্রহণ করেন। পীর মরে গেলেও ছাড়াছাড়ি নেই। ভক্তরা কবরে যেয়ে মাথা ঠুকতে থাকে।
কিন্তু এই ভ্রান্ত দল এতটুকু বুঝতে সমর্থ হল না যে, ফেরেশতারা আর মানুষ কখনো এক জীব নয়। ফেরেশতারা যা করে মানুষের জন্য তা করণীয় নয়; আর মানুষ যা করে, ফেরেশতাদের জন্য তা করণীয় নয়। তাছাড়া আল্লাহ ফেরেস্তাদের হুকুম করেছিলেন যে, আদমকে সিجدا কর, তাই তারা সিجدا করেছিল। কিন্তু এই পীর নামধারী জীবগুলোকে কে হুকুম করল যে, মানুষ হয়ে মানুষকে সিجدا করতে হবে? পীররা কি মুহাম্মদ -এর উম্মত নয়? যদি উম্মত না হয় তাহলে তারা কাফের। আর যদি উম্মত হয়, তাহলে শেষ নবী যে শরীয়ত রেখে গেছেন তাই তাদেরকে মানতে হবে। তাঁর আগের কোন বিধি বিধান মানা যেতে পারে না। রসূল মুহাম্মদের আগে ইতিহাসের কোন কোন পর্যায়ে দেখি, আপন ভাই-বোনে বিয়ে হালাল ছিল, মদ খাওয়া প্রভৃতি বৈধ ছিল। তাই বলে কি এই পীর সাহেবরা আপন বোনকে বিয়ে করবেন? শত সহস্র স্ত্রী গ্রহণ করবেন? মদ খাওয়া চালু করবেন? আর এক কথা হচ্ছে, আল্লাহ যে ফেরেশতাদেরকে বলেছিলেন, 'উজ্জুদু লি আদামা'-এর অর্থ এ নয় যে, আদমকে সিجدا কর। এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, আদমের কারণে আল্লাহকে সিجدا কর। একথা তাফসীরের কিতাব ও আরবী অভিধান থেকে প্রমাণিত হয়েছে।
পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে, সিجدا শুধু আল্লাহকেই করতে হবে। আল্লাহ ছাড়া কোন সৃষ্টিকে সিجدا করা হারাম।
দারেমী কিতাবে জাবের থেকে বর্ণিত আছে, আর তাবারানীতে ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, আল্লাহর রসূল বলেছেন: لا ينبغي لبشر أن يسجد لبشر অর্থাৎ কোন মানুষের পক্ষে অন্য কোন মানুষকে সিجدا করা হালাল নয়।
আবু দাউদ, নাসায়ী ইবনু মাজা প্রভৃতি হাদীসের কিতাবে লেখা আছে, একদিন মুআয বিন জাবাল (রহ.) ইয়ামান থেকে ফিরে এসে আল্লাহর রসূল -কে সিجدا করলেন। আল্লাহর রাসুল বললেন একি? মুআয বললেন, আমি ইয়াহুদী ও খৃস্টানদেরকে দেখেছি, তারা তাদের বড় বড় পাদ্রীদেরকে সিجدا করে থাকে। আমিও তাদেরকে বলেছিলাম একি ব্যাপার? তারা বলেছিল, এ হচ্ছে নবীদের সালামের পদ্ধতি। একথা শুনে আল্লাহর রসূল বললেন: ইহুদী ও খৃস্টানরা তাদের নবীদের নামে মিথ্যা অভিযোগ আবিষ্কার করেছে। তুমি কখনো এমন করো না। আর এক বর্ণনায় আছে, আল্লাহর রসূল মুআযকে বললেন, আচ্ছা মুআয বল দেখি, তুমি আমার কবর জিয়ারত করতে গেলে কি কবরে সিجدا করবে? মুআয বললেন, না। তখন আল্লাহর রসূল বললেন, খবরদার তোমরা এমন কাজ কখনো করো না। (মেশকাত)
তাফসীর ইবনু কাসীরে আছে, সাহাবী সালমান ফার্সী তখন সবেমাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছেন। একদিন মদিনার কোন রাস্তায় আল্লাহর রসূলের সাথে তাঁর দেখা হয়ে গেল। তিনি আল্লাহর রসুল -কে সিجدا করলেন। আল্লাহর রসূল তাঁকে বললেন, দেখ সালমান, আমাকে সিجدا করো না। যিনি চিরঞ্জীবি ও মৃত্যুঞ্জয়ী তুমি কেবল মাত্র তাঁকেই সিجدا করবে।
আল্লাহ ছাড়া অপরকে সিجدا করা যে হারাম, বে সব পীর তাদের ভক্তদের কাছ থেকে সিجدا নিয়ে থাকে আর যে সব অন্ধভক্ত পীরকে সিجدا করে থাকে, তারা যে ধর্মভ্রষ্ট ও মিথ্যুক এতে কোনই সন্দেহ নেই।
📄 যিকিরের রহস্য
