📘 পীরতন্ত্রের আজবলীলা > 📄 মূর্খ পীর

📄 মূর্খ পীর


যেখানে সেখানে হঠাৎ গজিয়ে উঠা কতকগুলো পীর আমরা দেখতে পাই।
এরা আসলে কুরআন হাদীসের ইল্ম কিছুই জানে না। বি.এ, এম.এ, ডাক্তারী, মাষ্টারী, উকালতি, ব্যারিষ্টারী সার্টিফিকেট কারো কারো থাকতে পারে কিন্তু কুরআন হাদীসের বিদ্যায় এরা একেবারে ইয়াতিম। কুরআন মাজীদের যে কোন তফসীরের কিতাব অথবা বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ প্রভৃতি হাদীসের যে কোন একখানা কিতাব খুলে দিলে, এদের হিম্মত নেই যে, একটা লাইন শুদ্ধভাবে পড়ে দিতে পারে, অথচ এরাই সেজেছে মুসলিম সমাজের পথপ্রদর্শক। এরাই পীরে কামেল, হাদিয়ে জামান।
মহিমান্বিত আল-কুরআনের কোন্ আয়াত, কোন্ ঘটনাকে কেন্দ্র করে, কোন্ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, কি উদ্দেশে অবতীর্ণ হল, কুরআনের ধারক বাহক ও প্রচারক, সৃষ্টির সেরা, নবীকুল শিরোমণি, মুহাম্মাদ মোস্তফা তাঁর জীবনে যত কথা বলে গেছেন, যে সব কাজ করে গেছেন আর যে সব বিষয়ে মৌন সম্মতি দিয়ে গেছেন, সেগুলি জানবার, বুঝবার ও পড়বার সুযোগ যে হতভাগার কপালে জুটল না, সে যদি হঠাৎ চাকরী করতে করতে, ডাক্তারী বা উকালতি করতে করতে, ব্যবসা বা কৃষিকাজ করতে করতে, পীরি-মুরীদির দু’একখানা কিতাবের দু’চারটা গৎ মুখস্থ করে, লম্বা পিরাহান গায়ে দিয়ে ও লম্বা পাগড়ী মাথায় বেঁধে, হঠাৎ পীর সেজে বসে যায় আর লোকজনকে বলে যে আমার হাতে তোমরা মুরীদ হও, আমি আল্লাহ আর তোমাদের মাঝখানে মধ্যস্থ হয়ে তোমাদের সব ফরিয়াদ আল্লাহর কাছে পৌঁছে দিব, আর এই কথা শুনে হাজার হাজার লোক যদি সেই মূর্খের কাছে ভীড় জমায়, তাহলে সে সমাজ কোন্ স্তরে পৌঁছে গেছে- চিন্তা করা দরকার।
আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই সব মূর্খরা নিজেরাই নিজেদেরকে সাইনবোর্ড, পোস্টার, বিজ্ঞাপন ও খবরের কাগজের মাধ্যমে, পীরে কামেল, হাদীয়ে জামান, আওলীয়া কুল শিরোভূষণ, মুজাদ্দেদে মিল্লাত, মাহবুবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী প্রভৃতি বিশেষণে বিশেষিত করে প্রচার করতে বা কিছু দালালের দ্বারা প্রচার করাতে একটুকুও লজ্জাবোধ করে না বা দিল কাঁপে না। হায়রে স্বার্থ- তোমার মহিমা বুঝা ভার।

📘 পীরতন্ত্রের আজবলীলা > 📄 পীর বংশ

📄 পীর বংশ


আমি সমাজের ছোট বড় সকলের কাছে অনুরোধ করছি, আপনারা এই ধরনের মূর্খদের কাছে যাবেন না। এরা কথাবার্তা যতই কায়দা করে বলুক, জেনে রাখবেন, বিরাট এক আর্থিক স্বার্থের জাল পেতে এরা বসে আছে। তবে হ্যাঁ, যাবেন কার কাছে, ইবাদত বন্দেগীর নিয়ম পদ্ধতি শিখবেন কোথায়, ইনশাআল্লাহ সে কথা পরে জানাচ্ছি।
হিন্দু সমাজে দেখা যায় ব্রাহ্মণের পুত্র হয় ব্রাহ্মণ, পুরোহিতের পুত্র হয় পুরোহিত। ব্রাহ্মণই পৌরহিত্য করার একমাত্র অধিকারী। কেননা হিন্দু ধর্মমতে ব্রাহ্মণ ব্রহ্মার মুখ হতে উৎপন্ন হয়েছে। সেজন্য ব্রাহ্মণকে বলা হয় বর্ণ শ্রেষ্ঠ। ব্রাহ্মণ মারা গেলে তার ছেলে হয় পুরোহিত। ছেলে মারা গেলে তার ছেলে, ছেলের ছেলে তস্য ছেলে- এভাবে বংশানুক্রমে এ পৌরহিত্য চলতেই থাকে। পাণ্ডিত্য থাক আর না থাক, কিছু যায় আসে না। কারণ পৌরহিত্য করাটা হচ্ছে ব্রাহ্মণদের বংশগত ব্যাপার।
