📄 দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব
মুসলমানদের সাধারণ অভিমত হচ্ছে, খিলাফতের স্বর্ণযুগে দর্শন শাস্ত্রের বিশ্বব্যাপী যেসব ব্যবস্থা সমৃদ্ধিলাভ করে তা ছিল আরব ও ইসলামী দর্শন। মুসলিম জ্ঞান চর্চা কেন্দ্রগুলি ছিল ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের পথিকৃৎ ও আদর্শ। ইসলাম ইউরোপীয় সভ্যতার জন্মদাতা ও প্রতিপালক এরূপ দাবি সম্বলিত উপরোক্ত অভিমত প্রচারমূলক সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যেসব আধুনিক মুসলিম পণ্ডিত মধ্যযুগের মুসলিম রীতিনীতিের বিকাশ ও ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তাদের রচনার মধ্যেও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তা দেখা যায়। পাশ্চাত্য সাহিত্যেও বিভিন্ন সময়ে 'আরব দর্শনের' উল্লেখ দেখা যায়। কোন কোন পাশ্চাত্য লেখক 'আরব' দর্শনকে সুস্পষ্টভাবে প্রাচীনদের অভিমতের এরূপ একটি জগাখিচুড়ি বলে মনে করেন, যাতে বিভিন্ন ধরনের সব কিছুর জ্বলন্ত সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। তাদের মতে 'আরব' দর্শন বলে কোন কিছু নেই; আরবী ভাষাভাষী লোকেরা শুধুমাত্র সিরীয় খৃস্টান ও হাররানের সুসভ্য পৌত্তলিকদের মধ্যে প্রচলিত গ্রীক দর্শনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এর সঙ্গে পারস্য ও ভারত থেকে ধার করা কিছু কিছু উপাদান যুক্ত করেন।
এ কথা সত্য যে, আরব দর্শনের সামগ্রিক কাঠামো, সম্ভাবনা ও উপাদানের সূত্র আরবরা যে সব সুসভ্য সাম্রাজ্য জয় করেছে তার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়, এবং তাদের ব্যবস্থায় গ্রীক দর্শনের প্রাধান্য দেখা যায়। অতি সাম্প্রতিককালে যা কিছু বলা হয়েছে এ সম্পর্কে প্রাথমিক মুসলিম পণ্ডিত ব্যক্তিদের মধ্যে কোন ভুল বোঝাবুঝি ছিল না। বসরার যে সুদক্ষ ও বহুমুখী প্রতিভাধর লেখক আল-জাহিয (মৃত ৮৬৯ খৃ.) পরবর্তীকালে মুসলিম স্পেনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব সৃষ্টি করেন, তিনি গ্রীকদের জ্ঞানদীপ্ত অবদানের কাছে তাঁর স্বধর্মাবলম্বীদের ঋণের কথা উদারভাবে স্বীকার করেন। "প্রাচীনদের যেসব গ্রন্থে তাদের বিস্ময়কর জ্ঞান অমরত্ব লাভ করেছে এবং যেগুলিতে ইতিহাসের বিভিন্নমুখী শিক্ষা প্রতিফলনের মাধ্যমে অতীতের জীবনকে আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে, আমরা যদি সেগুলি আয়ত্ত করতে না পারতাম, আমরা যদি এর মাধ্যমে তাদের অভিজ্ঞতায় অমূল্য অবদানের সঙ্গে পরিচিত হতে না পারতাম, তাহলে জ্ঞানের ক্ষেত্রে আমাদের ভূমিকা অত্যন্ত ক্ষুদ্রতর হতো এবং আমাদের একটি সত্যিকার প্রেক্ষিত লাভের উপায় অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ হতো।" তদুপরি দার্শনিকগণ এবং জ্ঞানদীপ্ত ধর্মতাত্ত্বিকগণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের মতবাদের সূত্র গোপন রাখার কোন চেষ্টা করেননি। ইসলামসম্মত নয় এমন জ্ঞান ও সংস্কৃতি বিকাশে বাধাদানে সচেষ্ট যেসব ব্যক্তি কুরআন ও মহানবী (সা)-এর হাদীসকে আঁকড়ে থাকতেন সাহিত্যের কোন ছলনাই তাদের ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করতে পারেনি। কারণ হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর আমলে অপরিচিত ছিল তথা শরীয়ত ও সুন্নাহ বিরোধী সর্বপ্রকার জ্ঞান চর্চা বাতিল বলে গণ্য হয়। অপসংস্কৃতি ও বিদআতের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালিত হয়। এন এক্সপোজার অর গ্রীক ইনফ্যামীজ এন্ড এ সিপ অব রিলিজিয়াস কাউন্সিলস এবং ওক্যুলার ডেমোস্ট্রেশন অব দি রিফিউটেশান অব ফিলোসফি ইন দি কুরআন প্রভৃতি গ্রন্থ শিরোনামে তাদের নিজস্ব কাহিনীর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এরূপ একটি কাহিনী প্রচলিত হয় যে, জনৈক বিখ্যাত দার্শনিক তাঁর মৃত্যু শয্যায় ভুল স্বীকার করে তার নিজস্ব মতবাদ প্রত্যাহার করেন, এবং তাঁর সর্বশেষ উক্তি ছিল, "সর্ব শক্তিমান আল্লাহ্ সত্য বলেছেন এবং ইবনে সিনা একজন মিথ্যাবাদী।"
আবার একথাও সত্য যে, মানুষের সামগ্রিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী চিন্তাবিদদের অবদানের অতিরিক্ত হিসাবে আরবরা যে প্রত্যক্ষ অবদান রেখেছেন তা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবুও কেউ যদি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে পারে যে, মুসলিম সভ্যতা যতোটা উত্তরাধিকারী হয়েছে তার চাইতে তেমন কিছু বা আদৌ কিছু দিতে পারেনি, তাহলেও একথা অস্বীকার করা অন্যায় হবে সে, এই সভ্যতা দার্শনিক চিন্তাধারার এমন এক বিশেষ সংশ্লেষ ঘটিয়েছে যা এর ফকীহ্ ও আলিমগণের নিজস্ব প্রবর্তনা। এবং জ্ঞানের জন্য জ্ঞান চর্চার যে উৎসাহ-উদ্দীপনা বিশাল মুসলিম জাহানের সর্বত্র বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে উজ্জীবিত করে তা ছোট করে দেখা অত্যন্ত অন্যায় হবে। 'আরব দর্শন' প্রাচ্যবিদদের কাছে সুনির্দিষ্ট অর্থ বহন করে। তারা জানে যে, আলকিন্দী নামে কেবল একজন খাঁটি আরব দার্শনিক সমস্যা পর্যালোচনায় অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। তারা এও জানে যে, অ্যারিস্টটলিয়ান ও নিও-প্লাটোনিক চিন্তাধারার যে অদ্ভুত ও বহু ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যহীন সংমিশ্রণকে শ্রেষ্ঠ মুসলিম দার্শনিকরাও বিশ্বজগতের একটি যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা হিসাবে গ্রহণ করেছেন তাকে প্রকৃষ্টভাবে আরব দর্শন বলা যায়। কিন্তু তা ইসলামী দর্শন নয়। এর অগ্রনায়করা প্রায়ই নামেমাত্র মুসলমান ছিলেন, কিংবা তারা ছিলেন প্রচলিত ধর্মমতে আত্মস্বীকৃতভাবে অবিশ্বাসী, যার দরুন নিজেদের মতামতের জন্য হয় তাদের জীবন দিতে হয়েছে, না হয় তাদের স্বাধীনতা হারাতে হয়েছে।
মঙ্গোলরা প্রাচ্য জ্ঞানের প্রজ্বলিত আলো এমনভাবে ছারখার করে দেয় যে, প্রাচ্য সে অবস্থা কখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি, এবং গ্রন্থাগারগুলি ও ঐতিহ্য যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে তাতে কখনো পারবে বলে মনে হয় না। আরবরা যদি মঙ্গোলদের মত বর্বর হতো তাহলে ইউরোপীয় রেনেসাঁ একশ বছরের বেশি পিছিয়ে যেতো। মুদ্রণ শিল্প আবিষ্কারের আগে একজন জ্ঞানান্বেষীর জীবন সবসময় বিরক্তি ও নৈরাজ্যে পরিপূর্ণ ছিল। প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যে মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত, এমন কি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেও, বহু ছাত্রকে একজন শিক্ষকের সন্ধানে এক হাজার মাইল বা তার চাইতেও বেশি পথ ভ্রমণ করতে হতো। তরুণরা একজন পছন্দ মতো উস্তাদের সংস্পর্শে যাওয়ার জন্য কার্যত কপর্দকহীন অবস্থায় গৃহ ত্যাগ করে স্পেন থেকে মক্কা পর্যন্ত কিংবা মরক্কো থেকে বাগদাদ পর্যন্ত সুদীর্ঘ ভ্রমণে বের হতো।
প্রসঙ্গক্রমে মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উদ্ভব সম্পর্কে কিছু বলা দরকার। প্রথম ছিল বাগদাদের বিখ্যাত নিযামী বিশ্ববিদ্যালয়। নর্ম্যানদের ইংল্যান্ড বিজয়ের এক বছর আগে ৪৫৭ হিজরী সালে ওমর খৈয়ামের বন্ধু নিযামূল মুল্ক ও তুর্কী উযির আল্প আরসালান এটি প্রতিষ্ঠা করেন। অচিরেই নিশাপুর, দামেস্ক, জেরুজালেম, কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া ও অন্যান্য স্থানে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও গড়ে ওঠে। লক্ষণীয় যে, এগুলি প্রায় এমন শহরে গড়ে ওঠে যা ইসলামের অভ্যুদয়ের আগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের জন্য বিখ্যাত ছিল। ইতিমধ্যে ইউরোপে দশম শতকে সালের্নো (ইটালীতে) একটি ভেষজ শিক্ষা কেন্দ্র হিসাবে খ্যাতি লাভ করে। এই শিক্ষা কেন্দ্রটি যদি প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন গ্রীক ভেষজ শিক্ষা কেন্দ্রের অব্যাহত প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকে তবে তার কারণ হচ্ছে যে, একাদশ শতক পর্যন্ত দক্ষিণ ইটালী বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের একটি অংশ ছিল। এমন কি নর্ম্যান বিজয়ের পরও এই এলাকাটি গ্রীক ভাষাভাষী একটি বিরাট জনসংখ্যা আধ্যুষিত ছিল। অপর দিকে সিসিলির নর্ম্যান বিজয়ীরা আরবী জ্ঞানচর্চার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন এবং তারা এতটা পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলামী রীতিনীতি প্রবর্তন করেন যাতে এরূপ সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যাওয়া দুষ্কর যে, এই কেন্দ্রের ওপর আরব ভেষজ বিজ্ঞানের অত্যন্ত শক্তিশালী প্রভাব ছিল এবং তা সৃজনশীল না হলেও সংরক্ষণশীল ছিল। যেকোন অবস্থাতেই মুসলিম চিকিৎসকগণ বিপুল সংখ্যক স্যারাসেন অধিবাসীর চিকিৎসা করতেন। প্রাচীনতম লেখকদের রচনায় দেখা যায় যে, তারা আরব চিকিৎসকদের রচনা সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন না।
সালের্নো সহজ ও সত্যিকারভাবে একটি চিকিৎসা বিদ্যালয় ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় নয়। বলোগনা, প্যারিস, মন্টপোলিয়ার ও অক্সফোর্ডের ন্যায় প্রাচীনতম খৃস্টান বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উদ্ভব হয় দ্বাদশ শতকে। ইউরোপে প্রথম 'আরব্য' বিশ্ববিদ্যালয় মুসলিম জ্ঞানচর্চার ভিত্তিতে গড়ে উঠলেও মুসলিম উদ্যোগে গড়ে ওঠেনি এবং এটি অনেক পরে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিজ্ঞ আলফন্সো (১২৫২-৮১) তৎকালীন অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী আবু বকর আর রিকুতিকে শিক্ষকতার কাজে নিযুক্ত করেন। তিনি তাঁর জন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে রিকুতি খৃস্টান, ইহুদী মুসলমানদের সর্বপ্রকার বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষা দান করতেন।
কিন্তু সবচাইতে গৌরবোজ্জ্বল মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ১২৩৪ খৃস্টাব্দে বাগদাদে প্রতিষ্ঠিত আল মুসতানসিরিয়াহ। আমাদের বলা হয় যে, বাইরের দৃশ্যে, কারুকার্য ও আসবাবপত্রের সৌকর্যে, প্রশস্ততায় এবং এর পবিত্র ভিত্তি স্থলের ঐশ্বর্যে মুসতানসিরিয়াহ ইতিপূর্বে ইসলামে পরিদৃষ্ট সব কিছুকে ছাড়িয়ে যায়। এতে সুন্নী সম্প্রদায়ের চারটি মাযহাবের প্রত্যেকটির জন্য একটি করে চারটি শরীয়ত বিধির শিক্ষাকেন্দ্র ছিল। প্রতি কেন্দ্রে প্রধান হিসাবে ছিলেন একজন অধ্যাপক। প্রত্যেক অধ্যাপক তার অধীনস্থ পঁচাত্তর জন শিক্ষার্থীকে (ফকীহ) বিনা বেতনে শিক্ষা প্রদান করতেন। চারজন অধ্যাপককে মাসিক বেতন দেওয়া হতো। এবং তিনশ শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে মাসে একটি করে সোনার দীনার দেওয়া হতো। তদুপরি কলেজের বিশাল রন্ধনশালা থেকে বাসিন্দাদের সবাইকে প্রত্যহ রুটি ও গোশত পরিবেশন করা হতো। ইবনুল ফুরাতের মতে মুসতানসিরিয়াহতে একটি গ্রন্থাগার ছিল-তাতে বিভিন্ন বিজ্ঞান সংক্রান্ত দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থাবলী ছিল। সেগুলি এমনভাবে সাজানো ছিল যে, শিক্ষার্থীরা সহজেই সেগুলি পড়তে পারতেন। কেউ এসব পাণ্ডুলিপি নকল করতে চাইলে তাও সহজে করতে পারতেন। প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের কাগজ কলম সরবরাহ করা হতো। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রদীপ, কলেজ ভবনকে আলোকিত করার জন্য প্রয়োজনীয় জলপাই তেল এবং খাবার পানি ঠাণ্ডা করার জন্য সংরক্ষিত স্থানের কথাও উল্লেখ করা হয়। বিশাল প্রবেশ কক্ষে..... একটি ঘড়ি ছিল..... নিঃসন্দেহে সেটি ছিল এক ধরনের পানি ঘড়ি। এতে নামাযের নির্দিষ্ট সময় ঘোষণা করা হতো এবং দিনে ও রাতে কতোটা সময় অতিক্রান্ত হয়েছে তা সূচিত হতো। কলেজের অভ্যন্তরে শিক্ষার্থীদের বিশেষ ব্যবহারের জন্য একটি হাম্মাম..... নির্মাণ করা হয়। সেখানে একটি হাসপাতালে একজন চিকিৎসক নিয়োগ করা হয়। প্রতিদিন সকালে কলেজ পরিদর্শন করা এবং যারা রুগ্ন তাদের ব্যবস্থাপত্র দেওয়া তার দায়িত্ব ছিল। মাদ্রাসার বড় বড় গুদামে প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানীয় ও ওষুধপত্র মজুদ থাকত। আর এসবই ছিল ত্রয়োদশ শতকের সূচনায়।
একাদশ শতকে জ্ঞান চর্চার সূত্র অত্যন্ত অস্পষ্ট এবং আমরা বর্তমানে যতদূর জানতে পেরেছি তাতে এটুকু উল্লেখ করা নিরাপদ হবে যে, স্পেনে মুসলিম পণ্ডিতদের ভূমিকার বিরাট গুরুত্ব ইউরোপের খৃস্টান বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রত্যক্ষ প্রভাব সৃষ্টির চাইতে বরং ব্যক্তি বিশেষদের শিক্ষাদানের মধ্যেই নিহিত ছিল। অবশ্য প্রাচ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলির তুলনায় ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলি অনগ্রসর ছিল এবং মধ্যযুগীয় পণ্ডিতদের প্রামাণিক সাক্ষ্য সম্বলিত গবেষণামূলক প্রবন্ধ থেকে যথেষ্ট পরিমাণে প্রমাণিত হয় যে, মুসলিম জ্ঞানবিজ্ঞান তাদের অধ্যয়নের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত উপাদান সরবরাহ করে। দি লিগেসি অব ইসরাইলে এবং এই গ্রন্থের অন্যান্য অধ্যায়ে এসব পণ্ডিতদের অনেকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। জন অব সলসবারি স্পেনীয়দের এবং যারা আফ্রিকা ও মুসলিম প্রাচ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয় তাদের অবদানের কথা তাঁর পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দেন। রজার বেকন (আনু. ১২১৫-৯২) লিখেছেন, 'ফিলোসফিয়া অ্যাব......অ্যারাবিকো ডিডাকটা এস্ট এট ইডিও নাল্লাস ল্যাটিনাস স্পিয়েন্টিয়াম স্যাক্রে স্ক্রিপচুরে এট ফিলোসফিয়ে পোটেরিট আট ওপোর্টেট ইন্টোলিজার লিংগুয়াস এ কুইবাস সান্ট ট্রান্সলেটে'। কিভাবে আরব লেখকরা তার এই বক্তব্য সমর্থন করেন তাও তিনি বলেন। কিন্তু দুভাগ্যবশত পূর্ববর্তী শতকগুলির খৃস্টান পরিব্রাজকগণ মুসলিম শাসনাধীন কিংবা মুসলিম প্রভাবাধীন দেশগুলি পরিভ্রমণের পর সেখান থেকে কি নিয়ে এসেছেন তা আমাদের জানান নি। দশম ও একাদশ শতকে মুসলমানরা যেসব বিষয়ে অধ্যয়ন করতেন এবং একাদশ ও দ্বাদশ শতকের খৃষ্টান ছাত্রদের অনুরূপ অধ্যয়নের তুলনা করলে এরূপ ইঙ্গিত পাওয়া যাবে যে, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে এতোদিন পর্যন্ত যা মনে করা হতো তার চাইতে ঘনিষ্ঠতর সম্পর্ক ছিল। অবশ্য সুনির্দিষ্ট কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। ধারাবাহিক অধ্যয়নের বিশেষ ধরন, শিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্ক, বেতন ও বিশেষ দানের প্রশ্ন, শান্তি শৃংখলা রক্ষা, ডিগ্রি দান বা শিক্ষাদানের লাইসেন্স প্রদান এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বহুবিধ কার্যকলাপ, শিক্ষাকেন্দ্র বাগদাদেই হোক আর অক্সফোর্ডেই হোক কমবেশি একই রকমের ছিল, ফলে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া না গেলে একথা দৃঢ়ভাবে বলা বিপজ্জনক যে, খৃস্টান বিশ্ববিদ্যালয় একটি প্রতিষ্ঠান হিসাবে মুসলিম আদর্শে গড়ে ওঠে। মুসলিম অধ্যাপক কর্তৃক তাঁর নামে ও কর্তৃত্বে শিক্ষা প্রদান কিংবা কোন নির্দিষ্ট দলিলের বিষয়বস্তু পুনঃ প্রকাশের একটি ইজাযা বা লাইসেন্স দানের ন্যায় বহু ক্ষেত্রে সাদৃশ্য রয়েছে। ডিগ্রির প্রাচীনতম রূপ মধ্যযুগীয় লাইসেনসিয়া ডসেন্ডির সঙ্গে এই রীতির সুস্পষ্ট মিল রয়েছে। অপর দিকে যথাযথ অনুমোদন প্রাপ্ত একজন অধ্যাপকের কাছে যথেষ্ট সময় পর্যন্ত শিক্ষাপ্রাপ্ত না হয়ে কারো অধ্যাপক হওয়া উচিত নয়, এরূপ নীতির জন্য যে সুস্পষ্ট নজীর থাকা প্রয়োজন সেরূপ নজীরের ক্ষেত্রেও মিল ছিল। অন্যান্য সাদৃশ্যপূর্ণ বাহ্যিক দিকগুলি হচ্ছে, বিশেষভাবে সংগঠিত বহু বিদেশী নাগরিকের উপস্থিতি এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোন কিছু গ্রহণ না করে অবৈতনিকভাবে শিক্ষা প্রদান।
বিনামূল্যে জ্ঞানের আলো বিতরণের এই মহানুভব রীতি এখনো কায়রোর বিখ্যাত আল 'আযহার বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে অব্যাহত রয়েছে। এখানে মুসলিম বিশ্বের সকল এলাকা থেকে আগত শিক্ষার্থীরা মাযহাব অনুযায়ী পৃথক পৃথক এলাকায় অবস্থান করে এবং তাদের ব্যয়ভার আংশিকভাবে দান-সদ্স্কার সাহায্যে এবং পরিচালকমণ্ডলীর মঞ্জুরি মাধ্যমে নির্বাহ করা হয়।
দ্বাদশ শতকের প্রাথমিক বছরগুলিতে সেগোভিয়ার আর্কডীকন ডোমিনিক গুণ্ডিসালভাসের অনুবাদের মাধ্যমে ইবনে সিনা, আল-ফারাবী ও গায্যালীর রচনার মধ্য দিয়ে খৃস্টান পাশ্চাত্য অ্যারিস্টটলের সঙ্গে পরিচিত হন। গুণ্ডিসালভাস তাঁর নিজস্ব জ্ঞান বিশ্বকোষে প্রধানত আরব সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের উপর নির্ভর করেন।
অ্যারিস্টটলকে পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য আরবদের কাছে ঋণী বলে প্রায়ই যে মন্তব্য করা হয় তা কিছুটা বিশ্লেষণ করা দরকার। এ কথা বলা যেতে পারে যে, অ্যারিস্টটল যে একজন দার্শনিক ছিলেন গুণ্ডিসালভাসের সময় পর্যন্ত তাতে কেউ সন্দেহ করবেন না। বেকনের মতে বোইথিয়াসই সর্ব প্রথম অ্যারিস্টটলকে পাশ্চাত্যের সঙ্গে পরিচিত করেন। তাঁর ক্যাটিগরিজ ও ডিইন্টারপ্রিটেশান অনুবাদ এবং সে সঙ্গে তর্কশাস্ত্র সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব রচনা ও ভাষ্য ইউরোপে কার্যত প্রায় ১১৫০ খৃ. পর্যন্ত অ্যারিস্টটলিয়ান জ্ঞানের সামগ্রিক রূপ তুলে ধরবে। সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে পাশ্চাত্যে অ্যারিস্টটলকে যতোটা জানতেন বাস্তবিক পক্ষে তার চাইতে বেশি প্ল্যাটো সম্পর্কে জানতেন না; অথচ খৃস্টান চিন্তাধারায় প্ল্যাটোর দর্শন সুদৃঢ়ভাবে প্রতিফলিত। মেটাফিজিক্স-এর প্রাচীনতম (কিন্তু অসম্পূর্ণ) সংস্করণ বাইজেন্টিয়াম থেকে আনু. ১২০০ খৃস্টাব্দে প্যারিসে পৌঁছে। কয়েক বছর পর আরবী থেকে অনূদিত অসম্পূর্ণ সংস্করণ পৌঁছে। ১২৬০ খৃ. পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ রচনা পণ্ডিতদের হাতে পৌঁছেনি। নিকমাচিয়ান এথিক্স প্রথমে গ্রীক সূত্রসমূহ থেকে এবং তারপর আরবী থেকে পাওয়া যায়। এটি সর্বশেষ ১২৫০ খৃস্টাব্দের দিকে সামগ্রিকভাবে সরাসরি গ্রীক থেকে অনূদিত হয়।
অতএব; একথা বলা যেতে পারে যে, আরবী চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর অ্যারিস্টটলের রচনার প্রতি ইউরোপীয় পণ্ডিতদের সর্বপ্রথম যতোটা আগ্রহের সৃষ্টি হয় ততোটা পরিমাণে অ্যারিস্টটলের দর্শন পুনরুদ্ধারের জন্য পাশ্চাত্য আরবদের কাছে ঋণী। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আরব চিন্তাধারার সংস্পর্শে এসে দর্শনের প্রতি তাদের আগ্রহ উদ্দীপনা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার ফলেই ইউরোপীয়রা অ্যারিস্টটলের রচনায় মনোযোগী হয়। বস্তুত, প্রথম কার্যকর প্রভাব যদি আরবদের না হতো তাহলে এ সত্যটির বিশ্লেষণ কিভাবে করা যায় যে, অ্যারিস্টটল যুগের পর যুগ ধরে ইবনে রুশদের নামে পরিচিত দার্শনিক রচনায় মিশে ছিলেন? ইবনে রুশদ নিজে গ্রীক জানতেন না; তাঁর পূর্ববর্তীদের অনুবাদের ওপর নির্ভর করেন। তাঁর দর্শন ব্যবস্থা ইহুদীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল এবং তা খৃস্টান চিন্তাধারায় এতো গভীরভাবে প্রবেশ করে যে, খৃষ্ট ধর্মীয় মতবাদের জন্য তা একটি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। অ্যারিস্টটলকে তার ভাষ্যকার থেকে পৃথক করার ব্যাপারে এবং আরব বিশ্লেষণের সমালোচনায় সেন্ট টমাসই বিশেষভাবে উদ্যোগী হন।
আরব দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের উদ্ভব এবং বিকাশের চাইতে পাশ্চাত্য চিন্তাধারায় এর প্রভাবের প্রশ্ন আমাদের প্রধান বিবেচ্য বিষয়। কিন্তু দর্শন প্রচারের ইতিহাসে আরবদের স্থান কোথায় তা বুঝতে হলে এর ব্যবস্থা ও উদ্ভবের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া অপরিহার্য। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, এ ধরনের পর্যালোচনায় দর্শনকে ধর্মতত্ত্ব থেকে পৃথক করা অসম্ভব না হলেও দুঃসাধ্য। দর্শন ও ধর্মতত্ত্বকে একটি বিষয় হিসাবে গ্রহণ করার পক্ষে উত্তম যুক্তি রয়েছে। কারণ আমরা যাকে মেটাফিজিক্স (অধিবিদ্যা) হিসাবে জানি অ্যারিস্টটল নিজেই তাকে 'প্রথম দর্শন' ও 'ধর্মতত্ত্ব' হিসাবে উল্লেখ করেছেন। গ্রীকদের মধ্যে একেশ্বরবাদের উদ্ভব ধর্মীয় মহলে নয়, বরং দার্শনিক মহলে হয়েছে। ইসলামে দুটি বিষয়ের উদ্ভব ও বিকাশের আলোচনায় এই সত্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি ধরে নেওয়া হয় যে, খৃস্টান-উত্তর যুগে দর্শন প্রধানত মানুষের যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাপারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল এবং ধর্মতত্ত্ব যা কেবল প্রত্যাদেশ দ্বারা প্রমাণ করা যায় এরূপ অনন্ত আধ্যাত্মিক সত্য প্রচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল, তাহলে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব এ ধরনের পার্থক্যকে বৈধ হিসাবে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাবে। সেন্ট টমাস আকিনাস এবং ডান্স স্কটাস উভয়েই দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের পার্থক্য স্বীকার করেন এবং প্রত্যেকটিকেই তাদের নিজস্ব পর্যায়ে সর্বেসর্বা বলে মনে করেন; এবং তাদের পূর্ববর্তী আরবদের ন্যায় তারা যুক্তি এবং প্রত্যাদেশ উভয়টিকেই প্রামাণ্য হিসাবে গ্রহণ করেন। কিন্তু কোনটি মেটাফিজিক্সের অন্তর্ভুক্ত এবং কোনটি প্রত্যাদেশমূলক ধর্মের অন্তর্ভুক্ত এ ব্যাপারে সবাই সব সময় একমত নয়।
রজার বেকন দর্শনতত্ত্ব পর্যালোচনা সমর্থন করতে গিয়ে এই প্রশ্নে তার মনোভাব সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন এবং এরূপ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, প্রাচ্য সূত্রসমূহই তার মনকে আকৃষ্ট করেছে। তিনি বলেছেন, 'দার্শনিকদের মধ্যে মেটাফিজিক্স ধর্মতত্ত্বের একটি অংশ হিসাবে বিবেচিত। তাঁরা এটিকে নৈতিক দর্শনের সঙ্গে একযোগে সায়েনশিয়া ডিভাইনা ও থিওলোজিয়া ফিজিকা নামে অভিহিত করেন। অ্যারিস্টটলের মেটাফিজিক্সের প্রথম ও একাদশ খণ্ডে এবং ইবনে সিনার মেটাফিজিক্সের নবম ও দশম খণ্ডে তা লক্ষণীয়। মেটাফিজিক্স আল্লাহ্, ফেরেশতা এবং এ ধরনের স্বর্গীয় ব্যাপার সংক্রান্ত বহু বিষয় পর্যালোচনা করে। আবার 'কল্পনামূলক দর্শনের চূড়ান্ত পর্যায় হচ্ছে সৃষ্ট জীবের মাধ্যমে স্রষ্টা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ। খৃস্টানদের অবশ্যই একথা স্মরণ রাখতে হবে যে, 'দর্শন নিজেই নরকের নির্বুদ্ধিতায় পরিচালিত করে, কাজেই এটি অবশ্যই স্বয়ং অন্ধকার ও কুয়াশা।'
আরব পণ্ডিতদের মধ্যে বৃহত্তর পরিমাণে কোন মতৈক্য ছিল না। ইবনে সিনা 'অস্তিত্বকে অস্তিত্ব হিসাবে' মেটাফিজিক্সের যথাযথ বিষয়রূপে গুরুত্ব আরোপ করেন। অপর দিকে অ্যারিস্টটলের ওপর ঘনিষ্ঠভাবে নির্ভরশীল ইবনে রুশদ জোর দিয়ে বলেন যে, আল্লাহ এবং বুদ্ধিমত্তাই এর উপযুক্ত এলাকা। অতএব, মেটাফিজিক্স ও ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রে ল্যাটিন পণ্ডিতদের কাছে সর্বাধিক পরিচিত দুজন আরব দার্শনিক সম্পূর্ণ বিপরীত মতবাদ পোষণ করেন। ইবনে রুশদ বিশ্বাসের প্রত্যাদেশ সংক্রান্ত মতবাদ ছাড়া সবকিছু যুক্তির বিচারে ছেড়ে দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন।
এবারে মুসলমানদের দর্শন চর্চার উদ্ভব প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। এরূপ মনে করার কোন কারণ নেই যে, যেসব আরব প্রাথমিক খলীফাদের বিজয়ী বাহিনীর সৈনিক ছিলেন তাদের সঙ্গে বর্তমানকালের আরবদের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল। তবে প্রথমোক্তদের মধ্যে খাঁটি বেদুইনের বৈশিষ্ট্য সম্ভবত যথেষ্ট পরিমাণে বেশি ছিল। অবশ্য আধুনিক দার্শনিকরা এ জন্যে খুব আশান্বিত না হওয়ারই কথা। ঐসব লোকের মধ্যে যেকোন প্রকার জ্ঞান চর্চার প্রতি তেমন উল্লেখযোগ্য আগ্রহ ছিল না। জ্ঞান চর্চার কেবল প্রেরণাই নয়, উপাদানও তাদের বাইরে থেকে আহরণ করতে হতো। প্রথম দুই-এক যুগ অতিক্রান্ত হওয়ার পর যখন বিজয়ী শ্রেণীকে একটি পৃথক, ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসাবে টিকে থাকার অধিকার সপ্রমাণ করতে হয়, তখন তাদের মধ্যে এই প্রেরণা আসে। নবাগতরা যতোদিন পর্যন্ত অস্ত্রের দ্বারা শাসন করেন, মরুভূমির সর্বপ্রকার কিংবা অন্তত অধিকাংশ সুস্পষ্ট রীতিনীতি বজায় রাখেন এবং একটি পৃথক আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন ততোদিন পর্যন্ত কোন প্রকার জ্ঞানদীপ্ত যুক্তির প্রয়োজন ছিল না।
এ কথা বিশেষ করে, দৃষ্টান্ত স্বরূপ সিরিয়ায়, যখন তাদের খৃস্টান প্রতিবেশীরা তাদের 'এরিয়ান' প্রবণতা সম্পন্ন একটি নতুন সম্প্রদায় বলে মনে করতো, এবং আরবরা নিজেরাও যখন ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসের প্রতি প্রশ্রয়মূলক মনোভাব পোষণ করতো তখনও প্রযোজ্য ছিল। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই মরুভূমির সেমিটিক ও কৃষিভূমির সেমিটিকদের মধ্যে পার্থক্য ঘুচে যায়। যেসব আরব রোমানদের অতিরিক্ত সেনাবাহিনীতে কাজ করতো তারা হাজারে হাজারে খলীফাদের সেনাবাহিনীতে যোগদান করে। সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া ও মিসরে আরবদের প্রায়ই অভিনন্দিত করা হতো, কারণ তারা রাজকীয় জোরজবরদস্তির অবসান ঘটায় এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অবাঞ্ছিত চাপ থেকে মতবাদ বিচ্ছিন্ন খৃস্টান সম্প্রদায়গুলিকে অব্যাহতি দেয়।
তারা স্থানীয় আশা-আকাঙক্ষা ও ভাবাবেগের প্রতি বিদেশীদের চাইতে বেশি সমঝোতা-মূলক মনোভাব প্রদর্শন করে। ইসলাম সর্বপ্রথম অস্পষ্টতামূলক ছিল। 'এক আল্লাহ্' প্রতি এর সহজ বিশ্বাস খৃস্টান বিশ্বাসের সঙ্গে কোন পরস্পর বিরোধিতার সম্মুখীন হয়নি। কিন্তু যখন দুটি ধর্মের পরস্পর বিরোধী ও বিতর্কমূলক দিকগুলি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে তখনি ইসলাম নিজস্ব মূল সুর খুঁজে পায় এবং সেটিকে সোচ্চার করার জন্য বিভিন্ন সূত্রের সন্ধান করে।
ভোটাধিকারমূলক কর (পোল-ট্যাক্স) থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য যথা সময়ে বহু ইহুদী ও খৃস্টান ইসলাম গ্রহণ করে। সকল অমুসলমান একেশ্বরবাদীদের কাছ থেকে কিংবা যারা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে ধর্মগ্রন্থের অধিকারী ছিল তাদের কাছ থেকে এই কর আদায় করা হতো। এঁরা বাইজেন্টাইন ও পারস্য সংস্কৃতির অধিকারী ছিল। এ ধরনের ব্যাপক ধর্ম ত্যাগ গির্জা কর্তৃপক্ষকে আতঙ্কিত করে এবং তারা যুক্তির মাধ্যমে ইসলামের মূল ভিত্তিতে আঘাত হানার জন্য এগিয়ে আসে। 'আল্লাহর বৈশিষ্ট্য কি? তিনি সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ একথার অর্থ কি? তাঁর সঙ্গে তাঁর জ্ঞানের সম্পর্ক কি? তিনি যদি কোন অপরিবর্তনীয় ফরমান দ্বারা সব কিছু পূর্ব নির্ধারিত করে থাকেন তাহলে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও দায়িত্ব কোথায় নিহিত? খৃস্টান যাজক সম্প্রদায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যেসব সমস্যা নিয়ে বিতর্ক করছিলেন এগুলিও তার অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাঁরা ব্যঙ্গাত্মক মনোভাব নিয়ে এসব প্রশ্ন সমাধানের দায়িত্ব মুসলমানদের হাতে তুলে দেন, এবং এগুলি সেখানেও পূর্বের ন্যায় একই পরিমাণে তিক্ততা ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। এমন এক সময় ও এলাকা ছিল যখন কর্তৃত্বমূলক কণ্ঠে এসব প্রশ্ন উত্থাপন বন্ধ করা যেতো। কিন্তু অধিকতর আগ্রহী ও বুদ্ধিমান শ্রেণীর লোকেরা কোন না কোন ধরনের জবাব চায়। যেসব জবাব দেওয়া হতো তা প্রথমে ছিল থমকে দেওয়ার মত এবং পরীক্ষামূলক। যে জাতির প্রশাসক শ্রেণী দর্শনের অস্তিত্ব সম্পর্কেও অবহিত ছিলেন না তাদের কাছে এসব জবাবের ভাষা এবং ধ্যান-ধারণা নতুন ও অদ্ভুত মনে হয়। দামেস্কের সেন্ট জন যুক্তি দেওয়ার সময় তার মুসলিম প্রতিপক্ষকে মুরুব্বীয়ানার সুরে নিবৃত্ত করতে পারতেন। কিন্তু মুসলমানরা তাদের প্রতিপক্ষ গ্রীক যুক্তি-কৌশলের অস্ত্রের একচ্ছত্র অধিকারী হয়ে থাকবে এই অবস্থা দীর্ঘকাল পর্যন্ত মেনে নিতে পারেনি। তারা গ্রীক ও সিরীয়দের রচনার চিন্তাধারার সঙ্গে ধীরে ধীরে নিজেদের পরিচিত করে তোলেন। আমরা এই প্রাথমিক যুগ সম্পর্কে লোক পরম্পরায় কেবল এটুকুই জানতে পেরেছি যে, এ সময় বিভিন্ন দার্শনিক রচনা আরবীতে অনূদিত হয়। আমরা প্রাথমিক চিন্তাশীল ধর্মতাত্ত্বিকদের এমন কিছু কিছু উক্তিও পেয়েছি যাতে দেখা যায় যে, দার্শনিক সন্দেহ তখনি তাদের মধ্যে দানা বাঁধতে শুরু করেছে।
আব্বাসীয় খলীফা আল-মামুনের (১৯৮-২১৮ হিঃ, ৮১৩-৩৩ খৃ) পৃষ্ঠপোষকতায়ই দর্শনশাস্ত্র প্রকৃতপক্ষে তার নিজস্ব রূপ লাভ করে। যেখানে নিষ্ঠাবান মুসলমানরা বিশ্বাস করেন যে, সমগ্র বিশ্বজগতের পূর্বেই আল কুরআন শাশ্বত সেখানে এই খলীফার মতে কুরআন যথাসময়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি আল্লাহ্র বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও স্বীকারোক্তিমূলক-ভাবে 'মুতাযিলা' তথা উদারপন্থী ধর্মতাত্ত্বিকদের মতবাদের অনুসারী ছিলেন। অতএব, একথা ধরে নেওয়া যায় যে, মুসলমানরা দীর্ঘকাল যাবত গ্রীক চিন্তাধারা ও খৃষ্ট ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। আল মামুন বাগদাদে পণ্ডিত ব্যক্তিদের একটি জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও গ্রীক রচনার অনুবাদ ব্যাপকভাবে অব্যাহত থাকে। অনুবাদ কার্যের দায়িত্বে নেস্টোরিয়ান চিকিৎসাবিদ হুনাইন ইবনে ইসহাক আল ইবাদী (৮০৯-৭৩) এবং তার পরিবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। হুনাইন কেবল বাগদাদেই জ্ঞান সাধনা করেননি। তিনি চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে প্রাচীন বিশ্বের সর্বপ্রকার জ্ঞান আহরণের জন্য এবং গ্রীকভাষা সম্পর্কে কার্যোপযোগী উত্তম জ্ঞান সঞ্চয়ের জন্য আলেকজান্দ্রিয়ার পথে সিরিয়া ও ফিলিস্তিন সফর করেন। আরবীতে চিকিৎসাশাস্ত্র ও অঙ্কশাস্ত্রের গ্রন্থাবলী অনুবাদ ছাড়াও হুনাইন অ্যারিস্টটলের ক্যাটিগোরিজ, ফিজিক্স ও ম্যাগনা মোরালিয়া অনুবাদ করেন। তিনি প্ল্যাটোর রিপাবলিক ল'জ এবং টিমায়ুসও অনুবাদ করেন, যদিও এ গুলির অনুবাদ সব সময় পূর্ণাঙ্গ ছিল না। তাঁর পুত্র ইসহাক সম্ভবত মেটাফিজিক্স, ডি অ্যানিমা, ডি জেনারেশন এট করাপশন এবং হার্মেনিউটিক্স এবং সে সঙ্গে আফ্রোডিসিয়াসের আলেকজান্ডার ও অন্যদের ভাষ্যগুলিও আরবীতে অনুবাদ করেন। এগুলির সঙ্গে হুনাইনের ভ্রাতুষ্পুত্র হুবাইশের অনূদিত গ্রন্থগুলি যোগ করা হলে আরবী ভাষার বাইরে সমসাময়িক জ্ঞানভাণ্ডারের তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু অবশিষ্ট থাকে না। ক্লাসিক্যাল যুগের কাব্য, নাটক ও ইতিহাসের প্রতি আরবদের তেমন আগ্রহ ছিল না।
এ পর্যন্ত কোন স্বাধীন চিন্তাধারার পরিচয় পাওয়া যায় না এবং এ গুলিকে 'আরব দর্শন' বলারও কোন যুক্তি নেই। জ্যাকবাইটরা এদের প্রতিষ্ঠিত অনুবাদ চর্চার ধারা অব্যাহত রাখেন। কেবল একটি ক্ষেত্র ছাড়া তাদের স্বাধীন মূল্যবোধের দাবি তাদের পূর্ববর্তীদের চাইতে উন্নততর ছিল না। এই ব্যতিক্রম হচ্ছে আত্মা ও সত্তার পার্থক্য সম্পর্কে জনৈক কুস্তা ইবনে লুকা রচিত একটি গ্রন্থ। ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হওয়ার পর এই গ্রন্থটি উল্লেখযোগ্য অবদান সৃষ্টি করে।
আরবদের প্রথম ও সর্বশেষ দার্শনিকের রচনা এই যুগেরই আওতায় পড়ে, তিনি হচ্ছেন আবূ ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আলকিন্দী। তাঁর পরিবারের মূল আবাস ভূমি আরব উপদ্বীপের দক্ষিণাঞ্চল। ৮৫০ খৃস্টাব্দে তিনি কুফায় জন্মগ্রহণ করেন এবং বসরা ও বাগদাদে শিক্ষা লাভ করেন। মূল ভাষায় তার রচনা খুব বেশি পরিমাণে পাওয়া যায় না, কিন্তু ক্রেমোনার জেরার্ড ও অন্যান্যের ল্যাটিন অনুবাদে যথেষ্ট পরিমাণে তা দেখা যায়। এখানে আমরা অঙ্কশাস্ত্র, জোতিষশাস্ত্র, আলকেমী ও আলোক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান সম্পর্কে আলোচনা করবো না। তার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হচ্ছে তাঁর নামে ও কর্তৃত্বে অনূদিত একটি গ্রন্থ, যা প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্যের দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের পরবর্তী সামগ্রিক ধারাকে প্রভাবিত করে। অবশেষে সেন্ট টমাস অ্যাকিনাস এটিকে দর্শনের ক্ষেত্র থেকে বিতাড়নের প্রয়াস পান এবং এ ব্যাপারেও তিনি আরব সূত্রেরই সাহায্য গ্রহণ করেন। আলোচ্য গ্রন্থে আরবীতে নিম্নোক্ত রচনাসমূহের সমাবেশ ঘটেছে: 'দার্শনিক অ্যারিস্টটলের বইয়ের প্রথম অধ্যায় যাকে গ্রীক ভাষায় থিওলোজিয়া বলা হয় এবং যাতে রবুবিয়ত বা পালনবাদ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। টায়ারের অধিবাসী প্রফিরিয়াসের ভাষ্য যা এমেসার আবুল মাসিহ ইবনে আবদুল্লাহ না'ঈমা আরবীতে অনুবাদ করেন, এবং যা আবূ ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আল-কিন্দী আহমদ ইবনে আল মু'তাসিম বিল্লাহর জন্য মূল রচনার সঙ্গে মিলিয়ে সংশোধন করেন।' এর থেকে একথা পরিষ্কার যে, এই বইটি মূলত অ্যারিস্টটলের রচনা বলে দাবি করা হলেও এর মধ্যে সমাবিষ্ট লেখা সম্পর্কে প্রকাশ্যে বলা হয়েছে যে, এটি প্রফিরির একটি ভাষ্য। সম্ভবত পরবর্তী সময়ে থিওলোজি তখনি অ্যারিস্টটলের বলে দাবি করা হয়েছে যখন নিওপ্লাটোনিজমের আধ্যাত্মিক প্রবণতা ইসলামে দৃঢ়ভাবে সম্পৃক্ত হয় এবং যখন আল-ফায়লাসূফ হিসাবে অ্যারিস্টটলের কর্তৃত্ব সর্বেসর্বা ছিল। বইটি কোন দিক দিয়েই ভাষ্য নয়। বরং প্লটিনাসের ইনিয়াডের ৪র্থ-৬ষ্ঠ খণ্ডের উপর ভিত্তি করে রচিত।
এই বইতে উল্লেখিত আত্মা সম্পর্কিত মতবাদগুলি বিভিন্ন ব্যক্তিগত সংশোধনীর মাধ্যমে আরব দর্শনের ধারার মধ্য দিয়ে যেভাবে বারবার প্রতিফলিত হয়েছে তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া যেতে পারে। আত্মা একটি খাঁটি বুদ্ধিসত্তা যা অশরীরী এবং অমর। এ বুদ্ধির জগৎ থেকে অনুভূতি ও বাস্তবতার জগতে অবতীর্ণ হয়েছে। এই বুদ্ধিসত্তা চিরন্তনভাবে বুদ্ধির জগতে বাস করে। সেখান থেকে তা বিলীন হতে পারে না। কিন্তু এটি যখন তার মধ্যে উপস্থিত আকারসমূহ সৃষ্টির ইচ্ছা পোষণ করে তখন তার খাঁটিত্ব ও আবেগহীন চিন্তাশক্তি হ্রাস পায়। এটি যে পর্যন্ত অনুভূতির জগতে তার ইচ্ছা পূরণ না করে সে পর্যন্ত ইচ্ছা বেদনার জন্ম দেয়। আত্মা এই ইচ্ছা দ্বারা গঠিত। তাই আত্মা হচ্ছে চিন্তাশক্তি: কখনও এটি একটি দেহের অভ্যন্তরে থাকে এবং কখনও দেহের বাইরে থাকে। এই বিশ্বে চিন্তাশক্তি আত্মার মাধ্যমে সক্রিয় হয়। সকল প্রাণীর আত্মা 'একটি ভুল পথ গ্রহণ করেছে।' একটি উদ্ভিদ-আত্মাও রয়েছে যা জীবন দ্বারা বিভূষিত। এটিও অন্যান্য আত্মার ন্যায় একই সূত্র থেকে উৎসারিত হয়। মানব আত্মার তিনটি অংশ রয়েছেঃ উদ্ভিদ, প্রাণী ও বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন। দেহ বিনাশের পর আত্মা দেহ ত্যাগ করে। যে খাঁটি আত্মা নিজেকে বিশ্ব থেকে অদৃশ্য রেখেছে সেটি তৎক্ষণাৎ কোন প্রকার বিলম্ব না করে বুদ্ধিসত্তাসমূহে ফিরে যাবে। অপরদিকে যেসব আত্মা এই বিশ্বে নিজেদের কলুষিত করেছে এবং দেহের আকাঙক্ষার বস্তু হয়েছে সেগুলি কষ্টকর প্রচেষ্টার পর কেবল তাদের মূল অবস্থা লাভ করবে। আত্মা যখন বুদ্ধির জগতে ফিরে আসে তখন কি স্মরণ করে, এই প্রশ্নের জবাবে জবাব দেওয়া হয় যে, এটি কেবল তাই চিন্তা করে ও করে যা ঐ বিশ্বে উপযুক্ত। এটি তার পূর্ববর্তী কাজকর্ম, পূর্ববর্তী ইচ্ছা বা পূর্ববর্তী দর্শন স্মরণ করবে না তার প্রমাণ হচ্ছে যে, তার দৃষ্টি যখন স্বর্গীয় বিশ্বের ওপর নিবদ্ধ থাকে তখন এই বিশ্বেও এটি অস্থায়ী ব্যাপারসমূহের প্রতি কোন আগ্রহ দেখায় না। স্বর্গীয় জগতে সর্ব প্রকার জ্ঞান সময়ের ঊর্ধ্বে, তাই আত্মাও সময়ের ঊর্ধ্বে। অতএব এই বিশ্বে যেসব জিনিস চিন্তা করা হয় আত্মাও সময়ের ঊর্ধ্বে ই তা জানে।
আত্মার কার্যক্ষমতা একটি সহজ সত্তার প্রতিফলন, এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে আত্মার বিভিন্নমুখী কার্যক্রমকে যুক্তি হিসাবে খাড়া করানো যায় না। আত্মার কার্যক্রম বিভিন্ন সময়ে প্রতিভাত হয়, কারণ দৈহিক সত্তাগুলি এর কার্যক্রম এক এবং একই সময়ে গ্রহণ করতে পারে না। চিন্তাশক্তি হচ্ছে সবকিছু এবং এর সত্তা সবকিছু উপলব্ধি করে, তাই এটি যখন তার নিজস্ব সত্তা দেখে তখন সব কিছু দেখে।
আল্লাহ্ বুদ্ধির কারণ, বুদ্ধি আত্মার কারণ, আত্মা স্বভাবের কারণ, আর স্বভাব সকল প্রকার স্বতন্ত্র জিনিসের কারণ। একটি জিনিস আরেকটি জিনিস ঘটাতে পারলেও আল্লাহই সবকিছুর কারণ, কেননা তিনিই হচ্ছেন কারণের স্রষ্টা। রুক্ষ পাথরের সঙ্গে খোদাই করা পাথরের যে সম্পর্ক অনুভূতি এবং বুদ্ধির দুটি জগতের মধ্যেও তেমনি সম্পর্ক। আত্মার মধ্যে যে সৌন্দর্য নিহিত সেখান থেকে স্বভাবের মধ্যে সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়।
অপ্রধান কারণসমূহের ফল তারকা জগতের কোন ইচ্ছা থেকে আসে না। দেহ আত্মার হাতিয়ার মাত্র। আত্মার জন্য দেহের যখন আর কোন প্রয়োজনীয়তা থাকে না তখন আত্মা দেহ ত্যাগ করে এবং দেহ ধ্বংস ও বিচ্ছিন্ন হয়। আত্মার কারণেই মানুষ যা আছে তাই হয়েছে। আত্মা চিরকাল একই অবস্থায় থাকে। কখনো কলুষিত বা বিলুপ্ত হয় না।
অ্যারিস্টটলের সূত্র থেকে যেসব ধ্যান-ধারণা নেওয়া হয়েছে এগুলি তার কয়েকটি মাত্র। এখানে একটি অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষণীয় যে, পরবর্তী আরব দার্শনিকরা এমন একটি দলিলের প্রামাণিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার কথা চিন্তা করেননি যাতে এমন বহু বিবরণী রয়েছে যা তারা স্বেচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করেন। অ্যারিস্টটলের মতবাদের প্রামাণ্য সূত্রের এই বিকৃতি প্রাচ্য থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত পাশ্চাত্যে বিভ্রান্তি ও মতানৈক্যের সৃষ্টি করে। সেন্ট টমাস এই অবস্থা থেকেই খৃস্টান জগতকে মুক্ত করেন। অবশ্য অ্যারিস্টটলের মতবাদের অংশ হিসাবে প্রচলিত একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা যে সন্দেহ ও জটিলতার সৃষ্টি করে তার থেকে রেহাই পাওয়ার উদ্দেশ্যে বহু লোক তাদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য নিওপ্ল্যাটোনিক মতবাদে নিহিত অধ্যাত্মবাদের আশ্রয় গ্রহণ করেন। অপর দিকে অসংলগ্ন দর্শনের টুকরো টুকরো সংযোজনের ফলে আন্তরিকভাবে সত্যাসুসন্ধানী মুসলমানদের মনে যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয় তার থেকেই তারা তাদের এতসব লেখকের প্রচারিত দর্শনের প্রতি ঘৃণা ও অসহনশীল মনোভাব পোষণ করেন।
দার্শনিক বলতে আরবরা এমন সব লোক মনে করতেন যাদের প্রাথমিক ব্যাপার ধর্মতত্ত্ব নয়, বরং দর্শন। আল-শাহ্াস্তানী বলেছেন যে, দু-একটি বিষয় ছাড়া সকল ক্ষেত্রে তারা অ্যারিস্টটলের পন্থা অনুসরণ করেছেন এবং সে দু-একটি বিষয়ও তারা প্ল্যাটো ও প্রাচীনতর দার্শনিকদের কাছ থেকে ধার করেছেন। নিওপ্ল্যাটোনিক মতবাদসমূহকে বাস্তবিকই অ্যারিস্টটলের মতবাদ বলে মুসলমানদের যে বিশ্বাস ছিল তার আলোকে এই বক্তব্য বিচার করতে হবে।
আল-শাহরাস্তানী তাঁর আরব দার্শনিকদের তালিকা আলকিন্দী ও হুনাইন ইবনে ইসহাক থেকে শুরু করে আবূ আলী ইবনে সিনায় শেষ করেন। তিনি বলেন, অধিকাংশের মতে ইবনে সিনার অন্তর্দৃষ্টি ও বিচারশক্তি সবচাইতে তীক্ষ্ণ ছিল। তিনি যদি আরো কিছুকাল বেঁচে থাকতেন তাহলে তিনি, নিঃসন্দেহে এই সঙ্গে অ্যারিস্টটলের সবচাইতে বিজ্ঞ ভাষ্যকার স্পেনীয় দার্শনিক ইবনে রুশদের নাম যোগ করতেন। এঁদের পদার্থ বিদ্যা অ্যারিস্টটলের চার কারণের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। যেসব আকার ও বৈশিষ্ট্যের দ্বারা জীবের পার্থক্য করা যায় তারা তার অস্তিত্ব স্বীকার করেন এবং এসব আকার ও বৈশিষ্ট্যের মধ্যে তারা জীবের মূলনীতি আবিষ্কারের চেষ্টা করেন।
বিশ্বজগত সম্পর্কে আল-কিন্দীর নিজস্ব মতবাদ অ্যারিস্টটলের ধর্মতত্ত্বের অনুরূপ ছিল। স্বর্গীয় বুদ্ধিমত্তাই বিশ্বের অস্তিত্বের কারণ: এর কার্যকলাপ স্বর্গীয় মণ্ডলসমূহের মাধ্যমে পার্থিবজগতে প্রতিফলিত হয়। বিশ্ব-আত্মা আল্লাহ ও জীবের বিশ্বের মাধ্যম। এই বিশ্ব-আত্মাই স্বর্গীয়মণ্ডলসমূহ সৃষ্টি করেছে। মানব আত্মা বিশ্ব-আত্মারই একটি নিঃসরণ। তাই মানুষের মধ্যে একটি দ্বিত্ব রয়েছে: আত্মা যতক্ষণ পর্যন্ত দেহের সঙ্গে যুক্ত থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত তা স্বর্গীয় মণ্ডলের দ্বারা প্রভাবিত হয়। আর যতক্ষণ পর্যন্ত এটি তার আধ্যাত্মিক মূল উদ্ভবের প্রতি অনুগত থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত মুক্ত ও স্বাধীন। স্বাধীনতা এবং অমরত্ব উভয়টি কেবল বুদ্ধির জগতেই লাভ করা যায়। তাই সেটি লাভ করতে হলে মানুষকে আল্লাহ ও বিশ্ব সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে বুদ্ধি শক্তির বিকাশ সাধনে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
অসাধারণ তথ্যাভিজ্ঞ জীবনীকার ইবনে খাল্লিকানের মতে প্রাথমিক মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন আল-ফারাবী। তিনি মূলত ছিলেন তুর্কী। তিনি অ্যারিস্টটলের ওপর এবং তার স্বধর্মাবলম্বীরা প্ল্যাটোর যেসব রচনার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন সেগুলির ওপর অত্যন্ত সরসভাষ্য রচনা করেন। তাঁর দি সোল, দি ফ্যাকাল্টিজ অব দি সোল এবং দি ইন্টেলিজেন্স-এর উপর রচিত গ্রন্থগুলি ল্যাটিনভাষীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। আল-কিন্দী ও আল-ফারাবী ইনটেলেক্টাস অ্যাজেন্স্-এর সমস্যাটি তাদের উত্তরাধিকারীদের জন্য রেখে যান। অ্যারিস্টটল তার মানবিক মনের মতবাদকে তাঁর ক্ষমতা ও কাজ এবং সম্ভাবনা ও বাস্তবতার বৈষম্যের মতবাদের আওতায় নিয়ে আসেন। তাঁর কাছে মানবিক কারণ কেবল জ্ঞানের একটি সক্ষমতা ছিলো: কখনো এটি জানে বা চিন্তা করে এবং কখনো করে না। তাহলে এমন একটি প্রকৃত কিছু অবশ্যই আছে যা সম্ভাবনাময় মানবিক চিন্তাশক্তিকে বাস্তবতায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে। এবং এটি অবশ্যই স্বয়ং আল-ফা'আল চিন্তাশক্তি। কিন্তু এই সক্রিয় বা সৃজনশীল চিন্তা শক্তি কি? মানব আত্মার সঙ্গে, যে বুদ্ধিমত্তা পরিমণ্ডলকে পরিচালিত করে তার সঙ্গে এবং আল্লাহর সঙ্গে এর কি সম্পর্ক?