এক শ্রেণীর পীর বলেন, শরীরের মধ্যে ছয়টা লতিফা আছে। ডান স্তনের একটু নীচে আছে 'লতিফায়ে কলব'। যাম স্তনের একটু নীচে আছে 'লতিফায়ে রুহ্'। নাভির নীচে আছে 'লতিফায়ে নফস্'। দুই স্তনের মাঝখানে আছে 'লতিফায়ে সের'। কপালে আছে 'লতিফায়ে খফী'। আর তালুতে আছে 'লতিফায়ে আখফা'। তাঁরা বলেন, 'লা' শব্দটাকে লতিফায়ে নফস্ হতে অর্থাৎ নাভীর নীচে থেকে টেনে বের করে 'লতিফায়ে সের' অর্থাৎ দুই স্তনের মাঝে নিয়ে যেতে হবে। সেখানে থেকে 'লতিফায়ে খফী' অর্থাৎ কপালে ও তথা হতে 'লতিফায়ে আখফা' অর্থাৎ তালুতে নিয়ে যেতে হবে। 'ইলাহ'কে ধরে নিয়ে যেয়ে লতিফায়ে 'রুহ' অর্থাৎ বাম স্তনের কাছে নিয়ে যেতে হবে। ওখানে যেয়ে 'ইলাহ'কে ছেড়ে দিয়ে 'ইল্লাল্লাহ'কে ধরে নিয়ে যেয়ে 'লতিফায়ে কল্প' অর্থাৎ ডান স্তনের কাছে ধাক্কা মারতে হবে। এভাবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র যিকির করতে হবে।
যিকির আমাদেরকে করতেই হবে কিন্তু যে সব লতিফার কথা উল্লেখ করে পীর সাহেবরা যিকিরের ফর্মুলা বের করেছেন, তার প্রমাণ কুরআন ও হাদীসে আছে কিনা সেটাই হল আমাদের দেখার বিষয়। পবিত্র কুরআনে একশত চৌদ্দটা সূরা আছে, মোট ছয় হাজার ছয়শত ছেষট্টিটা আয়াত আছে। অতীব দুঃখের বিষয় এই যে, পীর সাহেবদের ছয় লতিফার কথা কোন আয়াতে পাওয়া যায় না। তারপর বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ প্রভৃতি হাদীসের কিতাবগুলো খুঁজে দেখেছি, প্রিয় নবীর কোন হাদীস থেকে ছয় লতিফার বিবরণ মিলে না। তাহলে প্রশ্ন হল, ছয় লতিফার বিবরণ পীর সাহেবরা পেলেন কোত্থেকে? অবশ্য কোন কোন পীর বলেন, এসব গোপন তথ্য আল্লাহর নবী হযরত আলী (রাযি.)-কে দিয়ে গেছেন। হযরত আলী (রাযি.) আবার এসব তথ্য হাসান বসরীকে দিয়ে গেছেন। হাসান বসরীর কাছ থেকে নাকি পীর কিবলারা সব কলবে কলবে পেয়ে আসছেন। তাই যদি হয়, তাহলে হযরত আলী বাদে বাকী সাহাবীদের বাঁচার পথ কি? আল্লাহর নবীর স্ত্রীদের অবস্থাই বা কি হবে?
পীর কিবলারা এ সম্পর্কে কি বলেন? আল্লাহর নবী ছয় লতিফার মূলতত্ত্ব কাউকে না দিয়ে কেবলমাত্র হযরত আলী (রাযি.)-কে দিয়ে গেলেন- একথা বলায় আল্লাহর নবীকে কি পক্ষপাতিত্ব দোষে দোষী করা হচ্ছে না? যারা এরূপ আক্বিদা পোষণ করে, তারা কতটা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত পাঠকগণ তার বিচার করবেন।
আর এক শ্রেণীর পীর আছে, মেয়েদেরকে মুরীদ বানাতে বেশী আগ্রহী। যখন কোন মেয়ে মুরীদ হতে যায়, তখন তাকে নির্জন নিরালা ঘরে বসিয়ে ডান স্তনে, বাম স্তনে, নাভীর নীচে, দুই স্তনের মাঝে, কপালে ও তালুর নীচের লতিফা চিনাতে শুরু করে দেয়। আল্লাহ জানেন কোথায় যেয়ে এর শেষ হয়। আমার মনে হয়, এ দৃশ্য দেখে মস্তবড় আজাজিলেরও কাঁপুনি শুরু হয়ে যায়।
যিকিরের এই সমালোচনা শুনে অনেকেই হয়ত ভাবছেন, তাহলে বোধ হয় যিক্র করাই বাতিল হয়ে গেল। কিন্তু না, কখনই তা ভাববেন না। কুরআন ও হাদীসে যখন যিক্রের ফজিলতের কথা উল্লেখ রয়েছে, তখন যিক্র আমাদেরকে করতেই হবে। আল্লাহ বলেন, 'فَاذْكُرُونِي اَذْكُرْكُمْ আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করব।
আল্লাহর রসূল বলেছেন: যখন কোন দল আল্লাহর যিক্র বক্সে যান, তখন ফেরেস্তারা তাদেরকে ঘিরে ফেলে ও আল্লাহর রহমত তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তাদের উপর আল্লাহর শান্তি নাযির হয় আর আল্লাহর নিকটবর্তী যারা আল্লাহ তাদের কাছে ওদের কথা উল্লেখ করেন। (মেশকাত)
আল্লাহর নবী আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি তার প্রভুর যিক্র করে, আর যে ব্যক্তি যিক্র করে না, তাদের উপমা হচ্ছে, জীবিত ও মৃতের মত। (বুখারী)