বলাবাহুল্য, হিন্দু সমাজের মত আমাদের সমাজেও এক শ্রেণীর বংশ গজিয়ে উঠেছে আর সেটা হচ্ছে এই পীর বংশ। পীর বংশের সবাই পীর, পীর বাবা, পীর মা, পীর দাদা, পীর দাদী, পীর নানা, পীর নানী, পীর খালা, পীর খালু, পীর ভাই, পীর বোন ইত্যাদি সবাই পীর। পীরে পীরে সব একাকার। পীর সাহেব ইন্তিকাল করলেন, ব্যাস্ তাঁর ছেলে হয়ে গেলেন গদ্দীনশীন পীর। ছেলে ইন্তিকাল করলে তাঁর ছেলে, ছেলের ছেলে তস্য ছেলে- এভাবে ব্রাহ্মণদের মত বংশানুক্রমে পীরগিরি চলতেই থাকে। পীর সাহেবের একাধিক ছেলে থাকলে করে নেন সব এলাকা ভাগ। অনেক সময় এলাকা ভাগ নিয়ে গদ্দীনশীনদের মধ্যে লাঠালাঠি, ফাটাফাটি, এমনকি কোর্টকাছারী পর্যন্ত ছুটাছুটি করতেও দেখা যায়। ঠিক এ যেন ফারায়েজ সূত্রে পৈত্রিক সম্পত্তির ভাগ বাঁটোয়ারা, ঠিক এ যেন বাপের জমিদারী নিয়ে কাড়াকাড়ি। পীর সাহেবের ছেলে না থাকলে ভাই, ভাতিজা, জামাই বা নাতি-পুতা যেই থাক, সেই সেজে বসে গদ্দীনশীন। কারণ এহেন লাভজনক জমিদারীটা বংশের বাইরে যেন চলে না যায়। বিদ্যা না থাক, ইল্ম-কালাম না থাক, কি তাতে আসে যায়। পীরের গন্ধতো আছে। পীরের 'নুৎফায়' পয়দা তো বটে।

📘 পীরতন্ত্রের আজবলীলা > 📄 বিনা পুঁজির ব্যবসা

📄 বিনা পুঁজির ব্যবসা


পাঠক হয়তো ভাবছেন, মানুষ পীরগিরি করার জন্য এত লালায়িত কেন? মানুষ পীর বলে দাবী করে, বিভিন্ন বিশেষণে নিজেকে বিশেষিত করে, পোষ্টারে, বিজ্ঞাপনে, খবরের কাগজে ও মাইকিং করে নিজকে এত প্রচারণা করে বেড়ায় কেন? কেউ কাছে যেয়ে একটু বসে মুরীদ না হয়ে যদি চলে আসে, তাহলে পীরের মনটা খারাপ হয় কেন? কুরআন হাদীস না পড়েই মানুষ পীর সেজে লোকের দ্বারে দ্বারে ভক্ত বানাবার জন্য ঘুরে বেড়ায় কেন? অধিকতর যোগ্য লোক থাকা সত্ত্বে পীরের অযোগ্য বা মূর্খ বেটা, ভাই, ভাতিজা বা জামাই পীর হয় কেন? কেন পীরগিরিটাকে বংশের বাইরে যেতে দেয়া হয় না। এই পীরগিরিতে আছে কি? পাঠক একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন, এখানে বিরাট এক স্বার্থের খেলা চলছে। সত্যি কথা বলতে কি- পীরগিরির মত লাভজনক ব্যবসা আর কিছুই নেই। আর এতে পুঁজি লাগে না, বিনা পুঁজির ব্যবসা। আপনার ইনকামে আপনার সংসার চলে না, বেড়ার ঘর আপনার পাকা হয় না। চিন্তার কোন কারণ নেই। লম্বা পিরাহান গায়ে দিয়ে, মাথায় একটা পাগড়ি বেঁধে, যিক্র বক্সে যান আর ওখানে খানকা শরীফ চিশতিয়া, খানকা শরীফ কাদেরিয়া, খানকা শরীফ জালালিয়া, খানকা শরীফ আহমাদিয়া প্রভৃতি নামের যে কোন একটা নাম চয়েস করে সাইনবোর্ড লিখে ঝুলিয়ে দিন। আর নিজেকে কোন এক পীরের খলিফা বলে দাবী করুন। দেখবেন লোক জুটবে, টাকাও যথেষ্ট পাবেন। বেড়ার ঘর আপনার পাকা হয়ে যাবে। তারপর মাঝে মধ্যে ইসালে সওয়াব কিংবা উরুশ শরীফের মেলা বসাবেন, তখন দেখবেন কোথায় লাগে জমিদারী। হাজার বিশেক লোক যদি জুটাতে পারেন আর কি চাই। খালি হাতে কেউ আসবে