আল-ফারাবী চিন্তা শক্তিকে চার ভাগে ভাগ করেছেন। যেমন, ক্ষমতায় নিহিত চিন্তা-শক্তি, কাজে নিহিত চিন্তাশক্তি, অর্জিত চিন্তাশক্তি এবং মাধ্যম চিন্তাশক্তি। তৃতীয়টির দ্বারা তিনি বোধগম্য ব্যাপারসমূহ উপলব্ধির মুহূর্তে চিন্তাশক্তির সক্রিয় অবস্থা বোঝাতে চেয়েছেন বলে মনে হয়। মাধ্যম চিন্তাশক্তি দ্বারা তিনি বস্তুর মধ্যে অবস্থান করে না এমন একটি খাঁটি আকার বুঝিয়েছেন। এটিই সম্ভাবনাময় চিন্তাশক্তিকে বাস্তবে এবং বোধগম্য সম্ভাবনাকে প্রকৃত উপলব্ধিতে পরিণত করে।
প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার আগে একথা বলা যেতে পারে যে, ইবনে রুশদের মতে সক্রিয় চিন্তাশক্তি এবং সম্ভাবনাময় চিন্তাশক্তি সকল মানুষের মধ্যে এক। এ ধরনের বিশ্বাস ব্যক্তিগত অমরত্ব ও স্বতন্ত্র সত্তার বিনাশমূলক। সেন্ট টমাস অ্যাকিনাস এর ঘোর বিরোধিতা করেন। তার মতে সম্ভাব্য বা সম্ভাবনাময় চিন্তাশক্তি এবং সেসঙ্গে সক্রিয় চিন্তাশক্তি প্রত্যেক স্বতন্ত্র ব্যক্তির আত্মার একটি অংশ, তাই মানব জাতির সমষ্টির মধ্যে সক্রিয় চিন্তাশক্তি ও সম্ভাব্য চিন্তাশক্তির সংখ্যা একই রকম। ইবনে সিনা আল-ফারাবীর অনুসরণে সকল মানুষের মধ্যে সম্ভাবনাময় চিন্তাশক্তি না হলেও সক্রিয় চিন্তাশক্তির ঐক্যের পক্ষে অভিমত জ্ঞাপন করেছেন। কিন্তু সেন্ট টমাস অ্যাকিনাস যথার্থভাবেই দেখেছিলেন যে, এটি স্বতন্ত্রভাবে প্রত্যেকের নিজস্ব কাজের ওপর তার নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আল-ফারাবীর মধ্যে আমরা আল্লাহ্র অস্তিত্বের পক্ষে ঐসব যুক্তি দেখতে পাই, যেগুলি টিমায়ুস ও মেটাফিজিক্স থেকে উদ্ভূত। মুসলমানদের সর্বপ্রকার পণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনায় কষ্টসাধ্যভাবে বারবার এগুলির পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। এগুলি হচ্ছে প্রয়োজনীয় ও সম্ভাবনাপূর্ণ, সীমাহীনভাবে ধারাবাহিক কারণের অসাধ্যতা এবং এর মধ্যে ও এর পক্ষে আবশ্যিকভাবে নিহিত প্রথম কারণের স্বতঃসিদ্ধতা। আল-ফারাবী, 'বিশ্ব অনাদি' এই মতবাদের একজন উৎসাহী সমর্থক ছিলেন, কিন্তু ইসলাম ও খৃস্ট ধর্মমতে এরূপ ধারণা পাপ। তিনি সবকিছুকে একত্রিত রাখার গতি হিসাবে সময়ের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা উল্লেখযোগ্য।
আল-ফারাবী থেকেও পাশ্চাত্যে অনেক বেশি পরিচিত একটি নাম হচ্ছে ইবনে সিনা। তাঁর পরিবার বুখারা থেকে আসে। মৃত্যুর পর দার্শনিক রচনার চাইতে চিকিৎসা বিষয়ক রচনার জন্য তিনি সমধিক খ্যাতি লাভ করেন। তিনি জনপ্রিয় রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন এবং যেকোন বিষয়কে নিজস্ব পন্থায় সংক্ষেপে ও সুষ্ঠুভাবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারতেন। এ কারণে তিনি ইবনে রুশদের আবির্ভাবের পূর্ব পর্যন্ত পাশ্চাত্যে আরব দার্শনিক চিন্তাধারার শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি হিসাবে যথার্থভাবে স্বীকৃতি লাভ করেন। ল্যাটিনভাষীরা আবূ রুশদের রচনার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগে ইবনে সিনাকে জানতেন। টলেডোর আর্চবিশপ রেমও ১১৩০ ও ১১৫০ খৃস্টাব্দের মধ্যে, তাঁর আর্কডিকন ডোমিনিক গুণ্ডিসালভাস ও সেভিলের জুয়ান আভেলডেথকে এসব রচনা অনুবাদের নির্দেশ প্রদান করেন। ইবনে সিনার রচনা সাধারণভাবে তাঁর পূর্ববর্তীদের অনুরূপ হলেও তাঁর মতবাদসমূহ অনেক বেশি সুস্পষ্টভাবে সুবিন্যস্ত করা হয়েছে। খাঁটি বুদ্ধিসমূহ প্রয়োজনীয় অস্তিত্ব থেকে উৎসারিত হয়েছে। এগুলি সহজ সারবস্তু এবং পরিবর্তনশীল নয়। এসব সুন্দর জিনিস সব সময় প্রয়োজনীয় অস্তিত্বের দিকে ফিরেছে। তারা অনন্তকাল পর্যন্ত স্বর্গীয় ধ্যানের জ্ঞানদীপ্ত আনন্দে বিভোর থেকে সেই অস্তিত্বের অনুকরণের চেষ্টা করেছে। ইবনে সিনা তাঁর পূর্ববর্তীদের মতবাদের যে বিশ্লেষণ দিয়েছেন তা পাশ্চাত্যে অত্যন্ত শক্তিশালী প্রভাব সৃষ্টি করে এবং তাঁর রচনাসমূহ ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হওয়ার পরই এই প্রভাব সৃষ্টি হয়।
ইবনে সিনা পাশ্চাত্যকে যে অসংখ্য শব্দ ও ধ্যান-ধারণা দিয়ে গেছেন তার একটি হচ্ছে ইনটেনশিও। এর আরবী শব্দ হচ্ছে মা'কুলাত, অর্থাৎ চিন্তাশক্তি দ্বারা যা বোঝা যায়, বোধগম্য ব্যাপারসমূহ। 'অভিপ্রায়সমূহ' দুই প্রকারের : কোন জিনিসের প্রাথমিক ধারণা, যেমন একটি গাছ এবং বিশ্বজগতের জটিল ধারণার আলোকে কোন জিনিসের দ্বিতীয় যা যৌক্তিকতামূলক ধারণা। ইবনে সিনার মতে দ্বিতীয় অভিপ্রায় হচ্ছে যুক্তির বিষয়, যার মাধ্যমে মানুষ জানা থেকে অজানার পথে এগিয়ে যায়। এই মতবাদকে অবলম্বন করে আলবার্টাস ম্যাগনাস জ্ঞানদীপ্ত দার্শনিক ঐতিহ্যের অন্যতম ব্যক্তিত্ব হিসাবে পরিচিত হন।
ইবনে সিনা তার নিজের জন্য ও ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য এমন একটি সমস্যা তুলে ধরেন যাতে তাঁর নিপুণ উদ্ভাবন শক্তির চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি এই মূলনীতি নির্ধারণ করেন যে, এক ও অবিভাজ্য থেকে কেবলমাত্র এক অস্তিত্বের উদ্ভব হতে পারে। তাই এরূপ বক্তব্য অনুমোদনযোগ্য নয় যে, আকার ও বস্তু সরাসরি আল্লাহ্ থেকে উদ্ভূত হয়; কারণ তাতে এরূপ মনে করার অবকাশ রয়েছে যে, স্বর্গীয় সত্তার দুটি পৃথক আকৃতি রয়েছে। বস্তুত, বস্তু আল্লাহ্ থেকে আসছে এরূপ চিন্তা করা উচিত নয়। কেননা এটিই হচ্ছে বহুত্ব ও বিভিন্নতার মূলনীতি।
ইবনে সিনা আবারো বলেন, আমরা এরূপ বলতে পারি না যে, একটি প্রয়োজনীয় অস্তিত্ব কোন চূড়ান্ত কারণ না থাকার দরুন এই অর্থে একটি উদ্দেশ্য দ্বারা প্রভাবিত হয় যে, সে নিজের কারণের চাইতে অন্য কিছুর কারণে কাজ করছে। যদি সে তাই করতো তাহলে তার কাজে এমন একটি অস্তিত্বের বিবেচনা প্রাধান্য পেতো যা তার চাইতে নিকৃষ্টতর। তাহলে সেক্ষেত্রে স্বর্গীয় বৈশিষ্ট্যের মধ্যে নিম্নোক্ত পার্থক্য সৃষ্টির প্রয়োজন হতো: (ক) জিনিসের ভালো গুণ যার জন্য সেটি বাঞ্ছিত; (খ) সেই ভালো গুণের স্বর্গীয় জ্ঞান, এবং (গ) সেই ভালো গুণ অর্জন বা সৃষ্টির স্বর্গীয় অভিপ্রায়। অতএব, প্রয়োজনীয় অস্তিত্ব স্বরূপ আল্লাহ্ এবং বহুত্বের বিশ্বের মধ্যে মাধ্যম হিসাবে কোন কিছু স্বতঃসিদ্ধভাবে থাকতে হবে। তাই সমস্যাটি হচ্ছে, একটি জটিলতাপূর্ণ বিশ্বজগত ও একজন সহজ স্রষ্টাকে কিভাবে বুঝতে হবে।
ইবনে সিনা প্রয়োজন ও সম্ভবের ধারণার সঙ্গে চেতনা ও জ্ঞানের ধারণার সমন্বয়ের মাধ্যমে তাঁর বক্তব্য শুরু করেন। প্রথমটি খাঁটি চিন্তাশক্তির সূচনা করে এবং প্রথম অস্তিত্ব থেকে তার অস্তিত্ব লাভ করে। কাজেই এটি প্রয়োজনীয়। কিন্তু এটি স্বয়ং সম্ভাব্য ব্যাপার, কেননা প্রথম কারণের কারণ ঘটানোর কোন প্রয়োজনীয়তা ছিল না। এভাবে বিশ্বজগতে একটি দ্বিত্বের উদ্ভব হয় যার দ্বারা প্রথম কারণ ব্যাহত হয়নি। এবং এই দ্বিত্ব থেকে ত্রিত্বের আবির্ভাব ঘটে। সেখান থেকে ক্রমান্বয়ে নিঃসরণ আসতে থাকে, যার সমাপ্তি ঘটে চন্দ্রের পরিমণ্ডলে। সেখানে চাঁদের চিন্তাশক্তি একটি সর্বশেষ খাঁটি চিন্তাশক্তির জন্ম দেয় এবং এর থেকেই মানুষের আত্মা ও চারটি উপাদানের সূচনা হয়। এখানেই ইবনে সিনা গুরুতর অসুবিধার সম্মুখীন হন। তিনি যে মূলনীতিকে পরিমণ্ডলে স্থাপন করেন তা হারিয়ে ফেলেন। আর সেই মূলনীতি হচ্ছে, 'এক থেকে কেবলমাত্র একই এগিয়ে যেতে পারে'। উপাদানগুলি একটি সাধারণ স্তর। সমন্বিত হওয়ার দরুন বস্তুগতভাবে এক হতে পারে, কিন্তু সেগুলির আকার কি? তিনি 'চারটি উপাদানের' অস্তিত্ব খাঁটি বুদ্ধিশক্তির অভ্যন্তরে একটি জ্ঞানের মধ্যে আরোপ করেছেন, যেখানে তারা আল্লাহর চিন্তায় চার। তাঁর মূলনীতিকে রক্ষার প্রচেষ্টায় এবং একই সময়ে বহুত্বের অবকাশ রাখার জন্য ইবনে সিনা এরূপ মতবাদের অবতারণা করেন যে, বস্তুকে কোন একটি বিশেষ আকার দেওয়ার জন্য 'প্রস্তুত' বা 'বিন্যাস' করা হয়েছে। পরিমণ্ডলসমূহের গতির মাধ্যমে এই বিন্যাস এমনভাবে সূচিত হয়েছে যে, যে বস্তুটি তার যথাযথ আকার স্থাপন করার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে, আকার শুধুমাত্র তাকে অধিকার বা গ্রহণ করে। বহু মুসলিম দার্শনিকের মতে সৃষ্টির ক্রম এভাবে গঠিত হয়েছে: 'প্রথম মূলনীতি' অর্থাৎ আল্লাহ। 'প্রথম চিন্তাশক্তি' এর অস্তিত্ব ও মূল জানা। 'দ্বিতীয় চিন্তাশক্তি'. নবম পরিমণ্ডলের আত্মা। (ক) প্রয়োজন ও (খ) অবয়ব। (খ) সম্ভব হিসাবে এটিকে জানা। 'তৃতীয় চিন্তাশক্তি' শনির পরিমণ্ডলের আত্মা। (ক) প্রয়োজন ও (খ) অবয়ব (খ) সম্ভব হিসাবে এটিকে জানা। এবং এমনিভাবে যে পর্যন্ত 'চন্দ্রের পরিমণ্ডল' চন্দ্রের পরিমণ্ডলের আত্মা ও অবয়ব 'সক্রিয় চিন্তাশক্তি' মানবিক আত্মা ও চারটি উপাদান।
জ্ঞান চর্চার অগ্রগতি সম্পর্কে পূর্ব ধারণা থাকা সত্ত্বেও রজার বেকন তাঁর সময়ে দার্শনিক জ্ঞানের অবস্থা সম্পর্কে যে বিবরণ দিয়েছেন তা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। 'অ্যারিস্টটলের দর্শনের অধিকাংশ (পাশ্চাত্যে) কোন প্রভাব সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে। তার কারণ পাণ্ডুলিপিসমূহ অজ্ঞাত ও অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য ছিল, অথবা বিষয়বস্তু দুর্বোধ্য বা বিস্বাদ ছিল, কিংবা প্রাচ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ ছিল। মুসলিম যুগ পর্যন্ত এই অবস্থা অব্যাহত থাকে এবং এই যুগে ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ ও অন্যরা অ্যারিস্টটলের দর্শনকে ব্যাপকভাবে তুলে ধরেন। বোইথিয়াস গ্রীক ভাষা থেকে তর্কশাস্ত্র ও অন্যান্য বিষয়ের কিছু কিছু রচনা অনুবাদ করলেও মাইকেল দি স্কট নিজস্ব বিশ্লেষণসহ অ্যারিস্টটলের 'প্রকৃতি' ও 'মেটাফিজিক্স' সংক্রান্ত গ্রন্থসমূহের কোন কোন অংশ অনুবাদ করার পর তার সময় থেকেই ল্যাটিনভাষীদের কাছে অ্যারিস্টটলের দর্শন অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে দেখা দেয়। তাঁর বিশাল ও ব্যাপক জ্ঞানের ধারক হাজার হাজার গ্রন্থের মধ্যে খুব সামান্যই বর্তমান সময়ে (ঐ সময়) পর্যন্ত ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং তারও কম বিষয় সাধারণভাবে ছাত্রদের কাজে লাগছে। অ্যারিস্টটলের অনুকরণকারী ও ব্যাখ্যাতা এবং দর্শনশাস্ত্রে অসাধারণ পণ্ডিত ইবনে সিনা বিশেষভাবে দর্শন সম্পর্কে তিন খণ্ডে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি তাঁর দি সাফিসিয়েন্সি গ্রন্থের ভূমিকায় একথা উল্লেখ করেছেন। একটি অ্যারিস্টটলের জ্ঞান বিতরণ কেন্দ্রের পেরিপ্যাটিটিক দার্শনিকদের প্রামাণ্য বিবরণের ন্যায় জনপ্রিয় ছিল। দ্বিতীয়টি সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেন যে, দর্শনের খাঁটি সত্য অনুযায়ী যা 'বিরুদ্ধবাদীদের বর্শার আঘাত কে ভয় করে না'। জীবনসায়াহ্নে সমাপ্ত তৃতীয়টিতে তিনি প্রথম দিকে লিখিত গ্রন্থগুলি বিশ্লেষণ করেন এবং প্রকৃতি ও শিল্পের অধিকতর অস্পষ্ট বাস্তব দিকগুলির সমাবেশ ঘটান। এসব বইয়ের মধ্যে দুটি অনূদিত হয়নি। ল্যাটিনভাষীরা 'আসিফা' নামে পরিচিত গ্রন্থটির কয়েকটি অংশ পেয়েছেন। তাঁর পরে আসেন সুদৃঢ় জ্ঞানের অধিকারী ইবনে রুশদ। তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের বহু বক্তব্য সংশোধন করেন এবং নিজে বহু নতুন দর্শন তত্ত্ব তুলে ধরেন। কিন্তু কোন কোন বিশেষ ক্ষেত্রে তাঁর লেখারও সংশোধনী দরকার এবং বহু ক্ষেত্রে বিশ্লেষণের প্রয়োজন। অবশ্য ইকলিযিয়াসটিযে হযরত সুলায়মানের উক্তি অনুযায়ী "বহু বই তৈরির ব্যাপারে এর কোন শেষ নেই।" বেকনকে একজন তীক্ষ্ণ কটুভাষী মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে এবং তিনি কোন কোন সময় তাঁর যুগের জ্ঞানের সঙ্গে তাল বজায় রাখতে গিয়ে অবশ্যই ব্যর্থ হয়েছেন। এতদসত্ত্বেও তার অব্যবহিত পূর্ববর্তীকাল সম্পর্কে তাঁর এই বক্তব্যের মূল্য রয়েছে।
মুসলিম স্পেন প্রাচ্যের মুসলমানদের বিবদমান সবগুলি সম্প্রদায়ের একটি বিশ্বস্ত দর্পণ ছিল। দার্শনিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের বিভিন্নতা যেভাবে গ্রীক রীতিনীতির প্রাচীন কেন্দ্রগুলিকে উত্তপ্ত করে তোলে এখানেও তেমনি ধরনের বহু বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তাই এখানে আবশ্যিকভাবে ঐসব চিন্তা নায়কের কিছু কিছু বিবরণ তুলে ধরা দরকার, যাদের শিক্ষা প্রাথমিক স্পেনীয় দর্শন ও জ্ঞান চর্চা্য গভীর প্রভাব সৃষ্টি করে। বেকনের কোন কোন বক্তব্য এখনো যথার্থ। মুসলিম দর্শনের একটি ইতিহাস লেখার এখনো সময় আসেনি। এমনকি ইউরোপ ও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন লাইব্রেরির সংশ্লিষ্ট উপাদান সম্বলিত সবগুলি পাণ্ডুলিপি প্রকাশ করে পণ্ডিত ব্যক্তিদের হাতে দেওয়ার পরও, এগুলির বিষয়ভিত্তিক বিবরণ তৈরি ও বিস্তারিত বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর সুবিশাল বিষয়বস্তুর সাধারণ পর্যালোচনার ভিত্তি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। বর্তমানে আমাদের জ্ঞানে বহু শূন্যতা রয়েছে। এগুলি ধীরে ধীরে পূরণ হচ্ছে। কিন্তু মধ্যযুগীয় আরব দর্শনের প্রায় প্রতিটি বিষয় নতুন করে আমাদের অবগতিতে আসার সঙ্গে সঙ্গে তা পাশ্চাত্যের মধ্যযুগীয় চিন্তাধারা বিকাশের ওপর নতুন নতুন আলোক সম্পাত করে। মুসলিম প্রাচ্য পাশ্চাত্যের সঙ্গে ধর্মীয় বন্ধনে এমন ঘনিষ্ঠভাবে আবদ্ধ হয় যা রাজনৈতিক অনৈক্য ছিন্ন করতে পারেনি। একসময় যখন পাশ্চাত্যের ইসলাম প্রাচ্যের ধ্যান-ধারণার প্রবাহের জন্য উন্মুক্ত হয় তখন চিন্তাধারা ও জ্ঞান চর্চার বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমন একটি ঐক্য তথা সাধারণ স্বার্থ গড়ে ওঠে যা বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের বিচ্ছিন্ন জ্ঞানসাধকদের সমঝোতার একটি জ্ঞানদীপ্ত ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করে। ইউরোপ বর্তমানে এ ধরনের বন্ধন হারিয়ে ফেলেছে। মুসলিম ফ্যাচজেনোসেন একটি সাধারণ ভাষায় চিন্তা করার, লেখার ও কথা বলার এক অকল্পনীয় সুবিধা ভোগ করে, তাই আমাদেরকে স্পেনের মুসলিম চিন্তানায়কদের--যাঁরা হিজরীর তৃতীয় শতকের আগে সক্রিয় হননি--পূর্ববর্তী অবস্থা--প্রাচ্যে অনুসন্ধান করতে হবে।
স্পেনে খৃস্টান যাজক সম্প্রদায় দর্শনশাস্ত্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেন, তাই খৃস্টানরা অভিযানকারী মুসলমানদের শিক্ষক হওয়ার পরিবর্তে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। 'মুযারেবিক' সাহিত্য অত্যন্ত দুর্বল ও ক্ষয়শীল ছিল, তাই সেখানে মধ্যযুগীয় জ্ঞান চর্চার বীজ অনুসন্ধানের চেষ্টা বৃথা। স্পেন প্রায় তিন শতাব্দীকাল পর্যন্ত অত্যন্ত নিষ্ঠাবান মুসলিম দেশ ছিল, এবং মু'তাযিলা পন্থী আল জাহিযের রচনাকালের পূর্ব পর্যন্ত সেখানে কোন গুরুত্বপূর্ণ ধর্মতাত্ত্বিক বা যুক্তিভিত্তিক জ্ঞানচর্চার সন্ধান পাওয়া যায় না। আল-জাহিয প্রাচীন বিশ্বে পরিচিত প্রায় সকল বিষয়ে অত্যন্ত চিন্তাশীল গ্রন্থ রচনা করেন। যেসব স্পেনীয় আরব প্রাচ্যে তাঁর জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য শুনতেন তাঁরা তাঁকে স্পেনে নিয়ে আসেন। অচিরেই অধিকতর চিন্তাশীল ব্যক্তিরা মু'তাযিলা মতবাদে আকৃষ্ট হন এবং ধর্মীয় নিষ্ঠামূলক শিক্ষা সমালোচনার সম্মুখীন হয়।
হিজরীর প্রথম শতক থেকেই মানুষের ইচ্ছার সঙ্গে আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। আমাদের নিজস্ব 'পেলেজিয়াস' এই সমস্যাটি তুলে ধরেন এবং এতো গভীরভাবে আলোচনা করেন যে, তার প্রচারিত মতামত শীঘ্রই একটি নতুন ধর্মদ্রোহিতার পর্যায়ে পৌছে। গ্রীক ধর্মতাত্ত্বিকরা এই সমস্যাটিকে সামগ্রিকভাবে একটি বিতর্কমূলক বিষয় হিসাবে অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে গ্রহণ করেন। 'পূর্ব নির্ধারণ' ও 'স্বাধীন ইচ্ছা' অত্যন্ত বিতর্কমূলক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। এখান থেকেই এটি একটি সংক্রামক ব্যাধি হিসাবে মুসলিম ধর্মমতে প্রবেশ করে। যারা এরূপ অভিমত পোষণ করেন যে, আল্লাহ্ মানুষের কাজ পূর্ব-নির্ধারণ করতে পারেন না, কারণ তিনি একটি নৈতিক সত্তা যাকে অবশ্যই যা ন্যায্য তা করতে হয়, তারা মু'তাযিলা বা বিচ্ছিন্নতাবাদী রূপে পরিচিত। যারা কুরআন ও হাদীসের প্রতি অকুণ্ঠ নিষ্ঠামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পরবর্তীকালে তাদেরও এই নামে অভিহিত করা হয়। প্রাচ্যে এসব উদারনৈতিক ধর্মতাত্ত্বিকদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়। কিন্তু পরবর্তীকালের যে মুসলিম চিন্তাধারা পশ্চিম ও দক্ষিণ ইউরোপে প্রবেশ করে সেই চিন্তাধারাকে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা প্রভাবিত করেছে তা আমরা আলোচনা করবো। আল্লাহর ন্যায়পরায়ণতার চিরন্তন মূলনীতির ন্যায় কতিপয় মতবাদে অবিচলতা সভ্য জগতে মু'তাযিলাদের বিরাট অবদান সৃষ্টির ক্ষেত্রে ততোটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেনি, বরং ধর্মতত্ত্ব মনের অনুসন্ধানের বিষয় হওয়া উচিত, তাদের এই দাবিই সেখানে সব চাইতে বেশি অবদান রেখেছে। "সর্ব মহান আল্লাহ বলেছেন", এরূপ উক্তি দ্বারা তাদের মুখ বন্ধ করা যেতো না। তারা বরং 'আল্লাহ' ও 'বলেছেন' এই দুটি কথার তাৎপর্য দাবি করতেন। চরমপন্থীরা এ ধরনের মনোভাবের মধ্যে বিপদ দেখতে পান এবং তারা মু'তাযিলাদের প্রশ্ন করার প্রসঙ্গটিকে এতদূর টেনে নিয়ে যান যে, তা অজ্ঞেয়বাদ বা প্রকাশ্য নাস্তিকতার পর্যায়ভুক্ত হয়। ফিটব্জিরাল্ডের বিখ্যাত চতুষ্পদীগুলিতে যে নৈরাশ্যবাদ অপরূপভাবে প্রতিফলিত হয়েছে এদের অনেকেই সেই নৈরাশ্যবাদের শিকার হন। কিন্তু সন্দেহ ও নৈরাশ্যবাদ মনের এমন অবস্থার ইঙ্গিত দেয় যাকে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিকর বলে মনে করে। কিন্তু মু'তাযিলাদের আন্দোলনের শক্তি তাদের মধ্যে নিহিত ছিল যারা ইসলামী ধর্মতত্ত্বকে একটি দৃঢ় দার্শনিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠার জন্য সাধনা করেন। তাঁরা জোর দিয়ে বলেন যে, এর ভিত্তি যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত, এবং তারা যাকে দর্শনের পরিপন্থী হিসাবে জানেন তার কোন কিছুই ডি ফিডে হিসাবে শিক্ষা দেওয়া উচিত নয়। আমরা যদি আল্লাহর গুণাবলী সম্পর্কে মু'তাযিলাদের বাদানুবাদের বিপুল রচনার মধ্যে শুধু নামের বিরোধ দেখি, তাহলে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গটিকে অত্যন্ত ছোট করে দেখা হবে। গিবনও খৃস্টান সম্প্রদায়কে একটি যুক্ত স্বরধ্বনির জন্য বিশ্বকে প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত করার দায়ে অভিযুক্ত করে একইভাবে সেই প্রসঙ্গটিকে খাটো করে দেখেন।
কুরআন এর অনুসারীদের আল্লাহর একটি মতবাদের জন্য উপাদান সরবরাহ করেছেন একথা বলা যায় না। কুরআন আল্লাহকে 'জ্ঞানী', 'শক্তিশালী', 'জীবনদাতা' 'মৃত্যু আনয়নকারী' প্রভৃতি হিসাবে উল্লেখ করেছেন। এটিতে আল্লাহকে তাঁর 'আরশে' উপবিষ্ট বলা হয়েছে এবং তাঁর প্রতি মানুষের গঠন আরোপ করা হয়েছে। মু'তাযিলারা এ ধরনের বর্ণনাকে আলঙ্কারিক বলে মনে করেন,--মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞানে আল্লাহর প্রতি নিছক মানবত্ব আরোপ। 'ক্ষমতা', 'ইচ্ছা', 'জ্ঞান', 'শ্রবণ', 'দর্শন', 'বাকশক্তি' ও 'জীবন' এই সাতটি প্রশংসাসূচক বৈশিষ্ট্যকে পৃথক পৃথক গুণাবলী রূপে স্বর্গীয় বৈশিষ্ট্যের মধ্যে যেভাবে আরোপ করা হয়েছে তাকে বহুদেববাদের সমতুল্য বলে নিন্দা করেছেন। কেউ কেউ এতোটা পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছেন যে, আল্লাহর প্রতি কোনকিছু আরোপ করা যায় না। অন্যরা কেবল এসব গুণের কোন কোনটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। স্পেনীয় আরবদের জ্ঞান সাধনার কাছে অত্যন্ত ঋণী ডান্য স্কোয়েসের মতে 'প্রথম সত্তা' জীবন্ত, সক্রিয়, বুদ্ধিমান এবং ইচ্ছাশক্তির অধিকারী ছিল।
বাকশক্তির অধিকারী আল্লাহ বলতে কি বোঝায়, এরূপ আলোচনা মৌলিক হয়ে পড়ে এবং এর ফলে মু'তাযিলাদের ওপর পার্থিব হাতের দমনক্রিয়া প্রবল হয়ে ওঠে। মু'তাযিলারা যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, বাকশক্তি যদি একটি স্বর্গীয় গুণ হয়ে থাকে তাহলে তা অবশ্যই চিরন্তন এবং সমগ্র বিশ্বজগৎ সৃষ্টির আগে তার অস্তিত্ব ছিল। অন্যথায় আল্লাহ যখন সময়মত কথা বলেন, তখন তাঁর মধ্যে এই পরিবর্তন আসে যে, 'তিনি' আগে যা ছিলেন না 'তিনি' তা হয়েছেন, এবং আল্লাহ সম্পর্কে 'হওয়া' আরোপ করা যায় না। অতএব, বাকশক্তি বা কথা যদি স্বর্গীয় বৈশিষ্ট্য হয়ে থাকে তাহলে আল্লাহর বাণী হিসাবে কুরআন অবশ্যই সৃষ্টি-পূর্ব। কিন্তু তা অসম্ভব, কারণ এটি প্রকাশ্যত সৃষ্ট বিশ্বের একটি জিনিস, যথাসময়ে ও যথাস্থানে প্রকাশিত ও লিখিত হয়েছে। এরূপ ইঙ্গিত কখনো কখনো তার দেশভিত্তিক এবং সম্পূর্ণ স্থানীয় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আয়াতসমূহে পাওয়া যায়। আল্লাহর গুণাবলী তাঁর অস্তিত্বের অনুরূপ এবং তাঁর সৃষ্ট জীবের সঙ্গে 'তাঁর' সম্পর্কে সৃষ্টি ও সংরক্ষণের ন্যায় কতিপয় কার্য পরিচালনামূলক বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব ঘটালেও সেগুলি কেবল সময়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
খলীফা আল মামুন নিজেও মু'তাযিলা ছিলেন। তিনি একটি সময়ের জিনিস হিসাবে কুরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন। দুর্ভাগ্যবশত মু'তাযিলারা যখন ক্ষমতাসীন ছিলেন তখন অসহনশীল মনোভাব প্রদর্শন করেন। যেসব নিষ্ঠাবান মুসলমান পূর্ব থেকে কুরআনের অস্তিত্বের মতবাদে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন এবং মহানবীর বিপুল সংখ্যক হাদীস অনুসরণে এর সুষ্ঠু আক্ষরিক বিশ্লেষণ দান করেন, মু'তাযিলারা তাদের ওপর নির্যাতন চালান। এই একই নির্যাতন পরবর্তীকালে তাদের ওপরও আপতিত হয়।
অবশ্য হিজরী চতুর্থ শতকে এটা যথেষ্ট পরিমাণে পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, মু'তাযিলাদের দাবির ব্যাপারে কিছুটা সুযোগ দেওয়া দরকার। মানুষের মনে কিছুটা অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়, তাই প্রচলিত দর্শনের আলোকে বিশ্বাসের মতবাদসমূহ পুনঃ পর্যালোচনা জরুরী হয়ে পড়ে। দু'জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তারা গোঁড়া মতবাদমূলক কালাম বা জ্ঞানদীপ্ত দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা। এঁরা হচ্ছেন বাগদাদের আবুল হাসান আল আশ'আরী এবং সমরকন্দের আবুল মনসূর আল-মাতুরিদি। কালাম একটি কল্পনামূলক বিজ্ঞান। এতে একান্তভাবে না হলেও বিশেষভাবে ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাপার আলোচনা করা হয়। মুতাকাল্লিমুন এবং সেন্ট টমাসের ভাষায় লকুয়েন্টিজ কালাম-এর নিম্নোক্ত সংজ্ঞা দেন: 'বিশ্বাসের মূলনীতিসমূহের এবং ধর্মতাত্ত্বিক গুণাবলীর সমর্থনে জ্ঞানদীপ্ত প্রমাণসমূহের বিজ্ঞান।' মূলত মুতাকাল্লিমুন শব্দটি নিষ্ঠামূলক ও অনিষ্ঠামূলক নির্বিশেষে যেকোন মতবাদের লোকদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হতো। কিন্তু পরবর্তীকালে যারা ইসলামের নিষ্ঠামূলক দিকের অবিচল সমর্থক ছিলেন তাদের ক্ষেত্রে এই শব্দটি বিশেষভাবে প্রয়োগ করা হয়।
মু'তাযিলা মতবাদ বহু বছর পর্যন্ত স্পেনে অগ্রগতি লাভ করতে পারেনি, কারণ জনসাধারণের মনে এরূপ ধারণার সৃষ্টি হয় যে, এটি ধর্মদ্রোহিতামূলক। তাছাড়া একটি ফাতিমীয় গোপন সংগঠন সমগ্র মুসলিম চিন্তাধারার জন্য বিপজ্জনক হয়ে পড়ে। ফলে দার্শনিকরা গোপনে দর্শন চর্চা করতে বাধ্য হন। স্পেন ইবনে মাসাররা, ইবনুল আরাবী ও ইবনে রুশদ নামক যে তিনজন প্রভাবশালী চিন্তানায়কের জন্ম দেয় তাদের উপর নিও-প্ল্যাটোনিক, সুডো-এসপেডোক্লিয়ান ও অ্যারিস্টটলিয়ান রচনার সূত্র থেকে আগত দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব পর্যালোচনার দায়িত্ব অর্পিত হয়। এদের মধ্যে প্রথম দুজন ছিলেন অধ্যাত্মবাদী। তারা খৃস্টান সন্ন্যাসীদের সূত্র থেকে লব্ধ তাদের প্রাচ্যের স্বধর্মাবলম্বীদের কঠোর সাধনার পথ অবলম্বন করেন এবং এর সঙ্গে একটি সর্বেশ্বরবাদী কল্পনামূলক দর্শনের সংমিশ্রণ ঘটান।
এঁদের মধ্যে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মাসাররা ২৬৯ হিজরীতে তথা ৮৮৩ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কর্ডোভার অধিবাসী আবদুল্লাহ মু'তাযিলা মতবাদের উৎসাহী অনুসারী ছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে তিনি তাঁর মতবাদ গোপন রাখেন। পুত্রের বয়স যখন তরুণ তখন তিনি ইন্তিকাল করেন, কিন্তু তার আগেই তিনি পুত্রের মধ্যে কল্পনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও কঠোর সাধনামূলক জীবনের প্রেরণা সৃষ্টি করে যান। তাই ইবনে মাসাররা তাঁর বয়স ত্রিশ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সিয়েরা ডি কর্ডোভার পার্বত্য অঞ্চলে গমন করেন এবং সেখানে শিষ্যবর্গ পরিবৃত হয়ে গূঢ় ধর্মতত্ত্ব পর্যালোচনা ও প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। পার্থিব ক্ষমতার ভয়ে গোপনীয়তা অবলম্বনের ফলে তাঁর মতবাদ এমন এক গভীরতা লাভ করে যা অধিকতর ব্যাপকভাবে প্রচারিত মতবাদে কদাচিৎ দেখা যায়। এর ফলে ইবনে মাসাররা ও তার মতবাদ পরবর্তী শতকসমূহে একটি স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করে। যথাসময়ে জানাজানি হয়ে পড়ে যে, ইবনে মাসাররা যেখানে গিয়ে আস্তানা প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেখান থেকেই ইসলামের মৌলিক ধারণার পক্ষে বিপজ্জনক মতবাদ প্রচারিত হচ্ছে। তাই নাস্তিকতার অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার আশংকায় ইবনে মাসাররা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে মক্কায় হজ্জ যাত্রার অজুহাত প্রদর্শন করে দেশ ত্যাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সহনশীল ও বিদ্যোৎসাহী তৃতীয় আবদুর রহমান মসনদে আরোহণ না করা পর্যন্ত তিনি আরব থেকে স্পেনে প্রত্যাবর্তন করেননি। তিনি যখন আর একবার একজন শিক্ষাগুরু হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন তখন তার শিক্ষার গূঢ়তামূলক বৈশিষ্ট্য আরো সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। বহির্বিশ্বের কাছে তিনি এমন একজন ধার্মিক ও কঠোর সংযমী তাপস ছিলেন, যিনি গভীর অনুতাপমূলক সাধনা ও ভক্তির পথ অনুসরণ করেন। তাঁর সাধারণ শ্রোতাদের কাছে তিনি এমন একজন অধ্যাত্মবাদী ছিলেন, যার উক্তিসমূহ সর্বপ্রকার নিষ্ঠাহীন বক্তব্য থেকে মুক্ত ছিল। কিন্তু তাঁর প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত আভ্যন্তরীণ ভক্তদের মহলে তিনি গূঢ় সত্যের এমন একজন গুরু ছিলেন যার বক্তব্যে গভীর ও রহস্যজনক তাৎপর্য ছিল। এই বক্তব্য শুধুমাত্র কিছু সংখ্যক নির্ধারিত ব্যক্তি উপলব্ধি করতে পারেন। ইবনে মাসাররা পাশ্চাত্যে সর্বপ্রথম ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ কথাসমূহের অস্পষ্টতামূলক ব্যবহার প্রবর্তন করেন এবং তাঁর এই দৃষ্টান্ত পরবর্তীকালের অধিকাংশ মরমী লেখক অনুসরণ করেন। তাঁর পদ্ধতি এতটা সার্থক হয় যে, তিনি যখন ১৩১ খৃস্টাব্দে ইন্তিকাল করেন তখন সন্দেহাত্মক ধর্মতত্ত্বের গুরু হিসাবে নয়, বরং মহান সাধক ও কঠোর ধার্মিক হিসাবে তিনি সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করেন।
ইবনে মাসাররার কোন লিখিত রচনা পাওয়া যায় নি; কিন্তু জনৈক বিজ্ঞ স্পেনীয় প্রাচ্যতত্ত্ববিদ তাঁর ব্যবস্থার মৌল বৈশিষ্ট্যগুলি সমন্বিত করার উদ্দেশ্যে এর উপাদান সংগ্রহ করেন। এসব উপাদান থেকে দেখা যাবে যে, ইবনে মাসাররা এমপেডোক্লিজের প্রচারিত দর্শনের একজন উৎসাহী সমর্থক ছিলেন। মুসলমানরা এমপেডোক্লিজকে গ্রীসের সাতজন শ্রেষ্ঠ দার্শনিকের প্রথম হিসাবে মনে করেন। রূপকথা অনুযায়ী তিনি হযরত দাউদ, হযরত সুলায়মান ও হযরত লুকমানের একজন শ্রোতা ছিলেন। তাই নীতিমূলক বিষয়ে বিশেষ অভিজ্ঞ হিসাবে তাঁকে নির্ভরযোগ্য ধারায় বিশেষ মর্যাদা প্রদান করেন। অথচ তার জন্ম হয় যথা সময়ের বাইরে।
নিওপ্ল্যাটোনিজম সম্পর্কে ইবনে মাসাররার মতবাদ ও প্রাচ্যের মতবাদের প্রধান পার্থক্য আল্লাহ্র সৃষ্টির প্রথম বস্তু হিসাবে একটি 'প্রধান বস্তু বা উপাদানের' স্বতঃসিদ্ধতায় নিহিত। এই উপাদানটি আধ্যাত্মিক এবং এর প্রতীক হচ্ছে আল্লাহর সিংহাসন।
ইবনে মাসাররা যেসব ধ্যান-ধারণা সর্বপ্রথম পাশ্চাত্যে প্রচার করেন, তা পরবর্তী শতকগুলিতে বিপুল প্রভাব সৃষ্টি করে। মালাগার আভিসেব্রোন, টলেডোর জুদাহ্ হা-লেভি, গ্রানাডার মোসেস ইবনে এজরা, কর্ডোভার জোসেফ ইবনে সাদিক, সামুয়েল ইবনে তিব্বন, শেম তোব ইবনে জোসেফ ইবনে ফালকিরা প্রমুখ ইহুদী পণ্ডিত এমপেডোক্লিজের কল্পিত দর্শনের প্রধান মতবাদগুলি অনুসরণ করেন। অবশ্য তারা ইবনে মাসাররার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন, এ কথা সুস্পষ্টভাবে বলা যায় না।
মধ্যযুগের ইহুদীদের দার্শনিক চিন্তাধারার বিষয় ইতিপূর্বে এই সিরিজের দি লেগ্যাসি অব ইসরাইল-এ আলোচিত হলেও এখানে আরবদের কাছে ইহুদীরা কতোটা ঋণী তা আলোচনা করা যুক্তিযুক্ত হবে। এ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, অ্যারিস্টটলের কোন হিব্রু অনুবাদ কখনো হয়নি। ইহুদীরা আল ফারাবী, ইবনে সিনা এবং ইবনে রুশদের রচনাবলীর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যেই সন্তুষ্ট ছিল। ইহুদী জাতি আরব সংস্কৃতি দ্বারা কতো গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল এত দ্বারা তাই বোঝা যায়। হিব্রু পণ্ডিতগণ সম্ভবত অ্যারিস্টটলের আরবী অনুবাদের দিকে আড়ভাবে তাকান এবং উপরোল্লিখিত লেখকদের যে সব প্রকৃত অর্থবহ শব্দান্তর ও ভাষ্য স্বীকৃতি লাভ করেছে সেগুলি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মু'তাযিলারা বিশেষভাবে ইহুদী চিন্তাবিদদের উপর গভীর প্রভাব সৃষ্টি করেন। বস্তুত কোন একটি কালাম গ্রন্থের প্রসঙ্গ থেকে এর রচয়িতা ইহুদী না মুসলমান তা বলা কোন কোন সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আল্লাহ্ সম্পর্কে আশ'আরীর যে নিষ্ঠামূলক অভিমতে প্রাকৃতিক বিধিসমূহের কার্যক্রম এবং কারণ ও ফলের সম্পর্ক সুস্পষ্টভাবে অস্বীকার করা হয়েছে তা খৃস্টানদের উপর যতোটা প্রভাব সৃষ্টি করেছে ইহুদীদের উপর তার চাইতে বেশি প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি।
সা'আদিয়া বেন জোসেক আল-ফাইয়ুমী থেকে শুরু করে জোসেফ আলবো পর্যন্ত ইহুদী দর্শন তারা আরবদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে যেসব সমস্যা ও যুক্তি লাভ করেছে সেগুলির সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট ছিল। যারা তাদের সময়কার দার্শনিক চিন্তাধারার সঙ্গে সাধারণভাবে তাল বজায় রাখেন তাদের কোন তালিকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এদের মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন মোসেস মাইমোনাইডস। তাঁর আরব মুতাকাল্লিমুন-এর তীক্ষ্ণ সমালোচনা সেন্ট টমাস আকিনাস অবাধে ব্যবহার করেন। মাইমোনাইট্স আল্লাহর অস্তিত্ব, একত্ব ও অনবয়বত্ব প্রমাণের জন্য পুনরায় অ্যারিস্টটল পর্যন্ত ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে আল-ফারাবী ও ইবনে সিনার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেন।
আভিসেব্রোনের ফন্স্ ভিটাই গ্রন্থটি দ্বাদশ শতকের প্রথমার্ধে অ্যাভেনডিথ ও ডোমেনিক গুণ্ডিসালভাস কর্তৃক আরবী থেকে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হওয়ার পর খৃস্টান পণ্ডিতদের একাংশের মধ্যে তিনি বিস্ময়কর খ্যাতি অর্জন করেন। ফ্রান্সিসকান পন্থীরা সামগ্রিকভাবে ফন্স্ ভিটাই দ্বারা প্রভাবিত হয়, কিন্তু ডোমিনিকানরা সেন্ট টমাস আকিনাসের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে এর মতবাদসমূহের তীব্র সমালোচনা করে। গুণ্ডিসালভাস স্বয়ং তিনটি গ্রন্থ রচনা করেন। দি ইউনিটেট গ্রন্থে তিনি বিশ্লেষণ করেন যে, আল্লাহ ছাড়া প্রত্যেক জিনিসই বস্তু ও আকার দ্বারা গঠিত। ডি প্রসেশান মুন্ডি ও ডি অ্যানিমায় তিনি স্পেনীয় আরব দার্শনিকদের সর্বেশ্বরবাদমূলক মতবাদসমূহ প্রচার করেন। ফন্স্ ভিটাই এতোটা বাদানুবাদের ঊর্ধ্বে ছিল যে, বহু খৃস্টান লেখক এর লেখককে একজন আরব মনে করতেন। অপরদিকে গিলম ডি'ওভার্নি মনে করতেন যে, তিনি আরব দর্শন সম্পর্কে গভীরভাবে অভিজ্ঞ একমাত্র খৃস্টান যিনি ভারবুম ডি মতবাদ সম্পর্কেও গভীর জ্ঞান রাখতেন। অবশ্য গিলম আধ্যাত্মিক সত্তাসমূহ বস্তুর তৈরি, আভিসেব্রোনের এই মতবাদের অনুসারী ছিলেন না। তাই যুক্তিযুক্তভাবেই এরূপ মনে করা যায় যে, আভিসেব্রোনের রচনার সঙ্গে আংশিক পরিচয়ের ভিত্তিতেই তিনি তাকে সবচাইতে মহান দার্শনিক বলে অভিহিত করেন।
Hales-এর আলেকজাণ্ডারও আভিসেব্রোনের প্রধান বস্তুর মতবাদ গ্রহণ করেন এবং বলেন যে, ফেরেশতারা বস্তু ও আকার দ্বারা গঠিত। স্পেনীয় ইহুদীর কাছে তিনি এই ধারণার জন্যও ঋণী যে, প্রত্যেক সক্রিয় ও নিষ্ক্রীয় সম্পর্ক যথাক্রমে আকার ও বস্তুর ইঙ্গিত দেয়।
আভিসেব্রোন তাঁর রচনার শিরোনাম প্রদান করেন সোর্স অব লাইফ, কারণ এতে সব ব্যাপারের পিছনে মূলনীতির একটি গূঢ় জ্ঞানের ইঙ্গিত রয়েছে বলে দাবি করা হয়। এই জ্ঞান মূর্খ ও নির্বোধদের কাছে গুপ্ত এবং যেসব দার্শনিক স্বর্গীয় রহস্য সম্পর্কে কল্পনা করেন তাদের কাছে প্রতিভাত। অতএব, বিশ্বজগতের বিশ্লেষণ বিভিন্ন জিনিসের বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনার মাধ্যমে নয় বরং সেই মূলনীতির জ্ঞানের দ্বারা করা যায়, যে মূলনীতি অনুসারে সেগুলির উদ্ভব হয়েছে। বেকন আলোকপ্রদ জ্ঞানের ব্যাপার জানতেন এবং তিনি দর্শনকে একটি স্বর্গীয় আলোকের প্রভাবের মাধ্যমে উদ্ভূত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন।
পেরিপ্যাটেটিক জ্ঞানচর্চার পুনরাবির্ভাবের ফলে স্পেনীয় আরব মতবাদের প্রতি বহু খৃস্টান পণ্ডিতের বিরোধিতা আরো শক্তিশালী হয়। যাঁরা ঐসব মতবাদের সমর্থক ছিলেন তাদের প্রাচীন ধর্মগুরুদের নির্ভরযোগ্য ধারা অনুসরণে উদ্যোগী হওয়ার জন্য বাধ্য করা হয়। তাই সেন্ট টমাস বহু যুক্তিতর্ক দিয়ে দেখান যে, সেন্ট অগাস্টিন আধ্যাত্মিক অস্তিত্বে সুস্পষ্টভাবে বস্তু আরোপ করেননি। তিনি সম্ভবত দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া শুধুমাত্র বাতিল করার উদ্দেশ্যে আভিসেব্রোনের মতবাদসমূহ বিশ্লেষণ করেন। তাঁর ডি সাবস্ট্যানটিস সেপারেটিস এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, আধ্যাত্মিক অস্তিত্বসমূহ বস্তুর তৈরি একথা প্রমাণ করা অসম্ভব, তিনি আল্লাহ্র অব্যবহিত সৃষ্টিমূলক কার্যকলাপের স্থলে নিঃসরণের মতবাদ প্রত্যাখ্যানের জন্য বহু যুক্তি তুলে ধরেন।
পাশ্চাত্যে বিরাট প্রভাব সৃষ্টি করেছে এরূপ আরেকটি লেখক হচ্ছেন আবূ হামিদ ইবনে মোহাম্মদ আসী আল গায্যালী। ডাক নাম ছিলো হুজ্জাতুল ইসলাম, 'ইসলামের নিঃসন্দেহে প্রমাণ'। তার বৈচিত্রময় জীবন জ্ঞানচর্চা ও ধর্মচর্চার ক্ষেত্রে তার সময়কার অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। তিনি পালাক্রমে দার্শনিক, জ্ঞানসাধক, ঐতিহ্যবাদী, সন্দেহবাদী ও অধ্যাত্মবাদী ছিলেন। তাঁর আন্তরিকতা ও সুদৃঢ় নৈতিক উদ্দেশ্য প্রশ্নাতীত ছিল। তিনি স্বধর্মাবলম্বীদের মধ্যে নৈতিকতা বোধের উদ্দীপনা সৃষ্টির জন্য অব্যাহতভাবে যে সাধনা করে যান তার তুলনা তার জাতির মধ্যে বিরল। ইসলামে তাঁর মর্যাদা খৃস্টান জগতে সেন্ট টমাস কিনাসের মর্যাদার সঙ্গে কিছুটা তুলনীয়। তাঁর ধর্মতাত্ত্বিক গ্রন্থগুলি পাঠ করতে গিয়ে কিছুটা সচেষ্টভাবে স্মরণ করতে হয় যে, ত্রিত্ব ও অবতারের প্রসঙ্গ বাদ দিলে তিনি একজন মুসলমান।
প্রাথমিক বয়সে তিনি ধর্মতত্ত্ব ও শরীয়তী চর্চাকে কর্ম জীবন হিসাবে গ্রহণ করেন। বিশ বছর বয়সের আগেই তিনি যেসব ধর্ম বিশ্বাসকে প্রামাণ্য বলে গ্রহণ করা হয়, সেগুলি সম্পর্কে প্রশ্ন করতে থাকেন এবং বিভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক সমস্যা সম্পর্কে অনুসন্ধান কার্য শুরু করেন। নিশাপুরে তাঁকে অধ্যাপকের সহকারী নিয়োগ করা হয় এবং সেখান থেকে তিনি বাগদাদের নিযামী একাডেমীতে যোগদান করেন। এখানে একজন আইন বিশেষজ্ঞ হিসাবে তার ভাগ্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে কয়েক বছর পর্যন্ত বিশ্বাস ও যুক্তির দ্বন্দ্বে জর্জরিত হওয়ার পর তিনি মানসিকভাবে অত্যন্ত ভেঙে পড়েন এবং নির্জনতা ও শান্তির সন্ধানে রাজধানী ত্যাগ করেন। সুশৃঙ্খল চিন্তাশক্তি পুনরুদ্ধারের পর তিনি চারটি পন্থায় নতুন করে জ্ঞান সাধনা শুরু করেন যা তাকে সত্যের পথে পরিচালিত করে: ১. জ্ঞানদীপ্ত ধর্মতত্ত্ব; ২. তা'লিম অনুসারী যারা একজন অভ্রান্ত গুরুতে বিশ্বাস করেন; ৩. 'অ্যারিস্টটলিয়ান' দার্শনিকবৃন্দ এবং ৪. সূফী বা আধ্যাত্মবাদী, যারা বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহকে পরম আনন্দঘন মুহূর্তে আধ্যাত্মিকভাবে উপলব্ধি করা যায়। তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এর সবগুলি পন্থা অনুসরণ করেন এবং শেষ পর্যন্ত একজন অধ্যাত্মবাদী হয়ে ওঠেন। আল গায্যালীর আধ্যাত্মিক তীর্থ ভ্রমণ এমন একটি চমকপ্রদ কাহিনী যা বিস্তারিত বিষয়ের মধ্যেই উপলব্ধি করা যায়। আমাদের কাছে এর গুরুত্ব হচ্ছে এই যে, আল গায্যালী দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের কতিপয় ব্যবস্থা সম্পর্কে নতুন করে পর্যালোচনা শুরু করেন এবং এই পর্যালোচনার ফল তার রচনায় প্রতিফলিত হয়। এসব রচনা ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। তর্কশাস্ত্র, পদার্থবিদ্যা ও মেটাফিজিক্সের ওপর লিখিত তাঁর গ্রন্থগুলির বিষয়বস্তু দ্বাদশ শতকে টলেডোর অনুবাদকদের মাধ্যমে জানা যায়। কিন্তু আল- গায্যালীর মেটাফিজিক্স সম্পর্কিত বক্তব্য একই বিষয়ে আভিসেব্রোনের বক্তব্যের ন্যায় প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি। শেষোক্ত বক্তব্য স্পেনীয় চিন্তাধারার প্রধান প্রবাহ হিসাবে ল্যাটিন পণ্ডিতদের মধ্যে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইবনে রুশদ ও সেন্ট টমাস কর্তৃক তার অসারতা প্রতিপন্ন না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
রেমাও লাল ও রেমাও মার্টিন নামে দুজন স্পেনবাসীর প্রসঙ্গ অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে। রেমাও লালের দর্শনের উৎস সম্পর্কে যে বিতর্ক দেখা দিয়েছে তা এই অধ্যায়ের শুরুতে যে বিষয়টির অবতারণা করা হয় তা সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করে। স্পেনীয় প্রাচ্যবিদরা দাবি করেন যে, তারা রেমাও লালের রচনায় আরব প্রেরণার বহু দৃষ্টান্ত দেখতে পান। অপরদিকে কতিপয় আধুনিক ফরাসী পণ্ডিত জোর দিয়ে বলেন যে, তার ব্যবস্থার উৎস অগাস্টিনের মতবাদে এবং খৃষ্ট ধর্মের ক্লাসিক্যাল ঐতিহ্যে দেখতে পাওয়া যায়। যেখানে বাদানুবাদ তীব্র হয়ে ওঠে সেখানে 'সাধারণ জ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি' প্রয়োগ করতে হয়। কিন্তু সম্ভবত অনেকেই একমত হবেন যে, বাস্তব বিষয়গুলি এই অধ্যায়ের সাধারণ উপসংহারকে যথার্থ প্রমাণ করে: খৃস্টান ইউরোপে যে ক্লাসিক্যাল ঐতিহ্য বিলীন হয় কিংবা অস্পষ্টতায় ঢাকা পড়ে ইসলামের পৃষ্ঠপোষকতায় তার পুনরাবির্ভাব ঘটে এবং আরবদের, অ্যারিস্টটলের ও প্রাচীন খৃস্টান ধর্ম-গুরুদের রচনার উৎসাহমূলক চর্চার সূত্রপাত করে।
একটি রিপ্রোচ ডি'অ্যারাবিজম লেখার প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে না, কারণ যারা অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে প্রাচীনদের জ্ঞান-বিজ্ঞান মোটামুটিভাবে তুলে ধরেছেন খৃস্টান পণ্ডিতরা তাদেরই সাহায্য সহায়তা গ্রহণ করেন। আরব পুনর্জাগরণ যুগের খৃস্টানরা আরবদের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণে কোন প্রকার কৃত্রিম লজ্জাবোধ করেননি। আবার ন্যায়নীতির খাতিরে একথাও স্বীকার করতে হয় যে, আরবরাও জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে তাদের প্রাধান্যের যতোটা গৌরব প্রদর্শন করা দরকার তার চাইতে বেশি প্রদর্শন করেননি। লালের প্রায় সমসাময়িক আল সিরার ইবনে তুমলুস বলেননি: "জ্যামিতি, পাটিগণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও সঙ্গীতে মুসলিম জ্ঞানসাধকগণ তাদের প্রাচীন পূর্বসূরিদের অতিক্রম করে গেছেন। কিন্তু মানুষ বর্তমানে প্রাচীনদের তুলনায় পূর্ণতর জ্ঞানের অধিকারী একথা জোর দিয়ে বলা গেলেও ন্যায়ের খাতিরে আমাদের স্মরণ রাখা দরকার যে, প্রাচীনদের অনেক রচনা স্বভাবত ধ্বংস হয়ে গেছে।" ইবনে তুমলুস যে বক্তব্য রেখেছেন আধুনিক পণ্ডিতরা তা অনুমোদন করেন। তার অভিমতের মধ্য দিয়ে এমন একজন জ্ঞানসাধকের, ন্যায়ানুগ দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে যিনি পূর্বসূরিদের অবদানের নিন্দা না করে বরং তা বড় করে দেখান। মুসলিম চিন্তানায়করা প্রকৃত বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যতোটা সাফল্য অর্জন করেছেন মেটাফিজিক্সের ক্ষেত্রেও ততোটা সাফল্য লাভ করেন, তার এই দাবি নিশ্চিত যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। আরব পোশাকে অ্যারিস্টটলের মতবাদের কি অবস্থা হয়েছে তা আমরা দেখেছি।
আরব বলে অভিহিত করা যায় দার্শনিক মতবাদের এরূপ কোন উল্লেখযোগ্য প্রামাণ্য বিষয় না থাকায় অব্যবহিত পূর্ব সূত্রের প্রশ্নটি অযথা জটিলতা লাভ করে। লাল একটি প্রাচ্য জ্ঞানচর্চা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা, তিনি আরবীতে লিখতেন এবং কথা বলতেন, তাঁর জীবনের প্রধান লক্ষ্য ছিল জ্ঞানদীপ্ত যুক্তির ভিত্তিতে স্যারাসেনদের চাইতে খৃস্টানদের বিশ্বাসের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা এবং কথিত আছে যে, তিনি তিউনিসের আরবদের মধ্যে তার মতবাদ প্রচার করতে গিয়ে শহীদ হন--এই ব্যাপারগুলি যে কেউ বিবেচনা করবেন তিনি সম্ভবত এও অনুভব করবেন যে, লালের জীবন থেকে সরাসরি আরব প্রভাব বাদ দেওয়ার অর্থ তাঁর উচ্ছ্বাসময় সহানুভূতির ক্ষেত্রকে অযথা সঙ্কীর্ণ করা। তিনি এমন এক যুগে বাস করেন যখন পাশ্চাত্য তার দর্শনের প্রকৃত উৎসের সন্ধানে পিছনের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এবং তিনি মুসলিম দার্শনিকদের উপর কি পরিমাণে নির্ভর করেন তা কেবল চূড়ান্ত মৌল তথ্যের গভীর পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্ণয় করা সম্ভব। তাঁর রচনার ধর্মতাত্ত্বিক বা গভীর ভক্তিমূলক ক্ষেত্রে তিনি অবশ্যই আরবদের কাছ থেকে অনেক কিছু ধার করেছেন। তাঁর হান্ড্রেড্ নেক্স অব গড সংক্রান্ত গ্রন্থটি একথাই প্রমাণ করে। অপর দিকে ব্ল্যাঙ্কোয়ের্না গ্রন্থে তিনি মারবুট বা দরবেশদের এরূপ পন্থা অনুমোদন করেছেন যেখানে কতিপয় শব্দের ছন্দমূলক আবৃত্তির মাধ্যমে উত্তেজক ভক্তি ও আনন্দাবিষ্ট অবস্থার সৃষ্টি হয়। তাই অধিকতর স্বাভাবিকভাবে এরূপ অনুমান করা যায় যে, লাল যে ভাষা, অভ্যাস ও 'অস্তিত্বের আদর্শ প্রবর্তন করেছেন এবং এসব ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বে যা প্রচলিত ছিল তার মধ্যে সাদৃশ্যের পিছনে পূর্ববর্তী কালের খৃস্টান সন্ন্যাসীদের প্রভাবের চাইতে তার সমসাময়িক মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনের প্রতি তার গভীর নিরীক্ষা ও আগ্রহই বেশি দায়ী।
