📘 পীরতন্ত্রের আজবলীলা > 📄 আল্লাহর ওলীদের কারামতি

📄 আল্লাহর ওলীদের কারামতি


নিশ্চয়ই আল্লাহর যাঁরা ওলী, তাঁদের মধ্যে কারামত বা বুজুর্গী আছে। নিশ্চয়ই তাঁরা ইলহাম পান। পাবেন না কেন। আল্লাহর তরফ থেকে মনের মধ্যে যে ভাল কথার উদয় হয়, সৎ চিন্তা জেগে উঠে, তাকেই বলে ইলহাম। সামনে একটা কাজ, কাজটা করা ভাল হবে না মন্দ হবে বুঝা যাচ্ছে না। সত্যিকারভাবে কাজটার মধ্যে যদি ভালায়ী থাকে, আর আপনি যদি আল্লাহওয়ালা বা আল্লাহর প্রিয় হতে পারেন, তাহলে আল্লাহর তরফ হতে ঐ কাজটা করার প্রেরণা আপনার অন্তরে জেগে উঠবেই উঠবে। আর যদি কাজটার মধ্যে অকল্যাণ থাকে, তাহলে ঐ কাজটার প্রতি অন্তরে ঘৃণা জাগবেই জাগবে। আল্লাহর ওলী হওয়ার সৌভাগ্য যাঁর হয়েছে, তার অন্তরে আল্লাহর তরফ থেকে ইলহাম বা নেক খেয়াল ও ভাল কথার উদয় হবেই হবে। জাগ্রত বা নিদ্রিত যে কোন অবস্থায় এ ইঙ্গিত তিনি নিশ্চয়ই পাবেন। আর সেই ভাবটুকু ব্যক্ত করার নামই হচ্ছে কারামত বা বুজুর্গী।
কিন্তু ঐ যে বক-তপস্বী লাখ লাখ মানুষের মাথায় হাত বুলিয়ে অর্থের পাহাড় জমাবার ফাঁদ পেতে বসে আছে। ঐ যে লালসা সর্বস্ব বক ধার্মিক একদল দালালের মারফত নিজেকে হাদীয়ে-জামান, পীরে কামেল, আওলিয়াকুল শিরোভূষণ বলে জনগণের মাঝে প্রচার করে বেড়াচ্ছে। ঐ যে কুরআন হাদীস না জানা বে-ইলম মূর্খ পীর, দালালদেরকে 'টুপাইস' বাগাবার সুযোগ দিয়ে তাদের মাধ্যমে নিজেকে লাখ লাখ মানুষের পথ প্রদর্শক বলে প্রচার করে বেড়াচ্ছে- সে কম বখতরা কখনই ইলহাম বা বুজুর্গী পেতে পারে না। তারা পায় শয়তানী অসওয়াসা বা ইবলিসী বুদ্ধি।
প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর ওলী কারা- তা জানার দরকার। আল্লাহ বলেন:
الَّا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ * الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ *
“দেখ, যারা আল্লাহর অলী তাদের ভয়ের কোন কারণ নেই আর তারা কখনো চিন্তিত হবে না। তারা সেই সকল লোক যারা মুমিন হয়েছে আর সর্বদাই মুত্তাকী হয়ে চলে।” (সূরা ইউনুস ৬২-৬৩)
তাহলে এখানে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে, মুমিন ও মুত্তাকী যিনি, তিনিই আল্লাহর ওলী, আর যে মুমিন ও মুত্তাকী নয়, সে আল্লাহর ওলী নয়। এখন মুমিন ও মুত্তাকী কে? একথা লিখতে গেলে স্বতন্ত্র এক কিতাব লিখতে হয়। তবে সংক্ষেপ কথা এই যে, আল্লাহর প্রতি, তাঁর সত্বা ও গুণাবলীর প্রতি, তাঁর একত্ব ও আনুগত্যের প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, আসস্মানী কিতাবসমূহের প্রতি, আল্লাহর রসূলগণের প্রতি, মধ্য লোকের প্রতি, কিয়ামতের প্রতি, বেহেশত ও দোজখের প্রতি বিশ্বাস রেখে আল্লাহর নির্ধারিত শরীয়তকে ঠিকমত যে ব্যক্তি মেনে চলতে পারে, সেই হয় মুমিন, মুত্তাকী- সেই হয় আল্লাহর ওলী।
শরীয়তের বিধানে রয়েছে, তুমি যাবতীয় শির্ক ও কুফর থেকে, ভ্রান্ত আকিদা থেকে, কুসংস্কার থেকে, হিংসা-বিদ্বেষ ও কপটতা থেকে, আত্মশ্লাঘা থেকে, পরশ্রী-কাতরতা থেকে, কৃপণতা থেকে, কাপুরুষতা থেকে, মিথ্যা-প্রবঞ্চণা থেকে মনকে মুক্ত রেখে ঠিকমত আমল কর, অন্যায় থেকে তাওবা কর, আল্লাহর গজবের ভয় ও তাঁর রহমতের আশা পোষণ কর, আল্লাহর নিয়ামতের শুকরগুজারী কর, বিশ্বস্ত হও, বিপদে আপদে ধৈর্যধারণ কর, আল্লাহর দেয়া নিয়ামতে সন্তুষ্ট থাক, আল্লাহর উপর নির্ভরতা রাখ, দয়ালু ও বিনয়ী হও, সেই সঙ্গে বড়দেরকে সম্মান কর, ছোটদেরকে স্নেহ কর, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' মন্ত্র উচ্চারণ কর, মহাগ্রন্থ কুরআন মাজীদ পাঠ কর, অপরকে কুরআন শিক্ষা দাও, দু'আ ও আল্লাহর নাম স্মরণ কর, নাপাকী বর্জন কর, বিবস্ত্রতা দূর কর, ফরজ ও নফল রোযা রাখ, শারীরিক ও আর্থিক ক্ষতি থাকলে হাজ্জব্রত পালন কর, পরের উপকার কর, ছেলে-মেয়েদেরকে লালন পালন কর, মা বাপের সেবা কর, আত্মীয়দের প্রতি সদ্ব্যবহার কর, ন্যায়ের জন্য আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধ কর, অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিহাদ কর, ধার করজ দিও, অপরের পাওনা মিটিয়ে দিও, প্রতিবেশীর সম্মান রক্ষা কর, লেনদেন ও অন্যান্য ব্যবহারে সাধুতা বজায় রাখ, হালাল উপায়ে উপার্জন কর, কাউকে দুঃখ দিওনা- এসব শরীয়তের আদেশ নিষেধগুলি ঠিকমত যদি তুমি মেনে চলতে পার, তাহলে মুমিন ও মুত্তাকী তুমি হতে পারবে, আধ্যাত্মিক উন্নতি তোমার হবেই হবে। অন্তর ও বাহিরের মনুষ্যত্ব ও মহত্বের বিকাশ তোমার ঘটবেই ঘটবে। হকিকত ও মারেফতের দরজায় তুমি নিশ্চয়ই পৌঁছতে পারবে। পীরের আড্ডায় যেয়ে, পীরের পায়ে আর চুমা দিতে হবে না। উরুসের মেলায় চাল-ডাল কুমড়ো-খাসাঁ নিয়ে যেয়ে খিচড়ী পাকিয়ে খেয়েদেয়ে হেউ হেউ করে ঢেকুর তুললেই তোমার মারেফত হাসিল হবে না। জেনে রেখ-
کھتا ھے جسے لوگ حقیقت و طریقت رکہتا ھے جسکا نام مشائخ نے معرفت واى ڈالیاں هے بیخ هے ان سبکی شرعیت هو جر نه پائی در تو جائے شجر الٹ
কর্তা হ্যায় জিসে লোক হকিকত ও তরিকত রাখা হ্যায় জিস্কা নাম মাশায়েখ নে মারেফাত ওয়ায় ডালিয়া হ্যায় বেখ্ হ্যায় উন্‌ন্সী শরীয়ত হো জর না পায়েদর তো জায়ে শাজার উলাট।
লোকে যাতে তরিকত, হকিকত, মারেফত বলে, ওসব হচ্ছে ডালপালা। মূল হচ্ছে শরীয়ত। মূল যদি মজবুত না হয়, তাহলে ডালপালার অস্তিত্বই থাকবে না।
মোটকথা শরীয়ত ছাড়া হকিকত, তরিকত, মারেফতের অস্তিত্বই নেই। যারা শরীয়তের বাইরে মুক্তির পথ খুঁজে বেড়ায়, তারা বিভ্রান্ত-তারা কাফির। আর যারা শরীয়তের বিধি-বিধান মেনে চলে, তারাই মুমিন মুত্তাকী-তারাই আল্লাহর ওলী। আল্লাহ তাঁদের অন্তরে ইলহাম অর্থাৎ নেক খেয়াল দিয়ে কারামত অর্থাৎ বুজরুগী দান করেন।

