📄 ইসলামী শিল্পকলা এবং ইউরোপের চিত্রকলার ওপর এর প্রভাব
সপ্তদশ শতকের আগে মুসলিম চিত্রশিল্প ইউরোপে আনা হয়েছিল কিনা তাঁর কোন প্রমাণ নেই। রেমব্রান্টকেই প্রাচ্যের শিল্পকলার প্রতি যথেষ্ট আগ্রহশীল পাশ্চাত্যের প্রথম চিত্রকর মনে করা হতো। দূরপ্রাচ্য থেকে কতিপয় চিত্র হল্যান্ডে পৌঁছার পর তিনি সেগুলি নকল করেন। এগুলি ছিল দিল্লীর রাজকীয় পরিবারের সদস্যদের ছবি।
অতএব, ইউরোপে ব্যক্তিগতভাবে কোন শিল্পীর উপর মুসলিম বিশ্বের চিত্র শিল্পের কোন প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল না। তেমনি মুসলিম প্রাচ্যের প্রভাব কোন বড় রকমের চিত্রকলার আন্দোলনকে অনুপ্রাণিতও করেনি। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে ক্লাসিক্যাল শিল্পের প্রতি নতুন আবেগের ফলে ইটালীয় চিত্রকলায় যে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয় সেরূপ শিল্প চর্চায় মুসলমানদের কোন সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। খুঁজে পাওয়া গেলেও তা বাহ্যিক। ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে আরব প্রাধান্যের প্রাথমিক যুগেই এগুলি দেখা যায়। প্রাচ্যের নকশীবস্ত্র থেকে কিছু কিছু জীবজন্তুর ছবি নকল করা হয়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ একাদশ শতকে বিবলিওথেক ন্যাশনেলে (জাতীয় গ্রন্থাগার) বীটাসের অ্যাপক্যালিপসের টীকার পাণ্ডুলিপিতে এবং মধ্যযুগের প্রথম দিকের অন্যান্য কতিপয় পাণ্ডুলিপিতে এসব চিত্র দেখা যায়। কিন্তু মুসলিম সংস্কৃতির সঙ্গে খৃস্টান বিশ্বের সরাসরি যোগাযোগ এবং প্রাচ্যের শিল্প সৌকর্যমূলক জিনিস আমদানির ফলে ভাস্কর্য, স্থাপত্য কিংবা ধাতব শিল্পকর্মে যতটা অবদান সৃষ্টি হয়েছে চিত্রকলার ক্ষেত্রে তা আদৌ হয়নি। প্রাচ্যের উপাদানসমূহের কারুকার্যমূলক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ক্ষেত্রেই প্রধানত এর ভূমিকা দেখা যায় এবং সেখানেও ছোটখাট ব্যাপারেই তা সীমাবদ্ধ থাকে। এসব কারুকার্যমূলক উপাদান মুসলমানদের উৎপাদিত রেশমী বস্ত্র ও অন্যান্য শিল্প উপকরণ আমদানির মাধ্যমে পাশ্চাত্যের সংস্পর্শে এলেও এগুলি একান্তভাবে মুসলমানদের উদ্ভাবিত বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। মুসলমানরা তাদের পূর্বসূরিদের কাছ থেকে যেসব জিনিস লাভ করেছে সেগুলিও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। অতীতের এ ধরনের শৈল্পিক সম্পদের মধ্যে কালডিয়ার পবিত্র বৃক্ষের ন্যায় অত্যন্ত প্রাচীন কতিপয় প্রচলিত নকশাও রয়েছে। এই নকশাটি সাসানীয় শিল্পকলার মধ্য দিয়ে মুসলিম যুগে এসেছে। আদিম রীতি অনুসারে এই জীবন বৃক্ষটির দুপাশে দুটি জন্তু পরস্পরের মুখোমুখি থাকে। কিন্তু খৃস্টান শিল্পীরা প্রায়ই পবিত্র বৃক্ষের কেন্দ্রীয় উপাদানটি পরিহার করেছে। মুসলিম পূর্ববর্তী আদিম যুগের অন্যান্য চিত্রের মধ্যে একটি অপরটির শিকার দুটি জন্তু এবং একই দেহ ও দুই মস্তক বিশিষ্ট জন্তুর ছবি উল্লেখযোগ্য। এগুলি চিত্রকলার চাইতে ভাস্কর্যের মধ্যেই বেশি দেখা যায় এবং শেষোক্ত ক্ষেত্রে প্রায়ই অনুরূপ খোদাই শিল্প থেকে নকল করে গির্জার ক্যাপিটাল (স্তম্ভের শীর্ষদেশ) ও বাস-রিলিফে (পটভূমি থেকে উঁচু) খোদাই করা হয়। দ্বিতীয় রজারের (১১০১-৫৪ খৃ.) পালেরমোর প্যালেটাইন চ্যাপেলের নকশাশিল্পীদের ন্যায় যেসব মুসলিম শিল্পী মধ্যযুগের প্রথম দিকে খৃস্টান পৃষ্ঠপোষকদের জন্য কাজ করেন তাদের শিল্পকর্মে এধরনের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।
ক্রুসেডের আমলে মুসলিম প্রাচ্যের সঙ্গে অধিক পরিমাণ যোগাযোগের ফলে মুসলমানদের আলঙ্কারিক উপাদান সম্বলিত জিনিসপত্রের বিশেষভাবে আমদানি ঘটে। এ সময় জেনোয়া, পিসা ও ভেনিসের ন্যায় বাণিজ্যিক যোগাযোগ কেন্দ্রের দেশগুলিতে চিত্রশিল্পে এসব উপাদান প্রচলিত হয়। এর ফলে প্রধানত অপরিচিত জিনিসের প্রতি কৌতূহল ও আকর্ষণ থেকে প্রাচ্য বিশ্বের প্রতি একটি আগ্রহের সৃষ্টি হয়। এর প্রতিফলন ঘটে সিয়েনীয় চিত্রকলার প্রাথমিক দ্রব্যগুলিতে এবং তা আরো প্রাধান্য পায় টুসকান শিল্পে। চতুর্দশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধেই এসব ইটালীয় চিত্রে পাগড়িওয়ালা ছবি ও প্রাচ্যের মুখাবয়ব পরিদৃষ্ট হয়। কোন পবিত্র দৃশ্যে এসব বিদেশী ছবি সাধারণত প্রাধান্য পায় না। কেবলমাত্র আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রেই প্রাচ্যের প্রভাব বিশেষভাবে অনুভূত হয়। যেমন, পারস্য ও অন্যান্য কার্পেটের প্রতিলিপিতে, অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রাচ্যের পোশাকে এবং চিতা বাঘ, বানর ও তোতা পাখির ন্যায় ভিনদেশী জীবজন্তুর প্রচলনে। বিস্তারিত প্রাকৃতিক দৃশ্যেও প্রাচ্যের নকশার ইচ্ছাকৃত অনুকরণমূলক গাছপালা ও পত্রপুষ্প দেখা যায়।
কারুকার্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে প্রায়ই আরবী হস্তলিপি ব্যবহারের মধ্যে একটি বিশেষ প্রাচ্য বৈশিষ্ট্য ধার করার প্রমাণ পাওয়া যায়। এটি খৃস্টান শিল্পীদের উপর মুসলিম শিল্পের সরাসরি প্রভাবের অন্যতম প্রধান দৃষ্টান্ত যা ইউরোপীয় পণ্ডিত ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৮৪৬ খৃস্টাব্দে আডিয়েন ডি লং পারিয়ার কর্তৃক রিভিউ আর্কিওলজিক-এ তাঁর নিবন্ধ 'ডি এল এমপ্লয় ডেস কারেক্টার্স অ্যারাবেস ড্যান্স এল অর্নামেন্টেশন, চেযলেস পিউপলস্ ক্রেটিয়েন্স ডি এল অকসিডেন্ট' প্রকাশিত হওয়ার পর ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় এর দৃষ্টান্ত সংগৃহীত হয়। বার্লিংটন ম্যাগাযিন-এ মিঃ এইচ ক্রিস্টির অত্যন্ত সুচিন্তিত প্রবন্ধগুলিতে (১১শ ও ১২শ সংখ্যা 'দি ডেভেলপমেন্ট অব অর্নামেন্ট ফ্রম অ্যারাবিক স্ক্রিপ্টস')। ইটালীয় চিত্রকলায় চিত্রকর জটোর আমলেই এ ধরনের আরবী বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কারুকার্যের ব্যবহার দেখা যায় (যেমন পাড়ুয়ার অ্যারেনা চ্যাপেলে রিসারেকশন অব ল্যাযারাসে যিশুখৃস্টের ছবির ডান কাঁধের উপর)। এ ধরনের কারুকার্যের জন্য ফ্রা অ্যাঞ্জেলিকো এবং ফ্রালিপ্পো লিপপি বিশেষভাবে জনপ্রিয়। এখানে স্পষ্টত এ ধরনের নকশার মূল পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা থেকে ভার্জিনের আস্তিন এবং তাঁর পোশাকের প্রান্তভাগেও এই নকশা ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাচ্য থেকে আমদানিকৃত বহু ধরনের রেশমী ও সুতিবস্ত্র কিংবা প্রদীপ ও অন্যান্য পিতলের পাত্রই তাদের এ ধরনের নকশা জ্ঞানের সূত্র।
গ্রন্থপঞ্জি
স্যার টমাস ডব্লিউ আর্নল্ড, পেইন্টিং ইন ইসলাম, এ স্টাডি অব দি প্লেস অব পিক্টোরিয়াল আর্ট ইন মুসলিম কালচার, অক্সফোর্ড ১৯২৮।
টিকাঃ
১. ল্যাট্ (জে এবারসোন্ট, ওরিয়েন্ট এট্ অকসিডেন্ট পৃ. ১৯, প্যারিস, ১৯২৮)।
১. এগুলির একটি দীর্ঘ তালিকা সংকলিত হয়েছে, দ্রষ্টব্য-আঁদ্রে মাইকেল, হিস্টরি ডি লার্ট টি. আই ২ মি পার্টি, পৃ. ৮৮৩ এস কিউ কিউ (প্যারিস, ১৯০৫), এ ম্যারিগনান, আন হিস্টারিয়েন ডি লার্ট ফ্ল্যঙ্কয়েস লুই কোরাজড (৪র্থ অধ্যায়, এল' ইনফ্লুয়েন্স ওরিয়েন্টেল সুর লেস প্রভিন্সেস ডু নর্ড এটু ডু মিডি ডি এল ইটালী) (প্যারিস, ১৮৯৯)।
২. এ প্যাভলভস্কী 'ডেকোরেশন্স ডেস প্ল্যাফন্ডস ডি লা চ্যাপেল প্যালাটাইন' (বাইযেন্টিনিস্চ্ ফিটসচারিফ্ট, ২য়, ১৮৯৩)।
📄 স্থাপত্য শিল্প
এখন থেকে একযুগ পরে হয়তো কিছুটা আস্থার সঙ্গে স্থাপত্য শিল্পে মুসলিম বিশ্বের অবদান নিরূপণ করা সম্ভব হবে। অনুসন্ধানমূলক জ্ঞানচর্চার বর্তমান অবস্থায় মুসলিম স্থাপত্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্পর্কে এতটা সন্দেহ বিরাজ করছে যে, কেবলমাত্র ঘোরতর পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তিই তাঁর যুক্তি সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হতে পারে। এটি দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার যে, অতি সাম্প্রতিক গবেষণা যেখানে অনিশ্চিত বিষয়গুলির উপর আলোকপাত করার কথা, সেখানে তা আমাদের কাছে বিতর্কমূলক যুক্তি হিসাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
এসব ব্যাপার পরিণত যুগে মুসলিম স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে কিংবা পাশ্চাত্য বিশ্বে স্থাপত্যের বিবর্তনে এর প্রভাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। এগুলি বরং এর উদ্ভব এবং প্রাথমিক ভবনগুলির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাপার। এতদসত্ত্বেও মানবজাতির জন্য এর অবদানের ক্ষেত্রে এগুলির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে, কারণ এগুলি মূলত ইসলামী এরূপ কোন প্রমাণ পাওয়া না গেলে আমরা তাকে অবাধে ইসলামের অবদান হিসাবে মেনে নিতে পারি না। অপর কথায়, কারো কারো মতে মুসলিম স্থাপত্যে এমন বহু জিনিস রয়েছে যা অমুসলিম জাতিসমূহ থেকে ধার করা। কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তি এমনও মনে করেন যে, মুসলমানরা শুধুমাত্র স্থাপত্য রীতি ধার করেছেন এবং তাদের কোন উল্লেখযোগ্য নিজস্ব স্থাপত্য শিল্প নেই। এই মৌল প্রশ্নে উপসংহারে পৌঁছতে হলে সাধারণভাবে মুসলিম স্থাপত্যের উদ্ভব ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে প্রথমে একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া আবশ্যক।
আরবরা অর্ধ-শতাব্দীর মধ্যেই হেজাজ থেকে পশ্চিমে হারকিউলেসের পিলার পর্যন্ত এবং পূর্বে ভারতের সীমানা পর্যন্ত মরুভূমির ঘূর্ণিঝড়ের ন্যায় অগ্রসর হয়। যেসব দেশ ইতিপূর্বে সভ্যতা লাভ করে সেগুলি জয় করে। রোমান সাম্রাজ্যে সর্বাধিক উন্নতির যুগে যতোটা প্রসার লাভ করেছিল তারা তার চাইতে বিস্তৃততর এলাকায় নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে এবং এমন বহু জাতি তাদের কর্তৃত্বাধীনে আসে যাদের স্থাপত্য রোম থেকে পৃথক ধরনের ছিল এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের সভ্যতা রোম থেকে প্রাচীনও ছিল।
যারা আমাদের মধ্যযুগীয় পাশ্চাত্য স্থাপত্যের প্রধানত রোমান সূত্রে বিশ্বাস করেন এবং যারা এর প্রত্যেকটি ব্যাপারে ইরান বা আরমেনিয়ার সূত্র আরোপ করেন তাদের তীব্র বিতর্কের প্রেক্ষিতে প্রকৃত অবস্থা যাই হোকনা কেন, একটি বিষয় ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছে যে, শেষোক্ত বিষয়টির প্রতি আমাদের আরো গভীর মনোযোগ দেওয়া উচিত। আরমেনিয়া, মেসোপটেমিয়া ও তুর্কীস্তানে কতিপয় উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার কিছুটা বাদ-বিসম্বাদের সৃষ্টি করলেও তা আমাদের অতি-রোমান মনোভাবকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এমনো হতে পারে আমাদের 'রোমানেস্ক' ও গথিক ভবনগুলি রাজকীয় রোমের ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ভূত হয়েছে বলে রাজকীয় কর্তৃপক্ষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে বিশ্বাস পোষণ করতেন কিংবা রেনেসার পাণ্ডিত্যাভিমানী মানবতাবাদীরাও যা বিশ্বাস করতেন তা ভুল ধারণা প্রসূত। কারণ যাই হোক, একথা সুস্পষ্ট যে, বর্তমানে একটি নিরপেক্ষ মন নিয়ে আমাদের প্রাচ্যের দিকে তাকাতে হবে এবং প্রথমেই 'প্রাচ্যকে' একটি একক সত্তা হিসাবে মনে করার অভ্যাস পরিহার করতে হবে। আমরা রোমের কাছে ঋণী এই সত্যের প্রতি কেউ কদাচিৎ সন্দেহ পোষণ করে, কিন্তু আমাদের এই বাধ্যবাধকতার সীমা পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে।
আরব বিজয়ীরা যেসব অঞ্চল অধিকার করে তাঁর মধ্যে সিরিয়া, আরমেনিয়ার অংশবিশেষ এবং মিসরসহ উত্তর আফ্রিকার বসবাস উপযোগী অঞ্চলগুলি পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য থেকে অধিকৃত হয়। স্পেন ভিসিগথদের কাছ থেকে অধিকৃত হলেও ইতিপূর্বে এটি একটি রোমান প্রদেশ ছিল। মেসোপটেমিয়া থেকে তুর্কিস্তান পর্যন্ত ভূখণ্ড এবং আফগানিস্তান দ্বিতীয় খসরুর সাবেক সাসানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। খৃস্ট ধর্ম আর্মেনিয়ার পূর্ব সীমান্ত ও সিরিয়ায় প্রবেশ করে। সুদূর দক্ষিণে ইয়েমেনের সানায় (দক্ষিণ আরব) ষষ্ঠ শতকের একটি গির্জা ছিল। অতএব, বিজয়ীরা তাঁদের প্রত্যেকটি প্রদেশের প্রজাদের মধ্যে দক্ষ স্থপতিদের তৈরি অবস্থায় পায়। তাছাড়া তারা এমন বহু সংখ্যক ভবনও পায় যেগুলিকে তারা তাদের পূর্ববর্তী কপটিক (প্রাচীন মিসরীয়) ও ভিসিগথিক খৃস্টানদের ন্যায় পাথরের খনি হিসাবে ব্যবহার করে। এই অনস্বীকার্য বাস্তব অবস্থা থেকে অনেক কিছুর উদ্ভব হয়েছে। কিন্তু একথাও স্মরণ রাখতে হবে যে, আরবরা তাদের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলিতে এমনসব স্থানীয় নির্মাণ শিল্পীর সাক্ষাত পান যাদের নির্মাণ রীতি রোমানদের রীতির চাইতে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল এবং কোন কোন বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমতে বিশ্বাস স্থাপন করতে হলে তারা বাইজেন্টাইন স্থপতিদের এমনসব ব্যাপারে শিক্ষাদান করেছেন যার ফলে বাইজেন্টাইন স্থাপত্য রোমান স্থাপত্য থেকে আলাদা রূপ লাভ করে।
প্রাথমিককালের আরব বিজয়ীদের কোন স্থাপত্য দক্ষতা বা রুচি ছিল না বলে যে সাধারণ ও যুক্তিযুক্ত অভিমত দেওয়া হয় সে সম্পর্কে কোন বিতর্কে যাবো না। কারণ আপাত দৃষ্টিতে বিবেচনা করলে তেমনটিই মনে হতে পারে। তারা যে বিজয় গৌরবে দীপ্ত তা কেবল ধর্মীয় প্রেরণা্য উদ্বুদ্ধ একটি সৈনিক জাতির পক্ষেই সম্ভব, যাদের সময় প্রধানত সংগ্রাম ও ইবাদতেই অতিবাহিত হয়। তাছাড়া তারা শহরে বসবাসকারী ছিলেন না, তারা ছিলেন নিয়ত মুসাফির। তারা যখন যুদ্ধবিগ্রহ ছেড়ে শাসনকার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখনো নির্মাণ শিল্পের কারিগরি দক্ষতার জন্য স্থানীয় শিল্পীদের ওপর কিংবা (এবং এই ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ) একটি বিজিত এলাকা থেকে অপর এলাকায় নিয়ে আসা শিল্পীদের ওপর নির্ভর করেন। তাই জানা যায় যে, আরমেনীয় রাজমিস্ত্রীদের কেবল মিসরে নয়, স্পেনেও নিয়োজিত করা হয়। সম্ভবত ফ্রান্সের নবম শতকের জারমিনি-ডেস-প্রেস গির্জার নির্মাণ কাজেও তাদের নিয়োগ করা হয়, কারণ তাঁর মধ্যে কতিপয় মুসলিম বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু বিজয়ের প্রাথমিক বছরগুলিতে স্থাপত্য শিল্প সম্পর্কে আরবদের সম্ভাব্য অজ্ঞতা সত্ত্বেও মুসলিম স্থাপত্যের উল্লেখযোগ্য ও নিঃসন্দেহ দিক হচ্ছে, মৌলিকভাবে বিচিত্র হয়েও এটি সকল দেশে ও সকল যুগে নির্ভুলভাবে একটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখে। এর এমন একটি দিক রয়েছে, যা এটিকে সর্বপ্রকার স্থানীয় শিল্পকর্ম থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দান করেছে এবং এটিই কারিগরি ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব রূপের নিয়ামক।
যে কারণটি বহু বিচিত্র নির্মাণ আদর্শকে একক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন একটি রীতিতে রূপান্তরিত ও রূপায়িত করেছে তা হচ্ছে সম্ভবত ইসলামের বিশ্বাস। কারণ প্রথমদিকের আরবদের নির্মিত ভবনগুলি ছিল প্রধানত মসজিদ ও প্রাসাদ এবং পরবর্তী শতকগুলিতে যেসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য শিল্প-সমৃদ্ধ ভবন নির্মিত হয় সেগুলিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছিল মসজিদ কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় ভবন, যথা মাদ্রাসা ও মসজিদ সংলগ্ন ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র। মসজিদই ছিল আরবদের আদর্শমূলক ও প্রধান ভবন। বিভিন্ন এলাকায় আকারের দিক দিয়ে কিছু কিছু পার্থক্য থাকলেও এগুলির প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ থাকতো। মুসলিম বিশ্বের সকল এলাকা থেকে বার্ষিক হজ্জে গমন নিঃসন্দেহে একই বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মসজিদ সৃষ্টিতে অবদান রাখে, কারণ সুদীর্ঘ হজ্জযাত্রায় হাজীরা পথিমধ্যে স্থানীয় যে মসজিদটিতে নামায পড়তে যেতেন, সেখানে সংশ্লিষ্ট হাজী নির্মাণ শিল্পী বা স্থপতি হলে তিনি এর নকশাগুলি পর্যবেক্ষণ করতেন।
৬২২ খৃস্টাব্দে মহানবী কর্তৃক নির্মিত মদীনার আদি মসজিদটি অন্যসব মসজিদের আদর্শ ছিল। এটি ছিল চারদিকে ইট ও পাথরের প্রাচীর সমন্বিত একটি বর্গাকার বেষ্টনী। এর একটি অংশে ছাদ ছিল এবং সেটি সম্ভবত উত্তরাংশ, যেখানে মহানবী নামায পড়াতেন। এই ছাদ সম্ভবত খেজুর গাছের গুড়ির উপর খেজুর পাতাকে কাদায় আবৃত করে নির্মিত হয়। মুসল্লিরা উত্তরে পবিত্র জেরুজালেম শহরের দিকে মুখ করে সিজদা দিতেন। এবং এই দিক (কিবলাহ) কোন একটি পন্থায় চিহ্নিত করা হয়। ৬২৪ খৃস্টাব্দে জেরুজালেম থেকে মক্কার দিকে কিবলাহ পরিবর্তন করা হয়, অর্থাৎ (মদীনার ক্ষেত্রে) তা উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে পরিবর্তিত হয়। এরূপ একটি সাদাসিধে গৃহে কোন এলাকা থেকে স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ধার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়নি, কারণ স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজনও ছিল না।
পরবর্তী মসজিদটি নির্মিত হয় ৬৩৯ খৃস্টাব্দে মেসোপটেমিয়ার কুফা নগরে। মার্বেল স্তম্ভের উপরে এর ছাদ নির্মিত হয়। স্তম্ভগুলি হিরায় পারস্য রাজাদের একটি পরিত্যক্ত প্রাসাদ থেকে সংগ্রহ করা হয়। এই মসজিদটিও ছিল বর্গাকৃতির, কিন্তু তাঁর চারদিকে প্রাচীরের পরিবর্তে পরিখা ছিল। ৬৪২ খৃস্টাব্দে আমর কর্তৃক ফুসতাতে (কায়রো) একটি ছোট মসজিদ নির্মিত হয়। এটিও বর্গাকৃতির ছিল, কিন্তু কথিত আছে যে, এতে কোন উন্মুক্ত চত্বর (সাহন) ছিল না। এর মধ্যে নতুন বৈশিষ্ট্য ছিল একটি উঁচু মঞ্চ (মিম্বর)। কয়েক বছর পরে ইমামকে জনতা থেকে আলাদা রাখার জন্য এতে একটি মাকসুরাহ (পর্দা বা কাঠের জাফরী) প্রবর্তন করা হয়। বলা হয়, এই শতকের সমাপ্তিতে গম্বুজের আবির্ভাব ঘটে এবং তাঁর সামান্য কিছু দিন পরে কিবলাহ নির্দেশক মিহরাবের প্রবর্তন হয়, (চিত্র ৭৪)। এমনিভাবে মদীনা্য প্রথম মসজিদ নির্মিত হওয়ার আশি থেকে নব্বই বছরের মধ্যেই জামি মসজিদের সর্বপ্রকার অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব হয়। অন্য যেসব ছোটখাট বৈশিষ্ট্য সংযোজিত হয় সেগুলি হচ্ছে লাইওয়ানাত (আল-আইওয়ান-এর অপভ্রংশ লাইওয়ান-এর বহুবচন) নামে পরিচিত সাহন-এর চারদিকের খিলান শ্রেণী এবং ওযু করার ব্যবস্থা। এই ছোট তালিকায় সকল যুগের মসজিদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় সর্বপ্রকার প্রধান প্রধান বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
উপরোল্লিখিত মসজিদগুলির কোনটিতেই তাদের মূল কাঠামো রক্ষিত হয়নি। এমনকি পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের ফলে তাদের মূল পরিকল্পনাও হারিয়ে গেছে। কিন্তু পরিকল্পনাই হচ্ছে আসল ব্যাপার। কারণ আদি মসজিদটি কেবল একটি গৃহ ছিল এবং স্থাপত্য বলতে আমরা যা বুঝি তাঁর কোন নিদর্শন নিশ্চয়ই তাতে ছিল না। এতদসত্ত্বেও এম ভন বার্চেম এই প্রাথমিক মসজিদ পরিকল্পনার মূল ধারণার সঙ্গে খৃস্টান প্রাথমিক গির্জার তুলনা করেছেন: সাহন আটিয়াম (প্রধান কক্ষ) থেকে, প্রধান লাইওয়ান মূল গির্জা থেকে, মাকসুরাহ চান্সেল-স্ক্রিন (যাজকের জন্য সংরক্ষিত স্থান) থেকে, গম্বুজ গির্জার টাওয়ার থেকে এবং মিহরাব অ্যাপ্স (ছাদযুক্ত অর্ধ-বৃত্তাকার স্থান) থেকে উদ্ভূত হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের অনুমানের আদৌ প্রয়োজন ছিল না কিংবা তা যথাযথও নয়। আরবরা এই ধর্মীয় বেষ্টনী ও রক্ষিত স্থানকে স্থাপত্যশিল্পে রূপান্তরের পূর্বে এর মূল সূত্রের প্রশ্ন দেখা দেয়নি।
নিছক প্রয়োজনীয়তা থেকে মর্যাদা ও জাঁকজমকের অবস্থায় পৌঁছার চেষ্টা অত্যন্ত দ্রুত গতিসম্পন্ন ছিল। ইসলামী ধর্মীয় বিধানে অনাড়ম্বর জীবন এবং বহু নিষ্ঠাবান মুসলমানের কঠোর শৃঙ্খলপূর্ণ জীবন যাপনের কথা বিবেচনা করলে এই প্রচেষ্টা বিস্ময়কর বৈ কি! মহানবীর ইন্তিকালের বিশ বছরের মধ্যেই মদীনা্য তাঁর নিজস্ব মসজিদটিকে প্রাচীর ও সজ্জিত পাথরের পৈঠা দিয়ে পুনর্নির্মাণ করা হয়। ৬৩৯ খৃস্টাব্দে আরবদের জেরুজালেম বিজয়ের পর খলীফা ওমর সেখানে যে একটি স্থূল মসজিদ নির্মাণ করেন তাঁর পাশে সপ্তম শতকের শেষ বছরগুলিতে সাধারণত 'ডোম অব দি রক' কুব্বাতুস সাখরা নামে পরিচিত একটি সুরম্য প্রাসাদ নির্মিত হয়। মাশহাদ বা স্মৃতিসৌধের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বিশালকায় এই প্রাসাদটিতে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে কারুকার্য করা হয়েছে (চিত্র ৭৫)। এখান থেকেই মুসলমানদের স্থাপত্যশিল্প সম্পর্কে এখনো যে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে আমরা তাঁর কেন্দ্রস্থলে প্রবেশ করছি। ডোম অব দি রক (আরবী কুব্বাতুস সাখরা) একটি শ্রমসাধ্য ও সুসম্পন্ন ভবন। এটি এমন একটি মাশহাদ (স্মৃতিসৌধ) যেখানে তীর্থযাত্রীরা পাথরটির চারদিক প্রদক্ষিণ করে। মহানবী (সা) এখান থেকেই ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। তাছাড়া এটি এখনো অনুপম এবং অন্তত চারশ' বছর পর্যন্ত উন্মুক্ত চত্বরসহ বর্গাকৃতির স্বাভাবিক জামে মসজিদটির পরিবর্তন সাধনের কোন গুরুত্বপূর্ণ চেষ্টা করা হয়নি। তাই অত্যন্ত হঠকারিতার সঙ্গে অনুমান করা হয় যে, 'ডোম অব দি রক' একটি রোমান বা বাইজেন্টাইন রীতির ভবন, এটিকে সরাসরি পৌত্তলিক বা খৃস্টান আদর্শ থেকে নকল করা হয়েছে, এটি সম্পূর্ণভাবে খৃস্টান শ্রমশিল্পীরা তৈরি করেছে। সুতরাং এটি আরব শিল্পকর্মের প্রধান ধারার বাইরে একটি আলাদা স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেছে। এই অভিমতে কিছুটা সত্য থাকলেও এবং আপাত দৃষ্টিতে যথার্থ মনে হলেও তা কোন অবস্থায় জোর দিয়ে বলা যায় না।
পার্শ্ববর্তী অংশসহ উচ্চ গম্বুজ বিশিষ্ট নতুন রীতির এই ইমারতটি গড়ে তোলার পিছনে আরবদের একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছিল। ঐ মুসলমান ও ইহুদী উভয়ের কাছে পরম অনুরক্তের বস্তু জেরুজালেমের পবিত্র পাথরটিকে তারা গৌরবান্বিত ও সুরক্ষিত করতে চেয়েছিল। তারা এমন একটি ইমারত গড়তে চায় যা নিকটবর্তী হোলি সেপালচারের বিখ্যাত খৃস্টান গির্জাকে হার মানায়। নতুন মাশহাদ বিশাল সমতল ভূমির উপর 'হারাম শরীফ' বা পবিত্র স্থান নামে পরিচিত একটি প্রশস্ত পাথরের মালভূমির মধ্যস্থলে স্থাপন করা হয়। (একই সারিতে পরিকল্পনার কেন্দ্রস্থলের উপর ইতিপূর্বেই আল-আক্সা নামে একটি মসজিদ ছিল। এই আদি ভবনটির ইতিহাস এতই অস্পষ্ট ও জটিলতাপূর্ণ যে, এখানে তাঁর আলোচনা নিষ্ফল।) তাদের পবিত্র স্থানের সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য হিসাবে অঙ্গুরির ন্যায় গোলাকার উচ্চ গম্বুজ বিশিষ্ট ইমারতটি তৈরি করতে আরবরা অত্যন্ত বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়। একথা সত্য যে, তাদের পূর্ববর্তী রোমান বা বাইজেন্টাইনরা কোন সমাধি স্তম্ভ বা অন্যান্য পবিত্র স্থান সুরক্ষিত করার জন্য যেভাবে চূড়ান্ত ও নিয়ন্ত্রণকারী ভবন তৈরি করে এই গোলাকার গম্বুজ বিশিষ্ট ইমারতটি তৈরিতেও সেই পন্থা অনুসরণ করা হয়। কিন্তু এগুলিই বিশ্বে একমাত্র 'ডোম' (গোলাকার গম্বুজের ইমারত) ছিল না। ইরানীয় প্রেরণার প্রধান প্রবক্তা স্টেযিগোভস্কীর মতে-প্রাচ্যের গোলাকার গম্বুজের ইমারতের উদ্ভব এশিয়া মাইনরে কিংবা তাঁরো পূর্বদিকে, সেখান থেকে আরমেনিয়া হয়ে বাইজেন্টিয়ামে এবং বাইজেন্টিয়াম থেকে গ্রীক যাজকদের পৃষ্ঠপোষকতায় বলকান দেশসমূহে ও রাশিয়ায় এই রীতির প্রচলন হয়।
