📄 ভূগোল ও বাণিজ্য
দশম শতকের মাঝামাঝি সময়ের ইউরোপ, আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার একটি রাজনৈতিক মানচিত্র অংকন করি তাহলে দেখতে পাবো যে, 'বসতিপূর্ণ বিশ্বের' অতি বৃহত্তর যে অংশটিকে গ্রীকরা 'ওইকাউমেন' বলে অভিহিত করতো তা ইসলামী সরকার ও ইসলামী সভ্যতার অধিকারী দেশগুলির দখলে ছিলো। এসব দেশের মধ্যে মজবুত রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে না উঠলেও সাধারণভাবে এমন একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বন্ধন ছিলো যাতে তাদের অধিবাসীরা এবং মুসলমান অধিবাসীরাই নয়, বরং সকল শ্রেণীর নাগরিকই নিজেদের এক বিশাল সাম্রাজ্যের নাগরিক বলে মনে করতো। এ সাম্রাজ্যের ধর্মীয় কেন্দ্র ছিলো মক্কা এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিলো বাগদাদ। মূলত মদীনা থেকে পর্যায়ক্রমিক বিজয় অভিযানের মাধ্যমে পূর্ববর্তী তিন শতকে এই বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে। পশ্চিম দিকে মিসর এবং সুদূর অ্যান্টি-এ্যাটলাস পর্যন্ত আটলান্টিক উপকূলসহ আফ্রিকার সমগ্র উত্তর উপকূল এর অন্তর্ভুক্ত ছিলো। আরো দূরে অ্যাস্টরিয়া ছাড়া মসগ্র স্পেন এবং সিসিলি ও ক্রিট দ্বীপগুলি এর অন্তর্ভুক্ত ছিলো। সার্ডিনিয়া এবং সাইপ্রাসও মুসলমানদের অব্যাহত অভিযানের আওতায় ছিলো। তেমনি অবস্থায় ছিলো দক্ষিণ ইটালীয় উপকূল, যেখানে বারি প্রভৃতি কতিপয় শহর প্রকৃতপক্ষে মুসলিম শাসনাধীনে ছিলো এবং আমাল্ফি ইত্যাদি কতিপয় শহর তাদের প্রভাবাধীনে ছিলো। আরবের উত্তরে আর্মোনিয়া ও দক্ষিণপূর্ব ককেসাসসহ সিরিয়া মুসলমানদের স্থায়ী অধিকারভুক্ত ছিলো। আরো পূর্বে ইরাকসহ মেসোপটেমিয়া এবং তারপর আধুনিক পারস্য ও আফগানিস্তানের সামগ্রিক অঞ্চল তারা অধিকারভুক্ত করে। আবার এসব দেশের উত্তরদিকে ট্রান্নোক্সানিয়াও ইসলামের কর্তৃত্বাধীনে আসে। পশ্চিমে খাওয়ারিজম্ বদ্বীপ অঞ্চল এবং পূর্বে ফারগনার পার্বত্য ও উপত্যকা অঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত ছিলো। ইতিমধ্যে অষ্টম শতকে সিন্ধু নদ অতিক্রম করা হয়। সিন্ধুদেশসহ এর ভাটি অঞ্চল ইসলামী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। আফ্রিকার দক্ষিণ দিকে কেবলমাত্র মিসরে আসওয়ানের অক্ষাংশ মুসলমানরা কদাচিৎ অতিক্রম করে।
'আমাদের যুগে ইসলামী সাম্রাজ্য ফারগানার সীমা থেকে খুরাসান, আল-জিবান (মেডিয়া) ইরাক ও আরব হয়ে ইয়ামনের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এই পথ প্রায় চার মাসের সফর ছিলো। এর প্রস্থ ছিলো রুম দেশ (বাইযেন্টাইন সাম্রাজ্য) থেকে সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া, ইরাক, ফারস্ এবং কিরমান হয়ে ফার্স্ সাগরের (ভারত মহাসাগর) উপকূলবর্তী আল-মনসূরা অঞ্চল পর্যন্ত। এইপথ ভ্রমণ করতে প্রায় চারমাস অতিবাহিত হতো। ইসলামী রাজত্বের দৈর্ঘ বর্ণনা করতে গিয়ে ইতিপূর্বে আমি মাগরিব (উত্তর আফ্রিকা) ও আন্দালুসের (স্পেন) কথা উল্লেখ করিনি, কারণ এটি জামার আস্তিনের মতো। মাগরিবের পূর্বে ও পশ্চিমে কোন ইসলামী রাজ্য নেই। অবশ্য কেউ যদি মিসরের পরে মাগরিবের দেশে যায় তাহলে সুদানের (কৃষ্ণকায়) দেশ মাগরিবের দক্ষিণে অবস্থিত এবং এর উত্তরে রুম সাগর (ভূমধ্য সাগর) এবং তারপর রুম অঞ্চল অবস্থিত।' ভূগোলবিদ ইবন হাউকালের অনুমানিক ৯৭৫ খৃস্টাব্দের লেখা থেকে উপরিউক্ত উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে।
উপরে বর্ণিত অঞ্চলগুলির সাথে বর্তমানে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলির আদৌ কোন মিল না থাকলেও এবং তা বর্তমানের তুলনায় অনেক ছোট হলেও একথা সত্য যে, এই অঞ্চলগুলি ধর্মীয় দিক ছাড়া রাজনৈতিক দিক দিয়েও একটি শক্তিশালী ব্লক ছিলো। অস্ত্রের শক্তিতে এগুলি একতাবদ্ধ হয় এবং তৎকালে জ্ঞাত বিশ্বে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়।
অপর দিকে আমরা যদি ঐ সময়কার খৃস্টান ইউরোপীয় বিশ্বের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অবস্থার কথা বিবেচনা করি তাহলে এই বিশ্ব বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের উপর কতখানি নির্ভরশীল ছিলো তা সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি করতে পারবো। ঐ সময় ভূমধ্যসাগরের দক্ষিণে মুসলিম উপকূলসমূহের শাসকদের অধীনে একটি অপ্রতিরোধ্য প্রতিবন্ধকতা গড়ে ওঠে। উত্তর ককেসাস ও পূর্ব ইউরোপে যেসব অর্ধ সভ্য জাতি বাস করতো তারা যতটা খৃস্টান প্রভাবাধীন ছিলো, অন্তত ততোটা মুসলিম প্রভাবাধীনেও ছিলো। কেবলমাত্র ইউরোপের উত্তরে পৌত্তলিক নর্ম্যানরা (উত্তর ইউরোপের অধিবাসী) এ সময় তাদের শক্তি সম্প্রসারণের সূচনা করে, যা দ্বাদশ শতকে ইসলামের একচ্ছত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্বের অবসানে বিরাট অবদান সৃষ্টি করে।
দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্মের তীর্থস্থানগুলির তুলনামূলক ভৌগোলিক অবস্থান সম্পূর্ণ পৃথক। খৃস্টান ইউরোপের আদর্শ ধর্মীয় কেন্দ্র জেরুজালেম ৬৩৮ খৃস্টাব্দ থেকে মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণাধীনে ছিলো। কিন্তু মুসলিম বিজয়ের ফলে হোলি সেপালচারে ইউরোপীয় খৃস্টানদের তীর্থযাত্রা বন্ধ হয়নি। আমরা যে সব প্রথম তীর্থযাত্রীর ভ্রমণ কাহিনী পাই তারা হচ্ছেন ফ্রাঙ্ক আরকাল্ল্ফ (আনু. ৬৮০), স্যাক্সন উইলিবান্ড (আনু. ৭২৫) এবং জনৈক বার্নার্ড, যিনি আনু. ৮৭০ খৃস্টাব্দে রোম থেকে তীর্থযাত্রা করেন। নিঃসন্দেহে আমরা কেবল এদের কাছ থেকেই মুসলমানদের দ্বারা বিজিত দেশসমূহের তথ্য পাইনি। এক্ষেত্রে বাইযেন্টাইন সাম্রাজ্যের খৃস্টানদের সঙ্গে মিসর, সিরিয়া, মেসোপটেমিয়ায় বসবাসকারী তাদের স্বধর্মীদের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।
মুসলিম বিশ্বের ব্যাপারসমূহ ছিলো সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের। তীর্থযাত্রার কেন্দ্রস্থল মক্কা স্বয়ং মুসলমানদের কাছে একটি কেন্দ্রীয় ভৌগোলিক মর্যাদা লাভ করে। আল্লাহর ঘরে তীর্থযাত্রা বা হজ্জ ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম। ইসলামী সাম্রাজ্যের সকল এলাকা থেকে মুসলমানরা এখানে মিলিত হতেন। কাজেই হজ্জ কেবল ধর্মীয় ঐক্যসাধনের একটি শক্তিশালী নিয়ামক ছিলো না, মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নে এবং বিশ্বের সকল অংশ সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যে জ্ঞান বিতরণে হজ্জ বৈষয়িকভাবেও সাহায্য করে। হজ্জকে কেন্দ্র করে কতিপয় ভ্রমণ নির্দেশক পুস্তিকা সংকলিত হয়। এগুলিতে বিভিন্ন দেশ থেকে মক্কাগমনের পথসমূহের বিভিন্ন কেন্দ্র ও পর্যায় উল্লিখিত হয়। অবশ্য এগুলিতে তৎকালীন জ্ঞাত বিশ্বের অমুসলিম এলাকাগুলি সম্পর্কে জ্ঞানের ও আগ্রহের অভাব ছিলো।
ইসলাম প্রায় সকল দিক দিয়ে খৃস্টান ইউরোপের সাংস্কৃতিক দিগন্তকে সীমাবদ্ধ করার পর প্রায় এক সহস্র বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। ইত্যবসরে ইউরোপ নৌপ্রদক্ষিণ করেছে এবং যেসব বাধা তাকে অজ্ঞাত বিশ্বের কথা বাদ দিলেও জ্ঞাত বিশ্বের দক্ষিণ ও পূর্ব অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে সেগুলিকে অতিক্রম করেছে। ইউরোপ এর অনেকখানি নিজস্ব শক্তি ও উদ্যোগেই করেছে। কিন্তু যারা এক সময় বিশ্বের হর্তাকর্তা ছিলেন তাদের দ্বারাও ইউরোপ অনেকখানি উপকৃত হয়েছে। তাই ভৌগোলিক জ্ঞান আবিষ্কার ও বিশ্ববাণিজ্যের ক্ষেত্রে তাদেরকে তার সাংস্কৃতিক পূর্ব পুরুষ হিসাবে দেখা ইউরোপের উচিত ছিলো। এসব কর্মক্ষেত্রে আমাদের আধুনিক সভ্যতায় ইসলাম যে অবদান রেখেছে তা আমাদের ব্যবসায়-বাণিজ্য ও নৌচলাচলের শব্দভাণ্ডারে বহু মূল আরবী শব্দ থেকে বোঝা যায়। আমাদের প্রকৃত ভৌগোলিক জ্ঞান যে এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত কেবলমাত্র তার ঐতিহাসিক বিকাশ পর্যালোচনার মাধ্যমেই এই প্রভাবের গভীরতা প্রমাণ করা যায়। কারণ আধুনিক ভূগোল এমন একটি প্রত্যক্ষ ও ঐতিহ্য বর্জিত বিজ্ঞান যেখানে পূর্ববর্তী যুগসমূহের অল্প বিস্তর নির্ভুল প্রায় সব মতামতই বিবেচনার বহির্ভূত রাখে। আমি 'প্রায়' শব্দটি কেন ব্যবহার করেছি তার দৃষ্টান্ত হিসাবে উল্লেখ করতে চাই যে, ১৮৪০ খৃস্টাব্দে জউবার্ট যখন তার ইদ্রিসীর ফরাসী অনুবাদের সম্পাদনা করেন তখন এই সংস্করণের দ্বারা বিশ্বের ভৌগোলিক জ্ঞান এবং বিশেষ করে আফ্রিকার জ্ঞান বৃদ্ধি পেতে পারে এমন কথা চিন্তা করা হয়নি।
আমাদের বিশ্ব-জ্ঞানের ক্ষেত্রে আমাদের ইসলামী সংস্কৃতির পূর্বপুরুষদের ঐতিহাসিক প্রভাব পর্যালোচনা কিছুটা দুঃসাধ্য। কারণ, মুসলমানদের ভৌগোলিক জ্ঞান কতোটা ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভরশীল ছিলো, তারা ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে কতদূর পর্যন্ত গিয়েছিলেন এবং তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিস্তার কতটা ছিলো, এগুলি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সবসময় সহজ নয়। নবম শতক থেকে চতুর্দশ শতক পর্যন্ত এক উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক রচনা আরবীতে প্রকাশিত হয়। তাই উপরোক্ত বক্তব্য বিস্ময়কর মনে হতে পারে। কিন্তু আমাদের কাছে এই রচনার প্রধান অংশ জ্ঞানী ও সাহিত্যিকদের সরকারী বিজ্ঞান মাত্র। এসব লেখক যেসব অঞ্চলে ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভ্রমণ করেছেন, সেগুলি সম্পর্কে যতবেশি পর্যবেক্ষণশীল হোন না কেন, এবং যেসব পর্যটক ও নাবিকের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন তাদের কথা যত মনোযোগ সহকারেই শ্রবণ করুন না কেন, তারা তখনো কমবেশি আদর্শগত ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত মতামতের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ ছিলেন। এই অবস্থায় 'অন্ধকার যুগের' খৃস্টান পণ্ডিতদের চাইতে তাদের মতামত অনেক বেশি সংস্কারমুক্ত থাকলেও কতিপয় বাস্তবকে তারা সত্যিকার আলোকে দেখতে পাননি। এই সরকারী ও সাহিত্যমূলক বিজ্ঞান ছাড়াও এসময় সমুদ্র ভ্রমণকারী ও বণিকদের বিরাট নৌ ও ভৌগোলিক অভিজ্ঞতা ছিলো। সাহিত্যিকরা অবশ্যই এদের জ্ঞানের দ্বারা লাভবান হন। কিন্তু কোন কোন সময় তাদের নিজস্ব লেখা থেকে দেখা যায় যে, যেসব ব্যবসায়ী ও নাবিক ততোটা দাম্ভিকতার আশ্রয় গ্রহণ করেননি তারা লেখকদের চাইতেও বেশি সংস্কারমুক্ত ছিলেন। বর্তমানে আমরা এই অপেক্ষাকৃত বিনয়ী লোকদেরই ইসলাম ও মধ্যযুগীয় ইউরোপের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধান আপোসকারী ও শিক্ষক হিসাবে বিবেচনা করবো। বড় বড় আরবী ভৌগোলিক রচনা জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত ভৌগোলিক ক্ষেত্র ছাড়া মধ্যযুগীয় ভৌগোলিক মতামতের ক্ষেত্রে কার্যত তাৎক্ষণিক কোন প্রভাব সৃষ্টি করেছে বলে মনে হয় না।
আমরা অবশ্য আরবী সাহিত্যে মুসলমানদের বিরাট ভৌগোলিক জ্ঞান কিভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তার পর্যালোচনা পরিহার করবো না। ইসলামের প্রথম ১৫০ বছরে বিজ্ঞান হিসাবে ভূগোল, আমরা খৃস্টান জগতে যা লক্ষ্য করেছি তার চাইতে নিশ্চয়ই উন্নত ছিলো না। মহানবীর সমসাময়িক লেখকদের উক্তিতে বিশ্বের দৈর্ঘ, অংশসমূহ নীলনদের উৎস এবং অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে অদ্ভুত মতামত পাওয়া যায়। এসব মতামতের মধ্যে একটিতে পৃথিবীকে একটি পাখির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে যার মাথা হচ্ছে চীন এবং লেজ হচ্ছে আফ্রিকা। কুরআনে দুবার ভৌগোলিক ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ্ একটি অনতিক্রম্য বাধার সাহায্যে দুটি সমুদ্রকে পৃথক করেছেন (২৫.৫৫; পাতা ১৯,২০)। পণ্ডিত ব্যক্তিরা এই উক্তিকে ভূমধ্যসাগর এবং লোহিত সাগরসহ ভারত মহাসাগরের প্রতি ইঙ্গিত বলে অভিমত প্রদান করেছেন এবং তাদের এই বিশ্লেষণ সম্ভবত সত্য। দুই সমুদ্রের এই মতবাদ যে মূলত পারসিক, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কুরআনে উল্লিখিত হওয়ায় এই মতবাদটি ধর্মীয় বিশ্বাসে উন্নীত হয়েছে এবং মুসলমানদের সর্বপ্রকার ভৌগোলিক রচনায় ও মানচিত্র অঙ্কন বিদ্যায় এটি বহুল পরিমাণে প্রভাব বিস্তার করেছে।
গ্রীকদের প্রভাবেই ইসলামে ভূগোলের বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা শুরু হয়। নবম শতকের শুরুতে বিশেষ করে খলীফা আল মামুনের রাজত্বকালে (৮১৩-৩৩) গ্রীক রচনাবলীর যে ব্যাপক অনুবাদকার্য শুরু হয় তাতে মুসলমানরা গ্রীক সংস্কৃতির আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারী হয়ে পড়েন। এর একটি ফলশ্রুতি হচ্ছে টলেমীর ভৌগোলিক রচনার সঙ্গে তাদের পরিচিতি। টলেমীর আফ্রিকার পূর্ব উপকূলকে প্রাচ্যের দিকে সম্প্রসারিত করার মতবাদ দুই সমুদ্রের মতবাদের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। টলেমীর রচনার প্রাথমিক আরবী অনুবাদ আমরা পাই নি, কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল খারেজমী ৮৩০ খৃষ্টাব্দের দিকে এর যে পরিবর্তিত সংকলন প্রণয়ন করেন তা পাওয়া যায়। কিন্তু এর সঙ্গে আবশ্যিকভাবে যে মানচিত্র ছিলো তা নেই। আল খারেজমীর অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাগুলি অনেকাংশেই টলেমীর অনুরূপ, কিন্তু তাঁর গ্রন্থে মুসলিম বিজয়ের পর যেসব স্থানের সন্ধান পাওয়া যায় সেগুলির ভৌগোলিক অবস্থানও দেয়া হয়েছে। এই শেষোক্ত তথ্যগুলো জোতির্বিজ্ঞানের নতুন পর্যবেক্ষণের ফল কিনা তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। আমরা শুধু এটুকু জানতে পারি যে, খলীফা আল মামুন সিরীয় মরুভূমিতে একটি ভৌগোলিক ডিগ্রী পরিমাপ করার নির্দেশ দেন এবং একই খলীফার নির্দেশ আল-খারেজমীসহ সত্তরজন পণ্ডিত ব্যক্তি 'পৃথিবীর একটি প্রতিমূর্তি' তৈরি করেন, যার বর্ণনা পরবর্তীকালের একটি রচনায় এখনো পাওয়া যায়। কাজেই আমরা ধরে নিতে পারি যে, আল-খারেজমীর গ্রন্থে ইতিমধ্যে মুসলিম পণ্ডিতদের গবেষণার ফল অন্তর্ভুক্ত হয়। তদুপরি এতে অন্যান্য প্রভাবেরও প্রমাণ পাওয়া যায়, যেমন বসতিপূর্ণ বিশ্বকে সাতটি অঞ্চলে বা আবহাওয়ায় বিভক্তিকরণ, যা টলেমীর লেখায় দেখা যায় না। সাতটি আবহাওয়ার মতবাদের প্রমাণ নিঃসন্দেহে গ্রীক পণ্ডিতদের মধ্যেও, সম্ভবত সুপ্রাচীন ইরাটস্থনিসের আমলে পাওয়া যায়। অবশ্য এটিও সম্ভব যে, বসতিপূর্ণ বিশ্বের বিভাগ সম্পর্কিত এই মতবাদ মূলত পারসিক-ব্যবিলনীয়, এবং হয়ত একারণেই মুসলমানদের ভৌগোলিক রচনায় এদের স্থান প্রাধান্য লাভ করেছে। মুসলমানরা গ্রীকের চাইতে প্রাচ্য ঐতিহ্যকেই বেশি গুরুত্ব প্রদান করে।
কিন্তু মুসলিম বিশ্বে টলেমীর প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের যে ধারণাও প্রবেশ করেছিলো তার সঙ্গে নতুন ইসলামী রাজত্বের নাগরিকরা বিশ্ব সম্পর্কে যে ধারণা লাভ করে তার তেমন কোন সামঞ্জস্য ছিলো না। পৃথিবীর গোলাকৃতিতে তাদের কোন অপত্তি ছিলো না- যা ঐ সময় বহু খৃস্টান ধর্মতত্ত্ববিদ স্বীকার করতেন না-কিংবা এই মতবাদকে সমর্থন করার প্রয়োজনীয়তাও তারা বোধ করেননি। এতদ্বারা এ সত্যই প্রকাশ পাচ্ছে যে, ইসলামী ভূগোল ও জ্যোতির্বিজ্ঞান অচিরেই নিজস্ব পথ অনুসরণ করে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল-ফারগানী (আনু. ৮৬০), আল বাত্তানী (আনু. ৯০০), ইবনে ইউনুস (আনু. ১০০০) ও মহান আল বিরুনী (আনু ১০৩০) সাতটি আবহাওয়া বিভাগের নীতি অনুসরণ করে দ্রাঘিমা ও অক্ষাংশের ভৌগোলিক তালিকা দিতে থাকেন। কিন্তু তারা বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে খুব সামান্য তথ্যই দিতে পেরেছেন, কিংবা আদৌ কোন তথ্যই দিতে পারেন নি। এ ধরনের তথ্য বিভিন্ন দেশের একটি বর্ণনা ও ভ্রমণবৃত্তান্তসমূহ থেকে পাওয়া যায়, যা সাম্রাজ্যের প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিলো। এগুলির মধ্যে মক্কা ভ্রমণের বৃত্তান্তের কথা ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। তাই নবম শতকের মধ্যেই 'দেশ সম্পর্কে বই' কিংবা 'রাস্তা ও রাজ্য সম্পর্কে বই' প্রভৃতি শিরোনামে বিভিন্ন দেশের কতিপয় বর্ণনা পাওয়া যায়। ঐ যুগের প্রধান প্রধান লেখক হচ্ছেন ইবনে খুররাদাজবেহ (আনু. ৮৭০), আল ইয়াকুবী (আনু. ৮৯০), ইবনুল ফকিহ (আনু. ৯০৩) এবং ইবনে রুস্তা (আনু. ৯১০)। তারা কমবেশি সুবিন্যস্তভাবে ইসলামের আওতাভুক্ত বিভিন্ন দেশের একটি প্রশাসনিক ও স্থানের বৃত্তান্তমূলক বিবরণ প্রদান করেন। এতে ভ্রমণ পথ সংক্রান্ত বিবরণ বিশেষ প্রাধান্য পায়। এসব রচনায়- দূরপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ও দ্বীপপুঞ্জ এবং বাইযেন্টাইন সাম্রাজ্যের ন্যায় অমুসলিম দেশগুলির প্রতি এখনো বিশেষ দৃষ্টি প্রদান করা হয়। অপরদিকে এগুলিতে সর্বপ্রকার রূপকথার কাহিনীও বিরাটভাবে স্থান পায়। সমুদ্র-কাপ্তান সিরাফের সুলাইমানের ভারতে ও চীনে সমুদ্র ভ্রমণের বিবরণীও এই যুগের অন্তর্ভুক্ত।
দশম শতকে আমরা ভৌগোলিক রচনা বিকাশের একটি পর্যায় দেখতে পাই, যা মুসলমানদের ভৌগোলিক মতামতের উপর একটি স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করে। এসব গ্রন্থের বক্তব্য অনেকখানি পূর্ববর্তী রচনাসমূহের উপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এগুলি ইতিমধ্যে মুসলিম দেশগুলি থেকে যেসব তথ্য পাওয়া যায় তার দ্বারা সমৃদ্ধ। এযুগের অধিকাংশ গ্রন্থকার স্বয়ং ভ্রমণকারী ছিলেন। এই নতুন ভূগোলচর্চা পূর্ববর্তী যুগের ভূগোল চর্চা থেকে পৃথক ধরনের ছিলো; কারণ এতে যেসব দেশ ইসলামের আওতায় ছিলো না সেগুলি সম্পর্কে খুব সামান্যই উল্লেখ করা হয় এবং ভৌগোলিক বিষয়ের ধারাবাহিক আলোচনার সঙ্গে কতিপয় মানচিত্রও দেওয়া হয়। বক্তব্য বিষয় মানচিত্রেরই বর্ণনামূলক।
এসব মানচিত্রের মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে বিশ্বের একটি মানচিত্র। এর আকার গোল, এবং কেন্দ্রস্থল মক্কা। পৃথিবী 'বেষ্টনকারী মহাসমুদ্র' দ্বারা বেষ্টিত, যেখান থেকে দুটি উপসাগর এমনভাবে মহাদেশে প্রবেশ করেছে যাতে এক জায়গায় অর্থাৎ সুয়েজ যোজকে তারা পরস্পরের অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছেছে। কুরআনের ইঙ্গিত অনুযায়ী এই দুটি উপসাগর হচ্ছে ভূমধ্যসাগর ও ভারত মহাসাগর (রুম সাগর ও ফারস সাগর)। বিশ্ব মানচিত্রের পর আরব দেশকে বিশ্বের কেন্দ্র হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর উত্তর আফ্রিকা, মুসলিম স্পেন, মিসর ও সিরিয়ার বর্ণনা রয়েছে। এই অংশ রুম সাগরের বর্ণনার মধ্য দিয়ে সমাপ্ত করা হয়েছে। ভৌগোলিক বর্ণনার দ্বিতীয় অংশে মুসলিম প্রাচ্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এবং তা মেসোপটেমিয়া থেকে শুরু করে ট্রান্সঅক্সানিয়ায় শেষ করা হয়েছে।
যে প্রথম গ্রন্থকার এ ধরনের একটি ভৌগোলিক পুস্তিকা প্রণয়ন করেছেন বলে উল্লেখ করা হয় তিনি হচ্ছেন আবু যায়েদ আল-বলখী (মৃ. ৯৩৪)। তিনি খুরাসান ও ট্যান্সঅক্সানিয়ায় ক্ষমতাসীন সাসানীয় রাজবংশের (৮২২-৯৯৯) দরবারে একজন বিখ্যাত পণ্ডিত ছিলেন। আল-বলখী উজীর আল-জায়হানির অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন, যিনি নিজেও একইভাবে একটি বিরাট ভূগোল গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। এর বিষয়বস্তু ইউরোপের কাছে অপরিচিত। বন্ধীর গ্রন্থটিও সংরক্ষিত হয়নি, কিন্তু কয়েকটি প্রধান ভৌগোলিক গ্রন্থ তার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থারই বিশ্লেষণ। এগুলি হচ্ছে আল ইস্তাখ্রী (আনু. ৯৫০) ও ইবনে হাউকালের (আনু. ৯৭৫) গ্রন্থ, এবং কিছুটা অধিকতর স্বাধীনভাবে রচিত আল-মান্দিসীর (আনু. ১৮৫) রচনা। খুব সম্ভব এই ভৌগোলিক চর্চা আংশিকভাবে সাসানীয় আমল থেকে প্রচলিত প্রাচীনতর পারস্য ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারিত্ব লাভ করে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, ভারত মহাসাগরকে 'ফার্স সাগর' নামকরণ তারই ইঙ্গিত বহন করে। মানচিত্রগুলি অবশ্যই স্পেনীয় মঙ্ক বীটাস (আনু. ৭৩০-৯৮)-এর বিশ্ব মানচিত্রের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত যে সব মানচিত্র ঐ সময় ইউরোপে প্রচারিত হয় সেগুলির তুলনায় ভৌগোলিক বাস্তবতার অধিকতর সঠিক ধারণা প্রদান করে। জীবন্ত জিনিসের ছবি আঁকা নিষিদ্ধ হওয়ায় আমরা এসব মানচিত্রে কখনো মানুষ ও জীব-জন্তুর ছবি দেখতে পাই না। ছবি যুক্ত হওয়ায় হারফোর্ডের মানচিত্রসহ অধিকাংশ ইউরোপীয় মানচিত্র আরো অধিক অদ্ভুত দেখায়। কিন্তু অপর দিকে দশম শতকের ইসলামী মানচিত্রগুলোতে আমরা ইতিমধ্যেই গতানুগতিকভাবে উপকূল রেখা ও নদ-নদী প্রদর্শনের একটি প্রবণতা দেখতে পাই। তাই ইসতাখ্রীর বহু মানচিত্রে বৃত্তাকারে কিংবা উপবৃত্তাকারে ভূমধ্যসাগরকে দেখানো হয়েছে।
এ সময়কার ভৌগোলিক ধরনের অন্যান্য রচনায় কেবলমাত্র বিশেষ অঞ্চলের বিষয় আলোচিত হয়েছে। এগুলির মধ্যে সবচাইতে বিখ্যাত হচ্ছে আল-হামদানির আরব উপদ্বীপের বর্ণনা এবং আল-বিরুনীর ভারত সংক্রান্ত বিখ্যাত বর্ণনা। এজাতীয় কিছু কিছু রচনা আমরা অবিকলভাবে পাইনি; কিন্তু পরবর্তী সঙ্কলনগুলি থেকে তা জানা যায়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ ভল্লা বুলগেরিয়ানদের দরবারে ৯২১ খৃস্টাব্দে খলীফা আল-মুক্তাদির কর্তৃক প্রেরিত দূত ইবনে ফালান কর্তৃক প্রদত্ত রিপোর্ট উল্লেখযোগ্য। আল-মাসূদীর রচনা এক্ষেত্রে বিশেষ স্থান দখল করেছে। তিনি মুসলিম বিশ্বের একজন বিশ্ব পর্যটক ছিলেন। এসব সফরে তিনি বহু ভৌগোলিক ও জাতিতত্ত্বমূলক তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তাঁর বহু রচনার মধ্যে দুটি ১৫৬ খৃস্টাব্দে সমাপ্ত হয়, এবং সংরক্ষিত আছে। ভৌগোলিক বিষয়গুলিতে পদ্ধতির অভাব সুস্পষ্ট হলেও এগুলি এ কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, এগুলিতে 'রাজকীয়' ইসলামী ভূগোল ও ভ্রমণকারী ও নাবিকদের স্বাধীন ভৌগোলিক ধারণার বিরাট পার্থক্য চোখে পড়ে। যেমন এক জায়গায় ভারত মহাসাগরের বিস্তৃতি সম্পর্কে মুসলিম পণ্ডিতদের প্রচলিত মতামতের বিবরণ দেওয়ার পর লেখক এরূপ মন্তব্য না করে পারেন নি যে, পারস্য উপসাগরের বন্দরসমূহের যেসব নাবিক এসব সমুদ্র সম্পর্কে অভিজ্ঞ, তারা পণ্ডিতদের পরিমাপ সম্পর্কে আদৌ একমত হননি। এমনকি তাঁরা এরূপ দাবি করেন যে, কোন দিকে এসব সমুদ্রের আদৌ কোন সীমা নেই। এই অভিমত প্রচলিত বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত, সেখানে বলা হয় যে, ফারস্ সাগর 'পরিবেষ্টনকারী মহাসাগরের' একটি উপসাগর এবং ভূমধ্যসাগরের ন্যায় এর একটি সঙ্কীর্ণ প্রবেশ পথ রয়েছে। উপরোক্ত গ্রন্থকার আল-মাকদিসী ভারত মহাসাগরের আকারের বিষয় আলোচনা করতে গিয়ে একইভাবে বলেন যে, কোন কোন লোক এটিকে একটি 'তৈলাসানের' (এক ধরনের অর্ধবৃত্তাকার পারস্য কোট) সঙ্গে তুলনা করেছেন, এবং কেউ কেউ পাখির সঙ্গে তুলনা করেছেন, কিন্তু দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর এসম্পর্কে অভিজ্ঞ জনৈক শেখ তার জন্য বালির উপর এই সমুদ্রের একটি আকার অঙ্কন করেন। 'তৈলাসান' বা পাখি কারো সঙ্গেই এর মিল ছিল না, বরং উপসাগর বা উপদ্বীপের দরুন এটি বিশৃংখলপূর্ণ আকারে পরিপূর্ণ ছিলো। মনে হয় আল-মাসুদী চীন সফর করেছেন এবং আফ্রিকার পূর্ব উপকূল সম্পর্কে অনেক কিছু জানতেন। অপর পক্ষে জ্যোতির্বিজ্ঞানমূলক ভূগোল সম্পর্কে তাঁর ধারণা খুব কম ছিলো বলে মনে হয়, কারণ তার অন্যতম গ্রন্থে আমরা এরূপ অদ্ভুত অভিমত দেখতে পাই যে, একটি আবহাওয়ায় সবগুলি গুরুত্বপূর্ণ শহর আকস্মিকভাবে একই অক্ষাংশে অবস্থিত থাকবে।'
একাদশ শতকের পূর্ববর্তী শতকের ধারায় অপেক্ষাকৃত কম উজ্জ্বলতা নিয়ে অব্যাহত থাকে। এযুগের সর্বাধিক পরিচিত গ্রন্থকার হচ্ছেন, স্পেনীয় মুসলমান আল-বাক্বী (রচনাকাল আনু. ১০৬৭)। তাঁর বিরাটাকার রচনার মধ্যে কেবল মাত্র আফ্রিকা সংক্রান্ত অংশটিই সম্পাদিত হয়েছে। এখানে আমরা আরো বিশদভাবে ভ্রমণপথ নির্দেশক তথ্য, এবং বিশেষভাবে অসংখ্য বন্দর ও উপসাগর সমন্বিত উপকূল রেখার তথ্যাবলী পাই। প্রায় একই সময়ে আমরা পারস্যবাসী নাসির-ই খসরুর একটি ভ্রমণকাহিনী পাই। তিনি খোরাসানের অধিবাসী ছিলেন এবং মিসর ও মক্কা সফর করেন। এই ব্যক্তি নিজেকে গভীর পর্যবেক্ষণশীল হিসাবে প্রদর্শন করলেও সাধারণভাবে বিশ্বের গঠন প্রকৃতি সম্পর্কে অত্যন্ত ভুল ধারণা পোষণ করতেন।
একাদশ শতকে এমন কতিপয় ঘটনা ঘটে যা মুসলিম বিশ্বের আদর্শ ঐক্যে গভীর আঘাত হানে। ১০৫০ খৃস্টাব্দের দিকে সেলজুক তুর্কীরা প্রাচ্য অংশ আক্রমণ করে। পশ্চিমে সিসিলি দ্বীপ, স্পেনের এক বিরাট এলাকা, এমন কি আফ্রিকা উপকূলের কোন কোন স্থান খৃস্টান শাসকরা জয় করেন। একই সময়ে ইউরোপ ক্রুসেডের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলো। এই সময়েই খৃস্টানবিশ্ব থেকে ইসলামীবিশ্বের সংরক্ষিত বিশেষ সত্তা ক্ষুণ্ণ হতে শুরু করে। ইসলামী বিশ্ব বিচ্ছিন্নতার মধ্যে তার রাজনৈতিক শক্তি হারায়। অবশ্য একই সেলজুক তুর্কীদের নেতৃত্বে এবং ক্রুসেডের বিরুদ্ধে আইয়ুবীদের তীব্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মাত্র স্বল্পকালের জন্য এই শক্তি ফিরে আসে। এসব ঘটনা মুসলিম লেখকদের রচনায় প্রচলিত ভৌগোলিক মতামতের ক্ষেত্রে কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি। কেবলমাত্র জ্যোতির্বিজ্ঞানমূলক ভূগোলে সামান্য কিছু ব্যতিক্রম দেখা যায়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, আমরা ইবনে হাউকালের প্রায় ১১৬৪ খৃস্টাব্দে একটি ভূগোল গ্রন্থের একটি পরবর্তী উদ্ধৃতাংশে দেখতে পাই যে, বিশ্বের মানচিত্র আর গোলাকার নয়। বরং বসতিপূর্ণ বিশ্বের জ্যোতির্বিজ্ঞান ভিত্তিক ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পরিবৃত্তাকার (ডিম্বাকৃতি)।
এসময়কার সবচাইতে দীপ্তিমান লেখক হচ্ছেন ইতিপূর্বে এডিসী নামে অভিহিত আল-ইদ্রিসী। অন্য যে কোন মুসলিম ভূগোলবিদের চাইতে আল-ইদ্রিসীর প্রতি আমাদের দৃষ্টি বেশি আকৃষ্ট হয়েছে। এর প্রথম কারণ হচ্ছে, তিনি দুটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক মিলনকেন্দ্র সিসিলির খৃস্টান শাসক নর্ম্যান রাজা দ্বিতীয় রজারের (১১০১-৫৪) দরবারে কাজ করতেন এবং দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, তিনি সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত মুসলিম ভৌগোলিক জ্ঞানের একমাত্র প্রতিনিধি ছিলেন। পূর্ববর্তী আরবী ভূগোল গ্রন্থসমূহ পর্যালোচনা করে আমরা জানতে পারি যে, আল ইদ্রিসী তাঁর পূর্ববর্তী লেখকদের উপর অনেকখানি নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু রাজা রজার জ্ঞাত বিশ্বের বর্ণনামূলক একটি গ্রন্থ রচনার দায়িত্ব একজন মুসলমান জ্ঞানীর উপর ন্যস্ত করেছেন, এই বাস্তব সত্য থেকে মুসলিম জ্ঞান-বিজ্ঞান ঐ সময় যে কতটা শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে তাঁর সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এটা সর্বজন বিদিত যে, সিসিলির নর্ম্যান রাজ দরবার অর্ধেক পরিমান প্রাচ্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিলো। রজার তাঁর জন্য একটি ভূগোল তৈরির যে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তাও বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে প্রাচ্য। প্রাচীনকাল থেকে মহামতি আলেকজান্ডার ও কোন কোন পারস্য রাজার ন্যায় বড় বড় রাজার এরূপ বিশেষ অভিলাষ ছিলো যে, বিশ্ব তাদের পদানত তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ তাদের জন্য তৈরি করে দেওয়া হোক। ভূগোলের প্রতি খলীফা আল-মামুনের আগ্রহের পিছনেও এই অভিলাষ সক্রিয় ছিলো, এমন কি দশম শতকে সামানীয় রাজদরবারে যে ভূগোল চর্চার সূত্রপাত হয় তার পিছনেও এই একই কারণ ছিলো। আল-ইদ্রিসী তাঁর ভূমিকায় বলেছেন যে, এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত করার উদ্দেশ্যে তথ্য সংগ্রহের জন্য রাজা রজার সকল দিকে লোক পাঠান। ঠিক আল-মামুনের ন্যায় তিনিও একটি বিরাট বিশ্ব মানচিত্র তৈরি করার নির্দেশ দেন। আল-ইদ্রিসীর রচনায়ও বহু মানচিত্র রয়েছে, এবং এই মানচিত্রগুলি একদিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বক্তব্য বিষয় মানচিত্রগুলিরই ভাষ্য। সবচাইতে পরিচিত এর দুটি সংস্করণে সত্তরটি মানচিত্র রয়েছে। (প্রকৃত পক্ষে সবগুলি পাণ্ডুলিপিতে একটি মানচিত্র পাওয়া যায় না)। তিনি মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের অনুকরণে বিশ্বকে যে সাতটি আবহাওয়া অঞ্চলে ভাগ করেন তার প্রত্যেকটি ভাগের এক-দশমাংশের জন্য একটি করে মানচিত্র দেওয়া হয়। সবগুলি মানচিত্র একত্রে সন্নিবেশিত করা হলে এই সত্তরটি মানচিত্র টলেমীয় নমুনায় একটি আয়তাকার চতুর্ভুজের সৃষ্টি করে। কিন্তু এতে দুটি বৃহৎ সাগরের সুনির্দিষ্ট ইসলামী ধারণা সংরক্ষণ করা হয়, যদিও বিস্তারিত বর্ণনায় বিশেষ করে ভূমধ্য সাগরের উপকূল রেখার বর্ণনার পূর্ববর্তী যে কোন ইসলামী মানচিত্রের চাইতে অনেক সুন্দরভাবে বাস্তব অবস্থাকে তুলে ধরা হয়েছে। আল-ইদ্রিসীর লেখা থেকে পূববর্তী ভূগোলবিদের কাছে তিনি কতটা ঋণী তা বোঝা যায়, এবং রচনাটি সামগ্রিকভাবে বর্ণনামূলক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানমূলক ভূগোলের একটি সমন্বয় অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু আল বিরুনীর ন্যায় বড় বড় জ্যোতির্বিজ্ঞানীর পরিমাপের ফলাফল ব্যবহার করা হয়েছে কিনা সে সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে। কারণ তথাকথিত 'ক্ষুদে ইদ্রিসী' নামে পরিচিত আল-ইদ্রিসীর দ্বিতীয় ও সংক্ষিপ্ত সংস্করণে আমরা বিষুব রেখার দক্ষিণে সাতটি আবহাওয়ার অতিরিক্ত একটি অষ্টম, আবহাওয়া অঞ্চল দেখতে পাই। তাছাড়া 'বড় ইদ্রিসীতে' অন্যান্য মানচিত্রের আগে যে বিশ্ব মানচিত্র দেখা যায় তা গতানুগতিকভাবে গোলাকার।
এ কথা বিশ্বাস করা কষ্টকর যে, যুগ ও ভৌগোলিক বিকাশের দিক দিয়ে ইসলামী ও খৃস্টান সভ্যতার সম্মিলন স্থলে রচিত আল-ইদ্রিসীর গ্রন্থ সিসিলি, ইটালী বা অন্যান্য খৃস্টান দেশের খৃস্টান পণ্ডিতদের নিকট সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলো। অবশ্য বর্তমানে এর প্রভাবের কোন নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায় না। আল-ইদ্রিসীর বলে পরিচিত গ্রন্থের প্রথম অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৬১৯ খৃস্টাব্দে রোমে। অসমাপ্তভাবে সংক্ষিপ্ত করার পর এটি অনূদিত হয়, এমনকি অনুবাদক লেখকের নামও জানতেন না।
পর্যটকদের বর্ণনামূলক কাহিনী ছাড়া আল-ইদ্রিসীর পরবর্তী ভৌগোলিক রচনা তেমন বড় রকমের মৌলিকত্ব দাবি করতে পারে না। এই সময় বর্ণনামূলক কাহিনীই অধিকতর ব্যাপকতা লাভ করে। এসব পর্যটকের মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত হচ্ছেন স্পেনীয় ইবনে যুবায়র। তিনি ১১৯২ খৃস্টাব্দে মক্কা ও মেসোপটেমিয়া ভ্রমণ করেন। এক শতাব্দীরও পরে মরক্কোর ইবনে বতুতা মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র সফর করেন। তিনি আরো পূর্ব দিকে শ্রীলংকা ও মালদ্বীপে যান এবং কনস্টান্টিনোপলও সফর করেন। সর্বশেষ সফরে ১৩৫৩ খৃস্টাব্দে তিনি আফ্রিকার গভীর অভ্যন্তরে যান। অপর একজন ভ্রমণকারী যিনি ১২৫০ খৃস্টাব্দের দিকে বিশ্বের এই অংশের অত্যন্ত মূল্যবান বিবরণী রেখে যান, তিনি হচ্ছেন ইবনে ফাতিমা। তাঁর গ্রন্থ আমরা পাইনি, কিন্তু গ্রন্থকার ইবনে সাঈদ ১২৭৪ খৃস্টাব্দের দিকে এটিকে ব্যবহার করেন। এই সর্বশেষ লেখকের রচনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এতে বিষয়বস্তু আল-ইদ্রিসীর ন্যায় একইভাবে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। তার বর্ণনা অতোটা বিস্তারিত না হলেও এতে মুসলমানদের আফ্রিকা সংক্রান্ত জ্ঞান কত গভীর ছিলো তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তা ছাড়া এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানমূলক ভূগোলের এতোটা কাছাকাছি পৌঁছে যে, এতে প্রধান প্রধান শহর ও স্থানগুলির অত্যন্ত সঠিক ভৌগোলিক অবস্থান দেওয়া হয়েছে। ইবনে সাঈদ সিরিয়ার হামার যুবরাজ আবুল ফিদা সম্পর্কেও অন্যতম প্রধান বিবরণ দাতা। আবুল ফিদার 'দেশসমূহের তালিকা' (১৩২৭) প্রায় ১০০ বছর আগে আল-ইদ্রিসীর পরেই আরবীতে সর্বাধিক পরিচিত ভৌগোলিক রচনা ছিলো। তবে এটি পূর্ববর্তী সূত্রগুলির তুলনায় কিছুটা দুর্বল সংকলন।
আমাদের কাছে অনেক বেশি মূল্যবান সঙ্কলন হচ্ছে ইয়াকুতের বিরাটাকারের ভৌগোলিক অভিধান (১২২৮)। এতে সর্ব প্রকার ভৌগোলিক নাম বর্ণানুক্রমে দেওয়া হয়েছে। ভৌগোলিক দিকের ন্যায় জীবন চরিতের দিক দিয়েও রচনাটি মূল্যবান। গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য ছিলো বিখ্যাত ব্যক্তিদের জন্মস্থান বা বাসস্থানের নাম দেওয়ার পর বংশ পরিচয় ও বর্ণনামূলক অতিরিক্ত নাম প্রদান। আর এক ধরনের রচনা হচ্ছে, আল কাযউইনীর (আনুঃ ১২৭৫) রচনা। তাঁকে আরবী সাহিত্যের প্লিনি বলা হতো। তিনি একটি ভূ-বিবরণ (বিশ্বতত্ত্ব) ও একটি ভূগোল রচনা করেন। শেষোক্ত গ্রন্থে তিনি তার উল্লেখিত স্থানসমূহের বহু অদ্ভুত অতিরঞ্জিত বিবরণ প্রদান করেন। তিনি জার্মান দেশগুলি সম্পর্কেও কিছু কিছু তথ্য প্রদান করেন। অধিকতর উন্নত ও মৌলিক ভূগোলবিদ ছিলেন আল-দিমাল্কী (আনু. ১৩২৫), যদিও তাঁর সাধারণ প্রবণতা আল-কাযউইনীর মতোই ছিলো।
আল-ইদ্রিসীর পরে বহু ইসলামী ভূগোলবিদের আবির্ভাব একথাই স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ঐ যুগেও ভূগোল সংক্রান্ত জ্ঞান অত্যন্ত ব্যাপক ছিলো। কিন্তু আমরা আর কোন ভূগোল চর্চা কেন্দ্রের সন্ধান পাই মা। মঙ্গোল আক্রমণের পর চিরদিনের জন্য মুসলিম বিশ্বের সুসম্পূর্ণ ও সাংস্কৃতিক ঐক্য বিনষ্ট হয়। এ কথা সত্য যে, ইতিমধ্যে ইসলামী বিশ্বাস নতুন ধরনের অগ্রগতি লাভ করে এশিয়া মাইনর ও মধ্য এশিয়ায় তুর্কী অভিযান এবং আফ্রিকার অভ্যন্তর ভাগে অধিকতর শান্তিপূর্ণ পন্থায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও ধর্ম প্রচারের মাধ্যমে। আরবী ও পারস্য সাহিত্য ঐ সব দেশ সম্পর্কে আমাদের অনেক তথ্য জ্ঞাপন অব্যাহত রাখে। কিন্তু স্বয়ং খৃস্টানরা, এবং প্রথমত ইটালিয়ানরা ইতিমধ্যে ভ্রমণকার্যে ও আবিষ্কারে তৎপর হয়ে ওঠে। চতুর্দশ শতকের জনৈক মিসরীয় লেখক আল উমারী এশিয়া মাইনরের বর্ণনা দিতে গিয়ে তার বক্তব্যের সমর্থনে জনৈক জেনোয়া বাসীর উদ্ধৃতি দেন। এ সময় আমরা কোন একটি দেশ ও তার প্রতিষ্ঠানগুলির অধিকতর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ভৌগোলিক বর্ণনা পাই। কয়েকজন গ্রন্থকার ধারাবাহিকভাবে প্রাথমিক মামলুক যুগের মিসরের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রদান করেন। এগুলির মধ্যে আল-মাকরিযী প্রণীত মিসরের বর্ণনামূলক একটি বিরাটাকার গ্রন্থ (আনু. ১৪২০) সব চাইতে বিখ্যাত।
ইতিমধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসলামী ভূগোল সাহিত্য মধ্যযুগে ইউরোপীয় চিন্তাধারায় সরাসরি তেমন গভীর কোন প্রভাব সৃষ্টি করেছে বলে মনে হয় না। খৃস্টান লেখকগণ কর্তৃক মুসলিম ভৌগোলিক মতামত গ্রহণের দু-একটি প্রমাণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অপাস টেরাই স্যাঙ্কটাই-তে দ্রষ্টব্য বিশ্ব মানচিত্র। ১৩২১ খৃস্টাব্দে ম্যারিনো স্যানুটো এটি প্রণয়ন ও পোপের নামে উৎসর্গ করেন। এই মানচিত্রটি গোলাকার, এর কেন্দ্রস্থল জেরুজালেম এবং এতে সুস্পষ্টভাবে মহাসাগর থেকে দুটি বড় সমুদ্রের উদ্ভব ও পূর্বদিকে আফ্রিকান উপকূলের বিস্তৃতি দেখানো হয়েছে। তাই ক্রুসেডী প্রেরণা পুনরুজ্জীবনে আপোসহীন এই ব্যক্তি যাদের তিনি ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন তাদেরই জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম অনুসারী হন।
মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ভৌগোলিক রচনা সম্পর্কে ইতিমধ্যেই আমরা কিছুটা আলোকপাত করেছি। ভূগোলের চাইতে ইউরোপের মধ্যযুগীয় বিজ্ঞানে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব অনেক বেশি গভীর ছিলো। এদের কোন কোন রচনা প্রাথমিক দিকেই অনূদিত হয়। এক্ষেত্রে প্লাটো অব টিভলী (আনু. ১১৫০) কর্তৃক অনূদিত আল-বাত্তানীর যিজ (রচনাকাল আনু. ১০০) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সপ্তম আলফন্সো কর্তৃক বিজিত হওয়ার পর টলোডা ছিলো খৃস্টান জ্ঞানী-বিজ্ঞানীদের প্রধান কেন্দ্র, যেখানে তারা আরবী বিজ্ঞান সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য সকল দেশ থেকে এসে সমবেত হতেন। ভূগোলের ক্ষেত্রে এসব অনুসন্ধানমূলক পর্যালোচনা প্রথমত পৃথিবীর গোলাকৃতির মতবাদকে সজীব রাখার ক্ষেত্রে অবদান সৃষ্টি করে। খৃস্টান জগতের অন্ধকার যুগে এই মতবাদ প্রায় বিস্মৃতির অতলে চলে যায়, এবং এই ধারণা পুনরুজ্জীবিত না হলে আমেরিকা আবিষ্কার অসম্ভব হতো।
মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সকলেই মানচিত্র অঙ্কনের আদৌ কোন চেষ্টা না করে কতিপয় নির্দিষ্ট সংখ্যক স্থানের ভৌগোলিক দ্রাঘিমা ও অক্ষাংশ নিরূপণের উদ্দেশ্যেই ভূগোল চর্চা করতেন। সাতটি আবহাওয়া অনুসরণেই তাদের দ্রাঘিমা ও অক্ষাংশের তালিকা তৈরি করা হতো। এই বিজ্ঞানের অধিকতর সাধারণ বৈশিষ্ট্যের দরুন খৃস্টান বিজ্ঞানীরা নিছক ভৌগোলিক রচনার চাইতে এদিকটির প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। ফলে দ্বাদশ শতকে ল্যাটিন ভাষায় জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত তালিকা তৈরি শুরু হয় এবং এতে কোন কোন সময় ভৌগোলিক তালিকাও থাকতো। কোন কোন খৃস্টান বিজ্ঞানী সাতটি আবহাওয়ার বিভাগকেও মেনে নেন। বিশ্বের জ্ঞাত গোলার্ধের পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে সমান দূরত্বে অবস্থিত একটি কেন্দ্র বা 'বিশ্বচূড়া' রয়েছে, এই ধারণা ইসলামের আরো গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার। আল-বাত্তানী 'পৃথিবীর এই গম্বুজকে' একটি দ্বীপ হিসাবে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু অপর একজন গ্রন্থকার (ইবনে রুস্তা) ইতিপূর্বেই এটিকে 'আরিনের গম্বুজ' হিসাবে জানতেন। আরিন শব্দটি ভারতীয় শহর উজ্জয়িনীর (টলেমীর ভূগোলে ওযিনি। আরবী অনুবাদের একটি ভুল পাঠ। এখানে জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি মানমন্দির ছিলো এবং এই শহরেরই মধ্যরেখার উপর মূলত একটি ভারতীয় ধারণা 'বিশ্বচূড়া' অবস্থিত ছিল বলে মনে করা হতো। মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ন্যায় তাদের খৃস্টান শিষ্যরাও এই মতবাদকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেন। শেষোক্তদের মধ্যে একজন ছিলেন বাথ-এর অ্যাডেলার্ড, যিনি ১১২৬ খৃস্টাব্দে আল খারেযমীর ত্রিকোণমিতিক তালিকাসমূহ অনুবাদ করেন। আরো ছিলেন জেরার্ড অব ক্রিমোনা এবং ত্রয়োদশ শতকে রজার বেকন ও আল বার্টাস ম্যাগনাস। ১৪১০ খৃস্টাব্দে প্রকাশিত আইলীর কার্ডিন্যাল পিটারের ইম্যাগো মুণ্ডি গ্রন্থে পরবর্তীকালেও আরিন (বা আরিম) মতবাদের প্রমাণ পাওয়া যায়। এই গ্রন্থ থেকেই ক্রিস্টোফার কলম্বাস এই মতবাদ সম্পর্কে অবহিত হন। ইত্যবসরে এই মতবাদের এতোটা বিকাশ হয় যে, তার ভিত্তিতে কলম্বাস বিশ্বাস করেন যে, পৃথিবী একটি নাশপাতির ন্যায় গোলাকার এবং আরিনের চূড়ার বিপরীত দিকে পশ্চিম গোলার্ধেও পূর্বদিকের চূড়ার চাইতে অনেক বেশি উন্নত আরেকটি কেন্দ্র রয়েছে। যাকে ভিত্তি করে নাশপাতির নিচের দিক তৈরি হয়েছে। তাই মুসলিম ভৌগোলিক মতবাদ নতুন বিশ্ব আবিষ্কারে একটি হিস্সা দাবি করতে পারে। সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের আর একটি ক্ষেত্রেও আমরা একই মতবাদের প্রভাব দেখতে পাই। দান্তে মুসলিম ঐতিহ্যের কাছে ঋণী এ কথা বহু দিক দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে। তাই এটা খুবই সম্ভব যে, দান্তে এই মতবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে তার পারগেটোরিও পশ্চিম গোলার্ধের পাহাড়ের মত একটি স্থানে কল্পনা করেছেন এবং এই সঙ্গে অত্যন্ত নিপুণভাবে খৃস্টানদের এরূপ প্রাচীন বিশ্বাসকে যুক্ত করেছেন যে, পার্থিব স্বর্গ বিশ্বের পূর্বতম প্রান্তে সমুদ্রের পিছনে (বিটাসের বিভিন্ন বিশ্ব মানচিত্রে যেমনটি দেখানো হয়েছে) অবস্থিত।
মুসলিম নৌচলাচল বিজ্ঞান নবম শতকে চূড়ান্ত বিকাশলাভ করে। কিন্তু এই নৌচলাচল ভারত মহাসাগরে এশিয়া ও আফ্রিকার অমুসলিম অধ্যুষিত উপকূলসমূহের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক থেকে প্রধানত গুরুত্ব লাভ করলেও ভূমধ্যসাগরে তা মুসলিম শাসনাধীন এলাকাসমূহেই সীমাবদ্ধ থাকে। কারণ খৃস্টান বন্দরগুলির সঙ্গে তখন সম্পর্ক ছিল সামরিক ও আক্রমণাত্মক।
তাই শেষ পর্যন্ত ভারত মহাসাগরই বড় বড় বাণিজ্যিক তৎপরতার ক্ষেত্র হয়ে পড়ে। এর মূল কেন্দ্র ছিল পারস্য উপসাগর। এখানে আল উবুল্লা উপকণ্ঠসহ সিরাক ও বসরার ন্যায় বন্দর এবং ওমান উপকূলের অন্যান্য বন্দর ইসলামের আবির্ভাবের আগে থেকেই বাণিজ্য ও নৌচলাচলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। অবশ্য ইসলামের আবির্ভাব, বিশেষ করে ইরাকে এর রাজনৈতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এই ব্যবসায়ী উদ্যোগকে আরো উৎসাহিত করে। দশম শতকের মাঝামাঝি সময়ে মুসলমানদের জাহাজ চীনের খানফু শহরে পৌঁছে, খানফুর বর্তমান ক্যান্টনে ফৌঁছে। ঐ সময় শহরটি একটি উল্লেখযোগ্য মুসলিম উপনিবেশ হিসাবে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে পড়ে। এখান থেকে কিছু সংখ্যক মুসলিম ব্যবসায়ী ও নাবিক আরো দক্ষিণে অগ্রসর হন। সম্ভবত তাঁরা কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। কতিপয় গোলযোগের ফলে এই প্রাথমিক বাণিজ্যিক তৎপরতা ৮৭৮ খৃস্টাব্দে বন্ধ হয়ে যায় এবং এতে খানফু বন্দর ধ্বংস হয়। ঐ সময়ের পর থেকে আরবী লেখকদের কাছে কালা নামে পরিচিত এক শহরের পরে নিয়মিত নৌচলাচল সম্প্রসারিত হয়নি। এটি বিশেষভাবে টিন খনির জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। এর অবস্থান অবশ্যই মালাক্কার পশ্চিম উপকূলে ছিল। কালা রাজনৈতিকভাবে যাবাজের শাসকের অধীনে ছিল। প্রাথমিক আরবীতে জাবা থেকে এই নামটির উদ্ভব হয়। কিন্তু ঐ সময় যাবাজ বলতে প্রথমে সুমাত্রাকে এবং বিশেষভাবে ঐ সময়কার সমৃদ্ধ শ্রীবিজয় সাম্রাজ্যের কেন্দ্রকে বোঝাতো। এসব অঞ্চলের সঙ্গেই বাণিজ্যিক যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। ইবনে রস্তা (আনু. ৯০০) সুলায়মান (আনু. ৮৫০) এবং তার অনুসারী আবু যায়েদের (আনু. ১৫০) বিবরণী থেকে মনে হয় যে, মুসলিম নাবিকগণ এসব সমুদ্রে স্বচ্ছন্দে বিচরণ করতেন। কিন্তু তারা কোন্ কোন্ সমুদ্রপথ অনুসরণ করতেন বিবরণীতে তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। মুসলমানদের জাহাজ একইভাবে শ্রীলঙ্কার (সারানদিব) বন্দরসমূহ এবং ভারতের পশ্চিম উপকূলেও চলাচল করতো। বোম্বের কাছাকাছি সাইমূর শহরে একটি সমৃদ্ধ আরব উপনিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। সিন্ধুর মুসলিম অধিকৃত এলাকার দাইবুল (দেবল) এসব অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল। আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে বাণিজ্যিক তৎপরতা তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এখানে তাঁরা দশম শতকের সূচনায় সোনার জন্য বিখ্যাত সুফলা দেশে পৌঁছেন। আফ্রিকান উপকূলের এই অঞ্চলটি মাদাগাস্কারের বিপরীত দিকে অবস্থিত ছিল। মাদাগাস্কার দ্বীপটি মুসলমানদের কাছে ওয়াক্ ওয়াক্ দ্বীপ নামে পরিচিত ছিল।
লেখকরা আরো একটি ওয়াক্ ওয়াক্-এর কথাও উল্লেখ করেছেন যা চীনের বিপরীত দিকে অবস্থিত ছিল এবং বর্ণনা থেকে মনে হয় যে, এটিই ছিল জাপান। এতে ভৌগোলিক লেখার বিবরণীতে গুরুতর বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। নিঃসন্দেহে এই বিভ্রান্তির কারণ হচ্ছে, এরূপ ভৌগোলিক বিশ্বাস যে, আফ্রিকার পূর্ব উপকূল পূর্ব দিকে চীনের কাছাকাছি কোন এক জায়গায় 'ফারস সাগরের' মুখ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে। দেখা যাচ্ছে যে, এই চিরাচরিত মতবাদের দ্বারা সামুদ্রিক কাপ্তানদের জ্ঞান বাধা প্রাপ্ত হয়নি। তাদের সমুদ্র- বিহারের কাহিনী আরবী সাহিত্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়। কল্পনার মাধুরী মিশিয়ে আরব্য রজনীর সিন্দাবাদ নাবিকের বিখ্যাত্ কাহিনীগুলিতে তা এখনো টিকে আছে।
পারস্য উপসাগরকে কেন্দ্র করে সুদীর্ঘকালব্যাপী নৌচলাচলের যে ধারা গড়ে ওঠে তা পরবর্তীকালে পর্তুগীজ, তুর্কী, বৃটিশ, ওলন্দাজ প্রভৃতি যে সব শক্তি এসব এলাকায় প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে তাদের পথ সুগম করে। ১৪৯৮ খৃস্টাব্দে আফ্রিকা প্রদক্ষিণের পর ভাস্কো ডা গামা আফ্রিকার পূর্ব উপকূল মালিওি পৌঁছলে জনৈক আরব নাবিকই (Pilot) তাকে ভারত গমনের পথপ্রদর্শন করেন। পর্তুগীজ সূত্রে জানা যায় যে, এ নাবিকের কাছে অত্যন্ত উৎকৃষ্ট সামুদ্রিক মানচিত্র ও অন্যান্য নৌচলাচল সরঞ্জাম ছিল। ঐ সময়কার আরব মহলেরও এই কাহিনী জানা ছিল। তাদের মতে আহমদ ইবনে মজিদ নামে পরিচিত এই নাবিককে নেশাগ্রস্ত করার পরই তাকে দিয়ে পর্তুগীজরা পথ বাতলিয়ে নেয়। সম্ভবত কাল্পনিক এই বিবরণ দ্বারা এ কথাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, মুসলমানরা পর্তুগীজদের আগমনের সুদূর প্রসারী পরিণতি পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। এই আহমদ ইবনে মজিদ ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগর, দক্ষিণ চীন সমুদ্র এবং পূর্ব 'ভারতীয় দ্বীপাঞ্চলের নৌচলাচল ব্যবস্থা সম্পর্কে একটি পুস্তিকা প্রণয়ন করেন বলেও জানা যায়। স্যার আর এফ বার্টনের একটি বিবরণ অনুযায়ী এও দেখা যায় যে, ইবনে মজিদকে এর পূর্ববর্তী শতকে আফ্রিকান উপকূলে কম্পাসের আবিষ্কারক হিসাবে শ্রদ্ধা জানানো হতো।
প্রথম দিকের আব্বাসীয় খলীফাগণ সুয়েজ যোজক ভেদ করার কথা চিন্তা করেন। কিন্তু ক্রুসেডের পর থেকে যেভাবে চিন্তা করা হয়েছিলো তেমনিভাবে কখনো চিন্তা করা হয়নি যে, এ ধরনের উদ্যোগ ইসলামের জন্য এক বিরাট বিপদ হয়ে দেখা দেবে। তাই ভূমধ্যসাগরে মুসলিম নৌচলাচল প্রাচ্য সমুদ্রের নৌচলাচল থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। ভূমধ্যসাগরের বাণিজ্য মুসলিম বন্দরগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
খলীফা হযরত উমর (রা)-এর আমল থেকেই খৃস্টান দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক মুসলমান ও খৃস্টান উভয় পক্ষ থেকেই তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। এর ফলে আলেকজান্দ্রিয়া বন্দর এবং অন্যান্য বহু প্রাচীন সামুদ্রিক বন্দর ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তিউনিস উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনীয় বন্দরগুলির মধ্যে নৌচলাচলের নতুন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে ওঠে। খৃস্টানদের কাছে মুসলিম নাবিকরা প্রায়ই জলদস্যু ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এবং এ কথা খৃস্টান নাবিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল।
ক্রুসেডের শুরু থেকে ভূমধ্যসাগরে মুসলমানদের নৌচলাচলের প্রায় একক প্রধান্যের অবসান ঘটে। স্পেনের একটি বিরাট অংশ, সিসিলি দ্বীপ এবং ইটালীয় উপকূলের অধিকৃত এলাকা মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে যায়। একই সময়ে ইটালীয় সমুদ্র বন্দর জেনোয়া ও পিসার বিকাশ শুরু হয়। ১১৯২ খৃস্টাব্দে পর্যটক ইবনে জুবায়র একটি খৃস্টান জাহাজযোগে সিউটা থেকে আলেকজান্দ্রিয়া গমন করে। নৌচলাচলে একক প্রাধান্যের এই পরিবর্তন বাস্তবে অপেক্ষাকৃত কম হিংসাত্মক ছিল। অবস্থা কেবল এটুকুই দাঁড়ায় যে, যে খৃস্টানরা এর আগে মুসলিম নিয়ন্ত্রণাধীনে নিছক নাবিক বা ক্রীতদাস হিসাবে নৌচলাচলের সংশ্লিষ্ট ছিল তারা এখন পুরোপুরি স্বাধীনতা লাভ করে এবং নিজস্ব কর্তৃত্বেই নৌচলাচল ও বাণিজ্য করে। আধুনিক আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের শব্দকোষে এডমিরাল, ক্যাল, অ্যাভারেজ, শ্যালপ (স্লপ), বার্ক এবং ভারত মহাসাগরের নৌচলাচলের বিশেষ ভাষা মনসুন¹ প্রভৃতি বহু শব্দ এককালে সমুদ্রে মুসলমানদের একক প্রাধান্যের ইঙ্গিত বহন করে।
নাবিক ইবনে মজিদের প্রসঙ্গে কম্পাসের কথা ইতিপূর্বেই বলা হয়েছে। এই ব্যক্তি তাঁর রচনায় নিজেই অনুমান করেন যে, কম্পাসের আবিষ্কারক ছিলেন কিং ডেভিড (হযরত দাউদ আ) কিন্তু এটি কিছুতেই প্রমাণ করা যায় না যে, মুসলমানরা খৃস্টানদেরও আগে এই যন্ত্রটির সঙ্গে পরিচিত ছিল। এ কথা সত্য হতে পারে যে, চীনারা দ্বিতীয় শতাব্দীতে এই যন্ত্র ও এর ব্যবহারের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন এবং তাদের কাছ থেকেই পাশ্চাত্য এটি লাভ করে। কিন্তু মুসলমান সমুদ্র-কাপ্তানরা কম্পাসের ব্যবহার জানতেন এর প্রথম নিঃসন্দেহ প্রমাণ পাওয়া যায় ১২৮২ খৃস্টাব্দের জনৈক লেখকের রচনায়। প্রায় একই সময়ে ফ্রান্স এবং ইটালীতেও এর ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। কম্পাস সম্পর্কে এমন কয়েকটি পরিভাষা রয়েছে যা মূলত প্রাচ্য ভাষা হলেও আরবী নয়। তাতে মনে হয় যে, চুম্বকের কাঁটার গুণাগুণ সম্পর্কিত জ্ঞান ইউরোপ প্রাচ্য থেকে লাভ করে, কিন্তু এতে এ কথা মনে হয় না যে, মুসলমানরা এ ক্ষেত্রে খৃস্টানদের অগ্রগামী। বহু ক্ষেত্রে তাদের এলোমেলো মানচিত্র অঙ্কন বিজ্ঞান বরং এরূপ ধারণার সৃষ্টি করে যে, তাদের জাহাজগুলি কেবল উপকূলের দৃষ্টিপথেই চলাচল করতে পারতো। কাজেই নির্বিবাদে এরূপ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, মুসলমানরা ইউরোপীয় খৃস্টানদের আগেই কম্পাসের ব্যবহার জানলেও তাদের এই জ্ঞান ১২০০ খৃস্টাব্দের আগের নয়, এবং তারা বিষয়টি জানার অব্যবহিত পরেই খৃস্টান নাবিকরাও তা লাভ করে।
ত্রয়োদশ শতকের শেষ দিকে ভূমধ্যসাগরের প্রথম সামুদ্রিক চার্টের আবির্ভাবের ক্ষেত্রে অদ্ভুত সমস্যার ও কম্পাসের সমস্যার সঙ্গে মিল রয়েছে। সব চাইতে প্রাচীনজ্ঞাত চার্ট সম্ভবত জেনোয়াবাসীরা তৈরি করে। এসব চার্ট পূর্ববর্তী সর্বপ্রকার মানচিত্রের চাইতে অনেক বেশি সঠিকভাবে একই সময়ে উপকূল ও দ্বীপাঞ্চলের অবস্থান নির্দেশ করে কেবল কম্পাসের সাহায্যেই এগুলি তৈরি সম্ভব হয়। এসব চার্টে উপকূল রেখার বিস্তারিত নকশাও দেওয়া হয় এবং এসব বিশদ বিবরণ কিছুতেই এক যুগের অবদান হতে পারে না। এবারে আমরা আল-ইদ্রিসী এবং তাঁর পূর্ববর্তী ইবনে হাউকাল ও আল-বাস্ত্রীর রচনায় আফ্রিকান উপকূলের সঠিক বর্ণনার কথা স্মরণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, উপরোক্ত ভৌগোলিক গ্রন্থগুলিতে প্রতিফলিত মুসলিম নাবিকদের অভিজ্ঞতা আধুনিক মানচিত্র বিজ্ঞানের আদর্শ প্রাচীনতম চার্টগুলি তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।
মেসোপটেমিয়ার বিরাট সমুদ্র পথের মাধ্যমে পারস্য উপসাগর মুসলিম সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থল বাগদাদের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এর মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের নৌচলাচল বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের সহায়ক হয়। এই পথেই বাগদাদের বড় বড় বণিকরা চীনের রেশম, ভারতের মসল্লা ও সুগন্ধি দ্রব্য এবং কালার বিভিন্ন ধরনের কাঠ, নারিকেল ও টিন আমদানি করতেন। এসব পণ্য মুসলিম দেশগুলি থেকে ইউরোপে যেত। কারণ ঐ সব দেশের সঙ্গে ইউরোপের কোন প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল না। এই সামুদ্রিক বাণিজ্যের একটি অংশ পারস্য উপসাগরে প্রবেশ না করে পণ্যসামগ্রী এডেন এবং লোহিত সাগরের বন্দর জেদ্দা ও আল-কুলযুমে (সুয়েজের নিকট প্রাচীন ক্লিস্মা) পৌঁছিয়ে দিতো। ক্রুসেডের সময় জেদ্দার প্রায় বিপরীত দিকে তীর্থযাত্রীদের গমনাগমনের একটি প্রাচীন বন্দর 'আইজাবে পৌঁছিয়ে দিতো। এখান থেকেই মুসলিম বিশ্বের পশ্চিম অংশে সরবরাহ যেতো। আবার একই পথে আফ্রিকার আইভরি প্রভৃতি পণ্যসামগ্রীর আমদানি হতো। এগুলি এডেনের বিপরীত দিকে ইথিওপীয় সামুদ্রিক বন্দর যাইলা থেকে পাঠানো হতো।
মুসলমানদের নৌবাণিজ্যের চাইতে 'মরুভূমির জাহাজের' মাধ্যমে স্থল-বাণিজ্য আরো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ছিল। হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর আবির্ভাবের অনেক আগেই স্থল-বাণিজ্য বহর এশিয়া ও আফ্রিকার তৃণভূমি অঞ্চল অতিক্রম করলেও আমরা এই বাণিজ্যে মুসলমানদের অবদানের কথাই বিশেষভাবে জানি। এমন কি কিছুকাল আগেও মরুভূমিতে গমনাগমনের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য সভ্যতা মুসলমানদের পিছনে পড়েছিল। সাম্প্রতিককালে সিরীয় মরুভূমি, আরব উপদ্বীপ, পারস্য ও সাহারায় যে মোটর যানবাহন চালু হয়েছে, মধ্য এশিয়ায় যে সব রেলপথ নির্মিত হয়েছে এবং যে কয়েকটি বিমান সার্ভিস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এগুলি সবই স্মরণাতীত কাল থেকে অব্যাহত উটের পথই অনুসরণ করছে। মুসলিম সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধির যুগে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মুসলিম দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এবং বিশেষ করে তীর্থযাত্রীদের মক্কা গমনাগমনের ক্ষেত্রে এই দলবদ্ধ চলাচল সবচাইতে সাধারণ মাধ্যম ছিল। একই সময়ে সাম্রাজ্য থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থলপথ প্রথমত ভারত ও চীনের, দ্বিতীয়ত দক্ষিণ ও মধ্য রাশিয়ার এবং তৃতীয়ত আফ্রিকার স্থলপথের সঙ্গে যুক্ত হয়। সমুদ্র পথেও ভারত এবং চীনে যাওয়া যেতো, তাই অন্যান্য দিকের তুলনায় এদিকে স্থলপথে দলবদ্ধ বাণিজ্য তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তাছাড়া ভারতের সঙ্গে স্থলপথ আফগানিস্তানের পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম পথের দরুন ব্যাহত হয়। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে তুর্কী অধিকৃত অঞ্চলসমূহের মধ্য দিয়ে যেতে হতো। তদুপরি চীনের প্রধান উৎপাদিত পণ্য রেশম আগে পারস্যেও উৎপাতিক হতো। একাদশ শতকের সামানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর চীনের সঙ্গে স্থলপথ বাণিজ্য আরো প্রতিকূল হয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এশীয় বাণিজ্য পথের বিরাট প্রসার মঙ্গোলদেরই অবদান ছিল।
উত্তর দিকে মুসলমানদের বাণিজ্যিক প্রভাব প্রসারের তথ্য লাভের জন্য আমরা কেবল লিখিত সূত্রের উপর নির্ভর না করে রাশিয়া, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও নরওয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুল সংখ্যায় যে সব মুসলিম মুদ্রা পাওয়া যায় তাও বিবেচনা করতে পারি। এসব মুদ্রা বিচ্ছিন্ন ভাবে বৃটিশ দ্বীপপুঞ্জ এবং আইসল্যান্ডেও পাওয়া যায়। কাযান প্রদেশে ভলগা নদীর মাঝামাঝি অঞ্চলে এ ধরনের বিপুল সংখ্যক মুদ্রা পাওয়া যায়। কিন্তু বাল্টিক প্রদেশগুলিতে প্রাপ্ত মুদ্রা সংখ্যার দিক দিয়ে এগুলিকে অনেক বেশি পরিমাণে ছাড়িয়ে যায়। স্কান্ডিনেভিয়ার যে সব এলাকায় এসব মুদ্রা প্রধানত পাওয়া যায় সেগুলি হচ্ছে সুইডেনের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল এবং নরওয়ের দক্ষিণ এলাকা। মুদ্রাগুলির সময়কাল হচ্ছে সপ্তম শতকের সমাপ্তি থেকে একাদশ শতকের সূচনা। এরূপ সম্ভাবনা খুব কম যে, মুসলিম বণিকগণ উত্তর দিকে এসব স্থান পর্যন্ত গিয়েছিলেন; কারণ লিখিত আরবী সূত্র থেকে দেখা যায় যে, ভলগা নদীর মাঝামাঝি অঞ্চলে ভল্লা বুলগারদের দেশই ছিলো তাদের বাণিজ্যিক অভিযান ও দূতাবাসের চূড়ান্ত লক্ষ্য। ইসলাম ধর্মও প্রাথমিক দিকে ঐসব অঞ্চল পর্যন্তই প্রসারিত হয়। তাদের বাণিজ্য সাধারণত যে পথে অগ্রসর হয় তা ট্রান্সঅক্সানিয়া থেকে ওকসাস নদীর মোহনায় অবস্থিত খারিযমের (খিবা) বদ্বীপ অঞ্চল পর্যন্ত ছিল। ভল্লার মোহনা থেকে উজান দিকের পথ ততোটা স্বাভাবিক ছিল না। অবশ্য এতোটা বিস্তৃত এলাকায় মুদ্রা পাওয়ার কারণ হচ্ছে সাংস্কৃতিক প্রভাবের একটি লক্ষণ, এবং এতদ্বারা এ কথাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, মুসলমানরা বুলগেরীয় বাজারগুলিতে যেসব লোক উত্তর-পশ্চিমে বসবাস করতো তাদের কাছ থেকে পণ্যসামগ্রী ক্রয় করতো। এদের মধ্যে স্কান্ডিনেভীয় রাশিয়ানরা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে মুসলমান বণিকরা কি ধরনের পণ্যসামগ্রী ক্রয় করতেন তা আমরা বিভিন্ন ভৌগোলিক রচনা বিশেষ করে আল-মাকদিসীর রচনা থেকে জানতে পারি। পণ্যগুলি হচ্ছে নকুলের পশম, শুভ্র পশম, আরমিনের লোম, খেকশিয়াল, বিবর, ফুটফুটে খরগোস ও ছাগলের পশম, মোম, তীর-ধনুক, বার্চগাছের বাকল, খাড়া পশমের টুপী, মাছের সিরিশ, মাছের দাঁত, বিবরের নির্যাস, অম্বর, ঘোড়ার পাকা চামড়া, মধু, হেজেল নাট, বাজ পাখি, তলোয়ার, বর্ম, ম্যাপল কাঠ, ক্রীতদাস এবং ছোট বড় গবাদি পশু। অধিকাংশ ক্রীতদাসই ছিল স্লাভজাতীয়। তাদের নাম এখনো সভ্য জগতে, বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলিতে তাদের ভূমিকার ইঙ্গিত বহন করে। ক্রীতদাস আমদানির আর একটি সূত্র ছিল স্পেন। এখান থেকে মাগরেব ও মিসরে ক্রীতদাস আমদানি করা হতো। এই শেষোক্ত শ্রেণীর ক্রীতদাসরা প্রধানত খোজা ছিল এবং তাদেরকে মুসলিম হেরেমে নিয়োগ করা হতো। এটা সর্বজন বিদিত যে, বিভিন্ন জাতি থেকে এভাবে আমদানিকৃত ক্রীতদাসদের ইউরোপে মুসলিম সংস্কৃতি প্রসারে কোন অংশে কম অবদান ছিল না। এই সুদূর প্রসারী মুসলিম-বুলগেরীয় বাণিজ্য ছাড়াও যার প্রমাণ জার্মানীতেও পাওয়া যায়-- কাস্পিয়ান সাগরের তীরে ভল্লা নদীর মোহনায় খাযার সাম্রাজ্যের সঙ্গেও তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। খাযারদের রাজধানী ইটিল বা আটিল এখানেই অবস্থিত ছিল। পণ্য বিনিময়ের দিক দিয়ে এই বাণিজ্য অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু খাযার সাম্রাজ্য মুসলিম ও বাইযেন্টাইন সাম্রাজ্যের মধ্যে এক ধরনের নিরপেক্ষ এলাকার সৃষ্টি করে। ফলে এর মধ্য দিয়ে বহু মুসলিম ও প্রাচ্য পণ্য খৃস্টান দেশগুলোতে যাওয়ার পথ সুগম হয়।
আফ্রিকার স্থল-বাণিজ্য একটি প্রাচ্য ও একটি পাশ্চাত্য এলাকায় বিভক্ত ছিল। উভয় দিকেই প্রধান আমদানি পণ্য ছিল স্বর্ণ। মুসলিম অঞ্চলের পরে আসোয়ানের পূর্ব দিকে বুজা দেশে স্বর্ণখনি এলাকার বিরাট বাণিজ্য কেন্দ্র আল-'আল্লাকী প্রাচীন মিসরীয় আমল থেকেই বিখ্যাত ছিল। পশ্চিম আফ্রিকায় স্বর্ণের দেশ ঘানার সঙ্গে সক্রিয় বাণিজ্য অব্যাহত ছিল। এর রাজধানী অবশ্যই নাইজার নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। মরক্কো, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার মুসলিম বণিকরা দক্ষিণ দিকে কয়েক মাস পর্যন্ত ভ্রমণ করতেন। তারা সাধারণত আউদাগোশত নামে একটি মরূদ্যান পার হতেন। এটি ছিল ঘানার উত্তরে চৌদ্দ দিনের পথ। এসব এলাকায় বাণিজ্যের গুরুত্ব সম্পর্কে ভৌগোলিক ইবনে হাউকাল (আনুমানিক ৯৭৫) বলেন যে, তিনি আউদাগোশত-৪২০০০ দিনারের একটি আই ও ইউ¹ দেখেছেন যা দক্ষিণ মরক্কোর সিজিলমাসা শহরের জনৈক বণিকের নামে লেখা হয়। এমনও বলা হয়েছে যে, পূর্ববর্তী শতকে এই বাণিজ্যের পরিমাণ আরো বেশি ছিল। কারণ তখন পশ্চিমের অঞ্চলগুলি ও মিসরের মধ্যে একটি সরাসরি রাস্তা ছিল। কিন্তু নিরাপত্তা না থাকায় এই রাস্তাটি পরিত্যক্ত হয়।
পরবর্তী শতকগুলিতেও আফ্রিকা এমন একটি এলাকা ছিল যেখানে কোন প্রতিযোগিতা ছাড়াই মুসলমানরা ব্যবসা-বাণিজ্য ও ধর্ম প্রচারের প্রেরণা অব্যাহত রাখতে পারে। ত্রয়োদশ শতকে লেখক ইবনে সাঈদ ইবনে ফাতিমার ভ্রমণ কাহিনীর মাধ্যমে সুদূর সেনেগাল পর্যন্ত আটলান্টিক উপকূলের সঙ্গে সম্যকভাবে অবহিত হন। এই এলাকাটি নাইজারের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং নীল নদের ন্যায় একই নদী ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে মনে করা হতো। তিনি চাদ হ্রদের আশেপাশে বসবাসকারী নিগ্রোদের সম্পর্কেও অবহিত হন। অপরদিকে মুসলমানরা কখনো নীলনদের উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না, কারণ এ ব্যাপারে তারা কেবল টলেমীর প্রচলিত ধারণারই পুনরাবৃত্তি করেন। এতদসত্ত্বেও রেনেসাঁ যুগের ইউরোপ মুসলমানদের সূত্র ছাড়া অন্ধকার মহাদেশের অভ্যন্তর ভাগ সম্পর্কে কিছুই জানতো না। কারণ ১৫২৬ খৃস্টাব্দে খৃষ্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত মুসলমান লিও আফ্রিকানুস আফ্রিকা সম্পর্কে যে বিবরণী প্রদান করেন তা তখনকার জন্য এবং পরবর্তীকালে আরো দীর্ঘকালের জন্য তাদের একমাত্র তথ্যসূত্র ছিল। উনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে ইদ্রিসীর বিবরণের যে মূল্যায়ন করা হয় তা ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে।
ইতিপূর্বে বর্ণিত ব্যাপক ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্ব ও খৃস্টান ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্য প্রথমে তীব্র বিপরীতধর্মী ছিল। তাদের মধ্যে সরাসরি কোন বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল না বললেই চলে, যেটুকু ছিল তা ইহুদী বণিকদের হাতে ছিল। ঐ সময় ইহুদীরা একান্তভাবে একটি বাণিজ্যিক জাতি ছিল। সভ্যতার দুটি এলাকায় কেবল তারাই অবাধে বাণিজ্য করতে পারতো। ইবনে খুরাদাজবেহর বর্ণনায় দেখা যায় যে, ইহুদী বণিকরা ফ্রান্সের দক্ষিণ থেকে সমুদ্র পার হয়ে মিসর আগমন করতো, সেখান থেকে পায়ে হেঁটে সুয়েজ যোজক অতিক্রম করতো এবং সেখান থেকে জাহাজযোগে ভারতে যেতো। অন্যরা স্থলপথে সিউটা থেকে মিসর যেতো এবং সিরিয়া থেকে সিন্ধুনদ এলাকায় গমন করতো। তারা প্রায়ই কনস্টান্টিনোপলেও যেতো। এমনিভাবে মুসলিম দেশগুলি ইউরোপ থেকে ইতিপূর্বে বর্ণিত ক্রীতদাস, বাইযেন্টাইন সাম্রাজ্যের রেশম, পশম এবং অস্ত্রশস্ত্র লাভ করতো। এসব পণ্য রাশিয়া হয়েও তাদের কাছে যেতো। একই ব্যবসায়ীরা ইউরোপের জন্য নিয়ে আসতো মৃগনাভি, ঘৃতকুমারী, কর্পূর, দারুচিনি এবং এ জাতীয় অন্যান্য পণ্য। এসব নামের সঙ্গে তাদের মূল প্রাচ্য নামের মিল নেই। অন্যান্য যে সব পথে প্রাচ্যের পণ্যসামগ্রী ইউরোপে প্রবেশ করতো সেগুলি হচ্ছে কাস্পিয়ান অঞ্চল ও বাইযেন্টিয়ামের মধ্যবর্তী খাযার সাম্রাজ্য এবং মধ্য ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনকারী, রাশিয়ার অর্ধ-বর্বর জাতি অধ্যুষিত এলাকা। দশম শতকে বাইযেন্টাইন সীমান্তবর্তী টেবিযণ্ড শহর মুসলিম গ্রীক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। সেখানে কিছু সংখ্যক মুসলিম ব্যবসায়ী বসবাস করতো। বাইযেন্টাইন সরকার শুল্ক আরোপ করে প্রচুর লাভবান হতো। স্পেন সীমান্তেও কিছুটা সরাসরি বাণিজ্য অব্যাহত ছিল।
অতএব, আমরা একদিক দিয়ে বলতে পারি যে, খৃস্টান ও মুসলিম বিশ্বের মধ্যে পারস্পরিকভাবে এক ধরনের বাণিজ্যিক বিচ্ছিন্নতা বিরাজ করছিল। এ কথা সত্য যে, অষ্টম শতক থেকেই মুসলমান ভ্রমণকারী ও বণিকদের ইটালীয় শহরগুলিতে এবং কনস্টান্টিনোপলে দেখা যায়, কিন্তু এসব সম্পর্ক একাদশ শতকে যে প্রাণবন্ত বাণিজ্যিক লেনদেন শুরু হয় এবং যা ক্রুসেডের প্রথম যুগে স্বল্পকালের জন্য ব্যাহত হয় তারই সূচনা করে। বিগত যুগগুলির বাধা দূর হওয়ার পর যে বাণিজ্যিব সম্পর্ক গড়ে ওঠে তা ইউরোপীয় জাতিগুলির মধ্যে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ প্রচারে বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করে। এসব জাতি তাদের শাসকদের (যেমন সিসিলির রজার) সহায়তায় এই মূল্যবোধের দ্বারা লাভবান হতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে।
যৌথ অংশিদারিত্ব, বাণিজ্যিক চুক্তি
যে সব বহুমুখী পন্থায় বাণিজ্যিক সম্পর্ক মুসলমান ও খৃস্টানদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার সৃষ্টি করে তা এখানে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা যায় না। মুসলিম বিশ্ব প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে বৈষয়িক সংস্কৃতির যে সব সম্পদ আহরণ করে তা ইউরোপকে ঢেলে দেওয়া হয়। এ সব সম্পদ কেবল মুসলমানদের দুঃসাহসিক উদ্যমের মাধ্যমে দূরবর্তী দেশগুলি থেকে সংগৃহীত চীনা, ভারতীয় ও আফ্রিকান উৎপাদিত পণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এগুলির মধ্যে প্রথমত মুসলিম দেশগুলিতে স্বাভাবিকভাবে ও শিল্প উৎপাদনের মাধ্যমে যেসব সম্পদ পাওয়া যেতো, তাও ছিল। মুসলিম দেশগুলিতে একটি বিশেষ পন্থায় শিল্প উৎপাদনের বিকাশ হয়। মূলধন না থাকায়, এবং শ্রমশিল্পীরা বিভিন্ন সংস্থায় সংগঠিত হওয়ায় এটি প্রধানত শাসকদের নিয়ন্ত্রণাধীনে ছিল। মুসলমানরা পরবর্তীকালে যখন ইউরোপীয় শিল্পের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়, তখন শিল্পোন্নয়নের এই অদ্ভুত ব্যবস্থা তাদের জন্য বিরাট অসুবিধাজনক বলে প্রমাণিত হয়। কিন্তু ইসলামী সমৃদ্ধির যুগে এই ব্যবস্থা শিল্প দক্ষতার এমন এক বিকাশ ঘটায় যাতে উৎপাদিত জিনিসের শৈল্পিক মূল্য অপ্রতিদ্বন্দ্বিতার চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে। প্রথমে বস্ত্র শিল্পের উৎপাদিত দ্রব্যের কথা উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে সাধারণভাবে প্রচলিত কতগুলি নাম থেকে কোন্ কোন্ বস্ত্র ইসলামী দেশগুলি থেকে আমদানি করা হতো তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়: মসলিন (মসুল থেকে), ড্যামাঙ্ক (দামেস্ক থেকে), বালডাচিন (মূলত বাগদাদে উৎপাদিত হতো) এবং গজ, কটন, সার্টিন প্রভৃতি যে সব বোনা বস্ত্রে আরবী বা পারসিক নাম রয়েছে। একইভাবে প্রাচ্যের কম্বল আমদানিও মধ্যযুগের ন্যায় প্রাচীন। এখানে একটি অদ্ভুত বিষয়ও উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মধ্যযুগীয় জার্মান সম্রাটদের রাজকীয় পোশাকে আরবী উৎকীর্ণ লিপি ছিল। এগুলি সম্ভবত সিসিলি থেকে অর্ডার দিয়ে তৈরি করা হতো যেখানে খৃস্টান পুনর্বিজয়ের পরও দীর্ঘকাল পর্যন্ত ইসলামী শিল্পকলা ও শিল্প অব্যাহত থাকে। যে সব স্বাভাবিক উৎপাদিত দ্রব্য মূলত মুসলিম দেশসমূহ থেকে আমদানি করা হয়েছে এ কথা তাদের নাম থেকে বোঝা যায় না, সেগুলি হচ্ছে কমলা, লেবু, খোবানি প্রভৃতি ফল, স্পিনিজ, আর্টিকোক প্রভৃতি শাক-সব্জি, স্যফরণ বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অ্যানিলাইন। একইভাবে মূল্যবান পাথর (ল্যাপিস-ল্যাজিউলাই) এবং বাদ্যযন্ত্রেরও (বীণা, গিটার ইত্যাদি) নাম করা যেতে পারে, যদিও এগুলি সরাসরি বাণিজ্যিক লেনদেনের ফল কিনা তা প্রমাণ করা যায় না। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যেতে পারে, যার তৈরি কৌশল ইউরোপ দ্বাদশ শতকে মুসলমানদের কাছ থেকে আয়ত্ত করে।
সর্বশেষে আমাদের বাণিজ্যিক শব্দ সম্ভারের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, যেখানে এক সময় মুসলিম বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক রীতিনীতি কিভাবে খৃস্টান দেশগুলির বাণিজ্য বিকাশে গভীর প্রভার সৃষ্টি করে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ সংরক্ষিত রয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ 'স্টার্লিং' শব্দটির মধ্যে প্রাচীন গ্রীক শব্দ 'স্ট্যাটার' অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, কিন্তু এই শব্দটি আরবীর মাধ্যমেই ইংরেজি ভাষায় প্রবেশ করেছে। 'ট্রাফিক' শব্দটি সম্ভবত আরবী তাফরিক থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ বন্টন। তেমনি সর্বজন পরিচিত 'ট্যারিফ' শব্দটি বেশ সুন্দর আরবী শব্দ তা'রিফ থেকে এসেছে, যার অর্থ বৈশিষ্ট্য ঘোষণা। একই সূত্র থেকে এসেছে 'রিস্ক' 'টেয়ার' 'ক্যালিবার' এবং প্রাত্যহিক ব্যবহৃত 'ম্যাগাযিন' শব্দ। ম্যাগাযিনের মূল আরবী 'মাখাযিন', যার অর্থ ভাণ্ডার বা দোকান (ফারসী 'ম্যাগাসিন' শব্দ এখনো সাধারণভাবে দোকান অর্থে ব্যবহৃত হয়)। 'চেক' শব্দের কথা আফ্রিকান বাণিজ্য প্রসঙ্গে ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে এবং এর জার্মান এবং ওলন্দাজ প্রতিশব্দও (ওয়েচসেল, উইসেল) একইভাবে আরবী। 'অ্যাভাল' শব্দটির ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। এরপর বিল অব এক্সচেঞ্জ (মূল্যপত্র) প্রসঙ্গে বলা যায় যে, মুসলমান ও ইটালিয়ান খৃস্টানদের পার্টনারশীপ (অংশীদারিত্ব) থেকেই জয়েন্ট স্টক কোম্পানীর ধারণার উদ্ভব হয়। মুসলমানদের বাণিজ্যিক আইন কুরআন ও হাদীস থেকে উদ্ভূত শরিয়তী বিধানের উপর ভিত্তি করে রচিত হয়। বাস্তব ক্ষেত্রে একটি উন্নত বাণিজ্য রীতি ব্যবস্থার দ্বারা এটি পরিলক্ষিত হয়। উপরের দৃষ্টান্ত তারই প্রমাণ। এসব বাণিজ্য পদ্ধতির একটি হচ্ছে 'মোহাটা' নামে অভিহিত কাল্পনিক দরাদরি। এই শব্দটিও আরবী থেকে বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষাভুক্ত হয়।
'ডাউয়েন' (dauane)-এর ন্যায় একটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত শব্দ ঐ সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যখন ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন বন্দরে নিয়মিত বাণিজ্যিক লেনদেনের উদ্ভব হয়। এ কথা সর্বজন বিদিত যে, এই লেনদেন পাশ্চাত্য দেশগুলির বাণিজ্যিক সংগঠনেও বিরাট অবদান সৃষ্টি করে। মুসলিম শাসকদের সঙ্গে তারা যেসব চুক্তি সম্পাদন করে এবং পাশ্চাত্যের বন্দরগুলিতে যেসব বাণিজ্য প্রতিনিধি নিয়োগ করে তা বর্তমানে যে সব বিধি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে তার বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় ছিল।
পূর্ববর্তী পর্যালোচনা থেকে দেখা যাবে যে, ভূগোল ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইউরোপ মুসলিম বিশ্ব থেকে যে সাংস্কৃতিক সুফল লাভ করেছে তা কেবল এক মুহূর্তের ব্যাপার ছিলো না বরং একাদশ শতকের শুরু থেকে যে পারস্পরিক সম্পর্ক অব্যাহত থাকে এবং ত্রয়োদশ শতকের মঙ্গোল আমলে যা বিশেষভাবে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে তাই ছিল এর ভিত্তিভূমি। এ কথাও সত্য যে, তুরস্ক ও পারস্যের ন্যায় দেশগুলিতে এবং ভারত ও পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের মুসলিম অধিবাসীদের মধ্যে পরিবৃদ্ধি সহকারে যে ইসলামী সভ্যতা বিরাজমান ছিল তার মাধ্যমেও বহু মুসলিম মতামত ও রীতিনীতি ইউরোপীয় দেশগুলি অবহিত হয় এবং সেগুলি অনুসরণও করে। কিন্তু খৃস্টান জগতের উপর মুসলমানদের এককালের বিপুল প্রাধান্য দশম শতকের ন্যায় এতো সুস্পষ্টভাবে আর কোন যুগে দেখা যায়নি। এ সময় ইসলাম সমৃদ্ধির স্বর্ণশিখরে ছিল এবং খৃস্টান ইউরোপে নেমে আসে নৈরাশ্যজনক স্থবিরতা।
টিকাঃ
১. আর মেনেণ্ডেয পিডাল, অরিজেনস ডেল এসপানল, পৃ. ৪৪২। (মাদ্রিদ, ১৯২৬)
১. ১৯০৩ খৃষ্টাব্দে নাল্লিনো কর্তৃক আরবী ও ল্যাটিন ভাষায় সম্পাদিত। আল খওয়ারিযমীর জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থটি বাথের অ্যাডেলার্ডের সংস্করণ থেকে এইচ সুটার কর্তৃক ল্যাটিন ভাষায় সম্পাদিত হয় (কোপেন হেগেন, ১৯১৪)। ঐ সময় আরব জ্যোতির্বিদগণ 'আরিনের' মিরিডিয়ান থেকে দ্রাঘিমা নিরূপণ করতেন। এই নাম একটি অপভ্রংশ। প্রকৃতপক্ষে এটি হচ্ছে মধ্য ভারতের উজ্জয়িনী শহর, যেখানে ঐসময় একটি মানমন্দির ছিল। বহুকাল পরে অষ্টাদশ শতকে জয়সিংহ সেখানে মান মন্দিরটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।..
