📘 পীরতন্ত্রের আজবলীলা > 📄 পীর শব্দের তাৎপর্য

📄 পীর শব্দের তাৎপর্য


যে পীর পীর করে আমরা এতো পাগল, সেই পীর শব্দটা কিন্তু আরবী শব্দ নয়। আর ওটা পবিত্র কুরআন ও হাদীসের পরিভাষারও কোন শব্দ নয়। পীর শব্দটা ফারসী শব্দ। মানুষের বয়স বেশী হয়ে গেলে সেই বুড়োবুড়ি মানুষকে বলা হয় পীর। পারস্যের অগ্নি পূজারীদের পুরোহিতকে বলা হয় 'পীরে মুগাঁ'। ফারসী অভিধানে 'পীরে মুগাঁর' অর্থ করা হয়েছে- 'আতাশ পোরকুঁকা মুরশেদ' অগ্নি পূজারীদের পুরোহিত। মদের আড্ডায় যিনি মদ বিক্রয় করেন, সেই গুঁড়ি মহাশয়কে বলা হয় পীরে মুগাঁ। মুসলমানদের কোন ইমাম, খতীব, নায়েবে নবী বা নেতার শানে এই পীর শব্দটাকে ব্যবহার করতে হবে, এ প্রমাণ কুরআন ও হাদীসে মিলে না। তবে কেউ কেউ আধ্যাত্মিক প্রেমকে রূপকভাবে মদরূপে অভিহিত করে, সেই প্রেমরস পরিবেশনকারীকে পীরে মুগাঁ বা শুঁড়ি মশায় বলে অভিহিত করেছেন যেমন: بمائے سجادہ رنگین کن غیرت پیرے موگاں گوید سے سالک بے خبر نه بود جی راهی رسمو منزلها বমায়ে শাজ্জাদাহ্ রঙ্গীন কুন গিরাত পীরে মুগাঁ গোয়াদ সে সালেক বেখবর নাবুদ যে রাহে রামা মান্যালহা।
পীর মুগাঁ অর্থাৎ শুঁড়ি মশায় যদি বলেন, তাহলে তুমি জায়নামাযকে মদের দ্বারা রাঙিয়ে তুলো। কেননা পথের সন্ধান গুরুজী ভালভাবেই অবগত আছেন। এই কবিতার শুঁড়ি মশায়কে 'পীরে মুগাঁ' বলা হয়েছে।
খৃষ্টানদের Priest আর হিন্দুদের পুরোহিত বলতে যা বুঝায়, পীর বলতে ঠিক তাই বুঝায়। পীর পুরোহিত বা Priest এর কোন প্রতিশব্দ কুরআন হাদীসে নেই। আবূ বকর, উমার, উসমান, আলী (রাযি.) প্রমুখ সাহাবীগণও কেউ কোনদিন পীর বলে দাবী করেননি। তাবিয়ীনদের যুগে পীরের অস্তিত্ব ছিল না। ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফিয়ী, ইমাম মালিক, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল, ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবূ দাউদ, ইমাম নাসায়ী, ইমাম তিরমিযী, ইমাম ইবনু মাজাহ (রহ.) প্রভৃতি মহামতি ইমামগণও পীরগিরি করেননি। কোন্ কুক্ষণে পারস্যের অগ্নি পূজারীদের সেই পীর তওহীদবাদী মুসলিম সমাজের ঘাড়ে-গর্দানে জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসল- তা ভেবে কুল পাওয়া যায় না।
আরবী ভাষায় উসতায ও নেতাকে শাইখ বলা হয়। পীরি-মুরীদির শাস্ত্রে কেউ কেউ এ শাইখ শব্দটাকে পারস্যের অগ্নি পূজারীদের পীরের সমঅর্থবোধক বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তওহীদবাদী মুসলমানদের উসতায ও নেতাকে আর অগ্নি পূজকদের পুরোহিতকে এক গোয়ালে পুরে দেয়া কেমন করে হালাল হয়ে গেল- বুঝলাম না।