তাই আরবরা এখানে সর্বপ্রথম একটি গোলাকার গম্বুজের ইমারত তৈরি করলেও সেটিকে এমন এক বৈশিষ্ট্য প্রদান করেন যা একান্তভাবে খৃস্টানও ছিল না কিংবা রোমানও ছিল না। তারা সম্ভবত পার্শ্ববর্তী বিখ্যাত 'আনাসটাসিস' ডোমের নকল করেন। আকারের দিক দিয়ে এটি প্রায় একই রকমের। সপ্তম শতক শেষ হওয়ার বহু আগে সিরিয়া ও আর্মেনিয়ায় অবশ্যই গোলাকার গম্বুজ বিশিষ্ট গির্জা ছিল। ইতিপূর্বে ফিলিস্তিনেও 'ডোম অব দি রক' তথা একটি অষ্টভুজের অভ্যন্তরে উচ্চ গম্বুজ বিশিষ্ট গোল ইমারতের ন্যায় কয়েকটি গির্জা ছিল। অন্যান্য দিকে প্রাচীরগুলি হচ্ছে নিরেট পাথরের, আভ্যন্তরীণ খিলান পথের এবং জানালা পথের খিলানগুলি অর্ধ বৃত্তাকার এবং দুই সারিতে ব্যবহৃত স্তম্ভশ্রেণীর সবগুলি স্তম্ভ প্রাচীন। এসব স্তম্ভ পৌত্তলিক বা খৃস্টানদের প্রাচীনতর ভবনগুলি থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। তাই স্টাইলের দিক দিয়ে স্তম্ভগুলির নিচের দিকে কিংবা উপরিভাগে কোন সামঞ্জস্য নেই। খিলান শ্রেণীর নিচের দিকে বিশাল কাঠের বন্ধনী রয়েছে। এই এলাকায় যে ভূমিকম্প হতো সম্ভবত তা প্রতিরোধের জন্য কিংবা নির্মাণ শিল্পীরা শুধুমাত্র খিলানের উপর আস্থা স্থাপন করতে পারেনি বলেই এই ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয়। বাইজেন্টাইন ভবনগুলিতেও একই রকম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা দেখা যায়। 'ডোমটিও' স্বয়ং দ্বিগুণ। পুরোটা কাঠের তৈরি বাইরের দিক সীসায় এবং ভেতরের দিক নকশা করা প্লাস্টারে মোড়ানো। কিন্তু এটি মূল কাঠামো নয়। অনেকখানি মোজাইকের কাজ মূল অবস্থায় রয়েছে। অবশিষ্ট অধিকাংশ স্থানে পরবর্তীকালে কারুকার্য করা হয়েছে। অতএব আমরা দেখতে পাই যে, 'ডোম অব দি রক'-এ যা কিছু নতুনত্ব তা হচ্ছে গোলাকৃতির পরিকল্পনা, অর্ধবৃত্তাকার খিলান, কাঠের বন্ধনী এবং সম্ভবত মোজাইক। অর্ধ-বৃত্তাকার খিলান নিঃসন্দেহে আরবদের আবিষ্কার নয়, কাঠের বন্ধনীর উদ্ভব সন্দেহজনক এবং মোজাইকের প্রাচীনতম ব্যবহার প্রাক ইসলামী যুগের।
ডোম অব দি রক-এর পরে সময়ানুক্রমিকভাবে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম ভবন হচ্ছে অষ্টম শতকের সূচনায় নির্মিত দামেস্কের বিশাল জামে মসজিদ (চিত্র ৭৬)। এর প্রধান লাইওয়ান বা সংরক্ষিত এলাকা হচ্ছে একটি সুউচ্চ কক্ষ। যে খিলানপথ এটিকে সাহন থেকে পৃথক করেছে, সেখানে বিভিন্ন দরজা বা পর্দা রয়েছে। সাহন-এর অপর তিনদিক খিলান দেওয়া বারান্দায় ঘেরা। এই মসজিদের নতুন বৈশিষ্ট্যগুলি নানা রকমের। প্রধান লাইওয়ানের তিনটি গলিপথ একটি আড়াআড়ি পার্শ্বদেশে নিয়ে শেষ হয়েছে। পার্শ্বদেশের মাঝামাঝি উপরে একটি অর্ধবৃত্তাকার ছাদ রয়েছে। পার্শ্বদেশের প্রান্তভাগে অর্থাৎ প্রধান লাইওয়ানের দক্ষিণ দিকের প্রাচীরের মধ্যস্থলে কিবলাহ নির্দেশিত একটি মিহরাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় চত্বরের চারপাশের খিলান শ্রেণী কিছু অংশ পিলপার ওপরে এবং কিছু অংশ থামের ওপরে অবস্থিত। খিলানগুলি 'অশ্বনাল' আকৃতির। কোন সুস্পষ্ট কারণ না থাকলেও এগুলি পরবর্তীকালে পাশ্চাত্য মুসলিম স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য লাভ করে। অশ্বনাল গোলাকারও হতে পারে, কিংবা উপরিভাগ ছুঁচালোও হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে এর বক্রতা নিচের দিকে থামের উপরিভাগ পর্যন্ত প্রসারিত হয়। দামেস্কে গোলাকার অশ্বনাল খিলান ব্যবহৃত হয়। সাহন-এর চতুর্দিকে প্রধান খিলান শ্রেণীর ওপরে অর্ধবৃত্তের ন্যায় উপরিভাগ সমন্বিত সারিবদ্ধ জানালা রয়েছে। প্রতিটি খিলানের ওপর দুটি করে জানালা। যে টেমেনস্-এর অভ্যন্তরে মসজিদটি নির্মিত হয় তাঁর চারকোণে এক সময় যে চারটি রোমান টাওয়ার ছিল, এবং যেগুলিকে আরবরা মিনার হিসাবে ব্যবহার করতেন তাঁর মধ্যে বর্তমানে কেবল একটি (দক্ষিণ পশ্চিম কোণে) অবশিষ্ট আছে। বর্তমানের অপর তিনটি পরবর্তীকালে তৈরি করা হয়েছে। ভবনটির অভ্যন্তর ভাগ মার্বেল, মোজাইক এবং রঙীন কাচের জানালার সাহায্যে অপরূপভাবে সুসজ্জিত করা হয়েছে। যেসব সিরীয় গির্জাকে মসজিদে রূপান্তরিত করা হয়েছে সম্ভবত সেগুলির নির্মাণ প্রণালীতে প্রভাবিত হয়েই এই মসজিদটির অস্বাভাবিক পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিবলাহর গুরুত্ব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই সম্ভবত অভ্যন্তরভাগে একটি পার্শ্বদেশ এবং সংরক্ষিত এলাকার মধ্যস্থলে একটি অর্ধগোলাকার ছাদের প্রবর্তন করা হয়েছে। বর্তমানে তৃতীয়বারের মত একটি মিহরাব-এর মাধ্যমে এই কিবলাহ নির্দেশিত হয়েছে। মিহরাব সম্ভবত একটি মৌল ধারণা। বিশ্বের যে অংশে চক্ষু রোগ অত্যন্ত সাধারণ, সেখানে এ ধরনের ব্যবস্থা স্বাভাবিক। এক সময় জনৈক বৃদ্ধ শেখ আমার কাছে উপরোক্ত মন্তব্য করেন। মিহরাবটি দেওয়ালে ফাঁক সৃষ্টি করে কুলঙ্গী আকারে এ জন্য তৈরি করা হয়েছে যাতে দেওয়াল হাতড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় অন্ধ লোকও তা চিনতে পারে। অথবা খৃস্টানদের 'অ্যাপ্স' থেকেও ধারণাটি নেওয়া হতে পারে। প্রাক ইসলামিক যুগে পাথরে খোদাই করা অশ্বনাল খিলান দেখা যায়। কিন্তু দামেস্কের অশ্বনাল খিলানই প্রাচীনতম নিদর্শন, যেখানে এটিকে সত্যিকারের কাঠামোগত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। মিনারের উদ্দেশ্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট : মুয়াজ্জিন কর্তৃক আযান দেওয়ার সুবিধার্থেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। খৃস্টান ও ইহুদীরা যেভাবে উপাসনাকারীদের আহবান জানায়, তাঁর বিকল্প হিসাবে সম্ভবত ইচ্ছা করেই এই ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। খৃস্টানরা ঘণ্টাধ্বনি করে ও ইহুদীরা সিঙ্গাধ্বনি করে উপাসনাকারীদের আহবান জানায়। আযান দেওয়ার জন্য মিনার ব্যবহারের দৃষ্টান্ত মনে হয় দামেস্কে প্রথম দেখা যায়।
যে প্রাচীনতম মিনারটি এখনো টিকে আছে, সেটি তিউনিসের নিকটে কায়রওয়ানের বিশালকায় জামে মসজিদে অবস্থিত। খলীফা হিশামের রাজত্বকালে (৭২৪-৪৩) এটি নির্মিত হয়। বিরাট বিশাল এই মিনারটি ক্রমশ সরু হয়ে উপরের দিকে উঠেছে, এর পার্শ্বদেশে ফোকর রয়েছে এবং উপরের দিকে দুটি পর্যায় রয়েছে। একটি পর্যায় পরবর্তীকালে নির্মিত হয়। এ কথা যদি সত্য হয় যে, দামেস্কের চারটি মিনারই এ ধরনের প্রথম দৃষ্টান্ত তাহলেও এরূপ ধরে নেওয়া যায় না যে, কায়রওয়ানের মিনারের ন্যায় এমন সাদাসিধে কাঠামো সিরিয়া বা অন্য কোন বিশেষ স্থানের অবদান, এটি অত্যন্ত সহজ সরল পন্থায় ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা মিটানোর একটি প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে কায়রওয়ানের জামে মসজিদটির বিভিন্ন সময়ে সংস্কার সাধন করা হলেও নবম শতকের শেষভাগে যে আকারে এটি পুনর্নিমিত হয় সেই আকারটি প্রধানত অক্ষুণ্ণ থাকে। ৭৩২ খৃস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত তিউনিসের যয়তুনাহ মসজিদটি জামে মসজিদের আর একটি প্রাচীন ও চমকপ্রদ দৃষ্টান্ত। এর খিলান পথ প্রাচীন স্তম্ভের উপর অপ্রীতিকরভাবে তৈরি কৃত্রিম খিলানের সাহায্যে নির্মাণ করা হয়েছে। থামের উপরিভাগে আড়াআড়ি কাঠের সঙ্গে যুক্ত করে কাঠের পৈঠা বা আবাসী স্থাপন করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা বহু প্রাচীন মুসলিম ভবনের সৌন্দর্য ক্ষুণ্ণ করে।
স্পেনের কর্ডোভার বিরাট মসজিদটির নির্মাণ কাজ ৭৮৬ খৃস্টাব্দে শুরু হয় এবং ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকে (চিত্র ৭৭)। দশম শতকে এর এলাকা দ্বিগুণেরও বেশি সম্প্রসারিত করা হলেও বর্তমান কাঠামো গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এখনো এর মূল আকার সম্পর্কে ধারণা করা যায়। এই জামে মসজিদটির অত্যন্ত গভীর একটি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে। এতে খিলান শ্রেণী দ্বারা বিচ্ছিন্ন এগারটি মধ্যবর্তী পথ রয়েছে এবং প্রত্যেক খিলান শ্রেণীতে বিশটি স্তম্ভ রয়েছে। ইতিপূর্বে উল্লিখিত অন্যান্য ক্ষেত্রের ন্যায় এসব স্তম্ভও প্রাচীনতর রোমান ভবন থেকে সংগৃহীত হয়েছে। সংরক্ষিত এলাকার আকার বিশাল হওয়ায় সে অনুপাতে অনেক উঁচু ছাদ দিতে হয়েছে। বস্তুত উপরিভাগে সাধারণ অশ্বনাল খিলানসহ প্রাপ্ত থামগুলির তুলনায় ছাদটি অনেক বেশি উঁচু হয়। ফলে আরো উপরের পর্যায়ে দ্বিতীয় খিলান শ্রেণী তৈরি করতে হয়। এতে এমন একটি জটিল ও অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি হয় যা মোটেই প্রীতিকর নয়। অতএব আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, তৈরিভাবে প্রাপ্ত প্রাচীন স্তম্ভগুলি কায়রওয়ান ও কর্ডোভা উভয় ক্ষেত্রেই খিলান শ্রেণীর সামগ্রিক নকশাকে প্রভাবিত করেছে। অথচ ইট বা পাথরের পিলপা প্রবর্তন করা হলে কিংবা বিশেষভাবে তৈরি লম্বা থাম ব্যবহার করা হলে এরূপ অপ্রীতিকর স্থাপত্য কৌশল পরিহার করা যেতো। কর্ডোভার সমগ্র মসজিদটি ঠেস দেওয়া উঁচু দেওয়ালে পরিবেষ্টিত এবং এর সাহন-এর চারদিকে খিলান শ্রেণী রয়েছে।
এবারে মেসোপটেমিয়ায় ফিরে আসা যাক। এখানকার বিভিন্ন মসজিদ এদেশের ঐতিহ্যগত ইটের রীতিতে নির্মিত হয়েছে, এবং মদীনার মসজিদের আদর্শের সঙ্গে কায়রোর বিখ্যাত ইবনে তুলুন মসজিদের সংযোগ স্থাপন করেছে। এই মধ্যবর্তী দৃষ্টান্তগুলির মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে উখাইদির, রাক্কাহ্, আবু দুলাফ ও সামাররার মসজিদ। প্রথম দুটি মসজিদ অষ্টম শতকের শেষভাগে এবং অপর দুটি নবম শতকের মধ্যভাগে নির্মিত হয়েছে বলে বর্তমানে ধারণা করা হয়। সবগুলিতেই সাসানীয় স্থাপত্যের ঐতিহ্য রক্ষা করা হয়েছে এবং সবগুলিতেই জামে মসজিদের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পরলোকগত গার্টরুড বেল-এর বিষয়ভিত্তিক বিবরণ গ্রন্থে উখাইদিরে অবস্থিত মসজিদটির এমন অপরূপ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে যে, তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে সূক্ষ্মাগ্র খিলান পরবর্তীকালে পাশ্চাত্য গথিক স্থাপত্যে সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয় উপরোক্ত গ্রন্থে তাঁর মৌল রূপের পরিচয় পাওয়া যায়। বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সাসানীয় খিলান অর্ধ-বৃত্তাকার হলেও মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে ছুঁচালো খিলানের প্রাচীন দৃষ্টান্তও পাওয়া যায়। সম্ভবত এর আগে মেসোপটেমিয়ায় অশ্বনাল খিলান ব্যবহৃত হতো। সিরীয় গির্জাগুলিতে ঐ ধরনের কয়েকটি খিলান দেখা যায় (যেমন, আনু: ৫৬৪ খৃস্টাব্দে নির্মিত কাসর ইবনে ওয়ার্দান গির্জায়), এবং প্রকৃত পক্ষে ইটালির চিউসিতে একটি গ্রীক দৃষ্টান্তও রয়েছে। মাসহাত্তার ন্যায় উখাইদিরের খিলানগুলি ছুঁচালো ডিম্বাকৃতির এবং কিছুটা উত্তোলিত। কিন্তু রাক্কাহতে অবস্থিত বাগদাদ ফটকে এবং সামাররার নিকটে আবু দুলাফের খিলান পরবর্তী মুসলিম স্থাপত্য রীতি অনুযায়ী বক্রাকার। অষ্টম শতকের শেষের দিকে মেসোপটেমিয়ার অন্যান্য সর্বপ্রকার খিলান-আকারের স্থলে এই রীতিটি প্রবর্তিত হয়। এর অনেক আগে ভারতে মাঝে মাঝে যেসব ছুঁচালো খিলান দেখা যায়, সেগুলি নিরেট পাথর কেটে তৈরি করা হয় এবং সেদিক দিয়ে বিবেচনা করা হলে এগুলি আদৌ খিলান নয়।
সামাররার মসজিদটি বিশাল আকারের। এর যথেষ্ট ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে। মক্কার দিকে গভীর সংরক্ষিত এলাকাসহ এর একটি সাহন রয়েছে। সাহন-এর অপর দিকগুলিতে রয়েছে বেশ গভীর দরদালান। ইটের তৈরি বিশাল বেষ্টনী প্রাচীরের প্রত্যেক কোণে গোলাকার টাওয়ার এবং মধ্যবর্তী অর্ধবৃত্তাকার টাওয়ার রয়েছে। সংরক্ষিত এলাকার দক্ষিণ দিকের প্রাচীরে সূক্ষ্মাগ্র বা কারুকার্য মণ্ডিত উপরিভাগ সমন্বিত ছোট ছোট গবাক্ষের সারি রয়েছে। এই উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য কর্ডোভাতে দেখা যায় এবং হ্যাভেলের মতে এগুলি হয়তো বৌদ্ধ ভারতের অবদান। অন্যথায় পাশ্চাত্যের শিল্পকর্মে বৈশিষ্ট্য সৃষ্টিকারী এই অবদান একান্তভাবে মুসলমানদের (চিত্র ৭৮)। আরো গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে- খিলান শ্রেণী ধরে রাখার জন্যে কর্ডোভা ও অন্যান্য স্থানের ন্যায় প্রাচীন স্তম্ভের স্থলে ইটের পিলপা ব্যবহার। এ সব পিলপা একটি বর্গাকৃতির ভিত্তির উপরে অষ্টভুজ আকারের। প্রত্যেক পিলপার সঙ্গে গোলাকার অথবা অষ্টভুজ আকারের চারটি করে মার্বেলের দণ্ডভাগ রয়েছে। দণ্ডভাগগুলি ধাতব কব্জা দ্বারা সংযুক্ত এবং এগুলির উপরিভাগ ঘণ্টাকৃতির। এখানেও আমরা আর একটি বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই যা পাশ্চাত্য স্থাপত্যের অঙ্গীভূত হয়েছে। সামাররায় ও পরবর্তীকালে ইবনে তুলুনে ব্যবহৃত অদ্ভুত ধরনের পেঁচালো মিনারের দৃষ্টান্ত পরবর্তীকালে কোথাও দেখা যায় না।
কায়রোর ইবনে তুলুন মসজিদটির নির্মাণ কাজ ৮৭৬ খৃস্টাব্দে শুরু হয়। বহু লেখক এর বিস্তারিত বর্ণনা দিলেও আমরা যখন উপলব্ধি করি যে, এর উল্লেখযোগ্য কতগুলি বৈশিষ্ট্য মেসোপটেমিয়ার প্রাচীনতর ভবনগুলিতে পূর্ব থেকেই বিদ্যমান ছিল, তখন মুসলিম স্থাপত্যের ইতিহাসে এর গুরুত্ব কিছুটা হ্রাস পায়। এটি প্রায় বর্গাকৃতির একটি বিরাট জামে মসজিদ। সাহন-এর চারদিকে খিলান দেওয়া দরদালান রয়েছে (চিত্র ৭৯) এবং সংরক্ষিত লাইওয়ান অন্যান্য কিছুর চাইতে অনেক গভীর। প্রধান প্রাচীরগুলির বাইরে একটি উন্মুক্ত বেষ্টনী চত্বর (যিয়াদা) রয়েছে। এ ধরনের বৈশিষ্ট্য ইতিপূর্বে কোথাও দেখা যায়নি। বাইরের প্রাচীরগুলি অত্যন্ত বিরাট ও পুরু এবং সেগুলিতে কারুকার্য করা যেসব ফোকর রয়েছে তা ছিদ্র ও ঝুঁটিওয়ালা গথিক দুর্গ প্রাচীরের আদর্শে নির্মিত বলে ধরা যায়। (আসিরিয়ার খৃস্টপূর্ব অষ্টম শতকে এবং মিসরে তাঁরও পূর্বে বিভিন্ন ধরনের ফোকর ব্যবহৃত হতো।) ফোকরের নিচে একটি ছুঁচালো গবাক্ষ সারি ছিদ্রযুক্ত প্লাস্টারের পর্দায় আবৃত। প্রতিটি গবাক্ষের পর পর একটি করে ছুঁচালো কুলঙ্গী রয়েছে যেগুলির উপরিভাগ সূক্ষ্মাগ্র। ইটের তৈরি বড় বড় পিলপার সাহায্যে খিলান শ্রেণী তৈরি করা হয়েছে। এর বিভিন্ন কোণে রয়েছে ইটের স্তম্ভ দণ্ড। সব কিছুর উপরে রয়েছে ছুঁচালো খিলান শ্রেণী যেগুলির নিচের দিক অনেকটা 'অশ্বনালের' ন্যায় বাঁকা। এমনিভাবে কাঠের ছাদ পর্যন্ত সমস্ত কাঠামোটি ইটের তৈরি এবং পরিষ্কার বা কারুকার্য করা চুনাবালিতে আবৃত। অতিশয়োক্তি না করে একথা বলা যেতে পারে যে, এই মসজিদটি সবদিক দিয়ে মেসোপটেমীয় রীতিতে তৈরি এবং এর প্রতিষ্ঠাতা যৌবনে সামাররা ও বাগদাদের মসজিদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ায় তাঁর কিছু কিছু দৃষ্টান্তও এখানে সংযোজিত হয়েছে। ইতিমধ্যে উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি ছাড়াও এতে অন্য যেসব অভিনবত্ব রয়েছে তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কাঠের ওপর কুফী উৎকীর্ণলিপি (নকশার কাজে অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে হস্তলিপি ব্যবহার) এবং কার্যত সকল দৃশ্যমান উপরিভাগের ওপর রঙের কারুকার্য। সাদা চুনাবালির ওপর ছাড়াও সিলিংয়ের কাঠের ওপর রঙের কারুকার্য করা হয়েছে। স্পষ্ট নকশার একটি মিহরাব কুলঙ্গী রয়েছে; সাহন-এর কেন্দ্রস্থলে একটি ফোয়ারা রয়েছে (মূলত এখানে কাঠের অর্ধ বৃত্তাকার একটি ছাদ ছিল); এবং ছাদ থেকে ঝুলন্ত আড়ম্বরপূর্ণ বাতির ঝাড় রয়েছে।
নবম শতকের সমাপ্তি থেকে দ্বাদশ শতকের সমাপ্তি পর্যন্ত যে সব মসজিদ টিকে আছে সেগুলির সংখ্যা বেশি নয়। এসময় বহু সামরিক স্থাপত্যের সৃষ্টি হয়েছে। একথা স্বীকার করা হয় যে, এ ব্যাপারে ক্রুসেডাররা সিরিয়া ও মিসর থেকে বহু ধারণা সংগ্রহ করে, কারণ এর কয়েক শতক আগে সিরিয়া ও আর্মেনিয়ায় দুর্গ নির্মাণ কৌশল উচ্চতর পর্যায়ে বিকশিত হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ ইউরোপীয়রা এই সূত্র থেকেই 'ম্যাচিকলেশন' -এর ব্যবহার শেখে।
কায়রোর দুর্গ সম্পর্কিত নিজস্ব রচনার পরিশিষ্ট মিঃ কে এ সি ক্রেসওয়েল ম্যাচিকলেশনের উদ্ভব পর্যালোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সিরিয়ায় যে দশটি তথাকথিত দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে তাঁর মধ্যে ছয়-সাতটি এমন এক ধরনের পায়খানা (ল্যাটিন) যা সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত সাধারণ ব্যাপার। বস্তুত জার্সীর গোরিতে অবলম্বন মঞ্চের (পীয়ার) উপর এ ধরনের একটি পায়খানা এখনো ব্যবহৃত হয়। অবশিষ্ট যে তিনটি সম্ভবত উপর থেকে কোন কিছু নিক্ষেপের জন্য ব্যবহৃত হয় তাঁর মধ্যে প্রাচীনতমটির তারিখ হচ্ছে ৬ষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি সময়ের। ইসলাম তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মিঃ ক্রেসওয়েলের এসব দৃষ্টান্ত দেওয়ার পর সিরিয়ার রুসাফার নিকটে কাসর আল-হেয়ার-এ একটি মুসলিম দৃষ্টান্ত আবিষ্কৃত হয়েছে। এটির তারিখ ৭২৯ খৃস্টাব্দ। আরমেনীয় রাজমিস্ত্রীদের দ্বারা তৈরি কায়রোর একটি ফটক বাব আন-নাসর-এর (১০৮৭) উপরে দুটি রয়েছে। এগুলি স্পষ্টত প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিষ্ঠিত ম্যাচিকোলিস (চিত্র ৮০)। এর এক শতক পরে ইউরোপে সর্বপ্রথম এসব দৃষ্টান্ত দেখা যায়, যেমন শাটো গাইলার্ড (১১৮৪), শাটিলন (১১৮৬), নরউইচ (১১৮৭) এবং উইনচেষ্টার (১১৯৩)। অতএব এটা স্পষ্ট যে, এই ধারণাটি ক্রুসেডারগণ স্যারাসেনদের কাছ থেকে ধার করেছেন। কিন্তু স্যারাসেনরা ক্রুসেডারদের কাছ থেকে নয়। কালক্রমে চতুর্দশ শতকের ফরাসী ও ইংরেজ দুর্গসমূহে সারিবদ্ধ করবেলের (দেওয়াল থেকে উদগত অবলম্বন) উপর ম্যাচিকলেশন অত্যন্ত ব্যাপক হয়ে পড়ে (চিত্র ৮১)।
মিসর ও সিরিয়া থেকে ধার করা সামরিক স্থাপত্যের অপর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কোন দুর্গের 'সমকোণী' বা 'বক্র' প্রবেশ পথ। দেওয়ালের ফটকের মধ্যে এমনভাবে এই প্রবেশপথ তৈরি করা হয় যাতে শত্রুপক্ষ প্রবেশপথে পৌঁছার পর এর মধ্যদিয়ে ভেতরের চত্বরে কোন কিছু দেখতে বা নিক্ষেপ করতে না পারে। রোমান বা বাইজেন্টাইন সমর বিজ্ঞানে এ ধরনের প্রবেশ পথের জ্ঞান ছিল বলে প্রতীয়মান হয় না। যেখানে পর্যায়ক্রমিক প্রতিরক্ষা ফটকগুলি একই সরল পথে প্রপুগনাকুলাম নামে পরিচিত এলাকার পর পর স্থাপিত হতো। যত দূর জানা যায় এসব বাঁকা প্রবেশপথ সর্বপ্রথম বাগদাদের 'গোলাকার নগরীতে' ব্যবহৃত হয় (অষ্টম শতক)। পুনরায় কায়রোতে সালাহউদ্দীনের দুর্গে এগুলি দেখা যায় (শুরু ১১৭৬)। চূড়ান্ত পর্যায়ে আলেপ্পোর দুর্গে এর অপরূপ দৃষ্টান্ত পরিদৃষ্ট হয়। বুমারিসে একটি উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত থাকলেও ইংল্যাণ্ডে এগুলি কদাচিৎ দেখা যায়। ফ্রান্সে এগুলি অধিকতর জনপ্রিয় ছিল। দৃষ্টান্তস্বরূপ কারকাসোনের কথা উল্লেখযোগ্য। এই দুটি দেশে অধিকতর সুরক্ষিত দুর্গে অসমান্তরাল প্রবেশপথ প্রাধান্য লাভ করে, যেমনটি পিয়েরেফান্ডস্ ও কনওয়েতে দেখা যায়।
ত্রয়োদশ শতকের সূচনায় পুরাতন দিল্লীতে নির্মাণকার্য শুরু হওয়ার আগে গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম ইমারত ছিল না। এশীয় তুরস্কেও তেমন কিছু ছিল না। কোনিয়া্য সেলজুক ইমারতগুলি পুরাতন দিল্লীর ন্যায় একই সময়ে শুরু হয়। স্পেন ও উত্তর আফ্রিকায় সামরিক স্থাপত্য ছাড়া প্রধান ধ্বংসাবশেষগুলি হচ্ছে কর্ডোভার মসজিদের পরবর্তী স্থাপত্যকর্ম এবং সেভিল (জিরাল্ডা টাওয়ার, ১১৭২-৯৫) ও রাবাতের অপরূপ মিনার। কর্ডোভা মসজিদের উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ কাজ দশম শতকের শেষার্ধে সম্পন্ন হয়। সেভিল ও রাবাতের মিনারগুলি সূক্ষ্মাগ্র খিলান শ্রেণী দ্বারা সুসজ্জিত, যা পাথরের উপর কারুকার্যের পরবর্তী গথিক স্থাপত্যে দেখা যায় (চিত্র ৮২)। এই শিল্পকর্ম বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে অত্যন্ত চমকপ্রদ। এর মধ্যে গম্বুজ নির্মাণের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিকও রয়েছে। কিন্তু এটি স্থাপত্যের বিকাশে স্পেনের বাইরে কোন প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি। সিসিলিতে কাপেলা প্যালাটিনা ১১৩২ খৃস্টাব্দে, মার্টোরানা গির্জা ১১৩৬ খৃস্টাব্দে, লা যিযা ১১৫৪ খৃস্টাব্দে এবং লা কিউবা ১১৮০ খৃস্টাব্দে নির্মিত হয়। এগুলিই স্বীকৃত তারিখ এবং তা এই দ্বীপে, মুসলিম শাসনের আওতার বাইরে। কারণ পালের্মোতে ১০৬০ খৃস্টাব্দে এবং সামগ্রিকভাবে সিসিলিতে ১০৯০ খৃস্টাব্দে মুসলিম শাসনের অবসান হয়। কিন্তু নর্ম্যানদের দ্বারা নির্মিত হলেও এগুলিতে অবিমিশ্র স্যারাসেনিক বৈশিষ্ট্যসমূহ পুরোপুরি বর্তমান। এসব বৈশিষ্ট্য ইটালীর মূল ভূখণ্ডে আমাল্ফি এবং সালের্নোতেও দেখা যায়। পারস্যে এ সময়কার প্রধান ভবনগুলি হচ্ছে ইস্পাহানের জুমা মসজিদ এবং মসুলের বিশাল মসজিদ (আনুঃ ১১৪৫-৯১)। উভয়টিই বিরাট জামে মসজিদ। কিন্তু প্রথমোক্তটির অনেক পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে। পারস্যের মসজিদগুলি ইটের তৈরি হওয়ায় চুনাবালির রিলিফ এবং মিনা করা টালির সাহায্যে সেগুলিকে অলংকৃত করা হয়েছে। শেষোক্ত ফ্যাশানটি পরবর্তীকালে সিরিয়া ও মিসরের ন্যায় যেসব দেশে পাথর ব্যবহার করা হতো সেসব দেশেও প্রবর্তিত হয়। মিনারগুলি সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় স্থাপন করা হতো। আকারে নলের মতো, উপরের দিকে ক্রমশ কিছুটা সরু এবং উজ্জ্বল বর্ণের টালি দ্বারা আবৃত। এম সালাদিন সেগুলিকে কিছুটা নির্দয়ভাবে কারখানার চিমনির সঙ্গে তুলনা করেছেন। কিন্তু সেগুলি অবশ্যই তা নয়। পারস্যও আগ্রহের সঙ্গে এই অদ্ভুত 'স্ট্যালাকটাইট' (লম্বমান কোণাকৃতির) নকশা অভিনন্দিত করেছে। পরবর্তী অনুচ্ছেদে তা আলোচনা করা হয়েছে।
'সিরীয়-মিসরীয়' রীতির প্রধান দৃষ্টান্তগুলি সবই কায়রোতে দেখা যায় এবং সেগুলি হচ্ছে, বিরাটাকার জামে মসজিদ আল-আযহার (৯৭০) ও আল-হাকিম (৯৯০-১০১২), ছোট জামে মসজিদ আল-আকমার (১১২৫) এবং ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ সমাধি-মসজিদ আল যুয়ুশী (১০৮৫)। আল-আযহার ও আল আকমারে খিলান শ্রেণী প্রাচীন স্তম্ভের উপর স্থাপিত এবং আল-হাকিমে সেগুলি ইটের উত্তরণ মঞ্চের (পীয়ার) ওপর প্রতিষ্ঠিত। নিকটবর্তী মুকাত্তাম পাহাড়ে উৎকৃষ্ট চুনা পাথর থাকা সত্ত্বেও আল-হাকিমে স্যারাসেনিক কায়রোতে সর্বপ্রথম পাথর ব্যবহৃত হয়। স্পষ্টত কায়রো এতদিন পর্যন্ত মেসোপটেমীয় ঐতিহ্যের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট ছিল। আল যুয়ুশী মসজিদটি সমাধি-মসজিদের প্রথম দৃষ্টান্ত। পরবর্তীকালে এই রীতির ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। এই মসজিদটিতে প্রতিষ্ঠাতার সমাধির ওপর একটি গম্বুজ রয়েছে এবং দক্ষিণ দিকের দেওয়ালে রয়েছে মিহরাব। সাহনটি ছোট এবং সাহন ও গম্বুজের মধ্যস্থলে একটি খিলান দেওয়া আভ্যন্তরীণ পার্শ্বদেশ রয়েছে। এতে বর্গাকৃতির তিন পর্যায়ের একটি মিনার রয়েছে এবং অতি উঁচুতে ছোট একটি গম্বুজ রয়েছে। এ ধরনের গম্বুজ সিসিলীয় গির্জাগুলিতে দেখা যায়। মুসলিম স্থাপত্যের ইতিহাসে গম্বুজের বিবর্তন সব চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যেহেতু পাশ্চাত্য স্থাপত্যে ইসলামের অবদানের ক্ষেত্রে এর কোন সুস্পষ্ট সম্পর্ক নেই, সেহেতু বর্তমান সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনায় তা পরিহার করা যেতে পারে। একই কারণে 'স্ট্যালাকটাইটের' (লম্বমান কোণাকৃতির নকশা) যে অপরূপ বৈশিষ্ট্য মুসলমানরা সর্বত্র অনুসরণ করেছেন এবং যা ভারত থেকে স্পেন পর্যন্ত তাদের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসাবে চিহ্নিত, তাঁর উদ্ভব নিয়ে আলোচনা করাও কোন মানে হয় না। সম্ভবত মেসোপটেমীয় সূত্র থেকে উদ্ভূত এই বৈশিষ্ট্য আল-যুয়ুশী মসজিদের মিনারে নির্ভরযোগ্যভাবে প্রথম দেখা যায়। এরপর আল-আকমার মসজিদের সম্মুখ ভাগে এটি পরিদৃষ্ট হয়। এখানে এটিকে আলঙ্কারিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে শম্বুক সদৃশ অনেকগুলি কুলঙ্গিও খোদাই করা হয়েছে। এগুলি অতি পরিচিত রেনেসাঁর ঝিনুক কুলঙ্গির আদর্শ নয় কি? এই যুগের কায়রো মসজিদগুলিতে অপর একটি বিস্তারিত দিক হচ্ছে 'করাত কাঁটার' ন্যায় ফোকর (চিত্র ৮২) এবং এটিও সম্ভবত মেসোপটেমিয়া থেকে উদ্ভূত। ভেনিসের ডিউক প্রাসাদ ও অন্যান্য প্রাসাদের স্থাপত্যে এই উপাদানটি সম্ভবত প্রেরণা সৃষ্টি করেছে।