ইউরোপে 'অর্ডার অব দি প্রিচার্স' কর্তৃক ১২৫০ সালে টলেডোতে সর্বপ্রথম প্রাচ্য শিক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ইহুদী ও মুসলমানদের মধ্যে ধর্মপ্রচারে শিক্ষার্থীদের যথাযোগ্য করে তোলার উদ্দেশ্যে এখানে আরবী এবং বাইবেল ও রাব্বিদের হিব্রু ভাষা শিক্ষা দেওয়া হতো। এই কেন্দ্রেরই সর্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ছিলেন রেমাণ্ড মার্টিন। তিনি সেন্ট টমাসের সমসাময়িক ছিলেন। মার্টিন আরব লেখকদের সম্পর্কে এতোটা জ্ঞান অর্জন করেন যে, সম্ভবত আধুনিক যুগ পর্যন্ত এক্ষেত্রে আর কেউ তার সমকক্ষ ছিলেন না। তিনি কেবল কুরআন এবং হাদীসের সঙ্গেই পরিচিত ছিলেন না, আল ফারাবী থেকে শুরু করে ইবনে রুশদ পর্যন্ত প্রধান প্রধান মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদ এবং দার্শনিকদের রচনা থেকেও উদ্ধৃতি দেন। এসব উদ্ধৃতিতে তিনি তাদের মধ্যকার পার্থক্য সম্পর্কে বিশ্লেষণমূলক মন্তব্য করেন। সুম্মা কন্ট্রা জেন্টাইল্স এবং পুজিও ফিডি এডভার্সাস মওরস এট জুডাইডস 'অর্ডার অব দি প্রিচার্স' প্রধানের আদেশে রচিত হওয়ায় এগুলির একটি সাধারণ সূত্র ছিল।
রেমান্ড মার্টিন আল গায্যালীর তাহাফুতুল ফালাসিফা বা 'দার্শনিকদের সামঞ্জস্যহীনতা'-এর তাৎপর্য সম্যকভাবে উপলব্ধি করেন। মুসলিম দার্শনিক ও পণ্ডিতদের বিরুদ্ধে যুক্তিমূলক এই গ্রন্থটি থেকে অনেকখানি তিনি তাঁর পুজিও ফিডির অন্তর্ভুক্ত করেন। এর পর থেকে খৃস্টানরা তাদের বহু জ্ঞানগর্ভ রচনায় আল গায্যালীর ক্রিয়েশিয়ো এক্সনি হিলো-এর পক্ষে প্রদত্ত যুক্তিসমূহ, আল্লাহ সব খুঁটিনাটি বিষয়ও জানেন এরূপ প্রমাণ এবং মৃতব্যক্তির পুনরুজ্জীবনের মতবাদ তুলে ধরেন। রেমান্ড মার্টিন দার্শনিকদের প্রতি আল গায্যালীর আক্রমণ সংক্রান্ত অংশ রুইনা সিউ প্রেইসিপিটিয়াম ফিলোসফারাম অনুবাদ করেন। খৃস্টান পণ্ডিতরা যখন থেকে আল-গায্যালীর রচনা পড়ার সুযোগ পান তখন থেকে তাঁর মানসিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি তাদের আকৃষ্ট করে। এখনো পর্যন্ত তাঁরা এসব রচনা অভিনিবেশ সহকারে পর্যালোচনা করেন। মার্টিনের পুজিও প্রাচ্যের জ্ঞান জগতে অবাধে বিচরণ করে, তাই এটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একজন আধুনিক পণ্ডিত শিক্ষিত পাঠকদের জন্য যেভাবে গ্রন্থ রচনা করেন, ঠিক তেমনিভাবে মার্টিন ওল্ড টেস্টামেন্ট, টালমুড এবং মাইমোনাইসের হিব্রু সংস্করণের হিব্রু ভাষা হিব্রুতেই দৃষ্টান্ত হিসাবে তুলে ধরেন। আল গায্যালী, আররাযী এবং ইবনে রুশদের দৃষ্টান্তসমূহ তিনি ল্যাটিন ভাষায় তুলে ধরেন এবং যে গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন সেই গ্রন্থের নামও সব সময় উল্লেখ করেন।
আল গায্যালী অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ওহী, ইলহাম ও ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আরোপিত যুক্তির স্থান সম্পর্কেও একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এতে প্রদত্ত যুক্তি ও সিদ্ধান্ত-সমূহের সঙ্গে সেন্ট টমাসের সুম্মার বহু সাদৃশ্য রয়েছে। এর একটি মাত্র ব্যাখ্যাই দেওয়া যেতে পারে। সুম্মা কন্ট্রা জেনটাইলস এবং পুজিও ফিডি উভয়টিই ডোমিনিকান সম্প্রদায়ের জেনারেল রেমান্ড ডি পিনাফোর্টের অনুরোধে লিখিত হওয়ায় তাদের একটি সাধারণ সূত্র রয়েছে। সুম্মা ও পুজিওর কোন কোন অধ্যায়ের সাদৃশ্য এই ইঙ্গিত প্রদান করে। অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ যে কয়েকটি প্রশ্নে সেন্ট টমাস ও আল-গায্যালী একমত সেগুলি হচ্ছে--আসমানী বিষয়গুলি সম্পর্কে সত্য বিশ্লেষণ বা প্রদর্শনে মানবিক যুক্তির মূল্য, আল্লাহ্ অস্তিত্ব প্রমাণের সম্ভাব্যতা ও আবশ্যকতার ধ্যান-ধারণা আল্লাহর পরিপূর্ণতায় তাঁর একত্বের ইঙ্গিত, পরম সুখকর দৃষ্টির সম্ভাবনা, স্বর্গীয় জ্ঞান ও স্বর্গীয় সরলতা, ভারবুম মেনটিস হিসাবে আল্লাহ্ বাণী, নবীদের উক্তিসম্মূহের প্রমাণ হিসাবে অলৌকিক ব্যাপারসমূহ; মৃত্যু থেকে পুনরুজ্জীবনে বিশ্বাস।
আমরা লক্ষ করেছি যে, সেন্ট টমাস মাঝে মাঝে বিভিন্ন মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদদের মতামত উল্লেখ করেছেন। তাই কন্ট্রা জেনটাইলসের ৩য় খণ্ডের ১৭ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন: 'প্রথমত তাদের সেই ভুল যারা বলেন যে, সবকিছু কোন কারণ ছাড়া আল্লাহর শুধুমাত্র ইচ্ছার ফল। এটি স্যারাসেনদের আইনে মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিকদের ভুল। তাদের মতে আগুন কেন শীতল না করে উত্তপ্ত করে তার একমাত্র কারণ, সেটি আল্লাহ্ তেমন ইচ্ছা। দ্বিতীয়ত আমরা ঐসব লোকের ভুল অনুমোদন করি না যারা জোর দিয়ে বলেন যে, প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী আল্লাহর ব্যবস্থা থেকে কারণের উদ্ভব হয়।
সেন্ট টমাস মোসেসের যে উদ্ধৃতি দিয়েছেন তার থেকে একথা স্পষ্ট যে, এ ক্ষেত্রে আশ'আরী পন্থী ও মুতাযিলাপন্থীদের সম্পর্কে তার তথ্যের সূত্র সরাসরি আরবরা নন। কিন্তু উপরোল্লিখিত কারণে মাইমোনাইডস সম্ভবত তাঁর জানার একমাত্র সূত্র ছিল। বুদ্ধিদীপ্তির দিক দিয়ে আল গায্যালী এই অ্যাঞ্জেলিক ডক্টরের সমকক্ষ না হলেও তাদের মধ্যে অনেক কিছু সাধারণ ছিল। তাদের উদ্দেশ্য, তাদের সহানুভূতি, তাদের স্বার্থ মূলত একই ছিল। উভয়েই রায় দেওয়ার আগে বিরুদ্ধপক্ষের অনুকূলে বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করেন। উভয়ই তাঁদের বিশ্বাসের যুক্তিযুক্ত বক্তব্য তুলে ধরার জন্য সুম্মা পেশ করার যথাসাধ্য প্রয়াস পান। এবং উভয়েই আল্লাহর আধ্যাত্মিক উপলব্ধিতে সেই পরম আনন্দের সন্ধান পান, যা তাদের স্বীকৃতি অনুযায়ী তাদের পূর্ববর্তী সাধনায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
ইবনে বাজ্জা ও ইবনে তুফাইলের প্রসঙ্গে না গিয়ে আমরা উপসংহারে ইবনে রুশদের প্রসঙ্গ আলোচনা করবো। আবুল ওয়ালিদ ইবনে রুশদ প্রাচ্যের চাইতে ইউরোপ ও ইউরোপীয় চিন্তাধারার সঙ্গে বেশি সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ইটালীতে তার প্রভাব ষোড়শ শতক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল, এবং বিখ্যাত আচিল্লিনি ও পম্পোনায্যি বিতর্কের সূচনা করে। আধুনিক পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের উদ্ভব না হওয়া পর্যন্ত ইউরোপীয় চিন্তাধারায় ইবনে রুশদের মতবাদ একটি জীবন্ত প্রেরণা হিসাবে অব্যাহত থাকে। আরবী রচনা বিলুপ্ত হলেও ল্যাটিন ভাষা তার একাধিক রচনা সংরক্ষণ করেছে। ইউরোপে ইবনে রুশদের মতবাদ এক সময় সে যুগের প্রথম শ্রেণীর পণ্ডিতদের আলোচ্য বিষয় ছিল, যদিও মুসলিম বিশ্বে তিনি কখনো নেতৃস্থানীয় মর্যাদা লাভ করতে পারেননি।
কর্ডোভার একটি আইনজীবী পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পিতামহ, পিতা এবং তিনি নিজে কর্ডোভার কাযী ছিলেন। আইন বিষয়ক দায়িত্ব সম্পাদনের অবসরে তিনি দার্শনিক গ্রন্থ ও ভাষ্য রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। কিছুকাল পর্যন্ত তিনি মরক্কোর রাজদরবারের বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। কিন্তু ধর্মতত্ত্ববিদদের অব্যাহত বিরোধিতার ফলে তার পতন ঘটে। তাঁকে ধর্মদ্রোহী বলে অভিযুক্ত করা হয়, এমন কি ইহুদী হয়ে গেছেন বলে দোষ চাপানো হয় এবং তাঁকে কর্ডোভা থেকে বহিষ্কার করা হয়। অবশ্য মৃত্যুর পূর্বে তিনি পুনরায় রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন এবং তাঁকে মারাকেশে ডেকে পাঠানো হয়। সেখানে ১১৯৮ খৃষ্টাব্দে তিনি ইন্তিকাল করেন। এখনো সেখানে তাঁর মাযার দেখা যায়।
ইবনে রুশদ কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এই মতবাদের প্রতিনিধিত্ব করেন যে, দর্শনই সত্য এবং স্বর্গীয়ভাবে প্রতিভাত ধর্ম অসত্য। এজন্যে অন্য যে কারো ন্যায় ব্রাবান্টের সিগার দায়ী, কারণ তিনি যখন খৃষ্ট ধর্মবিশ্বাসের পরিপন্থী একটি মতবাদ পেশ করেন তখন অ্যারিস্টটলীকে এর সূত্র হিসাবে দাবি করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, অ্যারিস্টটলের ব্যাখ্যায় ইবনে রুশদের ভাষ্য দুর্বোধ্য। সিগারের মতে বিশ্বাস ও যুক্তি পরস্পর বিরোধী।
ইবনে রুশদ প্রকৃতপক্ষে কি লিখেছেন এবং কি প্রচার করতে চেয়েছেন তার নির্ভুল ব্যাখ্যার অভাবে এটা অপরিহার্য ছিল যে, গির্জা কর্তৃপক্ষ সিগারের সঙ্গে তিনি যে সূত্র থেকে তাঁর মতবাদ গ্রহণ করেছেন তারো নিন্দা করেন। ফলে স্বাভাবিকভাবে ইবনে রুশদকেই ইবনে রুশদ বাদের প্রবর্তক মনে করা হয়। একইভাবে অতি সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত নেস্টোরিয়ান মতবাদের জন্য নেস্টোরিয়াস অপবাদের বোঝা বহন করেন। অ্যাঞ্জেলিক ডক্টর তাঁর ডি ইউনিটেট ইনটেলেক্টাস কন্ট্রা আভেরোইস্টস গ্রন্থে এই মতবাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সোচ্চার ছিলেন যে, বুদ্ধির ঐক্য যুক্তি হিসাবে প্রয়োজনীয় হলেও বিশ্বাস হিসাবে দৃঢ়ভাবে পরিত্যাজ্য। ইবনে রুশদকে একজন ভুয়া পণ্ডিত হিসাবে চিহ্নিত করার পক্ষে এটিই যথেষ্ট ছিল। প্যারিসের বিশপ স্টিফেনের যে বিখ্যাত চিঠির ভূমিকায় ইবনে রুশদ পন্থীদের বহুল নিন্দিত ২১৯টি প্রস্তাবনা স্থান পায় তা স্বাধীন চিন্তা ও অবিশ্বাসের জনক হিসাবে ইবনে রুশদের উপর সীলমোহর অঙ্কিত করে। অবশ্য সকল মানুষের মধ্যে আত্মা এক এবং এর অংশগুলি যেসব দেহে তারা বাস করে সেগুলির দ্বারা কেবল বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। ইবনে রুশদের এই মতবাদ খৃস্টান এবং মুসলমান সবার কাছে অভিশপ্ত মার্টিনের পুজিওতে প্রশ্নটি সুস্পষ্টভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
বর্তমানে ইবনে রুশদের রচনাবলী যখন পরীক্ষা করা সম্ভব এবং তিনি স্বয়ং তাঁর কথা বলতে পারেন তখন একথা পরিষ্কার যে, খৃস্টান দেশসমূহে তথাকথিত ইবনে রুশদ বাদের জ্ঞানচর্চামূলক মর্যাদার জন্য তিনি আদৌ দায়ী নন, বরং একই আদর্শ, বিশ্বাসের একই সামঞ্জস্যতা এবং একই যুক্তির রক্ষাকর্তা হিসাবে ইবনে রুশদ ও সেন্ট টমাসের স্থান পাশাপাশি। তদুপরি মুসলিম পণ্ডিত ইতিপূর্বে যেসব যুক্তি প্রয়োগ করেন অ্যাঞ্জেলিক পণ্ডিত স্বয়ং তার অনেকগুলি ব্যবহার করেন। ইবনে রুশদের কিতাবুল ফালসাফা এবং বিশেষভাবে তার ফাসলুল মাকালী ফি মুওয়াফাকাতিল হিকমাতি ওয়াশ শারি'আত এবং তাহাফুতুত তাহাফুত গ্রন্থে দার্শনিকদের প্রতি আল-গায্যালীর আক্রমণের যুক্তিপূর্ণ জবাবের সংশ্লিষ্ট অংশগুলি কষ্ট স্বীকার করে পর্যালোচনা করা হলে প্রথমেই দেখা যাবে যে, যে বিশেষ ধরনের যুক্তিবাদ পাশ্চাত্যে ইবনে রুশদবাদ হিসাবে পরিচিত ছিল ইবনে রুশদ স্বয়ং তার ঘোরতর বিরোধী। তিনি কি চেয়েছিলেন এসব পর্যালোচনার মাধ্যমে তাও বোঝা যাবে।
ইবনে রুশদ ও সেন্ট টমাসের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে যে সাদৃশ্য রয়েছে তা বুদ্ধিবৃত্তির ঘনিষ্ঠতার চাইতেও বেশি কিছু। খৃস্টান ও মুসলিম পণ্ডিত উভয়েরই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল যুক্তিকে তার যথাযথস্থানে প্রতিষ্ঠার সঙ্কল্প প্রাচীনদের দর্শনের প্রয়োগ ও একই সময়ে পরবর্তীকালে এর যেসব সমালোচনা হয়েছে সে সম্পর্কে নিজেদের সিদ্ধান্ত জ্ঞাপন, এবং সন্দেহাত্মক অধ্যাত্মবাদ ও স্বর্গীয়ভাবে প্রতিভাত ধর্মবিশ্বাসের ব্যতিক্রম যুক্তিবাদের মধ্যবর্তী পন্থায় যৌক্তিকতা প্রদর্শন। তারা উভয়ে যে বিরোধিতার সম্মুখীন হন তা একই সূত্র থেকে উদ্ভূত এবং সেই সূত্রটি হচ্ছে ধর্মতত্ত্বে পেরিপ্যাটেটিক মূলনীতিসমূহ প্রয়োগের বিরোধী পক্ষ।
প্রত্যাদেশের মাধ্যমে জ্ঞাত স্বর্গীয় রহস্যে প্রবেশের পক্ষে প্রদত্ত যুক্তির অসারতা প্রতিপন্ন করে বিশ্বাস ও যুক্তির ক্ষেত্রে অ্যাঞ্জেলিক পণ্ডিত যেসব বিখ্যাত অধ্যায় রচনা করেছেন কর্ডোভার পণ্ডিতের অ্যাপোলজিয়া প্রো ভিটা সুয়া গ্রন্থের সঙ্গে তার অবিকল সাদৃশ্য রয়েছে। তাদের মতে দর্শন এবং বাইবেল ও কুরআনে স্বর্গীয়ভাবে প্রতিভাত সত্যের মধ্যে সংঘাত অচিন্তনীয়। স্বর্গীয়ভাবে প্রতিভাত সত্য ও দার্শনিক সত্যের মধ্যে যদি কোথাও গরমিল থাকে তাহলে সেজন্য পাঠকের ব্যাখ্যাই দায়ী। বক্তব্য বিষয়ের সোজাসুজি ও আক্ষরিক অর্থ সবসময় সঠিক নয়, বিশেষ করে যেখানে স্রষ্টার ব্যাপারে মানবত্ব আরোপ করা হয়েছে।
সেন্ট টমাস তাঁর সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংঘাতমূলক বিষয় সবসময় সাফল্যের সঙ্গে বিশ্লেষণ করতে পারতেন, কারণ তিনি প্রামাণ্য রূপক বিশ্লেষণ প্রদানে দক্ষ ছিলেন। কোন বিবরণ মতবাদসত্য কিনা বাইবেলই তার নিশ্চয়তা, আর বাইবেলের বক্তব্য বিষয় কিভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে একমাত্র যাজকীয় কর্তৃপক্ষই তা বলতে পারে। স্পষ্টত ইবনে রুশদ এতোটা যেতে পারতেন না, কিন্তু তিনি তার পক্ষে যতোটা সম্ভব ততোটা অগ্রসর হতেন। যেখানে রূপক বিশ্লেষণ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে, সেখানে তাৎপর্য নিরূপণের জন্য তিনি কতিপয় নিয়ম প্রবর্তন করেন। তার মতে, বক্তব্য বিষয়ের সোজাসুজি অর্থ পরিহার করা উচিত। কিন্তু যারা মূর্খ ও অশিক্ষিত, যারা আক্ষরিক অর্থের মধ্যে নিহিত, দার্শনিক তত্ত্ব উপলব্ধি করার মতো যথেষ্ট বুদ্ধিমান নয় এবং কুরআনের বক্তব্য বিষয় আক্ষরিক অর্থে সত্য নয় এ কথা বলা হলে যাদের বিশ্বাস নষ্ট হতে পারে, তাদের ক্ষেত্রে সোজাসুজি অর্থই প্রযোজ্য। আপত্তিকারীদের জবাব দিতে গিয়ে তিনি ইজমার মতবাদ সব সময় বৈধ বলে স্বীকার করেন না। যদি এরূপ যুক্তি দেওয়া হয় যে, কোন কোন বক্তব্য বিষয়কে সকল মুসলমান আউ পাইড ডিলালেটর গ্রহণ করেন, অথচ অন্যান্য বিষয় রূপকভাবে ব্যাখ্যার ব্যাপারে তারা একমত, তাহলে এক পদ্ধতি অন্যটিতে ব্যবহার করা যথার্থ হতে পারে না। এর জবাবে ইবনে রুশদ বলেন, সার্বজনীন সম্মতি যদি নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হতো তাহলে তা করা বৈধ হতো না। কিন্তু এই সম্মতি যখন কেবল অনুমানমূলক হয় তখন তা করা যেতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ গণ্ডি ছাড়া একথা কখনো নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হয়নি যে, কোন এক যুগে যেকোন একটি প্রশ্নে সকল বিশেষজ্ঞ একমত হয়েছেন।
পেরিপ্যাটিক পর্যালোচনায় তাদের গুরুর যে স্বাধীনতা ছিল ইবনে রুশদবাদী খৃস্টানদের সেই স্বাধীনতা ছিল না। ফলে তাদেরকে তার মতবাদসমূহ অনিশ্চিতভাবে সম্প্রসারিত করতে হয়। ইবনে রুশদ বলেছেন যে, কুরআন ব্যাখ্যার বিজ্ঞান মূর্খ জনসাধারণের জন্য নয়। তাই দার্শনিকরা যখন যুক্তির আলোকে পবিত্র বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করেন, তখন তাদেরকে তাদের স্থূল ধ্যানধারণা অনুসরণ করতে দেওয়া উচিত। স্বীকার্য যে, তার পরেও কুরআনের বাণী ও শিক্ষিত লোকদের বিশ্বাসের মধ্যে গরমিল থাকবে, কিন্তু এ ধরনের গরমিল এই বলিষ্ঠ মতবাদ অনুমোদন করতে পারে না যে, যুক্তি যাকে সত্য বলে স্বীকার করে না বিশ্বাস থেকে তার ওপর আস্থা জ্ঞাপন করতে হবে। ইবনে রুশদের নিরস ও অবিশ্লেষিত অনুবাদ এই আরব গ্রন্থকার দ্বৈতসত্যের একটি মতবাদ অনুসরণ করেন এরূপ ধারণার সৃষ্টি করে। যে সব শব্দ আলঙ্কারিক ও রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে অনুবাদকরা সব সময় তার খুঁটিনাটি তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারেননি। 'রূপক উপমা' এবং 'প্রতীক' বা 'সাদৃশ্য' দ্বারা ভুয়া ও কল্পিত ব্যাপার বোঝানো হতো। ইবনে রুশদ আলোচনার জন্য যেসব বিষয়বস্তু গ্রহণ করেন সে সম্পর্কে তার স্বধর্মাবলম্বীরা যাই চিন্তা করুন, তিনি রূপক বিশ্লেষণের বৈধতা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ গোড়াপন্থী ছিলেন। তিনি শুধুমাত্র এমন একটি মূলনীতি প্রয়োগ করার চেষ্টা করেন যার অস্তিত্ব শুরু থেকে খৃস্ট ও ইসলাম ধর্মে ছিল।
সেন্ট টমাস ও ইবনে রুশদের ধর্মতত্ত্বের মধ্যে ঘটনাক্রমিক মিল অনেক, এগুলোর মধ্যে আল্লাহ্ সব খুঁটিনাটি বিষয় জানেন এরূপ অটল বিশ্বাস এবং এর সমর্থনে উত্থাপিত যুক্তিসমূহ সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। আসমানী জ্ঞান সবকিছুর কারণ, অ্যাঞ্জেলিক পণ্ডিতের এই বিখ্যাত উক্তি ইবনে রুশদের নিম্নোক্ত উক্তির প্রতিধ্বনি ছাড়া আর কিছু নয়: আল ইলমুল কাদিমু হওয়া 'ইল্লাতুন ওয়া সাবাবুন লিল মাউজুদ। মুসলিম পেরিপ্যাটিক দার্শনিকরা 'আল্লাহ্র জ্ঞানে' সব খুঁটিনাটি বিষয় রয়েছে, এ কথা এই যুক্তিতে স্বীকার করেন না যে, যদি তাই হতো তাহলে জ্ঞাত বিষয়ের পরিবর্তন জ্ঞানীর মধ্যেও পরিবর্তনের সূচনা করতো। আল গায্যালী এর জবাবে বলেছেন যে, পার্থিব জগতে যা কিছু ঘটছে আল্লাহ যদি তার সবকিছু দেখতে ও শুনতে না পেতেন তাহলে দৃষ্টি ও শ্রুতির মালিক আল্লাহ তার সৃষ্ট জীব থেকে নিকৃষ্ট হতেন।
ইবনে রুশদ ও সেন্ট টমাসের মধ্যে মিল এতো ব্যাপক যে, সেগুলি নিছক ঘটনাক্রমিকের চাইতে গভীরতর ব্যাপার। দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টির ইচ্ছা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং পরিকল্পনাটি যেরূপ সাদৃশ্যমূলক পন্থায় প্রণীত হয় তাতে স্বাভাবিকভাবেই এরূপ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয় যে, ইবনে রুশদ অ্যারিস্টটলের ভাষ্যের চাইতেও অনেক বেশি মূল্যবান বিষয় খৃস্টান পণ্ডিতদের উত্তরাধিকার সূত্রে দিয়ে গেছেন। উভয় লেখকের মধ্যেই আমরা বিশ্বাসের দার্শনিক প্রমাণের পর কুরআন বা বাইবেলের উদ্ধৃতি দেখতে পাই। উভয়ের সন্দেহাত্মক বা স্পষ্টত পরস্পর বিরোধী বিষয় উপস্থাপন করে তাদের বক্তব্য শুরু করেন। গতি ও বিশ্বের স্বর্গীয় পরিকল্পনা থেকে আমরা আল্লাহর অস্তিত্বের একই প্রমাণ দেখতে পাই। বিশ্বের একত্ব থেকে আল্লাহর একত্বের একই যুক্তি দেখতে পাই। আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের জন্য ভায়া রিমশনিস-এর পন্থা অনুসরণ করা উচিত, এই বক্তব্য জোরদার করার জন্য উভয়েই এটিকে ভায়া অ্যানালজিয়েই-তে রূপায়িত করেন।
এসব সাদৃশ্যের দৃষ্টান্ত অবাধে বাড়ানো যায়, এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে এসব বহু সাদৃশ্য সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু প্রাচ্য থেকে দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক ধ্যান-ধারণার যে মিছিল অব্যাহত থাকে তার গতিধারা তুলে ধরার জন্য অনেক কিছু বলা হলো। ১২১৭ খৃস্টাব্দের পর থেকে ইবনে রুশদের ভাষ্যসমূহ মাইকেল স্কটের মাধ্যমে টলেডোর পাশ্চাত্য জ্ঞানচর্চা কেন্দ্রে পৌঁছে। সেন্ট টমাস মাঝে মাঝে মাইমোনাইডসের যে বিখ্যাত গ্রন্থের উদ্ধৃতি দেন তাতে ইবনে রুশদের বহু ধ্যান-ধারণা সন্নিবেশিত হয়েছে। ইবনে টমাস তার কোয়েসচ ডিসপিউটেটেই গ্রন্থে আল্লাহ্ জ্ঞানের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত বিতর্কের ওপর ইবনে রুশদ এর বক্তব্য উল্লেখ করেন।
সেন্ট টমাস আকিনাসের প্রসঙ্গ আলোচনার মাধ্যমে এই অধ্যায়ের সমাপ্তি টানা যুক্তিযুক্ত হবে। কারণ তিনি 'প্রভাবের' অস্পষ্টতামূলক ধারণা যথাযথভাবে তুলে ধরেন। তার রচনায় আমরা আরব প্রভাব প্রত্যক্ষ করেছি, কিন্তু এ কথা বলা সঠিক হবে না যে, তিনি আরব লেখকদের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। তাঁকে কোন বিশেষ ধারার বা শতকের ভৃত্যে পরিণত করা যায় না। তার মধ্যেই সময় প্রচলিত ধ্যান-ধারণা থেকে পিছনের দিকে অতীতের খৃস্টান ধর্মগুরুদের মতবাদে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা এই মূল্যবান কথাটিই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আরবদের কাছ থেকে পাশ্চাত্য তার হারানো পৈতৃক সম্পদ পুনরুদ্ধার করছিল, একথা বলার অর্থ আরবদের অবদানকে অস্বীকার করা বা ছোট করে দেখা নয়। তারা জ্ঞানের আলো প্রজ্বলিত রাখেন এবং খাঁটি দার্শনিক চিন্তাধারা বিকাশে তাদের অবদান যতো কিঞ্চিৎকর হোক, ধর্মতত্ত্বে তাদের অবদান নিঃসন্দেহে সবচাইতে মূল্যবান। যারা মুসলিম জ্ঞানসাধকদের মৌলিকত্ব ও বুদ্ধিদীপ্তির অভাবের কথা বলেন, আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, তারা কখনো ইবনে রুশদের রচনা পড়েন নি কিংবা আল গায্যালীর ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত হন নি বরং অপরের মুখে শুনে তারা তাদের মন্তব্য প্রকাশ করেন। পাশ্চাত্যের খৃস্টান জগতের সুরক্ষিত দুর্গ আকিনাসের সুম্মায় ইসলাম থেকে উদ্ভূত মতবাদসমূহের উপস্থিতিই এইসব মন্তব্যের দাঁত ভাঙ্গা জবাব।
মুসলিম প্রভাব বহু দিক দিয়ে যেভাবে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে তার প্রতি সুবিচার করতে হলে মধ্যযুগীয় সংস্কৃতির একটি ইতিহাস রচনা করতে হয়। এতে সুদূরপ্রসারী বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। জাতীয় সংস্কৃতির ধারাসমূহ মানুষের চিন্তাধারার বিশাল সমুদ্রে প্রবাহিত হয়। সেগুলি মহাসমুদ্রে মিলিত হওয়ার পর সুপেয় পানিকে লবণাক্ত পানি থেকে পৃথক করা অসম্ভব না হলেও দুঃসাধ্য। প্রত্যেককে তার নিজস্ব স্বাদের উপর নির্ভর করতে হয়।
মুসলিম প্রাধান্যের চারশ বছরেরও বেশি কাল সকল জ্ঞানচর্চা কেন্দ্রে ধর্মীয় ও দার্শনিক অনুসন্ধানের একটি প্রেরণা সক্রিয় ছিল। সে যুগে প্রত্যেক বণিকই কবি ছিলেন এবং সম্ভবত যে কোন কবি বণিক ছিলেন না, সে যুগের রচনায় এখনো প্রাচ্য মনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রং ও আকর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। ভ্রমণ ও অধ্যয়ন, যুদ্ধ ও প্রেম, সঙ্গীত ও গান, সবকিছুই আল্লাহ্ নিয়ামত ছিল। জীবন, বিশেষ করে যারা সিংহাসনের বা রাজদরবারের অত্যন্ত কাছাকাছি বাস করতো তাদের জীবন সংক্ষিপ্ত হলেও মধুর ছিল। এমনি এক যুগে ধর্মীয় অনিশ্চয়তা থাকলেও তাতে কি আসে যায়? সন্দেহ প্রবণতা এমন এক মিস্টিক সর্বখোদাবাদ আশ্রয় নিতো বা নিয়েছিল, যাতে নিজের ভিতরে ও বাইরে আল্লাহকে পাওয়া যেত। অ্যাপোকালিপ্সবাদী ও এসীনরাই পরম সুখাবেশ উপভোগ করতে কিংবা কঠোর সাধনা করতে পারত। তাদের এসব পন্থা ইউরোপে আলবিজেনসীজদেরও নতুন প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করে। মেসিয়াবাদীও তার মেহদীকে খুঁজে পান এবং গোড়াপন্থী হুরদের বাগানে তার 'সুদৃঢ় সুখ ও স্থায়ী আনন্দ' লাভ করেন।
কর্ডোভার ইবনে হাযম-এর ন্যায় বেয়াড়া জ্ঞানার্থীরা ইউরোপের প্রথম ব্যাপকতামূলক রিলিজিয়াজেসচিটে এবং ওল্ড ও নিউ টেস্টামেন্টের প্রথম ধারাবাহিক উচ্চাঙ্গের সমালোচনা গ্রন্থ রচনা করতে পারতেন। উদ্ভট ব্যাপার বাস্তবের সঙ্গে সংমিশ্রিত হতে পারতো এবং কল্পনাশক্তি জীবনের সাধারণ ধাতুকে সোনালি আভায় রঞ্জিত করতে পারতো। এই পটভূমিতেই অবশেষে ইবনুল আরাবীর ন্যায় জ্ঞানসাধকরা ডিভাইনা কমেডিয়ার অনুরূপ বিস্ময়কর গ্রন্থসমূহ রচনা করেন।
ভাষার বাধা একথাই প্রমাণ করে যে, আমাদের পূর্ব পুরুষরা এই সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় জীবনের খুব সামান্য অংশই হজম করতে সক্ষম হন। তাই ইউরোপে যখন মুসলিম সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে এবং যে সমস্ত জ্ঞান তখনো হজম করা সম্ভব হয়নি, তখনি পরাজিত মূরদের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলিও অদৃশ্য হয়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আগের যে কোন সময়ের তুলনায় ত্রয়োদশ শতকে প্রাচ্য ও প্রতীচ্য জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে অনেক ঘনিষ্ঠতা লাভ করে। আমরা দেখেছি যে, ত্রিত্ব ও অবতারের মূল বিশ্বাস ছাড়া পণ্ডিতরা প্রায়ই তাদের নিজেদের বাহিনীর চাইতে বিরোধী শিবিরে অধিক সংখ্যক মিত্র খুঁজে পেতেন। ইউরোপের গ্রন্থাগার সমূহের সবগুলি মূল্যবান উপাদান তুলে ধরা হলে এখনো দেখা যাবে যে, মধ্যযুগীয় সভ্যতায় আরবদের স্থায়ী প্রভাব এতোদিন পর্যন্ত যতোটা স্বীকৃতি লাভ করেছে তার চাইতে অনেক অনেক বেশি।
টিকাঃ
১. দ্রষ্টব্য: রাশডালের দি ইউনিভার্সিটিস অব ইউরোপ ইন দি মিডল এজেস, ১, অধ্যায় ৩, এবং ক্যাম্ব্রিজ মিডিয়েভ্যাল হিস্টোরি, ৬ষ্ঠ, পৃ. ৫৬০।
২. গিলম লি বন (২য়) অধিকাংশ স্যারাসেন অধ্যুষিত প্রজাদের আল্লাহর উদ্দেশ্যে নামায আদায় করার জন্য উৎসাহিত করেন। তার উত্তরাধিকারীরা স্যারাসেনদের অর্থ, দরবারের অনুষ্ঠান, প্রাসাদের উৎকীর্ণ লিপি, প্রশাসন ব্যবস্থা এমন কি হেরেমের রীতিনীতিও অনুকরণ করেন। ডেস্ক্রিপশন ডি এল' আফ্রিক এট ডি এল' এসপাগনে পার ইদ্রিসী, সম্পাদনা ডোযী ও ডি গোয়েজি, ইন্ট, পৃ. ১।
১. ম্যাটালজিকাস, ৪র্থ, ৬। এই রেফারেন্সের জন্য আমি ক্লিমেন্ট সি জে ওয়েব-এর কাছে ঋণী।
১. রাশডাল লিখেছেন: 'আইনের (শরীয়ত) একটি বিষয় বা গ্রন্থ "পাঠ করার" জন্য অথবা অপর কথায় একটি পাঠ্যক্রম সমাপ্তির জন্য অধ্যক্ষের (রেক্টর) লাইসেন্স ব্যক্তিবিশেষকে ব্যাচেলারে উন্নীত করে।' এবং 'একজন শরীয়ত বিশেষজ্ঞ চার বছর "শ্রবণের" পর একক একটি বিষয় সম্পর্কে ভাষণ দিতে পারেন। "শ্রবণ" ও "পাঠের" বিশেষ অর্থ আরবীতে অনুরূপ বিশেষ ব্যাপারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হলেও এই সাদৃশ্য এবং পাঁচ-ছয় বছরের শিক্ষালাভের পর ছাত্র-শিক্ষককে চাকরিতে নিয়োগের তেমন কোন তাৎপর্য নেই, এবং কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্ভবত স্বতঃস্ফূর্তভাবে এর উদ্ভব হয়েছে। রহস্যজনক বাক্কেলরিয়াস শব্দটি (ব্যাচেলার শব্দের মূল ল্যাটিন রূপ, যার উদ্ভব সম্পর্কে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিও কোন সন্তোষজনক বিশ্লেষণ দিতে পারেনি। কোন আরবী সূত্র খুঁজে পাওয়া গেলে এ ব্যাপারে দৃঢ় যুক্তি দেওয়া যেতো। মূলত কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাচেলার বলতে এরূপ ছাত্রকে বোঝানো হতো বলে মনে হয়, যে মাস্টার স্কুলে পড়ানোর অনুমতি পেতো। আমি কোন আরবী লেখকের মধ্যে সঠিক অর্থ খুঁজে না পেলেও বিহাক্কে-আল রিওয়ায়া ("অন্যের কর্তৃত্বে শিক্ষা দেওয়ার অধিকার") কথাটি বাক্কেলরিয়েটের অর্থের ইঙ্গিত দেয় এবং এর সঙ্গে মোটামুটি ধ্বনিগত মিলও দেখা যায়। অবশ্য এই শব্দটির প্রাচীনতম ব্যবহার ব্যান্সন ডি রোল্যান্ডে রয়েছে বলে জানা যায়। এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করা গেলে একথা বলা যাবে যে, মূল আরবী শব্দকে ব্যাচেলরে' রূপান্তর করা হয়েছে। আরবীতে ডিগ্রীধারীর জন্য নয়, পদের জন্য শব্দ ব্যবহার করা হয়।
২. এটি একটি ভুল অনুবাদ। আমার মনে হয় ডি এস মার্গোলিয়োথ সম্পাদিত অ্যানালেকটা ওরিয়েন্টালিয়া গ্রন্থে ১৮৮৭ খৃস্টাব্দে সর্বপ্রথম লিবার স্যানাশনিস নামে সঠিক শিরোনাম প্রদত্ত হয়।
১. রোমান দার্শনিক ও রাষ্ট্রনীতিক (আনু. ৪৮০-৫২৪ খৃ)।
২. চার্লস ও ডরোখিয়া সিংগারের নিবন্ধ দ্রষ্টব্য, পৃ. ২০৪ এফ।
১. ইবনে সিনার মেটাফিজিক্স সংক্রান্ত বইটির নাম ইলমূল ইলাহিয়্যাত, যার অর্থ 'স্বর্গীয় ব্যাপারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের জ্ঞান।'
২. ওপাস মাজুস, ফিলস্, ৩য় অধ্যায়।
৩. পূর্বোক্ত গ্রন্থ, ৮ম অধ্যায়।
৪. পূর্বোক্ত গ্রন্থ, ১৯তম অধ্যায়।
১. আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রীক ধর্মতত্ত্ববিদ এরিয়াসের (জীবিতকাল আনু. ২৮০-৩৩০ খৃ.) মতবাদ। তাঁর মতে যীশু খৃস্ট আল্লাহর সত্তা দ্বারা তৈরি নয়, তিনি কেবলমাত্র সৃষ্ট জীবের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন।
২. আমি দি লেগ্যাসি অব ইসরাইলে (পৃ. ১২৯) ইহুদীদের প্রভাব বর্ণনা করেছি।
১. আল-আশ'আরী নিজস্ব পন্থায় যে ব্যবস্থা তুলে ধরেন তা সর্বপ্রথম জার্মানীতে প্রকাশিত হয়। এটি পণ্ডিতদের হাতে না আসা পর্যন্ত আল-আশ'আরী তার নিজস্ব মতবাদ কতোটা সার্থকভাবে তুলে ধরেছেন সে সম্পর্কে কোন মন্তব্য করা সম্ভবপর নয়।
১. প্রফেসর এম আসিন, আবেলমাসাররা ওয়াইসু এস কুয়েলা, মাদ্রিদ, ১৯১৪।
১. আরো দ্রষ্টব্য দি লেগ্যাসি অব ইসরাইল, পৃ ১৯২-২০২ এবং বিশেষভাবে পরবর্তী ৪৩৭।
১. ১০ম, ১১শ ও দ্বাদশ অধ্যায় দ্রষ্টব্য।
১. ফরাসী ভাষায় এল গথিয়ার কর্তৃক এই রচনার অনুবাদ প্রকাশিত হয়। অ্যাকর্ড ডি লা রিলিজিয়ন এট ডি লা ফিলসফি। ট্রেইটি ডি ইবনে রুশদ, আলজার, ১৯০৫। স্পেনীয় ভাষায় এম অ্যাসিন কর্তৃক সেন্ট টমাসের তুলনাসহ এবং অত্যন্ত মূল্যবান ঐতিহাসিক ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণসহ এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়। হোমেনাজে এ ডি ফ্রান্সিস্কো কডেরা, মাদ্রিদ, ১৯০৪, পৃ. ২৭১ থেকে।
১. তুলনা ম্যাথিও ৭ : ৬; সুরাহ ৩৪৫; ইবনে রুশদ ফল্ পৃ. ৮; সুম থিওল, ১ এ কিউ ১ এ এট পাসিম।
২. দ্রষ্টব্য দামিমাতুল মাসআলাতিল্লাতি জাকারাহা আবুল ওয়ালিদ ফি ফাসলিল মাকাল। সম্পাদক আসিন, অপ. সিট, এই চিঠিটি রেমান্ড মার্টিন কর্তৃক অনূদিত হয়েছে এবং তার পুজিও গ্রন্থে (১ম খণ্ড ২৫তম অধ্যায়) স্থান পেয়েছে।
১. সেন্ট টমাস ও আল গায্যালীর মধ্যে বৃদ্ধিদীপ্তিতে কে বড় আল গায্যালীর সামগ্রিক রচনা পর্যালোচনার পরই তার যথাযথ মূল্যায়ন হতে পারে। তবে সাধারণ বুদ্ধিতে এটুকু বোঝা যায় যে, গায্যালীর প্রায় একশ বছরের পরবর্তী সেন্ট টমাস গায্যালীর দ্বারাই প্রভাবিত হয়েছেন।
১. আসমানী প্রত্যাদেশে বিশ্বাসী।
২. একটি প্রাচীন ইহুদী অধ্যাত্মবাদী সম্প্রদায়।
৩. ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলে আনু. ১০২০-১২৫০ খৃ. বসবাসকারী একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়, যাদের ধর্মদ্রোহিতার দায়ে শেষ পর্যন্ত অবদমিত করা হয়।
৪. মেসিয়া বা মসিহ মতবাদে বিশ্বাসী। ইহুদী মতে ইহুদীদের প্রতিশ্রুতি ও আকাঙিক্ষত মুক্তিদাতা; খৃস্টান মতে এই মুক্তিদাতা হিসাবে স্বয়ং যীশু খৃষ্ট-খৃস্ট শব্দটির অর্থ মুক্তিদাতা; মুসলিম মতে মুসলমানদের আকাঙিক্ষত ইমাম মেহদি (আ)।
৫. তুলনামূলক ধর্মবিজ্ঞান।
📄 আইন ও সমাজ
প্রাচীন আরবের সামাজিক কাঠামো রক্তের সম্পর্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। একই পূর্ব পুরুষ থেকে উদ্ভূত বংশধারা বা বংশধর বলে দাবিদার একটি জনগোষ্ঠী পারস্পরিক প্রতিরক্ষার জন্য সংঘবদ্ধ হয়। তারা সাধারণ উপাসনা ও সাধারণ আচরণ দ্বারা একতাবদ্ধ হলেও তাদের প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ বন্ধন ছিল রক্তের সম্পর্ক। খাঁটি হোক আর কল্পিত হোক এর মাধ্যমে একটি কার্যকর ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের সৃষ্টি হয়। বস্তুত আরব উপজাতি ছিল একটি বিরাট পরিবার।
অন্যান্য আদিম সমাজের ন্যায় আরবেও মূল সামাজিক ইউনিট ছিল দল, কোন ব্যক্তিবিশেষ নয়। স্বতন্ত্র হিসাবে ব্যক্তিবিশেষের কোন মূল্য ছিল না, সে-যে পরিবার বা দলের অন্তর্ভুক্ত থাকতো তাকেই গুরুত্ব দেওয়া হতো। পরিবার তার সামাজিক ও বৈধগণ্ডিতে সকল সদস্যের জীবনের সমষ্টি ছিল। এটি তাদের অধিকার সংরক্ষণ করতো, তাদের ক্ষতির প্রতিশোধ নিতো, তাদের অপরাধের কৈফিয়ত দিত এবং মৃত্যুর পর তাদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করতো। এসব ক্ষেত্রে তারা এমন একটি রীতি অনুসরণ করতো যা ছিল তাদের সর্বপ্রকার ক্ষমতার উৎস এবং স্মরণাতীতকাল থেকে অতীব মূল্যবান।
ইসলাম আবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্যগুলিসহ এর গাঠনিকরূপ বজায় রাখে। কেবল একটি মৌল বিষয়ে ইসলাম পরিবর্তন সাধন করে: যে রক্তের বন্ধন আরব উপজাতির রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল, সমষ্টিগত বিশ্বাস তার স্থলাভিষিক্ত হয়।
আদিম সেমিটিক উপজাতির মধ্যে পূর্ব থেকে উপাসনাই ছিল উপজাতীয় জীবনের কেন্দ্র বিন্দু। দেবতা ও উপাসনাকারী উপজাতি এক ছিল। দেবতা উপজাতির মিত্রদের মিত্র এবং শত্রুদের শত্রু ছিল। উপজাতি ও মিত্রদের সঙ্গে দেবতা একাকার ও একাত্ম হয়। তাদের কাছে দেবতা পরিবর্তন আমাদের কাছে জাতিগত পরিচয় পরিবর্তনের শামিল ছিল।
তাই মহানবী সাল্লালাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম আরব সমাজের আদিম অবস্থার কথা স্মরণ করে এর ভিত্তির ওপর এমন একটি সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলেন যা এর সহজাত আবেগের গভীরতাকে নাড়া দেয়। এই সত্যটি ইবনে খলদুনের গভীর দৃষ্টি এড়ায়নি। উপজাতি ও পরিবারের ঐতিহ্যগত কাঠামো ভেঙে ফেলা হয়। বংশগত মর্যাদা, আনুগত্য ও উপজাতীয় সংঘের প্রশ্ন চিরবিদায় গ্রহণ করে। যিনি ইসলাম ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন তাকে সর্বপ্রকার সম্পর্কের কথা ভুলে যেতে হয়। এমনকি ধর্মবিশ্বাসের সহচর না হলে নিজস্ব আত্মীয়-পরিজনের সম্পর্কও ভুলে যেতে হয়। পুরোন বিশ্বাস আঁকড়ে থাকলে তার পরিজনদের উদ্দেশ্যে তাকে হযরত ইবরাহীম আলায়হিস সালামের ন্যায় অবশ্যই বলা হয়: 'তোমাদের ও আমার মধ্যে অভিন্ন কিছু নেই।' মহানবী যে নতুন সামাজিক ব্যবস্থার উদ্বোধন করেন এটিই ছিল তার উল্লেখযোগ্য দিক।
আমরা সমষ্টিগত জীবনের সকল পরিচয় ছিন্ন করে ব্যক্তিগত জীবনের আবির্ভাব দেখতে পাই। অতঃপর মানুষকে স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসাবে গণ্য করা হয় এবং ব্যক্তি বিশেষ তার ক্ষেত্রে তার দাবি ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়। এই সচেতনতা সমাজের সঙ্গে তার সম্পর্ক থেকে নয়, বরং তার বিশ্বাস থেকে আসে। এসব বিশ্বাসীর সমবায়ই হচ্ছে 'মুসলিম সম্প্রদায়'।
যারা মুক্তকণ্ঠে একমাত্র ইলাহর প্রতি ও প্রেরিত পুরুষ হিসাবে হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর নৈতিক শিক্ষা অনুসরণ করে তারা অধিকারবলে হযরত মুহাম্মদের 'লোকদের' বা 'সম্প্রদায়ের' অন্তর্ভুক্ত হয়। এই উম্মাহ আত্মীয় সম্পর্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন উম্মাহ বা উপজাতির স্থলাভিষিক্ত হয়। এই সম্প্রদায় অন্য যেকোন সম্প্রদায় থেকে পৃথক রকমের। এরা নির্বাচিত ও পবিত্র লোক যাদের ওপর সৎকর্মের বিকাশ ও অসৎকর্ম বিনাশের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। মহানবী যেভাবে আরবদের মধ্যে আল্লাহর সাক্ষী ছিলেন তেমনি এরাও পৃথিবীতে ন্যায় বিচার ও বিশ্বাসের আসন এবং বিভিন্ন জাতির মধ্যে আল্লাহর একমাত্র সাক্ষী।
এই সব ধ্যান-ধারণা বহু আগেই ইসলামের প্রাচীনতম ঐতিহাসিক দলিলে সন্নিবেশিত হয়েছে। প্রথম হিজরীতে মদীনায় ফরমান হিসাবে তা জারি করা হয়।
মহানবীর অনুসারীরা একটি বিরাট পরিবার ছিল। যারা একই আল্লাহ্র উপাসনা করে না এরূপ প্রত্যেকটি দলের বিরুদ্ধে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, 'অন্য সকলের বিরুদ্ধে একা'। মদীনার লোকদের উদ্দেশ্য করে যেমনটি হযরত আবূ বকর (রা) বলেছিলেন, 'ঈমানদার ভাইগণ, গণিমতের মালের অংশীদারগণ, সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে মিত্রগণ।' এমনিভাবেই সামগ্রিক ব্যবস্থাটি একটি নৈতিক ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য লাভ করে। প্রয়োজনের সময় প্রত্যেক মুসলমানকে অন্য সকল মুসলমানের সাহায্যকারী ও রক্ষাকারী হতে হবে, এই ধর্মীয় নির্দেশ অনুযায়ী এতে পারস্পরিক সাহায্যকে একটি আইনগত কর্তব্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়। হাদীসে বলা হয়েছে, 'মুসলমানরা একটি সুদৃঢ় প্রাচীরের ন্যায় একক একটি হাত যেখানে প্রাচীরের প্রত্যেকটি ইট প্রত্যেকের সহায়ক।' সরকারী ও বেসরকারী উভয় পর্যায়ে আইনের প্রত্যেকটি এলাকায় এসব ধারণার প্রতিফলন দেখা যায়। ভ্রাতৃত্বের স্বাভাবিক ফল সাম্য। আল্লাহর কাছে সবাই সমান, তাই মুসলমানরা নিজেদের মধ্যেও সবাই সমান। ঈমানদারদের মধ্যে কেবলমাত্র ঈমানে প্রাধান্যের দ্বারা কিংবা অধিকতর নিষ্ঠার সঙ্গে ঈমানের অনুশাসন পালনের দ্বারা প্রাধান্য সূচিত হয়। 'হে কুরাইশ, আল্লাহ তোমাদের মধ্যে আভিজাত্যের অহঙ্কার এবং মূর্খতার যুগের ঔদ্ধত্য অবদমিত করেছেন। সকল মানুষ হযরত আদম থেকে এসেছে এবং আদমকে মাটি দ্বারা তৈরি করা হয়েছে।' রাজনৈতিক ও সামাজিক নির্বিশেষে সামগ্রিক ব্যবস্থায় আইনের দৃষ্টিতে সাম্য একটি মৌল ভিত্তি। আবূ মুসা আল আশ'আরীর প্রতি খলীফা উমরের বিখ্যাত উপদেশ বাণীতে বলা হয়েছে, 'তোমার বিচারে ও বিচারালয়ে তাদের সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখবে, অন্যথায় ক্ষমতাবানরা তোমার পক্ষপাতিত্ব আশা করবে এবং দুর্বলরা তোমার বিচারে নৈরাশ্য বোধ করবে।' নির্ভরযোগ্য হোক আর না হোক এসব বিধি প্রত্যেকটি আইন গ্রন্থে দেখা যায় এবং এগুলি ফৌজদারী ও দেওয়ানী আইনের ভিত্তি।
এই সাম্যবাদী সম্প্রদায়ের এবং প্রাচীন ইসরাইলের ন্যায় বিশ্বাসের ভ্রাতৃসমবায়ের পুরো ভাগে রয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ। আল্লাহ্র বিধান তার লোকদের ওপর সরাসরি ও প্রত্যক্ষ। প্রাচীন আরব উপজাতিগুলির দেবতারা ছিল তাদের উপাসকদের পৃষ্ঠপোষক ও রক্ষাকর্তা। তাঁর নির্বাচিত লোকদের পৃষ্ঠপোষক ও রক্ষাকর্তা আল্লাহ্ প্রাচীন দেবতাদের স্থলাভিষিক্ত হন এবং মুসলমান সম্প্রদায়কে শাসন করেন। কোন একটি উপজাতি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তাদের নেতা যখন মহানবীকে বলেন, 'আপনিই আমাদের রাজা', তখন সঙ্গে সঙ্গে মহানবী জবাব দেন 'রাজা হচ্ছেন আল্লাহ্, আমি নই।'
ইসলাম আল্লাহ্র সরাসরি শাসন তথা আল্লাহর হুকুমাত। আল্লাহর দৃষ্টি তাঁর বান্দাদের প্রতি নিবদ্ধ। অন্যান্য সমাজে যাকে সিভিটাস, পলিস, স্টেট বলা হয় ইসলামে সার্বভৌমত্বের মালিক একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ সর্ব শক্তিমান এবং তিনি সাধারণের কল্যাণ করেন। তাই সরকারী কোষাগার 'আল্লাহর কোষাগার', 'সেনাবাহিনী আল্লাহর সেনাবাহিনী', এমনকি সরকারী কর্মচারীরাও 'আল্লাহর কর্মচারী'।
আল্লাহ ও ব্যক্তিগতভাবে ঈমানদারদের মধ্যে সম্পর্কও সরাসরি, কারণ আল্লাহ ও ঈমানদারের মধ্যে কোন মধ্যস্থতাকারী নেই। ইসলামে কোন যাজক সম্প্রদায়, পুরোহিত বা সংস্কার নেই। যে 'স্রষ্টা' জন্মের আগে থেকে মানুষকে জানেন এবং 'গর্দানের শিরা থেকেও মানুষের কাছাকাছি' রয়েছেন, সেই 'স্রষ্টা' ও মানুষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর কি প্রয়োজন? যে মহানবী (সা) মানব জাতির কাছে আল্লাহর চূড়ান্ত বাণী পৌঁছিয়ে দিয়েছেন তার পরে অন্য কোন বিশ্লেষণকারী এবং তার ইচ্ছার প্রতিনিধি থাকতে পারে না। জীবনে মরণে আল্লাহ্র সামনে মানুষ একা। সে যেভাবে একজন 'আরব সৈয়দকে' সম্বোধন করতে পারতো তেমনিভাবে কোন প্রকার ভূমিকা ও আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া সবসময় আল্লাহকে সম্বোধন করতে পারে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহ্র দৃষ্টির সামনে মানুষ একা, তার দৃষ্টিতে কোন কিছু এড়ায় না এবং তার কাছে প্রতিটি কাজ, প্রতিটি কথা, এমনকি অত্যন্ত গোপন চিন্তাও সমুপস্থিত। সেই ডাইয়িয আইরিতে যখন প্রতিটি জীবকে তার কৃতকর্মের প্রতিদান গ্রহণের জন্য ডাকা হবে তখন সে একাই তার কৃতকর্মের জবাব দেবে, একাই আল্লাহ্র বিচারের মুকাবিলা করবে। তাঁর সামনে সুপারিশ বা সুপারিশকারী কোন কাজে আসবে না। এই অনমনীয় এবং মানুষ ও স্রষ্টার মধ্যে যে কোন হস্তক্ষেপ অসহনশীল ব্যক্তিগত একত্ববাদের তুলনায় অত্যন্ত কঠোর প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মমত ও একটি যাজকীয় ধর্ম বই কিছু নয়।
সর্বদ্রষ্টা বিচারকের সামনে একা ও সহায়হীন অবস্থায় আল্লাহ্ ক্ষমতা থেকে নিজেকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য মানুষ তাঁর দয়ার কাছে তাঁর কাছ থেকে তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করা ছাড়া আর কি করতে পারে? আল্লাহ্র কাছে মানুষের পরিপূর্ণ বিনয় ও আশা নিয়ে এই আত্মসমর্পণই সত্যিকারের ঈমান, এবং এ কারণেই ইসলাম একমাত্র সত্যিকারের ধর্ম, কেননা একমাত্র এটিই হচ্ছে আল্লাহর কাছে একটি ধর্মীয় আত্মা হস্তান্তর। মানুষ উপলব্ধি করে, আল্লাহকে এবং তাঁর দৃষ্টিতে মানুষের অবস্থা কত তুচ্ছ। সেমিটিক জাতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই সামগ্রিক আত্মসমর্পণই ইসলামের প্রতীক এবং বিভিন্ন জাতির মধ্যে তার নিশান। এই শিক্ষার সঙ্গে তার নিজস্ব উপজাতির সহজাত ধর্মীয় প্রবণতার যে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল সে সম্পর্কে সম্ভবত হযরত মুহাম্মদ (সা) সচেতন ছিলেন, এবং তাই তিনি নিজেকে হযরত ইবরাহীমের খাঁটি ও অকলুষিত ধর্ম বিশ্বাসের 'পুনরুদ্ধারকারী' এবং সর্বশেষ নবী হিসাবে ঘোষণা করেন।
ইসলামী সমাজের মূল ভিত্তিসমূহ আসমানী আইন (শরী'আ)। ঈমানের প্রতীকের চতুর্দিকে সমবেত এবং আল্লাহর দ্বারা শাসিত এই ভ্রাতৃসংঘের বৈশিষ্ট্য আইনের ধারণা নির্ধারণ করে। প্রাচীনদের এবং আমাদের মতে আইন হচ্ছে এমন একটি বৈধ আদর্শ যা জনসাধারণ কর্তৃক সরাসরি কিংবা তাদের প্রতিনিধিত্বশীল সংস্থার মাধ্যমে অনুমোদিত হয় এবং এর ক্ষমতার উৎস হচ্ছে মানুষের যুক্তি ও ইচ্ছা এবং তার নৈতিক স্বভাব। মুসলমানদের ধারণা সম্পূর্ণ বিপরীত। একথা যদি সত্য হয় যে, মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রধান ও শাসক স্বয়ং আল্লাহ তাহলে আইন আল্লাহ্ ইচ্ছা ছাড়া আর কিছুই নয়। এটিই হচ্ছে বিধি যার অনুসরণে আল্লাহ তাঁর নির্বাচিত বান্দাদের আইন প্রণেতা হিসাবে এটি পরীক্ষা করবেন।
এই আইনের কাছে আত্মসমর্পণ একই সময়ে একটি সামাজিক দায়িত্ব এবং ঈমানের একটি অঙ্গও বটে। এই আইন লংঘনকারী কেবলমাত্র বৈধ ব্যবস্থাতেই হস্তক্ষেপ করে না, এতদ্বারা পাপও করে। কারণ যেখানে আল্লাহ সংশ্লিষ্ট নন সেখানে কোন অধিকারও নেই। বিচার ব্যবস্থা ও ধর্ম এবং আইন ও নৈতিকতা সেই একই ইচ্ছার দু'টি দিক। এর থেকেই মুসলমান সম্প্রদায় তাদের অস্তিত্ব ও নির্দেশনা লাভ করে। প্রত্যেকটি আইনগত প্রশ্ন স্বয়ং একটি বিবেকের ব্যাপার, এবং আইনশাস্ত্র তার ভিত্তি হিসাবে ধর্মতত্ত্বের মুখাপেক্ষী।
এই আইনের বৈশিষ্ট্য ও যথাযথ কাজ কি? কুরআনের প্রত্যাদেশ পূর্ববর্তী প্রত্যাদেশ-সমূহের দৃঢ়তা শিথিল করার উদ্দেশ্যে স্বাধীনতার একটি আইন এবং আল্লাহ কর্তৃক মানব জাতিকে প্রদত্ত একটি দয়ার কাজ হিসাবে নিজেকে অভিহিত করে। ইহুদী ও খৃস্টানরা যে স্বাভাবিক আইন এবং পূর্বতন নবীদের যে আদি ধর্ম বিশ্বাস বিকৃত ও কলুষিত করেছিল ইসলাম সেটি পুনঃ প্রবর্তন করে। নতুন আইন ইহুদীরা যেসব কঠোরতা আরোপ করে এবং খৃস্টানরা যেসব রদবদল করে সেগুলি বাতিল করে দেয় এবং মানুষের দুবর্লতা ও সহজাত দোষত্রুটি এবং জীবনের বাস্তব প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানে সম্মতি ঘোষণা করে। মহানবী সাধারণত যেসব উপদেশ দিতেন তা হচ্ছে : 'পন্থা সহজ করো, এটিকে কঠোরতর করো না। আল্লাহ প্রত্যেকের ওপর সে যতটা করতে সক্ষম কেবল ততোটাই আরোপ করেন।' ইসলামে আধ্যাত্মিকতার প্রবণতা থাকলেও কঠোর তপস্যার অবকাশ নেই। ইসলাম বিধিগতভাবে কঠোর তপস্যার বাড়াবাড়ি নিষিদ্ধ করে, কারণ এতে দেহ দুর্বল হয় এবং মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা অবদমিত হয়। ইসলাম ঈমানদারকে আল্লাহ্ কর্তৃক প্রদত্ত 'ভালো জিনিসগুলি' উপভোগে উৎসাহিত করে; তবে তাকে সীমা বজায় রাখতে হবে এবং কুরআনের প্রত্যাদেশের নির্দেশগুলি পালন করতে হবে। কিন্তু এসব বিধিনিষেধের সংখ্যা অসংখ্য নয় এবং সেগুলি অত্যন্ত কঠোরও নয়।
ইসলামী আইন প্রত্যেকটি বাস্তব কার্যকলাপ অনুমোদন করে এবং কৃষি, বাণিজ্য ও প্রত্যেক রকমের কাজের অত্যন্ত মর্যাদা প্রদান করে। যারা নিজেদের ভরণ-পোষণের বোঝা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয় এই আইন তাদের নিন্দা করে। এই আইন অনুসারে প্রত্যেক লোককে তার নিজস্ব শ্রমের উৎপাদনের ওপর নির্ভর করতে হয়। অন্যের ওপর নির্ভর না করে যেকোন স্বাধীন পেশা প্রশংসনীয়। রেনান বলেন, 'লা' ইসলাম এস্ট উনে রিলিজিয়ান ডি' হোম্স্।' এই বক্তব্যের মর্ম অনুসারে আমরা দেখতে পাই যে, ইসলামী আইনের প্রবণতা হচ্ছে মানুষকে কাজ করার বিস্তীর্ণতম সুযোগ প্রদান। মুসলিম আইন বিশেষজ্ঞরা যখন বলেন যে, আইনের মূল বিধি হচ্ছে স্বাধীনতা, তখন আমরা তা অবাধে মেনে নিতে পারি।