📘 পীরতন্ত্রের আজবলীলা > 📄 পীরদের দাবী

📄 পীরদের দাবী


আমাদের দেশে নানা ধরনের পীর দেখা যায়। সব পীরের যে দাবী এক- তা নয়। তবে অধিকাংশ পীরের দাবী হচ্ছে ঠিক হিন্দুদের পুরোহিতদের মতই। পুরোহিত ও যাজকরা সব সময় হিন্দু জাতির সামনে থাকেন। পূজা-পার্বন, যাগ-যজ্ঞ ও শ্রাদ্ধ প্রভৃতির একচেটিয়া মালিক তারাই। তারা ছাড়া এ সবের অধিকার আর কারো নেই। তারা মানুষ আর সৃষ্টিকর্তার মাঝে মাধ্যম বা 'ওসীলা' স্বরূপ। সৃষ্টিকর্তার কাছে সরাসরি মানুষ যেতে পারে না, তাই এ 'Edditional God' এর কাছে তাদেরকে যেতে হয়। পুরোহিত না হলে পূজা অর্চনা হয় না, মনের বাসনা পুরা হয়না, পাপমুক্ত হওয়া যায় না। পুরোহিত বা 'Edditional God' যার আছে তার সবই আছে, আর যার পুরোহিত নেই তার মত হতভাগা আর কেউ নেই। এই পুরোহিতরাই গুরুদেব নামে আখ্যায়িত হয়ে থাকেন। কারণ মন্ত্র পড়ান এই গুরুদেব, শিক্ষা দেন এই গুরুদেব, ভক্তের পাপমোচন করে দেন এই গুরুদেব, ভক্তের যাবতীয় মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন এই গুরুদেব। ভক্ত শত অপরাধে অপরাধী হোক, শম্ভু হয়ে তার শত অপরাধ নাশ করে দিয়ে স্বয়ং ভগবানকে দেখিয়ে দেন এই গুরুদেব।
বলাবাহুল্য, পুরোহিত তন্ত্র বা গুরুবাদ হিন্দু সমাজের যে অবস্থা ঘটিয়েছে, পীরতন্ত্র ঠিক সেরূপ মুসলিম সমাজের অবস্থা ঘটিয়েছে। কারণ পীরের দাবী পুরোহিতদের দাবীর চেয়ে কোন অংশে কম নয়। পীররাও বান্দা আর আল্লাহর মাঝখানে নিজেদেরকে মাধ্যম বা 'ওসীলা' বলে দাবী করেন। তাঁর মুরিদ-মুরীদি বানান; তাঁরা ভক্তদের গোনাহখাতা নাশ করে পাপমুক্ত করেন, তাঁদের অনেকেই পরকালে মুরীদদেরকে বেহেশতে পৌঁছে দেয়ার 'গ্যারান্টি' দিয়ে থাকেন; অনেকে আবার ভক্তদেরকে আল্লাহর সঙ্গে দেখাও করিয়ে দেন; ইসমাঈলিয়াদের পীর আগাখান তো এখানে বসেই বেহেশতের পাসপোর্ট ভিসা দিয়ে থাকেন। তাহলে এখানে পুরোহিত ও পীর সবাই যে একই পথের পথিক তাতে আর সন্দেহ থাকলো কোথায়?

