📄 বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিদ্যা
১. প্রাথমিক যুগ ৭৫০ খৃ. পর্যন্ত
২. অনুবাদের যুগ প্রায় ৭৫০ থেকে প্রায় ৯০০ পর্যন্ত...
৩. সুবর্ণ যুগ: প্রায় ৯০০ থেকে প্রায় ১১০০ পর্যন্ত
৪. পতন যুগ প্রায় ১১০০ থেকে...
মুসলিম বিজ্ঞানের রত্নভাণ্ডারগুলি সবেমাত্র উন্মুক্ত হতে শুরু করেছে। একমাত্র কনস্টান্টিনোপলেই লক্ষ লক্ষ পাণ্ডুলিপি সমন্বিত ৮০টিরও বেশি মসজিদ গ্রন্থাগার রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে কায়রো, দামেস্ক, মসুল ও বাগদাদে এবং পারস্যে ও ভারতে আরো বহু সংগ্রহ। খুব কম সংখ্যক পাণ্ডুলিপিরই তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং তার চাইতেও অনেক কমসংখ্যক পাণ্ডুলিপির বিষয়বস্তু বর্ণনা বা সম্পাদনা করা হয়েছে। এমনকি স্পেনের এসকোরিয়াল লাইব্রেরীতে মুসলিম পাশ্চাত্যের জ্ঞান সাধনার যেসব সম্পদ সঞ্চিত রয়েছে সেগুলির ক্যাটালগ তৈরিও এখনো সম্পন্ন হয়নি। বিগত কয়েক বছরে যে বিপুল পরিমাণ উপাদান উদ্ধার করা হয়েছে তা আমাদের পূর্ববর্তী ধারণাসমূহ অনেকখানি পাল্টে দিয়েছে এবং মুসলিম বিশ্বে বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার প্রাথমিক ইতিহাসের উপর নতুনভাবে ব্যাপক আলোকপাত করেছে। তাই চিকিৎসা বিদ্যা ও বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদানের একটি মোটামুটি চিত্রও বর্তমানে বড়জোর পরীক্ষামূলক হতে পারে।
১. প্রাথমিক যুগ, ৭৫০ খৃ. পর্যন্ত
সপ্তম শতকে আরবরা যখন সর্বপ্রথম একটি প্রাচীন সভ্যতার উত্তরাধিকারিত্ব লাভ করে তখন নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক আদর্শ ছাড়াও তাদের নিজস্ব বলতে ছিল সঙ্গীত ও ভাষা। আরবদের সমৃদ্ধ ও নমনীয় ভাষা নিকট প্রাচ্যের বৈজ্ঞানিক ভাবধারায় পরিণত হয়, যেমনটি হয়েছিল ল্যাটিন ভাষা পাশ্চাত্যের বৈজ্ঞানিক ভাব বিনিময়ের মাধ্যম।
প্রাক ইসলাম ও ইসলামের প্রাথমিক যুগের আরবী কাব্যে দেখা যায় যে, বেদুইনরা তাদের বিশাল উপদ্বীপের জীবজন্তু, গাছপালা ও বিভিন্ন ধরনের পাথর সম্পর্কে কিছুটা জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। আরব কবিরা তাদের বহনকারী উট ও ঘোড়ার গুণাবলী বর্ণনায় অনুরাগমূলক জ্ঞানের পরিচয় দেন এবং তাদের বিবরণী থেকে পরবর্তী শতকসমূহে একটি সুনির্দিষ্ট শ্রেণীর সাহিত্যের সৃষ্টি হয়। চিকিৎসা, স্বাস্থ্য রক্ষা ও আবহাওয়া তত্ত্ব সম্পর্কে তাদের জ্ঞান অত্যন্ত মৌলিক ছিল। কুরআনে রোগের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়নি। কেবলমাত্র সামাজিক উদ্দেশ্যেই সেখানে স্বাস্থ্য রক্ষার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ইসলামের প্রথম কয়েক শতকে কুরআনের বিশ্লেষণমূলক হাদীস ও ভাষ্য থেকে অধিকতর বিস্তারিত উপাদান পাওয়া যায়। কিন্তু এগুলির বিষয়বস্তুর তেমন বৈজ্ঞানিক মূল্য নেই। কারণ এগুলিতে শুধুমাত্র বিভিন্ন রোগ ও সেগুলির প্রতিকার ব্যবস্থার তালিকা দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে জাদুবিদ্যা প্রয়োগ, অশুভ প্রভাবের বিরুদ্ধে মাদুলি ও কবচ ব্যবহারের বর্ণনা এবং প্রতিরোধমূলক প্রার্থনার সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে।
আরবরা যখন বাইযেন্টাইন ও পারস্য সাম্রাজ্যে প্রবেশ করে তার কয়েক শতক আগে থেকেই গ্রীক বিজ্ঞানের নির্জীব অবস্থা বিরাজ করছিল। এটি আরব পণ্ডিতদের হস্তগত হয়। তারা অ্যারিস্টটল, হিপোক্রেটিস, গ্যালেন, টলেমী, আর্কিমিডিস ও অন্যান্যের রচনাবলী নকল করেন কিংবা সেগুলির ভাষ্য তৈরি করেন। গ্রীক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ঐতিহ্য নিম্নোক্ত লেখকদের রচনাবলীতে অত্যন্ত জীবন্তভাবে সংরক্ষিত ছিল : আলেকজান্দ্রিয়ায় বসবাসকারী আমিডার এইটিয়াস ও এজিনার পল; রোমে বসবাসকারী ট্রাল্লেসের আলেকজান্ডার এবং কনস্টান্টিনোপলের থিওফিলস্ প্রটোসপাথারিয়স।
আরব অভিযানের আগে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত মিসরের রাজধানীতে প্রাচীন জ্ঞান চর্চার কিছুটা ক্ষীণ পুনরুজ্জীবন ঘটে। এখানে গ্যালেনের প্রধান প্রধান রচনাবলী থেকে নিষ্কাশনের মাধ্যমে চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষার একটি নতুন ভিত্তি তৈরি হয়। আলেকজান্দ্রিয়াবাসী জোহানেস ফিলোপোনাস অ্যারিস্টটলের মতবাদের সাহসী প্রবক্তা ছিলেন। পূর্ববর্তী সময়ে আলেকজান্দ্রিয়ার জ্ঞানবিদগণ হিপোক্রেটিসের নাম সম্বলিত রচনাবলীর সংক্ষিপ্তসার তৈরি করেন। অবশ্য মিসরে এদিকে গোড়াপন্থী খৃস্টানরা বসবাস করতো এবং অপরদিকে গূঢ়বাদ ও রহস্যবাদের চর্চা হতো। তাই সেখানকার মাটি কোন প্রকার বিজ্ঞান চর্চার অনুকূল ছিল না।
উপরোক্ত কারণে মিসর গ্রীক ও আবরদের চিকিৎসা বিদ্যা ও বিজ্ঞানের মধ্যবর্তী বাহক হিসাবে সক্রিয়তার পরিচয় দিতে পারেনি। এ জন্যে আমাদেরকে প্রাচীন সিরীয় ভাষাভাষী বিশ্বের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। তৃতীয় শতক থেকে পরবর্তীকালে প্রাচীন সিরীয় বাগধারা পশ্চিম এশিয়ার শিক্ষিত মহলে ধীরে ধীরে গ্রীক ভাষার স্থলাভিষিক্ত হয়। সিরীয়-গ্রীক সভ্যতার বাহক ছিল প্রধানত নেস্টোরিয়ানরা। এই খৃস্টান সম্প্রদায় কনস্টান্টিনোপলের প্যাট্রিয়ার্ক নেস্টোরিয়াস কর্তৃক ৪২৮ খৃস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। ৪৩১ খৃস্টাব্দে ইফেসাস কাউন্সিল এর অনুসারীদের ধর্মদ্রোহী বলে ঘোষণা করে এবং তখন থেকে তারা এডেসায় হিজরত করেন। সেখান থেকেও বাইযেন্টাইন সম্রাট যেনো ৪৮৯ খৃস্টাব্দে তাদের বহিষ্কার করেন। অতঃপর তারা দেশত্যাগ করে সাসানীয় শাসনাধীন পারস্য চলে যান। সেখানে তাদের সাদরে গ্রহণ করা হয়। ধর্ম প্রচারের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা আরো পূর্বদিকে এশিয়ার কেন্দ্রস্থলে অগ্রসর হন, এমনকি সুদূর পশ্চিম চীনে গিয়েও পৌঁছেন।
একটি মেডিক্যাল স্কুলসহ নেস্টোরীয় বিজ্ঞান কেন্দ্র এডেসা থেকে মেসোপটেমিয়ার নিসিবিসে স্থানান্তরিত হয় এবং সেখান থেকে ৬ষ্ঠ শতকের প্রথমার্ধে দক্ষিণ-পশ্চিম পারস্যের জুন্দিশাপুরে স্থানান্তরিত হয়। সেখানে একটি হাসপাতাল ছাড়াও চতুর্থ শতকে সাসানীয় সম্রাট কর্তৃক একটি একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হয়। বিখ্যাত সম্রাট খসরু নওশিরওয়ান এই শহরটিকে ঐযুগের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত করেন। ৫২৯ খৃস্টাব্দে জাস্টিনিয়ান কর্তৃক দর্শন চর্চা বন্ধ করে দেওয়ার পর গ্রীক পণ্ডিতগণ এথেন্স ত্যাগ করে এখানে সিরীয় পারসিক ও ভারতীয় সাধকদের সঙ্গে মিলিত হন। এমনিভাবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও দার্শনিক মতবাদের একটি বৈজ্ঞানিক সংমিশ্রণ ঘটে যা পরবর্তীকালে মুসলিম চিন্তাধারা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। খসরু চিকিৎসা সংক্রান্ত গ্রন্থাবলীর সন্ধানে তাঁর নিজস্ব চিকিৎসককে ভারতে প্রেরণ করেন। এসব সংগৃহীত গ্রন্থ পাহলভী ভাষায় অনূদিত হয়। এ ছাড়া গ্রীক ভাষা থেকে অন্যান্য বহু বৈজ্ঞানিক রচনা পারস্য বা প্রাচীন সিরীয় ভাষায় অনূদিত হয়। মহানবীর সমসাময়িক কালের জুন্দিশাপুর মেডিক্যাল স্কুলের জনৈক শিক্ষার্থী আরবদের প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসাবিদ। কুরআনের বিশ্লেষণমূলক হাদীস বিশেষজ্ঞগণ তাঁর নাম উল্লেখ করেছেন।
প্রাচীন সিরীয় ভাষাভাষী বিশ্বে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ছিলেন রেশ-আইনার অধিবাসী সার্জিয়াস। তিনি নেস্টোরিয়ান ছিলেন না, বরং মনোফিজাইট খৃস্টান পুরোহিত ও তার জন্মস্থান মেসোপটেমিয়ার প্রধান চিকিৎসাবিদ ছিলেন। তিনিই চিকিৎসাবিদ্যা সংক্রান্ত গ্রীক রচনা প্রাচীন সিরীয় ভাষায় অনুবাদ শুরু করেন। তাঁকে গ্যালেনের বহু গুরুত্বপূর্ণ রচনার অনুবাদক হিসাবে উল্লেখ করা হয়। অমার্জিত হলেও তাঁর রচনা দুই শতাব্দীরও বেশিকাল পর্যন্ত পশ্চিম এশিয়ায় চিকিৎসা বিদ্যা সংক্রান্ত গ্রীক ঐতিহ্য বজায় রাখে। এই সময় গ্রীক চিকিৎসা বিদ্যার ওপর ভিত্তি করে পণ্ডিত ব্যক্তিরা চিকিৎসা সংক্রান্ত তাদের নিজস্ব গ্রন্থ রচনা শুরু করেন। এগুলির মধ্যে সবচাইতে পরিচিত হচ্ছে আহরনের প্যাণ্ডেক্টস। ইসলামের আবির্ভাবের অব্যবহিত পূর্বে তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার একজন খৃস্টান পাদ্রী ও চিকিৎসক ছিলেন। সম্ভবত তিনি গ্রীক ভাষায় মূল গ্রন্থ রচনা করেন যা সিরীয় ও পরবর্তীকালে আরবী ভাষায় অনূদিত হয়। আহরনের রচনা বর্তমানে বিলুপ্ত, কিন্তু এতে খুব সম্ভব প্রাচীন গ্রীক চিকিৎসা বিজ্ঞানে অজ্ঞাত বসন্ত রোগের সর্বপ্রথম বর্ণনা স্থান পায়।
ইসলামের আবির্ভাবের অব্যবহিত পূর্ববর্তী শতকগুলিতে প্রকৃতি বিজ্ঞান সংক্রান্ত রচনাবলী কদাচিৎ দেখা যায়। এ সময়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রচনাই প্রাধান্য পায়। কিছুটা প্রাথমিক যুগে প্রাচীন সিরীয় ভাষায় অ্যারিস্টটলের পারতা নেচারালিয়া এবং বিশ্বজগৎ সম্পর্কে ও আত্মা সম্পর্কে অ্যারিস্টটলের রচনা হিসাবে কল্পিত কিছু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া জীবজন্তু এবং তাদের রূপকথার শক্তি ও গুণাবলী সম্পর্কে ফিজিওলগাস শিরোনামে একটি খৃস্টান ধর্মতাত্ত্বিক গ্রন্থও রচিত হয়। একই ভাষায় গবাদি পশু প্রজনন, কৃষি ও পশু চিকিৎসা সম্পর্কে এবং আলকেমী সম্পর্কেও বিভিন্ন গ্রীক রচনা প্রকাশিত হয়। প্রাচীন সিরীয় ভাষায় ধাতু বিদ্যার কারিগরি পদ্ধতি সম্পর্কেও কিছু কিছু ছিটেফোটা রচনা পাওয়া যায়। সাসানীয় শাসনামলে আলকেমী ও জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রধান কেন্দ্রগুলি সম্ভবত পারস্যের পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের প্রদেশগুলির বড় বড় শহরে ছিল। এখানে চীনা ও ভারতীয় প্রভাবে একটি নতুন সভ্যতা গড়ে ওঠে।
আরবরা যখন উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়া অধিকারভুক্ত করে তখন তারা বাইযেন্টাইন ও পারস্য প্রশাসন এবং বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের এতটুকু ক্ষতি সাধন করেনি। জুন্দিশাপুরের একাডেমী নতুন মুসলিম সাম্রাজ্যের বৈজ্ঞানিক কেন্দ্র হিসাবে অব্যাহত থাকে। উমাইয়াদের আমলে এখান থেকেই রাজধানী দামেস্কে বিদ্বজন, বিশেষ করে চিকিৎসাবিদদের আগমন ঘটে। এরা অধিকাংশই ছিলেন আরবী নামযুক্ত খৃস্টান বা ইহুদী। মাসারজাওইহ্ নামক জনৈক পারস্যবাসী ইহুদীই আহরনের প্যান্ডেক্টস্ আরবীতে অনুবাদ করেন এবং তিনিই সম্ভবত আরবী ভাষায় প্রাচীনতম বিজ্ঞান গ্রন্থের রচয়িতা। অবশ্য উমাইয়া খলীফাদের দরবারের বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইতিহাস প্রায় সম্পূর্ণ নীরব।
২. অনুবাদের যুগ, প্রায় ৭৫০ থেকে প্রায় ৯০০ পর্যন্ত
৭৫০ খৃস্টাব্দের দিকে আব্বাসীয়দের উত্থান মুসলিম শাসনের বৃহত্তম শক্তি, গৌরব ও সমৃদ্ধির যুগের সূচনা করে। একেবারে সূচনাতেই মুসলমানদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে যিনি প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্য উভয় ক্ষেত্রেই মধ্যযুগীয় বিজ্ঞানে ছায়ার ন্যায় বিরাজমান। ইনি হচ্ছেন আস-সুফী নামে পরিচিত জাবির ইবনে হাইয়ান এবং মধ্যযুগীয় ল্যাটিন সাহিত্যে জেবের। তাঁর পিতা কুফার জনৈক আরব ঔষধ বিশেষজ্ঞ শিয়া সম্প্রদায়ের শহীদ হিসাবে মৃত্যুবরণ করেন। জাবির চিকিৎসকের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন, কিন্তু চিকিৎসা শাস্ত্র সম্পর্কে তাঁর কোন রচনা আমরা পাইনি। অবশ্য এই নিবন্ধ রচয়িতা সম্প্রতি বিষ সম্পর্কিত কিছু রচনা উদ্ধার করেছেন যা জাবিরের বলে কথিত। জাবির আরবী আলকেমীর জনক হিসাবে বিখ্যাত। জাবির সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি হারুনুর রশীদের শক্তিশালী উজীর বারমাকী পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ৮০৩ খৃস্টাব্দে এই পরিবারের পতনের সংশ্লিষ্ট ঘটনার সঙ্গে তাঁকেকেও জড়িত করা হয়, এবং তিনি তাঁর পিতার জন্মস্থান কুফায় নির্বাসিত অবস্থায় ইন্তিকাল করেন। কথিত আছে যে, এখানে তাঁর মৃত্যুর দুই শত বছর পরেও তার গবেষণাগারের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়।
দ্বিতীয় আব্বাসীয় খলীফা আল মনসুরের সময় পুনরায় গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞান অনুবাদের কাজে হাত দেওয়া হয় এবং জুন্দিশাপুরই ছিল তার কেন্দ্রস্থল। খলীফা যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন সেখান থেকেই 'বাস্ত ঈশু' নামক খৃস্টান পরিবারের জুরজিস্কে ডেকে পাঠান। জুরজিস্ সেখানকার বিখ্যাত হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক ছিলেন। পরবর্তীকালে খলীফা আল হাদী ও হারুনুর রশীদ একই পরিবারের অপর একজন সদস্যের কাছ থেকে চিকিৎসকের ব্যাপারে পরামর্শ গ্রহণ করেন। সাত পুরুষ পর্যন্ত 'বাস্ত ঈশু' পরিবারের চিকিৎসাবিদগণ তাদের খ্যাতি অক্ষুণ্ণ রাখেন এবং সর্বশেষ খ্যাতিমান চিকিৎসক একাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে জীবিত ছিলেন। একথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে, 'বাস্ত ঈশু' পরিবারের প্রথম চিকিৎসাবিদের কৃতিত্বে মুগ্ধ হয়েই খলীফাগণ তাঁদের সাম্রাজ্যের চিকিৎসকদের মধ্যে গ্রীক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞান প্রচারের নির্দেশ প্রদান করেন।
নবম শতক ছিল অনুবাদ কাজের সর্বাধিক তৎপরতার যুগ। সার্জিয়াসের রচনার প্রাচীন সিরীয় ভাষার অনুবাদ সংশোধন করে নতুন গ্রন্থ রচিত হয়। প্রধানত নেস্টোরিয়ান খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী অনুবাদকগণ গ্রীক, প্রাচীন সিরীয়, আরবী, এমনকি পারস্য ভাষায়ও দক্ষ ছিলেন। অধিকাংশ অনুবাদকই প্রথমে প্রাচীন সিরীয় ভাষায় লেখেন। অবশ্য অর্ধ শতাব্দীকাল পর্যন্ত হারুনুর রশীদের উত্তরাধিকারীদের চিকিৎসক শ্রদ্ধেয় ইউহান্না ইবনে মাসাওইহ্ চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে আরবীতে কতিপয় গ্রন্থ রচনা করেন। সাধারণত খৃস্টান শিষ্য ও বন্ধুবান্ধবদের জন্য প্রাচীন সিরীয় ভাষায় এবং যেসব মুসলিম পৃষ্ঠপোষক জ্ঞানচর্চা করতেন তাদের জন্য আরবীতে গ্রন্থ রচনা করা হতো।
খলীফা আল মামুনের রাজত্বকালে নতুন জ্ঞানচর্চা তার প্রথম সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে। খলীফা অনুবাদ কার্যের জন্য বাগদাদে একটি নিয়মিত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এর সঙ্গে একটি গ্রন্থাগারও ছিল। এখানকার অন্যতম অনুবাদক হুনাইন ইবনে ইসহাক ছিলেন বিশেষ প্রতিভাসম্পন্ন দার্শনিক এবং ব্যাপক পাণ্ডিত্যসম্পন্ন চিকিৎসাবিদ। এই শতকের অনুবাদকদের মধ্যে তিনি ছিলেন অগ্রণী। তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত বাণী থেকে আমরা জানতে পারি যে, তিনি কার্যত গ্যালেনের বিপুল রচনা সম্ভার সামগ্রিকভাবে অনুবাদ করেন। এর মধ্যে গ্যালেনের রচনার প্রাচীন সিরীয় ভাষায় একশটি এবং আরবী ভাষায় ঊনচল্লিশটি চিকিৎসাশাস্ত্র এবং দর্শন বিষয়ক গ্রন্থ রয়েছে। পুত্র ইসহাক ও ভ্রাতুষ্পুত্র হুবাইশসহ তাঁর শিষ্যগণ প্রাচীন সিরীয় ভাষায় তেরোটি এবং আরবী ভাষায় ষাটটি গ্রন্থ রচনা করেন। শিষ্যদের মধ্যে পুত্র ও ভ্রাতুষ্পুত্র বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। এমনিভাবে মুসলিম বিশ্ব গ্রীক বৈজ্ঞানিক লেখকদের বিপুল রচনার সামগ্রিক উত্তরাধিকার লাভ করে।
গ্যালেনের মতবাদসমূহের প্রতি হুনাইনের বিশেষ অনুরাগ সর্বত্র সুস্পষ্ট। মধ্যযুগে প্রাচ্যে এবং পরোক্ষভাবে পাশ্চাত্যেও হুনাইনই গ্যালেনকে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। হিপোক্রেটিসের রচনাবলী সম্পর্কে আমরা সেই পরিমাণ অবহিত হইনি। হুনাইন স্বয়ং তাঁর অ্যাফোরিজমস অনুবাদ করেন। এই রচনাটি পরবর্তীকালের আরবদের কাছে একটি ক্লাসিক্যাল গ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত হয় এবং তারা প্রায়ই এ সম্পর্কে মন্তব্য করেন। হিপোক্রেটিসের অন্যান্য রচনার অধিকাংশ তাঁর শিষ্যরা অনুবাদ করেন। এসব অনুবাদ প্রায়ই গুরু নিজেই সংশোধন করতেন। হিপোক্রেটিসের ওপর গ্যালেন যেসব ভাষ্য রচনা করেন তার প্রায় সবগুলি হুনাইন স্বয়ং প্রাচীন সিরীয় ও আরবী ভাষায় রূপান্তরিত করেন। এ ছাড়াও হুনাইন ওরিবাসিয়াসের বিশাল সিনপসিস্, পল অব ইজিনার সেভেন বুক্স এবং ডায়োসকিউরাইডসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ম্যাটেরিয়া মেডিকা অনুবাদ করেন। শেষোক্ত গ্রন্থটি তাঁর পূর্ববর্তী অনুবাদক সঠিকভাবে অনুবাদ করেননি। স্পেনে দশম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এই রচনা পুনরায় আরবীতে অনূদিত হয়। ডায়োসকিউরাইডসের এসব আরবী অনুবাদের অত্যন্ত সুন্দরভাবে অলংকৃত আরবী পাণ্ডুলিপি বিভিন্ন গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে। হুনাইনের আরবী অনুবাদের মধ্যে অন্যান্য গ্রীক চিকিৎসাবিদ এবং পশু চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের রচনাও রয়েছে। তিনি অ্যারিস্টটলের পদার্থ বিজ্ঞান সংক্রান্ত কতিপয় রচনা এবং গ্রীক ওল্ড টেস্টামেন্ট আরবীতে অনুবাদ করেন। হুনাইনের বহু অনুবাদ এখনো পাণ্ডুলিপি আকারে রয়েছে এবং এগুলি বিশেষভাবে কনস্টান্টিনোপলের গ্রন্থাগারগুলিতে সংরক্ষিত। এগুলি ভাষার ওপর অবাধ ও নিশ্চিত দক্ষতা, মূল গ্রীক ভাষার সহজ রূপান্তর এবং কোন প্রকার শব্দবাহুল্য ছাড়া অত্যন্ত সঠিকভাবে ভাব প্রকাশের স্বাক্ষর বহন করে। তাঁর নিপুণতার প্রাধান্য এতোই সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত যে, বহু ছোটখাটো অনুবাদক তাঁদের রচনা এই মহান গুরুর নামে প্রচার করেন।
হুনাইনের নিজস্ব রচনাও প্রায় তাঁর অনুবাদের ন্যায়ই বহু ও ব্যাপক। এগুলির মধ্যে গ্যালেনের বিভিন্ন রচনার বহু সংক্ষিপ্তসার ও ভাষ্য এবং ছাত্রদের জন্য পাঠ্যপুস্তক আকারে দক্ষতামূলক উদ্ধৃতি ও সংরক্ষিত পুনর্বিবরণ রয়েছে। আরব ও পারস্যবাসীর মতে তাঁর সব চাইতে বিখ্যাত গ্রন্থ হচ্ছে প্রশ্ন ও জবাবের আকারে একটি সার গ্রন্থ: চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রশ্নাবলী এবং চক্ষু চিকিৎসার ওপর প্রাচীনতম ধারাবাহিক পাঠ্যপুস্তক: চক্ষু সম্পর্কে দশটি নিবন্ধ।
হুনাইন ইবনে ইসহাকের কতিপয় সমসাময়িক জ্ঞানবিদও 'বিরাট' অনুবাদক হিসাবে পরিচিত ছিলেন। এ ছাড়াও ছিল তাঁর নব্বই জনের মতো শিষ্য যারা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলী অনুবাদ করেন। প্রথমোক্তদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র হুবাইশ, পুত্র ইসহাক, প্রখ্যাত চিকিৎসাবিদ ও অঙ্কশাস্ত্রবিদ এবং মেসোপটেমিয়ার হাররানের অধিবাসী সাবিত ইবনে কাররা এবং কুসতা ইবনে লুকা। নবম শতকের অধিকাংশ চিকিৎসাবিদের ন্যায় সাবিত ছাড়া এরা সবাই খৃস্টান ছিলেন। সাবিত নিজেও ছিলেন একজন পৌত্তলিক 'সাবিয়ান' বা নক্ষত্র উপাসক। হুনাইন ও হুবাইশ প্রায় একান্তভাবে চিকিৎসাবিষয়ক রচনাবলী অনুবাদ করেন এবং তাদের সহকর্মীরা জ্যোতির্বিদ্যা, পদার্থ বিদ্যা, অঙ্কশাস্ত্র ও দর্শনশাস্ত্র সম্পর্কিত গ্রীক রচনাবলী অনুবাদে আত্মনিয়োগ করেন। এরা সবাই নিজস্ব গ্রন্থও রচনা করেন, যার সংখ্যা শত শত। নবম শতকের প্রথমার্ধে প্রাচীন সিরীয় ভাষার রচনা প্রাধান্য লাভ করে, কিন্তু অতঃপর আরবী রচনা ব্যাপকতা লাভ করে। এই অবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জুন্দিশাপুরের প্রাচীন জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়। এখানকার প্রখ্যাত চিকিৎসাবিদ ও বিজ্ঞানীরা একে একে বাগদাদে ও খলীফাদের মোহনীয় আবাস স্থল সামাররায় স্থানান্তরিত হন।
৮৫৬ খৃস্টাব্দের দিকে খলীফা আল মুতাওয়াক্কিল পুনরায় বাগদাদে গ্রন্থাগার ও অনুবাদ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এর পরিচালনা ভার দেওয়া হয় হুনাইনের ওপর। খৃস্টান জ্ঞানবিদদের গ্রীক পাণ্ডুলিপির সন্ধানে বিভিন্ন দেশ সফর করার জন্য এবং অনুবাদের উদ্দেশ্যে এগুলি বাগদাদে নিয়ে আসার জন্য খলীফাগণ এবং তাঁদের পদস্থ ওমরাহগণ সর্বপ্রকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তাই হুনাইন নিজে গ্যালেনের বর্তমানে বিলুপ্ত এবং ঐ সময়েও অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য একটি রচনা সম্পর্কে বলেন, "আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে এটির সন্ধান করি এবং এই উদ্দেশ্যে মেসোপটেমিয়া, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিসর এবং সর্বশেষে আলেকজান্দ্রিয়া সফর করি। এতো কিছু করেও আমি কোন কিছুর সন্ধান পাইনি। অবশেষে দামেস্কে আমি এর প্রায় অর্ধেক উদ্ধার করি।" তিনি বলেন যে, তিনি সব সময় একটি গ্রীক গ্রন্থের অন্ততপক্ষে তিনটি পাণ্ডুলিপির সাহায্য গ্রহণের চেষ্টা করতেন যাতে সবগুলি মিলিয়ে প্রকৃত বিষয়বস্তু উদ্ধার করা যায়--একজন সম্পাদকের দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ আধুনিক ধারণা।
