📘 পাশ্চাত্য সভ্যতায় ইসলাম 📄 সঙ্গীত

📄 সঙ্গীত


যে দুস্তর ব্যবধান প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সঙ্গীত শিল্পকে বিচ্ছিন্ন রেখেছে তা বিবেচনা করলে ইউরোপীয় সঙ্গীতে কোন আরব বা মুসলিম উত্তরাধিকারের অস্তিত্ব উপলব্ধি করা দুঃসাধ্য। ইউরোপীয়রা সঙ্গীতকে উল্লম্বভাবে এবং আরবরা সমান্তরালভাবে দেখে, সাধারণভাবে বলতে গেলে যে হার্মনিক ও মেলডিক মূলনীতি যথাক্রমে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের সঙ্গীত শিল্পের মধ্যে নিহিত এটিই হচ্ছে তার বোধগম্য পার্থক্য। তাছাড়া স্বর, ছন্দ ও মেলডিকে সুশোভিত করার ব্যাপারে আরবদের যেসব ধারণা রয়েছে তা আমাদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। অবশ্য দশম শতকের আগে দুটি শিল্পের পার্থক্য তেমন বিরাট ছিল না। বস্তুত দুটিকে একটি সাধারণ পর্যায়ে নিয়ে আসা যেতো বলে তাদের মধ্যেকার পার্থক্য ছিল অতি সামান্য। কোন এক সময় উভয়েরই একই পিথাগোরিয়ান স্বরগ্রাম ছিল। উভয়টিই কিছুটা গ্রীক ও সিরীয় উপাদানে গঠিত ছিল। সর্বোপরি বর্তমানে আমরা হার্মনি বলতে যা বুঝি তা অজ্ঞাত ছিল। এ দুটির মধ্যে যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল তা হচ্ছে, আরবরা এক ধরনের পরিমাপমূলক সঙ্গীত পদ্ধতির অধিকারী ছিল এবং তাদের মেলডিকে সুশোভিত করার একটি সুনির্দিষ্ট ধারণা ছিল। এই দুটিই যথাসময়ে পাশ্চাত্য সঙ্গীতকে প্রভাবিত করে।

সেমিটিক তত্ত্ব এবং প্রাচীনতর কালের চর্চা হচ্ছে আরব সঙ্গীতের উৎস। প্রকৃত ভিত্তি না হলেও এ দুটি গ্রীক সঙ্গীত তত্ত্ব ও চর্চাকে প্রভাবিত করেছে। ইসলামের আবির্ভাবের অব্যবহিত পূর্বে আরব রাজ্য আল-হিরা ও গাসসান নিঃসন্দেহে যথাক্রমে পারস্য ও বাইযেন্টাইন রীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই দুটি সাম্রাজ্যে সম্ভবত পিথাগোরিয়ান স্বরগ্রাম প্রচলিত ছিল। মূলত সেমাইটরাই এই স্বরগ্রামের উৎস।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে আমরা দেখতে পাই যে, তৎকালীন রাজনৈতিক কেন্দ্র আল-হিজাযে পরিমাপমূলক সঙ্গীত প্রচলিত ছিল। এটিকে ইকা বা ছন্দ বলা হতো, প্রায় একই সময়ে ইবনে মিসজাহ নামক জনৈক সঙ্গীতজ্ঞ সঙ্গীতের একটি নতুন মতবাদ প্রবর্তন করেন। এই মতবাদে পারস্য ও বাইযেন্টাইন উপাদান ছিল। কিন্তু পরলোকগত ড. জে পি এন ল্যান্ড মন্তব্য করেন : "পারস্য ও বাইযেন্টাইন উপাদান জাতীয় সঙ্গীতকে ছাড়িয়ে যায়নি, বরং নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন আরব ভিত্তিভূমির ওপর এগুলি গ্রথিত হয়।" এই পদ্ধতির স্বরগ্রাম পিথাগোরিয়ান বলে মনে হয়। ১২৫৮ খৃস্টাব্দে বাগদাদের পতন পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে।

ইতিমধ্যে কতিপয় পরিবর্তন সাধিত হয়। স্বরগ্রামে এগুলি এতোটা গোলযোগপূর্ণ ছিল যে, ইসহাক আল মাউসিলি এই মতবাদকে এর সাবেক পিথাগোরিয়ান আদর্শে পুনর্গঠিত করেন। আল ইস্ফাহানী পর্যন্ত এই পদ্ধতি অব্যাহত ছিল। তার সময় থেকে পুনরায় উপরোক্ত ধ্যানধারণা সমূহের আবির্ভাব ঘটে। এই শেষোক্ত ধ্যানধারণা হচ্ছে যালযালিয়ান ও খুরাসানিয়ান স্বরগ্রাম। প্রাচীনতর পদ্ধতিকে ভিত্তি হিসাবে সংরক্ষণে প্রাচীন গ্রীক মতবাদ সহায়তা করে। অ্যারিস্টটল, অ্যারিস্টক্সেনাস, ইউক্লিড, নিকোমেচাস, টলেমী ও অন্যদের রচনা অনুবাদের মাধ্যমে এই মতবাদের সংমিশ্রণ ঘটে। এসব আমদানি সত্ত্বেও আমরা আল-কিন্দী, আল ইসফাহানী ও ব্রিদরেন অব পিউরিটির মাধ্যমে জানতে পারি যে, আরব পারস্য ও বাইযেন্টাইন সঙ্গীত পদ্ধতি তাদের আলাদা সত্তা বজায় রাখে। একাদশ শতকের দিকে পারস্য ও খোরাসানী ধ্যানধারণা প্রবর্তিত হয় এবং তা বিশেষভাবে সঙ্গীতের মেজাজের ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায়। পরবর্তীকালে সাইফুদ্দিন আবদুল মুমিন নামক জনৈক তাত্ত্বিক একটি নতুন তত্ত্ব প্রবর্তন বা পদ্ধতিবদ্ধ করেন। অপরদিকে মধ্য যুগ শেষ হওয়ার আগে এক-চতুর্থাংশ স্বর পদ্ধতি নামে অপর একটি স্বরগ্রাম প্রবর্তিত হয়। এটি বর্তমানে প্রাচ্যের আরবদের মধ্যে দেখা যায়। আরব সঙ্গীত পারস্য ও বাইযেন্টাইন চর্চার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, একথা আরবরা প্রকাশ্যে স্বীকার করেন। অপরদিকে পারস্য এবং বাইযেন্টিয়ানবাসীরাও আরব সঙ্গীত শিল্প থেকে বহু কিছু ধার করেছেন।

সঙ্গীত চর্চা
আরবদের কাছে সঙ্গীতের অর্থ কি সহস্র ও এক রজনীতে তা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে। অবশ্য এই শিল্পের প্রতি আরবদের গভীর অনুরাগের পরিচয় ইবনে 'আবদ রাব্বিহির অনন্য কণ্ঠস্বর, আল ইসফাহানীর বৃহৎ সঙ্গীত গ্রন্থ ও আল নুওয়াইবির গ্রন্থে প্রকৃষ্টভাবে পাওয়া যায়। দুর্ভাগ্যবশত এগুলি এখনো কেবল আরবী ভাষাতেই পাওয়া যায়। এখানে আমরা দেখতে পাই যে, শৈশবের দোলনা থেকে সমাধি পর্যন্ত, শিশুর ঘুমপাড়ানি গান থেকে অন্ত্যেষ্টিগাথা পর্যন্ত সঙ্গীত আরবদের নিত্যসঙ্গী। সুখ, দুঃখ, কর্মমুখরতা, খেলাধুলা, যুদ্ধ-বিগ্রহ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রভৃতি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব সঙ্গীত ছিল। ঐ সময়কার প্রায় প্রত্যেক সচ্ছল আরবের নিজস্ব গায়িকা ছিল। বর্তমানে আমাদের ঘরে ঘরে যেমন পিয়ানোফোর্টি বাদ্যযন্ত্র দেখা যায়, তাদেরও ছিল ঠিক তাই।