📘 পীরতন্ত্রের আজবলীলা > 📄 পীরদের দাবী ঠিক নয়

📄 পীরদের দাবী ঠিক নয়


ইসলামী শারা শরীয়ত মতে পীর পুরোহিতদের দাবীগুলো ঠিক নয়। কারণ মানুষের পাপমোচন করার অধিকার কোন পীরকে দেয়া হয়নি। পাপ নাশ করার শক্তি কোন মানুষের নেই, কোন ফেরেশতার নেই, কোন জ্বিনের নেই, কোন ওলী-দরবেশের নেই। পাপমোচনের একমাত্র অধিকারী মহান আল্লাহ। সূরা আলে-ইমরানের ১৩৫ আয়াতে আছে- وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ ...*
"কোন ঈমানদার মুসলমান যখন কোন পাপ কাজ করে বসে, তখন তারা আল্লাহর কাছেই ক্ষমা চায়, কেননা আল্লাহ ছাড়া গোনাহ্ খাতা মাফ কে করতে পারে?"
اسکو درجے کو پہنچ سکتے نہی غوس و کتب زندگی میں جسنے پائی صحبت خیر الورا
উস্কে দাৰ্জে কো পুহুচ্ সাক্তে নেহী গওস্ ও কুতুব জিন্দেগী মে জিনে পায়ী সহবতে খায়রুল ওরা।
জীবনে যাঁরা প্রিয় রসূল-এর সাহচর্য লাভ করেছেন, তথাকথিত গওস্ ও কুতুবরা তাঁদের দরজায় পৌঁছতে পারে না। এহেন মহাসম্মানিত নিজের রসূলকেও আল্লাহ তা'আলা পাপমোচনের অধিকার দেননি। সূরা আন-নিসার ৬৪ আয়াতে বলা হয়েছে-
وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَّحِيمًا *
"পাপীরা যদি রসূলের কাছে এসে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় আর রসূলও যদি তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান, তাহলে আল্লাহকে তারা ক্ষমাশীল করুণাময়রূপে পাবে।"
এ থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে, পাপমুক্ত করার শক্তি রসূলকে দেয়া হয়নি। এবার হিদায়াত করার কথা। হিদায়াত করার শক্তি পীরতো দূরের কথা, আল্লাহর রসূলও পাননি। সূরা আল-কাসাসের ৫৬ আয়াতে আল্লাহ তাঁর নবীকে বলেছেন-
إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ *
"আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না, তবে আল্লাহ তা'আলাই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন। কে সৎপথে আসবে, সে সম্পর্কে তিনিই ভাল জানেন।"
মোট কথা পাপমোচনের দাবীও পীর সাহেবদের মিথ্যা, আর হিদায়াত করার দাবীও পীর সাহেবদের অমূলক। কোন কোন পীর সাহেব ভক্তদের পাপের বোঝা বহন করবেন বলে সান্ত্বনা বা 'গ্যারান্টি' দিয়ে থাকেন। তাঁদের এ দাবীও পীরগিরি বহাল রাখার এক ফন্দি ছাড়া আর কিছু না।
কুরআনে সূরা আন্কাবুত ১২ নং আয়াতে আছে-
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلَّذِينَ آمَنُوا اتَّبِعُوا سَبِيلَنَا وَلَنَحْمِلُ خَطِيكُمْ وَمَا هُمْ يَحْمِلِينَ مِنْ خَطِيهُمْ مِنْ شَيْءٍ إِنَّهُمْ لَكَذِبُونَ *
"কাফিররা মুমিনদেরকে বলতো আমাদের পথে চল, আমরা তোমাদের পাপের বোঝা বহন করব। কিন্তু তারা তাদের একটুমাত্র বোঝাও বহন করার শক্তি রাখে না; তারা মিথ্যুক, তারা ধোঁকাবাজ।
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিম শরীফের একটি হাদীসে পাওয়া যায়, আল্লাহর রসূল নিজের বংশের সকলকে আর বিশেষ করে আপন চাচা আব্বাস (রাযি.)-কে, আপন ফুফু সুফিয়া (রাযি.)-কে ও আপন মেয়ে ফাতিমা (রাযি.)-কে ডেকে বলেছিলেন, তোমরা আল্লাহর কাছ থেকে নিজেদেরকে মুক্ত কর। কেননা তোমাদেরকে উদ্ধার করার ব্যাপারে আমি তোমাদের কোনই কাজে লাগব না। হে বেটি ফাতিমা! এখন আমার মাল থেকে যা ইচ্ছে নিতে পার, কিন্তু জেনে রাখ আল্লাহর কাছে আমি তোমার কোনই কাজে লাগব না।
পাঠক এখানে লক্ষ্য করুন- যিনি সৃষ্টির সেরা, যিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই প্রিয় রসূল মুহাম্মদ মোস্তফা যদি কিয়ামতের দিন নিজের মেয়ে ফাতিমার দোষ-ত্রুটির দায়িত্ব গ্রহণ করতে অক্ষমতা প্রকাশ করেন, তাহলে কোন্ সাহসে এক শ্রেণীর পীর-নামধারী গুরুদেব কিয়ামতের মাঠে ভক্তদের পাপের বোঝা বহন করার স্পর্ধা দেখাতে পারে বুঝতে পারি না।