১. 'মূল আরবী মাওসিম, একটি বিশেষ সময়, একটি ঋতু; বাং মওসুম। ভারত মহাসাগরে ও দক্ষিণ এশিয়ায় এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে এবং বছরের অবশিষ্ট সময়ে উত্তর-পূর্ব থেকে প্রবাহিত মওসুমী বায়ু। প্রবল বৃষ্টিপাত সমন্বিত দক্ষিণ-পশ্চিমের বায়ু প্রবাহের কালকে মনসুন বা মওসুমী ঋতু বলা হয়।-অনুবাদক।
১. আই ও ইউ আমি তোমার কাছে ধারি। আরবী শব্দ বাক এবং এর থেকেই আধুনিক 'চেক' শব্দের উদ্ভব হয়েছে। -অনুবাদক
📄 ইসলামী লঘু শিল্পকলা এবং ইউরোপীয় শিল্পকর্মে এর প্রভাব
ইসলামের সেই চমকপ্রদ যুগের সূচনায় ইসলামী সভ্যতা পশ্চিমে আটলান্টিকের তীরবর্তী শহরগুলিতে নতুন ধরনের শিল্পের অবদান সৃষ্টি করার জন্য যেসব অঞ্চল থেকে শুরু করে সে সব অঞ্চলে শিল্পকলার অবস্থা ছিল সেকেলে ও অনুন্নত। ঐ সময় আরবের শিল্পকলায় ছিল হয় দূর অতীতের একটি নির্জীব অভিব্যক্তি কিংবা বিচ্ছিন্নভাবে বাইরের প্রভাবমূলক একটি অনুকরণ। যে সব স্থায়ী বসতিপূর্ণ উর্বর অঞ্চল মরুভূমির বিচ্ছিন্ন ভবঘুরে বেদুইনদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক পরিবেশে সমৃদ্ধি লাভ করে, সেখানেও স্থানীয়ভাবে শিল্পকলার তেমন বিকাশ ঘটেনি। ইসলামী শিল্পকলার আত্মিক রূপ আরব থেকে উদ্ভূত হলেও এর বাহ্যিক রূপ বাইরের যে সব দেশে শিল্পকলা একটি বলিষ্ঠ শক্তি ছিল তার আঙ্গিকেই গড়ে উঠেছে।
খৃস্টানরা সিরিয়া ও মিসরের পৌত্তলিক আমলের শিল্পকলায় গভীর পরিবর্তন সাধন করে। এ সব দেশের নিজস্ব যে সব বৈশিষ্ট্য ছিল কিংবা বাইরের প্রভাবাধীনে যে সব বৈশিষ্ট্যের আমদানি ও বিকাশ ঘটে, সেগুলিকে নতুন এক প্রাণশক্তিতে উজ্জীবিত করা হয় এবং উভয়ের সংমিশ্রণে একটি সুসংবদ্ধ ও অপরূপ শিল্পকলার উদ্ভব হয়। ইউফ্রেতিস ও তাইগ্রীসের অপর পারে আর এক ধরনের শিল্পকলা গড়ে ওঠে। পারস্যবাসী তাদের পার্থীয় অধিস্বামীদের বিতাড়িত করে নিজস্ব সাসানীয় রাজবংশ প্রতিষ্ঠার কয়েক শতকের মধ্যেই এক অপূর্ব জাতীয় পুনর্জাগরণের যুগে প্রবেশ করে। ইরানীয় শিল্প-প্রতিভা তাদের প্রাচীন শিল্প-সম্পদের সঙ্গে আলেকজান্ডারের অভিযানের সময় থেকে প্রচলিত গ্রীক বৈশিষ্ট্য এবং পরবর্তীকালে আভ্যন্তরীণ এশিয়া থেকে আমদানিকৃত বৈশিষ্ট্য সমূহের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে অত্যন্ত বলিষ্ঠ এক অপরূপ শিল্প সৌকর্য গড়ে তোলে। উপরোক্ত দুটি সংস্কৃতি ছিল পরস্পর বিরোধী। অপর দিকে মুসলমানদের কাছে উভয়টিই ছিল অপ্রীতিকর। ইসলামী শিল্পকলা এই পরিস্থিতিতেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে।
মধ্যযুগে শিল্পকলা ছিল প্রথমত ও প্রধানত একটি ধর্মীয় অভিব্যক্তি। আমরা মধ্যযুগীয় শিল্পকর্মের ধারায়, যে ধর্ম বিশ্বাসের প্রেরণায় সেগুলি গড়ে ওঠে তা বিশেষভাবে লক্ষ্য করি। এগুলির গঠন রীতিতে কোন কোন বৈশিষ্ট্য যত সুস্পষ্টই হোক না কেন এবং কোন বিশেষ পদ্ধতি তাদের মূল পরিচয় যতই তুলে ধরুক না কেন, তারা সুস্পষ্টভাবে ধর্মীয় প্রভাবের ছাঁচেই গড়ে ওঠে। খৃস্টান শিল্পকলা মূলত ধর্মীয় উপদেশের একটি বাহন। এর উদ্দেশ্য সব সময় সর্বপ্রকার সূক্ষ্ম ছবি ও প্রতীকের মাধ্যমে এত সরল-সহজভাবে প্রতিফলিত যে, শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে সবাই তা উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু এর সুন্দর পট-শিল্প আরবদের কাছে ছিল নিছক মূর্তিপূজা। কোন শৈল্পিক ঐতিহ্য না থাকায় তারা শিল্পকে সন্দেহের চোখে দেখে এবং আদিম যুগের লোকদের ন্যায় এর সঙ্গে জাদুর যোগাযোগ রয়েছে বলে মনে করে। তার ওপর ধর্মীয় নিষ্ঠার প্রথম দৃষ্টিতে বিলাসিতা তাদের কাছে বিশেষভাবে নিন্দনীয় ছিল। তারা মনে করতেন যে, এটি নাস্তিকতা থেকে উদ্ভূত একটি শয়তানের ফাঁদ, যার সঙ্গে সত্যিকারের বিশ্বাসীর কোন সংশ্রব থাকতে পারে না। পারস্য শিল্পের যে শিল্পসৌকর্য পারস্যের কারুশিল্পীরা বর্তমানে ইসলামী শিল্পকলায় গভীরভাবে প্রতিফলিত করেছে তাও প্রথমে পৌত্তলিকতার নিন্দনীয় বিষয় হিসাবে বিবেচনা করা হতো।
ইসলামী শিল্পের সূচনা মসজিদে। এখানে প্রকাশ্য দিবালোকে এর উদ্ভব হয় এবং সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় এটি লালিত পালিত হয়। প্রথম দিকের মসজিদগুলি কোন প্রকার স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যবিহীন সাদাসিধা কাঠামো ছিল। কেবল নামায আদায় এবং ধর্মীয় উপদেশ প্রচারের জন্যই সেগুলি ব্যবহৃত হতো। প্রথমে কোন প্রকার গৃহসজ্জা ছিল না। যখন এর প্রবর্তন হয়, তখনো সেগুলি ছিল যতোটা সম্ভব অতি সাধারণ। যে কোন অভিনবত্বের কঠোর সমালোচনা করা হতো। কথিত আছে যে, মিসরে যখন প্রথম মিম্বার তৈরি করা হয়, তখন এই অপকর্মের সংবাদ খলীফার কর্ণগোচর হলে তাঁর নির্দেশে সেটি ভেঙে ফেলা হয়; কারণ এতে ইমামের মর্যাদা তার অন্যান্য মুসলমান ভাইয়ের চাইতে অবাঞ্ছিতভাবে বৃদ্ধি পায়। তেমনি মক্কার দিকনির্দেশের জন্য প্রথম যে মিহরাব তৈরি করা হয় তারও তীব্র সমালোচনা হয়; কারণ এটি বিশেষভাবে খৃস্টান গির্জার আপস-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বস্তুত সেখান থেকেই মিহরাবের উদ্ভব হয়। কিন্তু শীঘ্রই এমন এক যুগের আবির্ভাব হয়, যে যুগের লোকদের রুচিশীল দৃষ্টিতে গির্জার উন্নত অবস্থার তুলনায় মসজিদের দৈন্য বিশেষভাবে ধরা পড়ে। ফলে যথাসময়ে মিম্বার ও মিহরাব মসজিদের প্রধান আলংকারিক সৌন্দর্যে পরিণত হয়। সূক্ষ্ম ডিজাইন ও অলংকরণের বৈচিত্রে এগুলি স্থাপত্য শিল্পে এক অপরূপ সাফল্য সূচিত করে।
ইসলাম যখন আরো প্রসারিত হতে থাকে, তখন বাইরের জাতিগুলির সংস্পর্শে তার শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গিও প্রসারিত হয়। ইসলামী ধর্মীয় বিধানে যেসব স্থায়ী বিধি-নিষেধ রয়েছে তার সীমার মধ্যে একটি শৈল্পিক আদর্শের নতুন নতুন দিক উন্মোচিত হয়। তার ওপর প্রাসাদিত দৃষ্টিভঙ্গি লাভের সঙ্গে সঙ্গে আধ্যাত্মিক প্রাধান্যের স্থলে সম্পূর্ণরূপে লৌকিক একটি সাংস্কৃতিক প্রবণতার উদ্ভব হয়।
যে সব শাসক ধর্মীয় বিশ্বাসের ধারক হিসাবে খ্যাতিমান ছিলেন না তাদের মধ্যে যখন বিদেশী রীতিনীতি সংক্রমিত হতে শুরু করে তখন রাজপ্রাসাদের পবিত্রতার সুনামও ক্ষীণ হতে থাকে। সংস্কৃতিমনা শাসকগণ মহানবীর উত্তরাধিকারী হিসাবে নয়, বরং রাজা হিসাবে যখন সুন্দর সুন্দর বই, সুদৃশ্য ছবিওয়ালা পোশাক ইত্যাদির প্রতি আকৃষ্ট হন তখনই বিধিনিষেধ বহির্ভূত শিল্পকর্মের আবির্ভাব শুরু হয়। শাসকের দেখাদেখি অভিজাত শ্রেণী এবং অন্ধ অনুসারীরাও এ ধরনের শিল্পের সমঝদার হয়ে ওঠেন এবং এর ফলে এমন এক 'দরবারী শিল্পের' উদ্ভব হয় যাতে কারুশিল্পীরা লাভবান হলেও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিরা আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন।
প্রাথমিক খলীফাদের আমলে আভিজাত্য চর্চা অসম্ভব ছিল। তারা অলংঘনীয় মূলনীতি হিসাবে সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের মতবাদ ছিল যে, প্রত্যেকে তার অভাব-অভিযোগে শাসকের প্রত্যক্ষ সহায়তা পাবে যার জীবন যাপন প্রণালী, বাসস্থান এবং বাসস্থানের আসবাবপত্র সমালোচনার ঊর্ধে থাকবে। কিন্তু একটি আয়েশী জীবনের শাসক শ্রেণী যখন নিজেদের জনগণের সংস্পর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে শুরু করে তখনই রাজপ্রাসাদও একটি বিচ্ছিন্ন মর্যাদা লাভ করে এবং সেখানে একটি নতুন ধরনের রীতিনীতি প্রচলিত হয়। কতিপয় উল্লেখযোগ্য প্রাচীর চিত্র থেকে একথা প্রমাণিত হয় যে, উমাইয়া খলীফাদের আমলেই একটি লৌকিক দরবারী শিল্পের উদ্ভব হয়। এসব প্রাচীর চিত্রে গ্রীক ও প্রাচ্য ধারার সংমিশ্রণে অত্যন্ত সুন্দরভাবে অঙ্কিত চিত্র সম্বলিত বিষয়বস্তু রয়েছে। মরু সাগরের পূর্বে মরুভূমি অঞ্চলের একটি পরিত্যক্ত শিকার-ভবনে এখনো দেখা যায়। ভবনটি খলীফা প্রথম ওয়ালিদ কর্তৃক ৭১২ থেকে ৭১৫ খৃস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয়। আব্বাসীয় খলীফাগণ কর্তৃক দামেস্ক থেকে নতুন নগরী বাগদাদে রাজধানী স্থানান্তরের পর দরবারী শিল্প একটি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যে পরিণত হয়। এই রাজধানী স্থানান্তর প্রকৃতপক্ষে ৭৬ খৃস্টাব্দে সম্পন্ন হয়। এই রাজধানী স্থানান্তর মুসলিম শিল্পকলার ইতিহাসে একটি বিশেষ যুগের সূচনা করে, কারণ এ সময় থেকে এর বিকাশে পারস্য প্রভাব প্রাধান্য বিস্তার করে।
মুসলিম শিল্পকলার উদ্ভব, ধাপে ধাপে বর্ণনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়: বরং এই শিল্পকলা কিভাবে খৃস্টান ইউরোপের সমসাময়িক ও পরবর্তী অগ্রগতিকে প্রভাবিত করেছে তা অনুসন্ধানের জন্য এর কতিপয় পরিণত বিকাশের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরাই আমাদের উদ্দেশ্য। তাছাড়া আমরা একান্তভাবে ছোটখাটো শিল্পকলার প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করছি। এগুলি ছিল কারুশিল্পীদের কাজ। যখন কোন ভবন নির্মিত হতো তখন এর উদ্দেশ্যের সাথে সঙ্গতি রেখে সর্বপ্রকার প্রয়োজনীয়তা ও সুযোগ সুবিধা বিধানের জন্য খুঁটিনাটি সব কিছু সজ্জিত করার উদ্দেশ্যে এদের ডাক পড়তো।
শীঘ্রই মুসলমানরা বিরাট নির্মাণশিল্পী হয়ে ওঠে। তাদের শিল্প প্রতিভা গভীর অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে স্থাপত্যের সুনির্দিষ্ট ধ্যান-ধারণা লাভ করে। মানুষের ছবি আঁকার ব্যাপারে ধর্মীয় বিধিনিষেধ থাকায় মূর্তি শিল্পের বিকাশ না ঘটলেও পাথর, কাঠ ও অন্যান্য জিনিসের খোদাই কার্যে তারা অত্যন্ত দক্ষতা অর্জন করে। প্রাচীর চিত্র দূর অতীত থেকে অব্যাহত থাকলেও বর্তমানে যে চিত্রকলা আমাদের কাছে পরিচিত তা তথাকথিত 'মিনিয়্যাচার' শিল্পে সীমাবদ্ধ। ছোট ছোট চিত্র, পাণ্ডুলিপির ছবি প্রভৃতি এর অন্তর্ভুক্ত। এগুলিতে কারিগরি সৌকর্যের দক্ষতা এবং রং সম্পর্কে গভীর বিচক্ষণতা প্রকাশ পেলেও মধ্যযুগীয় ইউরোপে একই অবস্থায় যেসব উৎকৃষ্টতম শিল্পকর্মের সৃষ্টি হয়েছে তার কতিপয় বৈশিষ্ট্য এগুলিতে দেখা যায় না। সুদক্ষ নির্মাণ শিল্পীর সংখ্যা বহু হলেও ভাস্কর্য ও চিত্রকলার ক্ষেত্রে তাদের সমকক্ষ কাউকে দেখা যায় না।
অবশ্য মুসলমানরা যদিও স্থাপত্য ছাড়া চারুকলার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য সাফল্যের সমকক্ষ হতে পারেনি, তথাপি যে সব শিল্পে তারা অবাধে তাদের প্রতিভার প্রতিফলন ঘটায়, সেখানে তারা মধ্যযুগে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ইসলাম পাশ্চাত্যের নিকট অপরিজ্ঞাত বহু প্রাচীন কারুশিল্প ধারার প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকারী ছিল। মুসলিম জ্ঞানী-বিজ্ঞানীরা যেভাবে ভবিষ্যৎ বংশধরদের প্রাচীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিরাট সম্পদ বিতরণ করে গেছেন, তেমনি মুসলিম কারুশিল্পীরাও প্রাচ্যে প্রচলিত শিল্পকলার 'কর্মকেন্দ্র ভিত্তিক চর্চার' ঐতিহ্য সংরক্ষণ, বিকাশ ও প্রসার করে গেছেন। এই ঐতিহ্য হয় ইউরোপে কখনো প্রবেশ করেনি, কিংবা অতীতে ইউরোপ এ সম্পর্কে অবহিত হলেও মধ্যযুগের ঝড়ঝঞ্ঝায় সেখানে তার বিলুপ্তি ঘটে।
নতুন করে অতীতের এই নিপুণতার বিকাশ ঘটাতে গিয়ে ইসলামী শিল্পকলা এমন এক সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য লাভ করে যে, এটিকে অতি সহজেই একটি স্বাভাবিক ব্যাপার মনে করা হয় এবং তাই গুরুত্ব দেওয়া হয় না। সাধারণের জন্য হোক কিংবা উৎসব অনুষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য হোক প্রতিটি জিনিসকে অত্যন্ত প্রাণবন্তভাবে অলংকৃত করা হতো। তার পরিকল্পনা ও প্রকাশ এতো সুষ্ঠু ছিল যেন সেটি কোন কৃত্রিম সৌন্দর্য নয় বরং প্রকৃতির স্বাভাবিক রূপের অভিব্যক্তি। এই অঙ্কন শিল্পের রীতি সুনির্দিষ্টভাবে বিদেশাগত হলেও ইউরোপীয় ঐতিহ্য থেকে সামঞ্জস্যহীন হিসাবে এখনো তা পরিত্যক্ত হয়নি। এর অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আকর্ষণীয় ও রোমান্টিক। এর অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যগুলি এতো সুনিপুণভাবে উদ্ঘাটিত হয় যাতে আমাদের মনে এরূপ বিশ্বাস জন্মে যে, এর বাহ্যিক অবয়বের বাইরে কোন অবোধ্য প্রাণশক্তি রয়েছে। এ ধরনের শিল্পসৌকর্য নগ্ন জিনিস রূপায়ণের নিছক কৌশল মাত্র নয়, বরং সূক্ষ্ম কারুকার্যের এমন একটি অপরিহার্য দিক যা ছাড়া কোন শিল্পকর্ম অসম্পূর্ণ থাকে। পাশ্চাত্যের শ্রবণে সুরমাধুর্য যেমন আনন্দের শিহরণ জাগায়, তেমনি কোন একটি কারুশিল্পের নৃত্যছন্দ প্রাচ্যের কাল্পনিক দৃষ্টিকে বিমোহিত করে। প্রাচ্যের কারুশিল্পীদের কাছে কারুশিল্পের চর্চা এতোটা মোহনীয় ছিল যে, এর বিভিন্ন সমস্যা পর্যালোচনায় এবং যে ধারা এখনো আধুনিক শিল্পীরা অনুসরণ করছে সেই ধারার সুষ্ঠুতা বিধানে তারা অবিরাম ও অক্লান্ত সাধনা করে যান। ইসলামী শিল্পকলার সামান্যতম পর্যালোচনা থেকে একথা প্রতীয়মান হবে যে, মুসলিম শিল্প প্রতিভা কারুশিল্পের ক্ষেত্রে যে অবদান রেখেছে তা ছোটোখাটো শিল্প হিসাবে অসাধারণ মর্যাদার অধিকারী।
ধর্মীয় বিধি-নিষেধে মানুষের কিংবা কোন জীব-জন্তুর ছবি আঁকা মুসলমানদের জন্য সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ হলেও মুসলিম অলংকরণে অত্যন্ত সাধারণভাবে এগুলির প্রতিফলন দেখা যায়। কিন্তু সময় সময় এরূপ বলা হয় যে, কোন বিশেষ সম্প্রদায় এগুলি সমর্থন করে না, কিংবা এগুলি কোন অবস্থায়ই মসজিদে করতে দেওয়া হয় না। এ ধরনের ছবি থাকলে সংশ্লিষ্ট জিনিসগুলি লৌকিক ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে বলে সঙ্গে সঙ্গে ধরে নেওয়া হয়। কোন বিশেষ শৃংখলা ভঙ্গকারী অন্যায় কার্যে সার্বজনীন মৌনসম্মতিও সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। উদারমনা লোকেরা তা মেনে নিলেও কঠোর মনোভাবসম্পন্ন লোকের কাছে তা সবসময় বিরক্তিকর এবং তারা যে কোন মুহূর্তে এর বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারে। আমাদের জাদুঘর এবং শিল্প সংগ্রহে এমন বহু জিনিস রয়েছে যেগুলি বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ফলে সুস্পষ্ট ত্রুটি-বিচ্যুতির স্বাক্ষর বহন করে। এতে নিশ্চিতভাবে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, এসব ক্ষেত্রে কোন না কোন সময়ে ন্যায়পরায়ণতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তিরস্কারের হাত সক্রিয় ছিল।
মুসলিম অলংকরণ শিল্পে আর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আরবী উৎকীর্ণ লিপির ব্যবহার। পবিত্র কুরআনের একটি উদ্ধৃতি, কোন কবির একটি উৎকৃষ্ট চরণ কিংবা অভিনন্দন বা আশীর্বাদমূলক কোন উক্তি প্রান্তভাগের বা ফ্রিজের চারদিকে লেখা হয়, অথবা গোল করে পাকানো কাগজের আকারে (কার্টুশ) লিপিবদ্ধ করা হয়। অভিজাত মালিকের নাম ও জাঁকজমকপূর্ণ উপাধি মাঝে মাঝে কোন মূল্যবান জিনিসের সৌকর্য বিধান করে। এতে তারিখ এবং ব্যুৎপত্তিও দেওয়া হয়। কোন কোন ওস্তাদ কারিগর সময় সময় তার শিল্পকর্মের উপর নিজের নাম, যে শহরে তৈরি করা হয়েছে তার নাম এবং যে বছর কাজ শেষ হয়েছে সে বছরের নামও প্রদান করেন।
ইসলামী শিল্পে আরবদের একক অবদান আরবী হস্তলিপি, ইসলাম যেখানেই প্রসার লাভ করেছে সেখানে মুসলিম প্রভাবের সার্বজনীন স্বাক্ষর রেখেছে। পবিত্র কুরআন এই বর্ণমালায় লিখিত। মুসলিম জগতের সর্বত্র এটি অত্যন্ত পবিত্র। এর লিপিকাররা এর লেখনরীতির সৌকর্য সাধনে পরস্পর প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন। অভিজ্ঞ লিপিকাররা পুরুষানুক্রমে এই হস্তলিপি চর্চা করে এতোটা সাফল্য ও স্বীকৃতি লাভ করেছে যে, একটি সুন্দর গ্রন্থ কেবল অমূল্য সম্পদই নয়, একজন ওস্তাদ হস্তলিপিবিদের লেখার একটি টুকরাও সংগ্রাহকের কাছে মহামূল্যবান।
পড়তে না পারলেও ইউরোপীয় কারুশিল্পীরা আরবী হস্তলিপির বাইরের সাদৃশ্যের সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচিত হন। এই পরিচয় ও অজ্ঞতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায় মার্সিয়ার রাজা ওফফার (৭৫৭-৯৬) তৈরি একটি স্বর্ণ মুদ্রায়, যা বর্তমানে বৃটিশ মিউজিয়ামে রয়েছে। একটি মুসলিম দিনারের সঙ্গে এর গভীর মিল রয়েছে, কিন্তু 'ওফফা রেক্স' কথাটি একটি আরবী রূপকথার মধ্যে উল্টোভাবে সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে। রূপকথাটি এতোটা নির্ভুলভাবে অনুকরণ করা হয়েছে যে, এতে মূল মুদ্রার তারিখ (৭৭৪) এবং মুসলিম ধর্মীয় বক্তব্যের বর্ণনাও কপিতে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। এই মুদ্রার অনুরূপ পরবর্তী কোন মুদ্রা পাওয়া যায় না, কিন্তু এতদ্বারা মুসলিম টাকশাল থেকে নিখুঁত মুদ্রার প্রচলন কতো ব্যাপক ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়। একই মিউজিয়ামে আনুমানিক নবম শতকের ব্রঞ্জের গিল্টি করা ক্রসের উপর মুসলিম শিল্পকর্মের সঙ্গে পাশ্চাত্যের যোগাযোগের আর একটি দৃষ্টান্ত রয়েছে। এর কেন্দ্রস্থলে একটি কাচের মধ্যে কুফী অক্ষরে আরবীতে বিসমিল্লাহ কথাটি উৎকীর্ণ রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই শিল্পীরা যে অপরিচিত লেখা নকল করেছেন তার অর্থ বুঝতে পারেননি, কারণ যে উৎকীর্ণলিপি এতোটা মুসলিম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তা কিছুতেই একজন খৃস্টান রাজার মুদ্রার উপর কিংবা খৃস্টানদের একটি পবিত্র নিদর্শনের উপর জেনেশুনে দেওয়ার কথা নয়।
এ সময়ের পর থেকে মুসলিম সূত্র হতে প্রায়ই হিজিবিজিভাবে নকল করা আরবী হস্তলিপির টুকরো টুকরো অংশ এবং অন্যান্য কারুকার্য খৃস্টান ইউরোপের কারুশিল্পে ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যাপকতা লাভ করে। পবিত্র স্থানসমূহের প্রতি শ্রদ্ধামূলক আকর্ষণ, মুসলমানরা এককভাবে যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অধিকারী ছিল তা অর্জন করার আগ্রহ, বাণিজ্যিক উদ্যম এবং এ ধরনের অন্যান্য স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ হয়ে বহু পর্যটক মুসলিম দেশগুলি ভ্রমণ করেন। তারা আরবদের জাঁকজমকের যেসব কাহিনী বর্ণনা করেন তার সমর্থনে মুসলিম দক্ষতার বিভিন্ন প্রামাণ্য জিনিসও নিয়ে আসেন।
নিজেদের দেশে অজ্ঞাত জ্ঞান সঞ্চয়ের জন্য পণ্ডিত ব্যক্তিরা মুসলমানদের জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র সফরের পর যেসব জিনিস নিয়ে আসেন তার মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল অ্যাস্টলেব (নক্ষত্র নির্ণায়ক যন্ত্র)। প্রাচীন গ্রীকদের আবিষ্কৃত জ্যোতির্বিজ্ঞানের এই যন্ত্রটির উন্নয়ন সাধন করেন আলেকজান্দ্রিয়ার ভূগোলবিদ টলেমী। মুসলমানরা এর পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রদান করেন। অ্যাস্টলেব দশম শতকে ইউরোপে আসে। নামাযের সময় নির্ধারণ এবং মক্কার দিক নির্ণয়ের জন্য প্রাচ্যে এটি প্রধানত ব্যবহৃত হতো। অন্যান্য কাজেও এটি ব্যবহৃত হতো, যেমন আমরা দর্জি কর্তৃক কথিত কাহিনীতে দেখতে পাই যে, বাকচতুর নরসুন্দর অ্যাস্টলেব দেখে ক্ষৌরকার্যের শুভ মুহূর্ত নির্ণয় না করা পর্যন্ত তার উত্ত্যক্ত মক্কেলকে দীর্ঘসময় অপেক্ষায় রাখেন। জ্যোতিষ শাস্ত্রের সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়ায় সমগ্র মধ্যযুগে অ্যাস্টলেব ও এর ব্যবহারকারীরা বহু দুর্নাম কুড়ায়। তখন সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হতো যে, জ্যোতিষশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞান সমার্থক। দশম শতকের মহান পণ্ডিত গারবার্ট অব গুভার্ন, যিনি ৯৯৯ খৃস্টাব্দে দ্বিতীয় সিলভেস্টার নামে পোপ নিযুক্ত হন, তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা করায় বলা হয় যে, কর্ডোভা সফরের সময় তাঁর সঙ্গে শয়তানের মোলাকাত হয়। 'গারবার্ট অ্যাস্টলেবের ব্যবহারের ক্ষেত্রে টলেমীকেও ছাড়িয়ে যান, এবং গলে যে গণিত বিজ্ঞানের চর্চা দীর্ঘকাল বন্ধ ছিল তিনি তা পুনরুজ্জীবিত করেন। এই গারবার্টের প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে গিয়ে মালমেসবারীর উইলিয়াম জাদু বিদ্যায় তার নিপুণতা ছিল বলে কুৎসিৎ উক্তি করেন। ফ্লোরেন্সে দশম শতকের শেষার্ধের বিজ্ঞানের স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে একটি অ্যাস্টলেব সংরক্ষিত আছে। রোমের অক্ষাংশ পরিমাপের জন্য এটি নির্মিত হয়। কোন কোন মহলের মতে পোপ সিলভেস্টার এটি ব্যবহার করতেন।
প্রাচীনতম তারিখের অ্যাস্টলেব অক্সফোর্ডে রয়েছে। ৯৮৪ খৃস্টাব্দে নির্মিত এই অ্যাস্টলেবটি ইস্পাহানের অ্যাস্টলেব বিশেষজ্ঞ ইব্রাহিমের দুই পুত্র আহমদ ও মাহমুদ নির্মাণ করেন। বৃটিশ মিউজিয়ামের অ্যাস্টলেবগুলির মধ্যে ১২৬০ খৃস্টাব্দে ইংরেজদের নির্মিত একটি অ্যাস্টলেবও রয়েছে। মার্টন কলেজ লাইব্রেরী ঐতিহ্যগতভাবে এটির অধিকারী। এর সঙ্গে সসারের নামও জড়িত রয়েছে। তিনি তাঁর ছোট ছেলের জন্য অ্যাস্টলেব সম্পর্কে একটি পুস্তিকা লেখেন।
নাবিকদের জন্য অ্যাস্টলেব ছিল অমূল্য জিনিস। সপ্তদশ শতকে নতুন যন্ত্র আবিষ্কৃত না হওয়া পর্যন্ত পাশ্চাত্যে সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণের জন্য এর ব্যবহার অব্যাহত থাকে। অ্যাস্টলেবের সৌন্দর্য তার শিল্প-সৌকর্যের মধ্যে নিহিত। কোন প্রকার অবয়ব পরিবর্তন ছাড়া শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিস্ময়কর যত্ন ও নিপুণতা সহকারে একই আকারে এটি নির্মিত ও খোদাই করা হয়। ১০৬৬-৭ খৃস্টাব্দে টলেডোতে ইব্রাহিম ইবনে সাঈদের তত্ত্বাবধানে নির্মিত একটি অ্যাস্টলেব ১৫ নং চিত্রে দেখানো হয়েছে। এর সঙ্গে অপর একটির (চিত্র ১৬) তুলনা করা যেতে পারে যা আকারে একই রকমের হলেও কারুকার্যের দিক দিয়ে অধিকতর সূক্ষ্ম। পারস্যের বিখ্যাত ওস্তাদ শিল্পী আবদুল হামিদ ১৭১৫ খৃস্টাব্দে এটি তৈরি করেন।
আমরা মুসলমানদের প্রাথমিক ধাতব শিল্পে সৌকর্যের যে অসংখ্য নমুনা পেয়েছি তার মধ্যে একটি হচ্ছে জেরোনা ক্যাথিড্রালে রক্ষিত একটি কাস্কেট (চিত্র ১৭)। এটি কাঠের উপর পিটিয়ে পাতলা করা রৌপ্যমণ্ডিত পাতে গুটানো আকারে রেপুজো কারুকার্য খচিত। কাস্কেটের উৎকীর্ণ লিপিতে বলা হয়েছে যে, বদ্র ও তা'রিফ নামক দুজন কারুশিল্পী দ্বিতীয় আল-হাকামের (৯৬১-৭৬) জনৈক ওমরাহর জন্য এটি তৈরি করেছেন। ওমরাহ এটি সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিশামকে উপহার হিসাবে প্রদান করবেন। হিশাম কর্ডোভায় তার পিতার উত্তরাধিকারী হিসাবে খলীফা হন। রৌপ্যের উপর কারুকার্যমণ্ডিত যে সামান্য কয়টি শিল্পকর্ম আমাদের যুগ পর্যন্ত টিকে আছে এটি তার অন্যতম। ইহকালে মূল্যবান ধাতব জিনিস ব্যবহারে ধর্মীয় আপত্তি থাকা সত্ত্বেও এটি স্বর্গের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে। খলীফাদের প্রাসাদের জন্য স্বর্ণ ও রৌপ্যের ব্যবহার কোন অবস্থাতেই নিষিদ্ধ ছিল না।
কায়রোতে ফাতিমীয় খলীফাগণ স্বর্ণ ও রৌপ্যের যেসব সম্পদ সঞ্চয় করেন মিসরীয় রেকর্ডপত্রে তার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে কিন্তু ১০৬৭ খৃস্টাব্দের বিদ্রোহের সময় তুর্কী ভাড়াটিয়া বাহিনী সেগুলি তছনছ করে। এই বংশের শুরু থেকে রাজপ্রসাদসমূহে যেসব বংশগত সম্পদ সঞ্চিত হয় তার একটি তালিকা ঐতিহাসিক আল-মাকরিযী প্রথম দিকের আর্কাইভজ থেকে নকল করেন। এই আর্কাইভজ তার আমলেও যথাযথ ছিল। এই তালিকা থেকে ঐ সময়কার দরবারের মনিকারগণ যেসব অদ্ভুত বিলাসদ্রব্য উদ্ভাবন করেন তার কিছু কিছু ছবি তুলে ধরা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়। এটি এক সুদীর্ঘ দলিল যাতে ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রতিটি জিনিসের নিখুঁত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এসব জিনিসের মধ্যে রয়েছে সোনা ও রূপার দোয়াতদানি, দাবার ঘুঁটি, ছাতার (প্যারাসল) বাট, বিভিন্ন ফুলদানি, সোনার পাখি, মূল্যবান পাথর খচিত গাছ, প্রভৃতি। উৎসাহী পর্যবেক্ষকরা হাজারো রকমের জিনিস গণনা করলেও আমরা যদি তার থেকে কয়েকশ বাদও দেই, তাতেই যে কেউ বিস্ময় বোধ করবেন। তাছাড়া সমসাময়িক পারস্য পর্যটক নাসির-ই-খসরুর বর্ণনা থেকে ফাতিমীয় খলীফাদের বিখ্যাত সম্পদের প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি ১০৪৭ খৃস্টাব্দে জনৈক ওমরাহর সৌজন্যে রাজকীয় প্রাসাদের প্রকোষ্ঠগুলি পরিভ্রমণ করেন। তিনি পরপর এগারটি প্রকোষ্ঠ অতিক্রম করেন যার প্রত্যেকটি পূর্ববর্তীটি থেকে সুন্দর ছিল। দ্বাদশ প্রকোষ্ঠে ছিল সিংহাসন। স্বর্ণের তৈরি সিংহাসনটি শিল্পসৌকর্যে ছিল বিস্ময়কর। এতে সুদর্শন উৎকীর্ণলিপি সমন্বিত বিভিন্ন মৃগয়ার দৃশ্য অংকিত ছিল। তিনটি রৌপ্য নির্মিত সোপানের উপর স্থাপিত সিংহাসনের সম্মুখভাগে উন্মুক্ত কারুকার্য মণ্ডিত একটি বিস্ময়কর সোনালি জাফরি স্থাপন করা হয়। দুর্ভাগ্যবশত এর সৌন্দর্য এতো অপূর্ব ছিল যে, 'এটি বর্ণনাকে হার মানায়' ।
প্রথমদিকের মুসলিম স্বর্ণ ও রৌপ্য শিল্পকর্ম কার্যত বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমানে যেসব মুসলিম ধাতব শিল্প পর্যালোচনা করা যায় সেগুলি হচ্ছে ধনী ও অভিজাত মুসলমানগণ কর্তৃক ব্যবহৃত প্রধানত ব্রঞ্জ, পিতল ও তামার আসবাব ও তৈজসপত্রের মধ্যে যেগুলি টিকে আছে সেগুলি। পিসার ক্যাম্পোসান্টোতে অবস্থিত ব্রঞ্জের বিশাল গ্রিফিন (চিত্র ১৮) এমন এক ধরনের শিল্পকর্মের দৃষ্টান্ত যে রীতি সাধারণত ছোট ছোট পাখি ও জীবজন্তু, ফোয়ারার বিভিন্ন অংশ কিংবা বহনযোগ্য জলপাত্রে দেখা যায়। এগুলি থেকেই পরবর্তীকালের তথাকথিত ইউরোপীয় একোয়ামানিলেস তাদের অদ্ভুত আকার লাভ করে।
অতি আদরের জীবের আত্মতুষ্টির প্রতিমূর্তি বিস্ময়কর দানব গ্রিফিনের দেহ সম্পূর্ণরূপে খোদাই করা নকশায় আবৃত। ঘাড় ও পাখা দুটির উপর পাল্লার ন্যায় পালক অংকিত করা হয়েছে। পিছনের দিক দেখলে মনে হয় গোল ডোরাওয়ালা কাপড় সেঁটে দেওয়া হয়েছে। তার প্রান্তভাগে কুফী হস্তলিপি উৎকীর্ণ করা হয়েছে এবং তা বক্ষের চারদিকে বৃত্তাকারে অব্যাহত রয়েছে। কটিদেশে তীক্ষ্ণ খোব সৃষ্টি করা হয়েছে এবং শৃঙ্খল প্রান্তভাগের অভ্যন্তরে এসব খোবে সিংহ ও বাজপাখি খোদাই করা হয়েছে। উৎকীর্ণলিপিতে কবিতায় মালিকের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয়েছে। কিন্তু এই অপূর্ব ব্রঞ্জ মূর্তিটি তৈরির তারিখ বা মূল পরিচয়ের কোন সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে এটি সম্ভবত একাদশ শতকের কোন ফাতেমীয় রাজপ্রাসাদ থেকে নিয়ে আসা হয়েছে।
রিলিফে উত্তোলিত নকশা বা খোদাইকরা নকশা ছাড়া ধাতব কারুকার্যের অন্যান্য রীতিও মুসলিম কারুশিল্পীরা চর্চা করেন। তারা ব্রঞ্জ বা তামার উপর স্বর্ণ ও রৌপ্য খচিত কারুকার্যে অত্যন্ত নিপুণতা অর্জন করেন। বিভিন্ন পন্থায় অনুসৃত এই পদ্ধতি সাধারণত ডামাস্কেনিং নামে পরিচিত। ইউরোপীয়দের এই শিল্প চর্চার সঙ্গে দামেস্কের সম্পর্ক থেকেই এই নামের উদ্ভব হয়। সেখানে এটির উদ্ভব না হলেও এর চর্চা অবশ্যই হতো। এই জাতীয় সবচাইতে সূক্ষ্ম ও প্রাচীনতম শিল্পকর্মে ধাতব পদার্থের উপর নকশাগুলি খোদাই করা হতো এবং তারপর শূন্যস্থানগুলি স্বর্ণ বা রৌপ্য দ্বারা ভরাট করে দেওয়া হতো। এক ধরনের কালো আঠালো পদার্থ দিয়ে অন্যান্য কর্তিত অংশ ভরাট করে প্রায়ই এই নকশার সৌকর্য সাধন করা হতো। কোন কোন ক্ষেত্রে এটিই ছিল এই কারুকার্যকে সমৃদ্ধ করার একমাত্র পন্থা।
মুসলিম খোদাই করা ধাতব শিল্পকর্ম দ্বাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পূর্ণতা লাভ করে এবং দুইশত বছর পর্যন্ত এর অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাব অব্যাহত থাকে। এর সর্বাধিক সুন্দর এবং আদর্শ নমুনা হচ্ছে বৃটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত একটি পিতলের সোরাহী (চিত্র ১৯), যার পুরোটাই রৌপ্য খচিত কারুকার্যমণ্ডিত। দশটি পৃষ্ঠদেশ সমন্বিত অবয়ব ও গণ্ডদেশ আড়াআড়িভাবে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত এবং সেগুলি বিভিন্ন আকারের খোবে বৈচিত্রময়। বহির্ভাগের প্রতিটি অংশ বিভিন্ন ধরনের ছবি, জ্যামিতিক বা পত্রপুষ্পের নকশা এবং উৎকীর্ণলিপির কারুকার্যে গভীরভাবে সুশোভিত। পাদদেশে গ্রন্থীযুক্ত কারুকার্যের একটি ঝালর থোবার ন্যায় ঝুলন্ত রয়েছে এবং এর মধ্যদিয়েই নকশার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। খচিত ছোট ছোট রূপার পাতে যেসব ছবি তৈরি করা হয়েছে সেগুলির আকার অপূর্ব এবং সেগুলিতে অত্যন্ত যত্নসহকারে মুখমণ্ডল, হাত, গুটানো কাপড় প্রভৃতি বিশদভাবে খোদিত হয়েছে। গণ্ডদেশের চারদিকে একটি উৎকীর্ণ লিপিতে বলা হয়েছে যে, সোরাহীটি মসুলে ১২৩২ খৃস্টাব্দে শুজা ইবনে হানফার কর্তৃক নির্মিত হয়েছে।
সোরাহীটি মসুলভিত্তিক একটি শিল্পচর্চা কেন্দ্রের প্রতিনিধিত্বশীল। প্রাচীন ও সমৃদ্ধ তাম্র খনির সঙ্গে এই নগরীর গভীর যোগাযোগ ছিল। এখানে বিভিন্ন ধরনের কারুশিল্পের জন্য বিখ্যাত শিল্পীদের সমাবেশ ঘটে। এম রিনাউদ কর্তৃক উদ্ধৃত ত্রয়োদশ শতকের জনৈক লেখকের ঘোষণা অনুযায়ী এখানে বিশেষ করে রান্নাবান্না ও খাবারের কাজে ব্যবহৃত তামার পাত্র তৈরির জন্য এসব কারুশিল্পী সমবেত হয়। কিন্তু এরও আগে মসুলের উত্তর ও পূর্বদিকের বিভিন্ন অঞ্চলে একই রীতি ও কারুকার্যের শিল্পকর্ম দেখা যায়। এতে এই শিল্পচর্চার সঙ্গে আরমেনীয় ও পারস্য সম্পর্ক ছিল বলে মনে হয়। অবশ্য এখন পর্যন্ত তার পক্ষে কোন সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তী কালের শিল্পকর্মে কারুকার্যের রীতি ও কোন কোন বৈশিষ্ট্যে দ্বিতীয় শতকের গ্রীক ঐতিহ্যের সম্পর্ক থাকায় এইরূপ সম্ভাবনা বাতিল করা যায় না যে, দূর অতীত থেকে এসব অঞ্চলে গড়ে ওঠা স্থানীয় শিল্প রীতিকে ভিত্তি করে হয়তো বা মুসলমানরা এই শিল্পের বিকাশ সাধন করে।