নিশ্চয়ই আল্লাহর যাঁরা ওলী, তাঁদের মধ্যে কারামত বা বুজুর্গী আছে। নিশ্চয়ই তাঁরা ইলহাম পান। পাবেন না কেন। আল্লাহর তরফ থেকে মনের মধ্যে যে ভাল কথার উদয় হয়, সৎ চিন্তা জেগে উঠে, তাকেই বলে ইলহাম। সামনে একটা কাজ, কাজটা করা ভাল হবে না মন্দ হবে বুঝা যাচ্ছে না। সত্যিকারভাবে কাজটার মধ্যে যদি ভালায়ী থাকে, আর আপনি যদি আল্লাহওয়ালা বা আল্লাহর প্রিয় হতে পারেন, তাহলে আল্লাহর তরফ হতে ঐ কাজটা করার প্রেরণা আপনার অন্তরে জেগে উঠবেই উঠবে। আর যদি কাজটার মধ্যে অকল্যাণ থাকে, তাহলে ঐ কাজটার প্রতি অন্তরে ঘৃণা জাগবেই জাগবে। আল্লাহর ওলী হওয়ার সৌভাগ্য যাঁর হয়েছে, তার অন্তরে আল্লাহর তরফ থেকে ইলহাম বা নেক খেয়াল ও ভাল কথার উদয় হবেই হবে। জাগ্রত বা নিদ্রিত যে কোন অবস্থায় এ ইঙ্গিত তিনি নিশ্চয়ই পাবেন। আর সেই ভাবটুকু ব্যক্ত করার নামই হচ্ছে কারামত বা বুজুর্গী।
কিন্তু ঐ যে বক-তপস্বী লাখ লাখ মানুষের মাথায় হাত বুলিয়ে অর্থের পাহাড় জমাবার ফাঁদ পেতে বসে আছে। ঐ যে লালসা সর্বস্ব বক ধার্মিক একদল দালালের মারফত নিজেকে হাদীয়ে-জামান, পীরে কামেল, আওলিয়াকুল শিরোভূষণ বলে জনগণের মাঝে প্রচার করে বেড়াচ্ছে। ঐ যে কুরআন হাদীস না জানা বে-ইলম মূর্খ পীর, দালালদেরকে 'টুপাইস' বাগাবার সুযোগ দিয়ে তাদের মাধ্যমে নিজেকে লাখ লাখ মানুষের পথ প্রদর্শক বলে প্রচার করে বেড়াচ্ছে- সে কম বখতরা কখনই ইলহাম বা বুজুর্গী পেতে পারে না। তারা পায় শয়তানী অসওয়াসা বা ইবলিসী বুদ্ধি।
প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর ওলী কারা- তা জানার দরকার। আল্লাহ বলেন:
الَّا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ * الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ *
“দেখ, যারা আল্লাহর অলী তাদের ভয়ের কোন কারণ নেই আর তারা কখনো চিন্তিত হবে না। তারা সেই সকল লোক যারা মুমিন হয়েছে আর সর্বদাই মুত্তাকী হয়ে চলে।” (সূরা ইউনুস ৬২-৬৩)
তাহলে এখানে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে, মুমিন ও মুত্তাকী যিনি, তিনিই আল্লাহর ওলী, আর যে মুমিন ও মুত্তাকী নয়, সে আল্লাহর ওলী নয়। এখন মুমিন ও মুত্তাকী কে? একথা লিখতে গেলে স্বতন্ত্র এক কিতাব লিখতে হয়। তবে সংক্ষেপ কথা এই যে, আল্লাহর প্রতি, তাঁর সত্বা ও গুণাবলীর প্রতি, তাঁর একত্ব ও আনুগত্যের প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, আসস্মানী কিতাবসমূহের প্রতি, আল্লাহর রসূলগণের প্রতি, মধ্য লোকের প্রতি, কিয়ামতের প্রতি, বেহেশত ও দোজখের প্রতি বিশ্বাস রেখে আল্লাহর নির্ধারিত শরীয়তকে ঠিকমত যে ব্যক্তি মেনে চলতে পারে, সেই হয় মুমিন, মুত্তাকী- সেই হয় আল্লাহর ওলী।
শরীয়তের বিধানে রয়েছে, তুমি যাবতীয় শির্ক ও কুফর থেকে, ভ্রান্ত আকিদা থেকে, কুসংস্কার থেকে, হিংসা-বিদ্বেষ ও কপটতা থেকে, আত্মশ্লাঘা থেকে, পরশ্রী-কাতরতা থেকে, কৃপণতা থেকে, কাপুরুষতা থেকে, মিথ্যা-প্রবঞ্চণা থেকে মনকে মুক্ত রেখে ঠিকমত আমল কর, অন্যায় থেকে তাওবা কর, আল্লাহর গজবের ভয় ও তাঁর রহমতের আশা পোষণ কর, আল্লাহর নিয়ামতের শুকরগুজারী কর, বিশ্বস্ত হও, বিপদে আপদে ধৈর্যধারণ কর, আল্লাহর দেয়া নিয়ামতে সন্তুষ্ট থাক, আল্লাহর উপর নির্ভরতা রাখ, দয়ালু ও বিনয়ী হও, সেই সঙ্গে বড়দেরকে সম্মান কর, ছোটদেরকে স্নেহ কর, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' মন্ত্র উচ্চারণ কর, মহাগ্রন্থ কুরআন মাজীদ পাঠ কর, অপরকে কুরআন শিক্ষা দাও, দু'আ ও আল্লাহর নাম স্মরণ কর, নাপাকী বর্জন কর, বিবস্ত্রতা দূর কর, ফরজ ও নফল রোযা রাখ, শারীরিক ও আর্থিক ক্ষতি থাকলে হাজ্জব্রত পালন কর, পরের উপকার কর, ছেলে-মেয়েদেরকে লালন পালন কর, মা বাপের সেবা কর, আত্মীয়দের প্রতি সদ্ব্যবহার কর, ন্যায়ের জন্য আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধ কর, অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিহাদ কর, ধার করজ দিও, অপরের পাওনা মিটিয়ে দিও, প্রতিবেশীর সম্মান রক্ষা কর, লেনদেন ও অন্যান্য ব্যবহারে সাধুতা বজায় রাখ, হালাল উপায়ে উপার্জন কর, কাউকে দুঃখ দিওনা- এসব শরীয়তের আদেশ নিষেধগুলি ঠিকমত যদি তুমি মেনে চলতে পার, তাহলে মুমিন ও মুত্তাকী তুমি হতে পারবে, আধ্যাত্মিক উন্নতি তোমার হবেই হবে। অন্তর ও বাহিরের মনুষ্যত্ব ও মহত্বের বিকাশ তোমার ঘটবেই ঘটবে। হকিকত ও মারেফতের দরজায় তুমি নিশ্চয়ই পৌঁছতে পারবে। পীরের আড্ডায় যেয়ে, পীরের পায়ে আর চুমা দিতে হবে না। উরুসের মেলায় চাল-ডাল কুমড়ো-খাসাঁ নিয়ে যেয়ে খিচড়ী পাকিয়ে খেয়েদেয়ে হেউ হেউ করে ঢেকুর তুললেই তোমার মারেফত হাসিল হবে না। জেনে রেখ-
کھتا ھے جسے لوگ حقیقت و طریقت رکہتا ھے جسکا نام مشائخ نے معرفت واى ڈالیاں هے بیخ هے ان سبکی شرعیت هو جر نه پائی در تو جائے شجر الٹ
কর্তা হ্যায় জিসে লোক হকিকত ও তরিকত রাখা হ্যায় জিস্কা নাম মাশায়েখ নে মারেফাত ওয়ায় ডালিয়া হ্যায় বেখ্ হ্যায় উন্‌ন্সী শরীয়ত হো জর না পায়েদর তো জায়ে শাজার উলাট।
লোকে যাতে তরিকত, হকিকত, মারেফত বলে, ওসব হচ্ছে ডালপালা। মূল হচ্ছে শরীয়ত। মূল যদি মজবুত না হয়, তাহলে ডালপালার অস্তিত্বই থাকবে না।
মোটকথা শরীয়ত ছাড়া হকিকত, তরিকত, মারেফতের অস্তিত্বই নেই। যারা শরীয়তের বাইরে মুক্তির পথ খুঁজে বেড়ায়, তারা বিভ্রান্ত-তারা কাফির। আর যারা শরীয়তের বিধি-বিধান মেনে চলে, তারাই মুমিন মুত্তাকী-তারাই আল্লাহর ওলী। আল্লাহ তাঁদের অন্তরে ইলহাম অর্থাৎ নেক খেয়াল দিয়ে কারামত অর্থাৎ বুজরুগী দান করেন।

📘 পীরতন্ত্রের আজবলীলা > 📄 ভক্তি যেখানে অন্ধ

📄 ভক্তি যেখানে অন্ধ


পীরপরস্তি এমন এক মারাত্মক ব্যাধি, যা মানুষকে একেবারে অন্ধ করে দেয়। কয়েক বছর আগের কথা বলছি, তখন আমি কলকাতায় মাসিক তওহীদের সম্পাদনার কাজে লিপ্ত ছিলাম। একদিন এক ব্যবসায়িক হাজী সাহেব মাগরিবের নামাযের পর আমাকে বললেন, আজ এক কাণ্ড ঘটে গেছে, দাদ ভাল করতে যেয়ে কুষ্ঠব্যাধি হয়ে গেছে। আমি বললাম, কি ব্যাপার; বললেন, এক ফকীর 'দে বাবা খাজা দে দেলাদে- দে বাবা খাজা দে দেলাদে' বলে চিৎকার করতে করতে এসে আমার সামনে দাঁড়ালো, আমি জোরসে এক ধমক দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দিলাম। খানিকটা যেই গেছে, আবার তাকে ডাক দিলাম- একটু বুঝিয়ে বলব বলে। ফকির ঘুরে এল। তার হাতে একটা টাকা দিয়ে বললাম, ঐ মালাবা হোটেলে গোশত রুটি কিনে খাস। আর খবরদার, খাজা বাবার কাছে কিছু চাস্ না, খাজা বাবার কিছুই দিবার ক্ষমতা নেই। আল্লাহর কাছে চাইবি- আল্লাহই দেনেওয়ালা। ফকির টাকাটা হাতে পেয়ে বলছে, 'বাহরে খাজা বাহ্, দুশমন সে ভী তু দেলাতা হ্যায়? দে বাবা খাজা দে-দেলাদে।' বলতে বলতে ফকীর চলে গেল। আমি বললাম, হাজী সাহেব! ভক্তি যেখানে অন্ধ, প্রমাণ সেখানে অচল। অন্ধ ভক্তের কাছে কুরআনে দলীল, বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ প্রভৃতি হাদীসের দলীল অচল।
এ প্রসঙ্গে আর এক ঘটনা শুনুন। অনেকদিন আগের ঘটনা। এক পীর সাহেব তাঁর এক শিষ্যকে বললেন- বাবা সহীরুদ্দীন! আমার গাইটা তাল পুকুরের পারে চরছে, সন্ধ্যার সময় নিয়ে এসে গোয়ালে বেঁধে দিসতো বাবা। সহীরুদ্দীন বলল হুজুর, আপনি গাই একটা কিনেছেন শুনেছি কিন্তু চোখে এখনো দেখিনি। পীর সাহেব বললেন, গাই বেশ মোটাসোটা, রং সাদা আর শিং দু'টো ছোট ছোট। একথা শুনে ঠিক সন্ধ্যার সময় সহীরুদ্দীন তাল পুকুরের পার থেকে গাই এনে পীর সাহেবের গোয়ালে বেঁধে দিল। আর ভালভাবে খল-ভূষী খেতে দিয়ে গোয়ালের দরজা বন্ধ করে দিল। সকাল বেলায় পীর সাহেবের স্ত্রী গোয়াল ঘরে যেয়ে দেখে, খুব বড় তাড়া এক ষাঁড় বাঁধা রয়েছে। পীর সাহেবের স্ত্রী তো কেঁদেই আকুল। পীর সাহেবও বিচলিত হয়ে সহীরুদ্দীনের কাছে যেয়ে বললেন, বাবা সহীর আমার গাই কই? দুধ না হলে আমার চলে না। তোর পীর মায়েরও চলে না- তাই চার সের দুধের গাই কিনে এনেছি, সেই গাই আমার কোথায় দিলি বাবা? সহীর বলল হুজুর, আপনার আদেশ শিরোধার্য করে সন্ধ্যার সময় গাই এনে গোয়ালে বেঁধে দিয়েছি। শুধু তাই নয়, ভালভাবে খল-ভুষা খেতে দিয়েছি। পীর সাহেব বললেন, গরুতো একটা বাঁধা রয়েছে রে বাবা, কিন্তু ওটা তো আমার গাই নয়, একটা ষাঁড় বাঁধা রয়েছে। আমার গাই কোথায় গেল? সহীর বলল হুজুর! আপনাকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, গাইটা কেমন? আপনি বললেন, বেশ মোটাসোটা, রং সাদা আর শিং দু'টো ছোট ছোটও বটে- অমনি আপনার গাই হাঁকিয়ে নিয়ে এসে আপনার গোয়ালে বেঁধে দিলাম। পীর সাহেব বললেন, একটু পিছন দিকে তাকিয়ে দেখলি না কেন? সহীর বলল, দেখতে তো বলেননি হুজুর, বললে নিশ্চয়ই দেখতাম। আপনি সব সময় আমাদেরকে বলেন, আমি যা বলব তাই শুনবি, এর বাইরে একচুল যাবি না। তাহলে কেমন করে আপনার কথার বাইরে যেতে পারি হুজুর বলুন।
বলাবাহুল্য, একেই বলে অন্ধভক্তি। এই অন্ধভক্তি পীর পূজকদেরকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, তারা পীর ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। তারা মনে করে পীর মুক্ত, পীর সর্বস্তরে বিরাজিত, পীর সবকিছুই জানেন। পীরের মূর্তি মনের মাঝে এঁকে নিয়ে ধ্যান করলে, সেই মূর্তির মাঝে পীরের রূহ এসে তার মনে ফয়েজ বা প্রেরণা যোগায়। এই বিশ্বাসে পীর পূজকরা পীরের মূর্তি মানসপটে এঁকে নিয়ে পীরের ধ্যানে মশগুল থাকে।
শুধু পীর পূজকদের দু'চারটা ওযীফা এখানে পাঠকদেরকে উপহার দিচ্ছি। লালনের ভক্তরা বলে-
লালনের মত কামেল পীর
ত্রিভুবনে নাই
অতএব লালনের সবে তরীক ধর ভাই।
এনায়েতপুরের ভক্তরা চোখ বন্ধ করে মাথা হিলিয়ে হিলিয়ে ওযীফা পাঠ করে-
যত নবী ওলী সব হবে মালগাড়ী
আর ইঞ্জিন হয়ে নিয়ে যাবে এনায়েতপুরী
ভাসানী সাহেবের অন্ধভক্তদের ওযীফা শুনুন।
দয়াল ভাসানী তোমার ঘাটে এলাম আমি, পার করে নাও।
দয়াল ভাসানী তোমার হালে হাল ধরেছি, পার করে নাও।
দয়াল ভাসানী কি যে দয়াল তুমি, বুঝেও বুঝি না আমি।
তোমার দয়ায়, তোমার দু'আয় ভাসিছে মোর জীবন তরী
এক ওসীলায় আমায় তুমি পার করে নাও।
দয়াল রে- তুমি যে কি যাদু জানো, হৃদয় ধরে টানো
ওগো দয়াল, ওগো নিঠুর ভাসানী
তুমিই আমার খাজা, তুমিই আমার রাজা
আমায় খাস প্রজা করে নাও। (হক কথা ২১/৩/৮৩)
আর একদল ঢোলে তালি মেরে মেরে ঘাড় হিলিয়ে হিলিয়ে কি ওযীফা পাঠ করে শুনুন-
امداد کن امداد کن از بندے گم آزاد کن در دین و دنیا شاد کن یا شیخ عبد قادر
এমদাদ কুন এমদাদ কুন আয বান্দেগম আযাদ কুন
দদীন ও দুনিয়া শাদ কুন ইয়া শেখ আব্দুল কাদেরা।
অর্থাৎ আমাকে মদদ কর, আমাকে মদদ কর, দুঃখ দুশ্চিন্তা হতে আমাকে মুক্ত কর, দীন ও দুনিয়ায় আমাকে সুখী কর, হে শেখ আব্দুল কাদের।
আর একদলের ওযীফা শুনুন-
پرا کر تو ارجو میری آے بابا خاجه اجميري آے بابا خاجه اجميري
পুরা কর তু আরজু মেরী আয় বাবা খাজা আজমিরী আয় বাবা খাজা আজমিরী।
তারা আরও বলে থাকে-
مدد کن یا معین الدین چشتی مدد کن یا معین الدین چشتی
মদদ কুন ইয়া মঈনুদ্দীন চিশতি মদদ কুন ইয়া মঈনুদ্দীন চিশতি।
তারা খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি রহমাতুল্লাহ আলাইহি নিরানব্বইটা নাম তৈরী করে নিয়ে নিয়মিতভাবে সেই নামের ওযীফা পাঠ করে থাকে। সে নামগুলি হচ্ছে এই-
আউয়ালো ইয়া মঈনুদ্দীন, আখেরো ইয়া মঈনুদ্দীন, জাহেরো ইয়া মঈনুদ্দীন, বাতেনো ইয়া মঈনুদ্দীন, জাব্বারো ইয়া মঈনুদ্দীন, গাফফারো ইয়া মঈনুদ্দীন, সাত্তারো ইয়া মঈনুদ্দীন, কুদ্দুসো ঈয়া মঈনুদ্দীন, রাহমানু ইয়া মঈনুদ্দীন ইত্যাদি। অর্থাৎ আল্লাহ রব্বুল আলামীনের যে নিরানব্বইটা গুণবাচক নাম রয়েছে, ঐ নামগুলি সব খাজা মঈনুদ্দীন চিশতির নামে লাগিয়ে দিয়ে মঈনুদ্দীন চিশতিকে আল্লাহর আসনে বসিয়ে দেয়া হয়েছে।
এ ধরনের বহু কথা রয়েছে। বইয়ের কলেবর বেড়ে যাওয়ার, ভয়ে ক্ষান্ত হলাম। শির্ক আর কাকে বলে; এরূপ আকিদার নামই শির্ক। যারা মানুষ হয়ে মানুষকে আল্লাহর আসনে বসায়; যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কথার উপর অপরের কথাকে গুরুত্ব দেয়, মুশরিক তারাই। কবি বলেন:
خداسے اور بزرگوا سے بہی کہنا يهي هي شرك يارو اسسے بچنا خدا فرما چکا قرآن کے اندر میرے محتاج هے پیر و پیغمبر نهی تاقت سوا میرے کسی میں جو کام آے تمھاری بکاسی میں
جو محتاج هو وے دسرے کا بہلا اس سے مدد کا مانگنا کیا
খোদাসে আওর বুজুরগুঁ সে ভী কহনা এহী হ্যায় শেরক্ ইয়ারো ইসে বাচনা খোদা ফরমা চুকা কুরআন কে আনদর মেরে মুহতাজ হ্যায় পীর ও পয়গম্বর নেহী তাকত সেওয়া মেরে কিসীমে জো কাম আয়ে তুম্হারী বেকাসী মে জো মুহতাজ হো বে দুস্র কা ভালা উল্সে মদদ কা মান্না কিয়া?
আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই অন্ধত্ব থেকে মুসলিম সমাজকে রক্ষা করুন এই প্রার্থনা করি।