ত্রয়োদশ শতক থেকে পরবর্তীকালে আমরা এর সবগুলি এলাকায় মুসলিম স্থাপত্যের অনেক ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাই। এ সময় সিসিলিকে বাদ দিয়ে ভারত ও তুরস্ককে তালিকাভুক্ত করতে হয়। স্পেনে আল হামরা ও আল কাসর নামে পরিচিত গুরুত্বপূর্ণ প্রাসাদ রয়েছে। এগুলি তাদের ব্যাপক ও অপরূপ কারুকার্যের জন্য বিখ্যাত। অন্যদিকে এখানকার পরবর্তীকালের মূরীয় ভবনগুলি প্রথম শ্রেণীর পর্যায়ের পড়ে না। কায়রো ১৫১৭ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত মসজিদ ও সমাধির অতুলনীয় পর্যায়ক্রমিক নিদর্শন সৃষ্টি করেছে। অতঃপর শহরটি তুর্কীদের অধিকারে যায় এবং তখন থেকে যে অল্প কয়টি মসজিদ নির্মিত হয়েছে সেগুলি ওসমানীয় রীতি অনুসরণ করে। আনাতোলিয়া ১২০০ থেকে ১৪৫৩ খৃ. পর্যন্ত কেনিয়া ও ব্রুসায় পর্যায়ক্রমিকভাবে অত্যন্ত চমকপ্রদ কয়েকটি নিদর্শন তুলে ধরে। এরপর কনস্টান্টিনোপল তুরস্কের রাজধানীতে পরিণত হয়। এ সময় থেকে ওসমানীয় স্থাপত্য বাইজেন্টিয়াম স্মৃতিসৌধগুলির অবাধ অনুকরণ শুরু করে। এমনকি সুদূর কায়রো বা দামেস্কের নির্মাণকার্যেও তা অনুসরণ করা হয়। পরবর্তীকালে পারস্য, তুর্কীস্তান ও ভারতে মুসলিম স্থাপত্যের এক অপরিমিত সম্পদ গড়ে ওঠে। ভারতে এই স্থাপত্য ঐতিহ্য আধুনিককাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত স্থানীয় বৈশিষ্ট্য পরবর্তীকালে স্যারাসেনিক স্থাপত্যকে পাঁচটি প্রধান শ্রেণীতে বিভক্ত করে: সিরীয়-মিসরীয়, হিস্পানো-মোরেস্ক, পারস্য, ওসমানীয় ও ভারতীয়। এসব পার্থক্য আংশিকভাবে স্থানীয় উপাদানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠলেও স্থানীয় নির্মাণ ঐতিহ্যই তাঁর মূল ভিত্তি।
'মধ্যযুগে' মসজিদ পরিকল্পনায় ব্যাপক বৈচিত্র্য ও বিকাশ ঘটে। জামে মসজিদের নির্মাণকাজ কোন কোন দেশে অব্যাহত থাকে। গম্বুজওয়ালা সমাধি মসজিদ অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দ্বাদশ শতকে প্রবর্তিত মাদ্রাসা (মসজিদ সংলগ্ন বিদ্যালয়) এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। গম্বুজ মুসলিম স্থাপত্যের একটি জনপ্রিয় বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। কায়রোতে এর আকার ছিল সাধারণত সুদৃঢ়। পারস্য ও তুর্কীস্তানে বাল্ব বা ডিম্বাকার প্রাধান্য লাভ করে। অপরদিকে কনস্টান্টিনোপলে মসজিদগুলিতে নিচু বাইজেন্টাইন গম্বুজ প্রবর্তন করা হয়। (চিত্র ৮৩) বাহ্যিক দিক দিয়ে পঞ্চদশ শতকে মিসরের পাথরের গম্বুজগুলিতে জরির ন্যায় নকশা অংকন করা হয়। পারস্যে সেগুলি উজ্জ্বল ঝলসানো টালি দ্বারা আবৃত করা হয়। লম্বমান (স্ট্যালাকটাইট) খিলানের উপর সেগুলি স্থাপন করা হয়। বস্তুত এই স্ট্যালাকটাইট সর্বত্র ব্যবহার করা হতো এবং প্রায়ই অতিরিক্ত পরিমাণে ব্যবহার করা হতো। এগুলি কোন কোন সময় সীলিং থেকে আমাদের বৈদ্যুতিক পাখার উপরিভাগের ন্যায় ঝুলন্ত থাকে। স্যারাসেন গম্বুজ পাশ্চাত্যের রেনেসাঁ গম্বুজকে প্রভাবিত না করলেও এটি সম্ভব বলে মনে হয় যে, অত্যন্ত সুদর্শন মুসলিম মিনার বিশেষ করে চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকের কায়রোর মিনারগুলি ইটালীর পরবর্তীকালের রেনেসাঁ ক্যাম্পানিলিকে প্রভাবিত করেছে এবং সেখান থেকেই রেন-এর কতিপয় সুদর্শন সিটি স্টাপল-এর উদ্ভব হয়েছে। ইতিমধ্যে মুসলিম স্থপতিরা গম্বুজ ও মিনারকে পার্থক্যমূলক-ভাবে ব্যবহারের সম্ভাবনা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করতে শুরু করেন, যেমনটি রেন পরবর্তীকালে সেন্ট পল গির্জায় অত্যন্ত সার্থকভাবে গম্বুজ ও টাওয়ারের পার্থক্য সৃষ্টি করেছেন। পারস্যের কিছুটা বিদঘুটে ধরনের নলাকার মিনার এবং ওসমানীয় তুর্কীদের পেনসিল আকারের মিনার তাদের নিজস্ব দেশের বাইরে কখনো প্রসার লাভ করেনি।
স্যারাসেনিক স্থাপত্যের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে গোলাকার অশ্বনাল ও সূক্ষ্মাগ্র অশ্বনাল খিলানের জনপ্রিয়তাও অব্যাহত থাকে। অর্ধ-বৃত্তাকার এবং সাধারণ সূক্ষ্মাগ্র বা দুই কেন্দ্রবিশিষ্ট খিলান প্রায়ই ব্যবহৃত হতো। এবং তথাকথিত 'পারস্য' খিলান—যেখানে বাঁকা অংশ সরল রেখায় পরিণত হয়—মূল দেশে এবং অন্যান্য স্থানে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এটি কিছুটা আমাদের 'টিউডর' খিলানের ন্যায় (চিত্র ৮৩)। বিচিত্র নকশা সম্বলিত বা সূক্ষ্মাগ্র খিলান সাধারণ ব্যাপার হয়ে পড়ে। সাধারণ খিলানের উপরিভাগে নানা রকম কারুকার্য করা হয়। ফোকরগুলিকে পত্রালঙ্কারে কিংবা করাতকাঁটা কেটে শোভিত করা হয়। গবাক্ষ পথ ছিদ্র করা পাথরের কারুকার্য কিংবা পাথর বা চুনাবালির জাফরিতে ভরে দেওয়া হতো। রংকরা কাচের সাহায্যে সেগুলিকে ঔজ্জ্বল্য প্রদান করা হতো। সম্ভবত পাশ্চাত্য দেশগুলিতে তখনো রঞ্জিত কাচের ব্যবহার প্রবর্তিত হয়নি। চুনাবালির ওপর অঙ্কিত করে অথবা কাঠ বা পাথরের ওপর খোদাই করে অলংকারমূলক হস্তলিপি ব্যবহার করা হতো এবং পালাক্রমে জ্যামিতিক নকশা অঙ্কন করা হতো, কারণ স্বাভাবিক চিত্র ব্যবহার ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ ছিল। মিসরের ভবনগুলিকে উঁচু রিলিফে সুস্পষ্ট খোদাই কদাচিৎ দেখা যায়, (চিত্র ৮৪) যদিও ভারতে হয়তো এ ধরনের দৃষ্টান্ত রয়েছে। খোদাই করা না হলেও অত্যন্ত সূক্ষ্ম জ্যামিতিক নকশার অবাধ ব্যবহারের মাধ্যমে ঐ ধরনের একটা রূপ ফুটিয়ে তোলা হতো এবং পাথর বা চুনাবালির উপর খোদাইয়ের পরিবর্তে ছেদন করে তা করা হতো। আরো পূর্বদিকে পারস্যে এবং বিশেষভাবে তুর্কীস্তানে, যেখানে ইটই হচ্ছে নির্মাণ কাজের স্বাভাবিক উপাদান, সেখানে প্রচুর পরিমাণে উজ্জ্বলতাপূর্ণ টালি ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘকাল পর্যন্ত নকশার কাজে জ্যামিতিক বা বিমূর্ত আকারই জনপ্রিয় ছিল। এরপর পত্রপুষ্প নকশা প্রবর্তনের মাধ্যমে অধিকতর স্বাভাবিক কারুকার্যের আবির্ভাব ঘটে। ইংল্যান্ডে এলিজাবেথীয় যুগ থেকে নীচু রিলিফে অঙ্কিত যে সব প্রচলিত নকশাকে 'অ্যারাবেস্ক' নামে অভিহিত করা হয় তাঁর দ্বারা এই ইঙ্গিতই পাওয়া যায় যে, এ ক্ষেত্রে আমরা মধ্যযুগের আরবদের কাছে কিছুটা ঋণী। অন্যত্র তেমনভাবে ব্যবহৃত না হলেও কায়রোতে অত্যন্ত সাধারণ অপর একটি নকশারীতি হচ্ছে আড়াআড়িভাবে পালাক্রমে অনুজ্জ্বল ও উজ্জ্বল পাথর ব্যবহার। এর সূত্র হয়তো রোম বা বাইজেন্টিয়ামে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। কারণ সেখানে পাথরের দেওয়ালে প্রায়ই ইটের 'জরির রেখা' প্রবর্তিত হতো। কিন্তু এতে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। তাই পিসা, জেনোয়া, সিয়েনা, ফ্লোরেন্স ও অন্যান্য ইটালীয় নগরীতে মার্বেল ভবনগুলির ডোরাকাটা সম্মুখভাগের নকশা কায়রোরই অবদান। কারণ এই নগরীর সঙ্গে মধ্য যুগে তাদের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। ওভার্নি-এর (ফ্রান্স) লি পাইতে একই ধরনের বিচিত্রবর্ণ সৌকর্য পরিদৃষ্ট হয় এবং নর্দাম্পটনের সেন্ট পিটার গির্জায় তাঁর কাছাকাছি জিনিস দেখা যায়।
বর্তমান পর্যালোচনায় উল্লিখিত বহু বিষয় সম্পর্কে এক কথায় বলতে গেলে একথা সুস্পষ্ট যে, সার্বিকভাবে স্থাপত্যের ক্ষেত্রে ইসলামের কাছে পাশ্চাত্য বিশ্বের ঋণ প্রচুর। কেবলমাত্র সামরিক স্থাপত্যের ক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি যে, যে ক্রুসেডাররা পবিত্র ভূমিতে বহু সুন্দর সুন্দর গির্জা ও দুর্গ রেখে গেছেন তারা নিজেরাই স্যারাসেন শত্রুদের কাছ থেকে দুর্গ নির্মাণের কৌশল আয়ত্ত করেছেন। অপরদিকে স্যারাসেনরা তাঁদের ক্ষেত্রে আরমেনীয় রাজমিস্ত্রীদের নৈপুণ্যের দ্বারা লাভবান হয়েছেন।
প্রাক ইসলামী যুগের আর্মেনিয়া ও সিরিয়ার প্রস্তর নির্মিত ভবন এবং ইরানের ইট নির্মিত ভবনের (আমাদের মধ্যযুগীয় খিলান করা ছাদের উৎস সম্পর্কে পণ্ডিত ব্যক্তিরা ক্রমবর্ধমানভাবে শেষোক্তটিকেই সূত্র হিসাবে মনে করেন) কাছে আমাদের সর্বপ্রকার ঋণের কথা বাদ দিলেও আমরা সিরিয়া ও অন্যান্য স্থানের মুসলিম ভবনগুলিকে সূক্ষ্মাগ্র খিলানের প্রবর্তক বলে যুক্তিযুক্তভাবে ধরে নিতে পারি। প্রায় সুনিশ্চিতভাবে ওজী খিলান এবং সম্ভবত 'টিউডর' খিলানও একই সূত্র থেকে উদ্ভব হয়েছে। সূক্ষ্মাগ্র বা বিচিত্র নকশা সম্বলিত খিলানও এই সূত্র থেকে এসেছে। তেমনি বিভিন্ন পর্যায়ে পাথরের উপর সূক্ষ্ম কারুকার্যের প্রচলন এখান থেকেই হয়। প্রাথমিক মসজিদগুলির পাথরে এবং চুনবালিতে ছেদন করে যেসব জ্যামিতিক জাফরি তৈরি করা হয়েছে সম্ভবত সেখান থেকেই থালার উপর সূক্ষ্ম কারুকার্যের প্রচলন হয়েছে। কিংবা এগুলি আরো অতীতের প্রাক ইসলামী সিরীয় বা মেসোপটেমীয় ভবনগুলিরও অবদান হতে পারে। কখনো কখনো বলা হয় যে, রঙীন কাচ (স্টেইন্ড গ্লাস) প্রাচ্যে আবিষ্কৃত হয়েছে, কিন্তু এটি প্রমাণিত হয়নি। গথিক খিলানকরা ছাদের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উত্তরণ মঞ্চের (পীয়ার) চারকোণে স্তম্ভদণ্ড ব্যবহার অষ্টম বা নবম শতকের একটি স্যারাসেনিক অবদান। কারুকার্যমণ্ডিত ও ছিদ্রকরা ফোকর মেসোপটেমিয়া থেকে কায়রোতে এসেছে এবং এখান থেকে ইটালীতে প্রচলিত হয়েছে। পরবর্তীকালে এটি গথিক স্থাপত্যের একটি বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ের গথিক শিল্পকর্মে খোদাই করা যে সব উৎকীর্ণলিপি নকশা হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে তা নবম শতকের কায়রোর ইবনে তুলুন মসজিদ থেকে অনুকৃত। কিন্তু সুদূর ফ্রান্সে কুফীরীতির উৎকীর্ণলিপি তাঁর দক্ষিণাঞ্চলের প্রদেশগুলিতে মুসলিম অধিকারের সময় প্রবর্তিত হয়েছে। এমনকি ইংল্যাণ্ডে ক্বচিৎ-কদাচিৎ এ জাতীয় যে দু-একটি নিদর্শন দেখা যায় তাও আরব প্রভাব বলে মনে করা হয়। (চিত্র ৮৫) ডোরাকাটা সম্মুখভাগ এবং এমনকি রেনেসাঁ যুগের ক্যাম্পানিলি ও শম্বুক-কুলঙ্গির নকশাও সম্ভবত কায়রোর অবদান। কোন ভবনের মহিলাদের কক্ষগুলিকে গোপন রাখার জন্য কিংবা মসজিদের পর্দা হিসাবে ব্যবহৃত আরব মাশরাবিইয়া বা কাষ্ঠনির্মিত জাফরি ইংরেজদের ধাতব গ্রিলে নকল করা হয়েছে। 'অ্যারাবেস্ক' বা বুটিদার কাপড়ের নকশার মাধ্যমে উপরিভাগে নিচু রিলিফের কারুকার্য এবং কারুকার্যে জ্যামিতিক নকশার ব্যবহার অবশ্যই মুসলমানদের কাছে আমাদের ঋণের একটি দিক। তারা আমাদের অনেকখানি জ্যামিতিক জ্ঞানের সূত্রও বটে।
উপরে সুনির্দিষ্ট দিকগুলিই আলোচনা করা হলো। কিন্তু ক্রুসেডের সময় এবং (আরো আপোসে) মধ্যযুগের শেষভাগে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ঘটে তাঁর স্থাপত্যের ক্ষেত্রে আবশ্যিকভাবে অন্যান্য যেসব প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে তা এই দ্রুত ও ভাসাভাসা আলোচনায় দৃষ্টির বাইরে থেকে যায়। স্পেনে নকশার ক্ষেত্রে মূরীয় ঐতিহ্য রেনেসাঁ যুগের শেষভাগ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে এবং স্পেনীয় গথিক স্থাপত্যের বহু জটিলতা ও বৈশিষ্ট্য সৃষ্টির পিছনে অবদান রাখে। সর্বশেষে একথা বলা যায় যে, কোন কোন দূরতর দেশে মুসলিম নির্মাণ শিল্পের বিকাশ এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং এর পরিধি এক হাজার বছরেরও বেশি।
টিকাঃ
১. জিব্রাল্টার প্রণালীর দুই দিকে সমুদ্র তীরবর্তী দুটি পার্বত্য ভূখণ্ড--একটি স্পেনের জিব্রান্টারে এবং অপরটি উত্তর মরক্কোর জেবেল মুসায় অবস্থিত।-অনুবাদক।
১. বি এবং ই এম হুইসাও, অ্যারাবিক স্পেন (লগুন, ১৯১২), পৃ ১২২।
১. জে স্টেযিগোভঙ্কী, অরিজিন অব ক্রিশ্চিয়ান চার্ট আর্ট (অক্সফোর্ড, ১৯২৩), পৃ ৬৪।
১. এনসাইক্লোপেডিয়া অব ইসলাম: প্রবন্ধ 'আর্কিটেক্চার' ।
২. বর্তমানে এই মতবাদ অগ্রাহ্য করা হয়।
১. জে স্টেজিগোভঙ্গী, ওপি, সি আইটি, পৃ. ২৭।
১. মিরের আরবী শব্দ মা'জানা এরূপ একটি স্থানের ইঙ্গিত দেয় যেখান থেকে নামাযের আযান দেওয়া হয়, আ যিনি আযান দেন তিনিই হচ্ছেন মুয়াজ্জিন।
১. জি এল বেল, প্যালেস এন্ড মস্ক এট উন্নাইদির (অক্সফোর্ড, ১৯১৪)
২. পশ্চিম ইউরোপে দ্বাদশ থেকে ষোড়শ শতকে বিকশিত বিশেষ স্থাপত্য রীতি, যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সূক্ষ্মাগ্র খিলান, খিলান দেওয়া ঠেস, পাঁজরার ন্যায় খিলান করা ছাদ, খাড়া ছাদ প্রভৃতি। -অনুবাদক
১. ইবি হ্যাভেল, ইন্ডিয়ান আর্কিটেকচার (২য় সংস্করণ, লন্ডন, ১৯২৭), পৃষ্ঠা ৮৫-৬।
২. আমার লেখা মোহামেডান আর্কিটেকচার এটসেটরা-এর তৃতীয় অধ্যায় দ্রষ্টব্য (অক্সফোর্ড, ১৯২৪)।
১. ম্যাচিকলেশনঃ ঘন ঘন সন্নিবেশিত দেওয়াল সংলগ্ন ব্র্যাকেট ব্যবস্থা যা একটি উদগত নিচু পাঁচিলের সৃষ্টি করে। প্রতি জোড়া ব্রাকেটের মধ্যস্থলে একটি ফাঁকে (ফরাসী মাচিকুলিস) বদ্ধ অবস্থায় একটি ঠেলা দরজা থাকে। অবরোধকারীরা দেওয়ালের নিচে বিস্ফোরক দ্রব্য স্থাপনের চেষ্টা করলে এসব ফাঁক পথে তাদের মাথার উপর তীর, গরম তেল বা পানি এবং অন্যান্য জিনিস নিক্ষেপ করা যেতে পারে। ম্যাচিকলেশনের স্থলে হোর্ডেস (হোর্ডিং) বা ব্রিটিশ নামে পরিচিত কাঠের গ্যালারি প্রবর্তিত হয়েছে এবং এগুলি একই উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।
২. কায়রোর দুর্গ সম্পর্কিত নিজস্ব রচনার পরিশিষ্ট মিঃ কে এ সি ক্রেসওয়েল ম্যাচিকলেশনের উদ্ভব পর্যালোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সিরিয়ায় যে দশটি তথাকথিত দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে তাঁর মধ্যে ছয়-সাতটি এমন এক ধরনের পায়খানা (ল্যাটিন) যা সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত সাধারণ ব্যাপার। বস্তুত জার্সীর গোরিতে অবলম্বন মঞ্চের (পীয়ার) উপর এ ধরনের একটি পায়খানা এখনো ব্যবহৃত হয়। অবশিষ্ট যে তিনটি সম্ভবত উপর থেকে কোন কিছু নিক্ষেপের জন্য ব্যবহৃত হয় তাঁর মধ্যে প্রাচীনতমটির তারিখ হচ্ছে ৬ষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি সময়ের।
১. সংশ্লিষ্ট সবগুলি প্রশ্নে আমার মোহামেডান আর্কিটেকচার, এটসেটরা (অক্সফোর্ড, ১৯২৪) গ্রন্থের 'নেচার অব স্যারাসেনিক অর্ণামেন্ট' শীর্ষক ১০ অধ্যায় দ্রষ্টব্য।
২. দুপাশে ইংরেজী 'এস' আকৃতির বক্র রেখা সমন্বিত সূক্ষ্মাগ্র খিলান। -অনুবাদক।
১. বেল টাওয়ার, সাধারণত গির্জার কাছাকাছি নির্মিত হয়। অনুবাদক।
২. কোন ভবনের বিশেষত গির্জার প্রধান অংশ থেকে উঁচু টাওয়ার, যার চূড়া সাধারণত সরু হয়। -অনুবাদক।
১. যেমন লি পাই ক্যাথিডালের আণ্ডার পোর্চের একটি চ্যাপেলে প্রখ্যাত খৃস্টান খোদাই শিল্পী গওফ্রিডাস কর্তৃক উৎকীর্ণ কাঠের দরজা। লা ভাউট চিলহাকের গির্জায়ও অনুরূপ আরেকটি দরজা রয়েছে। ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবির বেদির উপর উত্তোলিত তাকে (রিটেব্ল্) এবং প্রাথমিক যুগের কতিপয় রঙীন কাচের জানালায় যেসব ডোরাকাটা নকশা অঙ্কন করা হয়েছে-প্রফেসর লিখ্যাবির মতে সেগুলিও একই সূত্র থেকে এসেছে। বার্লিংটন ম্যাগাযিন-এ (৯ম-১২শ খণ্ড, ১৯২২) এ এইচ ক্রিস্টির 'দি ডেভেলপমেন্ট অব অর্নামেন্ট ফ্রম অ্যারাবিক স্ক্রিপ্ট' নিবন্ধ দ্রষ্টব্য।
📄 সাহিত্য
মুসলিম প্রাচ্যের সাহিত্য দৃশ্যত আমাদের পাশ্চাত্যের কাছ থেকে এত দূরে যে, সম্ভবত প্রতি হাজারে একজন পাঠকও আমাদের নিজস্ব সাহিত্যের সঙ্গে কখনো এটিকে হৃদয় দিয়ে মিলিয়ে দেখেনি। অপরদিকে বিভিন্ন সময়ে ইউরোপীয় সাহিত্যে প্রাচ্যের অবদান কত বেশি ছিল বলে দাবি করা হলেও তা কত কম প্রমাণিত হয়েছে এ সম্পর্কে সাহিত্যের ইতিহাসের যেসব ছাত্র অবহিত রয়েছেন, তারা হয়তো সমগ্র বিষয়টিকে সহনশীল সন্দেহাত্মক মনোভাব নিয়ে বিবেচনা করবেন। অবশ্য এ ক্ষেত্রে এমন কতকগুলি দিক রয়েছে যাতে দ্বিমতের অবকাশ নেই। প্রাচ্যের নীতিমূলক রূপক গল্প এবং এ জাতীয় অন্যান্য রচনা মধ্যযুগে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে। ইংল্যান্ডে এ ধরনের প্রথম গ্রন্থ হচ্ছে 'দি ডিকটেস এণ্ড সেয়িংস অব দি ফিলোসফার্স'। এটি মূল আরবী রচনা থেকে ল্যাটিনে, সেখান থেকে ফরাসীতে এবং সর্বশেষে ইংরেজীতে অনূদিত হয়। অষ্টাদশ শতকে পুনরায় অ্যারাবিয়ান নাইটস (আরব্য রজনী)-এর অন্তত ত্রিশটি ইংরেজী ও ফরাসী সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এবং তারপর থেকে পশ্চিম ইউরোপের সবগুলি ভাষায় এর তিনশ গুণেরও বেশি সংস্করণ বেরিয়েছে। ওমর খৈয়াম এমন একটি নাম যা পারস্য থেকে ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় বেশি পরিচিত। কিন্তু এগুলি কি প্রাচ্য থেকে বিচ্ছিন্ন অনাহৃত প্রবেশ, না একটি সাধারণ প্রবণতার প্রতিফলন আর তাই যদি হয় তাহলে কিভাবে এই প্রবণতার উদ্ভব হয়েছে এবং সাহিত্যের সাধারণ ধারায় তা কি প্রভাব সৃষ্টি করেছে? দুর্ভাগ্যবশত এসব প্রশ্নের কোন চূড়ান্ত জবাব নেই এবং প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে জবাব খুঁজে নেওয়ার একটি পন্থা নির্দেশ ছাড়া কোন জবাব দেওয়ার চেষ্টাও বৃথা।
এক সাহিত্য অপর সাহিত্যের ওপর যে প্রভাব বিস্তার করে তাঁর প্রকৃতি ও মাত্রা নিরূপণের কারণগুলি খুঁজে বের করার মতো জটিল সমস্যা আর কিছু হতে পারে না। দুটি দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক একটির বা উভয়টির সাহিত্যের অবদান সৃষ্টি করলেও এ ধরনের যোগাযোগ থাকতেই হবে এমন নয়। কিংবা এদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হোক বা শত্রুতামূলক হোক, তাতে কিছু আসে যায় না। ইউরোপের সবগুলি সাহিত্যের ইতিহাস এ কথা প্রমাণ করে যে, সাহিত্যের আদর্শ ও আন্দোলন সামরিক সীমান্তে বাধাপ্রাপ্ত হয়নি। ঐতিহাসিক সম্পর্কের চাইতেই বেশি অত্যাবশ্যকীয় জিনিসটি হচ্ছে আন্তঃযোগাযোগ এবং এটিও আবার সাধারণ ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে প্রমাণ করা অধিকতর দুঃসাধ্য। এই যোগাযোগ ব্যক্তিগত হোক আর দ্বিপক্ষীয় হোক কিংবা প্রায়াসিক ব্যাপারের ন্যায় জ্ঞানচর্চামূলক ও একতরফাই হোক, কেবল সাহিত্যিক বিশ্লেষণের মাধ্যমেই তাঁর অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায়।
সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারই সবচাইতে দুর্বোধ্য। কোন প্রকার স্থানান্তর সম্ভব হওয়ার আগে পারস্পরিকভাবে একটির বা উভয়টির গ্রহণ করার অবস্থাও থাকতে হবে। একটি যা দিতে পারে অপরটির তা গ্রহণ করার ইচ্ছা থাকতে হবে এবং যে কোন ক্ষেত্রে তাঁর প্রাধান্যের স্বীকৃতি থাকতে হবে। কোন গভীর পর্যালোচনা ছাড়াই একথা বলা যেতে পারে যে, আরবী বা পারস্য সাহিত্যের ধরনসমূহের ইউরোপীয় গ্রহণ ক্ষমতা সময় ও সুযোগের দিক দিয়ে অত্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। পাশ্চাত্য সাহিত্যে ধীরে ধীরে ল্যাটিন রেনেসাঁর যুগ থেকে গ্রীক প্রভাবের সূক্ষ্ম মিশ্রণ এবং প্রাচ্য সাহিত্যের উপাদানগুলির অনিয়মিত ও অর্ধ-মিশ্রিত অভিযোজনের কোন তুলনা হতে পারে না। ইউরোপীয় সাহিত্যে কোন প্রাচ্য সাহিত্য কলাকে সামগ্রিকভাবে স্থানান্তরের মতো কোন ব্যাপার ঘটেনি। কিন্তু এককভাবে কলাকৌশলগত উপাদান এবং সময় সময় সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত উদ্দেশ্যগুলি সাফল্যজনকভাবে স্থানান্তরিত হয়। অন্যান্য বিষয় বাদ দিয়ে কেবল এসব দিক কেন নির্বাচিত হয়েছে তা প্রধানত একটি জাতীয় ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার। অবশ্য এরূপ মন্তব্য করা যেতে পারে যে, প্রাচ্য সাহিত্য ইউরোপীয় সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর পার্থক্যের চাইতে সামঞ্জস্যের মাধ্যমেই প্রভাব সৃষ্টি করেছে। ইউরোপের সাহিত্য রুচি প্রাচ্য সাহিত্যের অত্যন্ত অপরিচিত উপাদানগুলিকে আগাগোড়া প্রত্যাখ্যান করে। অপর দিকে ইউরোপীয় চিন্তাধারা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রাচ্য সাহিত্যের যেসব উপাদানের বীজ নিহিত ছিল কিংবা প্রবিষ্ট হচ্ছিল পাশ্চাত্য সাহিত্য সেগুলির প্রতি আকৃষ্ট হয়। এসব ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য যে দ্বারদেশে করাঘাত করছিল প্রাচ্যের সাদৃশ্যগুলি তা উন্মুক্ত করে দেয়, কিংবা তাদের সাহিত্য কৌশলের রূপ ও সৌন্দর্য এতটা জনপ্রিয়তা লাভ করে যে, সেগুলি ইউরোপীয় অগ্রগমনের পথকে আলোকিত করে। এতদ্বারা একথা বোঝায় না যে, তারা ক্রীতদাসের ন্যায় অনুকরণের জন্য কোন মান বা আদর্শ স্থাপন করেছে। বরং তাদের প্রেরণাকে পরবর্তীকালে সাহিত্যের যে সব শাখায় প্রয়োগ করা হয়েছে তা প্রাচ্যের সঙ্গে কোন সম্পর্ক না রেখে এবং প্রায় ক্ষেত্রে এর প্রাচ্যের পথপ্রদর্শকদের সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে নিজস্ব বিশেষ ধারায় বিকাশ ও প্রসার ঘটায়।
প্রাচ্য ও ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের যে প্রভাব সৃষ্টি করে তাঁর মধ্যে একটি সাদৃশ্য খুঁজতে গিয়ে এ দুটির মধ্যে যে পার্থক্য আছে তা উপেক্ষা করা হয়। কেবল পরিমাণের ক্ষেত্রে নয়, প্রকারের মধ্যেও এই পার্থক্য বিদ্যমান। আরব ও পারস্যের সাহিত্য মূলত 'রোমান্টিক'। যে ছাত্র সাহিত্য ক্ষেত্রে অত্যন্ত উন্নত মানের গ্রীক আদর্শের সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত তিনি গ্রীক সাহিত্যের চিরন্তন আকর্ষণের বৈশিষ্ট্যগুলির কদাচিৎ সন্ধান পান। আকারের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ দক্ষতা থাকলেও গ্রীক সাহিত্য যেখানে সুদৃঢ় এবং যেখানে কঠোর সেখানে অমিতব্যয়ী। ক্লাসিক সাহিত্য সংযম ও সরলতার মাধ্যমে মহত্ত্ব অর্জন করে, আর প্রাচ্য সাহিত্য মূল্যবান ও অস্পষ্ট ভাষার এমন সূক্ষ্ম বুননীর সৃষ্টি করে যা প্রায়ই অস্বাভাবিক ও উদ্ভট উপমা্য সমৃদ্ধ। গ্রীক সাহিত্য সৌন্দর্যের মাধ্যমে বুদ্ধির জগতে আবেদন সৃষ্টি করে এবং আরবী ও পারস্য সাহিত্য রূপ মাধুর্যের মধ্য দিয়ে অনুভূতি ও কল্পনাকে নাড়া দেয়। গ্রীক সাহিত্য সৃষ্টিধর্মী এবং প্রাচ্য সাহিত্য মূলত অনুকরণমূলক ও বুদ্ধিদীপ্তিতে দুর্বল। এরূপ মন্তব্যে সত্যের কিছু উপাদান থাকলেও সামগ্রিকভাবে এটি ঠিক নয় বরং এরূপ মন্তব্য বাড়িয়ে বলার এবং নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করার প্রবণতা প্রকট। রোমান্সের ভাষায় চিন্তার মৌল বাস্তবতাকে সুশোভিত করার ক্ষেত্রে মুসলিম লেখকরা অন্যদের ছাড়িয়ে গেছে কিন্তু এর থেকে এরূপ সিদ্ধান্তে আসা ভুল হবে যে, প্রাচ্যচেতনা ও ইউরোপীয় চেতনার মধ্যে বৈষম্য রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বৈষম্য রয়েছে প্রাচ্যচেতনা ও ক্লাসিক্যাল চেতনার মধ্যে। ইউরোপীয় সাহিত্যে ক্লাসিকতা সব সময় উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাচ্য সাহিত্যের চেতনার সঙ্গে জনগণের বিশেষত উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে জনগণের সাহিত্যের একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখা যায়। পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা ও অজ্ঞতা থেকেই তাদের পারস্পরিক অনুভূতির মধ্যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে। যখনি উভয়টির মধ্যে একটি যোগাযোগের সূত্র উন্মুক্ত হয়েছে, তখনি ইউরোপীয় সাহিত্যের জনপ্রিয় ধারার সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য প্রাচ্য প্রভাবের ধারা সাধারণত এতটা বেগবান হয়ে ওঠে যে, তা ক্লাসিক্যাল প্রাধান্যের বিরুদ্ধে একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