এই শিল্পচর্চার প্রভাব সিরিয়ার মধ্য দিয়ে মিসরে দ্রুত প্রসারিত হয়। মঙ্গোল আক্রমণের ফলে মেসোপটেমিয়ার নগরগুলি ধ্বংস প্রাপ্ত হওয়ায় এবং কারুশিল্পীরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় এই স্থানান্তর দ্রুত সম্পাদিত হয়। চেঙ্গিস খানের পৌত্র হালাগু কর্তৃক বাগদাদ অধিকার এবং খলীফা মুসতাসিমের মৃত্যু ১২৫৮ খৃস্টাব্দে আব্বাসীয় খেলাফতের অবসান ঘটায়।
বৃটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত রৌপ্য ও স্বর্ণ খচিত একটি পিতলের রাইটিং কেস-এ (চিত্র ২০) এর শিল্পী বাগদাদের অধিবাসী মাহমুদ ইবনে সানকার-এর নাম রয়েছে। কিন্তু এটি তার পিতৃপুরুষদের নগরীতে (চিত্র ২২) তৈরি হতে পারে না। কারণ এর তারিখ দেওয়া হয়েছে ১২৮১ খৃস্টাব্দে, যখন এর অধিবাসীরা ছিল নগরীর ধ্বংসাবশেষের মধ্যে বসতি স্থাপনকারী গ্রামের লোক। এই সুদর্শন রাইটিং কেসটি কারুকার্য ও শিল্পসৌকর্যে সোরাহীটি থেকে কোন অংশে নিম্নমানের নয়। তিনটি বড় বড় পদকে চারগ্রুপে অংকিত দ্বাদশ রাশিচক্র এর ঢাকনির প্রধান অলংকার। ঢাকনির ভেতরের দিকে একসারি বৃত্তের মধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন নক্সা দেওয়া হয়েছে। মধ্যবর্তী বৃত্তের মধ্যে একটি মনুষ্য মুখাকৃতির আলোক বিকিরণকারী সূর্য রয়েছে এবং এর উভয় পার্শ্বের বৃত্তগুলিতে উপবিষ্ট অবস্থায় রয়েছে চন্দ্র, কলম ও কাগজ হাতে বুধ, বীণা হাতে শুক্র, তলোয়ার ও কর্তিত মস্তক হাতে মঙ্গল, বিচারকের আসনে বৃহস্পতি এবং যষ্টি ও থলে হাতে শনি গ্রহ।
সুন্দর সুন্দর কারুকার্যমণ্ডিত ভিত্তিভূমির উপর এসব নকশা অংকন করা হয়েছে এবং চারদিকের প্রান্তভাগেও রয়েছে জটিল নকশা। এই কেসটি এ ধরনের বহু কেসের মধ্যে একটি অপরূপ দৃষ্টান্ত। মূল অবস্থায় ২২ নং চিত্রের ন্যায় এর মধ্যে ছিল কালি রাখার কোটর, বালি ও আঠা রাখার কোটর এবং খাগের কলম রাখার জন্য আয়তাকার খোব।
খোদাই করে খচিত করার এই শিল্প দক্ষিণ দিকে প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর কারুকার্যও পরিবর্তিত হয় এবং তা চতুর্দশ শতকে কায়রোভিত্তিক দ্বিতীয় শিল্পধারার বৈশিষ্ট্য নিয়ে নতুনভাবে বিকশিত হয়। কারুকার্যপূর্ণ পৃষ্ঠদেশে মাঝে মাঝে যেসব পদক স্থাপন করা হয় সেগুলির চারদিকে পত্র-পুষ্প শোভিত সূক্ষ্ম প্রান্তভাগের উদ্ভব হয়। উৎকীর্ণলিপি আনুষঙ্গিক না হয়ে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। ২৩ নং চিত্রটি প্রান্তভাগ সমন্বিত একটি আদর্শ পদক। ১২৯৩ থেকে ১৩৪১ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত মিসরের সুলতান আল-নাসির মোহাম্মদ ইবনে কালাউনের জন্য নির্মিত একটি বৃহৎ থালা থেকে এই বিশদ নকশাটি তুলে ধরা হয়েছে।
আমাদের কাছে প্রায়ই অত্যন্ত সুন্দরভাবে রক্ষিত যে অসংখ্য শিল্প নিদর্শন রয়েছে এ দুটি দৃষ্টান্ত থেকে সে সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে। এগুলির মধ্যে রয়েছে সোরাহী, থালা এবং অন্যান্য সুদর্শন গঠনের পাত্র, যেগুলির নাম-পরিচয় তাদের কারুকার্যে নিহিত এবং যেগুলি সুলতান ও বড় বড় অভিজাত ব্যক্তিদের উৎসব অনুষ্ঠানের শোভাবর্ধন করতো। জুয়েল কেস, রাইটিং বক্স, মোমবাতিদানি, ধূপদানি, ফুলদানি এবং অনুরূপ অন্যান্য যে সব জিনিস গার্হস্থ্য জীবনে আড়ম্বরপূর্ণভাবে ব্যবহৃত হতো সেগুলি বৈচিত্র ও সংখ্যার দিক দিয়ে এতো বেশি যে তা বিশেষ বিশেষভাবে বর্ণনা করা যায় না। ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতকে এই শিল্প-কর্মের অত্যন্ত কদর ছিল। সম্পদশালী অভিজাত ব্যক্তিরা বিখ্যাত শিল্পীদের শিল্প কর্মের জন্য অধীর আগ্রহ প্রকাশ করতেন এবং প্রায়ই নিজেদের জন্য এসব জিনিস বিশেষভাবে তৈরি করিয়ে নিতেন। বৃটিশ ও ভিক্টোরিয়া এণ্ড আলবার্ট মিউজিয়ামে রক্ষিত বহু শিল্প নিদর্শনের সঙ্গে চমকপ্রদ ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে এবং এর কোন কোনটি শিল্প সৌকর্যের দিক দিয়ে অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
চতুর্দশ শতকের শেষ দিকে এই শিল্পের অবক্ষয় শুরু হয়। সিরিয়ায় মঙ্গোলদের হস্তক্ষেপ এবং ১৪০১ খৃস্টাব্দে তৈমুর কর্তৃক দামেস্কের ধ্বংস সাধন বড় বড় শিল্প কেন্দ্রগুলিকে বিপর্যস্ত করে। ১৫১৭ খৃস্টাব্দে উসমানীয়দের মিসর বিজয় কায়রোর অবশিষ্ট শিল্পীদেরও বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কিন্তু এটি নিজস্ব কেন্দ্রগুলিতে বিলুপ্ত হতে থাকলেও ইউরোপে এর আকর্ষণ ক্রমবর্ধমানভাবে বৃদ্ধি পায়। এখানেই তার গৌরবদীপ্ত পুনর্জন্ম ঘটে। ক্রুসেডের আমলে ইটালীয় শহরগুলিতে যে প্রাচ্য বাণিজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, পঞ্চদশ শতকে তা বিপুল সমৃদ্ধি লাভ করে। ছোট ছোট ইটালীয় রাজন্যবর্গের আড়ম্বরপূর্ণ জীবনে প্রাচ্যের জিনিস জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের কারুশিল্পীরা আদর্শ হিসাবে এসব শিল্পকর্ম প্রবর্তন করে এবং এগুলির সৌকর্য সাধনে অনুকরণমূলক প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়।
ভেনিসে মুসলিম ধাতব শিল্প স্থানীয় কারুশিল্পীদের এতটা অনুপ্রাণিত করে যে, সেখানে সুস্পষ্টভাবে একটি ভেনেসীয় প্রাচ্য শিল্পচর্চা কেন্দ্র গড়ে ওঠে এবং ইটালীয় রেনেসাঁর রুচির সঙ্গে মুসলিম শিল্পরীতি ও কারুকার্যের সংমিশ্রণ সাধিত হয়। ২১ নং চিত্রটি এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। এটি পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত একটি পিতলের থালা। এটি মুসলমানদের পারস্পরিক বুনটের গ্রন্থী নকশায় রৌপ্যখচিত একটি শিল্পকর্ম, যা প্রথমদিকের বলিষ্ঠ কায়রো কারুকার্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এর কেন্দ্রস্থলে ভেরোনার একটি অভিজাত পরিবার ওচি ডি কেন-এর স্মারক হিসাবে মিনাকরা একটি রূপার শিল্ড রয়েছে। অন্যান্য শিল্পকর্ম সমসাময়িক পারস্য শিল্পকর্মের আদর্শে তৈরি। এগুলি প্রকৃতপক্ষে ভেনিসেই উক্ত নগরীতে বসবাসকারী পারস্যের কারুশিল্পীরা তৈরি করতেন।
ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতকে ধাতব শিল্পকর্ম পারস্যে মসুলের শিল্পচর্চা কেন্দ্রের ন্যায় একই পন্থা অনুসরণ করে। কিন্তু এখানে কারুকার্যমণ্ডিত পাত্রগুলির গাঠনিক সৌকর্য বিধানের এবং অলংকরণের কতিপয় সংশোধনীর মাধ্যমে এর অগ্রগতি সূচিত হয়। ষোড়শ শতকের প্রাথমিক বছরগুলিতে সাফাভী বংশের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে পারস্য শিল্পকলার পুনরুজ্জীবনের সূচনায় একটি নতুন রীতিতে এসব পরিবর্তনের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধিত হয়। এই রীতিতে সাধারণত খোদাইকরণ রৈখিক নকশায় বা উৎকীর্ণ লিপিতে রূপান্তরিত হয় এবং তা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে অনুসৃত পাকানো নকশার ভিত্তিভূমিতে করা হয়। ২৪ নং চিত্রে এই রীতির একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে। একটি বাটির ঢাকনির উপর এই নকশাটিতে বিখ্যাত পারস্য কারুশিল্পী মাহমুদ আল-কুর্দীর স্বাক্ষর রয়েছে। ষোড়শ শতকের প্রাথমিক বছরগুলিতে তিনি ভেনিসে শিল্প চর্চা করেন।
মধ্যযুগীয় মুসলিম কারুশিল্পীদের স্বর্ণ ও রৌপ্য খচিত শিল্পকর্ম কোন কোন দিক দিয়ে সমসাময়িক ইউরোপীয় কারুশিল্পীদের তৈরি মিনাকরা ধাতব শিল্পের একটি প্রাচ্য প্রতিরূপ। ইউরোপীয়দের চ্যাম্পলিত পদ্ধতিতে বহু জিনিসের ওপর আঠালো রঙিন কাচে নকশা করা হয়। এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের রীতি ছিল অনুরূপ একটি পদ্ধতিতে মূল্যবান ধাতব পদার্থের সাহায্যে নকশা করা। ধাতব পদার্থের উপর মিনা করা অবশ্যই একটি প্রাচ্য রীতি, কিন্তু এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্টভাবে ইসলামী দৃষ্টান্ত কদাচিৎ দেখা যায়। আল-মাকরিযীর ফাতিমীয় সম্পদের তালিকায় রঙের সাহায্যে মিনাকরা সোনালি ফলকের উল্লেখ রয়েছে। ফুসতাতের আবর্জনার স্তূপ থেকে পত্রালংকার এবং ক্রয়যেনে রীতিতে মিনাকরা উৎকীর্ণ লিপি সমন্বিত একটি ধাতব থালা উদ্ধার করা হয়। এটি বর্তমানে কায়রোর আরব আর্ট মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। স্পষ্টত এটিও ফাতিমীয় যুগের। কিন্তু মুসলিম মিনাকরা ধাতব শিল্পের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ নমুনা হচ্ছে ইন্সব্রুকের মিউজিয়াম কার্ডিনেণ্ডামে রক্ষিত একটি তামার বাটি। চ্যাম্পলিভ রীতিতে সুশোভিত নকশার মধ্যস্থলে একটি বিরাট পদকে 'অ্যাসেন্ট অব আলেকজাণ্ডার' (আলেকজান্ডারের উত্থান) প্রতিফলিত করা হয়েছে। চারদিকে পৌরাণিক জীবজন্তুসহ অন্যরা রয়েছে এবং পটভূমিতে রয়েছে তাল জাতীয় গাছ ও নানা প্রকার দণ্ডায়মান ছবি। রীতির দিক দিয়ে বাইজেন্টাইন হওয়া সত্ত্বেও এই বাটির উৎকীর্ণ লিপিতে বলা হয়েছে যে, এটি মেসোপটেমিয়ার জনৈক অটুকী রাজার জন্য তৈরি করা হয়, যিনি দ্বাদশ শতকের মধ্যভাগে রাজত্ব করেন।
আমরা যে কয়টি নমুনা পেয়েছি তাতে মনে হয় যে, মিনার কাজ মুসলিম ধাতবশিল্পীদের প্রিয় ছিল না। পঞ্চদশ শতকের দিকে মুসলমানদের মধ্যে পুনরায় মিনাশিল্পের চর্চা দেখা যায়। এসময় স্পেনে অত্যন্ত সুন্দরভাবে মিনাকরা তলোয়ারের আসবাবপত্র তৈরি হয়। এসব দৃষ্টান্ত ও পরবর্তীকালে ভারতে মুঘল সম্রাটদের জন্য তৈরি করা মিনাশিল্প ঐতিহ্যগত না হয়ে সম্ভবত বিদেশী রীতির প্রতিফলন।
Mৃৎপাত্রের উপর রঙিন উজ্জ্বলতা (গ্লেজ) প্রয়োগের মাধ্যমে আর এক ধরনের মিনার কাজে মুসলমানরা অনেক পূর্ব থেকেই অত্যন্ত সুদক্ষ শিল্পী ছিলেন। মুসলিম শাসনাধীনে মিসর ও নিকট-প্রাচ্যের স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা তাদের এলাকায় প্রাচীনকাল থেকে কমবেশি ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় যে মৃৎশিল্প ছিল তা পুনরুজ্জীবিত করেন এবং তার প্রয়োগ পদ্ধতি ও কারুকার্যের কৌশলের উন্নতি সাধন করেন। মিসরে বহু যুগ আগে থেকেই উপরিভাগে সুন্দর সবুজ-নীল উজ্জ্বলতাসম্পন্ন প্রাচীর টালি প্রচলিত ছিল। আনুমানিক খৃষ্টপূর্ব ৫০০ খৃস্টাব্দে সুসায় দারিয়ুসের প্রাসাদে বিভিন্ন বর্ণের অনুরূপ শিল্প-সৌকর্যের প্রচলন ছিল। আরব অভিযানের পূর্ব-পর্যন্ত এসব অঞ্চলে সবার অজ্ঞাতে উপরোক্ত শিল্প চর্চা অব্যাহত ছিল। মুসলিম প্রভাবে মৃৎশিল্পীরা নতুন রীতি ও নকশা কৌশলের মাধ্যমে পুনরায় এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন।
মুসলিম মৃৎশিল্পের প্রাথমিক ইতিহাস এখনো অলিখিত রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বহু চমকপ্রদ নিদর্শন আবিষ্কৃত হলেও এগুলির ব্যুৎপত্তি এবং সময়-তারিখ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুমানের বিষয়। এ কথা পরিষ্কার যে, পারস্য, মেসোপটেমিয়া, সিরিয়া ও মিসরে অবস্থিত কেন্দ্রগুলি থেকে বিভিন্ন ধরনের মৃৎশিল্প মুসলিম বিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু বিশেষ বিশেষ মৃৎপাত্রের উদ্ভব মূলত কোথায় হয়েছিল তা সঠিকভাবে নির্ধারণ অসম্ভব। জনপ্রিয় শ্রেণীর মৃৎপাত্রগুলি বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে ছিল এবং একই ধরনের ও নকশার মৃৎপাত্র বিভিন্ন প্রাচীন এলাকায় পাওয়া যায়, যেসব এলাকা পরস্পর থেকে বহু দূরে বিচ্ছিন্ন। প্রাথমিক মুসলিম মৃৎশিল্প কি ধরনের ছিল দু-একটি নমুনা থেকে তা বোঝা যায়।
সুসায় একটি গ্লেজ করা মাটির থালা পাওয়া গেছে (চিত্র ৩০)। এতে সাদা ভিত্তিভূমির উপর উজ্জ্বল নিকেল ব্লু রঙে পপিবৃক্ষের একটি মাথা অংকিত করা হয়েছে। এর তৈরিকাল নবম শতক বলে ধরা হয়, কারণ সামাররার রাজপ্রাসাদ এলাকায় খননকার্যের পর অনুরূপ মৃৎপাত্র পাওয়া যায়। খলীফা হারুনুর রশীদের জনৈক পুত্র ৮৩৬ খৃস্টাব্দে এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেন এবং পঞ্চাশ বছর পর তা পরিত্যক্ত হয়। এই থালাটি বর্তমানে পাশ্চাত্য মৃৎশিল্পে অত্যন্ত জনপ্রিয় নীল ও সাদা কারুকার্যের একটি প্রাথমিক দৃষ্টান্ত। এই ফ্যাশনটি আধুনিক ইউরোপে পরবর্তীকালে চীন থেকে আসে। আব্বাসীয় শাসকগণ নবম শতকেই চীনা মৃৎশিল্প আমদানি করেন। সামাররায় তা রাজবংশের আমলে নির্মিত মৃৎশিল্প ও চীনামাটির পাত্র আবিষ্কৃত হয়। সে সঙ্গে ঐসব পাত্রের স্থানীয়ভাবে অনুকরণ করা মৃৎপাত্রও পাওয়া যায়। উপরোক্ত থালাটির বাস্তবতাপূর্ণ ডিজাইন এই বিদেশী ঐতিহ্যের অনুসারী। কিন্তু যে অপরূপ নীল বর্ণে নকশাটি প্রতিফলিত করা হয়েছে তা দেশীয়ভাবে উৎপাদিত। এই রংটি পরবর্তীকালে চীনে রফতানি করা হয় এবং এটি সেখানে 'মুসলিম ব্লু' নামে পরিচিত হয়। নীল ও সাদা পাত্র তৈরিতে এই রঙটি চীনাদের কাছে এতো অপরিহার্য ছিল যে; কোন অজ্ঞাত কারণে এর সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় এ ধরনের মৃৎপাত্র উৎপাদনও সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। তাই পাশ্চাত্যবাসী অভ্যাসবশত 'ব্লু এণ্ড হোয়াইট চায়না' দূরপ্রাচ্যের বলে মনে করলেও বিশেষ ধরনের ব্লু মুসলমানদেরই অবদান। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে এশিয়া মাইনরের কুতাহিয়ায় মুসলিম মৃৎশিল্পীরা এই রঙ কতিপয় মৃৎপাত্রে অপরূপভাবে ব্যবহার করেন।
প্রগতিশীল ধ্যান-ধারণা প্রতিফলিত করতে গিয়ে মুসলিম মৃৎশিল্পীরা বিদেশলব্ধ অভিজ্ঞতাকে নিজস্ব ঐতিহ্যের মধ্যে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সংযোজিত করে নিজেদের মহান মৌলিকত্ব অক্ষুণ্ণ রাখেন। কিভাবে এই মৌলিকত্ব বজায় রাখেন তা বহু চমকপ্রদ দৃষ্টান্ত থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যাবে। ৩১ নং চিত্র তথাকথিত গাবরি মৃন্ময় পাত্রের একটি ঢাকনি। এ ধরনের মৃন্ময়পাত্র অগ্নিপূজকরা তৈরি করতেন বলে ধারণা করা হয়। আরব বিজয়ের অনেক পরেও এরা পারস্যের কোন কোন অঞ্চলে তাদের প্রাচীন ধর্ম আঁকড়ে থাকে। এই কারুকার্য ইটের ন্যায় লাল দেহাবয়বের উপর সাদা কাদামাটির যে পাতলা আবরণ থাকে তা কেটে অংকন করা হয়। তারপর সমস্ত অবয়বটি ঈষৎ হলদে, সবুজ, বেগুনী বা বাদামী রঙের স্বচ্ছ উজ্জ্বলতায় আবৃত করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে বিভিন্ন রঙ এমন এলোমেলোভাবে দেওয়া হয় যা সমসাময়িক একটি চীনা রীতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অশ্বারোহী শিকারী, পৌরাণিক দানব এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পত্রালংকার প্রভৃতি সাসানীয় উপাদানের সাধারণ প্রচলন থেকে ইতিপূর্বে মনে করা হতো যে, গাবরি মুসলিম যুগের সূচনা থেকে প্রবর্তিত হয়েছে। কিন্তু একাদশ বা দ্বাদশ শতকের রীতির কুফী বর্ণমালার উৎকীর্ণলিপির দৃষ্টান্ত থেকে এর অধিকাংশ শিল্পকর্ম এযুগ থেকে শুরু হয়েছে বলে ধরা হয়। গ্রাফিটো নামে পরিচিত- খোদাই করা নকশারীতি চীনে সাধারণভাবে প্রচলিত থাকলেও সেখানেই এর উদ্ভব হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। ইসলামের পূর্ববর্তী মিসরেও এর প্রচলন ছিল। পঞ্চদশ শতকে ইটালীয় মৃৎশিল্পীরা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে এই রীতি অনুসরণ করেন। তারা সম্ভবত মুসলিম সূত্র থেকে এটি লাভ করেন। সেখান থেকেই অনেকখানি পরিণত কারিগরি জ্ঞান লাভ করার ফলে ইটালীয় রেনেসাঁর যুগে মৃৎশিল্প পুনরুজ্জীবনে এটি তাদের বিশেষ সহায়ক হয়।
যাকে দীপ্তিমান-মৃৎশিল্প (লাস্টার্ড পটারি) বলা হয়, সেখানে মুসলমানরা সীমাহীন সাফল্য অর্জন করে। এতে একটি রঞ্জিত ভিত্তিভূমিতে ধাতব লবণের সাহায্যে নকশাটি অংকন করা হয় এবং সেখানে এমনভাবে ধূম্র প্রয়োগ করা হয় যাতে একটি ধাতব উজ্জ্বল তাম্র-লাল থেকে শুরু করে সবুজ-হলদে উজ্জ্বলতার সৃষ্টি হয়। এই উজ্জ্বলতা বিভিন্ন আভাযুক্ত ধনুরাকার সমুজ্জ্বল নমুনার হতে পারে। কোন কোন ক্ষেত্রে এতে রংধনুর আলো ঝলোমলো রংয়ের প্রতিফলন ঘটে। নিকট-প্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনে দশম শতকের শিল্পকর্ম আবিষ্কৃত হয়েছে। এত দ্বারা ইসলামী বিশ্বের সর্বত্র এই শিল্পের অত্যধিক কদর প্রমাণিত হলেও এর উদ্ভব কোথা থেকে তা সন্দেহাবৃত। এটি প্রথমে মিসরে না পারস্যে তৈরি হয়েছে সে সম্পর্কে এখনো বিতর্ক চলছে এবং এ সম্পর্কে তীব্র মতপার্থক্য রয়েছে। ২৬ নং চিত্রের বিরাট পাত্রটি ফুসতাতের ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং এটি একাদশ শতকের ফাতেমীয় শিল্পকর্ম বলে অনুমান করা হয়। ৩২ নং চিত্রটি একটি থালা। নিষ্প্রভ দীপ্তির মধ্যে একটি উজ্জ্বল গ্রিফিন, পত্রালংকার এবং বিশেষ ধরনের কুফী হস্তলিপি রয়েছে। ১২২০ খৃস্টাব্দে মঙ্গোলদের দ্বারা ধ্বংস প্রাপ্ত একটি প্রাচীন পারস্য নগরী রাই বা রাজিসের ধ্বংসাবশেষ থেকে এটি আবিষ্কৃত হয়।
রাই মৃৎশিল্পের একটি বিরাট কেন্দ্র ছিল। এখান থেকে কয়েকটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রীতির উদ্ভব হয়। এর ধ্বংসাবশেষ বিভিন্ন সুদর্শন শিল্পকর্মের একটি খনি। সুনির্দিষ্টভাবে এই নগরীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কতিপয় পাত্র ও থালা রয়েছে যা অস্বচ্ছ (ওপেক) বর্ণে রঞ্জিত। বর্ণগুলি হচ্ছে নীল, সবুজ, লাল-বাদামী ও বেগুনী। মাঝে মাঝে সাদা বা রঙের আভাযুক্ত পাদভূমিতে সোনালি পত্রের স্পর্শ। বিষয়বস্তুতে রয়েছে সূক্ষ্ম কারুকার্যের জন্য বিখ্যাত বিভিন্ন ছবি ও আনুষ্ঠানিক অলংকার। সমসাময়িক পাণ্ডুলিপিগুলির চিত্রসমূহের সঙ্গে এগুলির এতটা মিল রয়েছে যে, যেন শিল্পীরা পাণ্ডুলিপির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই এগুলি অংকন করেছেন। ২৫ নং চিত্রের পেয়ালাটিতে পরস্পর বিরোধী 'এস' আকৃতির বক্ররেখা দ্বারা গঠিত খোবের মধ্যে স্পিঙ্কস সঙ্গীত শিল্পীদের ছবি অংকন করা হয়েছে। এটি প্রায়ই 'মিনিয়েচার' পাত্র হিসাবে অভিহিত এ ধরনের শিল্পের একটি আদর্শ দৃষ্টান্ত। রাই নগরী যখন মঙ্গোলদের দ্বারা ধ্বংস হয় তখন এই শিল্প উৎকর্ষের চরম সীমায় পৌঁছে।
২৭ নং চিত্রের পাত্রটি গাঢ়নীল ও কালোবর্ণের নীলকান্তমণির রঙে রঞ্জিত। ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতকে পারস্যের সুলতানাবাদে তৈরি এক ধরনের মৃৎশিল্পের রীতিতে এটি তৈরি করা হয়েছে। এই আকৃতির পাত্র ইটালীয়দের কাছে আলবারেল্লো নামে পরিচিত ছিল। নামটি সম্ভবত আরবী আল-বারনিয়া থেকে নেওয়া হয়েছে, যার অর্থ একটি ওষুধের পাত্র। এ ধরনের পাত্র প্রাচ্যে কি উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতো উপরোক্ত নাম থেকে তা বোঝা যায় এবং ইটালীতেও একই উদ্দেশ্যে এগুলি ব্যবহৃত হচ্ছে। পঞ্চদশ শতকের ইটালীয় ওষুধের দোকানে এ ধরনের পাত্র প্রাচ্য থেকে আমদানিকৃত ওষুধ ভর্তি করে সাজিয়ে রাখা হতো। আমাদের দেশে এখনো যেভাবে চীনা জিঞ্জার-জার (আদ্রক ভর্তিপাত্র) আমদানি করা হয়, ঠিক তেমনিভাবে ইটালীয় ওষুধের পাত্রও ওষুধ ব্যবসায়ের মাধ্যমে পশ্চিমদিকে প্রবর্তিত হয়। ২৮ নং চিত্রে প্রাচ্যের অনুকরণে একটি ইটালীয় পাত্র দেখা যায়। এটি ঈষৎ পীতবর্ণের পোড়ামাটির পাত্রে গাঢ়নীল রঙে রঞ্জিত একটি আলবারেল্লো। পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফায়েনযায় এটি তৈরি করা হয়।
ইটালীয়রা দীপ্তিমান বর্ণে রঞ্জিত ওষুধের পাত্র, প্রাচ্যে এধরনের পাত্রের মুসলিম কেন্দ্র ভ্যালেনসিয়া থেকে পেয়েছে। এ জাতীয় যেসব উৎকৃষ্টতম নিদর্শন রয়েছে সেগুলিও এখানে তৈরি করা হয়। কোন কোন সময়ে বিদেশী ক্রেতাদের অর্ডার অনুযায়ী এগুলি তৈরি করা হতো, যাতে তাদের কুলচিহ্ন অংকিত করা হতো। ২৯ নং চিত্রের থালাটি হলদে দীপ্তি ও নীল বর্ণে রঞ্জিত করা হয়েছে। এটি পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে ফ্লোরেন্সের ডেগলি আগলি পরিবারের জনৈক সদস্যের জন্য ভ্যালেন্সিয়ায় তৈরি করা হয়। উক্ত পরিবারের গৌরব প্রতীকও এটিতে অংকিত রয়েছে। স্পেনীয় দীপ্তিমান মৃৎশিল্প ইটালীয় অনুকরণমূলক প্রতিযোগিতাকে এতোটা অনুপ্রাণিত করে যে, তার ফলেই ষোড়শ শতকে স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা কিভাবে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রেনেসাঁর নকশা দীপ্তিমান করতে হবে তা আয়ত্ত করে। তারা এমন সব পন্থায় অম্লান দীপ্তি আরোপ করেন যা ঐতিহ্যের ধারা পাল্টিয়ে দেয়। বিখ্যাত শিল্পকেন্দ্র গুব্বিওতে মহান শিল্পী জিওরজিও আদ্রিওলির সোনালি ও চুনীবর্ণের দীপ্তি ইটালী কিংবা প্রাচ্য সর্বত্রই অপ্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছে।
ষোড়শ শতকের সূচনায় মৃৎশিল্পের প্রাচীন ধারা সর্বত্রই পরিবর্তিত হতে থাকে। নতুন রূপায়ণের ক্ষেত্রে পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতাসম্পন্ন দুটি রূপ এশিয়া-মাইনর ও সিরিয়ায় ধীরে ধীরে আবির্ভূত হয় এবং এক অপরূপ সমৃদ্ধি লাভ করে। সাদা পল্লবের আবরণযুক্ত পোড়ামাটির পাত্রে স্বচ্ছ উজ্জ্বলতা দ্বারা সেগুলি রঞ্জিত করা হয় এবং নকশাগুলি কালো পটভূমিতে সবুজ, নীল ও নিষ্প্রভ বাদামী রঙে অংকিত হয়। এশিয়া-মাইনরের কেন্দ্রগুলিতে প্রায়ই এগুলিতে টমাটোর ন্যায় উজ্জ্বল লালবর্ণও আরোপ করা হয়। এসব মৃৎশিল্পের চমকপ্রদ দিক হচ্ছে যে, বর্গাকৃতি প্রদানের মাধ্যমে এগুলি প্রাচীরের টালি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। সে ক্ষেত্রে প্রতিটি ইউনিটে পুনরাবৃত্তিমূলক আনুষ্ঠানিক নকশা অংকন করা হতো অথবা স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ নকশা সম্বলিত বড় বড় অংশ পৃথকভাবে তৈরি করা হতো। ওসমানীয় সাম্রাজ্যের কনস্টান্টিনোপল, ব্রুসা ও অন্যান্য বড় নগরীতেও বহু ভবনে এ ধরনের নকশাসম্বলিত প্রাচীর রয়েছে।
পরবর্তী তিনটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে পুনরাবৃত্তিমূলক নকশা অংকিত টালির নমুনা। প্রথমটিতে (চিত্র ৩৩) কারুশিল্পী প্রতিটি টালির মধ্যস্থলে দুই দিক সরু ডিম্বাকৃতির একটি নকশা অংকন এবং প্রত্যেক কোণে একই নকশার এক-চতুর্থাংশের পুনরাবৃত্তি করেন। এতে অনেক টালি একত্র করার পর উপর থেকে নিচের দিকে আঁকাবাঁকাভাবে পরস্পর বিরোধী সাদা সাদা ডোরা সৃষ্টি হয়। এই ডিজাইনের বিপরীত দ্বিতীয়টি (চিত্র ৩৪) হচ্ছে সম্পূর্ণ নৈসর্গিক। এতে সমান্তরালভাবে ঢেউ খেলানো লতায় পর্যায়ক্রমিকভাবে দ্রাক্ষাপত্র ও আঙ্গুর এবং বাদাম-কুঁড়ি অংকিত করা হয়। তৃতীয় নকশাটি (চিত্র ৩৫) উপরোক্ত আনুষ্ঠানিক ও নৈসর্গিক উভয় উপাদানের সংমিশ্রণে অংকিত হয়েছে এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাঝে মাঝে গোলাপাকৃতির পুষ্পশোভিত ক্ষীণ একান্থাসের পত্ররাজি। সহজ-সরল বিষয়গুলিকে জটিলতাপূর্ণ নকশায় রূপান্তরিত করতে গিয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অসঙ্গতির মধ্যেও সঙ্গতির সৃষ্টি করা হয়েছে। এটি এই রীতির বৈশিষ্ট্য। মুসলিম কারুশিল্পীরা কিভাবে কারুশিল্পের বিভিন্ন ধারণার সুষ্ঠু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন এখানে ঘটনাক্রমে তা লক্ষণীয়। ৩৬ নং চিত্রে প্রদর্শিত সুন্দর প্যানেলটিতে টালি-নকশার দ্বিতীয় প্রকার, অর্থাৎ একটি বড় আকারের মধ্যে সামগ্রিক নকশা দেখানো হয়েছে। এটি হালকা নীল, সবুজ ও বাদামী রঙে রঞ্জিত দামেস্ক শিল্পকর্মের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যা তুর্কী মৃন্ময় পাত্রের সঙ্গে সিরীয় মৃন্ময় পাত্রের পার্থক্য সৃষ্টি করেছে।
তুর্কী ও সিরীয় মৃৎশিল্পীরা তাদের টালিতে একটি রীতি প্রয়োগ করেছেন এবং থালা, বাটি, ফুলদানি ও অন্যান্য বিচিত্র ধরনের পাত্রে একই ধরনের নকশা ব্যবহার করেছেন। ৩৭ নং চিত্রের বোতলটিতে স্পিঙ্কস, পাখি ও জীব-জন্তুর এক অদ্ভুত সংমিশ্রণের নকশা অংকন করা হয়েছে। আপেল-গ্রীন পাদভূমিতে ছবিগুলি সাদা রাখা হয়েছে। এগুলি কিছুটা সেকেলে উপাদান সমন্বিত একটি বিশেষ শ্রেণীর উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। লালবর্ণের যে পরশ রঙের পরিকল্পনাকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে তা মূলত তুর্কী। এশিয়া-মাইনরের শিল্পকর্মে সবসময় লাল রঙ দেখা যায় না, আর সিরীয় শিল্পকর্মে তা আদৌ নেই।
এ ধরনের মৃৎশিল্পে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য যে সব আলঙ্কারিক উপাদান ব্যবহৃত হয় সেগুলি নিঃসন্দেহে পত্র-পুষ্প অলংকার। দামেস্ক প্যানেলে (চিত্র ৩৬) তা ব্যাপকভাবে প্রদর্শিত হয়েছে। অপরূপ নকশা সম্বলিত এ ধরনের দুটি সুদর্শন পাত্রে টিউলিপ, গোলাপ, কচুরিপানা, আইরিশ ও বাদাম-কুঁড়ির অপূর্ব সমাবেশ দেখতে পাওয়া যায়। ফুলগুলি সবসময় এতোটা পরিপূর্ণ নিপুণতা ও যথাযথ সৌকর্যবোধের মাধ্যমে অংকন করা হয় যে, ছবির মধ্যেও তাদের স্বাভাবিকতা কখনো ক্ষুণ্ণ হয় না। কারুশিল্পীরা পারস্য থেকেই তাদের পুষ্পালংকারের উপাদান সংগ্রহ করেন এবং এত অপরূপভাবে সেগুলি অংকনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। ৩৮ নং চিত্রে আমরা পারস্য রীতির দ্বারা প্রভাবিত দামেস্ক শিল্পকর্মের একটি অপরূপ জগ দেখতে পাই। এতে নীল খোলসসম্পন্ন পাদভূমিতে টিউলিপ ও গোলাপ ফুল অংকন করা হয়েছে। সূক্ষ্ম কারুকার্য ও উজ্জ্বল বর্ণের এটি এ জাতীয় একটি অপূর্ব সৃষ্টি।
পাশ্চাত্য শিল্পে কতিপয় ফুলের প্রবর্তন হয় প্রধানত তুরস্ক ও সিরিয়ার মাধ্যমে পারস্য থেকে। এসব ফুল বর্তমানে আমাদের উদ্যানসমূহে উৎপাদিত হচ্ছে। কিন্তু এক সময় মুসলিম প্রাচ্য থেকে আমদানিকৃত মৃন্ময়পাত্র এবং চীনামাটির বাসন-কোসনের নকশা থেকেই ইউরোপ এগুলির সঙ্গে পরিচিত হয়। ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কনস্টান্টিনোপলে নিযুক্ত রাজকীয় দূত বাসবেকের মাধ্যমেই টিউলিপ সর্বপ্রথম পাশ্চাত্যে আসে।
সিরিয়ায় প্রাচীনকাল থেকেই কাচ উৎপাদনের অত্যন্ত সুন্দর স্থানীয় উপাদান ব্যবহার করা হতো। মুসলমানরা এখানে কাচের উপর কারুকার্যের একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রীতি উদ্ভাবন করেন। বিভিন্ন রকমের বোতল, পানপাত্র, সজ্জিত পাত্র এবং রঙিন মিনাকরা এবং প্রায়ই সোনালি পরশ দেওয়া চিত্র ও কারুকার্য সমন্বিত পাত্রে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। কোন কোন পাত্র এমন পন্থায় কারু-সমৃদ্ধ করা হয়েছে যা পারস্য ও মেসোপটেমিয়ার কয়েকটি মৃন্ময় পাত্রের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ফলে বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে এগুলি প্রাচীনতম বলে ধরে নেওয়া হয়। প্রথম মঙ্গোল অভিযানের সময় মেসোপটেমিয়ার যেসব কারুশিল্পী সিরিয়ায় হিজরত করেন এগুলি সম্ভবত তাদেরই অবদান। এসব কারুশিল্পী সিরিয়ায় নিজেদের উৎপাদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন যা চতুর্দশ শতকে ব্যাপক সমৃদ্ধি লাভ করে। কিন্তু ১৪০১ খৃস্টাব্দে তৈমুর সিরিয়ার ধ্বংস সাধন করলে এরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
৩৯ নং চিত্রের পানপাত্রটিতে আড়াআড়িভাবে দুটি উৎকীর্ণ নকশা বন্ধনীর ন্যায় চিত্রিত করা হয়েছে। বন্ধনীর মাঝখানে দুদিকে দণ্ডায়মান দুজন পরিচারক পরিবৃত্ত হয়ে একজন রাজা সিংহাসনে উপবিষ্ট। লাল ও সাদা বর্ণে মিনাকরা এবং সমুজ্জ্বল এই চিত্রটি ত্রয়োদশ শতকের রীতির একটি আদর্শ দৃষ্টান্ত। পানপাত্রটিকে যেভাবে ফ্রান্সের চতুর্দশ শতকের রেপোসে শিল্প রীতিতে ব্যাপক কারুকার্যময় একটি প্রশস্ত পাদানি ও রূপার গিল্টি করা দণ্ডের উপর অত্যন্ত মূল্যবান বস্তুর ন্যায় চ্যালিস (পবিত্র পানপাত্র) হিসাবে স্থাপন করা হয়েছে, তাতে মনে হয় নির্মিত হওয়ার অব্যবহিত পরই এটি ইউরোপে আসে।
সমসাময়িক রেকর্ডপত্রে দেখা যায়, খৃস্টান ইউরোপে এ সময় সিরীয় কাচের পাত্রের অত্যন্ত কদর ছিল। ১৩৯৭ খৃস্টাব্দে ফ্রান্সের পঞ্চম চার্লসের সম্পদের যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে তার দুটিতে এ জাতীয় কাচের পাত্রের সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে, যেমন: 'টক্স পয ডি ভয়ের ঔভার পার ডেহর্স এ ইমেজেস এ লা ফ্যাকন ডি ডামাস'; এবং 'আং বেসিন প্ল্যাট ডি ভয়ের পেইন্ট এ লা ফ্যাকন ডি ডামাস' । বৃটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত আরেকটি সিরীয় কাচের পাত্রও বিশেষ করে কোন খৃস্টান মালিকের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, কারণ এতে ভার্জিন ও চাইল্ড, সেন্ট পিটার ও সেন্ট পলের ছবি এবং একটি ল্যাটিন উৎকীর্ণলিপি রয়েছে।
ত্রয়োদশ শতক থেকে সমগ্র ইউরোপে কাচের কারুকার্যের জন্য বিখ্যাত ভেনেসীয় কারুশিল্পীরা পঞ্চদশ শতকে প্রাচ্য রীতির প্রতি আকৃষ্ট হন এবং মিনার কাজে এতোটা দক্ষতা অর্জন করেন যে, শীঘ্রই এতে মুসলমানদের একচেটিয়া প্রাধান্যের অবসান ঘটে। এটি ভেনিস থেকে ইউরোপের অন্যান্য শিল্পকেন্দ্রে প্রসার লাভ করে এবং সেখানে নতুন নতুন রীতির উদ্ভব হয়। যেসব সুশোভিত মিনাকরা স্পিরিটের বোতল সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ইউরোপে অত্যন্ত সাধারণ হয়ে পড়ে সেগুলি মধ্যযুগীয় মুসলিম নিপুণতার নিকৃষ্ট উত্তরাধিকারী।
অনুকরণ যতই চমকপ্রদ হোক না কেন-আকারের সৌন্দর্যের দিক দিয়ে কিংবা অলংকরণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রত্যক্ষতার দিক দিয়ে এগুলি কখনো তাদের প্রাচ্যের আদর্শের সমকক্ষ হতে পারেনি। ৪১ নং চিত্রের লম্বা গলাওয়ালা বোতল এবং ৪২ নং চিত্রের সূক্ষ্ম কারুকার্যময় বাটি ও ঢাকনি মুসলমানদের খাবার টেবিলের আদর্শ কাচের পাত্র। বোতলটিতে আড়াআড়ি বন্ধনীর মধ্যে পদক, উৎকীর্ণলিপি ও পত্রালংকার মিনাকরা হয়েছে এবং এতে ১৩৪৫ খৃস্টাব্দে মিসরের মামলুক সুলতান আল কামিল, সাইফুদ্দিন শা'বানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনৈক আমীরের নাম খোদাই করা হয়েছে। বাটিতেও একই ধরনের নকশা রয়েছে এবং সেগুলি সবুজ, নীল, লাল ও সাদা বর্ণে মিনাকরা হয়েছে এবং কোথাও গিল্টি করা হয়েছে। এই অপরূপ আকৃতির সুদর্শন পাত্রটিতে কোন নাম নেই, কিন্তু নিম্নোক্ত কথাটি উৎকীর্ণ করা হয়েছে: 'আমাদের প্রভু সুলতানের উপর গৌরব বর্ষিত হোক!'