না। গড়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে দশটা করে টাকা পেলেও লাখ দুয়েক টাকা হয়ে যাবে। আর যাদের বিশ পঞ্চাশ লাখ ভক্ত আছে তাদের কথা তো চিন্তাই করা যায় না। তারপর ভক্তরা শুধু যে টাকাই আনবে তাই নয়। কেউ আনবে তেল, কেউ আনবে ঘি, কেউ আনবে চাল, কেউ আনবে ডাল, কেউ আনবে আলু, কেউ আনবে লাউ-কুমড়া, কেউ আনবে খাসি, কেউ আনবে মোরগ, কেউ আনবে হরিণ, কেউ আনবে গরু। অবশ্য সব উরুসের মেলায় গরু নিয়ে যেতে দেয়া হয় না। কারণ, যে সব পীর ধর্মনিরপেক্ষ পীর বা যেসব খানকায় হিন্দু, মুসলমান, মেথর, মাড়োয়াড়ী সবাই তীর্থ করতে যায়, সেখানে গোমাংস কেন যাবে। গরুর গোশত ধর্মনিরপেক্ষ খাদ্য নয়, ওটা হচ্ছে মুসলমানদের প্রিয় খাদ্য- সাম্প্রদায়িক খানা।
যাক ভক্তরা যা নিয়ে আসবে, তাই তারা খেয়ে শেষ করতে পারবে না, মোটা অংকের কিছু বেঁচে যাবে। তাহলে বুঝুন, পীরগিরি ব্যবসাটা কতবড় লাভজনক ব্যবসা। এ ব্যবসার নেশা যাকে পেয়ে বসেছে- সেকি সহজে তা ছাড়তে চায়, তাছাড়া কেউ রাজনীতি করেন, ইলেক্শনে নেমেছেন, ভোট চাই হোমরা চোমরা একটা কিছু হতেই হবে। দেখলেন ওমুক পীরের ভক্ত এখানে অনেক। লাখখানেক টাকা নিয়ে যেয়ে পীর সাহেবের হাতে দিয়ে বললেন হুজুর, জারা মেহেরবানী কিজিয়েগা। হুজুর ভক্তদেরকে বলবেন, তোমরা ভোটটা ইনাকেই দিও, কারণ ইনি আমার খাস ভক্ত। এভাবে কতদিক থেকে কতভাবে যে টাকার আমদানী হয় তা কল্পনাই করা যায় না। আমি এমন এক এলাকার খবর রাখি, যেখানে বর্তমানে কোন পীর নেই। পীর সাহেব কিছুদিন আগে ইন্তিকাল করায় আসন একেবারে খালি। ব্যাস্ আর যায় কোথায়, দু'তিনজন বুজরুগ ব্যক্তি পীর হওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। একজন প্রত্যেক জামাআতে ঘুরে ঘুরে বলে বেড়াচ্ছেন, আমি বুজরুগ ব্যক্তি, আমিই পীর হওয়ার একমাত্র উপযুক্ত, অতএব তোমরা আমার কাছেই মুরীদ হও। আর একজন যেয়ে বলেছেন, শুনলাম নাকি ওমুক তোমাদের কাছে পীর হওয়ার জন্য এসেছিল। খবরদার হুশিয়ার! আমি ওমুকের বেটা ওমুক, ওর থেকে পীর হওয়ার যোগ্যতা আমার মাঝেই বেশী, অতএব আমার কাছেই তোমরা মুরীদ হও।
একদিন ঐ এলাকার এক শিক্ষিত যুবক বলল, আচ্ছা বলুন তো বুজরুগ্রা এমন করে বেড়াচ্ছেন কেন? আমি বললাম, উনাদের কি অন্য কোন এলাকায় মুরীদ আছে? বলল, কিছু কিছু আছে। আমি বললাম বুঝতে পারছনা, শুনো তোমাদের এলাকা হল ধানের এলাকা, প্রচুর ধান হয়। আলু পেঁয়াজও মন্দ হয় না। এখন কোনমতে শতখানেক গ্রাম যদি একজন বুঞ্জুগ হাতে রাখতে পারেন, তো আর যায় কোথা; প্রত্যেক গ্রাম থেকে কমপক্ষে গড়পরতা মণ দশেক করে ধান যদি আদায় করতে পারেন তো একহাজার মণ ধান পাওয়া যাবে। পাঁচ মণ করে আলু পেয়াজ আদায় করতে পারলে, পাঁচশ' মণ আলু পেয়াজ হবে। তারপর যাকাত, ওশর, ফিতরা ও কুরবানীর চামড়ার অর্ধেক বা সিকি তো আছেই, তাহলে দু'চার শ' বিঘা জমির চেয়ে এই পীরগিরিতেই বেশী ফায়দা। আর এ দুনিয়াটা হল বড় বিচিত্র, আর এখানকার মানুষগুলোও বড় বিচিত্র। কাজেই এ দুনিয়ার একদল সুযোগ সন্ধানী এ সুযোগটা ছাড়বে কেন?