পীরপরস্তি এমন এক মারাত্মক ব্যাধি, যা মানুষকে একেবারে অন্ধ করে দেয়। কয়েক বছর আগের কথা বলছি, তখন আমি কলকাতায় মাসিক তওহীদের সম্পাদনার কাজে লিপ্ত ছিলাম। একদিন এক ব্যবসায়িক হাজী সাহেব মাগরিবের নামাযের পর আমাকে বললেন, আজ এক কাণ্ড ঘটে গেছে, দাদ ভাল করতে যেয়ে কুষ্ঠব্যাধি হয়ে গেছে। আমি বললাম, কি ব্যাপার; বললেন, এক ফকীর 'দে বাবা খাজা দে দেলাদে- দে বাবা খাজা দে দেলাদে' বলে চিৎকার করতে করতে এসে আমার সামনে দাঁড়ালো, আমি জোরসে এক ধমক দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দিলাম। খানিকটা যেই গেছে, আবার তাকে ডাক দিলাম- একটু বুঝিয়ে বলব বলে। ফকির ঘুরে এল। তার হাতে একটা টাকা দিয়ে বললাম, ঐ মালাবা হোটেলে গোশত রুটি কিনে খাস। আর খবরদার, খাজা বাবার কাছে কিছু চাস্ না, খাজা বাবার কিছুই দিবার ক্ষমতা নেই। আল্লাহর কাছে চাইবি- আল্লাহই দেনেওয়ালা। ফকির টাকাটা হাতে পেয়ে বলছে, 'বাহরে খাজা বাহ্, দুশমন সে ভী তু দেলাতা হ্যায়? দে বাবা খাজা দে-দেলাদে।' বলতে বলতে ফকীর চলে গেল। আমি বললাম, হাজী সাহেব! ভক্তি যেখানে অন্ধ, প্রমাণ সেখানে অচল। অন্ধ ভক্তের কাছে কুরআনে দলীল, বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ প্রভৃতি হাদীসের দলীল অচল।
এ প্রসঙ্গে আর এক ঘটনা শুনুন। অনেকদিন আগের ঘটনা। এক পীর সাহেব তাঁর এক শিষ্যকে বললেন- বাবা সহীরুদ্দীন! আমার গাইটা তাল পুকুরের পারে চরছে, সন্ধ্যার সময় নিয়ে এসে গোয়ালে বেঁধে দিসতো বাবা। সহীরুদ্দীন বলল হুজুর, আপনি গাই একটা কিনেছেন শুনেছি কিন্তু চোখে এখনো দেখিনি। পীর সাহেব বললেন, গাই বেশ মোটাসোটা, রং সাদা আর শিং দু'টো ছোট ছোট। একথা শুনে ঠিক সন্ধ্যার সময় সহীরুদ্দীন তাল পুকুরের পার থেকে গাই এনে পীর সাহেবের গোয়ালে বেঁধে দিল। আর ভালভাবে খল-ভূষী খেতে দিয়ে গোয়ালের দরজা বন্ধ করে দিল। সকাল বেলায় পীর সাহেবের স্ত্রী গোয়াল ঘরে যেয়ে দেখে, খুব বড় তাড়া এক ষাঁড় বাঁধা রয়েছে। পীর সাহেবের স্ত্রী তো কেঁদেই আকুল। পীর সাহেবও বিচলিত হয়ে সহীরুদ্দীনের কাছে যেয়ে বললেন, বাবা সহীর আমার গাই কই? দুধ না হলে আমার চলে না। তোর পীর মায়েরও চলে না- তাই চার সের দুধের গাই কিনে এনেছি, সেই গাই আমার কোথায় দিলি বাবা? সহীর বলল হুজুর, আপনার আদেশ শিরোধার্য করে সন্ধ্যার সময় গাই এনে গোয়ালে বেঁধে দিয়েছি। শুধু তাই নয়, ভালভাবে খল-ভুষা খেতে দিয়েছি। পীর সাহেব বললেন, গরুতো একটা বাঁধা রয়েছে রে বাবা, কিন্তু ওটা তো আমার গাই নয়, একটা ষাঁড় বাঁধা রয়েছে। আমার গাই কোথায় গেল? সহীর বলল হুজুর! আপনাকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, গাইটা কেমন? আপনি বললেন, বেশ মোটাসোটা, রং সাদা আর শিং দু'টো ছোট ছোটও বটে- অমনি আপনার গাই হাঁকিয়ে নিয়ে এসে আপনার গোয়ালে বেঁধে দিলাম। পীর সাহেব বললেন, একটু পিছন দিকে তাকিয়ে দেখলি না কেন? সহীর বলল, দেখতে তো বলেননি হুজুর, বললে নিশ্চয়ই দেখতাম। আপনি সব সময় আমাদেরকে বলেন, আমি যা বলব তাই শুনবি, এর বাইরে একচুল যাবি না। তাহলে কেমন করে আপনার কথার বাইরে যেতে পারি হুজুর বলুন।
বলাবাহুল্য, একেই বলে অন্ধভক্তি। এই অন্ধভক্তি পীর পূজকদেরকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, তারা পীর ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। তারা মনে করে পীর মুক্ত, পীর সর্বস্তরে বিরাজিত, পীর সবকিছুই জানেন। পীরের মূর্তি মনের মাঝে এঁকে নিয়ে ধ্যান করলে, সেই মূর্তির মাঝে পীরের রূহ এসে তার মনে ফয়েজ বা প্রেরণা যোগায়। এই বিশ্বাসে পীর পূজকরা পীরের মূর্তি মানসপটে এঁকে নিয়ে পীরের ধ্যানে মশগুল থাকে।
শুধু পীর পূজকদের দু'চারটা ওযীফা এখানে পাঠকদেরকে উপহার দিচ্ছি। লালনের ভক্তরা বলে-
লালনের মত কামেল পীর
ত্রিভুবনে নাই
অতএব লালনের সবে
তরীক ধর ভাই।
এনায়েতপুরের ভক্তরা চোখ বন্ধ করে মাথা হিলিয়ে হিলিয়ে ওযীফা পাঠ করে-
যত নবী ওলী
সব হবে মালগাড়ী
আর ইঞ্জিন হয়ে নিয়ে যাবে
এনায়েতপুরী
ভাসানী সাহেবের অন্ধভক্তদের ওযীফা শুনুন।
দয়াল ভাসানী তোমার ঘাটে এলাম আমি, পার করে নাও।
দয়াল ভাসানী তোমার হালে হাল ধরেছি, পার করে নাও।
দয়াল ভাসানী কি যে দয়াল তুমি, বুঝেও বুঝি না আমি।
তোমার দয়ায়, তোমার দু'আয়
ভাসিছে মোর জীবন তরী
এক ওসীলায় আমায় তুমি পার করে নাও।
দয়াল রে- তুমি যে কি যাদু জানো, হৃদয় ধরে টানো
ওগো দয়াল, ওগো নিঠুর ভাসানী
তুমিই আমার খাজা, তুমিই আমার রাজা
আমায় খাস প্রজা করে নাও। (হক কথা ২১/৩/৮৩)
আর একদল ঢোলে তালি মেরে মেরে ঘাড় হিলিয়ে হিলিয়ে কি ওযীফা পাঠ করে শুনুন-
امداد کن امداد کن از بندے گم آزاد کن در دین و دنیا شاد کن یا شیخ عبد قادر
এমদাদ কুন এমদাদ কুন
আয বান্দেগম আযাদ কুন
দদীন ও দুনিয়া শাদ কুন
ইয়া শেখ আব্দুল কাদেরা।
অর্থাৎ আমাকে মদদ কর, আমাকে মদদ কর, দুঃখ দুশ্চিন্তা হতে আমাকে মুক্ত কর, দীন ও দুনিয়ায় আমাকে সুখী কর, হে শেখ আব্দুল কাদের।
আর একদলের ওযীফা শুনুন-
پرا کر تو ارجو میری آے بابا خاجه اجميري آے بابا خاجه اجميري
পুরা কর তু আরজু মেরী
আয় বাবা খাজা আজমিরী
আয় বাবা খাজা আজমিরী।
তারা আরও বলে থাকে-
مدد کن یا معین الدین چشتی مدد کن یا معین الدین چشتی
মদদ কুন ইয়া মঈনুদ্দীন চিশতি
মদদ কুন ইয়া মঈনুদ্দীন চিশতি।
তারা খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি রহমাতুল্লাহ আলাইহি নিরানব্বইটা নাম তৈরী করে নিয়ে নিয়মিতভাবে সেই নামের ওযীফা পাঠ করে থাকে। সে নামগুলি হচ্ছে এই-
আউয়ালো ইয়া মঈনুদ্দীন, আখেরো ইয়া মঈনুদ্দীন, জাহেরো ইয়া মঈনুদ্দীন, বাতেনো ইয়া মঈনুদ্দীন, জাব্বারো ইয়া মঈনুদ্দীন, গাফফারো ইয়া মঈনুদ্দীন, সাত্তারো ইয়া মঈনুদ্দীন, কুদ্দুসো ঈয়া মঈনুদ্দীন, রাহমানু ইয়া মঈনুদ্দীন ইত্যাদি। অর্থাৎ আল্লাহ রব্বুল আলামীনের যে নিরানব্বইটা গুণবাচক নাম রয়েছে, ঐ নামগুলি সব খাজা মঈনুদ্দীন চিশতির নামে লাগিয়ে দিয়ে মঈনুদ্দীন চিশতিকে আল্লাহর আসনে বসিয়ে দেয়া হয়েছে।
এ ধরনের বহু কথা রয়েছে। বইয়ের কলেবর বেড়ে যাওয়ার, ভয়ে ক্ষান্ত হলাম। শির্ক আর কাকে বলে; এরূপ আকিদার নামই শির্ক। যারা মানুষ হয়ে মানুষকে আল্লাহর আসনে বসায়; যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কথার উপর অপরের কথাকে গুরুত্ব দেয়, মুশরিক তারাই। কবি বলেন:
خداسے اور بزرگوا سے بہی کہنا يهي هي شرك يارو اسسے بچنا خدا فرما چکا قرآن کے اندر میرے محتاج هے پیر و پیغمبر نهی تاقت سوا میرے کسی میں جو کام آے تمھاری بکاسی میں
جو محتاج هو وے دسرے کا بہلا اس سے مدد کا مانگنا کیا
খোদাসে আওর বুজুরগুঁ সে ভী কহনা
এহী হ্যায় শেরক্ ইয়ারো ইসে বাচনা
খোদা ফরমা চুকা কুরআন কে আনদর
মেরে মুহতাজ হ্যায় পীর ও পয়গম্বর
নেহী তাকত সেওয়া মেরে কিসীমে
জো কাম আয়ে তুম্হারী বেকাসী মে
জো মুহতাজ হো বে দুস্র কা
ভালা উল্সে মদদ কা মান্না কিয়া?
আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই অন্ধত্ব থেকে মুসলিম সমাজকে রক্ষা করুন এই প্রার্থনা করি।