📘 পীরতন্ত্রের আজবলীলা > 📄 ওসীলা হওয়ার দাবীও ভিত্তিহীন

📄 ওসীলা হওয়ার দাবীও ভিত্তিহীন


পীরদের আর এক দাবী হল, তাঁরা জনগণকে সম্বোধন করে বলেন, আদালতে ইষ্ট সিদ্ধির জন্য যেমন উকিল মোক্তারের দরকার, ঠিক তেমনি তোমরা সংসারের ক্ষুদ্র কীট, সরাসরি আল্লাহর কাছে যেতে পারবে না। আল্লাহর কাছে যেতে গেলে ওসীলা বা মাধ্যম তোমাদেরকে ধরতেই হবে, আর সেই মাধ্যম বা উকিল মোক্তার হচ্ছি আমরা এই পীরের দল।
পীরদের এ দাবীও ভিত্তিহীন। কারণ যে আল্লাহ প্রেমময়-বান্দার অন্তরের অন্তঃস্থলের যাবতীয় খবর রাখেন, যে আল্লাহ বান্দার আকুল ফরিয়াদ সরাসরি শ্রবণ করতে সক্ষম, সেই আল্লাহকে দুনিয়ার সংকীর্ণ দৃষ্টি, সসীম জ্ঞান, একেবারে অক্ষম বিচারকদের সাথে তুলনা করে পীরদের উকিল মোক্তার সাজার দাবীটা শির্ক ছাড়া আর কি হতে পারে?
এদের সম্পর্কে কুরআনের সূরা ইউনুসের ১৮ আয়াতে বলা হয়েছে- وَيَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللَّهِ قُلْ أَتُنَبِّئُونَ اللَّهَ بِمَا لَا يَعْلَمُ فِي السَّمَوتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ سُبْحْنَهُ وَتَعَلَّى عَمَّا يُشْرِكُونَ *
'তারা আল্লাহ ব্যতীত যাদের পূজায় লিপ্ত রয়েছে, তারা তাদের লাভ ও ক্ষতি কিছুই করতে পারে না, আর এই অপকর্মের কৈফিয়ত স্বরূপ তারা বলে থাকে, ওরা আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য সুপারিশকারী মাত্র।' কুরআনে সূরা আয-যুমারের তৃতীয় আয়াতে বর্ণিত আছে- الَّا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ كَمَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّ بُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى ... *
"উপাসনাকে শুধু আল্লাহর জন্য নির্ধারিত কর। যারা আল্লাহকে ছেড়ে আরও পৃষ্ঠপোষকের দল গ্রহণ করেছে, তারা বলে থাকে আমরা ওদের পূজা অর্চনা শুধু এই আশাতে করি যে, তারা 'ওসীলা' হয়ে আমাদেরকে আল্লাহর কাছে পৌঁছে দিবে।"
কোন কোন পীরভক্ত হয়তো এখানে বলবেন, মুরীদরা কি পীরের পূজা উপাসনা করে নাকি? অবশ্য এরূপ প্রশ্ন আদি বিনে হাতিম আল্লাহর রসূল -কে করেছিলেন। একদিন আল্লাহর রসূল কুরআনের সূরা তাওবার ৩১ নং আয়াতটি পাঠ করছিলেন-
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ رُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّنْ دُونِ اللَّهِ *
"ইয়াহুদী আর খৃষ্টানরা তাদের পণ্ডিত পুরোহিতদেরকে আল্লাহর পরিবর্তে রব বানিয়ে নিয়েছে।”
এমন সময় খৃষ্টান পণ্ডিত আদি বিনে হাতিম সেখানে হাজির হয়ে বললেন, কই আমরা তো তাদের পূজা অর্চনা করি না। আল্লাহর রসূল তখন বললেন, আল্লাহ যা হালাল করেছেন, সেগুলোকে যদি তারা হারাম বলে ঘোষণা করে, তাহলে তোমরা কি সেই হালালকে হারাম বলে গ্রহণ কর না? আর আল্লাহ যা হারাম করেছেন, সেগুলোকে যদি তারা হালাল বলে ফতোয়া দেয়, তাহলে তোমরা কি সেই হারামকে হালাল বলে স্বীকার কর না? আদি বললেন, জী হাঁ। আল্লাহর রসূল আলাইহি বললেন, এটাই হচ্ছে তাদের পূজা অর্চনা করা। (ইবনু জারীর) ওয়াসাল্লাম