বাগদাদে মেডিক্যাল শিক্ষা সম্পর্কে হুনাইনের সম্প্রতি প্রকাশিত গ্রন্থে দেখতে পাই যে, ৮৫৬ খৃস্টাব্দে সেখানে গ্রীক ঐতিহ্যসমূহ পুরোপুরি জীবন্ত হয়ে ওঠে। গ্যালেনের ২০টি বই কিভাবে শিক্ষা দেওয়া হতো তিনি তার একটি চিত্র তুলে ধরেন। "আলেকজান্দ্রিয়ার মেডিক্যাল স্কুলের ছাত্রদের অধ্যয়ন এসব বইর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং আমি আমার তালিকায় যে ধারাবাহিকতা অনুসরণ করেছি তা বজায় রাখা হতো। আমাদের সময়ে আমাদের খৃস্টান বন্ধুরা যেভাবে প্রাচীনদের গ্রন্থাবলী থেকে একটি নির্দিষ্ট মানের পাঠ্য বিষয় আলোচনা করার জন্য প্রত্যহ উসকুল নামে পরিচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে মিলিত হয়। তারাও তেমনি প্রত্যহ একটি মানের পাঠ্য বিষয় অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণ করার জন্য মিলিত হতো। গ্যালেনের অন্যান্য বইগুলি একটি পরিচিতিমূলক আলোচনার পর তারা নিজেরাই পড়তেন, যেমনটি বর্তমানে আমাদের বন্ধুরা প্রাচীনদের বইগুলির বিশ্লেষণসমূহ পড়ে থাকেন।" এ সময়ে এবং এর পরবর্তীকালে বাগদাদের স্কুল ও মসজিদগুলিতে শিক্ষা দানের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
গ্রীক রচনা ও রচনার অংশবিশেষের অনুবাদ ছাড়াও অনুবাদকগণ এগুলির সারগ্রন্থ তৈরি করেন এবং এরই একটি রূপ হচ্ছে 'প্যাণ্ডেক্টস' যা আরবদের জ্ঞানচর্চার একটি আদর্শ বৈশিষ্ট্য। এগুলি সামগ্রিক চিকিৎসা শাস্ত্রের পুনর্বর্ণনামূলক যাতে মাথা থেকে শুরু করে পা পর্যন্ত দেহের পীড়াগুলি ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হয়। এসব প্যাণ্ডেক্টস-এর অধিকাংশই বিলুপ্ত হয়েছে। অবশ্য কিছুকাল আগে কায়রোতে এর একটি পুনঃ প্রকাশিত হয়। এটি চিকিৎসাবিদের চাইতে অনুবাদক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসাবে খ্যাত সাবিত ইবনে কাররা কর্তৃক রচিত। এটি ৩১টি অংশে বিভক্ত। আলোচিত বিষয়গুলি হচ্ছে স্বাস্থ্য-বিজ্ঞান, 'গোপন' ও সাধারণ রোগসমূহ, যেমন চর্মরোগ। এর পরের শাখাটি বিরাট—মস্তক থেকে শুরু করে বক্ষদেশ, পাকস্থলী এবং অন্ত্র হয়ে দেহের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত বিভিন্ন অংশের রোগ। এরপর সংক্রামক ব্যাধি সংক্রান্ত আলোচনা, যার মধ্যে বসন্ত এবং হামও রয়েছে। এখানে বিভিন্ন ধরনের বিষ সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে। অতঃপর আবহাওয়ার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তারপর ভাঙা ও মচকানো, খাদ্য ও পথ্য এবং সর্বশেষে যৌন বিষয়াদি আলোচনা করা হয়েছে। প্রত্যেক রোগের স্বরূপ, কারণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসা অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও বাহুল্য বর্জিত ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে। বহু গ্রীক ও প্রাচীন সিরীয় ভাষার লেখকের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে।
আর এক ধরনের চিকিৎসা বিষয়ক বই আরব জ্ঞানীদের প্রিয় ছিল। এগুলি হচ্ছে প্রশ্ন ও জবাবের আকারে মুখস্থ করার বই। এধরনের শত শত পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় এবং আরবী চিকিৎসা বিজ্ঞানকে জ্ঞানদীপ্ত করে তোলার পিছনে এগুলির বিরাট অবদান রয়েছে। চিকিৎসা শাস্ত্র ছাড়া বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রীক রচনাবলী অনুবাদ সম্পর্কে আমাদের তথ্যসূত্র কিছুটা সঙ্কীর্ণ। অ্যারিস্টটলের বিজ্ঞান বিষয়ক রচনাবলী অধিকাংশ প্রাচীন সিরীয় ও আরবী ভাষায় অজ্ঞাত পরিচয় অনুবাদকরা অনুবাদ করেছেন। মহান দার্শনিকের ফিজিক্স, মেটিওরোলজি, ডি অ্যানিমা, ডি সেন্স, ডি সীলো, ডি জেনারেশন এট করাপশন, হিস্টোরিয়া অ্যানিমালিয়াম এবং সে সঙ্গে উদ্ভিদবিজ্ঞান, খনি বিজ্ঞান ও যন্ত্রকৌশল বিজ্ঞান সংক্রান্ত ভুয়া গ্রন্থাবলী এসব ভাষাতেই পাওয়া যায়। অ্যাপালোনিয়াস অব তিয়ানা কর্তৃক রচিত সিক্রেট অব ক্রিয়েশন ও বিখ্যাত ডি কসিস এর ন্যায় কতিপয় নিও-প্লাটোনিক গ্রন্থ এবং গ্রীক বিজ্ঞানীদের অন্যান্য সন্দেহজনক রচনা আরবী ভাষায় পাওয়া যায়। ভুয়া নামে আলকেমী সম্পর্কিত বহু গ্রীক রচনাও অনূদিত হয়েছে।
অবশ্য নবম শতকে রসায়ন সম্পর্কে কোন অগ্রগতির রেকর্ড নেই। হুনাইন ও আল কিন্দীর ন্যায় দুজন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আলকেমী চর্চার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁরা এটিকে প্রতারণামূলক বলে আখ্যায়িত করেন।
এবারে অনুবাদ থেকে এ যুগের মৌলিক রচনার প্রসঙ্গে আসা যাক। পদার্থ বিদ্যায় সব চাইতে উল্লেখযোগ্য পণ্ডিত হচ্ছেন আল-কিন্দী। তাঁর রচনার সংখ্যা অন্যূন ২৬৫টি এবং তিনি আরবদের মধ্যে প্রথম মুসলিম দার্শনিক। তিনি আবহাওয়া তত্ত্ব সম্পর্কে অন্ততপক্ষে পনেরটি গ্রন্থ রচনা করেন। সুনির্দিষ্ট ওজন, জোয়ার ভাটা, আলোক-বিজ্ঞান এবং বিশেষত আলোর প্রতিফলন সম্পর্কে তাঁর একাধিক গ্রন্থ এবং সঙ্গীতের ওপর আটটি গ্রন্থ রয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত আল-কিন্দীর বৈজ্ঞানিক রচনার অধিকাংশই বিলুপ্ত। একটি ল্যাটিন অনুবাদের মাধ্যমে সংরক্ষিত তাঁর আলোক বিজ্ঞান রজার বেকন ও অন্যান্য পাশ্চাত্য বিজ্ঞানীকে প্রভাবিত করে।
মেসোপটেমিয়া ও মিসরে সেচ ব্যবস্থা এবং পানি সরবরাহ ও যোগাযোগের জন্য খাল-ব্যবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় কৌশলবিজ্ঞানের দ্রুত বিকাশ ঘটে। কৌশলগত যন্ত্রবিজ্ঞান বিপুল আগ্রহের সৃষ্টি করে এবং পানি উত্তোলন, পানি চালিত চাকা, ভারসাম্য ও জল-ঘড়ি সম্পর্কে বহু গ্রন্থ রচিত হয়। যন্ত্রবিজ্ঞান সম্পর্কে বুক অব আর্টিফিসেস নামে প্রাচীনতম গ্রন্থ প্রকাশিত হয় আনুমানিক ৮৬০ খৃস্টাব্দে। এর রচয়িতা হচ্ছেন মূসা ইবনে শাকিরের পুত্র মোহাম্মদ, আহমদ এবং হাসান। তাঁরা অনুবাদকদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এই গ্রন্থটিতে ১০০টি কৌশলগত নির্মাণের বিষয় উল্লেখিত হয়েছে যার মধ্যে ২০টির ব্যবহারিক মূল্য রয়েছে। যথা উষ্ণ ও শীতল জলের নৌযান এবং নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত জলকূপের বিবরণ। অধিকাংশই আলেকজান্দ্রিয়ার হিরোর যন্ত্রকৌশলের মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি সাঙ্গিতিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা সমন্বিত পানপাত্রের ন্যায় বৈজ্ঞানিক শৌখিন বস্তুর বর্ণনা।
প্রকৃতির ইতিহাসের ক্ষেত্রে অষ্টম শতকে এক ধরনের বিশেষ রচনার উদ্ভব হয়। এটি জীব-জন্তু, উদ্ভিদ ও বিভিন্ন ধরনের পাথরের বর্ণনামূলক রূপ গ্রহণ করে। সাহিত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে রচিত হলেও প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়। এ ধরনের রচনার অত্যন্ত যশস্বী গ্রন্থকারদের অন্যতম হচ্ছেন বসরার বিখ্যাত আরবী ভাষাতত্ত্ববিদ আল-আসমাই। তিনি অন দি হর্স, অন দি ক্যামেল, অন দি ওয়াইল্ড অ্যানিম্যালস, অন দি প্ল্যান্টস এণ্ড ট্রীজ, অন দি ভাইন এণ্ড পাম টি এবং অন দি মেকিং অব ম্যান শিরোনামে গ্রন্থ রচনা করেন। অন্যান্য কয়েকজন লেখকও অনুরূপ গ্রন্থ রচনা করেন। ইবনে ওয়াহশিয়্যার নাবাটিয়ান এগ্রিকালচার গ্রন্থটি অনেক বিতর্কের সৃষ্টি করে। এতে জীবজন্তু এবং উদ্ভিদ ও সেগুলির চাষ সম্পর্কে কিছু কিছু মূল্যবান তথ্য রয়েছে। এসব বিবরণের সঙ্গে রূপকথা এবং ব্যাবিলনীয় ও অন্যান্য সেমিটিক সূত্রের জাল অনুবাদ যুক্ত করা হয়েছে। বাইযেন্টাইন পণ্ডিত ক্যাসিয়ানাস ব্যাসাসের কৃষি সংক্রান্ত রচনার প্রাচীন সিরীয় ভাষার সংস্করণ বিভিন্ন পণ্ডিত আরবীতে অনুবাদ করেন।
অ্যারিস্টটলের সন্দেহজনক রচনা মিনারালজির আরবী সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার পর বহু মুসলিম লেখক বিভিন্ন ধরনের পাথর বিশেষ করে মূল্যবান পাথর সম্পর্কে গ্রন্থ রচনা করেন, যা 'জহুরী' নামে একটি বিশেষ শ্রেণী সৃষ্টি করে। এগুলি পরবর্তীকালে পাশ্চাত্যে অনুবাদ ও অনুকরণ করা হয়। আমরা জাবির থেকে আল-কিন্দী পর্যন্ত যাদের নাম উল্লেখ করেছি তাদের প্রায় সবাই এ ধরনের পুস্তিকা রচনা করেন। আল-কিন্দী এ ছাড়াও অস্ত্রের জন্য লৌহ এবং ইস্পাতের ব্যবহার সম্পর্কে ছোট ছোট বই লেখেন। খলীফা শাসিত সাম্রাজ্যের সঙ্গে তুর্কিস্তান, ভারত, পূর্ব আফ্রিকার উপকূলবর্তী এলাকা প্রভৃতি পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলির ক্রমবর্ধমানভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ফলে দুষ্পাপ্য ও মূল্যবান পাথর এবং সেগুলি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ বৃদ্ধি পায়। পাথরের কোন কোন আধুনিক নাম এখনো আরবী বা পারস্য ভাষার সঙ্গে সেগুলির সম্পর্কের স্বাক্ষর বহন করে। যেমন বিযোর। এমনিভাবে গ্রীকদের কাছে অপরিচিত বহু উদ্ভিদ, ওষুধের উপাদান এবং অন্যান্য জিনিস আমরা পারস্যবাসীদের মাধ্যমে পাই, যেমন সুণ্ডা দ্বীপপুঞ্জের কপূর ও গালাঙ্গন রুট, তিব্বতের মাস্ক, ভারতের ইক্ষু এবং ভারত মহাসাগরের উপকূলের অম্বর। জাবির ইবনে হাইয়ান থেকে পরবর্তীকালে বহু আরবী লেখক চিকিৎসাবিদ ঔষধ-বিজ্ঞান ও বিষ-বিজ্ঞান সম্পর্কে গ্রন্থ রচনা করেন। মুসলিম বিশ্বে ৮ম শতকে চীন থেকে কাগজের প্রচলন হয় এবং ৭৯৪ খৃস্টাব্দে বাগদাদে প্রথম কাগজের কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩. সুবর্ণ যুগ প্রায় ৯০০ থেকে প্রায় ১১০০ পর্যন্ত
অনুবাদের যুগের শেষের দিকে মুসলিম বিশ্বের চিকিৎসাবিদ ও বিজ্ঞানীগণ গ্রীক বিজ্ঞানের একটি সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হয়। ইতিমধ্যে পারস্য ও ভারতীয় চিন্তাধারা এবং অভিজ্ঞতাও তাদের জ্ঞান ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে। তারা গ্রীক বিজ্ঞানীদের রচনা আয়ত্ত করলেও সেগুলি অত্যন্ত মৌলিক ছিল না। তাই এরপর থেকে তাঁরা নিজস্ব সম্পদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার জন্য এবং সেগুলির বিকাশ সাধনের জন্য উদ্যোগী হন।
বিজ্ঞান, বিশেষত চিকিৎসা-বিজ্ঞান খৃস্টান ও সাবিয়ানদের হাত থেকে দ্রুত মুসলমানদের হাতে চলে যায়। তারা অধিকাংশই ছিলেন পারস্যবাসী। চিকিৎসা শাস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রাচীন সূত্রসমূহ থেকে সংকলিত প্যাণ্ডেক্টস এর স্থলে আমরা বিশ্বকোষ আকারের বড় বড় রচনা দেখতে পাই। এগুলিতে পূর্ববর্তী যুগসমূহের জ্ঞান অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে শ্রেণীবিন্যাস করে আধুনিক জ্ঞানের পাশাপাশি সন্নিবেশিত করা হয়েছে।
এই নতুন যুগের প্রথম এবং নিশ্চিতভাবে শ্রেষ্ঠতম লেখক হচ্ছেন আররাযী, তিনি ল্যাটিন পাশ্চাত্যে 'রাযেস' নামে পরিচিত। পারস্যবাসী মুসলমান রাযী আধুনিক তেহরানের নিকটবর্তী রাই শহরে জন্মগ্রহণ করেন। রাযী নিঃসন্দেহে মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম এবং সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিদ ছিলেন। তিনি বাগদাদে হুনাইন ইবনে ইসহাকের জনৈক শিষ্যের কাছে শিক্ষা লাভ করেন। এই শিক্ষক গ্রীক, পারস্য ও ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তরুণ বয়সে রাযী আলকেমী চর্চা করেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর খ্যাতি যখন পশ্চিম এশিয়ার সকল অঞ্চলের শিষ্য ও রোগী আকর্ষণ করে তখন তিনি একান্তভাবে চিকিৎসাশাস্ত্রে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর জ্ঞান ছিল সর্বব্যাপক এবং বৈজ্ঞানিক অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি ২০০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেন, যার অর্ধেক চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত।
রাযীর চিকিৎসা বিষয়ক রচনার মধ্যে ক্ষণস্থায়ী বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বহু সংক্ষিপ্ত রচনা ছিল। অধিকাংশ পাঠকের কাছে কিছুটা নিরস মনে হলেও এগুলির শিরোনামে মানব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়েছে। হালকা রচনাগুলির মধ্যে রয়েছে দক্ষ চিকিৎসকরাও যে সকল রোগ নিরাময় করতে পারেন না সে বিষয় সম্পর্কে; সন্ত্রস্ত রোগীরা কেন দক্ষ চিকিৎসকদেরও সহজে ছেড়ে যায়; জনসাধারণ কেন দক্ষ চিকিৎসকদের চাইতে হাতুড়ে বাকপটু চিকিৎসকদের বেশি পছন্দ করে; শিক্ষিত চিকিৎসকদের চাইতে মূর্খ চিকিৎসক, সাধারণ লোক এবং মেয়েরা কেন বেশি সাফল্য লাভ করেছে। অন্যান্য সংক্ষিপ্ত রচনায় তিনি পৃথক পৃথক রোগের বিষয় আলোচনা করেছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ পিত্তাশয় ও মূত্রাশয়ের পাথর সংক্রান্ত রোগ। এই দুটি রোগই নিকটপ্রাচ্যে অত্যন্ত সাধারণ ছিল। শব ব্যবচ্ছেদ সম্পর্কেও তিনি গ্রন্থ রচনা করেন। রাযীর সবচাইতে বিখ্যাত রচনা হচ্ছে বসন্ত ও হাম রোগ প্রসঙ্গে। এটি প্রথম দিকে ল্যাটিন ভাষায় এবং পরবর্তীকালে ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। ১৪৯৮ খৃ. থেকে ১৮৬৬ খৃ. পর্যন্ত ৪০ বারেরও বেশি এই বইটি মুদ্রিত হয়। এতে উপরোক্ত দুটি রোগ সম্পর্কে সর্বপ্রথম সুস্পষ্ট বিবরণ দেওয়া হয়েছে। একটি উদ্ধৃতি থেকে মূল রচনার পর্যবেক্ষণমূলক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়।
"বসন্তরোগ দেখা দেওয়ার আগে ক্রমাগত জ্বর হয়। পিঠে ব্যথা হয়, নাক চুলকায় এবং ঘুমের মধ্যে শরীর কাঁপে। এই রোগ দেখা দেওয়ার প্রধান লক্ষণগুলি হচ্ছে : জ্বরসহ পিঠ ব্যথা, সমস্ত শরীরে কাঁটা ফোটার ন্যায় ব্যথা, মুখে রক্ত সঞ্চার, সময় সময় সঙ্কোচন, চোখেমুখে লালের আভা, শরীরে খিঁচুনিভাব, মাংস শিহরণ, শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্ট ও কাশিসহ গলা ও বুকে ব্যথা, মুখের ভিতর শুকিয়ে যাওয়া, গাঢ় লালা নির্গমন, কণ্ঠস্বরে কর্কশতা, মাথা ধরা ও ঝিমঝিম করা, উত্তেজনা, উদ্বেগ, বমির উদ্রেক এবং অস্থিরতা। বসন্তের চাইতে হামের ক্ষেত্রে উত্তেজনা, বমির উদ্রেক ও অস্থিরতা বেশি প্রকাশ পায়। আবার হামের চাইতে বসন্তে পিঠ ব্যথা বেশি হয়।"
গুটি বসন্ত পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার পর রাযী গুটিগুলির কিভাবে চিকিৎসা করতে হবে তার সুষ্ঠু ও বিস্তারিত পরামর্শ দেন। প্রাচ্যে এখনো সাধারণত এই রোগে গুটিগুলির দরুনই শরীরে দাগ থেকে যায়।
রাযীর বৃহত্তম চিকিৎসা গ্রন্থ এবং সম্ভবত কোন চিকিৎসাবিদ কর্তৃক কখনো লিখিত সব চাইতে বিস্তারিত গ্রন্থটি হচ্ছে আল-হাওউই, অর্থাৎ 'পূণাঙ্গ বই'। এতে গ্রীক, প্রাচীন সিরীয় ও প্রাচীন আরবের চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যাবলী সামগ্রিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। রাযী আজীবন চিকিৎসা সংক্রান্ত যেসব বই পড়েছেন সেগুলি থেকে প্রয়োজনীয় উদ্ধৃতি সংগ্রহ করেছেন এবং সেই সঙ্গে চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে তাঁর সামগ্রিক অভিজ্ঞতাও একত্র করেছেন। জীবনের শেষ বছরগুলিতে এগুলির সংমিশ্রণেই তিনি এই বিশাল গ্রন্থ রচনা করেন। আরবী জীবনী গ্রন্থগুলি এ সম্পর্কে একমত যে, তিনি তাঁর এই রচনা সমাপ্ত করতে পারেননি। মৃত্যুর পর তাঁর শিষ্যরাই এই রচনা সম্পন্ন করেন। হাওউই ২০টিরও বেশি খণ্ডে বিভক্ত ছিল। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ১০টির মতো খণ্ড পাওয়া যায় এবং এগুলির ৮-১০টি সাধারণ গ্রন্থাগারে বিচ্ছিন্নভাবে রয়েছে। রাযীর মৃত্যুর অর্ধশতাব্দী পরে কেবল দুটি পূর্ণাঙ্গ কপির কথা জানা যায়। কিন্তু আমি আনুমানিক ১০৭০ খৃস্টাব্দে লিখিত 'বখত ঈশু' বংশের জনৈক চক্ষু বিশেষজ্ঞের একটি গ্রন্থে এরূপ মন্তব্য দেখতে পাই যে, তিনি হাওউইর চক্ষু চিকিৎসা সংক্রান্ত পাঁচটি কপি পর্যালোচনা করেছেন। প্রত্যেক রোগের ক্ষেত্রে রাযী প্রথমে সমস্ত গ্রীক, সিরীয়, আরব, পারস্য ও ভারতীয় লেখকদের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন এবং শেষের দিকে নিজস্ব মতবাদ ও অভিজ্ঞতা প্রদান করেন। তিনি চিকিৎসা ক্ষেত্রে তাঁর গভীর পর্যবেক্ষণমূলক বহু উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্তও তুলে ধরেন।
আনজু রাজ বংশের প্রথম চার্লসের পৃষ্ঠপোষকতায় জিরজেন্টির সিসিলীয় ইহুদী চিকিৎসাবিদ ফারাজ ইবনে সালিম ল্যাটিন ভাষায় হাওউই অনুবাদ করেন। তিনি এই বিশাল দায়িত্ব ১২৭৯ খৃস্টাব্দে সমাপ্ত করেন। তিনি আল হাওউই শিরোনামটি কন্টিনেন্স এ পরিবর্তন করেন। অতঃপর লাইবার কন্টিনেন্স নামে রাযীর এই বৃহত্তম রচনাটি পরবর্তী শতকসমূহে অসংখ্য পাণ্ডুলিপি আকারে প্রচারিত হয়। ১৪৮৬ খৃস্টাব্দ থেকে এটি বার বার মুদ্রিত হয়। ১৫৪২ খৃস্টাব্দের মধ্যে এই বিশাল ও মূল্যবান রচনাটির পাঁচটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এ ছাড়াও এর বিভিন্ন অংশের বহু সংস্করণ প্রকাশিত হয়। তাই ইউরোপীয় চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর প্রভাব অসামান্য।
চিকিৎসাশাস্ত্র ছাড়াও রাযী ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, অঙ্কশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা এবং প্রকৃতি বিজ্ঞানের ওপর গ্রন্থ রচনা করেন। সর্বশেষ বিষয়ে বস্তু, স্থান, সময়, গতি, পুষ্টি, বৃদ্ধি, পচন, আবহাওয়াতত্ত্ব, আলোক বিজ্ঞান ও আলকেমী সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। রাযীর আলকেমী সংক্রান্ত রচনার গুরুত্ব মাত্র কিছুকাল আগে থেকে জানা যায়। তাঁর বিখ্যাত বুক অব দি আর্ট গ্রন্থটি সাম্প্রতিককালে জনৈক ভারতীয় রাজার লাইব্রেরীতে আবিষ্কৃত হয়েছে। আংশিকভাবে জাবিরের ন্যায় একই সূত্রসমূহের ওপর নির্ভরশীল হলেও উপাদানসমূহের সঠিক শ্রেণীবিন্যাস এবং রাসায়নিক পদ্ধতি ও সরঞ্জামের সুস্পষ্ট বর্ণনায় রাযী জাবিরকে ছাড়িয়ে যান। তাঁর বর্ণনায় আধ্যাত্মিকতার কোন প্রভাব নেই। জাবির এবং অন্যান্য আরব আলকেমী বিশেষজ্ঞগণ যেখানে খনিজ পদার্থকে 'বডীজ' বা 'দেহ' (স্বর্ণ রৌপ্য ইত্যাদি), 'সোল' বা 'সার' (গন্ধক, আর্সেনিক ইত্যাদি) এবং 'স্পীরিট্স' বা 'চেতনা' (পারদ, স্যাল অ্যামোনিয়াক ইত্যাদি), এই তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন সেখানে রাযী আলকেমীর উপাদানগুলিকে উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা খনিজ পদার্থে শ্রেণী বিন্যাস করেছেন। এই ধারণাটি তাঁর কাছ থেকেই আধুনিককালে প্রবর্তিত হয়। ধাতব পদার্থের শ্রেণীকে তিনি সার, দেহ, পাথর, ভিট্রিয়লস, সোহাগা ও লবণের পর্যায়ে পুনরায় শ্রেণী বিন্যাস করেছেন। তিনি পরিবর্তনশীল 'দেহ' ও অপরিবর্তনীয় 'সার'-এর মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে গন্ধক, পারদ, আর্সেনিক ও সালমিয়াককে শেষোক্ত পর্যায়ভুক্ত করেছেন।
পাশ্চাত্যে আইজাক জুডিয়াস নামে পরিচিত একজন বিশিষ্ট লেখক রাযীর সমসাময়িক ছিলেন। এই মিসরীয় ইহুদী তিউনিসিয়ার কাইরওয়ানের ফাতিমীয় শাসকদের চিকিৎসক ছিলেন। যাঁদের রচনা সর্বপ্রথম ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয় তিনি তাঁদের অন্যতম। আফ্রিকান কনস্ট্যান্টাইন ১০৮০ খৃস্টাব্দের দিকে এই দায়িত্ব সম্পাদন করেন। এই রচনা পাশ্চাত্যের মধ্যযুগীয় চিকিৎসাশাস্ত্রে অনেক প্রভাব সৃষ্টি করে এবং সপ্তদশ শতকেও এটি পঠিত হয়। রবার্ট বার্টন তাঁর অ্যানাটমি অব মেল্যাঙ্কলী গ্রন্থে এখান থেকে অবাধে উদ্ধৃতি দেন। আইজাকের অন ফিভার্স, অন দি ইলিমেন্টস, অন সিম্পল ড্রাগস এণ্ড অ্যালিমেন্টস শিরোনামের গ্রন্থগুলি এবং সর্বোপরি তাঁর প্রস্রাব সংক্রান্ত গ্রন্থটি বহু শতাব্দী পর্যন্ত চিকিৎসাশাস্ত্রে প্রাধান্য বজায় রাখে। কেবলমাত্র একটি হিব্রু অনুবাদের মাধ্যমে প্রাপ্ত চিকিৎসকদের পথপ্রদর্শক শিরোনামে তাঁর একটি ক্ষুদ্র পুস্তিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এতে চিকিৎসা পেশার উন্নত নৈতিক আদর্শ তুলে ধরা হয়েছে।
এই রচনার কোন কোন সারগর্ভ উক্তি প্রণিধানযোগ্য : "কোন চিকিৎসক দুঃসময়ের শিকার হলে নিন্দা করার জন্য তোমার মুখ খুলো না, কারণ প্রত্যেকেরই নিজস্ব সময় আছে।" "তোমার নিজস্ব দক্ষতাই তোমাকে গৌরবান্বিত করুক" "অন্যের অপমানের মধ্যে সম্মান প্রত্যাশা করো না।" "গরীবের কাছে গিয়ে তার চিকিৎসা করাকে অবহেলা করো না, কারণ এর চাইতে মহৎ কাজ আর কিছু নেই।" "রোগীকে নিরাময়ের আশ্বাস দিয়ে আশ্বস্ত করো, কারণ তুমি যদি নিশ্চিত নাও হও এতে তুমি তার স্বাভাবিক শক্তি সঞ্চয়ে সাহায্য করবে।" প্রাচ্যের রোগীদের সঙ্গে আচরণের ব্যাপারে একটি বাস্তব উপদেশ অপরূপ : "অসুস্থতা যখন বৃদ্ধি পেতে থাকবে কিংবা চরম পর্যায়ে পৌঁছবে তখন তোমার পারিশ্রমিক চাইবে, কারণ সুস্থ হওয়ার পর তুমি তার জন্য যা করেছ সে তা অবশ্যই ভুলে যাবে?"