কাজেই যিক্র আমাদেরকে করতেই হবে। তবে যিক্র কাকে বলে, সেটাই জানার দরকার। যিক্র শব্দের অর্থ হচ্ছে স্মরণ করা বা স্মরণে রাখা। আল্লাহর যিক্র করা মানে আল্লাহর সঙ্গে মনের যোগ সাধন করা। শব্দের সঙ্গে এর কোন সম্বন্ধই নেই। তবে মনের কোন ভাব বা মস্তিষ্কের কোন চিন্তা ভাষার বাহনকে অবলম্বন না করে প্রকাশ পেতে পারে না। তাই এক শ্রেণীর লোক শব্দের আশ্রয় না নিয়ে স্মরণীয় বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিতে পারেন। কিন্তু তথাকথিত এই মারফতী পীর বা ফকিরের দল, আল্লাহর বিভিন্ন নাম ও 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' কলেমাকে নিয়ে লতিফার উল্লেখ করে যেভাবে বিকট চীৎকার করে থাকে, আর উৎকট ও উদ্ভট কৃষ্ণ সাধনার প্রশ্রয় দিয়ে থাকে- তা কখনই যিক্র নয়। ইসলামের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। এসব হচ্ছে এদেশের 'বামমার্গী' প্রভৃতি ভ্রান্ত সাধকদের অন্ধ-অনুকরণ আর অন্যদিকে হচ্ছে 'রিয়া' বা লোক দেখানো বুজুর্গী প্রকাশের প্রধান অবলম্বন। আল্লাহর সঙ্গে যখন যার মনোযোগ ঘটবে, তখন তার পক্ষে ঐরূপ উৎকট লম্প-ঝম্প বা উদ্ভট হৈ হৈ চীৎকার আদৌ সম্ভবপর নয়।
আর একদল মারফতী পীর বা ফকির বলেন, ছয় লতিফার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর যিক্র হচ্ছে থার্ডক্লাসের লোকের জন্য, আর যারা সেকেন্ড ক্লাসের লোক তারা কেবল 'আল্লাহু আল্লাহু' জপ করবে। আর একেবারে আপার ক্লাসের পরম বিশিষ্ট সাধক যারা, তারা কেবল হু-হু-হু-হু করবে।
কিন্তু আমরা পবিত্র কুরআন ও হাদীসে এ ধরনের যিক্রের হুকুম দেখি না। আল্লাহর রসূল ও আল্লাহ! আল্লাহ! বা হু-হু-হু-হু জপ করার ব্যবস্থা দেননি। ইসলামী শরীয়তে যিক্রের যে হুকুম দেয়া হয়েছে তা অর্থপূর্ণ আর নির্দিষ্ট কোন না কোন উদ্দেশ্যের সহায়ক।
যখন কুরআনের এই আয়াত নাযিল হল-
فَسَبِّحْ بِسْمِ رَبِّكَ الْعَظِيمُ
"আপনি আপনার মহিমান্বিত রবের নামে তাস্বীহ করুন" তখন আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদেরকে বললেন : "اجْعَلُوا فِي رُكُوعِكُمْ" এটাকে তোমরা রুকুতে পালন করবে।
যখন কুরআনের এই আয়াত নাযিল হল, “سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى " আপনার রহমান রবের তাসবীহ করুন। তখন আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদেরকে বললেন : “اجْعَلُواهَا فِي سُجُودِكُمْ" তোমরা এটাকে সিজদায় পালন করবে। রসূলুল্লাহর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথার তাৎপর্য বুখারীতে লেখা আছে, আল্লাহর রসূল রুকুতে "سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمُ” আর সিজদায় “سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى” পাঠ করতেন। শুধু ইয়া রব, ইয়া রব বা আল্লাহু, আল্লাহু বা কেবল হু-হু-হু-হু করতেন না। এ থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে, আল্লাহর নামের তাসবীহ ও যিক্র অর্থবোধক সম্পূর্ণ বাক্যের দ্বারা করতে হবে।
আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: أَفْضَلُ الذِّكْرِ لَا إِلَهَ إِلا اللَّهَ وَأَفْضَلُ الدُّعَاءِ الْحَمْدُ لِلَّهِ অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ঠ জিকির হচ্ছে লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ আর সর্বশ্রেষ্ঠ দু'আ হচ্ছে- "আল-হামদু লিল্লাহ”। (ইবনু মাজা)
বুখারীতে আছে, আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: কুরআনের পর চারটি বাক্য হচ্ছে উত্তম এবং তা কুরআন থেকেই নেয়া হয়েছে। এ চারটি বাক্য হচ্ছেঃ (১) সুবহানাল্লাহ (২) আল-হামদুলিল্লাহ (৩) লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (৪) আল্লাহু আকবার।