অবশ্য আমরা এখানে প্রধানত জনগণের সঙ্গীতের ব্যাপারে আলোচনা করছি না। যেমনটি ইবনে খলদুন বলেছেন, শিল্পী না হলে প্রকৃত পক্ষে কোন শিল্পেরই সূচনা হয় না। আমরা প্রাক ইসলামিক যুগে এক শ্রেণীর পেশাদার সঙ্গীত শিল্পীর সন্ধান পাই। ইসলামে 'গান শোনা' নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও খিলাফতের আমলে এই শ্রেণীর সঙ্গীত শিল্পীরা অত্যন্ত সমাদৃত ছিলেন। বস্তুত আরবরা সঙ্গীতের সকল শাখায় যেভাবে এর চর্চা করেন তার তুলনায় অন্য যেকোন দেশের ইতিহাসে সঙ্গীত চর্চা তুচ্ছ। আরবদের কাছে সব সময় নির্ভেজাল যন্ত্রসঙ্গীতের চাইতে কণ্ঠ সঙ্গীত অধিকতর সমাদৃত ছিল। এর পিছনে কবিতার প্রতি বিশেষ অনুরাগ কিছুটা দায়ী। অবশ্য যন্ত্র সঙ্গীতে আইনগত বিধিনিষেধও এর অন্যতম কারণ। গীতি কবিতা বা কাসিদা ছাড়াও কণ্ঠসঙ্গীতের পদ্যরীতির মধ্যে খণ্ড কবিতা, গযল বা প্রেমের গান এবং অধিকতর জনপ্রিয় মাওয়াল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাশ্চাত্যে যাজাল ও মুওয়াশাহ-এর ন্যায় শেষোক্ত রীতিগুলি প্রবর্তিত হয়েছে। বিশেষ ধরন বা স্বরগ্রামে গঠিত মেলডি পরিমাপমূলক অর্থাৎ ছন্দযুক্ত হতে পারে, অথবা নাও হতে পারে। প্রত্যেক সঙ্গীত শিল্পী মিলযুক্তভাবে কিংবা স্বরাষ্টকে গাইতেন বা বাজাতেন। আমরা যে আকারে হার্মনি বুঝি তা অজ্ঞাত ছিল। এর স্থলে আরবরা মেলডিকে সুশোভিত করতেন। এতে সময় সময় যুগপৎভাবে চতুর্থ, পঞ্চম অথবা অষ্টমে মেলডির একটি স্বর ধ্বনিত হতো। এই পদ্ধতি তারকিব বা যৌগিক নামে পরিচিত ছিল। মেলডি পদ্ধতির সঙ্গে যেসব বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হতো তার মধ্যে আবশ্যিকভাবে ছিল বীণা, প্যান্ডোর, সন্টারি কিংবা বাঁশি। অপর দিকে ড্রাম, ট্যাম্বোরিন, কিংবা ওয়ান্ড সঙ্গীতের ছন্দ জোরদার করে তুলতো। এ ছাড়াও ছিল অনেক ছোটখাটো বাদ্যযন্ত্র, কিন্তু এগুলি প্রায়ই কণ্ঠ সংগীতের গৌরচন্দ্রিকা কিংবা বিরতিকালীন যন্ত্র সঙ্গীত হিসাবে ব্যবহৃত হতো। সম্ভবত সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গীত রীতি ছিল নাউবা। এতে কণ্ঠ ও যন্ত্র সঙ্গীতের কতিপয় সুরের সমন্বয় করা হতো। এই রীতি বিশেষভাবে পাশ্চাত্যে বিকাশ লাভ করে। এ পর্যন্ত যেসব সঙ্গীতের বিষয় আলোচনা হয়েছে তাকে মোটামুটি কক্ষ সঙ্গীত বলা যেতে পারে। কারণ মাঝে মাঝে আমরা অত্যন্ত বড় বড় বাদক দলের কথা পড়ে থাকলেও সাধারণত এদের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত ছোট।

কোন মিছিল বা সামরিক মহড়ার উপযোগী মুক্তাঙ্গনের সঙ্গীতে সাধারণত নিম্নোক্ত ধরনের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হতো; রীডপাইপ, সিঙ্গা, রণভেরী, ড্রাম, দামামা এবং করতাল। মুসলমানদের সামরিক মহড়ায় সামরিক বাদকদল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি সামরিক কৌশলের একটি বিশেষ দিক হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। পদস্থ সামরিক অফিসারদের অধীনে বাদকদল থাকতো এবং এসব দলের আকার তাঁদের মর্যাদা অনুসারে নির্ধারিত হতো, যেমনটি নির্ধারিত হতো সামরিক নাউবা-য় ভেরী নিনাদের সংখ্যা। সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্রের প্রতি, বিশেষ করে শেষোক্তটির প্রতি ধর্মীয় নিন্দাবাদ থাকা সত্ত্বেও সঙ্গীতের আধ্যাত্মিক প্রতিফল সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃতি লাভ করে। সূফীরা এটিকে পরম আনন্দাবিষ্টতার মধ্য দিয়ে প্রত্যাদেশ লাভের একটি পন্থা হিসাবে দেখেন। দরবেশ ও তাপসরা এরই মাধ্যমে তাদের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ন্ত্রণ করে। আল গায্যালী বলেছেন, "আনন্দাবিষ্টতার অর্থ এমন অবস্থা যা সঙ্গীত শ্রবণের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়।" অন্যত্র তাঁর সঙ্গীত এবং পরম আনন্দাবিষ্টতা গ্রন্থে তিনি নিম্নোক্ত বক্তব্যের সমর্থনে ৭টি কারণ প্রদর্শন করেন; আনন্দাবিষ্ট অবস্থা সৃষ্টিতে স্বয়ং কুরআনের চাইতেও গানের ক্ষমতা বেশি। সহস্র ও এক রজনীতে বলা হয়েছে: "কারো কারো সঙ্গীত হচ্ছে মাংস এবং অন্যদের কাছে ওষুধ।" 'সঙ্গীতের প্রভাবের' মতবাদ থেকেই এই অহমিকার সৃষ্টি হয়েছে। বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মনোভাব, পরিমণ্ডলের ঐকতান এবং সংখ্যাতত্ত্বের মূলনীতিতে বিশ্বাসের সঙ্গে এই মতবাদ বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সাঙ্গিতিক আরোগ্য বিজ্ঞানের এই মতবাদ ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে।

স্বাধীন লোকদের মধ্যে উৎসব উপলক্ষে সর্ব প্রকার বাদ্যযন্ত্র দেখা যেতো। কিন্তু মেয়েদের মধ্যে তাম্বুরা বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। ভবঘুরে চারণেরও নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র ছিল। তিনি সাধারণত একটি মৃদঙ্গ ও বাঁশি বহন করতেন। এক হাতে মৃদঙ্গ বাজাতেন এবং অপর হাতে বাঁশির ছিদ্রে অঙ্গুলি চালনা করতেন। মাথায় ছোট ছোট ঘন্টা বাঁধা মুকুট পরতেন এবং সুরের তালে তালে মাথা আন্দোলিত করতেন। সমরকন্দ থেকে আটলান্টিক পর্যন্ত সঙ্গীতের পরিভাষা প্রাচ্যে সঙ্গীত চর্চায় আরবদের প্রত্যক্ষ অবদানের যথেষ্ট প্রমাণ বহন করে।