ভক্তদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের আরও ফন্দী আছে। যেমন পীর সাহেব একটা মাদ্রাসা ঘর তৈরী করলেন। ভক্তদের মধ্য হতে দু'একজন উসতাযী রাখলেন। দু'চারটা তালবিলিমকে জা'গীর করে দিলেন। এবার হাজার হাজার ভক্তদের মাঝে যেয়ে বলতে লাগলেন- বাবারা! এবার ওরশ, যাকাত, ফিতরা কুরবানী সবই আমাকে দাও। বাগান দাও, সম্পত্তি দাও। কারণ, আমি বিরাট এক কাজে হাত দিয়েছি। এদেশের কোন ছেলেকে দিল্লী, লাক্ষ্ণৌ, সাহারনপুর আর মিসর যেতে দিব না। ওখানকার পড়া আমার এখানেই হবে। বিরাট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছি, তোমরা কেবল টাকা দাও- টাকা দাও। ভক্তরা দিতে লাগল টাকা, দিতে লাগল জমি, দিতে লাগল আরো অনেক কিছু।
মাদ্রাসার নামে পাওয়া গেল জমি, পাওয়া গেল বাগান, পাওয়া গেল পুকুর, পাওয়া গেল প্রচুর অর্থ কিন্তু মাদ্রাসার উন্নতি আর হল না। বিরাট পরিকল্পনা পীর সাহেবের কলবের মধ্যেই থেকে গেল। এখন কৈফিয়ৎ তলব করবে কে? পীর সাহেবই তো সব। তিনিই প্রতিষ্ঠাতা, তিনিই পরিচালক, তিনিই সেক্রেটারী, তিনিই ক্যাশিয়ার- তিনিই সব। তাঁর কাজে ভুল ধরতে গেলে চরম বেআদবী হবে। শিষ্য থেকেই সে খারিজ হয়ে যাবে। কিয়ামতের মাঠে সে পীর সাহেবের শাফাআতই পাবে না। অতএব, যা করেন বাবা পীর কেবলা। পীর সাহেবের ইন্তিকালের পর দেখা গেল, তাঁর ছেলেরা পীরত্ব ঠিকই বজায় রেখেছেন, মাদ্রাসার নামে টাকাও আদায় করছেন; মাদ্রাসাটি কাজীর গরু কিতাবের মত ঠিকই বহাল রেখেছেন, আর মাদ্রাসার যাবতীয় সম্পত্তি ভাগ বাটোয়ারা করে নিজেদের নামে রেকর্ড করে নিয়ে সুখে স্বাচ্ছন্দে ভোগ দখল করছেন।
মোটকথা পীর বংশটা বংশানুক্রমে বিনা পরিশ্রমে আরামসে যাতে দিন গুজরান করতে পারে, পীরগিরিটা হচ্ছে তারই একটা শ্রেষ্ঠ অবলম্বন। তবে সুখের বিষয় এই, বর্তমানে অধিকাংশ লোক পীরগিরির এসব ছলচাতুরী ধরে ফেলেছেন।

📘 পীরতন্ত্রের আজবলীলা > 📄 ভণ্ড পীরদের কীর্তিকাণ্ড

📄 ভণ্ড পীরদের কীর্তিকাণ্ড


এক শ্রেণীর ভণ্ড পীর বা ফকীর আমাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে। তাদের দাবী হল, কুরআন ত্রিশ পারা নয়- চল্লিশ পারা। তারা বলে দশ পারা আমাদের কাছে আছে। হকিকত ও মারফতীর আসল তত্ত্ব ঐ দশ পারার মধ্যেই আছে। মৌলবীরা ত্রিশ পারা কুরআন নিয়ে কচুরীপানার মত কেবল ভেসেই বেড়াচ্ছে, আর আসল ভেদ আমরাই পেয়েছি। এদের মতে, আবু বকর, উমার, উসমান, আয়িশা (রহ.), ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফিয়ী, ইমাম মালিক, ইমাম আহমাদ, ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম (রহ.) প্রমুখ শত শত সাহাবায়ে কেরাম, মহামতি ইমাম ও উলামায়ে দীনের কেউই আসল তত্ত্ব পাননি। একমাত্র তত্ত্ব পেয়েছে এই ফকীরের দল। এদের আরও বক্তব্য হল, ঐ দশ পারা লেখাজোখা নেই। ওগুলো খুব গোপন ব্যাপার, এদের সিনায় সিনায় ওগুলো সব চলে আসছে।