কিন্তু এই স্বাধীনতা সীমাহীন হতে পারে না। মানুষ স্বভাবত লোভী ও অকৃতজ্ঞ। অন্যের ধনের ব্যাপারে লোভ করে, নিজের ব্যাপারে কৃপণ, এবং আল্লাহ যেসব নিয়ামত দান করেছেন সে ব্যাপারে অকৃতজ্ঞ। আল্লাহ যদি প্রত্যেকের ক্ষুধা নিবারণের জন্য অবাধ সুযোগ দিতেন এবং সকলকে অবিচার ও হিংসাত্মক কার্যকলাপের অনুমতি দিতেন তাহলে মানব সমাজ সম্ভব হতো না এবং ব্যক্তি বিশেষ জীবন ধারণ করতে পারতো না। অতএব আল্লাহ মানুষের কার্যকলাপের একটি সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই সীমা হচ্ছে আমরা যাকে আইন বলি ঠিক তাই। এটিতে কোন কোন কাজ নিষিদ্ধ করে এবং অন্যান্য কাজের তাগিদ প্রদান করে মানুষের কাজ বিভিন্ন পর্যায় পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। এটিতে মানুষের আদিম স্বাধীনতাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে যাতে তা ব্যক্তিবিশেষ বা সমাজের জন্য যতোটা সম্ভব কল্যাণকর হয়ে ওঠে।
আইন স্বভাবত প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারে না, বরং যেসব ব্যাপারের আইনগত তাৎপর্য রয়েছে এরূপ নির্দিষ্ট সংখ্যক বিষয়ে আইনের আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকে। রোমান আইন শাস্ত্রবিদগণ বলেছেন, লেজিস ভার্চুস হায়েক এস্ট, ইস্পারারে, ভেটারে, পারমিটারে, পিউনিরে।
ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ইসলামী আইন আইনগত হস্তক্ষেপের নিম্নোক্ত দু'টি নতুন দিক সংযোজিত করেছে : 'যেসব জিনিস গ্রহণযোগ্য' এবং 'যে সব জিনিস তিরস্কারযোগ্য'। তাই আপাতত দণ্ড বিষয়ক দিক বাদ দিয়ে আমরা সুস্পষ্ট আইনের সামগ্রিক ক্ষেত্রের প্রতিনিধিত্বকারী পাঁচটি শ্রেণী পাই। আকার যাই হোক এসব বিধির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একই, অর্থাৎ জনগণের কল্যাণ। তাই মূলত স্বর্গীয় ও বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে মানবিক এই আইন আপাতদৃষ্টিতে মনে না হলেও মানুষের মঙ্গল ছাড়া এর আর কোন লক্ষ্য নেই। কারণ যে বিজ্ঞতা ও দয়ার মূল উৎস আল্লাহ তা যেখানে প্রতিফলিত হয় না সেখানে তাঁর কিছুই করণীয় নেই।
আত্মা ও দেহ সমন্বিত মানুষের জীবন দ্বিবিধ, নৈতিক এবং দৈহিক। মানব জাতির শৃঙ্খলা বিধানের জন্য আল্লাহ যেসব বিধি বা সীমা নির্ধারণ করেছেন তার কোন কোনটির সঙ্গে আত্মার জীবনের এবং কোন কোনটির সঙ্গে দেহের জীবনের সম্পর্ক রয়েছে। ধর্ম ও আইন দুটি পৃথক ব্যবস্থা হলেও তারা পরস্পরের পরিপূরক। কারণ সাধারণ লক্ষ্যের মধ্য দিয়ে তারা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং সেই লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের মঙ্গল। ঈমানের ভিত্তিগুলি আধ্যাত্মিক জীবনের নিয়ামক। অনন্ত জীবন লাভের জন্য মানুষকে কি বিশ্বাস করতে হবে এগুলি তা নির্ধারণ করে। সুস্পষ্ট আইন পার্থিব উদ্দেশ্যে পরিচালিত মানবিক কার্যকলাপের বিধান। এটি সেই পূর্ণাঙ্গ গঠনের সম্পূরক যার ঈমানের দিক হচ্ছে আত্মা। ঈমানের যথাযথ স্থান হচ্ছে অন্তর, অর্থাৎ মানুষের আভ্যন্তরীণ জীবন। সুস্পষ্ট আইনের যথাযথ স্থান হচ্ছে বাহ্যিকভাবে যতোটা বিস্তৃত হয় সে পর্যন্ত মানুষের কার্যকলাপ। এর কোন কোনটি ইসলামের নিম্নোক্ত মৌলিক নির্দেশসমূহ পালনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট : আল্লাহর একত্ব, নামায, রোযা, যাকাত ও হজ্জ। অন্তঃকরণ আইনজীবীদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়, তাই এখানে বিশ্বাসের কোন প্রশ্ন নেই; বরং মুসলিম আইনের নির্দেশ অনুযায়ী ঈমানদারের পক্ষে বাধ্যতামূলক বাহ্যিক ভক্তি প্রদর্শন বা ইবাদতের মধ্য দিয়ে দেহের যেসব কার্যকলাপ সূচিত হয় সেই প্রশ্নই এখানে সংশ্লিষ্ট। এসব মৌলিক নির্দেশকে 'আল্লাহ্র অধিকার' বলা হয়, কারণ এগুলির বিষয়বস্তু হচ্ছে স্রষ্টার প্রতি মানুষের কর্তব্য। ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর তা নির্ভর করে না।
কিন্তু মানুষ বলতে কেবল আত্মা বোঝায় না, দেহও বোঝায়। তাই তার পার্থিব অস্তিত্বের প্রয়োজন মেটাতে হয়। এখানেই সামাজিক জীবনের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ সত্য নিহিত। দুররাল মুখতার-এ বলা হয়েছে, 'মানুষ স্বভাবত একটি রাজনৈতিক জীব।' কারণ অন্যান্য প্রাণীর ন্যায় সে এককভাবে বাঁচতে পারে না। তার জন্য সাহায্য ও সহচর জীবদের সমাজের প্রয়োজন। কিন্তু বিভিন্ন ব্যক্তির সহজাত প্রবণতা বিভিন্ন ধরনের, তাদের প্রয়োজন অনেক এবং পৃথক ও সমষ্টিগতভাবে তাদের কার্যক্ষমতা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। মানুষ তার সঙ্গীদের সাহায্য কামনা করতে বাধ্য হয়। তাই বহুমুখী ও জটিলতা পূর্ণ স্বার্থ সম্পর্ক ও আদান প্রদানের উদ্ভব হয়। এগুলিই হচ্ছে সমাজের মূল ও প্রধান উৎস এবং এর হাতিয়ার হচ্ছে অর্থ। প্রাচীন গ্রীক ধ্যান-ধারণার প্রভাব কতো গভীর ও সুদূরপ্রসারী উপরোক্ত উদ্ধৃতি থেকে তা আমরা সহজে অনুমান করতে পারি। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে আমরা অর্থের ভূমিকায় এই প্রভাব লক্ষ্য করতে পারি। এই অর্থ ব্যবস্থা 'দিমাশকী'-তে বিকাশ লাভ করেছে এবং তা কিছুটা ডাইজেস্ট-এর ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনীয়।
সামজিক জীবন থেকে উদ্ভূত সম্পর্কসমূহ সুস্পষ্ট আইনের উৎস ও যথাযথ বিষয়। পুনরুৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা থেকে যৌন মিলন ও পরিবার গঠনের উদ্ভব হয়। অতএব বিবাহ থেকে আইনগত সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন ধরনের পেশা এবং ব্যক্তি বিশেষের বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ও আদান প্রদানের এমন এক জাল সৃষ্টি করে যাকে আইন শাস্ত্রবিদরা সাধারণভাবে আইনগত কার্যকলাপ রূপে উল্লেখ করেন। এগুলি আমাদের দেওয়ানী ও বাণিজ্যিক আইনের অনুরূপ। কিন্তু মুসলিম আইন ব্যবস্থায় রোমান আইনের ন্যায় এগুলিকে বিভিন্ন শাখায় পৃথক করা হয়নি। ব্যক্তি বিশেষের মৃত্যুতে উত্তরাধিকারের প্রশ্ন দেখা দেয় এবং এটি পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও বাটোয়ারা সংক্রান্ত বিধি দ্বারা পরিচালিত হয়। সর্বশেষে সামাজিক শৃংখলা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা থেকে একটি দণ্ড বিষয়ক ব্যবস্থার উদ্ভব হয়। এ বিষয়টি পরবর্তীকালে আরো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হবে।
আইন একটি সামাজিক ব্যাপার। এর একটি দিক সমাজের সঙ্গে এবং অপরদিক ব্যক্তি বিশেষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যা কিছু ব্যক্তিগত স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় তা আল্লাহ্র অধিকার হিসাবে গণ্য। কারণ ইসলামী ধারণায় আল্লাহ প্রাচীন সিভিটাস-এর ধারণার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। স্বাধীনতা, পৃষ্ঠপোষকতা, বিবাহ, আত্মীয়তা, সুদ নিষিদ্ধকরণ এবং দণ্ডবিষয়ক আইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিধিসমূহ আল্লাহর অধিকারভুক্ত। এই বিধিগুলিকে উপেক্ষা করা যায় না, কারণ এগুলি সাধারণের কল্যাণ, অথবা বলা যায় সাধারণের শান্তি-শৃংখলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর এগুলি নির্ভরশীল নয়। অন্য শ্রেণীর সম্পর্কগুলি ব্যক্তি বিশেষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত ব্যাপার। এগুলি মানুষের অধিকার হিসাবে অভিহিত। আইনের মৌল ভিত্তি হিসাবে স্বাধীনতা থেকে শুরু করে মুসলিম আইন বিশেষজ্ঞগণ একটি দ্বৈত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন:
১. স্বাধীনতার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই তার সীমা নিহিত, কারণ সীমাহীন স্বাধীনতার অর্থ আত্মবিনাশ--আর এই সীমাই হচ্ছে বৈধ আদর্শ বা আইন।
২. কোন সীমাই স্বৈচ্ছাচারমূলক নয়, কারণ এর উপকারিতা দ্বারা কিংবা ব্যক্তি বিশেষের বা সমাজের সর্বাধিক কল্যাণ দ্বারা এটি নির্ধারিত হয়। উপকারিতা আইনের ভিত্তি এবং এটি নিজেই তার সীমা ও বিস্তৃতি খুঁজে নেয়।
এসব মূলনীতির বাস্তব দিক উপলব্ধি করার জন্য আমরা বিভিন্ন আইনগত নিয়মবিধির ওপর দৃষ্টি বুলাতে পারি। পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসাবে মানুষকে এমন এক ব্যক্তিত্ব দেওয়া হয়েছে যা অধিকার এবং কর্তব্য উভয়টি সম্পর্কেই অনুভূতিশীল। এগুলির মধ্যে প্রধান হচ্ছে ব্যক্তিবিশেষ হিসাবে মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার অধিকার। স্বাধীনতা প্রত্যেক লোকের জন্মগত অধিকার। দাসত্ব এই বিধির একমাত্র ব্যতিক্রম। 'আদম ও হাওয়া স্বাধীন ছিলেন', এই বক্তব্য থেকে আইন শাস্ত্রবিদগণ বিভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছেন:
ক. যে পরিত্যক্ত শিশুর মর্যাদা অজ্ঞাত তাকে স্বাধীন মনে করা হয়;
খ. যে স্বাধীন লোককে ক্রীতদাস হিসাবে দাবি করা হয় তার বিরুদ্ধে আইনত স্বাধীনতার বিপরীত প্রমাণ প্রদর্শিত না হওয়া পর্যন্ত সে প্রাথমিকভাবে তার স্বাধীনতা প্রমাণ করতে বাধ্য নয়;
গ. সন্দেহের ক্ষেত্রে অনুমান স্বাধীনতার পক্ষে। স্বাধীনতার অর্থ আত্ম-পরিচালনা। সর্বপ্রকার মানবিক অস্তিত্বের সর্বময় কর্তা আল্লাহ ছাড়া স্বাধীন লোকের আর কোন প্রভু নেই। সে একমাত্র তাঁর কাছেই বশ্যতা স্বীকার করবে। তাই স্বাধীনতা খুশিমত ভোগ করা যায় না। এমনকি স্বতঃস্ফূর্তভাবে দাসত্বের স্বীকৃতিও আইন বৈধ হিসাবে স্বীকার করে না। একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আইন আত্মহত্যা নিষিদ্ধ করে এবং ধর্ম তা অনুমোদন করে না।
মালিকানা স্বত্বের মতবাদের ক্ষেত্রেও একই মূলনীতি ও পদ্ধতিগুলি প্রযোজ্য। সম্ভাবনার দিক দিয়ে যেকোন লোক যেকোন জিনিসের অধিকারী হতে পারে, কারণ মানুষের ভোগ করার জন্যই পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। সম্পত্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আল্লাহ এই অধিকারের একটি সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এমনিভাবে প্রত্যেক লোক জানতে পারে যে, সম্পদের সাধারণ ভাণ্ডার থেকে আল্লাহ তার জন্য কতোটা নির্ধারণ করেছেন। এমনিভাবে সামাজিক শৃংখলা বজায় রাখা হয়। কিন্তু একথা মনে করা ভুল হবে যে, অধিকার হিসাবে সম্পত্তি সীমাহীন। নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই অধিকারের সীমা এবং প্রয়োজনের সমাপ্তি নিহিত। মানুষ যাতে তার অস্বিত্ব বজায় রাখতে পারে সেজন্যই তাকে পার্থিব ধনসম্পদ দেওয়া হয়। অর্থাৎ এসব সম্পদ উদ্দেশ্যহীনভাবে কিংবা নিজের খেয়াল অনুযায়ী অপচয় না করে যাতে কাজে লাগান হয় সেটিই হচ্ছে উদ্দেশ্য। কুরআন ও হাদীসের নির্দেশ অনুযায়ী মুসলিম আইন রোমান আইনের জাস উটোণ্ডি এট আবটেণ্ডি উপক্ষো করে, প্রকৃত প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় না হলে সম্পদের যে কোন ব্যবহারকে এক ধরনের অপচয় হিসাবে অভিহিত করে এবং যেকোন অপ্রয়োজনীয় উপভোগকে পাপ মনে করে। ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে অপব্যয় এক ধরনের মানসিক রোগ যা আইনগতভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত। এটি ধনসম্পদের ব্যবহারে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে মিতাচারের তাগিদ দেয়, কারণ এটিই হচ্ছে আইনের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে এবং যে উদ্দেশ্যে আল্লাহ মানর জাতিকে তার সম্পদ দান করেছেন সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে অত্যন্ত সঙ্গতিপূর্ণ।
চুক্তি সংক্রান্ত ক্ষমতার ক্ষেত্রেও অপরূপ বৈশিষ্ট্যসমূহ দেখা যায়। প্রত্যেক লোকই কোন বাধ্যবাধকতায় যেতে এবং অন্যদের বাধ্যবাধকতার আওতাভুক্ত করতে সক্ষম, কারণ নিজস্ব অস্তিত্বের মাধ্যমেই তাকে এই বৈধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই দুর্বোধ্য কর্মক্ষমতারও সীমা আছে এবং তা বিষয়টির স্বার্থ বা উপকারিতা দ্বারা নির্ধারিত হয়। শিশুদের এবং মানসিক রোগ, অমিতব্যয়িতা, অসুস্থতা বা দেউলিয়াত্বের দরুন মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের চুক্তির ওপর আরোপিত বিভিন্ন বিধি-নিষিধের মাধ্যমে এই সীমা প্রকাশ করা হয়েছে। এসব সীমাকে সাধারণত বন্ধন বা শৃংখল বলা হয়। অক্ষমের সম্পত্তিকে তার অক্ষমতার পরিণাম থেকে রক্ষা করার জন্য আইনের উদ্দেশ্য থেকেই এগুলি আরোপ করা হয়েছে। একইভাবে প্রত্যেক লোক সে অন্যের অসুবিধা সৃষ্টি করছে কিনা সে কথা বিবেচনা না করে নিজের অধিকারকে কাজে লাগাতে পারে, কারণ প্রত্যেক অধিকারের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তির সুযোগ আদায়। কিন্তু নিজস্ব সুযোগ আদায়ের এই ক্ষমতারও সীমা আছে এবং তা দ্বিবিধভাবে প্রকাশ করা হয়েছে: ক. কোন লোকই নিজের কোন লাভ ছাড়া অন্যদের ক্ষতিগ্রস্ত করার একমাত্র উদ্দেশ্যে অধিকার প্রয়োগ করতে পারে না; খ. অধিকার আদায় করতে গেলে অন্যরা যদি সীমার বাইরে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে নিজের কল্যাণের জন্যও সে অধিকার প্রয়োগ করতে পারে না। সমগ্র ব্যবস্থার প্রত্যেকটি অংশের ক্ষেত্রেই এই বিধি প্রযোজ্য। দৃষ্টান্তস্বরূপ কন্যাদের ওপর পিতার কর্তৃত্ব, ক্রীতদাসের ওপর প্রভুর অধিকার, স্ত্রীর ওপর স্বামীর অধিকার এবং প্রতিবেশী সুলভ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই বিধি প্রযোজ্য। সবগুলি ক্ষেত্রে যে যুক্তিযুক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় তা সবসময় একই: একবার মূলনীতি প্রতিষ্ঠিত হলে আইন কর্তৃপক্ষ একটি সীমা নির্ধারণে সতর্ক থাকেন। অন্যথায় আইন সাহায্য করার পরিবর্তে মানবজাতির শত্রু হতে পারে।
একজন মুসলমানের জীবনের খুঁটিনাটি ব্যাপার থেকে শুরু করে তার নৈতিক ও সামাজিক অস্তিত্বের মূলনীতি পর্যন্ত প্রতিটি অংশের জন্য বিভিন্ন বিধি সম্বলিত এই ব্যবস্থাকে শরীয়ত বলা হয় এবং প্রত্যেক ঈমানদারকে তা অবশ্যই অনুসরণ করতে হয়। এখান থেকেই আইন-বিজ্ঞান গুরুত্ব লাভ করেছে। মূলত ধর্মীয় বিজ্ঞান হিসাবে এটি ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত এবং যারা এর চর্চা করেন তাঁদের অত্যন্ত বিজ্ঞ হিসাবে সম্মান করা হয়। হানাফী সংজ্ঞা থেকে এর তাৎপর্য উপলব্ধি করা যায়: 'আইন বিজ্ঞান হচ্ছে অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞান, যার দ্বারা মানুষ পৃথিবীতে ন্যায়ানুগ জীবন যাপনে সক্ষম হয় এবং নিজেকে ভবিষ্যত জীবনের জন্য তৈরি করতে পারে।' রোমান আইনশাস্ত্রবিদরা 'রিরাম হিউম্যানারাম আক্ ডিভাইনারাম সায়েনশিয়া' বলতে নিজেদের অনুসৃত পন্থা সম্পর্কে যা বোঝাতে চেয়েছেন এখানে তা আরো যথার্থতার সঙ্গে প্রযোজ্য।
শাসক আইনের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ: আইনের ন্যায়ই তিনি অপরিহার্য। আমরা দেখেছি যে, আইন মানব সমাজ ও মানুষের সামাজিক স্বভাবের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি বাস্তব সামাজিক ব্যাপার কিন্তু মানুষ স্বভাবত সামাজিক হলেও দুর্ভাগ্যবশত ভালো জীব নয়। 'মানুষ পরস্পরের শত্রু'। তাদের যদি তাদের সহজাত হিংসা ও লোভের অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলে তারা পৃথিবীকে সম্পূর্ণ তছনছ করবে। আইন মানুষের দুষ্ট প্রকৃতির বিরুদ্ধে একটি স্থায়ী সংগ্রাম। একজন রক্ষক না থাকলে আইন নিছক ফাঁকা বুলিতে পর্যবসিত হবে।
মানুষের কল্যাণের জন্য যেসব কারণে মানুষের কার্যকলাপ সীমিত হওয়া উচিত সেই একই কারণে এও অত্যাবশ্যক যে, তাদের পরিচালিত করার জন্য একজন শাসক থাকা উচিত, যিনি প্রয়োজন বোধে তাদেরকে আনুগত্যে বাধ্য করবেন। অতএব আল্লাহ একজন শাসক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এবং তার আদেশসমূহ পালনের নির্দেশ প্রদানের মাধ্যমে আইনের আওতাকে পূর্ণাঙ্গতা দান করেছেন। কেবলমাত্র আল্লাহই সর্বোচ্চ ক্ষমতা অর্পণ করতে পারেন। কারণ কোন মানুষই মানুষ হিসাবে তার সহচরদের ওপর শাসন ক্ষমতার অধিকারী নয়। মানুষের মধ্যে পিতা ও সন্তান, শিক্ষক ও ছাত্র, প্রভু ও ভৃত্য, শাসক ও প্রজা প্রভৃতি সব রকমের কর্তৃত্বের একমাত্র ভিত্তি হচ্ছে সেই আল্লাহ্ ইচ্ছা যিনি সব ক্ষমতার উৎস এবং যিনি কিছু কিছু লোককে অন্যদের কল্যাণের জন্য বিভিন্ন পরিমাণে সেই ক্ষমতা অর্পণ করেন। 'আল্লাহ্ রাজা করেন এবং আল্লাহ তাদের ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করেন।'
নেতা ও তাঁর নির্দেশসমূহের প্রতি আনুগত্য প্রতিষ্ঠা একটি ধর্মীয় কর্তব্য এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের জন্য অত্যাবশ্যক। কারণ সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত কোন ক্ষমতা না থাকলে কোন মানব সমাজ এবং কোন ধর্ম থাকতো না। সেটি নিয়ম-শৃংখলা বিরোধী ও বিপথগামী লোকদের এমন একটি আখড়া হতো যেখানে ঈমানের সর্বোচ্চ স্বার্থসহ যেসব জিনিস জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলে তার সবকিছুই বিলুপ্ত হতো। কেননা জীবনের এসব জিনিসের ভিত্তি প্রত্যেকের এবং সকলের জন্য শান্তি-শৃংখলা ও নিরাপত্তার উপর প্রতিষ্ঠিত। 'রাজা রাষ্ট্রীয় মণ্ডপের প্রধান স্তম্ভ'। তাই এ ধরনের একজন নেতা প্রতিষ্ঠা একটি ধর্মীয় কর্তব্য। প্রয়োজনীয় গুণাবলীসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলমানেরই এই কর্তব্যবোধ থাকা উচিত। এই কর্তব্য পরিহার করার অর্থ ঈমানদার সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। 'ঈমান ছাড়া যিনি মৃত্যু বরণ করেন তার মৃত্যু পৌত্তলিকের মৃত্যু।'
এই যুক্তিতে একই সময়ে কেবল একজন নেতাই নেতৃত্ব করতে পারেন: ক. কারণ স্বর্গীয় আইনের একত্ব যিনি সে আইন বলবৎ করবেন সেই নেতারও একত্ব চায়; খ. কারণ নেতার কর্তৃত্ব যদি একাধিক লোকের হাতে যায় তাহলে সামাজিক শৃংখলা বজায় থাকতে পারে না- আল কুরআন বলেন, 'যদি একাধিক আল্লাহ থাকতেন তাহলে বিশ্বজগৎ ধ্বংস হয়ে যেত'। এই এক নেতার নিজস্ব দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় নৈতিক ও দৈহিক গুণাবলী থাকতে হবে, যেমন: স্বাধীনতা-খলীফা একজন ক্রীতদাস হতে পারেন না, কারণ যিনি নিজেকে অবাধে প্রয়োগ করতে পারেন না তিনি একজন নেতার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেন না; পুরুষ- কারণ হাদীসে বলা হয়েছে, 'যে জাতির নেতা মহিলা সেজাতি সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে না'; বিধি সংগত সক্ষমতা অর্থাৎ বয়ঃসন্ধি ও নৈতিকক্ষেত্রে ত্রুটিমুক্তি; দৈহিক সুস্থতা অর্থাৎ যেসব দৈহিক অপূর্ণতা তাঁর দায়িত্ব সম্পাদনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে সেগুলি থেকে মুক্তি; স্বর্গীয় আইনের জ্ঞান- এই জ্ঞান কতদূর থাকতে হবে সে সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে-শান্তি ও যুদ্ধের সময়ে তার ওপর অর্পিত স্বার্থসমূহ সংরক্ষণের জন্য বিচক্ষণতা ও সাহস; নৈতিক জীবন, যা স্বর্গীয় আইন ও মুসলিম নীতিশাস্ত্রের নির্দেশসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ; সর্বশেষে উদ্ভব, অর্থাৎ কুরাইশ বংশোদ্ভূত হওয়ার ব্যাপার। মহানবী কুরাইশ উপজাতি থেকে এসেছেন। আরব পরিবারগুলির মধ্যে তাদের প্রাধান্য প্রাচীনকাল থেকে স্বীকৃত এবং তা ধীরে ধীরে প্রবাদবাক্যে পরিণত হয়। এতদ্বারা একথা বোঝায় না যে, এই উপজাতির কোন বিশেষ শাখার ওপর ক্ষমতা ন্যস্ত করতে হবে: এই অদ্ভুত বিধিনিষেধের মূল উদ্দেশ্য ছিল যে, খলীফাকে রক্ত সম্পর্কের দিক দিয়ে আরব জাতিভুক্ত হতে হবে। অতএব খিলাফত কোন বিদেশীর হাতে যাক এটি মূলনীতির বিরোধী, এবং পরবর্তীকালের খিলাফত অবৈধ হওয়ার পিছনে এটি অন্যতম কারণ।
এসব অবশ্য প্রয়োজনীয়তা নির্দেশিত হওয়ার পর একথা পরিষ্কার যে, মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য একজন নেতা নির্বাচন কোন সুযোগ বা হিংসাত্মক কার্যকলাপের ওপর ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে না বরং ঐসব উৎকৃষ্টতম গুণের যথাযথ প্রতিফলনের ভিত্তিতেই নেতা নির্বাচন করতে হবে। অতএব, সমগ্র মুসলিম জাতি নির্বাচক মণ্ডলী হতে পারে না। কেবল তারাই নির্বাচক হবেন যারা নিজেদের সংস্কৃতি, সামাজিক মর্যাদা, পার্থিব ব্যাপারে অভিজ্ঞতা ও নৈতিক চরিত্রের দরুন বিচারক হওয়ার উপযুক্ত। 'অসি ও মসীর অধিকারী ব্যক্তিদের' তথা উল্লেখযোগ্য সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিদের ওপর নির্বাচকের দায়িত্ব অর্পিত হবে। তাদেরকেই 'বন্ধন করার ও বন্ধন মুক্ত করার' তথা সমগ্র সম্প্রদায়ের নামে এরূপ চুক্তি সম্পাদন করার ক্ষমতা দেওয়া হয় যার ওপর রাজার ক্ষমতা এবং তাঁর প্রজাদের কাছ থেকে আনুগত্য নির্ভরশীল। আইন অনুযায়ী নির্বাচন এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে জনসাধারণ, কিংবা তাদের পক্ষে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিগণ তাদের মনোনীত ব্যক্তির ওপর সর্বোচ্চ ক্ষমতা অর্পণ করেন। এটি হচ্ছে চুক্তির প্রস্তাব যা নির্বাচিত ব্যক্তি গ্রহণ করার পর বাধ্যতামূলক চুক্তিতে পরিণত হয়।
হিজরীর প্রথম শতকে রীতি অনুসারে খলীফা নির্বাচনের অন্য একটি পন্থা প্রবর্তিত হয় ক্ষমতাসীন খলীফা কর্তৃক একজন উত্তরাধিকারী নিয়োগ। এ ধরনের নিয়োগ চুক্তির প্রস্তাবের সমতুল্য। নিয়োগের প্রস্তাব গৃহীত হলে তা চুক্তিতে পরিণত হয়। চুক্তিটি যেভাবে সম্পন্ন করা হয় তাকে বায় আহ্ বলা হয়। এই শব্দটি দ্বারা ইতিপূর্বে কোন ক্রয়-বিক্রয়ের কাজ সুসম্পন্ন করা বোঝাতো। বায়'আহ চিরাচরিত করমর্দনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতো। হযরত আবূ বকর (রা)-এর সময় থেকে এই করমর্দন নির্বাচিত ব্যক্তির সম্মতির প্রতীক ছিল।
পদে অভিষিক্ত হওয়ায় সম্মতি জ্ঞাপন করে খলীফা নিজের জন্য এরূপ বাধ্যবাধকতা মেনে নেন যে, তিনি স্বর্গীয় আইনে নির্দেশিত সীমার মধ্যে তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। এটিই হচ্ছে তার প্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য, কারণ মানব জীবনের উদ্দেশ্য এই পার্থিব জগতের স্বার্থ নয়, যা ব্যর্থ ও অর্থহীন এবং দুর্নীতি ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যার সমাপ্তি, বরং ঈমানই সত্যিকারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত যা মানুষকে অনন্ত জীবনে পরিচালিত করে। খলীফা ইসলামের পার্থিব স্বার্থসমূহ সংরক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যেমন সীমান্ত রক্ষা, অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা, আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সরকারী সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা এবং ন্যায় বিচারের ব্যবস্থা। এই দ্বিবিধ দায়িত্ব সম্পাদন করতে গিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতা মহানবীর প্রতিনিধি লোকাম টেনেন্স্ হিসাবে কার্যকরভাবে সক্রিয় হন।
মহানবী (সা)-এর উত্তরাধিকারিগণ যে আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যে তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন তার উত্তরাধিকারী ছিলেন না। বস্তুত তাঁরা মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও পার্থিব স্বার্থ-সমূহের উন্নতি বিধানে মহানবীর অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার দায়িত্বে নিযুক্ত প্রতিনিধি ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না। তাঁরা নিজেরাও এটাই দাবি করতেন। হযরত আবূ বকর 'আল্লাহ্র প্রতিনিধি' উপাধি গ্রহণে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন এবং তিনি 'আল্লাহ্ নবীর প্রতিনিধি' উপাধি গ্রহণ করেই সন্তুষ্ট থাকেন। পরবর্তীকালে হযরত 'উমরের সময় আমিরুল মু’মিনিন উপাধি প্রচলিত হয়। এই উপাধিতে সর্বময় ক্ষমতার প্রতিনিধির সংজ্ঞা আরো প্রকৃষ্টভাবে ব্যক্ত হয়েছে। এই সংজ্ঞা অনুসারে তিনি সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী নন, বরং শব্দটির মূল তাৎপর্য অনুসারে একজন শাসক।
ইমাম নামটি দ্বারা যথাযথভাবে অ্যান্টিস্টেস বোঝায়। তিনি নামাযের পরিচালক। এতদ্বারা সব সময় শাসকের সর্বোচ্চ অধিকারমূলক পদ বোঝায়। তাঁর ধর্মীয় পদ অন্যান্য সবরকমের ক্ষমতার উৎস। ইসলামের ধর্মীয় অনুশাসনমূলক আইন অনুযায়ী এগুলি হচ্ছে বিচার, ধর্মযুদ্ধ এবং শুল্ক নিয়ন্ত্রণ। লেখকরা কোন প্রকার বিশ্লেষণ ছাড়া যখন ইমামের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন তখন তাঁরা এতদ্বারা ক্ষমতার সর্বোচ্চ উৎস রাষ্ট্রের শাসক বোঝান, যার নামে সর্বপ্রকার সরকারী কার্যক্রম সম্পাদিত হয়। এসব সরকারী কার্যক্রমের কোনটিই কোন কোন কর্তৃপক্ষের ন্যায় খলীফাকে ধর্মগুরুর বা পবিত্র বৈশিষ্ট্য দান করে না।
সত্যিকার ব্যাপার হচ্ছে যে, খলীফা ধর্মীয় নেতা হিসাবে প্রধান পুরোহিত বা ধর্মগুরু নন: তাঁর কোন প্রকার যাজকীয় বৈশিষ্ট্য নেই, কারণ ইসলামে কোন পুরোহিততন্ত্র কিংবা নবীসুলভ উত্তরাধিকার নেই। রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে তিনি প্রভুও নন। খিলাফত সাধারণের কল্যাণের জন্য স্বর্গীয় আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কোন পদ নয়। এটি কল্যাণমূলক কাজ, রক্ষণ এবং পবিত্র আইন বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে জনসাধারণের একটি জিম্মা।
খলীফাকে প্রায়ই মেষপালকের সঙ্গে তুলনা করা হয় এবং তিনি তার চারপাশে সমবেত মেষপালের ঐক্যের প্রতীক। মেষপালক যেমন তার মেষপাল দেখাশোনা করেন এবং শিক্ষাগুরু যেমন তার শিষ্যকে সাহায্য করেন তেমনি একটি সংস্থা হিসাবে অক্ষম মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষা ও যত্নের জন্য শাসক নিয়োগ করা হয়। তিনি ঈমানদার সম্প্রদায়ের তত্ত্বাবধায়ক। একজন শাসক অবশ্যই তাঁর সম্প্রদায়ের কল্যাণ কামনা করবেন, কারণ এই উদ্দেশ্যেই জনসাধারণের ওপর শাসক প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই মূলনীতি থেকে তার কার্যকলাপ জনসাধারণের বৈধতা ও সীমা লাভ করে। তত্ত্বাবধায়ক তার প্রভুর কাছে তিনি যা করেছেন তার সত্যিকার হিসাব নিকাশ দিতে বাধ্য, তেমনি খলীফাও আল্লাহ্র কাছে হিসাব নিকাশ দিতে বাধ্য। আবূ ইউসুফ খলীফা হারুনুর রশীদকে লেখেন, 'যে মেষপালকে আপনার জিম্মায় দেওয়া হয়েছে তাদের তত্ত্বাবধান করার জন্য আমি আপনাকে উপদেশ দিচ্ছি.... যেহেতু মেষপালককে তার অধীনে ন্যস্ত মেষপালের হিসাব নিকাশ দিতে হয়, তাই প্রভু আপনার কাছ থেকে হিসাব নিকাশ চাইতে পারেন।'
জামা'আহ, ইমাম—এই দু'টি সহজ কথার মধ্য দিয়ে ইসলামের সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে এর ধারণা সংক্ষেপে প্রতিফলিত হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বমূলক ও নির্বাহী ক্ষমতা খলীফার মধ্যে কেন্দ্রীভূত এবং তাঁর কাজ হচ্ছে আইন যখন সুস্পষ্ট এবং বিধিসম্মত তখন সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করা। এক্ষত্রে এটির সামান্যতম পরিবর্তনের ক্ষমতাও তার নেই। যথাযথভাবেই তাকে তা প্রয়োগ করতে হবে। দৃষ্টান্তস্বরূপ আইন কখনো কোন বিচারককে দণ্ড স্থগিত রাখার ক্ষমতা দেয় না। যেসব ক্ষেত্রে কোন সুনির্দিষ্ট বিধি নেই সেখানে তার স্বাধীনতা কার্যত সীমাহীন। কারণ তিনি কোন সাধারণ প্রতিনিধি নন, তিনি তত্ত্বাবধায়ক। তাই আইনের বাস্তবায়ন তার বিচার শক্তির ওপর নির্ভরশীল। বিচারের ক্ষেত্রে এই স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা ছাড়াও জনসাধারণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বহু ব্যাপারে তার স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা রয়েছে, যেমন যুদ্ধ পরিচালনা, যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ বন্টন, খাজনা ধার্য করা, সরকারী রাজস্বের বিধি ব্যবস্থা করা, সরকারী কর্মচারী নিয়োগ।
জনসাধারণের ক্ষেত্রে বায়'আহ গ্রহণের অর্থ তাদের নেতাকে অনুসরণ করার এবং তাঁর প্রতি অনুগত থাকার একটি অঙ্গীকার: 'ইমামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অর্থ আল্লাহ্ বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা', 'কৃষ্ণকায় ক্রীতদাস হলেও তোমাদের নেতার প্রতি অনুগত হও।' সাহায্যের কর্তব্য আনুগত্যের কর্তব্যের সঙ্গে যুক্ত এবং এটিতে যে ব্যক্তি অঙ্গীকারমূলক শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন তিনি তার নেতার কর্তৃত্বের ওপর কিংবা মুসলমানদের নিরাপত্তার ওপর শত্রুর হামলার বিরুদ্ধে সাহায্য করার জন্য নেতা আহবান জানালে তাতে সাড়া দিতে বাধ্য।
এসব কর্তব্যের একমাত্র সীমা হচ্ছে দৈহিক বা নৈতিকভাবে সাহায্য প্রদানে অসম্ভব পরিস্থিতি। যখন কোন আদেশ মানুষের ক্ষমতা বহির্ভূত হয় কিংবা সুস্পষ্টভাবে স্বর্গীয় বিধানের পরিপন্থী হয়, যেমন শাসক যদি কাউকে হত্যা করার, ব্যভিচার করার, মদ্যপানের কিংবা নামায পরিহারের নির্দেশ দেন তাহলে শাসকের কর্তৃত্ব স্থগিত অবস্থায় থাকে। হাদীসে বলা হয়েছে 'পাপের প্রতি কোন আনুগত্য নয়।' খলীফা যতদিন পর্যন্ত মুসলিম সম্প্রদায়কে রক্ষার দায়িত্ব পালনে উপযুক্ত ততদিন পর্যন্ত খলীফা ও জনগণের পারস্পরিক অঙ্গীকার অলংঘনীয়। যেসব বিষয়ে জনসাধারণের আশা করার অধিকার আছে তিনি সেগুলি দিতে ব্যর্থ হলে তাঁর কর্তৃত্বের অবসান হয় এবং আইনত চুক্তিও বাতিল হয়ে যায়। দৈহিক অক্ষমতা কিংবা কাফেরদের হাতে বন্দী হওয়ার ন্যায় কোন পরিস্থিতিতে স্বাধীনতা না থাকার দরুন এই পরিবর্তন ঘটতে পারে।
খিলাফতের যে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হলো তাতে গোঁড়াপন্থী আইনশাস্ত্রবিদদের রাজনৈতিক পরিকল্পনা সূচিত হয়েছে। একে 'নবীসুলভ খিলাফত' আখ্যা দেওয়া হয়, যা সর্বোচ্চ ক্ষমতার একমাত্র বৈধরূপ। তাদের মতে মহানবীর প্রথম চারজন উত্তরাধিকারীর শাসনকাল ইসলামের স্বর্ণযুগ। এই চারজন খলীফাকে খুলাফায়ে রাশিদীন বলা হয়। ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন যে, এই সময়ের পর থেকে ইসলাম তার মূলনীতি থেকে সরে পড়ে এবং তার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। সত্যিকারের খিলাফতের স্থলে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি নিছক ক্ষমতা ও 'তলোয়ারের শাসন' যার সঙ্গে ধর্মীয় আইনের কোন সম্পর্ক ছিল না। বিভিন্নভাবে কথিত মহানবীর একটি হাদীসে বলা হয়েছে, 'আমার পরে আমীরগণ আসবেন, তাদের পরে রাজারা এবং তাদের পরে অত্যাচারীরা।' এই হাদীসে নিষ্ঠাবান মুসলমানদের দৃষ্টিতে খিলাফতের সংক্ষিপ্ত রূপ তুলে ধরা হয়েছে এবং তা মোটামুটিভাবে ইতিহাসের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বস্তুত ইসলামী আইনশাস্ত্রবিদগণ যে খিলাফতের কল্পনা করতেন বাস্তবে কখনো তার অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু সূচনায় প্রথম দু'জন খলীফার আমলে তাদের কল্পনা প্রায় বাস্তবায়িত হয়েছিল, এবং পরিস্থিতি যদি অনুকূল হতো তাহলে উত্তম সরকারের বীজ অঙ্কুরিত হতে পারতো। কিন্তু মুসলমানদের প্রথম পুরুষ শেষ হতে না হতেই বিরাট রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োজন এবং আরবদের দুর্বিনীত স্বভাব একযোগে খিলাফতকে উমাইয়াদের আমলে প্রথমে ব্যক্তিগত শাসনে রূপান্তরিত করে। অতঃপর আব্বাসীয়দের আমলে তা পারস্যের মতো রাজতন্ত্রে পরিবর্তিত হয়। বাহ্যত গোঁড়াপন্থী হলেও ভেতরে ভেতরে আব্বাসীয়দের স্বৈরতন্ত্র, হানাহানি এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থা সাম্রাজ্যকে ধ্বংসের পথে টেনে নেয়।
হিজরীর তৃতীয় শতকে খিলাফতের স্থলে সুলতান-শাসনের প্রবর্তন হয় এবং এটি অতঃপর সম্পূর্ণ আলঙ্কারিক পদে পরিণত হয়। সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ থেকে যেসব সামরিক কর্তার আর্বিভাব হয় বাস্তব কর্তৃপক্ষ হিসাবে তারাই তাদের শাসন বলবৎ করে। প্রদর্শনীয়মূলকভাবে তাদেরকে বৈধতা অর্পণ করে বাগদাদের খলীফাকে সন্তুষ্ট থাকতে হতো। আইন শাস্ত্রবিদদের অপরিহার্য অবস্থান মেনে নিতে হয়। যতো কঠিন হোক প্রকৃত পরিস্থিতির যতোটা সম্ভব উন্নতি বিধানে তাঁরা সচেষ্ট হন। তারা এরূপ শিক্ষা দিতে শুরু করেন যে, স্বর্গীয় আইনের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলেও এবং পরিষ্কারভাবে হিংসাত্মক পন্থায় প্রতিষ্ঠিত হলেও নৈরাজ্য ও বেসরকারী হানাহানি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সরকার এখনো শ্রদ্ধা দাবি করতে পারে। এমনিভাবে শরীয়তের যে মূল লক্ষ্য সামাজিক শান্তি তা বজায় রাখার ব্যবস্থা করা হয়। ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞরা উপলব্ধি করেন যে, পুরনো পরিকল্পনা এতোটা উচ্চাশাপূর্ণ যে, তা বাস্তবে প্রয়োগ করা যায় না; অনেকেই স্বীকার করেন যে, ইমাম শারি'আহর বিধান অনুযায়ী সম্পূর্ণ নির্দোষ ব্যক্তি নাও হতে পারেন, খলীফার কুরাইশ বংশোদ্ভূত হওয়া অপরিহার্য নয়; এবং এমন কি একাধিক ইমামও থাকতে পারেন। বৈধভাবেই হোক আর কার্যতই হোক যিনি ক্ষমতাসীন ঈমানদারকে তার অনুগত হতে হবে। প্রকৃত ক্ষমতাসীন ব্যক্তি অত্যাচারী হতে পারেন কিংবা কেলেংকারিপূর্ণ জীবন-যাপন করতে পারেন, কিন্তু তাতে ঈমানদারের কিছুই করার নেই। 'ধৈর্যশীল হও, কাইসারের যা প্রাপ্য তা কাইসারকে দাও, যে পর্যন্ত সুবিচার না হয় সে পর্যন্ত অপেক্ষা করো।'
হিজরী পঞ্চম শতকে আল-গায্যালী তাঁর চিরাচরিত আন্তরিকতা সহকারে সমস্যাটি আলোচনা করেন। তিনি বলেন, 'আমরা যে স্বীকৃতি দিচ্ছি তা স্বতঃস্ফূর্ত নয়; কিন্তু প্রয়োজন নিষিদ্ধ জিনিসকে বৈধ করে। আমরা জানি যে, মৃত প্রাণীর মাংস ভক্ষণ করা হালাল নয়, কিন্তু না খেয়ে মারা যাওয়া তার চাইতেও খারাপ। যারা বলেন যে, খিলাফত চিরকালের জন্য মৃত এবং কোন কিছু তার স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না আমরা তাদের জিজ্ঞেস করতে চাই: যথাযথভাবে গঠিত কর্তৃপক্ষের অভাবে নৈরাজ্য ও সামাজিক জীবনের অবসান, এবং যে ধরনেরই হোক ক্ষমতাসীন সরকারকে স্বীকৃতি দান এই দু'টির মধ্যে কোনটি উত্তম? এই দু'টির মধ্যে আইন বিশেষজ্ঞদের শেষোক্তটিই গ্রহণ করতে হবে।'
১২৫৮ খৃস্টাব্দে মঙ্গোলরা বাগদাদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়, খলীফাকে হত্যা করে এবং সমগ্র আব্বাসীয় পরিবারকে ধ্বংস করে। রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে দীর্ঘকালব্যাপী মৃত খিলাফতের কার্যত পরিসমাপ্তি ঘটে। এই যুগের পর ইতিহাসে মিসর ছাড়া সর্বত্র কেবলমাত্র সুলতানের উল্লেখ আছে। মিসরে খাঁটি হোক আর কাল্পনিক হোক জনৈক আব্বাসীয় খলীফার উপাধি অব্যাহত রাখা হয়। মামলুক শাসকদের সুবিধার জন্যই এই ফাঁকা পুতুলটিকে রাখা হয়। ১৫১৭ খৃস্টাব্দে তুর্কীরা কায়রো অধিকারের পর এই বংশের সর্বশেষ চিহ্নটির সাক্ষাত পান। বলা হয়েছে যে, এই সর্বশেষ আব্বাসীয়র কাছ থেকে তুর্কী শাসকের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়। কিন্তু আদৌ হয়ে থাকলেও এই হস্তান্তরের আইনগত কোন মূল্য নেই। কারণ খিলাফত এমন কোন মালিকানাস্বত্ব নয় যে, ইচ্ছা করলেই হস্তান্তর করা যায়। বরং এটি মুসলমান সম্প্রদায়ের পক্ষে একটি জিম্মা। অতএব, ১৫৪৩ খৃস্টাব্দ থেকে খিলাফত প্রকৃতপক্ষে বিলুপ্ত হয়। দামেস্কের কাযী ইবনে জামা'আহ প্রকৃত অবস্থা ব্যক্ত করেন। 'যে পর্যন্ত না তার চাইতে শক্তিশালী অপর একজন তাকে বহিষ্কার করে ক্ষমতা দখল করেন সে পর্যন্ত ক্ষমতাসীন শাসকের শাসন করার অধিকার থাকে। শেষোক্ত ব্যক্তি একই উপাধিতে শাসন করবেন এবং একই যুক্তিতে তাকে স্বীকৃতি দিতে হবে, কারণ যতো আপত্তিকরই হোক একবারে না থাকার চাইতে একটি সরকার থাকা উত্তম। দু'টি মন্দ জিনিসের মধ্যে কম মন্দ জিনিস আমাদের গ্রহণ করা উচিত।' মরক্কোর আইন বিশেষজ্ঞরা নিম্নোক্ত প্রবাদের মাধ্যমে সংক্ষেপে বিষয়টি তুলে ধরেন: ক্ষমতা যার আনুগত্য তারই প্রাপ্য।
দণ্ড ব্যবস্থা সম্পর্কে বেশি কিছু বলার অবকাশ নেই। এই ব্যবস্থা হিব্রু আইনের ন্যায় একটি চোখের জন্য একটি চোখ, একটি দাঁতের জন্য একটি দাঁত এবং প্রতিশোধের আদিম ধারণার মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এতে কোন প্রকার কঠোরতা হ্রাস না করে বাইবেলের প্রাচীন আইনগত ধারণা অত্যন্ত আক্ষরিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এসব ধারণার একটি ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত মূল্য রয়েছে। পরবর্তীকালের ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞগণ, এমন কি আরবের আইন বিশেষজ্ঞগণও প্রগতিশীল ধ্যান-ধারণার পক্ষে কুরআনের আক্ষরিক ব্যাখ্যার বিরোধিতা করতে সাহস পাননি। তবে তাঁরা বিশ্লেষণ ও ভাষ্যের মাধ্যমে কুরআনের বক্তব্য বিষয়ের কঠোর প্রয়োগ লাঘবে সচেষ্ট হন।
অত্যন্ত ব্যাপক অর্থেও ইসলামের উত্তরাধিকার প্রশ্ন আলোচনা কি বাঞ্ছনীয় হবে? প্রচলিত মতামত অনুযায়ী প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আইনের একটি সাধারণ মিলনক্ষেত্র খুঁজে বের করার চেষ্টা অর্থহীন। অটল বিশ্বাসের সুদৃঢ় কাঠামোতে আবদ্ধ ইসলামী ব্যবস্থাকে আমাদের ফর্মূলার আওতায় আনা যায় না। একটি ধর্মীয় আইন হওয়ায় এটি আমাদের ধ্যান-ধারণার বিপরীত এবং সে অনুযায়ী এর উন্নতি বিধান করা অসম্ভব। এক্ষেত্রে দুটি পৃথক এলাকার মধ্যে সাধারণত বিভ্রান্তিকর অবস্থার সৃষ্টি করা হয়। এই ব্যবস্থা সম্পর্কে খৃষ্ট ধর্ম ও অন্যান্য ধর্মের ন্যায় ইসলামেও একটি বিশেষ ধর্ম বিশ্বাস রয়েছে যা এর সমর্থকগণের প্রকাশ্য আলোচনার বিষয়বস্তু হতে পারে না। কিন্তু এটিকে কঠোরতায় ভারাক্রান্ত করা সমীচীন হবে না, যেমনি সমীচীন হবে না খৃস্টানদের বিরুদ্ধে অনুরূপ অভিযোগ আনা। প্রত্যেক বড় বড় ধর্মীয় ব্যবস্থায় নিছক বিশ্বাসের বাইরেও কিছু কিছু জিনিস রয়েছে। সেন্ট টমাস আকিনাস অত্যন্ত ন্যায়ভাবেই বলেছেন : 'আইনের যে মূল লক্ষ্য সাধারণ মঙ্গল ব্যক্তি, ঘটনা ও যুগ অনুযায়ী তার বিভিন্ন রকমের বহু উৎস থাকে।' ইসলামের চিন্তাবিদগণ এই বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করেছেন। আল্লাহর প্রত্যাদেশের মূলনীতির সঙ্গে অ্যারিস্টটলের রাজনৈতিক মতবাদের সংমিশ্রণে আরব বিজ্ঞানে এমন একটি ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে যার সঙ্গে মধ্যযুগীয় খৃষ্ট ধর্মের রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণার কিছু কিছু সাদৃশ্য দেখা যায়। এগুলি স্বাভাবিক এবং আকর্ষণীয়। এগুলি সম্পর্কেই আমরা সংক্ষেপে আলোকপাত করবো।
আমরা দেখেছি যে, সমাজ একটি আবশ্যকীয় বাস্তব বিষয়। এটি কোন বিশৃংখলাপূর্ণ আখড়া নয়, বরং একটি সাধারণ উদ্দেশ্য ও পারস্পরিক সাহায্য-সহায়তার বন্ধনে গ্রথিত একটি সমষ্টি। এখান থেকেই রাষ্ট্রের সামাজিক ও নৈতিক ধারণার উদ্ভব হয়েছে: 'সরকারের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে ইহকালে সমৃদ্ধির পথে এবং পরকালে মুক্তির পথে পরিচালিত করা।' এই উদ্দেশ্যই আইন দ্বারা বাস্তবায়িত হয়েছে 'আইনের কাঠামো সমাজের কাঠামো দ্বারাই নির্ধারিত হয় এবং বস্তুত এখান থেকেই এর বৈধতার উদ্ভব।'
মুসলমানরা এর সূচনা যেভাবে প্রদর্শন করেছেন তা খৃস্টান মতবাদেরই অনুরূপ। ইতিহাসের প্রত্যুষে এমন এক মুহূর্ত ছিল যখন মানবজাতি একটি একক দল ছিল। অমঙ্গল সম্পর্কে অজ্ঞ থাকায় তারা স্বাভাবিক আইনের নির্দেশ অনুযায়ী একটি শান্তিপূর্ণ নৈরাজ্যে বাস করতো। কাবিল পাপ করার সঙ্গে সঙ্গে স্বর্ণযুগের অবসান হয়। মানুষের রিপুগুলি প্রবল হয়ে ওঠে এবং এটিতে সামাজিক বিশৃংখলার সৃষ্টি হয়, সত্যিকারের বিশ্বাস নষ্ট হয় এবং বিশেষ বিশেষ আইনের প্রবর্তন হয়। আইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে অমঙ্গল প্রতিরোধ, তার এই দু'টি প্রধান মূলনীতি: সাম্য ও শুভেচ্ছা।
১. সাম্য: মহানবী (সা) বলেছেন, 'সাদা লোক কালো লোকের ওপরে নয়, কিংবা কালো লোক পীত লোকের ওপরে নয়। তাদের স্রষ্টার কাছে সব মানুষই সমান। মুসলমানরা আল্লাহর চোখে সমান, একটি বিরাট পরিবারের সদস্য, যেখানে উচ্চ নীচ বলতে কেউ নেই। বরং সবাই ঈমানদার এবং সবাই আইনের দৃষ্টিতেও সমান। এবং এই সাম্য এমন এক সময়ে ঘোষণা করা হয় যখন সমগ্র খৃস্টান জগতে কার্যত এটি অজ্ঞাত ছিল।
২. সকলের জন্য সমান এই আইন শুভেচ্ছার ওপর প্রতিষ্ঠিত। মুসলমানদের অবশ্যই অঙ্গীকার রক্ষা করতে হবে। মালিকের সম্মতি ছাড়া কেউই অন্যের অর্থ-সম্পদ থেকে আর্থিক সুবিধা আদায় করতে পারে না। 'তোমার সততায় যাদের আস্থা আছে তাদের প্রতি সততা প্রদর্শন করো', যারা তোমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করো না'- এসব হাদীস এবং অন্যান্য আরো বহু হাদীস মুসলিম আইনের সাধারণ বিধির অন্তর্ভুক্ত। শুভেচ্ছার এই ধারণা আবশ্যিকভাবে নৈতিকতার অন্তর্ভুক্ত এবং এটিকে সার্বজনীন বৈশিষ্ট্যে উন্নীত করা হয়েছে। শুভেচ্ছার যে সামন্ততান্ত্রিক ও জার্মান ধারণা ব্যক্তিগত ভক্তি থেকে উদ্ভূত তার চাইতে এটি আমাদের মনে অধিক রেখাপাত করে। তাই এই ব্যবস্থাটি মানুষের ইচ্ছার ব্যাপকতর পরিসর সৃষ্টি করে এবং আক্ষরিক বক্তব্যের চাইতে মনোভাবের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করে। যেভাবেই প্রকাশিত হোক না কেন, মানুষের ইচ্ছা একটি বৈধ বন্ধন সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট। মুসলিম আইনে কোন কাজের বৈধতা বা অবৈধতা আকারের উপর কদাচিৎ নির্ভরশীল। এর সঙ্গে জার্মান পদ্ধতির সীমাহীন আনুষ্ঠানিক মাইনিউশিই তুলনীয়। আইন পণ্ডিতদের দৃষ্টিতে 'কনসেনসাস সোলাস অবলিগাট' বিধিটি মৌলিক।
সামাজিক কল্যাণের সুযোগ বিধানের ব্যবস্থা থাকায় মুসলিম আইন আমাদের নিজস্ব আইনের ন্যায় মূলত প্রগতিশীল। ভাষা ও যুক্তির সৃষ্টি হিসাবে এটি একটি বিজ্ঞান। এটি অপরিবর্তনীয় নয় এবং নিছক ঐতিহ্যের উপরও নির্ভরশীল নয়। বিখ্যাত আইন বিশেষজ্ঞ মহলগুলি এ ব্যাপারে একমত। হানাফীরা বলেন, 'আইনের বিধি অপরিবর্তনীয় নয়। এটি ব্যাকরণ ও যুক্তিশাস্ত্রের বিধিগুলির অনুরূপ নয়। এটি সাধারণত যা ঘটে তা প্রকাশ করে এবং যে অবস্থায় ঘটেছে সেই অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এটি পরিবর্তিত হয়।'
প্রয়োগের ব্যাপারে আইন পরিবর্তিত হতে পারে। মালিকী ও হানাফী পন্থীরা এ প্রশ্নেও একমত। 'প্রয়োজনীয়তাই আইনজীবীর বিধি।' এই নমনীয়তার কারণ আরবরা সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করে। এটি আবার প্রথাও বটে। সমাজসমূহ জীবন্ত সংস্থা এবং যতোদিন এগুলির অস্তিত্ব থাকে ততোদিন পরিবর্তনও অব্যাহত থাকে। 'হযরত আদমের সময় মানুষের অবস্থা ছিল দুর্বল ও শোচনীয়। বোন ভাইয়ের কাছে বৈধ ছিল এবং আল্লাহ অন্যান্য বহু ব্যাপারে প্রশ্রয় দেন। সমাজ যখন অধিকতর সম্পদশালী ও বহু সংখ্যক হয় তখন বিধি-নিষেধের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়।' ইসলামের ইতিহাসের ধারায় জীবনের এই অব্যাহত রূপ দেখা যেতে পারে।
আমরা দেখতে পাবো যে, মহানবী (সা)-এর সাহাবাগণ কোন বিধি নিষেধের অনুমোদন ছাড়াই প্রয়োজনীয়তার যুক্তিতে বিভিন্ন রকমের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, কোন নজীর দ্বারা ক্ষমতা প্রাপ্ত না হওয়া সত্ত্বেও তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, কুরআন লিপিবদ্ধ করতে হবে। তারা সরকারের বিভিন্ন শাখার জন্য পদ সৃষ্টি করেন, মুদ্রা তৈরি করেন, কারাগার নির্মাণ করেন। একই প্রয়োজনীয়তার যুক্তিতে আইন বৈধ সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ওপর কঠোর শর্ত আরোপ করে, যদিও হাদীসে তা দেখা যায় না।...এই কারণেই আইন প্রয়োজনীতা দেখা দেওয়ায় ঋণ প্রভৃতি চুক্তিসমূহের বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রদান করেছে।...'