বাদ্যযন্ত্র
আরবীতে বাদ্যযন্ত্রের নাম অসংখ্য এবং এখানে তার ১-১০মাংশ নিয়ে আলোচনা করাও সম্ভব নয়। আরবরা বাদ্যযন্ত্র তৈরিকে ললিত কলায় উন্নীত করেন। বাদ্যযন্ত্র তৈরি সম্পর্কে বহু গ্রন্থ রচিত হয়েছে এবং সেভিলের ন্যায় কতিপয় শহর বাদ্যযন্ত্র তৈরিতে খ্যাতি অর্জন করে। শুধু বীণাই বিভিন্ন শ্রেণীর ও আকারের ছিল। প্রাক-ইসলামী যুগের বীণা ছিল চামড়ার পেটওয়ালা। তাদের ক্লাসিক্যাল বীণা অনেকটা আধুনিক ম্যান্ডেলিনের মতো ছিল। এ ছাড়া এ জাতীয় বৃহত্তর আকারের বাদ্যযন্ত্রকে বলা হতো পূর্ণাঙ্গ বীণা। তাদের শাহরুদ ছিল আধুনিক আর্কলিউট। এ ছাড়া আমরা বেশ কয়েকটি বড় আকারের বাদ্যযন্ত্রের ছবি দেখতে পাই। তাদের প্যান্ডোর শ্রেণীর বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে বৃহদাকারের তানবুর তার্কি থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র আকারের তানবুর বিগিলা পর্যন্ত বহু রকমের বাদ্যযন্ত্র ছিল। এ ছাড়া ছিল মুরাব্বা' নামে পরিচিত গিটার। এটি ছিল চেপ্টা বক্ষযুক্ত আয়তাকার বাদ্যযন্ত্র। পরবর্তীকালে এটি কিতারা নামে পরিচিত হয়। আমাদের কাছে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাদের বক্রাকারের বাদ্যযন্ত্র। প্রথমে এগুলি তাদের শ্রেণীগত রাবাব নামে পরিচিত ছিল। এগুলিও বড় ছোট এবং বিভিন্ন আকারের দেখা যায়। এর মধ্যে কামানজা ও গিশাক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। খোলা তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্রগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল হার্প, সন্টারি এবং ডালসিমার।

কাঠের বায়ু চালিত বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে ছিল বহু আকারের বাঁশি। প্রায় ৩ ফুট লম্বা নাইবাম থেকে শুরু করে ১ ফুট ও তার চাইতেও কম লম্বা শাব্ব্বাবা এবং জুয়াক। আর একটি বাঁশির নাম ছিল সাফফারা। নলের বাঁশির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল যাম্র, সারনাই, যুলামী ও গাইতা। এই জাতীয় বাক্ ছিল ধাতুর তৈরি।

তাম্বুরা বা খঞ্জনি জাতীয় বাদ্যযন্ত্রকে সাধারণত দক্ বলা হতো। এটি বিশেষভাবে বর্গাকৃতির ছিল। গোলাকার বাদ্যযন্ত্রগুলি আকার ও নির্মাণ কৌশল অনুযায়ী তার, দাইয়া ইত্যাদি নামে পরিচিত ছিল। ঢাক জাতীয় বাদ্যযন্ত্রগুলিও তবল, নাক্কারা, কাস'আ ইত্যাদি বহু ধরনের ছিল। করতালের নাম ছিল কাঁসা। থালা আকৃতির চেপ্টা ছোট করতালকে সিন্জ বলা হতো। আরবদের মধ্যে বায়ু চালিত অর্গ্যান এবং পানি চালিত অর্গ্যান উভয়টিই প্রচলিত ছিল। এছাড়া তাদের মধ্যে সম্ভবত অর্গানিস্টামও প্রচলিত ছিল। শেষোক্তটি মধ্যযুগীয় ইউরোপে সুপরিচিত ছিল এবং দেখতে অনেকটা আধুনিক হার্ডিগার্ডির মতো ছিল। এ জাতীয় আরেকটি বাদ্যযন্ত্র ছিল আল-শাকিরা।

বিভিন্ন বিবরণ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, আরবরা বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্রের উদ্ভাবক এবং সংস্কারক ছিলেন। আল-ফারাবী সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি রাবাব ও কানুনের উদ্ভাবক ছিলেন, আল-যুনাম নাই যুনামী বা যুলামী নামে প্রচলিত বায়ুচালিত বাদ্যযন্ত্র তৈরি করেন; যালযাল 'উদ আল শাদ্ভুত প্রবর্তন করেন; দ্বিতীয় আল-হাকাম নলের বাক-এর সংশোধন সাধন করেন; যিরিয়াব নতুন ধরনের বীণা প্রবর্তন করেন; আল-বাইয়াসি ও আবুল মাজদ উভয়েই ছিলেন অর্গ্যান নির্মাতা; এবং সফিউদ্দীন আবদুল মুমিন নুহা নামে একটি বর্গাকৃতির সন্টারী ও মুগনি নামে অপর একটি বাদ্যযন্ত্র আবিষ্কার করেন।

নবম শতকের প্রথম দিক থেকে এক ধরনের স্বরলিপি প্রচলিত থাকলেও অধিকাংশ শিল্পী শ্রবণের মাধ্যমে তাদের সঙ্গীত আয়ত্ত করেন। কোন কোন সুরকার বিশ্বাস করতেন যে, জ্বিনের প্রেরণায়ই তারা সঙ্গীত রচনা করেন। আরব চারণ কবিদের পোশাক-আশাক ও চেহারা-সুরত বিশেষভাবে লক্ষণীয়। লম্বা চুল, চিত্রিত চেহারা ও হাত এবং উজ্জ্বল রং এই শ্রেণীর গায়কদের বৈশিষ্ট্য। এরা ইসলামের প্রাথমিক যুগের মেয়েলী স্বভাবসুলভ মুখান্নাসুন-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কণ্ঠশিল্পীদের মধ্যে অনেকেই ছিল এতিরাতি। কেউ কেউ শাস্তি হিসাবে এই পেশায় নিয়োজিত হতো এবং অন্যরা সম্ভবত বালকদের কণ্ঠ জনপ্রিয় ছিল বলে এই পেশা গ্রহণ করতো। খলীফার দরবার থেকে গায়কদের পৃষ্ঠপোষকতা করা হতো। কেবল শিল্পী হিসাবে নয়, শিল্পীকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যেও এরূপ পৃষ্ঠপোষকতা করা হতো। সঙ্গীত পেশার সূত্রে শিল্পী বহু পরিবারে যাতায়াত করতো। সেখানে মদের পেয়ালার সংস্পর্শে অনেক গোপন রাজনীতি প্রকাশ হয়ে পড়তো। তাছাড়া মতামত প্রচারে গানের চাইতে কার্যকর মাধ্যম আর কিছু ছিল না। আরবদের অনুকরণকারী প্রভেন্সের ধর্মদ্রোহী টুবাডুরদের জংলাররাও এভাবে নিজেদের প্রচার কার্য চালাতো।

সঙ্গীত বিষয়ক গ্রন্থ রচয়িতা
আরবী সাহিত্যের এক বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে সঙ্গীত বিষয়ক রচনা। সঙ্গীতের ইতিহাস, গান সংগ্রহ, বাদ্যযন্ত্র, সঙ্গীতের বৈধ দিক, সৌন্দর্য বোধ এবং সঙ্গীতজ্ঞদের জীবনী এসব রচনার অন্তর্ভুক্ত। এঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম লেখক হচ্ছেন আল-মাসউদী এবং আল-ইসফাহানী। প্রথমোক্ত লেখকের মেডোজ অব গোল্ড গ্রন্থে আমরা প্রাথমিক যুগে আরব সঙ্গীত চর্চার চমকপ্রদ তথ্যাবলী জানতে পারি। তাঁর অন্যান্য রচনায় বাইরের দেশের সঙ্গীত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ২১ খণ্ডে রচিত আল ইসফাহানীর বিশাল গ্রন্থ বৃহৎ সঙ্গীত গ্রন্থ অধিকতর মূল্যবান। ইবনে খলদুন এটিকে 'আরবদের দিওয়ান' নামে আখ্যায়িত করেছেন। এই লেখক সঙ্গীত সম্পর্কে আরো ৪টি গ্রন্থ রচনা করেন। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক আল-ওয়াররাক এর দি ইনডেক্স গ্রন্থটি সঙ্গীত তত্ত্ব ও সঙ্গীত বিজ্ঞানের লেখকদের এবং সঙ্গীত বিষয়ক সাধারণ রচনাসমূহের একটি তথ্যখনি।