বুখারী ও মুসলিমে আছে, আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি দৈনিক একশত বার لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ উচ্চারণঃ “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর" বলবে, সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তা'আলা সারাদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা করবেন।
বুখারীতে আরও আছে, আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: দুটি বাক্য জবানে উচ্চারণ করতে খুব সহজ কিন্তু ওজনের পাল্লায় খুব ভারী আর রহমানের খুব প্রিয়, বাক্য দু'টি হচ্ছে- سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمُ
উচ্চারণঃ "সুবহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহী, সুবহানাল্লাহিল আযীম।"
ইসলামী শরীয়তের বিধান হলো নামাযে আল্লাহু আকবার, রব্বানা লাকাল হামদু, সুবহানা রব্বিয়াল আযীম, সুবহানা রব্বিয়ার আলা, আল-হামদু লিল্লাহ প্রভৃতি পাঠ করতে হয়। প্রত্যেক কাজের সূচনায় বিস্মিল্লাহ বলতে হয়।
মোটকথা, আযানে, ইকামতে, নামাযে, হাজ্জে, ঈদে, প্রত্যেক কাজের আরম্ভে, সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে, স্বদেশে-বিদেশে, সব সময়ে যে সব তাস্বীহ ও যিক্র করার ব্যবস্থা আল্লাহ ও তাঁর রসূল দিয়েছেন, সেগুলির কোনটাই এক শাব্দিক বা অসম্পূর্ণ বাক্য নয়।
আপার ক্লাসের লোকগুলো যে হু-হু-হু-হু করে থাকে, এরও কোন প্রমাণ কুরআন হাদীসে নেই। 'হু' শব্দটা হচ্ছে সর্বনাম। এর অর্থ হচ্ছে 'সে'। যারা কেবল সে-সে-সে-সে করে থাকে তারা পথভ্রষ্ট। কারণ এক শব্দ দিয়ে বা অসম্পূর্ণ কথা দিয়ে, সাহাবা ও তাবেয়ীগণ কখনো যিক্র করেনি। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরনের যিক্র করতে বলেননি। 'হু' শব্দ কোন বাক্য নয়। হু শব্দ দ্বারা কোন নিশ্চিত অর্থ বুঝা যায় না। হু-হু শব্দটা ভয়াবহ ফিত্নার উৎস। 'হু' শব্দের সাথে ইসলামী যিক্রের কোনই সম্পর্ক নেই। এটা হচ্ছে আগাগোড়া বিদ'আত ও গোমরাহী। মানুষের অন্তর যে, সব সময় একই অবস্থায় থাকবে, আল্লাহর সত্তার সঠিক ধ্যান ধারণা যে মানুষের অন্তরে সব সময় বিরাজ থাকবে- তা থাকতে পারে না। কেমন করে কোন্ অলক্ষে যে বিভ্রান্তির মায়া হৃদয়ে স্পর্শ করে, কেউ তা টের পায় না। সে জন্য আল্লাহ তাঁর সকল শ্রেণীর বান্দাকে তাওবা করতে বলেছেন। কাজেই হু-হু-হু-হু করলেই যে আল্লাহকে ডাকা হবে- তা নাও হতে পারে। বরং সে সময় তার অন্তরে বিরাজমান বস্তুর দিকেই ইঙ্গিত হতে পারে। আর তা যদি হয়, তাহলে সে গোমরাহীর অতল তলে তলিয়ে যাবে। অতএব তথাকথিত ঐসব মারফতী ফকিরদের উদ্ভট যিক্র থেকে প্রত্যেক মুসলমানকে হুশিয়ার থাকতে হবে।
অর্থবোধক পূর্ণ বাক্য দিয়ে যিক্র করার কথা শরীয়তে রয়েছে, সেরূপ যিক্রই আমাদেরকে করতে হবে। যিক্র দুই প্রকারে আমরা করতে পারি। কোন অন্যায় কাজ সামনে এলে আল্লাহকে স্মরণ করে তা থেকে যদি বিরত হতে পারি, কোন অন্যায় যদি হয়েই যায়, তাহলে আল্লাহকে স্মরণ করে তাওবা ইস্তিগফারের বাক্য যদি মনে মনে পড়তে পারি, তাহলে এটা হবে খুবই মূল্যবান। একে বলে 'যিক্র খফী।' তাছাড়া আল্লাহর প্রশংসাসূচক বাক্য নিম্নস্বরেও উচ্চারণ করতে পারি। এ ধরনের যিকেও যিক্র খফী বলে।
আর এক ধরনের যিক্র হচ্ছে- "যিক্র জলী"। তথাকথিত পীর ফকিররা লম্ফ ঝম্ফ করে গুরু গম্ভীর স্বরে বিকট চীৎকার করে যে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে থাকে, এটাকেই তারা বলছে- "যিক্রে জলী"। কিন্তু আসলে তা নয়। মানুষের সাথে মানুষ সাধারণ স্বরে যেভাবে কথা বলে, সাধারণত যে স্বরে মানুষ কুরআন তিলাওয়াত করে সেই স্বরে আল্লাহর প্রশংসাসূচক বাক্য উচ্চারণ করাকে "যিক্র জলী” বলে।