এই পীরদের কল্পিত দশ পারার গুপ্তভেদ এত ঘৃণিত, ন্যাক্কারজনক ও সাম স্যহীন যে, তা বর্ণনা করতে আমি নিজেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও দু'চারটি কথা না বলে থাকতে পারছি না। এদের প্রথম কথা হল, ত্রিশ পারা কুরআনে যে 'বিসমিল্লাহ' লেখা আছে, তা হল 'বীজমে আল্লাহ' অর্থাৎ বীর্যের মধ্যে আল্লাহ। সেজন্য এরা বীর্য বা ধাতুকে নষ্ট করা মহাপাপ বলে মনে করে এবং নিজেদের বীর্য নিজেরা খেয়ে ফেলে। নদীয়ায় বিখ্যাত পুঁথি সাহিত্যিক মুনশী ফসিহুদ্দীন তাঁর কিতাবে এদের 'প্রেমভাজা' খাওয়ার কথা লিখেছেন। আটার মধ্যে বীর্যপাত করে সেই আটা দিয়ে রুটি বানিয়ে পীর-মুরীদ সকলেই খুশী মনে খায়, তাকেই বলে 'প্রেমভাজা'। এই সব পীরের আখড়ায় কোন আগন্তুক গেলে তাকে একটা কিছু খেতেই হবে। খেতে না চাইলে পীর বাবাজী শত অনুরোধ করে হালুয়া হোক, রুটি হোক বা অন্য কিছু হোক, একটু তাকে খাওয়াবেই খাওয়াবে এবং উক্ত খাবারে পীর বাবাজীর একটু বীজ থাকবেই থাকবে। কেননা গোপন দশ পারায় আছে 'বীজমে আল্লাহ'।
নদীয়ার আরেক প্রখ্যাত পুঁথি সাহিত্যিক তাঁর কিতাবে 'লাল সাধন' বলে আর একটা জিনিসের কথা উল্লেখ করেছেন, সেটাও নাকি পীরদের গোপন দশপারায় লেখা আছে। মেয়েদের মাসিক রক্তস্রাব হলে- সে রক্ত ফেলে দেয়া চলবে না, নাক চোখ বন্ধ করে খেতে হবে- একে বলে লাল সাধন। তাছাড়া অমাবস্যার রাত্রিতে যদি কোন মেয়ের প্রথম মাসিক ঋতুস্রাব হয়, তাহলে ঐ রক্তমাখা ন্যাড়া একটু করে ছিঁড়ে ছিঁড়ে নিয়ে, পানিতে ভিজিয়ে রেখে, উক্ত পানি বা পানির শরবত আগন্তুকদের খাইয়ে থাকে। শুনা যায়, এতে নাকি আগন্তুকের চিত্ত-বিভ্রম ঘটে যায় এবং ঐ ব্যক্তি তার অজ্ঞাতেই নাকি পীরের অন্ধভক্ত হয়ে যায়।
উক্ত পীর সাহেবদের গোপন দশ পারার আর একটা ভেদের কথা হচ্ছে, মেয়েদের যৌনাঙ্গ একটা বয়ে যাওয়া নদীর ন্যায়। একটা মরা পচা দুর্গন্ধময় কুকুর নিয়ে যেয়ে, কেউ যদি ঐ নদীর পানিতে ফেলে দেয়, তাতে ঐ নদীর পানি যেমন নাপাক হতে পারে না, ঠিক সেরূপ কোন মুরীদ তার স্ত্রীর যৌনাঙ্গে বীর্যপাত করলে, উক্ত যৌনাঙ্গ পীর বাবাজীর জন্য হারাম হতে পারে না। পীর-মুরীদ সবাই মিলে উক্ত যৌনাঙ্গ ব্যবহার করতে পারবে- কারণ ওটা নদীর ন্যায়।
পীরদের কল্পিত দশ পারার আরও গোপন কথা হচ্ছে, শরীরের কোন জায়গায় নখ চুল কাটা যাবে না। চুল দাড়ির জন্য চিরুনী ব্যবহার করতে হবে না। তাতে মাথার চুলে জটা হয় হোক, দাড়িতে জটা হয় হোক, তাতে কোন ক্ষতি নেই বরং জটার অধিকারী হওয়া সৌভাগ্যের বিষয়। এরা আরও বলে- রসূল যখন মিরাজে গিয়েছিলেন, তখন কি তিনি ক্ষুর, কাঁচি, চিরুনী, নাপিত সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন? গা- কি তিনি ধুয়েছিলেন? তাহলে গোসল টোসলের কি দরকার? নখ চুল কাটার বা চিরুনী দিয়ে চুল দাড়ি আঁচড়াবার কি দরকার?