আইজাকের সব চাইতে বিশিষ্ট শিষ্য ছিলেন ইবনে আল-জাযযার নামক জনৈক মুসলমান। তাঁর প্রধান রচনা মুসাফিরের পাথেয় প্রথম দিকেই ল্যাটিন, প্রভেন্সাল ও হিব্রু ভাষায় অনূদিত হয়। আভ্যন্তরীণ রোগসমূহের উত্তম বিবরণী সম্বলিত এই রচনাটি মধ্যযুগীয় চিকিৎসকদের অত্যন্ত প্রিয়। কিন্তু এর অনুবাদক কনস্ট্যান্টাইন প্রকৃত গ্রন্থকারের স্থলে নিজের নামেই এটি প্রচার করেন।
আলকেমী সংক্রান্ত যেসব রচনার সঙ্গে জাবিরের নাম জড়িত তা দীর্ঘকাল পর্যন্ত পণ্ডিতদের কাছে একটি হেঁয়ালী ছিল। এই জাবির ও অষ্টম শতকের অধ্যাত্মবাদী জাবির যদি একই ব্যক্তি হন, তাহলে তিনি কিভাবে তখনো পর্যন্ত আয়ত্তের বাইরে আলকেমী সংক্রান্ত গ্রীক রচনার জ্ঞান লাভ করেন তা উপলব্ধি করা দুঃসাধ্য। অবশ্য আগেই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, বর্তমানে এরূপ প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, জাবিরের নামযুক্ত রচনাবলী দশম শতকের প্রথম দিকে প্রকাশিত হয়েছে। মনে হয় এগুলি ব্রিদরেন অব পিউরিটি জাতীয় কোন গোপন সংস্থার কারসাজি। জাবিরের চিকিৎসা সংক্রান্ত রচনায় গ্রীক গ্রন্থকারদের কেবল উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর রচনা পদ্ধতির সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক নেই এবং এতে জ্ঞানচর্চার একটি পৃথক ধারা সুস্পষ্ট। সিরীয় ও ভারতীয় ঔষধের নাম কদাচিৎ ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু পারস্য ভাষার বিভিন্ন অর্থবোধক শব্দ প্রচুর। তাই আমরা ধরে নিতে পারি যে, এই বিশেষ গ্রন্থটিতে গ্রীক বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং পারস্যের ঔষধ ও বিষ সংক্রান্ত বাস্তব জ্ঞানের সংমিশ্রণ ঘটেছে। যাই হোক এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, এটি প্রাক মুসলিম ও মুসলিম যুগের বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের একটি সুদীর্ঘ ধারার সর্বশেষ যোগসূত্র।
জাবির আরব আলকেমীর জনক হিসাবে বিশ্ব বিখ্যাত। সাধারণত বলা হয়ে থাকে যে, আল-কিমিয়া শব্দটি মিসরীয় কাম-ইট বা কিম-ইট থেকে উদ্ভূত। কারো কারো মতে এটি গ্রীক কিমা থেকে উদ্ভূত। মিসরীয় ও গ্রীক পণ্ডিতদের প্রতিষ্ঠিত মতামত অনুযায়ী এই 'বিজ্ঞানের' মৌলিক বক্তব্য বিষয়গুলি হচ্ছে (ক) সব ধাতুই বাস্তবে এক, তাই শেষ পর্যন্ত একটিকে আরেকটিতে রূপান্তরিত করা সম্ভব; (খ) স্বর্ণ 'সব চাইতে খাঁটি' ধাতু এবং তার পরেই হচ্ছে রৌপ্য; এবং (গ) এমন একটি উপাদান রয়েছে যা অব্যাহতভাবে নিকৃষ্ট ধাতুকে খাঁটি ধাতুতে পরিবর্তিত করতে সক্ষম। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উদ্বুদ্ধ করার ব্যাপারে এ সব ধারণার একটি মূল্যবান তাৎপর্য থাকলেও দুর্ভাগ্যবশত এতে অতিরিক্ত কল্পনার একটি প্রবণতাও রয়েছে। তাছাড়া গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্র আলেকজান্দ্রিয়ায় এবং বস্তুত মুসলিম সাম্রাজ্যের সর্বত্র নস্টিক ও নিওপ্লাটোনিক মতবাদ থেকে এমন কতিপয় আধ্যাত্মিক প্রবণতার উদ্ভব হয় যা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মনোভাবের ওপর অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। আলকেমী জাবিরের হাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক গবেষণার বিষয় ছিল। কিন্তু এর মধ্যে উদ্ভট কল্পনা ও কুসংস্কারমূলক চর্চার এমন একটি প্রবণতা দেখা দেয় যাতে এটি প্রতারণামূলক কার্যকলাপেও পরিণত হয়।
আলকেমীর ওপর জাবিরের প্রায় ১০০টি গ্রন্থ রয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলি কুসংস্কারের বিভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ। কিন্তু অন্যান্য রচনা থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, লেখক পরীক্ষা-নিরীক্ষার গুরুত্বকে পূর্ববর্তী রসায়নবিদদের তুলনায় অধিকতর সুস্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন এবং তা অধিকতর সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তাই এ বিষয়ে মতবাদ ও চর্চার ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করেন। ইউরোপীয় আলকেমী ও রসায়ন শাস্ত্রের সমগ্র ঐতিহাসিক ধারায় তাঁর প্রভাব সুস্পষ্ট।
ব্যবহারিক ক্ষেত্রে জাবির বাষ্পীয়করণ, পরিস্রাবণ, ঊর্ধ্বপাতন, গলিতকরণ, পরিশ্রুতকরণ এবং স্বচ্ছকরণের উন্নত পদ্ধতিসমূহ বর্ণনা করেন। তিনি বহু রাসায়নিক উপাদান তৈরির পদ্ধতিও বর্ণনা করেন, যেমন হিঙ্গুল, আর্সেনিয়াস অক্সাইড প্রভৃতি। কিভাবে প্রায় খাঁটি গন্ধক দ্রাবক ফিটকিরি, ক্ষার, সাল-অ্যামোনিয়াক ও সল্টপিটার পাওয়া যেতে পারে এবং ক্ষারের সঙ্গে গন্ধক মিশিয়ে তাপ প্রয়োগের মাধ্যমে গন্ধকের তথাকথিত 'লিভার' 'মিল্ক' তৈরি করতে হবে ইত্যাদি বিষয় তিনি জানতেন। তিনি যথেষ্ট খাঁটি মারকিউরী অক্সাইড ও সাবলিমেট এবং সীসা ও অন্যান্য ধাতুর অ্যাসিটেট তৈরি করেন এবং কখনো কখনো এ গুলিকে স্বচ্ছ করেন। তিনি অশোধিত সালফিউরিক ও নাইট্রিক এসিড তৈরির এবং এ দুটির সংমিশ্রণে রাজকীয় পানি মিক্সচারের সাহায্যে সোনা ও রূপা দ্রবণের ব্যাপারে অবগত ছিলেন।
জাবিরের আরবী রচনা থেকে বেশ কয়েকটি পরিভাষামূলক শব্দ ল্যাটিন ভাষার মাধ্যমে ইউরোপীয় ভাষাসমূহে প্রচলিত হয়েছে যেমন রিয়ালগার, তুতিয়া, আলকালী, অ্যান্টিমনি এবং ডিস্টিলেশন যন্ত্রের যথাক্রমে উপরিভাগে ও নিম্নভাগে ব্যবহৃত আল-আণবিক ও আল-উল্লি। জাবিরের রচনায় গ্রীকদের নিকট পরিচিত একটি নতুন রাসায়নিক পদার্থ সাল অ্যামোনিয়াক-এর উল্লেখ রয়েছে। গ্রীকদের অ্যামোনিয়াকন হচ্ছে খনিজ লবণ। মনে হয় একটি নতুন ধরনের লবণের ক্ষেত্রে প্রয়োগের জন্য সিরীয়রা প্রাচীন নামটির পরিবর্তন সাধন করেছেন।
জাবিরের রসায়ন সংক্রান্ত বিপুল রচনা বিশেষত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ বুক অব দি সেভেন্টি প্রকাশিত হওয়ার পরই রসায়ন শাস্ত্রে তার প্রতিভার পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পাওয়া যাবে। ৭০টি নিবন্ধ সম্বলিত এই রচনা কিছুকাল আগ পর্যন্ত কেবল একটি নিকৃষ্ট ও অসমাপ্ত ল্যাটিন অনুবাদের মাধ্যমে পরিচিত ছিল। এই নিবন্ধকারের তাঁর প্রায় পূর্ণাঙ্গ মূল আরবী রচনা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে।
রসায়ন সংক্রান্ত যেসব রচনার সঙ্গে জাবিরের নাম যুক্ত হয়েছে সেগুলি অচিরেই ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। ১১৪৪ খৃষ্টাব্দে রবার্ট অব চেস্টার নামক জনৈক ইংরেজ বুক অব দি কম্পজিশন অব আলকেমী শিরোনামে এ ধরনের প্রথম অনুবাদ সম্পন্ন করেন। ল্যাটিন ভাষায় বুক অব দি সেভেন্টির অনুবাদ ক্রিমোনার জিরার্ড এর অন্যতম কৃতিত্ব। ইংরেজী অনুবাদক রিচার্ড রাসেল সান অব পারফেকশন গ্রন্থটি মূলত জাবিরের রচনা বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি তাঁকে 'সব চাইতে বিখ্যাত আরব যুবরাজ ও দার্শনিক জেবের' হিসাবে উল্লেখ করেন। সম্প্রতি ডঃ ই জে হোমইয়ার্ডের রচনা থেকে ল্যাটিন লেখকদের 'জেবের' ও আরব আলকেমী বিশেষজ্ঞ জাবের যে একই ব্যক্তি তার স্বপক্ষে বহু প্রমাণ পাওয়া গেছে।
খলীফা শাসিত প্রাচ্য এলাকায়ও একদল বিশিষ্ট চিকিৎসাবিদের আবির্ভাব ঘটে। এঁদের মধ্যে আমরা প্রথমেই ল্যাটিন লেখকদের কাছে আলী আব্বাস নামে পরিচিত একজন পারস্যবাসী মুসলিম চিকিৎসাবিদদের প্রসঙ্গ আলোচনা করবো। তিনি সামগ্রিক চিকিৎসাশাস্ত্র শিরোনামে একটি অপরূপ ও সুসংবদ্ধ বিশ্বকোষ রচনা করেন। ল্যাটিন লেখকদের কাছে এটি লাইবার রিজিয়াস নামেও পরিচিত। এতে চিকিৎসাশাস্ত্রের তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক উভয় দিকই তুলে ধরা হয়েছে। চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত গ্রীক ও আরবী রচনাবলীর সমালোচনা সম্বলিত একটি চমকপ্রদ অধ্যায়ের মাধ্যমে রচনাটির সূচনা করা হয়। প্রথমদিকে গ্রন্থটি দুবার ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে বিশ্ববিখ্যাত ইবনে সিনার ক্যানন এটির স্থলাভিষিক্ত হয়।
বিশ্বজনীনভাবে পাশ্চাত্যে আভিসিনা নামে পরিচিত আবু 'আলী আল-হুসাইন ইবনে সিনা মুসলিম বিশ্বের মহাজ্ঞানী পণ্ডিতদের অন্যতম। কিন্তু তিনি দার্শনিক ও পদার্থ বিজ্ঞানী হিসাবে যতোটা খ্যাতি লাভ করেন, চিকিৎসাবিদ হিসাবে ততটা খ্যাত ছিলেন না। এতদসত্ত্বেও ইউরোপীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর বিপুল প্রভাব ছিল। ইবনে সিনা তাঁর বিশাল ক্যানন অব মেডিসিন গ্রন্থে গ্রীক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সঙ্গে আরব অবদানের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। এটি আরব চিকিৎসা বিজ্ঞানের সুসংবদ্ধ চূড়ান্ত রূপ এবং শ্রেষ্ঠ রচনা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই বিশ্বকোষ সাধারণ চিকিৎসা, সহজ ওষুধপত্র, মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেহের সকল অংশের রোগ, বিশেষ রোগনিরূপণ ব্যবস্থা এবং ওষুধ প্রস্তুত প্রণালী তুলে ধরা হয়েছে।
ক্যাননে শ্রেণীবিন্যাসের যে পদ্ধতি অনুসৃত হয়েছে তা অত্যন্ত জটিল। পরবর্তীকালে পাশ্চাত্য চিকিৎসা চর্চায় উপশ্রেণী সৃষ্টির যে বাতিক দেখা দেয় তার জন্য এই পদ্ধতি অংশত দায়ী। ক্রিমোনার জিরার্ড দ্বাদশ শতকে ল্যাটিন ভাষায় গ্রন্থটি অনুবাদ করেন এবং তাঁর অনূদিত অসংখ্য পাণ্ডুলিপি আকারে পাওয়া যায়। এর চাহিদা কত ব্যাপক ছিল নিম্নোক্ত তথ্য থেকে তা বোঝা যায়। পঞ্চদশ শতকের শেষ ত্রিশ বছরে এটি ১৬ বার প্রকাশিত হয় এবং তার মধ্যে ১৫টি সংস্করণ ল্যাটিন ভাষায় এবং একটি হিব্রু ভাষায়। ষোড়শ শতকে এটি ২০ বারেরও বেশি পুনঃপ্রকাশিত হয়। গ্রন্থটির বিভিন্ন অংশের যেসব সংস্করণ বেরিয়েছে সেগুলি এই হিসাবে ধরা হয়নি। ল্যাটিন হিব্রু ও বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় পাণ্ডুলিপি আকারে ও মুদ্রিতভাবে যেসব ভাষ্য প্রকাশিত হয়েছে তা অসংখ্য। সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত এটি ব্যাপকভাবে মুদ্রিত ও পঠিত হয়। চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত আর কোন রচনা সম্ভবত এতোবেশি পঠিত হয়নি। প্রাচ্যে এখনো এটি প্রচলিত।
চিকিৎসাশাস্ত্রের ওপর ইবনে সিনার আরো প্রায় পনেরটি রচনার বিষয় জানা যায়। এই সঙ্গে তিনি ধর্মতত্ত্ব, মেটাফিজিক্স, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভাষাতত্ত্বের ওপর একশটির মতো গ্রন্থ রচনা করেছেন। পারস্য ভাষায় কতিপয় কবিতা ছাড়া এর প্রায় সবগুলিই আরবীতে লিখিত। দশম শতকে পারস্য ভাষা নতুনভাবে গুরুত্ব লাভ করে। 'যুবরাজ ও চিকিৎসাবিদদের নায়ক' ইবনে সিনার হাতে মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রাচ্যে তার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে। পশ্চিম পারস্যের হামাদানে এই মহান চিকিৎসাবিদ ও দার্শনিকের মাজারে এখনো পর্যন্ত বহু ভক্তের সমাবেশ ঘটে।
প্রাচ্যের মুসলিম বিশ্ব যখন চিকিৎসা শাস্ত্রে ধীরে ধীরে প্রাধান্য অর্জন করতে থাকে তখন মুসলিম পাশ্চাত্যও এই বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্র হিসাবে বিকাশ লাভ করে। স্পেনে কর্ডোভার খলীফা তৃতীয় আবদুর রহমান ও দ্বিতীয় আল-হাকামের গৌরবোজ্জ্বল রাজত্বকালে হাসদাই বিন সাফরুত নামক জনৈক ইহুদী একই সময়ে মন্ত্রী, রাজ দরবারের চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি তরুণ বয়সে, সন্ন্যাসী নিকোলাসের সহায়তায় ডায়োসকিউরাইডসের মেটিরিয়া মেডিকার অপরূপ পাণ্ডুলিপি আরবীতে অনুবাদ করেন। এটি বাইযেন্টাইন সম্রাট সপ্তম কনস্ট্যান্টাইনের কাছ থেকে কূটনৈতিক উপহার হিসাবে প্রেরিত হয়। পরবর্তীকালে রাজদরবারের চিকিৎসক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস লেখক ইবনে জুলজুল এই অনুবাদটি সংশোধন করেন এবং এর ওপর একটি ভাষ্য রচনা করেন।
ল্যাটিন লেখকদের কাছে আবুল কাসিম নামে পরিচিত মুসলিম লেখকও কর্ডোভায় রাজ দরবারের চিকিৎসক ছিলেন। তিনি ৩০টি অধ্যায়ে বিভক্ত আত-তাসরিফ নামে পরিচিত একটি বিরাট গ্রন্থ রচনা করেন। সর্বশেষ অধ্যায়ে তিনি অস্ত্রোপচার সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এর আগে পর্যন্ত বিষয়টি মুসলিম লেখকদের কাছে উপেক্ষিত ছিল। আবুল কাসিমের শল্যচিকিৎসা বিষয়ক নিবন্ধটি প্রধানত পল অব ইজিনার ষষ্ঠ গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে রচিত হলেও তিনি এতে বহু বিষয় সংযোজিত করেছেন। তাঁর রচনায় বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জামের চিত্র সন্নিবেশিত হয়েছে। এটি অন্যান্য আরব লেখককে প্রভাবিত করে এবং বিশেষ করে ইউরোপ শল্যচিকিৎসার ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে। এটি প্রথম দিকে ল্যাটিন, প্রভেন্সাল ও হিব্রু ভাষায় অনূদিত হয়। বিখ্যাত ফরাসী শল্যচিকিৎসক গাই দ্য চৌলিয়াক তাঁর অন্যতম রচনায় ল্যাটিন অনুবাদটি পরিশিষ্ট হিসাবে প্রদান করেন।
একাদশ শতকে মিসর, সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়ায় ব্যাপকভাবে চিকিৎসা-বিজ্ঞান চর্চা হয়। ল্যাটিন লেখকদের কাছে হ্যালি রোডোয়াম নামে পরিচিত কায়রোর আলী ইবনে রিদওয়ান মিসরের চিকিৎসা-বিজ্ঞান চর্চার একটি সুন্দর বিবরণী তৈরি করেন। তিনি গ্যালেন ও গ্রীক লেখকদের অনুসারী ছিলেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, প্রাচীনদের রচনাবলী পর্যালোচনার মাধ্যমেই ভালো চিকিৎসাবিদ হওয়া যায়। এই মতবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁর সমসাময়িক বাগদাদের ইবনে বুতলান এক সুদীর্ঘ ও প্রচণ্ড বিতর্কের সূচনা করেন। গ্যালেনের আর্স-পার্ভা সম্পর্কে ইবনে রিদওয়ানের ভাষ্য এবং ইবনে বুতলানের সিনপটিক ট্যাবলস অব মেডিসিন নামক জ্ঞানদীপ্ত রচনা ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়।
মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই যুগের আলোচনা সমাপ্ত করার আগে অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আরো কতিপয় রচনা সম্পর্কেও আমাদের আলোচনা করা দরকার। যেসব সহজ ঔষধপত্র বড় বড় বিশ্বকোষে স্থান পেয়েছে এবং অন্য লেখকরা যেগুলি সম্পর্কে বিষয়ভিত্তিক পৃথক পৃথক গ্রন্থ রচনা করেছেন প্রথমে এসব রচনার বিষয় আলোচনা করা যাক। এসব নিবন্ধ এখনো প্রাচ্যে অত্যন্ত সমাদৃত। পারস্যের হেরাতের অধিবাসী আবু মানসুর মুওয়াফফাক পারস্য ভাষায় ৯৭৫টি ঔষধের বর্ণনা দিয়েছেন। ওষুধের গুণাগুণের ভিত্তি গ্রন্থে ৫৮৫টি ঔষধের বর্ণনা রয়েছে। গ্রীক ও প্রাচীন সিরীয় তথ্য ছাড়াও এতে ঔষধ সংক্রান্ত আরব, পারস্য এবং ভারতীয় তথ্যও সন্নিবেশিত হয়েছে। তাছাড়া এটি আধুনিক পারস্য গদ্যের প্রথম কীর্তি-স্তম্ভ। আরবী ভাষায়ও একই ধরনের বহু গ্রন্থ রয়েছে। এগুলির মধ্যে আমরা বাগদাদ ও কায়রোর মাসাওয়িহ আল মারিদিনী ও স্পেনের ইবনে ওয়াফিদের রচনাসমূহের বিষয় উল্লেখ করতে পারি। তাঁরা উভয়েই তাঁদের রচনার ল্যাটিন অনুবাদের মাধ্যমে অত্যন্ত পরিচিত এবং উভয়ের রচনাই একযোগে ৫০ বারের বেশি মুদ্রিত হয়েছে। ল্যাটিন ভাষায় এই রচনা 'মিসিউ' দি ইয়ংগার কর্তৃক ডি মেডিসিনিস ইউনিভার্সালিবাস এট পার্টিকুলারিবাস শিরোনামে এবং আবেনগিউফি কর্তৃক ডি মেডিকামেন্টিস সিমপ্লিসিবাস শিরোনামে অনূদিত হয়েছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের অপর একটি শাখা চক্ষু চিকিৎসা ১০০০ খৃস্টাব্দের দিকে চূড়ান্ত বিকাশ লাভ করে। ল্যাটিন লেখকদের কাছে জেসু হ্যালি নামে পরিচিত বাগদাদের খৃস্টান চক্ষু চিকিৎসক আলী ইবনে ঈসা ও 'ক্যানামুসালী' নামে পরিচিত মসুলের মুসলিম চক্ষু চিকিৎসক আম্মার এ বিষয়ে দুটি অপরূপ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁরা গ্রীক চক্ষু চিকিৎসা রীতির সঙ্গে বহু নতুন বিষয়, চক্ষু অস্ত্রোপচার সংক্রান্ত নতুন তথ্যাবলী এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সংযোজন করেছেন। উভয় রচনাই ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে ফ্রান্সে চক্ষু চিকিৎসা চর্চার রেনেসাঁর সূত্রপাত না হওয়া পর্যন্ত এই দুটি রচনা চক্ষু রোগের ওপর সর্বোৎকৃষ্ট গ্রন্থ ছিল।
বিজ্ঞানে আমরা আলকেমী চর্চায় রাযী ও জাবিরের অবদানের বিষয় উল্লেখ করেছি। সে যুগের শ্রেষ্ঠতম দুজন মনীষী ইবনে সিনা ও আল বিরুনী দৃঢ়ভাবে এ বিষয়টির বিরোধিতা করেন। অপর দিকে আমরা পাহাড়, পাথর ও খনিজ পদার্থের গঠন সম্পর্কিত একটি রচনার জন্য ইবনে সিনার কাছে ঋণী। এতে ভূকম্পন, বায়ু, জল, তাপমাত্রা, পাললিক গঠন, শুষ্কতা প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হওয়ায় ভূতত্ত্বের ইতিহাসের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।
'গুরু' হিসাবে অভিহিত আবু রায়হান মোহাম্মদ আল-বিরুনী একজন পারস্যবাসী চিকিৎসাবিদ, জ্যোতির্বিদ, অঙ্কশাস্ত্রবিদ, পদার্থ বিজ্ঞানী, ভূগোলবিদ ও ইতিহাসবিদ ছিলেন। মুসলিম বিজ্ঞান চর্চার সুবর্ণ যুগের সঙ্গে বিশ্বব্যাপী খ্যাতিসম্পন্ন যেসব জ্ঞানী পণ্ডিতের নাম জড়িত তিনি তাঁদের মধ্যে সম্ভবত সব চাইতে খ্যাতিমান ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর প্রাচীন জাতিসমূহের কালানুক্রমিক ইতিহাস ভারতীয় বিষয় পর্যালোচনা উৎকৃষ্ট ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে জানা যায়। অঙ্কশাস্ত্র সংক্রান্ত তাঁর অধিকাংশ রচনা এবং অন্যান্য বহু রচনা এখনো প্রকাশিত হয়নি। পদার্থ বিজ্ঞানে তাঁর বৃহত্তম অবদান হচ্ছে, প্রায় সঠিকভাবে ১৮টি মূল্যবান পাথর ও ধাতুর সুনির্দিষ্ট ওজন নিরূপণ। আল-বিরুনীর মণি-মুক্তা সংক্রান্ত অসম্পাদিত একটি বিরাট গ্রন্থ অপরূপ পাণ্ডুলিপি আকারে এসকোরিয়াল লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত আছে। এতে স্বাভাবিক, বাণিজ্যিক ও চিকিৎসার দৃষ্টিকোণ থেকে বিপুল সংখ্যক পাথর ও ধাতুর বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও তিনি ঔষধ বিজ্ঞানের ওপর একটি গ্রন্থ রচনা করেন। ভারতীয় ও চীনা পাথর এবং ঔষধপত্রের উৎস সম্পর্কে তাঁর অসম্পাদিত রচনা থেকে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।
আল মাসুদীকে এক দিক দিয়ে 'আরবদের প্লিনি' বলা যায়। তাঁর মেডোজ অব গোল্ড গ্রন্থে তিনি একটি ভূমিকম্প, মরু সাগরের পানি এবং প্রথম বায়ু চালিত কলের বর্ণনা দিয়েছেন। শেষোক্তটি সম্ভবত মুসলমানদের আবিষ্কার। তিনি বিবর্তনবাদের মূলতত্ত্বসমূহও প্রদান করেন।
দশম শতকে মেসোপটেমিয়ায় প্রতিষ্ঠিত গুপ্ত দার্শনিক সংস্থা 'ব্রিদরেন অব পিউরিটি' ৫২ খণ্ডে একটি বিশ্বকোষ রচনা করে। এর ১৭টি খণ্ডে প্রধানত গ্রীক রীতিতে প্রকৃতি বিজ্ঞান আলোচনা করা হয়েছে। আমরা এতে খনিজ পদার্থের গঠন, ভূকম্পন, জোয়ার ভাটা, আবহাওয়াতত্ত্ব ও বিভিন্ন উপাদানের আলোচনা দেখতে পাই। আকাশ মণ্ডলও সেখানকার বিভিন্ন বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কের আলোকে এসব বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। বাগদাদের গোঁড়া ধর্মীয় নেতারা এই প্রতিষ্ঠানকে ধর্মবিরোধী আখ্যায়িত করা সত্ত্বেও তাঁদের এই রচনা সুদূর স্পেন পর্যন্ত প্রচারিত হয় এবং সেখানে এটি দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারাক প্রভাবিত করে। মুসলিম দেশসমূহে প্রায়ই জল-ঘড়ি তৈরি করা হতো। হারুনুর রশীদের জনৈক রাজকীয় দূত এ ধরনের একটি ঘড়ি শার্লেমেনকে উপহার প্রদান করেন।
জনৈক তুরস্কবাসী মুসলমান বিখ্যাত দার্শনিক আল-ফারাবীর নাম তাঁর সঙ্গীত প্রসঙ্গে গ্রন্থের জন্য অবশ্যই উল্লেখ করা দরকার। এটি সঙ্গীত তত্ত্বের ওপর প্রাচ্যের সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ রচনা। তিনি বিজ্ঞানের শ্রেণী বিন্যাস সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বই লেখেন। শ্রেণী বিন্যাস সংক্রান্ত অনুরূপ দুটি গ্রন্থ পরবর্তীকালে রচিত হয়। এর একটি হচ্ছে বিজ্ঞানের চাবি। মোহাম্মদ আল-খাওয়ারিযমী ৯৭৬ খৃষ্টাব্দে এটি রচনা করেন। অপরটি ইবনে আন-নাদিসের বিখ্যাত রচনা ফিহরিস্ত আল 'উলুম। শেষোক্তটির মাধ্যমে আমরা ইসলামের প্রাথমিক যুগের মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের সম্পর্কে অনেক তথ্য জানতে পারি।
বসরার আবূ আলী আলহাসান ইবনে আল হাইসাম আলোক বিজ্ঞানের চূড়ান্ত বিকাশ সাধন করেন। তিনি কায়রো গিয়ে ফাতিমীয় খলীফা আল হাকিমের অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন। এখানে তিনি নীল নদের বার্ষিক প্লাবন নিয়ন্ত্রণের একটি পদ্ধতি আবিষ্কারে সচেষ্ট হন। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি খলীফার কোপানল থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আত্মগোপন করেন এবং আল হাকিমের মৃত্যু পর্যন্ত পাগলামির ভান করেন। এর মধ্যেও সময় করে তিনি কেবল অঙ্কশাস্ত্র ও পদার্থবিদ্যা-সংক্রান্ত প্রাচীন গ্রন্থাবলীই নকল করেননি, এ সমস্ত বিষয়ে এবং তাঁর মূল পেশা চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে মৌলিকভাবে বহু গ্রন্থও রচনা করেন। তাঁর প্রধান রচনা আলোক-বিজ্ঞান প্রসঙ্গে মূল আরবী রচনা বিলুপ্ত হলেও এর ল্যাটিন অনুবাদ পাওয়া যায়। চক্ষু দৃশ্যমান বস্তুর ওপর দর্শনমূলক আলো বিকিরণ করে--আল-হাইসাম ইউক্লিড ও টলেমীর এই মতবাদের বিরোধিতা করেন। তিনি আলোকরশ্মির প্রক্ষেপণ ও প্রতিফলনের বিভিন্ন কোণের পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ আলো ও বর্ণ এবং দৃষ্টি সংক্রান্ত বিভ্রম ও প্রতিফলনের উদ্ভব প্রক্রিয়া আলোচনা করেন। তাঁর নাম এখনো তথাকথিত 'আল হাযেন'স প্রোব্লেমের' সঙ্গে সংশ্লিষ্ট 'একটি গোলাকার ফাঁপা জিনিসের মধ্যে এরূপ স্থান নির্ধারণের জন্য ব্যবহৃত নলাকার আয়না, যে স্থান থেকে নির্ধারিত অবস্থানের একটি বস্তু নির্ধারিত অবস্থানের একটি চক্ষুর ওপর প্রতিফলিত হবে।' এটি একটি চতুর্ঘাত সমীকরণের সৃষ্টি করে যা আল-হাইসাম একটি পরাবলয়ের মাধ্যমে সমাধান করেন।
আল হায়সাম স্বচ্ছ মাধ্যমের মধ্য দিয়ে আলোকরশ্মির প্রতিসরণ পরীক্ষা করেন। গোলাকার অংশসমূহের সাহায্যে বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনি তাত্ত্বিকভাবে বর্ধনশীল পরকলা আবিষ্কারের প্রায় কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছেন। ৩০০ বছর পর এই জিনিসটি বাস্তবে পরিণত হয় এবং ৬০০ বছরেরও পরে স্নেল ও ডেসকার্টিস এর ওপর ভিত্তি করে সাইন্স বিধি প্রতিষ্ঠা করেন। রজার বেকন এবং আলোক বিজ্ঞানের ওপর পোল ভিটোল্লিয়ো প্রমুখ মধ্যযুগের সকল পাশ্চাত্য লেখক প্রধানত আল হায়সামের অপটিকাই থেসওরাস এর ওপর ভিত্তি করেই তাঁদের গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচনা লিওনার্দো দা ভিনচি এবং জোহান কেপলারকেও প্রভাবিত করে। শেষোক্ত লেখক তাঁর আলোক-বিজ্ঞান সংক্রান্ত মৌলিক রচনার নিম্নোক্ত শিরোনাম প্রদান করেন: অ্যাড ভিটেলিউনেম প্যারালিপমেনা।
প্রাচ্যের লেখকগণ আল-হায়সামের আলোক বিজ্ঞানের ওপর বহু ভাষ্য রচনা করলেও তাঁর অধিকাংশ উত্তরাধিকারী তাঁর দৃষ্টিতত্ত্ব প্রবর্তন করেননি। মুসলিম বিজ্ঞান চর্চার পরবর্তী যুগের চক্ষু চিকিৎসাবিদগণও তা করেননি। অবশ্য আল-বিরুনী ও ইবনে সিনা স্বতন্ত্রভাবে ও পুরোপুরি আল-হায়সামের সঙ্গে একমত হন যে, "চক্ষু থেকে কোন আলোকরশ্মি নিঃসৃত হয় না এবং বস্তুর সংস্পর্শে গিয়ে সেটিকে দৃশ্যমান করে না, বরং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর আকার চক্ষুর মধ্যে প্রবেশ করে এবং এর স্বচ্ছ অবয়বের দ্বারা রূপান্তরিত হয়।"