📘 পীরতন্ত্রের আজবলীলা > 📄 পীরদের আউট বুদ্ধি

📄 পীরদের আউট বুদ্ধি


বিদ্যান হোক আর মূর্খ হোক, আলিম হোক আর জাহিল হোক, সব শ্রেণীর পীর কিন্তু আউট বুদ্ধি খাটিয়ে থাকেন খুব বেশী। আউট বুদ্ধি, ট্যাক্টিস, চালাকী ও চতুরতা না খাটালে কোন পীরই তার পরীরগিরি কায়েম রাখতে পারেন না। এক জাঁদরেল পীর তাঁর কয়েকজন ভক্তকে নিয়ে এক মাহফিলে যাচ্ছিলেন। পথের ধারে এক ষাঁড় চরছিল। কাছাকাছি যেয়েই ষাঁড়টাকে লক্ষ্য করে খুব গাম্ভীর্যের সাথে বললেন, 'ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়ারহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ' ভক্তরা সব অবাক কি ব্যাপার! মাহফিলে যেয়ে অনেকের কানে তারা কথাটা দিল। সবাই ব্যাপারটা জানার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠল। মাহফিল শেষ হল। হুজুর বৈঠক ঘরে ঢুকে পড়লেন। লোকজন কিন্তু কেউ উঠল না।
ভেদ জানার জন্য সবাই থেকে গেল। প্রধান সাহাবীরা ভিতরে ঢুকে খুব আদবের সাথে বলল, হুজুর সব লোক বসে আছে একটা কথার জানার জন্য, যদি একটু মেহেরবানী করতেন তো ভাল হতো। হুজুর একটু মৃদু হেসে মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, বুঝেছি- ঐ সালামের ব্যাপারটা তো? ভক্তরা শুনেতো অবাক। কেউ কেউ বলল, হুজুর বুঝলেন কেমন করে যে আমরা সালামের কথাটাই জানতে চাই; কেউ কেউ বলল, হুঁ-হুঁ একি যার তার ব্যাপার; কামেল পীররা সবই জানতে পারেন, কারণ উনারা হলেন টেলিভিশন। আমাদের মনের খবর সবই উনাদের কাছে ধরা পড়ে।
এবার পীর সাহেব বললেন শুনো, আমি যখন আসছিলাম, আমাকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য দু'জন ফেরেশতা ঐ ষাঁড়ের শিং-এ দাঁড়িয়ে ছিল। কাছে যেতেই ওরা আমাকে সালাম দিল, তাই আমি ওদের সালামের জওয়াবে বললাম, 'ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়ারহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ'। একথা শুনে ভক্তরা সব খুশীর চোটে কেঁদে ফেলল, আর বলতে লাগল, সৌভাগ্য আমাদের যে, এহেন কামেল পীর আমরা পেয়েছি।
এক পীর উরুসের মেলা বসিয়েছেন। ভক্তরা সব খাসী, মোরগ, চাল, ডাল, তেল, আটা প্রভৃতি নিয়ে হাজির হয়েছে। এক ভক্ত খুব-সুরত এক দুম্বা নিয়ে হাজির হয়েছে। ভক্তের দিলের আকাঙ্ক্ষা, হুজুর যদি উঠে এসে দুম্বাটার গায়ে একটু হাত বুলিয়ে দিতেন তো ভাল হতো। এই বলে দুম্বাটাকে বাইরে বেঁধে রেখে সে ভিতরে ঢুকে পড়ল। পীর কেবলা তখন প্রধান ভক্তদের নিয়ে আসর জমিয়েছেন ভাল। এমন সময় দুম্বাওয়ালা তার মনের কথাটা পীরকে বলল। পীর সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে হাতের ইশারা করে বললেন, যাও হাত বুলিয়ে দিলাম। ভক্তের কিন্তু এতে মন উঠল না। বলল, হুজুর একটু কাছে যেয়ে গায়ে হাতটা যদি দিত পীরতো চটে লাল; বললেন বিশ্বাস হয় না তোমার। আমি এখানে বসে চোখ বন্ধ করে লন্ডনের আদালতে মামলার তদবীর করে আসি, আর এখানে বসে তোমার দুম্বার গায়ে হাত বুলাতে পারব না? যাও, হাত বুলিয়ে দিয়েছি- যাও ভক্ত হুজুরের পায়ে চুমা দিয়ে বেরিয়ে এল।
আর এক ঘটনা শুনুন। এক পীর সাহেবের নাম ছিল 'লাল বুজুক্কার'। একদিনের ঘটনা, এক গ্রামের রাস্তা দিয়ে গভীর রাতে একটা হাতী চলে গেছে। গ্রামের লোকেরা কিন্তু কেউ কোনদিন এ চিহ্ন দেখেনি। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, তাদের পীরও কোনদিন এরূপ চিহ্ন দেখেনি। ভোরবেলায় উঠে একজন লোক হাতীর পায়ের দাগ দেখে ডাক-হাঁক শুরু করে দিল। এক দুই করে গ্রামের ছোট-বড় মেয়ে-মরদ সবাই জুটে পড়ল। দাগ দেখে সবাই হয়রান, ব্যাপারটা কারো মাথায় আর আসে না। কেউ বলে কিয়ামত খুবই নজদিক, এটা তারই আলামত। কেউ বলে ভূমিকম্প হয়ে গ্রাম ধ্বংস হবে, এটা তারই আলামত। কেউ বলে গ্রামে কলেরা মহামারী আসবে, এটা তারই আলামত। মোটকথা, গ্রামের সকলেই আতঙ্কিত হয়ে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিল। কয়েকজন লোক ছুটল পালকী নিয়ে পীর সাহেবকে আনতে। পীর সাহেব এসেই বললেন চিন্তা নেই কেঁদ না। আমি থাকতে কোন মসিবত আসতে দিব না। এই বলে তিনি হাতীর পায়ের দাগ দেখে চিন্তা করতে লাগলেন এবং বৈঠক ঘরে ঢুকে পড়ে দরজা জানালা বন্ধ করে দিয়ে ধ্যানে বসে পড়লেন। আউট বুদ্ধি খাটিয়ে কিছুক্ষণ পর ঘর থেকে বের হয়ে বিকট এক চিৎকার করে বলতে লাগলেন-
لال بزککر نہ سکے تو اور سکیگا کو پاو میں چکی باندہکے شاید هرن كدا هے
লাল বুজুক্কার না সাকে তো আওর সাকেগা কো পাও মে চাক্কী বাঁধকে শায়েদ হরিণ কুদা হো।
লাল বুজুক্কার পীর না পারলে এ রহস্য আর কে বলতে পারবে? শুন, শুন, চার পায়ে চারটা চাক্কী (যাঁতা) বেঁধে একটা হরিণ এ রাস্তা দিয়ে লাফাতে লাফাতে চলে গেছে।
এ কথা শুনে গ্রামের লোকদের মুখে হাসি ফুটে উঠল। যথাসম্ভব সম্মান করে পীর সাহেবকে তারা পৌঁছে দিল।
এ ধরনের চালাকীর কথা কত শুনবেন। আর এক ঘটনা শুনুন। এক এলাকার চল্লিশ পঞ্চাশটা গ্রামের লোক ছিল তাঁতী। তাঁতের কাপড় বুনাই ছিল। তাদের একমাত্র পেশা এবং তারা সবাই ছিল এক গদ্দীনশীল ভণ্ড পীরের অন্ধভক্ত। এক সময় এক মিসর ফেরতা বিখ্যাত আলিম তাবলীগের উদ্দেশ্যে ঐ এলাকার গ্রামে গ্রামে যেয়ে ওয়াজ নসিহত শুরু করে দিলেন। ওয়াজ নসিহত শুনে এলাকার লোক খুবই মুগ্ধ হতে লাগল। কেউ কেউ পীর সাহেবের কাছে যেয়ে ওয়াজের প্রশংসা করতে লাগল। প্রশংসা শুনে পীর রেগে আগুন হয়ে গেলেন। বললেন, তোমাদের মতো আহাম্মক তো দেখি না। যার তার কথায় একেবারে গলে যাও দেখছি। নিয়ে এসোতো বেটাকে ধরে, দেখি সে কত বড় আলিম হয়েছে। আমার একটা কথার জওয়াব যদি সে দিতে পারে তাহলে বুঝব, হ্যাঁ কিছু জানে; আর যদি উত্তর দিতে না পারে, গলা ধাক্কা দিয়ে বেটাকে এলাকা ছাড়া করব। তোমরা যাও, যেয়ে কাল বিকেলে শিমুলতলীর হাটখোলায় তাকে হাজির কর। আর আমার সব মুরীদানকে জানিয়ে দাও- সবাই যেন হাজির থাকে।
এবার ভক্তরা সব ছুটল মাওলানার কাছে। সব কথাই খুলে বললেন মাওলানাকে। মাওলানা একজন বিরাট আলিম। ইল্‌মে কুরআন, ইল্‌মে হাদীস, ইল্‌মে ফিকাহ, ইল্‌মে ওসুল, ইল্‌মে বালাগাত, ইল্‌মে মান্ত্রেক ও ইল্‌মে আদবে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। কাজেই ঘাবরাবার পাত্র তো তিনি নন। তাছাড়া তিনি বেড়াচ্ছেন তাবলীগে-দীনের উদ্দেশে, কোন দুরভিসন্ধি তো তাঁর নেই; অতএব মাওলানা পরের দিন বিকেলে শিমুলতলীর হাটখোলায় হাজির হলেন। যেয়ে দেখেন হৈ হৈ রৈ রৈ ব্যাপার। চল্লিশ পঞ্চাশটা গ্রামের সব লোক জমা হয়েছে। বাহাসের বিরাট প্রস্তুতি। পীর সাহেবের সাথে মাওলানার হবে বাহাস। মাওলানা তো অবাক! একি ব্যাপার? যাক তিনি তাঁর আসনে যেয়ে বসলেন। একটু পরেই খুব জাঁকজমকের সাথে পীর সাহেব এসে সামনাসামনি তাঁর আসনে বসে পড়লেন। লোকের কোলাহল এবার থেমে গেল। পীর সাহেব মাওলানাকে লক্ষ্য করে গাম্ভীর্যের সাথে বললেন, কি সাহেব শুনছি নাকি আমার এই এলাকায় এসে আজে বাজে কি সব কথা বলে বেড়াচ্ছেন। মাওলানা বললেন- আস্তাগফিরুল্লাহ, কে আপনাকে বলল যে আমি আজে বাজে কথা বলে বেড়াচ্ছি। আল্লাহর ফজলে আমি একজন আলিম। মিসর থেকে পাশ করে এসে কিছু তাবলীগের উদ্দেশে বের হয়েছি। কুরআন হাদীস প্রচার করে বেড়াচ্ছি।
পীর সাহেব পীরগিরির ভঙ্গিমায় মাথা হিলিয়ে হিলিয়ে বলতে লাগলেন, বুঝেছি সাহেব বুঝেছি, বড় আলিম বলে নিজেকে তো প্রচার করে বেড়াচ্ছেন, বলি কুরান জানেন তো? মাওলানা বললেন, জানব না কেন? আল্লাহর ফজলে কুরআনের বড় বড় তাফসীরের কিতাবগুলি সবই পড়েছি। পীর সাহেব বললেন-
আসালাংলাং ফাসালাংলাং আবে আয়ে আবে গ্যায়ে ফাবে থপ্ ফাবে থপ্নপ্।
বলুন তো সাহেব, এই আয়াতের মানে কি? আর এটা কাদের শানে নাযিল হয়েছে?