আযান ছাড়া আল্লাহর যত প্রকার প্রশংসাসূচক বাক্য আছে, সবগুলোর উচ্চারণ সাধারণ স্বরেই করতে হবে। খুব জোরে চলবে না। কুরআনে সূরা বানী ইসরাঈল ১১০ নং আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করছে- وَلَا تَجْهَرْ بِصَلَاتِكَ وَلَا تُخَافِتْ بِهَا وَابْتَغِ بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا * "নামাযে চীৎকার করে তিলাওয়াত করো না, আর একেবারে নিম্নস্বরেও তিলাওয়াত করো না। বরং দুয়ের মাঝামাঝি পথ ধরো।"
নামাযে যা কিছু পড়া হয়, সেগুলো অবশ্যই যিক্রের অন্তর্ভুক্ত। কাজেই এই আয়াত থেকে বুঝা গেল, বিকট চীৎকার করে যিক্র করা হারাম।
একদিন আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাইবার যুদ্ধে যাচ্ছেন, সাহাবীরা সঙ্গে আছেন। একটা উপত্যকা পার হবার সময় কয়েকজন সাহাবী "আল্লাহু আকবার”, “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু” বলে খুব জোড়ে চীৎকার শুরু করে দিলো। তাতে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'হে জনগণ! তোমরা নিজেদের প্রতি সদয় হয়ে খুব জোরে চীৎকার থেকে বিরত হও। জেনে রেখো, তোমরা কোন বধিরকে বা অনুপস্থিতকে ডাকছো না।
আরও জেনে রেখো, তোমরা এমন একজন শ্রবণকারী, দর্শনকারী ও নিকটবর্তীকে ডাকছো, যিনি তোমাদের সাথেই আছেন। (বুখারী, মুসলিম)
পাঠক এথেকে পরিষ্কার বুঝতে পারছেন যে, অর্থবোধক পূর্ণ বাক্য দ্বারা আল্লাহকে স্মরণ, আল্লাহর প্রশংসা-ব্যঞ্জক পর্ণবাক্য নিম্নস্বরে বা সাধারণ স্বরে উচ্চারণ করাকেই যিক্র বলে। আর এর ব্যতিক্রম ঘটালেই বুঝতে হবে, ওটা যিক্র নয়- 'মক্কর'।
এক শ্রেণীর পীর বলেন, শরীরের মধ্যে ছয়টা লতিফা আছে। ডান স্তনের একটু নীচে আছে 'লতিফায়ে কলব'। যাম স্তনের একটু নীচে আছে 'লতিফায়ে রুহ্'। নাভির নীচে আছে 'লতিফায়ে নফস্'। দুই স্তনের মাঝখানে আছে 'লতিফায়ে সের'। কপালে আছে 'লতিফায়ে খফী'। আর তালুতে আছে 'লতিফায়ে আখফা'। তাঁরা বলেন, 'লা' শব্দটাকে লতিফায়ে নফস্ হতে অর্থাৎ নাভীর নীচে থেকে টেনে বের করে 'লতিফায়ে সের' অর্থাৎ দুই স্তনের মাঝে নিয়ে যেতে হবে। সেখানে থেকে 'লতিফায়ে খফী' অর্থাৎ কপালে ও তথা হতে 'লতিফায়ে আখফা' অর্থাৎ তালুতে নিয়ে যেতে হবে। 'ইলাহ'কে ধরে নিয়ে যেয়ে লতিফায়ে 'রুহ' অর্থাৎ বাম স্তনের কাছে নিয়ে যেতে হবে। ওখানে যেয়ে 'ইলাহ'কে ছেড়ে দিয়ে 'ইল্লাল্লাহ'কে ধরে নিয়ে যেয়ে 'লতিফায়ে কল্প' অর্থাৎ ডান স্তনের কাছে ধাক্কা মারতে হবে। এভাবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র যিকির করতে হবে।
যিকির আমাদেরকে করতেই হবে কিন্তু যে সব লতিফার কথা উল্লেখ করে পীর সাহেবরা যিকিরের ফর্মুলা বের করেছেন, তার প্রমাণ কুরআন ও হাদীসে আছে কিনা সেটাই হল আমাদের দেখার বিষয়। পবিত্র কুরআনে একশত চৌদ্দটা সূরা আছে, মোট ছয় হাজার ছয়শত ছেষট্টিটা আয়াত আছে। অতীব দুঃখের বিষয় এই যে, পীর সাহেবদের ছয় লতিফার কথা কোন আয়াতে পাওয়া যায় না। তারপর বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ প্রভৃতি হাদীসের কিতাবগুলো খুঁজে দেখেছি, প্রিয় নবীর কোন হাদীস থেকে ছয় লতিফার বিবরণ মিলে না। তাহলে প্রশ্ন হল, ছয় লতিফার বিবরণ পীর সাহেবরা পেলেন কোত্থেকে? অবশ্য কোন কোন পীর বলেন, এসব গোপন তথ্য আল্লাহর নবী হযরত আলী (রাযি.)-কে দিয়ে গেছেন। হযরত আলী (রাযি.) আবার এসব তথ্য হাসান বসরীকে দিয়ে গেছেন। হাসান বসরীর কাছ থেকে নাকি পীর কিবলারা সব কলবে কলবে পেয়ে আসছেন। তাই যদি হয়, তাহলে হযরত আলী বাদে বাকী সাহাবীদের বাঁচার পথ কি? আল্লাহর নবীর স্ত্রীদের অবস্থাই বা কি হবে?