সিরীয় কাচশিল্পীদের সবচাইতে সুন্দর শিল্পকর্ম হচ্ছে প্রদীপ কিংবা দ্বীপাধার। দ্বীপাধারগুলির সঙ্গে ভেতরের দিকে ছোট ছোট তৈলপাত্র প্রান্তভাগের তার দ্বারা যুক্ত করা হয়। প্রদীপগুলিকে তাদের গায়ের ভাঁজের সঙ্গে রূপা বা পিতলের শিকল দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এসব প্রদীপ বহু বড় বড় মসজিদকে রত্নের ন্যায় আলোকশিখায় উদ্ভাসিত করে। এগুলি সাধারণত পদক ও উৎকীর্ণ নকশার ডোরা কেটে অলংকৃত করা হয়। প্রচলিত পল্লবগুচ্ছের নকশা তাদের প্রাণবন্ত করে তোলে। কিন্তু ৪৪ নং চিত্রের ন্যায় কোন কোনটির সমগ্র উপরিভাগ বুটিদার রেশমী বস্ত্রের মতো পুষ্পের নকশায় আবৃত করা হয়। আরেকটির (চিত্র ৪০) অলংকরণও একইভাবে করা হয়েছে। সেটিতে যে দাতা প্রদীপটি কোন অজ্ঞাত মসজিদকে দান করেছেন তাঁর বর্মের গৌরবচিহ্ন অংকিত করা হয়েছে।
মুসলিম অভিজাত শ্রেণী প্রাচ্যের একটি প্রাচীন ঐতিহ্য অনুসরণ করে তাদের নিজস্ব জিনিসের উপর প্রায়ই কুলজীচিহ্ন অংকন করেন। তাদের এই রীতি পাশ্চাত্যকেও কুলজীচিহ্ন ব্যবহারে প্রভাবিত করে। এর ফলে ক্রুসেডের সময় নিজস্ব একটি অদ্ভুত পরিভাষাসহ ধারাবাহিক বিজ্ঞান হিসাবে কুলজীচিহ্ন রীতি প্রবর্তিত হয়। এতে পারস্য শব্দ থেকে নীলবর্ণের পরিভাষা আউরু গ্রহণ করা হয়, যার অর্থ 'ল্যাপিস ল্যাজিউলাই' নামে অভিহিত মূল্যবান নীল পাথর। ইউরোপীয় ও প্রাচ্য কুলজীচিহ্ন ব্যবস্থায় আরো কয়েকটি চমৎকার সম্পর্কও রয়েছে। এর মধ্যে সেই অদ্ভুত দ্বিমস্তক ঈগলের ছবির কথা উল্লেখ করা যায়। এই ছবিটি দূর অতীতের হিট্রাইট স্মৃতিসৌধে প্রথম দেখা যায়। দ্বাদশ শতকের প্রথম দিকে এটি সেলজুক সুলতানদের প্রতীকচিহ্নে পরিণত হয়। চতুর্দশ শতকে এটি হোলি রোমান সম্রাটদের বর্মে গৌরবচিহ্ন হিসাবে প্রবর্তিত হয়।
মুসলমানদের কুলজীচিহ্ন হয় ৪০ নং চিত্রের প্রদীপের ন্যায় গোল আকারে বর্মের উপর স্থাপন করা হতো অথবা ৪১ নং চিত্রে বোতলে যেভাবে মিনা করা হয়েছে সেভাবে পাদদেশে ছুঁচালো করে লাগানো হতো। ঈগলের ন্যায় বিভিন্ন ধরনের পাখি এবং মামলুক সুলতান বাইবার্স কর্তৃক ব্যবহৃত সিংহের ন্যায় বিভিন্ন পশুর প্রতীক চিহ্ন ছাড়াও রাজদরবারের কোন কোন কর্মচারী তাদের মর্যাদাসূচক সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের প্রতীক চিহ্ন ব্যবহার করতেন। এসব কর্মচারী ছিলেন সাকী, পোলো-মাস্টার, বিভিন্ন সমরসচিব প্রভৃতি। চ্যালিসের ন্যায় পেয়ালা এবং পোলো-স্টিকের তাৎপর্য বোঝা যায়, কিন্তু ৪৫ নং চিত্রে প্রদর্শিত সর্বশেষ ছবিটির অর্থ দীর্ঘকাল পর্যন্ত দুর্বোধ্য ছিল। একসময় মনে করা হতো যে, এর মাধ্যমে মুসলিম শিল্পকর্মে প্রাচীন মিসরীয় চিত্রাক্ষরের একমাত্র নমুনা ধরে রাখা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এটিকে ২২ নং চিত্রে একটি রাইটিং কেসের আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার যে নকশা দেওয়া হয়েছে, তেমনি একটি নকশা বলে ধরা হয়।
কোন কোন সময়ে সরকারী ব্যাজে কিভাবে একটি ব্যক্তিগত প্রতীক চিহ্ন ব্যবহৃত হতো লম্বা বোতলের উপর ছুঁচালো শিল্ডটি (একটি ঈগলের) তার দৃষ্টান্ত। সম্ভবপর ক্ষেত্রে মুসলমানদের গৌরব প্রতীকগুলি সবসময় উজ্জ্বল বর্ণের হতো, কারণ কোন অভিজাত ব্যক্তির ব্যবহৃত রং তার অস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
এবারে বস্ত্রের শিল্পকর্মের কথা আলোচনা করা যাক। আরবরা যখন পারস্য, সিরিয়া ও মিসর জয় করেন তখনই সেসব দেশ বস্ত্রের সুদর্শন কারুকার্যে বেশ উন্নতি সাধন করে। আশেপাশের বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের প্রদেশগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ বয়নকেন্দ্রসমূহে অত্যন্ত উন্নতমানের রেশমী বস্ত্র উৎপাদিত হতো। তারা নিজেদের নকশায় বহু সাসানীয় উপাদান গ্রহণ করেন। মহানবী কর্তৃক রেশমী কাপড়ের ব্যবহার বিশেষভাবে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানরা কেবল চালু রেশম কারখানাগুলিকে উৎসাহিতই করেননি; তারা যেখানে গেছেন সেখানেই নতুন নতুন রেশম কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছেন। নিষিদ্ধ বিলাসিতায় তাদের আগ্রহ এতটা নিঃসঙ্কোচ ও অবাধ ছিল যে, শীঘ্রই তারা মধ্যযুগীয় বিশ্বে রেশমী বস্ত্র ব্যবসায়ী হিসাবে প্রাধান্য লাভ করে। মধ্যযুগে বহু রেশমী বস্ত্র যে সব নামে পরিচিত হয়, এবং ব্যবসায়ের যেসব পরিভাষা আমাদের যুগ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে তার মধ্য দিয়ে এর পরিচয় পাওয়া যায়। নাম ও পরিভাষায় কোন কোন জিনিস যেখানে উৎপাদিত হতো কিংবা যেসব কেন্দ্র থেকে পাওয়া যেতো সেসব স্থানের পরিচয় রয়েছে। তাই মিসরের প্রথম মুসলিম রাজধানী ফুসতাত থেকে সসারের সময় প্রচলিত বস্ত্র 'ফুসচেন'-এর উদ্ভব হয়েছে। যেসব কাপড়কে এখনো আমরা 'ডামাস্কাস' বলি তার নাম দামেস্ক থেকে এসেছে। এই বিরাট বাণিজ্য কেন্দ্রের বহু জিনিস যা একান্তভাবে সেখানে উৎপাদিত হতো না সেগুলিকেও পাশ্চাত্যবাসী দামেস্কের জিনিস বলে মনে করতো। ইটালীয় বণিকগণ মসুল থেকে যে মুসোলিনা আমদানি করতো সেগুলিই আমাদের 'মসলিন'। বাগদাদকে ইটালিয়ানরা 'বালডাক্কো' বলতেন, এবং সেখান থেকে যেসব উৎকৃষ্ট রেশমী বস্ত্র আমদানি করা হতো সেগুলি এই নামে অভিহিত হয়। বহু গির্জায় বেদীর উপর যে রেশমী চাঁদোয়া টাঙানো হয় সেটিকেও 'বালডাচিনো' বলা হয়। পরবর্তীকালে ইউরোপীয় দোকানসমূহে গ্রানাডা থেকে আমদানিকৃত পোশাকের কাপড় 'গ্রেনাডাইন্স' নামে পরিচিত হয়। সেখানে পারস্য থেকে আমদানিকৃত 'তাফতাহ' 'টাফেটা' নামে পরিচিত হয়।
বাগদাদের 'আততাবীয়াহ' এলাকায় মহানবী (সা)-এর সাহাবী 'আততাব (রা)'-এর প্রপৌত্রগণ বসবাস করতেন। দ্বাদশ শতকে এই এলাকাটি একটি বিশেষ ধরনের বস্ত্র উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধি লাভ করে এবং তা সেখানে আত্তাবী রেশমী বস্ত্র হিসাবে পরিচিত হয়। স্পেনীয়রা এটির অনুকরণ করতেন। ফ্রান্স ও ইটালী এটিকে 'ট্যাবিস' নামে গ্রহণ করে এবং এই ব্যবসায়িক নামটিই ইউরোপের সর্বত্র জনপ্রিয় হয়। ১৬৬১ খৃস্টাব্দের ১৩ই অক্টোবর (লর্ডস ডে) মিঃ পেপিস বিশ্বের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনবহিত থেকেই তাঁর 'সোনালি লেস যুক্ত ভুয়া ট্যাবি ওয়েস্টকোট' পরিধান করেন। ১৭৮৬ খৃস্টাব্দে মিস বার্নি 'লাইল্যাক ট্যাবির' একটি গাউন পরে উইন্ডসর প্রাসাদে একটি রাজকীয় জন্মোৎসবে যোগদান করেন। লাইল্যাক পারস্যে এই নামে পরিচিত একটি রং। একই নামে পাশ্চাত্যে আমদানিকরা একটি ফুলের গাছ আছে। উপরোক্ত সুদর্শন ঝলসানো রেশমী কাপড় বর্তমানে অপ্রচলিত। কিন্তু আমাদের অতি পরিচিত বন্ধু ট্যাবি বিড়াল এখনো বাদামী ও হলদে রঙের একটি 'আত্তাবী' নকশা ধারণ করে।
বার্লিনে আব্বাসীয় খলীফা হারুনুর রশীদের জাদুকরী নামযুক্ত টুকরো কাপড় পাওয়া গেলেও বাগদাদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত রেশমী কাপড় বর্তমানে কদাচিৎ দেখা যায়। লিওনের কলেজিয়েটা ডি সান ইসিডরোতে রক্ষিত একখণ্ড রেশমী বস্ত্রের (চিত্র ৪৩) উৎকীর্ণলিপিতে বলা হয়েছে যে, সম্ভবত আবু নাসের নামে জনৈক শিল্পী এটি বাগদাদে তৈরি করেন, যেখানে শিল্পীর স্বাক্ষর থাকার কথা সেখানে নামের অক্ষরগুলো কিছুটা বিকৃত প্রতীয়মান হয়। লাল, হলুদ, কালো ও সাদাবর্ণে বোনা কাপড়টিতে নকশা দশম শতকের শেষভাগের প্রাথমিক মুসলিম শিল্প-রীতির বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। একটি প্রাচীনতর ঐতিহ্য অনুসরণে এর পাখি, পশু ও ফুলের নকশা বিরাট বৃত্তাকার প্যানেলের ভেতরে ও বাইরে অংকিত করা হয়েছে। একটি বিশেষ উপাদান হাতীর নকশা সম্ভবত ভারত থেকে এসেছে। কয়েক বছর আগে ক্যালের নিকটবর্তী একটি গ্রাম্য গির্জায় আবিষ্কৃত কিছুটা প্রাচীনতর একটি পারস্য রেশমী বস্ত্রখণ্ডটি বর্তমানে লুভারের অন্যতম সম্পদ। পারস্য বস্ত্রের কোন কোন বাইজেন্টাইন অনুকরণে, বিশেষ করে আচেনে শার্লেমানের সমাধিতে রক্ষিত সুদর্শন বস্ত্রখণ্ডেও এই ছবি দেখা যায়।
ইউরোপে প্রাচ্য বাণিজ্য প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে উৎকৃষ্টমানের রেশমী বস্ত্রের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মুসলিম দেশগুলি থেকে সূক্ষ্ম কারুকার্যসম্পন্ন বস্ত্র এতো অধিক পরিমাণে আসতে থাকে যে, পাশ্চাত্যের শিল্প উদ্যোক্তারা এই লাভজনক শিল্পে বিপুল অর্থাগমের সম্ভাবনা দেখতে পায়। তারা বিভিন্ন কেন্দ্রে তাঁত প্রতিষ্ঠা করে প্রাচ্য ও স্পেনীয় কারখানাগুলির সঙ্গে জোরেশোরে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। প্রধানত সিসিলি থেকেই পাওয়া ইটালীয় শিল্পীরা তাদের কারিগরিজ্ঞান এবং নকশার নমুনা লাভ করেন। এখানে পালেরমোর রাজকীয় প্রাসাদে মুসলিম অভিযানকারীরা একটি বিখ্যাত তাঁত কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। দ্বীপটি নর্ম্যানদের অধীনে পুনরায় খৃস্টান অধিকারে যাওয়ার পর এই কারখানা আরো সমৃদ্ধি লাভ করে। নর্ম্যান শাসনামলে সিসিলির শিল্পকেন্দ্রটি বাইজেন্টাইন ঐতিহ্যের সংস্পর্শে আরো বিকাশ লাভ করে। ১১৪৭ খৃস্টাব্দে ঈজিয়ান সাগরে হামলা চালিয়ে কতিপয় গ্রীক তাঁতীকে গ্রেফতার করার পর রাজপ্রাসাদের কারখানায় নিযুক্ত করা হয় এবং এরই মাধ্যমে গ্রীক ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ ঘটে। ত্রয়োদশ শতকের শুরুতেই কতিপয় সমৃদ্ধ ইটালিয়ান নগরীতে রেশমীবস্ত্র বয়ন প্রধান শিল্প উদ্যোগে পরিণত হয়। এখানকার উৎপাদিত বস্ত্রের সঙ্গে তারা যেসব সিসিলীয় বস্ত্রের অনুকরণ করেন সেগুলির পার্থক্য করা দুষ্কর হয়ে পড়ে। ফলে তারা ব্যাপকহারে বস্ত্র উৎপাদন করে বিদেশে রপ্তানি করতো।
চতুর্দশ শতকে ইটালীয় রেশমী বস্ত্রে মুসলিম বস্ত্র শিল্পের ন্যায় নতুন প্রভাব প্রতিফলিত হয়। ৪৬ নং চিত্রের ন্যায় সোনালি বুটিদার নীল ও সাদা রেশমী কাপড়ে কেবল সিংহ, তালজাতীয় ক্ষুদে গাছ, ফুলের নকশা, আরবী উৎকীর্ণলিপি এবং ইটালীয় শিল্পকর্মে ইতিমধ্যে প্রবর্তিত অন্যান্য প্রাচ্য উপাদান ছাড়াও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ চীনা পাখিও দেখা যায়। কতিপয় ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে দূরপ্রাচ্যে যে বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয় প্রধানত সেকারণেই ইউরোপে এগুলির আবির্ভাব ঘটে। ১২৫৮ খৃস্টাব্দে যে হালাগু খান আব্বাসীয়দের উচ্ছেদ সাধন করে তাঁর ভ্রাতা কুবলাই খানের নেতৃত্বে যাযাবর মঙ্গোলরা ১২৮০ খৃস্টাব্দে চীন আক্রমণ করে এবং সেখানে ইউয়ান রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে। এই রাজবংশ ১৩৬৭ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এসব বিজয়ের ফলে পারস্য থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত এশিয়ার এক বিস্তীর্ণ এলাকা প্রায় এক শতাব্দিকাল একই মঙ্গোল রাজবংশ শাসন করেন। এতে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয় যার ফলে পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়ার শিল্প ঐতিহ্যের উল্লেখযোগ্য বিনিময় ঘটে। চীনে তাং রাজ বংশের আমলে প্রতিষ্ঠিত উপনিবেশগুলি থেকে একটি মুসলিম জনবসতি গড়ে ওঠে এবং অন্য যেসব এলাকায় ইসলাম প্রসারিত হয়েছে সেসব এলাকার ন্যায় আরবীভাষা প্রচলিত হয়। মুসলিম জনবসতিতে বহু কারুশিল্পীও ছিলেন। এদের মধ্যে যারা রেশম তাঁতী ছিলেন তারা তাদের প্রাচীন আবাসভূমির রেশম শিল্পের ঐতিহ্যগত দক্ষতা নিয়ে বিভিন্ন কেন্দ্রে এমনসব রেশমীবস্ত্র উৎপাদন করেন যা মুসলিম বিশ্বে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়। তাদের সুদর্শন রেশমীবস্ত্র তাদের পাশ্চাত্যের ভাইদের এতোটা প্রভাবিত করে যে, এর ফলে মুসলিম বস্ত্র উৎপাদনে নতুন নতুন ডিজাইনের উদ্ভব হয় এবং তার মাধ্যমে পশ্চিম ইউরোপের বস্ত্রের ডিজাইনেও তা প্রতিফলিত হয়। মধ্যযুগীয় চীনা শিল্পসৌকর্যের কতিপয় অপরূপ নমুনা এখনো সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে সম্ভবত সবচাইতে উল্লেখযোগ্য নমুনাটি ড্যানসিগে (পোল্যাণ্ডের একটি বন্দর) রক্ষিত আছে। এটি মামলুক সুলতান আন নাসির মোহাম্মদ ইবনে কালাউনের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত হয়। ডিজাইনের মধ্যে তাঁর নামটি বোনা হয়েছে। ৪৭ নং চিত্রে রেশমী ও সোনালি বুটিদার একটি চীনাবস্ত্র দেখানো হয়েছে। নকশাটিতে রয়েছে ফিনিক্স পাখি ও আরবীতে উৎকীর্ণ পামেটিস। এগুলিকে আনুষ্ঠানিক কারুকার্যমণ্ডিত দুটি রেখার মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। নকশাটি উল্লেখিত পাখিসমন্বিত রীতির একটি প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।
কেবল মধ্যযুগে নয়, তার পরবর্তীকালেও প্রাচ্যের রেশমী কাপড় দিয়ে প্রায়ই গির্জার পোশাক তৈরি করা হতো। ৪৮ নং চিত্রের ফতুয়া জাতীয় পোশাকটি (চেচিউবল) ষোড়শ শতকের শেষভাগে কিংবা সপ্তদশ শতকের প্রথমভাগে তৈরি পারস্যের একটি রেশমী কাপড় থেকে কেটে তৈরি করা হয়েছে। এর নকশাটি যে উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে কোন অবস্থাতেই তার উপযোগী নয়, বিশেষ করে কোন মসজিদে এটিকে কখনো সহ্য করা হবে না। এর প্রধান উপাদান হচ্ছে হাতে পেয়ালা ও মদের বোতল নিয়ে দরবারী পোশাক পরিহিত দণ্ডায়মান তরুণদের সারি। পত্র-পুষ্প শোভিত সরু লতার ফাঁকে ফাঁকে এসব ছবি তুলে ধরা হয়েছে। এগুলির সঙ্গে তুর্কী মৃৎশিল্পীদের কারুকার্যের মিল রয়েছে। ভেতরের শূন্যস্থানগুলিতে এমন ধরনের সুদর্শন পাখির ছবি দেওয়া হয়েছে যা চীনাপাখির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ডিজাইনটি সাফাভী আমলের শৌখীন বুটিদার রেশমী পোশাকের উজ্জ্বল নকশার একই শ্রেণীভুক্ত। এই শ্রেণীর বিস্তারিত বৈশিষ্ট্যগতভাবে আরো বেশি ছবির সমাবেশ দেখা যায়। এর মধ্যে খসরু ও শিরিনের মিলনাত্মক রোমান্টিক কাহিনী কিংবা লাইলী ও মজনুর বিয়োগাত্মক কাহিনীর সচিত্র বর্ণনা উল্লেখযোগ্য। কোন কোন সময় পুষ্পশোভিত বৃক্ষ ও গুল্মরাজির মধ্যে নিরীহ বা হিংস্র প্রাণীর বিচরণের দৃশ্যও দেখা যায়। অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও উজ্জ্বলভাবে এগুলি অংকিত ও রঞ্জিত হয়।
ধর্মীয় পোশাক (ওরফ্রি) হিসাবে ব্যবহৃত লম্বা রেশমী ফালিটির উপর যে নকশা অংকিত হয়েছে তা তুর্কী ও ইটালীয় তাঁতিদের একটি বিশেষ শ্রেণীর ডিজাইন প্রতিফলিত করেছে। এ জাতীয় নকশা যখন প্রবর্তিত হয় তখন উভয় এলাকার শিল্পীরা এতোটা সক্রিয়ভাবে ও সফলতার সঙ্গে পরস্পরকে অনুকরণ করে, যাতে কোন্ কাপড়টি ইউরোপীয় বা প্রাচ্য তা নির্ণয় করা বিশেষজ্ঞদের পক্ষে অনেক সময় দুষ্কর হয়ে পড়ে। তারিখের দিক দিয়ে পরবর্তী এবং দেখতে ইউরোপীয় মনে হলেও এই বস্ত্রখণ্ডে এমন এক ধরনের একটি তুর্কী নকশা রয়েছে যার উদ্ভব হয় পঞ্চদশ শতকের কোন এক সময়ে এশিয়া মাইনরে। অত্যন্ত সাদাসিধে আকারের এই নকশাগুলি উপরে নিচে আঁকাবাঁকাভাবে অংকিত সাধারণ বা কারুকার্যমণ্ডিত রেখার দ্বারা গঠিত। রেখাগুলি মাঝে মাঝে পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয় এবং জমিনটি জালের ন্যায় কারুকার্যে ভরে দেওয়া হয়। কোন কোন নকশায় ওরফ্রির নকশাটির ন্যায় জালের ফাঁকগুলির মধ্যে কমবেশি আনুষ্ঠানিক কারুকার্য করা হয়। অন্যগুলিতে রেখাগুলির সংযোগ স্থল থেকে অনুরূপ উপাদানের উদ্ভব হয়। শেষোক্ত পরিকল্পনাটি ৫০ নং চিত্রের অত্যন্ত সুন্দর বুটিদার বস্ত্রের অনুসরণ করা হয়েছে। গাঢ় লাল বর্ণের পাদভূমি ও নিকেল নীলের পটভূমিতে নকশাটি সোনালি বর্ণে বোনা হয়েছে। প্রধান ব্যবস্থার ফলে ভেতরে ভেতরে যেসব স্থান শূন্য ছিল সেখানে একটি দ্বিতীয় নকশাজাল সৃষ্টি করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে গোলাপ, টিউলিপ কুড়ি, পিঙ্ক ও নার্গিস ফুল।
এই ডিজাইনের প্রধান উপাদান পুষ্পগুচ্ছ থেকে ইটালীয়রা ৪৯ নং চিত্রের পুষ্প-নকশাটি উদ্ভাবন করেছে। পঞ্চদশ শতকের শেষভাগের মখমলে প্রায় একই ধরনের একটি নকশা ৫১ নং চিত্রে দেখা যায়। ষোড়শ শতকে ইউরোপীয় ও তুর্কী তাঁতশিল্পীরা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে পালাক্রমে একে অপরকে হার মানায় এবং এর মাধ্যমে জাল ও গুচ্ছ রীতির বহু জটিলতাপূর্ণ বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে। তারা এই সময়ে সুদর্শন মখমলকে বিশেষ বিশেষ ধরনের নকশায় এমন অপরূপ করে তোলেন যে, এগুলি ঐতিহ্যগতভাবে তাদের অবদান হয়ে পড়ে। এসব মূল্যবান রেশমী বস্ত্র পুনরুজ্জীবিত করার একক প্রচেষ্টায় উইলিয়াম মরিস নীল, কমলা, সাদা ও সোনালি রঙে বোনা বুটিদার মখমলের উপর এই জাতীয় একটি নকশা (চিত্র ৫২) অংকন করেন।
বর্তমানকালে সার্বজনীনভাবে প্রয়োজনীয় কার্পেট প্রাচ্য থেকে ইউরোপে এমন একটি বিলাসদ্রব্য হিসাবে আসে যাকে ধনাঢ্য শিল্প রসিকগণ প্রথমে ব্যবহারের জিনিসের চাইতে সংরক্ষণযোগ্য সম্পদ হিসাবে মনে করতেন। ট্যাপিস্ট্রির ন্যায় মসৃণ এবং অসংলগ্ন সুতার গ্রন্থি সৃষ্টির মাধ্যমে মখমলের ন্যায় জড়ো করা, এই উভয় প্রকারের কার্পেটই প্রাচ্যের অতি প্রাচীন সম্পদ। এগুলিকে ঘুমানোর জন্য মাদুর, দেওয়ালের পর্দা এবং মেঝের আবরণ হিসাবে ব্যবহার করা হতো। ইটালীয় ছবিতে প্রাচ্যের কম্বলের অনুকরণ থেকে জানা যায় যে, ইউরোপে চতুর্দশ শতকে এগুলির আবির্ভাব ঘটে। ষোড়শ শতকে এগুলি ব্যবসায়-বাণিজ্যের নিয়মিত পণ্যে পরিণত হয়। প্রমাণ রয়েছে যে, কার্ডিন্যাল উলসী ১৫২১ খৃস্টাব্দে ভেনেসীয় রাষ্ট্রদূতের সৌজন্যে তাঁর হ্যাম্পটন কোর্টের প্রাসাদের জন্য প্রাচ্যের ষাটটি কম্বল সংগ্রহ করেন। চিত্রকর হলবিনের ছবিতে সম্ভবত এগুলির প্রতিফলন দেখা যায়। ঐ সময় এশিয়া-মাইনরে যেসব কার্পেট তৈরি হতো সেগুলির সঙ্গেও এর সাদৃশ্য দেখা যায়। নর্দাম্পটনশায়ারের বাউটন হাউসে স্যার এডওয়ার্ড মন্টেগুর জন্য বিশেষভাবে নির্মিত তিনটি জড়োকার তৈরি কার্পেট সংরক্ষিত আছে। এগুলিতে প্রান্তভাগে বোনা তাঁর প্রতীক চিহ্ন ও ১৫৮৪ খৃস্টাব্দের তারিখ দেওয়া রয়েছে। বর্তমানের ন্যায় তখনো এগুলি 'তুর্কী' গালিচা হিসাবে পরিচিত ছিল। এগুলি বিভিন্ন আকৃতিমূলক কারুকার্যে মণ্ডিত ছিল এবং লাল জমিনের উপর নীল ও হলুদ বর্ণে রঞ্জিত ছিল।
ষোড়শ শতকে পারস্যের কারুশিল্পীগণ কার্পেট বোনাকে সৌকর্যের এমন এক শিখরে নিয়ে যান যেখানে তাঁর পূর্বে কিংবা তারপর থেকে এ পর্যন্ত কেউ পৌঁছাতে পারেনি। তাঁদের অলৌকিক দক্ষতাপূর্ণ ডিজাইন সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে অতুলনীয়। এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান আর্দাবিল থেকে নিয়ে আসা হয়েছে এবং বর্তমানে ভিক্টোরিয়া ও আলবার্ট মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। আর্দাবিলে এটি সাফাভী শাহদের শ্রদ্ধেয় পূর্ব পুরুষ শেখ শাফীর মসজিদে কয়েক শতক পর্যন্ত ছিল। ৫৩ নং চিত্রে এই বিশাল কার্পেটের একটি অংশ দেখানো হয়েছে। অত্যন্ত সূক্ষ্ম কারুকার্যমণ্ডিত এই গালিচাটিতে তিন কোটিরও বেশি অতি ক্ষুদ্র গ্রন্থী রয়েছে। প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে গ্রন্থীর সংখ্যা ৩৮০। মধ্যভাগে কাটাকাটা প্রান্তভাগ সমন্বিত একটি বিরাট পদক রয়েছে। এর চারদিকে রয়েছে ডিম্বাকৃতির ছুঁচালো খোব, সেগুলি উজ্জ্বল বর্ণে পত্র-পুষ্পের অপরূপ কারুকার্যে সুশোভিত। আয়তাকার ক্ষেত্রটির প্রত্যেক কোণে কেন্দ্রীয় উপাদানের এক-চতুর্থাংশের পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। গাঢ় নীল বর্ণের জমিনে আঁকাবাঁকা লতায় উজ্জ্বল ফুলের সমাহার এবং তারি মধ্যে দুটি প্রদীপ দ্বিতীয় পর্যায়ের কেন্দ্রগুলি থেকে যেনো শূন্যে ঝুলে আছে। দৃঢ়বদ্ধ প্রান্তভাগ কর্ণলতিকার ন্যায় বৃত্ত ও সম্প্রসারমান খোবে সুশোভিত ও কারুকার্যমণ্ডিত। এক প্রান্তের একটি কার্টুশে (পাকানো কাগজ) কবি হাফিজের একটি কবিতা উদ্ধৃত করা হয়েছে এবং তার নিচে রয়েছে: 'দ্বার দেশের বান্দা কাশানের মকসূদের শিল্পকর্ম, ৯৪৬ হিজরী' (১৫৪০ খৃ.)। বহু প্রাচীনতর কার্পেট সংরক্ষিত থাকলেও দীর্ঘকাল পর্যন্ত এই কার্পেটটিকেই সবচাইতে প্রাচীনতম বলে মনে করা হতো। এই প্রসঙ্গে মিলানের মিউজিও পল্টিপ্লেযযোলিতে রক্ষিত অপর একটি অপরূপ পারস্য গালিচার কথা উল্লেখযোগ্য। এটি ১৫২১ খৃস্টাব্দে গিয়াসুদ্দীন জামী কর্তৃক বোনা হয়েছিল।
ইউরোপীয় কারুশিল্পীরা মুসলমানদের কাছ থেকে জড়ানো কার্পেট বোনার কাজ শিখেন। প্রথমে তারা প্রাচ্যের ঐতিহ্যগত হাতের কৌশল প্রয়োগ করতেন। কিন্তু পরবর্তীকালে যান্ত্রিক পন্থার আশ্রয় গ্রহণ করেন। যান্ত্রিক পন্থায় তৈরি গালিচা ও কম্বল বর্তমানে প্রায় সার্বজনীনভাবে ব্যবহৃত হয়। মুসলমানদের কাছ থেকে নেওয়া নকশা সাধারণ হলেও, সেগুলি ঐতিহ্যগত না হয়ে কিছুটা খেয়ালী ধরনের। নকশার মধ্যে নয়, বরং মখমলের ন্যায় বুনটের মধ্যেই আধুনিক গালিচার প্রাচীন ঐতিহ্য অব্যাহত রয়েছে।
আমরা সমতলের নকশা থেকে রিলিফের (সমতলের উঁচুতে) নকশাতে গেলে দেখতে পাবো যে, মুসলিম খোদাই-শিল্পীরা এখানেও তাদের অন্যান্য নকশা অংকন রীতি অনেকখানি একইভাবে অনুসরণ করেছে। ইউরোপীয় রিলিফের নকশা অংকনে আমরা যে রীতি বৈচিত্র্য দেখতে পাই, যেখানে মুসলিম দেশগুলিতে অপরিজ্ঞাত ভাস্কর্য ও ছবি অংকনের প্রভাব ঐতিহ্যগত হয়ে পড়েছে, মুসলিম খোদাই শিল্প ও মডেলিংয়ে তা অনুপস্থিত। সেখানে সাধারণত বয়নকার্যে, খচিত করণে কিংবা রংয়ের কারুকার্যে ব্যবহৃত নকশাগুলিরই পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। ইউরোপীয়দের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত পন্থায় এ ধরনের নকশাগুলি কারুকার্যের উপযোগী করে নেওয়া হয়, যে নকশা উজ্জ্বল বর্ণের একটি পাণ্ডুলিপির শিরোনামের পৃষ্ঠা কিংবা একটি রেশমী বস্ত্র অলংকরণে ব্যবহৃত হয়েছে, সেই একই নকশা কোন গম্বুজের বহির্ভাগে কিংবা মসজিদের প্রাচীরে পাথর খোদাইতেও সমভাবে উপযোগী বলে মনে করা হয়। ৫৫ নং চিত্রে সাদা মার্বেলের তৈরি ফাউন্টেন-বেসিনটির নির্মাণকাল ১২৭৭-৭৮ এবং তাতে ঐতিহাসিক আবুল ফিদার পিতৃব্য হামার সুলতান দ্বিতীয় মোহাম্মদের নাম অংকিত রয়েছে।
এতে খোদাইশিল্পী তাঁর বিশেষ প্রয়োজনে কিভাবে বিভিন্ন কারুশিল্পের একটি সাধারণ ডিজাইনকে কাজে লাগিয়েছেন তা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। পরিকল্পনাটি মূলত একটি পুনরাবৃত্তিমূলক নকশা যার উপাদানগুলি একপাশে অনির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত প্রান্তভাগ হিসাবে প্রসারিত করা যায় কিংবা একপাশে ও উপরে নিচে 'সার্বিক' নকশা হিসাবে ব্যবহার করা যায়। ১২১৬ খৃস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী জনৈক শেখের সমাধি থেকে সংগৃহীত ৫৬ নং চিত্রের কাঠের আবরণটিতে নিচের দিকের কারুকার্যমণ্ডিত লম্বা অংশে (ফ্রিজ) এবং পৃথক পৃথক খোবগুলিতে একই পুনরাবৃত্তিমূলক নকশা খোদাই করা হয়েছে। এই অপরূপ শিল্প কর্মটির একটি দিক সাউথ কেংসিংটনে এবং অবশিষ্ট অংশ কায়রোতে রক্ষিত আছে। ফাতিমীয় আমলের খোদাই শিল্পে ৫৪ নং চিত্রের ন্যায় সমতলভাগকে প্রায়ই এতোটা গভীর করে খোদাই করা হয় যে, এতে ছিদ্র করণের একটি ধারণার সৃষ্টি হয়। এই খোবটি কায়রোর আরব আর্ট মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। সিসিলিতে নির্মিত হলেও ৫৭ নং চিত্রের খোদাই করা কাঠের সিলিংটির (ভেতরের দিকের ছাদ) শিল্পকর্ম রীতির দিক দিয়ে ফাতিমীয়। গভীরভাবে খোদাই করা খোবের বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন ছাড়াও এই পত্রালংকারে বহু রকমের পশু-পাখির ছবিও রয়েছে। রাজ-দরবার কিংবা লৌকিক ব্যবহারের জন্য নির্মিত ফাতিমীয় শিল্পকর্মে এ ধরনের বৈশিষ্ট্য প্রায়ই দেখা যায়। এগুলিতে মানুষের ছবিও অবাধে ব্যবহৃত হতো।
মুসলিম ছুতাররা যে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নির্মাণ পদ্ধতি প্রবর্তন করেন উপরোক্ত সিলিংয়ে তাই অনুসরণ করা হয়েছে। ব্যবহারিক এবং আলংকারিক প্রয়োজনীয়তা থেকে এই রীতির উদ্ভব হয়েছে। আবহাওয়াগত কারণে কাঠ সংকুচিত হয়ে যেতে পারে কিংবা দুমড়ে যেতে পারে। অনেক সময় যথোপযুক্ত কাঠের অভাবও ছিল। তাই খোবগুলি আয়তনে যতটা সম্ভব ছোট করা হতো এবং তাঁর রক্ষণকারী ফ্রেমগুলি অপেক্ষাকৃত বড় করা হতো। নকশার স্থায়িত্ব ও বিভিন্ন রকমের উদ্দেশ্য সংরক্ষণের জন্য ধীরে ধীরে অদ্ভুত ও বিচিত্র রকমের ছোট ছোট খোবের উদ্ভব হয়। এই পরিকল্পনাটি প্রকৃতপক্ষে কাঠামোগত পন্থায় প্রকাশ পেতো এবং মুসলিম ছুতার শিল্পীরা এ ধরনের ডিজাইন অংকনে বিশেষ আনন্দ পেতো। দীপ্তিমান তারকার ন্যায় বিচিত্র আকারের বহু-ভুজ সম্বলিত এই নকশা এমন এক ধরনের কারুকার্য সৃষ্টি করে যা অলংকার শিল্পে মুসলমানদের সম্ভবত সবচাইতে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অবদান। এই রীতি রূপায়ণে কাঠের যে কারুকার্য বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করে সেখানে এর সর্বাধিক পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রকাশিত হয়। কিন্তু বহু কারুশিল্পী বিভিন্ন শিল্প মাধ্যমেও এসব নকশা ব্যবহার করেছেন। মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র এসব নকশা অংকনে অত্যন্ত উদ্ভাবনমূলক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। পরবর্তীকালে এগুলি বিরক্তিকর জটিলতা এবং অতি-সচেতন জ্যামিতিক রূপ লাভ করলেও এর সহজ আকারগুলি সবসময় মুসলিম প্রতিভার অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্য রঙের অপরূপ পরিকল্পনা রূপায়ণে এককভাবে কার্যকর বাহন ছিল।
৬০ নং চিত্রে এ ধরনের একটি নকশায় ষড়ভুজের মধ্যে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বারোটি ছুঁচালো তারকা স্থাপন করা হয়েছে। এই নকশাটি ৬১ নং চিত্রের খসড়া কাঠামোর উপর ভিত্তি করে অংকন করা হয়েছে। খসড়া কাঠামোটি উনবিংশ শতকের সূচনায় পারস্যের শাহর স্থপতি মির্যা আকবরের একটি নোট থেকে নেওয়া হয়েছে। তাঁর এ ধরনের বহু নকশা ভিক্টোরিয়া এণ্ড আলবার্ট মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। সূক্ষ্ম রেখা দ্বারা গঠিত মূল জ্যামিতিক চিত্রটি একটি ছুঁচালো জিনিস দিয়ে কাগজের উপর অংকন করা হয়েছে এবং তারি ভিত্তিতে কালি দিয়ে নকশাটি অংকন করা হয়েছে। পদ্ধতিটি উপদেশমূলক এবং সম্ভবত একটি প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারা বহন করছে। এতে প্রাচ্যের অংকন শিল্পীরা কিভাবে পরিকল্পনা তৈরি করে তাঁর ভিত্তিতে বহু রকমের নকশা অংকন করতেন তাঁর প্রমাণ পাওয়া যায়। এসব নকশা সম্বলিত পুস্তিকা থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
৫৮ ও ৫৯ নং চিত্রে চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকের দরজার দুটি পাল্লায় মিসরীয় শিল্পকর্মের নিদর্শন দেখানো হয়েছে। খোবগুলি এতো ছোট যে সেখানে কাঠের পরিবর্তে আইভরি ব্যবহার করে এক বিস্ময়কর শিল্প-সৌকর্য প্রদর্শন সম্ভব হয়েছে। একটি পাল্লায় খোবগুলিতে তীক্ষ্ণ রিলিফ পুষ্পালংকার খোদাই করা হয়েছে এবং অন্যটিতে জ্যামিতিক নকশায় সেগুলিকে খচিত করা হয়েছে। উভয়টিই সম্ভবত একই ডিজাইনের মিম্বরের ধ্বংসাবশেষ। অনুরূপ ডিজাইনের একটি নমুনা ভিক্টোরিয়া এণ্ড আলবার্ট মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। এটি কায়রোর একটি মসজিদে মামলুক সুলতান কায়েত বে (১৪৬৮-১৫ খৃ.) নির্মাণ করেন। উনবিংশ শতকে একটি নতুন রাস্তা নির্মাণের জন্য এটি ধ্বংস করা হয়।
আংশিকভাবে বা সামগ্রিকভাবে আইভরি দিয়ে মুসলমানরা বহু সুন্দর সুন্দর জিনিস তৈরি করেন। তারা খোদাই করে, খচিত করে কিংবা রঞ্জিত করে এটিকে অলংকৃত করতেন। দশম শতকে কর্ডোভায় আইভরি খোদাই শিল্পীদের একটি কেন্দ্র ছিল। তারা এমন এক রীতি অনুসরণ করতেন যাতে তখনি একটি পরিণত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটে। তাদের শিল্প-সৌকর্যের বহুবিধ দৃষ্টান্তের মধ্যে ৬২ নং চিত্রের নলাকার কৌটাটি বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য। এটি যামোরার গির্জা থেকে আহরিত হয়েছে এবং বর্তমানে মাদ্রিদের মিউজিও আর্কিলজিকোতে রক্ষিত আছে। গম্বুজ আকৃতির ঢাকনির চারপাশে এক উৎকীর্ণলিপিতে বলা হয়েছে যে, এটি ৯৬৪ খৃস্টাব্দে খলীফা দ্বিতীয় আল হাকামের জন্যে তাঁর পত্নী যুবরাজ আবদুর রহমানের মাতাকে উপহার হিসাবে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছে। প্রায় একই সময়ে কর্ডোভায় তৈরি অনুরূপ কতিপয় জিনিসের এই সুন্দরতম নিদর্শনটি সম্পূর্ণরূপে পত্রালংকার, ময়ূর ও অন্যান্য পশু-পাখির চিত্রে আবৃত। অন্যান্য নিদর্শন বর্তমানে লণ্ডন, প্যারিস ও অন্যত্র দেখা যায়। গঠনে এবং শিল্প-সৌকর্যে একই রকম হলেও এগুলির কারুকার্য বিভিন্ন রকমের। ৬৩ নং চিত্রে আয়তাকার কৌটার ন্যায় কোন কোনটিতে ছবিওয়ালা বিষয়বস্তুকে বেষ্টন করে পারস্পরিক বোনা ঝুলন্ত বৃত্ত খোদাই করা হয়েছে। কয়েকজন কারুশিল্পী একযোগে এটি তৈরি করেছেন, যাদের মধ্যে খায়ের ও উবায়দা নাম দুটি পড়া যায়। নাম দুটি তাদের খোদাই করা খোবে অংকিত রয়েছে। রাজদরবারের জনৈক ওমরাহর জন্য ১০০৫ খৃস্টাব্দে এটি নির্মিত হয়। ঢাকনির মধ্যে তাঁর নাম ও উপাধি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উৎকীর্ণ করা হয়েছে।