মোটকথা, আল্লাহ কোন মানুষকে পাপমুক্ত করার শক্তি, হিদায়াত করার শক্তি, দেহ ও মনের পবিত্রতা সাধন করার শক্তি পাপের বোঝা বহন করার শক্তি এবং আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে উকালতি করার শক্তি দেননি। এখন যদি কেউ বলে, মানুষ মেরেছি, দুর্নীতি করেছি, গুণ্ডামী করেছি, লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছি, গাড়ি বাড়ি করেছি, পর্বত প্রমাণ গুনাহ্ বোঝা হয়েছে, চতুর্দিক অন্ধকার। আমাকে বাঁচাবে কে- আমার ঐ পীর; আমাকে হিদায়াত করবে কে- আমার ঐ পীর; উকালতি করবে কে- আমার ঐ পীর। তাহলে এটাই হবে পীরের পূজা করা।
পূর্বেই বলেছি, পীর বা পুরোহিতের অস্তিত্ব ইসলামে নেই। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় প্রত্যেক মুসলমান স্বয়ং তার পুরোহিত। প্রত্যেক মুসলমানকে মহান আল্লাহর সাথে সরাসরি আধ্যাত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ বলেছেন- 'রাজা ও প্রজাদের মধ্যে যেমন মধ্যস্থ ধরা হয়, তেমনি আল্লাহ ও তাঁর বান্দার মধ্যে মধ্যস্থ ধরা হারাম। যারা কাফির, মুশরিক এবং বিদআতী, তাদের ধারণা রাজা আর প্রজাদের মধ্যে যেমন আড়াল বা ব্যবধান থাকে, ঠিক তেমনি আল্লাহ ও তাঁর বান্দার মধ্যে আড়াল বা ব্যবধান আছে। যারা সাধারণ মানুষ, হিদায়াতের ব্যাপারে, রুযী-রোজগারের ব্যাপারে বা অন্যান্য • দরকারী ব্যাপারে সরাসরি আল্লাহর কাছে আবেদন জানানোর অধিকার তাদের নেই, কাজেই মাঝখানে একটা মধ্যস্থের দরকার। এই মধ্যস্থের মাধ্যমেই তাদেরকে প্রার্থনা জানাতে হবে। তারা আরও মনে করে, এই মাধ্যমের মারফতে আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে হিদায়াত করে থাকেন ও রুযী-রোজগারের বিতরণ করে থাকেন। অতএব সাধারণ লোক এই মধ্যস্থদের কাছে আকুল ফরিয়াদ জানাবে আর মধ্যস্থগণ তাদের আবেদন আল্লাহর কাছে পৌঁছে দিবে, যেমন রাজার পরিষদরা রাজার সান্নিধ্য লাভ করার দরুন তাদের কথা যেমন রাজার কাছে অধিক কার্যকরী হয়ে থাকে, ঠিক তেমনি এই পীর ফকিরের দল মধ্যস্থরূপে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করেছে বলে তাদের সুপারিশ ও আল্লাহর কাছে অত্যধিক কার্যকরী হবে, এরূপ ধারণা নিয়ে কোন ব্যক্তি কাউকে পীর, মুর্শেদ, গুরু বা পুরোহিত যে নামেই হোক না কেন, মধ্যস্থ মান্য করলে সে কাফির ও মুশরিক হয়ে যাবে। তাদের তাওবাহ্ করা ওয়াজিব। (রাসায়েলে সুগ্রা)
ইবনু তাইমিয়ার এই মন্তব্যের পর কুরআন মাজীদের একটি আয়াতের দিকে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। কুরআনের একটি আয়াতে বলা হয়েছে: يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ وَجَاهِدُوا فِيُسَبِيْلِهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ *
"হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর আর তাঁর 'ওসীলা' অন্বেষণ কর এবং তাঁর পথে জিহাদ কর, তাহলে তোমরা পরিত্রাণ পাবে।"
এই আয়াতের মাঝে যে 'ওসীলা' শব্দ আছে, পীর সাহেবরা বলছেন, এই ওসীলার তাৎপর্য হচ্ছে মাধ্যম। তাঁরা 'ওয়ার্ তাগু ইলাইহিল ওসীলা'র অর্থ করেছেন 'আল্লাহর কাছে যাওয়ার জন্য ওসীলা বানাও'। পীর সাহেবরা জোর দাবী করে বলছেন, আমরা সেই ওসীলা। আমাদেরকে না ধরলে তোমাদের রক্ষা নেই। আর মুরীদরাও এই ওসীলাকে ঠেলে নিয়ে যেয়ে পীরপূজা ও কবরপূজায় রূপ দিয়ে দিয়েছে। তারা বলে- شيئا لله چوں غداء مستمند ال مدد خاهم جے خاجا نقش بند