পাশ্চাত্যে আমরা প্রায় একই ব্যাপার দেখতে পাই, ইবনে 'আবদ রাব্বিহি'র দি ইউনিক নেকলেস গ্রন্থ প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীতজ্ঞদের জীবনী এবং গোড়াপন্থীদের বিরোধিতার মুখে জোরালভাবে সঙ্গীত চর্চা সমর্থন পেয়েছে। ইয়াহইয়া আল খুন্দুজ আল মুরসী প্রাচ্যের আল ইসফাহানীর অনুকরণে একটি বুক অব সংস রচনা করেন। ইবনুল 'আরাবী ও অন্যরা সঙ্গীতের বৈধতা প্রতিপন্ন করে গ্রন্থ রচনা করেন এবং সে সঙ্গে বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে বহু তথ্য পরিবেশন করেন। বাগদাদের পতনের পর সঙ্গীত বিষয়ক 'বিশিষ্ট লেখকদের' প্রায় বিলুপ্তি ঘটে। তাদের স্থলে একদল ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞের আবির্ভাব হয়। তাঁরা সঙ্গীতের বৈধতার পক্ষে বা বিপক্ষে নানা প্রকার যুক্তি তুলে ধরেন। সঙ্গীত সম্পর্কে পূর্বের ন্যায় যে দু'-একটি রচনা দেখা যায় সেগুলি হচ্ছে ইবনে খালদুনের প্রলেগোমেনা এবং আল-ইবশিহির মুসতাতরাফ।

সঙ্গীত তত্ত্ববিদ
সঙ্গীত তত্ত্বের যে প্রথম লেখক সম্পর্কে আমরা সুনির্দিষ্টভাবে অবগত রয়েছি তিনি হচ্ছেন ইউনুস আল-কাতিব। তাঁর পরেই রয়েছে আরবী ছন্দশাস্ত্রের সুবিন্যাসকারী ও প্রথম শব্দকোষ সংকলক আল খলিল। দি ইনডেক্স-এ তাঁর বুক অব নোটস ও বুক অব রীদমস তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ইবনে ফিরনাস স্পেনে যা প্রবর্তন করেছেন, সেগুলি সম্ভবত আল খলিলের মতবাদ। ইবনে ফিরনাস আন্দালুসে সর্বপ্রথম সঙ্গীত বিজ্ঞান শিক্ষা দেন। ইসহাক আল-মাউসিলি প্রাচীন আরব পদ্ধতি পুনর্গঠিত করেন এবং বুক অব নোটস এণ্ড রীদমস গ্রন্থে তাঁর মতবাদসমূহ তুলে ধরেন।

অষ্টম থেকে দশম শতকের মধ্যে সঙ্গীত-তত্ত্ব ও স্বর-বিজ্ঞান সম্পর্কিত বহু গ্রীক রচনা আরবীতে অনূদিত হয়। পিথাগোরাসের বলে কথিত একটি রচনা ও প্ল্যাটোর টিমিয়াস আরবী ভাষায় পাওয়া যায়। শেষোক্ত গ্রন্থটি ইউহান্না ইবনে আল বাডরিক কর্তৃক এবং পুনরায় হুনাইন ইবনে ইসহাক কর্তৃক অনূদিত হয়। অ্যারিস্টটলীয় রচনার মধ্যে আরবরা প্রবলেম্যাটা ও ডি অ্যানিমার অধিকারী ছিলেন। উভয়টিই হুনাইন ইবনে ইসহাক অনুবাদ করেন। ডি অ্যানিমা সম্পর্কে গ্রীক লেখকদের যেসব ভাষ্য আরবীতে প্রচলিত ছিল সেগুলি থেমিস্টিয়াস ও সিমপ্লিসিয়াসের রচনা। প্রথমোক্তটির অনুবাদকও হুনাইন। তিনি গ্যালেনের ডি ভসে গ্রন্থটিও অনুবাদ করেন। এসব রচনা থেকেই আরবরা স্বরতত্ত্ব সম্পর্কে তাঁদের অধিকতর বৈজ্ঞানিক ধ্যানধারণা লাভ করেন।

অ্যারিস্টোজেনাস আরবীতে দি প্রিন্সিপালস ও অন রীদম নামক দুটি রচনার জন্য বিখ্যাত। আরবীতে সঙ্গীত সম্পর্কে ইউক্লিডের নামে দুটি রচনা রয়েছে- দি ইন্ট্রোডাকশন টু হার্মনি এবং দি সেকশন অব দি ক্যানন। গ্র্যান্ড বুক অন মিউজিক নামক একটি গ্রন্থে এবং অন্যান্য কতিপয় সংক্ষিপ্ত সারমূলক পুস্তিকায় নিকোমেচাসের রচনা পড়া হতো। গ্রীক রচনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, শেষোক্ত গ্রন্থটি তাঁর বিভিন্ন সংক্ষিপ্ত রচনার সমাবেশ। তাঁর ইন্ট্রোডাকশন টু অ্যারিথমেটিক নামক যে গ্রন্থটিতে প্রসঙ্গক্রমে সঙ্গীত সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে তা সাবিত ইবনে কাররা কর্তৃক অনূদিত হয়েছে। বুক অন মিউজিক গ্রন্থে টলেমীর রচনার পরিচয় পাওয়া যায়। এটি সম্ভবত বর্তমানে আমাদের জ্ঞাত টিটিজ অন হার্মনি। আরবী ভাষায় অন্যান্য যেসব গ্রীক রচনা আমাদের হস্তগত হয়েছে সেগুলি হচ্ছে আর্কিমিডিস ও অ্যাপোলোনিয়াস পার্গিয়াসের রচনা বলে কথিত পানিচালিত অর্গ্যান সংক্রান্ত গ্রন্থাবলী। এ বিষয়ে আরবীতে মুরিসতাস নামে পরিচিত জনৈক লেখকের রচনাও রয়েছে। তিনি বায়ুচালিত অর্গ্যান, হাইডলিস এবং চাইমস সম্পর্কেও গ্রন্থ রচনা করেন।

আরবীতে সঙ্গীততত্ত্ব সম্পর্কে যেসব প্রাচীনতম রচনায় গ্রীক লেখকদের প্রভাব দেখা যায়, সেগুলি আল-কিন্দীর রচনাবলী। তিনি সঙ্গীততত্ত্ব সম্পর্কে ৭টি গ্রন্থ রচনা করেন। এগুলির মধ্যে ৪টি না হলেও অন্তত ৩টি সংরক্ষিত আছে : দি এসেনসিয়ালস্ অব নলেজ ইন মিউজিক; অন দি মেলডীজ; দি নেসেসারী বুক ইন দি কমপোজিশন অব মেলডীজ। আল সারাখসী ও মানসুর ইবনে তালহা ইবনে তাহির তাঁর শিষ্য ছিলেন। সমসাময়িক তাত্ত্বিকরা ছিলেন সাবিত ইবনে কাররা, মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল-রাযী এবং কুসতা ইবনে লুকা। এদেরই পরে আবির্ভাব ঘটে আরব তাত্ত্বিকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম আল-ফারাবীর। তাঁর সঙ্গীত বিষয়ক গ্রন্থাবলী হচ্ছে গ্র্যান্ড বুক অন মিউজিক, স্টাইলস ইন মিউজিক এবং অন দি ক্লাসিফিকেশন অব রীদম্। এ ছাড়া তিনি বিজ্ঞান বিষয়ক তাঁর দুটি বিখ্যাত সংক্ষিপ্ত সার গ্রন্থেও সঙ্গীত সম্পর্কে আলোচনা করেন-দি ক্লাসিফিকেশন অব দি সায়েন্সেস এবং দি অরিজিন অব দি সায়েন্সেস। আল ফারাবী বলেছেন যে, তিনি গ্রীকদের সঙ্গীত বিষয়ক রচনায় বিশেষত এসব রচনার আরবী অনুবাদে, নানা প্রকার ল্যাকিডনা ও অস্পষ্টতা দেখেই তাঁর গ্র্যান্ড বুক অন মিউজিক রচনা করেন। তাঁর পরবর্তী লেখক হচ্ছেন অঙ্ক শাস্ত্রের ওপর শ্রেষ্ঠতম আরব গ্রন্থকার আল-বায়যানী। তাঁর গ্রন্থটি হচ্ছে কমপেণ্ডিয়াম অন দি সায়েন্স অব রীদম। একই সময়ে বিশ্বকোষ রচয়িতা ব্রিদরেন অব পিউরিটি ও মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল খারিযমীর নামও উল্লেখযোগ্য। ব্রিদরেন অব পিউরিটির সঙ্গীত সম্পর্কিত রচনা ব্যাপকভাবে পঠিত হয়। বিজ্ঞানের চাবি গ্রন্থের লেখক আল খারিযমীর অন্যতম রচনা সঙ্গীত তত্ত্বের দ্বার উন্মুক্ত করে।