৬৪ নং চিত্রে আর এক ধরনের আইভরি শিল্পকর্ম দ্রষ্টব্য। একটি বৃত্তাকার বাক্সের গায়ে ও সমতল ঢাকনিতে ছিদ্র করে জ্যামিতিক নকশা অংকন করা হয়েছে। এটি চতুর্দশ শতকে কায়রোতে নির্মিত এই শ্রেণীর শিল্পকর্মের প্রতিনিধি স্থানীয়। ত্রয়োদশ শতক থেকে প্রবর্তিত এবং কিছুটা অস্পষ্টভাবে 'সিকুলো-অ্যারাবিক' হিসাবে বর্ণিত কতিপয় নলাকার ও আয়তাকার আইভরি বাক্সের কথাও এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। এগুলি সোনালি ও অন্যান্য বর্ণে রঞ্জিত এবং বৃত্তের মধ্যে গ্রন্থি নকশা কিংবা পশু, পাখি, ফুল ও গাছের ছবি অংকিত এমন একটি রীতি যা উজ্জ্বল বর্ণের পাণ্ডুলিপির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ৬৬ নং চিত্রে এর একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে যেখানে পিছনে উপবিষ্ট একটি চিতাসহ জনৈক অশ্বারূঢ় শিকারীর ছবি অংকিত করা হয়েছে।
রঞ্জিত, খোদাই করা কিংবা ছিদ্র করা আইভরি কৌটা মণিমুক্তা, অলংকার, সুগন্ধি, মিষ্টি এবং এ ধরনের অন্যান্য জিনিস রাখার জন্যে ব্যবহার করা হতো। উৎকীর্ণলিপিতে দেখা যায় যে, এগুলি প্রায়ই উপহার হিসাবে বিশেষভাবে তৈরি করা হতো। প্রাচীনতম কৌটাগুলি সূচনায় ইসলামী শিল্পকর্মের অত্যন্ত মূল্যবান নিদর্শন। এর অনেকগুলি আমরা বিস্ময়করভাবে সুসম্পন্ন আকারে পেয়েছি। এগুলির কোন কোনটিতে এখনো রঙের যে সৌন্দর্য দেখা যায় তা বিবেচনা করলে মনে হয় যে, খোদাই করা কৌটাগুলি মূল অবস্থায় রং ও স্বর্ণের আমেজে সমুজ্জ্বল ছিল। কোন কোনটিতে এখনো তাদের ধাতব হুক ও কব্জা দেখা যায়। এগুলি একটি বিশেষ ধরনের ধাতব শিল্পের চমৎকার দৃষ্টান্ত।
খোদাই শিল্পে নিপুণতার একটি চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ৬৫ নং চিত্রে প্রদর্শিত স্বচ্ছ পাথরের একটি অপরূপ জলপাত্র। এটি ভেনিসের সেন্ট মার্কস-এর ট্রেজারীতে রক্ষিত আছে। শিল্পকর্মটি ঐতিহাসিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে মিসরের দ্বিতীয় ফাতেমীয় খলীফা আল-আজিজের নাম অংকিত রয়েছে। আল-মাকরিযী ১০৬৭ খৃস্টাব্দে বিলুপ্ত যেসব সম্পদের তালিকা তৈরি করেছেন এটি তাঁর অন্যতম স্বচ্ছ পাথরের জলপাত্রও হতে পারে, কারণ সেগুলিতে এই খলীফার নামও খোদাই করা হয়েছে। শিল্পসৌকর্য ও অলংকরণের দিক দিয়ে এটি ইসলামী শিল্পকলার এক গৌরবোজ্জ্বল যুগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
যেসব প্রাত্যহিক ব্যবহার্য জিনিসে মৌল-উপাদান, কলাকৌশল বা ডিজাইনের ক্ষেত্রে আমরা কোন না কোনভাবে ইসলামের কাছে ঋণী তাঁর মধ্যে আমাদের মুদ্রিত বই-পুস্তক সবচাইতে ব্যাপক। প্রথম দৃষ্টিতে প্রাচ্যের সঙ্গে এগুলির সম্পর্ক অত্যন্ত ক্ষীণ মনে হলেও বই উৎপাদনের আধুনিক পদ্ধতি মধ্যযুগীয় মুসলিম উদ্যোগ ও নৈপুণ্য থেকে অনেক কিছু লাভ করেছে। কেবলমাত্র সাম্প্রতিককালেই ইসলামী সাহিত্য টাইপের মাধ্যমে বা লিথোগ্রাফি পদ্ধতিতে পুনর্মুদ্রিত হচ্ছে। শেষোক্ত পদ্ধতিটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়, কারণ এতে লিপিকরের প্রকৃত সৌকর্য-দক্ষতা বিশ্বস্ততার সঙ্গে রক্ষিত হয়। লিপিকরের এই সৌকর্য-দক্ষতা সর্বপ্রকার কারুশিল্পীর কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার জিনিস। মুদ্রণশিল্প মুসলিম দেশগুলিতে সম্প্রসারিত হওয়ার বহু আগে ইউরোপে পূর্ণতা লাভ করলেও এর বিকাশের একটি বড় রকমের উপাদানের জন্য আমরা প্রাচ্যের কাছে ঋণী। মুসলমানরা যখন ৭০৪ খৃস্টাব্দে সমরকন্দ জয় করেন তখনই চীনের একটি প্রাচীন আবিষ্কার কাগজের সঙ্গে পরিচিত হন এবং চীনা শিল্পীদের কাছ থেকে কাগজ তৈরির কৌশল আয়ত্ত করেন। ইসলামী বিশ্বের মধ্যদিয়ে এটি পাশ্চাত্যে আসে। কাগজে লেখা বহু সংখ্যক আরবী পাণ্ডুলিপির তারিখ নবম শতক, কিন্তু দ্বাদশ শতকের আগে খৃস্টান ইউরোপে এর আমদানি হয়নি এবং ত্রয়োদশ শতকে এটি সাধারণভাবে প্রচলিত হয়নি। প্রথম ইউরোপীয় কাগজ কল প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলমানদের দ্বারা স্পেন ও সিসিলিতে এবং এখান থেকেই কাগজ প্রেরিত হয় ইটালীতে।
যান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে পঞ্চদশ শতকে যখন ব্যবসায় ভিত্তিতে বই উৎপাদন শুরু হয় তখনই কাগজ এর একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদানে পরিণত হয়। কাগজ ছাড়া মুদ্রণ শিল্পের এতোটা অগ্রগতি আদৌ হতো না। কিন্তু আধুনিক প্রকাশকরা একমাত্র কাগজের জন্যই মুসলমানদের কাছে ঋণী নয়। পঞ্চদশ শতকে ভেনিস যখন অতোটা সক্রিয়ভাবে মুসলিম শিল্পরীতি আয়ত্ত ও প্রচার করছিল তখন ইটালীতে বাঁধাই করা বই-পুস্তক বিশেষভাবে প্রাচ্যের বৈশিষ্ট্য লাভ করে। এসময় কিছু কিছু বই এমন একটি বৈশিষ্ট্য লাভ করে যা মুসলিম বই বাঁধাইর ক্ষেত্রে সাধারণ এবং এটি হচ্ছে সামনের প্রান্ত ভাগগুলি সুরক্ষিত করার জন্যে মোড়কের ন্যায় মলাট (ফ্ল্যাপ)। এই বৈশিষ্ট্য আমাদের ব্যাঙ্কারদের 'পাস-বুকের' ন্যায় হিসাব রক্ষণের জন্য তৈরি কতিপয় বাঁধাইর ক্ষেত্রে এখনো অব্যাহত রয়েছে। এটি এখনো প্রাচ্য ঐতিহ্যের একটি স্মারক।
মুসলমানদের দ্বারা অনুপ্রাণিত আর একটি অভিনব দিক হচ্ছে, চামড়ার মলাটে কারুকার্য করার একটি নতুন পদ্ধতি। মধ্যযুগে ইউরোপীয় বাইণ্ডাররা প্রায়ই ধাতব ছাঁচ দ্বারা ছাপ মেরে নকশা সৃষ্টির মাধ্যমে চামড়ার মলাটের সৌকর্য সাধন করতেন। এসব সীলমোহর নতুন নতুন ও বিস্তারিত নকশা খোদাইর মাধ্যমে বৃহত্তর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপরোক্ত পদ্ধতির বিকাশলাভ ঘটে। কিন্তু 'কানা হাতিয়ার' নামে পরিচিত এই সীলমোহরের নকশা কেবলমাত্র রিলিফেই প্রতিফলিত করা যেতো। অবশেষে প্রাচ্য শিল্পীদের সীলমোহরের খোদাই করা স্থানসমূহে সোনার রং ভরাট করে ছাপ মারা উন্নত নকশার সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। ভেনিসে বসবাসকারী মুসলিম বাইণ্ডাররা ইউরোপে এই রীতি প্রবর্তন করেন। পঞ্চদশ শতকের শেষের দিকে একটি নতুন রীতিতে এই পদ্ধতির উন্নয়ন সাধন করা হয়। এতে উত্তপ্ত হাতিয়ারটিকে বারবার সোনার পাতে চাপ দিয়ে ছাপ মেরে স্থায়ীভাবে সোনার রং যুক্ত করা হয়। সম্ভবত কর্ডোভায় এই নতুন রীতিটির উদ্ভব হয়। ষোড়শ শতকে খৃস্টান ও মুসলমান উভয় বাইণ্ডাররাই সার্বজনীনভাবে এই রীতি অনুসরণ করেন। অবশ্য সোনা ব্যবহারের প্রাচীনতর প্রাচ্যরীতি কখনো সামগ্রিকভাবে পরিত্যক্ত হয়নি।
৬৭ নং চিত্রে চতুর্দশ শতকের শেষ দিকে কিংবা পঞ্চদশ শতকের প্রথমভাগের একই বাঁধাইর ভেতরের দিকে অপরূপ কারুকার্য প্রাচ্যের সোনা ব্যবহারের একটি দৃষ্টান্ত। পরিষ্কার ও সূক্ষ্ম একটি অলৌকিক নকশা। কয়েকটি সাধারণ হাতিয়ারের সাহায্যে অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে অসংখ্য ছাপ মেরে এটি অংকিত করা হয়েছে। ৬৮ নং চিত্রে প্রাচ্যের বাইণ্ডারগণ কর্তৃক অনুসৃত অন্যান্য অলংকরণ রীতি প্রদর্শিত হয়েছে। এসব রীতি সপ্তদশ শতকের অনেক আগে প্রবর্তিত হয়। গাঢ় লাল বর্ণের চামড়ার মলাটে একটি কেন্দ্রীয় নকশা ছাপ মেরে সোনা দিয়ে সুশোভিত করা হয়েছে। এর উপরে ও নিচে এবং প্রত্যেক কোণে সমতল থেকে নিচু করা বিভিন্ন আকারের খোব রয়েছে। সাদা পাতলা চামড়া কেটে কালো পাদভূমির উপর আঠা দিয়ে জড়িয়ে সেগুলির মধ্যে ফিতার ন্যায় কারুকার্য মণ্ডিত নকশা অংকন করা হয়েছে। সমতল ক্ষেত্রে গাছপালা এবং দূরপ্রাচ্যের একটি ড্রাগনসহ বিভিন্ন রকমের পশুপাখি সমন্বিত একটি আনুষ্ঠানিক প্রাকৃতিক দৃশ্য স্বর্ণ দিয়ে রঞ্জিত করা হয়েছে। ৬৯ নং চিত্রে ষোড়শ শতকের ভেনিসীয় মলাটে একই ধরনের নিচু করা খোব ও রঞ্জিত কারুকার্য রয়েছে। এটি স্পষ্টত একটি পারস্য মডেলের অনুকরণ।
মিসরীয় বাঁধাইয়ে (চিত্র ৬৭) কেন্দ্রস্থলে একটি ছুঁচালো ডিম্বাকৃতির খোব থেকে এবং প্রত্যেক কোণে তাঁর এক-চতুর্থাংশের পুনরাবৃত্তি করা হয়। পারস্য মলাটে একই পরিকল্পনার কিছুটা পরিবর্তন সাধন করে কারুকার্য করা হয় যা আমরা ইতিমধ্যেই বহু কারুশিল্পে লক্ষ্য করেছি। ৭০ নং চিত্রে প্রদর্শিত ১৫৪৬ খৃস্টাব্দের একটি ভেনিসীয় মলাটে মূলত মুসলমানদের কেন্দ্রীয় ও কৌণিক কৌশল এবং প্রাচ্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত রৈখিক কারুকার্য সমন্বিত অনুরূপ একটি নকশা সোনালি দীপ্তিতে রঞ্জিত করা হয়েছে। ৭১ নং চিত্রে পরবর্তীকালের একটি জার্মান নকশায় একই ব্যবস্থা দেখা যায়, যদিও সমসাময়িক ইউরোপীয় রীতিতে বিস্তারিত কারুকার্য কিছুটা সংশোধন করা হয়েছে।
এই চারটি বাঁধাই শিল্পে মোটামুটিভাবে এমন কয়েকটি শৈল্পিক পদ্ধতির বিকাশকে অনুসরণ করা হয়েছে যার উদ্ভব মূলত মুসলিম দেশগুলিতে। এসব দেশের নকশা পরিকল্পনা ও কারুকার্যের উপাদান নিয়ে এগুলি ইউরোপীয় শিল্পকেন্দ্রে আবির্ভূত হয় এবং কিছুটা রদবদলসহ দৃঢ়ভাবে আধুনিক চর্চার অন্তর্ভুক্ত হয়। যেসব পন্থায় সূক্ষ্ম চামড়ার বাঁধাইয়ে বর্তমানে সার্বজনীনভাবে হাতিয়ারের সাহায্যে সোনালি লেখা অংকিত করা হয় মুসলিম শিল্পীরাই তাঁর পূর্ণতা সাধন করেন। প্রাচীন হাতের তৈরি বইয়ের মলাটের সঙ্গে যখন উনবিংশ শতকের যান্ত্রিকভাবে উৎপাদিত বইর মলাট যুক্ত হয় তখনো যান্ত্রিকভাবে বাঁধাইকরা বইগুলি মূল মুসলিম রীতিরই অনুসরণ করে।
প্রান্তভাগের মলাটে (এন্ডপেপার), কাগজের মলাটে এবং অষ্টাদশ শতকের ইউরোপীয় কারখানায় বইর প্রান্তভাগ বাঁধাইতে 'মার্বেল রঙের' যেসব উজ্জ্বল নকশা অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে সেগুলিও সরাসরি প্রাচ্য সূত্র থেকে নেওয়া হয়েছে। ষোড়শ শতকে মুসলমানদের অংকিত চিত্রের ও সুদর্শন হস্তলিপির প্রান্তভাগের চারদিকে আটকানো কাগজের টুকরার উপর এসব সূক্ষ্ম নকশার দৃষ্টান্ত দেখা যায়। শিল্পরসিকদের বিশেষ রুচিসম্মত সম্পদ সুশোভিত করার প্রয়োজনীয়তা থেকেই এর উদ্ভব হয়। ইংল্যাণ্ডে বেকনের সময় মার্বেল পেপারের কথা জানা ছিল। এ সম্পর্কে তাঁর উক্তি হচ্ছে, 'তুর্কীদের কাগজকে চ্যামলেটিং (মার্বেল রং করার) একটি সুন্দর শিল্প রয়েছে, যা আমাদের এখানে প্রচলিত নেই। তারা ডুবুরিদের তৈল রং বিভিন্নভাবে পানির সঙ্গে মিশায়, সেটাকে হালকাভাবে ঝাঁকিয়ে নেয় এবং তার দ্বারা তাদের কাগজ ভিজিয়ে নেয়। ফলে কাগজ চ্যামলেট বা মার্বেলের ন্যায় রেখায়িত হয়ে ওঠে।'
ষোড়শ শতকের শেষদিকে পাশ্চাত্যে যেসব বই বাঁধাই হতো সেগুলিতে প্রাচ্যকে আমদানি করা মার্বেল পেপার দেখা যায়। কিন্তু এরও প্রায় একশ বছর পরে ইউরোপীয় বাইণ্ডাররা এই কাগজ উৎপাদন শুরু করেন। হাতের তৈরি মার্বেল কাগজ বর্তমানে কদাচিৎ ব্যবহৃত হয়। অনুকরণমূলকভাবে উৎপাদিত কাগজই বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়।
ইউরোপ এক হাজার বছরেরও বেশি কাল পর্যন্ত মুসলিম শিল্পকর্মকে একটি বিস্ময়ের বস্তু হিসাবে দেখে। প্রথমে এ কারণে তারা বিস্ময় বোধ করে যে, এটি এমন সব দেশের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল যেগুলিকে উত্তরাধিকার সূত্রে খৃস্টান বলে মনে করা হতো। পরবর্তীকালে এর নিজস্ব সৌন্দর্যের জন্যই তারা বিস্ময় বোধ করে। মধ্যযুগীয় ভক্তি-শ্রদ্ধার কারণেই বহু সুন্দর সুন্দর শিল্পকর্ম সংরক্ষিত হয়। কারণ যেসব শিল্প নিদর্শন যুগের পর যুগ ধরে গির্জাগুলিতে সুরক্ষিত থাকে তাদের সংখ্যা কম নয়। এখানে খলীফার জুয়েল-কেস হিসাবে ব্যবহৃত কৌটা পবিত্র স্মৃতিচিহ্নের ভাণ্ডারে পরিণত হয়। এর মধ্যে পবিত্র ভূমি থেকে হয়ত মুসলমানদের কোন রাজকীয় পোশাক থেকে কেটে নেওয়া এক টুকরো অপরূপ রেশমী বস্ত্র ছিল। এসব জিনিসের প্রতি অতিরিক্ত ভক্তি-শ্রদ্ধার যথেষ্ট কারণও ছিল। এগুলির উপর যেসব অদ্ভুত ছবি ও রহস্যজনক লেখা থাকতো সেগুলিকে কোন কোন সময় ট্যালিসম্যান (জাদুকরি কবচ) এবং হযরত সোলায়মানের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জিনিস মনে করা হতো। মধ্যযুগে স্থাপত্য আর কিছু না হোক রোমান্টিক ছিল। শার্লেমনকে প্রদত্ত হারুনুর রশীদের উপহার কিংবা সেন্টলুই কর্তৃক প্রাচ্য থেকে সংগৃহীত শিল্প নিদর্শনের ন্যায় যেসব উল্লেখযোগ্য শিল্প সম্পদকে দীর্ঘকাল পর্যন্ত পবিত্র মনে করা হতো, গবেষণার মাধ্যমে, কেবলমাত্র বিগত শতকেই এই শ্রদ্ধামূলক মনোভাবে সন্দেহ আরোপ করা হয়। কিন্তু এই সন্দেহ সত্য হোক কিংবা মিথ্যা হোক এগুলির অপরূপ সৌন্দর্য নিঃসন্দেহে বাস্তব। যেসব শ্রেষ্ঠ অবদানকে প্রত্যেক কারুশিল্পী শ্রদ্ধা করে সেগুলি সবসময় উপেক্ষিত পাশ্চাত্যে শিল্পচর্চায় নিষ্ঠাবান শিল্পকর্মীদের জন্য একটি প্রেরণা ছিল।
খৃস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক ভাব বিনিময় ক্রুসেডের বহু পূর্ব থেকেই শুরু হয়। স্পেনে পশ্চিম ইউরোপের একেবারে দ্বারপ্রান্তে ইসলাম দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রথম থেকেই খৃস্টান সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব সৃষ্টি করে। সিসিলিতে দুটি ধর্ম সাধারণ ভূমিতে অবস্থান করে। উত্তর আফ্রিকা সামগ্রিকভাবে মুসলমানদের অধিকারভুক্ত হয় এবং এখান থেকে মুসলিম জাহাজগুলি ভূমধ্যসাগরের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত বিচরণ করে।
ক্রুসেডের সঙ্গে একটি নতুন যুগের সূচনা হয়। বিস্মিত খৃস্টান জগতের কাছে স্যারাসেন নামে পরিচিত অর্ধ-রূপকথার শিল্পসৌকর্য বাস্তবতা লাভ করে। ইউরোপের প্রত্যেকটি অঞ্চল থেকে আকস্মিকভাবে দলে দলে লোক এমন এক সামাজিক ব্যবস্থার গভীর সংস্পর্শে আসে যা প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের সংকীর্ণ অভিজ্ঞতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। বিদেশী প্রগতির সংস্পর্শে শীঘ্রই তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট প্রতিক্রিয়া সূচিত হয়। শিল্পক্ষেত্রে এই প্রভাব কোন অংশে কম সুদূর প্রসারী ছিল না। সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ইটালীয় বণিকরা সিরীয় বন্দরগুলির সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করে, প্রাচ্য বাণিজ্য নিয়মিতভাবে সংগঠিত করা হয় এবং মুসলিম শিল্প কেন্দ্রগুলি থেকে সর্বপ্রকার দুষ্প্রাপ্য জিনিস ইউরোপীয় বাজারসমূহে গিয়ে পৌঁছে। এসব আমদানি নতুন নতুন প্রয়োজন মেটায়। এগুলি যেখানে যায় সেখানেই প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে এবং সঙ্গে সঙ্গে কিংবা অদূর ভবিষ্যতের জন্য সূক্ষ্ম পন্থায় উন্নতির নতুন নতুন দিক উন্মোচিত করে।
যে গুরুত্বপূর্ণ যুগসন্ধিক্ষণে পাশ্চাত্য মধ্যযুগীয় অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসছিল তখন কতগুলি শক্তির উদ্ভব হয় এবং তা ধর্মীয় প্রেরণার দ্বারা পরিপুষ্ট হয়। এসব শক্তি সামগ্রিকভাবে বাণিজ্যিক তৎপরতার মধ্যে গড়ে ওঠা অপর একটি ক্ষমতার পর্যায়ে প্রবেশ করে। পঞ্চদশ শতকে ইউরোপীয় কারুশিল্পীগণ রেনেসাঁর জন্য অপরিহার্য আড়ম্বরপূর্ণ ও লাভজনক শিল্পচর্চায় মুসলমানদের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন উদ্যমে প্রাচ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। মুসলিম পদ্ধতিগুলি গভীরতরভাবে পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণ করে তারা তাদের নিজস্ব পদ্ধতিগুলির পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সাধন করেন। এমনিভাবে তারা যেসব অলংকারমূলক অবদান লাভ করেন সেগুলি কেবল আয়ত্ত করেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তারা মুসলিম নকশার রীতিনীতিগুলি গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে শুরু করেন এবং সেগুলিকে এমন এক নতুন শিল্প সাধনার প্রেরণায় অঙ্গীভূত করেন যা ধারণার দিক দিয়ে পুরোপুরি ইউরোপীয়। কেবল ছোটখাট কারুশিল্পীরাই নন, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ন্যায় অসাধারণ ব্যক্তিরাও প্রাচ্যের অলংকার শিল্প নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তিনি ৭২ নং চিত্রের নকশাটি তাঁর একটি নোট বুকের খসড়া রেখাচিত্র থেকে রূপায়িত করেন। এত দ্বারা এ ধরনের পর্যালোচনায় তাঁর আগ্রহ সূচিত হয়েছে।
সব সময় প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ থেকে এসব অভিনবত্বের সূচনা হয়নি। ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে এ ধরনের প্রেরণা সৃষ্টিকারী একটি নতুন পদ্ধতির উদ্ভব হয়, এবং তা হচ্ছে 'নকশার বই'। এটি মুদ্রণযন্ত্রের একটি সমূহ অবদান। মূল সূত্রসমূহের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা যাদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না তারা এ ধরনের সংগ্রহের মাধ্যমে নতুন রীতিতে প্রখ্যাত শিল্পীদের গবেষণামূলক কাজের সঙ্গে পরিচিত হন। ফ্রান্সিস্কো ডি পেলেগরিনোর একটি দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ নকশার বইগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর দৃষ্টান্তগুলি সামগ্রিকভাবে মুসলিম নমুনা থেকে নেওয়া হয়েছে। এটি এবং পিটার ফ্লন্টার, ভার্জিল সলিস ও মার্টিনাস পেটাস প্রমুখের সমসাময়িক নকশার বই থেকে হোলবিন কর্তৃক অংকিত নকশাগুলির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা যেতে পারে। রৌপ্যকার ও অন্যান্য কারুশিল্পীর জন্য তিনি যেসব নকশা অংকন করেছেন সেগুলিতে মুসলিম শিল্প প্রেরণাকে অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে একটি মৌল রীতিতে রূপায়িত করা হয়েছে।
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ওলন্দাজ ও ইংরেজ প্রতিষ্ঠানগুলি ভাস্কোদাগামার ভারত অভিযানের সুফল ভোগ করতে থাকে। প্রাচ্য থেকে সরাসরি একটি নতুন বাণিজ্যের ধারা ক্রমবর্ধমানভাবে অব্যাহত থাকে এবং তা প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট হস্তশিল্প দ্রব্যকে প্রভাবিত করে। এসব দ্রব্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় তা মিটানোর জন্য এমনসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় যা আধুনিক শিল্পোন্নয়নকেও ম্লান করে দেয়। মুসলিম এশিয়া থেকে বাহ্যত তুচ্ছ বহু জিনিস আসতে থাকে যা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়ে এবং তা কেবল ইউরোপেই নয়, সমগ্র সভ্য জগতে ছড়িয়ে পড়ে। জাহাজ ভর্তি তুলা ও উজ্জ্বল বর্ণের নকশা সম্বলিত 'চিন্টজ' (সুতি কাপড়) বস্ত্রের ক্ষেত্রে নতুন প্রচলনের সূচনা করে। এর ফলে প্যারিসের উপকণ্ঠে বস্ত্রশিল্পের বিকাশ হয়, রানী অ্যানের আমলে মহিলারা সুদর্শন পোশাক লাভ করেন এবং পরবর্তীকালে ম্যানচেস্টার সম্পদশালী হয়ে ওঠে। পারস্য থেকে 'নতুন শাল' আসতে থাকে। প্রাচুর্যের অধিকারী 'নবাবরা' ভারত থেকে সম্ভবত মোগলদের জলপাত্রের অনুকরণে নির্মিত বিভিন্ন ধরনের চা ও কফির পাত্র নিয়ে আসেন। এগুলি ভিক্টোরিয়া যুগের ব্রেকফাস্টের টেবিলে সাধারণ ব্যবহার্য জিনিসে পরিণত হয় এবং কিছুটা সংশোধিত আকারে বর্তমান যুগেও অব্যাহত রয়েছে।
পাশ্চাত্যের শ্রদ্ধাভক্তি, শিক্ষা গ্রহণ, ব্যবসায়-বাণিজ্য ও কৌতূহল ইসলামের সূচনা থেকে মুসলিম নিপুণতার স্বাক্ষর বহনকারী জিনিসসমূহে প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের রুচির খোরাক লাভ করেছে। কিন্তু তাদের কারিগরি দক্ষতা ও সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য শিল্পীরা এমন একটি তহবিল থেকে পাশ্চাত্যের শিল্পকে ক্রমাগত উজ্জীবিত করে আসছে যা আমাদের কাছে কেবল একটি উত্তরাধিকারই নয়, বরং আমাদের পোষণকারী একটি বার্ষিক বৃত্তিও বটে। ১২৮৬ খৃস্টাব্দে ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবের প্রেসবিটারির মার্বেল পাথরের মেঝেতে খচিত করে ইসলামী নকশা অংকনকারী রোমের ওডারিকাস এবং ১৮৮৪ খৃস্টাব্দে নিজস্ব মখমলের উপর অপর একটি নকশা অংকনকারী উইলিয়াম মরিসের ন্যায় প্রখ্যাত কারুশিল্পী এবং তাদের পূর্ববর্তী, মধ্যবর্তী ও পরবর্তীকালের অসংখ্য শিল্পীর কারুকার্য এই সত্যটিই প্রতিষ্ঠিত করেছে।
টিকাঃ
১. এ সব নকশার রঙীন চিত্র এলয়স্-মুসিলের কুশেজর আমরায় পুনর্মুদ্রিত করা হয়েছে।
১. এডুয়ার্ডো সাভেড্রা দ্রষ্টব্য, 'নোট সার আন অ্যাস্টলেব অ্যারাবে' অ্যাট্রিডেলিভ কংগেম্মে ইন্টারনেযিওনেল ডেগলি ওরিয়েন্টালিস্ট, ১৮৭৮। ফিরেনয ১৮৮০।
১. ১৮২৮ খৃস্টাব্দে উৎকীর্ণলিপিটি প্রথম পাঠ করে এম রিনাউদ উপরোক্ত নামটি দিয়েছেন। কিন্তু এম ম্যাক্সভ্যান বার্চেম এটি সংশোধন করে ('নোটস ডি 'আর্কিওলজি অ্যারাবে' জার্নাল এসিয়াটিক, ১১শ সিরি, প্যারিস, ১৯০৪) পৈতৃক হানফার-এর স্থলে মানআহ্ নাম দিয়েছেন।
১. দ্রষ্টব্য: সিলি স্টেঞ্জ, বাগদাদ আন্ডার দি আব্বাসিও ক্যালিফেট। অক্সফোর্ড ১৯০০।
১. এম জে বোরগয়েন লি টেইট ডেস এনটিল্যাকস (প্যারিস, ১৮৭৯) গ্রন্থে এ ধরনের প্রায় দুইশত অদ্ভুত ডিজাইন বিশ্লেষণ করেছেন। ডঃ ইএইচ হ্যার্কিন (দি ড্রইং অব জিওমেটিক প্যাটার্নস ইন স্যারাসেনিক আর্ট, কলকাতা, ১৯২৫) কতিপয় উল্লেখযোগ্য জটিল নমুনা অস্বাভাবিক দক্ষতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করেছেন।
১. ফ্লোরেন্সের জৈনিক চিত্রকর ও ভাস্কর। তিনি ফন্টেন ব্লুতে প্রথম ফ্রান্সিসের দরবারে শিল্পচর্চা করতেন এবং ফ্রান্সে ফ্রান্সিস্কো ডি পেলেগ্রিন নামে পরিচিত ছিলেন। লা ফ্লিউর ডি লা সায়েন্স ডি পোর্টেকচার : প্যাটন্স ব্রডারি, ফ্যাকন অ্যারাবিক এট ইটালিক শিরোনামে ১৫৩০ খৃস্টাব্দে তার গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। গ্যাস্টন মিজিওমের পরিচিতিসহ এর একটি প্রতিরূপ সংস্করণ প্যারিস থেকে ১৯০৮ খৃস্টাব্দে প্রকাশিত হয়।
📄 ইসলামী শিল্পকলা এবং ইউরোপের চিত্রকলার ওপর এর প্রভাব
সপ্তদশ শতকের আগে মুসলিম চিত্রশিল্প ইউরোপে আনা হয়েছিল কিনা তাঁর কোন প্রমাণ নেই। রেমব্রান্টকেই প্রাচ্যের শিল্পকলার প্রতি যথেষ্ট আগ্রহশীল পাশ্চাত্যের প্রথম চিত্রকর মনে করা হতো। দূরপ্রাচ্য থেকে কতিপয় চিত্র হল্যান্ডে পৌঁছার পর তিনি সেগুলি নকল করেন। এগুলি ছিল দিল্লীর রাজকীয় পরিবারের সদস্যদের ছবি।
অতএব, ইউরোপে ব্যক্তিগতভাবে কোন শিল্পীর উপর মুসলিম বিশ্বের চিত্র শিল্পের কোন প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল না। তেমনি মুসলিম প্রাচ্যের প্রভাব কোন বড় রকমের চিত্রকলার আন্দোলনকে অনুপ্রাণিতও করেনি। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে ক্লাসিক্যাল শিল্পের প্রতি নতুন আবেগের ফলে ইটালীয় চিত্রকলায় যে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয় সেরূপ শিল্প চর্চায় মুসলমানদের কোন সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। খুঁজে পাওয়া গেলেও তা বাহ্যিক। ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে আরব প্রাধান্যের প্রাথমিক যুগেই এগুলি দেখা যায়। প্রাচ্যের নকশীবস্ত্র থেকে কিছু কিছু জীবজন্তুর ছবি নকল করা হয়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ একাদশ শতকে বিবলিওথেক ন্যাশনেলে (জাতীয় গ্রন্থাগার) বীটাসের অ্যাপক্যালিপসের টীকার পাণ্ডুলিপিতে এবং মধ্যযুগের প্রথম দিকের অন্যান্য কতিপয় পাণ্ডুলিপিতে এসব চিত্র দেখা যায়। কিন্তু মুসলিম সংস্কৃতির সঙ্গে খৃস্টান বিশ্বের সরাসরি যোগাযোগ এবং প্রাচ্যের শিল্প সৌকর্যমূলক জিনিস আমদানির ফলে ভাস্কর্য, স্থাপত্য কিংবা ধাতব শিল্পকর্মে যতটা অবদান সৃষ্টি হয়েছে চিত্রকলার ক্ষেত্রে তা আদৌ হয়নি। প্রাচ্যের উপাদানসমূহের কারুকার্যমূলক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ক্ষেত্রেই প্রধানত এর ভূমিকা দেখা যায় এবং সেখানেও ছোটখাট ব্যাপারেই তা সীমাবদ্ধ থাকে। এসব কারুকার্যমূলক উপাদান মুসলমানদের উৎপাদিত রেশমী বস্ত্র ও অন্যান্য শিল্প উপকরণ আমদানির মাধ্যমে পাশ্চাত্যের সংস্পর্শে এলেও এগুলি একান্তভাবে মুসলমানদের উদ্ভাবিত বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। মুসলমানরা তাদের পূর্বসূরিদের কাছ থেকে যেসব জিনিস লাভ করেছে সেগুলিও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। অতীতের এ ধরনের শৈল্পিক সম্পদের মধ্যে কালডিয়ার পবিত্র বৃক্ষের ন্যায় অত্যন্ত প্রাচীন কতিপয় প্রচলিত নকশাও রয়েছে। এই নকশাটি সাসানীয় শিল্পকলার মধ্য দিয়ে মুসলিম যুগে এসেছে। আদিম রীতি অনুসারে এই জীবন বৃক্ষটির দুপাশে দুটি জন্তু পরস্পরের মুখোমুখি থাকে। কিন্তু খৃস্টান শিল্পীরা প্রায়ই পবিত্র বৃক্ষের কেন্দ্রীয় উপাদানটি পরিহার করেছে। মুসলিম পূর্ববর্তী আদিম যুগের অন্যান্য চিত্রের মধ্যে একটি অপরটির শিকার দুটি জন্তু এবং একই দেহ ও দুই মস্তক বিশিষ্ট জন্তুর ছবি উল্লেখযোগ্য। এগুলি চিত্রকলার চাইতে ভাস্কর্যের মধ্যেই বেশি দেখা যায় এবং শেষোক্ত ক্ষেত্রে প্রায়ই অনুরূপ খোদাই শিল্প থেকে নকল করে গির্জার ক্যাপিটাল (স্তম্ভের শীর্ষদেশ) ও বাস-রিলিফে (পটভূমি থেকে উঁচু) খোদাই করা হয়। দ্বিতীয় রজারের (১১০১-৫৪ খৃ.) পালেরমোর প্যালেটাইন চ্যাপেলের নকশাশিল্পীদের ন্যায় যেসব মুসলিম শিল্পী মধ্যযুগের প্রথম দিকে খৃস্টান পৃষ্ঠপোষকদের জন্য কাজ করেন তাদের শিল্পকর্মে এধরনের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।
ক্রুসেডের আমলে মুসলিম প্রাচ্যের সঙ্গে অধিক পরিমাণ যোগাযোগের ফলে মুসলমানদের আলঙ্কারিক উপাদান সম্বলিত জিনিসপত্রের বিশেষভাবে আমদানি ঘটে। এ সময় জেনোয়া, পিসা ও ভেনিসের ন্যায় বাণিজ্যিক যোগাযোগ কেন্দ্রের দেশগুলিতে চিত্রশিল্পে এসব উপাদান প্রচলিত হয়। এর ফলে প্রধানত অপরিচিত জিনিসের প্রতি কৌতূহল ও আকর্ষণ থেকে প্রাচ্য বিশ্বের প্রতি একটি আগ্রহের সৃষ্টি হয়। এর প্রতিফলন ঘটে সিয়েনীয় চিত্রকলার প্রাথমিক দ্রব্যগুলিতে এবং তা আরো প্রাধান্য পায় টুসকান শিল্পে। চতুর্দশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধেই এসব ইটালীয় চিত্রে পাগড়িওয়ালা ছবি ও প্রাচ্যের মুখাবয়ব পরিদৃষ্ট হয়। কোন পবিত্র দৃশ্যে এসব বিদেশী ছবি সাধারণত প্রাধান্য পায় না। কেবলমাত্র আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রেই প্রাচ্যের প্রভাব বিশেষভাবে অনুভূত হয়। যেমন, পারস্য ও অন্যান্য কার্পেটের প্রতিলিপিতে, অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রাচ্যের পোশাকে এবং চিতা বাঘ, বানর ও তোতা পাখির ন্যায় ভিনদেশী জীবজন্তুর প্রচলনে। বিস্তারিত প্রাকৃতিক দৃশ্যেও প্রাচ্যের নকশার ইচ্ছাকৃত অনুকরণমূলক গাছপালা ও পত্রপুষ্প দেখা যায়।
কারুকার্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে প্রায়ই আরবী হস্তলিপি ব্যবহারের মধ্যে একটি বিশেষ প্রাচ্য বৈশিষ্ট্য ধার করার প্রমাণ পাওয়া যায়। এটি খৃস্টান শিল্পীদের উপর মুসলিম শিল্পের সরাসরি প্রভাবের অন্যতম প্রধান দৃষ্টান্ত যা ইউরোপীয় পণ্ডিত ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৮৪৬ খৃস্টাব্দে আডিয়েন ডি লং পারিয়ার কর্তৃক রিভিউ আর্কিওলজিক-এ তাঁর নিবন্ধ 'ডি এল এমপ্লয় ডেস কারেক্টার্স অ্যারাবেস ড্যান্স এল অর্নামেন্টেশন, চেযলেস পিউপলস্ ক্রেটিয়েন্স ডি এল অকসিডেন্ট' প্রকাশিত হওয়ার পর ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় এর দৃষ্টান্ত সংগৃহীত হয়। বার্লিংটন ম্যাগাযিন-এ মিঃ এইচ ক্রিস্টির অত্যন্ত সুচিন্তিত প্রবন্ধগুলিতে (১১শ ও ১২শ সংখ্যা 'দি ডেভেলপমেন্ট অব অর্নামেন্ট ফ্রম অ্যারাবিক স্ক্রিপ্টস')। ইটালীয় চিত্রকলায় চিত্রকর জটোর আমলেই এ ধরনের আরবী বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কারুকার্যের ব্যবহার দেখা যায় (যেমন পাড়ুয়ার অ্যারেনা চ্যাপেলে রিসারেকশন অব ল্যাযারাসে যিশুখৃস্টের ছবির ডান কাঁধের উপর)। এ ধরনের কারুকার্যের জন্য ফ্রা অ্যাঞ্জেলিকো এবং ফ্রালিপ্পো লিপপি বিশেষভাবে জনপ্রিয়। এখানে স্পষ্টত এ ধরনের নকশার মূল পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা থেকে ভার্জিনের আস্তিন এবং তাঁর পোশাকের প্রান্তভাগেও এই নকশা ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাচ্য থেকে আমদানিকৃত বহু ধরনের রেশমী ও সুতিবস্ত্র কিংবা প্রদীপ ও অন্যান্য পিতলের পাত্রই তাদের এ ধরনের নকশা জ্ঞানের সূত্র।