এই জনপ্রিয় আবেদন এবং মধ্যযুগে প্রাচ্য উপাদানের আমদানি পদ্ধতিটিকে আরো অস্পষ্ট করে তুলেছে এবং বিষয়টি আরো জটিল হয়ে ওঠে। এতে ঐতিহাসিক সমালোচনার সাধারণ পদ্ধতিতে তা প্রমাণ করা প্রায়ই দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। উভয় দিকের অধিকাংশ গণসাহিত্য ধ্বংস হওয়ার ফলেও এই জটিলতা বৃদ্ধি পায়। এতদসত্ত্বেও আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসগুলিতে আরবী লেখক এবং ইউরোপীয় পণ্ডিতরা সাধারণত লোকসংগীত ও লোক-কাহিনীর প্রতি যে অবজ্ঞাসূচক দূরত্ব বজায় রাখেন তাঁর প্রমাণ পাওয়া যায়। এরূপ বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে যে, আধুনিক লোক-সাহিত্য পর্যালোচনা সমগ্র পশ্চিম ইউরোপে প্রাচ্য থেকে আহরিত উপাদান ও কৌশল কতটা পরিব্যাপ্ত হয়েছে সে সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে আলোকপাত করবে। সম্ভবত এই প্রভাব অষ্টম শতকেও কার্যকর ছিল। তবে প্রধানত দেশীয় ভাষার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গেই প্রাচ্য যোগাযোগের প্রশ্নের উদ্ভব হয়।
একেবারে প্রথম প্রশ্নটিই সম্ভবত সবচাইতে দুরূহ সমস্যা এবং সবচাইতে বিতর্কমূলকও বটে। একাদশ শতকের সমাপ্তিতে দক্ষিণ ফ্রান্সে নতুন বিষয়বস্তু সমন্বিত একটি নতুন ধরনের কাব্য, একটি নতুন ধরনের সামাজিক মনস্তত্ত্ব এবং নতুন ধরনের কাব্যরীতি আকস্মিকভাবে দেখা দেয়। পূর্ববর্তী ফরাসী সাহিত্যে এমন কিছু ছিল না যেখান থেকে এই নতুন জিনিসের আভাস পাওয়া যেতে পারে। অপর দিকে এই নতুন কাব্যে আরব স্পেনের সমসাময়িক কাব্যের একটি বিশেষ রীতির সুস্পষ্ট সামঞ্জস্য দেখা যায়। কাজেই অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই মনে করা যেতে পারে যে, প্রথম 'প্রভেন্সাল' কবিরা আরবী আদর্শের দ্বারা প্রভাবিত হন। এই অভিমত কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত প্রায় নিঃসন্দেহে স্বীকৃত হয়। এই অভিমত ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের পুনরুজ্জীবনের প্রবল বেগের মধ্যে গিয়ামোরিয়া বারবিরির ন্যায় এতোটা দৃঢ়তার সঙ্গে কখনো আর কেউ সমর্থন করেনি। অষ্টাদশ শতকের সমাপ্তিতে মধ্যযুগীয় সাহিত্য পর্যালোচনা যখন পুনরুজ্জীবিত হয় তখনো জনসাধারণের কল্পনা প্রাচ্যের রোমান্সে আবিষ্ট ছিল। এসমরেওসিসমণ্ডী ও ফরিয়েলের নেতৃত্বে সাধারণভাবে মনে করা হতো যে, আরবী কাব্যের সঙ্গে প্রভেন্সালের একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কেবল উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে প্রাচ্য ভাষাবিদ ও রোমান্স ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে আকস্মিকভাবে এই মতের পরিবর্তন দেখা দেয়। সমালোচকরা 'প্রভেন্স' ও আন্দালুসিয়ার মধ্যে যোগাযোগের প্রামাণিক রেকর্ডপত্র দাবি করেন। এধরনের প্রমাণ না পাওয়ায় তাঁরা চরম বিপরীত মতের অনুসারী হন। যে অতি উত্তপ্ত জাতীয়তাবাদ পাশ্চাত্য জাতিগুলিকে উত্তেজিত করে তোলে তাঁর প্রতিক্রিয়ায় কেউ নিরাসক্ত মনে কিছুটা সমর্থন জানালেও একথা স্বীকার করতেই হবে যে, বিখ্যাত প্রাচ্য ভাষাবিদ ডোযির নিম্নোক্ত নিন্দাসূচক অভিমতের প্রেক্ষিতে কোন আত্মমর্যাদা সচেতন রোমান্স পণ্ডিতই আরবীর প্রভাবের মতবাদ সমর্থন করতে পারেন না: 'নাউস কনসিডারনস সেট্রে কোয়েসচন কম টাউট এ ফেইট ওয়সিউস, নাউস ভাউডিয়ানস নেপ্লাস লা ভয়ের ডিভ্যাটু, কুইক নাউস সিয়ন্স কনভেইনকু কোয়েলে লি সেবা পেডান্ট লংটেম্পস এক্কোর। এ চাসুন সন চিভাল ডি ব্যাটেইলি?' মনে হয় এই যুক্তির উপর ভিত্তি করেই প্রচলিত মতামত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ এ ব্যাপারে মঁসিয়ে অ্যাংলেডের বক্তব্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট: 'আইনসি ফন্ড এট ফর মে, লেস টুবাডুরস ওন্ট টাউট ক্রী।'
কিন্তু পক্ষে বিপক্ষে উভয় প্রকারের মতামতের সঙ্গে প্রদত্ত আশ্বাস সত্ত্বেও উভয়টিই বাস্তবতার চাইতে অনুমানের উপরই প্রতিষ্ঠিত। প্রাচ্য ভাষাবিদদের পক্ষ থেকে সমস্যাটি সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে যে সব গবেষণা করা হয়েছে তাতে সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত কোন বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু বর্তমানে এমন কিছু নতুন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যাতে এ ব্যাপারে সর্বপ্রকার সন্দেহের অবসান ঘটেছে যে, দক্ষিণাঞ্চলের কাব্যচর্চা অন্তত কিছু পরিমাণে হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে প্রাচীনতম প্রভেন্সাল কবিদের প্রভাবিত করেছে।
প্রভেন্সাল কাব্যের অভিনবত্ব রচনার মূল বিষয়ে নয়, এর প্রচলিত প্রকাশ ভঙ্গিতে নিহিত। এই স্পন্দিত প্রেম এক অদ্ভুত কল্পিত চিত্র ও সাহিত্য সৌন্দর্যের ঐশ্বর্যে গরীয়ান হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের সহজ সরল ও আবেগপূর্ণ সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রকাশিত প্রেমের তুলনা করা যায় না। একটি ভাবাবেগপূর্ণ মতবাদ, রোমান্টিক শ্রদ্ধা-ভক্তি এবং নিরূপণমূলক অবস্থাই কাল্পনিক উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারে। এতেই কুমারী নারী নয়, বরং স্ত্রীর মধ্যে আদর্শ মানসী খুঁজে পাওয়া যায়। এই মানসীর প্রতি ভক্তি এবং সেবা থেকে এমন এক নৈতিক শক্তির উদ্ভব হয় যা কবির জীবনকে সমৃদ্ধ ও মহৎ করে তোলে।
এই প্রেমচাতুর্য, এই গৃহলক্ষ্মী ভজন কোত্থেকে এসেছে? সময়ের আচরণে টিউটনিক বা রোমান্স যে কোন গণসাহিত্যে এদের যেভাবে প্রতিফলিত করা হয়েছে সেখান থেকে তা আসতে পারে না। ব্রুনেটিয়ার লিখেছেন, "মধ্যযুগের বুর্জোয়া জীবনে মেয়েরা এতটাই নিচের দিকে মাথা নত করেছে যতটা অন্য কোন যুগে পৃথিবীর অন্য কোন স্থানে আইনের বলে কিংবা নিষ্ঠুরতায়ও তারা করেনি।” শিভলরির যেসব নতুন আদর্শ অভিজাত শ্রেণীকে অনুপ্রাণিত করতে শুরু করে তাঁর মধ্যেও কোনভাবে এটি নিহিত ছিল না। যোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তির সঙ্গে এই কৃত্রিম ভাবাবেগের কোন মিল নেই। নারীর প্রতি নতুন শ্রদ্ধা-ভক্তির আদর্শ গির্জার সতীত্বের আদর্শের সরাসরি পরিপন্থী ছিল। পেশাদার কবি ও তাঁর কাব্যচর্চায় পৃষ্ঠপোষক মহিলার স্বাভাবিক সম্পর্ক থেকে যদি এর উদ্ভব হতো তাহলে এর সুর আরো বিনয়নম্র হতো। স্বর্ণ যুগের কিংবা রৌপ্য যুগের হোক, গ্রীক ও ল্যাটিন সাহিত্যে এমন কিছু ছিল না যা এর মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করতে পারে। এতদসত্ত্বেও এটি স্পষ্টত একটি প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করে এবং অন্তত সেই সাহিত্য ঐতিহ্যের সম্ভাব্য সূত্র হিসাবে আমরা স্পেনের আরবী কাব্যের দিকে তাকাতে পারি।
একাদশ শতকের মধ্যে আরবী কাব্যের বিকাশ ও উন্নয়নের একটি সুদীর্ঘ প্রেক্ষিত গড়ে ওঠে। কিন্তু যতো পিছনেই যাওয়া যাক না কেন প্রেমই ছিল সব সময় এর অন্যতম প্রধান উৎস। বিশুদ্ধ ভাষা, বিস্তারিত উপমা, জটিল ছন্দ ও নিখুঁত মিলের (পাশ্চাত্য ভাষাগুলির মধ্যে আরবীই সর্বপ্রথম কাব্যের একটি মৌল উপাদান হিসাবে পূর্ণাঙ্গ মিলের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে) মাধ্যমে সৃষ্ট চিরাচরিত চিত্রকল্পে সমৃদ্ধ মরুভূমির প্রাচীন কাব্য সুষমার অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি গীতি কবিতার প্রারম্ভে প্রিয়তমার বিচ্ছেদ ব্যথা তুলে ধরা হতো। পরিত্যক্ত তাঁবু এলাকায় ফিরে আসার পর তাঁর স্মৃতি উদ্বেলিত হয়ে উঠতো। শহরাঞ্চলে হিজরতের পর এসব কাব্যে প্রেমের উদ্দেশ্য আরো বলিষ্ঠ হয়ে দেখা দেয়। মরুভূমির সহজ-সরল সুখানুভূতির স্থলে একটি সূক্ষ্ম নতুন অনুভূতির প্রতিফলন ঘটে। উপাখ্যানমূলক গীতিকাব্যের স্থলে ছোট ছোট গীতি কবিতার উদ্ভব হয়। এসব কবিতায় কবি তাঁর নিজস্ব সত্তা ও আবেগ তুলে ধরেন। গীতিধর্মী কবিতা নিজস্ব পন্থায়, স্টাইলে ও চিরন্তন রীতিতে পরিণত হওয়ার আগে আরবী কাব্য কয়েক দশক পর্যন্ত অবাধ, হাস্য-উচ্ছ্বল ও জীবনধর্মী নতুন প্রাণে উজ্জীবিত হয়। অপর দিকে দরবারী কবিদের মধ্যে এটি ভাবাবেগপূর্ণ গীতিরস ও অতি সূক্ষ্ম রূপলাবণ্য লাভ করে। সেখানে প্রকৃত আবেগের উত্তাপের স্থলে সাহিত্যিক নিপুণতার সঙ্গে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সঙ্গীতের সংমিশ্রণ ঘটে। জনসাধারণের মধ্যে এটি এক নতুন কলায় রূপায়িত হয়-যে উন্মত্ত প্রেমিকের জীবন এক দুর্লভ ও আদর্শ মানসীর প্রতি নিষ্কাম প্রেমে উৎসর্গীকৃত তাঁর রোমান্সে পরিণত হয়। আধ্যাত্মিকতাবাদীদের মধ্যে একটি উন্নত ও আধ্যাত্মিক প্রেমের এসব চিত্রকল্পে নিহিত আদর্শবাদের উপাদানগুলিকে মাশুকের প্রতি আত্মার অবিরাম ভক্তির রূপক হিসাবে ব্যবহৃত হয়। আরব ও পারস্যের মরমী কাব্যে পার্থিব প্রেমের বলিষ্ঠ ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য চিত্রকল্প প্রাধান্য লাভ করে। এসব গীতি কবিতা ছিল শব্দাড়ম্বরে ও আনন্দের রেশে উচ্ছল। কোন কোন আরব কবি আরবদের চিরাচরিত অদ্ভুত পন্থায় তা প্রকাশ করেন। অন্যদের হাতে তা দার্শনিক ধ্যান-ধারণায় অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুরুচিসম্পন্ন হয়ে ওঠে। পারস্য কবিদের হাতে নতুন মাধুর্য ও সরলতার আমেজ লাভ করে। পারস্যের চিন্তাধারা থেকে স্বাভাবিকভাবে উৎসারিত উন্নত চিত্রকল্পে সুষমমণ্ডিত হয়। ইউরোপীয় সাহিত্যের ইতিহাসে এই প্রেমমূলক গীতিকাব্যের প্রতিটি রূপই নিজস্ব ভূমিকা গ্রহণ করে।
এই নতুন গীতিকাব্যের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, নিষ্কাম প্রেমের একটি সুনির্দিষ্ট সাহিত্য পরিকল্পনার উদ্ভব। এর সঙ্গে আরবের সুস্পষ্ট অবদান প্রেমের সামাজিক ও নৈতিক মতবাদের সংমিশ্রণ ঘটে। অষ্টম শতকের শেষ ভাগেই বাগদাদের দরবারে কোন কোন কবি তাদের কবি প্রতিভাকে একান্তভাবে এই প্রেমমূলক কাব্যসাধনায় নিয়োজিত করেন। একশত বছরেরও কম সময়ের মধ্যে জনৈক কিশোর এই পরিকল্পনাটিকে একটি একক আকর্ষণীয় পদ্ধতিতে সুসংবদ্ধ করেন। তিনি ইসলামের একটি সাধক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতার পুত্র ও উত্তরাধিকারী ইবনে দাউদ। 'বুক অব ভেনাস' গ্রন্থে তিনি প্রেমের সবগুলি দিক, এর স্বভাব, বিধি, প্রকাশভঙ্গি এবং প্রতিক্রিয়া কবিতার মাধ্যমে সুবিন্যস্ত, শ্রেণীবদ্ধ ও বিশ্লেষণ করেন। এই কাজে তিনি মহানবীর নিম্নোক্ত উক্তির আদর্শে অনুপ্রাণিত হন : 'যিনি প্রেম করেন এবং প্রেমকে গোপন রাখেন, পবিত্র থাকেন এবং ইন্তিকাল করেন, তিনি একজন শহীদ।'
মুসলিম বিশ্বে সাংস্কৃতিক ঐক্য স্পেনেও এসব কাব্যিক শিল্পচর্চা সুনিশ্চিত করে। কিন্তু এখানে জনসংখ্যার স্পেনীয় ও আরব উপাদানের সংমিশ্রণে এবং উত্তরাঞ্চলের খৃস্টান শক্তির সঙ্গে ক্রমাগত সংগ্রামের উদ্দীপনায় এগুলি স্বতন্ত্র ধারায় আরো বিকশিত হয়। আরবী সাহিত্যের অন্য কোন যুগে সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে কবিতার প্রেরণা, হৃদয়-মনে সৌন্দর্যের প্রতিফলন এবং এসব প্রতিফলনকে আবেগপূর্ণ অপরূপ ভাষায় সুষমমণ্ডিত করার ক্ষমতা এতো বেশি প্রসার লাভ করেনি। এ ক্ষেত্রে জানা-অজানা অসংখ্য কবির মধ্যে ডোষি কর্তৃক উদ্ধৃত সা'দ ইবনে জুদাইর গীতিকাব্য দৃষ্টান্ত হিসাবে উল্লেখ করলেই যথেষ্ট হবে। এখানেও নিষ্কাম প্রেমের আদর্শ সার্বজনীন স্বীকৃতি লাভ করে। ইবনে হাযমের নাম ইসলামে ধর্মনিষ্ঠতা ও তীব্র বাদানুবাদের জন্য অত্যন্ত বিখ্যাত। পাশ্চাত্যে তিনি তুলনামূলক ধর্ম বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে শ্রদ্ধেয়। এই ব্যক্তিও প্রেম সম্পর্কে তাঁর স্বরচিত কবিতায় এমন একটি গ্রন্থ রচনা করেন যা সম্ভবত 'বুক অব ভেনাস' কেও ছাড়িয়ে গেছে। তিনি নিষ্কাম প্রেমের মতবাদকে এমন একটি পন্থায় গ্রহণ করেন যার মাধ্যমে একটি মহান অস্তিত্বের বিচ্ছিন্ন অংশগুলি পার্থিব সংযোগ লাভ করে। এই পবিত্রতম ভাব-প্রবণতার চেতনায় প্রেমের এমন এক বিশ্লেষণ সাধিত হয় যা বহু দিক দিয়ে পরবর্তী শতকে 'টুবাডুরদের (প্রভেন্সের গীতি কবি) মধ্যে দেখা যায়। কিন্তু টুবাডুররা তাঁর গৌরবোজ্জ্বল উচ্চতায় পৌঁছতে কদাচিৎ সক্ষম হয়।
স্পেনীয় আরবী কাব্যের এতোখানি স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত হওয়া সত্ত্বেও যে কাব্য আমাদের যুগ পর্যন্ত এসেছে তাঁর অধিকাংশই দরবারী কবিদের সতর্কতার সঙ্গে সুমার্জিত রচনা। তাদের কাব্যচর্চার আভিজাত্য যুবরাজ ও মন্ত্রীদের আভিজাত্যের সঙ্গে তুলনীয়। বস্তুত তারা নিজেরাও যুবরাজ ও মন্ত্রী ছিলেন। স্পেনীয় আরবী সংস্কৃতির এই দরবারী সুষমায় ধীরে ধীরে একটি নতুন কাব্যিক কৌশল গড়ে ওঠে। সমপরিমাণ দৈর্ঘ্য ও যতি চিহ্ন সম্বলিত ব্যাঙ্গাত্মক ও একক ছন্দের ছোট ছোট কবিতার পাশাপাশি আন্দালুসীয় প্রেমাত্মক গীতি-কবিতায় নতুন স্তবক রীতির প্রাধান্য দেখা দেয়। এসব স্তবকে অন্তমিল ও সূক্ষ্ম ছান্দিক কৌশল অনুসৃত হয়। এসব ছন্দ এখনো স্বরভিত্তিক হলেও তা যেনো টুবাডুর কাব্যের পথে এক পা এগিয়ে যায়। সেটিও ছিল মূলত প্রেমাত্মক কাব্য এবং অমাত্য ও দরবারী কবিদের অবদান। তারাও একইভাবে প্রচলিত কৃত্রিম রীতি ও জটিল স্তবক অনুসরণ করতেন। একটি অসুবিধাই থেকে যায়। প্রাথমিক টুবাডুরগণ কেউই আরবী জানতেন না। তাহলে আন্দালুসিয়া থেকে প্রভেন্সে এই কাব্যরীতি আমদানির মধ্যবর্তী ব্যক্তিরা কারা ছিলেন?
ডোষির আমল থেকে সেতুর নিচ দিয়ে বহু পানি গড়ালেও একথা অকপটে স্বীকার করতে হবে যে, এ সমস্যার পরিপূর্ণ সমাধান এখনো দেওয়া যায় না। বর্তমানে সর্বপ্রকার প্রশ্নের ঊর্ধ্বে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, আন্দালুসিয়ার 'মূররা' বিপুল পরিমাণে কেবল রক্ত সম্পর্কের দিক দিয়েই স্পেনীয় ছিলেন না, বরং উচ্চতম পর্যায় থেকে নিম্নতম পর্যায় পর্যন্ত তারা সবাই পরিচিত ও অভ্যাসগতভাবে রোমান্স ভাষা বুঝতে ও বলতে পারতেন। এসব স্পেনীয় মুসলমান আরবী সংস্কৃতিকে আয়ত্ত করার সঙ্গে সঙ্গে সেই সংস্কৃতিতে অবদানও রাখতেন এবং এদের সহযোগিতায় স্পেনীয় আরব সংস্কৃতি এর বহু সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। আন্দালুসিয়ার খৃস্টানরা অর্ধ-আরব হয়ে পড়েন (তাদের মোযারেব নামেই এই ইঙ্গিত পাওয়া যায়) এবং প্রায়ই আরবী সাহিত্যে দক্ষতা অর্জন করেন। অন্যদিকে তাঁর ইসলামী সংস্কৃতির বহু বীজ উত্তরাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে ছড়িয়ে দেন।
এই ধরনের আন্তঃক্রিয়া পদ্ধতি আন্দালুসীয় ও অনেকখানি স্পেনীয় কাব্যে মৌলিকভাবে সক্রিয় ছিল। স্ট্রোফিক ছন্দ বিকাশে স্পেনীয় প্রতিভা বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করে, কিন্তু অপরদিকে স্টোফির আকার আরবী আকার ও ছন্দ বিধির প্রভাব এই রচনা কৌশলকে যেভাবে মার্জিত করে (মুয়াশশাহ) তা জনপ্রিয় দ্বৈভাষিক গাথা্য (যাজাল) প্রতিফলিত হয়েছে এবং সেখান থেকেই এটি নিখুঁত রোমান্স কাব্যে প্রবর্তিত হয়েছে। যাজালের সঙ্গে জনপ্রিয় ভিলানসিসোর যে মিল রয়েছে সে সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ নেই এবং এরূপ মনে করারও কোন কারণ নেই যে, রোমানসেরোতে আরবী উপাদান যতো কম বলেই প্রমাণিত হোক না কেন তাতে এ ধরনের আন্তঃক্রিয়া কেবল রচনাকৌশলে কিংবা এক ধরনের কাব্যে সীমাবদ্ধ ছিল। 'ক্রনিকা জেনারেল'-এ আরবী ও স্পেনীয় ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা স্পেনীয় গদ্য সাহিত্য একটি সাদৃশ্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে।
অতএব, আমদানির মাধ্যম ছিল জনপ্রিয় 'যাজাল' এবং রোমান্স ভাষায় এর সমপর্যায়ভুক্ত 'ভিলানসিসো' । সৌভাগ্যবশত এই জনপ্রিয় সাহিত্যের একটি মূল্যবান অংশ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। এটি দ্বাদশ শতকের প্রথম দিকে আন্দালুসীয় কবি ইবনে কুযমান কর্তৃক অশিষ্ট মিশ্রিত উপভাষায় রচিত প্রায় ১৫০টি ছোট ছোট কবিতার একটি সংগ্রহ। তিনি প্রাথমিক টুবাডুর কবিদের সমসাময়িক হলেও তাঁর নিজস্ব স্বীকারোক্তি অনুযায়ী আন্দালুসিয়ার একটি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্য অনুসরণ করছিলেন। তাঁর কবিতার রচনাকৌশল-এর সমাপ্তি ও মিলের ক্ষেত্রে আরবী কিন্তু ছান্দিক বিপ্লব ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। ছন্দ তখন অক্ষরভিত্তিক না হয়ে স্বরভিত্তিক। তাঁর অধিকাংশ কবিতাই (রিবেরার বর্ণনা অনুযায়ী) রাস্তায় চারণ কবিদের অভিনয়ের উদ্দেশ্যে রচিত নাটকীয় কাহিনী। তাই সেখানে স্তবকগুলি সমবেত কণ্ঠে গান গাওয়ার উপযোগী করে অত্যন্ত নিপুণভাবে রচিত হয়েছে। এসব স্তবকের সঙ্গে প্রথম 'প্রভেন্সাল' কবিদের ছন্দ ব্যবস্থা তুলনা করা হলে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য দেখা যায়। উইলিয়াম অব পয়টিয়ার্সের কবিতাগুলি এমন ছন্দে রচিত যার সঙ্গে মাঝে মাঝে ইবনে কুযমানের ছন্দের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে কিছুটা ব্যতিক্রম হলেও তা মূলত সমবেত সঙ্গীতের জন্য উদ্ভাবিত শোকগাথার একটি পরিকল্পনা সংযোজনের ফল। তাছাড়া 'প্রভেন্সাল কবিদের' স্বেচ্ছাচারিতা ও খামখেয়াল থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, তারা এমন সব ছন্দ ব্যবহার করছিলেন যার কোন প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্য কিংবা অস্তিত্বের যুক্তি ছিল না। অথচ আন্দালুসিয়ার সমবেত সঙ্গীতমূলক কবিতা তাঁর সাঙ্গিতিক ও ছান্দিক প্রয়োজনীয়তা এতটা যথাযোগ্যভাবে অক্ষুণ্ণ রাখে যে, বিজ্ঞ আলফন্সো ও পরবর্তী স্পেনীয় কবিদের কবিতায় 'প্রভেন্সাল' কাব্যে এখনো এর প্রভাব সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়।
এখনো একটি চূড়ান্ত বক্তব্য দেওয়ার অবকাশ রয়েছে। ইবনে কুযমানের কবিতায় কোনক্রমেই আন্দালুসিয়ার দরবারী কাব্যের উদ্বেলিত আবেগ কিংবা জনপ্রিয় গাথার নিষ্কলুষ রোমান্স প্রতিফলিত হয় না। উইলিয়াম অব পয়টিয়ার্সের কোন কোন কবিতা একই নৈতিকতার সংকীর্ণ ধারা থেকে খুব দূরে না গেলেও এই আন্দালুসীয় জনপ্রিয় কাব্যের সুর ও 'প্রভেন্সাল' দরবারী কাব্যের প্রচলিত আদর্শবাদের মধ্যে বিরাট বৈসাদৃশ্য রয়েছে। কিন্তু ইবনে কুযমান স্পেনীয় আরব সমাজের এক বিস্ময়কর অধপতনের চিত্র প্রতিফলিত করেন। বিখ্যাত কাব্যসমূহের জনপ্রিয় সংস্করণগুলি সম্পর্কে আরব লেখকদের প্রাসঙ্গিক মন্তব্যসমূহ বিবেচনা করলে এরূপ সম্ভাবনা খুব প্রবল যে, অন্যান্য জনপ্রিয় কাব্যে (বিশেষত একাদশ শতকে আন্দালুসিয়ার সংস্কৃতি যখন উন্নতির চরম শিখরে তখন) দরবারী কাব্যের আদর্শসমূহ অধিকতর বিশ্বস্ততার সঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে।
সাক্ষ্য-প্রমাণের এই সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনায় থেকে একথা সুস্পষ্ট যে, আন্দালুসিয়ার দরবারী কাব্য ও 'প্রভেন্সের' কাব্যের মধ্যে একই সময়ে সংঘটিত এসব ঘটনা প্রবাহের আলোকে আমদানির মতবাদ সরাসরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এখনো এমন বহু বিষয় রয়েছে যা সুস্পষ্ট হওয়া দরকার। এছাড়া অন্যান্য প্রশ্নও রয়েছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ আন্দালুসীয় ও প্রভেন্সাল' কাব্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সঙ্গীত এ সমস্যার উপর অনেকখানি আলোকপাত করতে পারে। আমরা প্রফেসর ম্যাকাইলের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে না পারলেও আরবী কাব্য ইউরোপে নতুন কাব্য ধারা উদ্ভবে কিছু পরিমাণে অবদান রেখেছে, এই দাবি আপাতত যুক্তিযুক্ত বলে মেনে নিতে পারি। প্রফেসর ম্যাকাইলের বক্তব্য হচ্ছে: 'ইউরোপ জুদিয়ার কাছে যেমন তাঁর ধর্মের জন্য ঋণী তেমনি অ্যারাবিয়ার কাছে তাঁর রোমান্সের জন্য ঋণী।'
দ্বিতীয় যে এলাকা থেকে ইউরোপে আরবীর প্রভাব প্রসারিত হয় তা ছিল সিসিলির নর্ম্যান রাজ্য। এখানে বিশেষভাবে সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডারিক এসব ঐতিহ্য অব্যাহত রাখেন। এ সম্পর্কে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে, নর্ম্যান রাজাদের দরবারে আরবী কাব্যের চর্চা হতো। ফ্রেডারিকের আমলেই সিসিলীয় ধারার উদ্ভব হয়। ক্যাস্টিলের বিজ্ঞ আল ফন্সোর দরবারের ন্যায় ফ্রেডারিকের দরবারেও আরবী গ্রন্থের অনুবাদ, মুসলিম দর্শন চর্চা এবং প্রভেন্সাল ও স্থানীয় টুবাডুরদের কাব্য সাধনা সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু শুনলেও আরবী কবি বা কাব্য সম্পর্কে কোন সুনির্দিষ্ট উল্লেখ নেই। অপর দিকে একথা নিশ্চিত যে, ফ্রেডারিকের দরবারে স্যারাসেন নর্তকী ও গায়িকা ছিল। মধ্যযুগীয় সিসিলির সাবধানী ইতিহাসবিদ একথা স্বীকার করেন যে, আমরা সিসিলীয়-আরবী জনপ্রিয় কাব্য সম্পর্কে অধিকতর অবহিত হলেও আমরা এর সঙ্গে সিসিলির পূর্ববর্তী ইটালীয় কাব্যের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও আবিষ্কার করি। তিনি অধিক অগ্রসর না হয়ে কেবল এটুকুই দাবি করেন যে, আরবী কবিদের দৃষ্টান্ত এবং তারা মুসলিম শাসকদের কাছ থেকে যে পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছেন তাঁর দরুনই অশিষ্ট ভাষায় কাব্য চর্চা হয়। তবুও একথা সত্য যে, জাকোপোন ডি টোডির স্তোত্র, কার্নিভ্যাল সঙ্গীত এবং 'ব্যাল্লাটা্য' প্রতিফলিত প্রাথমিক জনপ্রিয় ইটালীয় কাব্যের ছন্দ এবং আন্দালুসিয়ার জনপ্রিয় কাব্যের ছন্দ একই ধরনের। এমনকি আরবদের বিরুদ্ধে পেত্রার্কের প্রচণ্ড জাতীয়তাবাদী বিক্ষোভ অন্তত একথা প্রমাণ করে যে, তাঁর আমলেও ইটালীতে অধিকতর জনপ্রিয় আরবী কাব্য প্রচলিত ছিল। কথ্য ল্যাটিন ভাষা হতে উদ্ভূত বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার লোকদের কাব্য প্রতিভাস্ফুরণে আরবী কাব্যের স্থান যাই হোক না কেন, আরবী গদ্য সাহিত্যের কাছে মধ্যযুগীয় ইউরোপের ঋণ সম্পর্কে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।
আরবী দর্শন ও বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা প্রচলিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরবী সাহিত্যের অন্যান্য দিক সম্পর্কেও আগ্রহের সৃষ্টি হয়। নীতিমূলক গল্প, উপকথা, কাহিনী ইত্যাদি সমবায়ে যে বিরাট আরবী সুকুমার সাহিত্য গড়ে ওঠে তা বিশেষ আবেদনের সৃষ্টি করে। অবশ্য মৌখিকভাবে এর আগেই আরবী ও অন্যান্য প্রাচ্য গল্প-কাহিনীর উপাদানগুলি বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ শতকে 'ফ্যাবলিয়ো' (ছন্দোময় ছোট গল্প), কন্টে (দুঃসাহসিকতামূলক কাল্পনিক গল্প), ইগজেম্পেল (আদর্শমূলক গল্প) প্রভৃতি আকারের যেসব কাহিনী ইউরোপে জনপ্রিয়তা লাভ করে, অতি সম্প্রতি এগুলির প্রাচ্য মূলসূত্র আবিষ্কৃত ও স্বীকৃত হয়েছে। এগুলির সঙ্গে নিঃসন্দেহে প্রাচ্য ও ভারতীয় কাহিনীর সাদৃশ্য রয়েছে। প্রফেসর বেডিয়ারের ব্যাপক গবেষণা এই অভিমতের সমর্থনে উত্থাপিত যুক্তিগুলিকে বর্তমানে অনেকটা দুর্বল করলেও এখনো এমন বহু জনপ্রিয় সাহিত্য রয়েছে যেগুলিতে অন্ততপক্ষে প্রাচ্য গল্পগুলির কাহিনী গ্রহণ করা হয়েছে। আরবী রোমান্টিক গল্প এবং 'আইসোন্ডে ব্লাঞ্চ মেইন' জার্মান রোলাওসলিড ও অন্যান্য উত্তরাঞ্চলীয় কাহিনীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি 'গ্রেইল-সাগর' অন্যতম সংস্করণের রচয়িতা তাঁর সূত্র হিসাবে একটি আরবী গ্রন্থের নাম উল্লেখ করেছেন। সুদর্শন 'আউকাসিন এট নিকলেট' -এর সঙ্গে সম্পর্ক থাকার দরুন প্রাচীন ফরাসী কাহিনী ফ্লয়ের এট ব্রাঞ্চেফলিউর রচনায় যে আরবী প্রেরণা প্রদর্শিত হয়েছে তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নায়কের আরবী নাম (আল কাসিম) এবং কাহিনীর বিন্যাসে অন্যান্য বিষয় থেকে নিঃসন্দেহে এর স্পেনীয়-আরবী সূত্র প্রমাণিত হয়। ফরাসী ভ্রাম্যমাণ চারণ কবিরা ইউরোপীয় সাহিত্যে অপরূপ যে চ্যান্টে-ফ্যাবল গেয়ে বা আবৃত্তি করে সবার মনোরঞ্জন করতেন তাও জনপ্রিয় আরবী রোমান্সের একটি পরিচিত রূপের অনুকরণ।