সঙ্গীত সম্পর্কে বিশেষভাবে বিখ্যাত লেখক ছিলেন ইবনে সিনা। আল-ফারাবীর পরে সঙ্গীত তত্ত্ব সম্পর্কে আরবী ভাষায় তাঁর অবদান সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর শিফা ও নাজাত গ্রন্থে এর পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি ইনট্রোডাকশন টু দি আর্ট অব মিউজিক নামেও একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এ ছাড়া তাঁর ডিভিশন্স অব দি সায়েন্সেস গ্রন্থে সঙ্গীত বিষয়ক কয়েকটি সংজ্ঞা দেখা যায়। তাঁর শিষ্য ইবনে যাইলা বুক অব সাফিসিয়েন্সী ইন মিউজিক গ্রন্থটি রচনা করেন। ইবনে সিনার সমসাময়িক লেখক এবং বিখ্যাত গাণিতিক ও পদার্থ বিজ্ঞানী ইবনে আল-হায়সাম ইউক্লিডের কমেন্টারি অন দি ইনট্রোডাকশন টু হার্মনি ও কমেন্টারি টু দি সেকশন অব দি ক্যানন এর দুটি ভাষ্য রচনা করেন। তিনি মিসরে তাঁর গ্রন্থ রচনা করেন। এখানে আর একজন প্রতিভাবান লেখক আবুল সাত্ উমাইয়া একটি ট্রিটিজ অন মিউজিক গ্রন্থ রচনা করেন। দ্বাদশ শতকের অন্য তাত্ত্বিকরা হচ্ছেন ইবনে আল-নাক্কাশ আল বাহিলী এবং তাঁর পুত্র আবুল মাজদ ও ইবনে মান'আ।

ত্রয়োদশ শতকে আরো বিখ্যাত তাত্ত্বিকদের আবির্ভাব ঘটে। আলমউদ্দীন কাইসার মিসর ও সিরিয়ায় অত্যন্ত খ্যাতিমান গাণিতিক ছিলেন। তিনি বিশেষভাবে সঙ্গীততত্ত্বের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। আরো পূর্বে নাসির উদ্দীন অনুরূপ খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর সঙ্গীত সংক্রান্ত খণ্ড রচনা সংরক্ষিত আছে। মুসলিম স্পেনে ফিরনাসের পর আমরা মাসলামা আল-মাজরিতি ও আল-কিরমানীর রচনা দেখতে পাই। এঁরা ব্রিদরেন অব পিউরিটির রচনাসমূহ জনপ্রিয় করেন। অন্য তাত্ত্বিক ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে আল-হাদ্দাদ এবং জনৈক ইহুদী আবুল ফজল হাসদাই। সঙ্গীত তত্ত্বের ওপর অধিকতর প্রতিভাবান লেখক ছিলেন ইবনে বাজ্জা। পাশ্চাত্যে তাঁর সঙ্গীত সংক্রান্ত গ্রন্থ প্রাচ্যে আল-ফারাবীর গ্রন্থের ন্যায়ই জনপ্রিয় ছিল। ইবনে রুশদ বিখ্যাত কমেন্টারি অন অ্যারিস্টটল্স ডি অ্যানিমা রচনা করেন। এতে স্বর তত্ত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত বুদ্ধি-দীপ্ত আলোচনা করা হয়েছে। ত্রয়োদশ শতকে বিখ্যাত সঙ্গীত তত্ত্ববিদ ইবনে সাব'ইন ও তাঁর সমসাময়িক আল রাকুতির রচনা দেখা যায়। শেষোক্ত ব্যক্তি খৃস্টানদের হাতে মুর্সিয়ার পতনের পর তাদের দ্বারা চতুর্কলা শিক্ষাদানের জন্য নিয়োজিত হন।

ত্রয়োদশ শতকে সফিউদ্দীন আবদুল মুমিন কর্তৃক নতুন পদ্ধতিবাদী ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়। বিখ্যাত শারাফিয়্যা ও বুক অব মিউজিক্যাল মোড় গ্রন্থে তাঁর মতবাদসমূহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। হাজি খলীফার মতে তিনি সঙ্গীততত্ত্ব লেখকদের মধ্যে 'প্রথম সারির' ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন। অতঃপর যাদের নাম উল্লেখ করা হচ্ছে তাদের অধিকাংশই তাঁর অনুসারী ছিলেন। শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে আল মারহুম কাব্যে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। মুহাম্মদ ইবনে ঈসা ইবনে কারা দি এণ্ড অব দি ইনকোয়ারী ইন টু দি নলেজ অব দি মেলডীজ এণ্ড রীদম্স নামক গ্রন্থ রচনা করেন। শাহ শূজা'র নামে উৎসর্গকৃত মাউলানা মুবারকশাহ কমেন্টারি অন দি মিউজিক্যাল মোড় নামক গ্রন্থটি অধিকতর প্রভাব সৃষ্টি করে। এটি সফিউদ্দীন আবদুল মুমিনের মতবাদের ওপর লিখিত অসংখ্য ভাষ্যের অন্যতম। একই পৃষ্ঠপোষকের নামে উৎসর্গকৃত অপর একটি গ্রন্থ হচ্ছে ডিসকোর্সেস অন দি সায়েন্সেস নামে পরিচিত একটি বিশ্বকোষ। এটি সম্ভবত আল-জুরজানি কর্তৃক রচিত। আমর ইবনে খিজর আল কুর্দী দি ট্রেজার অব দি ইনকোয়ারী ইন টু দি মোড্স এণ্ড দি রীদম্স গ্রন্থের রচয়িতা। ইবনে আল-ফানারী তাঁর বিজ্ঞান সংক্রান্ত বিশ্বকোষে সঙ্গীতের বিষয়ও পর্যালোচনা করেছেন। শামসুদ্দিন আল 'আজামীর একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে এপিল অন দি সায়েন্স অব দি মেলডীজ। আল-লাজিকী দি ফাতহিয়্যা নামে পরিচিত একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেন। হাজি খলীফা এই লেখককে সফিউদ্দীন আবদুল মুমিন ও আবদুল কাদির ইবনে গাইবির সমতুল্য মনে করেন। পদ্ধতিবাদী ধারার প্রতিষ্ঠাতার রচনাসমূহের পর সর্বশেষ এবং সম্ভবত সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ রচনা হচ্ছে অজ্ঞাত পরিচয় লেখকের মুহাম্মদ ইবনে মুরাদ টিটিজ।