গ্রন্থপঞ্জি
স্যার টমাস ডব্লিউ আর্নল্ড, পেইন্টিং ইন ইসলাম, এ স্টাডি অব দি প্লেস অব পিক্টোরিয়াল আর্ট ইন মুসলিম কালচার, অক্সফোর্ড ১৯২৮।
টিকাঃ
১. ল্যাট্ (জে এবারসোন্ট, ওরিয়েন্ট এট্ অকসিডেন্ট পৃ. ১৯, প্যারিস, ১৯২৮)।
১. এগুলির একটি দীর্ঘ তালিকা সংকলিত হয়েছে, দ্রষ্টব্য-আঁদ্রে মাইকেল, হিস্টরি ডি লার্ট টি. আই ২ মি পার্টি, পৃ. ৮৮৩ এস কিউ কিউ (প্যারিস, ১৯০৫), এ ম্যারিগনান, আন হিস্টারিয়েন ডি লার্ট ফ্ল্যঙ্কয়েস লুই কোরাজড (৪র্থ অধ্যায়, এল' ইনফ্লুয়েন্স ওরিয়েন্টেল সুর লেস প্রভিন্সেস ডু নর্ড এটু ডু মিডি ডি এল ইটালী) (প্যারিস, ১৮৯৯)।
২. এ প্যাভলভস্কী 'ডেকোরেশন্স ডেস প্ল্যাফন্ডস ডি লা চ্যাপেল প্যালাটাইন' (বাইযেন্টিনিস্চ্ ফিটসচারিফ্ট, ২য়, ১৮৯৩)।
📄 স্থাপত্য শিল্প
এখন থেকে একযুগ পরে হয়তো কিছুটা আস্থার সঙ্গে স্থাপত্য শিল্পে মুসলিম বিশ্বের অবদান নিরূপণ করা সম্ভব হবে। অনুসন্ধানমূলক জ্ঞানচর্চার বর্তমান অবস্থায় মুসলিম স্থাপত্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্পর্কে এতটা সন্দেহ বিরাজ করছে যে, কেবলমাত্র ঘোরতর পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তিই তাঁর যুক্তি সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হতে পারে। এটি দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার যে, অতি সাম্প্রতিক গবেষণা যেখানে অনিশ্চিত বিষয়গুলির উপর আলোকপাত করার কথা, সেখানে তা আমাদের কাছে বিতর্কমূলক যুক্তি হিসাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
এসব ব্যাপার পরিণত যুগে মুসলিম স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে কিংবা পাশ্চাত্য বিশ্বে স্থাপত্যের বিবর্তনে এর প্রভাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। এগুলি বরং এর উদ্ভব এবং প্রাথমিক ভবনগুলির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাপার। এতদসত্ত্বেও মানবজাতির জন্য এর অবদানের ক্ষেত্রে এগুলির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে, কারণ এগুলি মূলত ইসলামী এরূপ কোন প্রমাণ পাওয়া না গেলে আমরা তাকে অবাধে ইসলামের অবদান হিসাবে মেনে নিতে পারি না। অপর কথায়, কারো কারো মতে মুসলিম স্থাপত্যে এমন বহু জিনিস রয়েছে যা অমুসলিম জাতিসমূহ থেকে ধার করা। কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তি এমনও মনে করেন যে, মুসলমানরা শুধুমাত্র স্থাপত্য রীতি ধার করেছেন এবং তাদের কোন উল্লেখযোগ্য নিজস্ব স্থাপত্য শিল্প নেই। এই মৌল প্রশ্নে উপসংহারে পৌঁছতে হলে সাধারণভাবে মুসলিম স্থাপত্যের উদ্ভব ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে প্রথমে একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া আবশ্যক।
আরবরা অর্ধ-শতাব্দীর মধ্যেই হেজাজ থেকে পশ্চিমে হারকিউলেসের পিলার পর্যন্ত এবং পূর্বে ভারতের সীমানা পর্যন্ত মরুভূমির ঘূর্ণিঝড়ের ন্যায় অগ্রসর হয়। যেসব দেশ ইতিপূর্বে সভ্যতা লাভ করে সেগুলি জয় করে। রোমান সাম্রাজ্যে সর্বাধিক উন্নতির যুগে যতোটা প্রসার লাভ করেছিল তারা তার চাইতে বিস্তৃততর এলাকায় নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে এবং এমন বহু জাতি তাদের কর্তৃত্বাধীনে আসে যাদের স্থাপত্য রোম থেকে পৃথক ধরনের ছিল এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের সভ্যতা রোম থেকে প্রাচীনও ছিল।
যারা আমাদের মধ্যযুগীয় পাশ্চাত্য স্থাপত্যের প্রধানত রোমান সূত্রে বিশ্বাস করেন এবং যারা এর প্রত্যেকটি ব্যাপারে ইরান বা আরমেনিয়ার সূত্র আরোপ করেন তাদের তীব্র বিতর্কের প্রেক্ষিতে প্রকৃত অবস্থা যাই হোকনা কেন, একটি বিষয় ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছে যে, শেষোক্ত বিষয়টির প্রতি আমাদের আরো গভীর মনোযোগ দেওয়া উচিত। আরমেনিয়া, মেসোপটেমিয়া ও তুর্কীস্তানে কতিপয় উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার কিছুটা বাদ-বিসম্বাদের সৃষ্টি করলেও তা আমাদের অতি-রোমান মনোভাবকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এমনো হতে পারে আমাদের 'রোমানেস্ক' ও গথিক ভবনগুলি রাজকীয় রোমের ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ভূত হয়েছে বলে রাজকীয় কর্তৃপক্ষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে বিশ্বাস পোষণ করতেন কিংবা রেনেসার পাণ্ডিত্যাভিমানী মানবতাবাদীরাও যা বিশ্বাস করতেন তা ভুল ধারণা প্রসূত। কারণ যাই হোক, একথা সুস্পষ্ট যে, বর্তমানে একটি নিরপেক্ষ মন নিয়ে আমাদের প্রাচ্যের দিকে তাকাতে হবে এবং প্রথমেই 'প্রাচ্যকে' একটি একক সত্তা হিসাবে মনে করার অভ্যাস পরিহার করতে হবে। আমরা রোমের কাছে ঋণী এই সত্যের প্রতি কেউ কদাচিৎ সন্দেহ পোষণ করে, কিন্তু আমাদের এই বাধ্যবাধকতার সীমা পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে।
আরব বিজয়ীরা যেসব অঞ্চল অধিকার করে তাঁর মধ্যে সিরিয়া, আরমেনিয়ার অংশবিশেষ এবং মিসরসহ উত্তর আফ্রিকার বসবাস উপযোগী অঞ্চলগুলি পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য থেকে অধিকৃত হয়। স্পেন ভিসিগথদের কাছ থেকে অধিকৃত হলেও ইতিপূর্বে এটি একটি রোমান প্রদেশ ছিল। মেসোপটেমিয়া থেকে তুর্কিস্তান পর্যন্ত ভূখণ্ড এবং আফগানিস্তান দ্বিতীয় খসরুর সাবেক সাসানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। খৃস্ট ধর্ম আর্মেনিয়ার পূর্ব সীমান্ত ও সিরিয়ায় প্রবেশ করে। সুদূর দক্ষিণে ইয়েমেনের সানায় (দক্ষিণ আরব) ষষ্ঠ শতকের একটি গির্জা ছিল। অতএব, বিজয়ীরা তাঁদের প্রত্যেকটি প্রদেশের প্রজাদের মধ্যে দক্ষ স্থপতিদের তৈরি অবস্থায় পায়। তাছাড়া তারা এমন বহু সংখ্যক ভবনও পায় যেগুলিকে তারা তাদের পূর্ববর্তী কপটিক (প্রাচীন মিসরীয়) ও ভিসিগথিক খৃস্টানদের ন্যায় পাথরের খনি হিসাবে ব্যবহার করে। এই অনস্বীকার্য বাস্তব অবস্থা থেকে অনেক কিছুর উদ্ভব হয়েছে। কিন্তু একথাও স্মরণ রাখতে হবে যে, আরবরা তাদের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলিতে এমনসব স্থানীয় নির্মাণ শিল্পীর সাক্ষাত পান যাদের নির্মাণ রীতি রোমানদের রীতির চাইতে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল এবং কোন কোন বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমতে বিশ্বাস স্থাপন করতে হলে তারা বাইজেন্টাইন স্থপতিদের এমনসব ব্যাপারে শিক্ষাদান করেছেন যার ফলে বাইজেন্টাইন স্থাপত্য রোমান স্থাপত্য থেকে আলাদা রূপ লাভ করে।
প্রাথমিককালের আরব বিজয়ীদের কোন স্থাপত্য দক্ষতা বা রুচি ছিল না বলে যে সাধারণ ও যুক্তিযুক্ত অভিমত দেওয়া হয় সে সম্পর্কে কোন বিতর্কে যাবো না। কারণ আপাত দৃষ্টিতে বিবেচনা করলে তেমনটিই মনে হতে পারে। তারা যে বিজয় গৌরবে দীপ্ত তা কেবল ধর্মীয় প্রেরণা্য উদ্বুদ্ধ একটি সৈনিক জাতির পক্ষেই সম্ভব, যাদের সময় প্রধানত সংগ্রাম ও ইবাদতেই অতিবাহিত হয়। তাছাড়া তারা শহরে বসবাসকারী ছিলেন না, তারা ছিলেন নিয়ত মুসাফির। তারা যখন যুদ্ধবিগ্রহ ছেড়ে শাসনকার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখনো নির্মাণ শিল্পের কারিগরি দক্ষতার জন্য স্থানীয় শিল্পীদের ওপর কিংবা (এবং এই ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ) একটি বিজিত এলাকা থেকে অপর এলাকায় নিয়ে আসা শিল্পীদের ওপর নির্ভর করেন। তাই জানা যায় যে, আরমেনীয় রাজমিস্ত্রীদের কেবল মিসরে নয়, স্পেনেও নিয়োজিত করা হয়। সম্ভবত ফ্রান্সের নবম শতকের জারমিনি-ডেস-প্রেস গির্জার নির্মাণ কাজেও তাদের নিয়োগ করা হয়, কারণ তাঁর মধ্যে কতিপয় মুসলিম বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু বিজয়ের প্রাথমিক বছরগুলিতে স্থাপত্য শিল্প সম্পর্কে আরবদের সম্ভাব্য অজ্ঞতা সত্ত্বেও মুসলিম স্থাপত্যের উল্লেখযোগ্য ও নিঃসন্দেহ দিক হচ্ছে, মৌলিকভাবে বিচিত্র হয়েও এটি সকল দেশে ও সকল যুগে নির্ভুলভাবে একটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখে। এর এমন একটি দিক রয়েছে, যা এটিকে সর্বপ্রকার স্থানীয় শিল্পকর্ম থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দান করেছে এবং এটিই কারিগরি ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব রূপের নিয়ামক।
যে কারণটি বহু বিচিত্র নির্মাণ আদর্শকে একক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন একটি রীতিতে রূপান্তরিত ও রূপায়িত করেছে তা হচ্ছে সম্ভবত ইসলামের বিশ্বাস। কারণ প্রথমদিকের আরবদের নির্মিত ভবনগুলি ছিল প্রধানত মসজিদ ও প্রাসাদ এবং পরবর্তী শতকগুলিতে যেসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য শিল্প-সমৃদ্ধ ভবন নির্মিত হয় সেগুলিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছিল মসজিদ কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় ভবন, যথা মাদ্রাসা ও মসজিদ সংলগ্ন ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র। মসজিদই ছিল আরবদের আদর্শমূলক ও প্রধান ভবন। বিভিন্ন এলাকায় আকারের দিক দিয়ে কিছু কিছু পার্থক্য থাকলেও এগুলির প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ থাকতো। মুসলিম বিশ্বের সকল এলাকা থেকে বার্ষিক হজ্জে গমন নিঃসন্দেহে একই বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মসজিদ সৃষ্টিতে অবদান রাখে, কারণ সুদীর্ঘ হজ্জযাত্রায় হাজীরা পথিমধ্যে স্থানীয় যে মসজিদটিতে নামায পড়তে যেতেন, সেখানে সংশ্লিষ্ট হাজী নির্মাণ শিল্পী বা স্থপতি হলে তিনি এর নকশাগুলি পর্যবেক্ষণ করতেন।
৬২২ খৃস্টাব্দে মহানবী কর্তৃক নির্মিত মদীনার আদি মসজিদটি অন্যসব মসজিদের আদর্শ ছিল। এটি ছিল চারদিকে ইট ও পাথরের প্রাচীর সমন্বিত একটি বর্গাকার বেষ্টনী। এর একটি অংশে ছাদ ছিল এবং সেটি সম্ভবত উত্তরাংশ, যেখানে মহানবী নামায পড়াতেন। এই ছাদ সম্ভবত খেজুর গাছের গুড়ির উপর খেজুর পাতাকে কাদায় আবৃত করে নির্মিত হয়। মুসল্লিরা উত্তরে পবিত্র জেরুজালেম শহরের দিকে মুখ করে সিজদা দিতেন। এবং এই দিক (কিবলাহ) কোন একটি পন্থায় চিহ্নিত করা হয়। ৬২৪ খৃস্টাব্দে জেরুজালেম থেকে মক্কার দিকে কিবলাহ পরিবর্তন করা হয়, অর্থাৎ (মদীনার ক্ষেত্রে) তা উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে পরিবর্তিত হয়। এরূপ একটি সাদাসিধে গৃহে কোন এলাকা থেকে স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ধার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়নি, কারণ স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজনও ছিল না।
পরবর্তী মসজিদটি নির্মিত হয় ৬৩৯ খৃস্টাব্দে মেসোপটেমিয়ার কুফা নগরে। মার্বেল স্তম্ভের উপরে এর ছাদ নির্মিত হয়। স্তম্ভগুলি হিরায় পারস্য রাজাদের একটি পরিত্যক্ত প্রাসাদ থেকে সংগ্রহ করা হয়। এই মসজিদটিও ছিল বর্গাকৃতির, কিন্তু তাঁর চারদিকে প্রাচীরের পরিবর্তে পরিখা ছিল। ৬৪২ খৃস্টাব্দে আমর কর্তৃক ফুসতাতে (কায়রো) একটি ছোট মসজিদ নির্মিত হয়। এটিও বর্গাকৃতির ছিল, কিন্তু কথিত আছে যে, এতে কোন উন্মুক্ত চত্বর (সাহন) ছিল না। এর মধ্যে নতুন বৈশিষ্ট্য ছিল একটি উঁচু মঞ্চ (মিম্বর)। কয়েক বছর পরে ইমামকে জনতা থেকে আলাদা রাখার জন্য এতে একটি মাকসুরাহ (পর্দা বা কাঠের জাফরী) প্রবর্তন করা হয়। বলা হয়, এই শতকের সমাপ্তিতে গম্বুজের আবির্ভাব ঘটে এবং তাঁর সামান্য কিছু দিন পরে কিবলাহ নির্দেশক মিহরাবের প্রবর্তন হয়, (চিত্র ৭৪)। এমনিভাবে মদীনা্য প্রথম মসজিদ নির্মিত হওয়ার আশি থেকে নব্বই বছরের মধ্যেই জামি মসজিদের সর্বপ্রকার অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব হয়। অন্য যেসব ছোটখাট বৈশিষ্ট্য সংযোজিত হয় সেগুলি হচ্ছে লাইওয়ানাত (আল-আইওয়ান-এর অপভ্রংশ লাইওয়ান-এর বহুবচন) নামে পরিচিত সাহন-এর চারদিকের খিলান শ্রেণী এবং ওযু করার ব্যবস্থা। এই ছোট তালিকায় সকল যুগের মসজিদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় সর্বপ্রকার প্রধান প্রধান বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
উপরোল্লিখিত মসজিদগুলির কোনটিতেই তাদের মূল কাঠামো রক্ষিত হয়নি। এমনকি পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের ফলে তাদের মূল পরিকল্পনাও হারিয়ে গেছে। কিন্তু পরিকল্পনাই হচ্ছে আসল ব্যাপার। কারণ আদি মসজিদটি কেবল একটি গৃহ ছিল এবং স্থাপত্য বলতে আমরা যা বুঝি তাঁর কোন নিদর্শন নিশ্চয়ই তাতে ছিল না। এতদসত্ত্বেও এম ভন বার্চেম এই প্রাথমিক মসজিদ পরিকল্পনার মূল ধারণার সঙ্গে খৃস্টান প্রাথমিক গির্জার তুলনা করেছেন: সাহন আটিয়াম (প্রধান কক্ষ) থেকে, প্রধান লাইওয়ান মূল গির্জা থেকে, মাকসুরাহ চান্সেল-স্ক্রিন (যাজকের জন্য সংরক্ষিত স্থান) থেকে, গম্বুজ গির্জার টাওয়ার থেকে এবং মিহরাব অ্যাপ্স (ছাদযুক্ত অর্ধ-বৃত্তাকার স্থান) থেকে উদ্ভূত হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের অনুমানের আদৌ প্রয়োজন ছিল না কিংবা তা যথাযথও নয়। আরবরা এই ধর্মীয় বেষ্টনী ও রক্ষিত স্থানকে স্থাপত্যশিল্পে রূপান্তরের পূর্বে এর মূল সূত্রের প্রশ্ন দেখা দেয়নি।
নিছক প্রয়োজনীয়তা থেকে মর্যাদা ও জাঁকজমকের অবস্থায় পৌঁছার চেষ্টা অত্যন্ত দ্রুত গতিসম্পন্ন ছিল। ইসলামী ধর্মীয় বিধানে অনাড়ম্বর জীবন এবং বহু নিষ্ঠাবান মুসলমানের কঠোর শৃঙ্খলপূর্ণ জীবন যাপনের কথা বিবেচনা করলে এই প্রচেষ্টা বিস্ময়কর বৈ কি! মহানবীর ইন্তিকালের বিশ বছরের মধ্যেই মদীনা্য তাঁর নিজস্ব মসজিদটিকে প্রাচীর ও সজ্জিত পাথরের পৈঠা দিয়ে পুনর্নির্মাণ করা হয়। ৬৩৯ খৃস্টাব্দে আরবদের জেরুজালেম বিজয়ের পর খলীফা ওমর সেখানে যে একটি স্থূল মসজিদ নির্মাণ করেন তাঁর পাশে সপ্তম শতকের শেষ বছরগুলিতে সাধারণত 'ডোম অব দি রক' কুব্বাতুস সাখরা নামে পরিচিত একটি সুরম্য প্রাসাদ নির্মিত হয়। মাশহাদ বা স্মৃতিসৌধের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বিশালকায় এই প্রাসাদটিতে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে কারুকার্য করা হয়েছে (চিত্র ৭৫)। এখান থেকেই মুসলমানদের স্থাপত্যশিল্প সম্পর্কে এখনো যে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে আমরা তাঁর কেন্দ্রস্থলে প্রবেশ করছি। ডোম অব দি রক (আরবী কুব্বাতুস সাখরা) একটি শ্রমসাধ্য ও সুসম্পন্ন ভবন। এটি এমন একটি মাশহাদ (স্মৃতিসৌধ) যেখানে তীর্থযাত্রীরা পাথরটির চারদিক প্রদক্ষিণ করে। মহানবী (সা) এখান থেকেই ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। তাছাড়া এটি এখনো অনুপম এবং অন্তত চারশ' বছর পর্যন্ত উন্মুক্ত চত্বরসহ বর্গাকৃতির স্বাভাবিক জামে মসজিদটির পরিবর্তন সাধনের কোন গুরুত্বপূর্ণ চেষ্টা করা হয়নি। তাই অত্যন্ত হঠকারিতার সঙ্গে অনুমান করা হয় যে, 'ডোম অব দি রক' একটি রোমান বা বাইজেন্টাইন রীতির ভবন, এটিকে সরাসরি পৌত্তলিক বা খৃস্টান আদর্শ থেকে নকল করা হয়েছে, এটি সম্পূর্ণভাবে খৃস্টান শ্রমশিল্পীরা তৈরি করেছে। সুতরাং এটি আরব শিল্পকর্মের প্রধান ধারার বাইরে একটি আলাদা স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেছে। এই অভিমতে কিছুটা সত্য থাকলেও এবং আপাত দৃষ্টিতে যথার্থ মনে হলেও তা কোন অবস্থায় জোর দিয়ে বলা যায় না।
পার্শ্ববর্তী অংশসহ উচ্চ গম্বুজ বিশিষ্ট নতুন রীতির এই ইমারতটি গড়ে তোলার পিছনে আরবদের একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছিল। ঐ মুসলমান ও ইহুদী উভয়ের কাছে পরম অনুরক্তের বস্তু জেরুজালেমের পবিত্র পাথরটিকে তারা গৌরবান্বিত ও সুরক্ষিত করতে চেয়েছিল। তারা এমন একটি ইমারত গড়তে চায় যা নিকটবর্তী হোলি সেপালচারের বিখ্যাত খৃস্টান গির্জাকে হার মানায়। নতুন মাশহাদ বিশাল সমতল ভূমির উপর 'হারাম শরীফ' বা পবিত্র স্থান নামে পরিচিত একটি প্রশস্ত পাথরের মালভূমির মধ্যস্থলে স্থাপন করা হয়। (একই সারিতে পরিকল্পনার কেন্দ্রস্থলের উপর ইতিপূর্বেই আল-আক্সা নামে একটি মসজিদ ছিল। এই আদি ভবনটির ইতিহাস এতই অস্পষ্ট ও জটিলতাপূর্ণ যে, এখানে তাঁর আলোচনা নিষ্ফল।) তাদের পবিত্র স্থানের সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য হিসাবে অঙ্গুরির ন্যায় গোলাকার উচ্চ গম্বুজ বিশিষ্ট ইমারতটি তৈরি করতে আরবরা অত্যন্ত বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়। একথা সত্য যে, তাদের পূর্ববর্তী রোমান বা বাইজেন্টাইনরা কোন সমাধি স্তম্ভ বা অন্যান্য পবিত্র স্থান সুরক্ষিত করার জন্য যেভাবে চূড়ান্ত ও নিয়ন্ত্রণকারী ভবন তৈরি করে এই গোলাকার গম্বুজ বিশিষ্ট ইমারতটি তৈরিতেও সেই পন্থা অনুসরণ করা হয়। কিন্তু এগুলিই বিশ্বে একমাত্র 'ডোম' (গোলাকার গম্বুজের ইমারত) ছিল না। ইরানীয় প্রেরণার প্রধান প্রবক্তা স্টেযিগোভস্কীর মতে-প্রাচ্যের গোলাকার গম্বুজের ইমারতের উদ্ভব এশিয়া মাইনরে কিংবা তাঁরো পূর্বদিকে, সেখান থেকে আরমেনিয়া হয়ে বাইজেন্টিয়ামে এবং বাইজেন্টিয়াম থেকে গ্রীক যাজকদের পৃষ্ঠপোষকতায় বলকান দেশসমূহে ও রাশিয়ায় এই রীতির প্রচলন হয়।
তাই আরবরা এখানে সর্বপ্রথম একটি গোলাকার গম্বুজের ইমারত তৈরি করলেও সেটিকে এমন এক বৈশিষ্ট্য প্রদান করেন যা একান্তভাবে খৃস্টানও ছিল না কিংবা রোমানও ছিল না। তারা সম্ভবত পার্শ্ববর্তী বিখ্যাত 'আনাসটাসিস' ডোমের নকল করেন। আকারের দিক দিয়ে এটি প্রায় একই রকমের। সপ্তম শতক শেষ হওয়ার বহু আগে সিরিয়া ও আর্মেনিয়ায় অবশ্যই গোলাকার গম্বুজ বিশিষ্ট গির্জা ছিল। ইতিপূর্বে ফিলিস্তিনেও 'ডোম অব দি রক' তথা একটি অষ্টভুজের অভ্যন্তরে উচ্চ গম্বুজ বিশিষ্ট গোল ইমারতের ন্যায় কয়েকটি গির্জা ছিল। অন্যান্য দিকে প্রাচীরগুলি হচ্ছে নিরেট পাথরের, আভ্যন্তরীণ খিলান পথের এবং জানালা পথের খিলানগুলি অর্ধ বৃত্তাকার এবং দুই সারিতে ব্যবহৃত স্তম্ভশ্রেণীর সবগুলি স্তম্ভ প্রাচীন। এসব স্তম্ভ পৌত্তলিক বা খৃস্টানদের প্রাচীনতর ভবনগুলি থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। তাই স্টাইলের দিক দিয়ে স্তম্ভগুলির নিচের দিকে কিংবা উপরিভাগে কোন সামঞ্জস্য নেই। খিলান শ্রেণীর নিচের দিকে বিশাল কাঠের বন্ধনী রয়েছে। এই এলাকায় যে ভূমিকম্প হতো সম্ভবত তা প্রতিরোধের জন্য কিংবা নির্মাণ শিল্পীরা শুধুমাত্র খিলানের উপর আস্থা স্থাপন করতে পারেনি বলেই এই ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয়। বাইজেন্টাইন ভবনগুলিতেও একই রকম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা দেখা যায়। 'ডোমটিও' স্বয়ং দ্বিগুণ। পুরোটা কাঠের তৈরি বাইরের দিক সীসায় এবং ভেতরের দিক নকশা করা প্লাস্টারে মোড়ানো। কিন্তু এটি মূল কাঠামো নয়। অনেকখানি মোজাইকের কাজ মূল অবস্থায় রয়েছে। অবশিষ্ট অধিকাংশ স্থানে পরবর্তীকালে কারুকার্য করা হয়েছে। অতএব আমরা দেখতে পাই যে, 'ডোম অব দি রক'-এ যা কিছু নতুনত্ব তা হচ্ছে গোলাকৃতির পরিকল্পনা, অর্ধবৃত্তাকার খিলান, কাঠের বন্ধনী এবং সম্ভবত মোজাইক। অর্ধ-বৃত্তাকার খিলান নিঃসন্দেহে আরবদের আবিষ্কার নয়, কাঠের বন্ধনীর উদ্ভব সন্দেহজনক এবং মোজাইকের প্রাচীনতম ব্যবহার প্রাক ইসলামী যুগের।
ডোম অব দি রক-এর পরে সময়ানুক্রমিকভাবে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম ভবন হচ্ছে অষ্টম শতকের সূচনায় নির্মিত দামেস্কের বিশাল জামে মসজিদ (চিত্র ৭৬)। এর প্রধান লাইওয়ান বা সংরক্ষিত এলাকা হচ্ছে একটি সুউচ্চ কক্ষ। যে খিলানপথ এটিকে সাহন থেকে পৃথক করেছে, সেখানে বিভিন্ন দরজা বা পর্দা রয়েছে। সাহন-এর অপর তিনদিক খিলান দেওয়া বারান্দায় ঘেরা। এই মসজিদের নতুন বৈশিষ্ট্যগুলি নানা রকমের। প্রধান লাইওয়ানের তিনটি গলিপথ একটি আড়াআড়ি পার্শ্বদেশে নিয়ে শেষ হয়েছে। পার্শ্বদেশের মাঝামাঝি উপরে একটি অর্ধবৃত্তাকার ছাদ রয়েছে। পার্শ্বদেশের প্রান্তভাগে অর্থাৎ প্রধান লাইওয়ানের দক্ষিণ দিকের প্রাচীরের মধ্যস্থলে কিবলাহ নির্দেশিত একটি মিহরাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় চত্বরের চারপাশের খিলান শ্রেণী কিছু অংশ পিলপার ওপরে এবং কিছু অংশ থামের ওপরে অবস্থিত। খিলানগুলি 'অশ্বনাল' আকৃতির। কোন সুস্পষ্ট কারণ না থাকলেও এগুলি পরবর্তীকালে পাশ্চাত্য মুসলিম স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য লাভ করে। অশ্বনাল গোলাকারও হতে পারে, কিংবা উপরিভাগ ছুঁচালোও হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে এর বক্রতা নিচের দিকে থামের উপরিভাগ পর্যন্ত প্রসারিত হয়। দামেস্কে গোলাকার অশ্বনাল খিলান ব্যবহৃত হয়। সাহন-এর চতুর্দিকে প্রধান খিলান শ্রেণীর ওপরে অর্ধবৃত্তের ন্যায় উপরিভাগ সমন্বিত সারিবদ্ধ জানালা রয়েছে। প্রতিটি খিলানের ওপর দুটি করে জানালা। যে টেমেনস্-এর অভ্যন্তরে মসজিদটি নির্মিত হয় তাঁর চারকোণে এক সময় যে চারটি রোমান টাওয়ার ছিল, এবং যেগুলিকে আরবরা মিনার হিসাবে ব্যবহার করতেন তাঁর মধ্যে বর্তমানে কেবল একটি (দক্ষিণ পশ্চিম কোণে) অবশিষ্ট আছে। বর্তমানের অপর তিনটি পরবর্তীকালে তৈরি করা হয়েছে। ভবনটির অভ্যন্তর ভাগ মার্বেল, মোজাইক এবং রঙীন কাচের জানালার সাহায্যে অপরূপভাবে সুসজ্জিত করা হয়েছে। যেসব সিরীয় গির্জাকে মসজিদে রূপান্তরিত করা হয়েছে সম্ভবত সেগুলির নির্মাণ প্রণালীতে প্রভাবিত হয়েই এই মসজিদটির অস্বাভাবিক পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিবলাহর গুরুত্ব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই সম্ভবত অভ্যন্তরভাগে একটি পার্শ্বদেশ এবং সংরক্ষিত এলাকার মধ্যস্থলে একটি অর্ধগোলাকার ছাদের প্রবর্তন করা হয়েছে। বর্তমানে তৃতীয়বারের মত একটি মিহরাব-এর মাধ্যমে এই কিবলাহ নির্দেশিত হয়েছে। মিহরাব সম্ভবত একটি মৌল ধারণা। বিশ্বের যে অংশে চক্ষু রোগ অত্যন্ত সাধারণ, সেখানে এ ধরনের ব্যবস্থা স্বাভাবিক। এক সময় জনৈক বৃদ্ধ শেখ আমার কাছে উপরোক্ত মন্তব্য করেন। মিহরাবটি দেওয়ালে ফাঁক সৃষ্টি করে কুলঙ্গী আকারে এ জন্য তৈরি করা হয়েছে যাতে দেওয়াল হাতড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় অন্ধ লোকও তা চিনতে পারে। অথবা খৃস্টানদের 'অ্যাপ্স' থেকেও ধারণাটি নেওয়া হতে পারে। প্রাক ইসলামিক যুগে পাথরে খোদাই করা অশ্বনাল খিলান দেখা যায়। কিন্তু দামেস্কের অশ্বনাল খিলানই প্রাচীনতম নিদর্শন, যেখানে এটিকে সত্যিকারের কাঠামোগত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। মিনারের উদ্দেশ্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট : মুয়াজ্জিন কর্তৃক আযান দেওয়ার সুবিধার্থেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। খৃস্টান ও ইহুদীরা যেভাবে উপাসনাকারীদের আহবান জানায়, তাঁর বিকল্প হিসাবে সম্ভবত ইচ্ছা করেই এই ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। খৃস্টানরা ঘণ্টাধ্বনি করে ও ইহুদীরা সিঙ্গাধ্বনি করে উপাসনাকারীদের আহবান জানায়। আযান দেওয়ার জন্য মিনার ব্যবহারের দৃষ্টান্ত মনে হয় দামেস্কে প্রথম দেখা যায়।
যে প্রাচীনতম মিনারটি এখনো টিকে আছে, সেটি তিউনিসের নিকটে কায়রওয়ানের বিশালকায় জামে মসজিদে অবস্থিত। খলীফা হিশামের রাজত্বকালে (৭২৪-৪৩) এটি নির্মিত হয়। বিরাট বিশাল এই মিনারটি ক্রমশ সরু হয়ে উপরের দিকে উঠেছে, এর পার্শ্বদেশে ফোকর রয়েছে এবং উপরের দিকে দুটি পর্যায় রয়েছে। একটি পর্যায় পরবর্তীকালে নির্মিত হয়। এ কথা যদি সত্য হয় যে, দামেস্কের চারটি মিনারই এ ধরনের প্রথম দৃষ্টান্ত তাহলেও এরূপ ধরে নেওয়া যায় না যে, কায়রওয়ানের মিনারের ন্যায় এমন সাদাসিধে কাঠামো সিরিয়া বা অন্য কোন বিশেষ স্থানের অবদান, এটি অত্যন্ত সহজ সরল পন্থায় ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা মিটানোর একটি প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে কায়রওয়ানের জামে মসজিদটির বিভিন্ন সময়ে সংস্কার সাধন করা হলেও নবম শতকের শেষভাগে যে আকারে এটি পুনর্নিমিত হয় সেই আকারটি প্রধানত অক্ষুণ্ণ থাকে। ৭৩২ খৃস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত তিউনিসের যয়তুনাহ মসজিদটি জামে মসজিদের আর একটি প্রাচীন ও চমকপ্রদ দৃষ্টান্ত। এর খিলান পথ প্রাচীন স্তম্ভের উপর অপ্রীতিকরভাবে তৈরি কৃত্রিম খিলানের সাহায্যে নির্মাণ করা হয়েছে। থামের উপরিভাগে আড়াআড়ি কাঠের সঙ্গে যুক্ত করে কাঠের পৈঠা বা আবাসী স্থাপন করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা বহু প্রাচীন মুসলিম ভবনের সৌন্দর্য ক্ষুণ্ণ করে।
স্পেনের কর্ডোভার বিরাট মসজিদটির নির্মাণ কাজ ৭৮৬ খৃস্টাব্দে শুরু হয় এবং ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকে (চিত্র ৭৭)। দশম শতকে এর এলাকা দ্বিগুণেরও বেশি সম্প্রসারিত করা হলেও বর্তমান কাঠামো গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এখনো এর মূল আকার সম্পর্কে ধারণা করা যায়। এই জামে মসজিদটির অত্যন্ত গভীর একটি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে। এতে খিলান শ্রেণী দ্বারা বিচ্ছিন্ন এগারটি মধ্যবর্তী পথ রয়েছে এবং প্রত্যেক খিলান শ্রেণীতে বিশটি স্তম্ভ রয়েছে। ইতিপূর্বে উল্লিখিত অন্যান্য ক্ষেত্রের ন্যায় এসব স্তম্ভও প্রাচীনতর রোমান ভবন থেকে সংগৃহীত হয়েছে। সংরক্ষিত এলাকার আকার বিশাল হওয়ায় সে অনুপাতে অনেক উঁচু ছাদ দিতে হয়েছে। বস্তুত উপরিভাগে সাধারণ অশ্বনাল খিলানসহ প্রাপ্ত থামগুলির তুলনায় ছাদটি অনেক বেশি উঁচু হয়। ফলে আরো উপরের পর্যায়ে দ্বিতীয় খিলান শ্রেণী তৈরি করতে হয়। এতে এমন একটি জটিল ও অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি হয় যা মোটেই প্রীতিকর নয়। অতএব আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, তৈরিভাবে প্রাপ্ত প্রাচীন স্তম্ভগুলি কায়রওয়ান ও কর্ডোভা উভয় ক্ষেত্রেই খিলান শ্রেণীর সামগ্রিক নকশাকে প্রভাবিত করেছে। অথচ ইট বা পাথরের পিলপা প্রবর্তন করা হলে কিংবা বিশেষভাবে তৈরি লম্বা থাম ব্যবহার করা হলে এরূপ অপ্রীতিকর স্থাপত্য কৌশল পরিহার করা যেতো। কর্ডোভার সমগ্র মসজিদটি ঠেস দেওয়া উঁচু দেওয়ালে পরিবেষ্টিত এবং এর সাহন-এর চারদিকে খিলান শ্রেণী রয়েছে।
এবারে মেসোপটেমিয়ায় ফিরে আসা যাক। এখানকার বিভিন্ন মসজিদ এদেশের ঐতিহ্যগত ইটের রীতিতে নির্মিত হয়েছে, এবং মদীনার মসজিদের আদর্শের সঙ্গে কায়রোর বিখ্যাত ইবনে তুলুন মসজিদের সংযোগ স্থাপন করেছে। এই মধ্যবর্তী দৃষ্টান্তগুলির মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে উখাইদির, রাক্কাহ্, আবু দুলাফ ও সামাররার মসজিদ। প্রথম দুটি মসজিদ অষ্টম শতকের শেষভাগে এবং অপর দুটি নবম শতকের মধ্যভাগে নির্মিত হয়েছে বলে বর্তমানে ধারণা করা হয়। সবগুলিতেই সাসানীয় স্থাপত্যের ঐতিহ্য রক্ষা করা হয়েছে এবং সবগুলিতেই জামে মসজিদের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পরলোকগত গার্টরুড বেল-এর বিষয়ভিত্তিক বিবরণ গ্রন্থে উখাইদিরে অবস্থিত মসজিদটির এমন অপরূপ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে যে, তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে সূক্ষ্মাগ্র খিলান পরবর্তীকালে পাশ্চাত্য গথিক স্থাপত্যে সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয় উপরোক্ত গ্রন্থে তাঁর মৌল রূপের পরিচয় পাওয়া যায়। বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সাসানীয় খিলান অর্ধ-বৃত্তাকার হলেও মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে ছুঁচালো খিলানের প্রাচীন দৃষ্টান্তও পাওয়া যায়। সম্ভবত এর আগে মেসোপটেমিয়ায় অশ্বনাল খিলান ব্যবহৃত হতো। সিরীয় গির্জাগুলিতে ঐ ধরনের কয়েকটি খিলান দেখা যায় (যেমন, আনু: ৫৬৪ খৃস্টাব্দে নির্মিত কাসর ইবনে ওয়ার্দান গির্জায়), এবং প্রকৃত পক্ষে ইটালির চিউসিতে একটি গ্রীক দৃষ্টান্তও রয়েছে। মাসহাত্তার ন্যায় উখাইদিরের খিলানগুলি ছুঁচালো ডিম্বাকৃতির এবং কিছুটা উত্তোলিত। কিন্তু রাক্কাহতে অবস্থিত বাগদাদ ফটকে এবং সামাররার নিকটে আবু দুলাফের খিলান পরবর্তী মুসলিম স্থাপত্য রীতি অনুযায়ী বক্রাকার। অষ্টম শতকের শেষের দিকে মেসোপটেমিয়ার অন্যান্য সর্বপ্রকার খিলান-আকারের স্থলে এই রীতিটি প্রবর্তিত হয়। এর অনেক আগে ভারতে মাঝে মাঝে যেসব ছুঁচালো খিলান দেখা যায়, সেগুলি নিরেট পাথর কেটে তৈরি করা হয় এবং সেদিক দিয়ে বিবেচনা করা হলে এগুলি আদৌ খিলান নয়।