পীর কিবলারা এ সম্পর্কে কি বলেন? আল্লাহর নবী ছয় লতিফার মূলতত্ত্ব কাউকে না দিয়ে কেবলমাত্র হযরত আলী (রাযি.)-কে দিয়ে গেলেন- একথা বলায় আল্লাহর নবীকে কি পক্ষপাতিত্ব দোষে দোষী করা হচ্ছে না? যারা এরূপ আক্বিদা পোষণ করে, তারা কতটা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত পাঠকগণ তার বিচার করবেন।
আর এক শ্রেণীর পীর আছে, মেয়েদেরকে মুরীদ বানাতে বেশী আগ্রহী। যখন কোন মেয়ে মুরীদ হতে যায়, তখন তাকে নির্জন নিরালা ঘরে বসিয়ে ডান স্তনে, বাম স্তনে, নাভীর নীচে, দুই স্তনের মাঝে, কপালে ও তালুর নীচের লতিফা চিনাতে শুরু করে দেয়। আল্লাহ জানেন কোথায় যেয়ে এর শেষ হয়। আমার মনে হয়, এ দৃশ্য দেখে মস্তবড় আজাজিলেরও কাঁপুনি শুরু হয়ে যায়।
যিকিরের এই সমালোচনা শুনে অনেকেই হয়ত ভাবছেন, তাহলে বোধ হয় যিক্র করাই বাতিল হয়ে গেল। কিন্তু না, কখনই তা ভাববেন না। কুরআন ও হাদীসে যখন যিক্রের ফজিলতের কথা উল্লেখ রয়েছে, তখন যিক্র আমাদেরকে করতেই হবে। আল্লাহ বলেন, 'فَاذْكُرُونِي اَذْكُرُكُمْ আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করব।
আল্লাহর রসূল বলেছেন: যখন কোন দল আল্লাহর যিক্র বক্সে যান, তখন ফেরেস্তারা তাদেরকে ঘিরে ফেলে ও আল্লাহর রহমত তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তাদের উপর আল্লাহর শান্তি নাযির হয় আর আল্লাহর নিকটবর্তী যারা আল্লাহ তাদের কাছে ওদের কথা উল্লেখ করেন। (মেশকাত)
আল্লাহর নবী আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি তার প্রভুর যিক্র করে, আর যে ব্যক্তি যিক্র করে না, তাদের উপমা হচ্ছে, জীবিত ও মৃতের মত। (বুখারী)
কাজেই যিক্র আমাদেরকে করতেই হবে। তবে যিক্র কাকে বলে, সেটাই জানার দরকার। যিক্র শব্দের অর্থ হচ্ছে স্মরণ করা বা স্মরণে রাখা। আল্লাহর যিক্র করা মানে আল্লাহর সঙ্গে মনের যোগ সাধন করা। শব্দের সঙ্গে এর কোন সম্বন্ধই নেই। তবে মনের কোন ভাব বা মস্তিষ্কের কোন চিন্তা ভাষার বাহনকে অবলম্বন না করে প্রকাশ পেতে পারে না। তাই এক শ্রেণীর লোক শব্দের আশ্রয় না নিয়ে স্মরণীয় বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিতে পারেন। কিন্তু তথাকথিত এই মারফতী পীর বা ফকিরের দল, আল্লাহর বিভিন্ন নাম ও 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' কলেমাকে নিয়ে লতিফার উল্লেখ করে যেভাবে বিকট চীৎকার করে থাকে, আর উৎকট ও উদ্ভট কৃষ্ণ সাধনার প্রশ্রয় দিয়ে থাকে- তা কখনই যিক্র নয়। ইসলামের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। এসব হচ্ছে এদেশের 'বামমার্গী' প্রভৃতি ভ্রান্ত সাধকদের অন্ধ-অনুকরণ আর অন্যদিকে হচ্ছে 'রিয়া' বা লোক দেখানো বুজুর্গী প্রকাশের প্রধান অবলম্বন। আল্লাহর সঙ্গে যখন যার মনোযোগ ঘটবে, তখন তার পক্ষে ঐরূপ উৎকট লম্প-ঝম্প বা উদ্ভট হৈ হৈ চীৎকার আদৌ সম্ভবপর নয়।
আর একদল মারফতী পীর বা ফকির বলেন, ছয় লতিফার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর যিক্র হচ্ছে থার্ডক্লাসের লোকের জন্য, আর যারা সেকেন্ড ক্লাসের লোক তারা কেবল 'আল্লাহু আল্লাহু' জপ করবে। আর একেবারে আপার ক্লাসের পরম বিশিষ্ট সাধক যারা, তারা কেবল হু-হু-হু-হু করবে।
কিন্তু আমরা পবিত্র কুরআন ও হাদীসে এ ধরনের যিক্রের হুকুম দেখি না। আল্লাহর রসূল ও আল্লাহ! আল্লাহ! বা হু-হু-হু-হু জপ করার ব্যবস্থা দেননি। ইসলামী শরীয়তে যিক্রের যে হুকুম দেয়া হয়েছে তা অর্থপূর্ণ আর নির্দিষ্ট কোন না কোন উদ্দেশ্যের সহায়ক।
যখন কুরআনের এই আয়াত নাযিল হল-
فَسَبِّحْ بِسْمِ رَبِّكَ الْعَظِيمُ