আল হায়সাম ফিজিক্যাল অপটিক্স সম্পর্কেও কয়েকটি পুস্তিকা লেখেন। এগুলির মধ্যে আলো প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। তিনি আলোকে এক ধরনের আগুন মনে করেন যা পরিমণ্ডলের একটি গোলাকার সীমা পর্যন্ত প্রতিফলিত হয়। অন টোয়াইলাইট ফেনোমেনা গ্রন্থে তিনি হিসাব করে দেখেন যে, এই পরিমণ্ডল ইংরেজী মাইল অনুসারে প্রায় ১০ মাইল উচ্চতাসম্পন্ন। বইটি বর্তমানে কেবল ল্যাটিন ভাষায় পাওয়া যায়। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থে রামধনু, জ্যোতির্মণ্ডল এবং বৃত্তাকার ও অর্ধ-বৃত্তাকার আয়নার বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। এসব গ্রন্থ এবং ছায়া ও গ্রহণ সম্পর্কিত অন্যান্য গ্রন্থ অত্যন্ত উন্নতমানের অঙ্কশাস্ত্রের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। নিজস্ব হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে তিনি ধাতব আয়না তৈরি করেন। এসব রচনার অধিকাংশই আল-হায়সামের জীবনের শেষ ১০ বছরের অবদান। অন দি বার্নিং গ্লাস শিরোনামের মৌলিক পর্যালোচনাটিও এই সময়কার। এতে তিনি এমন একটি ডায়োটিক সৃষ্টি করেন যা গ্রীকদের চাইতে অনেক বেশি উন্নত। এতে প্রতিমূর্তিকে কেন্দ্রীভূত করা, পরিবর্তন করা ও উলটপালট করার এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে গোলাকৃতি ও বর্ণগঠনের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গভীর ও নির্ভুল ধারণা প্রতিফলিত হয়েছে। আল হায়সাম ইউক্লিড ও টলেমীর আলোক বিজ্ঞান সম্পর্কিত রচনা, অ্যারিস্টটলের ফিজিক্স এবং অ্যারিস্টটলীয় প্রবলেম্যাটা সম্পর্কে একটি ভাষ্যও রচনা করেন। তিনি জানালার খড়খড়িতে সুন্দর একটি ছিদ্রের মধ্য দিয়ে বিপরীত দিকের দেওয়ালের ওপর সূর্য গ্রহণের সময় সূর্যের প্রতিমূর্তির অর্ধ চন্দ্রাকার রূপ অবলোকন করেন। এটি ক্যামেরা অবস্কিউরার প্রথম রেকর্ড।
মুসলিম বিজ্ঞানের এই সুবর্ণ যুগে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের বিষয় আলোচনা করা যেতে পারে। প্রথম দিকেই হাসপাতালসমূহ সম্ভবত জুন্দিশাপুরের প্রাচীন ও বিখ্যাত একাডেমী হাসপাতালের আদর্শে প্রতিষ্ঠিত হয়। পারস্য ভাষার বিমারিস্তান শব্দটি হাসপাতালের নাম হিসাবে মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র প্রচলিত হয়। আমরা নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ ধরনের কমপক্ষে ৩৪টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য পেয়েছি। এগুলি পারস্য থেকে মরক্কো পর্যন্ত এবং উত্তর সিরিয়া থেকে মিসর পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কায়রোতে ৮৭২ খৃস্টাব্দে গভর্নর ইবনে তুলুন কর্তৃক প্রথম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। পরবর্তীকালে এখানে আরো হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাগদাদে হারুনুর রশীদের নির্দেশে নবম শতকের সূচনায় প্রথম হাসপাতালের সৃষ্টি করা হয়। একাদশ শতকে ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালের কথা জানা যায়। মুসলিম ঘটনাপঞ্জীসমূহে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক তথ্যসমূহ অত্যন্ত সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এগুলির কেবল বাজেটই নয় চিকিৎসক, চক্ষু চিকিৎসক এবং বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মচারীদের বেতনের বিষয়ও জানা যায়। প্রধান চিকিৎসক ও শল্যচিকিৎসকগণ ছাত্র ও গ্রাজুয়েটদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতেন, তাদের পরীক্ষা গ্রহণ করতেন এবং ডিপ্লোমা প্রদান করতেন। চিকিৎসক, ভেষজ বিশেষজ্ঞ এবং নরসুন্দরদের পরীক্ষা করা হতো। দৃষ্টান্তস্বরূপ, শিশু চিকিৎসকগণ পল অব ইজিনার অ্যানাটমী ও সার্জারী সম্পর্কে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা হতো। হাতেকলমে শিক্ষা প্রদানেরও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। হাসপাতালে পুরুষ ও মহিলাদের জন্য দুটি বিভাগ ছিল। প্রত্যেক বিভাগের নিজস্ব ওয়ার্ড ও ডিসপেন্সারী ছিল। কোন কোন হাসপাতালের নিজস্ব গ্রন্থাগার ছিল। বহু চিকিৎসককে একজন গুরুর অধীনে শিক্ষানবীস হিসাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। এবং এই গুরু প্রায়ই পিতা বা পিতৃব্য ছিলেন। অন্যরা কোন বিখ্যাত চিকিৎসকের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য ভিন্ন দেশে সফরে যেতেন। স্পেনের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, কাডিযে জনৈক চিকিৎসককে সেখানকার গভর্নরের উদ্যোগে নিয়োগ করা হয়। তিনি বিভিন্ন দেশ সফর করে ঔষধ তৈরিতে ব্যবহারের জন্য যেসব দুষ্প্রাপ্য গুল্ম সংগ্রহ করেন উক্ত উদ্যানে সেগুলির চাষ করতেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞান ছাড়া অন্যান্য বিজ্ঞান প্রধানত মসজিদে শিক্ষা দেওয়া হতো। ইসলামের প্রাথমিক যুগে এসব বিষয় উদারভাবে পণ্ডিতদের এখতিয়ারে ছেড়ে দেওয়া হতো। খলীফা, রাজা ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তির দ্বারা একাডেমিক লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠার নজীরও রয়েছে। আরবী ঘটনাপঞ্জীসমূহে এসব প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রচুর তথ্য দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ মসজিদে কেবল ধর্মতাত্ত্বিক গ্রন্থ নয়-দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক গ্রন্থের লাইব্রেরীও ছিল এবং এখনো বহু স্থলে রয়েছে। আমরা ইতিমধ্যেই খলীফা আল মামুন কর্তৃক ৮৩০ খৃষ্টাব্দের দিকে বাগদাদে 'জ্ঞান ভবন' প্রতিষ্ঠার বিষয় উল্লেখ করেছি। তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র আল-মুতাওয়াক্কিল এবং তাঁর দরবারের বহু ওমরাহও একই পথ অনুসরণ করেন। খলীফার বন্ধু ও সচিব আলী ইবনে ইয়াহইয়ার পল্লী ভবনে একটি সুন্দর গ্রন্থাগার ছিল। কায়রোতে ফাতিমীয় খলীফা আল হাকিম ৯৯৫ খৃষ্টাব্দে একটি 'বিজ্ঞান ভবন' প্রতিষ্ঠা করেন। এর সঠিক বাজেট জানা যায়। নিষ্ঠামূলক ধর্মতত্ত্ব প্রাধান্য লাভ করার পর ধর্মদ্রোহিতার বিপদের কথা চিন্তা করে এটি বাতিল করা হয়।
প্রত্যেক সক্ষম মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য হিসাবে মক্কা ও মদীনায় তীর্থ যাত্রা বিজ্ঞান চর্চা প্রসারে সহায়তা করে। ভারত, স্পেন, এশিয়া মাইনর ও আফ্রিকার যেসব জ্ঞানার্থী হজ্জে যেতেন তাঁদের স্বভাবতই বহু দেশ হয়ে যেতে হতো। এসব দেশে তাঁরা বিভিন্ন মসজিদ ও একাডেমী পরিদর্শন করতেন এবং সেখানকার বিখ্যাত পণ্ডিতদের সঙ্গে জ্ঞান চর্চামূলক মতবিনিময় করতেন। এ ছাড়া বিখ্যাত শিক্ষকদের শিক্ষা কোর্স অনুসরণের জন্য বহু শিক্ষার্থী তিউনিস থেকে পারস্য কিংবা কাস্পিয়ান সাগরের উপকূল থেকেও কর্ডোভায় আগমন করতেন। প্রকৃত শিক্ষা প্রদান পদ্ধতি অনেকটা বর্তমানকালের মতোই। অধ্যাপক কোন একটি থামে ঠেস দিয়ে উপবেশন করতেন এবং শিষ্যরা চক্রাকারে তাঁর চারদিকে জড়ো হতেন। প্রাচীনকাল থেকে বিখ্যাত কায়রোর আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশাল হিপোস্টাইল হলের অভ্যন্তরে পর্যটকগণ এখনো এ ধরনের ২০-৩০টি দল দেখতে পারেন। এটি সম্ভবত গ্রীস ও কর্ডোভার শিক্ষা প্রদান প্রণালীর সত্যিকারের চিত্র এখনো অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
৪. পতন যুগ প্রায় ১১০০ থেকে
ইসলামের প্রাথমিক যুগে প্রচলিত ধর্মমতের প্রতি নিষ্ঠা বিজ্ঞানচর্চা সহ্য করলেও আমরা একথা বলতে পারি যে, বিখ্যাত ধর্মীয় গুরু আল-গায্যালীর পর থেকে নির্যাতন এই সহনশীলতার স্থলাভিষিক্ত হয়, "কারণ এগুলি বিশ্ব সৃষ্টি ও স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস নষ্ট করে।" বড় বড় স্বাধীন চিন্তাবিদের আবির্ভাব রোধে এই মনোভাব একমাত্র কারণ না হলেও এদের দমিয়ে রাখার পিছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল, দ্বাদশ শতকে একটি অচলাবস্থা বিরাজ করে। এ সময়ে রাযী, ইবনে সিনা ও জাবিরের রচনাবলী পুনঃপ্রকাশিত হয়। সংক্ষিপ্ত করা হয় এবং এগুলির ওপর ভাষ্য রচনা করা হয়। কিন্তু কোন বিশিষ্ট ও স্বাধীন রচনা কদাচিৎ দেখা যায়। চিকিৎসাবিদদের ক্ষেত্রে ইহুদীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা এবং বিশেষ করে বাগদাদ, কায়রো ও স্পেনের রাজদরবারে ক্রমবর্ধমান হারে তাদের চিকিৎসা বিজ্ঞান চর্চা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এর কারণ, সম্ভবত ইহুদীরা ইসলামের নিষ্ঠামূলক মতবাদের বিধিনিষেধ থেকে তুলনামূলকভাবে মুক্ত ছিল। রাজ দরবারের এরূপ আদর্শস্থানীয় বিশিষ্ট ইহুদী চিকিৎসাবিদ, দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদ ছিলেন মাইমোনাইডস।
তিনি স্পেনে জন্মগ্রহণ করেন এবং কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় কায়রোতে মহান সালাহউদ্দিন ও তাঁর পুত্রদের অধীনে অতিবাহিত করেন। চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা হচ্ছে অ্যাফোরিজম্স। এতে তিনি স্বয়ং গ্যালেনের মতামতের সমালোচনা করেন। দরবারের চিকিৎসক হিসাবে তিনি সুলতানের জন্য স্বাস্থ্য-বিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করেন। এগুলি ইসলামের পরবর্তী শতকসমূহের চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত আদর্শ রচনা। কায়রোর দরবার অন্যভাবে উদার হলেও সেখানে গভীর নিষ্ঠামূলক ধর্মীয় মতবাদের প্রভাব কতখানি ছিল তার প্রমাণ মাইমোনাইডসের একটি পুস্তিকার শেষের দিকে প্রদত্ত ক্ষমা প্রার্থনামূলক বক্তব্য থেকে বোঝা যায়। মনের অবসাদ দূর করার জন্য তিনি সুলতানকে নিষিদ্ধ মদ্যপান ও সঙ্গীত উপভোগের পরামর্শ দেন, আর সে জন্যই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সুলতানের কাছে ক্ষমতা প্রার্থনা করেন।
মাইমোনাইডসের বয়সে তরুণ সমসাময়িক মুসলিম পণ্ডিত আবদুল লতিফ বিখ্যাত জ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য এবং মিসর দেশ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য বাগদাদ থেকে কায়রো সফর করেন এবং এ সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত বিবরণী প্রদান করেন। মিসরের ১২০০ থেকে ১২০২ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত দুর্ভিক্ষ ও ভূমিকম্পের বর্ণনা দেওয়ার পর তিনি কায়রোর উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত একটি প্রাচীন গোরস্থানে তাঁর অস্থিতত্ত্ব বিষয়ক গবেষণার একটি চমৎকার বিবরণী প্রদান করেন। নিম্নের চোয়াল এবং মেরুদণ্ডের নিম্নস্থ অস্থি সম্পর্কে গ্যালেন যে বিবরণ দিয়ে গেছেন তিনি তা পরীক্ষা করে সংশোধন করেন।
এই যুগে ঔষধ বিজ্ঞানের ওপর বহু গ্রন্থ রচিত হয়। এগুলিতে সাধারণ ওষুধের বিষয় কিংবা যৌগিক ওষুধের বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। সাধারণ ঔষধ সংক্রান্ত রচনার জন্য ইবনে আল-বাইতার সব চাইতে বিখ্যাত। অপর শ্রেণীর রচনাসমূহকে আকরাবাজিন বলা হতো। ইবনে আল-বাইতারের রচনাটির নাম হচ্ছে এ কালেকশন অব সিম্পল ড্রাগস। তিনি স্পেন থেকে সিরিয়া পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরের উপকূল থেকে ওষুধ তৈরির বহু লতাগুল্ম ও উপকরণ সংগ্রহ করেন, প্রায় ১৪০০টি উপকরণের বিবরণী প্রদান করেন এবং ১৫০ জনেরও বেশি প্রাচীন ও আরব লেখকের বর্ণিত উপাদানের সঙ্গে সেগুলির তুলনা করেন। এই রচনা অসাধারণ পাণ্ডিত্য ও পর্যবেক্ষণের স্বাক্ষর বহন করে এবং এটি উদ্ভিদ বিজ্ঞানের ওপর আরবদের শ্রেষ্ঠতম গ্রন্থ।
যৌগিক ওষুধ সংক্রান্ত পরবর্তীকালের আরবী গ্রন্থগুলি এখনো মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ওষুধ প্রস্তুতকারকদের কাছে সমাদৃত। বর্তমানে সব চাইতে জনপ্রিয় বইগুলির মধ্যে ইহুদী কোহেন আল আত্তার লিখিত ম্যানেজমেন্ট অব দি ড্রাগ স্টোর এবং দাউদ আল আনতাকী রচিত মেমোরিয়াল এর নাম উল্লেখযোগ্য। দুটি গ্রন্থই কায়রোতে রচিত হয়। এসব গ্রন্থের বহু প্রাচীন ও জটিলতাপূর্ণ প্রস্তুত প্রণালী ইউরোপীয় ওষুধ প্রস্তুত কারখানাগুলিতে প্রবর্তিত হয়। এমনিভাবে বহু যৌগিক ওষুধের নাম প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে প্রচলিত হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ মধুসহযোগে গাঢ় করা ফলের রস রব, ওষুধ জাতীয় সুগন্ধী পানীয় জুলেপ এবং সিরাপ এর নাম উল্লেখযোগ্য।
চতুর্দশ শতকের শুরুতে চিকিৎসা বিষয়ক মুসলিম লেখকদের রচনায় জাদু ও কুসংস্কারমূলক চর্চার বিষয় ধীরে ধীরে প্রবেশ করে। এদের চিকিৎসা-বিষয়ক জ্ঞান প্রায়ই ধর্মীয় রচনা থেকে উদ্ভূত হয়। এর ফলে এসব উপাদানের সাধারণ মানের আরো অবনতি ঘটে। স্পেনে চিকিৎসাবিদদের মধ্যে দর্শন প্রবণতা প্রাধান্য লাভ করে। দুজন মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে জুহর ও ইবনে রুশদ এই শ্রেণীর আদর্শ স্থানীয় ব্যক্তি। ইবনে জুহর আল মোহেড রাজদরবারে একজন অভিজাত চিকিৎসক ছিলেন। তিনি শল্যচিকিৎসা ও শল্য চিকিৎসকদের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করেন। সাধারণ চিকিৎসা পেশার চাইতে তিনি চিকিৎসা সংক্রান্ত পরামর্শদাতা হিসাবে কাজ করতেন। তাঁর প্রধান রচনা আরবী আত-তাইসির নামে পরিচিত ছিল। এটি ১২৮০ খৃ. ভেনিসে জনৈক ইহুদীর সহায়তায় প্যারাভিসিয়াস কর্তৃক থেইসির শিরোনামে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। এখানেই পরবর্তীকালে এটি বার বার মুদ্রিত হয়। প্রধানত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে রচিত হওয়ায় বইটিতে চিন্তার স্বাধীনতার উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। সম্ভবত এই কারণেই গ্রন্থটি ইউরোপের তুলনায় আরবদের কাছে কম জনপ্রিয়তা লাভ করে।
ইবনে জুহরের শিষ্য ও বন্ধু ইবনে রুশদ অ্যারিস্টটলের শ্রেষ্ঠতম দার্শনিকদের অন্যতম ছিলেন। তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রের ওপরও ১৬টি গ্রন্থ রচনা করেন। এর মধ্যে জেনারেল রুল্স অন মেডিসিন গ্রন্থটির ল্যাটিন অনুবাদ অত্যন্ত জনপ্রিয়। ১২৫৫ সালে পাডুয়ান ইহুদী বোনাকোসা কলিজেট শিরোনামে এটি অনুবাদ করেন। ইবনে জুহরের থেইসিরের সঙ্গে এটি কয়েকবার মুদ্রিত হয়। তাঁর গ্রন্থের সর্বত্র, বিশেষ করে দ্বিতীয় খণ্ডের যেখানে তিনি ভাষাতত্ত্ব ও মনস্তত্ত্ব আলোচনা করেছেন সেখানে ইবনে রুশদ নিজেকে একজন অ্যারিস্টটলের চিন্তাবিদ হিসাবে প্রকাশ করেছেন। তিনি প্রায়ই রাযী ও ইবনে জুহরের মতামতের সঙ্গে হিপোক্রেটিস ও গ্যালেনের মতামতের তুলনামূলক আলোচনা করেন।
'ব্ল্যাক ডেথ' নামে পরিচিত চতুর্দশ শতকের প্লেগ মহামারী স্পেনের মুসলিম চিকিৎসকগণকে ধর্মীয় সংস্কার থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ প্রদান করে। ধর্মীয় সংস্কার অনুযায়ী প্লেগকে সংক্রামক ব্যাধি মনে না করে আল্লাহ্র একটি শাস্তি মনে করা হতো। প্রখ্যাত আরব রাষ্ট্রনীতিবিদ, ঐতিহাসিক ও চিকিৎসাবিদ গ্রানাডার ইবনে আল-খাতিব তাঁর অন প্লেগ নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থে এই রোগের বর্ণনা দান করেন। এই গ্রন্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখানে তুলে ধরা হচ্ছেঃ "অভিজ্ঞতা, পর্যালোচনা এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রমাণ থেকে; পোশাক, ব্যবহৃত পাত্র ও কানের দুলের মাধ্যমে সংক্রমিত হওয়ার বিশ্বাসযোগ্য বিবরণী থেকে এক ঘরের লোকদের দ্বারা অন্য ঘরের লোকদের মধ্যে এটির প্রসার থেকে; কোন রোগাক্রান্ত দেশ থেকে আগত ব্যক্তিদের মাধ্যমে রোগমুক্ত সামুদ্রিক বন্দরে সংক্রমণ থেকে... বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের .... এবং আফ্রিকার ভবঘুরে বেদুইন উপজাতিদের সংক্রমণমুক্ত অবস্থা থেকে সংক্রমণের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।... অতএব এই বক্তব্যকে অবশ্যই মূলনীতি হিসাবে গ্রহণ করতে হবে যে, হাদীস থেকে যে প্রমাণ গ্রহণ করা হয়েছে তা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রমাণের সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে অসঙ্গতিপূর্ণ হলে তার সংশোধন করতে হবে।"
অত্যন্ত গোঁড়ামির যুগে এই বক্তব্য যথেষ্ট দুঃসাহসের পরিচায়ক। মুরীয় চিকিৎসাবিদ ইবনে খাতিমা ১৩৪৮-৪৯ খৃস্টাব্দে স্পেনের আলমেরিয়ায় যে প্লেগ মহামারী দেখা দেয় সে সম্পর্কে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। চতুর্দশ শতক থেকে ষোড়শ শতকের মধ্যে ইউরোপে প্লেগ সংক্রান্ত যে অসংখ্য বই সম্পাদিত হয় সেগুলির তুলনায় এই গ্রন্থটি অনেক বেশি উন্নতমানের। তিনি বলেন: "আমার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফল এই যে, কোন ব্যক্তি যদি রোগীর সংস্পর্শে আসে তাহলে সে সঙ্গে সঙ্গে একই লক্ষণযুক্ত রোগে আক্রান্ত হয়। প্রথম রোগীর যদি শ্লেষ্মার আকারে রক্ত নিঃসৃত হয় দ্বিতীয় রোগীরও তাই হবে... প্রথম রোগীর কুঁচকি, বগল ইত্যাদি স্থানে যদি গ্রন্থিস্ফীতি দেখা দেয় তাহলে দ্বিতীয় রোগীরও ঠিক একই স্থানগুলিতে গ্রন্থিস্ফীতি দেখা দেবে। প্রথম রোগীর যদি আলসার হয়, দ্বিতীয় রোগীরও তাই হবে। দ্বিতীয় রোগীও একইভাবে অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়ায়।"
এসব লেখকের শিক্ষার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, গ্রীক চিকিৎসাবিদরা রোগের সংক্রমণ বৈশিষ্ট্যের মতবাদের ওপর কোন গুরুত্ব আরোপ করেননি এবং এ বিষয়টি অধিকাংশ মধ্যযুগীয় লেখকের রচনায়ও প্রায় কোন গুরুত্ব পায়নি। চিকিৎসা শাস্ত্র ছাড়া বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে পতন যুগে বহু গ্রন্থ রচিত হয়। কিন্তু তার মধ্যে অবনতির লক্ষণও কম সুস্পষ্ট নয়। একাদশ শতকের পর আলকেমীর ওপর আরবী ও পারস্য ভাষায় প্রায় ৪০টি গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু উক্ত বিষয়ে এসব রচনার নতুন অবদান অতি সামান্য। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ইতিহাসের অত্যন্ত প্রতিভাবান আরব দার্শনিক এবং তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠতম বুদ্ধিজীবী ইবনে খালদুন আলকেমীর ঘোর বিরোধী ছিলেন।
ধাতু-বিজ্ঞান আলকেমীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। মূল্যবান পাথর সংক্রান্ত প্রায় ৫০টি আরবী গ্রন্থের নাম জানা যায়। এগুলির মধ্যে সব চাইতে বিখ্যাত গ্রন্থ হচ্ছে শিহাবুদ্দিন আত তিফাশীর ফ্লাওয়ার্স অব নলেজ অব স্টোনস। এতে ২৫টি অধ্যায়ে সমসংখ্যক মূল্যবান পাথর সম্পর্কে ব্যাপক তথ্য প্রদান করা হয়েছে। এসব পাথরের উৎস, ভৌগোলিক এলাকা, খাঁটিত্ব, মূল্য এবং ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজনে এগুলির ব্যবহারের বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে। প্লিনি ও অ্যারিস্টটলীয় ভুয়া গ্রন্থ ছাড়া তিনি কেবল আরব লেখকদের উদ্ধৃতি প্রদান করেন।
প্রাণীতত্ত্ব সম্পর্কে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম গ্রন্থ হচ্ছে মোহাম্মদ আদ-দামিরীর জীব-জন্তুর জীবন। লেখক একজন ধর্মীয় শিক্ষক ছিলেন। তাই তাঁর গ্রন্থটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাপ্রসূত নয়, বরং বিভিন্ন রচনা থেকে তিনি তাঁর তথ্যসমূহ সংকলিত করেছেন। বইটি নিছক পাণ্ডিত্যপূর্ণ হলেও প্রাচ্যে অত্যন্ত প্রসিদ্ধি লাভ করে। এর বিভিন্ন অংশে লোকগাথা, জনপ্রিয় ওষুধ এবং বর্ণগত মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে বহু মূল্যবান তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে। কিন্তু এতে সব সময় অসংলগ্ন বর্ণনার প্রাচুর্যও দেখা যায়।
বিশ্বতত্ত্ব সম্পর্কে আরব ও পারস্যের পণ্ডিতরা যেসব বিশ্বকোষ রচনা করেছেন তাঁর সবগুলিতেই জীবজন্তু, উদ্ভিদ ও পাথর সংক্রান্ত বিভাগ রয়েছে। এগুলির মধ্যে যাকারিয়া আল কাযউইনীর বিশ্বকোষটি সব চাইতে বিখ্যাত। পদার্থবিদ্যা সম্পর্কে বেশ কিছু সংখ্যক বই এবং বিশ্বকোষের বিভাগ রয়েছে। কিন্তু এর অধিকাংশ রচনাতেই দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টির আলোচনা করা হয়েছে।
ওজন ও পরিমাপ, বিশেষত দাঁড়িপাল্লা সম্পর্কিত পর্যালোচনায় পরবর্তী শতকসমূহে মুসলমানরা বিশেষ তৎপর ছিলেন। এ সম্পর্কে মূলত গ্রীক ক্রীতদাস এবং মার্ভের অধিবাসী আল খাযিনী দি ব্যালেন্স অব উইজডম নামে একটি বিরাট গ্রন্থ রচনা করেন। এর কয়েকটি অংশমাত্র সম্পাদিত রয়েছে। সাবিত ইবনে কাররা তথাকথিত 'রোমান' দাঁড়িপাল্লা বা তুলাদণ্ড সম্পর্কে যে অনুসন্ধান কার্য পরিচালনা করেন আল-খাযিনী তা অব্যাহত রাখেন। এ ছাড়াও তাঁর রচনার মধ্যে সুনির্দিষ্ট ভার এবং খাদের সুনির্দিষ্ট ওজন সম্পর্কে মূল্যবান অভিমতসমূহ পাওয়া যায়। পানি পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলের যত কাছাকাছি হয় তার ঘনত্বও ততো বেশি হয়। এই বিষয়টি নিয়েও আল-খাযিনী আলোচনা করেন এবং রজার বেকন কর্তৃক বিষয়টি তুলে ধরার আগেই তিনি তা তুলে ধরেন।
পানি বিজ্ঞান সংক্রান্ত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা সম্পর্কে এবং পানি, পারদ, ওজন কিংবা জ্বলন্ত মোমবাতির সাহায্যে পরিচালিত ঘড়ি সম্পর্কে অসংখ্য চিত্র সম্বলিত অত্যন্ত সুন্দর সুন্দর পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়। আল-জাযারী ১২০৬ খৃস্টাব্দে মেসোপটেমিয়ায় যন্ত্রবিজ্ঞান ও ঘড়ি সম্পর্কে একটি বিরাট গ্রন্থ রচনা করেন। মুসলিম বিশ্বে এটি সর্বাধিক প্রচারিত। একই সময়ে পারস্যবাসী রিদওয়ান তাঁর পিতা মুহাম্মদ ইবনে আলী কর্তৃক দামেস্কের অন্যতম ফটকের কাছে নির্মিত জল-ঘড়ির বর্ণনা দান করেন। এর নির্মাণ-কৌশল সমগ্র মুসলিম বিশ্বে বহুলভাবে প্রশংসিত হয় এবং এর স্মৃতি ষোড়শ শতক পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এসব বিষয়ের গ্রন্থকারগণ আর্কিমিডিস, অ্যাপোলোনিয়াস ও টেসিবিয়াসের প্রসঙ্গ উল্লেখ করলেও তাঁদের নিজস্ব যান্ত্রিক ব্যবস্থার সঠিক বর্ণনা অনবদ্য।
আলোক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন পারস্যবাসী কামালউদ্দীন। তিনি ক্যামেরা অবস্কিউরা সম্পর্কে আল-হায়সামের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পুনরাবৃত্তি করেন এবং এটির উন্নতি সাধন করেন। বৃষ্টির ফোঁটার মধ্যে সূর্যালোকের প্রতিসরণ পরীক্ষা করার জন্য তিনি কাঁচের অভ্যন্তরে আলোকরশ্মির গতিপথও পর্যবেক্ষণ করেন। এর ফলে তিনি প্রাথমিক পর্যায়ের ও দ্বিতীয় পর্যায়ের রামধনুর উদ্ভব বিশ্লেষণে সক্ষম হন। কায়রোর জনৈক ধর্মতত্ত্ববিদ ও বিচারক শিহাবুদ্দীন আল-কারাফী আলোক বিজ্ঞান সম্পর্কে যে গ্রন্থ রচনা করেন তাতে সাধারণ লোক হয়েও বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহের অপূর্ব নজীর সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির চাইতে কাল্পনিক পদ্ধতিতে আলোকবিজ্ঞান সংক্রান্ত ৫০টি সমস্যা আলোচনা করেন। এর মধ্যে তিনটি এ জন্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, এগুলিতে সিসিলীস্থ ফ্রাঙ্কদের সম্রাট ও রাজা মুসলিম পণ্ডিতদের উদ্দেশ্যে যে সব প্রশ্ন রাখেন সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ইনিই হচ্ছেন হহেনস্টওফেনের দ্বিতীয় ফ্রেডারিক। তিনি ১২২০ থেকে ১২৩০ খৃস্টাব্দের মধ্যে স্পেন ও মিসরের মুসলিম পণ্ডিতদের জন্য বিভিন্ন দার্শনিক ও জ্যামিতিক সমস্যা তুলে ধরেন। আলোক বিজ্ঞান সংক্রান্ত তাঁর তিনটি প্রশ্ন হচ্ছে: দাঁড় ও বল্লম আংশিকভাবে পানিতে থাকলে সেগুলিকে বাঁকানো মনে হয় কেন? দিগন্তের কাছাকাছি এলে ক্যানোপাসকে বড়ো দেখায় কেন? চোখে ছানি পড়ার প্রাথমিক অবস্থায় এবং অন্যান্য চক্ষুরোগে দৃষ্টির সামনে কালো কালো দাগ ভাসমান দেখায় কেন?