সামাররার মসজিদটি বিশাল আকারের। এর যথেষ্ট ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে। মক্কার দিকে গভীর সংরক্ষিত এলাকাসহ এর একটি সাহন রয়েছে। সাহন-এর অপর দিকগুলিতে রয়েছে বেশ গভীর দরদালান। ইটের তৈরি বিশাল বেষ্টনী প্রাচীরের প্রত্যেক কোণে গোলাকার টাওয়ার এবং মধ্যবর্তী অর্ধবৃত্তাকার টাওয়ার রয়েছে। সংরক্ষিত এলাকার দক্ষিণ দিকের প্রাচীরে সূক্ষ্মাগ্র বা কারুকার্য মণ্ডিত উপরিভাগ সমন্বিত ছোট ছোট গবাক্ষের সারি রয়েছে। এই উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য কর্ডোভাতে দেখা যায় এবং হ্যাভেলের মতে এগুলি হয়তো বৌদ্ধ ভারতের অবদান। অন্যথায় পাশ্চাত্যের শিল্পকর্মে বৈশিষ্ট্য সৃষ্টিকারী এই অবদান একান্তভাবে মুসলমানদের (চিত্র ৭৮)। আরো গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে- খিলান শ্রেণী ধরে রাখার জন্যে কর্ডোভা ও অন্যান্য স্থানের ন্যায় প্রাচীন স্তম্ভের স্থলে ইটের পিলপা ব্যবহার। এ সব পিলপা একটি বর্গাকৃতির ভিত্তির উপরে অষ্টভুজ আকারের। প্রত্যেক পিলপার সঙ্গে গোলাকার অথবা অষ্টভুজ আকারের চারটি করে মার্বেলের দণ্ডভাগ রয়েছে। দণ্ডভাগগুলি ধাতব কব্জা দ্বারা সংযুক্ত এবং এগুলির উপরিভাগ ঘণ্টাকৃতির। এখানেও আমরা আর একটি বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই যা পাশ্চাত্য স্থাপত্যের অঙ্গীভূত হয়েছে। সামাররায় ও পরবর্তীকালে ইবনে তুলুনে ব্যবহৃত অদ্ভুত ধরনের পেঁচালো মিনারের দৃষ্টান্ত পরবর্তীকালে কোথাও দেখা যায় না।
কায়রোর ইবনে তুলুন মসজিদটির নির্মাণ কাজ ৮৭৬ খৃস্টাব্দে শুরু হয়। বহু লেখক এর বিস্তারিত বর্ণনা দিলেও আমরা যখন উপলব্ধি করি যে, এর উল্লেখযোগ্য কতগুলি বৈশিষ্ট্য মেসোপটেমিয়ার প্রাচীনতর ভবনগুলিতে পূর্ব থেকেই বিদ্যমান ছিল, তখন মুসলিম স্থাপত্যের ইতিহাসে এর গুরুত্ব কিছুটা হ্রাস পায়। এটি প্রায় বর্গাকৃতির একটি বিরাট জামে মসজিদ। সাহন-এর চারদিকে খিলান দেওয়া দরদালান রয়েছে (চিত্র ৭৯) এবং সংরক্ষিত লাইওয়ান অন্যান্য কিছুর চাইতে অনেক গভীর। প্রধান প্রাচীরগুলির বাইরে একটি উন্মুক্ত বেষ্টনী চত্বর (যিয়াদা) রয়েছে। এ ধরনের বৈশিষ্ট্য ইতিপূর্বে কোথাও দেখা যায়নি। বাইরের প্রাচীরগুলি অত্যন্ত বিরাট ও পুরু এবং সেগুলিতে কারুকার্য করা যেসব ফোকর রয়েছে তা ছিদ্র ও ঝুঁটিওয়ালা গথিক দুর্গ প্রাচীরের আদর্শে নির্মিত বলে ধরা যায়। (আসিরিয়ার খৃস্টপূর্ব অষ্টম শতকে এবং মিসরে তাঁরও পূর্বে বিভিন্ন ধরনের ফোকর ব্যবহৃত হতো।) ফোকরের নিচে একটি ছুঁচালো গবাক্ষ সারি ছিদ্রযুক্ত প্লাস্টারের পর্দায় আবৃত। প্রতিটি গবাক্ষের পর পর একটি করে ছুঁচালো কুলঙ্গী রয়েছে যেগুলির উপরিভাগ সূক্ষ্মাগ্র। ইটের তৈরি বড় বড় পিলপার সাহায্যে খিলান শ্রেণী তৈরি করা হয়েছে। এর বিভিন্ন কোণে রয়েছে ইটের স্তম্ভ দণ্ড। সব কিছুর উপরে রয়েছে ছুঁচালো খিলান শ্রেণী যেগুলির নিচের দিক অনেকটা 'অশ্বনালের' ন্যায় বাঁকা। এমনিভাবে কাঠের ছাদ পর্যন্ত সমস্ত কাঠামোটি ইটের তৈরি এবং পরিষ্কার বা কারুকার্য করা চুনাবালিতে আবৃত। অতিশয়োক্তি না করে একথা বলা যেতে পারে যে, এই মসজিদটি সবদিক দিয়ে মেসোপটেমীয় রীতিতে তৈরি এবং এর প্রতিষ্ঠাতা যৌবনে সামাররা ও বাগদাদের মসজিদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ায় তাঁর কিছু কিছু দৃষ্টান্তও এখানে সংযোজিত হয়েছে। ইতিমধ্যে উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি ছাড়াও এতে অন্য যেসব অভিনবত্ব রয়েছে তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কাঠের ওপর কুফী উৎকীর্ণলিপি (নকশার কাজে অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে হস্তলিপি ব্যবহার) এবং কার্যত সকল দৃশ্যমান উপরিভাগের ওপর রঙের কারুকার্য। সাদা চুনাবালির ওপর ছাড়াও সিলিংয়ের কাঠের ওপর রঙের কারুকার্য করা হয়েছে। স্পষ্ট নকশার একটি মিহরাব কুলঙ্গী রয়েছে; সাহন-এর কেন্দ্রস্থলে একটি ফোয়ারা রয়েছে (মূলত এখানে কাঠের অর্ধ বৃত্তাকার একটি ছাদ ছিল); এবং ছাদ থেকে ঝুলন্ত আড়ম্বরপূর্ণ বাতির ঝাড় রয়েছে।
নবম শতকের সমাপ্তি থেকে দ্বাদশ শতকের সমাপ্তি পর্যন্ত যে সব মসজিদ টিকে আছে সেগুলির সংখ্যা বেশি নয়। এসময় বহু সামরিক স্থাপত্যের সৃষ্টি হয়েছে। একথা স্বীকার করা হয় যে, এ ব্যাপারে ক্রুসেডাররা সিরিয়া ও মিসর থেকে বহু ধারণা সংগ্রহ করে, কারণ এর কয়েক শতক আগে সিরিয়া ও আর্মেনিয়ায় দুর্গ নির্মাণ কৌশল উচ্চতর পর্যায়ে বিকশিত হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ ইউরোপীয়রা এই সূত্র থেকেই 'ম্যাচিকলেশন' -এর ব্যবহার শেখে।
কায়রোর দুর্গ সম্পর্কিত নিজস্ব রচনার পরিশিষ্ট মিঃ কে এ সি ক্রেসওয়েল ম্যাচিকলেশনের উদ্ভব পর্যালোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সিরিয়ায় যে দশটি তথাকথিত দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে তাঁর মধ্যে ছয়-সাতটি এমন এক ধরনের পায়খানা (ল্যাটিন) যা সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত সাধারণ ব্যাপার। বস্তুত জার্সীর গোরিতে অবলম্বন মঞ্চের (পীয়ার) উপর এ ধরনের একটি পায়খানা এখনো ব্যবহৃত হয়। অবশিষ্ট যে তিনটি সম্ভবত উপর থেকে কোন কিছু নিক্ষেপের জন্য ব্যবহৃত হয় তাঁর মধ্যে প্রাচীনতমটির তারিখ হচ্ছে ৬ষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি সময়ের। ইসলাম তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মিঃ ক্রেসওয়েলের এসব দৃষ্টান্ত দেওয়ার পর সিরিয়ার রুসাফার নিকটে কাসর আল-হেয়ার-এ একটি মুসলিম দৃষ্টান্ত আবিষ্কৃত হয়েছে। এটির তারিখ ৭২৯ খৃস্টাব্দ। আরমেনীয় রাজমিস্ত্রীদের দ্বারা তৈরি কায়রোর একটি ফটক বাব আন-নাসর-এর (১০৮৭) উপরে দুটি রয়েছে। এগুলি স্পষ্টত প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিষ্ঠিত ম্যাচিকোলিস (চিত্র ৮০)। এর এক শতক পরে ইউরোপে সর্বপ্রথম এসব দৃষ্টান্ত দেখা যায়, যেমন শাটো গাইলার্ড (১১৮৪), শাটিলন (১১৮৬), নরউইচ (১১৮৭) এবং উইনচেষ্টার (১১৯৩)। অতএব এটা স্পষ্ট যে, এই ধারণাটি ক্রুসেডারগণ স্যারাসেনদের কাছ থেকে ধার করেছেন। কিন্তু স্যারাসেনরা ক্রুসেডারদের কাছ থেকে নয়। কালক্রমে চতুর্দশ শতকের ফরাসী ও ইংরেজ দুর্গসমূহে সারিবদ্ধ করবেলের (দেওয়াল থেকে উদগত অবলম্বন) উপর ম্যাচিকলেশন অত্যন্ত ব্যাপক হয়ে পড়ে (চিত্র ৮১)।
মিসর ও সিরিয়া থেকে ধার করা সামরিক স্থাপত্যের অপর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কোন দুর্গের 'সমকোণী' বা 'বক্র' প্রবেশ পথ। দেওয়ালের ফটকের মধ্যে এমনভাবে এই প্রবেশপথ তৈরি করা হয় যাতে শত্রুপক্ষ প্রবেশপথে পৌঁছার পর এর মধ্যদিয়ে ভেতরের চত্বরে কোন কিছু দেখতে বা নিক্ষেপ করতে না পারে। রোমান বা বাইজেন্টাইন সমর বিজ্ঞানে এ ধরনের প্রবেশ পথের জ্ঞান ছিল বলে প্রতীয়মান হয় না। যেখানে পর্যায়ক্রমিক প্রতিরক্ষা ফটকগুলি একই সরল পথে প্রপুগনাকুলাম নামে পরিচিত এলাকার পর পর স্থাপিত হতো। যত দূর জানা যায় এসব বাঁকা প্রবেশপথ সর্বপ্রথম বাগদাদের 'গোলাকার নগরীতে' ব্যবহৃত হয় (অষ্টম শতক)। পুনরায় কায়রোতে সালাহউদ্দীনের দুর্গে এগুলি দেখা যায় (শুরু ১১৭৬)। চূড়ান্ত পর্যায়ে আলেপ্পোর দুর্গে এর অপরূপ দৃষ্টান্ত পরিদৃষ্ট হয়। বুমারিসে একটি উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত থাকলেও ইংল্যাণ্ডে এগুলি কদাচিৎ দেখা যায়। ফ্রান্সে এগুলি অধিকতর জনপ্রিয় ছিল। দৃষ্টান্তস্বরূপ কারকাসোনের কথা উল্লেখযোগ্য। এই দুটি দেশে অধিকতর সুরক্ষিত দুর্গে অসমান্তরাল প্রবেশপথ প্রাধান্য লাভ করে, যেমনটি পিয়েরেফান্ডস্ ও কনওয়েতে দেখা যায়।
ত্রয়োদশ শতকের সূচনায় পুরাতন দিল্লীতে নির্মাণকার্য শুরু হওয়ার আগে গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম ইমারত ছিল না। এশীয় তুরস্কেও তেমন কিছু ছিল না। কোনিয়া্য সেলজুক ইমারতগুলি পুরাতন দিল্লীর ন্যায় একই সময়ে শুরু হয়। স্পেন ও উত্তর আফ্রিকায় সামরিক স্থাপত্য ছাড়া প্রধান ধ্বংসাবশেষগুলি হচ্ছে কর্ডোভার মসজিদের পরবর্তী স্থাপত্যকর্ম এবং সেভিল (জিরাল্ডা টাওয়ার, ১১৭২-৯৫) ও রাবাতের অপরূপ মিনার। কর্ডোভা মসজিদের উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ কাজ দশম শতকের শেষার্ধে সম্পন্ন হয়। সেভিল ও রাবাতের মিনারগুলি সূক্ষ্মাগ্র খিলান শ্রেণী দ্বারা সুসজ্জিত, যা পাথরের উপর কারুকার্যের পরবর্তী গথিক স্থাপত্যে দেখা যায় (চিত্র ৮২)। এই শিল্পকর্ম বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে অত্যন্ত চমকপ্রদ। এর মধ্যে গম্বুজ নির্মাণের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিকও রয়েছে। কিন্তু এটি স্থাপত্যের বিকাশে স্পেনের বাইরে কোন প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি। সিসিলিতে কাপেলা প্যালাটিনা ১১৩২ খৃস্টাব্দে, মার্টোরানা গির্জা ১১৩৬ খৃস্টাব্দে, লা যিযা ১১৫৪ খৃস্টাব্দে এবং লা কিউবা ১১৮০ খৃস্টাব্দে নির্মিত হয়। এগুলিই স্বীকৃত তারিখ এবং তা এই দ্বীপে, মুসলিম শাসনের আওতার বাইরে। কারণ পালের্মোতে ১০৬০ খৃস্টাব্দে এবং সামগ্রিকভাবে সিসিলিতে ১০৯০ খৃস্টাব্দে মুসলিম শাসনের অবসান হয়। কিন্তু নর্ম্যানদের দ্বারা নির্মিত হলেও এগুলিতে অবিমিশ্র স্যারাসেনিক বৈশিষ্ট্যসমূহ পুরোপুরি বর্তমান। এসব বৈশিষ্ট্য ইটালীর মূল ভূখণ্ডে আমাল্ফি এবং সালের্নোতেও দেখা যায়। পারস্যে এ সময়কার প্রধান ভবনগুলি হচ্ছে ইস্পাহানের জুমা মসজিদ এবং মসুলের বিশাল মসজিদ (আনুঃ ১১৪৫-৯১)। উভয়টিই বিরাট জামে মসজিদ। কিন্তু প্রথমোক্তটির অনেক পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে। পারস্যের মসজিদগুলি ইটের তৈরি হওয়ায় চুনাবালির রিলিফ এবং মিনা করা টালির সাহায্যে সেগুলিকে অলংকৃত করা হয়েছে। শেষোক্ত ফ্যাশানটি পরবর্তীকালে সিরিয়া ও মিসরের ন্যায় যেসব দেশে পাথর ব্যবহার করা হতো সেসব দেশেও প্রবর্তিত হয়। মিনারগুলি সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় স্থাপন করা হতো। আকারে নলের মতো, উপরের দিকে ক্রমশ কিছুটা সরু এবং উজ্জ্বল বর্ণের টালি দ্বারা আবৃত। এম সালাদিন সেগুলিকে কিছুটা নির্দয়ভাবে কারখানার চিমনির সঙ্গে তুলনা করেছেন। কিন্তু সেগুলি অবশ্যই তা নয়। পারস্যও আগ্রহের সঙ্গে এই অদ্ভুত 'স্ট্যালাকটাইট' (লম্বমান কোণাকৃতির) নকশা অভিনন্দিত করেছে। পরবর্তী অনুচ্ছেদে তা আলোচনা করা হয়েছে।
'সিরীয়-মিসরীয়' রীতির প্রধান দৃষ্টান্তগুলি সবই কায়রোতে দেখা যায় এবং সেগুলি হচ্ছে, বিরাটাকার জামে মসজিদ আল-আযহার (৯৭০) ও আল-হাকিম (৯৯০-১০১২), ছোট জামে মসজিদ আল-আকমার (১১২৫) এবং ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ সমাধি-মসজিদ আল যুয়ুশী (১০৮৫)। আল-আযহার ও আল আকমারে খিলান শ্রেণী প্রাচীন স্তম্ভের উপর স্থাপিত এবং আল-হাকিমে সেগুলি ইটের উত্তরণ মঞ্চের (পীয়ার) ওপর প্রতিষ্ঠিত। নিকটবর্তী মুকাত্তাম পাহাড়ে উৎকৃষ্ট চুনা পাথর থাকা সত্ত্বেও আল-হাকিমে স্যারাসেনিক কায়রোতে সর্বপ্রথম পাথর ব্যবহৃত হয়। স্পষ্টত কায়রো এতদিন পর্যন্ত মেসোপটেমীয় ঐতিহ্যের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট ছিল। আল যুয়ুশী মসজিদটি সমাধি-মসজিদের প্রথম দৃষ্টান্ত। পরবর্তীকালে এই রীতির ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। এই মসজিদটিতে প্রতিষ্ঠাতার সমাধির ওপর একটি গম্বুজ রয়েছে এবং দক্ষিণ দিকের দেওয়ালে রয়েছে মিহরাব। সাহনটি ছোট এবং সাহন ও গম্বুজের মধ্যস্থলে একটি খিলান দেওয়া আভ্যন্তরীণ পার্শ্বদেশ রয়েছে। এতে বর্গাকৃতির তিন পর্যায়ের একটি মিনার রয়েছে এবং অতি উঁচুতে ছোট একটি গম্বুজ রয়েছে। এ ধরনের গম্বুজ সিসিলীয় গির্জাগুলিতে দেখা যায়। মুসলিম স্থাপত্যের ইতিহাসে গম্বুজের বিবর্তন সব চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যেহেতু পাশ্চাত্য স্থাপত্যে ইসলামের অবদানের ক্ষেত্রে এর কোন সুস্পষ্ট সম্পর্ক নেই, সেহেতু বর্তমান সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনায় তা পরিহার করা যেতে পারে। একই কারণে 'স্ট্যালাকটাইটের' (লম্বমান কোণাকৃতির নকশা) যে অপরূপ বৈশিষ্ট্য মুসলমানরা সর্বত্র অনুসরণ করেছেন এবং যা ভারত থেকে স্পেন পর্যন্ত তাদের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসাবে চিহ্নিত, তাঁর উদ্ভব নিয়ে আলোচনা করাও কোন মানে হয় না। সম্ভবত মেসোপটেমীয় সূত্র থেকে উদ্ভূত এই বৈশিষ্ট্য আল-যুয়ুশী মসজিদের মিনারে নির্ভরযোগ্যভাবে প্রথম দেখা যায়। এরপর আল-আকমার মসজিদের সম্মুখ ভাগে এটি পরিদৃষ্ট হয়। এখানে এটিকে আলঙ্কারিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে শম্বুক সদৃশ অনেকগুলি কুলঙ্গিও খোদাই করা হয়েছে। এগুলি অতি পরিচিত রেনেসাঁর ঝিনুক কুলঙ্গির আদর্শ নয় কি? এই যুগের কায়রো মসজিদগুলিতে অপর একটি বিস্তারিত দিক হচ্ছে 'করাত কাঁটার' ন্যায় ফোকর (চিত্র ৮২) এবং এটিও সম্ভবত মেসোপটেমিয়া থেকে উদ্ভূত। ভেনিসের ডিউক প্রাসাদ ও অন্যান্য প্রাসাদের স্থাপত্যে এই উপাদানটি সম্ভবত প্রেরণা সৃষ্টি করেছে।
ত্রয়োদশ শতক থেকে পরবর্তীকালে আমরা এর সবগুলি এলাকায় মুসলিম স্থাপত্যের অনেক ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাই। এ সময় সিসিলিকে বাদ দিয়ে ভারত ও তুরস্ককে তালিকাভুক্ত করতে হয়। স্পেনে আল হামরা ও আল কাসর নামে পরিচিত গুরুত্বপূর্ণ প্রাসাদ রয়েছে। এগুলি তাদের ব্যাপক ও অপরূপ কারুকার্যের জন্য বিখ্যাত। অন্যদিকে এখানকার পরবর্তীকালের মূরীয় ভবনগুলি প্রথম শ্রেণীর পর্যায়ের পড়ে না। কায়রো ১৫১৭ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত মসজিদ ও সমাধির অতুলনীয় পর্যায়ক্রমিক নিদর্শন সৃষ্টি করেছে। অতঃপর শহরটি তুর্কীদের অধিকারে যায় এবং তখন থেকে যে অল্প কয়টি মসজিদ নির্মিত হয়েছে সেগুলি ওসমানীয় রীতি অনুসরণ করে। আনাতোলিয়া ১২০০ থেকে ১৪৫৩ খৃ. পর্যন্ত কেনিয়া ও ব্রুসায় পর্যায়ক্রমিকভাবে অত্যন্ত চমকপ্রদ কয়েকটি নিদর্শন তুলে ধরে। এরপর কনস্টান্টিনোপল তুরস্কের রাজধানীতে পরিণত হয়। এ সময় থেকে ওসমানীয় স্থাপত্য বাইজেন্টিয়াম স্মৃতিসৌধগুলির অবাধ অনুকরণ শুরু করে। এমনকি সুদূর কায়রো বা দামেস্কের নির্মাণকার্যেও তা অনুসরণ করা হয়। পরবর্তীকালে পারস্য, তুর্কীস্তান ও ভারতে মুসলিম স্থাপত্যের এক অপরিমিত সম্পদ গড়ে ওঠে। ভারতে এই স্থাপত্য ঐতিহ্য আধুনিককাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত স্থানীয় বৈশিষ্ট্য পরবর্তীকালে স্যারাসেনিক স্থাপত্যকে পাঁচটি প্রধান শ্রেণীতে বিভক্ত করে: সিরীয়-মিসরীয়, হিস্পানো-মোরেস্ক, পারস্য, ওসমানীয় ও ভারতীয়। এসব পার্থক্য আংশিকভাবে স্থানীয় উপাদানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠলেও স্থানীয় নির্মাণ ঐতিহ্যই তাঁর মূল ভিত্তি।
'মধ্যযুগে' মসজিদ পরিকল্পনায় ব্যাপক বৈচিত্র্য ও বিকাশ ঘটে। জামে মসজিদের নির্মাণকাজ কোন কোন দেশে অব্যাহত থাকে। গম্বুজওয়ালা সমাধি মসজিদ অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দ্বাদশ শতকে প্রবর্তিত মাদ্রাসা (মসজিদ সংলগ্ন বিদ্যালয়) এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। গম্বুজ মুসলিম স্থাপত্যের একটি জনপ্রিয় বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। কায়রোতে এর আকার ছিল সাধারণত সুদৃঢ়। পারস্য ও তুর্কীস্তানে বাল্ব বা ডিম্বাকার প্রাধান্য লাভ করে। অপরদিকে কনস্টান্টিনোপলে মসজিদগুলিতে নিচু বাইজেন্টাইন গম্বুজ প্রবর্তন করা হয়। (চিত্র ৮৩) বাহ্যিক দিক দিয়ে পঞ্চদশ শতকে মিসরের পাথরের গম্বুজগুলিতে জরির ন্যায় নকশা অংকন করা হয়। পারস্যে সেগুলি উজ্জ্বল ঝলসানো টালি দ্বারা আবৃত করা হয়। লম্বমান (স্ট্যালাকটাইট) খিলানের উপর সেগুলি স্থাপন করা হয়। বস্তুত এই স্ট্যালাকটাইট সর্বত্র ব্যবহার করা হতো এবং প্রায়ই অতিরিক্ত পরিমাণে ব্যবহার করা হতো। এগুলি কোন কোন সময় সীলিং থেকে আমাদের বৈদ্যুতিক পাখার উপরিভাগের ন্যায় ঝুলন্ত থাকে। স্যারাসেন গম্বুজ পাশ্চাত্যের রেনেসাঁ গম্বুজকে প্রভাবিত না করলেও এটি সম্ভব বলে মনে হয় যে, অত্যন্ত সুদর্শন মুসলিম মিনার বিশেষ করে চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকের কায়রোর মিনারগুলি ইটালীর পরবর্তীকালের রেনেসাঁ ক্যাম্পানিলিকে প্রভাবিত করেছে এবং সেখান থেকেই রেন-এর কতিপয় সুদর্শন সিটি স্টাপল-এর উদ্ভব হয়েছে। ইতিমধ্যে মুসলিম স্থপতিরা গম্বুজ ও মিনারকে পার্থক্যমূলক-ভাবে ব্যবহারের সম্ভাবনা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করতে শুরু করেন, যেমনটি রেন পরবর্তীকালে সেন্ট পল গির্জায় অত্যন্ত সার্থকভাবে গম্বুজ ও টাওয়ারের পার্থক্য সৃষ্টি করেছেন। পারস্যের কিছুটা বিদঘুটে ধরনের নলাকার মিনার এবং ওসমানীয় তুর্কীদের পেনসিল আকারের মিনার তাদের নিজস্ব দেশের বাইরে কখনো প্রসার লাভ করেনি।
স্যারাসেনিক স্থাপত্যের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে গোলাকার অশ্বনাল ও সূক্ষ্মাগ্র অশ্বনাল খিলানের জনপ্রিয়তাও অব্যাহত থাকে। অর্ধ-বৃত্তাকার এবং সাধারণ সূক্ষ্মাগ্র বা দুই কেন্দ্রবিশিষ্ট খিলান প্রায়ই ব্যবহৃত হতো। এবং তথাকথিত 'পারস্য' খিলান—যেখানে বাঁকা অংশ সরল রেখায় পরিণত হয়—মূল দেশে এবং অন্যান্য স্থানে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এটি কিছুটা আমাদের 'টিউডর' খিলানের ন্যায় (চিত্র ৮৩)। বিচিত্র নকশা সম্বলিত বা সূক্ষ্মাগ্র খিলান সাধারণ ব্যাপার হয়ে পড়ে। সাধারণ খিলানের উপরিভাগে নানা রকম কারুকার্য করা হয়। ফোকরগুলিকে পত্রালঙ্কারে কিংবা করাতকাঁটা কেটে শোভিত করা হয়। গবাক্ষ পথ ছিদ্র করা পাথরের কারুকার্য কিংবা পাথর বা চুনাবালির জাফরিতে ভরে দেওয়া হতো। রংকরা কাচের সাহায্যে সেগুলিকে ঔজ্জ্বল্য প্রদান করা হতো। সম্ভবত পাশ্চাত্য দেশগুলিতে তখনো রঞ্জিত কাচের ব্যবহার প্রবর্তিত হয়নি। চুনাবালির ওপর অঙ্কিত করে অথবা কাঠ বা পাথরের ওপর খোদাই করে অলংকারমূলক হস্তলিপি ব্যবহার করা হতো এবং পালাক্রমে জ্যামিতিক নকশা অঙ্কন করা হতো, কারণ স্বাভাবিক চিত্র ব্যবহার ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ ছিল। মিসরের ভবনগুলিকে উঁচু রিলিফে সুস্পষ্ট খোদাই কদাচিৎ দেখা যায়, (চিত্র ৮৪) যদিও ভারতে হয়তো এ ধরনের দৃষ্টান্ত রয়েছে। খোদাই করা না হলেও অত্যন্ত সূক্ষ্ম জ্যামিতিক নকশার অবাধ ব্যবহারের মাধ্যমে ঐ ধরনের একটা রূপ ফুটিয়ে তোলা হতো এবং পাথর বা চুনাবালির উপর খোদাইয়ের পরিবর্তে ছেদন করে তা করা হতো। আরো পূর্বদিকে পারস্যে এবং বিশেষভাবে তুর্কীস্তানে, যেখানে ইটই হচ্ছে নির্মাণ কাজের স্বাভাবিক উপাদান, সেখানে প্রচুর পরিমাণে উজ্জ্বলতাপূর্ণ টালি ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘকাল পর্যন্ত নকশার কাজে জ্যামিতিক বা বিমূর্ত আকারই জনপ্রিয় ছিল। এরপর পত্রপুষ্প নকশা প্রবর্তনের মাধ্যমে অধিকতর স্বাভাবিক কারুকার্যের আবির্ভাব ঘটে। ইংল্যান্ডে এলিজাবেথীয় যুগ থেকে নীচু রিলিফে অঙ্কিত যে সব প্রচলিত নকশাকে 'অ্যারাবেস্ক' নামে অভিহিত করা হয় তাঁর দ্বারা এই ইঙ্গিতই পাওয়া যায় যে, এ ক্ষেত্রে আমরা মধ্যযুগের আরবদের কাছে কিছুটা ঋণী। অন্যত্র তেমনভাবে ব্যবহৃত না হলেও কায়রোতে অত্যন্ত সাধারণ অপর একটি নকশারীতি হচ্ছে আড়াআড়িভাবে পালাক্রমে অনুজ্জ্বল ও উজ্জ্বল পাথর ব্যবহার। এর সূত্র হয়তো রোম বা বাইজেন্টিয়ামে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। কারণ সেখানে পাথরের দেওয়ালে প্রায়ই ইটের 'জরির রেখা' প্রবর্তিত হতো। কিন্তু এতে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। তাই পিসা, জেনোয়া, সিয়েনা, ফ্লোরেন্স ও অন্যান্য ইটালীয় নগরীতে মার্বেল ভবনগুলির ডোরাকাটা সম্মুখভাগের নকশা কায়রোরই অবদান। কারণ এই নগরীর সঙ্গে মধ্য যুগে তাদের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। ওভার্নি-এর (ফ্রান্স) লি পাইতে একই ধরনের বিচিত্রবর্ণ সৌকর্য পরিদৃষ্ট হয় এবং নর্দাম্পটনের সেন্ট পিটার গির্জায় তাঁর কাছাকাছি জিনিস দেখা যায়।
বর্তমান পর্যালোচনায় উল্লিখিত বহু বিষয় সম্পর্কে এক কথায় বলতে গেলে একথা সুস্পষ্ট যে, সার্বিকভাবে স্থাপত্যের ক্ষেত্রে ইসলামের কাছে পাশ্চাত্য বিশ্বের ঋণ প্রচুর। কেবলমাত্র সামরিক স্থাপত্যের ক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি যে, যে ক্রুসেডাররা পবিত্র ভূমিতে বহু সুন্দর সুন্দর গির্জা ও দুর্গ রেখে গেছেন তারা নিজেরাই স্যারাসেন শত্রুদের কাছ থেকে দুর্গ নির্মাণের কৌশল আয়ত্ত করেছেন। অপরদিকে স্যারাসেনরা তাঁদের ক্ষেত্রে আরমেনীয় রাজমিস্ত্রীদের নৈপুণ্যের দ্বারা লাভবান হয়েছেন।
প্রাক ইসলামী যুগের আর্মেনিয়া ও সিরিয়ার প্রস্তর নির্মিত ভবন এবং ইরানের ইট নির্মিত ভবনের (আমাদের মধ্যযুগীয় খিলান করা ছাদের উৎস সম্পর্কে পণ্ডিত ব্যক্তিরা ক্রমবর্ধমানভাবে শেষোক্তটিকেই সূত্র হিসাবে মনে করেন) কাছে আমাদের সর্বপ্রকার ঋণের কথা বাদ দিলেও আমরা সিরিয়া ও অন্যান্য স্থানের মুসলিম ভবনগুলিকে সূক্ষ্মাগ্র খিলানের প্রবর্তক বলে যুক্তিযুক্তভাবে ধরে নিতে পারি। প্রায় সুনিশ্চিতভাবে ওজী খিলান এবং সম্ভবত 'টিউডর' খিলানও একই সূত্র থেকে উদ্ভব হয়েছে। সূক্ষ্মাগ্র বা বিচিত্র নকশা সম্বলিত খিলানও এই সূত্র থেকে এসেছে। তেমনি বিভিন্ন পর্যায়ে পাথরের উপর সূক্ষ্ম কারুকার্যের প্রচলন এখান থেকেই হয়। প্রাথমিক মসজিদগুলির পাথরে এবং চুনবালিতে ছেদন করে যেসব জ্যামিতিক জাফরি তৈরি করা হয়েছে সম্ভবত সেখান থেকেই থালার উপর সূক্ষ্ম কারুকার্যের প্রচলন হয়েছে। কিংবা এগুলি আরো অতীতের প্রাক ইসলামী সিরীয় বা মেসোপটেমীয় ভবনগুলিরও অবদান হতে পারে। কখনো কখনো বলা হয় যে, রঙীন কাচ (স্টেইন্ড গ্লাস) প্রাচ্যে আবিষ্কৃত হয়েছে, কিন্তু এটি প্রমাণিত হয়নি। গথিক খিলানকরা ছাদের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উত্তরণ মঞ্চের (পীয়ার) চারকোণে স্তম্ভদণ্ড ব্যবহার অষ্টম বা নবম শতকের একটি স্যারাসেনিক অবদান। কারুকার্যমণ্ডিত ও ছিদ্রকরা ফোকর মেসোপটেমিয়া থেকে কায়রোতে এসেছে এবং এখান থেকে ইটালীতে প্রচলিত হয়েছে। পরবর্তীকালে এটি গথিক স্থাপত্যের একটি বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ের গথিক শিল্পকর্মে খোদাই করা যে সব উৎকীর্ণলিপি নকশা হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে তা নবম শতকের কায়রোর ইবনে তুলুন মসজিদ থেকে অনুকৃত। কিন্তু সুদূর ফ্রান্সে কুফীরীতির উৎকীর্ণলিপি তাঁর দক্ষিণাঞ্চলের প্রদেশগুলিতে মুসলিম অধিকারের সময় প্রবর্তিত হয়েছে। এমনকি ইংল্যাণ্ডে ক্বচিৎ-কদাচিৎ এ জাতীয় যে দু-একটি নিদর্শন দেখা যায় তাও আরব প্রভাব বলে মনে করা হয়। (চিত্র ৮৫) ডোরাকাটা সম্মুখভাগ এবং এমনকি রেনেসাঁ যুগের ক্যাম্পানিলি ও শম্বুক-কুলঙ্গির নকশাও সম্ভবত কায়রোর অবদান। কোন ভবনের মহিলাদের কক্ষগুলিকে গোপন রাখার জন্য কিংবা মসজিদের পর্দা হিসাবে ব্যবহৃত আরব মাশরাবিইয়া বা কাষ্ঠনির্মিত জাফরি ইংরেজদের ধাতব গ্রিলে নকল করা হয়েছে। 'অ্যারাবেস্ক' বা বুটিদার কাপড়ের নকশার মাধ্যমে উপরিভাগে নিচু রিলিফের কারুকার্য এবং কারুকার্যে জ্যামিতিক নকশার ব্যবহার অবশ্যই মুসলমানদের কাছে আমাদের ঋণের একটি দিক। তারা আমাদের অনেকখানি জ্যামিতিক জ্ঞানের সূত্রও বটে।
উপরে সুনির্দিষ্ট দিকগুলিই আলোচনা করা হলো। কিন্তু ক্রুসেডের সময় এবং (আরো আপোসে) মধ্যযুগের শেষভাগে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ঘটে তাঁর স্থাপত্যের ক্ষেত্রে আবশ্যিকভাবে অন্যান্য যেসব প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে তা এই দ্রুত ও ভাসাভাসা আলোচনায় দৃষ্টির বাইরে থেকে যায়। স্পেনে নকশার ক্ষেত্রে মূরীয় ঐতিহ্য রেনেসাঁ যুগের শেষভাগ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে এবং স্পেনীয় গথিক স্থাপত্যের বহু জটিলতা ও বৈশিষ্ট্য সৃষ্টির পিছনে অবদান রাখে। সর্বশেষে একথা বলা যায় যে, কোন কোন দূরতর দেশে মুসলিম নির্মাণ শিল্পের বিকাশ এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং এর পরিধি এক হাজার বছরেরও বেশি।
টিকাঃ
১. জিব্রাল্টার প্রণালীর দুই দিকে সমুদ্র তীরবর্তী দুটি পার্বত্য ভূখণ্ড--একটি স্পেনের জিব্রান্টারে এবং অপরটি উত্তর মরক্কোর জেবেল মুসায় অবস্থিত।-অনুবাদক।
১. বি এবং ই এম হুইসাও, অ্যারাবিক স্পেন (লগুন, ১৯১২), পৃ ১২২।
১. জে স্টেযিগোভঙ্কী, অরিজিন অব ক্রিশ্চিয়ান চার্ট আর্ট (অক্সফোর্ড, ১৯২৩), পৃ ৬৪।
১. এনসাইক্লোপেডিয়া অব ইসলাম: প্রবন্ধ 'আর্কিটেক্চার' ।
২. বর্তমানে এই মতবাদ অগ্রাহ্য করা হয়।
১. জে স্টেজিগোভঙ্গী, ওপি, সি আইটি, পৃ. ২৭।
১. মিরের আরবী শব্দ মা'জানা এরূপ একটি স্থানের ইঙ্গিত দেয় যেখান থেকে নামাযের আযান দেওয়া হয়, আ যিনি আযান দেন তিনিই হচ্ছেন মুয়াজ্জিন।
১. জি এল বেল, প্যালেস এন্ড মস্ক এট উন্নাইদির (অক্সফোর্ড, ১৯১৪)
২. পশ্চিম ইউরোপে দ্বাদশ থেকে ষোড়শ শতকে বিকশিত বিশেষ স্থাপত্য রীতি, যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সূক্ষ্মাগ্র খিলান, খিলান দেওয়া ঠেস, পাঁজরার ন্যায় খিলান করা ছাদ, খাড়া ছাদ প্রভৃতি। -অনুবাদক
১. ইবি হ্যাভেল, ইন্ডিয়ান আর্কিটেকচার (২য় সংস্করণ, লন্ডন, ১৯২৭), পৃষ্ঠা ৮৫-৬।
২. আমার লেখা মোহামেডান আর্কিটেকচার এটসেটরা-এর তৃতীয় অধ্যায় দ্রষ্টব্য (অক্সফোর্ড, ১৯২৪)।
১. ম্যাচিকলেশনঃ ঘন ঘন সন্নিবেশিত দেওয়াল সংলগ্ন ব্র্যাকেট ব্যবস্থা যা একটি উদগত নিচু পাঁচিলের সৃষ্টি করে। প্রতি জোড়া ব্রাকেটের মধ্যস্থলে একটি ফাঁকে (ফরাসী মাচিকুলিস) বদ্ধ অবস্থায় একটি ঠেলা দরজা থাকে। অবরোধকারীরা দেওয়ালের নিচে বিস্ফোরক দ্রব্য স্থাপনের চেষ্টা করলে এসব ফাঁক পথে তাদের মাথার উপর তীর, গরম তেল বা পানি এবং অন্যান্য জিনিস নিক্ষেপ করা যেতে পারে। ম্যাচিকলেশনের স্থলে হোর্ডেস (হোর্ডিং) বা ব্রিটিশ নামে পরিচিত কাঠের গ্যালারি প্রবর্তিত হয়েছে এবং এগুলি একই উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।
২. কায়রোর দুর্গ সম্পর্কিত নিজস্ব রচনার পরিশিষ্ট মিঃ কে এ সি ক্রেসওয়েল ম্যাচিকলেশনের উদ্ভব পর্যালোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সিরিয়ায় যে দশটি তথাকথিত দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে তাঁর মধ্যে ছয়-সাতটি এমন এক ধরনের পায়খানা (ল্যাটিন) যা সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত সাধারণ ব্যাপার। বস্তুত জার্সীর গোরিতে অবলম্বন মঞ্চের (পীয়ার) উপর এ ধরনের একটি পায়খানা এখনো ব্যবহৃত হয়। অবশিষ্ট যে তিনটি সম্ভবত উপর থেকে কোন কিছু নিক্ষেপের জন্য ব্যবহৃত হয় তাঁর মধ্যে প্রাচীনতমটির তারিখ হচ্ছে ৬ষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি সময়ের।
১. সংশ্লিষ্ট সবগুলি প্রশ্নে আমার মোহামেডান আর্কিটেকচার, এটসেটরা (অক্সফোর্ড, ১৯২৪) গ্রন্থের 'নেচার অব স্যারাসেনিক অর্ণামেন্ট' শীর্ষক ১০ অধ্যায় দ্রষ্টব্য।
২. দুপাশে ইংরেজী 'এস' আকৃতির বক্র রেখা সমন্বিত সূক্ষ্মাগ্র খিলান। -অনুবাদক।
১. বেল টাওয়ার, সাধারণত গির্জার কাছাকাছি নির্মিত হয়। অনুবাদক।
২. কোন ভবনের বিশেষত গির্জার প্রধান অংশ থেকে উঁচু টাওয়ার, যার চূড়া সাধারণত সরু হয়। -অনুবাদক।
১. যেমন লি পাই ক্যাথিডালের আণ্ডার পোর্চের একটি চ্যাপেলে প্রখ্যাত খৃস্টান খোদাই শিল্পী গওফ্রিডাস কর্তৃক উৎকীর্ণ কাঠের দরজা। লা ভাউট চিলহাকের গির্জায়ও অনুরূপ আরেকটি দরজা রয়েছে। ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবির বেদির উপর উত্তোলিত তাকে (রিটেব্ল্) এবং প্রাথমিক যুগের কতিপয় রঙীন কাচের জানালায় যেসব ডোরাকাটা নকশা অঙ্কন করা হয়েছে-প্রফেসর লিখ্যাবির মতে সেগুলিও একই সূত্র থেকে এসেছে। বার্লিংটন ম্যাগাযিন-এ (৯ম-১২শ খণ্ড, ১৯২২) এ এইচ ক্রিস্টির 'দি ডেভেলপমেন্ট অব অর্নামেন্ট ফ্রম অ্যারাবিক স্ক্রিপ্ট' নিবন্ধ দ্রষ্টব্য।