এসব পীরেরা তাদের ভক্তদেরকে বলে, বাবারা মৌলবীর দল আসল ভেদ পাবে কোথায়; আসল তত্ত্ব আমাদের কাছে। ঐ যে, 'আলিফ' অক্ষর দেখছ না? ঐ 'আলিফ' মানে আল্লাহ। আলিফের মাথা যেমন ফাটা, ঠিক তেমনি পুরুষের লিঙ্গের মাথাটাও ফাটা। অতএব বাবারা শুনো, ভেদ আছে- ভেদ আছে। ঐ লিঙ্গের মধ্যেই মারফতীর আসল তত্ত্ব নিহিত আছে।
এদের যুক্তি হল 'বীজ আল্লাহ'। আর ঐ বীজ থেকেই যখন মানুষ, তখন মানুষকে মানুষের সাথে মিশে 'ফানাফিল্লাহ' হয়ে যেতে হবে। তাই শত শত ভক্তের দল পীরের কাছে যায় ফানা হতে। শত শত মেয়েরা যায় দেহ মন উজাড় করে দিতে। পীর সাহেবও তার মাথা ফাটানো আলিফের আশ্চর্য্য কেরামতি দেখিয়ে সকলকে ফানাফিল্লায় পাঠিয়ে দেয়। আর মনের আনন্দে বলতে থাকে-
মন পাগলরে গুরু ভজনা
গুরু বিনে শান্তি পাবি না।
গুরু নামে আছে সুধা
যিনি গুরু তিনিই খোদা
মন পাগলরে গুরু ভজনা।
গুরু বা পীর ছাড়া এরা আর কিছুই বোঝে না। চলতে ফিরতে, খেতে শুতে, উঠতে বসতে, সব সময় পীরের ধ্যান করা, পীরের ছবি মানসপটে অঙ্কিত করে রাখাই হচ্ছে এদের একমাত্র ধর্ম। তেল মাখতে যেয়ে হাতে একটু তেল নিয়ে চোখ দু'টো বন্ধ করে, ধ্যানযোগে পীরকে আগে মাখিয়ে দিয়ে তারপর নিজে তেল মাখে। ভাত খেতে বসে এক মুঠো ভাত ও একটু তরকারী হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করে, ধ্যানযোগে আগে পীরকে খাইয়ে দিয়ে, সেই ভাত তরকারী থালার সব ভাতের উপর ছড়িয়ে দিয়ে তারপর খেতে আরম্ভ করে। এরা সরাসরি মসজিদে বা জামাআতে শরীক না হয়ে হুজরার মধ্যে ধ্যানযোগে পীরকে সিজদা করে। আর পীর যদি সামনেই থাকে তাহলে সরাসরি পীরকে সিজদা করে এবং উবুড় হয়ে পীরের পায়ের বুড়ো আঙ্গুল চুষতে থাকে; কেউবা পায়ের তলা চাটতে থাকে। এসব হল গোপন দশ পারার আসল ব্যাপার।
পাঠক হয়ত এসব কথা শুনে অবাক হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু জেনে রাখবেন এদের সংখ্যা বাংলাদেশে নেহায়েত কম না। অবিভক্ত বাংলার শ্রী চৈতণ্যের লীলাক্ষেত্র নদীয়া থেকে বৈষ্ণবদের অনুকরণে এই দলের আবির্ভাব ঘটেছিল। শ্রী চৈতন্য একজন দার্শনিক ছিলেন। শ্রী চৈতন্যের দর্শনকে খণ্ডন করার জন্য ইমাম গাজ্জালীর মত, জামালুদ্দীন আফগানীর মত, মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরীর মত ব্যক্তিদের দরকার ছিল। কিন্তু তা না হয়ে নদীয়ার শান্তিপুরের নিকট বুড়ল গ্রামের মুনশী আব্দুল্লাহ গেল চৈতন্যের সাথে বাহাস করতে। শেষে মুনশী আব্দুল্লাহ পরাজিত হয়ে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করে চৈতন্যের শিষ্য হয়ে গেল। চৈতন্য তার নাম রেখে দিরেন 'যবন হরিদাস'। আশুতোষ দেব তার বাংলা অভিধানে যবন হরিদাসের পরিচয়ে লিখেছেন- 'ইনি জনৈক হরিভক্ত মুসলমান'। স্বধর্ম ত্যাগ করে হরিনাম জপে রত হলে এই নামে খ্যাত হন।