সর্বশেষে আমরা মুসলিম চিকিৎসাশাস্ত্র ও বিজ্ঞানের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি জীবনীমূলক রচনার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। প্রথমে ইবনে আল-কিফতির দার্শনিকদের ইতিহাস উল্লেখযোগ্য। এতে গ্রীক, সিরীয় ও মুসলিম চিকিৎসাবিদ, জ্যোতির্বিদ ও দার্শনিকদের ৪১৪টি জীবনী স্থান পেয়েছে। আরবরা গ্রীক সাহিত্যের যে জ্ঞানের অধিকারী হয়েছেন এটি তার একটি তথ্য-খনি এবং প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার যেসব তথ্য ক্লাসিক্যাল সূত্রে পাওয়া যায় না এতে তার অনেক কিছু পাওয়া যায়। ইবনে আবি উসাইবিয়ার চিকিৎসাবিদদের শ্রেণী সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য গ্রন্থটিও কোন অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি স্বয়ং অত্যন্ত জ্ঞানী চিকিৎসাবিদ ও চক্ষু চিকিৎসক ছিলেন এবং প্রধানত কায়রোতে বসবাস করতেন। তিনি ৬০০-রও বেশি চিকিৎসাবিদের জীবনী রচনা সম্পর্কে আলোচনা করেন। এসব তথ্য তিনি আংশিকভাবে যেসব রচনা বর্তমানে পাওয়া যায় না সেগুলি থেকে এবং আংশিকভাবে চিকিৎসা বিষয়ক হাজার হাজার গ্রন্থের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয়মূলক জ্ঞান থেকে সংগ্রহ করেছেন। আরব চিকিৎসাশাস্ত্রের আধুনিক ইতিহাস এই গ্রন্থটির ওপর ভিত্তি করে রচিত। আরব চিকিৎসা শাস্ত্রের ওপর মিসরের আদিম অধিবাসী ও আরমেনীয়দের নির্ভরশীলতার পরিচয় তাদের বিভিন্ন রচনার মাধ্যমে পাওয়া যায়।
৫. উত্তরাধিকার
এবারে আরব বিজ্ঞানের রত্নভাণ্ডার থেকে পাশ্চাত্যে এর প্রসারের প্রসঙ্গে আসা যাক। চিকিৎসা বিজ্ঞান ও প্রকৃতি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের উত্তরাধিকার গ্রীসেরই উত্তরাধিকার। গ্রীক উত্তরাধিকারের সঙ্গে বহু নতুন জিনিস যুক্ত হয়েছে এবং সেগুলি প্রধানত ব্যবহারিক। পারস্যবাসী রাযী একজন প্রতিভাবান চিকিৎসাবিদ হলেও তিনি হার্ভি ছিলেন না। আরব আবদুল লতিফ অ্যানাটমীর গভীর অনুসন্ধানী হলেও ভেসালিয়াসের সঙ্গে তাঁর তুলনা করা যায় না। মুসলমানরা হিপোক্রেটিস ও গ্যালেনের সামগ্রিক রচনার সুন্দর অনুবাদের অধিকারী ছিলেন। হুনাইনের ন্যায় বুদ্ধিমান ও বহু ভাষাভাষী পণ্ডিতরা তাত্ত্বিক বিশ্লেষণসহ সবকিছু সুন্দরভাবে উপলব্ধি করেন ও তুলে ধরেন। কিন্তু মুসলিম চিকিৎসাবিদদের অতিরিক্ত সংযোজন প্রায় সম্পূর্ণরূপে রোগ চিকিৎসা ও নিরাময়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। গ্রীকদের মতবাদ ও চিন্তাধারা অবিকল থাকে। সাবধানতার সঙ্গে সুবিন্যস্ত করার পর সেগুলিকে সম্পদ হিসাবে মজুদ করা হয়। একথা স্মরণ রাখা দরকার যে, মানুষের বা জীবন্ত প্রাণীর দেহ ব্যবচ্ছেদ মুসলমানের জন্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। ফলে এতদসংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রায় অসম্ভব ছিল এবং এ কারণে গ্যালেনের শব ব্যবচ্ছেদ ও শারীর বৃত্ত সংক্রান্ত ভুলত্রুটি সংশোধন করা যায়নি। অপরপক্ষে মুসলমানরা পারস্য, ভারত ও মধ্য এশিয়ার পণ্ডিতদের চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার এবং ওষুধ ও ধাতব পদার্থের জ্ঞান সংক্রান্ত বিশেষ ধারার অভিজ্ঞতা থেকে প্রেরণা লাভ করেন। এর ফলে তাঁরা রসায়ন শাস্ত্রে কিছুটা অগ্রগতি লাভ করেন। অবশ্য আলকেমীর উন্নয়নে গ্রীসের ও প্রাচ্যের অবদান কতখানি সে সম্পর্কে যথার্থ অভিমত প্রদানের মতো তথ্য এখনো আমরা পাইনি।
অন্যান্য বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গ্রীকদের কোন কোন শ্রেষ্ঠ রচনা মুসলমানদের কাছে অজ্ঞাত ছিল। দৃষ্টান্তস্বরূপ থিওফ্রেসটাসের উদ্ভিদ বিজ্ঞানের কথা উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব অবদান উল্লেখযোগ্য। অবশ্য এখানেও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব নিহিত। মুসলিম মনীষীরা গভীর পর্যবেক্ষণশীল হলেও তাদের চিন্তাধারা সীমাবদ্ধ ছিল। একথা প্রাণী বিজ্ঞান, খনিজ বিজ্ঞান এবং যন্ত্রবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মুসলিম বিজ্ঞান সাধনার গৌরব আলোক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নিহিত। এখানে ইবনে হায়সাম ও জনৈক কামাল উদ্দিনের গাণিতিক দক্ষতা ইউক্লিড ও টলেমীর দক্ষতাকে ম্লান করে দিয়েছে। বিজ্ঞানের এই বিভাগে তাঁরা বাস্তব ও স্থায়ী অবদান রেখে গেছেন।
১১০০ খৃস্টাব্দের দিকে মুসলমানদের চিকিৎসাশাস্ত্র ও বিজ্ঞান চর্চায় যখন স্থবিরতার সৃষ্টি হয় তখন এগুলি ল্যাটিন অনুবাদের মাধ্যমে ইউরোপে প্রচারিত হতে শুরু করে। চার্লস সিঙ্গার তাঁর শর্ট হিস্টোরী অব মেডিসিন গ্রন্থে সন্ন্যাসীদের এই সময়কার চিকিৎসা চর্চার বিবরণ দান করেন : "দেহ ব্যবচ্ছেদ ও শারীর তত্ত্বের অবসান ঘটে। রোগ নিরূপণ ব্যবস্থা একটি রুক্ষ অবান্তর বিধিতে পর্যবসিত হয়। উদ্ভিদ বিজ্ঞান ওষুধের তালিকায় স্থান গ্রহণ করে। নানা প্রকার কুসংস্কারমূলক ব্যবস্থার উদ্ভব হয়। চিকিৎসাশাস্ত্র কতিপয় সূত্র সংগ্রহের পর্যায়ে নেমে আসে এবং তার সঙ্গে নানাপ্রকার জাদুমন্ত্র যুক্ত হয়। যে বৈজ্ঞানিক ধারা চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রাণরস তা উৎস স্থলেই শুকিয়ে যায়।"
ইউরোপের কেবল একটি কোণে ন্যাপলসের অদূরে সালের্নোতে একটি মেডিক্যাল স্কুলে গ্রীক চিকিৎসাশাস্ত্রের কিছুটা স্বাক্ষর দেখা যায়। এখানেই তিউনিসীয় সংসার বিবাগী ভবঘুরে আফ্রিকান কনস্ট্যান্টাইন ক্যাম্পেনিয়ার বিখ্যাত মন্টি ক্যাসিনো কনভেন্টে সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণের আগে কয়েক বছর অতিবাহিত করেন। তিনি সেখানে ১০৭০ খৃস্টাব্দের দিকে অনুবাদ কাজে আত্মনিয়োগ করেন এবং আমৃত্যু তা অব্যাহত রাখেন। কনস্ট্যান্টাইনের ল্যাটিন অনুবাদ ত্রুটিপূর্ণ, বিভ্রান্তিকর, আরবী পরিভাষা সম্পর্কে অজ্ঞতা-প্রসূত এবং প্রায়ই দুর্বোধ্য। এগুলি মধ্যযুগের বর্বর-ল্যাটিন রচনার সমতুল্য। এতদসত্ত্বেও এসব অনুবাদ মধ্যযুগীয় ইউরোপের অনুর্বর ভূমিতে সর্বপ্রথম গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিচ্ছিন্ন বীজ বপনের কৃতিত্ব দাবি করে। কনস্ট্যান্টাইন নির্লজ্জভাবে অন্যের রচনা চুরি করতেন। তিনি আরবী থেকে ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করার পর বহু গ্রন্থ নিজের রচনা হিসাবে দাবি করেন। অবশ্য আমাদের এ কথা স্মরণ রাখা দরকার যে, ঐ যুগে গ্রন্থকারদের স্বত্বের প্রশ্নটিতে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না। তিনি হুবাইশের অনুবাদ থেকে গ্যালেনের ভাষ্যসহ হুনাইনের আরবী অনুবাদ থেকে হিপোক্রেটিসের অ্যাফোরিজম্স ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। এ ছাড়া গ্যালেনের বহু রচনাসহ হিপোক্রেটিসের প্রোগনস্টিকা ও ডায়েটা একিউটোরাম গ্রন্থ দুটিও অনুবাদ করেন। কনস্ট্যান্টাইনের রচিত বলে প্রচারিত ডি অকিউলিস গ্রন্থটির ভাষ্য থেকে ঐ যুগের বৈশিষ্ট্য বোঝা যাবে। এটি পরবর্তীকালে সম্ভবত সিসিলীতে জনৈক ডেমিটিয়াস কর্তৃক পুনরায় ল্যাটিন ভাষায় প্রকাশিত হয়। অথচ এটি ছিল মূলত হুনাইনের চক্ষু সম্পর্কে দশটি নিবন্ধ। অবশ্য কনস্ট্যান্টাইনই সর্বপ্রথম গ্রীক বিজ্ঞান বিষয়ক রচনার সঙ্গে পাশ্চাত্যকে পরিচিত করেন। এ ছাড়া তিনি আলী আব্বাস ও আইজ্যাক জুডিয়াসের রচনা অনুবাদের দায়িত্ব তাঁর উত্তরাধিকারীদের ওপর ন্যস্ত করেন। কনস্ট্যান্টাইন রাযীর আলকেমী সংক্রান্ত গ্রন্থ লিবার এক্সপেরিমেন্টোরাম ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। মন্টি ক্যাসিনোর সন্ন্যাসীদের মধ্যে তাঁর অনেক শিষ্য ছিল। এদেরই একজন ছিলেন 'স্যারাসেন' নামে পরিচিত জোহানেস অ্যাপলেসিয়াস। তিনি আরবী রচনা ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদে কনস্ট্যান্টাইনকে সাহায্য করতেন।
কনস্ট্যান্টাইনের জীবিতকালে স্পেন ও সিসিলী উভয় স্থানেই খৃস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে সক্রিয় সংগ্রাম অব্যাহত ছিল। ১০৮৫ খৃস্টাব্দে পাশ্চাত্যে মুসলিম জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৃহত্তম কেন্দ্র টলেডো স্পেনীয় খৃস্টানের অধিকারভুক্ত হয়। মুরীয় সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ পর্যবেক্ষণ করার জন্য এবং আরব শিল্পকলা সম্পর্কে শিক্ষা লাভের জন্য নতুন রাজধানীতে ল্যাটিন শিক্ষার্থীদের সমাগম হতে থাকে। যারা এসব জ্ঞান-বিজ্ঞান ও পরবর্তীকালে অনুবাদ কার্যের মাধ্যম হিসাবে কাজ করতেন তারা ছিলেন ইহুদী ও সাবেক মুসলিম প্রজা। এই গ্রন্থ সিরিজের অন্য একটি গ্রন্থ চার্লস ও ডরোথিয়া সিঙ্গার এ ধরনের সহযোগিতার একটি প্রাণবন্ত চিত্র তুলে ধরেন। এতে বিভিন্ন মতবাদের বৈজ্ঞানিক সংমিশ্রণের একটি অদ্ভুত ধারণা পাওয়া যায়। টলেডোতে আগমনকারী প্রথম বিশিষ্ট ইউরোপীয় বিজ্ঞানী ছিলেন ইংরেজ গাণিতিক ও দার্শনিক বাথের অ্যাডেলার্ড। অপরদিকে খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত স্পেনীয় ইহুদী-পেটাস আলফন্সী ইংল্যান্ড গিয়ে প্রথম হেনরীর চিকিৎসক পদে বরিত হন এবং সর্বপ্রথম মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রচার করেন। উভয় পণ্ডিত ব্যক্তিই দ্বাদশ শতকের প্রথমার্ধে আরবদের জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গাণিতিক রচনাবলী ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। এরপর অনেকেই তাঁদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেন।
দ্বাদশ শতকে টলেডোতে যে বিজ্ঞান চর্চার প্রসার হয় তা বহু দিক দিয়ে ৩০০ বছর আগের বাগদাদের অনুবাদ যুগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। খলীফা আল মামুন যেভাবে 'জ্ঞান ভবন' প্রতিষ্ঠা করেন ঠিক তেমনিভাবে আর্কডিকন ডোমিনিকো গুণ্ডিসালভির নির্দেশে আর্কবিশপ রেমাও টলেডোতে একটি অনুবাদ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। টলেডোতে ইহুদীরা বাগদাদের বহু ভাষাভাষী খৃস্টান ও সাবিয়ান অনুবাদকদের ভূমিকা গ্রহণ করেন। এসব ইহুদী আরবী, হিব্রু, স্পেনীয় এবং কোন কোন সময় ল্যাটিন ভাষাও জানতেন। সাবিয়ান সাবিত ইবনে কাররা যেমন গ্রীক রচনাবলী আরবীতে অনুবাদ করেন, তেমনি খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত ইহুদী আভেন ডেথ আরবদের বহু গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিঃ শাস্ত্র সম্পর্কিত গ্রন্থ ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। হুনাইন ইবনে ইসহাক আরবদের জন্য দার্শনিক, গাণিতিক, পদার্থ বিজ্ঞানী ও চিকিৎসাবিদদের রচনাবলী অনুবাদের মাধ্যমে যে অবদান রাখেন ক্রিমোনার জিরার্ড ল্যাটিন ভাষীদের জন্য সেই একই অবদান সৃষ্টি করেন।
জিরার্ড ১১১৪ খৃস্টাব্দে ইটালীর ক্রিমোনায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি টলেমীর আল মাজেস্ট এর সন্ধানে টলেডো আগমন করেন। ১১৭৫ খৃস্টাব্দে তিনি এই গ্রন্থটি ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। শীঘ্রই তিনি আরবী অনুবাদকদের মধ্যে সব চাইতে খ্যাতি ও মর্যাদা লাভ করেন। একজন স্থানীয় খৃস্টান ও ইহুদী অনুবাদ কাজে তাঁকে সাহায্য করেন। ১১৮৭ খৃস্টাব্দে পরলোকগমনের পূর্ববর্তী ২ দশকে তিনি প্রায় ৮০টি গ্রন্থ অনুবাদ করেন। এর মধ্যে কয়েকটি গ্রন্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রীক ও আরব জ্ঞান-বিজ্ঞানের রত্নভাণ্ডার উন্মোচিত করে তিনি তাঁর বহু অনুসারীকে এই দৃষ্টান্ত অনুকরণে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি ইউরোপে 'আরববাদের' সত্যিকার জনক। চিকিৎসাশাস্ত্রে আমরা জিরার্ডের কাছে নিম্নোক্ত রচনাসমূহ অনুবাদের জন্য ঋণী: হিপোক্রেটিস ও গ্যালেনের রচনাবলী, হুনাইনের প্রায় সমগ্র অনুবাদ, আল-কিন্দীর রচনাসমূহ, ইবনে সিনার বিশাল ক্যানন এবং আবুল কাসিমের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাব সৃষ্টিকারী সার্জারী। পদার্থ বিজ্ঞানে তিনি আরবী থেকে অ্যারিস্টটলের বহু রচনা অনুবাদ করেন। এগুলির মধ্যে অ্যারিস্টটলের সন্দেহজনক রচনা ল্যাপিডারি এবং আল-কিন্দী, আল ফারাবী, আইজ্যাক জুডিয়াস ও সাবিতের রচনাবলী রয়েছে।
টলেডোর ক্যাননও এ ব্যাপারে অবদান রাখেন। তিনি বয়সে তরুণ হলেও সম্ভবত জিরার্ডের সমসাময়িক ছিলেন। তিনি হিপোক্রেটিসের বায়ু, পানি ও স্থান সম্পর্কিত রচনাবলী এবং গ্যালেনের বহু রচনা অনুবাদ করেন। এর সবগুলিই তিনি হুবাইশ ও হুনাইনের আরবী সংস্করণ থেকে অনুবাদ করেন। স্পেনের মুর্সিয়ায় বসবাসকারী ইটালীর আলেস্সান্দ্রিয়ার পণ্ডিত রাফিনো গুনাইনের বিখ্যাত চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রশ্নাবলী অনুবাদ করেন। টর্টোসার জনৈক ইহুদী আব্রাহাম আবুল কাসিমের লিবার সার্ভিটোরিজ ও সেরাপিন দি ইয়ংগারের ডি সিম্পলিসিবাস অনুবাদে জেনোয়ার সিমনকে সাহায্য করেন। আবুল কাসিমের রচনার অন্যান্য অংশ ভ্যালেনসিয়ার জনৈক বেরেংগার ও ভিলানোভার আর্নল্ড কর্তৃক অনূদিত হয়। শেষোক্ত ব্যক্তি স্পেনে চিকিৎসাবিষয়ক রচনার সর্বশেষ বিখ্যাত অনুবাদক। ইবনে সিনা, আল কিন্দী, ইবনে জুহর ও অন্যদের রচনাবলী অনুবাদের জন্য আমরা তাঁর কাছে ঋণী।
১৩০ বছর পর্যন্ত মুসলিম শাসনাধীন সিসিলি ১০৯১ খৃস্টাব্দে সুনির্দিষ্টভাবে নর্ম্যানদের কর্তৃত্বাধীনে যায় এবং এ সময় থেকে আরব বিজ্ঞান প্রসারের একটি উর্বর কেন্দ্রে পরিণত হয়। অধিবাসীদের মধ্যে গ্রীক, আরবী ও ল্যাটিন কথ্য ভাষা হিসাবে প্রচলিত ছিল। কিন্তু কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তি, বিশেষ করে ইহুদীরা এই তিনটি ভাষার সাহিত্যও আয়ত্ত করেন। প্রথম রজার থেকে দ্বিতীয় ফ্রেডারিক পর্যন্ত রাজণ্যবর্গ, ম্যানফ্রেড ও আনজু বংশীয় প্রথম চার্লস ভাষা ও ধর্ম নির্বিশেষে জ্ঞানী-বিজ্ঞানীদের পালের্মোতে জড়ো করেন। টলেডোর ন্যায় এখানেও একদল বিজ্ঞ অনুবাদক গ্রীক ও আরবী থেকে ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদের কাজ শুরু করেন। প্রধানত জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিত শাস্ত্রের ওপর এসব অনুবাদকার্য সম্পন্ন হয়।
দ্বাদশ শতকে সিসিলীতে চিকিৎসা শাস্ত্রের ওপর কোন গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদ সম্পাদিত হয়নি। কিন্তু পরবর্তী শতকে আনজু বংশীয় চার্লসের রাজত্বকালে আমরা বিখ্যাত ইহুদী অনুবাদক ফারাজ ইবনে সেলিম এর সঙ্গে এবং রাযীর কন্টিনেন্স এর অনুবাদের সঙ্গে পরিচিত হই। তিনি ১২৭৯ খৃস্টাব্দে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সম্পন্ন করেন, যাতে একটি স্বাভাবিক জীবন কালের অর্ধেক ব্যয়িত হয়। রাজা চার্লসের নির্দেশে মোসেস অব পালের্মো নামক অপর একজন ইহুদীকে ল্যাটিন অনুবাদক হিসাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাঁর অনুবাদের মধ্যে আমরা কেবল অর্শরোগ সম্পর্কে একটি কল্পিত হিপোক্রেটিক রচনার অনুবাদ দেখতে পাই। দ্বিতীয় ফ্রেডারিকের প্রিয়ভাজন মাইকেল স্কট অ্যারিস্টটলের জীববিজ্ঞান ও উদ্ভিদবিজ্ঞান সংক্রান্ত সামগ্রিক রচনা, বিশেষত ইবনে সিনার ভাষ্যসহ ডি অ্যানিমালিভাস এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ আরবী ও হিব্রু থেকে ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। শেষোক্ত গ্রন্থটি তিনি ১২৩২ খৃস্টাব্দে সম্রাটের নামে উৎসর্গ করেন। সবাই জানেন, দ্বিতীয় ফ্রেডারিক প্রাণীবিজ্ঞানে অত্যন্ত আগ্রহশীল ছিলেন। তিনি হাতি, আরব দেশীয় এক কুঁজ বিশিষ্ট উট, সিংহ, চিতাবাঘ, বাজ পাখি, পেঁচা প্রভৃতি পোষা প্রাণী সংরক্ষণের জন্য তাঁর সম্পদ ও মুসলমানদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কাজে লাগান। এগুলি সঙ্গে নিয়ে তিনি ভ্রমণে বের হতেন। সম্রাট শিকার সম্পর্কে স্বয়ং একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এটি প্রধানত মাইকেল স্কটের রচনার ওপর এবং একই লেখকের অ্যারিস্টটলের প্রাণীবিদ্যার অনুবাদের ওপর ভিত্তি করে রচিত।
ইউরোপে মুসলিম বিজ্ঞান প্রচারে ক্রুসেডের প্রভাব বিস্ময়করভাবে অতি সামান্য। এই আন্দোলনের মধ্যে যে একটি মাত্র রচনার সন্ধান পাওয়া যায় তা পিসার জনৈক স্টিফেনের লেখা। তিনি সালের্মো ও সিসিলিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি এন্টিয়কে আগমন করেন এবং সেখানে ১১২৭ খৃস্টাব্দে আলী আব্বাসের লিবার রিগালিস অনুবাদ করেন। এতে তিনি আফ্রিকান কনস্ট্যান্টাইন কর্তৃক একই রচনার পূর্ববর্তী অনুবাদের তীব্র সমালোচনা করেন। আমরা ধরে নিতে পারি যে, আংশিকভাবে ক্রুসেডের প্রভাবেই ত্রয়োদশ শতকে ইউরোপের সর্বত্র হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব হাসপাতাল তখন আর কেবল পাদ্রিদের তত্ত্বাবধানে ছিল না। এগুলি সম্ভবত দামেস্কের সমসাময়িক সেলজুক শাসক নূরুদ্দীনের এবং কায়রোতে মামলুক সুলতান আল-মানসুর কালাউনের প্রতিষ্ঠিত অত্যন্ত সুন্দর বিমারিস্তানগুলির অনুকরণ। পরবর্তী শতকের ইউরোপীয় পর্যটকগণ শেষোক্ত প্রতিষ্ঠানগুলির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। কিছুকাল বিলুপ্ত হওয়ার পর আমরা এগুলির পুনরুজ্জীবন দেখতে পাই। পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট ত্রয়োদশ শতকের সূচনায় ইটালীর রোমে সান স্পিরিটো হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন এবং এরই অনুকরণে সমগ্র পশ্চিম ইউরোপে অনুরূপ প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। নবম লুই ১২৫৪-৬০ খৃস্টাব্দে ক্রুসেড থেকে অপ্রীতিকর অবস্থায় প্রত্যাবর্তনের পর প্যারিসে আশ্রম ও হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত ৩০০ গরীব অন্ধের জন্য এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে এর সঙ্গে চক্ষু রোগের একটি হাসপাতাল সংযুক্ত করা হয়। এটি বর্তমানে ফরাসী রাজধানীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতাল।
ক্রুসেডের সময় যেসব মুসলমান ফ্রাঙ্ক চিকিৎসকদের সংস্পর্শে আসেন তাঁরা শেষোক্তদের পেশাগত মানের তীব্র নিন্দা করেন। সিরীয় যুবরাজ উসামা তাঁর আরব খৃস্টান চিকিৎসক সাবিতের বিবরণের ওপর ভিত্তি করে যেসব কাহিনী বর্ণনা করেন তাঁর থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ১১৪০ খৃস্টাব্দের দিকে সাবেত এ ধরনের দুটি ঘটনা অবলোকন করেন যাতে জনৈক ফ্রাঙ্কের বর্বরোচিত অস্ত্রোপচারের ফলে দুজন রোগীই মারা যায়। কয়েকজন ল্যাটিন অনুবাদক উত্তর ইটালীতে অনুবাদ চর্চা করেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ এখানে পিসার বুরগুণ্ডিও সরাসরি গ্রীক থেকে গ্যালেনের রচনাবলী অনুবাদ করেন। ১২০০ খৃস্টাব্দের দিকে পিস্টোয়ার একারসিয়াস হুবাইশের আরবী সংস্করণ থেকে গ্যালেনের ডি ভিরিবাস এলিমেন্টোরাম অনুবাদ করেন। ১২৫৫ খৃস্টাব্দে খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত ইহুদী বোনাকোসা পাদুয়ায় ইবনে রুশদের কলিজেট ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। ১২৮০ খৃস্টাব্দে ইহুদী জ্যাকবের সহায়তায় প্যারাভিসিয়াস ভেনিসে ইবনে জুহরের তাইসির অনুবাদ করেন।