আরব তাত্ত্বিকদের মূল্য
চতুর্কলা-এ দক্ষ হওয়ার দরুন অধিকাংশ আরব তাত্ত্বিকই অঙ্কশাস্ত্র ও পদার্থবিদ্যায়ও পারদর্শী ছিলেন। গ্রীক রচনাসমূহ তাদের জন্য সঙ্গীতের যে কাল্পনিক মতবাদ ও স্বরের যে বাস্তব ভিত্তি তুলে ধরেন তার অনুকরণে এদের অনেকেই নিজস্ব পন্থায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। এটিই হচ্ছে তাদের রচনার অন্যতম চমকপ্রদ দিক। সফিউদ্দীন কর্তৃক আল-ফারাবী ও ইবনে সিনার সংজ্ঞাসমূহের সমালোচনা এ ধরনের অনুসন্ধিৎসার মনোভাব প্রতিভাত করে। পূর্বসূরিরা যতো বিখ্যাত ব্যক্তিই হোন তাদের বক্তব্য নির্ভুল না হলে তিনি সবিনয়ে তা মেনে নেবেন না। আমরা দেখেছি যে, আল ফারাবী ও ইবনে সিনা উভয়েই গ্রীকরা যা শিক্ষা দিয়েছেন তার উন্নতি ও বিকাশ সাধন করেন। আরব জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যেভাবে টলেমী ও অন্যান্য গ্রীক লেখকের ভুলত্রুটি সংশোধন করেন তেমনিভাবে আরব সঙ্গীততত্ত্ববিদরাও গ্রীক শিক্ষকদের বক্তব্য সংশোধন করেন। আল ফারাবীর সঙ্গীত তত্ত্বের পরিচিতি গ্রীক সূত্র থেকে আমরা যা কিছু পেয়েছি তার থেকে উন্নত না হলেও সুনিশ্চিতভাবে তার সমকক্ষ। স্বরের বাস্তবভিত্তিক মতবাদের ক্ষেত্রে বিশেষত স্বরের শূন্য মণ্ডলীয় বিবরণ সংক্রান্ত প্রশ্নের ক্ষেত্রে আরবরা নিশ্চিতভাবে বেশ কিছুটা অগ্রগতি সাধন করেছেন।

আরব তাত্ত্বিকরা স্বরের পরিমাপসহ বাদ্যযন্ত্রসমূহের যে সতর্ক বর্ণনা প্রদান করেছেন তাতে আমরা তাদের ব্যবহৃত সঠিক স্বরলিপি জানতে পারি। আমরা আল কিন্দী, আল-ফারাবী, আল খারিযমী ও ব্রিদরেন অব পিউরিটি কর্তৃক বর্ণিত বীণা, প্যান্ডোর, হার্প ও বায়ুচালিত বাদ্যযন্ত্রসমূহ সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত হই। ইউরোপে এ ধরনের কোন প্রচেষ্টার শত শত বছর আগে তারা এগুলির সূক্ষ্ম বিবরণ প্রদান করেছেন। তাঁরা যালযালের 'নিউট্রাল থার্ড' ও 'পারস্য থার্ড' সম্পর্কে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান তাতে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে, তারা কেবল গ্রীক সুর পদ্ধতিতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। সফিউদ্দীন প্রবর্তিত পদ্ধতিবাদী ধারা সম্পর্কে স্যার হুবার্ট প্যারী বলেন যে, এটি "এ যাবত উদ্ভাবিত স্বরলিপিসমূহের মধ্যে সব চাইতে পূর্ণাঙ্গ।" হেলম হল্স বলেন, "সুরের মধ্যে প্রধান স্বর হিসাবে তাদের স্বরলিপির ম্যাজিক সেভেন্থ ব্যবহার একটি নতুন ধারণার সৃষ্টি করেছে।"

আরব সঙ্গীতের উত্তরাধিকার
সঙ্গীত জগতে আরবরা যে অবদান রেখে গেছেন তার সারবত্তা উপেক্ষা করার উপায় নেই। আমরা প্রাচ্যের যেকোন দিকেই তাকাই সেখানেই আরবদের ব্যবহারিক শিল্পের প্রভাব দেখতে পাই। পারস্যে আবদুল মুমিনের গ্ল্যাডনেস অব দি সোল, ফখর উদ্দিন আল-রাযীর অ্যাসেম্বলিং অব দি সায়েন্সেস, আল আমুলীর প্রেশাস সায়েন্সেস এবং আবদুল কাদির ইবনে গাইবীর অ্যাসেম্বলিং অব দি মেলডীজ ও অন্যান্য রচনায় আরবদের উত্তরাধিকার সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়। তুরস্কে আল-ফারাবী, সফিউদ্দীন ও আবদুল কাদিরের রচনাসমূহ তুর্কী ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আবদুল কাদিরের পুত্র আবদুল আজিজ ও জনৈক পৌত্র উসমানীয় সুলতানদের চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁরা যেসব গ্রন্থ রচনা করেছেন তাতে আরব ওস্তাদের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা প্রমাণিত হয়। খিজর ইবনে আবদুল্লাহ এবং আহমদ উগলু শুকরুল্লাহর রচনায়ও তাই দেখা যায়। এমনকি ভারতেও আমরা আরবী গ্রন্থসমূহের অনুবাদ দেখতে পাই।

আরব সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগের ফলে পশ্চিম ইউরোপ যেভাবে উপকৃত হয়েছে তা আরো ব্যাপক। ইউরোপ দুটি পন্থায় আরব উত্তরাধিকার লাভ করে। ১. রাজনৈতিক যোগাযোগ, হস্তান্তর ও মৌখিক ভাষার মাধ্যমে ব্যবহারিক শিল্পের উত্তরাধিকার লাভ, এবং ২. সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চামূলক যোগাযোগ, আরবী থেকে অনুবাদ এবং স্পেন ও অন্যত্র মুসলিম শিক্ষা কেন্দ্রসমূহে অধ্যয়নকারী পণ্ডিতদের মৌখিক শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে তাত্ত্বিক শিল্পের উত্তরাধিকার লাভ।

মধ্যযুগে সঙ্গীত তত্ত্ব সম্পর্কে পর্যাপ্ত পরিমাণে আরবী রচনা থাকা সত্ত্বেও ল্যাটিন বা হিব্রু অনুবাদের মাধ্যমে আমরা তার অতি সামান্যই পেয়েছি। গ্রীক রচনার মধ্যে জোহানেস হিস্পালেনসিস অনূদিত অ্যারিস্টটলের ডি অ্যানিমা এবং গ্যালেনের ডি ভসের ত্রয়োদশ শতকের একটি পাণ্ডুলিপি আরবী থেকে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত। আরবদের রচনার মধ্যে আল-ফারাবীর দুটি বিশ্বকোষ জোহানেস হিস্পালেনসিস ও ক্রিমোনার জিরার্ড কর্তৃক ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। জোহানেস হিস্পালেনসিস অনূদিত কমপেণ্ডিয়াম অব অ্যারিস্টটল্স ডি অ্যানিমার মাধ্যমে ইবনে সিনাও ল্যাটিন ভাষায় পরিচিত। আদ্রিয়াস আলপাগাস কর্তৃক এটি পুনরায় অনূদিত হয়। তিনি ডি ডিভিশন সায়েন্টিয়ারাম শিরোনামে ইবনে সিনার বিশ্বকোষও ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল ইবনে রুশদের গ্রেট কমেন্টারি অন অ্যারিস্টটল্স ডি অ্যানিমা। মাইকেল স্কট এটি ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। আরবী থেকে বহু হিব্রু অনুবাদও পশ্চিম ইউরোপে পরিচিত হয়। আমরা ইসাইয়া বেন আইজাক অনূদিত কমেন্টারি অন দি ক্যানন গ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত। ইউক্লিডের সেকশন অব দি ক্যানন ও স্পষ্টত আরবী থেকে হিব্রু ভাষায় অনূদিত হয়। মোসেস ইবনে তিব্বন প্রবলেম্যাটা অনুবাদ করেন। ভ্যাটিকানেও আব্রাহাম ইবনে হাইয়া কর্তৃক আরবী থেকে অনূদিত একটি সঙ্গীত গ্রন্থ পাওয়া যায়। আবুস সান্ত উমাইয়ার ট্রিটিজ অন মিউজিক গ্রন্থটিও সম্ভবত হিব্রু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আল-ফারাবীর সঙ্গীত তত্ত্বের পরিচিতি ইবনে আকনিন কর্তৃক প্রশংসিত হয়। টর্টোসার শেম-তোব আইজাক ইবনে রুশদের কমেন্টারি অন অ্যারিস্টটল্স ডি অ্যানিমা অনুবাদ করেন। কালোনিমাস বেন কালোনিমাস আল-ফারাবীর ক্লাসিফিকেশন অব দি সায়েন্সেস অনুবাদ করেন।