আরবী ভ্রমণ সাহিত্য এবং ভূ-বিবরণও পাশ্চাত্য সাহিত্যে তাদের স্বাক্ষর রাখে। যে সময় ইউরোপের জন্য ভ্রমণ বলতে প্রধানত পবিত্র ভূমিতে তীর্থযাত্রা বোঝাতো তখন এটিই আশা করা যায়। প্রায় অপরিহার্যভাবে ধরে নেওয়া যায় যে, রূপকথার ন্যায় বিস্ময়কর উপাদানগুলি মৌখিক প্রচারের মাধ্যমে দূরতম এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ে। অন্যান্যের মধ্যে এগুলি মার্কো পোলো এবং 'স্যার জন ম্যান্ডেভিলের কাহিনীকেও অলংকৃত করে। কিন্তু এগুলির ব্যাপ্তি পাশ্চাত্যের ল্যাটিন দেশগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এগুলি সুদূর আয়ারল্যান্ড এবং স্কান্ডিনেভিয়ায়ও প্রবেশ করে এবং এখানে সম্ভবত কাস্পিয়ান-বাল্টিক ব্যবসায় পথে প্রচারিত হয়। লিজেন্ড অব সেন্ট ব্রেন্ডান-এর ন্যায় সন্ন্যাসীদের কাহিনীতে এগুলির পুনরাবির্ভাব ঘটে। বণিক ও ভ্রাম্যমাণ চারণ কবিরা এগুলিকে সিরিয়ার ক্রুসেডের রাজ্যগুলি থেকে লেভ্যান্টের বন্দরগুলিতে নিয়ে আসে। বোক্কাক্কিও খুব সম্ভব মৌখিক সূত্র থেকেই তাঁর ডিক্যামেরন-এর প্রাচ্য কাহিনীগুলি সংগ্রহ করেন। সসারের স্কুইয়ারেস টেল 'আরব্য রজনীরই' একটি কাহিনী। এই কাহিনীটি সম্ভবত ইটালীয় বণিকগণ কৃষ্ণসাগর এলাকা থেকে ইউরোপে নিয়ে আসেন। কারণ দৃশ্যটি ভল্গাতীরে মঙ্গোল খানদের দরবার থেকে তুলে ধরা হয়েছে, তাতারীর দেশে সারেতে।
আরবী কাহিনীসমূহের মৌখিক প্রচারের সঙ্গে চতুর্দশ শতকে নতুন পাঠক শ্রেণীর চিত্তবিনোদনের জন্য আরবী গল্প সংগ্রহগুলি থেকে বহু অনুবাদ যুক্ত হয়। মধ্যযুগীয় জনপ্রিয় কাহিনী থেকে এসব প্রাচ্য কাহিনী অধিক প্রাধান্য লাভ করে। বৈচিত্র্য ও মার্জিত সাহিত্য রসই এর একমাত্র কারণ ছিল না। এসব গল্পে যে উন্নততর কল্পনাশক্তি ও নৈতিক শিক্ষা প্রতিফলিত হয় তাই ছিল প্রধান কারণ। এখানে সাহিত্য প্রাধান্য ও সাহিত্য পদ্ধতির ক্ষেত্রে খৃস্টান ও মুসলিম মধ্যপ্রাচ্য একটি সাধারণ ভিত্তি ভূমিতে মিলিত হয়। জনসাধারণ গল্প বলতেন, কারণ তারা গল্প পছন্দ করতেন। সাধারণভাবে তাদের গল্পগুলিতে কোন নৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু এই গল্প একটি সাহিত্যকলা হিসাবে নৈতিক কাঠামো লাভ করে। লেখকের সাধারণ উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকার পরিচালনার কৌশল, উত্তম জীবন যাপনের কর্তব্য কিংবা সদ্গুণাবলীর পেশা তুলে ধরা। এসব রচনার মধ্যে আরবী রচনার সংখ্যা বিপুল। এগুলি প্রাচীন ভারতীয় উপকথা থেকে, প্রাচ্যের অন্যান্য গল্পভাণ্ডার থেকে (তাঁর মধ্যে নিঃসন্দেহে অনেকখানি গ্রীক সূত্র থেকে) এবং প্রাচ্য ইতিহাসের ঐতিহাসিক ও রূপকথার কাহিনীসমূহ থেকে সংগৃহীত। অবশ্য এগুলির কোন সাহিত্যিক ভিত্তির ধারণা ছিল না। মুসলমানদের বা খৃস্টানদের মধ্যে কোন লেখক কিংবা পাঠক এগুলির উপাদানের মৌলিকত্ব কিংবা মনস্তাত্ত্বিক আবিষ্কারের ক্ষমতার উপর কোন গুরুত্ব আরোপ করেননি। নৈতিকতাবাদীর কলাকৌশল (আপাতত তাঁর সাহিত্য স্টাইলের কথা বাদ দিলেও) পরিচিত উপাদানকে নতুন প্রেক্ষাপটে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর নির্বাচন ও সমন্বয় ক্ষমতার মধ্যে নিহিত। এমনিভাবে নীতিমূলক আরবী গল্পগুলি মধ্যযুগীয় ও পরবর্তী ইউরোপীয় সাহিত্যে বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করে, এক দেশ থেকে আরেক দেশে প্রসারিত হয় এবং বহু সমসাময়িক মৌলিক রচনাকে অনুপ্রাণিত করে এবং তাঁর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে।
প্রধানত ইহুদীদের দ্বারা আরবী থেকে অনূদিত এ ধরনের বহু রচনার মধ্যে তিনটিকে অবশিষ্টগুলির আদর্শ হিসাবে নির্বাচিত করা যায়। আরবী বুক অব সিন্দবাদ ('দি সেলর' শব্দ বাদে) একটি মূল সংস্কৃত গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে। মূল-গ্রন্থটির ন্যায় এটিও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে না। এই আরবী গ্রন্থটি মধ্যযুগীয় বিভিন্ন সংস্করণের সূত্র ছিল। এগুলির মধ্যে একটি সিরীয় সংস্করণ হচ্ছে 'সিন্দবান' এটি থেকে মধ্যযুগীয় গ্রীক 'সিন্টিপাস' একটি হিব্রু সংস্করণ (সিণ্ডাবার) এবং কতিপয় পারস্য সংস্করণের উদ্ভব হয়। কিছু কিছু আরবী ও তুর্কী ভাষায় পুনরনূদিত হয়। এগুলিই অষ্টাদশ শতকে ইউরোপ পৌঁছে। সম্ভবত হিব্রু সিন্ডাবারই ছিল ত্রয়োদশ শতকের স্পেনীয় লিব্রো ডি লস এঙ্গানস এবং চতুর্দশ শতকে ল্যাটিন হিস্টোরিয়া সেপ্টেম স্যাপিয়োন্টিয়াম-এর সূত্র। শেষোক্তটি থেকেই কাব্যে রচিত বিভিন্ন গ্রন্থের উদ্ভব হয়, যার অন্যতম হচ্ছে ইংরেজী 'সেভেন সেজেস অব রোম'।
দ্বিতীয় গ্রন্থটি ছিল প্রাচীন দার্শনিকদের উক্তি সম্বলিত একটি সংগ্রহ গ্রন্থ। একাদশ শতকে জনৈক মুবাশির ইবনে ফাতিক কর্তৃক মিসরে এটি সঞ্চালিত হয়। এটি স্পেনীয় ভাষায় বোকাডোস ডি ওরো শিরোনামে অনূদিত হয়। পাশ্চাত্যের অন্যান্য সংস্করণ একটি ল্যাটিন অনুবাদের (লিবার ফিলোসফোরাম মরালিয়াম) উপর ভিত্তি করে রচিত। এর থেকেই গিলম ডিটিগ্লনভিল তাঁর লেস ডিট্য মোরাডেস ফিলোসফেস রচনা করেন এবং এরই ইংরেজী অনুবাদ হচ্ছে আর্ল রিভার্সের দি ডিকটেস এণ্ড সেয়িংস অব দি ফিলোসফার্স। ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এটি ক্যাক্সটন কর্তৃক মুদ্রিত প্রথম ইংরেজী গ্রন্থ।
স্পেনীয় সাহিত্যে, বিশেষত প্রাথমিক যুগে এসব গ্রন্থ ও অনুরূপ অন্যান্য রচনার প্রভাব অত্যন্ত সুস্পষ্ট। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, এগুলি থেকেই ইনফ্যান্টে (যুবরাজ) ডন জন ম্যানুয়েল (যিনি নিজে আরবী ভাষা জানতেন) এল কণ্ডে লুক্যানোর রচনার অনুপ্রেরণা লাভ করেন। এমনকি সর্বপ্রকার আরবী রচনায় যেভাবে গৌরচন্দ্রিকা দেওয়া হয় তাঁর গ্রন্থেও তেমনিভাবে গৌরচন্দ্রিকার অবতারণা করা হয়েছে। বস্তুত স্পেনে এরূপ প্রাথমিক গদ্য রচনা খুবই কম, যেগুলি আরবী থেকে অনূদিত উপাদান গ্রহণ করেনি। অথচ প্রায়ই এরূপ মন্তব্য করা হয়েছে যে, স্পেন থেকে সরাসরি আরবী সাহিত্যের ঐতিহ্য অন্যত্র প্রচারিত হয়নি। মধ্যযুগীয় ইউরোপ অন্যান্য ব্যাপারের ন্যায় এ ক্ষেত্রেও ইটালী এবং দক্ষিণ ফ্রান্সের ওপর নির্ভরশীল ছিল। স্পেনীয় সাহিত্যে আরবীর যেসব প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে সে ধরনের প্রভাব বহুকাল পরে ফ্রান্স ও ইংল্যাণ্ডে প্রবেশ করে।
তৃতীয় এবং অধিকতর বিখ্যাত রচনাটির ক্ষেত্রেও স্পেন তুলনামূলকভাবে একই অবস্থায় বিচ্ছিন্ন থাকে। এই রচনাটিতেও মূলত প্রাণী বিষয়ক সংস্কৃত উপকথা ছিল। অষ্টম শতকে 'কালিলা এও দিমনাহ' শিরোনামে এটি আরবীতে অনূদিত হয়। কিন্তু আলফন্সোর জন্য এটি স্পেনীয় ভাষায় অনূদিত হয় (১২৫২-৮৪)। কিন্তু অবশিষ্ট একটি ল্যাটিন অনুবাদ থেকেই এটি অবগত হয়। কাপুয়ার জন নামে পরিচিত জনৈক ধর্মান্তরিত ইহুদী একই শতকে 'ডাইরেক্টারিয়াম হিউম্যান ভিটে' শিরোনামে এই অনুবাদকার্য সম্পন্ন করেন। গেস্টা রোমানোরাম-এর ন্যায় অন্যান্য ল্যাটিন রচনা এই সংস্করণটি অবলম্বনেই লিখিত হয়। ১৫৫২ খৃস্টাব্দে ডোনি কর্তৃক এটি সর্বপ্রথম দেশীয় ভাষায় অনূদিত হয়। এই প্রাচ্য কাহিনীর পরবর্তীকালের ভাগ্যে দেখা যায় যে, ক্লাসিক্যাল পুনরুজ্জীবনের প্রবলতম বন্যার সময়ও প্রাচ্য সাহিত্যের আকর্ষণী-শক্তি অব্যাহত ছিল। টমাস নর্থ-এর মর্যাল ফিলোসফি অব ডোনি (১৫৭০) বহু ইংরেজী সংস্করণের মধ্যে একটি। নভেল্লির (ক্ষুদে উপন্যাস) লেখকরা, এমনকি নাট্যকাররাও (ম্যাসিঙ্গারের দি গার্ডিয়ান-এর তৃতীয় অঙ্ক দ্রষ্টব্য) ল্যাটিন এবং দেশীয় সংস্করণগুলির ব্যবহার অব্যাহত রাখেন। এর পরবর্তী পুনরুজ্জীবন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই পর্যায়ে দি লাইটস অব ক্যানোপাস নামে পরিচিত পারস্য সংস্করণ থেকে ফ্যাবলস অব পিল্পে হিসাবে এটি ফরাসী ভাষায় অনূদিত হয় (১৬৪৪)। পারস্য সাহিত্যের সঙ্গে পশ্চিম ইউরোপের এটিই প্রথম সরাসরি যোগাযোগ এবং লা ফন্টেনের অন্যতম সূত্র।
আরবী সুকুমার সাহিত্যের আরেকটি শাখাও মধ্যযুগীয় সাহিত্যে অবদান রেখেছে। এটি ছিল সর্ব প্রকার আরবী রচনার সবচাইতে বিশ্লেষণমূলক মাকামাত। যদিও প্রচলিত সাহিত্য রীতি অনুসারে মিলযুক্ত গদ্যে মাকামাত রচনা করতে হতো এবং সর্ব প্রকার ভাষাতাত্ত্বিক কৌতূহল সৃষ্টির মাধ্যমে এটিকে সুশোভিত করা হতো, তবুও এসব রচনার কাহিনীর পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত সহজ। এতে পরস্পর বিচ্ছিন্ন কতিপয় কাহিনী থাকে। এর নায়ক সব সময় একজন অশ্বারোহী সাহসী সৈনিক, ভবঘুরে, জীবিকা অর্জনের জন্য বহু রকমের ছলচাতুরি অবলম্বন করে। অপর দিকে এই নায়ক অত্যন্ত সুমার্জিত সাহিত্য রসের অধিকারী এবং এর সাহায্যে উচ্চতম নৈতিকতাপূর্ণ আবেগ প্রকাশ করে। এই পরিকল্পনার সঙ্গে স্পেনীয় 'পিকারেস্ক' উপন্যাসের কতিপয় সাদৃশ্য রয়েছে। এ সঙ্গে আরো বলা যায় যে, স্পেনীয় ইহুদীরা কেউ কেউ 'মাকামাত' -এর অনুকরণ করেছেন। 'এল ক্যাভেলেরো সিফার'-এ প্রাচ্যের অন্যান্য সাদৃশ্য ছাড়াও প্রথম স্পেনীয় পিকারো (নায়ক) 'রিবান্ডোর' অন্তত একটি দুঃসাহসিক অভিযানের বর্ণনা রয়েছে। এই কাহিনীতে আরবী গ্রন্থের জুহায়ের চরিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রাচ্যের ধারা অক্ষুণ্ণ রয়েছে। মাকামাত-এর কাহিনীগুলির সঙ্গে সম্ভবত প্রাথমিক ইটালীয় বাস্তবধর্মী বা 'পিকারেস্ক' ধরনের কাহিনীগুলিরও সাদৃশ্য রয়েছে কিন্তু সমগ্র বিষয়টি সম্পর্কে এখনো কোন অনুসন্ধান করা হয়নি।
মধ্যযুগীয় ইউরোপে আরবী সাহিত্যের মৌল চিন্তাধারার অনুপ্রবেশ বাস্তবে সাধারণ বুদ্ধিভিত্তিক আন্দোলনের একটি দিক গড়ে তোলে। অন্ধকার যুগের সংকীর্ণ যাজকীয় ব্যবস্থায় ল্যাটিন সভ্যতা সব কিছুকে ছাড়িয়ে যায়। মানুষ এতোদিন যেসব জিনিসকে ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করে এসেছে সেগুলি সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে ওঠে। তারা যে ল্যাটিন সাহিত্যের অধিকারী ছিল তাঁর সংকীর্ণতা, দারিদ্র্য ও মৌলিকত্বের অভাবের দরুন কৌতূহল মিটাতে না পেরে নিজেদের আকাঙক্ষা পূরণের জন্য অন্যদিকে দৃষ্টি ফিরাতে বাধ্য হয়। তারা কিছুটা আক্রোশ থাকলেও এতদিন পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের সামরিক প্রাধান্য স্বীকার করে নেয়। বর্তমানে তারা লজ্জার সঙ্গে উপলব্ধি করে যে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিক দিয়েও মুসলিম বিশ্ব উন্নত। যে আরবী বিজ্ঞানের জোয়ারে তাদের এই দৃঢ়বিশ্বাস জন্মে তাঁর বাহন ছিল বিপুল পরিমাণ গদ্য সাহিত্য। এই সাহিত্য ইউরোপের সকল উদীয়মান সাহিত্যে কম-বেশি গভীরভাবে প্রবেশ করে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে রেনেসাঁর পথ উন্মুক্ত করে। কিন্তু মধ্যযুগীয় সাহিত্যে ইসলামের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল কাব্যে ও গদ্যে ইসলামী সংস্কৃতি ও ধ্যান-ধারণার প্রভাব। এই প্রভাব আরবী সূত্র থেকে বস্তুগত উপাদান ধার না করেও হতে পারে। কড়াকড়িভাবে বলতে গেলে বিষয়টি বর্তমান অধ্যায়ের আওতাবহির্ভূত হলেও সাম্প্রতিক গবেষকদের বারংবার প্রদত্ত কতিপয় অভিমত এখানে উল্লেখ না করে পারা যায় না। তাদের অভিমত অনুযায়ী মুসলিম বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ব এবং মহানবীর মিরাজের কাহিনীর (এর কোন কোনটির সূত্র প্রাচীনতর পারস্য রূপকথাও হতে পারে) উপাদানগুলি 'ডিভাইনা কমেডিয়ায়' প্রবেশ করেছে। এসব উপাদান সরাসরিও আসতে পারে। কিংবা লিজেন্ড অব টুণ্ডাল ও সেন্ট প্যাট্রিক্স পারগেটরি-এর ন্যায় পূর্ববর্তী পাশ্চাত্য রূপকথার মাধ্যমেও গৃহীত হতে পারে। কারণ আরবী দার্শনিক ধ্যান-ধারণা ও মুসলিম অধ্যাত্মবাদের কাল্পনিক চিত্র ও আদি রস সুনিশ্চিতভাবে কেবল দান্তের রচনাতেই নয়, ডলসে স্টিল নুওভো-এর অন্যান্য কবির ধ্যান-ধারণা্য প্রতিফলিত হয়েছে। দান্তের সময় যেরূপ আগ্রহের সঙ্গে ইটালীতে আরবীয় চর্চা হতো তাতে এই অভিমতের ভিত্তি কিছুতেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অবশ্য বিস্তারিত পর্যায়ে কোন কোন ক্ষেত্রে ছাড়া এটি প্রমাণিত হয়েছে বলে এখনো ধরে নেওয়া যায় না। কিন্তু দান্তে যেভাবে কেবল খৃস্টান ঐতিহ্য ও ক্লাসিক্যাল অধ্যাত্মবাদই নয় ইসলামের অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্যগুলিকেও তাঁর প্রতিভার যাদু স্পর্শে একীভূত করেছেন। তা যদি তুলে ধরা যেতো তাহলে এই চিন্তাধারা আরো আকর্ষণীয় হতো।
মধ্যযুগের প্রসঙ্গ সমাপ্ত করার আগে কিছু সময়ের জন্য স্পেনের প্রসঙ্গে ফিরে যেতে হয় এবং সেখানে ইতিপূর্বে আলোচিত আরেকটি বিষয়ের উপর আলোকপাত করতে হয়। বিষয়টি হচ্ছে খৃস্টানদের দ্বারা বৃহত্তর অংশটি পুনর্বিজয়ের পর আন্দালুসিয়ায় আরবদের অলিখিত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অব্যাহত প্রভাব। গোঁড়ামিপূর্ণ যুক্তির ভিত্তিতে বিচার্য না হলেও এই প্রভাব স্পেনীয় সাহিত্যে এবং তাঁর মাধ্যমে ইউরোপীয় সাহিত্যে কোন অংশে কম লক্ষণীয় নয়। এ কথা কেউ অস্বীকার করবে না যে, দক্ষিণাঞ্চলের সাহিত্যে যে উত্তাপ ও আলোড়নমূলক উন্নততর কল্পনার স্বাক্ষর বিদ্যমান তা প্রথম কয়েক শতকে আন্দালুসিয়ার আরব সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং আন্দালুসীয়দের উপর উক্ত সংস্কৃতি যে ছাপ রেখে গেছে তারই ফলশ্রুতি। অবশ্য একথাও সত্য যে, সেভিল বিজয় থেকে গ্রানাডার পতন পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ে আন্দালুসীয়রা ভাষা, ঐতিহ্য ও সাহিত্য রীতির ক্ষেত্রে তাদের 'ক্যাস্টিলের' সহ-ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে একই ধারার অনুসারী ছিলেন। কিন্তু মূরীয় ক্ষমতা দুর্বল ও বিলুপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিরূপতার প্রধান কারণও দূরীভূত হয়। মূর ও খৃস্টানদের মধ্যে পারস্পরিক মৈত্রী সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে সাহিত্যিক অনুভূতিরও আকস্মিক এবং আমূল পরিবর্তন ঘটে। অধিকতর উত্তাপহীন ও কঠোর ক্যাস্টিলীয়দের মধ্যে আন্দালুসীয়রা যেন এমন এক জিনিসের অভাব বোধ করে যা তখনো তাদের হৃদয় তন্ত্রীতে অনুরণিত হচ্ছিলো। তাই সেটিকে ফিরে পাওয়ার জন্য তারা মূরীয় অতীতের প্রতি ফিরে তাকায়। যে সুমার্জিত সাহিত্য রস আমাডিস ডি গাউলা গ্রন্থটিকে অন্যান্য উপন্যাস থেকে পৃথক বৈশিষ্ট্য দান করেছে তাঁর মধ্যেই আন্দালুসীয় চেতনার প্রভাব পরিদৃষ্ট হয়। 'মরিস্কো' উপন্যাসে এর পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে এবং হিস্টোরিয়া ডেল অ্যাবেনসারেজ (১৫৫০ খৃস্টাব্দের পূর্বে) ও এর পরবর্তী গ্রন্থ জিনেস পেরেয ডি হিটার গুয়েরাস সিভিলেস-এ তাঁর চূড়ান্ত বিকাশ দেখা যায়। এসব উপন্যাস আংশিকভাবে মূল আরবী উপাদানের উপর ভিত্তি করে রচিত কিনা তা এখানে বিবেচ্য বিষয় নয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে, এগুলি মূরীয় ও স্পেনীয় সংস্কৃতির এমন এক সংমিশ্রণ ঘটায় যা আধুনিক ইউরোপীয় সাহিত্যের ইতিহাসের মোড় পরিবর্তন করে। এটিই ছিল আধুনিক উপন্যাসের জন্মলগ্ন। এদিক দিয়ে বিবেচনা করলে যে ডন কুইক্সট প্রেসকটের ভাষায়, সম্পূর্ণরূপে আন্দালুসীয় দীপ্তিতে উজ্জ্বল তাঁর রচয়িতা সারভেন্টিযও আন্দালুসীয় সংস্কৃতির কাছে ঋণী (আরব ইতিহাসবিজ্ঞানী সিড হামেট বেনেন জেলির মাধ্যমে না হলেও)। স্পেনীয় সাহিত্যের অন্যান্য দিকপালের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য।
রেনেসাঁ প্রাচ্যকে পটভূমিতে নির্বাসিত করে একটি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এবং প্রাচ্য প্রভাবের জোয়ার রুদ্ধ করে। কিন্তু ক্লাসিক্যাল ব্যবস্থা স্থায়ী হতে পারেনি। ইউরোপের যে রোমান্টিক চেতনা ব্রেটনের উপন্যাসে টিউটনিক লোক-গাথায় এবং ইংরেজি নাটকে প্রকাশ লাভ করে তা আড়ষ্ট ও অবদমিত হয়। মুক্তি পাওয়ার জন্য একটি নির্গমন পথ খুঁজতে থাকে। প্যাস্টোরাল রোমান্স, বীরত্বব্যঞ্জক উপন্যাস 'পিকারেস্ক' প্রভৃতি সর্বপ্রকার সৃষ্টি একের পর এক ব্যর্থ হতে থাকে। পেরো একটি শক্তিশালী সূত্র অনুসরণ করে। কিন্তু তখনও লোককাহিনী আক্রমণের প্রচণ্ডতা সহ্য করার মত দৃঢ়তা লাভ করেনি। এরপর ১৭০৪ খৃস্টাব্দে গ্যালাণ্ডের অ্যারাবিয়ান নাইটস-এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়। সাম্প্রতিক গবেষণার ফলে জানা যায় যে, এই অনুবাদ একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। দীর্ঘকাল ধরে যে শৈল্পিক আদর্শ ধীরে ধীরে রূপায়িত হয় এটি ছিল তাঁর চূড়ান্ত মুহূর্ত। 'মরিস্কো' রোমান্স, প্রাচ্যে ভ্রমণ ও উপনিবেশ স্থাপন; ট্যাভার্নিয়ার, শারডেন, বার্ণিয়ার প্রমুখের ভারতীয় ও পারস্য জীবনের বর্ণনা, এবং যেসব প্রাচ্য দূতাবাস বিভিন্ন সময়ে তাদের সুষমায় প্যারিসকে উজ্জ্বলতা দান করে তাদের দ্বারা সৃষ্ট স্থানীয় বর্ণচ্ছটার মায়া এই আদর্শকে পরিপুষ্ট করে তোলে। নিঃসন্দেহে এসব ছিল বাহ্যিক; কিন্তু এই দীর্ঘ সময় ধরে প্রাচ্যের সেই আকর্ষণীয় বর্ণ, প্রেমরস ও রহস্যভরা রোমান্টিক কল্পচিত্র গড়ে ওঠে যা আমাদের এ যুগের রচনাকেও নাড়া দেয়। নির্ভেজাল প্রাচ্য বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন অ্যারাবিয়ান নাইটস সঙ্গে সঙ্গে এবং সামগ্রিকভাবে সাফল্য লাভ করে। পাঠক সাধারণের কল্পনায় বিস্ফোরণ ঘটে। পাঠকদের এই পছন্দের সুযোগ গ্রহণের জন্য প্রকাশকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। অ্যারাবিয়ান নাইটস-এর অনুসরণে প্রকাশিত হয় পার্সিয়ান টেলস (সহস্র ও এক দিবস)। 'টার্কিশ টেলস' হিসাবে পুরোন বুক অব সিন্দবাদ-এর পুনরাবির্ভাব হয়। খাঁটি উপাদানের অভাব দেখা দিলে পরিশ্রমী লেখকগণ তা পূরণ করার জন্য সক্রিয় হয়ে ওঠেন। নিউলেট এক যুগ পর্যন্ত মানুষের মনের ক্ষুধা নিবারণের জন্য কৃত্রিম অনুবাদের পন্থা অবলম্বন করেন এবং মন্টেসকিউ তাঁর লেটার্স পার্সেন্স-এ নতুন ধরনের সামাজিক সমালোচনা সৃষ্টি করেন।
ইংল্যান্ডেও এই উন্মত্ততা কোন অংশে কম ছিল না। অ্যারাবিয়ান নাইটস, পার্সিয়ান টেলস এবং টার্কিশ টেলস, প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনূদিত হয় এবং এগুলির সংস্করণের পর সংস্করণ প্রকাশিত হতে থাকে। একটি পারস্য কাহিনীকে কিভাবে 'হাফ-এ-ক্রাউন' মূল্যে দ্রুত প্রচার করা যায় বহু অনুকরণকারী গিউলেটর দৃষ্টান্ত থেকে তা আয়ত্ত করেন। অষ্টাদশ শতকের 'প্রাচ্য' সাহিত্যে যা প্রতিফলিত হয় তা এক অদ্ভুত 'প্রাচ্য' ছিল। এই প্রাচ্যকে ঐ সময়কার রোমান্টিক কল্পনা নিজস্ব ধ্যান-ধারণা অনুযায়ী নতুন রূপে চিত্রিত করে। খলীফা, কাজি ও জিনের পোশাকে এতে অদ্ভুত সব ছবি স্থান পায়। এতো বড়ো বিকৃতি স্থায়ী হতে পারেনি। হ্যামিলটন, পোপ ও গোল্ডস্মিথের কশাঘাতে কৃত্রিম প্রাচ্য রোমান্স দমে যায়, যদিও ইতিমধ্যেই তা সাহিত্যে তাঁর স্বাক্ষর রাখে। এতে ইংল্যান্ডে ওল্ড টেস্টামেন্টের অনুরূপ ছন্দে দি ভিসন অব মিরযা (যে স্ফুলিঙ্গ রবার্ট বার্ণসের কল্পনায় প্রথম আলোকিত করে) এবং র্যাসেলাস-এর সৃষ্টি হয়। ফ্রান্সে এক অদ্ভুত ঘটনা পরম্পরায় নীতিমূলক গল্পের সত্যিকারের প্রাচ্য রীতিতে ফিরে গিয়ে এটি ভল্টেয়ার ও অন্যান্য সংস্কারকদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যঙ্গ রচনার পটভূমি দান করে। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড উভয় দেশেই এটি বেকফোর্ডের ব্যাথেক-এর ন্যায় একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের জন্ম দেয়। এই বইটি প্রাচ্যের বিষয়বস্তু ও চিত্রকল্পের সঙ্গে 'গথিক রোমান্সের' সংমিশ্রণ ঘটিয়ে পরবর্তী অর্ধ শতকের অধিকাংশ কল্পনামূলক রচনাকে পূর্বসূরি হিসাবে প্রভাবিত করে। অবশ্য অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে জনসাধারণের রুচিকে রোমান্টিক আন্দোলন নামে পরিচিত নন-ক্লাসিক্যাল ও মধ্যযুগীয় পর্যায়ে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে এর পরোক্ষ প্রভাব ও প্রবণতা সৃষ্টি।
কিন্তু অ্যারাবিয়ান নাইটসের সাফল্য বিশ্লেষণ করার জন্য আরো কিছু বলা দরকার। পাঠক শ্রেণী বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং অধিকতর জনপ্রিয় সাহিত্যের চাহিদা থাকায় ফরাসী ও ইংরেজি সাহিত্যে যে সংকটের সৃষ্টি হয় সম্ভবত তাঁর মধ্যেই এর কারণ নিহিত। ক্লাসিকবাদ অন্তত ইংল্যান্ডে কখনো সত্যিকারের জনপ্রিয় ছিল না। সপ্তদশ শতকের ভারিক্কি ও মন্থরগতি উপন্যাসগুলি জনসাধারণ তেমন পছন্দ করত না। এটি ছিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার যুগ, যেখানে ডেফো, স্টীল ও এডিসনের ন্যায় লেখকগণ একটি নতুন স্টাইল সৃষ্টির প্রয়াস পান। অ্যারাবিয়ান নাইটস মূলত জনগণের উপযোগী একটি সাহিত্যকর্ম। এতে সাহিত্য শিল্পের সবগুলি সূক্ষ্ম উপাদান না থাকলেও একটি উপাদান সব চাইতে বেশি পরিমাণে বিদ্যমান এবং তা হচ্ছে দুঃসাহসিক অভিযানের প্রাণশক্তি। এটি জনপ্রিয় সাহিত্যের জন্য অপরিহার্য হলেও লেখক-সাহিত্যিকরা এতো দিন পর্যন্ত তা উপেক্ষা করেন। এরূপ বলা অতিশয়োক্তি হবে না যে, জনপ্রিয় লেখকরা যে সূত্রের সন্ধান করছিলেন এটি তা উন্মুক্ত করে। বস্তুত অ্যারাবিয়ান নাইটস না হলে কোন রবিন্সন ক্রুসো এমনকি সম্ভবত গালিভার্স ট্রাভেলও হতো না।
অষ্টাদশ শতকে প্রাচ্য কাহিনীর প্রচলন কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং এগুলি কতোটা প্রভাব বিস্তার করেছিল, এই বিষয়গুলি আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসবিদগণ উপেক্ষা করেন। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে সরাসরি অনুকরণের মাধ্যমে সৃষ্ট দুর্বল সাহিত্যে নিঃসন্দেহে এর বিশ্লেষণ পাওয়া যাবে। এই বাস্তব অবস্থার আলোকেই ব্রুনেটিয়ার তাঁর সমালোচনায় বলেছেন যে, মুসলিম প্রাচ্যের সঙ্গে যোগাযোগের ফলে কেবল আমাদের সাহিত্যের এমন একটি শাখা সমৃদ্ধ হয়েছে যা জাতীয় লজ্জা হিসাবে চিহ্নিত। এই শতকের মানসিকতা্য প্রাচ্য কাহিনী যে গভীর ছাপ রেখেছে সে সম্পর্কে অন্যান্য অভিমতও রয়েছে। ১৭৭০ খৃষ্টাব্দে তাঁর হিস্টরী অব ইংলিশ পোয়েট্রি লিখতে গিয়ে ওয়ার্টনের কাছে এটি স্বয়ংসিদ্ধ বলে প্রতীয়মান হয় যে, মধ্যযুগের রোমান্টিক আন্দোলন সম্পূর্ণরূপে একটি আরব অবদান ছিল। ওয়ার্টনের অভিমত অতিরঞ্জিত হলেও এর অস্তিত্ব এবং স্বীকৃতি তাঁর যুগ যে সব ধ্যানধারণায় অনুপ্রাণিত হয় তাঁর উপর আলোকপাত করে। সাউদে তাঁর থালাবা ও দি কার্স অব কেহামা নামক বর্ণনামূলক কাব্যের জন্য যেসব বিষয়বস্তু নির্বাচন করেছেন তাঁর মধ্যেও একই তন্ময়তা পরিদৃষ্ট হয়। আধুনিক সমালোচকদের কাছে এগুলি 'বিচ্ছিন্ন ও জনমত বর্জিত ধারণা' বলে মনে হলেও বিংশ শতকের নারী-পুরুষের কাছে 'আলী বাবা' ও 'আলাদিন' যতটা বিচ্ছিন্ন ও জনমত বর্জিত ছিল তাদের যুগে তাদের কাছে 'মগরেবী দি ম্যাজিসিয়ান' ও অন্যান্য অদ্ভুত কল্পনামূলক প্রাচ্য কাহিনী তাঁর চাইতে বেশি বিচ্ছিন্ন ও জনমত বর্জিত ছিল না; কারণ এসব কাহিনী একইভাবে সে যুগের লোকদেরও উজ্জীবিত করে।
সব কিছুর ঊর্ধ্বে অ্যারাবিয়ান নাইটস টিকে আছে। এগুলিতে এমন একটি উপাদান রয়েছে যা কল্পনা জগতকে নাড়া দিতে কখনো ব্যর্থ হয় না। যে উপাদান তাঁর অনুকরণকারীদের জন্য সৌভাগ্যের দ্বার উন্মোচিত করে তা কেবল বর্ণাঢ্যতা এবং কল্পনা জগতই নয়। এসব কাহিনীতে যাদুকরী ও রহস্যময় দিক বাস্তবতার দৃঢ় ভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত। চরিত্রগুলি নির্দিষ্ট মানের ও অবিকশিত হলেও তাদের দুঃসাহসিক অভিযানগুলি ছিল সত্যিকারের শিহরণমূলক দুঃসাহসিক অভিযান, যা নাটকীয় আবেগ নিয়ে বর্ণিত হয়। এই অদ্ভুত ও কল্পনা জগতের মধ্যে নিহিত রয়েছে নৈতিকতার একটি প্রাণকেন্দ্র। এটি না থাকলে এগুলি ইউরোপের হৃদয়ের এতো গভীরে প্রবেশ করতে পারতো না কিংবা দুই শতাব্দীকাল পর্যন্ত শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে সকলের হৃদয় জয় করতে পারতো না। সত্যিকারের প্রাচ্য অধিকতর সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং এর প্রভাব আরো বলিষ্ঠ হয়। এতদিন পর্যন্ত যেসব বিদঘুটে পরিস্থিতি এটিকে আচ্ছন্ন করে রাখে সেখান থেকে তা মুক্ত হয়।
একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, ইউরোপ তখনো প্রাচ্যের সত্যিকারের সাহিত্য ও চিন্তাধারা সম্পর্কে গভীরভাবে অজ্ঞ ছিল। উইলিয়াম জোন্স 'ভাষাবিদ হিসাবে নয়, রুচিবান হিসাবে এবং বিশ্লেষক হিসাবে নয়, কবি হিসাবে' যখন ১৭৭৪ খৃষ্টাব্দে তাঁর ল্যাটিন কমেন্টারীজ অন এশিয়াটিক পোয়েট্রি প্রকাশ করেন তখন একটি নতুন পৃষ্ঠা উন্মোচিত হয়। পশ্চিম ইউরোপের সংস্কৃতিমনা ও ক্লাসিক্যাল ধারায় শিক্ষিত লোকেরা সর্বপ্রথম মুক্ত মনে আরবী ও পারস্য কাব্য উপলব্ধি ও উপভোগ করতে সক্ষম হন। কিন্তু ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের সাহিত্য ঐতিহ্যের ভারে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত থাকায় নতুন জার্মান আন্দোলন এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগায়। এগুলি ছিল অবাধ মাধ্যম। জনসাধারণের রুচির সেবক নয়, স্রষ্টা। তাছাড়া পারস্য কাব্য ইতিমধ্যেই জার্মান সাহিত্যে তাঁর স্বাক্ষর রাখে। এক শতাব্দীরও আগে পর্যটক ও পণ্ডিত ওলিয়ারিয়াস শেখ সাদীর গুলিস্তাঁ ও বুস্তা-এর যে অনুবাদ করেন তা ঐ সময়কার জার্মান সাহিত্যকে সজীবতা ও প্রাণশক্তি দান করে এবং গ্রিমেলসওসেনের জোসেফ কাহিনীর ইউসুফ এণ্ড যুলেখা গল্পে পারস্য সাহিত্যের একটি অব্যাহত প্রভাব দৃষ্ট হয়। অপর দিকে লেসিং তাঁর উপদেশাত্মক রচনায় একটি প্রাচ্য প্রেক্ষিত প্রদানে ভল্টেয়ারকে অনুসরণ করেন। ওয়েহলেন শ্লেগারের আলী অ্যাণ্ড গালহিন্দী-এর ন্যায় রোমান্টিক শ্রেণীর গ্রন্থগুলি আদর্শগতভাবে অষ্টাদশ শতকের অদ্ভুত কল্পনাপ্রবণ রচনা। তাঁর পরবর্তী নাটক অ্যালাড্ডিনে (১৮০৮) অ্যারাবিয়ান নাইটস, পরী, বামন ও ভারতীয় নীতিমূলক গল্পের সংমিশ্রণ থাকলেও প্রাচ্যকে সম্যকভাবে উপলব্ধির সেই আভাস পাওয়া যায় যা ঐ সব জিনিসকে ধীরে ধীরে বিদূরিত করে।
সত্যিকারের এই উপলব্ধির জন্য জার্মানী কবি-জ্ঞানীদের একটি উল্লেখযোগ্য শ্রেণীর কাছে ঋণী ছিল। উইলিয়াম জোন্স যে কাজ শুরু করেন তারা তা অব্যাহত রাখেন। হার্ডারের প্রভাবে জার্মান রোমান্টিক আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনার আবেগপূর্ণ প্রেরণা প্রাচ্য সাহিত্য এবং চিন্তাধারাতেও সম্প্রসারিত হয়। প্রথম যুগে শ্লেগেল ও হ্যামার এবং দ্বিতীয় যুগে রাকার্ট পাশ্চাত্যের কবি ও লেখকদের কাছে নতুন ও প্রায় সন্দেহাতীত ধনভাণ্ডার উদ্ঘাটিত করেন। এমনিভাবে ভারতীয়, পারস্য, আরব প্রভৃতি প্রাচ্য সাহিত্য উনবিংশ শতকের জার্মান সাহিত্যে এতো অধিক পরিমাণে প্রবেশ করতে সক্ষম হয় যা মধ্যযুগীয় স্পেনীয় সাহিত্যের পর ইউরোপে অতুলনীয়। পাশ্চাত্যের 'গুলিস্তানে' প্রথম এবং সুন্দরতম ফুল ছিল গথের ওয়েস্টসলিচ ডিভান। তাঁর উত্তরাধিকারীরা আরো অগ্রসর হন। তারা তাদের পাশ্চাত্য আদর্শগুলি নিজেদের জন্য পড়েন ও অনুবাদ করেন। রাকার্টের ন্যায় তারা পারস্যের ধ্যান-ধারণা ও চিত্রকলা পুনঃ প্রকাশ, এবং অনুকরণ করেন, আর তা না করলেও প্লাটেনের ন্যায় পারস্যের ছন্দরীতি পুরোপুরি অনুসরণ করেন। অপর দিকে গথে প্রাচ্যের কাব্যে সকলের আগে ঐ যুগের নিষ্ঠুর বাস্তবতা থেকে কল্পনার জগতে মুক্তির আস্বাদন গ্রহণের একটি পন্থা খুঁজে পান। নিছক অনুকরণ তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি; তিনি বরং পারস্য কাব্যের শিল্পসৌকর্য ও ধ্যান-ধারণাকে সেগুলির সঙ্গে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ ইউরোপীয় ঐতিহ্যের মধ্যযুগীয় ও 'রোমান্টিক' উপাদানসমূহের সঙ্গে জোয়ালবদ্ধ করে তাঁর নিজস্ব চিন্তাধারা প্রকাশের জন্য একটি নতুন ভাষাগত বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করেন। একই সময়ে তিনি এমন এক বিশ্বজনীনতার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন, যেটিকে জার্মান সাহিত্যে প্রতিফলিত করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য।
কিছুকালের জন্য পারস্য ও ভারতীয় রীতি অব্যাহত থাকে। এমনকি নিজস্ব ব্যঙ্গ রচনায় ব্যবহার না করলেও হাইনে তাঁর গীতিকাব্য থেকে সামগ্রিকভাবে প্রাচ্যের নিদর্শন পরিহার করতে পারেন নি। কিন্তু এটি ব্যর্থ হয়, কারণ এটি ব্যর্থ হতে বাধ্য। এটি ছিল: চারা গাছের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত উষ্ণ গৃহের (হটহাউস) উদ্ভিদ, তাই সংস্কার না করে ইউরোপীয় ভূমিতে তা পরিবর্ধন করা যায় না। এরূপ অভিমতের মধ্যে যথেষ্ট সত্য রয়েছে যে, কবির মধ্যে প্রাচ্যের চিন্তাধারা যত বেশি অনুপ্রবেশিত হয় তাঁর রচনা সাহিত্য হিসাবে ততো কম সার্থকতা লাভ করে। গথের প্রতিভা সহজাতভাবে হাফিযের সর্বপ্রকার উপাদান বর্জন করে। কারণ সেগুলিকে তিনি স্বাভাবিক মনে করেননি। তবুও তাঁর রচনাবলীর মধ্যে উৎকৃষ্টতমগুলির পরেই ডিভান-এর স্থান। জাল রচনা লাইডার ডেস মিরযা শফী-এর মাধ্যমে কেবলমাত্র বোডেনস্টেডট জনসাধারণের কল্পনায় আবেদন সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। কিন্তু জার্মান রোমান্টিক আন্দোলনের প্রাচ্য কাব্যকে সাহিত্য হিসাবে উচ্চ মর্যাদা দেওয়া না গেলেও, কিংবা এটি আধুনিক ইউরোপীয় কাব্যের সঙ্গে প্রাচ্য কাব্যের সংমিশ্রণ ঘটাতে না পারলেও পুনঃ প্রকাশ ও অনুবাদের মাধ্যমে এটি শেষ পর্যন্ত ইউরোপের সাহিত্য ধারায় মূল্যবান অবদান রাখে এবং এমন এক দ্বার উন্মুক্ত করে যা কখনো বন্ধ হয়নি।
জার্মান সাহিত্যে প্রাচ্য প্রবাহের আংশিক প্রবেশ আরো বিস্তৃততর ক্ষেত্রে একটি প্রাচ্যমুখী আন্দোলনের আশা জোরালো করতে পারতো এবং এই আশা কার্যত আরো জোরালো হয়। কিন্তু উনবিংশ শতকে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স এই আশা সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। ভালোর জন্যই হোক আর মন্দের জন্যই হোক পাশ্চাত্যের মন প্রাচ্য থেকে আকস্মিকভাবে আগের যে কোন সময়ের তুলনায় অনেক দূরে সরে যায়। নিজস্ব নতুন দর্শন, নতুন রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণা, নতুন আবিষ্কার ও বিপুল শিল্পোন্নয়নের উন্মাদনায় প্রাচ্যের দিকে মনোযোগ দেওয়ার কোন মনোভাব ছিল না। প্রাচ্যের চিন্তাধারা ধৈর্যের সঙ্গে উপলব্ধি করার অবকাশও আদৌ ছিল না। জাতীয়তাবাদের চাকার নিচে গথের একটি ওয়েলটলিটারেচার-এর আদর্শ বিচূর্ণ হয়। এমনকি জার্মানীতেই তা ধ্বংস হয়। এতদসত্ত্বেও উনবিংশ শতকের এবং আমাদের সময়কার সাহিত্যে প্রাচ্য, বিশেষ করে মুসলিম প্রাচ্য যে স্থান দখল করে আছে তা মোটেই উপেক্ষণীয় নয়। এটি আপাত বিরোধী সত্য বলে মনে হয় যে, যে যুগে আগের যে কোন সময়ের তুলনায় প্রাচ্য পাশ্চাত্যের সঙ্গে অধিকতর ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং পাশ্চাত্যের জনগণের কল্পনায় প্রাচ্যের আকর্ষণ ক্ষমতা সব চাইতে বেশি প্রবল, সে সময় প্রাচ্য সাহিত্যের দাবি সামগ্রিকভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের রোমান্টিক আন্দোলন এবং হার্ডারের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনের মধ্যে যে বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য রয়েছে তাঁর মধ্যে অন্তত আংশিকভাবে হলেও এর বিশ্লেষণ অনুসন্ধান করতে হবে।
ফ্রান্সের রোমান্টিক আন্দোলন জার্মানীর তুলনায় কম উৎসাহমূলক ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে কম সংশ্লিষ্ট ছিল। সেখানে এতে গথে ও শিলারের চাইতে বায়রন ও স্কটের প্রভাব ছিল বেশি। তাই সেখানে নতুন প্রাচ্যবাদের স্বাক্ষর কদাচিৎ দেখা যায়। রাজনৈতিক তন্ময়তা এবং যে বৈশিষ্ট্যের জন্য ফরাসী সাহিত্যের প্রাদেশিকতার অপবাদ রয়েছে তাঁর দরুন ফরাসী লেখকগণ নিজেদের দেশের কাছাকাছি জিনিসের মধ্যেই তাদের মনোযোগ নিবদ্ধ রাখেন। একথা সত্য নয় যে, প্রাচ্যকে উপেক্ষা করা হয়। বরং ভিক্টর হিউগো তাঁর লেস ওরিয়েন্টাল-এর ভূমিকায় লিখেছেন, 'সমগ্র বিশ্ব গ্রীক ভাষাবিদ ছিল, এখন তা প্রাচ্যবিদ।' তিনি প্রাচ্য বিশ্বের প্রতি গভীর কাব্যিক সহানুভূতি প্রকাশ করেন। 'তিনি যেন দূর থেকে এর মধ্যে একটি সমৃদ্ধ কাব্যকলার ঔজ্জ্বল্য দেখতে পান। এটি একটি ঝর্ণা যেখানে তৃষ্ণা নিবারণের ইচ্ছা তিনি দীর্ঘকাল যাবত পোষণ করেন। বস্তুত সেখানে সব কিছুই বিশাল, সমৃদ্ধ এবং উৎপাদনশীল। কাব্যের সে আর এক মহা সমুদ্র। কিন্তু এই ঘোষণা সত্ত্বেও তাঁর কবিতায় কোন উল্লেখযোগ্য প্রাচ্য অবদান খুঁজে বের করা দুষ্কর। যে সব পারস্য কবি গথে ও জার্মানদের উপর তাদের যাদুকরী প্রভাব সৃষ্টি করেছেন তাদের প্রভাব তাঁর মধ্যে অবশ্যই নেই। বরং আরব কবিদের প্রতিই তাঁর সহানুভূতি ছিল। আরব থেকে পারস্য একটি প্রচণ্ড পরিবর্তন; এটি যেন একটি পুরুষ জাতির পর একটি নারী জাতির কাছে আগমন...... পরাধীন জাতির কাব্য সৃষ্টি। পারস্যবাসী হচ্ছে এশিয়ার ইটালীয়বাসী। তাঁর কাছে প্রাচ্য, লেস ওরিয়েন্টেলস-এর যিম-যিযিমির প্রাচ্য, তখনো অষ্টাদশ শতকের ঐতিহ্য অনুযায়ী মূলত একটি উজ্জ্বল ও দুর্বিনীত প্রাচ্য ছিল। এই প্রাচ্য গোটিয়ের ফচুনিয়ো চরিত্রে প্রতিফলিত হয়েছে। কিংবা কবি ও পণ্ডিতদের কল্পনা ও স্বর মাধুর্যের আবাস না হয়ে এটি বায়রনের একটি সুশোভিত প্রাচ্য। ডেলাক্রওয়া আলজিরীয় বিষয়বস্তুকে যেভাবে চিত্রিত করেছেন তেমনিভাবে তিনি এটিকে তাঁর উজ্জ্বল বর্ণের শৈল্পিক রূপ দেওয়ার জন্য ব্যবহার করেছেন। ফ্রান্সের প্রায় সব রোমান্টিক লেখকের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। জেরার্ড ডি নার্ভাল ও জ্যেষ্ঠ গোটিয়ের ন্যায় কেউ কেউ অনেকটা জার্মান সাহিত্য চর্চার প্রভাবে প্রাচ্যের প্রতি সত্যিকারের সংশ্লিষ্টতা অনুভব করেন। কিন্তু তাদের প্রাচ্যবাদ প্রায়ই ধার করা। ব্রুনেটিয়ারের ভাষায় প্রাচ্যের জিনিস পরিচিত হতে গিয়েও 'আভ্যন্তরীণ' হয়নি।
উনবিংশ শতকে ইংরেজি সাহিত্য মূলত ফ্রান্সের ন্যায় একই পর্যায়ে ছিল। নতুন প্রাচ্যবাদ আশা অনুযায়ী অধিকতর স্বাক্ষর রাখলেও প্রাচ্য আলঙ্কারিক পটভূমি সৃষ্টির বাইরে তেমন কোন অবদান রাখেনি। এই পটভূমি 'স্থানীয় রঙের' ওপর রোমান্টিকতার আমেজে সমৃদ্ধ হয় এবং তা স্কট ও জার্মান আন্দোলনের অবদান। এই অপর প্রাচ্যকে বায়রনই জনপ্রিয় করেন এবং এর ক্লাসিক দৃষ্টান্ত হচ্ছে মূর-এর লাল্লা রুখ। অ্যারাবিয়ান নাইটস কাঠামো গল্পের কয়েকটি উপাদানে সীমাবদ্ধ হয় এবং জোন্স, ডি হার্বিলট ও প্রাচ্যবিদদের রচনার ওপর ভিত্তি করে কাব্য-কাহিনীগুলি রচিত হয়। প্রাচ্যের ভাবধারা ও চিত্রকল্পে নিজস্ব কল্পনাকে ভরে তোলার জন্য মূর দুই বছর পর্যন্ত নিভৃতে অবস্থান করেন। কিন্তু এর ফলে নিজস্ব তৃপ্তি লাভ করলেও তাঁর কাব্য কেরল স্কটের রচনাভঙ্গিকে তাঁর আবাসভূমি থেকে ভারতে বয়ে নিয়ে যায়। অন্যদের ব্যাপারে বলতে গেলে বড় বড় কবিদের ক্ষেত্রে প্রাচ্যবাদের স্থান অতি সামান্য। সোহরাব এণ্ড রুস্টাম ফেরিস্টাহস ফ্যান্সীজ প্রভৃতি গ্রন্থে নাম ছাড়া প্রাচ্যের নিদর্শন নেই বললেই চলে। গদ্য সাহিত্যে শাগপাট আরব আদর্শের ওপর এককভাবে স্বকীয়তা বজায় রেখেছে।
অতএব এই আপাতবিরোধী সত্যের সমাধান হচ্ছে যে, যেখানে মুসলিম প্রাচ্য সংশ্লিষ্ট সেখানে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের কবি-সাহিত্যিকগণ পর্দার অন্তরালে যে বাস্তবতা তাদের প্রেরণা যোগাতো সেখান থেকে তাদের নিজস্ব কল্পনার রোমান্টিক দৃশ্যের তন্ময়তা্য অন্যমনস্ক হতেন। প্রাচ্যকে নিছক রঙের পরিকল্পনা হিসাবে ব্যবহার করা হতো। মানব জাতির আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারিত্বে এর অবদানের যে দাবি করা হয় তা অধৈর্যের সঙ্গে একদিকে সরিয়ে দেওয়া হতো। বহুকাল আগে স্যার উইলিয়াম জোন্স মন্তব্য করেন যে, এশিয়ার জনগণ ও প্রাকৃতিক ইতিহাস সম্পর্কে গভীরতাপূর্ণ জ্ঞান না থাকলে এশীয় কাব্যের সমঝদার হওয়া সম্ভব নয়। যতদিন পর্যন্ত এই অপরিহার্য জ্ঞান গুটিকয়েক পণ্ডিত ব্যক্তি ও সিভিল সার্ভেন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল ততদিন পর্যন্ত ইউরোপের ওপর প্রাচ্য সাহিত্য ও চিন্তাধারার কোন উৎপাদনশীল প্রভাব সৃষ্টির প্রশ্নই ওঠেনি। যারা প্রাচ্যকে সম্যকভাবে উপলব্ধি করে এবং যারা গোবিনিউ ও মোরিয়ারের ন্যায় কিছুটা ব্যঙ্গাত্মক সহানুভূতি নিয়ে এর চিত্র অঙ্কন করে তারা নিঃসন্দেহে প্রাচ্য সাহিত্য ও প্রাচ্য জীবনের কাছে কিছুটা ঋণী। কিন্তু এই ঋণ পরিমাপ করা দুঃসাধ্য।
তবুও উনবিংশ শতকেও প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মৌল সম্পর্কের স্বাক্ষর বহন করে। একজন ইংরেজ যেভাবে ভ্যার্থেক-এ প্রাচ্য ও গথিক কাহিনীর সংমিশ্রণ সৃষ্টি করেন, ঠিক তেমনিভাবে বর্তমান কালেও আরেকজন ইংরেজ পাশ্চাত্য কাব্যের অন্তস্থলে জনৈক প্রাচ্য কবির প্রবেশ ক্ষমতা প্রদর্শন করেন। ফিজিরান্ডের ওমর খৈয়াম একই সময়ে সত্যিকারের পারসিক এবং সত্যিকারের ইংরেজি। এটি অনুবাদ নয়, পুনঃসৃষ্টি। বিখ্যাত চতুষ্পদী শ্লোকগুলিতে প্রকাশিত কবি-মানস অত্যন্ত বীরত্বব্যঞ্জক বা উচ্চমার্গের না হলেও এতে ঐ যুগের সঠিক সুর ধরে রাখা হয়েছে এবং আটশত বছর আগে ইস্পাহানের সভ্য সমাজের সুমার্জিত ভোগ সুখবাদকে যেভাবে প্রতিধ্বনিত করা হয় ঠিক তেমনিভাবে এটিও প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
ইউরোপীয় সাহিত্যের দিকে দৃষ্টি ফিরালে প্রথমে মনে হয় যে, মুসলিম প্রাচ্যের সাহিত্যের প্রভাব একটি সংকীর্ণ ও অনুৎপাদনশীল ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। কিন্তু যখন এটি উপলব্ধি করা যায় যে, প্রাচ্য সেখানকার চেতনায় খামিরের ন্যায় কাজ করেছে, তখনি এর অনেক বিস্তৃততর গুরুত্ব বোঝা যায়। আমাদের অভিমত নির্ভুল হলে তিনটি পৃথক পৃথক যুগে এটি পাশ্চাত্য সাহিত্যে ফলশ্রুতি সৃষ্টি করেছে। এসব ফলশ্রুতি একই ধরনের হলেও পরিমাণের দিক দিয়ে এক নয়। প্রত্যেক বারেই এর কাজ ছিল একটি সংকীর্ণ ও নির্যাতিত অবস্থা থেকে কল্পনার মুক্তি সাধন, গতানুগতিকতার প্রাচীরে প্রথম ভাঙন সৃষ্টি। এতোদিন পর্যন্ত যে সৃজনশীল প্রেরণা সুপ্ত বা প্রাণহীন ছিল এবং যা প্রাচ্য সাহিত্য পাশ্চাত্যকে ঋণ হিসাবে দিয়েছে, সেই প্রেরণা উদ্দীপ্ত করার ক্ষমতা এর ছিল। আন্দোলন একবার শুরু হলে নিজস্ব আভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে তা প্রাণবেগ লাভ করে। যে সব প্রাচ্য উপাদান আয়ত্ত করা হয় সেগুলি স্থানীয় উপাদানের সঙ্গে এমনভাবে সংমিশ্রিত হয় যে, চূড়ান্ত পর্যায় সেগুলিকে প্রায়ই চেনা যায় না। প্রাচ্য যেখানে ইউরোপীয় সাহিত্যের জন্য আদর্শসমূহ সরবরাহ করেছে সেখানে সে নিম্ন পর্যায়ের ভূমিকা গ্রহণ করেছে। মধ্যযুগে ইসলামী সভ্যতা ও খৃস্টান জগতের মধ্যে যখন জ্ঞানচর্চার পদ্ধতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় তখন শেষোক্তদের অনুকরণই বেশি ফলপ্রসূ হয়। রেনেসাঁর পর এটি বড়জোর নির্দোষ কৌতূহলের সৃষ্টি করে। একই কারণে প্রাচ্য সাহিত্যের সঙ্গে মধ্যযুগীয় চিন্তাধারার যোগাযোগের ফল পরবর্তীকালের যোগাযোগের ফলের চাইতে অনেক বেশি ব্যাপক।
এই তিনটি আকস্মিক যোগাযোগের মুহূর্তগুলি অনুসরণ করে জার্মান রোমান্টিক লেখকরা পুনরায় প্রাচ্যের দিকে দৃষ্টি ফেরায় এবং প্রাচ্য কাব্যের সত্যিকারের লব্ধ সম্পদকে ইউরোপীয় কাব্যে প্রবেশ করানোর একটি পন্থা উন্মুক্ত করার জন্য সচেতনভাবে লক্ষ্য স্থির করে। নতুন ক্ষমতা ও প্রাধান্যবোধ নিয়ে উনবিংশ শতক তাদের এই লক্ষ্যের সামনে চূড়ান্তভাবে সমাজে দ্বার উন্মুক্ত করে। অপর দিকে বর্তমানে একটি পরিবর্তনের লক্ষণও দেখা দেয়। প্রাচ্য সাহিত্য তাঁর জন্যই আবার পঠিত হচ্ছে এবং প্রাচ্য সম্পর্কে একটি নতুন উপলব্ধি দানা বেঁধে উঠেছে। এই জ্ঞান প্রসারিত হওয়ার জন্য মানব জীবনে তাঁর যথাযথ স্থান পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গে প্রাচ্য সাহিত্য আর একবার তাঁর ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে পারে, এবং যে সংকীর্ণ ও নির্যাতনমূলক ধ্যান-ধারণা সাহিত্য, চিন্তাধারা ও ইতিহাসের সর্বপ্রকার উল্লেখযোগ্য জিনিসকে ভূ-মণ্ডলে আমাদের নিজস্ব ক্ষুদ্র অংশে সীমাবদ্ধ করে রাখবে-সেখান থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমাদের সাহায্য করতে পারে।
টিকাঃ
১. আরবীর প্রভাবের ক্ষেত্রে গথিক মধ্যস্থতার পক্ষে প্রফেসর লিও ওয়াইনারের উদ্ভাবনমূলক যুক্তিসমূহ কেনটিবিউশন টুওয়ার্ডস এ হিস্টোরী অব অ্যারাবীকে গথিক কালচার, ১ম খণ্ড, নিউইয়র্ক, ১৯১৭), বিশেষ করে ব্যাকরণবিদ ভার্জিলিয়াস মারো সম্পর্কিত অধ্যায় দ্রষ্টব্য।
১. ভূমধ্যসাগরের তীরে দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের একটি সাবেক প্রদেশের অধিবাসী, ভাষা, সাহিত্য ইত্যাদি। কতিপয় আঞ্চলিক ভাষার সমন্বয়ে গঠিত এখানকার সুস্পষ্ট রোমান্স ভাষা ইউরোপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের ভাষা ছিল। এই ভাষায় টুবাডুর নামে পরিচিত গীতি কবিরা সাড়া জাগানো কাব্য রচনা করেন।
২. ডেল অরিজিন ডেল্লা পোয়েসিয়া রিমাটা (টিরাবস্টি কর্তৃক প্রকাশিত মডেনা, ১৭৯০)।
৩. রিসার্চেস সুর এল হিস্টোরী.....ডি এল, এসপাঁনে ৩য় সং (১৮৮১) ২য় খণ্ড, পরিশিষ্ট ৬৪, নোট ২।
৩. এ বিষয়ের আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য: কে বুরদাচ্, উবার ডেন আর্সপ্রাং ডেন মিটেনালটার লিচেন মিনেসাংস, এস বি প্রিউস। অ্যাকাড, উইস, ১৯১৮।
১. হিস্টোরি ডেস মুসুলমানস ডি এল, এস পাগনে, ২য় ২ ২৭ এফ এফ (জি স্টোক্সের ইংরেজী অনুবাদ, স্প্যানিশ ইসলাম, পৃষ্ঠা ৩৩২-৫।)
২. ইবনে হাযম্ (মৃ. ১০৬৪) তাওক আল-হামামা (লি কোলিয়ার ডি লা কলোম্বে), পরিচিতিসহ সম্পাদনা, পেটফ, লিডেন, ১৯১৪।
১. ডন জুলিয়ান রিবেরা ডিসারটেনিয়াস ওয়াই ওপাসকুলস (মাদ্রিদ, ১৯২৮), ১ম, ১২-৩৫, ১০৯-১২।
২. স্টোফি শব্দের বিশেষণ: প্রাচীন গ্রীক থিয়েটারে সমবেত সঙ্গীতের গায়কদল মঞ্চের ডান দিক থেকে বাম দিকে গমনের সময় যেভাবে সুরের পরিবর্তন ঘটাতেন গীতি কবিতার তেমনি পরিবর্তনমূলক স্তবক।
৩. দ্রষ্টব্য ফিস্মাউরিস কেলি, এ নিউ হিস্টোরী অব স্প্যানিশ লিটারেচার, ১৯২৬, পৃ ২৪; আর মেনেণ্ডেয পিডাল, এল রোমান্সেরো পৃঃ ৫৮।
১. রিবেরা, অপ সিট, ১ম, ৩৫-৯২।
১. দ্রষ্টব্যঃ রিবেরা, হিস্টোরিয়া ডিলা মিউজিকা অ্যারাবে মিডিয়েভ্যাল, ১৯২৭ এবং এইচ জি ফার্মার হিস্টোরিক্যাল ফ্যাক্টর ফর দি অ্যারাবিয়ান মিউজিক্যাল ইনফ্লুয়েন্স, ১৯৩০। পাদটীকা আকারে একথাও বলা যেতে পারে যে, এই দৃষ্টিকোণ থেকে রোমান্স কাব্যের পরিভাষা পুনরায় পর্যালোচনা করা দরকার।
২. এক সময় রোমান শাসনের অধীনে দক্ষিণ ফেলিস্তিনের একটি অংশ।
৩. লেকচার্স অন পোয়েটি (১৯১১), পৃঃ ৯৭; সি. এফ পৃঃ ১২৫; 'আরব সিরীয় একই জাতি সত্তার কাছে (কারণ ফিলিস্তিনও সেই একই জাতি ও অঞ্চলের একটি অংশ) আমরা প্রধানত সেসব উপাদানের জন্য ঋণী যা মধ্যযুগকে আধ্যাত্মিক ও চিন্তাশক্তির দিক দিয়ে রোম শাসিত বিশ্ব থেকে আলাদা করেছে।
৪. এম আমারী, স্টোরিয়া ডাই মুসুলমানি ডি সিসিলিয়া, ১৮৬৮-৭২, ৩য় ৭৩৮, ৮৮৯। আরো দ্রষ্টব্য জি সিসারিও, লি অরিজিনি ডেল্লা পোয়েসিয়া লিরিকা ইলা' পোয়েসিয়া সিসিলিয়ানা সট্টো গ্লি সোয়েতি ১৯২৪, পৃঃ ১০১, ১০৭।
১. দ্রষ্টব্য: জে এম মিল্লাস, ইনফ্লুয়েন্সিয়া ডি লা পোয়েসিয়া পপুলার হিসপানো-মুসুলমানা এন লা পোয়েসিয়া ইটালিয়ানা, রিভিজিটা ডি আর্চিভস ইত্যাদি, ১৯২০, ১৯২১।
৩. জে বেডিয়ার, লেস ফ্যাবলিয়া, ৫ ম সং; ১৯২৫।
৪. এ গুলির জন্য সাধারণভাবে দ্রষ্টব্য: এস সিংগার, 'অ্যারাবিস্স্ট আন্ডইউরোপাইসচ পোয়েসি ইমমিটেলালটার' আবহ, প্রিউস, আকাড, উইসেন চাফটেন, ১৯১৮।
১. অবশ্য ডন জন সরাসরি আরবী সূত্র থেকে নিয়েছেন, এ কথা প্রমাণ করা যায় না (জি মলডেন হাওয়ার, ডাই লিজেন্ডে ভন ব্যরলাম আশু জোসাপ্ট, ১৯২৯, ১০-৪)।
১. পিকারো শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ দুঃসাহসী দুষ্ট প্রকৃতির লোক, চোর, জলদস্যু ইত্যাদি। পিকারেস্ক এক ধরনের উপন্যাস যার নায়কের চরিত্র পিকারো-এর অনুরূপ। মূলত স্পেনে এ ধরনের উপন্যাসের উদ্ভব হয়। এর পিছনে মাকামাত-এর প্রভাব থাকা বিচিত্র নয়।
১. রিভিউ হিস্পানিক, ১০ম, (১৯০৯), ১১। এইচ জে, দি টুবাডুস্ (১৯১২), ১০৬।
২. এই সর্বশেষ প্রশ্নে দ্রষ্টব্য: এইচ জে চেটর, দি ট্রুবাডুস্ (১৯১২), ১০৬।
১. পিয়ের মার্টিনোঃ এল ওরিয়েন্ট ড্যানস লা লিটারেচার ফ্রাঙ্কয়েস আউ ১৬ শ এট আউ ১৮ শ সিকল, ১৯০৬।
১. ইবনে তুফায়লের দার্শনিক রোমান্স 'হাই ইবনে ইয়াক যান'-এ কখনো কখনো রবিন্সন ক্রুসো-এর মূল সূত্র অনুসন্ধান করা হয়।
১. আমি নিজে কখনো প্রাচ্যে না গেলেও যারা সেখানে গিয়েছেন তাদের প্রত্যেকেই ঘোষণা করেন যে, 'লাল্লা রুখ'-এ আমি যেভাবে প্রাচ্যকে, এর জনসাধারণকে এবং এর জীবনকে প্রতিফলিত করেছি তাঁর চাইতে অধিকতর পূর্ণাঙ্গ আর কিছু হতে পারে না।
১. অ্যালগেমাইন ডিউশ বায়োগ্রাফী, খণ্ড ২৪, পৃ. ২৭৫। ১৬৭১ খৃস্টাব্দে ওলিয়ারিয়াসের মৃত্যু হয়।
১. জার্মান রোমান্টিক আন্দোলনে প্রাচ্য উপাদান সম্পর্কে দ্রষ্টব্য: এ জে এফ রেমী, কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি জার্মানিক স্টাডিজ, ১ম খণ্ড, সংখ্যা ৪ (নিউইয়র্ক, ১৯০১)।
২. তুলনীয়: ব্রুনেটিয়ার কর্তৃক উদ্ধৃত শপেন হাওয়ারের অংশবিশেষ (এটুডেস, ৮ম, ২১১)।
১. দক্ষিণ আকাশের 'আর্গো' তারকাপুঞ্জের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র।
📄 আধ্যাত্মিকতা
বেশি দিন আগের কথা নয়। আমি মিস আণ্ডারহিলের মিস্ট্রিসিজম বইটির প্রথম দিকের কয়েকটি পৃষ্ঠা উল্টিয়ে যাচ্ছিলাম। দুটি উদ্ধৃতির প্রতি আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। একটি মধ্যযুগীয় জনৈক জার্মান অতীন্দ্রিয়বাদীর এবং অপরটি জনৈক ইংরেজ লেখকের যার মৃত্যু সংবাদ মাত্র কয়েকদিন আগে প্রচারিত হয়। আমি অত্যন্ত বিস্মিত হই, কারণ দুটি উদ্ধৃতির সঙ্গেই মুসলিম অধ্যাত্মবাদীদের অবিকল সাদৃশ্যের কথা আমার মনে পড়ে। 'একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কোন জীব সমষ্টি এই শব্দটি বলতে পারে না, কারণ এতে সেই জীবকে নিজেকে অ-সমষ্টি বলে সাক্ষ্য দিতে হয়'-একহার্টের এই বিখ্যাত উক্তিটি আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সাড়ে তিনশ বছর আগে বাগদাদে মরমী অদ্বিতীয়ত্বের (তওহীদ) সংজ্ঞা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে আবূ নাসর আস-সাররাজ লিখেছেন, "আল্লাহ ছাড়া আর কেউ 'আমি' বলতে পারে না, কারণ প্রকৃত সত্তা (অস্তিত্ব) একমাত্র আল্লাহতেই নিহিত।" "এই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উপলব্ধি একক বলে মনে হয়, যেখানে সব রোধশক্তি একই বোধশক্তিতে একাকার"-এডওয়ার্ড কার্পেন্টারের এই উক্তিটি আমাকে মিসরীয় কবি ও সূফী ইবনুল ফরিদের (আনু. ১২৩৫ খৃ.) তা'ইয়া শীর্ষক কবিতার কতিপয় স্তবক (৫৮০-এর পরবর্তী) অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ করে। সেখানে তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক চেতনাকে এমন একটি অভিজ্ঞতা হিসাবে বর্ণনা করেন যেখানে সর্বপ্রকার বোধশক্তি একাকার এবং যুগপৎভাবে সক্রিয় হয়ঃ
* আমার চোখ যখন কথা বলে তখন আমার রসনা অপলক দৃষ্টিতে থাকে তাকিয়ে; আমার কান যখন সরব তখন হাত তা শোনে; আর আমার কান যখন দৃশ্যমান সব কিছু দেখার জন্য হয় চোখ, তখন আমার চোখ গান শোনার জন্য হয় কান।