বলাবাহুল্য, এই যবন হরিদাসই হল দশ পারা গোপন কুরআন ও ষাট হাজার গোপন কথার আবিষ্কারক। বাউলিয়া, শাহজিয়া, কীর্তনিয়া, বুদ্ধ-শায়েরিয়া, মাইজ-ভাণ্ডারিয়া প্রভৃতি যত পীর ফকিরের দল আছে, এদের গুরু ঠাকুর হল যবন হরিদাস। এরা যবন হরিদাসের চেলা। রসূল মুহাম্মাদ-এর এরা উম্মত কখনই নয়। বর্তমানে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গার এলাকায় এদের সংখ্যা অনেক এবং এদের একটি দল সুপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। যশোর, খুলনা, রাজশাহী, মোমেনশাহী, টাঙ্গাইল, চট্টগ্রাম, পাবনা প্রভৃতি জেলায় এদেরকে দেখা যায়। অন্যান্য জেলায় চেষ্টা চলছে। পশ্চিম বাংলা থেকেও মাঝে মধ্যে দু'চারটা অচেনা মুখ এসে টোপ গিলাবার চেষ্টা করে থাকে। এই ধরনের পীররা বাউলিয়া, কীর্তনিয়া, ন্যাড়া, শাহজিয়া, বুদ্ধ-শায়েরিয়া, ভাণ্ডারিয়া, নাগদিয়া, সোহাগীয়া, সন্দ্রোশিয়া প্রভৃতি বিভিন্ন নামে বিভিন্ন জায়গায় অভিহিত হয়ে থাকে। অনেকে আবার বড় বড় আল্লাহর ওলী ও বুজুর্গানে দীনের নাম ভাঙ্গিয়ে তাঁদের আশেক সেজে, ঝাড় বুঝে কোপ মেরে অতি কৌশলে এই সব ইসলাম বিরোধী কীর্তিকাণ্ড চালু করে থাকে।
আমি প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানিয়ে বলছি, আপনারা এই ধরনের পীর-ফকিরদের কাছে যাবেন না। কেননা এরা ভণ্ড; এরা কাফির। আমি নই, মহিউদ্দীন আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) তাঁর ফতহুল গায়েব কিতাবের ৮ পৃষ্ঠায় কি লিখেছেন, শুনুন। তিনি লিখেছেন-
'কুলু হাকিকাতিল্ লা ইয়াশহাদু লাহাশ্ শারও ফাহুয়া যিন্দীকাহ্।'
'শরীয়ত যে মা'রেফাত বা হাকিকাতের সাক্ষ্য দেয় না- সে মা'রেফাত কুফর।'
আমরা দেখছি, উক্ত ভণ্ড পীরদের কোন কথা বা কোন আচরণকে শরীয়ত সমর্থন করে না। শরীয়তের কোন জায়গায় লেখা নেই যে, দশ পারা কুরআন গুপ্তভাবে আছে। ভণ্ড পীরদের দশ পারা কুরআন ও তাদের বক্তব্যগুলো উদ্ভট কল্পনা প্রসূত। অবশ্য প্রতিটি দৃশ্যমান বস্তু যে স্রষ্টার অংশ বিশেষ, মানুষ যে নররূপী নারায়ণ- একথা শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্য বলে গেছেন। অতএব যারা 'বীজমে আল্লাহ' বলে থাকে, যারা গুরু নামে আছে সুধা, যিনি গুরু তিনিই খোদা- বলে থাকে, তারা যে আসলে শঙ্করাচার্য্যের শিষ্য- এতে কোন সন্দেহ নেই। তাদেরকে মুসলমান বলে অভিহিত করা কবীরা গুনাহ।