"আপনি আপনার মহিমান্বিত রবের নামে তাস্বীহ করুন" তখন আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদেরকে বললেন : "اجْعَلُوا فِي رُكُوعِكُمْ" এটাকে তোমরা রুকুতে পালন করবে।
যখন কুরআনের এই আয়াত নাযিল হল, “سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى " আপনার রহমান রবের তাসবীহ করুন। তখন আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম مسلمانوںকে বললেন : “اجْعَلُواهَا فِي سُجُودِكُمْ" তোমরা এটাকে সিজদায় পালন করবে। রসূলুল্লাহর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথার তাৎপর্য বুখারীতে লেখা আছে, আল্লাহর রসূল রুকুতে "سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمُ” আর সিজদায় “سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى” পাঠ করতেন। শুধু ইয়া রব, ইয়া রব বা আল্লাহু, আল্লাহু বা কেবল হু-হু-হু-হু করতেন না। এ থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে, আল্লাহর নামের তাসবীহ ও যিক্র অর্থবোধক সম্পূর্ণ বাক্যের দ্বারা করতে হবে।
আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: أَفْضَلُ الذِّكْرِ لَا إِلَهَ إِلا اللَّهَ وَأَفْضَلُ الدُّعَاءِ الْحَمْدُ لِلَّهِ অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ঠ জিকির হচ্ছে লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ আর সর্বশ্রেষ্ঠ দু'আ হচ্ছে- "আল-হামদু লিল্লাহ”। (ইবনু মাজা)
বুখারীতে আছে, আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: কুরআনের পর চারটি বাক্য হচ্ছে উত্তম এবং তা কুরআন থেকেই নেয়া হয়েছে। এ চারটি বাক্য হচ্ছেঃ (১) সুবহানাল্লাহ (২) আল-হামদুলিল্লাহ (৩) লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (৪) আল্লাহু আকবার।
বুখারী ও মুসলিমে আছে, আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি দৈনিক একশত বার لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ উচ্চারণঃ “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর" বলবে, সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তা'আলা সারাদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা করবেন।
বুখারীতে আরও আছে, আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: দুটি বাক্য জবানে উচ্চারণ করতে খুব সহজ কিন্তু ওজনের পাল্লায় খুব ভারী আর রহমানের খুব প্রিয়, বাক্য দু'টি হচ্ছে- سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمُ
উচ্চারণঃ "সুবহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহী, সুবহানাল্লাহিল আযীম।"
ইসলামী শরীয়তের বিধান হলো নামাযে আল্লাহু আকবার, রব্বানা লাকাল হামদু, সুবহানা রব্বিয়াল আযীম, সুবহানা রব্বিয়ার আলা, আল-হামদু লিল্লাহ প্রভৃতি পাঠ করতে হয়। প্রত্যেক কাজের সূচনায় বিস্মিল্লাহ বলতে হয়।
মোটকথা, আযানে, ইকামতে, নামাযে, হাজ্জে, ঈদে, প্রত্যেক কাজের আরম্ভে, সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে, স্বদেশে-বিদেশে, সব সময়ে যে সব তাস্বীহ ও যিক্র করার ব্যবস্থা আল্লাহ ও তাঁর রসূল দিয়েছেন, সেগুলির কোনটাই এক শাব্দিক বা অসম্পূর্ণ বাক্য নয়।