এটি এমন একটি 'ঘটনাচক্র' স্পষ্টত যার প্রমাণমূলক মূল্য রয়েছে। আধ্যাত্মিক মনস্তত্ত্ব ও অনুধ্যানের সমস্যাবলীর ব্যাপারে পাশ্চাত্য এখনো ইসলামের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে। মধ্যযুগে মুসলিম দর্শন ও বিজ্ঞান যখন তাদের স্পেনীয় কেন্দ্র থেকে খৃস্টান ইউরোপে আলো বিকিরণ করে তখন পাশ্চাত্য এসব বিষয়ে প্রকৃত পক্ষে কি পরিমাণে শিক্ষা লাভ করে তা এখনো আমাদের বিস্তারিতভাবে অনুসন্ধান করতে হবে। কিন্তু এই পরিমাণ নিশ্চয়ই যথেষ্ট ছিল। এই সূত্র থেকে যদি টমাস অ্যাকিনাস, একহার্ট ও দান্তের ন্যায় ব্যক্তিদের মধ্যে কোন প্রভাব সৃষ্টি না হয়ে থাকে তাহলে তা বাস্তবিকই অদ্ভুত ব্যাপার হবে। কারণ আধ্যাত্মিকতার সাধারণ ক্ষেত্রেই মধ্যযুগীয় খৃষ্ট ধর্ম ও ইসলাম অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে পরস্পরের সংস্পর্শে আসে। আমরা দেখতে পাবো যে, ইতিহাসে এই সত্য প্রতিষ্ঠিত। ঐ যুগের রোমান ক্যাথলিক ও মুসলিম অধ্যাত্মবাদীদের ধ্যান-ধারণা ও রীতি-পদ্ধতিতে একই ও অনুরূপ আধ্যাত্মিক প্রতিভার ছাপ কেন দেখা যায়, এটি তা বিশ্লেষণ করে। কিন্তু ক্যাথলিক সম্প্রদায় তাদের ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখলেও ত্রয়োদশ শতকের পরে ইসলাম-এর প্রধান ধারা এমন একটি নতুন ধর্মীয় দর্শনের পথে প্রবাহিত হয় যাতে নিষ্ঠাবান মুসলমানদের দৃষ্টিতে, ধর্ম ছাড়া আর সব কিছুই আছে।
আমরা যখন মেসোপটেমিয়ায় সূফী নামের সঙ্গে পরিচিত হই তখন হিজরীর দ্বিতীয় শতক (৭১৯-৮১৬ খৃ.) সমাপ্ত প্রায়। মুসলিম অধ্যাত্মবাদীরা অচিরেই সাধারণভাবে এই নামে পরিচিত হন। সূফী শব্দটি সাওফ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ পশমের বর্ণহীন মোটা পোশাক। খৃস্টান তাপসরা এই পোশাক পরতেন এবং তা একই পন্থা নির্দেশ করে। এর উৎস সম্পর্কিত জটিল প্রশ্নগুলি এখানে আলোচনা করার অবকাশ নেই, কিন্তু এ সম্পর্কে আমার কাছে যা মনে হয় তা আমি তুলে ধরতে চাই। প্রথমেই আমাদের এই অভিমত মেনে নিতে হবে যে, সূফীবাদ তথা তাসাওউফ মূলত ইসলামী। সূফীরা মহানবী (সা)-এর কাছ থেকে তাদের মতবাদ লাভ করেছেন বলে যে দাবি করেন তা শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করা যায়। তাঁর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আমরা সম্ভবত যে একমাত্র খাঁটি লিখিত তথ্য পাই তা হচ্ছে পবিত্র কুরআন। এখানে রিয়াযত ও মা'রিফতের ঐ সব উপাদানের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। অবশ্য সূফীয়ায়েকেরাম প্রথমোক্ত উপাদানগুলির উপর তাঁর চাইতেও বেশি গুরুত্ব আরোপ করেন এবং অধিকতর গভীর ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণভাবে এগুলির তাৎপর্য তুলে ধরেন। কিন্তু এর দ্বারা এই অভিমত প্রমাণিত হয় না যে, সূফীবাদের সঙ্গে কুরআনের কোন সম্পর্ক নেই। মুসলমানরা সব সময় তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থকে শ্রদ্ধা করে, শৈশব থেকে কণ্ঠস্থ করে এবং মানুষের সকল জ্ঞানের উৎস হিসাবে গভীর মনোযোগের সঙ্গে পর্যালোচনা করে।
তাই সূফীদের উপরিউক্ত ধারণা তাদের কাছে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইলমে শরীফ ও ইলমে মা'রিফাত-এর পৃথক কোন নির্দিষ্ট প্রণালী রেখে না গেলেও পবিত্র কুরআনে উভয়টিরই উপাদান রয়েছে। মুসলিম ফুকাহা ও উলামায়েকেরাম বৈষয়িক জগতের অতীত শ্রেষ্ঠত্বকে তাদের বিশ্বাসের অঙ্গীভূত করেছেন। অপর দিকে সূফীগণ প্রিয় নবী করীম (সা)-এর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে এই শ্রেষ্ঠত্বকে সর্বব্যাপী অস্তিত্বের সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন। এ বিষয়টি কুরআনে কম প্রাধান্য পেলেও তারা স্বাভাবিকভাবে এর ওপর সমধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। 'আল্লাহ আসমানসমূহ ও পৃথিবীর নূর (আলো)' (২৪ : ৩৫), 'তিনি আউয়াল ও আখির এবং জাহির ও বাতিন (৫৭ : ৩), তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই; তাঁর সত্তা ছাড়া সব কিছুই ধ্বংসশীল' (২৮:৮৮); 'আমি আমার রূহ তাঁর (মানুষের) মধ্যে সঞ্চারিত করেছি' (১৫:২৯); আমিই মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তাঁর নফস তাঁকে কি কুমন্ত্রণা দেয় তা আমি জানি, কারণ আমি তাঁর গ্রীবার ধমনীর চাইতেও নিকটতর' (৫০:১৬), 'যেদিকেই তুমি মুখ ফিরাও না কেন সেদিকেই আল্লাহর দিক, (২ : ১১৫), যাকে আল্লাহ জ্যোতি দেন না তাঁর আদৌ কোন জ্যোতি নেই' (২৪:৪০), মারিফতের বীজ নিশ্চয়ই এগুলির মধ্যে নিহিত। প্রাথমিক সূফীদের জন্য কুরআন কেবল আল্লাহর কালামই নয়; এটি তাঁর নৈকট্য লাভের মৌলিক উপায়। ঐকান্তিকভাবে ইবাদতের মাধ্যমে এবং সামগ্রিকভাবে উদ্ধৃত অংশগুলিও বিশেষভাবে 'রাত্রিকালীন সফর এবং ঊর্ধ্বারোহণ (মিরাজ) সম্পর্কিত মুজিযা সম্বলিত আয়াতে করিমাসমূহের (১৭:১; ৫৩:১-১৮) সম্পর্কে গভীর মুরাকাবা-মুশাহাদার মাধ্যমে তারা মহানবী (সা)-এর রূহানী অভিজ্ঞতা পুনরুৎপাদনে কঠোর সাধনা করেন।
এখন সময় ও স্থানের অবস্থা বিবেচনা করা যাক। যে রাজনৈতিক বিপ্লবের ফলে দামেস্ক থেকে বাগদাদে রাজধানী স্থানান্তরের পর ইসলাম সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রাচীনতর সভ্যতার চিন্তাধারার সংস্পর্শে আসে এবং একই সময়ে উভয়টির মধ্যে সংঘাতেরও সৃষ্টি হয়। এসব চিন্তাধারা শেষ পর্যন্ত বিলীন হলেও ইতিহাসে দেখা যায় যে, এ ধরনের মুকাবিলায় পুরোপুরি বিজয় কদাচিৎ সাধিত হয়। যেসব এলাকায় দীর্ঘকাল যাবত প্রাচীন গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল আমরা সেখানকার একটি সুদূর প্রসারী আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করছি। এখানে একদিকে মুসলমান এবং অন্যদিকে খৃস্টান ম্যানেকিয়েন ও যোরোয়াস্টিয়ানদের মধ্যে ধর্মতত্ত্ব নিয়ে দৈনন্দিন বিতর্ক অনুষ্ঠিত হতো। যেসব বিজিত জাতি সদ্য ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন এবং নিজেদের প্রয়োজনের সঙ্গে নতুন ধর্মকে খাপ খাইয়ে নিতে চান তারা যেসব মতবাদ ও রীতিকে গুরুত্ব দিতেন সেগুলিতে মহানবী (সা)-এর অনুমোদন রয়েছে বলে দাবি করতেন। সূফীদের কুরআনের গূঢ় অনুসারী মনে করা যুক্তিযুক্ত। তবে কোন কোন সূফী সম্প্রদায়ের কার্যকলাপ দেখে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, তা কুরআন অনুশীলনের নিখুঁত ফল নয়। ১০০০ খৃস্টাব্দের পর প্রাচীন গ্রীক দর্শন আত্মভূত ও সংমিশ্রণ করতে শুরু করে এবং এ পর্যন্ত যেসব প্রমাণ পাওয়া গেছে তাতে এই ইঙ্গিতই পাওয়া যায় যে, এর মূল উদ্ভব ও প্রাথমিক বিকাশ খৃস্টান সন্ন্যাসবাদ ও গ্রীক অতীন্দ্রিয়বাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়। আমরা বিশ্বাস করতে পারি যে, মহানবী (সা)-এর কাছে পরিচিত রাহিব (খৃস্টান সন্ন্যাসী) তাঁর অনুসারীরা যে জীবন যাপন করেন তাঁর অন্যতম আদর্শ হিসাবে কাজ করে। তাঁর বিখ্যাত উক্তি হিসাবে পরিচিত 'লা রাহবানিয়াতা ফিল ইসলাম', ইসলামে সন্ন্যাস জীবনের স্থান নেই, বস্তুত খৃস্টান আদর্শের বিরুদ্ধে পরবর্তীকালের একটি প্রতিবাদ এবং এটি উক্ত আদর্শের প্রভাবের একটি প্রমাণ। মহানবী (সা) কুরআনে উল্লিখিত চিরকৌমার্যসহ রাহবানিয়ার নিন্দা করেছেন বলে সাধারণত মনে করা হয়, কিন্তু সূরা ৫৭ঃ ২৭-এর যে ভাষ্য হিজরী তৃতীয় শতকের সমাপ্তি পর্যন্ত অব্যাহত ছিল তদনুযায়ী তিনি আল্লাহর নির্দেশিত একটি পন্থা হিসাবে এর প্রশংসা করেন: যারা এটিকে নীতিভ্রষ্ট করেছেন তাদেরই কেবল নিন্দা করেছেন। তাসাওউফের মৌল পার্থক্য রয়েছে। সে সব দলকে পথভ্রষ্ট রূপে তরীকতের ইমামগণ চিহ্নিত করেছেন।
তাকওয়া, রোযা, আত্মসংযম, ইবাদতে একাগ্রতা, যিকর ফিকর ও রিয়াযত সে কালেই মুসলমানদের ইলমে বাতিনের জন্য জোরদার প্রতিষ্ঠান ছিল, যেহেতু আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, তাই জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কিংবা জান্নাত লাভের আশায় তাঁর ইবাদত করার অর্থ তাঁর (আল্লাহর) সঙ্গে 'উপাস্যকে' সংশ্লিষ্ট অর্থাৎ আশা বা ভীতি নামক অন্য বিষয়কে সংশ্লিষ্ট করা, তাই কঠোর সংযমী সূফী একমাত্র তাঁর (আল্লাহর) উপরই নির্ভর করতে (তাওয়াক্কুল) উদ্বুদ্ধ হন এবং তাঁর ইবাদত করেন। শুধুমাত্র তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য তাঁরই নিকট নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করেন। এখানেই শেষ নয়। প্রকৃত সূফী মনে করেন যাবতীয় শির্ক বর্জনের মাধ্যমেই আল্লাহর কুরবত ও রিযামন্দী হাসিল হয়। ইলমে মারিফাতের ভাষায়: প্রেমের মাধ্যমেই আল্লাহর সাথে মিলন। এই চিন্তাধারাই ইলমে তাসাউফ বিকশিত করেছে। মহিলা সাধক রাবেয়া বসরীর (ওফাত ৮০১ খৃ.) মধ্যে এর প্রথম সূচনা দেখা যায়। কথিত আছে যে, তিনি একজন ক্রীতদাসী ছিলেন এবং তাঁর কোন জন্ম পরিচয় ছিল না। তাঁর দ্বারা রচিত হোক বা না হোক নিম্নোক্ত চরণগুলিতে মাশুকের (প্রেমাস্পদ) পরমানন্দজনক ধ্যানের মধ্য দিয়ে অধ্যাত্মবাদীদের লক্ষ্য প্রতিফলিত হয়েছেঃ
আমি তোমাকে দুভাবে ভালবাসি : স্বার্থপর ভাবে, এবং তারপর, শুধু তোমারই জন্য যথাযোগ্যভাবে। প্রতিটি চিন্তায় তোমার চিন্তা ছাড়া স্বার্থপরতার লেশমাত্র নেই আমার প্রেমে। আমার গভীর প্রেমার্ত দৃষ্টির সামনে তুমি যখন অবগুণ্ঠন তোলো তখন তা পবিত্রতম প্রেম। এতে হোক ওতে হোক প্রশংসা আমার নয়; আমি মনে করি, উভয় ক্ষেত্রে প্রশংসা তোমারই।
আল্লাহর অনুগ্রহে প্রাপ্ত আধ্যাত্মিক মিলনের মতবাদ কুরআনে অনেক গভীরতাপূর্ণ। মহানবী (সা)-এর হাদীসে কুদসীতে তা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন আল্লাহ্ বলেছেন, "আমার বান্দা নফল ইবাদত দ্বারা আমার কাছাকাছি আসে, এবং আমি তাঁকে ভালবাসি। এবং আমি যখন তাঁকে ভালবাসি তখন আমি তাঁর শ্রবণশক্তি, যাতে সে আমার দ্বারা শুনতে পায়, এবং দৃষ্টি, যাতে সে দেখতে পায়; এবং কণ্ঠ, যাতে সে কথা বলতে পারে; এবং তাঁর হাত, যাতে সে গ্রহণ করতে পারে।” আল্লাহর নামের অবিরত পুনরাবৃত্তির (যিকর) মাধ্যমে আপনা থেকে উৎপন্ন একাগ্রতার প্রগাঢ় প্রচেষ্টা থেকে শুরু করে সূফীরা এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতি তথা মুরাকাবা-মুশাহাদার উদ্ভাবন করেছেন যা আত্মাকে আধ্যাত্মিক জ্ঞান (মারিফাত) লাভে অনুপ্রাণিত বা উদ্বুদ্ধ করে। এই অবস্থাকেই বলা হয় আল্লাহর সঙ্গে একাত্ম হওয়ার বৈশিষ্ট্য (ফানাফিল্লাহ) সমূহের জ্ঞান যা ঐসব সূফীর বিশেষত্ব যারা নিজেদের কলবে নূর অবলোকন করে। মুসলমানদের মধ্যে যিনি সর্বপ্রথম এই আভ্যন্তরীণ জীবনের একটি পরীক্ষামূলক বিশ্লেষণ দান করেছেন তিনি হচ্ছেন বসরার হারিস আল মুহাসিবি (ওফাত ৮৫৭)। রি'আয়া লি-হুকুক আল্লাহ্ বা 'ধর্মীয় কর্তব্য পালনের পদ্ধতি' শিরোনামে লিখিত এই গ্রন্থটির একটি অপরূপ পাণ্ডুলিপি এখনো অক্সফোর্ডে রয়েছে। যদিও তিনি নৈতিক উন্নতি বিধানের জন্য ইহুদী ও খৃস্টান সূত্রকে অনেক খানি কাজে লাগিয়েছেন, তথাপি এই গ্রন্থে সূক্ষ্মতা ও মৌলিকত্ব রয়েছে। পরবর্তী লেখকদের দ্বারা বর্ণিত 'পন্থা' (তরিকা) অর্জিত গুণাবলী (মাকামাত) ও আধ্যাত্মিক অবস্থা (আহওয়াল) সমবায়ে গঠিত। প্রথম পর্যায়টি হচ্ছে অনুতাপ বা অবস্থান্তর। এরপর পর্যায়ক্রমিকভাবে অন্য পর্যায়গুলি আসে। যেমন, পরিহার, দারিদ্র্য, ধৈর্য, আল্লাহয় বিশ্বাস। প্রত্যেকটি পরবর্তীটির প্রস্তুতিমূলক। বিস্তারিত ক্ষেত্রে কিছু কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি একই ধরনের। শিষ্যরা 'হৃদয়ের কাজকে' 'অনুসারীদের কাজের' উপর ও নিয়াতকে কার্যের উপর স্থান দেওয়ার এবং মনোযোগের সঙ্গে ধর্মীয় বিধান পালনের সময় জরুরী বিধিগুলিকে একটি গভীরতর সত্যের প্রকাশ বা প্রতীক হিসাবে মনে করার শিক্ষা লাভ করে। অসঙ্গতিমূলক প্রবণতা থাকা সত্ত্বেও এসব মূলনীতি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে মুসলিম বিধি-বিধানে প্রবিষ্ট হয়েছে এবং যে নীতিশাস্ত্র মহান ধর্মতাত্ত্বিক ইমাম গায্যালী রহমাতুল্লাহি আলায়হি (ওফাত ১১১১) বিশ্লেষণ করেছেন এবং সাদীর (ওফাত ১২৯১ খৃ.) ন্যায় জনপ্রিয় নীতিবিদগণ প্রতিফলিত করেছেন তাঁর ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছেন।
নিজেদের ভালবেসেছেন বলে সূফীদের অভিযুক্ত করা না গেলেও একথা সত্য যে, তারা আল্লাহর প্রতি প্রেম প্রদর্শন করতে গিয়ে কখনো কখনো তাদের প্রতিবেশীদের বিশেষত যারা তাদের সম্প্রদায়ভুক্ত নন, তাদের ক্ষতি সাধন করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের ফানাফিল্লাহর ধারণা তাঁর সৃষ্ট জীবকে ভালো না বেসে আল্লাহকে ভালবাসা তাদের জন্য অসম্ভব করে তোলে।
হিজরী তৃতীয় শতকের সূফীগণ ইলমে তাসাওউফ সামগ্রিকভাবে বিকশিত করেন। হযরত যুননুন মিসরী রহমাতুল্লাহি আলায়হি ইসলামে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের (মারিফা) তথা পরমানন্দের মোহাবিষ্ট অবস্থার জ্ঞানের প্রচলন করেন। এটি বুদ্ধিভিত্তিক প্রচলিত জ্ঞান (ইলম) থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। আল্লাহকে কিভাবে জানেন এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আমি তাঁকে তাঁর মাধ্যমেই জানি।' ডায়োনিসিয়াসের ন্যায় তিনি ঘোষণা করেন যে, 'আপনি যা কিছু কল্পনা করতে পারেন আল্লাহ্ হচ্ছেন তাঁর বিপরীত' এবং 'কেউ আল্লাহকে যত বেশি জানে তত বেশি তাঁর (আল্লাহর) মধ্যে বিলীন হয়।' এরপর থেকে আমরা নির্বাচিত ব্যক্তির জন্য সংরক্ষিত মতবাদের উপযোগী প্রতীক পদ্ধতি ও পরিভাষার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার দেখতে পাই। তারা উপলব্ধি করেন যে, এসব গূঢ় রহস্য কোন অপবিত্র কানে দেওয়া উচিত হবে না।
পারস্যবাসী বিস্তামের আবূ ইয়াযিদ (বায়েযীদ বুস্তামী) ফানা (আত্মবিলোপ) মতবাদ উদ্ভাবিত করেন। অচিরেই এর সঙ্গে এর যথার্থ পরিপূরক অংশ বাকা (আল্লাহতে স্থিতি) যুক্ত হয়। এই নিগূঢ় তত্ত্বের দ্বারা বায়েযীদ বুস্তামী মঞ্জিলে মকসুদে কতটুকু উন্নীত হয়েছিলেন তা বলা দুরূহ হলেও তিনি পারস্যের পরবর্তী কালের সূফীদের কাছে সুলতানুল আবেদিনের মর্যাদা লাভ করেন। তাঁরা তাঁর বিশেষ হালতে উচ্চারিত বাক্য যেমন সুবহানী, গৌরব আমারই ইত্যাদির উচ্চারণে অবসন্ন হননি।
তাঁর নীতিমূলক প্রবচনগুলির মধ্যে রয়েছে, 'সৃষ্টজীবগুলি অবস্থাসমূহের অধীন, কিন্তু আরিফের কোনো অবস্থা নেই। কারণ অন্য এক পরম সত্তা দ্বারা তাঁর আমিত্ব এবং অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। ত্রিশ বছর পর্যন্ত অদৃশ্য আল্লাহ্ আমার আয়না ছিলেন, বর্তমানে আমি আমার নিজস্ব আয়না অর্থাৎ যে আমি ছিলাম এখন আর আমি নেই। কারণ 'আমি' এবং 'আল্লাহ্' আল্লাহর তৌহিদকে অস্বীকার করার শামিল। যেহেতু আমি আর নেই সেজন্য অদৃশ্য আল্লাহই তাঁর নিজস্ব আয়না। আমি বলছি যে, আমি আমার নিজস্ব আয়না, কারণ আমার কণ্ঠ দ্বারা আল্লাহই কথা বলছেন এবং আমি উধাও হয়েছি।' সাপ যেমন তাঁর খোলস থেকে আসে তেমনি আমিও বায়েযিদত্ব থেকে এসেছি। এরপর আমি তাকাই। আমি দেখতে পাই যে, প্রেমিক, প্রেমাস্পদ এবং প্রেম এক। কারণ একাত্মতার জগতে সব কিছু এক হতে পারে।'
যারা আধ্যাত্মিক 'নেশাকে' গাম্ভীর্যের চাইতে প্রাধান্য দান করেন তারা বায়েযিদের অনুরাগী হলেও তাদের বিরুদ্ধবাদীরা বাগদাদের জুনাইদের রীতি অনুসরণ করেন। তাঁর 'মিলনের' মতবাদ তাঁর শিষ্য বিখ্যাত হাল্লাজ মুসলিম বিশ্বে আপসহীন বাস্তবতার সঙ্গে প্রয়োগ ও প্রদর্শন করেন। এটি বিস্ময়কর নয় যে, হাল্লাজকে যখন ধর্মদ্রোহিতার গুরুতর অপরাধে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় তখন জুনাইদ বিচক্ষণতার সঙ্গে তাঁকে অস্বীকার করেন। তাঁর 'কিতাবুত তাওয়ামিন' গ্রন্থে এই মতবাদ সন্নিবেশিত হয়েছে। তীক্ষ্ণ ব্যাঙ্গাত্মক আনাল হক 'আমি সত্য (আল্লাহ্)' সূত্রটি বাদ দিলেও এটি মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত মর্মবিদারক হতো।
হাল্লাজের মতে, আল্লাহ্ প্রেমময়, তিনি মানুষকে তাঁর সুরত অনুযায়ী এই উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন যে, তাঁর সৃষ্টজীব একমাত্র তাঁকে ভালবেসে একটি আধ্যাত্মিক রূপান্তর লাভ করবে, নিজের মধ্যে পবিত্র অনুভবের সন্ধান পাবে এবং এভাবে পরম সত্তার ইচ্ছা ও ফিতরতের সঙ্গে একাত্মতা লাভ করবে। একথা পরিষ্কার যে, হাল্লাজ যে একাত্মতার কথা বলেছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে যে একাত্মতার অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন তাঁকে মুসলিম এবং ইউরোপীয় লেখকগণ প্রায়ই সর্বেশ্বরবাদ হিসাবে উল্লেখ করলেও তা সর্বেশ্বরবাদ ছিল না। তিনি একথা বোঝানোর জন্য যে হলুল শব্দটি ব্যবহার করেছেন তা খৃস্টান অবতারবাদের ক্ষেত্রে তাঁর সহ-ধর্মাবলম্বীদের মনেও সংশ্লিষ্ট ছিল না। তাঁর নিজের ক্ষেত্রে তিনি এই অর্থ প্রয়োগ করেছেন বলে মনে না হলেও এতে অসাধারণ ধরনের অন্যান্য এমন কতিপয় সাদৃশ্য রয়েছে যার ফলে সূফীদের মধ্যে তিনিই যীশু খৃষ্টের মননের নিকটতর হন। তিনি এক ধরনের গৌরবান্বিত ও আল্লাহর গুণে গুণান্বিত মানুষ যার ব্যক্তি সত্তাকে রূপান্তরিত ও সারবত্তাসম্পন্ন করা হয়েছে এবং যিনি আল্লাহর সাক্ষী ও প্রতিনিধি হিসাবে সমুপস্থিত থেকে তাঁর মধ্য থেকে আল-হক প্রতিভাত করেছেন। এই আল-হক হচ্ছেন স্রষ্টা যাঁর মধ্য দিয়ে তিনি টিকে আছেন এবং 'সৃষ্টিমূলক সত্য' যাঁর মধ্যে তাঁর সামগ্রিক সত্তা নিহিত। এ ছাড়া হাল্লাজ আধ্যাত্মিক মিলনকে 'সৃষ্টিমূলক শব্দের' (কুন, হও) সঙ্গে মিলন হিসাবে কল্পনা করেন। কুরআনের এই শব্দটি যীশু খৃস্টের জন্ম ও পুনরুত্থানের পক্ষে প্রযোজ্য। উপরিউক্ত মিলন 'আল্লাহর আদেশসমূহের ঘনিষ্ঠ ও গভীর উপলব্ধির মাধ্যমে' সাধিত হয়। স্বর্গীয় আদেশ এরূপ স্থায়িভাবে প্রতিপালনের ফল হচ্ছে অধ্যাত্মবাদীর আত্মার মধ্যে স্বর্গীয় সত্তার আবির্ভাব, যা 'আমার প্রভুর আদেশ থেকে' (কুরআন ১৭: ৮৭) অগ্রসর হয় এবং সেখান থেকে ঐ ব্যক্তির প্রতিটি কার্যকে 'সত্যিকারের স্বর্গীয় কার্যে' পরিণত করে। দুঃখ-কষ্ট বরণ ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে পরিপূর্ণ পবিত্রতা অর্জনের শিক্ষা কতো প্রকৃষ্টভাবে তিনি লাভ করেছেন একথা প্রমাণ করতেও হাল্লাজ ব্যর্থ হননি। ৯২২ খৃস্টাব্দে বাগদাদে তাঁর প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হয়। যখন তাঁকে শূলে চড়ানোর জন্য নিয়ে আসা হয় এবং তিনি শূল ও পেরেক দেখতে পান তখন জনসাধারণের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে তিনি উচ্চকণ্ঠে আল্লাহর কাছে মুনাজাত করেন। তাঁর মুনাজাতের শেষ কথাগুলি ছিলঃ
এবং তোমার ধর্মের জন্য গভীর আবেগে এবং তোমার অনুগ্রহ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় এই যে তোমার যেসব বান্দা আমাকে হত্যা করার জন্য সমবেত হয়েছে, হে প্রভু! তাদের ক্ষমা করো, এবং তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করো, কারণ নিশ্চয়ই তুমি আমার কাছে যা প্রকাশ করেছ তা যদি তাদের কাছে প্রকাশ করতে তাহলে তারা যা করেছে তা করতো না; এবং তুমি তাদের কাছ থেকে যা গোপন রেখেছ তা যদি আমার কাছ থেকে গোপন রাখতে তাহলে আমি এই নিদারুণ ক্লেশ ভোগ করতাম না। তুমি যা কিছু করো সমস্ত গৌরব ও প্রশংসা তোমার এবং তুমি যা-কিছু ইচ্ছা করো সমস্ত গৌরব ও প্রশংসা তোমার!
ইসলামে যেখানে নিজেদের কৃতকর্মের দ্বারা মানুষের বিচার করা হয় সেখানে প্রচলিত বিশ্বাসের ব্যতিক্রম বিশ্বাসের জন্য বিধি অনুযায়ী কার্যকরভাবে শাস্তি দেওয়া যায় না, এবং ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার সত্যের সংঘাত যতো তীব্রই হোক না কেন, অধ্যাত্মবাদী যতদিন পর্যন্ত তাঁর সঙ্গী মুসলমানদের সঙ্গে নামায-রোযা অব্যাহত রাখেন ততদিন পর্যন্ত অত্যন্ত গুরুতর কিছু না ঘটাই স্বাভাবিক। একথা স্বীকৃত যে, হাল্লাজ যথাবিহিতভাবে তাঁর ধর্মীয় কর্তব্য পালন করতেন। পবিত্র হৃদয়ের অত্যন্ত বিনয় ও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে সত্যিকারের ধর্মের লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য যে 'মৌল পরিমাণ' ধর্ম চর্চা করা দরকার তিনি কখনও তাঁর নিন্দা করতেন না। অবশ্য তিনি কখনো তোষামোদও করতেন না। ইসলামী বিধানের প্রতি এটিই ছিল বহু সূফীর আদর্শ মনোভাব, এবং দুই প্রভুর প্রতি কর্তব্য পালনের জন্য, মনে হয় এটিই ছিল তাদের প্রকৃষ্টতম পন্থা। কিন্তু হাল্লাজ তাঁর বিবেকের সঙ্গে আপস করার জন্য অনেক বেশি আকুল ছিলেন। মুসলিম ধর্মমত ও রাষ্ট্রের সরকারী কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে তিনি অচিরেই যে আল্লাহর সঙ্গে একাত্ম হন তাঁর কাছ থেকে প্রাপ্ত ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি জুনাইদের মত শুধু মতবাদ সর্বস্ব ছিলেন না; 'কারমাতিয়ানদের' সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল বলে সন্দেহ করা হতো; তিনি ঈমানদার এবং কাফির নির্বিশেষে সকলের মধ্যে তাঁর বিশ্বাস প্রচার করতেন; এবং সর্বোপরি 'প্রামাণিক' অলৌকিক বিষয় প্রদর্শন করে মানুষকে তাঁর মতে আকৃষ্ট করতেন। এসব যুক্তিতে যথাযথভাবেই তাঁকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীকালের সূফীদের অভিমত অনুযায়ী 'তিনি স্বর্গীয় প্রভুত্বের রহস্য প্রকাশ করেছেন' এটি তাঁর অপরাধ ছিল না, বরং তাঁর অপরাধ এই ছিল যে, তিনি একটি আভ্যন্তরীণ আহবানে সাড়া দিয়ে এমন একটি সত্য প্রকাশ করেছেন এবং সক্রিয়ভাবে প্রতিপন্ন করেছেন যা ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়। অন্যান্য অধ্যাত্মবাদীও এই সত্যের সন্ধান পায়। হাল্লাজ এই সত্যকে অবলম্বন করে বেঁচেছিলেন এবং এরই জন্য মৃত্যুবরণ করেন। তাই কবিতার যে চরণগুলির মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর প্রেমাস্পদের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার জন্য প্রার্থনা করেন কিংবা তাঁর (আল্লাহ্) সঙ্গে পরিপূর্ণ একাত্মতার অনুভূতি প্রকাশের চেষ্টা করেন সেগুলি এতো আন্তরিক ও কোমল যা সূফীবাদে কদাচিৎ দেখা যায়।
তোমার আর আমার মধ্যে একটি 'এটি আমি' টিকে আছে যা আমাকে যন্ত্রণা দেয়। ওগো, দয়াময়, আমার মধ্য থেকে এই 'আমি' সরিয়ে নাও! আমি তিনি, যাকে আমি ভালবাসি, এবং যাকে আমি ভালবাসি তিনি হচ্ছেন আমি, আমরা দুটি সত্তা এক দেহে বাস করছি। তুমি আমাকে দেখলে তাঁকে দেখো, এবং তুমি তাঁকে দেখলে আমাদের-উভয়কে দেখো।
প্রসঙ্গক্রমে আমি বলতে পারি যে, চারটি বাক্যের দ্বিতীয় বাক্যটি কোন সর্বেশ্বরবাদী লিখতে পারে না। একই মনোভাবের অদ্বৈতবাদমূলক প্রকাশ জিলির উক্তিতেও দেখা যায়, 'দুটি দেহে বাস করলেও আমরা এক-এরই সত্তা।' জালালুদ্দিন রুমীর চরণেও তাই দেখা যায়। 'মুহূর্তটি আনন্দের যখন আমরা প্রাসাদে বসে থাকি, তুমি আর আমি; দুটি আকার এবং দুটি ছবি কিন্তু একটি আত্মা, তুমি আর আমি' ।
অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাষায় আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করা সত্ত্বেও কোন কোন বিশেষ মুহূর্তে এবং কোন এক বিশেষ অর্থে হাল্লাজ নিজেই আল্লাহ হয়েছেন বলে যে ঘোষণা করেন তা ঐ সব ব্যক্তিকে বিস্মিত করবে না যারা এরূপ মন্তব্য করেছেন: তর্কশাস্ত্রের আপাত বিরোধী সত্যগুলো প্রায়ই অধ্যাত্মবাদের সত্য। মৃত্যুর পর তাঁর মূল মতবাদ বহুকাল টিকে না থাকলেও এটি গভীর কল্পনা বিকাশের একটি ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে, যেমন-পরিপূর্ণ মানুষের প্রকৃতি সংক্রান্ত কল্পনা। ইবনুল আরাবীর রচনায় এবং পারস্যের আধ্যাত্মিক কাব্যে এটি বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করে। কিন্তু আমরা সেখানে তাঁর চরিত্র কিংবা নিম্নোক্ত পদ্যে তিনি তাঁর যে বিষাদময় ব্যক্তিগত সংকট তুলে ধরা হয়েছে তা উপলব্ধি করিঃ 'আল্লাহ তাকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করেন, তার পিছনের দিকে তার হাত দুটি বেঁধে, এবং তাকে বলেন, 'সাবধান হও, সাবধান হও, অন্যথায় তুমি পানিতে ভিজে যাবে!'