আল্লাহর নবীর যখন মিরাজ হল। তিনি ঘুরে এসে সাহাবাদের কাছে তা ব্যক্ত করলেন, তখন ক্ষুর কাঁচি নরুণের অভাবে তাঁর নখ চুল বড় হয়ে গিয়েছিল; চিরনী ব্যবহার না করায় তাঁর চুলে বা দাড়িতে জটা বেঁধে গিয়েছিল, একথা তো তাঁর সাহাবারা কেউ কোনদিন বলেননি; আল্লাহর নবী যত কথা বলেছেন, যত কাজ করেছেন, যে সব ব্যাপারে মৌন-সম্মতি দিয়েছেন, কোনটাই তো তাঁর সাহাবারা গোপন রাখেননি; আর এত বড় একটা কাণ্ড ঘটে গেল, চুল বড় বড় হয়ে গেল, লম্বা লম্বা জটা ঝুলতে লাগল, নখগুলো সব বাদুরের নখের মত হয়ে গেল, অথচ নিকটে যাঁরা ছিলেন তাঁরা কেউ দেখতে পেলেন না আর এই ফকিরগুলো সব দেখে ফেলল কিভাবে- বুঝলাম না। আল্লাহর রসূল গেলেন, তাঁর মিরাজ হলো, তিনি ফিরে এলেন, এসে দেখছেন বিছানা তখনো গরম, ওজুর পানি তখনো বয়ে যাচ্ছে, এমতাবস্থায় ঐ সফরে ক্ষুর কাঁচির কি দরকার ছিল তাও বুঝলাম না। আমরা জানি আল্লাহর রসূল আলম ঐ সময় খাবার টাবার কিছু নিয়ে যাননি। খাবার যখন তিনি নিয়ে যাননি তখন এই সব ফকিরদের খাওয়া দাওয়া একেবারে বন্ধ করে দেয়া দরকার। কিন্তু খাবার বেলায় ফকির সাহেবরা তালে ঠিক আছে।
রসূলুল্লাহ মাথায় যদি লম্বা চুল থাকত, চুল দাড়িতে যদি জটা ঝুলত, নখগুলো যদি বাদুরের নখের মত হতো, তাহলে তাঁর সাহাবাগণ নিশ্চয়ই এ সুন্নাত পালন করতেন, কিন্তু তা তাঁরা করেননি কেন? মহামতি ইমামদের মাথায় বা দাড়িতে এতবড় সুন্নাত ঝুলেনি কেন? খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি, আব্দুল কাদের জিলানী প্রমুখ আল্লাহওয়ালাদের মাথায় এ ধরনের জটা কোনদিন শোভা বর্ধন করেনি কেন? অবশ্য হিন্দু যোগী সন্ন্যাসীদের মাথায় লম্বা চুল ও জটা আমরা দেখে থাকি। তাদের মহাদেবের মাথাতে জটা আছে। অনেক যোগী সন্ন্যাসীকে বছরের পর বছর গোসল করতে দেখা যায় না। ছোট বেলায় জটাধারী এক ন্যাংটা সন্ন্যাসীকে গঙ্গার ঘাটে নিজের প্রস্রাব নিজেকেই ধরে খেতে দেখেছিলাম। এই ভক্ত পীররা যদি হিন্দু যোগী সন্ন্যাসীদের অনুকরণ করে করুক, প্রেম ভাজা খায় খাক, গাঁজার কলকেয় বা হুক্কা সিগারেটে টান মারে মারুক, যা মন চায় তাই করুক- তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। কিন্তু সব সময় বিশ্বাস রাখতে হবে, ইসলামের সঙ্গে ওদের কোনই সম্পর্ক নেই।
যদি কোন মুসলমানের বাচ্চা ওদের পা চুমতে যায়, তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। অতিসত্বর তার তওবা-ইস্তিগফার করা ওয়াজিব।
মা-বোনদের যৌনাঙ্গকে নদীর সাথে তুলনা করে যা ব্যভিচারের কৃমি-কীটে পরিণত হয়, তারা পীর নয়, ইসলাম বলে তারা শিয়াল কুকুরেরও অধম। এই অধমগুলো শুধু যে লালসাধন ও প্রেমভাজা খাইয়ে মানুষকে বশ করে তাই নয়, ঘাড় গুঁজে চক্ষু খুঁজে কিছু কারামতিও জাহির করে থাকে। কারামতের কথা এক্ষুনি শুনবেন। এখানে শুধু এতটুকু বলে রাখছি যে, এসব ভণ্ড পীরের ফাঁদে কেউ যেন পা বাড়াবেন না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00