সাহিত্যভিত্তিক যোগাযোগের মাধ্যমে সঙ্গীতে আরব উত্তরাধিকারের প্রমাণ প্রথম দৃষ্টিতে কনস্ট্যান্টাইন দি আফ্রিকানের রচনায় দেখা যায়। তিনি ছিলেন ল্যাটিন ভাষায় প্রাথমিক আরবী অনুবাদকদের অন্যতম। তিনি তাঁর ডি হিউম্যানা নেচারা ও ডি মর্বোরাম কগনিশন গ্রন্থে গ্রহের প্রভাব এবং সঙ্গীতের নিরাময়মূলক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আরব মতবাদসমূহ প্রবর্তন করেন। ইবনে সিনার একটি প্রবাদবাক্য ছিল 'ইন্টার অমনিয়া এক্সারসিটিয়া স্যানিটাটিস ক্যান্টারে মিলিয়াস এস্ট।' গুণ্ডিসাল ভাসের ডি ডিভিশন ফিলোসফিয়া গ্রন্থে সঙ্গীত বিষয়ক একটি অংশ ছিল। এই অংশটি তিনি আল-ফারাবীর রচনা থেকে সম্ভবত স্বয়ং অনুবাদ করে উদ্ধৃত করেছেন। অ্যারিস্টটলের ছদ্ম নামে প্রচলিত ডি মিউজিকা এবং ভিন্সেন্ট ডি বুভাইসের স্পেকুলাম ডকটিনেল গ্রন্থ দুটিতেও একই সূত্র থেকে ধার করা হয়েছে। জোহানেস এজিডিয়াসের একটি সংজ্ঞা থেকে বোঝা যায় যে, এরও সূত্র ছিল আল ফারাবী। এই স্পেনীয় তাত্ত্বিক কনস্ট্যান্টাইন দি আফ্রিকানের রচনার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। রবার্ট কিলওয়ার্ডবি, রাইমুণ্ডো লাল, সিমন টানস্টেড এবং অ্যাডাম ডি ফুন্ডা প্রভৃতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। রজার বেকন ওপাস টের্টিয়ামের সঙ্গীতাংশে টলেমী ও ইউক্লিডের সঙ্গে আল-ফারাবীরও উদ্ধৃতি প্রদান করেন। তিনি বিশেষ করে ডি সায়েন্টিসের উল্লেখ করেন। সঙ্গীতের নিরাময়মূলক দিক সম্পর্কে তিনি ইবনে সিনারও উদ্ধৃতি দেন। নিম্নোক্ত গ্রন্থকারগণও ইবনে সিনার কাছ থেকে ধার করেছেন; ওয়াল্টার অডিংটন এবং এঞ্জেল বার্ট। জেরোম মোরাভিয়ার তাঁর ডি মিউজিকার একটি অধ্যায়ে আল-ফারাবী সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। জর্জ ভ্যাল্লার, জর্জ রাইশের এবং ক্যামেরারিয়াসের পুনঃ প্রকাশিত ডি সায়েন্টিস থেকে দেখা যায় যে, আল-ফারাবী সপ্তদশ শতকেও পণ্ডিতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

উপরে সাহিত্যের মাধ্যমে যোগাযোগের যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে তার অবদান তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। যে আরব মতবাদ মৌখিকভাবে প্রচারিত হয় তার গুরুত্ব বরং অনেক বেশি ছিল। ইবনে হিজারী বলেন, স্পেনে উমাইয়া শাসনামলে "যে কর্ডোভা জ্ঞান-বিজ্ঞানের মহান ভাণ্ডার ছিল সেখানে বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য বিশ্বের সকল এলাকা থেকে জ্ঞানার্থীদের সমাবেশ হতো।" এখানে চতুর্কলা-এর অন্যতম দিক সঙ্গীত তত্ত্ব শিক্ষা দেওয়া হতো, তাই ল্যাটিন অনুবাদের মধ্যস্থতা ছাড়া ইউরোপীয় শিক্ষার্থীরা সরাসরি আরব জ্ঞানভাণ্ডার থেকে সঙ্গীত বিষয়ক জ্ঞান সঞ্চয়ের সুযোগ পায়। মোযারেবরা সম্ভবত আরবী ভাষায় কথা বলতেন। তাই আরব বিজ্ঞানের প্রচার ও প্রসারে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। আমরা জানি যে, রজার বেকন যখন অক্সফোর্ডে আরবীর ভুল ল্যাটিন অনুবাদ ব্যবহার করে স্পেনীয় ছাত্রদের মধ্যে ভাষণ দিচ্ছিলেন তখন ছাত্ররা তাঁকে উপহাস করেন, কারণ তারা তাঁর কর্তৃত্ব শুরু থেকে জানতেন। এটি মোটেই বিস্ময়কর নয় যে, এই অলৌকিক পণ্ডিত তাঁর পূর্বসূরি বাথের অ্যাডেলার্ডের ন্যায় তাঁর পাঠক ও শ্রোতাদের আরব চিন্তাধারার পক্ষে ইউরোপীয় চিন্তাধারা পরিহারের উপদেশ দিতেন। ইউরোপীয় তাত্ত্বিকরা কেবল মার্টিয়ানাস কাপেল্লা, বোইথিয়াসের মাধ্যমে গ্রীক মতবাদের সঙ্গে পরিচিত হন, অথচ আরবরা অ্যারিস্টটল, অ্যারিস্টজেনাস, ইউক্লিড, নিকোমেচাস, টলেমী ও অন্যান্য গ্রীক মনীষীর রচনার অধিকারী ছিলেন।

আরবরা সোলফেজিয়োর ক্ষেত্রে ইউরোপকে প্রভাবিত করলেও একটি বর্ণমালা-ভিত্তিক স্বরলিপির কথা সুনিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বাদ্যযন্ত্রের স্বরলিপির ক্ষেত্রে আরবদের অবদান অনেক সুস্পষ্ট। রূপান্তরমূলক স্বরলিপির ক্ষেত্রে মুসলিম প্রাচ্যে ১২০০ খৃস্টাব্দের দিকে এর প্রথম প্রয়োগ দেখা যায়। ইউরোপের জন্য আরবদের সম্ভবত সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হচ্ছে পরিমাপমূলক সঙ্গীত। কলোনের ফ্রাঙ্কোবার আগে পরিমাপ করা গান অজ্ঞাত ছিল। ছন্দ নামে এটি সপ্তম শতক থেকে আরবীয় সঙ্গীতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল। ফ্রাঙ্কো ও তাঁর প্রবর্তিত ধারায় আমরা স্বরলিপির পরিমাপমূলক ব্যবস্থা ছাড়াও একটি ছান্দিক রীতি দেখতে পাই এবং এগুলি মূলত আরবদের কাছ থেকেই নেওয়া হয়েছে। ল্যাটিন গ্রন্থে আমরা এলমুয়াহিম ও এল মুয়ারিফা প্রভৃতি নামে বিশেষ বিশেষ ধরনের স্বরলিপির উল্লেখ দেখতে পাই। এগুলি মূলত আরবী থেকে উদ্ভূত। অপরদিকে জোহানেস ডি মুরিসের রচনায় আলেনটেড নামে একটি কৌশলের উল্লেখ রয়েছে। এই শব্দটিও মূলত আরবী। মধ্যযুগীয় যে হকেট শব্দটিকে রবার্ট ডি হ্যান্ডলো 'স্বরলিপি ও যতির সংমিশ্রণ' বলে উল্লেখ করেছেন তা আরবী ইকা'আত শব্দ থেকে উদ্ভূত। তেমনি ইবনে সিনার ক্যাননে ল্যাটিন আলহাশ শব্দটি আরবী আল ইশক।