মাওলানা তো হতভম্ভ। বললেন, একথা ত্রিশপারা কুরআনের কোন জায়গায় যদি আপনি দেখাতে পারেন তো এক্ষুণি আপনাকে পাঁচশত টাকা পুরস্কর দিব। পীর সাহেব ভীষণ এক গর্জন করে বললেন, ত্রিশ পারা নিয়েই পড়ে থাকেন সাহেব- ত্রিশ পারা নিয়েই পড়ে থাকেন। আরও যে দশ পারা কলবের মধ্যে আছে সে খরবতো রাখেন না; হিয়া বড়া মাওলানা সেজে বসে আছেন। যান, আমার এলাকা ছেড়ে চলে যান। তারপর ভক্তদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, যতসব আহম্মকের দল; যে ব্যক্তি একটা কুরআনের আয়াতের খবর রাখে না, তার ওয়াজ শুনে সব পাগল হয়ে গেছে, দাও এ ভণ্ডকে এলাকা ছাড়া করে দাও। ভক্তরা হুকুম পাওয়া মাত্র মাওলানাকে এলাকা থেকেই তাড়িয়ে দিল।
এবার পীর সাহেবকে সবাই ধরল যে, হুজুর ঐ আয়াতটার মানে আমাদেরকে একটু ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিন। হুজুর বললেন, ওগো আমার প্রিয় শিষ্যরা শুন, এ আয়াত একমাত্র তোমাদের শানেই আমার কলবে নাযিল হয়েছে। তোমরা যখন তাঁতের কাপড় তৈরী কর, সেই সময়কার ঘটনাটাই এই আয়াতে সুন্দর করে বলা হয়েছে। অর্থাৎ ডান পায়ে করে যখন চেপে ধর, তখন বলা হচ্ছে 'আসালাংলাং' আর বাম পায়ে করে যখন চেপে ধর, তখন বলা হচ্ছে 'ফাসালাংলাং', ডান দিক থেকে সূতার গুটি যখন বামে যায়, সে অবস্থাটাকে বলা হয়েছে 'আবে আয়ে' আর বামে থেকে যখন ডানে যায়, তখন বলা হচ্ছে 'আবে গ্যায়ে' আর যখন চাপ দিয়ে সূতার গায়ে সূতা বসিয়ে দাও, তখনকার অবস্থাটা হচ্ছে 'ফাবে থপ্ ফাবে থস্থপ্।
তারপর পীর সাহেব বললেন, বাবারা শুন! তোমাদের কাজটাকে আল্লাহ খুব পছন্দ করেছেন বলেই আল্লাহর খাস্ রহমত স্বরূপ এ আয়াত আমার কলবে নাজিল হয়েছে, অতএব তোমরা বেশক জান্নাতী। এ কথা শুনে মুরীদের দল পীরের পায়ে চুমা দিয়ে পীর কেবলা জিন্দাবাদ ধ্বনি দিতে দিতে প্রস্থান করল। এই ঘটনা উল্লেখ এজন্য করলাম যে, অনেক পীর নিজের প্রভাব, পীরত্ব ও ভাত রুটি চলে যাওয়ার ভয়ে, কোন যোগ্য ও জবরদস্ত হক্কানী আলেমকে নিজের এলাকায় ঢুকতে দিতে চান না।
এ ধরনের কত কথা শুনবেন। জনৈক জাঁদরেল পীর এক এলাকা থেকে আর এক এলাকা যাবেন। সকাল সাতটার ট্রেন তাঁকে ধরতেই হবে। পীর আগেই তাঁর দু'জন খাস ভক্তকে চুপে চুপে স্টেশনে পাঠিয়ে দিলেন আর কানে কানে বলে দিলেন যে, আমার স্টেশন যাওয়ার আগেই যদি ট্রেন ছেড়ে দেয়, তাহলে তোমরা শিকল টেনে ট্রেন থামিয়ে দিও। এদিকে পীর সাহেবের নাস্তাটাস্তা হয়ে গেল- পালকী হাজির। পীর সাহেব কিন্তু ইচ্ছা করেই দেরী করছেন। সবাই বলল হুজুর, তাড়াতাড়ি উঠুন, তা না হলে ট্রেন পাবেন না, দু'মাইল রাস্তা যেতে হবে। হুজুর বললেন, এত বড় শক্তি যে ট্রেন আমাকে ফেলে চলে যাবে? জেনে রেখো ট্রেন আমার সাথে কখনই বেয়াদবী করবে না। এই বলে পীর সাহেব কয়েক মিনিট দেরী করেই পালকীতে উঠলেন। পালকী স্টেশন হতে কোয়াটার মাইল দূরে থাকতেই ট্রেন ছেড়ে দিল। হুজুর ট্রেন ছেড়ে দিল, হুজুর ট্রেন ছেড়ে দিল- বলে ভক্তরা চেঁচাতে শুরু করে দিল। হুজুর বললেন চেঁচাও কেন? জেনে রেখ, ট্রেন আমার সাথে কখনই বেআদবী করবে না। সত্যিই ট্রেনটা আউট সিগনালের কাছে যেয়ে থেমে গেল। আর পালকীর কাছ থেকে ট্রেনের দূরত্বটা অনেকটা কমে গেল। হুজুর যেয়ে ট্রেনে উঠলেন, আর সেই সঙ্গে পীর সাহেবের মস্তবড় কারামতি জাহের হয়ে গেল।
আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে, পীর সাহেবের ইন্তেকালের পর তাঁর কতকগুলো ভক্তকে বুজুরগীটা এভাবে বর্ণনা করতে দেখা গেছে। একদিন হুজুর কেবলা পালকীতে চড়ে ট্রেন ধরার জন্য রওয়ানা হলেন। হাফ মাইল দূরে থাকতেই ট্রেন ছেড়ে দিল। সবাই তখন বলল, হুজুর, ট্রেন তো ছেড়ে দিল। আমাদের হুজুর পাক তখন বললেন, বাবারা চিন্তা করো না, আমাকে না নিয়ে ট্রেন যাবে না। সত্যিই দেখা গেল, ট্রেন প্লাটফরমের বাইরে যেয়ে থেমে গেল। ট্রেন আর কোন মতে চলে না। ড্রাইভারের শত চেষ্টা ব্যর্থ হল। এমন সময় হুজুর পাক যেয়ে পালকী থেকে নামলেন। এবার ব্যাপারটা বুঝতে আর কারো বাকী থাকলো না। ড্রাইভার ও গার্ড ছুটে এসে হুজুরের পা দু'টো জড়িয়ে ধরল। হুজুর তখন ইঞ্জিনের দিকে মুখ করে একটা ফুঁক মেরে দিয়ে বললেন, যাও- এবার চালাও। ড্রাইভার ইঞ্জিনে উঠেই দেখে, কলকব্জা সব ঠিক হয়ে গেছে। ট্রেন এবার চলতে আরম্ভ করল। ভাইসব, আমাদের হুজুর এমন হুজুর ছিলেন যে, রেলগাড়ী তাঁর কথা শুনতো। এ ধরনের বহু কথা আছে। ঘটনা ঘটে এক- আর নিজেদের কারামতি জাহের করার জন্য রূপ দেয় আর এক।
আর একটা ঘটনা শুনুন। এক পীরের আড্ডায় পীর ও তার ভক্তদেরকে বিকট চিৎকার করে হেলে-দুলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চালনা করে যিক্র করতে দেখে এক হাজী সাহেব বলেছিলেন, তোমরা যিক্র করো তো এত নাচো কেন? সঙ্গে সঙ্গে পীর বাবাজী উত্তর দিল, বাবা, কেবল হাজী হলেই হয় না, কুরআনের খবর টবর রাখতে হয়। এই বলে পড়তে শুরু করে দিল:
কূল আউযো বেরব্বিন নাছে, মালেকিন নাছে, ইলাহিন নাছে, মিন শাররিল ওয়াছ ওয়াছিল খান্নাছে, আল্লাযী ইয়ো-ওয়াছ বিছু ফী সুদুরীন নাছে, মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাছে। অর্থাৎ- রব নাচে, মালেক নাচে, ইলাহি নাচে, জিন-ইনসান সবাই নাচে, নাচে না কেবল খান্নাস।
আর এক আউট বুদ্ধির কথা বলবো। এক পীর ভক্তের গ্রামের একটি ছেলে আমার কাছে পড়তো। ছেলেটি বাড়ী গেলেই পীর সাহেব তাকে প্রশ্ন করতো, আচ্ছা বলতো বাবা, আউযোবিল্লার বাপ কে? 'আলিফ' কেন খাড়া হযে আছে আর 'বে' কেন পড়ে আছে? জিমের পেটে কেন নুক্তা? ছেলেটি বলতো, এগুলো সব বাজে প্রশ্ন। শরীয়তের আদেশ নিষেধের কথা কিছু জিজ্ঞেস করুন। পীর তখন বলতো, বাবা- ভেদ আছে, ভেদ আছে। মৌলবীদের কাছে এসব পাবে না। এসব হচ্ছে মারফতী তত্ত্ব।
এক পীরের কাছে কোন লোক গেলেই তাকে এক গ্লাস পানি আনা করাতো। তারপর ঐ পানিতে লাঠির মাথাটা একটু ডুবিয়ে দিলে বলতো- লে বেটা খেয়ে লে। ভক্ত পানি খেয়ে দেখে একেবারে মিছরীর সরবত। কিন্তু পীর যে আগেই কাম সেরে রেখেছে তা আর কয়জন বোঝে। মানে লাঠির মাথায় 'সেকারিন' দিয়ে রেখেছে।
এক মুনসেফ সাহেবের একটা ছেলে হারিয়ে গিয়েছিল। বিচলিত হয়ে মুনসেফ সাহেব জনৈক পীরের কাছে গেলেন। দূরে থেকে মুনসেফ সাহেবকে দেখে পীরের জনৈক ভক্ত পীরের কানে কানে বলে দিল যে, হুজুর আজ তিন দিন হল মুনসেফ সাহেবের ছেলে হারিয়েছে, তাই আপনার কাছে আসছেন। সামনে যেতেই কোন কথা না শুনেই চোখ বন্ধ করে ঘাড় হিলিয়ে হিলিয়ে পীর বলতে লাগল, মুনসেফের বেটা! মাত্র তিনদিন হল, ধৈর্য ধরো, ধৈর্য ধরো, ফল পাবে- ফল পাবে। মুনসেফ তো শুনেই অবাক, একি! কেমন করে ইনি জানলেন যে, আমি ছেলের জন্য এসেছি এবং আমার ছেলে তিনদিন হলো হারিয়েছে। যাক, তিনি আবেদন নিবেদন জানিয়ে চলে এলেন। আল্লাহর মর্জি, ছেলেটি কয়েকদিন পর ফিরে এলো। পীরের ভক্ত এ রিপোর্টটাও পীরের কানে দিয়ে দিল। ছেলে ফিরে আসায় মুনসেফ সাহেব খুসী হয়ে কিছু উপঢৌকন নিয়ে পীরের কাছে যেতেই, সেই আগের ভঙ্গিমায় বলতে লাগল, মুনসেফের বেটা বলি নাই যে ধৈর্য্য ধরো, ধৈর্য ধরো, ফল পাবে, ফল পাবে। কি হলো- ছেলে এসেছে তো? বাবা, ভেদ আছে ভেদ আছে।
মোটকথা আউট বুদ্ধি খাটিয়ে পীররা তাদের ব্যবসাকে ঠিক রেখেছেন। আর জনমত তাদের অন্ধভক্ত হয়ে পা চাঁটতে শুরু করে দিয়েছে। অন্ধভক্তরা তদন্ত করে দেখল না যে, আউট সিগ্লালের কাছে ট্রেনটা কেন থামল? যে পীর বাংলার মাটিতে বসে চোখ বন্ধ করে লন্ডনের আদালতে মামলার তদবীরে যায়, যে পীর একই সঙ্গে একাধিক সুরত ধরতে পারে, যে পীর নিজেকে টেলিভিশন বলে দাবী করে সকলের মনের খবর বলে দেওয়ার স্পর্ধা দেখায়, যে পীর ঘরে বসে চোখ বুজে বাইরে বাঁধা দুম্বার গায়ে হাত বুলাতে পারে; সেই পীরের ভক্ত যখন তারই সামনে মটর গাড়ির তলায় পড়ে মারা যায়, কেন সে পীর তখন হাত ইশারায় গাড়ীটা রুকে দিয়ে দুর্ঘটানর হাত থেকে, তার ভক্তকে বাঁচাতে পারে না? এ সব সাধারণ কথা যদি ভক্তদের মাথায় না ঢুকে, তাহলে তাদের অন্ধত্ব ঘুচাবে কে?