মুসলিম আইন বিশেষজ্ঞগণ প্রচলিত রীতিকে যে বিরাট ক্ষমতা প্রদান করেছেন এগুলিই হচ্ছে তার মূল ভিত্তি। এটি এক ধরনের অলিখিত বিধি যার আইন প্রণয়নের ক্ষমতা, এমনকি পরিবর্তনের ক্ষমতাও রয়েছে। 'মুসলমানরা যা অনুমোদন করেন আল্লাহও তা অনুমোদন করেন। প্রয়োজনীয়তা যখন সামঞ্জস্যপূর্ণ ও স্থায়িত্বমূলক হয় এবং আইনের সাধারণ বিধির পরিপন্থী না হয় তখন আইনের ন্যায়ই তা ক্ষমতাবান এবং তা আইনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়।
হানাফীপন্থীরা বলেন, 'প্রয়োজনীয়তা কঠোর বিধি অনুযায়ী যা গ্রহণযোগ্য হতো না এমন বহু জিনিস পুনরায় গ্রহণযোগ্য করার পথ উন্মুক্ত করেছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, ঋণ গ্রহণকারীর সুবিধা বিধানের উদ্দেশ্যে বন্ধকের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আদিম যুগের অধিকাংশ অর্থনীতিতে সুদপ্রথা অত্যন্ত দ্রুত কঠোর শোষণমূলক চড়া সুদে রূপান্তরিত হতো বিধায় তাত্ত্বিকভাবে নিষিদ্ধ হলেও ঋণের ওপর লভ্যাংশ প্রকারান্তরে স্বীকৃত রীতিতে পরিণত হয়েছে। আরো উল্লেখ করা যেতে পারে, যেমন উৎপাদনের অংশের জন্য শ্রমিক নিয়োগ, দালাল বা শহরের ঘোষকের সঙ্গে চুক্তি। মুসলিম আইনের আক্ষরিক তাৎপর্য অনুযায়ী এসব কাজের অনিশ্চয়তার দরুন এবং এগুলিতে যে ক্ষতির ঝুঁকি আছে তার দরুন এগুলি বাতিল হওয়ার কথা। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আইনের দুটি গোড়াপন্থী মহল এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।
আইন কেবল রীতি গ্রহণই করে না এর পরিবর্তনসমূহও অনুসরণ করে। 'সাধারণ বিধি হচ্ছে যে, যেসব আইন প্রয়োজন বা রীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত সেগুলি রীতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। একদিকে একথা বলা যেতে পারেও আমাদেরকে যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা অনুসরণ করতে হবে, জ্ঞান না থাকায় এবং প্রয়োজনীয় কর্তৃত্ব না থাকায় আমরা আইন তৈরি করতে পারি না। আমাদের কাছে যেসব প্রশ্ন উত্থাপন করা হয় সেগুলির সমাধান বইতে যা পাওয়া যায় তার ভিত্তিতেই করতে হবে। কিন্তু অপরপক্ষে যেসব আইন প্রাচীন রীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেই রীতি একবার পরিবর্তিত হলে সেসব আইন প্রয়োগ করার অর্থ জনমতের বিরুদ্ধে যাওয়া। প্রকৃত সত্য হচ্ছে যে, যদি কোন আইন কোন বিশেষ যুগের রীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে যে অবস্থায় সেই আইনটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেই অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আইনটিরও পরিবর্তন করতে হবে।'
রাজা বা শাসকই হচ্ছেন এই পরিবর্তনের প্রধান উৎস। তিনি একজন জিম্মাদার, তাই প্রচলিত আইনকে তিনি তাঁর নিজস্ব কর্তৃত্বের স্থলাভিষিক্ত করতে পারেন না। কিন্তু তিনি একটি স্বীকৃত ব্যবস্থার স্থলে অপরটিকে গুরুত্ব প্রদান করতে পারেন। তিনি কোন রীতিকে এতোটা প্রচলিত করতে পারেন যাতে সেটি শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হয়। সর্বশেষে প্রয়োজন বোধে তিনি অবস্থার তাগিদে এমন সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন যা কল্যাণাশ্রয়ীদের পক্ষে একজন উত্তম জিম্মাদারের অবশ্যই করা উচিত। এতদ্বারা কি এ কথা বোঝায় যে, মুসলিম আইন বিকাশে ধর্মীয় ধারণার কোন অবদান নেই? চিন্তার যে শক্তিশালী ঐক্য ইসলামের প্রধান শক্তি সে সম্পর্কে এরূপ ধারণা অত্যন্ত ভুল হবে। আইন বিজ্ঞান ধর্মতত্ত্বের একটি অংশ মাত্র। এমন কি ধর্মতত্ত্ব সম্ভবত খৃষ্ট ধর্মের চাইতেও অধিক পরিমাণে নগরভিত্তিক রাষ্ট্রের ক্লাসিক্যাল ধারণাকে ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু এই বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে আমাদের ভুল পথে যাওয়া উচিত হবে না। বিষয়টির প্রতি গভীরতর দৃষ্টি প্রদান করে আমরা দেখতে পাবো যে, মুসলিম আইনশাস্ত্রবিদদের ব্যাখ্যা আমাদের নিজস্ব ব্যাখ্যার অনুরূপ। আল্লাহর অধিকার ও মানুষের অধিকারের মধ্যে যেটুকু পার্থক্য আছে তা হচ্ছে সরকারী আইন ও ব্যক্তিগত আইনের পার্থক্য।
ধর্মীয় ধারণার নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বিরাট এক প্রভাব রয়েছে, কিন্তু তা সাধারণত যা মনে করা হয় তা নয়। এই প্রভাব ধর্মীয় ধারণা আইনে যে নৈতিক প্রবণতা প্রদান করেছে তার মধ্যে নিহিত। অর্থাৎ আইনগত বিধি ও নৈতিক বিধি-নিষেধের মধ্যে যে সংযোগ রয়েছে ধর্মীয় ধারণা সেখানে প্রায়ই একটি মিশ্রণ হিসাবে কাজ করে। অংশীদারিত্ব ঋণ, সাক্ষীর চরিত্র, প্রভু ও ভূত্যের সম্পর্ক, বাদী ও বিবাদী এবং বৈধ সম্পর্কের বিষয়বস্তু সমন্বিত প্রতিটি প্রচলিত রীতি ও বাণিজ্যিক চুক্তি একটি নৈতিক বৈশিষ্ট্য লাভ করে এবং এক দিক দিয়ে নিছক ব্যক্তিগত স্বার্থের চাইতে উন্নত ব্যাপার হিসাবে বিবেচিত হয়।
দৃষ্টান্তস্বরূপ, আমানত এক ধরনের সহায়তা ও পারস্পরিক সাহায্য, কারণ এতদ্বারা কেউ সম্পত্তির মালিককে তার সম্পত্তি সংরক্ষণে সাহায্য করে, এটি অনুমোদিত। কারণ আল্লাহ বলেছেন: উত্তম, কাজে পরস্পরকে সাহায্য করো'। এবং মহানবী বলেছেন, 'আল্লাহ মানুষকে সাহায্য করে যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ তার ভাইকে সাহায্য করে। যে লোক জেনে-শুনে এরূপ অর্থ গ্রহণ করে যা তার নিজের নয় সে দুই ধরনের বাধ্যবাধকতায় জড়িয়ে পড়ে: সে আল্লাহর কাছে দোষী এবং যে তার প্রবণতার শিকার তার কাছে দোষী হয়। যে ঋণ গ্রহণকারীর ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা আছে সে যদি ঋণ পরিশোধ না করে তাহলে সে গুরুতর পাপে পাপী, এবং সে কারণে সে তার আধ্যাত্মিক মুক্তিকে বিপন্ন করে। প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের ব্যাপারে মহানবী কতিপয় অপরূপ উক্তি করে গেছেন। 'প্রতিবেশীর প্রতি সদয় হও। তার অবগুণ্ঠন অপসারণ করো। অপরের ক্ষতি পরিহার করো। তার প্রতি দয়ার দৃষ্টিতে তাকাও। তাকে যদি ক্ষতি করতে দেখ, ক্ষমা করে দাও। তাকে যদি তোমার উপকার করতে দেখ, তোমার কৃতজ্ঞতা জানাও।'
এই মনোভাবের তাৎপর্য এই যে, অধিকার প্রতিষ্ঠা প্রকৃতপক্ষে একটি কর্তব্য সম্পাদন হিসাবে বিবেচিত হয়। কারণ অধিকার যদি ন্যায্য হয় তাহলে সে অধিকার পাপ ছাড়া বাদ দেওয়া যায় না। যে তার সম্পত্তি অনধিকারমূলকভাবে করায়ত্তকারীর কাছ থেকে দাবি করে সে একটি নৈতিক দায়িত্বও পালন করে। কারণ সে যদি নীরব থাকে তাহলে সে এতদ্বারা অন্যায়ভাবে অধিকারকারীর পাপ অব্যাহত রাখায় সাহায্য করে। মহানবী বলেছেন, 'অন্যায়কারী হলেও তোমার ভাইকে সাহায্য করো। এ ক্ষেত্রে সাহায্য করার অর্থ তাকে অন্যায় থেকে বিরত রাখো। কিন্তু প্রত্যেকের অধিকার যদি তার ব্যক্তিগত স্বার্থ ছাড়া নৈতিক কর্তব্যও হয় তাহলে এই অধিকারের কতিপয় সীমা রয়েছে যা নৈতিক আইন ও সামাজিক স্বার্থ দ্বারা নিরূপিত হয়। শান্তিপূর্ণ মীমাংসা ও আপোস সর্বত্রই অত্যন্ত প্রশংসনীয় হিসাবে বিবেচিত। প্রতিশোধ নিষিদ্ধ। ঋণ গ্রহণকারীর বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ আইনের পরিপন্থী এবং অধিকারের অপপ্রয়োগ। কোন লোকই অপরের সুস্পষ্ট ক্ষতি সাধিত হতে পারে এমনভাবে তার অধিকার প্রয়োগ করতে পারে না।' এসব ব্যাপারে মুসলিম আইন বিশেষজ্ঞদের আমরা যতোটা অনুমান করতে পারি তার চাইতে অনেক সূক্ষ্ম অনুভূতি রয়েছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ নিম্নোক্ত ব্যাপারগুলি নিষিদ্ধ : যে পক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তাব করা হয়েছে তার শত্রুকে ওকালতনামা প্রদান। যে পশুর প্রতি নির্দয় ব্যবহারের জন্য খ্যাত তাকে কোন ভারবাহী পশু ভাড়া দেওয়া, এমন কোন লম্পটের কাছে তরুণী ক্রীতদাসী বিক্রয় করা যে তাকে অসৎ কাজে ব্যবহার করতে কিংবা তার ওপর ব্যভিচার করতে পারে। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আইনের সীমা এবং পরিমাণ নৈতিকতার মাপকাঠিতে নিরূপিত হয়।
তাই একথা যথার্থভাবেই বলা হয়েছে: 'যেখানে আল্লাহ্ অংশ নেই সেখানে মানুষের কোন অধিকার নেই। আল্লাহ্ অংশ হচ্ছে, প্রত্যেককে তার প্রাপ্য প্রদান করার এবং অন্যের মালিকানায় হস্তক্ষেপ না করার জন্য তাঁর নির্দেশ।' এমনিভাবে আমরা খাঁটি অধিকারের এমন এক পর্যায় দেখতে পাচ্ছি যা প্রত্যেক সভ্য সমাজের সাধারণ ভিত্তি।
মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহের দিক দিয়ে এটিই হচ্ছে মুসলিম আইন ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে এটি যথার্থভাবেই একটি উন্নত শ্রেণীর মর্যাদা দাবি করতে পারে। এর সমৃদ্ধিকালের সমসাময়িক প্রাথমিক সামন্ততান্ত্রিক আইনের বর্বরতামূলক ও রূঢ় রীতিনীতির তুলনায় এর স্থান ছিল অনেক অনেক উঁচুতে।
মুসলিম আইনে যে জিনিসটির অভাব, অন্যান্য প্রতিটি ক্ষেত্রেও সে জিনিসটির অভাব দেখা যায় এবং তা হচ্ছে অধিকতর সুসংবদ্ধ চেতনা। নৈরাজ্যের প্রতি প্রবণতা এবং সংগঠনে ও নিয়ম-শৃংখলা বিধানে মৌলিক অসামর্থ্য যেমন আরবদের রাজনৈতিক অক্ষমতার কারণ ছিল, তেমনি তাদের আইন ব্যবস্থায় দুর্বলতার উৎসও ছিল এসব বৈশিষ্ট্য। দুর্বলতার আর একটি কারণ হচ্ছে, আরবরা তাদের ব্যবস্থা মৌলভিত্তিকে মাত্রাতিরিক্তভাবে অতিরঞ্জিত করেন। ন্যায়বিচার পারস্পরিক অধিকার বিনিময়ের মধ্যে নিহিত। এই ধারণাকে তারা এবং আমাদের ধর্মীয় আইন বিশেষজ্ঞরা চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যান। এক্ষেত্রে অ্যারিস্টটলের দর্শনে যতখানি ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে ততোটা অবদান সৃষ্টি করে। যে কোন প্রকারের সুদ নিষিদ্ধকরণ, যে কোন রকমের বিপদের ঝুঁকি অনুমোদন, চুক্তির মধ্যে সর্বপ্রকার অনিশ্চয়তা পরিহার, এক কথায় মুসলিম আইনের সবগুলি বিশেষ দিক সেই একই সূত্র থেকে উদ্ভূত এবং একই সাধারণ ধারণার ওপর নির্ভরশীল। সবগুলি ক্ষেত্রেই সাম্যের বিধি এবং সে সঙ্গে ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়। আইনজীবীকে কেবলমাত্র ভারসাম্য বজায় রাখার কথা চিন্তা করতে হয়। অর্থাৎ আমাদের ধর্মীয় আইনের বিশেষজ্ঞদের ন্যায় তারা আইনের কঠোর প্রয়োগ ব্যাহত হতে পারে এরূপ প্রতিটি কৌশল এড়িয়ে যান।
এই উদ্দেশ্য সাধনের অব্যাহত প্রচেষ্টা অতিরিক্ত নিয়ম বিধির সৃষ্টি করে। ধর্মীয় আদেশসমূহকে যদি আপাতদৃষ্টিতে অধিকতর যুক্তিযুক্ত কাল্পনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে কমবেশি পরিহার করা না হতো, কিংবা সেগুলিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রাখা হতো তাহলে গুরুত্বহীন খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রতি এ ধরনের দৃষ্টি প্রতিটি কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতো।
আরব আইন থেকে আমরা প্রত্যক্ষভাবে যা লাভ করেছি তার মধ্যে 'লিমিটেড পার্টনারশীপ'-এর ন্যায় আইনগত ব্যবস্থাসমূহ এবং বাণিজ্যিক আইনের কতিপয় খুঁটিনাটি বিষয় রয়েছে। কিন্তু এগুলি বাদ দিলেও একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, আরব আইনের কতিপয় অংশের উচ্চ নৈতিক মান আমাদের আধুনিক ধ্যানধারণা বিকাশে অনুকূল অবদান সৃষ্টি করেছে। মুসলিম আইনের স্থায়ী বৈশিষ্ট্য এখানেই নিহিত।
টিকাঃ
১. অবশ্য বহু মুসলমান হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর কার্যকর মধ্যস্থতায় বিশ্বাস করেন।
১. মূল ল্যাটিন শব্দ একবচন মাইনিউশিয়া, শব্দগত অর্থ ক্ষুদ্রত্ব; ছোটখাটো বা তুলনামূলকভাবে গুরুত্বহীন বিস্তারিত বিষয়।
১. এই উক্তিটি একান্তভাবে লেখকের।
১. মিরের আরবী শব্দ মা'জানা এরূপ একটি স্থানের ইঙ্গিত দেয় যেখান থেকে নামাযের আযান দেওয়া হয়, আ যিনি আযান দেন তিনিই হচ্ছেন মুয়াজ্জিন।
১. হিব্রু কাইন; হযরত আদম ও বিবি হাওয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র, সে তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা হাবিলকে হত্যা করে।
১. ১০ম, ১১শ ও দ্বাদশ অধ্যায় দ্রষ্টব্য।
📄 বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিদ্যা
১. প্রাথমিক যুগ ৭৫০ খৃ. পর্যন্ত
২. অনুবাদের যুগ প্রায় ৭৫০ থেকে প্রায় ৯০০ পর্যন্ত...
৩. সুবর্ণ যুগ: প্রায় ৯০০ থেকে প্রায় ১১০০ পর্যন্ত
৪. পতন যুগ প্রায় ১১০০ থেকে...
মুসলিম বিজ্ঞানের রত্নভাণ্ডারগুলি সবেমাত্র উন্মুক্ত হতে শুরু করেছে। একমাত্র কনস্টান্টিনোপলেই লক্ষ লক্ষ পাণ্ডুলিপি সমন্বিত ৮০টিরও বেশি মসজিদ গ্রন্থাগার রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে কায়রো, দামেস্ক, মসুল ও বাগদাদে এবং পারস্যে ও ভারতে আরো বহু সংগ্রহ। খুব কম সংখ্যক পাণ্ডুলিপিরই তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং তার চাইতেও অনেক কমসংখ্যক পাণ্ডুলিপির বিষয়বস্তু বর্ণনা বা সম্পাদনা করা হয়েছে। এমনকি স্পেনের এসকোরিয়াল লাইব্রেরীতে মুসলিম পাশ্চাত্যের জ্ঞান সাধনার যেসব সম্পদ সঞ্চিত রয়েছে সেগুলির ক্যাটালগ তৈরিও এখনো সম্পন্ন হয়নি। বিগত কয়েক বছরে যে বিপুল পরিমাণ উপাদান উদ্ধার করা হয়েছে তা আমাদের পূর্ববর্তী ধারণাসমূহ অনেকখানি পাল্টে দিয়েছে এবং মুসলিম বিশ্বে বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার প্রাথমিক ইতিহাসের উপর নতুনভাবে ব্যাপক আলোকপাত করেছে। তাই চিকিৎসা বিদ্যা ও বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদানের একটি মোটামুটি চিত্রও বর্তমানে বড়জোর পরীক্ষামূলক হতে পারে।
১. প্রাথমিক যুগ, ৭৫০ খৃ. পর্যন্ত
সপ্তম শতকে আরবরা যখন সর্বপ্রথম একটি প্রাচীন সভ্যতার উত্তরাধিকারিত্ব লাভ করে তখন নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক আদর্শ ছাড়াও তাদের নিজস্ব বলতে ছিল সঙ্গীত ও ভাষা। আরবদের সমৃদ্ধ ও নমনীয় ভাষা নিকট প্রাচ্যের বৈজ্ঞানিক ভাবধারায় পরিণত হয়, যেমনটি হয়েছিল ল্যাটিন ভাষা পাশ্চাত্যের বৈজ্ঞানিক ভাব বিনিময়ের মাধ্যম।
প্রাক ইসলাম ও ইসলামের প্রাথমিক যুগের আরবী কাব্যে দেখা যায় যে, বেদুইনরা তাদের বিশাল উপদ্বীপের জীবজন্তু, গাছপালা ও বিভিন্ন ধরনের পাথর সম্পর্কে কিছুটা জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। আরব কবিরা তাদের বহনকারী উট ও ঘোড়ার গুণাবলী বর্ণনায় অনুরাগমূলক জ্ঞানের পরিচয় দেন এবং তাদের বিবরণী থেকে পরবর্তী শতকসমূহে একটি সুনির্দিষ্ট শ্রেণীর সাহিত্যের সৃষ্টি হয়। চিকিৎসা, স্বাস্থ্য রক্ষা ও আবহাওয়া তত্ত্ব সম্পর্কে তাদের জ্ঞান অত্যন্ত মৌলিক ছিল। কুরআনে রোগের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়নি। কেবলমাত্র সামাজিক উদ্দেশ্যেই সেখানে স্বাস্থ্য রক্ষার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ইসলামের প্রথম কয়েক শতকে কুরআনের বিশ্লেষণমূলক হাদীস ও ভাষ্য থেকে অধিকতর বিস্তারিত উপাদান পাওয়া যায়। কিন্তু এগুলির বিষয়বস্তুর তেমন বৈজ্ঞানিক মূল্য নেই। কারণ এগুলিতে শুধুমাত্র বিভিন্ন রোগ ও সেগুলির প্রতিকার ব্যবস্থার তালিকা দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে জাদুবিদ্যা প্রয়োগ, অশুভ প্রভাবের বিরুদ্ধে মাদুলি ও কবচ ব্যবহারের বর্ণনা এবং প্রতিরোধমূলক প্রার্থনার সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে।
আরবরা যখন বাইযেন্টাইন ও পারস্য সাম্রাজ্যে প্রবেশ করে তার কয়েক শতক আগে থেকেই গ্রীক বিজ্ঞানের নির্জীব অবস্থা বিরাজ করছিল। এটি আরব পণ্ডিতদের হস্তগত হয়। তারা অ্যারিস্টটল, হিপোক্রেটিস, গ্যালেন, টলেমী, আর্কিমিডিস ও অন্যান্যের রচনাবলী নকল করেন কিংবা সেগুলির ভাষ্য তৈরি করেন। গ্রীক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ঐতিহ্য নিম্নোক্ত লেখকদের রচনাবলীতে অত্যন্ত জীবন্তভাবে সংরক্ষিত ছিল : আলেকজান্দ্রিয়ায় বসবাসকারী আমিডার এইটিয়াস ও এজিনার পল; রোমে বসবাসকারী ট্রাল্লেসের আলেকজান্ডার এবং কনস্টান্টিনোপলের থিওফিলস্ প্রটোসপাথারিয়স।
আরব অভিযানের আগে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত মিসরের রাজধানীতে প্রাচীন জ্ঞান চর্চার কিছুটা ক্ষীণ পুনরুজ্জীবন ঘটে। এখানে গ্যালেনের প্রধান প্রধান রচনাবলী থেকে নিষ্কাশনের মাধ্যমে চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষার একটি নতুন ভিত্তি তৈরি হয়। আলেকজান্দ্রিয়াবাসী জোহানেস ফিলোপোনাস অ্যারিস্টটলের মতবাদের সাহসী প্রবক্তা ছিলেন। পূর্ববর্তী সময়ে আলেকজান্দ্রিয়ার জ্ঞানবিদগণ হিপোক্রেটিসের নাম সম্বলিত রচনাবলীর সংক্ষিপ্তসার তৈরি করেন। অবশ্য মিসরে এদিকে গোড়াপন্থী খৃস্টানরা বসবাস করতো এবং অপরদিকে গূঢ়বাদ ও রহস্যবাদের চর্চা হতো। তাই সেখানকার মাটি কোন প্রকার বিজ্ঞান চর্চার অনুকূল ছিল না।
উপরোক্ত কারণে মিসর গ্রীক ও আবরদের চিকিৎসা বিদ্যা ও বিজ্ঞানের মধ্যবর্তী বাহক হিসাবে সক্রিয়তার পরিচয় দিতে পারেনি। এ জন্যে আমাদেরকে প্রাচীন সিরীয় ভাষাভাষী বিশ্বের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। তৃতীয় শতক থেকে পরবর্তীকালে প্রাচীন সিরীয় বাগধারা পশ্চিম এশিয়ার শিক্ষিত মহলে ধীরে ধীরে গ্রীক ভাষার স্থলাভিষিক্ত হয়। সিরীয়-গ্রীক সভ্যতার বাহক ছিল প্রধানত নেস্টোরিয়ানরা। এই খৃস্টান সম্প্রদায় কনস্টান্টিনোপলের প্যাট্রিয়ার্ক নেস্টোরিয়াস কর্তৃক ৪২৮ খৃস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। ৪৩১ খৃস্টাব্দে ইফেসাস কাউন্সিল এর অনুসারীদের ধর্মদ্রোহী বলে ঘোষণা করে এবং তখন থেকে তারা এডেসায় হিজরত করেন। সেখান থেকেও বাইযেন্টাইন সম্রাট যেনো ৪৮৯ খৃস্টাব্দে তাদের বহিষ্কার করেন। অতঃপর তারা দেশত্যাগ করে সাসানীয় শাসনাধীন পারস্য চলে যান। সেখানে তাদের সাদরে গ্রহণ করা হয়। ধর্ম প্রচারের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা আরো পূর্বদিকে এশিয়ার কেন্দ্রস্থলে অগ্রসর হন, এমনকি সুদূর পশ্চিম চীনে গিয়েও পৌঁছেন।
একটি মেডিক্যাল স্কুলসহ নেস্টোরীয় বিজ্ঞান কেন্দ্র এডেসা থেকে মেসোপটেমিয়ার নিসিবিসে স্থানান্তরিত হয় এবং সেখান থেকে ৬ষ্ঠ শতকের প্রথমার্ধে দক্ষিণ-পশ্চিম পারস্যের জুন্দিশাপুরে স্থানান্তরিত হয়। সেখানে একটি হাসপাতাল ছাড়াও চতুর্থ শতকে সাসানীয় সম্রাট কর্তৃক একটি একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হয়। বিখ্যাত সম্রাট খসরু নওশিরওয়ান এই শহরটিকে ঐযুগের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত করেন। ৫২৯ খৃস্টাব্দে জাস্টিনিয়ান কর্তৃক দর্শন চর্চা বন্ধ করে দেওয়ার পর গ্রীক পণ্ডিতগণ এথেন্স ত্যাগ করে এখানে সিরীয় পারসিক ও ভারতীয় সাধকদের সঙ্গে মিলিত হন। এমনিভাবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও দার্শনিক মতবাদের একটি বৈজ্ঞানিক সংমিশ্রণ ঘটে যা পরবর্তীকালে মুসলিম চিন্তাধারা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। খসরু চিকিৎসা সংক্রান্ত গ্রন্থাবলীর সন্ধানে তাঁর নিজস্ব চিকিৎসককে ভারতে প্রেরণ করেন। এসব সংগৃহীত গ্রন্থ পাহলভী ভাষায় অনূদিত হয়। এ ছাড়া গ্রীক ভাষা থেকে অন্যান্য বহু বৈজ্ঞানিক রচনা পারস্য বা প্রাচীন সিরীয় ভাষায় অনূদিত হয়। মহানবীর সমসাময়িক কালের জুন্দিশাপুর মেডিক্যাল স্কুলের জনৈক শিক্ষার্থী আরবদের প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসাবিদ। কুরআনের বিশ্লেষণমূলক হাদীস বিশেষজ্ঞগণ তাঁর নাম উল্লেখ করেছেন।
প্রাচীন সিরীয় ভাষাভাষী বিশ্বে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ছিলেন রেশ-আইনার অধিবাসী সার্জিয়াস। তিনি নেস্টোরিয়ান ছিলেন না, বরং মনোফিজাইট খৃস্টান পুরোহিত ও তার জন্মস্থান মেসোপটেমিয়ার প্রধান চিকিৎসাবিদ ছিলেন। তিনিই চিকিৎসাবিদ্যা সংক্রান্ত গ্রীক রচনা প্রাচীন সিরীয় ভাষায় অনুবাদ শুরু করেন। তাঁকে গ্যালেনের বহু গুরুত্বপূর্ণ রচনার অনুবাদক হিসাবে উল্লেখ করা হয়। অমার্জিত হলেও তাঁর রচনা দুই শতাব্দীরও বেশিকাল পর্যন্ত পশ্চিম এশিয়ায় চিকিৎসা বিদ্যা সংক্রান্ত গ্রীক ঐতিহ্য বজায় রাখে। এই সময় গ্রীক চিকিৎসা বিদ্যার ওপর ভিত্তি করে পণ্ডিত ব্যক্তিরা চিকিৎসা সংক্রান্ত তাদের নিজস্ব গ্রন্থ রচনা শুরু করেন। এগুলির মধ্যে সবচাইতে পরিচিত হচ্ছে আহরনের প্যাণ্ডেক্টস। ইসলামের আবির্ভাবের অব্যবহিত পূর্বে তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার একজন খৃস্টান পাদ্রী ও চিকিৎসক ছিলেন। সম্ভবত তিনি গ্রীক ভাষায় মূল গ্রন্থ রচনা করেন যা সিরীয় ও পরবর্তীকালে আরবী ভাষায় অনূদিত হয়। আহরনের রচনা বর্তমানে বিলুপ্ত, কিন্তু এতে খুব সম্ভব প্রাচীন গ্রীক চিকিৎসা বিজ্ঞানে অজ্ঞাত বসন্ত রোগের সর্বপ্রথম বর্ণনা স্থান পায়।
ইসলামের আবির্ভাবের অব্যবহিত পূর্ববর্তী শতকগুলিতে প্রকৃতি বিজ্ঞান সংক্রান্ত রচনাবলী কদাচিৎ দেখা যায়। এ সময়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রচনাই প্রাধান্য পায়। কিছুটা প্রাথমিক যুগে প্রাচীন সিরীয় ভাষায় অ্যারিস্টটলের পারতা নেচারালিয়া এবং বিশ্বজগৎ সম্পর্কে ও আত্মা সম্পর্কে অ্যারিস্টটলের রচনা হিসাবে কল্পিত কিছু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া জীবজন্তু এবং তাদের রূপকথার শক্তি ও গুণাবলী সম্পর্কে ফিজিওলগাস শিরোনামে একটি খৃস্টান ধর্মতাত্ত্বিক গ্রন্থও রচিত হয়। একই ভাষায় গবাদি পশু প্রজনন, কৃষি ও পশু চিকিৎসা সম্পর্কে এবং আলকেমী সম্পর্কেও বিভিন্ন গ্রীক রচনা প্রকাশিত হয়। প্রাচীন সিরীয় ভাষায় ধাতু বিদ্যার কারিগরি পদ্ধতি সম্পর্কেও কিছু কিছু ছিটেফোটা রচনা পাওয়া যায়। সাসানীয় শাসনামলে আলকেমী ও জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রধান কেন্দ্রগুলি সম্ভবত পারস্যের পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের প্রদেশগুলির বড় বড় শহরে ছিল। এখানে চীনা ও ভারতীয় প্রভাবে একটি নতুন সভ্যতা গড়ে ওঠে।
আরবরা যখন উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়া অধিকারভুক্ত করে তখন তারা বাইযেন্টাইন ও পারস্য প্রশাসন এবং বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের এতটুকু ক্ষতি সাধন করেনি। জুন্দিশাপুরের একাডেমী নতুন মুসলিম সাম্রাজ্যের বৈজ্ঞানিক কেন্দ্র হিসাবে অব্যাহত থাকে। উমাইয়াদের আমলে এখান থেকেই রাজধানী দামেস্কে বিদ্বজন, বিশেষ করে চিকিৎসাবিদদের আগমন ঘটে। এরা অধিকাংশই ছিলেন আরবী নামযুক্ত খৃস্টান বা ইহুদী। মাসারজাওইহ্ নামক জনৈক পারস্যবাসী ইহুদীই আহরনের প্যান্ডেক্টস্ আরবীতে অনুবাদ করেন এবং তিনিই সম্ভবত আরবী ভাষায় প্রাচীনতম বিজ্ঞান গ্রন্থের রচয়িতা। অবশ্য উমাইয়া খলীফাদের দরবারের বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইতিহাস প্রায় সম্পূর্ণ নীরব।
২. অনুবাদের যুগ, প্রায় ৭৫০ থেকে প্রায় ৯০০ পর্যন্ত
৭৫০ খৃস্টাব্দের দিকে আব্বাসীয়দের উত্থান মুসলিম শাসনের বৃহত্তম শক্তি, গৌরব ও সমৃদ্ধির যুগের সূচনা করে। একেবারে সূচনাতেই মুসলমানদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে যিনি প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্য উভয় ক্ষেত্রেই মধ্যযুগীয় বিজ্ঞানে ছায়ার ন্যায় বিরাজমান। ইনি হচ্ছেন আস-সুফী নামে পরিচিত জাবির ইবনে হাইয়ান এবং মধ্যযুগীয় ল্যাটিন সাহিত্যে জেবের। তাঁর পিতা কুফার জনৈক আরব ঔষধ বিশেষজ্ঞ শিয়া সম্প্রদায়ের শহীদ হিসাবে মৃত্যুবরণ করেন। জাবির চিকিৎসকের পেশায় নিয়োজিত ছিলেন, কিন্তু চিকিৎসা শাস্ত্র সম্পর্কে তাঁর কোন রচনা আমরা পাইনি। অবশ্য এই নিবন্ধ রচয়িতা সম্প্রতি বিষ সম্পর্কিত কিছু রচনা উদ্ধার করেছেন যা জাবিরের বলে কথিত। জাবির আরবী আলকেমীর জনক হিসাবে বিখ্যাত। জাবির সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি হারুনুর রশীদের শক্তিশালী উজীর বারমাকী পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ৮০৩ খৃস্টাব্দে এই পরিবারের পতনের সংশ্লিষ্ট ঘটনার সঙ্গে তাঁকেকেও জড়িত করা হয়, এবং তিনি তাঁর পিতার জন্মস্থান কুফায় নির্বাসিত অবস্থায় ইন্তিকাল করেন। কথিত আছে যে, এখানে তাঁর মৃত্যুর দুই শত বছর পরেও তার গবেষণাগারের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়।
দ্বিতীয় আব্বাসীয় খলীফা আল মনসুরের সময় পুনরায় গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞান অনুবাদের কাজে হাত দেওয়া হয় এবং জুন্দিশাপুরই ছিল তার কেন্দ্রস্থল। খলীফা যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন সেখান থেকেই 'বাস্ত ঈশু' নামক খৃস্টান পরিবারের জুরজিস্কে ডেকে পাঠান। জুরজিস্ সেখানকার বিখ্যাত হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক ছিলেন। পরবর্তীকালে খলীফা আল হাদী ও হারুনুর রশীদ একই পরিবারের অপর একজন সদস্যের কাছ থেকে চিকিৎসকের ব্যাপারে পরামর্শ গ্রহণ করেন। সাত পুরুষ পর্যন্ত 'বাস্ত ঈশু' পরিবারের চিকিৎসাবিদগণ তাদের খ্যাতি অক্ষুণ্ণ রাখেন এবং সর্বশেষ খ্যাতিমান চিকিৎসক একাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে জীবিত ছিলেন। একথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে, 'বাস্ত ঈশু' পরিবারের প্রথম চিকিৎসাবিদের কৃতিত্বে মুগ্ধ হয়েই খলীফাগণ তাঁদের সাম্রাজ্যের চিকিৎসকদের মধ্যে গ্রীক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞান প্রচারের নির্দেশ প্রদান করেন।
নবম শতক ছিল অনুবাদ কাজের সর্বাধিক তৎপরতার যুগ। সার্জিয়াসের রচনার প্রাচীন সিরীয় ভাষার অনুবাদ সংশোধন করে নতুন গ্রন্থ রচিত হয়। প্রধানত নেস্টোরিয়ান খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী অনুবাদকগণ গ্রীক, প্রাচীন সিরীয়, আরবী, এমনকি পারস্য ভাষায়ও দক্ষ ছিলেন। অধিকাংশ অনুবাদকই প্রথমে প্রাচীন সিরীয় ভাষায় লেখেন। অবশ্য অর্ধ শতাব্দীকাল পর্যন্ত হারুনুর রশীদের উত্তরাধিকারীদের চিকিৎসক শ্রদ্ধেয় ইউহান্না ইবনে মাসাওইহ্ চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে আরবীতে কতিপয় গ্রন্থ রচনা করেন। সাধারণত খৃস্টান শিষ্য ও বন্ধুবান্ধবদের জন্য প্রাচীন সিরীয় ভাষায় এবং যেসব মুসলিম পৃষ্ঠপোষক জ্ঞানচর্চা করতেন তাদের জন্য আরবীতে গ্রন্থ রচনা করা হতো।
খলীফা আল মামুনের রাজত্বকালে নতুন জ্ঞানচর্চা তার প্রথম সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে। খলীফা অনুবাদ কার্যের জন্য বাগদাদে একটি নিয়মিত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এর সঙ্গে একটি গ্রন্থাগারও ছিল। এখানকার অন্যতম অনুবাদক হুনাইন ইবনে ইসহাক ছিলেন বিশেষ প্রতিভাসম্পন্ন দার্শনিক এবং ব্যাপক পাণ্ডিত্যসম্পন্ন চিকিৎসাবিদ। এই শতকের অনুবাদকদের মধ্যে তিনি ছিলেন অগ্রণী। তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত বাণী থেকে আমরা জানতে পারি যে, তিনি কার্যত গ্যালেনের বিপুল রচনা সম্ভার সামগ্রিকভাবে অনুবাদ করেন। এর মধ্যে গ্যালেনের রচনার প্রাচীন সিরীয় ভাষায় একশটি এবং আরবী ভাষায় ঊনচল্লিশটি চিকিৎসাশাস্ত্র এবং দর্শন বিষয়ক গ্রন্থ রয়েছে। পুত্র ইসহাক ও ভ্রাতুষ্পুত্র হুবাইশসহ তাঁর শিষ্যগণ প্রাচীন সিরীয় ভাষায় তেরোটি এবং আরবী ভাষায় ষাটটি গ্রন্থ রচনা করেন। শিষ্যদের মধ্যে পুত্র ও ভ্রাতুষ্পুত্র বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। এমনিভাবে মুসলিম বিশ্ব গ্রীক বৈজ্ঞানিক লেখকদের বিপুল রচনার সামগ্রিক উত্তরাধিকার লাভ করে।
গ্যালেনের মতবাদসমূহের প্রতি হুনাইনের বিশেষ অনুরাগ সর্বত্র সুস্পষ্ট। মধ্যযুগে প্রাচ্যে এবং পরোক্ষভাবে পাশ্চাত্যেও হুনাইনই গ্যালেনকে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। হিপোক্রেটিসের রচনাবলী সম্পর্কে আমরা সেই পরিমাণ অবহিত হইনি। হুনাইন স্বয়ং তাঁর অ্যাফোরিজমস অনুবাদ করেন। এই রচনাটি পরবর্তীকালের আরবদের কাছে একটি ক্লাসিক্যাল গ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত হয় এবং তারা প্রায়ই এ সম্পর্কে মন্তব্য করেন। হিপোক্রেটিসের অন্যান্য রচনার অধিকাংশ তাঁর শিষ্যরা অনুবাদ করেন। এসব অনুবাদ প্রায়ই গুরু নিজেই সংশোধন করতেন। হিপোক্রেটিসের ওপর গ্যালেন যেসব ভাষ্য রচনা করেন তার প্রায় সবগুলি হুনাইন স্বয়ং প্রাচীন সিরীয় ও আরবী ভাষায় রূপান্তরিত করেন। এ ছাড়াও হুনাইন ওরিবাসিয়াসের বিশাল সিনপসিস্, পল অব ইজিনার সেভেন বুক্স এবং ডায়োসকিউরাইডসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ম্যাটেরিয়া মেডিকা অনুবাদ করেন। শেষোক্ত গ্রন্থটি তাঁর পূর্ববর্তী অনুবাদক সঠিকভাবে অনুবাদ করেননি। স্পেনে দশম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এই রচনা পুনরায় আরবীতে অনূদিত হয়। ডায়োসকিউরাইডসের এসব আরবী অনুবাদের অত্যন্ত সুন্দরভাবে অলংকৃত আরবী পাণ্ডুলিপি বিভিন্ন গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে। হুনাইনের আরবী অনুবাদের মধ্যে অন্যান্য গ্রীক চিকিৎসাবিদ এবং পশু চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের রচনাও রয়েছে। তিনি অ্যারিস্টটলের পদার্থ বিজ্ঞান সংক্রান্ত কতিপয় রচনা এবং গ্রীক ওল্ড টেস্টামেন্ট আরবীতে অনুবাদ করেন। হুনাইনের বহু অনুবাদ এখনো পাণ্ডুলিপি আকারে রয়েছে এবং এগুলি বিশেষভাবে কনস্টান্টিনোপলের গ্রন্থাগারগুলিতে সংরক্ষিত। এগুলি ভাষার ওপর অবাধ ও নিশ্চিত দক্ষতা, মূল গ্রীক ভাষার সহজ রূপান্তর এবং কোন প্রকার শব্দবাহুল্য ছাড়া অত্যন্ত সঠিকভাবে ভাব প্রকাশের স্বাক্ষর বহন করে। তাঁর নিপুণতার প্রাধান্য এতোই সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত যে, বহু ছোটখাটো অনুবাদক তাঁদের রচনা এই মহান গুরুর নামে প্রচার করেন।
হুনাইনের নিজস্ব রচনাও প্রায় তাঁর অনুবাদের ন্যায়ই বহু ও ব্যাপক। এগুলির মধ্যে গ্যালেনের বিভিন্ন রচনার বহু সংক্ষিপ্তসার ও ভাষ্য এবং ছাত্রদের জন্য পাঠ্যপুস্তক আকারে দক্ষতামূলক উদ্ধৃতি ও সংরক্ষিত পুনর্বিবরণ রয়েছে। আরব ও পারস্যবাসীর মতে তাঁর সব চাইতে বিখ্যাত গ্রন্থ হচ্ছে প্রশ্ন ও জবাবের আকারে একটি সার গ্রন্থ: চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রশ্নাবলী এবং চক্ষু চিকিৎসার ওপর প্রাচীনতম ধারাবাহিক পাঠ্যপুস্তক: চক্ষু সম্পর্কে দশটি নিবন্ধ।
হুনাইন ইবনে ইসহাকের কতিপয় সমসাময়িক জ্ঞানবিদও 'বিরাট' অনুবাদক হিসাবে পরিচিত ছিলেন। এ ছাড়াও ছিল তাঁর নব্বই জনের মতো শিষ্য যারা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলী অনুবাদ করেন। প্রথমোক্তদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র হুবাইশ, পুত্র ইসহাক, প্রখ্যাত চিকিৎসাবিদ ও অঙ্কশাস্ত্রবিদ এবং মেসোপটেমিয়ার হাররানের অধিবাসী সাবিত ইবনে কাররা এবং কুসতা ইবনে লুকা। নবম শতকের অধিকাংশ চিকিৎসাবিদের ন্যায় সাবিত ছাড়া এরা সবাই খৃস্টান ছিলেন। সাবিত নিজেও ছিলেন একজন পৌত্তলিক 'সাবিয়ান' বা নক্ষত্র উপাসক। হুনাইন ও হুবাইশ প্রায় একান্তভাবে চিকিৎসাবিষয়ক রচনাবলী অনুবাদ করেন এবং তাদের সহকর্মীরা জ্যোতির্বিদ্যা, পদার্থ বিদ্যা, অঙ্কশাস্ত্র ও দর্শনশাস্ত্র সম্পর্কিত গ্রীক রচনাবলী অনুবাদে আত্মনিয়োগ করেন। এরা সবাই নিজস্ব গ্রন্থও রচনা করেন, যার সংখ্যা শত শত। নবম শতকের প্রথমার্ধে প্রাচীন সিরীয় ভাষার রচনা প্রাধান্য লাভ করে, কিন্তু অতঃপর আরবী রচনা ব্যাপকতা লাভ করে। এই অবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জুন্দিশাপুরের প্রাচীন জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়। এখানকার প্রখ্যাত চিকিৎসাবিদ ও বিজ্ঞানীরা একে একে বাগদাদে ও খলীফাদের মোহনীয় আবাস স্থল সামাররায় স্থানান্তরিত হন।
৮৫৬ খৃস্টাব্দের দিকে খলীফা আল মুতাওয়াক্কিল পুনরায় বাগদাদে গ্রন্থাগার ও অনুবাদ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এর পরিচালনা ভার দেওয়া হয় হুনাইনের ওপর। খৃস্টান জ্ঞানবিদদের গ্রীক পাণ্ডুলিপির সন্ধানে বিভিন্ন দেশ সফর করার জন্য এবং অনুবাদের উদ্দেশ্যে এগুলি বাগদাদে নিয়ে আসার জন্য খলীফাগণ এবং তাঁদের পদস্থ ওমরাহগণ সর্বপ্রকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তাই হুনাইন নিজে গ্যালেনের বর্তমানে বিলুপ্ত এবং ঐ সময়েও অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য একটি রচনা সম্পর্কে বলেন, "আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে এটির সন্ধান করি এবং এই উদ্দেশ্যে মেসোপটেমিয়া, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিসর এবং সর্বশেষে আলেকজান্দ্রিয়া সফর করি। এতো কিছু করেও আমি কোন কিছুর সন্ধান পাইনি। অবশেষে দামেস্কে আমি এর প্রায় অর্ধেক উদ্ধার করি।" তিনি বলেন যে, তিনি সব সময় একটি গ্রীক গ্রন্থের অন্ততপক্ষে তিনটি পাণ্ডুলিপির সাহায্য গ্রহণের চেষ্টা করতেন যাতে সবগুলি মিলিয়ে প্রকৃত বিষয়বস্তু উদ্ধার করা যায়--একজন সম্পাদকের দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ আধুনিক ধারণা।
বাগদাদে মেডিক্যাল শিক্ষা সম্পর্কে হুনাইনের সম্প্রতি প্রকাশিত গ্রন্থে দেখতে পাই যে, ৮৫৬ খৃস্টাব্দে সেখানে গ্রীক ঐতিহ্যসমূহ পুরোপুরি জীবন্ত হয়ে ওঠে। গ্যালেনের ২০টি বই কিভাবে শিক্ষা দেওয়া হতো তিনি তার একটি চিত্র তুলে ধরেন। "আলেকজান্দ্রিয়ার মেডিক্যাল স্কুলের ছাত্রদের অধ্যয়ন এসব বইর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং আমি আমার তালিকায় যে ধারাবাহিকতা অনুসরণ করেছি তা বজায় রাখা হতো। আমাদের সময়ে আমাদের খৃস্টান বন্ধুরা যেভাবে প্রাচীনদের গ্রন্থাবলী থেকে একটি নির্দিষ্ট মানের পাঠ্য বিষয় আলোচনা করার জন্য প্রত্যহ উসকুল নামে পরিচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে মিলিত হয়। তারাও তেমনি প্রত্যহ একটি মানের পাঠ্য বিষয় অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণ করার জন্য মিলিত হতো। গ্যালেনের অন্যান্য বইগুলি একটি পরিচিতিমূলক আলোচনার পর তারা নিজেরাই পড়তেন, যেমনটি বর্তমানে আমাদের বন্ধুরা প্রাচীনদের বইগুলির বিশ্লেষণসমূহ পড়ে থাকেন।" এ সময়ে এবং এর পরবর্তীকালে বাগদাদের স্কুল ও মসজিদগুলিতে শিক্ষা দানের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
গ্রীক রচনা ও রচনার অংশবিশেষের অনুবাদ ছাড়াও অনুবাদকগণ এগুলির সারগ্রন্থ তৈরি করেন এবং এরই একটি রূপ হচ্ছে 'প্যাণ্ডেক্টস' যা আরবদের জ্ঞানচর্চার একটি আদর্শ বৈশিষ্ট্য। এগুলি সামগ্রিক চিকিৎসা শাস্ত্রের পুনর্বর্ণনামূলক যাতে মাথা থেকে শুরু করে পা পর্যন্ত দেহের পীড়াগুলি ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হয়। এসব প্যাণ্ডেক্টস-এর অধিকাংশই বিলুপ্ত হয়েছে। অবশ্য কিছুকাল আগে কায়রোতে এর একটি পুনঃ প্রকাশিত হয়। এটি চিকিৎসাবিদের চাইতে অনুবাদক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসাবে খ্যাত সাবিত ইবনে কাররা কর্তৃক রচিত। এটি ৩১টি অংশে বিভক্ত। আলোচিত বিষয়গুলি হচ্ছে স্বাস্থ্য-বিজ্ঞান, 'গোপন' ও সাধারণ রোগসমূহ, যেমন চর্মরোগ। এর পরের শাখাটি বিরাট—মস্তক থেকে শুরু করে বক্ষদেশ, পাকস্থলী এবং অন্ত্র হয়ে দেহের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত বিভিন্ন অংশের রোগ। এরপর সংক্রামক ব্যাধি সংক্রান্ত আলোচনা, যার মধ্যে বসন্ত এবং হামও রয়েছে। এখানে বিভিন্ন ধরনের বিষ সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে। অতঃপর আবহাওয়ার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তারপর ভাঙা ও মচকানো, খাদ্য ও পথ্য এবং সর্বশেষে যৌন বিষয়াদি আলোচনা করা হয়েছে। প্রত্যেক রোগের স্বরূপ, কারণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসা অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও বাহুল্য বর্জিত ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে। বহু গ্রীক ও প্রাচীন সিরীয় ভাষার লেখকের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে।
আর এক ধরনের চিকিৎসা বিষয়ক বই আরব জ্ঞানীদের প্রিয় ছিল। এগুলি হচ্ছে প্রশ্ন ও জবাবের আকারে মুখস্থ করার বই। এধরনের শত শত পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় এবং আরবী চিকিৎসা বিজ্ঞানকে জ্ঞানদীপ্ত করে তোলার পিছনে এগুলির বিরাট অবদান রয়েছে। চিকিৎসা শাস্ত্র ছাড়া বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রীক রচনাবলী অনুবাদ সম্পর্কে আমাদের তথ্যসূত্র কিছুটা সঙ্কীর্ণ। অ্যারিস্টটলের বিজ্ঞান বিষয়ক রচনাবলী অধিকাংশ প্রাচীন সিরীয় ও আরবী ভাষায় অজ্ঞাত পরিচয় অনুবাদকরা অনুবাদ করেছেন। মহান দার্শনিকের ফিজিক্স, মেটিওরোলজি, ডি অ্যানিমা, ডি সেন্স, ডি সীলো, ডি জেনারেশন এট করাপশন, হিস্টোরিয়া অ্যানিমালিয়াম এবং সে সঙ্গে উদ্ভিদবিজ্ঞান, খনি বিজ্ঞান ও যন্ত্রকৌশল বিজ্ঞান সংক্রান্ত ভুয়া গ্রন্থাবলী এসব ভাষাতেই পাওয়া যায়। অ্যাপালোনিয়াস অব তিয়ানা কর্তৃক রচিত সিক্রেট অব ক্রিয়েশন ও বিখ্যাত ডি কসিস এর ন্যায় কতিপয় নিও-প্লাটোনিক গ্রন্থ এবং গ্রীক বিজ্ঞানীদের অন্যান্য সন্দেহজনক রচনা আরবী ভাষায় পাওয়া যায়। ভুয়া নামে আলকেমী সম্পর্কিত বহু গ্রীক রচনাও অনূদিত হয়েছে।
অবশ্য নবম শতকে রসায়ন সম্পর্কে কোন অগ্রগতির রেকর্ড নেই। হুনাইন ও আল কিন্দীর ন্যায় দুজন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আলকেমী চর্চার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁরা এটিকে প্রতারণামূলক বলে আখ্যায়িত করেন।
এবারে অনুবাদ থেকে এ যুগের মৌলিক রচনার প্রসঙ্গে আসা যাক। পদার্থ বিদ্যায় সব চাইতে উল্লেখযোগ্য পণ্ডিত হচ্ছেন আল-কিন্দী। তাঁর রচনার সংখ্যা অন্যূন ২৬৫টি এবং তিনি আরবদের মধ্যে প্রথম মুসলিম দার্শনিক। তিনি আবহাওয়া তত্ত্ব সম্পর্কে অন্ততপক্ষে পনেরটি গ্রন্থ রচনা করেন। সুনির্দিষ্ট ওজন, জোয়ার ভাটা, আলোক-বিজ্ঞান এবং বিশেষত আলোর প্রতিফলন সম্পর্কে তাঁর একাধিক গ্রন্থ এবং সঙ্গীতের ওপর আটটি গ্রন্থ রয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত আল-কিন্দীর বৈজ্ঞানিক রচনার অধিকাংশই বিলুপ্ত। একটি ল্যাটিন অনুবাদের মাধ্যমে সংরক্ষিত তাঁর আলোক বিজ্ঞান রজার বেকন ও অন্যান্য পাশ্চাত্য বিজ্ঞানীকে প্রভাবিত করে।
মেসোপটেমিয়া ও মিসরে সেচ ব্যবস্থা এবং পানি সরবরাহ ও যোগাযোগের জন্য খাল-ব্যবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় কৌশলবিজ্ঞানের দ্রুত বিকাশ ঘটে। কৌশলগত যন্ত্রবিজ্ঞান বিপুল আগ্রহের সৃষ্টি করে এবং পানি উত্তোলন, পানি চালিত চাকা, ভারসাম্য ও জল-ঘড়ি সম্পর্কে বহু গ্রন্থ রচিত হয়। যন্ত্রবিজ্ঞান সম্পর্কে বুক অব আর্টিফিসেস নামে প্রাচীনতম গ্রন্থ প্রকাশিত হয় আনুমানিক ৮৬০ খৃস্টাব্দে। এর রচয়িতা হচ্ছেন মূসা ইবনে শাকিরের পুত্র মোহাম্মদ, আহমদ এবং হাসান। তাঁরা অনুবাদকদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এই গ্রন্থটিতে ১০০টি কৌশলগত নির্মাণের বিষয় উল্লেখিত হয়েছে যার মধ্যে ২০টির ব্যবহারিক মূল্য রয়েছে। যথা উষ্ণ ও শীতল জলের নৌযান এবং নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত জলকূপের বিবরণ। অধিকাংশই আলেকজান্দ্রিয়ার হিরোর যন্ত্রকৌশলের মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি সাঙ্গিতিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা সমন্বিত পানপাত্রের ন্যায় বৈজ্ঞানিক শৌখিন বস্তুর বর্ণনা।
প্রকৃতির ইতিহাসের ক্ষেত্রে অষ্টম শতকে এক ধরনের বিশেষ রচনার উদ্ভব হয়। এটি জীব-জন্তু, উদ্ভিদ ও বিভিন্ন ধরনের পাথরের বর্ণনামূলক রূপ গ্রহণ করে। সাহিত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে রচিত হলেও প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়। এ ধরনের রচনার অত্যন্ত যশস্বী গ্রন্থকারদের অন্যতম হচ্ছেন বসরার বিখ্যাত আরবী ভাষাতত্ত্ববিদ আল-আসমাই। তিনি অন দি হর্স, অন দি ক্যামেল, অন দি ওয়াইল্ড অ্যানিম্যালস, অন দি প্ল্যান্টস এণ্ড ট্রীজ, অন দি ভাইন এণ্ড পাম টি এবং অন দি মেকিং অব ম্যান শিরোনামে গ্রন্থ রচনা করেন। অন্যান্য কয়েকজন লেখকও অনুরূপ গ্রন্থ রচনা করেন। ইবনে ওয়াহশিয়্যার নাবাটিয়ান এগ্রিকালচার গ্রন্থটি অনেক বিতর্কের সৃষ্টি করে। এতে জীবজন্তু এবং উদ্ভিদ ও সেগুলির চাষ সম্পর্কে কিছু কিছু মূল্যবান তথ্য রয়েছে। এসব বিবরণের সঙ্গে রূপকথা এবং ব্যাবিলনীয় ও অন্যান্য সেমিটিক সূত্রের জাল অনুবাদ যুক্ত করা হয়েছে। বাইযেন্টাইন পণ্ডিত ক্যাসিয়ানাস ব্যাসাসের কৃষি সংক্রান্ত রচনার প্রাচীন সিরীয় ভাষার সংস্করণ বিভিন্ন পণ্ডিত আরবীতে অনুবাদ করেন।
অ্যারিস্টটলের সন্দেহজনক রচনা মিনারালজির আরবী সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার পর বহু মুসলিম লেখক বিভিন্ন ধরনের পাথর বিশেষ করে মূল্যবান পাথর সম্পর্কে গ্রন্থ রচনা করেন, যা 'জহুরী' নামে একটি বিশেষ শ্রেণী সৃষ্টি করে। এগুলি পরবর্তীকালে পাশ্চাত্যে অনুবাদ ও অনুকরণ করা হয়। আমরা জাবির থেকে আল-কিন্দী পর্যন্ত যাদের নাম উল্লেখ করেছি তাদের প্রায় সবাই এ ধরনের পুস্তিকা রচনা করেন। আল-কিন্দী এ ছাড়াও অস্ত্রের জন্য লৌহ এবং ইস্পাতের ব্যবহার সম্পর্কে ছোট ছোট বই লেখেন। খলীফা শাসিত সাম্রাজ্যের সঙ্গে তুর্কিস্তান, ভারত, পূর্ব আফ্রিকার উপকূলবর্তী এলাকা প্রভৃতি পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলির ক্রমবর্ধমানভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ফলে দুষ্পাপ্য ও মূল্যবান পাথর এবং সেগুলি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ বৃদ্ধি পায়। পাথরের কোন কোন আধুনিক নাম এখনো আরবী বা পারস্য ভাষার সঙ্গে সেগুলির সম্পর্কের স্বাক্ষর বহন করে। যেমন বিযোর। এমনিভাবে গ্রীকদের কাছে অপরিচিত বহু উদ্ভিদ, ওষুধের উপাদান এবং অন্যান্য জিনিস আমরা পারস্যবাসীদের মাধ্যমে পাই, যেমন সুণ্ডা দ্বীপপুঞ্জের কপূর ও গালাঙ্গন রুট, তিব্বতের মাস্ক, ভারতের ইক্ষু এবং ভারত মহাসাগরের উপকূলের অম্বর। জাবির ইবনে হাইয়ান থেকে পরবর্তীকালে বহু আরবী লেখক চিকিৎসাবিদ ঔষধ-বিজ্ঞান ও বিষ-বিজ্ঞান সম্পর্কে গ্রন্থ রচনা করেন। মুসলিম বিশ্বে ৮ম শতকে চীন থেকে কাগজের প্রচলন হয় এবং ৭৯৪ খৃস্টাব্দে বাগদাদে প্রথম কাগজের কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩. সুবর্ণ যুগ প্রায় ৯০০ থেকে প্রায় ১১০০ পর্যন্ত
অনুবাদের যুগের শেষের দিকে মুসলিম বিশ্বের চিকিৎসাবিদ ও বিজ্ঞানীগণ গ্রীক বিজ্ঞানের একটি সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হয়। ইতিমধ্যে পারস্য ও ভারতীয় চিন্তাধারা এবং অভিজ্ঞতাও তাদের জ্ঞান ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে। তারা গ্রীক বিজ্ঞানীদের রচনা আয়ত্ত করলেও সেগুলি অত্যন্ত মৌলিক ছিল না। তাই এরপর থেকে তাঁরা নিজস্ব সম্পদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার জন্য এবং সেগুলির বিকাশ সাধনের জন্য উদ্যোগী হন।
বিজ্ঞান, বিশেষত চিকিৎসা-বিজ্ঞান খৃস্টান ও সাবিয়ানদের হাত থেকে দ্রুত মুসলমানদের হাতে চলে যায়। তারা অধিকাংশই ছিলেন পারস্যবাসী। চিকিৎসা শাস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রাচীন সূত্রসমূহ থেকে সংকলিত প্যাণ্ডেক্টস এর স্থলে আমরা বিশ্বকোষ আকারের বড় বড় রচনা দেখতে পাই। এগুলিতে পূর্ববর্তী যুগসমূহের জ্ঞান অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে শ্রেণীবিন্যাস করে আধুনিক জ্ঞানের পাশাপাশি সন্নিবেশিত করা হয়েছে।
এই নতুন যুগের প্রথম এবং নিশ্চিতভাবে শ্রেষ্ঠতম লেখক হচ্ছেন আররাযী, তিনি ল্যাটিন পাশ্চাত্যে 'রাযেস' নামে পরিচিত। পারস্যবাসী মুসলমান রাযী আধুনিক তেহরানের নিকটবর্তী রাই শহরে জন্মগ্রহণ করেন। রাযী নিঃসন্দেহে মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম এবং সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিদ ছিলেন। তিনি বাগদাদে হুনাইন ইবনে ইসহাকের জনৈক শিষ্যের কাছে শিক্ষা লাভ করেন। এই শিক্ষক গ্রীক, পারস্য ও ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তরুণ বয়সে রাযী আলকেমী চর্চা করেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর খ্যাতি যখন পশ্চিম এশিয়ার সকল অঞ্চলের শিষ্য ও রোগী আকর্ষণ করে তখন তিনি একান্তভাবে চিকিৎসাশাস্ত্রে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর জ্ঞান ছিল সর্বব্যাপক এবং বৈজ্ঞানিক অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি ২০০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেন, যার অর্ধেক চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত।
রাযীর চিকিৎসা বিষয়ক রচনার মধ্যে ক্ষণস্থায়ী বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বহু সংক্ষিপ্ত রচনা ছিল। অধিকাংশ পাঠকের কাছে কিছুটা নিরস মনে হলেও এগুলির শিরোনামে মানব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়েছে। হালকা রচনাগুলির মধ্যে রয়েছে দক্ষ চিকিৎসকরাও যে সকল রোগ নিরাময় করতে পারেন না সে বিষয় সম্পর্কে; সন্ত্রস্ত রোগীরা কেন দক্ষ চিকিৎসকদেরও সহজে ছেড়ে যায়; জনসাধারণ কেন দক্ষ চিকিৎসকদের চাইতে হাতুড়ে বাকপটু চিকিৎসকদের বেশি পছন্দ করে; শিক্ষিত চিকিৎসকদের চাইতে মূর্খ চিকিৎসক, সাধারণ লোক এবং মেয়েরা কেন বেশি সাফল্য লাভ করেছে। অন্যান্য সংক্ষিপ্ত রচনায় তিনি পৃথক পৃথক রোগের বিষয় আলোচনা করেছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ পিত্তাশয় ও মূত্রাশয়ের পাথর সংক্রান্ত রোগ। এই দুটি রোগই নিকটপ্রাচ্যে অত্যন্ত সাধারণ ছিল। শব ব্যবচ্ছেদ সম্পর্কেও তিনি গ্রন্থ রচনা করেন। রাযীর সবচাইতে বিখ্যাত রচনা হচ্ছে বসন্ত ও হাম রোগ প্রসঙ্গে। এটি প্রথম দিকে ল্যাটিন ভাষায় এবং পরবর্তীকালে ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। ১৪৯৮ খৃ. থেকে ১৮৬৬ খৃ. পর্যন্ত ৪০ বারেরও বেশি এই বইটি মুদ্রিত হয়। এতে উপরোক্ত দুটি রোগ সম্পর্কে সর্বপ্রথম সুস্পষ্ট বিবরণ দেওয়া হয়েছে। একটি উদ্ধৃতি থেকে মূল রচনার পর্যবেক্ষণমূলক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়।
"বসন্তরোগ দেখা দেওয়ার আগে ক্রমাগত জ্বর হয়। পিঠে ব্যথা হয়, নাক চুলকায় এবং ঘুমের মধ্যে শরীর কাঁপে। এই রোগ দেখা দেওয়ার প্রধান লক্ষণগুলি হচ্ছে : জ্বরসহ পিঠ ব্যথা, সমস্ত শরীরে কাঁটা ফোটার ন্যায় ব্যথা, মুখে রক্ত সঞ্চার, সময় সময় সঙ্কোচন, চোখেমুখে লালের আভা, শরীরে খিঁচুনিভাব, মাংস শিহরণ, শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্ট ও কাশিসহ গলা ও বুকে ব্যথা, মুখের ভিতর শুকিয়ে যাওয়া, গাঢ় লালা নির্গমন, কণ্ঠস্বরে কর্কশতা, মাথা ধরা ও ঝিমঝিম করা, উত্তেজনা, উদ্বেগ, বমির উদ্রেক এবং অস্থিরতা। বসন্তের চাইতে হামের ক্ষেত্রে উত্তেজনা, বমির উদ্রেক ও অস্থিরতা বেশি প্রকাশ পায়। আবার হামের চাইতে বসন্তে পিঠ ব্যথা বেশি হয়।"
গুটি বসন্ত পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার পর রাযী গুটিগুলির কিভাবে চিকিৎসা করতে হবে তার সুষ্ঠু ও বিস্তারিত পরামর্শ দেন। প্রাচ্যে এখনো সাধারণত এই রোগে গুটিগুলির দরুনই শরীরে দাগ থেকে যায়।
রাযীর বৃহত্তম চিকিৎসা গ্রন্থ এবং সম্ভবত কোন চিকিৎসাবিদ কর্তৃক কখনো লিখিত সব চাইতে বিস্তারিত গ্রন্থটি হচ্ছে আল-হাওউই, অর্থাৎ 'পূণাঙ্গ বই'। এতে গ্রীক, প্রাচীন সিরীয় ও প্রাচীন আরবের চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যাবলী সামগ্রিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। রাযী আজীবন চিকিৎসা সংক্রান্ত যেসব বই পড়েছেন সেগুলি থেকে প্রয়োজনীয় উদ্ধৃতি সংগ্রহ করেছেন এবং সেই সঙ্গে চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে তাঁর সামগ্রিক অভিজ্ঞতাও একত্র করেছেন। জীবনের শেষ বছরগুলিতে এগুলির সংমিশ্রণেই তিনি এই বিশাল গ্রন্থ রচনা করেন। আরবী জীবনী গ্রন্থগুলি এ সম্পর্কে একমত যে, তিনি তাঁর এই রচনা সমাপ্ত করতে পারেননি। মৃত্যুর পর তাঁর শিষ্যরাই এই রচনা সম্পন্ন করেন। হাওউই ২০টিরও বেশি খণ্ডে বিভক্ত ছিল। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ১০টির মতো খণ্ড পাওয়া যায় এবং এগুলির ৮-১০টি সাধারণ গ্রন্থাগারে বিচ্ছিন্নভাবে রয়েছে। রাযীর মৃত্যুর অর্ধশতাব্দী পরে কেবল দুটি পূর্ণাঙ্গ কপির কথা জানা যায়। কিন্তু আমি আনুমানিক ১০৭০ খৃস্টাব্দে লিখিত 'বখত ঈশু' বংশের জনৈক চক্ষু বিশেষজ্ঞের একটি গ্রন্থে এরূপ মন্তব্য দেখতে পাই যে, তিনি হাওউইর চক্ষু চিকিৎসা সংক্রান্ত পাঁচটি কপি পর্যালোচনা করেছেন। প্রত্যেক রোগের ক্ষেত্রে রাযী প্রথমে সমস্ত গ্রীক, সিরীয়, আরব, পারস্য ও ভারতীয় লেখকদের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন এবং শেষের দিকে নিজস্ব মতবাদ ও অভিজ্ঞতা প্রদান করেন। তিনি চিকিৎসা ক্ষেত্রে তাঁর গভীর পর্যবেক্ষণমূলক বহু উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্তও তুলে ধরেন।
আনজু রাজ বংশের প্রথম চার্লসের পৃষ্ঠপোষকতায় জিরজেন্টির সিসিলীয় ইহুদী চিকিৎসাবিদ ফারাজ ইবনে সালিম ল্যাটিন ভাষায় হাওউই অনুবাদ করেন। তিনি এই বিশাল দায়িত্ব ১২৭৯ খৃস্টাব্দে সমাপ্ত করেন। তিনি আল হাওউই শিরোনামটি কন্টিনেন্স এ পরিবর্তন করেন। অতঃপর লাইবার কন্টিনেন্স নামে রাযীর এই বৃহত্তম রচনাটি পরবর্তী শতকসমূহে অসংখ্য পাণ্ডুলিপি আকারে প্রচারিত হয়। ১৪৮৬ খৃস্টাব্দ থেকে এটি বার বার মুদ্রিত হয়। ১৫৪২ খৃস্টাব্দের মধ্যে এই বিশাল ও মূল্যবান রচনাটির পাঁচটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এ ছাড়াও এর বিভিন্ন অংশের বহু সংস্করণ প্রকাশিত হয়। তাই ইউরোপীয় চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর প্রভাব অসামান্য।
চিকিৎসাশাস্ত্র ছাড়াও রাযী ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, অঙ্কশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা এবং প্রকৃতি বিজ্ঞানের ওপর গ্রন্থ রচনা করেন। সর্বশেষ বিষয়ে বস্তু, স্থান, সময়, গতি, পুষ্টি, বৃদ্ধি, পচন, আবহাওয়াতত্ত্ব, আলোক বিজ্ঞান ও আলকেমী সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। রাযীর আলকেমী সংক্রান্ত রচনার গুরুত্ব মাত্র কিছুকাল আগে থেকে জানা যায়। তাঁর বিখ্যাত বুক অব দি আর্ট গ্রন্থটি সাম্প্রতিককালে জনৈক ভারতীয় রাজার লাইব্রেরীতে আবিষ্কৃত হয়েছে। আংশিকভাবে জাবিরের ন্যায় একই সূত্রসমূহের ওপর নির্ভরশীল হলেও উপাদানসমূহের সঠিক শ্রেণীবিন্যাস এবং রাসায়নিক পদ্ধতি ও সরঞ্জামের সুস্পষ্ট বর্ণনায় রাযী জাবিরকে ছাড়িয়ে যান। তাঁর বর্ণনায় আধ্যাত্মিকতার কোন প্রভাব নেই। জাবির এবং অন্যান্য আরব আলকেমী বিশেষজ্ঞগণ যেখানে খনিজ পদার্থকে 'বডীজ' বা 'দেহ' (স্বর্ণ রৌপ্য ইত্যাদি), 'সোল' বা 'সার' (গন্ধক, আর্সেনিক ইত্যাদি) এবং 'স্পীরিট্স' বা 'চেতনা' (পারদ, স্যাল অ্যামোনিয়াক ইত্যাদি), এই তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন সেখানে রাযী আলকেমীর উপাদানগুলিকে উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা খনিজ পদার্থে শ্রেণী বিন্যাস করেছেন। এই ধারণাটি তাঁর কাছ থেকেই আধুনিককালে প্রবর্তিত হয়। ধাতব পদার্থের শ্রেণীকে তিনি সার, দেহ, পাথর, ভিট্রিয়লস, সোহাগা ও লবণের পর্যায়ে পুনরায় শ্রেণী বিন্যাস করেছেন। তিনি পরিবর্তনশীল 'দেহ' ও অপরিবর্তনীয় 'সার'-এর মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে গন্ধক, পারদ, আর্সেনিক ও সালমিয়াককে শেষোক্ত পর্যায়ভুক্ত করেছেন।
পাশ্চাত্যে আইজাক জুডিয়াস নামে পরিচিত একজন বিশিষ্ট লেখক রাযীর সমসাময়িক ছিলেন। এই মিসরীয় ইহুদী তিউনিসিয়ার কাইরওয়ানের ফাতিমীয় শাসকদের চিকিৎসক ছিলেন। যাঁদের রচনা সর্বপ্রথম ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয় তিনি তাঁদের অন্যতম। আফ্রিকান কনস্ট্যান্টাইন ১০৮০ খৃস্টাব্দের দিকে এই দায়িত্ব সম্পাদন করেন। এই রচনা পাশ্চাত্যের মধ্যযুগীয় চিকিৎসাশাস্ত্রে অনেক প্রভাব সৃষ্টি করে এবং সপ্তদশ শতকেও এটি পঠিত হয়। রবার্ট বার্টন তাঁর অ্যানাটমি অব মেল্যাঙ্কলী গ্রন্থে এখান থেকে অবাধে উদ্ধৃতি দেন। আইজাকের অন ফিভার্স, অন দি ইলিমেন্টস, অন সিম্পল ড্রাগস এণ্ড অ্যালিমেন্টস শিরোনামের গ্রন্থগুলি এবং সর্বোপরি তাঁর প্রস্রাব সংক্রান্ত গ্রন্থটি বহু শতাব্দী পর্যন্ত চিকিৎসাশাস্ত্রে প্রাধান্য বজায় রাখে। কেবলমাত্র একটি হিব্রু অনুবাদের মাধ্যমে প্রাপ্ত চিকিৎসকদের পথপ্রদর্শক শিরোনামে তাঁর একটি ক্ষুদ্র পুস্তিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এতে চিকিৎসা পেশার উন্নত নৈতিক আদর্শ তুলে ধরা হয়েছে।
এই রচনার কোন কোন সারগর্ভ উক্তি প্রণিধানযোগ্য : "কোন চিকিৎসক দুঃসময়ের শিকার হলে নিন্দা করার জন্য তোমার মুখ খুলো না, কারণ প্রত্যেকেরই নিজস্ব সময় আছে।" "তোমার নিজস্ব দক্ষতাই তোমাকে গৌরবান্বিত করুক" "অন্যের অপমানের মধ্যে সম্মান প্রত্যাশা করো না।" "গরীবের কাছে গিয়ে তার চিকিৎসা করাকে অবহেলা করো না, কারণ এর চাইতে মহৎ কাজ আর কিছু নেই।" "রোগীকে নিরাময়ের আশ্বাস দিয়ে আশ্বস্ত করো, কারণ তুমি যদি নিশ্চিত নাও হও এতে তুমি তার স্বাভাবিক শক্তি সঞ্চয়ে সাহায্য করবে।" প্রাচ্যের রোগীদের সঙ্গে আচরণের ব্যাপারে একটি বাস্তব উপদেশ অপরূপ : "অসুস্থতা যখন বৃদ্ধি পেতে থাকবে কিংবা চরম পর্যায়ে পৌঁছবে তখন তোমার পারিশ্রমিক চাইবে, কারণ সুস্থ হওয়ার পর তুমি তার জন্য যা করেছ সে তা অবশ্যই ভুলে যাবে?"