অন্য অনুবাদকদের সময় ও সূত্র অপরিজ্ঞাত। দৃষ্টান্তস্বরূপ আম্মার এর চক্ষু বিজ্ঞানের অনুবাদক ডেভিড হার্মেনাসের নাম উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা লেখকদের বহু ল্যাটিন অনুবাদ রয়েছে। এগুলি মাইমোনাইডস, ইবনে সিনা, জাবের, রাযী, আল হায়সাম প্রমুখের রচনা। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, আলকেমী সংক্রান্ত অধিকাংশ রচনাই অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের অনুবাদ। ষোড়শ শতক পর্যন্ত এই অনুবাদকার্য পুরাদমে অব্যাহত থাকে। এই প্রসঙ্গে একজন বিশিষ্ট অনুবাদক হিসাবে ইটালীর আঁদ্রে আল পাগোর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ইবনে সিনার ক্যানন, অ্যাফোরিজমি, ডি এনিমা, ইবনে রুশদ ও জোহানেস সেরাপিয়নের ছোটখাটো রচনা এবং ইবনে কিফতির জীবনীমূলক শব্দকোষ অনুবাদ করেন। এমনকি ষোড়শ শতকের পরেও বহু অনুবাদ সম্পন্ন হয়। এগুলি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে বিশেষ করে উত্তর ইটালী ও ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়।
এমনিভাবে গ্রীক ও আরবী রচনার শত শত অনুবাদ ইউরোপের উষর বৈজ্ঞানিক ভূমিতে আবির্ভূত হয়। এগুলি ফসলদায়ী বৃষ্টির ভূমিকা গ্রহণ করে। কনস্ট্যান্টাইনের অনুবাদের প্রভাবে সালের্নোতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশিষ্ট শিক্ষকদের একটি শ্রেণীর সৃষ্টি হয়। দেহব্যবচ্ছেদ চর্চা পুনরুজ্জীবনের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শল্যচিকিৎসা সম্পর্কে উৎকৃষ্ট পাঠ্য-পুস্তক প্রকাশিত হয়। যে স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা এতোদিন ধাত্রীদের একচেটিয়া ব্যাপার ছিল তা বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনার বিষয়-বস্তু হয়। চক্ষুরোগ চিকিৎসা ভবঘুরে হাতুড়ে চিকিৎসকদের হাত থেকে শিক্ষিত চিকিৎসকদের চর্চার অধীনে আসে।
দ্বাদশ শতক থেকে বেশ কিছুসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেগুলি নতুন জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এগুলির মধ্যে বলোনিয়া, পাদুয়া, মোনপলিয়া ও প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাইযেন্টাইন আলেকজান্দ্রিয়া ও খলীফা আমলের বাগদাদের ন্যায় সামগ্রিকভাবে প্রাচীন লেখকদের রচনা পাঠ শিক্ষাদানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কারণ এসব রচনা অবশেষে ল্যাটিন ভাষায় পাওয়া যেত। তখনো পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান প্রচলিত হয়নি। উদ্ভিদ বিজ্ঞান, প্রাণী বিজ্ঞান, পদার্থ বিদ্যা ও আলকেমী চর্চা সামগ্রিকভাবে গ্রীক-আরব ঐতিহ্য অনুসরণ করে। ষোড়শ শতক শেষ হওয়ার পরেই বলোনিয়ায় সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে মানুষের দেহ-ব্যবচ্ছেদ করা হয় এবং বৈধ পদ্ধতি প্রমাণ করার উদ্দেশ্যেই তা করা হয়। দেহ-ব্যবচ্ছেদ ও শরীর তত্ত্বের ক্ষেত্রে ইবনে সিনা গ্যালেনের যেসব ভুলভ্রান্তি তুলে ধরেন এতে তার সংশোধন করা যায়নি; কারণ ময়নাতদন্তের চাইতে ঐতিহ্যই শক্তিশালী থাকে।
অবশ্য ব্যবহারিক দিকে অস্ত্রোপচার, স্বাস্থ্য রক্ষা এবং সম্ভবত সর্বোপরি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি সাধিত হয়। মোনপোলিয়ার শল্যচিকিৎসক গাই দ্য চৌলিয়াক কাটাছেঁড়া ও চোখের ছানির নিন্দিত অস্ত্রোপচারে উদ্যোগী হন। মিলানের ল্যানফ্রাঞ্চি ফ্রান্সে বসতি স্থাপন করেন এবং সেখানে রক্তকণিকা ব্যান্ডেজ করার ও ক্ষতস্থানে জোড়া দেওয়ার উন্নত পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। উত্তর ইটালিতে কিছুকাল যাবত না পাকিয়ে বা পুঁজ বের না করে মদ্যযুক্ত পট্টি ব্যবহারের মাধ্যমে কাটা ঘায়ের চিকিৎসা প্রচলিত ছিল।
প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃতি বিজ্ঞানের কেন্দ্র ছিল। টলেডো থেকে ইবনে রুশদের ভাষ্যসহ প্রবর্তিত অ্যারিস্টটলীয় বিজ্ঞান ছিল সেখানকার বিজ্ঞান চর্চার ভিত্তি। রজার বেকন ও তাঁর বৈজ্ঞানিক প্রতিদ্বন্দ্বী আলবার্টাস ম্যাগনাস এখানে বড় বড় মুসলিম বিজ্ঞানীর রচনা ব্যাখ্যা করতেন। রজার বেকনের আলোক বিজ্ঞানের মতবাদ কিভাবে আল হায়সামের থেসাওরাস অপটিকা এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে তা আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। আলবার্ট তাঁর মিনারেলিবাস এ জাবের ও অন্যান্য আরব লেখকের আলকেমী মতবাদের পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি কেবল তাঁর প্রাণীবিদ্যা ও উদ্ভিদ বিদ্যা সংক্রান্ত পর্যালোচনায় কিছুটা মৌলিকত্বের পরিচয় দেন। কিন্তু এসব ক্ষেত্রেও তিনি আরবী অনুবাদের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল ছিলেন। ভিন্সেন্ট দ্য বুভা রচিত বিশ্বকোষ স্পেকুলাম নেচারেল এ জাবেরের প্রভাব অত্যন্ত সুস্পষ্ট। আর্নল্ড অব ভিলানোভা ও রেমাও লালের নামে যেসব আলকেমী সংক্রান্ত গ্রন্থ রয়েছে সেগুলি জাবেরের উদ্ধৃতিতে পরিপূর্ণ। জ্যোতিঃশাস্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরব আলকেমী ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতকে তার প্রাধান্য অক্ষুণ্ণ রাখে।
ষোড়শ শতকের পরে, বিশেষ করে উত্তর ইটালীতে চিকিৎসা শাস্ত্র ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আরবীর চাইতে গ্রীক ভাষা থেকে অনুবাদ অধিক থেকে অধিকতর গুরুত্ব লাভ করে। কোন প্রকার মৌলিক পার্থক্য না থাকা সত্ত্বেও 'গ্রীকবাদ' 'আরববাদের' বিরোধী ছিল। যতোদিন পর্যন্ত প্রাচীনদের গ্রন্থাবলী প্রায় এককভাবে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তি ছিল ততোদিন পর্যন্ত বিজ্ঞানের মতবাদ প্রাধান্য বজায় রাখে। পঞ্চদশ শতকের শেষার্ধে মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃত হওয়ার পর চিকিৎসাশাস্ত্র ও বিজ্ঞানের ওপর গ্রীক-আরবী রচনা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে বারংবার মুদ্রিত হয়। ১৫৩০ থেকে ১৫৫০ খৃস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে আরববাদ তার মরণাঘাত লাভ করে। একই সময়ে কোপার্নিকাস কর্তৃক জ্যোতির্বিজ্ঞানে বিপ্লব সাধিত হওয়ায় প্যারাসেলসাস আলকেমী ও চিকিৎসাশাস্ত্র সংশোধন করেন। তিনি তাঁর ছাত্রদের গ্যালেন ও ইবনে সিনা পরিহার করে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে ফিরে আসার জন্য অবিরামভাবে তাগিদ দেন। ১৫৪৩ খৃস্টাব্দে কোপার্নিকাসের ডি রিভল্যুশনিবাস অর্বিয়াম কালেস্টিয়াম প্রকাশিত হওয়ার একই বছরে আদ্রিয়াস বিসালিয়াস তাঁর মৌলিক নতুন অ্যানাটমি সম্পাদিত করেন। এই বছর চিকিৎসাশাস্ত্র ও বিজ্ঞানে মধ্যযুগের সমাপ্তি সূচনা করে এবং এর সঙ্গে সঙ্গে আরব বিজ্ঞানের সরাসরি প্রভাবেরও কার্যত পরিসমাপ্তি ঘটে।
কিন্তু এতদসত্ত্বেও আরববাদ অব্যাহত থাকে। ১৫২০ খৃস্টাব্দেও ভিয়েনায় এবং ১৫৮৮ খৃস্টাব্দে ফ্রাঙ্কফুর্ট অন দি ওডারে চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত পাঠ্যসূচী প্রধানত ইবনে সিনার ক্যানন ও রাযীর ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এমনকি ফ্রান্স এবং জার্মানীতে সপ্তদশ শতকেও কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তি আরব জ্ঞানচর্চা অব্যাহত রাখেন। এদিকে উত্তর ইটালীতে গ্রীকবাদী ও আরববাদীদের মধ্যে সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। আধুনিক বিজ্ঞান পদ্ধতির আবির্ভাবে উভয় পক্ষ পর্যুদস্ত না হওয়া পর্যন্ত এই সংগ্রাম চলতে থাকে। উনবিংশ শতকের সূচনা পর্যন্ত আরব ভেষজ-বিজ্ঞান টিকে ছিল। ইবনে আল-বাইতারের সিমপ্লিসিয়া এর ল্যাটিন অনুবাদ ১৭৫৮ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত ক্রিমোনায় মুদ্রিত হয়। সেরাপিয়ন ও মেসিউ দি ইয়ংগারের গ্রন্থাবলী ১৮৩০ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত পঠিত হয় এবং ইউরোপীয় ভেষজ বিজ্ঞানে ব্যবহারের জন্য সংক্ষিপ্ত করা হয়। ১১৮৪ খৃস্টাব্দে মেচিযার কর্তৃক গ্রীক, আরবী ও পারস্য সূত্র থেকে চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে যে আরমেনীয় গ্রন্থ সংকলিত হয় তা ১৮৩২ খৃস্টাব্দেও ভেনিসে পুনর্মুদ্রিত হয়। প্রাণীবিদ্যা সংক্রান্ত ১৮৩৮ খৃস্টাব্দের একটি প্রাচীন জার্মান গ্রন্থে আমি 'গেকো' নামক প্রাচ্য দেশীয় একটি নিরীহ অথচ বিষাক্ত গিরগিটি সম্পর্কে যাবতীয় রূপকথা দেখতে পেয়েছি। এসব কাহিনী আদ-দামিরির লাইফ অব অ্যানিমেল্স গ্রন্থে দেখা যায়।
চিকিৎসা শাস্ত্রের কোন কোন শাখায় গ্রীক-আরব ঐতিহ্য দীর্ঘকাল যাবত অব্যাহত থাকে। এমনকি ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও এগুলির চর্চা হয়। ভেসালিয়াস নিজেই চোখের অস্ত্রোপচার সম্পর্কে গ্যালেন ও ইবনে সিনার কতিপয় ভুলভ্রান্তি অপরিবর্তিত রাখেন এবং এগুলি আনুমানিক ১৬০০ খৃস্টাব্দের আগে পর্যন্ত সংশোধিত হয়নি। একটি জমাট তরল পদার্থ হিসাবে নয় বরং লেন্সের সুদৃঢ় অস্বচ্ছতা হিসাবে ছানির প্রকৃত বৈশিষ্ট্য ১৬০৪ খৃস্টাব্দে ফরাসী চিকিৎসাবিদ পিয়ের ব্রিসো আবিষ্কার করেন। আলেকজান্দ্রিয়ার অ্যান্টিলস কর্তৃক বর্ণিত এবং রাযী ও আলী ইবনে ঈসা কর্তৃক প্রচারিত সুইয়ের সহায়তায় প্রাচীন পদ্ধতিতে ছানির অস্ত্রোপচার ইংল্যান্ডে ১৭৮০ খৃস্টাব্দের দিকেও পার্সিভ্যাল পট কর্তৃক এবং জার্মানীতে ১৮২০ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত অনুসৃত হয়।
মুসলিম প্রাচ্যে প্রাচীন বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা বিষয়ক ঐতিহ্য এখনো জনপ্রিয় চিকিৎসা হিসাবে এবং গ্রাম্য নরসুন্দরদের মধ্যে পুরোপুরি প্রচলিত। এই গ্রন্থকার যেদিন এই কথাগুলি লিখছিলেন ঠিক সেদিনই কায়রোতে জনৈক ভবঘুরে সুদানী হাতুড়ে ডাক্তারকে অ্যান্টিলস ও ইবনে সিনার নির্দেশ অনুযায়ী কোন এক ব্যক্তির ছানি অস্ত্রোপচার অবলোকন করেন। মরক্কো থেকে ভারত পর্যন্ত দেশী ভেষজবিদগণ চিরাচরিত অভ্যাসবশত আরব চিকিৎসাবিদদের আকরাবাজিন্স অনুসরণ করে তাঁদের ওষুধ তৈরি করেন। পূর্বাপর বিষয় বিবেচনা করে আমরা এ কথা বলতে পারি যে, গ্রীকদের দিবা অবসানের পর মুসলিম চিকিৎসাশাস্ত্র ও বিজ্ঞান গ্রীক সূর্যের আলো বিকিরণ করে এবং তা পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় প্রজ্বলিত হয়ে মধ্যযুগীয় ইউরোপের গভীর তমসাচ্ছন্ন রাত্রিকে আলোকিত করে। কোন কোন উজ্জ্বল নক্ষত্র তাদের নিজস্ব আলোও প্রদান করে। রেনেসাঁর নতুন দিনের আবির্ভাবে এই চন্দ্র এবং নক্ষত্রগুলিও বিলুপ্ত হয়। যেহেতু সেই মহান আন্দোলনের দিকনির্দেশে ও প্রবর্তনে তাদের অবদান রয়েছে সেজন্য যুক্তিযুক্তভাবেই একথা দাবি করা যেতে পারে যে, তারা আমাদের মধ্যেই রয়েছে।
টিকাঃ
১. ১৮২৮ খৃস্টাব্দে উৎকীর্ণলিপিটি প্রথম পাঠ করে এম রিনাউদ উপরোক্ত নামটি দিয়েছেন। কিন্তু এম ম্যাক্সভ্যান বার্চেম এটি সংশোধন করে পৈতৃক হানফার-এর স্থলে মানআহ নাম দিয়েছেন।
১. আনজু রাজ বংশের প্রথম চার্লসের পৃষ্ঠপোষকতায় জিরজেন্টির সিসিলীয় ইহুদী চিকিৎসাবিদ ফারাজ ইবনে সালিম ল্যাটিন ভাষায় হাওউই অনুবাদ করেন।
১. আক্ষরিক অর্থ রাজকীয় পানি; এটি সোনা ও প্লাটিনাম দ্রবণে সক্ষম বলে এই নামে অভিহিত।
২. মূল আরবী রাহজ আল-গার (রাহজ) গুঁড়া+আল-গার, গুহাবা খনি), কমলা রঙের খনিজ পদার্থ, আতসবাজি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
৩. মূল আরবী আল-আণবিক।
৪. মূল আরবী আল-উল্লি।
১. ইবনে সিনার মেটাফিজিক্স সংক্রান্ত বইটির নাম ইলমূল ইলাহিয়্যাত, যার অর্থ 'স্বর্গীয় ব্যাপারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের জ্ঞান।'
২. আরবীতে ডিগ্রীধারীর জন্য নয়, পদের জন্য শব্দ ব্যবহার করা হয়।
১. পুরো নাম গাইয়াস প্লিনিয়াস সেকাস্তাস, রোমান প্রকৃতি বিজ্ঞানী ও গ্রন্থকার, জীবিতকাল ২৩-৭৯ খৃ। জ্যেষ্ঠ প্লিনি নামে পরিচিত।
১. ফরাসী ভাষায় এল গথিয়ার কর্তৃক এই রচনার অনুবাদ প্রকাশিত হয়। অ্যাকর্ড ডি লা রিলিজিয়ন এট ডি লা ফিলসফি। ট্রেইটি ডি ইবনে রুশদ, আলজার, ১৯০৫। স্পেনীয় ভাষায় এম অ্যাসিন কর্তৃক সেন্ট টমাসের তুলনাসহ এবং অত্যন্ত মূল্যবান ঐতিহাসিক ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণসহ এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়। হোমেনাজে এ ডি ফ্রান্সিস্কো কডেরা, মাদ্রিদ, ১৯০৪, পৃ. ২৭১ থেকে।
১. আক্ষরিক অর্থ রাজকীয় পানি; এটি সোনা ও প্লাটিনাম দ্রবণে সক্ষম বলে এই নামে অভিহিত।
১. দক্ষিণ আকাশের 'আর্গো' তারকাপুঞ্জের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র।
১. পুরো নাম উইলিয়াম হার্ভি। ইংরেজ চিকিৎসাবিদ, যিনি রক্ত সংবহন প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন।
২. পুরো নাম ভেসালিয়াস আদ্রিয়াস, ১৫১৪-১৫৬৪, ইটালীতে বসবাসকারী ফ্লেমিশ অ্যানাটমিস্ট।
১. ন্যাপলসের অদূরে দক্ষিণ-পূর্ব ইতালী।
১. তৃতীয় ক্রুসেডের সময় মিসরের সুলতান সালাহউদ্দিন কর্তৃক ছদ্মবেশে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম রিচার্ডের দুরারোগ্য ব্যাধি চিকিৎসার কাহিনী প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য।
১. অ্যারিস্টটলের যেসব অনুসারী তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণের সময় 'লাইসিয়াম' নামে এথেন্সের একটি উদ্যানে ইতস্তত বিচরণ করতেন।
১. পুরো নাম নিকোলাস কোপার্নিকাস (১৪৭৩-১৫৪৩), পোলিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের নিম্নোক্ত মতবাদের প্রবক্তা: গ্রহসমূহ সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণ করে; পৃথিবী তার কক্ষপথে আবর্তিত হওয়ার দরুনই নক্ষত্রসমূহের উদয়াস্ত বোঝা যায়।
১. পুরো নাম ফিলিপাস ওরিগুলাস প্যারাসেলসাস (১৪৯৩/-১৫৪১), সুইজারল্যাণ্ডে জন্মগ্রহণকারী জার্মান চিকিৎসাবিদ ও আলকেমী বিশেষজ্ঞ।
১. জার্মান শব্দ যার অর্থ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ও জীবন সম্পর্কে ব্যক্তি বিশেষের দর্শন বা ধারণা।
১. এই অংশটির পরিবর্তন, সংশোধন ও এ সম্পর্কে কতিপয় পরামর্শ দানের জন্য চার্লস সিগারের কাছে গ্রন্থকার অত্যন্ত ঋণী।
📄 সঙ্গীত
যে দুস্তর ব্যবধান প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সঙ্গীত শিল্পকে বিচ্ছিন্ন রেখেছে তা বিবেচনা করলে ইউরোপীয় সঙ্গীতে কোন আরব বা মুসলিম উত্তরাধিকারের অস্তিত্ব উপলব্ধি করা দুঃসাধ্য। ইউরোপীয়রা সঙ্গীতকে উল্লম্বভাবে এবং আরবরা সমান্তরালভাবে দেখে, সাধারণভাবে বলতে গেলে যে হার্মনিক ও মেলডিক মূলনীতি যথাক্রমে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের সঙ্গীত শিল্পের মধ্যে নিহিত এটিই হচ্ছে তার বোধগম্য পার্থক্য। তাছাড়া স্বর, ছন্দ ও মেলডিকে সুশোভিত করার ব্যাপারে আরবদের যেসব ধারণা রয়েছে তা আমাদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। অবশ্য দশম শতকের আগে দুটি শিল্পের পার্থক্য তেমন বিরাট ছিল না। বস্তুত দুটিকে একটি সাধারণ পর্যায়ে নিয়ে আসা যেতো বলে তাদের মধ্যেকার পার্থক্য ছিল অতি সামান্য। কোন এক সময় উভয়েরই একই পিথাগোরিয়ান স্বরগ্রাম ছিল। উভয়টিই কিছুটা গ্রীক ও সিরীয় উপাদানে গঠিত ছিল। সর্বোপরি বর্তমানে আমরা হার্মনি বলতে যা বুঝি তা অজ্ঞাত ছিল। এ দুটির মধ্যে যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল তা হচ্ছে, আরবরা এক ধরনের পরিমাপমূলক সঙ্গীত পদ্ধতির অধিকারী ছিল এবং তাদের মেলডিকে সুশোভিত করার একটি সুনির্দিষ্ট ধারণা ছিল। এই দুটিই যথাসময়ে পাশ্চাত্য সঙ্গীতকে প্রভাবিত করে।
সেমিটিক তত্ত্ব এবং প্রাচীনতর কালের চর্চা হচ্ছে আরব সঙ্গীতের উৎস। প্রকৃত ভিত্তি না হলেও এ দুটি গ্রীক সঙ্গীত তত্ত্ব ও চর্চাকে প্রভাবিত করেছে। ইসলামের আবির্ভাবের অব্যবহিত পূর্বে আরব রাজ্য আল-হিরা ও গাসসান নিঃসন্দেহে যথাক্রমে পারস্য ও বাইযেন্টাইন রীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই দুটি সাম্রাজ্যে সম্ভবত পিথাগোরিয়ান স্বরগ্রাম প্রচলিত ছিল। মূলত সেমাইটরাই এই স্বরগ্রামের উৎস।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে আমরা দেখতে পাই যে, তৎকালীন রাজনৈতিক কেন্দ্র আল-হিজাযে পরিমাপমূলক সঙ্গীত প্রচলিত ছিল। এটিকে ইকা বা ছন্দ বলা হতো, প্রায় একই সময়ে ইবনে মিসজাহ নামক জনৈক সঙ্গীতজ্ঞ সঙ্গীতের একটি নতুন মতবাদ প্রবর্তন করেন। এই মতবাদে পারস্য ও বাইযেন্টাইন উপাদান ছিল। কিন্তু পরলোকগত ড. জে পি এন ল্যান্ড মন্তব্য করেন : "পারস্য ও বাইযেন্টাইন উপাদান জাতীয় সঙ্গীতকে ছাড়িয়ে যায়নি, বরং নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন আরব ভিত্তিভূমির ওপর এগুলি গ্রথিত হয়।" এই পদ্ধতির স্বরগ্রাম পিথাগোরিয়ান বলে মনে হয়। ১২৫৮ খৃস্টাব্দে বাগদাদের পতন পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে।
ইতিমধ্যে কতিপয় পরিবর্তন সাধিত হয়। স্বরগ্রামে এগুলি এতোটা গোলযোগপূর্ণ ছিল যে, ইসহাক আল মাউসিলি এই মতবাদকে এর সাবেক পিথাগোরিয়ান আদর্শে পুনর্গঠিত করেন। আল ইস্ফাহানী পর্যন্ত এই পদ্ধতি অব্যাহত ছিল। তার সময় থেকে পুনরায় উপরোক্ত ধ্যানধারণা সমূহের আবির্ভাব ঘটে। এই শেষোক্ত ধ্যানধারণা হচ্ছে যালযালিয়ান ও খুরাসানিয়ান স্বরগ্রাম। প্রাচীনতর পদ্ধতিকে ভিত্তি হিসাবে সংরক্ষণে প্রাচীন গ্রীক মতবাদ সহায়তা করে। অ্যারিস্টটল, অ্যারিস্টক্সেনাস, ইউক্লিড, নিকোমেচাস, টলেমী ও অন্যদের রচনা অনুবাদের মাধ্যমে এই মতবাদের সংমিশ্রণ ঘটে। এসব আমদানি সত্ত্বেও আমরা আল-কিন্দী, আল ইসফাহানী ও ব্রিদরেন অব পিউরিটির মাধ্যমে জানতে পারি যে, আরব পারস্য ও বাইযেন্টাইন সঙ্গীত পদ্ধতি তাদের আলাদা সত্তা বজায় রাখে। একাদশ শতকের দিকে পারস্য ও খোরাসানী ধ্যানধারণা প্রবর্তিত হয় এবং তা বিশেষভাবে সঙ্গীতের মেজাজের ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায়। পরবর্তীকালে সাইফুদ্দিন আবদুল মুমিন নামক জনৈক তাত্ত্বিক একটি নতুন তত্ত্ব প্রবর্তন বা পদ্ধতিবদ্ধ করেন। অপরদিকে মধ্য যুগ শেষ হওয়ার আগে এক-চতুর্থাংশ স্বর পদ্ধতি নামে অপর একটি স্বরগ্রাম প্রবর্তিত হয়। এটি বর্তমানে প্রাচ্যের আরবদের মধ্যে দেখা যায়। আরব সঙ্গীত পারস্য ও বাইযেন্টাইন চর্চার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, একথা আরবরা প্রকাশ্যে স্বীকার করেন। অপরদিকে পারস্য এবং বাইযেন্টিয়ানবাসীরাও আরব সঙ্গীত শিল্প থেকে বহু কিছু ধার করেছেন।
সঙ্গীত চর্চা
আরবদের কাছে সঙ্গীতের অর্থ কি সহস্র ও এক রজনীতে তা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে। অবশ্য এই শিল্পের প্রতি আরবদের গভীর অনুরাগের পরিচয় ইবনে 'আবদ রাব্বিহির অনন্য কণ্ঠস্বর, আল ইসফাহানীর বৃহৎ সঙ্গীত গ্রন্থ ও আল নুওয়াইবির গ্রন্থে প্রকৃষ্টভাবে পাওয়া যায়। দুর্ভাগ্যবশত এগুলি এখনো কেবল আরবী ভাষাতেই পাওয়া যায়। এখানে আমরা দেখতে পাই যে, শৈশবের দোলনা থেকে সমাধি পর্যন্ত, শিশুর ঘুমপাড়ানি গান থেকে অন্ত্যেষ্টিগাথা পর্যন্ত সঙ্গীত আরবদের নিত্যসঙ্গী। সুখ, দুঃখ, কর্মমুখরতা, খেলাধুলা, যুদ্ধ-বিগ্রহ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রভৃতি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব সঙ্গীত ছিল। ঐ সময়কার প্রায় প্রত্যেক সচ্ছল আরবের নিজস্ব গায়িকা ছিল। বর্তমানে আমাদের ঘরে ঘরে যেমন পিয়ানোফোর্টি বাদ্যযন্ত্র দেখা যায়, তাদেরও ছিল ঠিক তাই।