বিদ্যান হোক আর মূর্খ হোক, আলিম হোক আর জাহিল হোক, সব শ্রেণীর পীর কিন্তু আউট বুদ্ধি খাটিয়ে থাকেন খুব বেশী। আউট বুদ্ধি, ট্যাক্টিস, চালাকী ও চতুরতা না খাটালে কোন পীরই তার পরীরগিরি কায়েম রাখতে পারেন না। এক জাঁদরেল পীর তাঁর কয়েকজন ভক্তকে নিয়ে এক মাহফিলে যাচ্ছিলেন। পথের ধারে এক ষাঁড় চরছিল। কাছাকাছি যেয়েই ষাঁড়টাকে লক্ষ্য করে খুব গাম্ভীর্যের সাথে বললেন, 'ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়ারহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ' ভক্তরা সব অবাক কি ব্যাপার! মাহফিলে যেয়ে অনেকের কানে তারা কথাটা দিল। সবাই ব্যাপারটা জানার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠল। মাহফিল শেষ হল। হুজুর বৈঠক ঘরে ঢুকে পড়লেন। লোকজন কিন্তু কেউ উঠল না।
ভেদ জানার জন্য সবাই থেকে গেল। প্রধান সাহাবীরা ভিতরে ঢুকে খুব আদবের সাথে বলল, হুজুর সব লোক বসে আছে একটা কথার জানার জন্য, যদি একটু মেহেরবানী করতেন তো ভাল হতো। হুজুর একটু মৃদু হেসে মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, বুঝেছি- ঐ সালামের ব্যাপারটা তো? ভক্তরা শুনেতো অবাক। কেউ কেউ বলল, হুজুর বুঝলেন কেমন করে যে আমরা সালামের কথাটাই জানতে চাই; কেউ কেউ বলল, হুঁ-হুঁ একি যার তার ব্যাপার; কামেল পীররা সবই জানতে পারেন, কারণ উনারা হলেন টেলিভিশন। আমাদের মনের খবর সবই উনাদের কাছে ধরা পড়ে।
এবার পীর সাহেব বললেন শুনো, আমি যখন আসছিলাম, আমাকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য দু'জন ফেরেশতা ঐ ষাঁড়ের শিং-এ দাঁড়িয়ে ছিল। কাছে যেতেই ওরা আমাকে সালাম দিল, তাই আমি ওদের সালামের জওয়াবে বললাম, 'ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়ারহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ'। একথা শুনে ভক্তরা সব খুশীর চোটে কেঁদে ফেলল, আর বলতে লাগল, সৌভাগ্য আমাদের যে, এহেন কামেল পীর আমরা পেয়েছি।
এক পীর উরুসের মেলা বসিয়েছেন। ভক্তরা সব খাসী, মোরগ, চাল, ডাল, তেল, আটা প্রভৃতি নিয়ে হাজির হয়েছে। এক ভক্ত খুব-সুরত এক দুম্বা নিয়ে হাজির হয়েছে। ভক্তের দিলের আকাঙ্ক্ষা, হুজুর যদি উঠে এসে দুম্বাটার গায়ে একটু হাত বুলিয়ে দিতেন তো ভাল হতো। এই বলে দুম্বাটাকে বাইরে বেঁধে রেখে সে ভিতরে ঢুকে পড়ল। পীর কেবলা তখন প্রধান ভক্তদের নিয়ে আসর জমিয়েছেন ভাল। এমন সময় দুম্বাওয়ালা তার মনের কথাটা পীরকে বলল। পীর সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে হাতের ইশারা করে বললেন, যাও হাত বুলিয়ে দিলাম। ভক্তের কিন্তু এতে মন উঠল না। বলল, হুজুর একটু কাছে যেয়ে গায়ে হাতটা যদি দিত পীরতো চটে লাল; বললেন বিশ্বাস হয় না তোমার। আমি এখানে বসে চোখ বন্ধ করে লন্ডনের আদালতে মামলার তদবীর করে আসি, আর এখানে বসে তোমার দুম্বার গায়ে হাত বুলাতে পারব না? যাও, হাত বুলিয়ে দিয়েছি- যাও ভক্ত হুজুরের পায়ে চুমা দিয়ে বেরিয়ে এল।
আর এক ঘটনা শুনুন। এক পীর সাহেবের নাম ছিল 'লাল বুজুক্কার'। একদিনের ঘটনা, এক গ্রামের রাস্তা দিয়ে গভীর রাতে একটা হাতী চলে গেছে।
গ্রামের লোকেরা কিন্তু কেউ কোনদিন এ চিহ্ন দেখেনি। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, তাদের পীরও কোনদিন এরূপ চিহ্ন দেখেনি। ভোরবেলায় উঠে একজন লোক হাতীর পায়ের দাগ দেখে ডাক-হাঁক শুরু করে দিল। এক দুই করে গ্রামের ছোট-বড় মেয়ে-মরদ সবাই জুটে পড়ল। দাগ দেখে সবাই হয়রান, ব্যাপারটা কারো মাথায় আর আসে না। কেউ বলে কিয়ামত খুবই নজদিক, এটা তারই আলামত। কেউ বলে ভূমিকম্প হয়ে গ্রাম ধ্বংস হবে, এটা তারই আলামত। কেউ বলে গ্রামে কলেরা মহামারী আসবে, এটা তারই আলামত। মোটকথা, গ্রামের সকলেই আতঙ্কিত হয়ে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিল। কয়েকজন লোক ছুটল পালকী নিয়ে পীর সাহেবকে আনতে। পীর সাহেব এসেই বললেন চিন্তা নেই কেঁদ না। আমি থাকতে কোন মসিবত আসতে দিব না। এই বলে তিনি হাতীর পায়ের দাগ দেখে চিন্তা করতে লাগলেন এবং বৈঠক ঘরে ঢুকে পড়ে দরজা জানালা বন্ধ করে দিয়ে ধ্যানে বসে পড়লেন। আউট বুদ্ধি খাটিয়ে কিছুক্ষণ পর ঘর থেকে বের হয়ে বিকট এক চিৎকার করে বলতে লাগলেন-
لال بزککر نہ سکے تو اور سکیگا کو پاو میں چکی باندہکے شاید هرن كدا هے
লাল বুজুক্কার না সাকে তো আওর সাকেগা কো
পাও মে চাক্কী বাঁধকে শায়েদ হরিণ কুদা হো।
লাল বুজুক্কার পীর না পারলে এ রহস্য আর কে বলতে পারবে? শুন, শুন, চার পায়ে চারটা চাক্কী (যাঁতা) বেঁধে একটা হরিণ এ রাস্তা দিয়ে লাফাতে লাফাতে চলে গেছে।
এ কথা শুনে গ্রামের লোকদের মুখে হাসি ফুটে উঠল। যথাসম্ভব সম্মান করে পীর সাহেবকে তারা পৌঁছে দিল।
এ ধরনের চালাকীর কথা কত শুনবেন। আর এক ঘটনা শুনুন। এক এলাকার চল্লিশ পঞ্চাশটা গ্রামের লোক ছিল তাঁতী। তাঁতের কাপড় বুনাই ছিল।
তাদের একমাত্র পেশা এবং তারা সবাই ছিল এক গদ্দীনশীল ভণ্ড পীরের অন্ধভক্ত। এক সময় এক মিসর ফেরতা বিখ্যাত আলিম তাবলীগের উদ্দেশ্যে ঐ এলাকার গ্রামে গ্রামে যেয়ে ওয়াজ নসিহত শুরু করে দিলেন। ওয়াজ নসিহত শুনে এলাকার লোক খুবই মুগ্ধ হতে লাগল। কেউ কেউ পীর সাহেবের কাছে যেয়ে ওয়াজের প্রশংসা করতে লাগল। প্রশংসা শুনে পীর রেগে আগুন হয়ে গেলেন। বললেন, তোমাদের মতো আহাম্মক তো দেখি না। যার তার কথায় একেবারে গলে যাও দেখছি। নিয়ে এসোতো বেটাকে ধরে, দেখি সে কত বড় আলিম হয়েছে। আমার একটা কথার জওয়াব যদি সে দিতে পারে তাহলে বুঝব, হ্যাঁ কিছু জানে; আর যদি উত্তর দিতে না পারে, গলা ধাক্কা দিয়ে বেটাকে এলাকা ছাড়া করব। তোমরা যাও, যেয়ে কাল বিকেলে শিমুলতলীর হাটখোলায় তাকে হাজির কর। আর আমার সব মুরীদানকে জানিয়ে দাও- সবাই যেন হাজির থাকে।
এবার ভক্তরা সব ছুটল মাওলানার কাছে। সব কথাই খুলে বললেন মাওলানাকে। মাওলানা একজন বিরাট আলিম। ইল্‌মে কুরআন, ইল্‌মে হাদীস, ইল্‌মে ফিকাহ, ইল্‌মে ওসুল, ইল্‌মে বালাগাত, ইল্‌মে মান্ত্রেক ও ইল্‌মে আদবে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। কাজেই ঘাবরাবার পাত্র তো তিনি নন। তাছাড়া তিনি বেড়াচ্ছেন তাবলীগে-দীনের উদ্দেশে, কোন দুরভিসন্ধি তো তাঁর নেই; অতএব মাওলানা পরের দিন বিকেলে শিমুলতলীর হাটখোলায় হাজির হলেন। যেয়ে দেখেন হৈ হৈ রৈ রৈ ব্যাপার। চল্লিশ পঞ্চাশটা গ্রামের সব লোক জমা হয়েছে। বাহাসের বিরাট প্রস্তুতি। পীর সাহেবের সাথে মাওলানার হবে বাহাস। মাওলানা তো অবাক! একি ব্যাপার? যাক তিনি তাঁর আসনে যেয়ে বসলেন। একটু পরেই খুব জাঁকজমকের সাথে পীর সাহেব এসে সামনাসামনি তাঁর আসনে বসে পড়লেন। লোকের কোলাহল এবার থেমে গেল। পীর সাহেব মাওলানাকে লক্ষ্য করে গাম্ভীর্যের সাথে বললেন, কি সাহেব শুনছি নাকি আমার এই এলাকায় এসে আজে বাজে কি সব কথা বলে বেড়াচ্ছেন। মাওলানা বললেন- আস্তাগফিরুল্লাহ, কে আপনাকে বলল যে আমি আজে বাজে কথা বলে বেড়াচ্ছি। আল্লাহর ফজলে আমি একজন আলিম। মিসর থেকে পাশ করে এসে কিছু তাবলীগের উদ্দেশে বের হয়েছি। কুরআন হাদীস প্রচার করে বেড়াচ্ছি।
পীর সাহেব পীরগিরির ভঙ্গিমায় মাথা হিলিয়ে হিলিয়ে বলতে লাগলেন, বুঝেছি সাহেব বুঝেছি, বড় আলিম বলে নিজেকে তো প্রচার করে বেড়াচ্ছেন, বলি কুরান জানেন তো? মাওলানা বললেন, জানব না কেন? আল্লাহর ফজলে কুরআনের বড় বড় তাফসীরের কিতাবগুলি সবই পড়েছি। পীর সাহেব বললেন-
আসালাংলাং ফাসালাংলাং আবে আয়ে আবে গ্যায়ে ফাবে থপ্ ফাবে থপ্নপ্।
বলুন তো সাহেব, এই আয়াতের মানে কি? আর এটা কাদের শানে নাযিল হয়েছে?