আইজাকের সব চাইতে বিশিষ্ট শিষ্য ছিলেন ইবনে আল-জাযযার নামক জনৈক মুসলমান। তাঁর প্রধান রচনা মুসাফিরের পাথেয় প্রথম দিকেই ল্যাটিন, প্রভেন্সাল ও হিব্রু ভাষায় অনূদিত হয়। আভ্যন্তরীণ রোগসমূহের উত্তম বিবরণী সম্বলিত এই রচনাটি মধ্যযুগীয় চিকিৎসকদের অত্যন্ত প্রিয়। কিন্তু এর অনুবাদক কনস্ট্যান্টাইন প্রকৃত গ্রন্থকারের স্থলে নিজের নামেই এটি প্রচার করেন।
আলকেমী সংক্রান্ত যেসব রচনার সঙ্গে জাবিরের নাম জড়িত তা দীর্ঘকাল পর্যন্ত পণ্ডিতদের কাছে একটি হেঁয়ালী ছিল। এই জাবির ও অষ্টম শতকের অধ্যাত্মবাদী জাবির যদি একই ব্যক্তি হন, তাহলে তিনি কিভাবে তখনো পর্যন্ত আয়ত্তের বাইরে আলকেমী সংক্রান্ত গ্রীক রচনার জ্ঞান লাভ করেন তা উপলব্ধি করা দুঃসাধ্য। অবশ্য আগেই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, বর্তমানে এরূপ প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, জাবিরের নামযুক্ত রচনাবলী দশম শতকের প্রথম দিকে প্রকাশিত হয়েছে। মনে হয় এগুলি ব্রিদরেন অব পিউরিটি জাতীয় কোন গোপন সংস্থার কারসাজি। জাবিরের চিকিৎসা সংক্রান্ত রচনায় গ্রীক গ্রন্থকারদের কেবল উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর রচনা পদ্ধতির সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক নেই এবং এতে জ্ঞানচর্চার একটি পৃথক ধারা সুস্পষ্ট। সিরীয় ও ভারতীয় ঔষধের নাম কদাচিৎ ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু পারস্য ভাষার বিভিন্ন অর্থবোধক শব্দ প্রচুর। তাই আমরা ধরে নিতে পারি যে, এই বিশেষ গ্রন্থটিতে গ্রীক বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং পারস্যের ঔষধ ও বিষ সংক্রান্ত বাস্তব জ্ঞানের সংমিশ্রণ ঘটেছে। যাই হোক এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, এটি প্রাক মুসলিম ও মুসলিম যুগের বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের একটি সুদীর্ঘ ধারার সর্বশেষ যোগসূত্র।
জাবির আরব আলকেমীর জনক হিসাবে বিশ্ব বিখ্যাত। সাধারণত বলা হয়ে থাকে যে, আল-কিমিয়া শব্দটি মিসরীয় কাম-ইট বা কিম-ইট থেকে উদ্ভূত। কারো কারো মতে এটি গ্রীক কিমা থেকে উদ্ভূত। মিসরীয় ও গ্রীক পণ্ডিতদের প্রতিষ্ঠিত মতামত অনুযায়ী এই 'বিজ্ঞানের' মৌলিক বক্তব্য বিষয়গুলি হচ্ছে (ক) সব ধাতুই বাস্তবে এক, তাই শেষ পর্যন্ত একটিকে আরেকটিতে রূপান্তরিত করা সম্ভব; (খ) স্বর্ণ 'সব চাইতে খাঁটি' ধাতু এবং তার পরেই হচ্ছে রৌপ্য; এবং (গ) এমন একটি উপাদান রয়েছে যা অব্যাহতভাবে নিকৃষ্ট ধাতুকে খাঁটি ধাতুতে পরিবর্তিত করতে সক্ষম। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উদ্বুদ্ধ করার ব্যাপারে এ সব ধারণার একটি মূল্যবান তাৎপর্য থাকলেও দুর্ভাগ্যবশত এতে অতিরিক্ত কল্পনার একটি প্রবণতাও রয়েছে। তাছাড়া গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্র আলেকজান্দ্রিয়ায় এবং বস্তুত মুসলিম সাম্রাজ্যের সর্বত্র নস্টিক ও নিওপ্লাটোনিক মতবাদ থেকে এমন কতিপয় আধ্যাত্মিক প্রবণতার উদ্ভব হয় যা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মনোভাবের ওপর অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। আলকেমী জাবিরের হাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক গবেষণার বিষয় ছিল। কিন্তু এর মধ্যে উদ্ভট কল্পনা ও কুসংস্কারমূলক চর্চার এমন একটি প্রবণতা দেখা দেয় যাতে এটি প্রতারণামূলক কার্যকলাপেও পরিণত হয়।
আলকেমীর ওপর জাবিরের প্রায় ১০০টি গ্রন্থ রয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলি কুসংস্কারের বিভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ। কিন্তু অন্যান্য রচনা থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, লেখক পরীক্ষা-নিরীক্ষার গুরুত্বকে পূর্ববর্তী রসায়নবিদদের তুলনায় অধিকতর সুস্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন এবং তা অধিকতর সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তাই এ বিষয়ে মতবাদ ও চর্চার ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করেন। ইউরোপীয় আলকেমী ও রসায়ন শাস্ত্রের সমগ্র ঐতিহাসিক ধারায় তাঁর প্রভাব সুস্পষ্ট।
ব্যবহারিক ক্ষেত্রে জাবির বাষ্পীয়করণ, পরিস্রাবণ, ঊর্ধ্বপাতন, গলিতকরণ, পরিশ্রুতকরণ এবং স্বচ্ছকরণের উন্নত পদ্ধতিসমূহ বর্ণনা করেন। তিনি বহু রাসায়নিক উপাদান তৈরির পদ্ধতিও বর্ণনা করেন, যেমন হিঙ্গুল, আর্সেনিয়াস অক্সাইড প্রভৃতি। কিভাবে প্রায় খাঁটি গন্ধক দ্রাবক ফিটকিরি, ক্ষার, সাল-অ্যামোনিয়াক ও সল্টপিটার পাওয়া যেতে পারে এবং ক্ষারের সঙ্গে গন্ধক মিশিয়ে তাপ প্রয়োগের মাধ্যমে গন্ধকের তথাকথিত 'লিভার' 'মিল্ক' তৈরি করতে হবে ইত্যাদি বিষয় তিনি জানতেন। তিনি যথেষ্ট খাঁটি মারকিউরী অক্সাইড ও সাবলিমেট এবং সীসা ও অন্যান্য ধাতুর অ্যাসিটেট তৈরি করেন এবং কখনো কখনো এ গুলিকে স্বচ্ছ করেন। তিনি অশোধিত সালফিউরিক ও নাইট্রিক এসিড তৈরির এবং এ দুটির সংমিশ্রণে রাজকীয় পানি মিক্সচারের সাহায্যে সোনা ও রূপা দ্রবণের ব্যাপারে অবগত ছিলেন।
জাবিরের আরবী রচনা থেকে বেশ কয়েকটি পরিভাষামূলক শব্দ ল্যাটিন ভাষার মাধ্যমে ইউরোপীয় ভাষাসমূহে প্রচলিত হয়েছে যেমন রিয়ালগার, তুতিয়া, আলকালী, অ্যান্টিমনি এবং ডিস্টিলেশন যন্ত্রের যথাক্রমে উপরিভাগে ও নিম্নভাগে ব্যবহৃত আল-আণবিক ও আল-উল্লি। জাবিরের রচনায় গ্রীকদের নিকট পরিচিত একটি নতুন রাসায়নিক পদার্থ সাল অ্যামোনিয়াক-এর উল্লেখ রয়েছে। গ্রীকদের অ্যামোনিয়াকন হচ্ছে খনিজ লবণ। মনে হয় একটি নতুন ধরনের লবণের ক্ষেত্রে প্রয়োগের জন্য সিরীয়রা প্রাচীন নামটির পরিবর্তন সাধন করেছেন।
জাবিরের রসায়ন সংক্রান্ত বিপুল রচনা বিশেষত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ বুক অব দি সেভেন্টি প্রকাশিত হওয়ার পরই রসায়ন শাস্ত্রে তার প্রতিভার পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পাওয়া যাবে। ৭০টি নিবন্ধ সম্বলিত এই রচনা কিছুকাল আগ পর্যন্ত কেবল একটি নিকৃষ্ট ও অসমাপ্ত ল্যাটিন অনুবাদের মাধ্যমে পরিচিত ছিল। এই নিবন্ধকারের তাঁর প্রায় পূর্ণাঙ্গ মূল আরবী রচনা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে।
রসায়ন সংক্রান্ত যেসব রচনার সঙ্গে জাবিরের নাম যুক্ত হয়েছে সেগুলি অচিরেই ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। ১১৪৪ খৃষ্টাব্দে রবার্ট অব চেস্টার নামক জনৈক ইংরেজ বুক অব দি কম্পজিশন অব আলকেমী শিরোনামে এ ধরনের প্রথম অনুবাদ সম্পন্ন করেন। ল্যাটিন ভাষায় বুক অব দি সেভেন্টির অনুবাদ ক্রিমোনার জিরার্ড এর অন্যতম কৃতিত্ব। ইংরেজী অনুবাদক রিচার্ড রাসেল সান অব পারফেকশন গ্রন্থটি মূলত জাবিরের রচনা বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি তাঁকে 'সব চাইতে বিখ্যাত আরব যুবরাজ ও দার্শনিক জেবের' হিসাবে উল্লেখ করেন। সম্প্রতি ডঃ ই জে হোমইয়ার্ডের রচনা থেকে ল্যাটিন লেখকদের 'জেবের' ও আরব আলকেমী বিশেষজ্ঞ জাবের যে একই ব্যক্তি তার স্বপক্ষে বহু প্রমাণ পাওয়া গেছে।
খলীফা শাসিত প্রাচ্য এলাকায়ও একদল বিশিষ্ট চিকিৎসাবিদের আবির্ভাব ঘটে। এঁদের মধ্যে আমরা প্রথমেই ল্যাটিন লেখকদের কাছে আলী আব্বাস নামে পরিচিত একজন পারস্যবাসী মুসলিম চিকিৎসাবিদদের প্রসঙ্গ আলোচনা করবো। তিনি সামগ্রিক চিকিৎসাশাস্ত্র শিরোনামে একটি অপরূপ ও সুসংবদ্ধ বিশ্বকোষ রচনা করেন। ল্যাটিন লেখকদের কাছে এটি লাইবার রিজিয়াস নামেও পরিচিত। এতে চিকিৎসাশাস্ত্রের তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক উভয় দিকই তুলে ধরা হয়েছে। চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত গ্রীক ও আরবী রচনাবলীর সমালোচনা সম্বলিত একটি চমকপ্রদ অধ্যায়ের মাধ্যমে রচনাটির সূচনা করা হয়। প্রথমদিকে গ্রন্থটি দুবার ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে বিশ্ববিখ্যাত ইবনে সিনার ক্যানন এটির স্থলাভিষিক্ত হয়।
বিশ্বজনীনভাবে পাশ্চাত্যে আভিসিনা নামে পরিচিত আবু 'আলী আল-হুসাইন ইবনে সিনা মুসলিম বিশ্বের মহাজ্ঞানী পণ্ডিতদের অন্যতম। কিন্তু তিনি দার্শনিক ও পদার্থ বিজ্ঞানী হিসাবে যতোটা খ্যাতি লাভ করেন, চিকিৎসাবিদ হিসাবে ততটা খ্যাত ছিলেন না। এতদসত্ত্বেও ইউরোপীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর বিপুল প্রভাব ছিল। ইবনে সিনা তাঁর বিশাল ক্যানন অব মেডিসিন গ্রন্থে গ্রীক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সঙ্গে আরব অবদানের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। এটি আরব চিকিৎসা বিজ্ঞানের সুসংবদ্ধ চূড়ান্ত রূপ এবং শ্রেষ্ঠ রচনা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই বিশ্বকোষ সাধারণ চিকিৎসা, সহজ ওষুধপত্র, মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেহের সকল অংশের রোগ, বিশেষ রোগনিরূপণ ব্যবস্থা এবং ওষুধ প্রস্তুত প্রণালী তুলে ধরা হয়েছে।
ক্যাননে শ্রেণীবিন্যাসের যে পদ্ধতি অনুসৃত হয়েছে তা অত্যন্ত জটিল। পরবর্তীকালে পাশ্চাত্য চিকিৎসা চর্চায় উপশ্রেণী সৃষ্টির যে বাতিক দেখা দেয় তার জন্য এই পদ্ধতি অংশত দায়ী। ক্রিমোনার জিরার্ড দ্বাদশ শতকে ল্যাটিন ভাষায় গ্রন্থটি অনুবাদ করেন এবং তাঁর অনূদিত অসংখ্য পাণ্ডুলিপি আকারে পাওয়া যায়। এর চাহিদা কত ব্যাপক ছিল নিম্নোক্ত তথ্য থেকে তা বোঝা যায়। পঞ্চদশ শতকের শেষ ত্রিশ বছরে এটি ১৬ বার প্রকাশিত হয় এবং তার মধ্যে ১৫টি সংস্করণ ল্যাটিন ভাষায় এবং একটি হিব্রু ভাষায়। ষোড়শ শতকে এটি ২০ বারেরও বেশি পুনঃপ্রকাশিত হয়। গ্রন্থটির বিভিন্ন অংশের যেসব সংস্করণ বেরিয়েছে সেগুলি এই হিসাবে ধরা হয়নি। ল্যাটিন হিব্রু ও বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় পাণ্ডুলিপি আকারে ও মুদ্রিতভাবে যেসব ভাষ্য প্রকাশিত হয়েছে তা অসংখ্য। সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত এটি ব্যাপকভাবে মুদ্রিত ও পঠিত হয়। চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত আর কোন রচনা সম্ভবত এতোবেশি পঠিত হয়নি। প্রাচ্যে এখনো এটি প্রচলিত।
চিকিৎসাশাস্ত্রের ওপর ইবনে সিনার আরো প্রায় পনেরটি রচনার বিষয় জানা যায়। এই সঙ্গে তিনি ধর্মতত্ত্ব, মেটাফিজিক্স, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভাষাতত্ত্বের ওপর একশটির মতো গ্রন্থ রচনা করেছেন। পারস্য ভাষায় কতিপয় কবিতা ছাড়া এর প্রায় সবগুলিই আরবীতে লিখিত। দশম শতকে পারস্য ভাষা নতুনভাবে গুরুত্ব লাভ করে। 'যুবরাজ ও চিকিৎসাবিদদের নায়ক' ইবনে সিনার হাতে মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রাচ্যে তার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে। পশ্চিম পারস্যের হামাদানে এই মহান চিকিৎসাবিদ ও দার্শনিকের মাজারে এখনো পর্যন্ত বহু ভক্তের সমাবেশ ঘটে।
প্রাচ্যের মুসলিম বিশ্ব যখন চিকিৎসা শাস্ত্রে ধীরে ধীরে প্রাধান্য অর্জন করতে থাকে তখন মুসলিম পাশ্চাত্যও এই বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্র হিসাবে বিকাশ লাভ করে। স্পেনে কর্ডোভার খলীফা তৃতীয় আবদুর রহমান ও দ্বিতীয় আল-হাকামের গৌরবোজ্জ্বল রাজত্বকালে হাসদাই বিন সাফরুত নামক জনৈক ইহুদী একই সময়ে মন্ত্রী, রাজ দরবারের চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি তরুণ বয়সে, সন্ন্যাসী নিকোলাসের সহায়তায় ডায়োসকিউরাইডসের মেটিরিয়া মেডিকার অপরূপ পাণ্ডুলিপি আরবীতে অনুবাদ করেন। এটি বাইযেন্টাইন সম্রাট সপ্তম কনস্ট্যান্টাইনের কাছ থেকে কূটনৈতিক উপহার হিসাবে প্রেরিত হয়। পরবর্তীকালে রাজদরবারের চিকিৎসক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস লেখক ইবনে জুলজুল এই অনুবাদটি সংশোধন করেন এবং এর ওপর একটি ভাষ্য রচনা করেন।
ল্যাটিন লেখকদের কাছে আবুল কাসিম নামে পরিচিত মুসলিম লেখকও কর্ডোভায় রাজ দরবারের চিকিৎসক ছিলেন। তিনি ৩০টি অধ্যায়ে বিভক্ত আত-তাসরিফ নামে পরিচিত একটি বিরাট গ্রন্থ রচনা করেন। সর্বশেষ অধ্যায়ে তিনি অস্ত্রোপচার সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এর আগে পর্যন্ত বিষয়টি মুসলিম লেখকদের কাছে উপেক্ষিত ছিল। আবুল কাসিমের শল্যচিকিৎসা বিষয়ক নিবন্ধটি প্রধানত পল অব ইজিনার ষষ্ঠ গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে রচিত হলেও তিনি এতে বহু বিষয় সংযোজিত করেছেন। তাঁর রচনায় বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জামের চিত্র সন্নিবেশিত হয়েছে। এটি অন্যান্য আরব লেখককে প্রভাবিত করে এবং বিশেষ করে ইউরোপ শল্যচিকিৎসার ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে। এটি প্রথম দিকে ল্যাটিন, প্রভেন্সাল ও হিব্রু ভাষায় অনূদিত হয়। বিখ্যাত ফরাসী শল্যচিকিৎসক গাই দ্য চৌলিয়াক তাঁর অন্যতম রচনায় ল্যাটিন অনুবাদটি পরিশিষ্ট হিসাবে প্রদান করেন।
একাদশ শতকে মিসর, সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়ায় ব্যাপকভাবে চিকিৎসা-বিজ্ঞান চর্চা হয়। ল্যাটিন লেখকদের কাছে হ্যালি রোডোয়াম নামে পরিচিত কায়রোর আলী ইবনে রিদওয়ান মিসরের চিকিৎসা-বিজ্ঞান চর্চার একটি সুন্দর বিবরণী তৈরি করেন। তিনি গ্যালেন ও গ্রীক লেখকদের অনুসারী ছিলেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, প্রাচীনদের রচনাবলী পর্যালোচনার মাধ্যমেই ভালো চিকিৎসাবিদ হওয়া যায়। এই মতবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁর সমসাময়িক বাগদাদের ইবনে বুতলান এক সুদীর্ঘ ও প্রচণ্ড বিতর্কের সূচনা করেন। গ্যালেনের আর্স-পার্ভা সম্পর্কে ইবনে রিদওয়ানের ভাষ্য এবং ইবনে বুতলানের সিনপটিক ট্যাবলস অব মেডিসিন নামক জ্ঞানদীপ্ত রচনা ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়।
মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই যুগের আলোচনা সমাপ্ত করার আগে অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আরো কতিপয় রচনা সম্পর্কেও আমাদের আলোচনা করা দরকার। যেসব সহজ ঔষধপত্র বড় বড় বিশ্বকোষে স্থান পেয়েছে এবং অন্য লেখকরা যেগুলি সম্পর্কে বিষয়ভিত্তিক পৃথক পৃথক গ্রন্থ রচনা করেছেন প্রথমে এসব রচনার বিষয় আলোচনা করা যাক। এসব নিবন্ধ এখনো প্রাচ্যে অত্যন্ত সমাদৃত। পারস্যের হেরাতের অধিবাসী আবু মানসুর মুওয়াফফাক পারস্য ভাষায় ৯৭৫টি ঔষধের বর্ণনা দিয়েছেন। ওষুধের গুণাগুণের ভিত্তি গ্রন্থে ৫৮৫টি ঔষধের বর্ণনা রয়েছে। গ্রীক ও প্রাচীন সিরীয় তথ্য ছাড়াও এতে ঔষধ সংক্রান্ত আরব, পারস্য এবং ভারতীয় তথ্যও সন্নিবেশিত হয়েছে। তাছাড়া এটি আধুনিক পারস্য গদ্যের প্রথম কীর্তি-স্তম্ভ। আরবী ভাষায়ও একই ধরনের বহু গ্রন্থ রয়েছে। এগুলির মধ্যে আমরা বাগদাদ ও কায়রোর মাসাওয়িহ আল মারিদিনী ও স্পেনের ইবনে ওয়াফিদের রচনাসমূহের বিষয় উল্লেখ করতে পারি। তাঁরা উভয়েই তাঁদের রচনার ল্যাটিন অনুবাদের মাধ্যমে অত্যন্ত পরিচিত এবং উভয়ের রচনাই একযোগে ৫০ বারের বেশি মুদ্রিত হয়েছে। ল্যাটিন ভাষায় এই রচনা 'মিসিউ' দি ইয়ংগার কর্তৃক ডি মেডিসিনিস ইউনিভার্সালিবাস এট পার্টিকুলারিবাস শিরোনামে এবং আবেনগিউফি কর্তৃক ডি মেডিকামেন্টিস সিমপ্লিসিবাস শিরোনামে অনূদিত হয়েছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের অপর একটি শাখা চক্ষু চিকিৎসা ১০০০ খৃস্টাব্দের দিকে চূড়ান্ত বিকাশ লাভ করে। ল্যাটিন লেখকদের কাছে জেসু হ্যালি নামে পরিচিত বাগদাদের খৃস্টান চক্ষু চিকিৎসক আলী ইবনে ঈসা ও 'ক্যানামুসালী' নামে পরিচিত মসুলের মুসলিম চক্ষু চিকিৎসক আম্মার এ বিষয়ে দুটি অপরূপ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁরা গ্রীক চক্ষু চিকিৎসা রীতির সঙ্গে বহু নতুন বিষয়, চক্ষু অস্ত্রোপচার সংক্রান্ত নতুন তথ্যাবলী এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সংযোজন করেছেন। উভয় রচনাই ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে ফ্রান্সে চক্ষু চিকিৎসা চর্চার রেনেসাঁর সূত্রপাত না হওয়া পর্যন্ত এই দুটি রচনা চক্ষু রোগের ওপর সর্বোৎকৃষ্ট গ্রন্থ ছিল।
বিজ্ঞানে আমরা আলকেমী চর্চায় রাযী ও জাবিরের অবদানের বিষয় উল্লেখ করেছি। সে যুগের শ্রেষ্ঠতম দুজন মনীষী ইবনে সিনা ও আল বিরুনী দৃঢ়ভাবে এ বিষয়টির বিরোধিতা করেন। অপর দিকে আমরা পাহাড়, পাথর ও খনিজ পদার্থের গঠন সম্পর্কিত একটি রচনার জন্য ইবনে সিনার কাছে ঋণী। এতে ভূকম্পন, বায়ু, জল, তাপমাত্রা, পাললিক গঠন, শুষ্কতা প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হওয়ায় ভূতত্ত্বের ইতিহাসের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।
'গুরু' হিসাবে অভিহিত আবু রায়হান মোহাম্মদ আল-বিরুনী একজন পারস্যবাসী চিকিৎসাবিদ, জ্যোতির্বিদ, অঙ্কশাস্ত্রবিদ, পদার্থ বিজ্ঞানী, ভূগোলবিদ ও ইতিহাসবিদ ছিলেন। মুসলিম বিজ্ঞান চর্চার সুবর্ণ যুগের সঙ্গে বিশ্বব্যাপী খ্যাতিসম্পন্ন যেসব জ্ঞানী পণ্ডিতের নাম জড়িত তিনি তাঁদের মধ্যে সম্ভবত সব চাইতে খ্যাতিমান ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর প্রাচীন জাতিসমূহের কালানুক্রমিক ইতিহাস ভারতীয় বিষয় পর্যালোচনা উৎকৃষ্ট ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে জানা যায়। অঙ্কশাস্ত্র সংক্রান্ত তাঁর অধিকাংশ রচনা এবং অন্যান্য বহু রচনা এখনো প্রকাশিত হয়নি। পদার্থ বিজ্ঞানে তাঁর বৃহত্তম অবদান হচ্ছে, প্রায় সঠিকভাবে ১৮টি মূল্যবান পাথর ও ধাতুর সুনির্দিষ্ট ওজন নিরূপণ। আল-বিরুনীর মণি-মুক্তা সংক্রান্ত অসম্পাদিত একটি বিরাট গ্রন্থ অপরূপ পাণ্ডুলিপি আকারে এসকোরিয়াল লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত আছে। এতে স্বাভাবিক, বাণিজ্যিক ও চিকিৎসার দৃষ্টিকোণ থেকে বিপুল সংখ্যক পাথর ও ধাতুর বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও তিনি ঔষধ বিজ্ঞানের ওপর একটি গ্রন্থ রচনা করেন। ভারতীয় ও চীনা পাথর এবং ঔষধপত্রের উৎস সম্পর্কে তাঁর অসম্পাদিত রচনা থেকে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।
আল মাসুদীকে এক দিক দিয়ে 'আরবদের প্লিনি' বলা যায়। তাঁর মেডোজ অব গোল্ড গ্রন্থে তিনি একটি ভূমিকম্প, মরু সাগরের পানি এবং প্রথম বায়ু চালিত কলের বর্ণনা দিয়েছেন। শেষোক্তটি সম্ভবত মুসলমানদের আবিষ্কার। তিনি বিবর্তনবাদের মূলতত্ত্বসমূহও প্রদান করেন।
দশম শতকে মেসোপটেমিয়ায় প্রতিষ্ঠিত গুপ্ত দার্শনিক সংস্থা 'ব্রিদরেন অব পিউরিটি' ৫২ খণ্ডে একটি বিশ্বকোষ রচনা করে। এর ১৭টি খণ্ডে প্রধানত গ্রীক রীতিতে প্রকৃতি বিজ্ঞান আলোচনা করা হয়েছে। আমরা এতে খনিজ পদার্থের গঠন, ভূকম্পন, জোয়ার ভাটা, আবহাওয়াতত্ত্ব ও বিভিন্ন উপাদানের আলোচনা দেখতে পাই। আকাশ মণ্ডলও সেখানকার বিভিন্ন বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কের আলোকে এসব বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। বাগদাদের গোঁড়া ধর্মীয় নেতারা এই প্রতিষ্ঠানকে ধর্মবিরোধী আখ্যায়িত করা সত্ত্বেও তাঁদের এই রচনা সুদূর স্পেন পর্যন্ত প্রচারিত হয় এবং সেখানে এটি দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারাক প্রভাবিত করে। মুসলিম দেশসমূহে প্রায়ই জল-ঘড়ি তৈরি করা হতো। হারুনুর রশীদের জনৈক রাজকীয় দূত এ ধরনের একটি ঘড়ি শার্লেমেনকে উপহার প্রদান করেন।
জনৈক তুরস্কবাসী মুসলমান বিখ্যাত দার্শনিক আল-ফারাবীর নাম তাঁর সঙ্গীত প্রসঙ্গে গ্রন্থের জন্য অবশ্যই উল্লেখ করা দরকার। এটি সঙ্গীত তত্ত্বের ওপর প্রাচ্যের সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ রচনা। তিনি বিজ্ঞানের শ্রেণী বিন্যাস সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বই লেখেন। শ্রেণী বিন্যাস সংক্রান্ত অনুরূপ দুটি গ্রন্থ পরবর্তীকালে রচিত হয়। এর একটি হচ্ছে বিজ্ঞানের চাবি। মোহাম্মদ আল-খাওয়ারিযমী ৯৭৬ খৃষ্টাব্দে এটি রচনা করেন। অপরটি ইবনে আন-নাদিসের বিখ্যাত রচনা ফিহরিস্ত আল 'উলুম। শেষোক্তটির মাধ্যমে আমরা ইসলামের প্রাথমিক যুগের মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের সম্পর্কে অনেক তথ্য জানতে পারি।
বসরার আবূ আলী আলহাসান ইবনে আল হাইসাম আলোক বিজ্ঞানের চূড়ান্ত বিকাশ সাধন করেন। তিনি কায়রো গিয়ে ফাতিমীয় খলীফা আল হাকিমের অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন। এখানে তিনি নীল নদের বার্ষিক প্লাবন নিয়ন্ত্রণের একটি পদ্ধতি আবিষ্কারে সচেষ্ট হন। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি খলীফার কোপানল থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আত্মগোপন করেন এবং আল হাকিমের মৃত্যু পর্যন্ত পাগলামির ভান করেন। এর মধ্যেও সময় করে তিনি কেবল অঙ্কশাস্ত্র ও পদার্থবিদ্যা-সংক্রান্ত প্রাচীন গ্রন্থাবলীই নকল করেননি, এ সমস্ত বিষয়ে এবং তাঁর মূল পেশা চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে মৌলিকভাবে বহু গ্রন্থও রচনা করেন। তাঁর প্রধান রচনা আলোক-বিজ্ঞান প্রসঙ্গে মূল আরবী রচনা বিলুপ্ত হলেও এর ল্যাটিন অনুবাদ পাওয়া যায়। চক্ষু দৃশ্যমান বস্তুর ওপর দর্শনমূলক আলো বিকিরণ করে--আল-হাইসাম ইউক্লিড ও টলেমীর এই মতবাদের বিরোধিতা করেন। তিনি আলোকরশ্মির প্রক্ষেপণ ও প্রতিফলনের বিভিন্ন কোণের পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ আলো ও বর্ণ এবং দৃষ্টি সংক্রান্ত বিভ্রম ও প্রতিফলনের উদ্ভব প্রক্রিয়া আলোচনা করেন। তাঁর নাম এখনো তথাকথিত 'আল হাযেন'স প্রোব্লেমের' সঙ্গে সংশ্লিষ্ট 'একটি গোলাকার ফাঁপা জিনিসের মধ্যে এরূপ স্থান নির্ধারণের জন্য ব্যবহৃত নলাকার আয়না, যে স্থান থেকে নির্ধারিত অবস্থানের একটি বস্তু নির্ধারিত অবস্থানের একটি চক্ষুর ওপর প্রতিফলিত হবে।' এটি একটি চতুর্ঘাত সমীকরণের সৃষ্টি করে যা আল-হাইসাম একটি পরাবলয়ের মাধ্যমে সমাধান করেন।
আল হায়সাম স্বচ্ছ মাধ্যমের মধ্য দিয়ে আলোকরশ্মির প্রতিসরণ পরীক্ষা করেন। গোলাকার অংশসমূহের সাহায্যে বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনি তাত্ত্বিকভাবে বর্ধনশীল পরকলা আবিষ্কারের প্রায় কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছেন। ৩০০ বছর পর এই জিনিসটি বাস্তবে পরিণত হয় এবং ৬০০ বছরেরও পরে স্নেল ও ডেসকার্টিস এর ওপর ভিত্তি করে সাইন্স বিধি প্রতিষ্ঠা করেন। রজার বেকন এবং আলোক বিজ্ঞানের ওপর পোল ভিটোল্লিয়ো প্রমুখ মধ্যযুগের সকল পাশ্চাত্য লেখক প্রধানত আল হায়সামের অপটিকাই থেসওরাস এর ওপর ভিত্তি করেই তাঁদের গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচনা লিওনার্দো দা ভিনচি এবং জোহান কেপলারকেও প্রভাবিত করে। শেষোক্ত লেখক তাঁর আলোক-বিজ্ঞান সংক্রান্ত মৌলিক রচনার নিম্নোক্ত শিরোনাম প্রদান করেন: অ্যাড ভিটেলিউনেম প্যারালিপমেনা।
প্রাচ্যের লেখকগণ আল-হায়সামের আলোক বিজ্ঞানের ওপর বহু ভাষ্য রচনা করলেও তাঁর অধিকাংশ উত্তরাধিকারী তাঁর দৃষ্টিতত্ত্ব প্রবর্তন করেননি। মুসলিম বিজ্ঞান চর্চার পরবর্তী যুগের চক্ষু চিকিৎসাবিদগণও তা করেননি। অবশ্য আল-বিরুনী ও ইবনে সিনা স্বতন্ত্রভাবে ও পুরোপুরি আল-হায়সামের সঙ্গে একমত হন যে, "চক্ষু থেকে কোন আলোকরশ্মি নিঃসৃত হয় না এবং বস্তুর সংস্পর্শে গিয়ে সেটিকে দৃশ্যমান করে না, বরং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর আকার চক্ষুর মধ্যে প্রবেশ করে এবং এর স্বচ্ছ অবয়বের দ্বারা রূপান্তরিত হয়।"
আল হায়সাম ফিজিক্যাল অপটিক্স সম্পর্কেও কয়েকটি পুস্তিকা লেখেন। এগুলির মধ্যে আলো প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। তিনি আলোকে এক ধরনের আগুন মনে করেন যা পরিমণ্ডলের একটি গোলাকার সীমা পর্যন্ত প্রতিফলিত হয়। অন টোয়াইলাইট ফেনোমেনা গ্রন্থে তিনি হিসাব করে দেখেন যে, এই পরিমণ্ডল ইংরেজী মাইল অনুসারে প্রায় ১০ মাইল উচ্চতাসম্পন্ন। বইটি বর্তমানে কেবল ল্যাটিন ভাষায় পাওয়া যায়। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থে রামধনু, জ্যোতির্মণ্ডল এবং বৃত্তাকার ও অর্ধ-বৃত্তাকার আয়নার বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। এসব গ্রন্থ এবং ছায়া ও গ্রহণ সম্পর্কিত অন্যান্য গ্রন্থ অত্যন্ত উন্নতমানের অঙ্কশাস্ত্রের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। নিজস্ব হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে তিনি ধাতব আয়না তৈরি করেন। এসব রচনার অধিকাংশই আল-হায়সামের জীবনের শেষ ১০ বছরের অবদান। অন দি বার্নিং গ্লাস শিরোনামের মৌলিক পর্যালোচনাটিও এই সময়কার। এতে তিনি এমন একটি ডায়োটিক সৃষ্টি করেন যা গ্রীকদের চাইতে অনেক বেশি উন্নত। এতে প্রতিমূর্তিকে কেন্দ্রীভূত করা, পরিবর্তন করা ও উলটপালট করার এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে গোলাকৃতি ও বর্ণগঠনের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গভীর ও নির্ভুল ধারণা প্রতিফলিত হয়েছে। আল হায়সাম ইউক্লিড ও টলেমীর আলোক বিজ্ঞান সম্পর্কিত রচনা, অ্যারিস্টটলের ফিজিক্স এবং অ্যারিস্টটলীয় প্রবলেম্যাটা সম্পর্কে একটি ভাষ্যও রচনা করেন। তিনি জানালার খড়খড়িতে সুন্দর একটি ছিদ্রের মধ্য দিয়ে বিপরীত দিকের দেওয়ালের ওপর সূর্য গ্রহণের সময় সূর্যের প্রতিমূর্তির অর্ধ চন্দ্রাকার রূপ অবলোকন করেন। এটি ক্যামেরা অবস্কিউরার প্রথম রেকর্ড।
মুসলিম বিজ্ঞানের এই সুবর্ণ যুগে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের বিষয় আলোচনা করা যেতে পারে। প্রথম দিকেই হাসপাতালসমূহ সম্ভবত জুন্দিশাপুরের প্রাচীন ও বিখ্যাত একাডেমী হাসপাতালের আদর্শে প্রতিষ্ঠিত হয়। পারস্য ভাষার বিমারিস্তান শব্দটি হাসপাতালের নাম হিসাবে মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র প্রচলিত হয়। আমরা নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ ধরনের কমপক্ষে ৩৪টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য পেয়েছি। এগুলি পারস্য থেকে মরক্কো পর্যন্ত এবং উত্তর সিরিয়া থেকে মিসর পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কায়রোতে ৮৭২ খৃস্টাব্দে গভর্নর ইবনে তুলুন কর্তৃক প্রথম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। পরবর্তীকালে এখানে আরো হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাগদাদে হারুনুর রশীদের নির্দেশে নবম শতকের সূচনায় প্রথম হাসপাতালের সৃষ্টি করা হয়। একাদশ শতকে ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালের কথা জানা যায়। মুসলিম ঘটনাপঞ্জীসমূহে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক তথ্যসমূহ অত্যন্ত সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এগুলির কেবল বাজেটই নয় চিকিৎসক, চক্ষু চিকিৎসক এবং বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মচারীদের বেতনের বিষয়ও জানা যায়। প্রধান চিকিৎসক ও শল্যচিকিৎসকগণ ছাত্র ও গ্রাজুয়েটদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতেন, তাদের পরীক্ষা গ্রহণ করতেন এবং ডিপ্লোমা প্রদান করতেন। চিকিৎসক, ভেষজ বিশেষজ্ঞ এবং নরসুন্দরদের পরীক্ষা করা হতো। দৃষ্টান্তস্বরূপ, শিশু চিকিৎসকগণ পল অব ইজিনার অ্যানাটমী ও সার্জারী সম্পর্কে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা হতো। হাতেকলমে শিক্ষা প্রদানেরও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। হাসপাতালে পুরুষ ও মহিলাদের জন্য দুটি বিভাগ ছিল। প্রত্যেক বিভাগের নিজস্ব ওয়ার্ড ও ডিসপেন্সারী ছিল। কোন কোন হাসপাতালের নিজস্ব গ্রন্থাগার ছিল। বহু চিকিৎসককে একজন গুরুর অধীনে শিক্ষানবীস হিসাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। এবং এই গুরু প্রায়ই পিতা বা পিতৃব্য ছিলেন। অন্যরা কোন বিখ্যাত চিকিৎসকের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য ভিন্ন দেশে সফরে যেতেন। স্পেনের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, কাডিযে জনৈক চিকিৎসককে সেখানকার গভর্নরের উদ্যোগে নিয়োগ করা হয়। তিনি বিভিন্ন দেশ সফর করে ঔষধ তৈরিতে ব্যবহারের জন্য যেসব দুষ্প্রাপ্য গুল্ম সংগ্রহ করেন উক্ত উদ্যানে সেগুলির চাষ করতেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞান ছাড়া অন্যান্য বিজ্ঞান প্রধানত মসজিদে শিক্ষা দেওয়া হতো। ইসলামের প্রাথমিক যুগে এসব বিষয় উদারভাবে পণ্ডিতদের এখতিয়ারে ছেড়ে দেওয়া হতো। খলীফা, রাজা ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তির দ্বারা একাডেমিক লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠার নজীরও রয়েছে। আরবী ঘটনাপঞ্জীসমূহে এসব প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রচুর তথ্য দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ মসজিদে কেবল ধর্মতাত্ত্বিক গ্রন্থ নয়-দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক গ্রন্থের লাইব্রেরীও ছিল এবং এখনো বহু স্থলে রয়েছে। আমরা ইতিমধ্যেই খলীফা আল মামুন কর্তৃক ৮৩০ খৃষ্টাব্দের দিকে বাগদাদে 'জ্ঞান ভবন' প্রতিষ্ঠার বিষয় উল্লেখ করেছি। তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র আল-মুতাওয়াক্কিল এবং তাঁর দরবারের বহু ওমরাহও একই পথ অনুসরণ করেন। খলীফার বন্ধু ও সচিব আলী ইবনে ইয়াহইয়ার পল্লী ভবনে একটি সুন্দর গ্রন্থাগার ছিল। কায়রোতে ফাতিমীয় খলীফা আল হাকিম ৯৯৫ খৃষ্টাব্দে একটি 'বিজ্ঞান ভবন' প্রতিষ্ঠা করেন। এর সঠিক বাজেট জানা যায়। নিষ্ঠামূলক ধর্মতত্ত্ব প্রাধান্য লাভ করার পর ধর্মদ্রোহিতার বিপদের কথা চিন্তা করে এটি বাতিল করা হয়।
প্রত্যেক সক্ষম মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য হিসাবে মক্কা ও মদীনায় তীর্থ যাত্রা বিজ্ঞান চর্চা প্রসারে সহায়তা করে। ভারত, স্পেন, এশিয়া মাইনর ও আফ্রিকার যেসব জ্ঞানার্থী হজ্জে যেতেন তাঁদের স্বভাবতই বহু দেশ হয়ে যেতে হতো। এসব দেশে তাঁরা বিভিন্ন মসজিদ ও একাডেমী পরিদর্শন করতেন এবং সেখানকার বিখ্যাত পণ্ডিতদের সঙ্গে জ্ঞান চর্চামূলক মতবিনিময় করতেন। এ ছাড়া বিখ্যাত শিক্ষকদের শিক্ষা কোর্স অনুসরণের জন্য বহু শিক্ষার্থী তিউনিস থেকে পারস্য কিংবা কাস্পিয়ান সাগরের উপকূল থেকেও কর্ডোভায় আগমন করতেন। প্রকৃত শিক্ষা প্রদান পদ্ধতি অনেকটা বর্তমানকালের মতোই। অধ্যাপক কোন একটি থামে ঠেস দিয়ে উপবেশন করতেন এবং শিষ্যরা চক্রাকারে তাঁর চারদিকে জড়ো হতেন। প্রাচীনকাল থেকে বিখ্যাত কায়রোর আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশাল হিপোস্টাইল হলের অভ্যন্তরে পর্যটকগণ এখনো এ ধরনের ২০-৩০টি দল দেখতে পারেন। এটি সম্ভবত গ্রীস ও কর্ডোভার শিক্ষা প্রদান প্রণালীর সত্যিকারের চিত্র এখনো অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
৪. পতন যুগ প্রায় ১১০০ থেকে
ইসলামের প্রাথমিক যুগে প্রচলিত ধর্মমতের প্রতি নিষ্ঠা বিজ্ঞানচর্চা সহ্য করলেও আমরা একথা বলতে পারি যে, বিখ্যাত ধর্মীয় গুরু আল-গায্যালীর পর থেকে নির্যাতন এই সহনশীলতার স্থলাভিষিক্ত হয়, "কারণ এগুলি বিশ্ব সৃষ্টি ও স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস নষ্ট করে।" বড় বড় স্বাধীন চিন্তাবিদের আবির্ভাব রোধে এই মনোভাব একমাত্র কারণ না হলেও এদের দমিয়ে রাখার পিছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল, দ্বাদশ শতকে একটি অচলাবস্থা বিরাজ করে। এ সময়ে রাযী, ইবনে সিনা ও জাবিরের রচনাবলী পুনঃপ্রকাশিত হয়। সংক্ষিপ্ত করা হয় এবং এগুলির ওপর ভাষ্য রচনা করা হয়। কিন্তু কোন বিশিষ্ট ও স্বাধীন রচনা কদাচিৎ দেখা যায়। চিকিৎসাবিদদের ক্ষেত্রে ইহুদীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা এবং বিশেষ করে বাগদাদ, কায়রো ও স্পেনের রাজদরবারে ক্রমবর্ধমান হারে তাদের চিকিৎসা বিজ্ঞান চর্চা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এর কারণ, সম্ভবত ইহুদীরা ইসলামের নিষ্ঠামূলক মতবাদের বিধিনিষেধ থেকে তুলনামূলকভাবে মুক্ত ছিল। রাজ দরবারের এরূপ আদর্শস্থানীয় বিশিষ্ট ইহুদী চিকিৎসাবিদ, দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদ ছিলেন মাইমোনাইডস।
তিনি স্পেনে জন্মগ্রহণ করেন এবং কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় কায়রোতে মহান সালাহউদ্দিন ও তাঁর পুত্রদের অধীনে অতিবাহিত করেন। চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা হচ্ছে অ্যাফোরিজম্স। এতে তিনি স্বয়ং গ্যালেনের মতামতের সমালোচনা করেন। দরবারের চিকিৎসক হিসাবে তিনি সুলতানের জন্য স্বাস্থ্য-বিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করেন। এগুলি ইসলামের পরবর্তী শতকসমূহের চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত আদর্শ রচনা। কায়রোর দরবার অন্যভাবে উদার হলেও সেখানে গভীর নিষ্ঠামূলক ধর্মীয় মতবাদের প্রভাব কতখানি ছিল তার প্রমাণ মাইমোনাইডসের একটি পুস্তিকার শেষের দিকে প্রদত্ত ক্ষমা প্রার্থনামূলক বক্তব্য থেকে বোঝা যায়। মনের অবসাদ দূর করার জন্য তিনি সুলতানকে নিষিদ্ধ মদ্যপান ও সঙ্গীত উপভোগের পরামর্শ দেন, আর সে জন্যই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সুলতানের কাছে ক্ষমতা প্রার্থনা করেন।
মাইমোনাইডসের বয়সে তরুণ সমসাময়িক মুসলিম পণ্ডিত আবদুল লতিফ বিখ্যাত জ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য এবং মিসর দেশ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য বাগদাদ থেকে কায়রো সফর করেন এবং এ সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত বিবরণী প্রদান করেন। মিসরের ১২০০ থেকে ১২০২ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত দুর্ভিক্ষ ও ভূমিকম্পের বর্ণনা দেওয়ার পর তিনি কায়রোর উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত একটি প্রাচীন গোরস্থানে তাঁর অস্থিতত্ত্ব বিষয়ক গবেষণার একটি চমৎকার বিবরণী প্রদান করেন। নিম্নের চোয়াল এবং মেরুদণ্ডের নিম্নস্থ অস্থি সম্পর্কে গ্যালেন যে বিবরণ দিয়ে গেছেন তিনি তা পরীক্ষা করে সংশোধন করেন।
এই যুগে ঔষধ বিজ্ঞানের ওপর বহু গ্রন্থ রচিত হয়। এগুলিতে সাধারণ ওষুধের বিষয় কিংবা যৌগিক ওষুধের বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। সাধারণ ঔষধ সংক্রান্ত রচনার জন্য ইবনে আল-বাইতার সব চাইতে বিখ্যাত। অপর শ্রেণীর রচনাসমূহকে আকরাবাজিন বলা হতো। ইবনে আল-বাইতারের রচনাটির নাম হচ্ছে এ কালেকশন অব সিম্পল ড্রাগস। তিনি স্পেন থেকে সিরিয়া পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরের উপকূল থেকে ওষুধ তৈরির বহু লতাগুল্ম ও উপকরণ সংগ্রহ করেন, প্রায় ১৪০০টি উপকরণের বিবরণী প্রদান করেন এবং ১৫০ জনেরও বেশি প্রাচীন ও আরব লেখকের বর্ণিত উপাদানের সঙ্গে সেগুলির তুলনা করেন। এই রচনা অসাধারণ পাণ্ডিত্য ও পর্যবেক্ষণের স্বাক্ষর বহন করে এবং এটি উদ্ভিদ বিজ্ঞানের ওপর আরবদের শ্রেষ্ঠতম গ্রন্থ।
যৌগিক ওষুধ সংক্রান্ত পরবর্তীকালের আরবী গ্রন্থগুলি এখনো মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ওষুধ প্রস্তুতকারকদের কাছে সমাদৃত। বর্তমানে সব চাইতে জনপ্রিয় বইগুলির মধ্যে ইহুদী কোহেন আল আত্তার লিখিত ম্যানেজমেন্ট অব দি ড্রাগ স্টোর এবং দাউদ আল আনতাকী রচিত মেমোরিয়াল এর নাম উল্লেখযোগ্য। দুটি গ্রন্থই কায়রোতে রচিত হয়। এসব গ্রন্থের বহু প্রাচীন ও জটিলতাপূর্ণ প্রস্তুত প্রণালী ইউরোপীয় ওষুধ প্রস্তুত কারখানাগুলিতে প্রবর্তিত হয়। এমনিভাবে বহু যৌগিক ওষুধের নাম প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে প্রচলিত হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ মধুসহযোগে গাঢ় করা ফলের রস রব, ওষুধ জাতীয় সুগন্ধী পানীয় জুলেপ এবং সিরাপ এর নাম উল্লেখযোগ্য।
চতুর্দশ শতকের শুরুতে চিকিৎসা বিষয়ক মুসলিম লেখকদের রচনায় জাদু ও কুসংস্কারমূলক চর্চার বিষয় ধীরে ধীরে প্রবেশ করে। এদের চিকিৎসা-বিষয়ক জ্ঞান প্রায়ই ধর্মীয় রচনা থেকে উদ্ভূত হয়। এর ফলে এসব উপাদানের সাধারণ মানের আরো অবনতি ঘটে। স্পেনে চিকিৎসাবিদদের মধ্যে দর্শন প্রবণতা প্রাধান্য লাভ করে। দুজন মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে জুহর ও ইবনে রুশদ এই শ্রেণীর আদর্শ স্থানীয় ব্যক্তি। ইবনে জুহর আল মোহেড রাজদরবারে একজন অভিজাত চিকিৎসক ছিলেন। তিনি শল্যচিকিৎসা ও শল্য চিকিৎসকদের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করেন। সাধারণ চিকিৎসা পেশার চাইতে তিনি চিকিৎসা সংক্রান্ত পরামর্শদাতা হিসাবে কাজ করতেন। তাঁর প্রধান রচনা আরবী আত-তাইসির নামে পরিচিত ছিল। এটি ১২৮০ খৃ. ভেনিসে জনৈক ইহুদীর সহায়তায় প্যারাভিসিয়াস কর্তৃক থেইসির শিরোনামে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। এখানেই পরবর্তীকালে এটি বার বার মুদ্রিত হয়। প্রধানত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে রচিত হওয়ায় বইটিতে চিন্তার স্বাধীনতার উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। সম্ভবত এই কারণেই গ্রন্থটি ইউরোপের তুলনায় আরবদের কাছে কম জনপ্রিয়তা লাভ করে।
ইবনে জুহরের শিষ্য ও বন্ধু ইবনে রুশদ অ্যারিস্টটলের শ্রেষ্ঠতম দার্শনিকদের অন্যতম ছিলেন। তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রের ওপরও ১৬টি গ্রন্থ রচনা করেন। এর মধ্যে জেনারেল রুল্স অন মেডিসিন গ্রন্থটির ল্যাটিন অনুবাদ অত্যন্ত জনপ্রিয়। ১২৫৫ সালে পাডুয়ান ইহুদী বোনাকোসা কলিজেট শিরোনামে এটি অনুবাদ করেন। ইবনে জুহরের থেইসিরের সঙ্গে এটি কয়েকবার মুদ্রিত হয়। তাঁর গ্রন্থের সর্বত্র, বিশেষ করে দ্বিতীয় খণ্ডের যেখানে তিনি ভাষাতত্ত্ব ও মনস্তত্ত্ব আলোচনা করেছেন সেখানে ইবনে রুশদ নিজেকে একজন অ্যারিস্টটলের চিন্তাবিদ হিসাবে প্রকাশ করেছেন। তিনি প্রায়ই রাযী ও ইবনে জুহরের মতামতের সঙ্গে হিপোক্রেটিস ও গ্যালেনের মতামতের তুলনামূলক আলোচনা করেন।
'ব্ল্যাক ডেথ' নামে পরিচিত চতুর্দশ শতকের প্লেগ মহামারী স্পেনের মুসলিম চিকিৎসকগণকে ধর্মীয় সংস্কার থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ প্রদান করে। ধর্মীয় সংস্কার অনুযায়ী প্লেগকে সংক্রামক ব্যাধি মনে না করে আল্লাহ্র একটি শাস্তি মনে করা হতো। প্রখ্যাত আরব রাষ্ট্রনীতিবিদ, ঐতিহাসিক ও চিকিৎসাবিদ গ্রানাডার ইবনে আল-খাতিব তাঁর অন প্লেগ নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থে এই রোগের বর্ণনা দান করেন। এই গ্রন্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখানে তুলে ধরা হচ্ছেঃ "অভিজ্ঞতা, পর্যালোচনা এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রমাণ থেকে; পোশাক, ব্যবহৃত পাত্র ও কানের দুলের মাধ্যমে সংক্রমিত হওয়ার বিশ্বাসযোগ্য বিবরণী থেকে এক ঘরের লোকদের দ্বারা অন্য ঘরের লোকদের মধ্যে এটির প্রসার থেকে; কোন রোগাক্রান্ত দেশ থেকে আগত ব্যক্তিদের মাধ্যমে রোগমুক্ত সামুদ্রিক বন্দরে সংক্রমণ থেকে... বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের .... এবং আফ্রিকার ভবঘুরে বেদুইন উপজাতিদের সংক্রমণমুক্ত অবস্থা থেকে সংক্রমণের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।... অতএব এই বক্তব্যকে অবশ্যই মূলনীতি হিসাবে গ্রহণ করতে হবে যে, হাদীস থেকে যে প্রমাণ গ্রহণ করা হয়েছে তা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রমাণের সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে অসঙ্গতিপূর্ণ হলে তার সংশোধন করতে হবে।"
অত্যন্ত গোঁড়ামির যুগে এই বক্তব্য যথেষ্ট দুঃসাহসের পরিচায়ক। মুরীয় চিকিৎসাবিদ ইবনে খাতিমা ১৩৪৮-৪৯ খৃস্টাব্দে স্পেনের আলমেরিয়ায় যে প্লেগ মহামারী দেখা দেয় সে সম্পর্কে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। চতুর্দশ শতক থেকে ষোড়শ শতকের মধ্যে ইউরোপে প্লেগ সংক্রান্ত যে অসংখ্য বই সম্পাদিত হয় সেগুলির তুলনায় এই গ্রন্থটি অনেক বেশি উন্নতমানের। তিনি বলেন: "আমার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফল এই যে, কোন ব্যক্তি যদি রোগীর সংস্পর্শে আসে তাহলে সে সঙ্গে সঙ্গে একই লক্ষণযুক্ত রোগে আক্রান্ত হয়। প্রথম রোগীর যদি শ্লেষ্মার আকারে রক্ত নিঃসৃত হয় দ্বিতীয় রোগীরও তাই হবে... প্রথম রোগীর কুঁচকি, বগল ইত্যাদি স্থানে যদি গ্রন্থিস্ফীতি দেখা দেয় তাহলে দ্বিতীয় রোগীরও ঠিক একই স্থানগুলিতে গ্রন্থিস্ফীতি দেখা দেবে। প্রথম রোগীর যদি আলসার হয়, দ্বিতীয় রোগীরও তাই হবে। দ্বিতীয় রোগীও একইভাবে অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়ায়।"
এসব লেখকের শিক্ষার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, গ্রীক চিকিৎসাবিদরা রোগের সংক্রমণ বৈশিষ্ট্যের মতবাদের ওপর কোন গুরুত্ব আরোপ করেননি এবং এ বিষয়টি অধিকাংশ মধ্যযুগীয় লেখকের রচনায়ও প্রায় কোন গুরুত্ব পায়নি। চিকিৎসা শাস্ত্র ছাড়া বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে পতন যুগে বহু গ্রন্থ রচিত হয়। কিন্তু তার মধ্যে অবনতির লক্ষণও কম সুস্পষ্ট নয়। একাদশ শতকের পর আলকেমীর ওপর আরবী ও পারস্য ভাষায় প্রায় ৪০টি গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু উক্ত বিষয়ে এসব রচনার নতুন অবদান অতি সামান্য। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ইতিহাসের অত্যন্ত প্রতিভাবান আরব দার্শনিক এবং তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠতম বুদ্ধিজীবী ইবনে খালদুন আলকেমীর ঘোর বিরোধী ছিলেন।
ধাতু-বিজ্ঞান আলকেমীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। মূল্যবান পাথর সংক্রান্ত প্রায় ৫০টি আরবী গ্রন্থের নাম জানা যায়। এগুলির মধ্যে সব চাইতে বিখ্যাত গ্রন্থ হচ্ছে শিহাবুদ্দিন আত তিফাশীর ফ্লাওয়ার্স অব নলেজ অব স্টোনস। এতে ২৫টি অধ্যায়ে সমসংখ্যক মূল্যবান পাথর সম্পর্কে ব্যাপক তথ্য প্রদান করা হয়েছে। এসব পাথরের উৎস, ভৌগোলিক এলাকা, খাঁটিত্ব, মূল্য এবং ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজনে এগুলির ব্যবহারের বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে। প্লিনি ও অ্যারিস্টটলীয় ভুয়া গ্রন্থ ছাড়া তিনি কেবল আরব লেখকদের উদ্ধৃতি প্রদান করেন।
প্রাণীতত্ত্ব সম্পর্কে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম গ্রন্থ হচ্ছে মোহাম্মদ আদ-দামিরীর জীব-জন্তুর জীবন। লেখক একজন ধর্মীয় শিক্ষক ছিলেন। তাই তাঁর গ্রন্থটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাপ্রসূত নয়, বরং বিভিন্ন রচনা থেকে তিনি তাঁর তথ্যসমূহ সংকলিত করেছেন। বইটি নিছক পাণ্ডিত্যপূর্ণ হলেও প্রাচ্যে অত্যন্ত প্রসিদ্ধি লাভ করে। এর বিভিন্ন অংশে লোকগাথা, জনপ্রিয় ওষুধ এবং বর্ণগত মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে বহু মূল্যবান তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে। কিন্তু এতে সব সময় অসংলগ্ন বর্ণনার প্রাচুর্যও দেখা যায়।
বিশ্বতত্ত্ব সম্পর্কে আরব ও পারস্যের পণ্ডিতরা যেসব বিশ্বকোষ রচনা করেছেন তাঁর সবগুলিতেই জীবজন্তু, উদ্ভিদ ও পাথর সংক্রান্ত বিভাগ রয়েছে। এগুলির মধ্যে যাকারিয়া আল কাযউইনীর বিশ্বকোষটি সব চাইতে বিখ্যাত। পদার্থবিদ্যা সম্পর্কে বেশ কিছু সংখ্যক বই এবং বিশ্বকোষের বিভাগ রয়েছে। কিন্তু এর অধিকাংশ রচনাতেই দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টির আলোচনা করা হয়েছে।
ওজন ও পরিমাপ, বিশেষত দাঁড়িপাল্লা সম্পর্কিত পর্যালোচনায় পরবর্তী শতকসমূহে মুসলমানরা বিশেষ তৎপর ছিলেন। এ সম্পর্কে মূলত গ্রীক ক্রীতদাস এবং মার্ভের অধিবাসী আল খাযিনী দি ব্যালেন্স অব উইজডম নামে একটি বিরাট গ্রন্থ রচনা করেন। এর কয়েকটি অংশমাত্র সম্পাদিত রয়েছে। সাবিত ইবনে কাররা তথাকথিত 'রোমান' দাঁড়িপাল্লা বা তুলাদণ্ড সম্পর্কে যে অনুসন্ধান কার্য পরিচালনা করেন আল-খাযিনী তা অব্যাহত রাখেন। এ ছাড়াও তাঁর রচনার মধ্যে সুনির্দিষ্ট ভার এবং খাদের সুনির্দিষ্ট ওজন সম্পর্কে মূল্যবান অভিমতসমূহ পাওয়া যায়। পানি পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলের যত কাছাকাছি হয় তার ঘনত্বও ততো বেশি হয়। এই বিষয়টি নিয়েও আল-খাযিনী আলোচনা করেন এবং রজার বেকন কর্তৃক বিষয়টি তুলে ধরার আগেই তিনি তা তুলে ধরেন।
পানি বিজ্ঞান সংক্রান্ত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা সম্পর্কে এবং পানি, পারদ, ওজন কিংবা জ্বলন্ত মোমবাতির সাহায্যে পরিচালিত ঘড়ি সম্পর্কে অসংখ্য চিত্র সম্বলিত অত্যন্ত সুন্দর সুন্দর পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়। আল-জাযারী ১২০৬ খৃস্টাব্দে মেসোপটেমিয়ায় যন্ত্রবিজ্ঞান ও ঘড়ি সম্পর্কে একটি বিরাট গ্রন্থ রচনা করেন। মুসলিম বিশ্বে এটি সর্বাধিক প্রচারিত। একই সময়ে পারস্যবাসী রিদওয়ান তাঁর পিতা মুহাম্মদ ইবনে আলী কর্তৃক দামেস্কের অন্যতম ফটকের কাছে নির্মিত জল-ঘড়ির বর্ণনা দান করেন। এর নির্মাণ-কৌশল সমগ্র মুসলিম বিশ্বে বহুলভাবে প্রশংসিত হয় এবং এর স্মৃতি ষোড়শ শতক পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এসব বিষয়ের গ্রন্থকারগণ আর্কিমিডিস, অ্যাপোলোনিয়াস ও টেসিবিয়াসের প্রসঙ্গ উল্লেখ করলেও তাঁদের নিজস্ব যান্ত্রিক ব্যবস্থার সঠিক বর্ণনা অনবদ্য।
আলোক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন পারস্যবাসী কামালউদ্দীন। তিনি ক্যামেরা অবস্কিউরা সম্পর্কে আল-হায়সামের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পুনরাবৃত্তি করেন এবং এটির উন্নতি সাধন করেন। বৃষ্টির ফোঁটার মধ্যে সূর্যালোকের প্রতিসরণ পরীক্ষা করার জন্য তিনি কাঁচের অভ্যন্তরে আলোকরশ্মির গতিপথও পর্যবেক্ষণ করেন। এর ফলে তিনি প্রাথমিক পর্যায়ের ও দ্বিতীয় পর্যায়ের রামধনুর উদ্ভব বিশ্লেষণে সক্ষম হন। কায়রোর জনৈক ধর্মতত্ত্ববিদ ও বিচারক শিহাবুদ্দীন আল-কারাফী আলোক বিজ্ঞান সম্পর্কে যে গ্রন্থ রচনা করেন তাতে সাধারণ লোক হয়েও বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহের অপূর্ব নজীর সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির চাইতে কাল্পনিক পদ্ধতিতে আলোকবিজ্ঞান সংক্রান্ত ৫০টি সমস্যা আলোচনা করেন। এর মধ্যে তিনটি এ জন্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, এগুলিতে সিসিলীস্থ ফ্রাঙ্কদের সম্রাট ও রাজা মুসলিম পণ্ডিতদের উদ্দেশ্যে যে সব প্রশ্ন রাখেন সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ইনিই হচ্ছেন হহেনস্টওফেনের দ্বিতীয় ফ্রেডারিক। তিনি ১২২০ থেকে ১২৩০ খৃস্টাব্দের মধ্যে স্পেন ও মিসরের মুসলিম পণ্ডিতদের জন্য বিভিন্ন দার্শনিক ও জ্যামিতিক সমস্যা তুলে ধরেন। আলোক বিজ্ঞান সংক্রান্ত তাঁর তিনটি প্রশ্ন হচ্ছে: দাঁড় ও বল্লম আংশিকভাবে পানিতে থাকলে সেগুলিকে বাঁকানো মনে হয় কেন? দিগন্তের কাছাকাছি এলে ক্যানোপাসকে বড়ো দেখায় কেন? চোখে ছানি পড়ার প্রাথমিক অবস্থায় এবং অন্যান্য চক্ষুরোগে দৃষ্টির সামনে কালো কালো দাগ ভাসমান দেখায় কেন?