অন্যদিক দিয়ে তুলনামূলকভাবে প্রাণহীন হলেও হাল্লাজের মৃত্যুর পরবর্তী শতকে সূফী মতবাদের ওপর সর্বপ্রথম ধারাবাহিক ও সাধারণ রচনা প্রকাশিত হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ আবূ নাসর আস-সাররাজের 'কিতাবুল লুমা' ও আবু তালেব আল মাক্কীর কুতুউল কুলুব উল্লেখযোগ্য। এ গুলিতে যেসব সূত্র বিলুপ্ত হয়েছে সেগুলি থেকে সংগৃহীত বহু মূল্যবান উপাদান সংরক্ষিত আছে। তখন থেকে সূফীবাদ ইসলামের ভিত্তিভূমি থেকে সর্বেশ্বরবাদ ও বিশ্বাসবাদের দিকে সরে যেতে শুরু করে। এই প্রবণতার পিছনে কাজ করেছে গ্রীক দার্শনিক চিন্তাধারার বিশেষ করে 'নিঃসরণের' চিন্তাধারার ক্রমবর্ধমান প্রভাব। পারস্যের অধ্যাত্মবাদী আবূ সাঈদের (৯৬৭-১০৪৯ খৃ.) জীবন ও উক্তিসমূহের মধ্যে এটি সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, 'সত্যিকারের সাধক জনসাধারণের মধ্যে যাতায়াত করেন, তাদের সঙ্গে আহার করেন ও নিদ্রা যান, বাজারে কেনাবেচা করেন, বিয়ে করেন এবং সামাজিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করেন এবং কখনও এক মুহূর্তের জন্যও আল্লাহকে বিস্মৃত হন না।' তিনি সমস্ত সৃষ্টজীবকে 'স্রষ্টার দৃষ্টির মধ্য দিয়ে দেখেন' এবং দান ও প্রীতিমূলক দয়ার এমন ভাণ্ডার প্রতিষ্ঠা করেন-যেখানে একজন মুসলমানের হৃদয়ে আনন্দ সৃষ্টির চাইতে আল্লাহকে পাওয়ার আর কোন উত্তম পন্থা তিনি জানতেন না।
ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে সাধকের সম্পর্ক বিষয়ে তিনি যা বলেন তাঁর সঙ্গে হাল্লাজের তুলনা হতে পারে; কিন্তু মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি ও রীতির ক্ষেত্রে পার্থক্য অনেক ব্যাপক। হাল্লাজ যেখানে আগ্রহের সঙ্গে বিধান রক্ষা করতে গিয়ে এর আদেশসমূহের প্রতি আনুগত্য এবং তাঁর সত্তার মধ্যে অনুভূত উচ্চতর শক্তির প্রতি আনুগত্যের মধ্যে সমাধানের অতীত সংঘাতের মুকাবিলা করেন, সেখানে আবূ সাঈদ বিধানকে বন্ধনের এমন একটি অবস্থা হিসাবে মনে করেন যা পন্থা অনুসারীদের জন্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা লক্ষ্যে পৌঁছার পর অপ্রয়োজনীয়। তাঁর মতে আল্লাহর সঙ্গে একাত্মতা কোন প্রাসঙ্গিক বা সাময়িক অভিজ্ঞতা নয় বরং ব্যক্তিসত্তা বিলোপের ও স্বর্গীয় বৈশিষ্ট্য লাভের একটি স্থায়ী ফলশ্রুতি। কথিত আছে যে, তিনি তাঁর শিষ্যদের কাবায় হজ্জ যাত্রা নিষিদ্ধ করেন, কারণ কাবাকে তিনি নিন্দার সঙ্গে 'একটি প্রস্তর ভবন' হিসাবে উল্লেখ করেন। আরো কথিত আছে যে, কোন এক সময় মু'আজ্জিনের আযান শোনার পর তিনি এই বলে দরবেশদের আধ্যাত্মিক নৃত্য (জজবা) বন্ধ করতে অস্বীকার করেন, এটিই হচ্ছে আমাদের 'ইবাদতের রীতি'। আক্ষরিকভাবে সত্য না হলেও এসব কাহিনী আদর্শ স্থানীয়। ১০৪৫ খৃষ্টাব্দে লিখিত কুশায়েরীর দীর্ঘ উপদেশাত্মক পত্রে প্রাচীনতর ধারার সূফীদের শ্রদ্ধা-ভক্তির সঙ্গে তাঁর সময়কার অধ্যাত্মবাদীদের শ্রদ্ধা-ভক্তির পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমোক্তদের মতবাদ বিশ্বস্ততার সঙ্গে সুন্নাহ পালনের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং শেষোক্তদের বিশৃঙ্খলা ও কপটতা ছিল। ত্রিশ বছর পর কাশফুল মাহজুব-এর রচয়িতা ঘোষণা করেন যে, তাঁর সমসাময়িক ব্যক্তিরা তাদের ইন্দ্রিয়াসক্তিকে 'বিধি' নাম প্রদান করেন এবং তাদের অর্থহীন কল্পনাকে 'স্বর্গীয় জ্ঞান', তাদের হৃদয়াবেগ ও জৈবিক আত্মার ভালবাসাকে 'স্বর্গীয় প্রেম', ধর্মদ্রোহিতাকে 'দারিদ্র্য', সন্দেহবাদকে 'পবিত্রতা' এবং প্রত্যক্ষ ধর্মের প্রতি অবিশ্বাসকে 'আত্মপরিহার' নামে অভিহিত করেন। একদিকে অগণিত অনুসারীসহ সাধকরা ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি হুমকি সৃষ্টি করেন। অপরদিকে নিজেদের মধ্যে দ্বিধা-বিভক্ত গোঁড়াপন্থীরা আন্তরিকভাবে কুরআনকে আঁকড়ে রেখে কিংবা বিধিগত ও অনুষ্ঠানগত খুঁটিনাটি নিয়ে বিতর্কে অবতীর্ণ হয়ে বা ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদকে বুদ্ধিবৃত্তির নিরস আলোকে বিশ্লেষণ করে, যে আভ্যন্তরীণ প্রাণ চেতনা ধর্মকে বাস্তবে পরিণত করে তাঁর সঙ্গে দ্রুত সংস্রবহীন হতে থাকে। বহু আন্তরিক ও নিষ্ঠাবান মুসলমানের মনে এই আত্ম জিজ্ঞাসা দেখা দেয় যে, এই অবস্থা কতদিন চলতে থাকবে। মুসলমান সম্প্রদায়কে টুকরো টুকরো না করে 'বিশ্বাসের' যে গুরুত্বপূর্ণ দিক তা কি সংরক্ষণ করা যায় না? ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরুষের হস্তক্ষেপে এই প্রশ্নের মীমাংসা হয় এবং তিনি হচ্ছেন আবূ হামিদ গায্যালী (১০৫৮-১১১১ খৃ.)।
গায্যালীর সূফীবাদে দীক্ষা সম্পর্কে তাঁর স্বয়ং কথিত কাহিনী অপরূপ। সংক্ষেপে কাহিনীটি হচ্ছে যে, যৌবনে তিনি সন্দেহবাদী ছিলেন, কিন্তু একটি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা তাঁর এই মানসিক পীড়া নিরাময় করে। তিনি তাঁর সমস্ত শক্তি পূর্ণাঙ্গ সত্যের সন্ধানে নিয়োজিত করেন। দর্শনশাস্ত্র ও জ্ঞানগর্ভ ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, সেখানে কোন আলোর সন্ধান পাওয়া যাবে না। অকাট্য ধর্মীয় কর্তৃত্বের মতবাদ অনুসারী তালীমীদেরও পরীক্ষা করে তিনি দেখেছেন যে, এতেও কোন কাজ হবে না। এর পর তিনি হারিস আল-মুহাসিবী ও তৃতীয় হিজরী শতকের প্রাচীন সাধকদের রচনার প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করেন। এসব রচনা পড়তে পড়তে তাঁর কাছে সত্য উদ্ভাসিত হয়। তিনি বলেন, 'আমি পরিষ্কারভাবে দেখতে পাই যে, তাদের (সূফীদের) কাছে যা অনন্য তা বই থেকে জানা যাবে না। কেবল আশু অভিজ্ঞতা, মোহাবিষ্ট অবস্থা এবং আভ্যন্তরীণ রূপান্তরের মাধ্যমেই তা লাভ করা যায়।' অপর কথায় আধ্যাত্মিক জীবন যাপনের মাধ্যমেই তা পাওয়া যায়। তিনি আরো দেখতে পান যে, তাঁর নিজস্ব মুক্তি বিপন্ন। তাঁর বৈষয়িক সম্ভাবনা ছিল উজ্জ্বল। তাই তা পরিহার করতে গিয়ে তাঁকে কঠোর সংগ্রাম করতে হয়।
এই সাধনায় তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে এবং অবশেষে তিনি 'আঘাতে জর্জরিত নিঃস্ব অবস্থার একজন মানুষ হিসাবে' আল্লাহর আশ্রয়ে গিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করেন। তিনি কখনও ফিরে না আসার কঠোর সঙ্কল্প নিয়ে যখন বাগদাদ ত্যাগ করেন তখনো তাঁর বয়স চল্লিশে পৌঁছেনি।
সত্য তখন অধ্যাত্মবাদীদের মধ্যে নিহিত ছিল। এই সত্য সম্পর্কে গায্যালীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই বিরাট ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনের প্রেরণা জোগায়। এতোদিন পর্যন্ত যেসব মহল অধ্যাত্মবাদের প্রতি বিরূপ ছিল তাদের মধ্যে এই পুনরুজ্জীবন সূচিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ইহইয়া প্রভৃতি গ্রন্থের চাইতে তাঁর দৃষ্টান্ত কোন অংশে কম অবদান রাখেনি। অতঃপর সূফীগণ সুনিশ্চিতভাবে ইসলামের আওতাধীন থাকে, কারণ গায্যালী ও তাঁর পরবর্তী অধিকাংশ মুসলমানের মতে সাধকদের মধ্যে যে সব সত্য প্রতিভাত হয় তা সর্বপ্রকার বাস্তব জ্ঞানের সূত্র ও ভিত্তি হিসাবে নবীদের ওপর প্রতিভাত সত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়। কিন্তু একই সময়ে তিনি এ কথাও জোর দিয়ে বলেন যে, সাধকদের সাধনা, নবীদের কার্যকলাপ থেকে উদ্ভূত এবং তা সব সময় হযরত মুহাম্মদের সর্বময় কর্তৃত্বের মুখাপেক্ষী। তাঁর বিধান অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। আত্মা সম্পর্কে গায্যালীর মতবাদ হচ্ছে, এটি এমন একটি সারবস্তু যেখানে আল্লাহ্ তাঁর নিজস্ব সত্তা ও বৈশিষ্ট্যসমূহকে প্রতিফলিত করে-এমন একটি আয়না যা 'স্বর্গীয় স্ফুলিঙ্গ' দ্বারা আলোকিত হয়। এই মতবাদ অত্যন্ত সাহসী অধ্যাত্মবাদীকেও ধর্ম বিশ্বাস বিরোধী ধ্যান-ধারণার পথে পরিচালিত করার সম্ভাবনা থাকলেও তিনি নিজে তাঁর থেকে দূরে ছিলেন। সম্ভবত ব্যক্তিগতভাবে তিনি যা চিন্তা করতেন তা বইতে তিনি যা শিক্ষা দিতেন তাঁর সীমা ছাড়িয়ে যায়। অবশ্য দৃষ্টান্তস্বরূপ, তিনি তাঁর 'মিশকাতুল আনওয়ার' গ্রন্থে বলেছেন যে, আল্লাহ্ হচ্ছেন সূর্য এবং সূর্যের চারপাশে শুধু সূর্যের আলোই আছে।' কিন্তু ইসলামে সর্বেশ্বরবাদমূলক ভাষা ব্যবহারের অর্থ এই নয় যে, লেখকও একজন সর্বেশ্বরবাদী। গায্যালী একাত্মতার মতবাদকে কোন কোন সময় চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেলেও, তিনি এ কথা কখনো বিস্মৃত হন না যে, আল্লাহ্ই হচ্ছেন স্রষ্টা যাঁর একান্ত ইচ্ছায় বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে। সূফীবাদের কাছে তাঁর ঋণ ছিল যেমন বিরাট, তেমনি সে ঋণ তিনি পুরোপুরি পরিশোধও করেন। এতদসত্ত্বেও অধিকাংশ সূফী মনে করেন এবং যুক্তিযুক্তভাবেই মনে করেন যে, তিনি যতোটা ইসলামের 'ক্যাথলিক চার্চের' সদস্য ততোটা তাদের একজন নন। তিনি রক্ষণশীল মতবাদের শক্তিশালী ও যথেষ্ট সহনশীল একটি দর্শককে তাঁর মতবাদে আকৃষ্ট করেন। এঁরা আগত দিনের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে একটি প্রতিরোধ শক্তি হিসাবে কাজ করে। কিন্তু অতঃপর এর পরিচালিকা শক্তি আসে অন্য একটি মহল থেকে, এবং যে ধ্যান-ধারণা এটিতে অপ্রতিরোধ্যভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নেয় এবং ভবিষ্যতে এর মধ্যে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে তাঁর সঙ্গে গায্যালীর ধ্যান-ধারণার মিল কদাচিৎ ছিল। নতুন মতবাদের বহু অনুসারী মহানবীর প্রতি শ্রদ্ধাভক্তি জ্ঞাপন করলেও এ সত্য লুকাতে পারেন না যে, তাদের আধ্যাত্মিক সূত্র মক্কা নয়, বরং এথেন্স ও আলেকজান্দ্রিয়া। গায্যালীর সঙ্গে সঙ্গে সূফীবাদের একটি যুগের অবসান হয়। অধ্যাত্মবাদ এতোদিন কুরআন ও হাদীসের ভিত্তিতে বিধিসম্মত ইবাদতের বিপরীত আল্লাহ্ ও আত্মার সঙ্গে একটি ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্কের ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তারা এটিতে আংশিকভাবে কুরআন থেকে এবং আংশিকভাবে অ্যারিস্টটল ও নিওপ্লাটোনিকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত উপাদানের সাহায্যে গঠিত একটি ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে সংযুক্ত করেন।
মুসলিম অধ্যাত্মবাদীদের (সূফী) মধ্যে সবচাইতে চিন্তাশীল প্রতিভার অধিকারী মুহীউদ্দীন ইবনুল আরাবী স্পেনের মুর্সিয়া্য জন্মগ্রহণ করেন এবং ১২৪০ খৃস্টাব্দে দামেস্কে ইন্তিকাল করেন। তাঁর বিপুল রচনাবলীর মধ্যে তাঁর সার্বজনীন দর্শন ব্যবস্থা গভীরভাবে প্রতিফলিত। এর মধ্যে অত্যন্ত বিখ্যাত গ্রন্থগুলি হচ্ছে ফুতুহাতুল মাক্কিয়্যাহ (মক্কার প্রত্যাদেশসমূহ) এবং ফুসূসুল হিকাম (জ্ঞানের কৌটাসমূহ)। এসব রচনার অধিকাংশই দুর্বোধ্য ও উদ্ভট। তবুও যারা এগুলি অধ্যয়ন করেন তাদের কেউই লেখকের বুদ্ধি ও কল্পনা শক্তিতে বিস্মিত না হয়ে পারেন না। আবার আবদুল করিম জিলির ন্যায় কেউ কেউ তাঁর রচনাকে তাঁর চাইতেও সহজ ও সুস্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
ইবনুল আরাবী আগাগোড়া একজন অদ্বৈতবাদী। তাঁর মতবাদকে যে নামে অভিহিত করা হয় (ওয়াহদাতুল ওজুদ, অস্তিত্বের একত্ব) তাতেই একথা যথাযথভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাঁর মতে আল্লাহর জ্ঞানের মধ্যে ধারণা হিসাবে সবকিছুর অস্তিত্বই পূর্ব থেকে ছিল। সেখান থেকেই এগুলি নিঃসরিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেখানেই ফিরে যায়। কোন কিছুই এক্সনাহিলো (অনস্তিত্ব) থেকে সৃষ্ট নয়। যার অভ্যন্তরীণ দিক আল্লাহ্ কেবল তারই বাহ্যিক দিক বিশ্ব। প্রত্যেক ব্যাপার বাস্তবতার এক একটি বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করলেও 'মানুষ' হচ্ছে এমন একটি ক্ষুদে বিশ্ব যার মধ্যে সর্বপ্রকার আসমানী বৈশিষ্ট্যের মিলন ঘটেছে এবং কেবল 'মানুষের' মধ্যেই আল্লাহ্ 'নিজের' সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন হন। নস্টিসিজম নিওপ্লাটোনিজম, খৃষ্ট ধর্ম এবং অন্যান্য সূত্র থেকে আহরিত উপাদানগুলির সংমিশ্রণে গ্রথিত এই মতবাদ ইবনুল 'আরাবী প্রবর্তিত ব্যবস্থার মূল বিষয়। এটি মূলত একটি লোগোস মতবাদ। আসমানী সত্তা বস্তুর মধ্যে মূর্ত হয়েছে এবং মানুষের সত্যিকারের ধারণায় তা প্রকাশ করা হয়েছে যার প্রথম মূর্ত প্রতীক হযরত আদম। আল্লাহর মূর্ত প্রতীক এবং প্রকৃতির মূল আদর্শ হিসাবে পূর্ণাঙ্গ 'মানুষ' (আল-ইনসানুল কামিল) একই সময়ে আল্লাহর সুষমা ও মহাজাগতিক মূলনীতির মধ্যবর্তী সত্তা, যার দ্বারা বিশ্ব প্রাণবন্ত ও পরিপুষ্ট হয়। অবশ্য সর্বোৎকৃষ্ট পরিপূর্ণ মানুষ হচ্ছেন হযরত মুহাম্মদ। ইবনুল 'আরাবী হযরত মুহাম্মদকে তাঁর সত্যিকারের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী হাকিকাতুল হাকিক হিসাবে বর্ণনা করেছেন।
ওরিজেন লোগোসের বিবরণ দিতে গিয়ে একই ধরনের উক্তি করেছেন। এ হিসাবে তিনি হযরত মুহাম্মদ বিশ্বসৃষ্টির মাধ্যমে (আল হাককুল মাখলুকু বিহি)। পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি (খলীফা) এবং যার ওপর এর অস্তিত্ব নির্ভরশীল ও যার দরুন এটিকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেই মূল দণ্ড (কুতুব)। তিনি সব আসমানী প্রত্যাদেশের অতুলনীয় সূত্র ও প্রবাহ পথ; কারণ হযরত আদম যখন মাটির অবয়ব তখন তিনি ছিলেন নবী। এটি সেন্ট পলের এবং যীশুখৃস্ট সংক্রান্ত চতুর্থ সুসমাচারের (ফোর্থ গসপেল) রচয়িতার মতবাদের প্রতিধ্বনির মত শোনায়। ইবনুল 'আরাবী খৃষ্ট ধর্মের প্রতি অদ্ভুত ধরনের সহানুভূতি প্রদর্শন করেন এবং কালিমা শব্দ যীশুখৃস্ট এবং হযরত মুহাম্মদ উভয়টির জন্য প্রয়োগ করেন। আসমানী সত্তা ব্যক্তিবিশেষের ন্যায় শ্রদ্ধাভাজন থাকেন, যার মধ্যে এবং মধ্য দিয়ে আল্লাহ নিজেকে পরিচিত করেন। আল্লাহর একত্বকে ক্ষুণ্ণ না করে গভীর ধর্মীয় আশা-আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার প্রয়োজনীয়তা থেকে ইসলামী লোগোস মতবাদের উদ্ভব হয়েছে বলে মনে হয়। খৃস্টানরা আল্লাহর মধ্যে যেখানে বিভিন্ন সত্তার পার্থক্য সৃষ্টি করেন সেখানে এটি বিভিন্ন দিকের পার্থক্য সৃষ্টি করে। বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের দিক দিয়ে পূর্ণাঙ্গ মানুষ তথা ইনসানে কামিল আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর সত্তার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে বেঁচে থাকেন।
অবশ্য ইবনুল 'আরাবীর মতে যে বহু আকারের মধ্যে আল্লাহ নিজেকে প্রকাশ করেন মহানবী ও সাধকদের জনপ্রিয় ভজন তারই অন্যতম। তিনি বলেন, সত্যিকারের সূফী তাঁকে (আল্লাহকে) সব ধর্মের মধ্যেই খুঁজে পাবেন।
আমার হৃদয় যে কোন আকার ধারণে সক্ষম: সন্ন্যাসীর জন্য মঠ, প্রতিমার জন্য মন্দির, দ্রুতগামী হরিণের চারণভূমি, ভক্তের জন্য কাবা, তওরাতের টেবিল আর কুরআনের রিহল, প্রেমই আমার বিশ্বাস, তাঁর উটগুলি যে দিকেই যাক, একমাত্র সত্যিকারের বিশ্বাস আমার।
অধ্যাত্মবাদের আল্লাহর তুলনায় ধর্মের আল্লাহ সীমাবদ্ধ, তাই কারো নিজস্ব ধর্মমতের প্রশংসার কিংবা অন্যের ধর্ম মতের নিন্দার মধ্য দিয়ে অজ্ঞতা ও অন্যায় প্রদর্শন করা হয়। এমনকি কাফের এবং মূর্তিপূজকরাও তাঁর নিজস্ব প্রতিমূর্তিতে আল্লাহ্ দ্বারা সৃষ্ট। আত্মা স্বর্গীয় সত্তার একটি রীতি-প্রকৃতি, এই সত্যের আলোকে ইবনুল আরাবী এরূপ সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে, মানুষের কাজসমূহ আত্মসংকল্প প্রসূত। কিন্তু তাঁর ব্যবস্থায় সাধারণ অর্থে স্বাধীন চিন্তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ্ নিজেই তাঁর বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজনে সক্রিয় হন। তাঁর বিভিন্ন রকমের সীমাবদ্ধতা যে সব বস্তুর মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয় সেগুলির মধ্যেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। এর সঙ্গে আলো ও অন্ধকার, ভালো ও মন্দ এবং যে সব বিপরীত জিনিসের ওপর জ্ঞানের সম্ভাবনা নির্ভরশীল তাঁর সব কিছু সংশ্লিষ্ট। যেহেতু মন্দ হিসাবে মন্দের অস্তিত্ব নেই, সে জন্য নরক একটি সাময়িক অবস্থা মাত্র। তাই প্রত্যেক পাপীই শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাবে।
ইবনুল 'আরাবীর মধ্যে এমন অনেক কিছু আছে যা আমাদের স্পিনোযার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু তাঁর গূঢ় কার্যকলাপ প্রায়ই এ সত্যকে প্রচ্ছন্ন রাখে যে, তিনিও একজন গভীর এবং মৌলিক চিন্তাশীল ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু ইবনুল আরাবী কোন কোন মধ্যযুগীয় খৃস্টান চিন্তাবিদকে অবশ্যই প্রভাবিত করেছেন। প্রফেসর আসিন পালাসিওস সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন যে, তিনি দোযখ, বেহেস্ত ও স্বর্গীয় অন্তর্দৃষ্টির যে সব বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর বহু অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য দান্তের রচনায় এতো ঘনিষ্ঠভাবে প্রতিফলিত হয়েছে যে, তাঁকে কিছুতেই আকস্মিক বা ঘটনাক্রমিক বলা যায় না। এয়ীসত্তার (ত্রিত্ব) প্রতীক তিনটি বৃত্ত-দান্তে ঠিক ইবনুল 'আরাবীর ন্যায় একইভাবে বর্ণনা করেছেন।' দান্তে আমাদের বলেন, কিভাবে তিনি বেহেশতে ক্রমেই যত উপরে উঠছিলেন ততোই বিয়েটিসকে সুন্দর থেকে সুন্দরতর দেখে তাঁর প্রেম প্রগাঢ়তর এবং আধ্যাত্মিক দৃষ্টি গভীরতর হয়। প্রায় একশ বছর আগে লিখিত ইবনুল 'আরাবীর একটি কবিতায় একই ধারণা দেখতে পাওয়া যায়। তাঁর প্রেমাস্পদ নিযামের সম্মানে আধ্যাত্মিক গীতি কবিতা রচনা করায় কেলেঙ্কারির সৃষ্টি হয়। দান্তে তাঁর কনভিটোতে চৌদ্দটি প্রেম সঙ্গীতের গূঢ় অর্থ বিশ্লেষণ করার ইচ্ছা ঘোষণা করেন। সাধারণ ক্ষেত্রে ও বিশেষ ক্ষেত্রে এতটা সাদৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছে যে, তাঁর কেবল একটি উপসংহারই সম্ভবপর। মহানবীর স্বর্গারোহণ (মিরাজ) বা কাহিনীর সঙ্গে আল ফারাবী, ইবনে সিনা, গায্যালী ও ইবনুল 'আরাবীর ন্যায় লেখকের জনপ্রিয় ও দার্শনিক ধ্যান-ধারণা এমন একটি সাধারণ সাহিত্য সংস্কৃতির ভাণ্ডার সৃষ্টি করেছে, যার সঙ্গে ত্রয়োদশ শতকে ইউরোপের শ্রেষ্ঠমনা ব্যক্তিরা পরিচিত হন।
এবারে সেই প্রাচ্যের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করা যাক যেখানে ইতিমধ্যেই পারস্যে অধ্যাত্মবাদের স্বর্ণ যুগ শুরু হয়। মঙ্গোলরা এশিয়ায় বর্বতার স্বাক্ষর হিসাবে রেখে যায় কেবল বিভীষিকা, সীমাহীন দুর্দশা ও বিশৃঙ্খলা। নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে ক্লান্ত পারস্য স্বস্তির সন্ধানে তাদের শরণাপন্ন হয় যারা তাঁকে একদিকে এমন সব আদর্শ জিনিস প্রদান করে যা পৃথিবী থেকে উধাও হয়েছিল বলে মনে হয়-শান্তি-শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, পরোপকার, প্রতিষ্ঠিত রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সামাজিক সদ্গুণাবলী যা যে কোন সংগঠিত জাতীয় জীবনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে। অপর দিকে তারা পারস্যকে চিরস্থায়ী শান্তি ও আনন্দের একটি অধ্যাত্মবাদীর অন্তর্দৃষ্টিও দান করে। এই অন্তর্দৃষ্টি ঐসব পবিত্র ব্যক্তি লাভ করেন যারা নিজেদের মধ্যে একমাত্র বাস্তব ও চিরস্থায়ী আধ্যাত্মিক জগতের সন্ধান করেন। সূফী কবিরা এই চিত্র তুলে ধরার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তারা যেভাবে এই দায়িত্ব সম্পাদন করেন তাতে পারস্যের আধ্যাত্মিক কাব্য এমন সব দেশেও খ্যাতি লাভ করে যেখানে খুব কম লোকই পারস্য ভাষা পড়তে পারে।
এই চিত্রের জ্ঞানদীপ্ত পটভূমি রচনা করেন ইবনুল 'আরাবী। তাঁর প্রভাবে সূফীবাদ ততোটা হৃদয় ও বিবেকের ব্যাপার না হয়ে এমন একটি কল্পনামূলক দর্শনে রূপায়িত হচ্ছে যার সঙ্গে প্রাথমিক অধ্যাত্মবাদীদের অনুপ্রেরণা সৃষ্টিকারী নৈতিক ও ধর্মীয় অনুভূতির সম্পর্ক নেই। তিনি বরং পুরোপুরি দিব্যজ্ঞান ও রহস্যজ্ঞানের অধিকারী যার কাছে কোন রহস্যই গোপন থাকে না। তিনি পরিপূর্ণ মানুষ যিনি নিজেকে আল্লাহ বা লোগোসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত করেন। 'আমি সেই দিন ছিলাম যখন কোন নাম ছিল না, কিংবা নামের সঙ্গে প্রদত্ত অস্তিত্বের কোন চিহ্ন ছিল না। আমার দ্বারাই নামগুলি ও নামের অধিকারীরা দৃশ্যমান হয়... সেই দিন যখন 'আমি' এবং 'আমরা' ছিলাম না।'
অবিনশ্বর কেবল আল্লাহ্ মহান সত্তা। তাঁর সিফাতসমূহ তাঁর মহান জাত থেকে পৃথক করে চিন্তা করা হয়, কিন্তু বাস্তবে সেগুলি তাঁরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর বৈশিষ্ট্যগুলির যে সমষ্টিকে আমরা বিশ্ব জগত বলি তা চির পরিবর্তনশীল রঙের জগৎ, এ সবই তাঁর কুদরত। আল্লাহ্ ছাড়া কোন অস্তিত্ব নেই। আল্লাহর ইচ্ছাতেই তাদের উদ্ভাসিত করে সেখান থেকেই তারা একটি সাপেক্ষ অস্তিত্ব লাভ করে। উপরে বিভিন্ন জিনিসের পরিকল্পনার মধ্যে মানুষের স্থান এবং দায়িত্ব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাঁর (মানুষের) মধ্যে আধ্যাত্মিক ও বাহ্যিক জগত মিলিত হয় এবং সে বিশ্বজগতের কেন্দ্রে অবস্থান করে যার সে আত্মা। কিন্তু তাঁর দৃশ্যমান দিকে সে 'অনস্তিত্বের অন্ধকারে অন্ধকারাচ্ছন্ন'। তাঁর দৈহিক স্নেহ-মমতা তাঁকে বন্দী করে রাখে। তাই সে মনে করে যে, সে আল্লাহ থেকে পৃথক। অনুভব ও যুক্তির দ্বারা সমর্থিত হলেও এই বিভ্রম সূফী দর্শনের প্রথম মূলনীতিকে অস্বীকার করে। সূফী মূলনীতি শিক্ষা দেয় যে, সর্বপ্রকার অস্তিত্ব এবং সর্ব প্রকার ক্রিয়া আল্লাহর কুদরতেরই প্রকাশ। এর দ্বারা কি বোঝায় তা কেবল এ সম্পর্কে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সূফীরাই উপলব্ধি করতে পারেন। অবশ্য প্রতীকের মাধ্যম ছাড়া তারা অন্যকে তা বোঝাতে পারেন না। যে প্রেমমূলক কবিতার মধ্যে এর ছায়া প্রতিফলিত হয় তাতে জ্ঞানের মধ্য দিয়ে যা বোঝা যায় না তাঁর ইঙ্গিত কল্পনায় পাওয়া যায়। তাছাড়া প্রেমের আবেগ এমন এক মহাবিষ্ট অবস্থার সৃষ্টি করে যাকে সূফীরা সব সময় অতিন্দ্রীয় সত্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে এই উদ্দেশ্যে এগুলি রচনা করা হতো। তাঁর সৌন্দর্য ও তাঁর রাজসিকতার মধ্যে আমি নীরব উল্লাসিতায় দাঁড়িয়ে থাকি, প্রতিভাত হয় তা যা আমার সত্তার মধ্যে যায় আসে। ওই দেখো, তাঁর মুখমণ্ডলে মিশ্রিত হয়েছে প্রতিটি মোহনীয়তা ও দীপ্তি; সৌন্দর্যের সবখানি একত্ব লাভ করেছে একটি পরিপূর্ণ মুখাবয়বে, তাকে দেখে চিৎকার করবে, 'তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ্ নেই এবং তিনিই সবচাইতে মহান!'
যে গৃহে ক্রমাগত বীণার ধ্বনি শোনা যায়, তাঁর মালিক সম্পর্কে, সেই গৃহ সম্পর্কে প্রশ্ন করছো? এটি যদি কা'বা হয়, এই প্রতিমা-আকারের অর্থ কি? আর যদি মেজিয়ান মন্দির হয়, আল্লাহর এই নূরের অর্থ কি? এই গৃহে যে ধন-সম্পদ তা ধারণ করার জন্য বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড অতীব ক্ষুদ্র; এই 'গৃহ' এই 'মালিক' সবই অভিনয় আর ছল। গৃহটিকে ছুঁয়ো না, কারণ এই গৃহ একটি তিলিসমাত; মালিকের সঙ্গে কথা বলো না, কারণ তিনি পূর্ব রাত্রে নেশাগ্রস্ত। এ গৃহের ধূলিকণা আর আবর্জনা কস্তুরী ও সুগন্ধী, এ গৃহের ছাদ ও দরজা শুধু কবিতা আর সুর। এক কথায়, যে-ই এ গৃহে প্রবেশ করেছে সে-ই বিশ্বের সুলতান এবং কালের সোলায়মান। হে মালিক, এ ছাদ থেকে একবার তোমার মাথা নামাও, কারণ তোমার সুদর্শন মুখাবয়ব সৌভাগ্যের প্রতীক। আত্মা আয়নার ন্যায় তাঁর হৃদয়ে তোমার অবয়ব গ্রহণ করেছে; তাঁর হৃদয়ে তোমার কুঞ্চিত কুন্তলের অগ্রভাগ মধুচক্রের ন্যায় নিমজ্জিত। এই হচ্ছেন বেহেশতের প্রভু, যিনি শুক্র গ্রহ ও চাঁদের ন্যায়; এই হচ্ছে প্রেম নিকেতন, যার সীমা বা শেষ নেই।
এসব কাসীদা্য স্থান ও সময়ের ঊর্ধ্বে বিচরণ করে যে আনন্দ বিহবল অবস্থায় সব কিছু দেখা যায় তাঁর কতিপয় শ্লোকে আল্লাহর অনুসন্ধানে আত্মার ব্যথাতুর আকাঙ্ক্ষাকে মূর্ত করেছে। এই কাব্যধারাকে পূর্ণতা দান করেছেন নিযামী (মৃ. ১২০৩ খৃ)। তাঁর কাব্যের শিরোনামের অনুবাদ 'পাখির কথা' দেওয়া যেতে পারে। কাহিনীর অন্তিমে পাখিরা উপলব্ধি করে যে, 'তারা নিজেরাই সীমুর্গ, আর সীমুর্গ হচ্ছে সেই ত্রিশটি পাখি (সী মুর্গ)।' সেই 'উপস্থিতি' থেকে কোন কথা ছাড়া এই মর্মে জবাব আসে, "এই সূর্যের ন্যায় 'উপস্থিতি' একটি আয়না, যে-ই সেখানে প্রবেশ করে সে-ই নিজেকে সেখানে দেখতে পায়; দেহ ও আত্মা সেখানে একই দেহ ও আত্মা দেখতে পায়।” মানুষের মধ্যে আল্লাহর আত্মপ্রকাশকে সীমাবদ্ধ করায় জিলি খৃস্টানদের দোষারোপ করেছেন। আল্লাহ্ বলেছেন, "আমি আমার সত্তা আদমের মধ্যে সঞ্চারিত করেছি।”
মওলানা জালালুদ্দীন রুমীর মসনবী-ই-মা'নবীতে বা 'আধ্যাত্মিক শ্লোকে' পারস্য সূফীবাদের ভেন্টানশাউউৎ অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে। মওলবী দরবেশ সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা এই মহান সাধক ১২৭৩ খৃস্টাব্দে কোনিয়া্য ইন্তিকাল করেন। তাঁর প্রথমদিকের চরণগুলিতে মূল বক্তব্য প্রতিফলিত হয়েছে। 'ওই শোন, কত তীব্র নলের বাঁশিতে বিরহীর ব্যথাদীর্ণ সুর। জর্জরিত আমি নলের শয্যায়, আমার গান কাঁদায় নরনারী, দিতে চায় প্রেমের বেদনা আবেগ, আমি চাই দরদী হৃদয়। দূর দূরান্তে কেঁদে বেড়ায় হতভাগ্য তাঁর সেই সুখ আর ঘরের সন্ধানে।' আল্লাহর কাছে আচার অনুষ্ঠান ও ধর্ম মতের মূল্য নেই। তিনি মসজিদ, গির্জা বা মন্দিরে বাস করেন না বরং পবিত্র হৃদয়ে বাস করেন। অত্যাবশ্যকীয় জিনিস হচ্ছে একটি পরিপূর্ণ নৈতিক রূপান্তর যা কেবল গভীর বিশ্বাস এবং আকুল প্রার্থনার মাধ্যমে লাভ করা যায়। জালালুদ্দীন আল্লাহর মঙ্গলত্বে এবং মানুষের পাপময়তায় গভীর বিশ্বাসী ছিলেন। কবির রচনার অনেকখানি স্থান জুড়ে রয়েছে আবেগপ্রবণতা ও অসৎ গুণাবলীর দক্ষ বর্ণনা। প্রেমের কারণে 'বাধ্যবাধকতা' কথাটি আমাকে অস্থির করে তোলে; যে ভালবাসে না কেবল সেই 'বাধ্যবাধকতা' দ্বারা বন্দী হয়।
যে নৈতিক উদ্দেশ্য মসনবী রচনায় প্রেরণা সৃষ্টি করে তাঁর দার্শনিক অনুচ্ছেদগুলিতেও তাঁর প্রভাব দেখা যায়। এসব অনুচ্ছেদে অস্তিত্বের প্রতিটি ধাপের মধ্য দিয়ে 'একক সত্তার' নিঃসরণ বর্ণনা করা হয়েছে। এটি সেই 'একত্বেরই' আয়না। এই বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আত্মা উপলব্ধি করে যে, তাঁর বিচ্ছিন্নতার সমস্ত অভিজ্ঞতা 'যে উপাদানের দ্বারা স্বপ্ন তৈরি হয় তাই'। প্রথমে সে আবির্ভূত হয়েছে প্রাণহীন রাজ্যে; সেখান থেকে এসেছে উদ্ভিদ জগতে; পুনরায় সেই বিজ্ঞ স্রষ্টা যাঁকে তুমি জানো সে তাকে প্রাণীত্ব থেকে উন্নীত করে মানুষের রাজ্যে। সে নিদ্রা নিমজ্জিত হলেও আল্লাহ তাকে ছেড়ে যাবে না এই বিস্তৃত অবস্থায়। জেগে ওঠে, সে একথা ভেবে হাসবে কি দুর্যোগের স্বপ্নইনা সে দেখেছে। নিশ্চিত হও; 'বিচারের দিন' হিসাব-নিকাশ করবে তুমি যা কিছু ভালো বা মন্দ করেছো এই জীবনে, এবং ব্যাখ্যা করবে তোমার সব স্বপ্ন। হে অত্যাচারী যে ক্ষত-বিক্ষত করেছো নিরীহকে, তুমি এই গভীর নিদ্রা থেকে জাগবে নেকড়ে হয়ে, তোমার রিপুগুলি একটির পর একটি ক্ষুধার্ত নেকড়ে হয়ে, ক্ষত-বিক্ষত কবরে তোমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ।
স্থাপত্য আর কিছু না হোক রোমান্টিক ছিল। সূফীদের স্বভাব হচ্ছে ঊর্ধ্বে বিচরণ, আর বিধিপন্থীদের কাজ হচ্ছে সেই বৃদ্ধার অনুসরণ যে রাজার শিকারী বাজ পাখিকে হাতে পেয়ে তাঁর ডানা ও নখর দুটি কেটে দেয়। অবশ্য ইসলামে এ ধরনের শাস্তি কার্যকর করা কঠিন, এবং সূফীবাদও মুসলিম সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরেই এর যুক্তিযুক্ত বিকাশের পথ অনুসরণ করে। এটিই ছিল তাদের প্রকৃষ্টতম পন্থা। যারা মোহাবিষ্ট অবস্থা সৃষ্টির স্বকল্পিত পন্থায় পরম আনন্দময়তার চর্চা করেন এবং এতোটা অনুপ্রাণিত বোধ করেন যে, তাদের ব্যক্তিসত্তা আল্লাহয় বিলীন হয়েছে, তাদের কাছে প্রচলিত নৈতিকতার নিয়ম-বিধিতে বা বিশ্বের অন্য কিছুতে কি আসে যায়? আদর্শের প্রতি তাদের অকৃত্রিম গভীর অনুরক্তি কিংবা তারা যে প্রকৃত সত্যের কথা তুলে ধরেন তা স্বীকার করতেই হবে। তারা পাপ-পঙ্কিলতার আবর্ত থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারে, তাদের আমল তাদের পাপ স্খলন করে দেয়। এটাও স্বীকার করতে হবে যে, মুরাকাবা-মুশাহাদার মাধ্যমে তারা উচ্চ মকামে উন্নীত হয়। তারা যে পরিচ্ছন্ন ধর্মানুভূতি এবং উচ্চতর নৈতিকতা লাভ করে তা ইসলামই তাদের দিয়েছে।
টিকাঃ
১. বক্তব্যটি একান্তভাবে লেখকের। অনুবাদক।
১. ম্যানেকী, ধর্মমতের অনুসারী। মেনিয নামে পরিচিত পারস্যের জনৈক ধর্মপ্রচারক ও তাঁর অনুসারীরা ৩য় থেকে ৭ম শতক পর্যন্ত এই ধর্মমত প্রচার করেন।
২. জরথুস্ত্র (খৃ. পু. ৬ষ্ঠ বা ৭ম শতক) প্রচারিত ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ববর্তী প্রাচীন পারস্য ধর্ম। যেন্দআবেস্তা নামক ধর্ম গ্রন্থে এর যেসব মূলনীতি উল্লিখিত রয়েছে তদনুযায়ী এর অনুসারীরা এক ধরনের পরকালে এবং সর্বব্যাপী ভালো শক্তি ও মন্দ শক্তির মধ্যকার অব্যাহত দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত ভাল শক্তির বিজয়ে বিশ্বাস করেন।
১. এই উক্তিটি একান্তভাবে লেখকের। অনুবাদক।
২. এই অভিমতও একান্তভাবে লেখকের। অনুবাদক।
১. এন্টিনোমিয়ে নিয়ম, খৃষ্টান সম্প্রদায় বিশেষের এরূপ মতবাদ যাতে বলা হয় যে, আত্মার মুক্তির জন্য নৈতিক বিধানের প্রতি আনুগত্য নয়, বরং কেবল বিশ্বাসই প্রয়োজন।
১. খৃস্টান ধর্মতত্ত্ববিদ, গুরু ও লেখক; আলেকজান্দ্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন (জীবিতকাল আনু, ১৮৫-২৫৪ খৃ.) -অনুবাদক।
৩. অভিমতটি একান্তভাবে লেখকের- অনুবাদক।
১. আধ্যত্মিক, ধর্মীয় ও দার্শনিক মতবাদসমূহের এমন একটি ব্যবস্থা যাতে খৃস্ট মতবাদের সঙ্গে গ্রীক ও প্রাচ্য দর্শনসমূহের সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে।
১. খৃস্টান ধর্মতত্ত্বে আল্লাহর বাণী; ত্রিত্বের (ট্রিনিটি, পিতা, পুত্র ও পরমাত্মা) দ্বিতীয় সত্তা যীশুখৃস্ট। গ্রীক দর্শনে সেই যুক্তি যাকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিয়ামক নীতির ভিত্তি হিসাবে মনে করা এবং যা কথার দ্বারা সুস্পষ্ট।
২. খৃস্টান ধর্মতত্ত্ববিদ, গুরু ও লেখক; আলেকজান্দ্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন (জীবিতকাল আনু, ১৮৫-২৫৪ খৃ.) -অনুবাদক।
৩. অভিমতটি একান্তভাবে লেখকের- অনুবাদক।
১. ওলন্দাজ দার্শনিক (১৬৩২-১৬৭৭), তাঁর মতে, আল্লাহই একমাত্র সারবস্তু যার দুটি দিক রয়েছে, চিন্তাও সম্প্রসারণ।
২. পুরো নাম বিয়েটিস পোর্টিনারী, ফ্লোরেন্সের জনৈক সুন্দরী, দান্তের প্রেমিকা যিনি তাঁর ডিভাইন কমেডিতে অমরত্ব লাভ করেছেন।
১. মেজাই নামে পরিচিত এবং জাদুকরি শক্তির অধিকারী বলে কথিত প্রাচীন মিডিয়া ও পারস্যের একটি পুরোহিত সম্প্রদায়ের মতাবলম্বী।
১. জার্মান শব্দ যার অর্থ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ও জীবন সম্পর্কে ব্যক্তি বিশেষের দর্শন বা ধারণা।
১. ত্রয়োদশ শতকের রুমীর বক্তব্যের সঙ্গে হিন্দুদের জন্মান্তর বাদ এবং উনবিংশ শতকের ডারউইনের বিবর্তনবাদ তুলনীয়।