মাওলানা তো হতভম্ভ। বললেন, একথা ত্রিশপারা কুরআনের কোন জায়গায় যদি আপনি দেখাতে পারেন তো এক্ষুণি আপনাকে পাঁচশত টাকা পুরস্কর দিব। পীর সাহেব ভীষণ এক গর্জন করে বললেন, ত্রিশ পারা নিয়েই পড়ে থাকেন সাহেব- ত্রিশ পারা নিয়েই পড়ে থাকেন। আরও যে দশ পারা কলবের মধ্যে আছে সে খরবতো রাখেন না; হিয়া বড়া মাওলানা সেজে বসে আছেন। যান, আমার এলাকা ছেড়ে চলে যান। তারপর ভক্তদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, যতসব আহম্মকের দল; যে ব্যক্তি একটা কুরআনের আয়াতের খবর রাখে না, তার ওয়াজ শুনে সব পাগল হয়ে গেছে, দাও এ ভণ্ডকে এলাকা ছাড়া করে দাও। ভক্তরা হুকুম পাওয়া মাত্র মাওলানাকে এলাকা থেকেই তাড়িয়ে দিল।
এবার পীর সাহেবকে সবাই ধরল যে, হুজুর ঐ আয়াতটার মানে আমাদেরকে একটু ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিন। হুজুর বললেন, ওগো আমার প্রিয় শিষ্যরা শুন, এ আয়াত একমাত্র তোমাদের শানেই আমার কলবে নাযিল হয়েছে। তোমরা যখন তাঁতের কাপড় তৈরী কর, সেই সময়কার ঘটনাটাই এই আয়াতে সুন্দর করে বলা হয়েছে। অর্থাৎ ডান পায়ে করে যখন চেপে ধর, তখন বলা হচ্ছে 'আসালাংলাং' আর বাম পায়ে করে যখন চেপে ধর, তখন বলা হচ্ছে 'ফাসালাংলাং', ডান দিক থেকে সূতার গুটি যখন বামে যায়, সে অবস্থাটাকে বলা হয়েছে 'আবে আয়ে' আর বামে থেকে যখন ডানে যায়, তখন বলা হচ্ছে 'আবে গ্যায়ে' আর যখন চাপ দিয়ে সূতার গায়ে সূতা বসিয়ে দাও, তখনকার অবস্থাটা হচ্ছে 'ফাবে থপ্ ফাবে থস্থপ্।
তারপর পীর সাহেব বললেন, বাবারা শুন! তোমাদের কাজটাকে আল্লাহ খুব পছন্দ করেছেন বলেই আল্লাহর খাস্ রহমত স্বরূপ এ আয়াত আমার কলবে নাজিল হয়েছে, অতএব তোমরা বেশক জান্নাতী। এ কথা শুনে মুরীদের দল পীরের পায়ে চুমা দিয়ে পীর কেবলা জিন্দাবাদ ধ্বনি দিতে দিতে প্রস্থান করল। এই ঘটনা উল্লেখ এজন্য করলাম যে, অনেক পীর নিজের প্রভাব, পীরত্ব ও ভাত রুটি চলে যাওয়ার ভয়ে, কোন যোগ্য ও জবরদস্ত হক্কানী আলেমকে নিজের এলাকায় ঢুকতে দিতে চান না।
এ ধরনের কত কথা শুনবেন। জনৈক জাঁদরেল পীর এক এলাকা থেকে আর এক এলাকা যাবেন। সকাল সাতটার ট্রেন তাঁকে ধরতেই হবে। পীর আগেই তাঁর দু'জন খাস ভক্তকে চুপে চুপে স্টেশনে পাঠিয়ে দিলেন আর কানে কানে বলে দিলেন যে, আমার স্টেশন যাওয়ার আগেই যদি ট্রেন ছেড়ে দেয়, তাহলে তোমরা শিকল টেনে ট্রেন থামিয়ে দিও। এদিকে পীর সাহেবের নাস্তাটাস্তা হয়ে গেল- পালকী হাজির। পীর সাহেব কিন্তু ইচ্ছা করেই দেরী করছেন। সবাই বলল হুজুর, তাড়াতাড়ি উঠুন, তা না হলে ট্রেন পাবেন না, দু'মাইল রাস্তা যেতে হবে। হুজুর বললেন, এত বড় শক্তি যে ট্রেন আমাকে ফেলে চলে যাবে? জেনে রেখো ট্রেন আমার সাথে কখনই বেয়াদবী করবে না। এই বলে পীর সাহেব কয়েক মিনিট দেরী করেই পালকীতে উঠলেন। পালকী স্টেশন হতে কোয়াটার মাইল দূরে থাকতেই ট্রেন ছেড়ে দিল। হুজুর ট্রেন ছেড়ে দিল, হুজুর ট্রেন ছেড়ে দিল- বলে ভক্তরা চেঁচাতে শুরু করে দিল। হুজুর বললেন চেঁচাও কেন? জেনে রেখ, ট্রেন আমার সাথে কখনই বেআদবী করবে না। সত্যিই ট্রেনটা আউট সিগনালের কাছে যেয়ে থেমে গেল। আর পালকীর কাছ থেকে ট্রেনের দূরত্বটা অনেকটা কমে গেল। হুজুর যেয়ে ট্রেনে উঠলেন, আর সেই সঙ্গে পীর সাহেবের মস্তবড় কারামতি জাহের হয়ে গেল।
আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে, পীর সাহেবের ইন্তেকালের পর তাঁর কতকগুলো ভক্তকে বুজুরগীটা এভাবে বর্ণনা করতে দেখা গেছে। একদিন হুজুর কেবলা পালকীতে চড়ে ট্রেন ধরার জন্য রওয়ানা হলেন। হাফ মাইল দূরে থাকতেই ট্রেন ছেড়ে দিল। সবাই তখন বলল, হুজুর, ট্রেন তো ছেড়ে দিল। আমাদের হুজুর পাক তখন বললেন, বাবারা চিন্তা করো না, আমাকে না নিয়ে ট্রেন যাবে না। সত্যিই দেখা গেল, ট্রেন প্লাটফরমের বাইরে যেয়ে থেমে গেল। ট্রেন আর কোন মতে চলে না। ড্রাইভারের শত চেষ্টা ব্যর্থ হল। এমন সময় হুজুর পাক যেয়ে পালকী থেকে নামলেন। এবার ব্যাপারটা বুঝতে আর কারো বাকী থাকলো না। ড্রাইভার ও গার্ড ছুটে এসে হুজুরের পা দু'টো জড়িয়ে ধরল। হুজুর তখন ইঞ্জিনের দিকে মুখ করে একটা ফুঁক মেরে দিয়ে বললেন, যাও- এবার চালাও। ড্রাইভার ইঞ্জিনে উঠেই দেখে, কলকব্জা সব ঠিক হয়ে গেছে। ট্রেন এবার চলতে আরম্ভ করল। ভাইসব, আমাদের হুজুর এমন হুজুর ছিলেন যে, রেলগাড়ী তাঁর কথা শুনতো। এ ধরনের বহু কথা আছে। ঘটনা ঘটে এক- আর নিজেদের কারামতি জাহের করার জন্য রূপ দেয় আর এক।
আর একটা ঘটনা শুনুন। এক পীরের আড্ডায় পীর ও তার ভক্তদেরকে বিকট চিৎকার করে হেলে-দুলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চালনা করে যিক্র করতে দেখে এক হাজী সাহেব বলেছিলেন, তোমরা যিক্র করো তো এত নাচো কেন? সঙ্গে সঙ্গে পীর বাবাজী উত্তর দিল, বাবা, কেবল হাজী হলেই হয় না, কুরআনের খবর টবর রাখতে হয়। এই বলে পড়তে শুরু করে দিল:
কূল আউযো বেরব্বিন নাছে, মালেকিন নাছে, ইলাহিন নাছে, মিন শাররিল ওয়াছ ওয়াছিল খান্নাছে, আল্লাযী ইয়ো-ওয়াছ বিছু ফী সুদুরীন নাছে, মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাছে। অর্থাৎ- রব নাচে, মালেক নাচে, ইলাহি নাচে, জিন-ইনসান সবাই নাচে, নাচে না কেবল খান্নাস।
আর এক আউট বুদ্ধির কথা বলবো। এক পীর ভক্তের গ্রামের একটি ছেলে আমার কাছে পড়তো। ছেলেটি বাড়ী গেলেই পীর সাহেব তাকে প্রশ্ন করতো, আচ্ছা বলতো বাবা, আউযোবিল্লার বাপ কে? 'আলিফ' কেন খাড়া হযে আছে আর 'বে' কেন পড়ে আছে? জিমের পেটে কেন নুক্তা? ছেলেটি বলতো, এগুলো সব বাজে প্রশ্ন। শরীয়তের আদেশ নিষেধের কথা কিছু জিজ্ঞেস করুন। পীর তখন বলতো, বাবা- ভেদ আছে, ভেদ আছে। মৌলবীদের কাছে এসব পাবে না। এসব হচ্ছে মারফতী তত্ত্ব।
এক পীরের কাছে কোন লোক গেলেই তাকে এক গ্লাস পানি আনা করাতো। তারপর ঐ পানিতে লাঠির মাথাটা একটু ডুবিয়ে দিলে বলতো- লে বেটা খেয়ে লে। ভক্ত পানি খেয়ে দেখে একেবারে মিছরীর সরবত। কিন্তু পীর যে আগেই কাম সেরে রেখেছে তা আর কয়জন বোঝে। মানে লাঠির মাথায় 'সেকারিন' দিয়ে রেখেছে।
এক মুনসেফ সাহেবের একটা ছেলে হারিয়ে গিয়েছিল। বিচলিত হয়ে মুনসেফ সাহেব জনৈক পীরের কাছে গেলেন। দূরে থেকে মুনসেফ সাহেবকে দেখে পীরের জনৈক ভক্ত পীরের কানে কানে বলে দিল যে, হুজুর আজ তিন দিন হল মুনসেফ সাহেবের ছেলে হারিয়েছে, তাই আপনার কাছে আসছেন। সামনে যেতেই কোন কথা না শুনেই চোখ বন্ধ করে ঘাড় হিলিয়ে হিলিয়ে পীর বলতে লাগল, মুনসেফের বেটা! মাত্র তিনদিন হল, ধৈর্য ধরো, ধৈর্য ধরো, ফল পাবে- ফল পাবে। মুনসেফ তো শুনেই অবাক, একি! কেমন করে ইনি জানলেন যে, আমি ছেলের জন্য এসেছি এবং আমার ছেলে তিনদিন হলো হারিয়েছে। যাক, তিনি আবেদন নিবেদন জানিয়ে চলে এলেন। আল্লাহর মর্জি, ছেলেটি কয়েকদিন পর ফিরে এলো। পীরের ভক্ত এ রিপোর্টটাও পীরের কানে দিয়ে দিল। ছেলে ফিরে আসায় মুনসেফ সাহেব খুসী হয়ে কিছু উপঢৌকন নিয়ে পীরের কাছে যেতেই, সেই আগের ভঙ্গিমায় বলতে লাগল, মুনসেফের বেটা বলি নাই যে ধৈর্য্য ধরো, ধৈর্য ধরো, ফল পাবে, ফল পাবে। কি হলো- ছেলে এসেছে তো? বাবা, ভেদ আছে ভেদ আছে।
মোটকথা আউট বুদ্ধি খাটিয়ে পীররা তাদের ব্যবসাকে ঠিক রেখেছেন। আর জনমত তাদের অন্ধভক্ত হয়ে পা চাঁটতে শুরু করে দিয়েছে। অন্ধভক্তরা তদন্ত করে দেখল না যে, আউট সিগ্লালের কাছে ট্রেনটা কেন থামল? যে পীর বাংলার মাটিতে বসে চোখ বন্ধ করে লন্ডনের আদালতে মামলার তদবীরে যায়, যে পীর একই সঙ্গে একাধিক সুরত ধরতে পারে, যে পীর নিজেকে টেলিভিশন বলে দাবী করে সকলের মনের খবর বলে দেওয়ার স্পর্ধা দেখায়, যে পীর ঘরে বসে চোখ বুজে বাইরে বাঁধা দুম্বার গায়ে হাত বুলাতে পারে; সেই পীরের ভক্ত যখন তারই সামনে মটর গাড়ির তলায় পড়ে মারা যায়, কেন সে পীর তখন হাত ইশারায় গাড়ীটা রুকে দিয়ে দুর্ঘটানর হাত থেকে, তার ভক্তকে বাঁচাতে পারে না? এ সব সাধারণ কথা যদি ভক্তদের মাথায় না ঢুকে, তাহলে তাদের অন্ধত্ব ঘুচাবে কে?