সর্বশেষে আমরা মুসলিম চিকিৎসাশাস্ত্র ও বিজ্ঞানের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি জীবনীমূলক রচনার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। প্রথমে ইবনে আল-কিফতির দার্শনিকদের ইতিহাস উল্লেখযোগ্য। এতে গ্রীক, সিরীয় ও মুসলিম চিকিৎসাবিদ, জ্যোতির্বিদ ও দার্শনিকদের ৪১৪টি জীবনী স্থান পেয়েছে। আরবরা গ্রীক সাহিত্যের যে জ্ঞানের অধিকারী হয়েছেন এটি তার একটি তথ্য-খনি এবং প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার যেসব তথ্য ক্লাসিক্যাল সূত্রে পাওয়া যায় না এতে তার অনেক কিছু পাওয়া যায়। ইবনে আবি উসাইবিয়ার চিকিৎসাবিদদের শ্রেণী সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য গ্রন্থটিও কোন অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি স্বয়ং অত্যন্ত জ্ঞানী চিকিৎসাবিদ ও চক্ষু চিকিৎসক ছিলেন এবং প্রধানত কায়রোতে বসবাস করতেন। তিনি ৬০০-রও বেশি চিকিৎসাবিদের জীবনী রচনা সম্পর্কে আলোচনা করেন। এসব তথ্য তিনি আংশিকভাবে যেসব রচনা বর্তমানে পাওয়া যায় না সেগুলি থেকে এবং আংশিকভাবে চিকিৎসা বিষয়ক হাজার হাজার গ্রন্থের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয়মূলক জ্ঞান থেকে সংগ্রহ করেছেন। আরব চিকিৎসাশাস্ত্রের আধুনিক ইতিহাস এই গ্রন্থটির ওপর ভিত্তি করে রচিত। আরব চিকিৎসা শাস্ত্রের ওপর মিসরের আদিম অধিবাসী ও আরমেনীয়দের নির্ভরশীলতার পরিচয় তাদের বিভিন্ন রচনার মাধ্যমে পাওয়া যায়।
৫. উত্তরাধিকার
এবারে আরব বিজ্ঞানের রত্নভাণ্ডার থেকে পাশ্চাত্যে এর প্রসারের প্রসঙ্গে আসা যাক। চিকিৎসা বিজ্ঞান ও প্রকৃতি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের উত্তরাধিকার গ্রীসেরই উত্তরাধিকার। গ্রীক উত্তরাধিকারের সঙ্গে বহু নতুন জিনিস যুক্ত হয়েছে এবং সেগুলি প্রধানত ব্যবহারিক। পারস্যবাসী রাযী একজন প্রতিভাবান চিকিৎসাবিদ হলেও তিনি হার্ভি ছিলেন না। আরব আবদুল লতিফ অ্যানাটমীর গভীর অনুসন্ধানী হলেও ভেসালিয়াসের সঙ্গে তাঁর তুলনা করা যায় না। মুসলমানরা হিপোক্রেটিস ও গ্যালেনের সামগ্রিক রচনার সুন্দর অনুবাদের অধিকারী ছিলেন। হুনাইনের ন্যায় বুদ্ধিমান ও বহু ভাষাভাষী পণ্ডিতরা তাত্ত্বিক বিশ্লেষণসহ সবকিছু সুন্দরভাবে উপলব্ধি করেন ও তুলে ধরেন। কিন্তু মুসলিম চিকিৎসাবিদদের অতিরিক্ত সংযোজন প্রায় সম্পূর্ণরূপে রোগ চিকিৎসা ও নিরাময়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। গ্রীকদের মতবাদ ও চিন্তাধারা অবিকল থাকে। সাবধানতার সঙ্গে সুবিন্যস্ত করার পর সেগুলিকে সম্পদ হিসাবে মজুদ করা হয়। একথা স্মরণ রাখা দরকার যে, মানুষের বা জীবন্ত প্রাণীর দেহ ব্যবচ্ছেদ মুসলমানের জন্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। ফলে এতদসংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রায় অসম্ভব ছিল এবং এ কারণে গ্যালেনের শব ব্যবচ্ছেদ ও শারীর বৃত্ত সংক্রান্ত ভুলত্রুটি সংশোধন করা যায়নি। অপরপক্ষে মুসলমানরা পারস্য, ভারত ও মধ্য এশিয়ার পণ্ডিতদের চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার এবং ওষুধ ও ধাতব পদার্থের জ্ঞান সংক্রান্ত বিশেষ ধারার অভিজ্ঞতা থেকে প্রেরণা লাভ করেন। এর ফলে তাঁরা রসায়ন শাস্ত্রে কিছুটা অগ্রগতি লাভ করেন। অবশ্য আলকেমীর উন্নয়নে গ্রীসের ও প্রাচ্যের অবদান কতখানি সে সম্পর্কে যথার্থ অভিমত প্রদানের মতো তথ্য এখনো আমরা পাইনি।
অন্যান্য বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গ্রীকদের কোন কোন শ্রেষ্ঠ রচনা মুসলমানদের কাছে অজ্ঞাত ছিল। দৃষ্টান্তস্বরূপ থিওফ্রেসটাসের উদ্ভিদ বিজ্ঞানের কথা উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব অবদান উল্লেখযোগ্য। অবশ্য এখানেও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব নিহিত। মুসলিম মনীষীরা গভীর পর্যবেক্ষণশীল হলেও তাদের চিন্তাধারা সীমাবদ্ধ ছিল। একথা প্রাণী বিজ্ঞান, খনিজ বিজ্ঞান এবং যন্ত্রবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মুসলিম বিজ্ঞান সাধনার গৌরব আলোক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নিহিত। এখানে ইবনে হায়সাম ও জনৈক কামাল উদ্দিনের গাণিতিক দক্ষতা ইউক্লিড ও টলেমীর দক্ষতাকে ম্লান করে দিয়েছে। বিজ্ঞানের এই বিভাগে তাঁরা বাস্তব ও স্থায়ী অবদান রেখে গেছেন।
১১০০ খৃস্টাব্দের দিকে মুসলমানদের চিকিৎসাশাস্ত্র ও বিজ্ঞান চর্চায় যখন স্থবিরতার সৃষ্টি হয় তখন এগুলি ল্যাটিন অনুবাদের মাধ্যমে ইউরোপে প্রচারিত হতে শুরু করে। চার্লস সিঙ্গার তাঁর শর্ট হিস্টোরী অব মেডিসিন গ্রন্থে সন্ন্যাসীদের এই সময়কার চিকিৎসা চর্চার বিবরণ দান করেন : "দেহ ব্যবচ্ছেদ ও শারীর তত্ত্বের অবসান ঘটে। রোগ নিরূপণ ব্যবস্থা একটি রুক্ষ অবান্তর বিধিতে পর্যবসিত হয়। উদ্ভিদ বিজ্ঞান ওষুধের তালিকায় স্থান গ্রহণ করে। নানা প্রকার কুসংস্কারমূলক ব্যবস্থার উদ্ভব হয়। চিকিৎসাশাস্ত্র কতিপয় সূত্র সংগ্রহের পর্যায়ে নেমে আসে এবং তার সঙ্গে নানাপ্রকার জাদুমন্ত্র যুক্ত হয়। যে বৈজ্ঞানিক ধারা চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রাণরস তা উৎস স্থলেই শুকিয়ে যায়।"
ইউরোপের কেবল একটি কোণে ন্যাপলসের অদূরে সালের্নোতে একটি মেডিক্যাল স্কুলে গ্রীক চিকিৎসাশাস্ত্রের কিছুটা স্বাক্ষর দেখা যায়। এখানেই তিউনিসীয় সংসার বিবাগী ভবঘুরে আফ্রিকান কনস্ট্যান্টাইন ক্যাম্পেনিয়ার বিখ্যাত মন্টি ক্যাসিনো কনভেন্টে সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণের আগে কয়েক বছর অতিবাহিত করেন। তিনি সেখানে ১০৭০ খৃস্টাব্দের দিকে অনুবাদ কাজে আত্মনিয়োগ করেন এবং আমৃত্যু তা অব্যাহত রাখেন। কনস্ট্যান্টাইনের ল্যাটিন অনুবাদ ত্রুটিপূর্ণ, বিভ্রান্তিকর, আরবী পরিভাষা সম্পর্কে অজ্ঞতা-প্রসূত এবং প্রায়ই দুর্বোধ্য। এগুলি মধ্যযুগের বর্বর-ল্যাটিন রচনার সমতুল্য। এতদসত্ত্বেও এসব অনুবাদ মধ্যযুগীয় ইউরোপের অনুর্বর ভূমিতে সর্বপ্রথম গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিচ্ছিন্ন বীজ বপনের কৃতিত্ব দাবি করে। কনস্ট্যান্টাইন নির্লজ্জভাবে অন্যের রচনা চুরি করতেন। তিনি আরবী থেকে ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করার পর বহু গ্রন্থ নিজের রচনা হিসাবে দাবি করেন। অবশ্য আমাদের এ কথা স্মরণ রাখা দরকার যে, ঐ যুগে গ্রন্থকারদের স্বত্বের প্রশ্নটিতে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না। তিনি হুবাইশের অনুবাদ থেকে গ্যালেনের ভাষ্যসহ হুনাইনের আরবী অনুবাদ থেকে হিপোক্রেটিসের অ্যাফোরিজম্স ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। এ ছাড়া গ্যালেনের বহু রচনাসহ হিপোক্রেটিসের প্রোগনস্টিকা ও ডায়েটা একিউটোরাম গ্রন্থ দুটিও অনুবাদ করেন। কনস্ট্যান্টাইনের রচিত বলে প্রচারিত ডি অকিউলিস গ্রন্থটির ভাষ্য থেকে ঐ যুগের বৈশিষ্ট্য বোঝা যাবে। এটি পরবর্তীকালে সম্ভবত সিসিলীতে জনৈক ডেমিটিয়াস কর্তৃক পুনরায় ল্যাটিন ভাষায় প্রকাশিত হয়। অথচ এটি ছিল মূলত হুনাইনের চক্ষু সম্পর্কে দশটি নিবন্ধ। অবশ্য কনস্ট্যান্টাইনই সর্বপ্রথম গ্রীক বিজ্ঞান বিষয়ক রচনার সঙ্গে পাশ্চাত্যকে পরিচিত করেন। এ ছাড়া তিনি আলী আব্বাস ও আইজ্যাক জুডিয়াসের রচনা অনুবাদের দায়িত্ব তাঁর উত্তরাধিকারীদের ওপর ন্যস্ত করেন। কনস্ট্যান্টাইন রাযীর আলকেমী সংক্রান্ত গ্রন্থ লিবার এক্সপেরিমেন্টোরাম ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। মন্টি ক্যাসিনোর সন্ন্যাসীদের মধ্যে তাঁর অনেক শিষ্য ছিল। এদেরই একজন ছিলেন 'স্যারাসেন' নামে পরিচিত জোহানেস অ্যাপলেসিয়াস। তিনি আরবী রচনা ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদে কনস্ট্যান্টাইনকে সাহায্য করতেন।
কনস্ট্যান্টাইনের জীবিতকালে স্পেন ও সিসিলী উভয় স্থানেই খৃস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে সক্রিয় সংগ্রাম অব্যাহত ছিল। ১০৮৫ খৃস্টাব্দে পাশ্চাত্যে মুসলিম জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৃহত্তম কেন্দ্র টলেডো স্পেনীয় খৃস্টানের অধিকারভুক্ত হয়। মুরীয় সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ পর্যবেক্ষণ করার জন্য এবং আরব শিল্পকলা সম্পর্কে শিক্ষা লাভের জন্য নতুন রাজধানীতে ল্যাটিন শিক্ষার্থীদের সমাগম হতে থাকে। যারা এসব জ্ঞান-বিজ্ঞান ও পরবর্তীকালে অনুবাদ কার্যের মাধ্যম হিসাবে কাজ করতেন তারা ছিলেন ইহুদী ও সাবেক মুসলিম প্রজা। এই গ্রন্থ সিরিজের অন্য একটি গ্রন্থ চার্লস ও ডরোথিয়া সিঙ্গার এ ধরনের সহযোগিতার একটি প্রাণবন্ত চিত্র তুলে ধরেন। এতে বিভিন্ন মতবাদের বৈজ্ঞানিক সংমিশ্রণের একটি অদ্ভুত ধারণা পাওয়া যায়। টলেডোতে আগমনকারী প্রথম বিশিষ্ট ইউরোপীয় বিজ্ঞানী ছিলেন ইংরেজ গাণিতিক ও দার্শনিক বাথের অ্যাডেলার্ড। অপরদিকে খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত স্পেনীয় ইহুদী-পেটাস আলফন্সী ইংল্যান্ড গিয়ে প্রথম হেনরীর চিকিৎসক পদে বরিত হন এবং সর্বপ্রথম মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রচার করেন। উভয় পণ্ডিত ব্যক্তিই দ্বাদশ শতকের প্রথমার্ধে আরবদের জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গাণিতিক রচনাবলী ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। এরপর অনেকেই তাঁদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেন।
দ্বাদশ শতকে টলেডোতে যে বিজ্ঞান চর্চার প্রসার হয় তা বহু দিক দিয়ে ৩০০ বছর আগের বাগদাদের অনুবাদ যুগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। খলীফা আল মামুন যেভাবে 'জ্ঞান ভবন' প্রতিষ্ঠা করেন ঠিক তেমনিভাবে আর্কডিকন ডোমিনিকো গুণ্ডিসালভির নির্দেশে আর্কবিশপ রেমাও টলেডোতে একটি অনুবাদ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। টলেডোতে ইহুদীরা বাগদাদের বহু ভাষাভাষী খৃস্টান ও সাবিয়ান অনুবাদকদের ভূমিকা গ্রহণ করেন। এসব ইহুদী আরবী, হিব্রু, স্পেনীয় এবং কোন কোন সময় ল্যাটিন ভাষাও জানতেন। সাবিয়ান সাবিত ইবনে কাররা যেমন গ্রীক রচনাবলী আরবীতে অনুবাদ করেন, তেমনি খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত ইহুদী আভেন ডেথ আরবদের বহু গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিঃ শাস্ত্র সম্পর্কিত গ্রন্থ ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। হুনাইন ইবনে ইসহাক আরবদের জন্য দার্শনিক, গাণিতিক, পদার্থ বিজ্ঞানী ও চিকিৎসাবিদদের রচনাবলী অনুবাদের মাধ্যমে যে অবদান রাখেন ক্রিমোনার জিরার্ড ল্যাটিন ভাষীদের জন্য সেই একই অবদান সৃষ্টি করেন।
জিরার্ড ১১১৪ খৃস্টাব্দে ইটালীর ক্রিমোনায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি টলেমীর আল মাজেস্ট এর সন্ধানে টলেডো আগমন করেন। ১১৭৫ খৃস্টাব্দে তিনি এই গ্রন্থটি ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। শীঘ্রই তিনি আরবী অনুবাদকদের মধ্যে সব চাইতে খ্যাতি ও মর্যাদা লাভ করেন। একজন স্থানীয় খৃস্টান ও ইহুদী অনুবাদ কাজে তাঁকে সাহায্য করেন। ১১৮৭ খৃস্টাব্দে পরলোকগমনের পূর্ববর্তী ২ দশকে তিনি প্রায় ৮০টি গ্রন্থ অনুবাদ করেন। এর মধ্যে কয়েকটি গ্রন্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রীক ও আরব জ্ঞান-বিজ্ঞানের রত্নভাণ্ডার উন্মোচিত করে তিনি তাঁর বহু অনুসারীকে এই দৃষ্টান্ত অনুকরণে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি ইউরোপে 'আরববাদের' সত্যিকার জনক। চিকিৎসাশাস্ত্রে আমরা জিরার্ডের কাছে নিম্নোক্ত রচনাসমূহ অনুবাদের জন্য ঋণী: হিপোক্রেটিস ও গ্যালেনের রচনাবলী, হুনাইনের প্রায় সমগ্র অনুবাদ, আল-কিন্দীর রচনাসমূহ, ইবনে সিনার বিশাল ক্যানন এবং আবুল কাসিমের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাব সৃষ্টিকারী সার্জারী। পদার্থ বিজ্ঞানে তিনি আরবী থেকে অ্যারিস্টটলের বহু রচনা অনুবাদ করেন। এগুলির মধ্যে অ্যারিস্টটলের সন্দেহজনক রচনা ল্যাপিডারি এবং আল-কিন্দী, আল ফারাবী, আইজ্যাক জুডিয়াস ও সাবিতের রচনাবলী রয়েছে।
টলেডোর ক্যাননও এ ব্যাপারে অবদান রাখেন। তিনি বয়সে তরুণ হলেও সম্ভবত জিরার্ডের সমসাময়িক ছিলেন। তিনি হিপোক্রেটিসের বায়ু, পানি ও স্থান সম্পর্কিত রচনাবলী এবং গ্যালেনের বহু রচনা অনুবাদ করেন। এর সবগুলিই তিনি হুবাইশ ও হুনাইনের আরবী সংস্করণ থেকে অনুবাদ করেন। স্পেনের মুর্সিয়ায় বসবাসকারী ইটালীর আলেস্সান্দ্রিয়ার পণ্ডিত রাফিনো গুনাইনের বিখ্যাত চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রশ্নাবলী অনুবাদ করেন। টর্টোসার জনৈক ইহুদী আব্রাহাম আবুল কাসিমের লিবার সার্ভিটোরিজ ও সেরাপিন দি ইয়ংগারের ডি সিম্পলিসিবাস অনুবাদে জেনোয়ার সিমনকে সাহায্য করেন। আবুল কাসিমের রচনার অন্যান্য অংশ ভ্যালেনসিয়ার জনৈক বেরেংগার ও ভিলানোভার আর্নল্ড কর্তৃক অনূদিত হয়। শেষোক্ত ব্যক্তি স্পেনে চিকিৎসাবিষয়ক রচনার সর্বশেষ বিখ্যাত অনুবাদক। ইবনে সিনা, আল কিন্দী, ইবনে জুহর ও অন্যদের রচনাবলী অনুবাদের জন্য আমরা তাঁর কাছে ঋণী।
১৩০ বছর পর্যন্ত মুসলিম শাসনাধীন সিসিলি ১০৯১ খৃস্টাব্দে সুনির্দিষ্টভাবে নর্ম্যানদের কর্তৃত্বাধীনে যায় এবং এ সময় থেকে আরব বিজ্ঞান প্রসারের একটি উর্বর কেন্দ্রে পরিণত হয়। অধিবাসীদের মধ্যে গ্রীক, আরবী ও ল্যাটিন কথ্য ভাষা হিসাবে প্রচলিত ছিল। কিন্তু কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তি, বিশেষ করে ইহুদীরা এই তিনটি ভাষার সাহিত্যও আয়ত্ত করেন। প্রথম রজার থেকে দ্বিতীয় ফ্রেডারিক পর্যন্ত রাজণ্যবর্গ, ম্যানফ্রেড ও আনজু বংশীয় প্রথম চার্লস ভাষা ও ধর্ম নির্বিশেষে জ্ঞানী-বিজ্ঞানীদের পালের্মোতে জড়ো করেন। টলেডোর ন্যায় এখানেও একদল বিজ্ঞ অনুবাদক গ্রীক ও আরবী থেকে ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদের কাজ শুরু করেন। প্রধানত জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিত শাস্ত্রের ওপর এসব অনুবাদকার্য সম্পন্ন হয়।
দ্বাদশ শতকে সিসিলীতে চিকিৎসা শাস্ত্রের ওপর কোন গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদ সম্পাদিত হয়নি। কিন্তু পরবর্তী শতকে আনজু বংশীয় চার্লসের রাজত্বকালে আমরা বিখ্যাত ইহুদী অনুবাদক ফারাজ ইবনে সেলিম এর সঙ্গে এবং রাযীর কন্টিনেন্স এর অনুবাদের সঙ্গে পরিচিত হই। তিনি ১২৭৯ খৃস্টাব্দে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সম্পন্ন করেন, যাতে একটি স্বাভাবিক জীবন কালের অর্ধেক ব্যয়িত হয়। রাজা চার্লসের নির্দেশে মোসেস অব পালের্মো নামক অপর একজন ইহুদীকে ল্যাটিন অনুবাদক হিসাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাঁর অনুবাদের মধ্যে আমরা কেবল অর্শরোগ সম্পর্কে একটি কল্পিত হিপোক্রেটিক রচনার অনুবাদ দেখতে পাই। দ্বিতীয় ফ্রেডারিকের প্রিয়ভাজন মাইকেল স্কট অ্যারিস্টটলের জীববিজ্ঞান ও উদ্ভিদবিজ্ঞান সংক্রান্ত সামগ্রিক রচনা, বিশেষত ইবনে সিনার ভাষ্যসহ ডি অ্যানিমালিভাস এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ আরবী ও হিব্রু থেকে ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। শেষোক্ত গ্রন্থটি তিনি ১২৩২ খৃস্টাব্দে সম্রাটের নামে উৎসর্গ করেন। সবাই জানেন, দ্বিতীয় ফ্রেডারিক প্রাণীবিজ্ঞানে অত্যন্ত আগ্রহশীল ছিলেন। তিনি হাতি, আরব দেশীয় এক কুঁজ বিশিষ্ট উট, সিংহ, চিতাবাঘ, বাজ পাখি, পেঁচা প্রভৃতি পোষা প্রাণী সংরক্ষণের জন্য তাঁর সম্পদ ও মুসলমানদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কাজে লাগান। এগুলি সঙ্গে নিয়ে তিনি ভ্রমণে বের হতেন। সম্রাট শিকার সম্পর্কে স্বয়ং একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এটি প্রধানত মাইকেল স্কটের রচনার ওপর এবং একই লেখকের অ্যারিস্টটলের প্রাণীবিদ্যার অনুবাদের ওপর ভিত্তি করে রচিত।
ইউরোপে মুসলিম বিজ্ঞান প্রচারে ক্রুসেডের প্রভাব বিস্ময়করভাবে অতি সামান্য। এই আন্দোলনের মধ্যে যে একটি মাত্র রচনার সন্ধান পাওয়া যায় তা পিসার জনৈক স্টিফেনের লেখা। তিনি সালের্মো ও সিসিলিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি এন্টিয়কে আগমন করেন এবং সেখানে ১১২৭ খৃস্টাব্দে আলী আব্বাসের লিবার রিগালিস অনুবাদ করেন। এতে তিনি আফ্রিকান কনস্ট্যান্টাইন কর্তৃক একই রচনার পূর্ববর্তী অনুবাদের তীব্র সমালোচনা করেন। আমরা ধরে নিতে পারি যে, আংশিকভাবে ক্রুসেডের প্রভাবেই ত্রয়োদশ শতকে ইউরোপের সর্বত্র হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব হাসপাতাল তখন আর কেবল পাদ্রিদের তত্ত্বাবধানে ছিল না। এগুলি সম্ভবত দামেস্কের সমসাময়িক সেলজুক শাসক নূরুদ্দীনের এবং কায়রোতে মামলুক সুলতান আল-মানসুর কালাউনের প্রতিষ্ঠিত অত্যন্ত সুন্দর বিমারিস্তানগুলির অনুকরণ। পরবর্তী শতকের ইউরোপীয় পর্যটকগণ শেষোক্ত প্রতিষ্ঠানগুলির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। কিছুকাল বিলুপ্ত হওয়ার পর আমরা এগুলির পুনরুজ্জীবন দেখতে পাই। পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট ত্রয়োদশ শতকের সূচনায় ইটালীর রোমে সান স্পিরিটো হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন এবং এরই অনুকরণে সমগ্র পশ্চিম ইউরোপে অনুরূপ প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। নবম লুই ১২৫৪-৬০ খৃস্টাব্দে ক্রুসেড থেকে অপ্রীতিকর অবস্থায় প্রত্যাবর্তনের পর প্যারিসে আশ্রম ও হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত ৩০০ গরীব অন্ধের জন্য এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে এর সঙ্গে চক্ষু রোগের একটি হাসপাতাল সংযুক্ত করা হয়। এটি বর্তমানে ফরাসী রাজধানীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতাল।
ক্রুসেডের সময় যেসব মুসলমান ফ্রাঙ্ক চিকিৎসকদের সংস্পর্শে আসেন তাঁরা শেষোক্তদের পেশাগত মানের তীব্র নিন্দা করেন। সিরীয় যুবরাজ উসামা তাঁর আরব খৃস্টান চিকিৎসক সাবিতের বিবরণের ওপর ভিত্তি করে যেসব কাহিনী বর্ণনা করেন তাঁর থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ১১৪০ খৃস্টাব্দের দিকে সাবেত এ ধরনের দুটি ঘটনা অবলোকন করেন যাতে জনৈক ফ্রাঙ্কের বর্বরোচিত অস্ত্রোপচারের ফলে দুজন রোগীই মারা যায়। কয়েকজন ল্যাটিন অনুবাদক উত্তর ইটালীতে অনুবাদ চর্চা করেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ এখানে পিসার বুরগুণ্ডিও সরাসরি গ্রীক থেকে গ্যালেনের রচনাবলী অনুবাদ করেন। ১২০০ খৃস্টাব্দের দিকে পিস্টোয়ার একারসিয়াস হুবাইশের আরবী সংস্করণ থেকে গ্যালেনের ডি ভিরিবাস এলিমেন্টোরাম অনুবাদ করেন। ১২৫৫ খৃস্টাব্দে খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত ইহুদী বোনাকোসা পাদুয়ায় ইবনে রুশদের কলিজেট ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। ১২৮০ খৃস্টাব্দে ইহুদী জ্যাকবের সহায়তায় প্যারাভিসিয়াস ভেনিসে ইবনে জুহরের তাইসির অনুবাদ করেন।
অন্য অনুবাদকদের সময় ও সূত্র অপরিজ্ঞাত। দৃষ্টান্তস্বরূপ আম্মার এর চক্ষু বিজ্ঞানের অনুবাদক ডেভিড হার্মেনাসের নাম উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা লেখকদের বহু ল্যাটিন অনুবাদ রয়েছে। এগুলি মাইমোনাইডস, ইবনে সিনা, জাবের, রাযী, আল হায়সাম প্রমুখের রচনা। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, আলকেমী সংক্রান্ত অধিকাংশ রচনাই অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের অনুবাদ। ষোড়শ শতক পর্যন্ত এই অনুবাদকার্য পুরাদমে অব্যাহত থাকে। এই প্রসঙ্গে একজন বিশিষ্ট অনুবাদক হিসাবে ইটালীর আঁদ্রে আল পাগোর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ইবনে সিনার ক্যানন, অ্যাফোরিজমি, ডি এনিমা, ইবনে রুশদ ও জোহানেস সেরাপিয়নের ছোটখাটো রচনা এবং ইবনে কিফতির জীবনীমূলক শব্দকোষ অনুবাদ করেন। এমনকি ষোড়শ শতকের পরেও বহু অনুবাদ সম্পন্ন হয়। এগুলি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে বিশেষ করে উত্তর ইটালী ও ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়।
এমনিভাবে গ্রীক ও আরবী রচনার শত শত অনুবাদ ইউরোপের উষর বৈজ্ঞানিক ভূমিতে আবির্ভূত হয়। এগুলি ফসলদায়ী বৃষ্টির ভূমিকা গ্রহণ করে। কনস্ট্যান্টাইনের অনুবাদের প্রভাবে সালের্নোতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশিষ্ট শিক্ষকদের একটি শ্রেণীর সৃষ্টি হয়। দেহব্যবচ্ছেদ চর্চা পুনরুজ্জীবনের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শল্যচিকিৎসা সম্পর্কে উৎকৃষ্ট পাঠ্য-পুস্তক প্রকাশিত হয়। যে স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা এতোদিন ধাত্রীদের একচেটিয়া ব্যাপার ছিল তা বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনার বিষয়-বস্তু হয়। চক্ষুরোগ চিকিৎসা ভবঘুরে হাতুড়ে চিকিৎসকদের হাত থেকে শিক্ষিত চিকিৎসকদের চর্চার অধীনে আসে।
দ্বাদশ শতক থেকে বেশ কিছুসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেগুলি নতুন জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এগুলির মধ্যে বলোনিয়া, পাদুয়া, মোনপলিয়া ও প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাইযেন্টাইন আলেকজান্দ্রিয়া ও খলীফা আমলের বাগদাদের ন্যায় সামগ্রিকভাবে প্রাচীন লেখকদের রচনা পাঠ শিক্ষাদানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কারণ এসব রচনা অবশেষে ল্যাটিন ভাষায় পাওয়া যেত। তখনো পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান প্রচলিত হয়নি। উদ্ভিদ বিজ্ঞান, প্রাণী বিজ্ঞান, পদার্থ বিদ্যা ও আলকেমী চর্চা সামগ্রিকভাবে গ্রীক-আরব ঐতিহ্য অনুসরণ করে। ষোড়শ শতক শেষ হওয়ার পরেই বলোনিয়ায় সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে মানুষের দেহ-ব্যবচ্ছেদ করা হয় এবং বৈধ পদ্ধতি প্রমাণ করার উদ্দেশ্যেই তা করা হয়। দেহ-ব্যবচ্ছেদ ও শরীর তত্ত্বের ক্ষেত্রে ইবনে সিনা গ্যালেনের যেসব ভুলভ্রান্তি তুলে ধরেন এতে তার সংশোধন করা যায়নি; কারণ ময়নাতদন্তের চাইতে ঐতিহ্যই শক্তিশালী থাকে।
অবশ্য ব্যবহারিক দিকে অস্ত্রোপচার, স্বাস্থ্য রক্ষা এবং সম্ভবত সর্বোপরি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি সাধিত হয়। মোনপোলিয়ার শল্যচিকিৎসক গাই দ্য চৌলিয়াক কাটাছেঁড়া ও চোখের ছানির নিন্দিত অস্ত্রোপচারে উদ্যোগী হন। মিলানের ল্যানফ্রাঞ্চি ফ্রান্সে বসতি স্থাপন করেন এবং সেখানে রক্তকণিকা ব্যান্ডেজ করার ও ক্ষতস্থানে জোড়া দেওয়ার উন্নত পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। উত্তর ইটালিতে কিছুকাল যাবত না পাকিয়ে বা পুঁজ বের না করে মদ্যযুক্ত পট্টি ব্যবহারের মাধ্যমে কাটা ঘায়ের চিকিৎসা প্রচলিত ছিল।
প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃতি বিজ্ঞানের কেন্দ্র ছিল। টলেডো থেকে ইবনে রুশদের ভাষ্যসহ প্রবর্তিত অ্যারিস্টটলীয় বিজ্ঞান ছিল সেখানকার বিজ্ঞান চর্চার ভিত্তি। রজার বেকন ও তাঁর বৈজ্ঞানিক প্রতিদ্বন্দ্বী আলবার্টাস ম্যাগনাস এখানে বড় বড় মুসলিম বিজ্ঞানীর রচনা ব্যাখ্যা করতেন। রজার বেকনের আলোক বিজ্ঞানের মতবাদ কিভাবে আল হায়সামের থেসাওরাস অপটিকা এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে তা আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। আলবার্ট তাঁর মিনারেলিবাস এ জাবের ও অন্যান্য আরব লেখকের আলকেমী মতবাদের পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি কেবল তাঁর প্রাণীবিদ্যা ও উদ্ভিদ বিদ্যা সংক্রান্ত পর্যালোচনায় কিছুটা মৌলিকত্বের পরিচয় দেন। কিন্তু এসব ক্ষেত্রেও তিনি আরবী অনুবাদের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল ছিলেন। ভিন্সেন্ট দ্য বুভা রচিত বিশ্বকোষ স্পেকুলাম নেচারেল এ জাবেরের প্রভাব অত্যন্ত সুস্পষ্ট। আর্নল্ড অব ভিলানোভা ও রেমাও লালের নামে যেসব আলকেমী সংক্রান্ত গ্রন্থ রয়েছে সেগুলি জাবেরের উদ্ধৃতিতে পরিপূর্ণ। জ্যোতিঃশাস্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরব আলকেমী ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতকে তার প্রাধান্য অক্ষুণ্ণ রাখে।
ষোড়শ শতকের পরে, বিশেষ করে উত্তর ইটালীতে চিকিৎসা শাস্ত্র ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আরবীর চাইতে গ্রীক ভাষা থেকে অনুবাদ অধিক থেকে অধিকতর গুরুত্ব লাভ করে। কোন প্রকার মৌলিক পার্থক্য না থাকা সত্ত্বেও 'গ্রীকবাদ' 'আরববাদের' বিরোধী ছিল। যতোদিন পর্যন্ত প্রাচীনদের গ্রন্থাবলী প্রায় এককভাবে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তি ছিল ততোদিন পর্যন্ত বিজ্ঞানের মতবাদ প্রাধান্য বজায় রাখে। পঞ্চদশ শতকের শেষার্ধে মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃত হওয়ার পর চিকিৎসাশাস্ত্র ও বিজ্ঞানের ওপর গ্রীক-আরবী রচনা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে বারংবার মুদ্রিত হয়। ১৫৩০ থেকে ১৫৫০ খৃস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে আরববাদ তার মরণাঘাত লাভ করে। একই সময়ে কোপার্নিকাস কর্তৃক জ্যোতির্বিজ্ঞানে বিপ্লব সাধিত হওয়ায় প্যারাসেলসাস আলকেমী ও চিকিৎসাশাস্ত্র সংশোধন করেন। তিনি তাঁর ছাত্রদের গ্যালেন ও ইবনে সিনা পরিহার করে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে ফিরে আসার জন্য অবিরামভাবে তাগিদ দেন। ১৫৪৩ খৃস্টাব্দে কোপার্নিকাসের ডি রিভল্যুশনিবাস অর্বিয়াম কালেস্টিয়াম প্রকাশিত হওয়ার একই বছরে আদ্রিয়াস বিসালিয়াস তাঁর মৌলিক নতুন অ্যানাটমি সম্পাদিত করেন। এই বছর চিকিৎসাশাস্ত্র ও বিজ্ঞানে মধ্যযুগের সমাপ্তি সূচনা করে এবং এর সঙ্গে সঙ্গে আরব বিজ্ঞানের সরাসরি প্রভাবেরও কার্যত পরিসমাপ্তি ঘটে।
কিন্তু এতদসত্ত্বেও আরববাদ অব্যাহত থাকে। ১৫২০ খৃস্টাব্দেও ভিয়েনায় এবং ১৫৮৮ খৃস্টাব্দে ফ্রাঙ্কফুর্ট অন দি ওডারে চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত পাঠ্যসূচী প্রধানত ইবনে সিনার ক্যানন ও রাযীর ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এমনকি ফ্রান্স এবং জার্মানীতে সপ্তদশ শতকেও কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তি আরব জ্ঞানচর্চা অব্যাহত রাখেন। এদিকে উত্তর ইটালীতে গ্রীকবাদী ও আরববাদীদের মধ্যে সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। আধুনিক বিজ্ঞান পদ্ধতির আবির্ভাবে উভয় পক্ষ পর্যুদস্ত না হওয়া পর্যন্ত এই সংগ্রাম চলতে থাকে। উনবিংশ শতকের সূচনা পর্যন্ত আরব ভেষজ-বিজ্ঞান টিকে ছিল। ইবনে আল-বাইতারের সিমপ্লিসিয়া এর ল্যাটিন অনুবাদ ১৭৫৮ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত ক্রিমোনায় মুদ্রিত হয়। সেরাপিয়ন ও মেসিউ দি ইয়ংগারের গ্রন্থাবলী ১৮৩০ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত পঠিত হয় এবং ইউরোপীয় ভেষজ বিজ্ঞানে ব্যবহারের জন্য সংক্ষিপ্ত করা হয়। ১১৮৪ খৃস্টাব্দে মেচিযার কর্তৃক গ্রীক, আরবী ও পারস্য সূত্র থেকে চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে যে আরমেনীয় গ্রন্থ সংকলিত হয় তা ১৮৩২ খৃস্টাব্দেও ভেনিসে পুনর্মুদ্রিত হয়। প্রাণীবিদ্যা সংক্রান্ত ১৮৩৮ খৃস্টাব্দের একটি প্রাচীন জার্মান গ্রন্থে আমি 'গেকো' নামক প্রাচ্য দেশীয় একটি নিরীহ অথচ বিষাক্ত গিরগিটি সম্পর্কে যাবতীয় রূপকথা দেখতে পেয়েছি। এসব কাহিনী আদ-দামিরির লাইফ অব অ্যানিমেল্স গ্রন্থে দেখা যায়।
চিকিৎসা শাস্ত্রের কোন কোন শাখায় গ্রীক-আরব ঐতিহ্য দীর্ঘকাল যাবত অব্যাহত থাকে। এমনকি ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও এগুলির চর্চা হয়। ভেসালিয়াস নিজেই চোখের অস্ত্রোপচার সম্পর্কে গ্যালেন ও ইবনে সিনার কতিপয় ভুলভ্রান্তি অপরিবর্তিত রাখেন এবং এগুলি আনুমানিক ১৬০০ খৃস্টাব্দের আগে পর্যন্ত সংশোধিত হয়নি। একটি জমাট তরল পদার্থ হিসাবে নয় বরং লেন্সের সুদৃঢ় অস্বচ্ছতা হিসাবে ছানির প্রকৃত বৈশিষ্ট্য ১৬০৪ খৃস্টাব্দে ফরাসী চিকিৎসাবিদ পিয়ের ব্রিসো আবিষ্কার করেন। আলেকজান্দ্রিয়ার অ্যান্টিলস কর্তৃক বর্ণিত এবং রাযী ও আলী ইবনে ঈসা কর্তৃক প্রচারিত সুইয়ের সহায়তায় প্রাচীন পদ্ধতিতে ছানির অস্ত্রোপচার ইংল্যান্ডে ১৭৮০ খৃস্টাব্দের দিকেও পার্সিভ্যাল পট কর্তৃক এবং জার্মানীতে ১৮২০ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত অনুসৃত হয়।
মুসলিম প্রাচ্যে প্রাচীন বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা বিষয়ক ঐতিহ্য এখনো জনপ্রিয় চিকিৎসা হিসাবে এবং গ্রাম্য নরসুন্দরদের মধ্যে পুরোপুরি প্রচলিত। এই গ্রন্থকার যেদিন এই কথাগুলি লিখছিলেন ঠিক সেদিনই কায়রোতে জনৈক ভবঘুরে সুদানী হাতুড়ে ডাক্তারকে অ্যান্টিলস ও ইবনে সিনার নির্দেশ অনুযায়ী কোন এক ব্যক্তির ছানি অস্ত্রোপচার অবলোকন করেন। মরক্কো থেকে ভারত পর্যন্ত দেশী ভেষজবিদগণ চিরাচরিত অভ্যাসবশত আরব চিকিৎসাবিদদের আকরাবাজিন্স অনুসরণ করে তাঁদের ওষুধ তৈরি করেন। পূর্বাপর বিষয় বিবেচনা করে আমরা এ কথা বলতে পারি যে, গ্রীকদের দিবা অবসানের পর মুসলিম চিকিৎসাশাস্ত্র ও বিজ্ঞান গ্রীক সূর্যের আলো বিকিরণ করে এবং তা পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় প্রজ্বলিত হয়ে মধ্যযুগীয় ইউরোপের গভীর তমসাচ্ছন্ন রাত্রিকে আলোকিত করে। কোন কোন উজ্জ্বল নক্ষত্র তাদের নিজস্ব আলোও প্রদান করে। রেনেসাঁর নতুন দিনের আবির্ভাবে এই চন্দ্র এবং নক্ষত্রগুলিও বিলুপ্ত হয়। যেহেতু সেই মহান আন্দোলনের দিকনির্দেশে ও প্রবর্তনে তাদের অবদান রয়েছে সেজন্য যুক্তিযুক্তভাবেই একথা দাবি করা যেতে পারে যে, তারা আমাদের মধ্যেই রয়েছে।
টিকাঃ
১. ১৮২৮ খৃস্টাব্দে উৎকীর্ণলিপিটি প্রথম পাঠ করে এম রিনাউদ উপরোক্ত নামটি দিয়েছেন। কিন্তু এম ম্যাক্সভ্যান বার্চেম এটি সংশোধন করে পৈতৃক হানফার-এর স্থলে মানআহ নাম দিয়েছেন।
১. আনজু রাজ বংশের প্রথম চার্লসের পৃষ্ঠপোষকতায় জিরজেন্টির সিসিলীয় ইহুদী চিকিৎসাবিদ ফারাজ ইবনে সালিম ল্যাটিন ভাষায় হাওউই অনুবাদ করেন।
১. আক্ষরিক অর্থ রাজকীয় পানি; এটি সোনা ও প্লাটিনাম দ্রবণে সক্ষম বলে এই নামে অভিহিত।
২. মূল আরবী রাহজ আল-গার (রাহজ) গুঁড়া+আল-গার, গুহাবা খনি), কমলা রঙের খনিজ পদার্থ, আতসবাজি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
৩. মূল আরবী আল-আণবিক।
৪. মূল আরবী আল-উল্লি।
১. ইবনে সিনার মেটাফিজিক্স সংক্রান্ত বইটির নাম ইলমূল ইলাহিয়্যাত, যার অর্থ 'স্বর্গীয় ব্যাপারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের জ্ঞান।'
২. আরবীতে ডিগ্রীধারীর জন্য নয়, পদের জন্য শব্দ ব্যবহার করা হয়।
১. পুরো নাম গাইয়াস প্লিনিয়াস সেকাস্তাস, রোমান প্রকৃতি বিজ্ঞানী ও গ্রন্থকার, জীবিতকাল ২৩-৭৯ খৃ। জ্যেষ্ঠ প্লিনি নামে পরিচিত।
১. ফরাসী ভাষায় এল গথিয়ার কর্তৃক এই রচনার অনুবাদ প্রকাশিত হয়। অ্যাকর্ড ডি লা রিলিজিয়ন এট ডি লা ফিলসফি। ট্রেইটি ডি ইবনে রুশদ, আলজার, ১৯০৫। স্পেনীয় ভাষায় এম অ্যাসিন কর্তৃক সেন্ট টমাসের তুলনাসহ এবং অত্যন্ত মূল্যবান ঐতিহাসিক ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণসহ এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়। হোমেনাজে এ ডি ফ্রান্সিস্কো কডেরা, মাদ্রিদ, ১৯০৪, পৃ. ২৭১ থেকে।
১. আক্ষরিক অর্থ রাজকীয় পানি; এটি সোনা ও প্লাটিনাম দ্রবণে সক্ষম বলে এই নামে অভিহিত।
১. দক্ষিণ আকাশের 'আর্গো' তারকাপুঞ্জের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র।
১. পুরো নাম উইলিয়াম হার্ভি। ইংরেজ চিকিৎসাবিদ, যিনি রক্ত সংবহন প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন।
২. পুরো নাম ভেসালিয়াস আদ্রিয়াস, ১৫১৪-১৫৬৪, ইটালীতে বসবাসকারী ফ্লেমিশ অ্যানাটমিস্ট।
১. ন্যাপলসের অদূরে দক্ষিণ-পূর্ব ইতালী।
১. তৃতীয় ক্রুসেডের সময় মিসরের সুলতান সালাহউদ্দিন কর্তৃক ছদ্মবেশে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম রিচার্ডের দুরারোগ্য ব্যাধি চিকিৎসার কাহিনী প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য।
১. অ্যারিস্টটলের যেসব অনুসারী তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণের সময় 'লাইসিয়াম' নামে এথেন্সের একটি উদ্যানে ইতস্তত বিচরণ করতেন।
১. পুরো নাম নিকোলাস কোপার্নিকাস (১৪৭৩-১৫৪৩), পোলিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের নিম্নোক্ত মতবাদের প্রবক্তা: গ্রহসমূহ সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণ করে; পৃথিবী তার কক্ষপথে আবর্তিত হওয়ার দরুনই নক্ষত্রসমূহের উদয়াস্ত বোঝা যায়।
১. পুরো নাম ফিলিপাস ওরিগুলাস প্যারাসেলসাস (১৪৯৩/-১৫৪১), সুইজারল্যাণ্ডে জন্মগ্রহণকারী জার্মান চিকিৎসাবিদ ও আলকেমী বিশেষজ্ঞ।
১. জার্মান শব্দ যার অর্থ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ও জীবন সম্পর্কে ব্যক্তি বিশেষের দর্শন বা ধারণা।
১. এই অংশটির পরিবর্তন, সংশোধন ও এ সম্পর্কে কতিপয় পরামর্শ দানের জন্য চার্লস সিগারের কাছে গ্রন্থকার অত্যন্ত ঋণী।
📄 সঙ্গীত
যে দুস্তর ব্যবধান প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সঙ্গীত শিল্পকে বিচ্ছিন্ন রেখেছে তা বিবেচনা করলে ইউরোপীয় সঙ্গীতে কোন আরব বা মুসলিম উত্তরাধিকারের অস্তিত্ব উপলব্ধি করা দুঃসাধ্য। ইউরোপীয়রা সঙ্গীতকে উল্লম্বভাবে এবং আরবরা সমান্তরালভাবে দেখে, সাধারণভাবে বলতে গেলে যে হার্মনিক ও মেলডিক মূলনীতি যথাক্রমে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের সঙ্গীত শিল্পের মধ্যে নিহিত এটিই হচ্ছে তার বোধগম্য পার্থক্য। তাছাড়া স্বর, ছন্দ ও মেলডিকে সুশোভিত করার ব্যাপারে আরবদের যেসব ধারণা রয়েছে তা আমাদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। অবশ্য দশম শতকের আগে দুটি শিল্পের পার্থক্য তেমন বিরাট ছিল না। বস্তুত দুটিকে একটি সাধারণ পর্যায়ে নিয়ে আসা যেতো বলে তাদের মধ্যেকার পার্থক্য ছিল অতি সামান্য। কোন এক সময় উভয়েরই একই পিথাগোরিয়ান স্বরগ্রাম ছিল। উভয়টিই কিছুটা গ্রীক ও সিরীয় উপাদানে গঠিত ছিল। সর্বোপরি বর্তমানে আমরা হার্মনি বলতে যা বুঝি তা অজ্ঞাত ছিল। এ দুটির মধ্যে যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল তা হচ্ছে, আরবরা এক ধরনের পরিমাপমূলক সঙ্গীত পদ্ধতির অধিকারী ছিল এবং তাদের মেলডিকে সুশোভিত করার একটি সুনির্দিষ্ট ধারণা ছিল। এই দুটিই যথাসময়ে পাশ্চাত্য সঙ্গীতকে প্রভাবিত করে।
সেমিটিক তত্ত্ব এবং প্রাচীনতর কালের চর্চা হচ্ছে আরব সঙ্গীতের উৎস। প্রকৃত ভিত্তি না হলেও এ দুটি গ্রীক সঙ্গীত তত্ত্ব ও চর্চাকে প্রভাবিত করেছে। ইসলামের আবির্ভাবের অব্যবহিত পূর্বে আরব রাজ্য আল-হিরা ও গাসসান নিঃসন্দেহে যথাক্রমে পারস্য ও বাইযেন্টাইন রীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই দুটি সাম্রাজ্যে সম্ভবত পিথাগোরিয়ান স্বরগ্রাম প্রচলিত ছিল। মূলত সেমাইটরাই এই স্বরগ্রামের উৎস।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে আমরা দেখতে পাই যে, তৎকালীন রাজনৈতিক কেন্দ্র আল-হিজাযে পরিমাপমূলক সঙ্গীত প্রচলিত ছিল। এটিকে ইকা বা ছন্দ বলা হতো, প্রায় একই সময়ে ইবনে মিসজাহ নামক জনৈক সঙ্গীতজ্ঞ সঙ্গীতের একটি নতুন মতবাদ প্রবর্তন করেন। এই মতবাদে পারস্য ও বাইযেন্টাইন উপাদান ছিল। কিন্তু পরলোকগত ড. জে পি এন ল্যান্ড মন্তব্য করেন : "পারস্য ও বাইযেন্টাইন উপাদান জাতীয় সঙ্গীতকে ছাড়িয়ে যায়নি, বরং নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন আরব ভিত্তিভূমির ওপর এগুলি গ্রথিত হয়।" এই পদ্ধতির স্বরগ্রাম পিথাগোরিয়ান বলে মনে হয়। ১২৫৮ খৃস্টাব্দে বাগদাদের পতন পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে।
ইতিমধ্যে কতিপয় পরিবর্তন সাধিত হয়। স্বরগ্রামে এগুলি এতোটা গোলযোগপূর্ণ ছিল যে, ইসহাক আল মাউসিলি এই মতবাদকে এর সাবেক পিথাগোরিয়ান আদর্শে পুনর্গঠিত করেন। আল ইস্ফাহানী পর্যন্ত এই পদ্ধতি অব্যাহত ছিল। তার সময় থেকে পুনরায় উপরোক্ত ধ্যানধারণা সমূহের আবির্ভাব ঘটে। এই শেষোক্ত ধ্যানধারণা হচ্ছে যালযালিয়ান ও খুরাসানিয়ান স্বরগ্রাম। প্রাচীনতর পদ্ধতিকে ভিত্তি হিসাবে সংরক্ষণে প্রাচীন গ্রীক মতবাদ সহায়তা করে। অ্যারিস্টটল, অ্যারিস্টক্সেনাস, ইউক্লিড, নিকোমেচাস, টলেমী ও অন্যদের রচনা অনুবাদের মাধ্যমে এই মতবাদের সংমিশ্রণ ঘটে। এসব আমদানি সত্ত্বেও আমরা আল-কিন্দী, আল ইসফাহানী ও ব্রিদরেন অব পিউরিটির মাধ্যমে জানতে পারি যে, আরব পারস্য ও বাইযেন্টাইন সঙ্গীত পদ্ধতি তাদের আলাদা সত্তা বজায় রাখে। একাদশ শতকের দিকে পারস্য ও খোরাসানী ধ্যানধারণা প্রবর্তিত হয় এবং তা বিশেষভাবে সঙ্গীতের মেজাজের ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায়। পরবর্তীকালে সাইফুদ্দিন আবদুল মুমিন নামক জনৈক তাত্ত্বিক একটি নতুন তত্ত্ব প্রবর্তন বা পদ্ধতিবদ্ধ করেন। অপরদিকে মধ্য যুগ শেষ হওয়ার আগে এক-চতুর্থাংশ স্বর পদ্ধতি নামে অপর একটি স্বরগ্রাম প্রবর্তিত হয়। এটি বর্তমানে প্রাচ্যের আরবদের মধ্যে দেখা যায়। আরব সঙ্গীত পারস্য ও বাইযেন্টাইন চর্চার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, একথা আরবরা প্রকাশ্যে স্বীকার করেন। অপরদিকে পারস্য এবং বাইযেন্টিয়ানবাসীরাও আরব সঙ্গীত শিল্প থেকে বহু কিছু ধার করেছেন।
সঙ্গীত চর্চা
আরবদের কাছে সঙ্গীতের অর্থ কি সহস্র ও এক রজনীতে তা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে। অবশ্য এই শিল্পের প্রতি আরবদের গভীর অনুরাগের পরিচয় ইবনে 'আবদ রাব্বিহির অনন্য কণ্ঠস্বর, আল ইসফাহানীর বৃহৎ সঙ্গীত গ্রন্থ ও আল নুওয়াইবির গ্রন্থে প্রকৃষ্টভাবে পাওয়া যায়। দুর্ভাগ্যবশত এগুলি এখনো কেবল আরবী ভাষাতেই পাওয়া যায়। এখানে আমরা দেখতে পাই যে, শৈশবের দোলনা থেকে সমাধি পর্যন্ত, শিশুর ঘুমপাড়ানি গান থেকে অন্ত্যেষ্টিগাথা পর্যন্ত সঙ্গীত আরবদের নিত্যসঙ্গী। সুখ, দুঃখ, কর্মমুখরতা, খেলাধুলা, যুদ্ধ-বিগ্রহ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রভৃতি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব সঙ্গীত ছিল। ঐ সময়কার প্রায় প্রত্যেক সচ্ছল আরবের নিজস্ব গায়িকা ছিল। বর্তমানে আমাদের ঘরে ঘরে যেমন পিয়ানোফোর্টি বাদ্যযন্ত্র দেখা যায়, তাদেরও ছিল ঠিক তাই।