'শায়আন লিল্লাহ চুঁ গাদায়ে মুস্তামান্দ আল্‌ল্মদদ খাহাম যেখাজা নক্শ বন্দ।'
আমি নেহায়েত বাধ্য ও অভাবগ্রস্থ হয়ে নক্শ বন্দ সাহেবের কাছে আল্লাহর ওয়াস্তে কিছু চাচ্ছি।
পাঠকগণ এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্য করুন। যেখানে দাবী করা হচ্ছে ঐ সব বুজরুগ পীররা আমাদের ওসীলা। ওদের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে কিছু চাইতে হবে। আল্লাহ তা'আলাই আমাদেরকে ওদের মাধ্যমে দিবেন, কারণ আল্লাহই হচ্ছেন আসল কর্তা। কিন্তু হয়ে গেল তার উল্টা। নক্শ বন্দ সাহেবকে ওসীলা না বানিয়ে ওসীলা বানানো হল আল্লাহকে। 'শায়আন লিল্লাহ, অর্থাৎ হে বুজুর্গ, আল্লাহর ওয়াস্তে কিছু দিন। এ কথার দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হচ্ছে যে, আসল দেনেওয়ালা এ পীর আর আল্লাহ হলেন ওসীলা। কি তাআজ্জুব ব্যাপার।
যাক, এখন কথা হচ্ছে, 'ওয়ার্ তাগু ইলাইহিল ওসীলা'র নৈকট্য লাভ করতে হলে কুরআন হাদীস মোতাবেক আল্লাহর দ্বারা আল্লাহ একথা আমাদের বলেননি যে, তোমরা পীর ধর।' ওসীলা শব্দের আসল অর্থ হচ্ছে 'নৈকট্য'। আর আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীর দ্বারাই করতে হবে। শাহ অলিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবী এর অর্থ করেছেন- 'আল্লাহর নৈকট্য অন্বেষণ কর। কামুস নামক বিখ্যাত অভিধান গ্রন্থে বলা হয়েছে- 'বাদশাহ বা মহান আল্লাহর নৈকট্যের নাম ওসীলা।' কুরআনের ভাষ্যকারগণ সমবেতভাবে ওসীলার অর্থ 'নৈকট্য' বলে উল্লেখ করেছেন। তফসীর জালালায়িনে 'ওয়ান্তাগু ইলাইহিল ওসীলা'র মানে করা হয়েছে- 'ইবাদত বন্দেগীর দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ কর।' তফসীর জামেউল বয়ানে ওসীলার অর্থে বলা হয়েছে- 'ইবাদতের দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অন্বেষণ করা।' তফসীর খাযেনে ওসীলার তাৎপর্যে বলা হয়েছে- ইবাদত ও সৎকর্মের দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অন্বেষণ কর। তফসীর মাদারিকে 'ওসীলা' প্রসঙ্গে বলা হয়েছে- 'ওসীলা' ঐ কাজের নাম যার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। তফসীর ফতহুল বয়ানে বলা হয়েছে- 'ওসীলা' আল্লাহর নৈকট্যের নাম। হাফেয ইবনু কাসীর বলেছেন- 'আল্লাহর নৈকট্যের নাম যে 'ওসীলা' এ বিষয়ে কুরআনের ভাষ্যকারদের মধ্যে কোন মতভেদ নেই। তফসীর কাবীরে বলা হয়েছে- 'ওসীলা' ওরই নাম, যার সাহায্যে উদ্দেশ্য পর্যন্ত পৌঁছতে পারা যায়। এই ওসীলার উদ্দেশ্য- ঐ ওসীলা যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে কাজে লাগে। এ ওসীলা ইবাদত ও আনুগত্যের সাথে সম্পর্কিত।
মোটকথা সমস্ত অভিধান ও তফসীরের কিতাব থেকে এ কথাই জানা যাচ্ছে যে, ওসীলা ঐসব ইবাদত ও সৎকর্মের নাম, যা আল্লাহর নৈকট্য লাভে সহায়ক হয়। আল্লাহকে পেতে হলে ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে, সৎকর্মের মাধ্যমে, কুরআন ও হাদীসের নির্দেশের মাধ্যমেই পেতে হবে। এ নয় যে, কোন মানুষকে মাঝখানে রেখে প্রার্থনা কর, আর শেষ পর্যন্ত ঐ বুজুর্গের কাছেই চাইতে শুরু করে দাও।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00