📘 পীরতন্ত্রের আজবলীলা > 📄 পীরদের সিজদার দাবী

📄 পীরদের সিজদার দাবী


অনেক পীর বলে থাকেন যে, তাজিমের সিজদা হালাল। সেজন্য তাঁরা মুরীদদের কাছ থেকে সিজদা নিয়ে থাকেন। তাঁরা বলেন ফেরেশতারা যখন আদমকে সিজদা করেছিলেন, তখন মুরীদরা কেন পীরকে সিজদা করবে না? তারা আরও বলেন, ইবলিশ যেমন আদমকে সিজদা না করে শয়তান হয়ে গেছে, ঠিক তেমনি কোন মুরীদ যদি তার পীরকে সিজদা না করে, সেও শয়তান হয়ে যাবে। এই ফতোয়ার পর কোন অন্ধভক্ত আর স্থির থাকতে পারে কি? তাই দেখা যায়, দলে দলে সব ভক্তরা এসে পীরের পায়ে সিজদা করে থাকে। পীর সাহেবও 'এডিশনাল গড' সেজে দাঁতের গোঁড়ায় গোঁড়ায় হাসতে হাসতে সিজদা গ্রহণ করেন। পীর মরে গেলেও ছাড়াছাড়ি নেই। ভক্তরা কবরে যেয়ে মাথা ঠুকতে থাকে।
কিন্তু এই ভ্রান্ত দল এতটুকু বুঝতে সমর্থ হল না যে, ফেরেশতারা আর মানুষ কখনো এক জীব নয়। ফেরেশতারা যা করে মানুষের জন্য তা করণীয় নয়; আর মানুষ যা করে, ফেরেশতাদের জন্য তা করণীয় নয়। তাছাড়া আল্লাহ ফেরেস্তাদের হুকুম করেছিলেন যে, আদমকে সিজদা কর, তাই তারা সিজদা করেছিল। কিন্তু এই পীর নামধারী জীবগুলোকে কে হুকুম করল যে, মানুষ হয়ে মানুষকে সিজদা করতে হবে? পীররা কি মুহাম্মদ -এর উম্মত নয়? যদি উম্মত না হয় তাহলে তারা কাফের। আর যদি উম্মত হয়, তাহলে শেষ নবী যে শরীয়ত রেখে গেছেন তাই তাদেরকে মানতে হবে। তাঁর আগের কোন বিধি বিধান মানা যেতে পারে না। রসূল মুহাম্মদের আগে ইতিহাসের কোন কোন পর্যায়ে দেখি, আপন ভাই-বোনে বিয়ে হালাল ছিল, মদ খাওয়া প্রভৃতি বৈধ ছিল। তাই বলে কি এই পীর সাহেবরা আপন বোনকে বিয়ে করবেন? শত সহস্র স্ত্রী গ্রহণ করবেন? মদ খাওয়া চালু করবেন? আর এক কথা হচ্ছে, আল্লাহ যে ফেরেশতাদেরকে বলেছিলেন, 'উজ্জুদু লি আদামা'-এর অর্থ এ নয় যে, আদমকে সিজদা কর। এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, আদমের কারণে আল্লাহকে সিজদা কর। একথা তাফসীরের কিতাব ও আরবী অভিধান থেকে প্রমাণিত হয়েছে।
পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে, সিজদা শুধু আল্লাহকেই করতে হবে। আল্লাহ ছাড়া কোন সৃষ্টিকে সিজদা করা হারাম।
দারেমী কিতাবে জাবের থেকে বর্ণিত আছে, আর তাবারানীতে ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, আল্লাহর রসূল বলেছেন: لا ينبغي لبشر أن يسجد لبشر অর্থাৎ কোন মানুষের পক্ষে অন্য কোন মানুষকে সিজদা করা হালাল নয়।
আবু দাউদ, নাসায়ী ইবনু মাজা প্রভৃতি হাদীসের কিতাবে লেখা আছে, একদিন মুআয বিন জাবাল (রহ.) ইয়ামান থেকে ফিরে এসে আল্লাহর রসূল -কে সিজদা করলেন। আল্লাহর রাসুল বললেন একি? মুআয বললেন, আমি ইয়াহুদী ও খৃস্টানদেরকে দেখেছি, তারা তাদের বড় বড় পাদ্রীদেরকে সিজদা করে থাকে। আমিও তাদেরকে বলেছিলাম একি ব্যাপার? তারা বলেছিল, এ হচ্ছে নবীদের সালামের পদ্ধতি। একথা শুনে আল্লাহর রসূল বললেন: ইহুদী ও খৃস্টানরা তাদের নবীদের নামে মিথ্যা অভিযোগ আবিষ্কার করেছে। তুমি কখনো এমন করো না। আর এক বর্ণনায় আছে, আল্লাহর রসূল মুআযকে বললেন, আচ্ছা মুআয বল দেখি, তুমি আমার কবর জিয়ারত করতে গেলে কি কবরে সিজদা করবে? মুআয বললেন, না। তখন আল্লাহর রসূল বললেন, خبردار তোমরা এমন কাজ কখনো করো না। (মেশকাত)
তাফসীর ইবনু কাসীরে আছে, সাহাবী সালমান ফার্সী তখন সবেমাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছেন। একদিন মদিনার কোন রাস্তায় আল্লাহর রসূলের সাথে তাঁর দেখা হয়ে গেল। তিনি আল্লাহর রসুল -কে সিজদা করলেন। আল্লাহর রসূল তাঁকে বললেন, দেখ সালমান, আমাকে সিজদা করো না। যিনি চিরঞ্জীবি ও মৃত্যুঞ্জয়ী তুমি কেবল মাত্র তাঁকেই সিজদা করবে।
আল্লাহ ছাড়া অপরকে সিজদা করা যে হারাম, বে সব পীর তাদের ভক্তদের কাছ থেকে সিজদা নিয়ে থাকে আর যে সব অন্ধভক্ত পীরকে সিজদা করে থাকে, তারা যে ধর্মভ্রষ্ট ও মিথ্যুক এতে কোনই সন্দেহ নেই।

অনেক পীর বলে থাকেন যে, তাজিমের সিজদা হালাল। সেজন্য তাঁরা মুরীদদের কাছ থেকে সিজদা নিয়ে থাকেন। তাঁরা বলেন ফেরেশতারা যখন আদমকে সিজদা করেছিলেন, তখন মুরীদরা কেন পীরকে সিজদা করবে না? তারা আরও বলেন, ইবলিশ যেমন আদমকে সিজদা না করে শয়তান হয়ে গেছে, ঠিক তেমনি কোন মুরীদ যদি তার পীরকে সিজদা না করে, সেও শয়তান হয়ে যাবে। এই ফতোয়ার পর কোন অন্ধভক্ত আর স্থির থাকতে পারে কি? তাই দেখা যায়, দলে দলে সব ভক্তরা এসে পীরের পায়ে সিجدا করে থাকে। পীর সাহেবও 'এডিশনাল গড' সেজে দাঁতের গোঁড়ায় গোঁড়ায় হাসতে হাসতে সিجدا গ্রহণ করেন। পীর মরে গেলেও ছাড়াছাড়ি নেই। ভক্তরা কবরে যেয়ে মাথা ঠুকতে থাকে।
কিন্তু এই ভ্রান্ত দল এতটুকু বুঝতে সমর্থ হল না যে, ফেরেশতারা আর মানুষ কখনো এক জীব নয়। ফেরেশতারা যা করে মানুষের জন্য তা করণীয় নয়; আর মানুষ যা করে, ফেরেশতাদের জন্য তা করণীয় নয়। তাছাড়া আল্লাহ ফেরেস্তাদের হুকুম করেছিলেন যে, আদমকে সিجدا কর, তাই তারা সিجدا করেছিল। কিন্তু এই পীর নামধারী জীবগুলোকে কে হুকুম করল যে, মানুষ হয়ে মানুষকে সিجدا করতে হবে? পীররা কি মুহাম্মদ -এর উম্মত নয়? যদি উম্মত না হয় তাহলে তারা কাফের। আর যদি উম্মত হয়, তাহলে শেষ নবী যে শরীয়ত রেখে গেছেন তাই তাদেরকে মানতে হবে। তাঁর আগের কোন বিধি বিধান মানা যেতে পারে না। রসূল মুহাম্মদের আগে ইতিহাসের কোন কোন পর্যায়ে দেখি, আপন ভাই-বোনে বিয়ে হালাল ছিল, মদ খাওয়া প্রভৃতি বৈধ ছিল। তাই বলে কি এই পীর সাহেবরা আপন বোনকে বিয়ে করবেন? শত সহস্র স্ত্রী গ্রহণ করবেন? মদ খাওয়া চালু করবেন? আর এক কথা হচ্ছে, আল্লাহ যে ফেরেশতাদেরকে বলেছিলেন, 'উজ্জুদু লি আদামা'-এর অর্থ এ নয় যে, আদমকে সিجدا কর। এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, আদমের কারণে আল্লাহকে সিجدا কর। একথা তাফসীরের কিতাব ও আরবী অভিধান থেকে প্রমাণিত হয়েছে।
পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে, সিجدا শুধু আল্লাহকেই করতে হবে। আল্লাহ ছাড়া কোন সৃষ্টিকে সিجدا করা হারাম।
দারেমী কিতাবে জাবের থেকে বর্ণিত আছে, আর তাবারানীতে ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, আল্লাহর রসূল বলেছেন: لا ينبغي لبشر أن يسجد لبشر অর্থাৎ কোন মানুষের পক্ষে অন্য কোন মানুষকে সিجدا করা হালাল নয়।
আবু দাউদ, নাসায়ী ইবনু মাজা প্রভৃতি হাদীসের কিতাবে লেখা আছে, একদিন মুআয বিন জাবাল (রহ.) ইয়ামান থেকে ফিরে এসে আল্লাহর রসূল -কে সিجدا করলেন। আল্লাহর রাসুল বললেন একি? মুআয বললেন, আমি ইয়াহুদী ও খৃস্টানদেরকে দেখেছি, তারা তাদের বড় বড় পাদ্রীদেরকে সিجدا করে থাকে। আমিও তাদেরকে বলেছিলাম একি ব্যাপার? তারা বলেছিল, এ হচ্ছে নবীদের সালামের পদ্ধতি। একথা শুনে আল্লাহর রসূল বললেন: ইহুদী ও খৃস্টানরা তাদের নবীদের নামে মিথ্যা অভিযোগ আবিষ্কার করেছে। তুমি কখনো এমন করো না। আর এক বর্ণনায় আছে, আল্লাহর রসূল মুআযকে বললেন, আচ্ছা মুআয বল দেখি, তুমি আমার কবর জিয়ারত করতে গেলে কি কবরে সিجدا করবে? মুআয বললেন, না। তখন আল্লাহর রসূল বললেন, খবরদার তোমরা এমন কাজ কখনো করো না। (মেশকাত)
তাফসীর ইবনু কাসীরে আছে, সাহাবী সালমান ফার্সী তখন সবেমাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছেন। একদিন মদিনার কোন রাস্তায় আল্লাহর রসূলের সাথে তাঁর দেখা হয়ে গেল। তিনি আল্লাহর রসুল -কে সিجدا করলেন। আল্লাহর রসূল তাঁকে বললেন, দেখ সালমান, আমাকে সিجدا করো না। যিনি চিরঞ্জীবি ও মৃত্যুঞ্জয়ী তুমি কেবল মাত্র তাঁকেই সিجدا করবে।
আল্লাহ ছাড়া অপরকে সিجدا করা যে হারাম, বে সব পীর তাদের ভক্তদের কাছ থেকে সিجدا নিয়ে থাকে আর যে সব অন্ধভক্ত পীরকে সিجدا করে থাকে, তারা যে ধর্মভ্রষ্ট ও মিথ্যুক এতে কোনই সন্দেহ নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00