আপার ক্লাসের লোকগুলো যে হু-হু-হু-হু করে থাকে, এরও কোন প্রমাণ কুরআন হাদীসে নেই। 'হু' শব্দটা হচ্ছে সর্বনাম। এর অর্থ হচ্ছে 'সে'। যারা কেবল সে-সে-সে-সে করে থাকে তারা পথভ্রষ্ট। কারণ এক শব্দ দিয়ে বা অসম্পূর্ণ কথা দিয়ে, সাহাবা ও তাবেয়ীগণ কখনো যিক্র করেনি। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরনের যিক্র করতে বলেননি। 'হু' শব্দ কোন বাক্য নয়। হু শব্দ দ্বারা কোন নিশ্চিত অর্থ বুঝা যায় না। হু-হু শব্দটা ভয়াবহ ফিত্নার উৎস। 'হু' শব্দের সাথে ইসলামী যিক্রের কোনই সম্পর্ক নেই। এটা হচ্ছে আগাগোড়া বিদ'আত ও গোমরাহী। মানুষের অন্তর যে, সব সময় একই অবস্থায় থাকবে, আল্লাহর সত্তার সঠিক ধ্যান ধারণা যে মানুষের অন্তরে সব সময় বিরাজ থাকবে- তা থাকতে পারে না। কেমন করে কোন্ অলক্ষে যে বিভ্রান্তির মায়া হৃদয়ে স্পর্শ করে, কেউ তা টের পায় না। সে জন্য আল্লাহ তাঁর সকল শ্রেণীর বান্দাকে তাওবা করতে বলেছেন। কাজেই হু-হু-হু-হু করলেই যে আল্লাহকে ডাকা হবে- তা নাও হতে পারে। বরং সে সময় তার অন্তরে বিরাজমান বস্তুর দিকেই ইঙ্গিত হতে পারে। আর তা যদি হয়, তাহলে সে গোমরাহীর অতল তলে তলিয়ে যাবে। অতএব তথাকথিত ঐসব মারফতী ফকিরদের উদ্ভট যিক্র থেকে প্রত্যেক মুসলমানকে হুশিয়ার থাকতে হবে।
অর্থবোধক পূর্ণ বাক্য দিয়ে যিক্র করার কথা শরীয়তে রয়েছে, সেরূপ যিক্রই আমাদেরকে করতে হবে। যিক্র দুই প্রকারে আমরা করতে পারি। কোন অন্যায় কাজ সামনে এলে আল্লাহকে স্মরণ করে তা থেকে যদি বিরত হতে পারি, কোন অন্যায় যদি হয়েই যায়, তাহলে আল্লাহকে স্মরণ করে তাওবা ইস্তিগফারের বাক্য যদি মনে মনে পড়তে পারি, তাহলে এটা হবে খুবই মূল্যবান। একে বলে 'যিক্র খফী।' তাছাড়া আল্লাহর প্রশংসাসূচক বাক্য নিম্নস্বরেও উচ্চারণ করতে পারি। এ ধরনের যিকেও যিক্র খফী বলে।
আর এক ধরনের যিক্র হচ্ছে- "যিক্র জলী"। তথাকথিত পীর ফকিররা লম্ফ ঝম্ফ করে গুরু গম্ভীর স্বরে বিকট চীৎকার করে যে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে থাকে, এটাকেই তারা বলছে- "যিক্রে জলী"। কিন্তু আসলে তা নয়। মানুষের সাথে মানুষ সাধারণ স্বরে যেভাবে কথা বলে, সাধারণত যে স্বরে মানুষ কুরআন তিলাওয়াত করে সেই স্বরে আল্লাহর প্রশংসাসূচক বাক্য উচ্চারণ করাকে "যিক্র জলী” বলে।
আযান ছাড়া আল্লাহর যত প্রকার প্রশংসাসূচক বাক্য আছে, সবগুলোর উচ্চারণ সাধারণ স্বরেই করতে হবে। খুব জোরে চলবে না। কুরআনে সূরা বানী ইসরাঈল ১১০ নং আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করছে- وَلَا تَجْهَرْ بِصَلَاتِكَ وَلَا تُخَافِتْ بِهَا وَابْتَغِ بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا * "নামাযে চীৎকার করে তিলাওয়াত করো না, আর একেবারে নিম্নস্বরেও তিলাওয়াত করো না। বরং দুয়ের মাঝামাঝি পথ ধরো।"
নামাযে যা কিছু পড়া হয়, সেগুলো অবশ্যই যিক্রের অন্তর্ভুক্ত। কাজেই এই আয়াত থেকে বুঝা গেল, বিকট চীৎকার করে যিক্র করা হারাম।
একদিন আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাইবার যুদ্ধে যাচ্ছেন, সাহাবীরা সঙ্গে আছেন। একটা উপত্যকা পার হবার সময় কয়েকজন সাহাবী "আল্লাহু আকবার”, “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু” বলে খুব জোড়ে চীৎকার শুরু করে দিলো। তাতে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'হে জনগণ! তোমরা নিজেদের প্রতি সদয় হয়ে খুব জোরে চীৎকার থেকে বিরত হও। জেনে রেখো, তোমরা কোন বধিরকে বা অনুপস্থিতকে ডাকছো না।
আরও জেনে রেখো, তোমরা এমন একজন শ্রবণকারী, দর্শনকারী ও নিকটবর্তীকে ডাকছো, যিনি তোমাদের সাথেই আছেন। (বুখারী, মুসলিম)
পাঠক এথেকে পরিষ্কার বুঝতে পারছেন যে, অর্থবোধক পূর্ণ বাক্য দ্বারা আল্লাহকে স্মরণ, আল্লাহর প্রশংসা-ব্যঞ্জক পর্ণবাক্য নিম্নস্বরে বা সাধারণ স্বরে উচ্চারণ করাকেই যিক্র বলে। আর এর ব্যতিক্রম ঘটালেই বুঝতে হবে, ওটা যিক্র নয়- 'মক্কর'।