অবশ্য আমরা এখানে প্রধানত জনগণের সঙ্গীতের ব্যাপারে আলোচনা করছি না। যেমনটি ইবনে খলদুন বলেছেন, শিল্পী না হলে প্রকৃত পক্ষে কোন শিল্পেরই সূচনা হয় না। আমরা প্রাক ইসলামিক যুগে এক শ্রেণীর পেশাদার সঙ্গীত শিল্পীর সন্ধান পাই। ইসলামে 'গান শোনা' নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও খিলাফতের আমলে এই শ্রেণীর সঙ্গীত শিল্পীরা অত্যন্ত সমাদৃত ছিলেন। বস্তুত আরবরা সঙ্গীতের সকল শাখায় যেভাবে এর চর্চা করেন তার তুলনায় অন্য যেকোন দেশের ইতিহাসে সঙ্গীত চর্চা তুচ্ছ। আরবদের কাছে সব সময় নির্ভেজাল যন্ত্রসঙ্গীতের চাইতে কণ্ঠ সঙ্গীত অধিকতর সমাদৃত ছিল। এর পিছনে কবিতার প্রতি বিশেষ অনুরাগ কিছুটা দায়ী। অবশ্য যন্ত্র সঙ্গীতে আইনগত বিধিনিষেধও এর অন্যতম কারণ। গীতি কবিতা বা কাসিদা ছাড়াও কণ্ঠসঙ্গীতের পদ্যরীতির মধ্যে খণ্ড কবিতা, গযল বা প্রেমের গান এবং অধিকতর জনপ্রিয় মাওয়াল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাশ্চাত্যে যাজাল ও মুওয়াশাহ-এর ন্যায় শেষোক্ত রীতিগুলি প্রবর্তিত হয়েছে। বিশেষ ধরন বা স্বরগ্রামে গঠিত মেলডি পরিমাপমূলক অর্থাৎ ছন্দযুক্ত হতে পারে, অথবা নাও হতে পারে। প্রত্যেক সঙ্গীত শিল্পী মিলযুক্তভাবে কিংবা স্বরাষ্টকে গাইতেন বা বাজাতেন। আমরা যে আকারে হার্মনি বুঝি তা অজ্ঞাত ছিল। এর স্থলে আরবরা মেলডিকে সুশোভিত করতেন। এতে সময় সময় যুগপৎভাবে চতুর্থ, পঞ্চম অথবা অষ্টমে মেলডির একটি স্বর ধ্বনিত হতো। এই পদ্ধতি তারকিব বা যৌগিক নামে পরিচিত ছিল। মেলডি পদ্ধতির সঙ্গে যেসব বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হতো তার মধ্যে আবশ্যিকভাবে ছিল বীণা, প্যান্ডোর, সন্টারি কিংবা বাঁশি। অপর দিকে ড্রাম, ট্যাম্বোরিন, কিংবা ওয়ান্ড সঙ্গীতের ছন্দ জোরদার করে তুলতো। এ ছাড়াও ছিল অনেক ছোটখাটো বাদ্যযন্ত্র, কিন্তু এগুলি প্রায়ই কণ্ঠ সংগীতের গৌরচন্দ্রিকা কিংবা বিরতিকালীন যন্ত্র সঙ্গীত হিসাবে ব্যবহৃত হতো। সম্ভবত সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গীত রীতি ছিল নাউবা। এতে কণ্ঠ ও যন্ত্র সঙ্গীতের কতিপয় সুরের সমন্বয় করা হতো। এই রীতি বিশেষভাবে পাশ্চাত্যে বিকাশ লাভ করে। এ পর্যন্ত যেসব সঙ্গীতের বিষয় আলোচনা হয়েছে তাকে মোটামুটি কক্ষ সঙ্গীত বলা যেতে পারে। কারণ মাঝে মাঝে আমরা অত্যন্ত বড় বড় বাদক দলের কথা পড়ে থাকলেও সাধারণত এদের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত ছোট।
কোন মিছিল বা সামরিক মহড়ার উপযোগী মুক্তাঙ্গনের সঙ্গীতে সাধারণত নিম্নোক্ত ধরনের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হতো; রীডপাইপ, সিঙ্গা, রণভেরী, ড্রাম, দামামা এবং করতাল। মুসলমানদের সামরিক মহড়ায় সামরিক বাদকদল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি সামরিক কৌশলের একটি বিশেষ দিক হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। পদস্থ সামরিক অফিসারদের অধীনে বাদকদল থাকতো এবং এসব দলের আকার তাঁদের মর্যাদা অনুসারে নির্ধারিত হতো, যেমনটি নির্ধারিত হতো সামরিক নাউবা-য় ভেরী নিনাদের সংখ্যা। সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্রের প্রতি, বিশেষ করে শেষোক্তটির প্রতি ধর্মীয় নিন্দাবাদ থাকা সত্ত্বেও সঙ্গীতের আধ্যাত্মিক প্রতিফল সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃতি লাভ করে। সূফীরা এটিকে পরম আনন্দাবিষ্টতার মধ্য দিয়ে প্রত্যাদেশ লাভের একটি পন্থা হিসাবে দেখেন। দরবেশ ও তাপসরা এরই মাধ্যমে তাদের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ন্ত্রণ করে। আল গায্যালী বলেছেন, "আনন্দাবিষ্টতার অর্থ এমন অবস্থা যা সঙ্গীত শ্রবণের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়।" অন্যত্র তাঁর সঙ্গীত এবং পরম আনন্দাবিষ্টতা গ্রন্থে তিনি নিম্নোক্ত বক্তব্যের সমর্থনে ৭টি কারণ প্রদর্শন করেন; আনন্দাবিষ্ট অবস্থা সৃষ্টিতে স্বয়ং কুরআনের চাইতেও গানের ক্ষমতা বেশি। সহস্র ও এক রজনীতে বলা হয়েছে: "কারো কারো সঙ্গীত হচ্ছে মাংস এবং অন্যদের কাছে ওষুধ।" 'সঙ্গীতের প্রভাবের' মতবাদ থেকেই এই অহমিকার সৃষ্টি হয়েছে। বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মনোভাব, পরিমণ্ডলের ঐকতান এবং সংখ্যাতত্ত্বের মূলনীতিতে বিশ্বাসের সঙ্গে এই মতবাদ বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সাঙ্গিতিক আরোগ্য বিজ্ঞানের এই মতবাদ ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে।
স্বাধীন লোকদের মধ্যে উৎসব উপলক্ষে সর্ব প্রকার বাদ্যযন্ত্র দেখা যেতো। কিন্তু মেয়েদের মধ্যে তাম্বুরা বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। ভবঘুরে চারণেরও নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র ছিল। তিনি সাধারণত একটি মৃদঙ্গ ও বাঁশি বহন করতেন। এক হাতে মৃদঙ্গ বাজাতেন এবং অপর হাতে বাঁশির ছিদ্রে অঙ্গুলি চালনা করতেন। মাথায় ছোট ছোট ঘন্টা বাঁধা মুকুট পরতেন এবং সুরের তালে তালে মাথা আন্দোলিত করতেন। সমরকন্দ থেকে আটলান্টিক পর্যন্ত সঙ্গীতের পরিভাষা প্রাচ্যে সঙ্গীত চর্চায় আরবদের প্রত্যক্ষ অবদানের যথেষ্ট প্রমাণ বহন করে।
বাদ্যযন্ত্র
আরবীতে বাদ্যযন্ত্রের নাম অসংখ্য এবং এখানে তার ১-১০মাংশ নিয়ে আলোচনা করাও সম্ভব নয়। আরবরা বাদ্যযন্ত্র তৈরিকে ললিত কলায় উন্নীত করেন। বাদ্যযন্ত্র তৈরি সম্পর্কে বহু গ্রন্থ রচিত হয়েছে এবং সেভিলের ন্যায় কতিপয় শহর বাদ্যযন্ত্র তৈরিতে খ্যাতি অর্জন করে। শুধু বীণাই বিভিন্ন শ্রেণীর ও আকারের ছিল। প্রাক-ইসলামী যুগের বীণা ছিল চামড়ার পেটওয়ালা। তাদের ক্লাসিক্যাল বীণা অনেকটা আধুনিক ম্যান্ডেলিনের মতো ছিল। এ ছাড়া এ জাতীয় বৃহত্তর আকারের বাদ্যযন্ত্রকে বলা হতো পূর্ণাঙ্গ বীণা। তাদের শাহরুদ ছিল আধুনিক আর্কলিউট। এ ছাড়া আমরা বেশ কয়েকটি বড় আকারের বাদ্যযন্ত্রের ছবি দেখতে পাই। তাদের প্যান্ডোর শ্রেণীর বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে বৃহদাকারের তানবুর তার্কি থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র আকারের তানবুর বিগিলা পর্যন্ত বহু রকমের বাদ্যযন্ত্র ছিল। এ ছাড়া ছিল মুরাব্বা' নামে পরিচিত গিটার। এটি ছিল চেপ্টা বক্ষযুক্ত আয়তাকার বাদ্যযন্ত্র। পরবর্তীকালে এটি কিতারা নামে পরিচিত হয়। আমাদের কাছে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাদের বক্রাকারের বাদ্যযন্ত্র। প্রথমে এগুলি তাদের শ্রেণীগত রাবাব নামে পরিচিত ছিল। এগুলিও বড় ছোট এবং বিভিন্ন আকারের দেখা যায়। এর মধ্যে কামানজা ও গিশাক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। খোলা তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্রগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল হার্প, সন্টারি এবং ডালসিমার।
কাঠের বায়ু চালিত বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে ছিল বহু আকারের বাঁশি। প্রায় ৩ ফুট লম্বা নাইবাম থেকে শুরু করে ১ ফুট ও তার চাইতেও কম লম্বা শাব্ব্বাবা এবং জুয়াক। আর একটি বাঁশির নাম ছিল সাফফারা। নলের বাঁশির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল যাম্র, সারনাই, যুলামী ও গাইতা। এই জাতীয় বাক্ ছিল ধাতুর তৈরি।
তাম্বুরা বা খঞ্জনি জাতীয় বাদ্যযন্ত্রকে সাধারণত দক্ বলা হতো। এটি বিশেষভাবে বর্গাকৃতির ছিল। গোলাকার বাদ্যযন্ত্রগুলি আকার ও নির্মাণ কৌশল অনুযায়ী তার, দাইয়া ইত্যাদি নামে পরিচিত ছিল। ঢাক জাতীয় বাদ্যযন্ত্রগুলিও তবল, নাক্কারা, কাস'আ ইত্যাদি বহু ধরনের ছিল। করতালের নাম ছিল কাঁসা। থালা আকৃতির চেপ্টা ছোট করতালকে সিন্জ বলা হতো। আরবদের মধ্যে বায়ু চালিত অর্গ্যান এবং পানি চালিত অর্গ্যান উভয়টিই প্রচলিত ছিল। এছাড়া তাদের মধ্যে সম্ভবত অর্গানিস্টামও প্রচলিত ছিল। শেষোক্তটি মধ্যযুগীয় ইউরোপে সুপরিচিত ছিল এবং দেখতে অনেকটা আধুনিক হার্ডিগার্ডির মতো ছিল। এ জাতীয় আরেকটি বাদ্যযন্ত্র ছিল আল-শাকিরা।
বিভিন্ন বিবরণ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, আরবরা বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্রের উদ্ভাবক এবং সংস্কারক ছিলেন। আল-ফারাবী সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি রাবাব ও কানুনের উদ্ভাবক ছিলেন, আল-যুনাম নাই যুনামী বা যুলামী নামে প্রচলিত বায়ুচালিত বাদ্যযন্ত্র তৈরি করেন; যালযাল 'উদ আল শাদ্ভুত প্রবর্তন করেন; দ্বিতীয় আল-হাকাম নলের বাক-এর সংশোধন সাধন করেন; যিরিয়াব নতুন ধরনের বীণা প্রবর্তন করেন; আল-বাইয়াসি ও আবুল মাজদ উভয়েই ছিলেন অর্গ্যান নির্মাতা; এবং সফিউদ্দীন আবদুল মুমিন নুহা নামে একটি বর্গাকৃতির সন্টারী ও মুগনি নামে অপর একটি বাদ্যযন্ত্র আবিষ্কার করেন।
নবম শতকের প্রথম দিক থেকে এক ধরনের স্বরলিপি প্রচলিত থাকলেও অধিকাংশ শিল্পী শ্রবণের মাধ্যমে তাদের সঙ্গীত আয়ত্ত করেন। কোন কোন সুরকার বিশ্বাস করতেন যে, জ্বিনের প্রেরণায়ই তারা সঙ্গীত রচনা করেন। আরব চারণ কবিদের পোশাক-আশাক ও চেহারা-সুরত বিশেষভাবে লক্ষণীয়। লম্বা চুল, চিত্রিত চেহারা ও হাত এবং উজ্জ্বল রং এই শ্রেণীর গায়কদের বৈশিষ্ট্য। এরা ইসলামের প্রাথমিক যুগের মেয়েলী স্বভাবসুলভ মুখান্নাসুন-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কণ্ঠশিল্পীদের মধ্যে অনেকেই ছিল এতিরাতি। কেউ কেউ শাস্তি হিসাবে এই পেশায় নিয়োজিত হতো এবং অন্যরা সম্ভবত বালকদের কণ্ঠ জনপ্রিয় ছিল বলে এই পেশা গ্রহণ করতো। খলীফার দরবার থেকে গায়কদের পৃষ্ঠপোষকতা করা হতো। কেবল শিল্পী হিসাবে নয়, শিল্পীকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যেও এরূপ পৃষ্ঠপোষকতা করা হতো। সঙ্গীত পেশার সূত্রে শিল্পী বহু পরিবারে যাতায়াত করতো। সেখানে মদের পেয়ালার সংস্পর্শে অনেক গোপন রাজনীতি প্রকাশ হয়ে পড়তো। তাছাড়া মতামত প্রচারে গানের চাইতে কার্যকর মাধ্যম আর কিছু ছিল না। আরবদের অনুকরণকারী প্রভেন্সের ধর্মদ্রোহী টুবাডুরদের জংলাররাও এভাবে নিজেদের প্রচার কার্য চালাতো।
সঙ্গীত বিষয়ক গ্রন্থ রচয়িতা
আরবী সাহিত্যের এক বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে সঙ্গীত বিষয়ক রচনা। সঙ্গীতের ইতিহাস, গান সংগ্রহ, বাদ্যযন্ত্র, সঙ্গীতের বৈধ দিক, সৌন্দর্য বোধ এবং সঙ্গীতজ্ঞদের জীবনী এসব রচনার অন্তর্ভুক্ত। এঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম লেখক হচ্ছেন আল-মাসউদী এবং আল-ইসফাহানী। প্রথমোক্ত লেখকের মেডোজ অব গোল্ড গ্রন্থে আমরা প্রাথমিক যুগে আরব সঙ্গীত চর্চার চমকপ্রদ তথ্যাবলী জানতে পারি। তাঁর অন্যান্য রচনায় বাইরের দেশের সঙ্গীত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ২১ খণ্ডে রচিত আল ইসফাহানীর বিশাল গ্রন্থ বৃহৎ সঙ্গীত গ্রন্থ অধিকতর মূল্যবান। ইবনে খলদুন এটিকে 'আরবদের দিওয়ান' নামে আখ্যায়িত করেছেন। এই লেখক সঙ্গীত সম্পর্কে আরো ৪টি গ্রন্থ রচনা করেন। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক আল-ওয়াররাক এর দি ইনডেক্স গ্রন্থটি সঙ্গীত তত্ত্ব ও সঙ্গীত বিজ্ঞানের লেখকদের এবং সঙ্গীত বিষয়ক সাধারণ রচনাসমূহের একটি তথ্যখনি।
পাশ্চাত্যে আমরা প্রায় একই ব্যাপার দেখতে পাই, ইবনে 'আবদ রাব্বিহি'র দি ইউনিক নেকলেস গ্রন্থ প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীতজ্ঞদের জীবনী এবং গোড়াপন্থীদের বিরোধিতার মুখে জোরালভাবে সঙ্গীত চর্চা সমর্থন পেয়েছে। ইয়াহইয়া আল খুন্দুজ আল মুরসী প্রাচ্যের আল ইসফাহানীর অনুকরণে একটি বুক অব সংস রচনা করেন। ইবনুল 'আরাবী ও অন্যরা সঙ্গীতের বৈধতা প্রতিপন্ন করে গ্রন্থ রচনা করেন এবং সে সঙ্গে বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে বহু তথ্য পরিবেশন করেন। বাগদাদের পতনের পর সঙ্গীত বিষয়ক 'বিশিষ্ট লেখকদের' প্রায় বিলুপ্তি ঘটে। তাদের স্থলে একদল ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞের আবির্ভাব হয়। তাঁরা সঙ্গীতের বৈধতার পক্ষে বা বিপক্ষে নানা প্রকার যুক্তি তুলে ধরেন। সঙ্গীত সম্পর্কে পূর্বের ন্যায় যে দু'-একটি রচনা দেখা যায় সেগুলি হচ্ছে ইবনে খালদুনের প্রলেগোমেনা এবং আল-ইবশিহির মুসতাতরাফ।
সঙ্গীত তত্ত্ববিদ
সঙ্গীত তত্ত্বের যে প্রথম লেখক সম্পর্কে আমরা সুনির্দিষ্টভাবে অবগত রয়েছি তিনি হচ্ছেন ইউনুস আল-কাতিব। তাঁর পরেই রয়েছে আরবী ছন্দশাস্ত্রের সুবিন্যাসকারী ও প্রথম শব্দকোষ সংকলক আল খলিল। দি ইনডেক্স-এ তাঁর বুক অব নোটস ও বুক অব রীদমস তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ইবনে ফিরনাস স্পেনে যা প্রবর্তন করেছেন, সেগুলি সম্ভবত আল খলিলের মতবাদ। ইবনে ফিরনাস আন্দালুসে সর্বপ্রথম সঙ্গীত বিজ্ঞান শিক্ষা দেন। ইসহাক আল-মাউসিলি প্রাচীন আরব পদ্ধতি পুনর্গঠিত করেন এবং বুক অব নোটস এণ্ড রীদমস গ্রন্থে তাঁর মতবাদসমূহ তুলে ধরেন।
অষ্টম থেকে দশম শতকের মধ্যে সঙ্গীত-তত্ত্ব ও স্বর-বিজ্ঞান সম্পর্কিত বহু গ্রীক রচনা আরবীতে অনূদিত হয়। পিথাগোরাসের বলে কথিত একটি রচনা ও প্ল্যাটোর টিমিয়াস আরবী ভাষায় পাওয়া যায়। শেষোক্ত গ্রন্থটি ইউহান্না ইবনে আল বাডরিক কর্তৃক এবং পুনরায় হুনাইন ইবনে ইসহাক কর্তৃক অনূদিত হয়। অ্যারিস্টটলীয় রচনার মধ্যে আরবরা প্রবলেম্যাটা ও ডি অ্যানিমার অধিকারী ছিলেন। উভয়টিই হুনাইন ইবনে ইসহাক অনুবাদ করেন। ডি অ্যানিমা সম্পর্কে গ্রীক লেখকদের যেসব ভাষ্য আরবীতে প্রচলিত ছিল সেগুলি থেমিস্টিয়াস ও সিমপ্লিসিয়াসের রচনা। প্রথমোক্তটির অনুবাদকও হুনাইন। তিনি গ্যালেনের ডি ভসে গ্রন্থটিও অনুবাদ করেন। এসব রচনা থেকেই আরবরা স্বরতত্ত্ব সম্পর্কে তাঁদের অধিকতর বৈজ্ঞানিক ধ্যানধারণা লাভ করেন।
অ্যারিস্টোজেনাস আরবীতে দি প্রিন্সিপালস ও অন রীদম নামক দুটি রচনার জন্য বিখ্যাত। আরবীতে সঙ্গীত সম্পর্কে ইউক্লিডের নামে দুটি রচনা রয়েছে- দি ইন্ট্রোডাকশন টু হার্মনি এবং দি সেকশন অব দি ক্যানন। গ্র্যান্ড বুক অন মিউজিক নামক একটি গ্রন্থে এবং অন্যান্য কতিপয় সংক্ষিপ্ত সারমূলক পুস্তিকায় নিকোমেচাসের রচনা পড়া হতো। গ্রীক রচনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, শেষোক্ত গ্রন্থটি তাঁর বিভিন্ন সংক্ষিপ্ত রচনার সমাবেশ। তাঁর ইন্ট্রোডাকশন টু অ্যারিথমেটিক নামক যে গ্রন্থটিতে প্রসঙ্গক্রমে সঙ্গীত সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে তা সাবিত ইবনে কাররা কর্তৃক অনূদিত হয়েছে। বুক অন মিউজিক গ্রন্থে টলেমীর রচনার পরিচয় পাওয়া যায়। এটি সম্ভবত বর্তমানে আমাদের জ্ঞাত টিটিজ অন হার্মনি। আরবী ভাষায় অন্যান্য যেসব গ্রীক রচনা আমাদের হস্তগত হয়েছে সেগুলি হচ্ছে আর্কিমিডিস ও অ্যাপোলোনিয়াস পার্গিয়াসের রচনা বলে কথিত পানিচালিত অর্গ্যান সংক্রান্ত গ্রন্থাবলী। এ বিষয়ে আরবীতে মুরিসতাস নামে পরিচিত জনৈক লেখকের রচনাও রয়েছে। তিনি বায়ুচালিত অর্গ্যান, হাইডলিস এবং চাইমস সম্পর্কেও গ্রন্থ রচনা করেন।
আরবীতে সঙ্গীততত্ত্ব সম্পর্কে যেসব প্রাচীনতম রচনায় গ্রীক লেখকদের প্রভাব দেখা যায়, সেগুলি আল-কিন্দীর রচনাবলী। তিনি সঙ্গীততত্ত্ব সম্পর্কে ৭টি গ্রন্থ রচনা করেন। এগুলির মধ্যে ৪টি না হলেও অন্তত ৩টি সংরক্ষিত আছে : দি এসেনসিয়ালস্ অব নলেজ ইন মিউজিক; অন দি মেলডীজ; দি নেসেসারী বুক ইন দি কমপোজিশন অব মেলডীজ। আল সারাখসী ও মানসুর ইবনে তালহা ইবনে তাহির তাঁর শিষ্য ছিলেন। সমসাময়িক তাত্ত্বিকরা ছিলেন সাবিত ইবনে কাররা, মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল-রাযী এবং কুসতা ইবনে লুকা। এদেরই পরে আবির্ভাব ঘটে আরব তাত্ত্বিকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম আল-ফারাবীর। তাঁর সঙ্গীত বিষয়ক গ্রন্থাবলী হচ্ছে গ্র্যান্ড বুক অন মিউজিক, স্টাইলস ইন মিউজিক এবং অন দি ক্লাসিফিকেশন অব রীদম্। এ ছাড়া তিনি বিজ্ঞান বিষয়ক তাঁর দুটি বিখ্যাত সংক্ষিপ্ত সার গ্রন্থেও সঙ্গীত সম্পর্কে আলোচনা করেন-দি ক্লাসিফিকেশন অব দি সায়েন্সেস এবং দি অরিজিন অব দি সায়েন্সেস। আল ফারাবী বলেছেন যে, তিনি গ্রীকদের সঙ্গীত বিষয়ক রচনায় বিশেষত এসব রচনার আরবী অনুবাদে, নানা প্রকার ল্যাকিডনা ও অস্পষ্টতা দেখেই তাঁর গ্র্যান্ড বুক অন মিউজিক রচনা করেন। তাঁর পরবর্তী লেখক হচ্ছেন অঙ্ক শাস্ত্রের ওপর শ্রেষ্ঠতম আরব গ্রন্থকার আল-বায়যানী। তাঁর গ্রন্থটি হচ্ছে কমপেণ্ডিয়াম অন দি সায়েন্স অব রীদম। একই সময়ে বিশ্বকোষ রচয়িতা ব্রিদরেন অব পিউরিটি ও মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল খারিযমীর নামও উল্লেখযোগ্য। ব্রিদরেন অব পিউরিটির সঙ্গীত সম্পর্কিত রচনা ব্যাপকভাবে পঠিত হয়। বিজ্ঞানের চাবি গ্রন্থের লেখক আল খারিযমীর অন্যতম রচনা সঙ্গীত তত্ত্বের দ্বার উন্মুক্ত করে।
সঙ্গীত সম্পর্কে বিশেষভাবে বিখ্যাত লেখক ছিলেন ইবনে সিনা। আল-ফারাবীর পরে সঙ্গীত তত্ত্ব সম্পর্কে আরবী ভাষায় তাঁর অবদান সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর শিফা ও নাজাত গ্রন্থে এর পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি ইনট্রোডাকশন টু দি আর্ট অব মিউজিক নামেও একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এ ছাড়া তাঁর ডিভিশন্স অব দি সায়েন্সেস গ্রন্থে সঙ্গীত বিষয়ক কয়েকটি সংজ্ঞা দেখা যায়। তাঁর শিষ্য ইবনে যাইলা বুক অব সাফিসিয়েন্সী ইন মিউজিক গ্রন্থটি রচনা করেন। ইবনে সিনার সমসাময়িক লেখক এবং বিখ্যাত গাণিতিক ও পদার্থ বিজ্ঞানী ইবনে আল-হায়সাম ইউক্লিডের কমেন্টারি অন দি ইনট্রোডাকশন টু হার্মনি ও কমেন্টারি টু দি সেকশন অব দি ক্যানন এর দুটি ভাষ্য রচনা করেন। তিনি মিসরে তাঁর গ্রন্থ রচনা করেন। এখানে আর একজন প্রতিভাবান লেখক আবুল সাত্ উমাইয়া একটি ট্রিটিজ অন মিউজিক গ্রন্থ রচনা করেন। দ্বাদশ শতকের অন্য তাত্ত্বিকরা হচ্ছেন ইবনে আল-নাক্কাশ আল বাহিলী এবং তাঁর পুত্র আবুল মাজদ ও ইবনে মান'আ।
ত্রয়োদশ শতকে আরো বিখ্যাত তাত্ত্বিকদের আবির্ভাব ঘটে। আলমউদ্দীন কাইসার মিসর ও সিরিয়ায় অত্যন্ত খ্যাতিমান গাণিতিক ছিলেন। তিনি বিশেষভাবে সঙ্গীততত্ত্বের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। আরো পূর্বে নাসির উদ্দীন অনুরূপ খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর সঙ্গীত সংক্রান্ত খণ্ড রচনা সংরক্ষিত আছে। মুসলিম স্পেনে ফিরনাসের পর আমরা মাসলামা আল-মাজরিতি ও আল-কিরমানীর রচনা দেখতে পাই। এঁরা ব্রিদরেন অব পিউরিটির রচনাসমূহ জনপ্রিয় করেন। অন্য তাত্ত্বিক ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে আল-হাদ্দাদ এবং জনৈক ইহুদী আবুল ফজল হাসদাই। সঙ্গীত তত্ত্বের ওপর অধিকতর প্রতিভাবান লেখক ছিলেন ইবনে বাজ্জা। পাশ্চাত্যে তাঁর সঙ্গীত সংক্রান্ত গ্রন্থ প্রাচ্যে আল-ফারাবীর গ্রন্থের ন্যায়ই জনপ্রিয় ছিল। ইবনে রুশদ বিখ্যাত কমেন্টারি অন অ্যারিস্টটল্স ডি অ্যানিমা রচনা করেন। এতে স্বর তত্ত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত বুদ্ধি-দীপ্ত আলোচনা করা হয়েছে। ত্রয়োদশ শতকে বিখ্যাত সঙ্গীত তত্ত্ববিদ ইবনে সাব'ইন ও তাঁর সমসাময়িক আল রাকুতির রচনা দেখা যায়। শেষোক্ত ব্যক্তি খৃস্টানদের হাতে মুর্সিয়ার পতনের পর তাদের দ্বারা চতুর্কলা শিক্ষাদানের জন্য নিয়োজিত হন।