অবশ্য আমরা এখানে প্রধানত জনগণের সঙ্গীতের ব্যাপারে আলোচনা করছি না। যেমনটি ইবনে খলদুন বলেছেন, শিল্পী না হলে প্রকৃত পক্ষে কোন শিল্পেরই সূচনা হয় না। আমরা প্রাক ইসলামিক যুগে এক শ্রেণীর পেশাদার সঙ্গীত শিল্পীর সন্ধান পাই। ইসলামে 'গান শোনা' নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও খিলাফতের আমলে এই শ্রেণীর সঙ্গীত শিল্পীরা অত্যন্ত সমাদৃত ছিলেন। বস্তুত আরবরা সঙ্গীতের সকল শাখায় যেভাবে এর চর্চা করেন তার তুলনায় অন্য যেকোন দেশের ইতিহাসে সঙ্গীত চর্চা তুচ্ছ। আরবদের কাছে সব সময় নির্ভেজাল যন্ত্রসঙ্গীতের চাইতে কণ্ঠ সঙ্গীত অধিকতর সমাদৃত ছিল। এর পিছনে কবিতার প্রতি বিশেষ অনুরাগ কিছুটা দায়ী। অবশ্য যন্ত্র সঙ্গীতে আইনগত বিধিনিষেধও এর অন্যতম কারণ। গীতি কবিতা বা কাসিদা ছাড়াও কণ্ঠসঙ্গীতের পদ্যরীতির মধ্যে খণ্ড কবিতা, গযল বা প্রেমের গান এবং অধিকতর জনপ্রিয় মাওয়াল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাশ্চাত্যে যাজাল ও মুওয়াশাহ-এর ন্যায় শেষোক্ত রীতিগুলি প্রবর্তিত হয়েছে। বিশেষ ধরন বা স্বরগ্রামে গঠিত মেলডি পরিমাপমূলক অর্থাৎ ছন্দযুক্ত হতে পারে, অথবা নাও হতে পারে। প্রত্যেক সঙ্গীত শিল্পী মিলযুক্তভাবে কিংবা স্বরাষ্টকে গাইতেন বা বাজাতেন। আমরা যে আকারে হার্মনি বুঝি তা অজ্ঞাত ছিল। এর স্থলে আরবরা মেলডিকে সুশোভিত করতেন। এতে সময় সময় যুগপৎভাবে চতুর্থ, পঞ্চম অথবা অষ্টমে মেলডির একটি স্বর ধ্বনিত হতো। এই পদ্ধতি তারকিব বা যৌগিক নামে পরিচিত ছিল। মেলডি পদ্ধতির সঙ্গে যেসব বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হতো তার মধ্যে আবশ্যিকভাবে ছিল বীণা, প্যান্ডোর, সন্টারি কিংবা বাঁশি। অপর দিকে ড্রাম, ট্যাম্বোরিন, কিংবা ওয়ান্ড সঙ্গীতের ছন্দ জোরদার করে তুলতো। এ ছাড়াও ছিল অনেক ছোটখাটো বাদ্যযন্ত্র, কিন্তু এগুলি প্রায়ই কণ্ঠ সংগীতের গৌরচন্দ্রিকা কিংবা বিরতিকালীন যন্ত্র সঙ্গীত হিসাবে ব্যবহৃত হতো। সম্ভবত সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গীত রীতি ছিল নাউবা। এতে কণ্ঠ ও যন্ত্র সঙ্গীতের কতিপয় সুরের সমন্বয় করা হতো। এই রীতি বিশেষভাবে পাশ্চাত্যে বিকাশ লাভ করে। এ পর্যন্ত যেসব সঙ্গীতের বিষয় আলোচনা হয়েছে তাকে মোটামুটি কক্ষ সঙ্গীত বলা যেতে পারে। কারণ মাঝে মাঝে আমরা অত্যন্ত বড় বড় বাদক দলের কথা পড়ে থাকলেও সাধারণত এদের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত ছোট।
কোন মিছিল বা সামরিক মহড়ার উপযোগী মুক্তাঙ্গনের সঙ্গীতে সাধারণত নিম্নোক্ত ধরনের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হতো; রীডপাইপ, সিঙ্গা, রণভেরী, ড্রাম, দামামা এবং করতাল। মুসলমানদের সামরিক মহড়ায় সামরিক বাদকদল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি সামরিক কৌশলের একটি বিশেষ দিক হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। পদস্থ সামরিক অফিসারদের অধীনে বাদকদল থাকতো এবং এসব দলের আকার তাঁদের মর্যাদা অনুসারে নির্ধারিত হতো, যেমনটি নির্ধারিত হতো সামরিক নাউবা-য় ভেরী নিনাদের সংখ্যা। সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্রের প্রতি, বিশেষ করে শেষোক্তটির প্রতি ধর্মীয় নিন্দাবাদ থাকা সত্ত্বেও সঙ্গীতের আধ্যাত্মিক প্রতিফল সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃতি লাভ করে। সূফীরা এটিকে পরম আনন্দাবিষ্টতার মধ্য দিয়ে প্রত্যাদেশ লাভের একটি পন্থা হিসাবে দেখেন। দরবেশ ও তাপসরা এরই মাধ্যমে তাদের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ন্ত্রণ করে। আল গায্যালী বলেছেন, "আনন্দাবিষ্টতার অর্থ এমন অবস্থা যা সঙ্গীত শ্রবণের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়।" অন্যত্র তাঁর সঙ্গীত এবং পরম আনন্দাবিষ্টতা গ্রন্থে তিনি নিম্নোক্ত বক্তব্যের সমর্থনে ৭টি কারণ প্রদর্শন করেন; আনন্দাবিষ্ট অবস্থা সৃষ্টিতে স্বয়ং কুরআনের চাইতেও গানের ক্ষমতা বেশি। সহস্র ও এক রজনীতে বলা হয়েছে: "কারো কারো সঙ্গীত হচ্ছে মাংস এবং অন্যদের কাছে ওষুধ।" 'সঙ্গীতের প্রভাবের' মতবাদ থেকেই এই অহমিকার সৃষ্টি হয়েছে। বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মনোভাব, পরিমণ্ডলের ঐকতান এবং সংখ্যাতত্ত্বের মূলনীতিতে বিশ্বাসের সঙ্গে এই মতবাদ বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সাঙ্গিতিক আরোগ্য বিজ্ঞানের এই মতবাদ ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে।
স্বাধীন লোকদের মধ্যে উৎসব উপলক্ষে সর্ব প্রকার বাদ্যযন্ত্র দেখা যেতো। কিন্তু মেয়েদের মধ্যে তাম্বুরা বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। ভবঘুরে চারণেরও নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র ছিল। তিনি সাধারণত একটি মৃদঙ্গ ও বাঁশি বহন করতেন। এক হাতে মৃদঙ্গ বাজাতেন এবং অপর হাতে বাঁশির ছিদ্রে অঙ্গুলি চালনা করতেন। মাথায় ছোট ছোট ঘন্টা বাঁধা মুকুট পরতেন এবং সুরের তালে তালে মাথা আন্দোলিত করতেন। সমরকন্দ থেকে আটলান্টিক পর্যন্ত সঙ্গীতের পরিভাষা প্রাচ্যে সঙ্গীত চর্চায় আরবদের প্রত্যক্ষ অবদানের যথেষ্ট প্রমাণ বহন করে।
বাদ্যযন্ত্র
আরবীতে বাদ্যযন্ত্রের নাম অসংখ্য এবং এখানে তার ১-১০মাংশ নিয়ে আলোচনা করাও সম্ভব নয়। আরবরা বাদ্যযন্ত্র তৈরিকে ললিত কলায় উন্নীত করেন। বাদ্যযন্ত্র তৈরি সম্পর্কে বহু গ্রন্থ রচিত হয়েছে এবং সেভিলের ন্যায় কতিপয় শহর বাদ্যযন্ত্র তৈরিতে খ্যাতি অর্জন করে। শুধু বীণাই বিভিন্ন শ্রেণীর ও আকারের ছিল। প্রাক-ইসলামী যুগের বীণা ছিল চামড়ার পেটওয়ালা। তাদের ক্লাসিক্যাল বীণা অনেকটা আধুনিক ম্যান্ডেলিনের মতো ছিল। এ ছাড়া এ জাতীয় বৃহত্তর আকারের বাদ্যযন্ত্রকে বলা হতো পূর্ণাঙ্গ বীণা। তাদের শাহরুদ ছিল আধুনিক আর্কলিউট। এ ছাড়া আমরা বেশ কয়েকটি বড় আকারের বাদ্যযন্ত্রের ছবি দেখতে পাই। তাদের প্যান্ডোর শ্রেণীর বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে বৃহদাকারের তানবুর তার্কি থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র আকারের তানবুর বিগিলা পর্যন্ত বহু রকমের বাদ্যযন্ত্র ছিল। এ ছাড়া ছিল মুরাব্বা' নামে পরিচিত গিটার। এটি ছিল চেপ্টা বক্ষযুক্ত আয়তাকার বাদ্যযন্ত্র। পরবর্তীকালে এটি কিতারা নামে পরিচিত হয়। আমাদের কাছে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাদের বক্রাকারের বাদ্যযন্ত্র। প্রথমে এগুলি তাদের শ্রেণীগত রাবাব নামে পরিচিত ছিল। এগুলিও বড় ছোট এবং বিভিন্ন আকারের দেখা যায়। এর মধ্যে কামানজা ও গিশাক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। খোলা তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্রগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল হার্প, সন্টারি এবং ডালসিমার।
কাঠের বায়ু চালিত বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে ছিল বহু আকারের বাঁশি। প্রায় ৩ ফুট লম্বা নাইবাম থেকে শুরু করে ১ ফুট ও তার চাইতেও কম লম্বা শাব্ব্বাবা এবং জুয়াক। আর একটি বাঁশির নাম ছিল সাফফারা। নলের বাঁশির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল যাম্র, সারনাই, যুলামী ও গাইতা। এই জাতীয় বাক্ ছিল ধাতুর তৈরি।
তাম্বুরা বা খঞ্জনি জাতীয় বাদ্যযন্ত্রকে সাধারণত দক্ বলা হতো। এটি বিশেষভাবে বর্গাকৃতির ছিল। গোলাকার বাদ্যযন্ত্রগুলি আকার ও নির্মাণ কৌশল অনুযায়ী তার, দাইয়া ইত্যাদি নামে পরিচিত ছিল। ঢাক জাতীয় বাদ্যযন্ত্রগুলিও তবল, নাক্কারা, কাস'আ ইত্যাদি বহু ধরনের ছিল। করতালের নাম ছিল কাঁসা। থালা আকৃতির চেপ্টা ছোট করতালকে সিন্জ বলা হতো। আরবদের মধ্যে বায়ু চালিত অর্গ্যান এবং পানি চালিত অর্গ্যান উভয়টিই প্রচলিত ছিল। এছাড়া তাদের মধ্যে সম্ভবত অর্গানিস্টামও প্রচলিত ছিল। শেষোক্তটি মধ্যযুগীয় ইউরোপে সুপরিচিত ছিল এবং দেখতে অনেকটা আধুনিক হার্ডিগার্ডির মতো ছিল। এ জাতীয় আরেকটি বাদ্যযন্ত্র ছিল আল-শাকিরা।
বিভিন্ন বিবরণ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, আরবরা বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্রের উদ্ভাবক এবং সংস্কারক ছিলেন। আল-ফারাবী সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি রাবাব ও কানুনের উদ্ভাবক ছিলেন, আল-যুনাম নাই যুনামী বা যুলামী নামে প্রচলিত বায়ুচালিত বাদ্যযন্ত্র তৈরি করেন; যালযাল 'উদ আল শাদ্ভুত প্রবর্তন করেন; দ্বিতীয় আল-হাকাম নলের বাক-এর সংশোধন সাধন করেন; যিরিয়াব নতুন ধরনের বীণা প্রবর্তন করেন; আল-বাইয়াসি ও আবুল মাজদ উভয়েই ছিলেন অর্গ্যান নির্মাতা; এবং সফিউদ্দীন আবদুল মুমিন নুহা নামে একটি বর্গাকৃতির সন্টারী ও মুগনি নামে অপর একটি বাদ্যযন্ত্র আবিষ্কার করেন।
নবম শতকের প্রথম দিক থেকে এক ধরনের স্বরলিপি প্রচলিত থাকলেও অধিকাংশ শিল্পী শ্রবণের মাধ্যমে তাদের সঙ্গীত আয়ত্ত করেন। কোন কোন সুরকার বিশ্বাস করতেন যে, জ্বিনের প্রেরণায়ই তারা সঙ্গীত রচনা করেন। আরব চারণ কবিদের পোশাক-আশাক ও চেহারা-সুরত বিশেষভাবে লক্ষণীয়। লম্বা চুল, চিত্রিত চেহারা ও হাত এবং উজ্জ্বল রং এই শ্রেণীর গায়কদের বৈশিষ্ট্য। এরা ইসলামের প্রাথমিক যুগের মেয়েলী স্বভাবসুলভ মুখান্নাসুন-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কণ্ঠশিল্পীদের মধ্যে অনেকেই ছিল এতিরাতি। কেউ কেউ শাস্তি হিসাবে এই পেশায় নিয়োজিত হতো এবং অন্যরা সম্ভবত বালকদের কণ্ঠ জনপ্রিয় ছিল বলে এই পেশা গ্রহণ করতো। খলীফার দরবার থেকে গায়কদের পৃষ্ঠপোষকতা করা হতো। কেবল শিল্পী হিসাবে নয়, শিল্পীকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যেও এরূপ পৃষ্ঠপোষকতা করা হতো। সঙ্গীত পেশার সূত্রে শিল্পী বহু পরিবারে যাতায়াত করতো। সেখানে মদের পেয়ালার সংস্পর্শে অনেক গোপন রাজনীতি প্রকাশ হয়ে পড়তো। তাছাড়া মতামত প্রচারে গানের চাইতে কার্যকর মাধ্যম আর কিছু ছিল না। আরবদের অনুকরণকারী প্রভেন্সের ধর্মদ্রোহী টুবাডুরদের জংলাররাও এভাবে নিজেদের প্রচার কার্য চালাতো।
সঙ্গীত বিষয়ক গ্রন্থ রচয়িতা
আরবী সাহিত্যের এক বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে সঙ্গীত বিষয়ক রচনা। সঙ্গীতের ইতিহাস, গান সংগ্রহ, বাদ্যযন্ত্র, সঙ্গীতের বৈধ দিক, সৌন্দর্য বোধ এবং সঙ্গীতজ্ঞদের জীবনী এসব রচনার অন্তর্ভুক্ত। এঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম লেখক হচ্ছেন আল-মাসউদী এবং আল-ইসফাহানী। প্রথমোক্ত লেখকের মেডোজ অব গোল্ড গ্রন্থে আমরা প্রাথমিক যুগে আরব সঙ্গীত চর্চার চমকপ্রদ তথ্যাবলী জানতে পারি। তাঁর অন্যান্য রচনায় বাইরের দেশের সঙ্গীত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ২১ খণ্ডে রচিত আল ইসফাহানীর বিশাল গ্রন্থ বৃহৎ সঙ্গীত গ্রন্থ অধিকতর মূল্যবান। ইবনে খলদুন এটিকে 'আরবদের দিওয়ান' নামে আখ্যায়িত করেছেন। এই লেখক সঙ্গীত সম্পর্কে আরো ৪টি গ্রন্থ রচনা করেন। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক আল-ওয়াররাক এর দি ইনডেক্স গ্রন্থটি সঙ্গীত তত্ত্ব ও সঙ্গীত বিজ্ঞানের লেখকদের এবং সঙ্গীত বিষয়ক সাধারণ রচনাসমূহের একটি তথ্যখনি।
পাশ্চাত্যে আমরা প্রায় একই ব্যাপার দেখতে পাই, ইবনে 'আবদ রাব্বিহি'র দি ইউনিক নেকলেস গ্রন্থ প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীতজ্ঞদের জীবনী এবং গোড়াপন্থীদের বিরোধিতার মুখে জোরালভাবে সঙ্গীত চর্চা সমর্থন পেয়েছে। ইয়াহইয়া আল খুন্দুজ আল মুরসী প্রাচ্যের আল ইসফাহানীর অনুকরণে একটি বুক অব সংস রচনা করেন। ইবনুল 'আরাবী ও অন্যরা সঙ্গীতের বৈধতা প্রতিপন্ন করে গ্রন্থ রচনা করেন এবং সে সঙ্গে বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে বহু তথ্য পরিবেশন করেন। বাগদাদের পতনের পর সঙ্গীত বিষয়ক 'বিশিষ্ট লেখকদের' প্রায় বিলুপ্তি ঘটে। তাদের স্থলে একদল ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞের আবির্ভাব হয়। তাঁরা সঙ্গীতের বৈধতার পক্ষে বা বিপক্ষে নানা প্রকার যুক্তি তুলে ধরেন। সঙ্গীত সম্পর্কে পূর্বের ন্যায় যে দু'-একটি রচনা দেখা যায় সেগুলি হচ্ছে ইবনে খালদুনের প্রলেগোমেনা এবং আল-ইবশিহির মুসতাতরাফ।
সঙ্গীত তত্ত্ববিদ
সঙ্গীত তত্ত্বের যে প্রথম লেখক সম্পর্কে আমরা সুনির্দিষ্টভাবে অবগত রয়েছি তিনি হচ্ছেন ইউনুস আল-কাতিব। তাঁর পরেই রয়েছে আরবী ছন্দশাস্ত্রের সুবিন্যাসকারী ও প্রথম শব্দকোষ সংকলক আল খলিল। দি ইনডেক্স-এ তাঁর বুক অব নোটস ও বুক অব রীদমস তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ইবনে ফিরনাস স্পেনে যা প্রবর্তন করেছেন, সেগুলি সম্ভবত আল খলিলের মতবাদ। ইবনে ফিরনাস আন্দালুসে সর্বপ্রথম সঙ্গীত বিজ্ঞান শিক্ষা দেন। ইসহাক আল-মাউসিলি প্রাচীন আরব পদ্ধতি পুনর্গঠিত করেন এবং বুক অব নোটস এণ্ড রীদমস গ্রন্থে তাঁর মতবাদসমূহ তুলে ধরেন।
অষ্টম থেকে দশম শতকের মধ্যে সঙ্গীত-তত্ত্ব ও স্বর-বিজ্ঞান সম্পর্কিত বহু গ্রীক রচনা আরবীতে অনূদিত হয়। পিথাগোরাসের বলে কথিত একটি রচনা ও প্ল্যাটোর টিমিয়াস আরবী ভাষায় পাওয়া যায়। শেষোক্ত গ্রন্থটি ইউহান্না ইবনে আল বাডরিক কর্তৃক এবং পুনরায় হুনাইন ইবনে ইসহাক কর্তৃক অনূদিত হয়। অ্যারিস্টটলীয় রচনার মধ্যে আরবরা প্রবলেম্যাটা ও ডি অ্যানিমার অধিকারী ছিলেন। উভয়টিই হুনাইন ইবনে ইসহাক অনুবাদ করেন। ডি অ্যানিমা সম্পর্কে গ্রীক লেখকদের যেসব ভাষ্য আরবীতে প্রচলিত ছিল সেগুলি থেমিস্টিয়াস ও সিমপ্লিসিয়াসের রচনা। প্রথমোক্তটির অনুবাদকও হুনাইন। তিনি গ্যালেনের ডি ভসে গ্রন্থটিও অনুবাদ করেন। এসব রচনা থেকেই আরবরা স্বরতত্ত্ব সম্পর্কে তাঁদের অধিকতর বৈজ্ঞানিক ধ্যানধারণা লাভ করেন।
অ্যারিস্টোজেনাস আরবীতে দি প্রিন্সিপালস ও অন রীদম নামক দুটি রচনার জন্য বিখ্যাত। আরবীতে সঙ্গীত সম্পর্কে ইউক্লিডের নামে দুটি রচনা রয়েছে- দি ইন্ট্রোডাকশন টু হার্মনি এবং দি সেকশন অব দি ক্যানন। গ্র্যান্ড বুক অন মিউজিক নামক একটি গ্রন্থে এবং অন্যান্য কতিপয় সংক্ষিপ্ত সারমূলক পুস্তিকায় নিকোমেচাসের রচনা পড়া হতো। গ্রীক রচনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, শেষোক্ত গ্রন্থটি তাঁর বিভিন্ন সংক্ষিপ্ত রচনার সমাবেশ। তাঁর ইন্ট্রোডাকশন টু অ্যারিথমেটিক নামক যে গ্রন্থটিতে প্রসঙ্গক্রমে সঙ্গীত সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে তা সাবিত ইবনে কাররা কর্তৃক অনূদিত হয়েছে। বুক অন মিউজিক গ্রন্থে টলেমীর রচনার পরিচয় পাওয়া যায়। এটি সম্ভবত বর্তমানে আমাদের জ্ঞাত টিটিজ অন হার্মনি। আরবী ভাষায় অন্যান্য যেসব গ্রীক রচনা আমাদের হস্তগত হয়েছে সেগুলি হচ্ছে আর্কিমিডিস ও অ্যাপোলোনিয়াস পার্গিয়াসের রচনা বলে কথিত পানিচালিত অর্গ্যান সংক্রান্ত গ্রন্থাবলী। এ বিষয়ে আরবীতে মুরিসতাস নামে পরিচিত জনৈক লেখকের রচনাও রয়েছে। তিনি বায়ুচালিত অর্গ্যান, হাইডলিস এবং চাইমস সম্পর্কেও গ্রন্থ রচনা করেন।
আরবীতে সঙ্গীততত্ত্ব সম্পর্কে যেসব প্রাচীনতম রচনায় গ্রীক লেখকদের প্রভাব দেখা যায়, সেগুলি আল-কিন্দীর রচনাবলী। তিনি সঙ্গীততত্ত্ব সম্পর্কে ৭টি গ্রন্থ রচনা করেন। এগুলির মধ্যে ৪টি না হলেও অন্তত ৩টি সংরক্ষিত আছে : দি এসেনসিয়ালস্ অব নলেজ ইন মিউজিক; অন দি মেলডীজ; দি নেসেসারী বুক ইন দি কমপোজিশন অব মেলডীজ। আল সারাখসী ও মানসুর ইবনে তালহা ইবনে তাহির তাঁর শিষ্য ছিলেন। সমসাময়িক তাত্ত্বিকরা ছিলেন সাবিত ইবনে কাররা, মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল-রাযী এবং কুসতা ইবনে লুকা। এদেরই পরে আবির্ভাব ঘটে আরব তাত্ত্বিকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম আল-ফারাবীর। তাঁর সঙ্গীত বিষয়ক গ্রন্থাবলী হচ্ছে গ্র্যান্ড বুক অন মিউজিক, স্টাইলস ইন মিউজিক এবং অন দি ক্লাসিফিকেশন অব রীদম্। এ ছাড়া তিনি বিজ্ঞান বিষয়ক তাঁর দুটি বিখ্যাত সংক্ষিপ্ত সার গ্রন্থেও সঙ্গীত সম্পর্কে আলোচনা করেন-দি ক্লাসিফিকেশন অব দি সায়েন্সেস এবং দি অরিজিন অব দি সায়েন্সেস। আল ফারাবী বলেছেন যে, তিনি গ্রীকদের সঙ্গীত বিষয়ক রচনায় বিশেষত এসব রচনার আরবী অনুবাদে, নানা প্রকার ল্যাকিডনা ও অস্পষ্টতা দেখেই তাঁর গ্র্যান্ড বুক অন মিউজিক রচনা করেন। তাঁর পরবর্তী লেখক হচ্ছেন অঙ্ক শাস্ত্রের ওপর শ্রেষ্ঠতম আরব গ্রন্থকার আল-বায়যানী। তাঁর গ্রন্থটি হচ্ছে কমপেণ্ডিয়াম অন দি সায়েন্স অব রীদম। একই সময়ে বিশ্বকোষ রচয়িতা ব্রিদরেন অব পিউরিটি ও মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল খারিযমীর নামও উল্লেখযোগ্য। ব্রিদরেন অব পিউরিটির সঙ্গীত সম্পর্কিত রচনা ব্যাপকভাবে পঠিত হয়। বিজ্ঞানের চাবি গ্রন্থের লেখক আল খারিযমীর অন্যতম রচনা সঙ্গীত তত্ত্বের দ্বার উন্মুক্ত করে।
সঙ্গীত সম্পর্কে বিশেষভাবে বিখ্যাত লেখক ছিলেন ইবনে সিনা। আল-ফারাবীর পরে সঙ্গীত তত্ত্ব সম্পর্কে আরবী ভাষায় তাঁর অবদান সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর শিফা ও নাজাত গ্রন্থে এর পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি ইনট্রোডাকশন টু দি আর্ট অব মিউজিক নামেও একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এ ছাড়া তাঁর ডিভিশন্স অব দি সায়েন্সেস গ্রন্থে সঙ্গীত বিষয়ক কয়েকটি সংজ্ঞা দেখা যায়। তাঁর শিষ্য ইবনে যাইলা বুক অব সাফিসিয়েন্সী ইন মিউজিক গ্রন্থটি রচনা করেন। ইবনে সিনার সমসাময়িক লেখক এবং বিখ্যাত গাণিতিক ও পদার্থ বিজ্ঞানী ইবনে আল-হায়সাম ইউক্লিডের কমেন্টারি অন দি ইনট্রোডাকশন টু হার্মনি ও কমেন্টারি টু দি সেকশন অব দি ক্যানন এর দুটি ভাষ্য রচনা করেন। তিনি মিসরে তাঁর গ্রন্থ রচনা করেন। এখানে আর একজন প্রতিভাবান লেখক আবুল সাত্ উমাইয়া একটি ট্রিটিজ অন মিউজিক গ্রন্থ রচনা করেন। দ্বাদশ শতকের অন্য তাত্ত্বিকরা হচ্ছেন ইবনে আল-নাক্কাশ আল বাহিলী এবং তাঁর পুত্র আবুল মাজদ ও ইবনে মান'আ।
ত্রয়োদশ শতকে আরো বিখ্যাত তাত্ত্বিকদের আবির্ভাব ঘটে। আলমউদ্দীন কাইসার মিসর ও সিরিয়ায় অত্যন্ত খ্যাতিমান গাণিতিক ছিলেন। তিনি বিশেষভাবে সঙ্গীততত্ত্বের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। আরো পূর্বে নাসির উদ্দীন অনুরূপ খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর সঙ্গীত সংক্রান্ত খণ্ড রচনা সংরক্ষিত আছে। মুসলিম স্পেনে ফিরনাসের পর আমরা মাসলামা আল-মাজরিতি ও আল-কিরমানীর রচনা দেখতে পাই। এঁরা ব্রিদরেন অব পিউরিটির রচনাসমূহ জনপ্রিয় করেন। অন্য তাত্ত্বিক ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে আল-হাদ্দাদ এবং জনৈক ইহুদী আবুল ফজল হাসদাই। সঙ্গীত তত্ত্বের ওপর অধিকতর প্রতিভাবান লেখক ছিলেন ইবনে বাজ্জা। পাশ্চাত্যে তাঁর সঙ্গীত সংক্রান্ত গ্রন্থ প্রাচ্যে আল-ফারাবীর গ্রন্থের ন্যায়ই জনপ্রিয় ছিল। ইবনে রুশদ বিখ্যাত কমেন্টারি অন অ্যারিস্টটল্স ডি অ্যানিমা রচনা করেন। এতে স্বর তত্ত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত বুদ্ধি-দীপ্ত আলোচনা করা হয়েছে। ত্রয়োদশ শতকে বিখ্যাত সঙ্গীত তত্ত্ববিদ ইবনে সাব'ইন ও তাঁর সমসাময়িক আল রাকুতির রচনা দেখা যায়। শেষোক্ত ব্যক্তি খৃস্টানদের হাতে মুর্সিয়ার পতনের পর তাদের দ্বারা চতুর্কলা শিক্ষাদানের জন্য নিয়োজিত হন।
ত্রয়োদশ শতকে সফিউদ্দীন আবদুল মুমিন কর্তৃক নতুন পদ্ধতিবাদী ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়। বিখ্যাত শারাফিয়্যা ও বুক অব মিউজিক্যাল মোড় গ্রন্থে তাঁর মতবাদসমূহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। হাজি খলীফার মতে তিনি সঙ্গীততত্ত্ব লেখকদের মধ্যে 'প্রথম সারির' ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন। অতঃপর যাদের নাম উল্লেখ করা হচ্ছে তাদের অধিকাংশই তাঁর অনুসারী ছিলেন। শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে আল মারহুম কাব্যে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। মুহাম্মদ ইবনে ঈসা ইবনে কারা দি এণ্ড অব দি ইনকোয়ারী ইন টু দি নলেজ অব দি মেলডীজ এণ্ড রীদম্স নামক গ্রন্থ রচনা করেন। শাহ শূজা'র নামে উৎসর্গকৃত মাউলানা মুবারকশাহ কমেন্টারি অন দি মিউজিক্যাল মোড় নামক গ্রন্থটি অধিকতর প্রভাব সৃষ্টি করে। এটি সফিউদ্দীন আবদুল মুমিনের মতবাদের ওপর লিখিত অসংখ্য ভাষ্যের অন্যতম। একই পৃষ্ঠপোষকের নামে উৎসর্গকৃত অপর একটি গ্রন্থ হচ্ছে ডিসকোর্সেস অন দি সায়েন্সেস নামে পরিচিত একটি বিশ্বকোষ। এটি সম্ভবত আল-জুরজানি কর্তৃক রচিত। আমর ইবনে খিজর আল কুর্দী দি ট্রেজার অব দি ইনকোয়ারী ইন টু দি মোড্স এণ্ড দি রীদম্স গ্রন্থের রচয়িতা। ইবনে আল-ফানারী তাঁর বিজ্ঞান সংক্রান্ত বিশ্বকোষে সঙ্গীতের বিষয়ও পর্যালোচনা করেছেন। শামসুদ্দিন আল 'আজামীর একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে এপিল অন দি সায়েন্স অব দি মেলডীজ। আল-লাজিকী দি ফাতহিয়্যা নামে পরিচিত একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেন। হাজি খলীফা এই লেখককে সফিউদ্দীন আবদুল মুমিন ও আবদুল কাদির ইবনে গাইবির সমতুল্য মনে করেন। পদ্ধতিবাদী ধারার প্রতিষ্ঠাতার রচনাসমূহের পর সর্বশেষ এবং সম্ভবত সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ রচনা হচ্ছে অজ্ঞাত পরিচয় লেখকের মুহাম্মদ ইবনে মুরাদ টিটিজ।
আরব তাত্ত্বিকদের মূল্য
চতুর্কলা-এ দক্ষ হওয়ার দরুন অধিকাংশ আরব তাত্ত্বিকই অঙ্কশাস্ত্র ও পদার্থবিদ্যায়ও পারদর্শী ছিলেন। গ্রীক রচনাসমূহ তাদের জন্য সঙ্গীতের যে কাল্পনিক মতবাদ ও স্বরের যে বাস্তব ভিত্তি তুলে ধরেন তার অনুকরণে এদের অনেকেই নিজস্ব পন্থায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। এটিই হচ্ছে তাদের রচনার অন্যতম চমকপ্রদ দিক। সফিউদ্দীন কর্তৃক আল-ফারাবী ও ইবনে সিনার সংজ্ঞাসমূহের সমালোচনা এ ধরনের অনুসন্ধিৎসার মনোভাব প্রতিভাত করে। পূর্বসূরিরা যতো বিখ্যাত ব্যক্তিই হোন তাদের বক্তব্য নির্ভুল না হলে তিনি সবিনয়ে তা মেনে নেবেন না। আমরা দেখেছি যে, আল ফারাবী ও ইবনে সিনা উভয়েই গ্রীকরা যা শিক্ষা দিয়েছেন তার উন্নতি ও বিকাশ সাধন করেন। আরব জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যেভাবে টলেমী ও অন্যান্য গ্রীক লেখকের ভুলত্রুটি সংশোধন করেন তেমনিভাবে আরব সঙ্গীততত্ত্ববিদরাও গ্রীক শিক্ষকদের বক্তব্য সংশোধন করেন। আল ফারাবীর সঙ্গীত তত্ত্বের পরিচিতি গ্রীক সূত্র থেকে আমরা যা কিছু পেয়েছি তার থেকে উন্নত না হলেও সুনিশ্চিতভাবে তার সমকক্ষ। স্বরের বাস্তবভিত্তিক মতবাদের ক্ষেত্রে বিশেষত স্বরের শূন্য মণ্ডলীয় বিবরণ সংক্রান্ত প্রশ্নের ক্ষেত্রে আরবরা নিশ্চিতভাবে বেশ কিছুটা অগ্রগতি সাধন করেছেন।
আরব তাত্ত্বিকরা স্বরের পরিমাপসহ বাদ্যযন্ত্রসমূহের যে সতর্ক বর্ণনা প্রদান করেছেন তাতে আমরা তাদের ব্যবহৃত সঠিক স্বরলিপি জানতে পারি। আমরা আল কিন্দী, আল-ফারাবী, আল খারিযমী ও ব্রিদরেন অব পিউরিটি কর্তৃক বর্ণিত বীণা, প্যান্ডোর, হার্প ও বায়ুচালিত বাদ্যযন্ত্রসমূহ সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত হই। ইউরোপে এ ধরনের কোন প্রচেষ্টার শত শত বছর আগে তারা এগুলির সূক্ষ্ম বিবরণ প্রদান করেছেন। তাঁরা যালযালের 'নিউট্রাল থার্ড' ও 'পারস্য থার্ড' সম্পর্কে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান তাতে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে, তারা কেবল গ্রীক সুর পদ্ধতিতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। সফিউদ্দীন প্রবর্তিত পদ্ধতিবাদী ধারা সম্পর্কে স্যার হুবার্ট প্যারী বলেন যে, এটি "এ যাবত উদ্ভাবিত স্বরলিপিসমূহের মধ্যে সব চাইতে পূর্ণাঙ্গ।" হেলম হল্স বলেন, "সুরের মধ্যে প্রধান স্বর হিসাবে তাদের স্বরলিপির ম্যাজিক সেভেন্থ ব্যবহার একটি নতুন ধারণার সৃষ্টি করেছে।"
আরব সঙ্গীতের উত্তরাধিকার
সঙ্গীত জগতে আরবরা যে অবদান রেখে গেছেন তার সারবত্তা উপেক্ষা করার উপায় নেই। আমরা প্রাচ্যের যেকোন দিকেই তাকাই সেখানেই আরবদের ব্যবহারিক শিল্পের প্রভাব দেখতে পাই। পারস্যে আবদুল মুমিনের গ্ল্যাডনেস অব দি সোল, ফখর উদ্দিন আল-রাযীর অ্যাসেম্বলিং অব দি সায়েন্সেস, আল আমুলীর প্রেশাস সায়েন্সেস এবং আবদুল কাদির ইবনে গাইবীর অ্যাসেম্বলিং অব দি মেলডীজ ও অন্যান্য রচনায় আরবদের উত্তরাধিকার সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়। তুরস্কে আল-ফারাবী, সফিউদ্দীন ও আবদুল কাদিরের রচনাসমূহ তুর্কী ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আবদুল কাদিরের পুত্র আবদুল আজিজ ও জনৈক পৌত্র উসমানীয় সুলতানদের চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁরা যেসব গ্রন্থ রচনা করেছেন তাতে আরব ওস্তাদের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা প্রমাণিত হয়। খিজর ইবনে আবদুল্লাহ এবং আহমদ উগলু শুকরুল্লাহর রচনায়ও তাই দেখা যায়। এমনকি ভারতেও আমরা আরবী গ্রন্থসমূহের অনুবাদ দেখতে পাই।
আরব সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগের ফলে পশ্চিম ইউরোপ যেভাবে উপকৃত হয়েছে তা আরো ব্যাপক। ইউরোপ দুটি পন্থায় আরব উত্তরাধিকার লাভ করে। ১. রাজনৈতিক যোগাযোগ, হস্তান্তর ও মৌখিক ভাষার মাধ্যমে ব্যবহারিক শিল্পের উত্তরাধিকার লাভ, এবং ২. সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চামূলক যোগাযোগ, আরবী থেকে অনুবাদ এবং স্পেন ও অন্যত্র মুসলিম শিক্ষা কেন্দ্রসমূহে অধ্যয়নকারী পণ্ডিতদের মৌখিক শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে তাত্ত্বিক শিল্পের উত্তরাধিকার লাভ।
মধ্যযুগে সঙ্গীত তত্ত্ব সম্পর্কে পর্যাপ্ত পরিমাণে আরবী রচনা থাকা সত্ত্বেও ল্যাটিন বা হিব্রু অনুবাদের মাধ্যমে আমরা তার অতি সামান্যই পেয়েছি। গ্রীক রচনার মধ্যে জোহানেস হিস্পালেনসিস অনূদিত অ্যারিস্টটলের ডি অ্যানিমা এবং গ্যালেনের ডি ভসের ত্রয়োদশ শতকের একটি পাণ্ডুলিপি আরবী থেকে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত। আরবদের রচনার মধ্যে আল-ফারাবীর দুটি বিশ্বকোষ জোহানেস হিস্পালেনসিস ও ক্রিমোনার জিরার্ড কর্তৃক ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। জোহানেস হিস্পালেনসিস অনূদিত কমপেণ্ডিয়াম অব অ্যারিস্টটল্স ডি অ্যানিমার মাধ্যমে ইবনে সিনাও ল্যাটিন ভাষায় পরিচিত। আদ্রিয়াস আলপাগাস কর্তৃক এটি পুনরায় অনূদিত হয়। তিনি ডি ডিভিশন সায়েন্টিয়ারাম শিরোনামে ইবনে সিনার বিশ্বকোষও ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল ইবনে রুশদের গ্রেট কমেন্টারি অন অ্যারিস্টটল্স ডি অ্যানিমা। মাইকেল স্কট এটি ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। আরবী থেকে বহু হিব্রু অনুবাদও পশ্চিম ইউরোপে পরিচিত হয়। আমরা ইসাইয়া বেন আইজাক অনূদিত কমেন্টারি অন দি ক্যানন গ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত। ইউক্লিডের সেকশন অব দি ক্যানন ও স্পষ্টত আরবী থেকে হিব্রু ভাষায় অনূদিত হয়। মোসেস ইবনে তিব্বন প্রবলেম্যাটা অনুবাদ করেন। ভ্যাটিকানেও আব্রাহাম ইবনে হাইয়া কর্তৃক আরবী থেকে অনূদিত একটি সঙ্গীত গ্রন্থ পাওয়া যায়। আবুস সান্ত উমাইয়ার ট্রিটিজ অন মিউজিক গ্রন্থটিও সম্ভবত হিব্রু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আল-ফারাবীর সঙ্গীত তত্ত্বের পরিচিতি ইবনে আকনিন কর্তৃক প্রশংসিত হয়। টর্টোসার শেম-তোব আইজাক ইবনে রুশদের কমেন্টারি অন অ্যারিস্টটল্স ডি অ্যানিমা অনুবাদ করেন। কালোনিমাস বেন কালোনিমাস আল-ফারাবীর ক্লাসিফিকেশন অব দি সায়েন্সেস অনুবাদ করেন।
সাহিত্যভিত্তিক যোগাযোগের মাধ্যমে সঙ্গীতে আরব উত্তরাধিকারের প্রমাণ প্রথম দৃষ্টিতে কনস্ট্যান্টাইন দি আফ্রিকানের রচনায় দেখা যায়। তিনি ছিলেন ল্যাটিন ভাষায় প্রাথমিক আরবী অনুবাদকদের অন্যতম। তিনি তাঁর ডি হিউম্যানা নেচারা ও ডি মর্বোরাম কগনিশন গ্রন্থে গ্রহের প্রভাব এবং সঙ্গীতের নিরাময়মূলক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আরব মতবাদসমূহ প্রবর্তন করেন। ইবনে সিনার একটি প্রবাদবাক্য ছিল 'ইন্টার অমনিয়া এক্সারসিটিয়া স্যানিটাটিস ক্যান্টারে মিলিয়াস এস্ট।' গুণ্ডিসাল ভাসের ডি ডিভিশন ফিলোসফিয়া গ্রন্থে সঙ্গীত বিষয়ক একটি অংশ ছিল। এই অংশটি তিনি আল-ফারাবীর রচনা থেকে সম্ভবত স্বয়ং অনুবাদ করে উদ্ধৃত করেছেন। অ্যারিস্টটলের ছদ্ম নামে প্রচলিত ডি মিউজিকা এবং ভিন্সেন্ট ডি বুভাইসের স্পেকুলাম ডকটিনেল গ্রন্থ দুটিতেও একই সূত্র থেকে ধার করা হয়েছে। জোহানেস এজিডিয়াসের একটি সংজ্ঞা থেকে বোঝা যায় যে, এরও সূত্র ছিল আল ফারাবী। এই স্পেনীয় তাত্ত্বিক কনস্ট্যান্টাইন দি আফ্রিকানের রচনার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। রবার্ট কিলওয়ার্ডবি, রাইমুণ্ডো লাল, সিমন টানস্টেড এবং অ্যাডাম ডি ফুন্ডা প্রভৃতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। রজার বেকন ওপাস টের্টিয়ামের সঙ্গীতাংশে টলেমী ও ইউক্লিডের সঙ্গে আল-ফারাবীরও উদ্ধৃতি প্রদান করেন। তিনি বিশেষ করে ডি সায়েন্টিসের উল্লেখ করেন। সঙ্গীতের নিরাময়মূলক দিক সম্পর্কে তিনি ইবনে সিনারও উদ্ধৃতি দেন। নিম্নোক্ত গ্রন্থকারগণও ইবনে সিনার কাছ থেকে ধার করেছেন; ওয়াল্টার অডিংটন এবং এঞ্জেল বার্ট। জেরোম মোরাভিয়ার তাঁর ডি মিউজিকার একটি অধ্যায়ে আল-ফারাবী সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। জর্জ ভ্যাল্লার, জর্জ রাইশের এবং ক্যামেরারিয়াসের পুনঃ প্রকাশিত ডি সায়েন্টিস থেকে দেখা যায় যে, আল-ফারাবী সপ্তদশ শতকেও পণ্ডিতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
উপরে সাহিত্যের মাধ্যমে যোগাযোগের যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে তার অবদান তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। যে আরব মতবাদ মৌখিকভাবে প্রচারিত হয় তার গুরুত্ব বরং অনেক বেশি ছিল। ইবনে হিজারী বলেন, স্পেনে উমাইয়া শাসনামলে "যে কর্ডোভা জ্ঞান-বিজ্ঞানের মহান ভাণ্ডার ছিল সেখানে বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য বিশ্বের সকল এলাকা থেকে জ্ঞানার্থীদের সমাবেশ হতো।" এখানে চতুর্কলা-এর অন্যতম দিক সঙ্গীত তত্ত্ব শিক্ষা দেওয়া হতো, তাই ল্যাটিন অনুবাদের মধ্যস্থতা ছাড়া ইউরোপীয় শিক্ষার্থীরা সরাসরি আরব জ্ঞানভাণ্ডার থেকে সঙ্গীত বিষয়ক জ্ঞান সঞ্চয়ের সুযোগ পায়। মোযারেবরা সম্ভবত আরবী ভাষায় কথা বলতেন। তাই আরব বিজ্ঞানের প্রচার ও প্রসারে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। আমরা জানি যে, রজার বেকন যখন অক্সফোর্ডে আরবীর ভুল ল্যাটিন অনুবাদ ব্যবহার করে স্পেনীয় ছাত্রদের মধ্যে ভাষণ দিচ্ছিলেন তখন ছাত্ররা তাঁকে উপহাস করেন, কারণ তারা তাঁর কর্তৃত্ব শুরু থেকে জানতেন। এটি মোটেই বিস্ময়কর নয় যে, এই অলৌকিক পণ্ডিত তাঁর পূর্বসূরি বাথের অ্যাডেলার্ডের ন্যায় তাঁর পাঠক ও শ্রোতাদের আরব চিন্তাধারার পক্ষে ইউরোপীয় চিন্তাধারা পরিহারের উপদেশ দিতেন। ইউরোপীয় তাত্ত্বিকরা কেবল মার্টিয়ানাস কাপেল্লা, বোইথিয়াসের মাধ্যমে গ্রীক মতবাদের সঙ্গে পরিচিত হন, অথচ আরবরা অ্যারিস্টটল, অ্যারিস্টজেনাস, ইউক্লিড, নিকোমেচাস, টলেমী ও অন্যান্য গ্রীক মনীষীর রচনার অধিকারী ছিলেন।
আরবরা সোলফেজিয়োর ক্ষেত্রে ইউরোপকে প্রভাবিত করলেও একটি বর্ণমালা-ভিত্তিক স্বরলিপির কথা সুনিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বাদ্যযন্ত্রের স্বরলিপির ক্ষেত্রে আরবদের অবদান অনেক সুস্পষ্ট। রূপান্তরমূলক স্বরলিপির ক্ষেত্রে মুসলিম প্রাচ্যে ১২০০ খৃস্টাব্দের দিকে এর প্রথম প্রয়োগ দেখা যায়। ইউরোপের জন্য আরবদের সম্ভবত সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হচ্ছে পরিমাপমূলক সঙ্গীত। কলোনের ফ্রাঙ্কোবার আগে পরিমাপ করা গান অজ্ঞাত ছিল। ছন্দ নামে এটি সপ্তম শতক থেকে আরবীয় সঙ্গীতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল। ফ্রাঙ্কো ও তাঁর প্রবর্তিত ধারায় আমরা স্বরলিপির পরিমাপমূলক ব্যবস্থা ছাড়াও একটি ছান্দিক রীতি দেখতে পাই এবং এগুলি মূলত আরবদের কাছ থেকেই নেওয়া হয়েছে। ল্যাটিন গ্রন্থে আমরা এলমুয়াহিম ও এল মুয়ারিফা প্রভৃতি নামে বিশেষ বিশেষ ধরনের স্বরলিপির উল্লেখ দেখতে পাই। এগুলি মূলত আরবী থেকে উদ্ভূত। অপরদিকে জোহানেস ডি মুরিসের রচনায় আলেনটেড নামে একটি কৌশলের উল্লেখ রয়েছে। এই শব্দটিও মূলত আরবী। মধ্যযুগীয় যে হকেট শব্দটিকে রবার্ট ডি হ্যান্ডলো 'স্বরলিপি ও যতির সংমিশ্রণ' বলে উল্লেখ করেছেন তা আরবী ইকা'আত শব্দ থেকে উদ্ভূত। তেমনি ইবনে সিনার ক্যাননে ল্যাটিন আলহাশ শব্দটি আরবী আল ইশক।
ব্যবহারিক শিল্পকলা
ভবঘুরে শিল্পী শ্রেণীর দরুনই আরবদের ব্যবহারিক শিল্পকলা প্রসার লাভ করে। এসব চারণ মধ্যযুগে সঙ্গীতের সত্যিকার প্রচারক ছিলেন। পাশ্চাত্য গায়কদের জাঁকালো পোশাক, লম্বা চুল ও চিত্রিত চেহারার পিছনে সম্ভবত প্রাচ্যের প্রভাব ছিল। খেলনা ঘোড়া ও ঘন্টা শোভিত মরিস নৃত্য শিল্পীরা অবধরিতভাবে আরব চারণ শিল্পীদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এমনকি থয়নট আরবিউর সময় পর্যন্ত এসব মরিস নৃত্যশিল্পী মূরদের অনুকরণে নানারঙে তাদের চোহারা রঞ্জিত করতো। খেলনা ঘোড়ার নাম যামালযাইন সোজাসুজি আরবী উৎসবের ঘোড়া এর প্রতিধ্বনি। স্পেনীয় শব্দ মাসকারা ইংরেজী মাসকার শব্দের ন্যায় আরবী ভাঁড় শব্দ থেকে উদ্ভূত। আইবেরীয় উপদ্বীপে যাম্বরা, যারাবান্দা, হুদা, মারিস্কা ইত্যাদি বহু শব্দ রয়েছে যা সুস্পষ্টভাবে মূলত আরবী।
আরবদের উন্নততর সংস্কৃতি অবধারিতভাবে পশ্চিম ইউরোপে প্রতিফলিত হয়। আমরা দেখতে পেয়েছি যে, নবম শতকে স্পেনীয়রা মিল ও ছন্দের ক্ষেত্রে আরবদের অনুকরণ করছে, এমনকি দশম শতকে ইহুদীরাও এতদ্বারা প্রভাবিত হয়। স্পষ্টত কবিতার সঙ্গে যে সঙ্গীত ছিল তাও তারা অনুকরণ করে, কারণ এই দুটি পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। আমরা খৃস্টান স্পেনের জাগলারদের মধ্যে আরব ও ইহুদীদের দেখতে পাই। দ্বাদশ শতকে বার্সিলোনায় কাউন্টরা যখন প্রভেন্সের শাসক ছিলেন তখন টুবাডুর ও জংলার আরব আমীর ও তাঁর মুঘান্নীর ভূমিকা পুনরাভিনয় করতো।
বাদ্যযন্ত্রে ও যন্ত্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রে পশ্চিম ইউরোপে মুসলিম উত্তরাধিকার সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সাধারণভাবে স্বীকার করা হয় যে, বেশ কিছুসংখ্যক বাদ্যযন্ত্রের নাম, এমনকি প্রকৃত আকার আরবদেরই অবদান। লিউট, রেবেক, গিটার ও নাকের শব্দগুলির মূল আরবী যথাক্রমে আল-উদ, রাবাব, কিতারা ও নাককারা-এ কথা বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত সত্য। ইউরোপে বাদ্যযন্ত্রের বিদেশী নাম প্রবর্তিত হয়ে থাকলেও নতুন আকার প্রবর্তনের ক্ষেত্রে সেসব নাম সব সময় অব্যাহত থাকেনি। সুস্পষ্টভাবে বহু নতুন ধরনের আরব বাদ্যযন্ত্র প্রবর্তিত হয় এবং তখনকার ইউরোপীয় সঙ্গীত জগতে এগুলি উল্লেখযোগ্য ছিল। প্রথমত তার যুক্ত বীণা, প্যান্ডোর ও গিটার শ্রেণীর সর্বপ্রকার বাদ্যযন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে। এর পরে আসে বেহালা জাতীয় বিভিন্ন ধরনের বক্রাকারের বাদ্যযন্ত্র।
এসব বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধারও সৃষ্টি হয়। আরবদের সঙ্গে যোগাযোগের আগে তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে ইউরোপীয় চারণ শিল্পীদের কেবল সিথারা ও হার্প ছিল। কেবল কানে শুনেই তারা এগুলি বাজাতেন। আরবরা ইউরোপে তাদের লিউট, প্যান্ডোর ও গিটার আমদানির সঙ্গে সঙ্গে জালি ব্যবস্থার সাহায্যে ফিঙ্গার বোর্ডে স্বরলিপির নির্ধারিত স্থানসমূহও আমদানি করেন। এসব স্থান পরিমাপের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। এটি বিশেষভাবে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বস্তুত আরব লিউটের এই ফ্রেটিংয়ের মাধ্যমেই ইউরোপে প্রধান রীতি প্রবর্তিত হয়।
অবশ্য আরবদের সঙ্গে যোগাযোগের সব চাইতে বৃহত্তম অবদান ছিল পরিমাপমূলক সঙ্গীত। সঙ্গীত তত্ত্ববিদরা এটি লক্ষ্য ও পর্যালোচনা করার বহু আগে চারণশিল্পীরা তা প্রচার করেন। দ্বিতীয়ত অন্যান্য শিল্পকলায় আ্যরাবেস্ক এর প্রতিরূপ মেলডি 'সুশোভিত করণও' অবদানের সৃষ্টি করে। তারকিব বা যৌগিক নামে পরিচিত সুশোভনের এই রীতিতে চতুর্থ, পঞ্চম বা অষ্টকে যুগপৎভাবে স্বরাঘাত সৃষ্টি করা হয় এবং সম্ভবত এর মাধ্যমেই ইউরোপ সর্বপ্রথম হার্মনির পথে এগিয়ে যায়।
মঙ্গোলদের কাছে বাগদাদের পতন, খৃস্টানদের গ্রানাডা অধিকার এবং তুর্কীদের কাছে খৃস্টানদের আত্মসমর্পণের ফলে আরবী ভাষাভাষীদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রাধান্যের অবসান হয়। দৃশ্যত শিল্প ও রাজনীতির মধ্যে ব্যবধান দুস্তর হলেও সত্যিকার ব্যাপার হচ্ছে এ দুটি পারস্পরিক ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট। এই ক্ষেত্রটি ছাড়া সর্বশেষে উল্লেখিত তারিখের বহু আগে থেকেই ইউরোপ বিশ্বসংস্কৃতিতে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে।
টিকাঃ
১. মওলবী দরবেশ সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা জালালুদ্দীন রূমী ১২৭৩ খৃস্টাব্দে কেনিয়ায় ইন্তিকাল করেন।
১. এটি সুলতান মুহাম্মদ ইবনে মুরাদের নামে উৎসর্গিত হওয়ায় আমি এই নামে আখ্যায়িত করেছি।
১. মূলত ল্যাটিন; অর্থ শুরু থেকে।
২. বাঁধাগৎ স্বরগ্রাম সাধা: যেমন সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি; পাশ্চাত্য স্বরগ্রাম: ডু-রে-মি-ফি সোল-লা-টি।
১. খেলনা ঘোড়া; মরিস নৃত্যের সময় খেলনা ঘোড়া এমনভাবে কোমর পর্যন্ত যুক্ত করা হতো যাতে মনে হতো যে, নৃত্য শিল্পী ঘোড়ায় চড়ে ছুটেছে।
২. একটি প্রাচীন লোকনৃত্যের নাম যা এক সময় ইংল্যান্ডে, বিশেষত মে দিবসে সাধারণ ব্যাপার ছিল। এতে রঙ বেরঙের পোশাক পরা হতো।
৩. পশ্চিম পিরেনিজ অঞ্চলে, বিশেষত উত্তর স্পেনে বসবাসকারী উপজাতি ও তাদের ভাষা।
১. মধ্যযুগীয় ফ্রান্স ও ইংল্যাণ্ডের ভবঘুরে চারণ করি যারা আবৃত্তি বা গানের মাধ্যমে জনসাধারণের চিত্তবিনোদন করতো।
২. বীণা জাতীয় প্রাচীন ইউরোপের বাদ্যযন্ত্র, জিথারের প্রাচীনরূপ।
৩. সচ্ছিদ্র বা জালির কাজ; অঙ্গুলি চালনা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ব্যাঞ্জো, গিটার প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রের ফিঙ্গার বোর্ডের উপর স্থাপিত উঁচু পৃষ্ঠদেশ।