ব্যবহারিক শিল্পকলা
ভবঘুরে শিল্পী শ্রেণীর দরুনই আরবদের ব্যবহারিক শিল্পকলা প্রসার লাভ করে। এসব চারণ মধ্যযুগে সঙ্গীতের সত্যিকার প্রচারক ছিলেন। পাশ্চাত্য গায়কদের জাঁকালো পোশাক, লম্বা চুল ও চিত্রিত চেহারার পিছনে সম্ভবত প্রাচ্যের প্রভাব ছিল। খেলনা ঘোড়া ও ঘন্টা শোভিত মরিস নৃত্য শিল্পীরা অবধরিতভাবে আরব চারণ শিল্পীদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এমনকি থয়নট আরবিউর সময় পর্যন্ত এসব মরিস নৃত্যশিল্পী মূরদের অনুকরণে নানারঙে তাদের চোহারা রঞ্জিত করতো। খেলনা ঘোড়ার নাম যামালযাইন সোজাসুজি আরবী উৎসবের ঘোড়া এর প্রতিধ্বনি। স্পেনীয় শব্দ মাসকারা ইংরেজী মাসকার শব্দের ন্যায় আরবী ভাঁড় শব্দ থেকে উদ্ভূত। আইবেরীয় উপদ্বীপে যাম্বরা, যারাবান্দা, হুদা, মারিস্কা ইত্যাদি বহু শব্দ রয়েছে যা সুস্পষ্টভাবে মূলত আরবী।

আরবদের উন্নততর সংস্কৃতি অবধারিতভাবে পশ্চিম ইউরোপে প্রতিফলিত হয়। আমরা দেখতে পেয়েছি যে, নবম শতকে স্পেনীয়রা মিল ও ছন্দের ক্ষেত্রে আরবদের অনুকরণ করছে, এমনকি দশম শতকে ইহুদীরাও এতদ্বারা প্রভাবিত হয়। স্পষ্টত কবিতার সঙ্গে যে সঙ্গীত ছিল তাও তারা অনুকরণ করে, কারণ এই দুটি পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। আমরা খৃস্টান স্পেনের জাগলারদের মধ্যে আরব ও ইহুদীদের দেখতে পাই। দ্বাদশ শতকে বার্সিলোনায় কাউন্টরা যখন প্রভেন্সের শাসক ছিলেন তখন টুবাডুর ও জংলার আরব আমীর ও তাঁর মুঘান্নীর ভূমিকা পুনরাভিনয় করতো।

বাদ্যযন্ত্রে ও যন্ত্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রে পশ্চিম ইউরোপে মুসলিম উত্তরাধিকার সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সাধারণভাবে স্বীকার করা হয় যে, বেশ কিছুসংখ্যক বাদ্যযন্ত্রের নাম, এমনকি প্রকৃত আকার আরবদেরই অবদান। লিউট, রেবেক, গিটার ও নাকের শব্দগুলির মূল আরবী যথাক্রমে আল-উদ, রাবাব, কিতারা ও নাককারা-এ কথা বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত সত্য। ইউরোপে বাদ্যযন্ত্রের বিদেশী নাম প্রবর্তিত হয়ে থাকলেও নতুন আকার প্রবর্তনের ক্ষেত্রে সেসব নাম সব সময় অব্যাহত থাকেনি। সুস্পষ্টভাবে বহু নতুন ধরনের আরব বাদ্যযন্ত্র প্রবর্তিত হয় এবং তখনকার ইউরোপীয় সঙ্গীত জগতে এগুলি উল্লেখযোগ্য ছিল। প্রথমত তার যুক্ত বীণা, প্যান্ডোর ও গিটার শ্রেণীর সর্বপ্রকার বাদ্যযন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে। এর পরে আসে বেহালা জাতীয় বিভিন্ন ধরনের বক্রাকারের বাদ্যযন্ত্র।

এসব বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধারও সৃষ্টি হয়। আরবদের সঙ্গে যোগাযোগের আগে তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে ইউরোপীয় চারণ শিল্পীদের কেবল সিথারা ও হার্প ছিল। কেবল কানে শুনেই তারা এগুলি বাজাতেন। আরবরা ইউরোপে তাদের লিউট, প্যান্ডোর ও গিটার আমদানির সঙ্গে সঙ্গে জালি ব্যবস্থার সাহায্যে ফিঙ্গার বোর্ডে স্বরলিপির নির্ধারিত স্থানসমূহও আমদানি করেন। এসব স্থান পরিমাপের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। এটি বিশেষভাবে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বস্তুত আরব লিউটের এই ফ্রেটিংয়ের মাধ্যমেই ইউরোপে প্রধান রীতি প্রবর্তিত হয়।

অবশ্য আরবদের সঙ্গে যোগাযোগের সব চাইতে বৃহত্তম অবদান ছিল পরিমাপমূলক সঙ্গীত। সঙ্গীত তত্ত্ববিদরা এটি লক্ষ্য ও পর্যালোচনা করার বহু আগে চারণশিল্পীরা তা প্রচার করেন। দ্বিতীয়ত অন্যান্য শিল্পকলায় আ্যরাবেস্ক এর প্রতিরূপ মেলডি 'সুশোভিত করণও' অবদানের সৃষ্টি করে। তারকিব বা যৌগিক নামে পরিচিত সুশোভনের এই রীতিতে চতুর্থ, পঞ্চম বা অষ্টকে যুগপৎভাবে স্বরাঘাত সৃষ্টি করা হয় এবং সম্ভবত এর মাধ্যমেই ইউরোপ সর্বপ্রথম হার্মনির পথে এগিয়ে যায়।

মঙ্গোলদের কাছে বাগদাদের পতন, খৃস্টানদের গ্রানাডা অধিকার এবং তুর্কীদের কাছে খৃস্টানদের আত্মসমর্পণের ফলে আরবী ভাষাভাষীদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রাধান্যের অবসান হয়। দৃশ্যত শিল্প ও রাজনীতির মধ্যে ব্যবধান দুস্তর হলেও সত্যিকার ব্যাপার হচ্ছে এ দুটি পারস্পরিক ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট। এই ক্ষেত্রটি ছাড়া সর্বশেষে উল্লেখিত তারিখের বহু আগে থেকেই ইউরোপ বিশ্বসংস্কৃতিতে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে।

টিকাঃ
১. মওলবী দরবেশ সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা জালালুদ্দীন রূমী ১২৭৩ খৃস্টাব্দে কেনিয়ায় ইন্তিকাল করেন।
১. এটি সুলতান মুহাম্মদ ইবনে মুরাদের নামে উৎসর্গিত হওয়ায় আমি এই নামে আখ্যায়িত করেছি।
১. মূলত ল্যাটিন; অর্থ শুরু থেকে।
২. বাঁধাগৎ স্বরগ্রাম সাধা: যেমন সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি; পাশ্চাত্য স্বরগ্রাম: ডু-রে-মি-ফি সোল-লা-টি।
১. খেলনা ঘোড়া; মরিস নৃত্যের সময় খেলনা ঘোড়া এমনভাবে কোমর পর্যন্ত যুক্ত করা হতো যাতে মনে হতো যে, নৃত্য শিল্পী ঘোড়ায় চড়ে ছুটেছে।
২. একটি প্রাচীন লোকনৃত্যের নাম যা এক সময় ইংল্যান্ডে, বিশেষত মে দিবসে সাধারণ ব্যাপার ছিল। এতে রঙ বেরঙের পোশাক পরা হতো।
৩. পশ্চিম পিরেনিজ অঞ্চলে, বিশেষত উত্তর স্পেনে বসবাসকারী উপজাতি ও তাদের ভাষা।
১. মধ্যযুগীয় ফ্রান্স ও ইংল্যাণ্ডের ভবঘুরে চারণ করি যারা আবৃত্তি বা গানের মাধ্যমে জনসাধারণের চিত্তবিনোদন করতো।
২. বীণা জাতীয় প্রাচীন ইউরোপের বাদ্যযন্ত্র, জিথারের প্রাচীনরূপ।
৩. সচ্ছিদ্র বা জালির কাজ; অঙ্গুলি চালনা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ব্যাঞ্জো, গিটার প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রের ফিঙ্গার বোর্ডের উপর স্থাপিত উঁচু পৃষ্ঠদেশ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px