ত্রয়োদশ শতকে সফিউদ্দীন আবদুল মুমিন কর্তৃক নতুন পদ্ধতিবাদী ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়। বিখ্যাত শারাফিয়্যা ও বুক অব মিউজিক্যাল মোড় গ্রন্থে তাঁর মতবাদসমূহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। হাজি খলীফার মতে তিনি সঙ্গীততত্ত্ব লেখকদের মধ্যে 'প্রথম সারির' ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন। অতঃপর যাদের নাম উল্লেখ করা হচ্ছে তাদের অধিকাংশই তাঁর অনুসারী ছিলেন। শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে আল মারহুম কাব্যে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। মুহাম্মদ ইবনে ঈসা ইবনে কারা দি এণ্ড অব দি ইনকোয়ারী ইন টু দি নলেজ অব দি মেলডীজ এণ্ড রীদম্স নামক গ্রন্থ রচনা করেন। শাহ শূজা'র নামে উৎসর্গকৃত মাউলানা মুবারকশাহ কমেন্টারি অন দি মিউজিক্যাল মোড় নামক গ্রন্থটি অধিকতর প্রভাব সৃষ্টি করে। এটি সফিউদ্দীন আবদুল মুমিনের মতবাদের ওপর লিখিত অসংখ্য ভাষ্যের অন্যতম। একই পৃষ্ঠপোষকের নামে উৎসর্গকৃত অপর একটি গ্রন্থ হচ্ছে ডিসকোর্সেস অন দি সায়েন্সেস নামে পরিচিত একটি বিশ্বকোষ। এটি সম্ভবত আল-জুরজানি কর্তৃক রচিত। আমর ইবনে খিজর আল কুর্দী দি ট্রেজার অব দি ইনকোয়ারী ইন টু দি মোড্স এণ্ড দি রীদম্স গ্রন্থের রচয়িতা। ইবনে আল-ফানারী তাঁর বিজ্ঞান সংক্রান্ত বিশ্বকোষে সঙ্গীতের বিষয়ও পর্যালোচনা করেছেন। শামসুদ্দিন আল 'আজামীর একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে এপিল অন দি সায়েন্স অব দি মেলডীজ। আল-লাজিকী দি ফাতহিয়্যা নামে পরিচিত একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেন। হাজি খলীফা এই লেখককে সফিউদ্দীন আবদুল মুমিন ও আবদুল কাদির ইবনে গাইবির সমতুল্য মনে করেন। পদ্ধতিবাদী ধারার প্রতিষ্ঠাতার রচনাসমূহের পর সর্বশেষ এবং সম্ভবত সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ রচনা হচ্ছে অজ্ঞাত পরিচয় লেখকের মুহাম্মদ ইবনে মুরাদ টিটিজ।
আরব তাত্ত্বিকদের মূল্য
চতুর্কলা-এ দক্ষ হওয়ার দরুন অধিকাংশ আরব তাত্ত্বিকই অঙ্কশাস্ত্র ও পদার্থবিদ্যায়ও পারদর্শী ছিলেন। গ্রীক রচনাসমূহ তাদের জন্য সঙ্গীতের যে কাল্পনিক মতবাদ ও স্বরের যে বাস্তব ভিত্তি তুলে ধরেন তার অনুকরণে এদের অনেকেই নিজস্ব পন্থায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। এটিই হচ্ছে তাদের রচনার অন্যতম চমকপ্রদ দিক। সফিউদ্দীন কর্তৃক আল-ফারাবী ও ইবনে সিনার সংজ্ঞাসমূহের সমালোচনা এ ধরনের অনুসন্ধিৎসার মনোভাব প্রতিভাত করে। পূর্বসূরিরা যতো বিখ্যাত ব্যক্তিই হোন তাদের বক্তব্য নির্ভুল না হলে তিনি সবিনয়ে তা মেনে নেবেন না। আমরা দেখেছি যে, আল ফারাবী ও ইবনে সিনা উভয়েই গ্রীকরা যা শিক্ষা দিয়েছেন তার উন্নতি ও বিকাশ সাধন করেন। আরব জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যেভাবে টলেমী ও অন্যান্য গ্রীক লেখকের ভুলত্রুটি সংশোধন করেন তেমনিভাবে আরব সঙ্গীততত্ত্ববিদরাও গ্রীক শিক্ষকদের বক্তব্য সংশোধন করেন। আল ফারাবীর সঙ্গীত তত্ত্বের পরিচিতি গ্রীক সূত্র থেকে আমরা যা কিছু পেয়েছি তার থেকে উন্নত না হলেও সুনিশ্চিতভাবে তার সমকক্ষ। স্বরের বাস্তবভিত্তিক মতবাদের ক্ষেত্রে বিশেষত স্বরের শূন্য মণ্ডলীয় বিবরণ সংক্রান্ত প্রশ্নের ক্ষেত্রে আরবরা নিশ্চিতভাবে বেশ কিছুটা অগ্রগতি সাধন করেছেন।
আরব তাত্ত্বিকরা স্বরের পরিমাপসহ বাদ্যযন্ত্রসমূহের যে সতর্ক বর্ণনা প্রদান করেছেন তাতে আমরা তাদের ব্যবহৃত সঠিক স্বরলিপি জানতে পারি। আমরা আল কিন্দী, আল-ফারাবী, আল খারিযমী ও ব্রিদরেন অব পিউরিটি কর্তৃক বর্ণিত বীণা, প্যান্ডোর, হার্প ও বায়ুচালিত বাদ্যযন্ত্রসমূহ সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত হই। ইউরোপে এ ধরনের কোন প্রচেষ্টার শত শত বছর আগে তারা এগুলির সূক্ষ্ম বিবরণ প্রদান করেছেন। তাঁরা যালযালের 'নিউট্রাল থার্ড' ও 'পারস্য থার্ড' সম্পর্কে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান তাতে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে, তারা কেবল গ্রীক সুর পদ্ধতিতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। সফিউদ্দীন প্রবর্তিত পদ্ধতিবাদী ধারা সম্পর্কে স্যার হুবার্ট প্যারী বলেন যে, এটি "এ যাবত উদ্ভাবিত স্বরলিপিসমূহের মধ্যে সব চাইতে পূর্ণাঙ্গ।" হেলম হল্স বলেন, "সুরের মধ্যে প্রধান স্বর হিসাবে তাদের স্বরলিপির ম্যাজিক সেভেন্থ ব্যবহার একটি নতুন ধারণার সৃষ্টি করেছে।"
আরব সঙ্গীতের উত্তরাধিকার
সঙ্গীত জগতে আরবরা যে অবদান রেখে গেছেন তার সারবত্তা উপেক্ষা করার উপায় নেই। আমরা প্রাচ্যের যেকোন দিকেই তাকাই সেখানেই আরবদের ব্যবহারিক শিল্পের প্রভাব দেখতে পাই। পারস্যে আবদুল মুমিনের গ্ল্যাডনেস অব দি সোল, ফখর উদ্দিন আল-রাযীর অ্যাসেম্বলিং অব দি সায়েন্সেস, আল আমুলীর প্রেশাস সায়েন্সেস এবং আবদুল কাদির ইবনে গাইবীর অ্যাসেম্বলিং অব দি মেলডীজ ও অন্যান্য রচনায় আরবদের উত্তরাধিকার সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়। তুরস্কে আল-ফারাবী, সফিউদ্দীন ও আবদুল কাদিরের রচনাসমূহ তুর্কী ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আবদুল কাদিরের পুত্র আবদুল আজিজ ও জনৈক পৌত্র উসমানীয় সুলতানদের চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁরা যেসব গ্রন্থ রচনা করেছেন তাতে আরব ওস্তাদের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা প্রমাণিত হয়। খিজর ইবনে আবদুল্লাহ এবং আহমদ উগলু শুকরুল্লাহর রচনায়ও তাই দেখা যায়। এমনকি ভারতেও আমরা আরবী গ্রন্থসমূহের অনুবাদ দেখতে পাই।
আরব সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগের ফলে পশ্চিম ইউরোপ যেভাবে উপকৃত হয়েছে তা আরো ব্যাপক। ইউরোপ দুটি পন্থায় আরব উত্তরাধিকার লাভ করে। ১. রাজনৈতিক যোগাযোগ, হস্তান্তর ও মৌখিক ভাষার মাধ্যমে ব্যবহারিক শিল্পের উত্তরাধিকার লাভ, এবং ২. সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চামূলক যোগাযোগ, আরবী থেকে অনুবাদ এবং স্পেন ও অন্যত্র মুসলিম শিক্ষা কেন্দ্রসমূহে অধ্যয়নকারী পণ্ডিতদের মৌখিক শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে তাত্ত্বিক শিল্পের উত্তরাধিকার লাভ।
মধ্যযুগে সঙ্গীত তত্ত্ব সম্পর্কে পর্যাপ্ত পরিমাণে আরবী রচনা থাকা সত্ত্বেও ল্যাটিন বা হিব্রু অনুবাদের মাধ্যমে আমরা তার অতি সামান্যই পেয়েছি। গ্রীক রচনার মধ্যে জোহানেস হিস্পালেনসিস অনূদিত অ্যারিস্টটলের ডি অ্যানিমা এবং গ্যালেনের ডি ভসের ত্রয়োদশ শতকের একটি পাণ্ডুলিপি আরবী থেকে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত। আরবদের রচনার মধ্যে আল-ফারাবীর দুটি বিশ্বকোষ জোহানেস হিস্পালেনসিস ও ক্রিমোনার জিরার্ড কর্তৃক ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। জোহানেস হিস্পালেনসিস অনূদিত কমপেণ্ডিয়াম অব অ্যারিস্টটল্স ডি অ্যানিমার মাধ্যমে ইবনে সিনাও ল্যাটিন ভাষায় পরিচিত। আদ্রিয়াস আলপাগাস কর্তৃক এটি পুনরায় অনূদিত হয়। তিনি ডি ডিভিশন সায়েন্টিয়ারাম শিরোনামে ইবনে সিনার বিশ্বকোষও ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল ইবনে রুশদের গ্রেট কমেন্টারি অন অ্যারিস্টটল্স ডি অ্যানিমা। মাইকেল স্কট এটি ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। আরবী থেকে বহু হিব্রু অনুবাদও পশ্চিম ইউরোপে পরিচিত হয়। আমরা ইসাইয়া বেন আইজাক অনূদিত কমেন্টারি অন দি ক্যানন গ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত। ইউক্লিডের সেকশন অব দি ক্যানন ও স্পষ্টত আরবী থেকে হিব্রু ভাষায় অনূদিত হয়। মোসেস ইবনে তিব্বন প্রবলেম্যাটা অনুবাদ করেন। ভ্যাটিকানেও আব্রাহাম ইবনে হাইয়া কর্তৃক আরবী থেকে অনূদিত একটি সঙ্গীত গ্রন্থ পাওয়া যায়। আবুস সান্ত উমাইয়ার ট্রিটিজ অন মিউজিক গ্রন্থটিও সম্ভবত হিব্রু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আল-ফারাবীর সঙ্গীত তত্ত্বের পরিচিতি ইবনে আকনিন কর্তৃক প্রশংসিত হয়। টর্টোসার শেম-তোব আইজাক ইবনে রুশদের কমেন্টারি অন অ্যারিস্টটল্স ডি অ্যানিমা অনুবাদ করেন। কালোনিমাস বেন কালোনিমাস আল-ফারাবীর ক্লাসিফিকেশন অব দি সায়েন্সেস অনুবাদ করেন।
সাহিত্যভিত্তিক যোগাযোগের মাধ্যমে সঙ্গীতে আরব উত্তরাধিকারের প্রমাণ প্রথম দৃষ্টিতে কনস্ট্যান্টাইন দি আফ্রিকানের রচনায় দেখা যায়। তিনি ছিলেন ল্যাটিন ভাষায় প্রাথমিক আরবী অনুবাদকদের অন্যতম। তিনি তাঁর ডি হিউম্যানা নেচারা ও ডি মর্বোরাম কগনিশন গ্রন্থে গ্রহের প্রভাব এবং সঙ্গীতের নিরাময়মূলক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আরব মতবাদসমূহ প্রবর্তন করেন। ইবনে সিনার একটি প্রবাদবাক্য ছিল 'ইন্টার অমনিয়া এক্সারসিটিয়া স্যানিটাটিস ক্যান্টারে মিলিয়াস এস্ট।' গুণ্ডিসাল ভাসের ডি ডিভিশন ফিলোসফিয়া গ্রন্থে সঙ্গীত বিষয়ক একটি অংশ ছিল। এই অংশটি তিনি আল-ফারাবীর রচনা থেকে সম্ভবত স্বয়ং অনুবাদ করে উদ্ধৃত করেছেন। অ্যারিস্টটলের ছদ্ম নামে প্রচলিত ডি মিউজিকা এবং ভিন্সেন্ট ডি বুভাইসের স্পেকুলাম ডকটিনেল গ্রন্থ দুটিতেও একই সূত্র থেকে ধার করা হয়েছে। জোহানেস এজিডিয়াসের একটি সংজ্ঞা থেকে বোঝা যায় যে, এরও সূত্র ছিল আল ফারাবী। এই স্পেনীয় তাত্ত্বিক কনস্ট্যান্টাইন দি আফ্রিকানের রচনার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। রবার্ট কিলওয়ার্ডবি, রাইমুণ্ডো লাল, সিমন টানস্টেড এবং অ্যাডাম ডি ফুন্ডা প্রভৃতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। রজার বেকন ওপাস টের্টিয়ামের সঙ্গীতাংশে টলেমী ও ইউক্লিডের সঙ্গে আল-ফারাবীরও উদ্ধৃতি প্রদান করেন। তিনি বিশেষ করে ডি সায়েন্টিসের উল্লেখ করেন। সঙ্গীতের নিরাময়মূলক দিক সম্পর্কে তিনি ইবনে সিনারও উদ্ধৃতি দেন। নিম্নোক্ত গ্রন্থকারগণও ইবনে সিনার কাছ থেকে ধার করেছেন; ওয়াল্টার অডিংটন এবং এঞ্জেল বার্ট। জেরোম মোরাভিয়ার তাঁর ডি মিউজিকার একটি অধ্যায়ে আল-ফারাবী সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। জর্জ ভ্যাল্লার, জর্জ রাইশের এবং ক্যামেরারিয়াসের পুনঃ প্রকাশিত ডি সায়েন্টিস থেকে দেখা যায় যে, আল-ফারাবী সপ্তদশ শতকেও পণ্ডিতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
উপরে সাহিত্যের মাধ্যমে যোগাযোগের যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে তার অবদান তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। যে আরব মতবাদ মৌখিকভাবে প্রচারিত হয় তার গুরুত্ব বরং অনেক বেশি ছিল। ইবনে হিজারী বলেন, স্পেনে উমাইয়া শাসনামলে "যে কর্ডোভা জ্ঞান-বিজ্ঞানের মহান ভাণ্ডার ছিল সেখানে বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য বিশ্বের সকল এলাকা থেকে জ্ঞানার্থীদের সমাবেশ হতো।" এখানে চতুর্কলা-এর অন্যতম দিক সঙ্গীত তত্ত্ব শিক্ষা দেওয়া হতো, তাই ল্যাটিন অনুবাদের মধ্যস্থতা ছাড়া ইউরোপীয় শিক্ষার্থীরা সরাসরি আরব জ্ঞানভাণ্ডার থেকে সঙ্গীত বিষয়ক জ্ঞান সঞ্চয়ের সুযোগ পায়। মোযারেবরা সম্ভবত আরবী ভাষায় কথা বলতেন। তাই আরব বিজ্ঞানের প্রচার ও প্রসারে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। আমরা জানি যে, রজার বেকন যখন অক্সফোর্ডে আরবীর ভুল ল্যাটিন অনুবাদ ব্যবহার করে স্পেনীয় ছাত্রদের মধ্যে ভাষণ দিচ্ছিলেন তখন ছাত্ররা তাঁকে উপহাস করেন, কারণ তারা তাঁর কর্তৃত্ব শুরু থেকে জানতেন। এটি মোটেই বিস্ময়কর নয় যে, এই অলৌকিক পণ্ডিত তাঁর পূর্বসূরি বাথের অ্যাডেলার্ডের ন্যায় তাঁর পাঠক ও শ্রোতাদের আরব চিন্তাধারার পক্ষে ইউরোপীয় চিন্তাধারা পরিহারের উপদেশ দিতেন। ইউরোপীয় তাত্ত্বিকরা কেবল মার্টিয়ানাস কাপেল্লা, বোইথিয়াসের মাধ্যমে গ্রীক মতবাদের সঙ্গে পরিচিত হন, অথচ আরবরা অ্যারিস্টটল, অ্যারিস্টজেনাস, ইউক্লিড, নিকোমেচাস, টলেমী ও অন্যান্য গ্রীক মনীষীর রচনার অধিকারী ছিলেন।
আরবরা সোলফেজিয়োর ক্ষেত্রে ইউরোপকে প্রভাবিত করলেও একটি বর্ণমালা-ভিত্তিক স্বরলিপির কথা সুনিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বাদ্যযন্ত্রের স্বরলিপির ক্ষেত্রে আরবদের অবদান অনেক সুস্পষ্ট। রূপান্তরমূলক স্বরলিপির ক্ষেত্রে মুসলিম প্রাচ্যে ১২০০ খৃস্টাব্দের দিকে এর প্রথম প্রয়োগ দেখা যায়। ইউরোপের জন্য আরবদের সম্ভবত সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হচ্ছে পরিমাপমূলক সঙ্গীত। কলোনের ফ্রাঙ্কোবার আগে পরিমাপ করা গান অজ্ঞাত ছিল। ছন্দ নামে এটি সপ্তম শতক থেকে আরবীয় সঙ্গীতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল। ফ্রাঙ্কো ও তাঁর প্রবর্তিত ধারায় আমরা স্বরলিপির পরিমাপমূলক ব্যবস্থা ছাড়াও একটি ছান্দিক রীতি দেখতে পাই এবং এগুলি মূলত আরবদের কাছ থেকেই নেওয়া হয়েছে। ল্যাটিন গ্রন্থে আমরা এলমুয়াহিম ও এল মুয়ারিফা প্রভৃতি নামে বিশেষ বিশেষ ধরনের স্বরলিপির উল্লেখ দেখতে পাই। এগুলি মূলত আরবী থেকে উদ্ভূত। অপরদিকে জোহানেস ডি মুরিসের রচনায় আলেনটেড নামে একটি কৌশলের উল্লেখ রয়েছে। এই শব্দটিও মূলত আরবী। মধ্যযুগীয় যে হকেট শব্দটিকে রবার্ট ডি হ্যান্ডলো 'স্বরলিপি ও যতির সংমিশ্রণ' বলে উল্লেখ করেছেন তা আরবী ইকা'আত শব্দ থেকে উদ্ভূত। তেমনি ইবনে সিনার ক্যাননে ল্যাটিন আলহাশ শব্দটি আরবী আল ইশক।
ব্যবহারিক শিল্পকলা
ভবঘুরে শিল্পী শ্রেণীর দরুনই আরবদের ব্যবহারিক শিল্পকলা প্রসার লাভ করে। এসব চারণ মধ্যযুগে সঙ্গীতের সত্যিকার প্রচারক ছিলেন। পাশ্চাত্য গায়কদের জাঁকালো পোশাক, লম্বা চুল ও চিত্রিত চেহারার পিছনে সম্ভবত প্রাচ্যের প্রভাব ছিল। খেলনা ঘোড়া ও ঘন্টা শোভিত মরিস নৃত্য শিল্পীরা অবধরিতভাবে আরব চারণ শিল্পীদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এমনকি থয়নট আরবিউর সময় পর্যন্ত এসব মরিস নৃত্যশিল্পী মূরদের অনুকরণে নানারঙে তাদের চোহারা রঞ্জিত করতো। খেলনা ঘোড়ার নাম যামালযাইন সোজাসুজি আরবী উৎসবের ঘোড়া এর প্রতিধ্বনি। স্পেনীয় শব্দ মাসকারা ইংরেজী মাসকার শব্দের ন্যায় আরবী ভাঁড় শব্দ থেকে উদ্ভূত। আইবেরীয় উপদ্বীপে যাম্বরা, যারাবান্দা, হুদা, মারিস্কা ইত্যাদি বহু শব্দ রয়েছে যা সুস্পষ্টভাবে মূলত আরবী।
আরবদের উন্নততর সংস্কৃতি অবধারিতভাবে পশ্চিম ইউরোপে প্রতিফলিত হয়। আমরা দেখতে পেয়েছি যে, নবম শতকে স্পেনীয়রা মিল ও ছন্দের ক্ষেত্রে আরবদের অনুকরণ করছে, এমনকি দশম শতকে ইহুদীরাও এতদ্বারা প্রভাবিত হয়। স্পষ্টত কবিতার সঙ্গে যে সঙ্গীত ছিল তাও তারা অনুকরণ করে, কারণ এই দুটি পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। আমরা খৃস্টান স্পেনের জাগলারদের মধ্যে আরব ও ইহুদীদের দেখতে পাই। দ্বাদশ শতকে বার্সিলোনায় কাউন্টরা যখন প্রভেন্সের শাসক ছিলেন তখন টুবাডুর ও জংলার আরব আমীর ও তাঁর মুঘান্নীর ভূমিকা পুনরাভিনয় করতো।
বাদ্যযন্ত্রে ও যন্ত্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রে পশ্চিম ইউরোপে মুসলিম উত্তরাধিকার সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সাধারণভাবে স্বীকার করা হয় যে, বেশ কিছুসংখ্যক বাদ্যযন্ত্রের নাম, এমনকি প্রকৃত আকার আরবদেরই অবদান। লিউট, রেবেক, গিটার ও নাকের শব্দগুলির মূল আরবী যথাক্রমে আল-উদ, রাবাব, কিতারা ও নাককারা-এ কথা বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত সত্য। ইউরোপে বাদ্যযন্ত্রের বিদেশী নাম প্রবর্তিত হয়ে থাকলেও নতুন আকার প্রবর্তনের ক্ষেত্রে সেসব নাম সব সময় অব্যাহত থাকেনি। সুস্পষ্টভাবে বহু নতুন ধরনের আরব বাদ্যযন্ত্র প্রবর্তিত হয় এবং তখনকার ইউরোপীয় সঙ্গীত জগতে এগুলি উল্লেখযোগ্য ছিল। প্রথমত তার যুক্ত বীণা, প্যান্ডোর ও গিটার শ্রেণীর সর্বপ্রকার বাদ্যযন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে। এর পরে আসে বেহালা জাতীয় বিভিন্ন ধরনের বক্রাকারের বাদ্যযন্ত্র।
এসব বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধারও সৃষ্টি হয়। আরবদের সঙ্গে যোগাযোগের আগে তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে ইউরোপীয় চারণ শিল্পীদের কেবল সিথারা ও হার্প ছিল। কেবল কানে শুনেই তারা এগুলি বাজাতেন। আরবরা ইউরোপে তাদের লিউট, প্যান্ডোর ও গিটার আমদানির সঙ্গে সঙ্গে জালি ব্যবস্থার সাহায্যে ফিঙ্গার বোর্ডে স্বরলিপির নির্ধারিত স্থানসমূহও আমদানি করেন। এসব স্থান পরিমাপের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। এটি বিশেষভাবে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বস্তুত আরব লিউটের এই ফ্রেটিংয়ের মাধ্যমেই ইউরোপে প্রধান রীতি প্রবর্তিত হয়।
অবশ্য আরবদের সঙ্গে যোগাযোগের সব চাইতে বৃহত্তম অবদান ছিল পরিমাপমূলক সঙ্গীত। সঙ্গীত তত্ত্ববিদরা এটি লক্ষ্য ও পর্যালোচনা করার বহু আগে চারণশিল্পীরা তা প্রচার করেন। দ্বিতীয়ত অন্যান্য শিল্পকলায় আ্যরাবেস্ক এর প্রতিরূপ মেলডি 'সুশোভিত করণও' অবদানের সৃষ্টি করে। তারকিব বা যৌগিক নামে পরিচিত সুশোভনের এই রীতিতে চতুর্থ, পঞ্চম বা অষ্টকে যুগপৎভাবে স্বরাঘাত সৃষ্টি করা হয় এবং সম্ভবত এর মাধ্যমেই ইউরোপ সর্বপ্রথম হার্মনির পথে এগিয়ে যায়।
মঙ্গোলদের কাছে বাগদাদের পতন, খৃস্টানদের গ্রানাডা অধিকার এবং তুর্কীদের কাছে খৃস্টানদের আত্মসমর্পণের ফলে আরবী ভাষাভাষীদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রাধান্যের অবসান হয়। দৃশ্যত শিল্প ও রাজনীতির মধ্যে ব্যবধান দুস্তর হলেও সত্যিকার ব্যাপার হচ্ছে এ দুটি পারস্পরিক ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট। এই ক্ষেত্রটি ছাড়া সর্বশেষে উল্লেখিত তারিখের বহু আগে থেকেই ইউরোপ বিশ্বসংস্কৃতিতে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে।
টিকাঃ
১. মওলবী দরবেশ সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা জালালুদ্দীন রূমী ১২৭৩ খৃস্টাব্দে কেনিয়ায় ইন্তিকাল করেন।
১. এটি সুলতান মুহাম্মদ ইবনে মুরাদের নামে উৎসর্গিত হওয়ায় আমি এই নামে আখ্যায়িত করেছি।
১. মূলত ল্যাটিন; অর্থ শুরু থেকে।
২. বাঁধাগৎ স্বরগ্রাম সাধা: যেমন সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি; পাশ্চাত্য স্বরগ্রাম: ডু-রে-মি-ফি সোল-লা-টি।
১. খেলনা ঘোড়া; মরিস নৃত্যের সময় খেলনা ঘোড়া এমনভাবে কোমর পর্যন্ত যুক্ত করা হতো যাতে মনে হতো যে, নৃত্য শিল্পী ঘোড়ায় চড়ে ছুটেছে।
২. একটি প্রাচীন লোকনৃত্যের নাম যা এক সময় ইংল্যান্ডে, বিশেষত মে দিবসে সাধারণ ব্যাপার ছিল। এতে রঙ বেরঙের পোশাক পরা হতো।
৩. পশ্চিম পিরেনিজ অঞ্চলে, বিশেষত উত্তর স্পেনে বসবাসকারী উপজাতি ও তাদের ভাষা।
১. মধ্যযুগীয় ফ্রান্স ও ইংল্যাণ্ডের ভবঘুরে চারণ করি যারা আবৃত্তি বা গানের মাধ্যমে জনসাধারণের চিত্তবিনোদন করতো।
২. বীণা জাতীয় প্রাচীন ইউরোপের বাদ্যযন্ত্র, জিথারের প্রাচীনরূপ।
৩. সচ্ছিদ্র বা জালির কাজ; অঙ্গুলি চালনা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ব্যাঞ্জো, গিটার প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রের ফিঙ্গার বোর্ডের উপর স্থাপিত উঁচু পৃষ্ঠদেশ।